12.01.2017

পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী’র বিরধিতার আগে জেনে নিন যা করছেন তা কি ইসলাম সম্মত

আরবি মিলাদ শব্দের অর্থ হচ্ছে জন্ম। আর ঈদে মীলাদুন নবী অর্থ রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিলাদত(জন্মদিন) শরীফ উপলক্ষে খুশি উদযাপন করা। উনার জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করা।

পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা কুরআন শরীফ এর হুকুম অনুসারে মুফতি মুহাদ্দিস ভেদে ফরয/ওয়াজিব/সুন্নত/মুস্তাহাব। তবে পালন করাটা সবথেকে উত্তম, না করলে যদিও কোন গুনাহ নাই কিন্তু মাহরুম হবে নেকি থেকে। তবে বিরোধিতা করা গুমরাহি অর্থাৎ কুফুরীর অন্তর্ভুক্ত।

আজকের দিনের পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা নিয়ম নিতির পরিবর্তে আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে, আজ যেভাবে র‍্যালী- মীলাদ মাহফিল করে ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন হচ্ছে, সেভাবে পবিত্র ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন তো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা উনার সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন করেননি। যেই কাজ রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা উনার সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন করেননি আমরা কিভাবে সেই কাজ করতে পারি? আমরা কি রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উনার সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন উনাদের চেয়েও বেশী ভালোবাসি??

এহেন মূর্খতাসুলভ কথার পরিপ্রেক্ষিতে একটি কথাই বলবো যে, কুরআন শরীফ বা হাদিস শরীফ এর এমন কোনো আয়াত শরীফ বা হাদিস শরীফ নেই যেখানে মহান আল্লাহ পাক বা রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা বলেছেন যে, হে আমার বান্দা বা উম্মতেরা তোমরা এমন কোনো কাজ করো না যা আমি বা আমার সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু করেননি। বরং ইসলামে নতুন সৃষ্ট ভালো কাজকে সর্বদাই উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন বিদয়াতে হাসানা পছন্দ করেছেন।

যেমনঃ হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন নিয়মিত ভাবে তারাবীর পবিত্র নামায জামাত সহকারে পড়া আরম্ভ করলেন, (দেখুন বুখারী শরীফ, তারাবিহ অধ্যায় ১৮৮৩ নং হাদিস শরীফ) তখনতো কোনো সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমকে এই প্রশ্ন করেননি যে, হে উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যে কাজ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিতভাবে করেননি সেই কাজ(জামায়াতে তারাবী) আপনি কেনো নিয়মিতভাবে করছেন? আপনি কি দ্বীন রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চেয়ে বেশি বুঝেন?

কোনো সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে এ প্রশ্ন করেননি, কেননা উনারা জানতেন এ কাজ উত্তম, এ বিদয়াত ভালো(হাসানাহ), এ নব্যসৃষ্টি ভালো। তাইতো হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একে "নে'মাতু বিদয়াতিল হাযিহি" অর্থাৎ উত্তম বিদআত বলে আখ্যায়িত করেছেন। (দেখুন বুখারী শরীফ, তারাবীহ নামাজ অধ্যায়)

এভাবেই আপনি যখন শরীয়ত মেনে ঈদে মিলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করবেন, তখন কেউ আপনাকে নবী করেননি, সাহাবী করেননি বলে প্রশ্ন করলে তাকে উপরোক্ত হাদিস শরীফ দ্বারা বুঝিয়ে দিন যে, নবী করেননি, সাহাবী করেননি তাই একাজ করা যাবেনা একথা তো কুরআন হাদিস সম্মত নয়। বরং নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যা নিষেধ করেছেন তা করা ঠিক নয়। আর মহান আল্লাহ পাক সুরা হাশরের ৭ নং আয়াত শরীফে একথাই উল্লেখ করেছেনঃ [] রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তুমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাক এবং মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় কর। নিশ্চয় মহান আল্লাহ পাক তিনি কঠোর শাস্তিদাতা।

মীলাদুন নবীতে ইসলামিক ধ্বণীতে মিসিল, ্যালী,  মিলাদ শরীফ এর মাহফিল করা সর্বোত্তম ভালো এবং ইবাদতের কাজ।

মহান আল্লাহ পাক তিনি সুরা আম্বিয়া শরীফের ১০৭নং আয়াত শরীফে ইরশাদ মুবারক করেন [وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ] "আমি আপনাকে তামাম জাহানের জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।" দেখুন মহান আল্লাহ পাক তিনি কালামুল্লাহ শরীফে বলছেন যে রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমগ্র জাহানের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরন করেছি।
আবার সূরা ইউনুস আলাইহিস সালামের ৫৮ নং আয়াত শরীফে ইরশাদ মুবারক করেনঃ [قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ] হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম "আপনি তাদের বলে দিন, তারা যেনো মহান আল্লাহ পাক উনার অনুগ্রহ(দ্বীন ইসলাম) ও রহমত(রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাওয়ার কারনে ঈদ উদযাপন করে। যা (এই খুশি ও আনন্দ উদযাপন) তাদের সমুদয় সঞ্চয়(নেক আমল) থেকেও বেশী হবে।" সুবহানআল্লাহ!!!

১ম আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ পাক তিনি রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে রহমত বলছেন এবং ২য় আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ পাক তিনি আদেশ দিয়েছেন এই রহমত (অর্থাৎ রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে) পেয়ে খুশি উদযাপন করতে। শুধু উদযাপনই নয় বরং এই খুশি উদযাপন করাটা যারা করবে তাদের সমস্ত সঞ্চয় (নেক আমল) থেকে উত্তম হবে বলে স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক তিনি ঘোষনা দিয়েছেন। আর রইসূল মুফাসসিরিন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সহ অনেক মুফাসসিরীনে কেরাম এই বিষয়ে একমত যে, উক্ত আয়াত শরীফে বর্ণিত 'ফাদ্বলুল্লাহ' (অনুগ্রহ) ও 'রহমত' দ্বারা রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে।

এছাড়াও বুখারী শরীফে ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, "রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহ পাক উনার শ্রেষ্ঠ নিয়ামত।" দেখতে পারেন (বুখারী শরীফ ২/৫৬৬)।

পবিত্র সূরা আল ইমরান শরীফ এর ১৬৪ নং আয়াত শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছেঃ [لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو] "মহান আল্লাহ পাক তিনি ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী/রাসূল পাঠিয়েছেন।" এখানেও মহান আল্লাহ পাক তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন যে রাসূলকে প্রেরন করে তিনি মুমিনদের উপর অনেক বড় এহসান করেছেন, তাই এই নিয়ামত লাভ করার জন্য তাদের খুশি উদযাপন করা উচিৎ।

আরো দেখুন সূরা আল বাক্বারাহ শরীফের ২৩১ নং আয়াত শরীফেঃ [وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَمَا أَنزَلَ عَلَيْكُم مِّنَ الْكِتَابِ وَالْحِكْمَةِ يَعِظُكُم بِهِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ] "মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশকে হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করো না। মহান আল্লাহ পাক উনার সেই অনুগ্রহের(রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথা স্মরণ কর, যা তোমাদের উপর রয়েছে এবং তাও স্মরণ কর, যে কিতাব ও জ্ঞানের কথা তোমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে যার দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দান করা হয়। মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি সর্ববিষয়েই জ্ঞানময়।" এখানেও মহান আল্লাহ পাক উনার অনুগ্রহ তথা নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কথা স্বরন করার আদেশ দিয়েছেন।

এছাড়াও পবিত্র কুরআন শরীফ এর আলোকে জানা যায়, জন্মদিনের শুভেচ্ছা দেওয়া মহান আল্লাহ পাক উনার সুন্নত যেমনঃ ইয়াহিয়া আলাইহিস সালাম উনাকেঃ [وَسَلَـٰمٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ] উনার উপর শান্তি (বর্ষিত হয়েছিলো) যেদিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ঈসা আলাইহিস সালাম উনাকেঃ [وَٱلسَّلَـٰمُ عَلَىَّ يَوْمَ وُلِدتُّ] আমার উপর বিশেষ রহমত যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম।

শুধু তাই নয় বরং মহান আল্লাহ পাক উনার নিয়ামত প্রাপ্তিতে খুশি উদযাপন করা নবী/রাসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদেরও সুন্নত। যেমন হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তিনি যখন মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে নিজ উম্মতের জন্যে খাদ্য চেয়েছিলেন, তখন এভাবে আরজ করলেন, সূরা মায়িদাহ শরীফের ১১৪ নং আয়াত শরীফেঃ "হে মহান আল্লাহ পাক আপনি আমাদের রব! আসমান থেকে আমাদের জন্যে নিয়ামতের খানা অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্যে ঈদ হয়ে যায়।" কুরআন শরীফ এর এই আয়াত শরীফ হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তিনি এই আশা করেই ব্যক্ত করেছেন যে, যেদিন মহান আল্লাহ পাক উনার নিয়ামত অবতীর্ন হবে, সেই দিনটি ঈদ হিসেবে পালিত হোক পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল উম্মতের জন্য; যা ওই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের একটি উত্তম পন্থা। সুবহানআল্লাহ!!!

এখন বোঝার বিষয় হচ্ছে যে হযরত ঈসা আলাইহিস যদি সামান্য জান্নাতি খাবার পেয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারেন তাহলে আমরা রাহমাতুল্লিল আলামিনকে (যাকে সৃষ্টি না করলে মহান আল্লাহ পাক তিনি কিছুই সৃষ্টি করতেননা) পেয়ে কেনো ঈদ উদযাপন করতে পারবো না? উনার চেয়ে বড় নিয়ামত আর কি আছে বা হতে পারে বা কখনও হবে? বরং এদিন ঈদ মানানো হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম উনার ঈদ মানানোর চেয়ে কোটিগুন উত্তম। তাই পবিত্র ঈদে মিলাদুন নবী পালন করা কুরআন শরীফ হতেই প্রমাণিত, আলহামদুলিল্লাহ!!!

রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি নিজের মিলাদ(বিলাদত/জন্মদিন) নিজে পালন করেছেন?

হ্যাঁ, তিনি করেছেন। কেননা হযরত আবু কাতাদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, একজন সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার খেদমতে আরজ করলেন "ইয়া রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার মাতা পিতা আপনার কদমে কুরবান হোন। আপনি প্রতি সোমবার রোজা পালন করেন কেনো? জবাবে রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই দিনে আমি জন্মগ্রহন(বিলাদত শরিফ/মিলাদের দিন) করেছি এবং এই দিনেই আমার উপর ওয়াহী নাজিল হয়েছে। দেখতে পারেন (সহীহ মুসলিম শরীফ ২য় খন্ড, ৮১৯ পৃষ্ঠা, বায়হাকী শরীফ সুনানে কুবরা, ৪র্থ খন্ড ২৮৬ পৃষ্টা, মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল শরীফ ৫ম খন্ড ২৯৭ পৃষ্টা, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৪র্থ খন্ড ২৯৬পৃষ্টা, হিলয়াতুল আউলিয়া ৯ম খন্ড ৫২ পৃষ্টা)।

দেখুন রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছরে নয় বরং প্রতি সপ্তাহে নিজের জন্মদিন পালন করেছেন। তাহলে আমাদের প্রতি বছরে উদযাপন করাটা কোন ভিত্তিতে অবৈধ হতে পারে?

রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেয়ে খুশি হওয়া এমন এক বিষয় যা কোন কাফের মুশরিক করলেও সে ফলাফল পাবেই যা অন্য কোন কিছুতে পাবেনা, যেমনঃ হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, আবু লাহাবের মৃত্যুর এক বছর পর আমি তাকে স্বপ্নে দেখি। সে আমাকে বলে "কবরের জিন্দেগীতে আমি বড়ই অশান্তিতে আছি। তবে হ্যাঁ, প্রত্যেক সোমবার আমার তর্জনী আঙ্গুল থেকে আমি মিস্টি পানি পেয়ে থাকি কেননা আমি সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নামক বাদীকে (নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদ শরীফ এর সংবাদ দেয়ায় খুশী হয়ে) আযাদ করেছিলাম এই আঙ্গুলের ইশারায়।" দেখতে পারেন (সহিহ বুখারী শরীফ কিতাবুন নিকাহঃ- ৫১০১ নং হাদিস শরীফ)। এই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে হজরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন আবু লাহাবের এই সোমবারের শাস্তি লাঘবের কারণ রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের খবর আবু লাহাবকে দিলে সে খুশি হয়ে সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে (খবরকারী দাসী ছিলেন তখন) আজাদ করেছিল। দেখতে পারেন (ফাতহুল বারি সরহে সহীহুল বুখারী শরীফ, ৯ম খন্ড, ১১৮ পৃষ্ঠা, ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী আলাইহে রাহমা)।

এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল আবু লাহাবের মত কাফের যার ধ্বংস হওয়ার ব্যপারে কুরয়ানুল কারিমে সুরা লাহাব নাযিল হয়েছে, যার স্থান সর্বদাই জাহান্নাম, সে যদি নবীজি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মদিনের সংবাদে খুশি হয়ে মাত্র একটি দাসী আযাদ করলে প্রতি সোমবার জাহান্নামে মহান আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতের সুমিষ্ট পানি দান করেন, তাহলে আমরা যারা মুমিন সুন্নী মুসলমান, নবীপ্রেমিক তারা মীলাদুন নবী পালন করলে মহান আল্লাহ পাক কি আমাদের উত্তম প্রতিদান দিবেন না? ইনশাআল্লাহ অবশ্যই দিবেন, কেননা তিনিই বলেছেন নবীকে পেয়ে খুশি উদযাপন করা সকল সঞ্চয়কৃত নেক আমলের চেয়েও উত্তম (সুরা ইউনুস আলাইহিস সালামঃ ৫৮ নং আয়াত শরীফ)। আলহামদুলিল্লাহ!!!

এবার আসুন জেনে নেই সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারা কি রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মিলাদ(বিলাদত/জন্মদিন) পালন করেছেন?

উনারা মূলত সবসময়ই করতেন কিন্তু আমরা আজ এতো গাফেল হয়ে গেছি যে বছরে একবার করে থাকি ঘটা করে। (তবে আমরা ৩৬৫ দিন পালন করি, এর মধ্যে ৬৩ দিন স্পেশাল, আর ১২ই শরীফে সবথেকে বড় আয়োজন করে)

যেমনঃ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, একদা তিনি উনার গৃহে সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের নিয়ে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মবৃত্যান্ত(তাওয়াল্লুদ শরীফ) আলোচনা করছিলেন। শ্রবনকারীরাও তা শুনে অত্যান্ত খুশী প্রকাশ করছিলেন। ঠিক ওই সময় নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন আপনারা এখানে কি করছেন? সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম বললেন আপনার মিলাদ শরীফ এর আলোচনা করছি, তখন নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেছে"। এই হাদিস শরীফটি বিভিন্ন হাদিস শরীফ এর গ্রন্থে এসেছে। যেমনঃ মাওলুদুল কবীর, আত তানভীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযার, হকিকতে মোহাম্মদী (মিলাদ শরীফ অধ্যায়), দুররুল মুনাজ্জাম, ইশবাউল কালাম।
.
নবিজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পেয়ে আমরা যে জশনে জুলুস বা খুশি হয়ে মিসিল বা র‍্যালী করে থাকি তাও কিন্তু নতুন কিছু নয়। বরং এটাও সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের সুন্নত। মুসলিম শরীফের ২য় খণ্ডের ৪১৯ পৃষ্ঠায় হাদিস শরীফ বর্ণিত হয়েছে যে "রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন হিজরত করে মদিনা শরীফে আগমন করেছেন ওইদিন মদিনাবাসী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সাহাবীগন রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনের শুকরিয়া হিসেবে আনন্দ মিছিল করেছিলেন এবং তালায়াল বাদরু আলাইনা..... এই নাত শরীফ পাঠ করেছিলেন। কেউ কেউ বাড়ির ছাদের উপর আরোহন করেছিলেন, আবার অনেকে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন এবং 'ইয়া রাসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্লোগান দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।" এমনকি অনেকে দফ(এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) বাজাচ্ছিলেন যা এখনো দ্বীন ইসলামে যায়েজ। হ্যা, এটাইতো আমরাও করে থাকি, সাহাবি রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের দেখানো পথে হেটে, উনাদের সুন্নত মুবারকের উপর আমল করে। আলহামদুলিল্লাহ।

এছাড়াও হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ইসলাম গ্রহনের প্রসিদ্ধ ঘটনা যা আমরা সকলেই জানি এবং যা ইবনে ইসহাক্ব রহিমাহুল্লাহ উনার সিরাত গ্রন্থ সহ অসংখ্য সিরাতের কিতাবে পেয়ে থাকি যে, হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইসলাম গ্রহন করলে সাহাবি রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আবেদন জানান যে উনারা ইসলামের সুমহান বানী ও হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর মুসলমান হওয়ার কথা পুরো মক্কায় প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দিতে চান মিসিলের মাধ্যমে (কেননা হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মতো মুসলমান হওয়ার আগে ইসলাম প্রচার চুপি চুপি করে করা হত, কুফফারে মক্কার অত্যাচারের ভয়ে)। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অনুমতি দিলে উনারা ৪০ জন সাহাবি রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একে অপরের হাত ধরে মক্কার অলিগলিতে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ স্লোগান দিয়ে মিসিল করেছিলেন। সুবহানআল্লাহ!!!

সাহাবি রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে পেয়ে খুশিতে মিসিল করতে পারলে আমরা কি হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নবী, সমস্ত নবী/রাসূলদের সরদার, শাফায়াতের কান্ডারী, আমাদের ঈমান-জান উনাকে পেয়ে খুশিতে মিসিল করতে পারিনা?

এটা অত্যান্ত দুঃখের বিষয় যে কিছু পথভ্রষ্টদের ঈমান এতই দুর্বল হয়ে গিয়েছে যে আজ তারা নিজের পরিবারের বা অন্য কারো জন্মদিন বিধর্মীদের নিয়মে (বেপর্দা হয়ে, গানবাজনা, করা যা সম্পুর্ন ইসলাম বিরোধী) পালন করলে তাদের বিবেক তাদের বাধা দেয়না, তখন তারা কুরআন-হাদিসের বৈধতা খোজে না। কিন্তু যখনই কোনো নবী প্রেমিক মুমিন রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেয়ে কুরআন শরীফ ও শরিয়ত মোতাবেক (মিলাদুন নবীতে কুরআন-হাদিস পাঠ, নবীজীর উপর দরুদ শরীফ ও সালাম পাঠ, নবীজীর জন্মবৃত্যান্ত আলোচনা যা মহান আল্লাহ পাক পুরো কুরআন শরীফ জুড়ে করেছেন, সাহাবি রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের সুন্নত মুবারক অনুসরণ করে জাশনে জুলুস করা, অবশেষে মুনাজাত করা হয়। আপনিই বলুন এখানে কোন কাজটি ইসলাম বিরোধী? একটিও পাবেন না, বরং সবই কুরআন শরীফ হাদিস শরীফ অনুসারে উত্তম কাজ) রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার জন্মদিন পালন করে তখন কিছু অবুঝের ঈমান/বিবেক কুরআন হাদিস খুজে!!! ধিৎকার এমন বিবেক কে যা ইসলাম, মহান আল্লাহ পাক ও রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মানুষকে দুরে রাখে। এটা ঈমান নয় বরং এটা শয়তান। কেননা আমরা পড়েছি ইবন কাসির রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত কিতাবঃ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২য় খন্ড, ১৬৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছেঃ যখন রহমাতুল্লিল আলামিন উনার জন্ম(মিলাদ) হলো তখন ইবলিস তার জিবনের বার এর একবার এই দিনে খুবই কেঁদেছিল ও দুঃখিত হয়েছিল। তাই আজ মিলাদুন নবীতে কারো মন যদি ব্যথিত হয়, তাহলে সেই বিবেচনা করুক তার ঈমান কোন দিকে যাচ্ছে এবং কাকে অনুসরণ করছে? রহমানকে নাকি শয়তানকে!!!

কিছু স্বল্পজ্ঞানী বলে থাকে যে এই দিন তো রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার ওফাত এর দিনও, তাই আমাদের শোক পালন করা উচিত!! নাউযুবিল্লাহ তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি যে হাদিস শরীফে এসেছে নবীগন কবরে জীবিত ও উনারা পবিত্র নামাযরত। দেখতে পারেনঃ মুসলিম শরীফ খন্ডঃ ৪ পৃষ্ঠাঃ ১৮৪৫ হাদীস শরীফ নং ২৩৭৫, ইবনে মাযাহ শরীফ খন্ডঃ ২ পৃষ্ঠাঃ ২৯১ হাদীস শরীফ নং ১৬৩৭, মুসনাদে আবু ইয়ালা শরীফ খন্ডঃ ৩ পৃষ্ঠাঃ ৩৭৯ হাদীস শরীফ নং ৩৪১২ (সহীহ) হাইছামী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ খন্ড ৮ পৃষ্ঠা ২১১।

এছাড়াও সহিহ হাদিস শরীফ অনুসারে আপনি সাধারণ কোনো মানুষের জন্যও তিন দিনের বেশি শোক পালন করতে পারবেননা। দেখতে পারেন (সহীহ বুখারি শরীফ ৩০৭ ই.ফা.)। এবার আপনিই বলুন যেখানে সাধারণ কোনো মানুষের জন্যও তিন দিনের বেশি শোক পালন করতে পারবেননা সেখানে রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য শোক পালন করার কথা আপনি চিন্তা করেন কিভাবে? আর এইজন্যেই আজ পর্যন্ত কেউ রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য শোক পালন করেননি। এছাড়াও রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন "আমার দুনিয়াবি জীবন মুবারক যেভাবে তোমাদের জন্য কল্যানকর তেমনী আমার পর্দার জীবন ও তোমাদের জন্য কল্যানকর।" সুবহানআল্লাহ!!! দেখতে পারেন (শিফা শরীফ কৃত কাজী আয়াজ খন্ডঃ ২ পৃষ্টাঃ ১৯, খাসায়েসুল কুবরা কৃত ঈমাম সুয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি খন্ডঃ ২ পৃষ্টাঃ ২৮১)।

অবাক লাগে যখন শুনি কিছু অবুঝ মিলাদুন্নাবির র‍্যালীকে জন্মাষ্টমীর মিসিলের সাথে তুলনা দেয়; কেউ কেউ তো এতোদুর বলে ফেলে যে, মিলাদুন্নাবীর র‍্যালী নাকি জন্মাষ্টমীর অনুকরণে করা হয়!!! মুসলমানেরা হিন্দুদের অনুকরনে নাকি নাবীজি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মদিন পালন করে!!! নাউজুবিল্লাহ!!!

এই সমস্ত মুর্খদের বলবো দয়া করে ইতিহাস সম্পর্কে পড়ুন, ইতিহাস জানুন; যে কোনটি কতসালে পালন করা শুরু হয়। সর্বজনস্বীকৃত মত হলো রাষ্ট্রিয়ভাবে প্রথম ঈদে মিলাদুন নবীর পালন শুরু করেন আরবের অধিপতি বাদশাহ মালিক মুজাফফর উদ্দিন কৌকুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ৬০৪ হিজরীতে তথা ১১৭৪ খ্রিস্টাব্দে আর জন্মাষ্টমী পালন শুরু হয় ১৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দে (সময় হলে উইকিপিডিয়া দেখুন, নিজেই সত্যতা যাচাই করুন)। এর অর্থ হলো মিলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাষ্ট্রিয়ভাবে পালনের কমপক্ষে ৪০০ বছর পর হিন্দুরা মুসলিমদের অনুকরণে তাদের ধর্মগুরুর জন্মদিন পালন শুরু করেছে। মুসলমানেরা বিধর্মীদের অনুকরণ করেনি বরং বিধর্মীরা মুসলমানদের অনুকরন করেছে, সুবহানআল্লাহ!!!

আর মিলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাসে আরেকভাবে ফিৎনা ছড়ানো হচ্ছে একথা বলে যে, রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার জন্মতারিখের নাকি ঠিক নেই!! নাউযুবিল্লাহ!! অথচ জন্মতারিখের কয়েকটি হাদিস শরীফ বিদ্যমান রয়েছে। যেখানে হযরত আফফান রদ্বিয়াল্লাহু তায়াল আনহু হতে বর্নিত, হযরত জাবির ও হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, "রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার জন্ম হস্তি বাহিনী বর্ষের ১২ই রবীউল আউয়াল শরীফ এর সোমবার হয়েছিল।" (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা; বুলূগুল আমানী ফী শরহিল ফাততিহর রব্বানী' ২য় খণ্ড, ১৮৯ পৃঃ বৈরুতে মুদ্রিত; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ' ২য় খণ্ড, ২৬০ পৃঃ বৈরুতে মুদ্রিত)।

এছাড়াও ৫৬টি মুসলিম দেশের মধ্যে ৫১টি দেশই (স্বয়ং সৌদিআরব এর অন্তর্ভুক্ত) ১২ই রবিউল আউওয়াল শরীফে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষনা করেছে; তাই মুসলিম উম্মাহ যে এ বিষয়ে একমত তার প্রমানে এই তথ্যই যথেষ্ট। (একমত না হলে একেক দেশ একেক দিনে পালন করতো নয় কি?)

এরপরেও যদি কারো ১২ই রবিউল আউয়াল শরীফে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মদিন অবিশ্বাস হয়, তাহলে তারা যেদিন বিশ্বাস করে, সেদিনই মিলাদুন নবী পালন করুক; কোন সমস্যা নাই কেননা আমরা চাই মহান আল্লাহ পাক তিনি ও উনার রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সর্বাধিক গুণগান হোক, তা যেদিনই বা যেখানেই হোক না কেনো। সুবহানআল্লাহ!!!

হাজার হাজার বছর ধরে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দ্বারা উদযাপিত মহান দিন ঈদে মিলাদুন নবীকে ৫০/১০০ বছরের আগের কোনো লেখকের বইয়ের মাধ্যমে আপনি হারাম বিদআত বলতে পারেননা। ঈদে মিলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন যদি আসলেই বিদআত/হারাম/অনৈসলামিক হতো তাহলে ৫৬টি মুসলিম দেশের মধ্যে ৫১টি দেশই এদিনে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষনা করতো কেনো? কেনো এ আইন বানানোর সময় সেদেশের প্রকৃত মুসলমানেরা!! এর বিরুদ্ধাচার করলোনা? এবছরতো সেই গুটিকতক মিলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদ্বেষীদের গুরু স্বয়ং সৌদিআরব নিজেই মিলাদুন নবী কে রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন ঘোষনা করেছে।

এগুলিই কি প্রমান করেনা ঈদে মিলাদুন নবী পালন বিদআত নয় বরং একটি উত্তম আমল যা মুসলিম উম্মাহর স্বীকৃত সর্বচ্ছো নেক আমল কুরআন শরীফ এর সূরা ইউনূস শরীফের ৫৮ নং আয়াত শরীফ অনুসারে!! সুবহানআল্লাহ!!!!

কিছু অবুঝেরা বলে থাকে যে দ্বীন ইসলামে ঈদ নাকি শুধু দুটোই, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা!!! আসলেই কি তাই? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয় এ দিন (জুমুআ শরীফের দিন) মহান আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি জুময়া শরীফ পড়তে আসবে সে যেনো গোসল করে ও সুগন্ধি থাকলে উহা লাগায় এবং তোমাদের উপর মিসওয়াক করা আবশ্যক। [ইবন মাজাহ পৃষ্টা ৭৮]। অনেক রেওয়াতে ৯ই জিলহজ্ব অর্থাৎ আরাফাহ শরীফ এর দিনটিকেও ঈদের দিন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। [দেখুনঃ- মিশকাত শরীফ পৃষ্টা ১২১ ও তিরমিযী শরীফ পৃষ্টা ১৩৪]।

সুতরাং একথা বলা যে ঈদ শুধু দুটোই স্বল্পজ্ঞান বা মুর্খতা ছাড়া কিছুই নয়।

৯ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি পবিত্র মিলাদুন নবীর পক্ষে উনার রচিত স্বীয় কিতাব হুসনুল মাক্বাসিদ ফি আ'মালিল মাওলিদ এর ৬৫ পৃষ্টা, এমনকি হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ফায়সালায়ে হাফ্ত মাসায়েলে মিলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন সম্পর্কে উত্তম কথা বলেছেন। এছাড়াও ইবনে তাইমিয়া (যাকে সমস্ত বাতিলেরা নিজের ইমাম মনে করে) (১২৬৩ খ্রিষ্টাব্দ - ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দ) তার কিতাব ইক্তিদায়ে সিরাতে মুস্তাকীম ৩১৩" পৃস্টায় লিখেছে যদি মিলাদ শরীফ মাহফিল নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য করা হয়ে থাকে তবে মহান আল্লাহ পাক এ মুহব্বত ও সম্মান প্রদর্শনের কারণে সওয়াব বা প্রতিদান দেবেন।

একই কিতাবের ৩১৫ পৃস্টায় সে লিখেছে, “বরং ঐ দিনে (রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্মদিনে) পরিপূর্ণরূপে অনুষ্ঠান করা এবং এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, উত্তম নিয়ত এবং হুজুরে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি মুহব্বত প্রদর্শন বড় প্রতিদানের কারন হবে।

এছাড়াও অসংখ্য ইমাম, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুজাদ্দিদ ও হক্কানী আলেমগন মিলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করেছেন যার বর্ননা জগতবিখ্যাত কিতাব আন নে'য়মাতুল কুবরা আ'লাল আ'লাম এ বিস্তারিতভাবে রয়েছে।

অপরপক্ষে ফরজ/ওয়াজিব এই মিলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা হারাম বা নাজায়েজ হওয়ার কথা কুরআন শরীফ সহিহ হাদিস শরীফতো দূরের কথা বরং দ্বয়ীফ হাদিস শরিফেও নেই।

আসল কথা বলতে পথভ্রষ্টরা সাধারণ মুসলমানদের বিপথগামী করতে জন্মদিবস ঠিক নেই, বিদাত, নাবী সাহাবি পালন করেননি, শোক দিবস পালন করা উচিৎ, এটা বিধর্মী সভ্যতা ইত্যাদি ভিত্তিহীন কথা বলে থাকে। আর আশিক্বে রাসূলের জন্য তো এটুকু দলীলই যথেষ্ট যে এদিনে তাদের প্রিয়তম হাবীব হুযুরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি দুনিয়ায় তাশরিফ এনেছেন, সুবহানআল্লাহ!!!

মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের ঈমানকে ছদ্মবেশী বাতেলদের হাত থেকে রক্ষা করে সিরাতে মুস্তাক্বিমে চলে এই মহান দিবসকে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করার তওফিক দান করুন। ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালা। আমিন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: