9.25.2014

ইন্টারনেটে মেয়েদের ছবি আপলোড, ইসলামের বিধান এবং কিছু কথা...

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিমঃ গতকাল একটা কাজে মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলামসেখানে কিছু দোকান আছে যেখানে ক্রেস্ট, ট্রফি, চায়ের মগ ইত্যাদি অর্ডার দিয়ে বানানো যায় সেরকম একটা দোকান থেকে দুইজন যুবক একটা মগ নিয়ে বেরুলোমগ হাতের যুবক অন্য যুবককে মগের ছবিটা দেখিয়ে বলল, “এই মাইয়াটারে চিনিস? অমুকের গার্লফ্রেন্ড”! অমুকের গার্লফ্রেন্ডের ছবি চায়ের মগে সেঁটে দেওয়া হয়েছেকোন প্রফেশনালি মডেলিং নয়, হয়ত মোবাইলে তোলা ছবি কিংবা ফেসবুকে আপলোড করা ছবি

আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা সহজ মনে হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব অত্যান্ত ভয়ংকরকিছুদিন আগে একটা নিউজ পড়েছিলাম ভারতীয় এক মেয়ের ঘটনা নিয়েইন্টারনেটে আপলোড করা তার ছবি নিয়ে কে বা কারা সেগুলো একটা পর্ণ সাইটে কল গার্লদের লিস্টে দিয়ে দেয়সেটা যখন এলাকায় জানাজানি হয়ে যায় আত্মসম্মানের চরম অপমান সইতে না পেরে মেয়েটিসহ তার পুরো পরিবার আত্মহত্যা করেযাদের নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাস আছে তারা হয়ত দেখে থাকবেন, ছবি বিকৃত করে ফেসবুকে ছেড়ে দিয়ে ব্ল্যাকমেইল, নোংরা ছবি ছড়িয়ে পড়ায় অমুকের আত্মহত্যা এই ঘটনাগুলো অহরহ ঘটছেফটোশপের এই স্বর্ণযুগে একটি সাদাসিধে ছবিকে নোংরা ছবি বানিয়ে বিশ্রী ক্যান্ড ঘটানো আজ কোন ব্যাপারই না, এমনকি বোঝার উপায়ই থাকেনা যে ছবিটা আসল না নকল!
ইন্টারনেটে মেয়েদের ছবি আপলোড, ইসলামের বিধান এবং কিছু কথা...
ইন্টারনেটে মেয়েদের ছবি আপলোড, ইসলামের বিধান এবং কিছু কথা... 
ইন্টারনেটে বিশেষ করে ফেসবুকে আমাদের বোনেদের নিজের ছবি আপলোডের হিড়িক দেখলে তাই মাঝে মাঝে আঁতকে উঠিকি ভয়ংকর ফিতনার দরজাই না আমার বোনেরা খুলে দিচ্ছে অনায়াসেইজাহেল মেয়েরা এসব করে বেড়াবে সেটা স্বাভাবিক কিন্তু তাদের দেখাদেখি আমাদের হিজাবি বোনেরা নিজের ছবি মানুষজনের সামনে উন্মুক্ত করবে এর চেয়ে হতাশার মনে হয় আর কিছু হয়নাআমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি অতি উৎসাহী ছেলেদের আমি চোখের সামনে দেখেছি ফেসবুক থেকে হিজাবিদের ছবি মোবাইলে ডাউনলোড করে রাখতে এবং তা বন্ধু বান্ধবদের দেখিয়ে বেড়াতে

আরেকটা Trend দেখা যায় হিজাবি বোনেরা ফেসবুকে জাহেল কায়দার ছবি না দিলেও বেশ ফিতনাময় কায়দায় নিজেদের চোখের ছবি সাথে চোখে রাখ চোখটাইপ ক্যাপশন দিয়ে অনায়াসেই ফেসবুকে আপলোড করে যাচ্ছেএটা আরও ভয়ংকরএটা ফিতনার দিকে নোংরা এক ধরনের আহবানের মতআমরা যদি কুরআনে নারী পুরুষের জন্য পর্দার আয়াতগুলো খেয়াল করি তাহলে দেখব আল্লাহ মুমিন মুমিনাদের প্রথমেই বলেছেন দৃষ্টি অবনত করতে কেননা সমস্ত জিনার শুরু হয় দৃষ্টি থেকেযে নিজের চোখের হেফাজত করতে পারে তার জন্য অশ্লীলতা, জিনার মত ব্যাপারগুলো থেকে হেফাজতে থাকার কাজটা সহজ হয়ে যায়আর সেখানে আমাদের বোনেরা যদি সেই চোখকেই পুরুষের লুলুপ দৃষ্টির জন্য উন্মুক্ত করে দেয় তাহলে ফিতনার চূড়ান্ত ভয়াবহতার দিকেই তা রুপ নিবে

পবিত্র কালামিল্লাহ শরিফে আল্লাহ্‌ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা এরশাদ মোবারক করেন মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে……” [সূরা নুরঃ ৩০] আরো বলেন ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে…..” [সূরা নুরঃ ৩১] আবার কিছু বোন আরও এক ধাপ এগিয়ে নিজেদের ঠোঁটের ছবি আপলোড করে চূড়ান্ত রকম জাহিলিপনার পরিচয় বহন করেহয়ত ব্যাপারগুলো অজ্ঞতার কারণে কিংবা ফিতনার স্বরূপ বুঝতে না পারার কারনেই হয়ে থাকেকিন্তু এই বিষয়গুলোতে আমাদের অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়া উচিতইসলামি ফ্যামিলি হলেও মেয়ে ফেসবুকে কি করছে, যা করছে তা ইসলাম সমর্থন করে কিনা তার খবরাখবর রাখা, ভুল কিছু করলে তা শুধরে দেওয়া, ইসলামের রুলিং জানানো অভিভাবকদের দায়িত্বআশা করি এই দায়িত্বে অবহেলার পরিচয় দিয়ে কেউ দাইয়ুস হয়ে জাহান্নামের বাসিন্দা হতে চাইবেন না আর আমাদের হিজাবি বোনেরাও ফিতনার দরোজা উন্মুক্ত করে শয়তানকে সুযোগ দিতে চাইবেন না ইনশাআল্লাহ

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ফেসবুকে মেয়েদের ছবি আপলোডের বিষয়ে ইসলামের বিধান কি? বিশেষ করে যখন আমাদের কিছু হিজাবি বোন মনে করেন যে ফেসবুকে নিজেদের হিজাব পরিহিত ছবি আপলোড ইসলামি শরিয়ায় অনুমোদিত?

এর উত্তর হচ্ছে, বেশ কিছু কারণে মেয়েদের ফেসবুকে, চ্যাট রুমে কিংবা অন্য কোন ওয়েবসাইটে নিজেদের ছবি দেওয়া হারামঃ প্রথমত ইন্টারনেটে ছবি আপলোডের ব্যাপারটা কুরআন এবং সুন্নাহর আলোকে আল্লাহ আয ওয়া যাল মহিলাদের পর্দার মাধ্যমে শরীর ঢেকে রাখার এবং গোপন করার যে বিধান দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে যায়কেননা আল্লাহ সুবাহানু ওয়া তায়ালা নবী পত্নীদের সাথে পর্দার বিষয় আলোকপাত করতে গিয়ে সূরা আহযাবে বলেন, তোমরা তাঁর পত্নীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবেএটা তোমাদের অন্তরের জন্যে এবং তাঁদের অন্তরের জন্যে অধিকতর পবিত্রতার কারণ। [সূরা আহযাবঃ ৫৩]

হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবেফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে নাআল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। [সূরা আহযাবঃ ৫৯]

এছাড়া আল্লাহ আয ওয়া যাল নারীদেরকে পুরুষের সামনে কোমল স্বরে কথা বলতেও নিষেধ করেছেন, হে নবী পত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষনীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, ফলে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে, যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে। [সূরা আহযাবঃ ৩২]

তাই আল্লাহ সুবাহানু ওয়া তায়ালা নবী পত্নীদের এবং সাথে সকল বিশ্বাসী মুসলিমাদের জন্য পর্দার যে বিধান নির্ধারণ করেছেন সেটা মেনে চলা উচিত যাতে তারা ফিতনা থেকে নিরাপদে থাকতে পারেন, নিজেদের সতীত্ব রক্ষা করে চলতে পারেন এবং মানুষের মনে যেন বক্রতার দরুন অহেতুক সন্দেহের সৃষ্টি না হয়একবার যদি আমরা এটা বুঝতে সক্ষম হই তাহলে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা যে, একজন মহিলা যদি তার ছবি আপলোড করে যা একইসাথে সৎকর্মশীল এবং বক্রহৃদয়ের নীতিহীন মানুষগুলোর কাছে উন্মুক্ত তাহলে এধরনের ওয়েবসাইটে নিজেদের শো করাটা আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ!

দ্বিতীয়ত এটা ছবির মহিলা এবং ছবির দর্শক উভয়ের জন্য ফিতনাস্বরূপএই ফিতনার ফলশ্রুতিস্বরূপ অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা আমরা শুনেছি এবং পড়েছিঅনেক নিষ্পাপ এবং সচ্চরিত্রের মেয়েই এভাবে আল্লাহকে ভয় না করা শয়তানদের মিষ্টি কথা এবং প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়ে নিজেদের দ্বীন, আত্মসম্মান সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেননিজেদের ফায়দা হাসিল করে তারা এসব মেয়েদের জন্য দুনিয়া আর আখিরাতে লজ্জা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট রাখেনি

অনেক নীতিহীন আলাহর দুশমন মেয়েদের এসব ছবিকে আধুনিক উপায়ে বিকৃত করেছে, কোন মেয়ের মাথা ব্যভিচারি মহিলার শরীরের সাথে লাগিয়ে কুৎসা রটিয়েছে যা মেয়েটির জীবন এবং পরিবারের জন্য মারাত্মক অনুতাপের কারণ হয়েছে আর এই অসম্মান আর অনুতাপ মেয়েটি নিজেই ডেকে এনেছি নিজের ছবি মানুষের কাছে সহজলভ্য করে

তৃতীয়ত, কিছু কিছু ক্ষেত্রে যদি প্রপার হিজাব মেনে চলা হয় এবং চেহারা ঢেকে রাখা হয় তখন বিশেষ করে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তা বৈধতা পায়তবে একজন সচেতন মুসলিমাহ মানেই এটা বুঝতে পারার কথা এই ইন্টারনেটে বিশেষ করে ফেসবুকে নিজেদের ছবি আপলোড করার মাঝে কোন জরুরাত কিংবা বেনেফিশিয়াল কিছু নেইযা আছে তা হল ফিতনা এবং নিজেদের নিরাপত্তাহীনতাএমনকি আমরা যদি বলিও যে মহিলাদের মুখ ঢেকে রাখাটা বাধ্যতামূলক নয় তারপরও কোন মুসলিমাহ তার ছবি নেটে ছেড়ে শয়তানের রাস্তায় যে ফিতনার অবতারণা হয় সেটাই যথেষ্ট এটাকে অবৈধ করতেএক্ষেত্রে পাপের মাত্রাটা মাল্টিপ্লাই হতে থাকে এবং বিপদের আশংকাও বাড়তে থাকেআর এর মাধ্যমে মুসলিমদের ইতিহাসে বিশ্বাসী মহিলারা আল্লাহর বিধান পালনের যে ধারা অনুসরণ করে এসেছে তার সীমালংঘন করা হয়

তাছাড়া কারো যদি নুন্যতম কমনসেন্স থেকে থাকে তাহলে তার বোঝার কথা যে, একজন মেয়ের জন্য তার সৌন্দর্য এবং একইসাথে ফিতনা সৃষ্টির মূল কেন্দ্র হচ্ছে তার চেহারা যা পুরুষমাত্রই আকর্ষিত হয়সেই ফিতনার উৎসকে যদি আমরা পুরুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিই, বারবার সেই ছবির দিকে তাকানোর (যেহেতু ছবি স্থির থাকবে এবং কেউ চাইলে সারাদিন ধরেই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবে) সুযোগ করে দিই, সেই ছবিকে বিকৃত করে অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপনের সুযোগ করে দিই তাহলে তা আমাদের জন্য দুনিয়া এবং আখিরাতে চরম আক্ষেপের কারণ হবে

তাই আমরা আমাদের সকল মুসলিম বোনদের কাছে অনুরোধ করব তারা যেন ফেসবুকে কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে নিজেদের ছবি আপলোড না করেনযারা ইতোমধ্যে ছবি দিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে তারা যেন তা সরিয়ে ফেলেনআমরা আশা করব আপনারা নেজেদের সম্মান এবং ইজ্জতের হেফাজত করবেন ইসলামের মাধ্যমেশয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণের আগে আল্লাহকে ভয় করবেনআল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলামের সঠিক বুঝ দান করুনআল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফজত করুনআল্লাহ আমাদের বোনেদের পরপুরুষের লুলুপ দৃষ্টি কিংবা ফেসবুকের লাইক কমেন্টের মাধ্যমে নয় ইসলামের মাধ্যমেই সম্মানিত হওয়ার তৌফিক দান করুনআমীন

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ পোষ্ট টা পড়ে যদি ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট বক্স এ আপনার মতামত জানাবেন আর আপনার বন্ধু বান্দব দের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন্নাআসসালামু আলাইকুমফি আমানিল্লাহ !!! আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুজ দান করুন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: