10.13.2014

আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার জিবনি মোবারক ।

হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হিসাবে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আদম আলাইহিস সাল্লাম-উনাকে নিজ দুহাত দ্বারা সরাসরি সৃষ্টি করেন (ছোয়াদ ৩৮/৭৫) মাটির সকল উপাদানের সার-নির্যাস একত্রিত করে আঠালো ও পোড়ামাটির ন্যায় শুষ্ক মাটির তৈরী সুন্দরতম অবয়বে রূহ ফুঁকে দিয়ে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আদম আলাইহিস সাল্লামকে সৃষ্টি করেছেন[1] 

অতঃপর আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার পাঁজর থেকে উনার স্ত্রী হাওয়া (আলাইহিস সালাম) উনাকে সৃষ্টি করেন[2] আর এ কারণেই স্ত্রী জাতি স্বভাবগত ভাবেই পুরুষ জাতির অনুগামী ও পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট।  অতঃপর স্বামী-স্ত্রীর মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে একই নিয়মে মানববংশ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে পবিত্র আল-কুরআন উনার বর্ণনা অনুযায়ী প্রথম দিন থেকেই মানুষ পূর্ণ চেতনা ও জ্ঞান সম্পন্ন সভ্য মানুষ হিসাবেই যাত্রারম্ভ করেছে এবং আজও সেভাবেই তা অব্যাহত রয়েছে। অতএব গুহামানববন্যমানবআদিম মানব ইত্যাদি বলে অসভ্য যুগ থেকে সভ্য যুগে মানুষের উত্তরণ ঘটেছে বলে কিছু কিছু ঐতিহাসিক কল্পকাহিনি বা বিজ্ঞানিরা যেসব কথা শুনিয়ে থাকেনতা অলীক কল্পনা ব্যতীত কিছুই নয়। সূচনা থেকে এযাবত এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মানুষ কখনোই মানুষ ব্যতীত অন্য কিছু ছিল না। মানুষ বানর বা উল্লুকের উদ্বর্তিত রূপ বলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে চার্লস ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২) যে বিবর্তনবাদ’ (Theory of Evolution) পেশ করেছেনতা বর্তমানে একটি মৃত মতবাদ মাত্র এবং তা প্রায় সকল বিজ্ঞানী কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে

প্রথম মানুষ আদি পিতা আদম আলাইহিস সাল্লাম উনাকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা  সর্ব বিষয়ের জ্ঞান ও যোগ্যতা দান করেন এবং বিশ্বে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা  উনার খেলাফত পরিচালনার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। সাথে সাথে সকল সৃষ্ট বস্ত্তকে করে দেন মানুষের অনুগত (লোকমান ৩১/২০) ও সবকিছুর উপরে দেন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব (ইসরা ১৭/৭০)। আর সেকারণেই জিন-ফিরিশতা (আলাইহিমুস সালাম) সহ সবাইকে মানুষের মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আদম আলাইহিস সাল্লাম  উনাকে সিজদা করার আদেশ দেন। সবাই সে নির্দেশ মেনে নিয়েছিল।  কিন্তু  ইবলীস অহংকার বশে সে নির্দেশ অমান্য করায় চিরকালের মত অভিশপ্ত হয়ে যায় (বাক্বারাহ ২/৩৪)। অথচ সে ছিল বড় আলেম ও ইবাদতগুযার। সেকারণ জিন জাতির হওয়া সত্ত্বেও সে ফিরিশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের সঙ্গে বসবাস করার অনুমতি পেয়েছিলো ও তাদের নেতা হয়েছিল [3] কিন্তু আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার উচ্চ মর্যাদা দেখে সে ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে। ফলে অহংকার বশে আদম আলাইহিস সাল্লামকে সিজদা না করায় এবং আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা ভীতি না থাকায় সে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার গযবে পতিত হয়। এজন্য জনৈক আরবী কবি বলেন,

لوكان للعلم شرف من دون التقى

لكان أشرف خلق الله إبليسُ

            ‘যদি তাক্বওয়া বিহীন ইলমের কোন মর্যাদা থাকতো,

         তবে ইবলীস আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টিকুলের সেরা বলে গণ্য হতো

শয়তানের সৃষ্টি ছিল মানুষের জন্য পরীক্ষা স্বরূপঃ ইবলীসকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ সৃষ্টি করেন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার হায়াত দীর্ঘ করে দেন। মানুষকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা  উনার পথ থেকে বিচ্যুৎ করার জন্য ও তাকে ধোঁকা দেওয়াই শয়তানের একমাত্র কাজ। সে মানুষকে বলে কুফরী কর। কিন্তু যখন সে কুফরী করেতখন শয়তান বলে আমি তোমার থেকে মুক্ত। আমি বিশ্বপ্রভু আল্লাহ্কে ভয় করি’ (হাশর ৫৯/১৬)। অন্যদিকে যুগে যুগে নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম ও কিতাব পাঠিয়ে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা রাব্বুল ইজ্জত মানুষকে সত্য পথ প্রদর্শনের ব্যবস্থা অব্যাহত রাখেন (বাক্বারাহ ২/২১৩)। আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার থেকে শুরু করে সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ট নবী নূরে মুজাসসাম হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার পর্যন্ত এক লক্ষ চবিবশ হাজার পয়গাম্বর বা মতান্তরে লক্ষ চবিবশ হাজার পয়গাম্বর আলাইহিমুস সালাম দুনিয়াতে এসেছেন[4] এবং বর্তমানে সর্বশেষ এলাহীগ্রন্থ পবিত্র আল-কুরআনুল কারিম উনার ধারক ও বাহক পূর্বে আওলিয়ায়ে কেরাম আর বর্তমানে খাটি হাক্কানি মুসলিম ওলামায়ে কেরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিগন শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার ওয়ারিছ’ হিসেবে[5] আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রেরিত অহীর বিধান সমূহ বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেবার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন (মায়েদাহ ৫/৬৭)। পৃথিবীর চূড়ান্ত ধ্বংস তথা ক্বিয়ামতের অব্যবহিত কাল পূর্ব পর্যন্ত এই নিয়ম জারি থাকবে। শেষনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী পৃথিবীর এমন কোন বস্তি ও ঝুপড়ি ঘরও থাকবে নাযেখানে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা  উনার প্রেরিত একমাত্র পবিত্র ধর্ম ইসলাম উনার বাণী পৌঁছে দেবেন না[6] এতদসত্ত্বেও অবশেষে পৃথিবীতে যখন আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলার মতো কোন লোক থাকবে নাঅর্থাৎ প্রকৃত তাওহীদের অনুসারী কোন মুমিন বাকী থাকবে নাতখন আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার হুকুমে প্রলয় ঘনিয়ে আসবে এবং ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে[7] মানুষের দেহগুলি সব মৃত্যুর পরে মাটিতে মিশে যাবে। কিন্তু রূহগুলি স্ব স্ব ভাল বা মন্দ আমল অনুযায়ী ইল্লীন’ অথবা সিজ্জীনে’ অবস্থান করবে (মুত্বাফফেফীন ৮৩/৭১৮)। যা ক্বিয়ামতের পরপরই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা  উনার হুকুমে স্ব স্ব দেহে পুনঃপ্রবেশ করবে (ফজর ৮৯/২৯) এবং চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের জন্য সকল মানুষ সশরীরে একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা  উনার দরবারে উপস্থিত হবে (মুত্বাফফেফীন ৮৩/৪-৬)

মানুষের ঠিকানা হলো তিনটি : ১- দারুদ দুনিয়া। অর্থাৎ যেখানে আমরা এখন বসবাস করছি ২- দারুল বরযখ। অর্থাৎ মৃত্যুর পরে কবরের জগত। ৩- দারুল ক্বারার। অর্থাৎ ক্বিয়ামতের দিন শেষ বিচার শেষে জান্নাত বা জাহান্নামের চিরস্থায়ী ঠিকানা

অতএব পৃথিবী হলো মানুষের জন্য সাময়িক পরীক্ষাগার মাত্র। জান্নাত থেকে নেমে আসা মানুষ এই পরীক্ষাস্থলে পরীক্ষা শেষে সুন্দর ফল লাভে পুনরায় জান্নাতে ফিরে যাবেঅথবা ব্যর্থকাম হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। অতঃপর সেখানেই হবে তাদের সর্বশেষ যাত্রাবিরতি এবং সেটাই হবে তাদের চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী ঠিকানা। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, ‘মাটি থেকেই আমরা তোমাদের সৃষ্টি করেছি। ঐ মাটিতেই তোমাদের ফিরিয়ে নেব। অতঃপর ঐ মাটি থেকেই আমরা তোমাদেরকে পুনরায় বের করে আনব’ (ত্বোয়াহা ২০/৫৫)। অতঃপর বিচার শেষে কাফেরদেরকে হাঁকিয়ে নেওয়া হবে জাহান্নামের দিকে এবং মুত্তাক্বীদের নেওয়া হবে জান্নাতে (যুমার ৩৯/৬৯-৭৩)। এভাবেই সেদিন যালেম তার প্রাপ্য শাস্তি ভোগ করবে এবং মযলূম তার যথাযথ প্রতিদান পেয়ে ধন্য হবে। সেদিন কারু প্রতি কোনরূপ অবিচার করা হবে না (বাক্বারাহ ২/২৮১)

উল্লেখ্য যেহযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১০টি সূরায় ৫০টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে[8]

এক্ষণে আদম আলাইহিস সাল্লাম সৃষ্টির ঘটনাবলী কুরআনে যেভাবে বর্ণিত হয়েছেতার আলোকে সার-সংক্ষেপ আমরা তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশা আল্লাহ

আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার সৃষ্টির কাহিনীঃ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা একদা ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের ডেকে বললেনআমি পৃথিবীতে খলীফা’ অর্থাৎ প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে চাই। বলএ বিষয়ে তোমাদের বক্তব্য কিতারা (সম্ভবতঃ ইতিপূর্বে সৃষ্ট জিন জাতির তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে) বললহে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা! আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে আবাদ করতে চানযারা গিয়ে সেখানে ফাসাদ সৃষ্টি করবে ও রক্তপাত ঘটাবেঅথচ আমরা সর্বদা আপনার হুকুম পালনে এবং আপনার গুণগান ও পবিত্রতা বর্ণনায় রত আছি। এখানে ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের উক্ত বক্তব্য আপত্তির জন্য ছিল নাবরং  জানার জন্য ছিল। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বললেনআমি যা জানিতোমরা তা জানো না (বাক্বারাহ ২/৩০)। অর্থাৎ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা চান এ পৃথিবীতে এমন একটা সৃষ্টির আবাদ করতেযারা হবে জ্ঞান ও ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন এবং নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি ও  চিন্তা-গবেষণা সহকারে স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার বিধান সমূহের আনুগত্য করবে ও তাঁর ইবাদত করবে। ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের মত কেবল হুকুম তামিলকারী জাতি নয়

খলীফা অর্থঃ এখানে খলীফা’ বা প্রতিনিধি বলে জিনদের পরবর্তী প্রতিনিধি হিসাবে বনি আদমকে বুঝানো হয়েছেযারা পৃথিবীতে একে অপরের প্রতিনিধি হবে (ইবনি কাছীর)। অথবা এর দ্বারা আদম আলাইহিস সাল্লাম ও পরবর্তী ন্যায়নিষ্ঠ শাসকদের বুঝানো হয়েছেযারা জনগণের মধ্যে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার আনুগত্য ও ইনছাফপূর্ণ শাসক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রতিনিধিত্ব করবে। কেননা ফাসাদ সৃষ্টিকারী ও অন্যায় রক্তপাতকারী ব্যক্তিরা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রতিনিধি নয় (ইবনি জারীর)। তবে প্রথম ব্যাখ্যাই অগ্রগণ্যযা ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের জবাবে প্রতীয়মান হয় যেএমন প্রতিনিধি আপনি সৃষ্টি করবেনযারা পূর্ববর্তী জিন জাতির মত পৃথিবীতে গিয়ে ফাসাদ ও রক্তপাত ঘটাবে। বস্ত্ততঃ জিন জাতির উপর ক্বিয়াস করেই তারা এরূপ কথা বলে থাকতে পারে’ (ইবনি কাছীর)

অতঃপর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আদম আলাইহিস সাল্লামকে সবকিছুর নাম শিক্ষা দিলেন। সবকিছুর নাম’ বলতে পৃথিবীর সূচনা থেকে লয় পর্যন্ত ছোট-বড় সকল সৃষ্টবস্ত্তর ইল্ম ও তা ব্যবহারের যোগ্যতা তাকে দিয়ে দেওয়া হলো[9] যা দিয়ে সৃষ্টবস্ত্ত সমূহকে আদম আলাইহিস সাল্লাম ও বনি আদম নিজেদের অনুগত্য করতে পারে এবং তা থেকে ফায়েদা হাছিল করতে পারে। যদিও আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার অসীম জ্ঞানরাশির সাথে মানবজাতির সম্মিলিত জ্ঞানের তুলনা শত কোটি আটলান্টিক মহাসাগরের অথৈ জলরাশির বুক থেকে পাখির ছোঁ মারা এক ফোঁটা পানির সমতুল্য মাত্র[10] বলা চলে যেআদম আলাইহিস সাল্লামকে দেওয়া সেই যোগ্যতা ও জ্ঞান ভান্ডার যুগে যুগে তাঁর জ্ঞানী ও বিজ্ঞানী সন্তানদের মাধ্যমে বিতরিত হচ্ছে ও তার দ্বারা জগত সংসার উপকৃত হচ্ছে। আদম আলাইহিস সাল্লামকে সবকিছুর নাম শিক্ষা দেওয়ার পর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনাকে ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের সম্মুখে পেশ করলেন। কুরআনে কেবল ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের কথা উল্লেখিত হলেও সেখানে জিনদের সদস্য ইবলীসও উপস্থিত ছিল (কাহফ ১৮/৫০)। অর্থাৎ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা চেয়েছিলেনজিন ও ফেরেশতা উভয় সম্প্রদায়ের উপরে আদম আলাইহিস সাল্লাম-উনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হৌক এবং বাস্তবে সেটাই হলো। তবে যেহেতু ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম)গণ জিনদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্নসেজন্য কেবল তাদের নাম নেওয়া হয়েছে। আর দুনিয়াতে জিনদের ইতিপূর্বেকার উৎপাত ও অনাচার সম্বন্ধে ফেরেশতারা আগে থেকেই অবহিত ছিলসেকারণ তারা মানুষ সম্বন্ধেও একইরূপ ধারণা পোষণ করেছিল এবং প্রশ্নের জবাবে নেতিবাচক উত্তর দিয়েছিল। উল্লেখ্য যে, ‘আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা জিন জাতিকে আগেই সৃষ্টি করেন গনগনে আগুন থেকে’ (হিজর ১৫/২৭)। কিন্তু তারা অবাধ্যতার চূড়ান্ত করে

আদম আলাইহিস সাল্লামকে ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের সম্মুখে পেশ করার পর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদেরকে ঐসব বস্ত্তর নাম জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু সঙ্গত কারণেই তারা তা বলতে পারল না। তখন আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আদম আলাইহিস সাল্লামকে নির্দেশ দিলেন এবং তিনি সবকিছুর নাম বলে দিলেন। ফলে ফেরেশতারা অকপটে তাদের পরাজয় মেনে নিল এবং আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার মহত্ত্ব ও পবিত্রতা ঘোষণা করে বললহে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা! আপনি আমাদেরকে যতটুকু শিখিয়েছেনতার বাইরে আমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনি সর্বজ্ঞ ও দূরদৃষ্টিময়’ (বাক্বারাহ ২/৩২)। অতঃপর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের সবাইকে আদম আলাইহিস সাল্লামের সম্মুখে সম্মানের সিজদা করতে বললেন। সবাই সিজদা করলইবলীস ব্যতীত। সে অস্বীকার করল ও অহংকারে স্ফীত হয়ে প্রত্যাখ্যান করল। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলো (বাক্বারাহ ২/৩৪)। ইবলীস ঐ সময় নিজের পক্ষে যুক্তি পেশ করে বলল, ‘আমি ওর চাইতে উত্তম। কেননা আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন আর ওকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বললেনতুই বের হয়ে যা। তুই অভিশপ্ততোর উপরে আমার অভিশাপ রইল পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত’ (ছোয়াদ ৩৮/৭৬-৭৮রাফ ৭/১২)

সিজদার ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্যঃ আদম আলাইহিস সাল্লামকে সৃষ্টি করার আগেই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদেরকে আদম আলাইহিস সাল্লামের প্রতি সিজদা করার কথা বলে দিয়েছিলেন (হা-মীম সাজদাহ/ফুছছিলাত ৪১/১১)। তাছাড়া কুরআনের বর্ণনা সমূহ থেকে একথা স্পষ্ট হয় যেআদম আলাইহিস সাল্লামকে সিজদা করার জন্য আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার নির্দেশ ব্যক্তি আদম আলাইহিস সাল্লাম হিসাবে ছিল নাবরং ভবিষ্যৎ মানব জাতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে তাঁর প্রতি সম্মান জানানোর জন্য জিন ও ফিরিশতাদের সিজদা করতে বলা হয়েছিল। এই সিজদা কখনোই আদম আলাইহিস সাল্লামের প্রতি ইবাদত পর্যায়ের ছিল না। বরং তা ছিল মানবজাতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন ও তাদেরকে সকল কাজে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দানের প্রতীকী ও সম্মান সূচক সিজদা মাত্র

ওদিকে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলেও ইবলীস কিন্তু আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালাকে সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা হিসাবে অস্বীকার করেনি। বরং আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা যখন তাকে অভিসম্পাৎ’ করে জান্নাত থেকে চিরদিনের মত বিতাড়িত করলেনতখন সে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনাকে রব’ হিসাবেই সম্বোধন করে প্রার্থনা করলقَالَ رَبِّ فَأَنظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ- ‘হে আমার প্রভু! আমাকে আপনি ক্বিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিন’ (হিজর ১৫/৩৬ছোয়াদ ৩৮/৭৯)। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তার প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। অতঃপর সে বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা! আপনি যেমন আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেনআমিও তেমনি তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানারূপ সৌন্দর্যে প্রলুব্ধ করব এবং তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেব। তবে যারা আপনার একনিষ্ঠ বান্দাতাদের ব্যতীত’ (হিজর ১৫/৩৪-৪০ছোয়াদ ৩৮/৭৯-৮৩)। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে বললেনতুমি নেমে যাও এবং এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তুমি নীচুতমদের অন্তর্ভুক্ত। এখানে তোমার অহংকার করার অধিকার নেই’ (রাফ ৭/১৩)। উল্লেখ্য যেইবলীস জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হলেও মানুষের রগ-রেশায় ঢুকে ধোঁকা দেওয়ার ও বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে দিয়েছিলেন[11] আর এটা ছিল মানুষের পরীক্ষার জন্য। শয়তানের ধোঁকার বিরুদ্ধে জিততে  পারলেই মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে এবং আখেরাতে জান্নাত লাভে ধন্য হবে। নইলে ইহকাল ও পরকালে ব্যর্থকাম হবে। মানুষের প্রতি ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের সিজদা করা ও ইবলীসের সিজদা না করার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে এ বিষয়ে যেমানুষ যেন প্রতি পদে পদে শয়তানের ব্যাপারে সতর্ক থাকে এবং আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখে

আদম আলাইহিস সাল্লামের পাঁচটি শ্রেষ্ঠত্বঃ

(১) আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে নিজ দুহাতে সৃষ্টি করেছেন (ছোয়াদ ৩৮/৭৫)। (২) আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা নিজে তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন (ছোয়াদ ৩৮/৭২)
(৩) আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে সকল বস্ত্তর নাম শিক্ষা দিয়েছেন (বাক্বারাহ ২/৩১)
(৪) তাকে সিজদা করার জন্য আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের নির্দেশ দিয়েছেন (বাক্বারাহ ২/৩৪)
(৫) আদম আলাইহিস সাল্লাম একাই মাত্র মাটি থেকে সৃষ্ট। বাকী সবাই পিতা-মাতার মাধ্যমে সৃষ্ট (সাজদাহ ৩২/৭-৯)

ইবলীসের অভিশপ্ত হওয়ার কারণ ছিল তার ক্বিয়াস। সে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার আদেশের বিরুদ্ধে যুক্তি পেশ করে বলেছিল, ‘আমি আদম আলাইহিস সাল্লামের চাইতে উত্তম। কেননা আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে’ (হিজর ২৯)। মুহাম্মাদ ইবনি সীরীন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেনاول من قاس ابليس ‘প্রথম ক্বিয়াস করেছিল ইবলীস। হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহিও অনুরূপ বলেছেন[12]

নারী জাতি পুরুষেরই অংশ এবং তার অনুগতঃ  সিজদা অনুষ্ঠানের পর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আদম আলাইহিস সাল্লামের জুড়া হিসাবে তার অবয়ব হতে একাংশ নিয়ে অর্থাৎ তার পাঁজর হতে তার স্ত্রী হাওয়া (আলাইহিস সালাম)কে সৃষ্টি করলেন[13] মাটি থেকে সৃষ্ট হওয়া আদম আলাইহিস সাল্লামের নাম হলো আদম আলাইহিস সাল্লাম’ এবং জীবন্ত আদম আলাইহিস সাল্লামের পাঁজর হতে সৃষ্ট হওয়ায় তাঁর স্ত্রীর নাম হলো হাওয়া (আলাইহিস সালাম)’ (কুরতুবী)। অতঃপর তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বললেন, ‘তোমরা দুজন জান্নাতে বসবাস কর ও সেখান থেকে যা খুশী খেয়ে বেড়াও। তবে সাবধান! এই গাছটির নিকটে যেয়ো না। তাহলে তোমরা সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’ (বাক্বারাহ ২/৩৫)। এতে বুঝা যায় যেফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম গণের সিজদা কেবল আদম আলাইহিস সাল্লামের জন্য ছিলোহাওয়া (আলাইহিস সালাম)র জন্য নয়। দ্বিতীয়তঃ সিজদা অনুষ্ঠানের পরে আদম আলাইহিস সাল্লামের অবয়ব থেকে হাওয়া (আলাইহিস সালাম)কে সৃষ্টি করা হয়পূর্বে নয়। তিনি পৃথক কোন সৃষ্টি ছিলেন না। এতে পুরুষের প্রতি নারীর অনুগামী হওয়া প্রমাণিত হয়। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, ‘পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল’ (নিসা ৪/৩৪)। অতঃপর বহিষ্কৃত ইবলীস তার প্রথম টার্গেট হিসেবে আদম আলাইহিস সাল্লাম ও হাওয়া (আলাইহিস সালাম) উনার বিরুদ্ধে প্রতারণার জাল নিক্ষেপ করলো। সেমতে সে প্রথমে তাদের খুব আপনজন বনে গেলো এবং নানা কথায় তাদের ভুলাতে লাগলো। এক পর্যায়ে সে বলল, ‘আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা যে তোমাদেরকে ঐ গাছটির নিকটে যেতে নিষেধ করেছেনতার কারণ হলো এই যেতোমরা তাহলে ফেরেশতা হয়ে যাবে কিংবা তোমরা এখানে চিরস্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাবে’ (রাফ ৭/২০)। সে অতঃপর কসম খেয়ে বলল যেআমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাংখী’ (২১)। এভাবেই সে আদম আলাইহিস সাল্লাম ও হাওয়া (আলাইহিস সালাম)কে সম্মত করে ফেললো এবং তার প্রতারণার জালে আটকে গিয়ে তারা উক্ত নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল আস্বাদন করলো। ফলে সাথে সাথে তাদের গুপ্তাঙ্গ প্রকাশিত হয়ে পড়ল এবং তারা তড়িঘড়ি গাছের পাতা সমূহ দিয়ে তা ঢাকতে লাগল। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাদেরকে ডেকে বললেনআমি কি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনি এবং বলিনি যেশয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? (২২) তখন তারা অনুতপ্ত হয়ে বললقَالاَ رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ-   ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিজেদের উপর যুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেনতবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (২৩)। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তখন বললেনতোমরা (জান্নাত থেকে) নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু। তোমাদের অবস্থান হবে পৃথিবীতে এবং সেখানেই তোমরা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত সম্পদরাজি ভোগ করবে’ (২৪)। তিনি আরও বললেন যে, ‘তোমরা পৃথিবীতেই জীবনযাপন করবেসেখানেই মৃত্যুবরণ করবে এবং সেখান থেকেই তোমরা পুনরুত্থিত হবে’ (রাফ ৭/২০-২৫)

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যেইবলীসের কথায় সর্বপ্রথম হাওয়া (আলাইহিস সালাম) প্রতারিত হন। অতঃপর তার মাধ্যমে আদম আলাইহিস সাল্লাম প্রতারিত হন বলে যে কথা চালু আছে পবিত্র আল কোরআনে এর কোন সমর্থন নেই। কোন হাদীছ শরিফেও স্পষ্ট কিছু নেই তবে এ বিষয়ে তাফসীরে ইবনি জারীরে ইবনি আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে যে বর্ণনা এসেছেতা যঈফ বলা হয়[14] দ্বিতীয়তঃ জান্নাত থেকে অবতরণের নির্দেশ তাদের অপরাধের শাস্তি স্বরূপ ছিলনা। কেননা এটা ছিল তওবা কবুলের পরের ঘটনা। অতএব এটা ছিল হয়তবা তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দানের জন্য। বরং সঠিক কথা এই যেএটা ছিল আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার পূর্ব নির্ধারিত ও দূরদর্শী পরিকল্পনারই অংশ। কেননা জান্নাত হলো কর্মফল লাভের স্থানকর্মের স্থান নয়। তাছাড়া জান্নাতে মানুষের বংশ বৃদ্ধির সুযোগ নেই। এজন্য দুনিয়ায় নামিয়ে দেওয়া জরূরী ছিল

প্রথম বার আদেশ দানের পরে পুনরায় স্নেহ ও অনুগ্রহ মিশ্রিত আদেশ দিয়ে বললেন, ‘তোমরা সবাই নেমে যাও। অতঃপর পৃথিবীতে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার খলীফা হওয়ার (বাক্বারাহ ২/৩০ফাত্বির ৩৫/৩৯) মহান মর্যাদা প্রদান করে বললেন, ‘তোমাদের নিকটে আমার পক্ষ থেকে হেদায়াত অবতীর্ণ হবে। যারা তার অনুসরণ করবেতাদের জন্য কোন ভয় বা চিন্তার কারণ থাকবে না। কিন্তু যারা তা প্রত্যাখ্যান করবে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করবেতারা হবে জাহান্নামের অধিবাসী এবং সেখানে তারা অনন্তকাল ধরে অবস্থান করবে’ (বাক্বারাহ ২/৩৮-৩৯)

উল্লেখ্য যেনবীগণ ছিলেন নিষ্পাপ এবং হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম ছিলেন নিঃসন্দেহে নিষ্পাপ। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ভুল করেননি। বরং শয়তানের প্ররোচনায় প্রতারিত হয়ে তিনি সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ বৃক্ষের নিকটবর্তী হওয়ার নিষেধাজ্ঞার কথাটি ভুলে গিয়েছিলেন। যেমন অন্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছেفَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا- ‘অতঃপর আদম আলাইহিস সাল্লাম ভুলে গেলেন এবং আমি তার মধ্যে (সংকল্পের) দৃঢ়তা পাইনি’ (ত্বোয়াহা ২০/১১৫)। তাছাড়া উক্ত ঘটনার সময় তিনি নবী হননি বরং পদস্খলনের ঘটনার পরে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে নবী মনোনীত করে দুনিয়ায় পাঠান ও হেদায়াত প্রদান করেন’ (রাফ ৭/১২২)

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যেইবলীসের ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বললেনقَالَ فَاخْرُجْ مِنْهَا فَإِنَّكَ رَجِيمٌ- ‘তুমি জান্নাত থেকে বেরিয়ে যাও। নিশ্চয়ই তুমি অভিশপ্ত’ (হিজর ১৫/৩৪রাফ ৭/১৮)। অন্যদিকে আদম আলাইহিস সাল্লাম ও হাওয়া (আলাইহিস সালাম) উনার ক্ষেত্রে বললেনقُلْنَا اهْبِطُواْ مِنْهَا- ‘ তোমরা নেমে যাও’ (বাক্বারাহ ২/৩৬৩৮রাফ ৭/২৪)। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যেইবলীস কখনোই আর জান্নাতে ফিরে আসতে পারবে না। কিন্তু বনি আদম ঈমানদারগণ পুনরায় ফিরে আসতে পারবে ইনশাআল্লাহ

নগ্নতা শয়তানের প্রথম কাজঃ মানুষের উপরে শয়তানের প্রথম হামলা ছিল তার দেহ থেকে কাপড় খসিয়ে তাকে উলঙ্গ করে দেওয়া। আজও পৃথিবীতে শয়তানের পদাংক অনুসারী ও ইবলীসের শিখন্ডীদের প্রথম কাজ হলো তথাকথিত ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ সমতার নামে নারীকে উলঙ্গ করে ঘরের বাইরে আনা ও তার সৌন্দর্য উপভোগ করা। অথচ পৃথিবীর বিগত সভ্যতাগুলি ধ্বংস হয়েছে মূলতঃ নারী ও মদের সহজলভ্যতার কারণেই। অতএব সভ্য-ভদ্র ও আল্লাহভীরু বান্দাদের নিকটে ঈমানের পর সর্বপ্রথম ফরয হলো স্ব স্ব লজ্জাস্থান আবৃত রাখা ও ইজ্জত-আবরূর হেফাযত করা। অন্যান্য ফরয সবই এর পরে। নারীর পর্দা কেবল পোষাকে হবে নাবরং তা হবে তার ভিতরেতার কথা-বার্তায়আচার-আচরণে ও চাল-চলনে সর্ব বিষয়ে। পরনারীর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি ও মিষ্ট কণ্ঠস্বর পরপুরুষের হৃদয়ে অন্যায় প্রভাব বিস্তার করে। অতএব লজ্জাশীলতাই মুমিন নর-নারীর অঙ্গভূষণ ও পারস্পরিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি। নারী ও পুরুষ প্রত্যেকে একে অপরের থেকে স্ব স্ব দৃষ্টিকে অবনত রাখবে (নূর ২৪/৩০-৩১) এবং পরস্পরে সার্বিক পর্দা বজায় রেখে কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় কথাটুকু স্বাভাবিকভাবে সংক্ষেপে বলবে। নারী ও পুরুষ প্রত্যেকে নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য ও পর্দা বজায় রেখে স্ব স্ব কর্মস্থলে ও কর্মপরিধির মধ্যে স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং সংসার ও সমাজের কল্যাণে সাধ্যমত অবদান রাখবে। নেগেটিভ ও পজেটিভ পাশাপাশি বিদ্যুৎবাহী দুটি ক্যাবলের মাঝে প্লাষ্টিকের আবরণ যেমন পর্দার কাজ করে এবং অপরিহার্য এক্সিডেন্ট ও অগ্নিকান্ড থেকে রক্ষা করেঅনুরূপভাবে পরনারী ও পরপুরুষের মধ্যকার পর্দা উভয়ের মাঝে ঘটিতব্য যেকোন অনাকাংখিত বিষয় থেকে পরস্পরকে হেফাযত করে। অতএব শয়তানের প্ররোচনায় জান্নাতের পবিত্র পরিবেশে আদি পিতা-মাতার জীবনে ঘটিত উক্ত অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা থেকে দুনিয়ার এই পঙ্কিল পরিবেশে বসবাসরত মানব জাতিকে আরও বেশী সতর্ক ও সাবধান থাকা উচিত। পবিত্র আল কোরআন ও হাদীছ শরিফ আমাদেরকে সেদিকেই হুঁশিয়ার করেছে

মানব সৃষ্টির রহস্যঃ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনوَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلاَئِكَةِ إِنِّيْ خَالِقٌ بَشَرًا مِّن صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَإٍ مَّسْنُوْنٍ، فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيْهِ مِن رُّوحِيْ فَقَعُوْا لَهُ سَاجِدِيْنَ-  ‘স্মরণ কর সেই সময়ের কথাযখন তোমার মালিক ফেরেশতা (আলাইহিমুস সালাম) উনাদের বললেনআমি মিশ্রিত পচা কাদার শুকনো মাটি দিয়ে মানুষ’ সৃষ্টি করবো। অতঃপর যখন আমি তার অবয়ব পূর্ণভাবে তৈরী করে ফেলব ও তাতে আমি আমার রূহ ফুঁকে দেবতখন তোমরা তার প্রতি সিজদায় পড়ে যাবে’ (হিজর ১৫/২৮-২৯)। অন্যত্র তিনি বলেনهُوَ الَّذِيْ يُصَوِّرُكُمْ فِي الأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَآءُ لآ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ- (آل عمران ৬)- তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে মাতৃগর্ভে আকার-আকৃতি দান করেছেন যেমন তিনি চেয়েছেন। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি মহা পরাক্রান্ত ও মহা বিজ্ঞানী’ (আলে ইমরান ৩/৬)। তিনি আরও বলেনيَخْلُقُكُمْ فِيْ بُطُوْنِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِّن بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلاَثٍ- (زمر ৬)-   তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করেন একের পর এক স্তরে তিনটি অন্ধকারাচ্ছন্ন আবরণের মধ্যে’ (যুমার ৩৯/৬)। তিনটি আবরণ হলো- পেটরেহেম বা জরায়ু এবং জরায়ুর ফুল বা গর্ভাধার

উপরোক্ত আয়াতগুলিতে আদম আলাইহিস সাল্লাম সৃষ্টির তিনটি পর্যায় বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমে মাটি দ্বারা অবয়ব নির্মাণঅতঃপর তার আকার-আকৃতি গঠন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহে শক্তির আনুপতিক হার নির্ধারণ ও পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান এবং সবশেষে তাতে রূহ  সঞ্চার  করে আদম আলাইহিস সাল্লামকে অস্তিত্ব দান। অতঃপর আদম আলাইহিস সাল্লামের অবয়ব (পাঁজর) থেকে কিছু অংশ নিয়ে তার জোড়া বা স্ত্রী সৃষ্টি করা। সৃষ্টির সূচনা পর্বের এই কাজগুলি আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা সরাসরি নিজ হাতে করেছেন (ছোয়াদ ৩৮/৭৫)। অতঃপর এই পুরুষ ও নারী স্বামী-স্ত্রী হিসাবে বসবাস করে প্রথম যে যমজ সন্তান জন্ম দেয়তারাই হলো মানুষের মাধ্যমে সৃষ্ট পৃথিবীর প্রথম মানব যুগল। তারপর থেকে এযাবত স্বামী-স্ত্রীর মিলনে মানুষের বংশ বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে

শুধু মানুষ নয়উদ্ভিদরাজিজীবজন্তু ও প্রাণীকুলের সৃষ্টি হয়েছে মাটি থেকে। আর মাটি সৃষ্টি হয়েছে পানি থেকে। পানিই হলো সকল জীবন্ত বস্ত্তর মূল (ফুরক্বান ২৫/৫৪)

মৃত্তিকাজাত সকল প্রাণীর জীবনের প্রথম ও মূল একক (Unit) হচ্ছে প্রোটোপ্লাজম’ (Protoplasm)। যাকে বলা হয় আদি প্রাণসত্তা। এ থেকেই সকল প্রাণী সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য বিজ্ঞানী মরিস বুকাইলী একে Bomb shell বলে অভিহিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মাটির সকল প্রকারের রাসায়নিক উপাদান। মানুষের জীবন বীজে প্রচুর পরিমাণে চারটি উপাদান পাওয়া যায়। অক্সিজেননাইট্রোজেনকার্বন ও হাইড্রোজেন। আর আটটি পাওয়া যায় সাধারণভাবে সমপরিমাণে। সেগুলি হলো- ম্যাগনেশিয়ামসোডিয়ামপটাশিয়ামক্যালসিয়ামফসফরাসক্লোরিনসালফার ও আয়রণ। আরও আটটি পদার্থ পাওয়া যায় স্বল্প পরিমাণে। তাহলো: সিলিকনমোলিবডেনামফ্লুরাইনকোবাল্টম্যাঙ্গানিজআয়োডিনকপার ও যিংক। কিন্তু এই সব উপাদান সংমিশ্রিত করে জীবনের কণা তথা প্রোটোপ্লাজম’ তৈরী করা সম্ভব নয়। জনৈক বিজ্ঞানী দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এসব মৌল উপাদান সংমিশ্রিত করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন এবং তাতে কোন জীবনের কণা’ পরিলক্ষিত হয়নি। এই সংমিশ্রণ ও তাতে জীবন সঞ্চার আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা ব্যতীত কারু পক্ষে সম্ভব নয়। বিজ্ঞান এক্ষেত্রে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে

প্রথম পর্যায়ে মাটি থেকে সরাসরি আদম আলাইহিস সাল্লামকে অতঃপর আদম আলাইহিস সাল্লাম থেকে তার স্ত্রী হাওয়া (আলাইহিস সালাম)কে সৃষ্টি করার পরবর্তী পর্যায়ে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার সন্তানদের মাধ্যমে বনি আদমের বংশ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছেন। এখানেও রয়েছে সাতটি স্তর। যেমনঃ মৃত্তিকার সারাংশ তথা প্রোটোপ্লাজমবীর্য বা শুক্রকীটজমাট রক্তমাংসপিন্ডঅস্থিমজ্জাঅস্থি পরিবেষ্টনকারী মাংস এবং সবশেষে রূহ সঞ্চারণ (মুমিনূন ২৩/১২-১৪মুমিন ৪০/৬৭ফুরক্বান ২৫/৪৪তারেক্ব ৮৬/৫-৭)। স্বামীর শুক্রকীট স্ত্রীর জরায়ুতে রক্ষিত ডিম্বকোষে প্রবেশ করার পর উভয়ের সংমিশ্রিত বীর্যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করে (দাহর ৭৬/২)। উল্লেখ্য যেপুরুষের একবার নির্গত লম্ফমান বীর্যে লক্ষ-কোটি শুক্রাণু থাকে। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার হুকুমে তন্মধ্যকার একটি মাত্র শুক্রকীট স্ত্রীর জরায়ুতে প্রবেশ করে। এই শুক্রকীট পুরুষ ক্রোমোজম অথবা স্ত্রী ক্রোমোজম হয়ে থাকে। এর মধ্যে যেটি স্ত্রীর ডিম্বের ক্রোমোজমের সাথে মিলিত হয়সেভাবেই পুত্র বা কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার হুকুমে

মাতৃগর্ভের  তিন তিনটি  গাঢ়  অন্ধকার  পর্দার অন্তরালে এইভাবে দীর্ঘ নয় মাস ধরে বেড়ে ওঠা প্রথমতঃ একটি পূর্ণ জীবন সত্তার সৃষ্টিঅতঃপর একটি জীবন্ত প্রাণবন্ত ও প্রতিভাবান শিশু হিসাবে দুনিয়াতে ভূমিষ্ট হওয়া কতই না বিষ্ময়কর ব্যাপার। কোন মানুষের পক্ষে এই অনন্য-অকল্পনীয় সৃষ্টিকর্ম আদৌ সম্ভব কীমাতৃগর্ভের ঐ অন্ধকার গৃহে মানবশিশু সৃষ্টির সেই মহান কারিগর কেকে সেই মহান আর্কিটেক্টযিনি ঐ গোপন কুঠরীতে পিতার ২৩টি ক্রোমোজম ও মাতার ২৩টি ক্রোমোজম একত্রিত করে সংমিশ্রিত বীর্য প্রস্ত্তত করেনকে সেই মহান শিল্পীযিনি রক্তপিন্ড আকারের জীবন টুকরাটিকে মাতৃগর্ভে পুষ্ট করেনঅতঃপর ১২০ দিন পরে তাতে রূহ সঞ্চার করে তাকে জীবন্ত মানব শিশুতে পরিণত করেন এবং পূর্ণ-পরিণত হওয়ার পরে সেখান থেকে বাইরে ঠেলে দেন (আবাসা ৮০/১৮-২০)। বাপ-মায়ের স্বপ্নের ফসল হিসাবে নয়নের পুত্তলি হিসাবেমায়ের গর্ভে মানুষ তৈরীর সেই বিষ্ময়কর যন্ত্রের দক্ষ কারিগর ও সেই মহান শিল্পী আর কেউ ননতিনি আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা! সুবহানাল্লাহি ওয়া বেহামদিহিসুবহানাল্লাহিল আযীম!!

পুরুষ ও নারীর সংমিশ্রিত বীর্যে সন্তান জন্ম লাভের তথ্য কুরআনই সর্বপ্রথম উপস্থাপন করেছে (দাহর ৭৬/২)। আধুনিক বিজ্ঞান এ তথ্য জনতে পেরেছে মাত্র গত শতাব্দীতে ১৮৭৫ সালে ও ১৯১২ সালে। তার পূর্বে এরিষ্টটল সহ সকল বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল যেপুরুষের বীর্যের কোন কার্যকারিতা নেই। রাসূলের হাদীছ বিজ্ঞানীদের এই মতকে সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছে[15] কেননা সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে সন্তান প্রজননে পুরুষ ও নারী উভয়ের বীর্য সমানভাবে কার্যকর

উল্লেখ্য যেমাতৃগর্ভে বীর্য প্রথম ৬ দিন কেবল বুদ্বুদ আকারে থাকে। তারপর জরায়ুতে সম্পর্কিত হয়। তিন মাসের আগে ছেলে বা মেয়ে সন্তান চিহ্নিত হয় না। চার মাস পর রূহ সঞ্চারিত হয়ে বাচ্চা নড়েচড়ে ওঠে ও আঙ্গুল চুষতে থাকে। যাতে ভূমিষ্ট হওয়ার পরে মায়ের স্তন চুষতে অসুবিধা না হয়। এ সময় তার কপালে চারটি বস্ত্ত লিখে দেওয়া হয়। তার আজাল (হায়াত)আমলরিযিক এবং সে ভাগ্যবান না দুর্ভাগা[16]

এভাবেই জগত সংসারে মানববংশ বৃদ্ধির ধারা এগিয়ে চলেছে। এ নিয়মের ব্যতিক্রম নেই কেবল আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার হুকুম ব্যতীত। একারণেই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা অহংকারী মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘মানুষ কি দেখে না যেআমরা তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকেঅতঃপর সে হয়ে গেল প্রকাশ্যে বিতন্ডাকারী। সে আমাদের সম্পর্কে নানারূপ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে। অথচ সে নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে ভুলে যায়আর বলে যেকে জীবিত করবে এসব হাড়গোড় সমূহকেযখন সেগুলো পচে গলে যাবে? (ইয়াসীন ৩৬/৭৭-৭৮)

জান্নাত থেকে পতিত হবার পরঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে ইমাম আহমাদনাসাঈ ও হাকেম (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বর্ণনা করেন যেألست بربكم ‘আমি  কি তোমাদের প্রভু নইবনি আদমমের কাছ থেকে এই বহুল প্রসিদ্ধ আহদে আলাস্ত্ত’ বা প্রতিজ্ঞা-প্রতিশ্রুতিটি তখনই নেওয়া হয়যখন আদম আলাইহিস সাল্লাম-কে জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর এ প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিল নামান (وادى نَعْمَانَ) নামক উপত্যকায়যা পরবর্তীকালে আরাফাত’-এর ময়দান নামে পরিচিত হয়েছে[17] এর দ্বারা একটি বিষয় প্রমাণিত হয় যেজান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থান পৃথিবীর বাইরে অন্যত্র এবং তা সৃষ্ট অবস্থায় তখনও ছিল এখনও আছে। আধুনিক বিজ্ঞান এ পৃথিবী ও সৌরলোকের বাইরে দূরে বহুদূরে অগণিত সৌরলোকের সন্ধান দিয়ে কুরআন ও হাদীছের তথ্যকেই সপ্রমাণ করে দিচ্ছে

আদম আলাইহিস সাল্লামের অবতরণ স্থলঃ আদম আলাইহিস সাল্লাম ও হাওয়া (আলাইহিস সালাম)কে আসমানে অবস্থিত জান্নাত থেকে নামিয়ে দুনিয়ায় কোথায় রাখা হয়েছিলসে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। যেমন বলা হয়েছে আদম আলাইহিস সাল্লামকে সরনদীপে (শ্রীলংকা) ও হাওয়া (আলাইহিস সালাম)কে জেদ্দায় (সঊদী আরব) এবং ইবলীসকে বছরায় (ইরাক) ও ইবলিসের জান্নাতে ঢোকার কথিত বাহন সাপকে ইস্ফাহানে (ইরান) নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কেউ বলেছেনআদম আলাইহিস সাল্লামকে মক্কার ছাফা পাহাড়ে এবং হাওয়া (আলাইহিস সালাম)কে মারওয়া পাহাড়ে নামানো হয়েছিল। এছাড়া আরও বক্তব্য এসেছে। তবে যেহেতু কুরআন ও ছহীহ হাদীছে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নিসেকারণ এ বিষয়ে আমাদের চুপ থাকাই শ্রেয়

আহ্দে আলাস্ত্ত-র বিবরণঃ মুসলিম ইবনে ইয়াসার (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বলেনকিছু লোক হযরত ওমর ফারূক (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)-উনার নিকটে সূরা আরাফ ১৭২ আয়াতের মর্ম জানতে চাইলে তিনি বলেনএ বিষয়ে নূরে মুজাসসাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হলে তাঁকে আমি বলতে শুনেছি যে, ‘আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আদম আলাইহিস সাল্লাম-উনাকে সৃষ্টি করেন[18] অতঃপর নিজের ডান হাত তার পিঠে বুলিয়ে দিলেন। তখন তার ঔরসে যত সৎ মানুষ জন্মাবার ছিলতারা সব বেরিয়ে এল। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বললেনএদেরকে আমি জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছি এবং এরা দুনিয়াতে জান্নাতেরই কাজ করবে। অতঃপর তিনি পুনরায় তার পিঠে হাত বুলালেনতখন সেখান থেকে একদল সন্তান বের করে আনলেন এবং বললেনএদেরকে আমি জাহান্নামের জন্যে সৃষ্টি করেছি। এরা দুনিয়াতে জাহান্নামের কাজই করবে। একথা শুনে জনৈক ছাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রশ্ন করলেনহে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার রাসূল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহলে আর আমল করানোর উদ্দেশ্য কিনূরে মুজাসসাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনযখন আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা কাউকে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেনতখন তিনি তাকে দিয়ে জান্নাতের কাজই করিয়ে নেনএমনকি তার মৃত্যুও অনুরূপ কাজের মধ্যে হয়ে থাকে। অতঃপর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। পক্ষান্তরে যখন তিনি কাউকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেনতখন তাকে দিয়ে জাহান্নামের কাজই করিয়ে নেন। এমনকি তার মৃত্যুও অনুরূপ কাজের মধ্যে হয়ে থাকে। অতঃপর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান[19] আবুদ্দারদা (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) হতে বর্ণিত হয়েছে যেনূরে মুজাসসাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনডান মুষ্টির লোকগুলো ছিল সুন্দর চকচকে ক্ষুদ্র পিপীলিকা দলের ন্যায়। আর বাম মুষ্টির ক্ষুদ্র লোকগুলো ছিল কালো কয়লার ন্যায়[20]

উল্লেখ্য যেকুরআনে বলা হয়েছে, ‘বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে’ (রাফ ১৭২)। অন্যদিকে হাদীছে বলা হয়েছে, ‘আদম আলাইহিস সাল্লামের পৃষ্ঠদেশ’ থেকে- মূলতঃ উভয়ের মধ্যে কোন বৈপরিত্য নেই। আদম আলাইহিস সাল্লাম যেহেতু বনি আদমমের মূল এবং আদি পিতাসেহেতু তাঁর পৃষ্ঠদেশ বলা আর বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ বলা একই কথা। তাছাড়া আদম আলাইহিস সাল্লামের দেহের প্রতিটি লোমকূপ থেকে অসংখ্য বনি আদম বের করে এনে উপস্থিত করানো আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার জন্য বিচিত্র কিছুই নয়

মানুষ যেহেতু তার ভাগ্য সম্পর্কে জানে নাসেহেতু তাকে সর্বদা জান্নাত লাভের আশায় উক্ত পথেই কাজ করে যেতে হবে। সাধ্যমত চেষ্টা সত্ত্বেও ব্যর্থ হলে বুঝতে হবে যেওটাই তার তাকদীরের লিখন ছিল। বান্দাকে ভাল ও মন্দ দুটি করারই স্বাধীন এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। আর এই ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগের স্বাধীনতার কারণেই বনি আদম আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার সেরা সৃষ্টির মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। আর একারণেই তাকে তার ভাল ও মন্দ কাজের পরিণতি ভোগ করতে হয়

এখানে আদম আলাইহিস সাল্লামের ঔরস  বলতে  আদম আলাইহিস সাল্লাম  ও  তার  ভবিষ্যৎ সন্তানদের ঔরস বুঝানো হয়েছে। এখানে বংশধর’ বলতে তাদের অশরীরী আত্মাকে বুঝানো হয়নিবরং আত্মা ও দেহের সমন্বয়ে জ্ঞান ও চেতনা সম্পন্ন ক্ষুদ্র অবয়ব সমূহকে বুঝানো হয়েছেযাদের কাছ থেকে সেদিন সজ্ঞানে তাদের প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিল। আর এটা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার জন্য খুবই সহজ। আজকের বিজ্ঞান একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুর ভিতরে গোটা সৌরমন্ডলীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। ফিল্মের মাধ্যমে একটি বিরাটকায় বস্ত্তকে একটি ছোট্ট বিন্দুর আয়তনে দেখানো হচ্ছে। কাজেই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাআলা যদি উক্ত অঙ্গীকার অনুষ্ঠানে সকল আদম সন্তানকে জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দেহে অণু-বিন্দুতে অস্তিত্ব দান করে থাকেনতবে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তাছাড়া জ্ঞানসম্পন্ন না হলে এবং বিষয়টি তাদের অনুধাবনে ও উপলব্ধিতে না আসলে এ ধরনের  প্রতিশ্রুতি গ্রহণের ও অঙ্গীকার ঘোষণার কোন গুরুত্ব থাকে না

প্রশ্ন হতে পারে যেসৃষ্টির সূচনায় গৃহীত এই প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতির কথা পরবর্তীতে মানুষের ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাহলে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি গ্রহণের ফলাফলটা কিএর জবাব এই যেআদি পিতা-মাতা আদম আলাইহিস সাল্লাম-হাওয়া (আলাইহিস সালাম) উনার রক্ত ও মানসিকতার প্রভাব যেমন যুগে-যুগে দেশে-দেশে সকল ভাষা ও বর্ণের মানুষের মধ্যে সমভাবে পরিদৃষ্ট হয়তেমনিভাবে সেদিনে গৃহীত তাওহীদের স্বীকৃতি ও প্রতিশ্রুতির  প্রভাব সকল মানুষের মধ্যেই কমবেশী বিদ্যমান রয়েছে। মানুষের অস্তিত্বই মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার সন্ধান দেয় ও বিপন্ন অবস্থায় তার কাছে আশ্রয় গ্রহণের জন্য  তার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে

তাই তো দেখা গেছেবিশ্ব ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম শাসক ও আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালাদ্রোহী ফেরাঊন ডুবে মরার সময় চীৎকার দিয়ে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার উপরে তার বিশ্বাস ঘোষণা করেছিল’ (ইউনুস ১০/৯০-৯১)। মক্কা-মদীনার কাফের-মুশরিকরা শেষনবীর সাথে শত্রুতা পোষণ করলেও কখনো আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালাকে অস্বীকার করেনি। আধুনিক বিশ্বের নাস্তিক সেরা স্ট্যালিনকে পর্যন্ত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে ওহ মাই গড’ বলে চীৎকার করে উঠতে শোনা গেছে। প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টির সূচনালগ্নে গৃহীত উক্ত স্বীকারোক্তি প্রত্যেকটি মানুষের হৃদয়ে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসের বীজ বপন করে দিয়েছে। চাই তার বিকাশ কোন শিরকী ও ভ্রান্ত পদ্ধতিতে হৌক বা নবীদের দেখানো সঠিক তাওহীদী পদ্ধতিতে হৌক

এ কথাটাই হাদীছে এসেছে এভাবে যেمَامِنْ مَوْلُوْدٍ إلاَّ يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبْوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ اَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ... ‘প্রত্যেক মানবশিশুই ফিৎরাতের উপরে জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী-নাছারা বা মজূসী (অগ্নিউপাসক) বানায়[21] এখানে ফিৎরাত’ অর্থ স্বভাবধর্ম ইসলাম[22] অর্থাৎ  মানব শিশু কোন শিরকী ও কুফরী চেতনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না। বরং আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালাকে চেনা ও তার প্রতি আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের চেতনা ও যোগ্যতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এর ফলে নবীদের প্রদত্ত তাওহীদের শিক্ষাকে সে অত্যন্ত সহজে ও সাগ্রহে বরণ করে নেয়। কেননা শুধু জন্মগত চেতনার কারণেই কেউ মুসলমান হতে পারে না। যতক্ষণ না সে নবীর মাধ্যমে প্রেরিত দ্বীন সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় কবুল করে

ছহীহ মুসলিমের অপর বর্ণনায় এসেছেوَإِنِّىْ خَلَقْتُ عِبَادِيْ حُنَفَاءَ كُلَّهُمْ وَأَنَّهُمْ أَتَتْهُمْ الشَّيَاطِيْنُ فَاجْتَالَتْهُمْ عَنْ دِيْنِهِمْ... ‘আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেনযে আমি আমার বান্দাদের হানীফ’ অর্থাৎ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রতি একনিষ্ঠ’ রূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর  শয়তান তার পিছে লেগে তাকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার পথ থেকে দূরে নিয়ে গেছে[23] আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনفِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِيْ فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لاَ تَبْدِيْلَ لِخَلْقِ اللَّهِ   ‘আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার ফিৎরতযার উপরে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার এই সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই’ (রূম ৩০/৩০)

মোট কথা প্রত্যেক মানবশিশু স্বভাবধর্ম ইসলামের উপরে জন্মগ্রহণ করে এবং নিজ সৃষ্টিকর্তাকে চেনার ও তাকে মেনে চলার অনুভূতি ও যোগ্যতা নিয়ে সৃষ্টি হয়। যদিও  পিতা-মাতা ও পরিবেশের কারণে কিংবা শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পরবর্তীতে অনেকে বিভ্রান্ত হয়। অতএব কাফির-মুমিন-মুশরিক সবার মধ্যে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালাকে চেনার ও তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যের চেতনা ও যোগ্যতা বিদ্যমান রয়েছে। এই সৃষ্টিগত চেতনা ও অনুভূতিকে কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। অর্থাৎ কুশিক্ষাকুসঙ্গ ও শয়তানী সাহিত্য পাঠ করে বা নষ্ট ব্লু ফিল্মের নীল দংশনে উক্ত চেতনাকে পরিবর্তনের চেষ্টা করা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার সৃষ্টির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শামিল। অতএব উক্ত সৃষ্টিগত চেতনাকে সমুন্নত রাখাই ব্যক্তিসমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তব্য

একথা ব্যক্ত করে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনوَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُوْنِ- ‘আমি জিন ও ইনসানকে আমার ইবাদত ব্যতীত অন্য কোন কাজের জন্য সৃষ্টি করিনি’ (যারিয়াত ৫১/৫৬)। অর্থাৎ আমি তার প্রকৃতিতে আমার প্রতি ইবাদত ও দাসত্বের আগ্রহ ও যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছি। এটাকে সঠিক অর্থে কাজে লাগালে আমার অবাধ্যতামূলক কোন কাজ বান্দার দ্বারা সংঘটিত হবে না এবং জগতসংসারেও কোন অশান্তি ঘটবে না। যেমনভাবে কোন মুসলিম শিশু জন্মগ্রহণের সাথে সাথে তার কানে আযান শোনানো হয়[24] অথচ ঐ শিশু আযানের মর্ম বুঝে না বা বড় হয়েও তার সেকথা মনে থাকে না। অথচ ঐ আযানের মাধ্যমে তার হৃদয়ে প্রোথিত হয়ে যায় তাওহীদরিসালাত ও ইবাদতের বীজ। যার প্রভাব সে আজীবন অনুভব করে। সে বে-আমল হলেও ইসলাম’-এর গন্ডী থেকে খারিজ হয়ে যেতে তার অন্তর কখনোই সায় দেয় না। তার অবচেতন মনে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা ও রাসূলের প্রতি আনুগত্য বোধ অক্ষুণ্ণ থাকে। বিশেষ করে হতাশা ও বিপন্ন অবস্থায় সে তার প্রভুর সাহায্য ও সান্নিধ্য লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে

অর্থ না বুঝলেও কুরআন পাঠ ও আযানের ধ্বনি মানুষের মনকে যেভাবে আকৃষ্ট করে এবং হৃদয়ে যে স্থায়ী প্রভাব ফেলে তার কোন তুলনা নেই। একারণেই কাফির আরব নেতারা মানুষকে কুরআন শুনতে দিত না। অথচ নিজেরা রাতের অন্ধকারে তা গোপনে আড়ি পেতে শুনত এবং একে জাদু বলত। শ্রেষ্ঠ আরব কবিগণ কুরআনের অলৌকিকত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করেন এমনকি অন্যতম শ্রেষ্ঠ আরবী কবি লাবীদ বিন রাবীআহ কুরআন শোনার পর কাব্যচর্চা পরিত্যাগ করেন। গত শতাব্দীর শুরুতে তুরষ্কে ওছমানীয় খেলাফত উৎখাত করে কামাল পাশা ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করেন এবং মসজিদ সমূহে আরবী আযান বন্ধ করে তুর্কী ভাষায় আযান দেওয়ার নির্দেশ জারি করেন। কিন্তু তাতে আরবী আযানের প্রতি মানুষের হৃদয়াবেগ আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে গণবিদ্রোহ দেখা দিলে তিনি উক্ত আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হন

আধুনিক বিজ্ঞানও প্রমাণ করে দিয়েছে যেশব্দ মানব মনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তাই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা প্রেরিত আযানের ধ্বনি সদ্যপ্রসূত শিশুর কচি মনে আজীবনের জন্য সুদূরপ্রসারী স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করবে- এটাই স্বাভাবিক। অতএব সৃষ্টির সূচনাকালের গৃহীত আহ্দে আলাস্ত্ত’ বা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রতি ইবাদত ও আনুগত্যের  প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি  মানব মনে জীবনব্যাপী স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে থাকে। যার কথা বারবার বান্দাকে স্মরণ করিয়ে দিতে হয় এবং যার বিরোধিতা করা আত্মপ্রবঞ্চনা করার শামিল

আহ্দে আলাস্ত্ত-র উদ্দেশ্য :

আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

أَنْ تَقُولُوْا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ، أَوْ تَقُولُوْا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةً مِّن بَعْدِهِمْ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ، وَكَذَلِكَ نُفَصِّلُ الآيَاتِ وَلَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ- (الأعراف ১৭২ -১৭৪)-

‘(আমি পৃথিবীতে আবাদ করার আগেভাগে তোমাদের অঙ্গীকার এজন্যেই নিয়েছি) যাতে তোমরা ক্বিয়ামতের দিন একথা বলতে না পার যে, (তাওহীদ ও ইবাদতের) এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। অথবা একথা বলতে না পার যেশিরকের  প্রথা তো আমাদের পূর্বে আমাদের বাপ-দাদারা চালু করেছিল। আমরা  হলাম তাদের পরবর্তী বংশধর। তাহলে সেই বাতিলপন্থীরা যে কাজ করেছেতার জন্য কি আপনি আমাদের ধ্বংস করবেন’? আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, ‘বস্ত্ততঃ এভাবে আমরা (আদিকালে ঘটিত) বিষয়সমূহ সবিস্তারে বর্ণনা করলামযাতে তারা (অর্থাৎ অবিশ্বাসীরা আমার পথে) ফিরে আসে’ (রাফ ১৭২-১৭৪)

উপরোক্ত বর্ণনার আলোকে বুঝা যায় যেউক্ত প্রতিজ্ঞা ছিল দুধরনের। এক- আদিকালে ঘটিত প্রতিজ্ঞা (الميثاق الأزلى ) এবং দুই- অহীর বিধানের আনুগত্য করার জাগতিক প্রতিজ্ঞা (والميثاق الإنزالي الحالي ) যা প্রত্যেক নবীর আমলে তার উম্মতগণের উপরে ছিল অপরিহার্য

অন্যান্য অঙ্গীকার গ্রহণঃ

(১) নবী-রাসূলদের প্রতিশ্রুতিঃ আহ্দে আলাস্ত্তর মাধ্যমে সাধারণভাবে সকল আদম  সন্তানের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণের পর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের কাছ থেকে বিশেষভাবে প্রতিশ্রুতি নেনতারা যেন আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার পক্ষ থেকে প্রাপ্তব্য রেসালাতের বাণীসমূহ স্ব  স্ব উম্মতের নিকটে যথাযথভাবে পৌঁছে দেন এবং এতে কারো ভয়-ভীতি ও অপবাদ-ভৎর্সনার পরোয়া না করেন

(২) উম্মতগণের প্রতিশ্রুতিঃ অনুরূপভাবে বিভিন্ন নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের উম্মতগণের কাছ থেকেও প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়তারা যেন নিজ নিজ নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের আনুগত্য করে ও কোন অবস্থায় জেনো তাদের নাফরমানী না করে

যেমন ছাহাবী উবাই ইবনি কাব (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) সূরা আরাফ উনার ১৭২ আয়াত শরীফের (অনুবাদঃ যখন তোমার মালিক বনি আদমের পিঠ সমূহ থেকে তাদের সন্তানদের বের করে আনলেন’) ব্যাখ্যায় বলেনঅতঃপর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের একত্রিত করলেন এবং নারী-পুরুষে বিভক্ত করলেন। অতঃপর তাদেরকে ভবিষ্যতের আকৃতি দান করলেন ও কথা বলার ক্ষমতা দিলেন। তখন তারা কথা বলল। অতঃপর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের কাছ থেকে প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন এবং তাদেরকে নিজেদের উপরে সাক্ষী করে জিজ্ঞেস করলেনআমি কি তোমাদের প্রতিপালক নইতারা বললহ্যাঁ। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বললেনআমি তোমাদের একথার উপর সাত আসমান ও সাত যমীনকে সাক্ষী করছি এবং তোমাদের উপর তোমাদের পিতা আদম আলাইহিস সাল্লামকে সাক্ষী রাখছিযাতে তোমরা ক্বিয়ামতের দিন একথা বলতে না পার যেএ প্রতিশ্রুতির কথা আমরা জানতাম না

তোমরা জেনে রাখ যেআমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই ও আমি ব্যতীত কোন  প্রতিপালক নেই। আর তোমরা আমার সাথে কাউকে শরীক করো না। সত্বর আমি তোমাদের নিকট আমার রাসূল আলাইহিমুস সালাম গণকে পাঠাবো। তাঁরা তোমাদেরকে আমার সাথে কৃত এই প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। আর আমি তোমাদের প্রতি আমার  কিতাব সমূহ নাযিল করব। তখন তারা বললআমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যেনিশ্চয়ই আপনি আমাদের প্রভু এবং উপাস্য। আপনি ব্যতীত আমাদের কোন প্রতিপালক নেই এবং আপনি ব্যতীত আমাদের কোন উপাস্য নেই। এভাবে তারা স্বীকৃতি দিল। অতঃপর আদম আলাইহিস সাল্লামকে তাদের উপর উঠিয়ে ধরা হলো। তিনি তাদের দিকে দেখতে লাগলেন। তিনি দেখলেন তাদের মধ্যকার ধনী-গরীবসুন্দর-অসুন্দর সবাইকে। তখন তিনি বললেনহে প্রভু! আপনি কেন আপনার বান্দাদের সমান করলেন নাআল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বললেনআমি চাই যেএর ফলে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হউক

তিনি তাদের মধ্যে নবীগণকে দেখলেন প্রদীপ সদৃশ। তাঁদের নিকট থেকে পৃথকভাবে রিসালাত ও নবুঅতের দায়িত্ব পালনের বিশেষ অঙ্গীকার নেওয়া হয়। যে সম্পর্কে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, ‘যখন আমরা নবীগণের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম এবং আপনার নিকট থেকেও এবং নূহইবরাহীমমূসা ও মারিয়াম-পুত্র ঈসার নিকট থেকে’ (আহযাব ৩৩/৭)। ঐ রূহগুলির মধ্যে ঈসার রূহ ছিলযা মারিয়ামের কাছে পাঠানো হয়। উবাই থেকে বর্ণিত হয়েছে যেউক্ত রূহ মারিয়ামের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে[25]

(৪) শেষনবীর জন্য প্রতিশ্রুতিঃ এরপর সকল নবীর কাছ থেকে বিশেষ প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছে সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ট শেষনবী নূরে মুজাসসাম রাসুলুল্লাহ হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-উনার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদাকে মেনে নেওয়ার জন্যতাঁর অনুসরণের জন্য এবং তাঁর যুগ পেলে তাঁকে সাহায্য করার জন্য। যেমন- আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ-وَإِذْ أَخَذَ اللّهُ مِيْثَاقَ النَّبِيِّيْنَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّنْ كِتَابٍ وَّحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِيْ قَالُوْا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوْا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِيْنَ- (آل عمران ৮১)-

আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা যখন নবীগ আলাইহিমুস সালাম গণের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলেন যেআমি যা কিছু তোমাদেরকে দান করেছি কিতাব ও হিকমতঅতঃপর তোমাদের নিকটে (যখন) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (শেষনবীর) আসেন তোমাদের নিকট যা আছে (তাওরাত-ইঞ্জীল) তার সত্যয়নকারী হিসাবেতখন সেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার (শেষনবীর) প্রতি তোমরা ঈমান আনবে ও তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেনতোমরা কি অঙ্গীকার করছএবং উপরোক্ত শর্তে তোমরা আমার ওয়াদা কবুল করে নিচ্ছতারা (নবী আলাইহিমুস সালামগণ) বললেনআমরা অঙ্গীকার করছি। তিনি (আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা) বললেনতাহলে তোমরা সাক্ষী থাক। আর আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম’ (আলে ইমরান ৩/৮১)

অন্যত্র আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনوَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُم مُّصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّراً بِرَسُولٍ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ...، স্মরণ করযখন মারিয়াম-তনয় ঈসা বললহে ইস্রাঈল সন্তানগণ! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রেরিত রাসূল আলাইহিস সালাম এবং আমার পূর্ববর্তী তাওরাত কিতাবের সত্যয়নকারী। আর আমি একজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার সুসংবাদ দানকারীযিনি আমার পরে আসবেনযার নাম হবে আহমাদ’... (ছফ ৬১/৬)

উপরোক্ত আয়াত দ্বয়ে বুঝা যায় যেবিগত সকল নবী আলাইহিমুস সালাম যেমন তাঁর পূর্ববর্তী নবীর সত্যয়নকারী ছিলেনতেমনি সকল নবী স্ব স্ব উম্মতের নিকটে শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আগমনবার্তা শুনিয়ে গেছেন ও তাঁর প্রতি ঈমানআনুগত্য ও তাঁকে সার্বিকভাবে সাহায্য করার জন্য অছিয়ত করে গেছেন। এদিক দিয়ে শেষনবী যে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন এবং উনার আনীত শরীআতের মধ্যে বিগত সকল শরীআত যে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছেতা পরিষ্কার হয়ে যায়

(৫) ইহুদী পন্ডিতদের প্রতিশ্রুতিঃ উপরোক্ত ওয়াদা ছাড়াও ইহুদী-নাছারা পন্ডিতদের কাছ থেকে বিশেষ প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়যাতে তারা সত্য গোপন না করে। যেমন আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ- وَإِذْ أَخَذَ اللّهُ مِيْثَاقَ الَّذِيْنَ أُوتُوْا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلاَ تَكْتُمُونَهُ فَنَبَذُوْهُ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَناً قَلِيْلاً فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُوْنَ- (آل عمران ১৮৭)-

আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা যখন আহলে কিতাবদের (পন্ডিতদের) নিকট থেকে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করলেন যেতারা তা লোকদের নিকটে বর্ণনা করবে ও তা গোপন করবে না। তখন তারা সে প্রতিজ্ঞাকে পিছনে রেখে দিলআর তা বেচা-কেনা করল সামান্য পয়সার বিনিময়ে। কতই না মন্দ তাদের এ বেচা-কেনা’ (আলে ইমরান ৩/১৮৭)

(৬) সাধারণ বনি ইস্রাঈলগণের প্রতিশ্রুতিঃ অতঃপর বনি ইস্রাঈলের সাধারণ লোকদের কাছ থেকেও প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়। যেমন আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ- وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ لاَ تَعْبُدُونَ إِلاَّ اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِيْنِ وَقُولُوْا لِلنَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيْمُوا الصَّلاَةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلاَّ قَلِيلاً مِنْكُمْ وَأَنْتُمْ مُعْرِضُوْنَ-  (البقرة ৮৩)-

যখন আমরা বনি ইস্রাঈলগণের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিলাম এই মর্মে যেতোমরা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তিনি ব্যতীত অন্য কারু ইবাদত করবে না। আর তোমরা পিতা-মাতাআত্মীয়-স্বজন ও ইয়াতীম-মিসকীনদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সুন্দর কথা বলবেছালাত কায়েম করবে ও যাকাত আদায় করবে। কিন্তু কিছু লোক ব্যতীত তোমরা সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলে এবং তোমরা তা অগ্রাহ্য করলে’ (বাক্বারাহ ২/৮৩)

বলা বাহুল্য যেঅধিকাংশ নবী বনি ইস্রাঈল থেকেই হয়েছেন। কিন্তু বনি ইস্রাঈলরাই অধিকাংশ নবীকে হত্যা করেছেতাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেতাদের ঐশী কিতাবসমূহকে পরিবর্তন ও বিকৃত করেছেতাদের নবীদের চরিত্র হনন করেছেতাদের নামে কলংক লেপন করেছে এবং অবশেষে শেষনবী নূরে মুজাসসাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-উনাকে চিনতে পেরেও (বাক্বারাহ ২/১৪৬আনআম ৬/২০) না চেনার ভান করেছে ও তাঁর সঙ্গে চূড়ান্ত গাদ্দারী করেছে। অবশ্য তাদের মধ্যে অনেকে (قِسِّيْسِيْنَ وَرُهْبَانًا) ঈমান এনে ধন্য হয়েছিলেন এবং আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার নিকটে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছিলেন[26] যেমন খ্যাতনামা ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে সালামআদী ইবনে হাতেম (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। এতদ্ব্যতীত হাবশার খৃষ্টান বাদশাহ নাজ্জাশী নিজে তো শেষনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার উপরে বিশ্বাসী ছিলেন। অধিকন্তু তিনি আবিসিনিয়ার ৬২ জন ও সিরিয়ার ৮ জন মোট ৭০ জনের একটি শীর্ষস্থানীয় খৃষ্টান ধর্মীয় প্রতিনিধিদলকে মদীনায় প্রেরণ করেন। তাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার মুখে সূরা ইয়াসীন শুনে অবিরল ধারায় অশ্রু বিসর্জন দেন। অতঃপর সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের প্রত্যাবর্তনের পর নাজ্জাশী নিজের ইসলাম কবুলের কথা ঘোষণা করেন এবং একখানা পত্র লিখে স্বীয় পুত্রের নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধিদল মদীনায় প্রেরণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে জাহায ডুবির কারণে তারা সবাই পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেন[27]

আদম আলাইহিস সাল্লামের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বঃ আশরাফুল মাখলূক্বাত’ বা সেরা সৃষ্টি হিসাবে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আদম আলাইহিস সাল্লাম ও বনি আদমকে সৃষ্টি করেন। এ বিষয়ে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ- وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِيْ آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيْلاً- (الإسراء ৭০)-

আমরা বনি আদমকে উচ্চ সম্মানিত করেছিতাদেরকে স্থল ও জলপথে বহন করে নিয়েছিতাদেরকে পবিত্র বস্ত্ত সমূহ হতে খাদ্য দান করেছি এবং আমাদের বহু সৃষ্টির উপরে তাদেরকে উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছি’ (ইসরা ১৭/৭০)

এখানে প্রথমে كَرَّمْنَا শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষকে এমন কিছু বিষয়ে একচ্ছত্র সম্মান দানের কথা বলা হয়েছেযা অন্য কোন সৃষ্টিকে দেওয়া হয়নি। যেমন জ্ঞান-বিবেকচিন্তাশক্তিভাল-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যবোধস্বাধীন ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা ইত্যাদি। অতঃপর فَضَّلْنَا শব্দ  ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যের  তুলনায় মানুষকে উচ্চ মর্যাদা দানের কথা বলা হয়েছে। যেমন মানুষের উন্নত হতে উন্নততর জীবন যাপন প্রণালীগৃহ নির্মাণ পদ্ধতিখাদ্য গ্রহণপোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদিতে উন্নততর রুচিশীলতাআইনানুগ ও সমাজবদ্ধ জীবনযাপন প্রভৃতি বিষয়গুলি অন্যান্য  প্রাণী  হতে  বৈশিষ্ট্য  মন্ডিত  এবং  নানা বৈচিত্র্যে ভরপুর। তাতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনপরিবর্ধনবিবর্তন ও উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। অথচ বাবুই পাখির নীড় রচনা কিংবা বনে-জঙ্গলে বাঘ-শৃগালের বসবাস পদ্ধতি লক্ষ বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। না তাতে অতীতে কোন পরিবর্তন এসেছেনা ভবিষ্যতে কোন পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে

মানুষ জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে উন্নত হতে উন্নততর পরিবহনে চলাফেরা ও ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। তারা পৃথিবীর সর্বোত্তম খাদ্যসমূহ গ্রহণ করছেউন্নত  পাক-প্রণালীর মাধ্যমে সুস্বাদু খাবার গ্রহণ ও সর্বোত্তম  পানীয় পান করছেযা অন্য প্রাণীর পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়

মানব মর্যাদার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিষয় হচ্ছে তাকে কথা বলার শক্তি দান করাযা অন্য কোন সৃষ্টিকে দেওয়া হয়নি। তাকে দেওয়া হয়েছে ভাষা ও রঙের বৈচিত্র্যদেওয়া হয়েছে লিখনক্ষমতা এবং উন্নত সাহিত্য জ্ঞান ও অলংকার সমৃদ্ধ বাক্য গঠন ও কাব্য রচনার যোগ্যতাযা অন্য কোন সৃষ্টিকে দেওয়া হয়নি

মানব মর্যাদার অন্যতম বিষয় হলোবিশ্বের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল সৃষ্টিকে মানুষের অনুগত করে দেওয়া হয়েছে (লোকমান ৩১/২০)। যেন আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার যাবতীয় সৃষ্টিকর্মের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষ। মানুষের জন্যই যেন সবকিছু। সূর্যের কিরণচন্দ্রের জ্যোতিগ্রহ-নক্ষত্রের মিটিমিটি আলোবাতাসের মৃদুমন্দ প্রবাহপানির জীবনদায়িনী ক্ষমতামাটির উর্বরা শক্তিআগুনের দাহিকা শক্তিবিদ্যুতের বহু মাত্রিক কল্যাণকারিতামাঠভরা সবুজ শস্যভান্ডারগাছ ভরা ফল-ফলাদিবাগিচায় রং-বেরংয়ের ফুলের বাহারপুকুর-নদী-সাগর ভরা নানা জাতের মাছ ও মণি-মুক্তার সমাহারভূগর্ভে সঞ্চিত স্বর্ণ-রৌপ্য ও খনিজ সম্পদরাজি ও তৈল-গ্যাসের আকরগোয়াল ও জঙ্গলভরা পশু-পক্ষীর আবাস কাদের জন্যএক কথায় জবাবঃ এসবই কেবল মানুষের জন্য। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনهُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الأَرْضِ جَمِيعاً  ‘তিনিই সেই সত্তাযিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন’ (বাক্বারাহ ২/২৯)

প্রশ্ন হলোঃ সবই যখন মানুষের জন্যতাহলে মানুষ কার জন্যতারও জবাব একটাইঃ আমরা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার জন্যএবং আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব’ (বাক্বারাহ ২/১৫৬)। আমরা এসেছি তাঁর ইবাদতের জন্যসর্বক্ষেত্রে তাঁর দাসত্বের জন্য (যারিয়াত ৫১/৫৬) এবং দুনিয়ায় তাঁর খেলাফত পরিচালনার জন্য’ (বাক্বারাহ ২/৩০)।। বিশ্বলোকে যা কিছু আছে সবই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার ইবাদতে রত। সবই একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (লোকমান ৩১/২৯) নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে পরিচালিত (ফাতির ৩৫/৪৩)। সবই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার অনুগত ও তাঁর প্রতি সিজদায় অবনত এবং কেবল তাঁরই গুণগানে রত। জগত সংসার পরিচালনার এই সুনির্দিষ্ট নিয়মটাই হলো দ্বীন’ এবং এই দ্বীনের প্রতি নিখাদ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণকেই বলা হয় ইসলাম। এজন্যেই বলা হয়েছে إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُ ‘আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার নিকটে দ্বীন’ হলো কেবল ইসলাম’ (আলে ইমরান ৩/১৯)

ইসলামের দুটি দিক রয়েছেপ্রাকৃতিক ও মানবিক। প্রথমটি সমস্ত বিশ্ব প্রকৃতিতে পরিব্যপ্ত। যেখানে সবকিছু সরাসরি আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক প্রাকৃতিক নিয়মে পরিচালিত। যে নিয়মের কোন ব্যত্যয় নেই কোন ব্যতিক্রম নেই (আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার বিশেষ হুকুম ব্যতীত) (ইউসুফ ১২/৪০আহযাব ৩৩/৬২ইসরা ১৭/৭৭)

দ্বিতীয়টি অর্থাৎ মানবিক জীবন পরিচালনার ব্যবহারিক নীতি-নিয়ম যা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসূলদের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। একেই বলে ইসলামী শরীআত। যা আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার মাধ্যমে শুরু হয়ে শেষনবী নূরে মুজাসসাম হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাধ্যমে শেষ হয়েছে ও পূর্ণতা লাভ করেছে (মায়েদাহ ৫/৩)। উল্লেখ্য যেআভিধানিক অর্থে বিগত সকল নবীর দ্বীনকে ইসলাম বলা গেলেও পারিভাষিকভাবে শেষনবীর নিকটে প্রেরিত সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ দ্বীনকেই কেবল ইসলাম’ বলা হয়ে থাকে। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ- فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّيْنِ حَنِيفًا فِطْرَةَ اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لاَ تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لاَ يَعْلَمُونَ- (الروم ৩০)-

তুমি একনিষ্ঠ ভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহর প্রকৃতিযার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না (রূম ৩০/৩০)

উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার অপরিবর্তনীয় দ্বীনের প্রতি মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে বলেছেনসেটি হলো সেই দ্বীনযা বিশ্বলোকে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। মানুষের দেহসত্তায় ও জীবন প্রবাহে উক্ত দ্বীন প্রতিবিম্বিত। উক্ত দ্বীনের প্রতি আনুগত্যের কারণেই পিতার সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম শুক্রাণু থেকে মাতৃগর্ভে ভ্রুণ সৃষ্টি হয়। অতঃপর নির্ধারিত সময়ে তা সুন্দর ফুটফুটে মানবশিশু রূপে দুনিয়াতে ভূমিষ্ট হয়। অতঃপর শৈশবকৈশোরযৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে সে বার্ধক্যে উপনীত হয় ও এক সময় তার মৃত্যু হয়। দেহের এই জন্ম-মৃত্যুর নিয়মের কোন পরিবর্তন নেই। এক্ষেত্রে মানুষ সহ সকল সৃষ্টজীব ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার অলংঘনীয় বিধানের প্রতি আনুগত্যশীল ও আত্মসমর্পিত মুসলিম’ (আলে ইমরান ৩/৮৩রাদ ১৩/১৫)। এটা হলো ইসলাম’-এর প্রাকৃতিক দিকযা মানতে প্রত্যেক মানুষ বাধ্য। মানুষের দেহ তাই প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন। কিন্তু জ্ঞানের দিক দিয়ে সে স্বাধীন। সে তার জ্ঞানকে স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারে

মানুষের বাহ্যিক আকৃতির শ্রেষ্ঠত্বের সাথে তার আধ্যাত্মিক দিকের সংযোগ এক অসাধারণ ব্যাপার। অথচ বিশ্বলোকের অন্যান্য সৃষ্টির বাইরের দিক ও ভিতরের দিকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। চন্দ্র-সূর্যের সবটাই আলোপশুর সবটাই পশুত্বে ভরা। কিন্তু মানুষের বাইরের দিকের সাথে ভিতরের দিকের কোন মিল নেই। বরং তা আরও জটিল ও দুর্বোধ্য। মানুষের দৈহিক অবয়বের মধ্যে ওটা একটা আলাদা জগত। যা দেখা যায় নাকেবল উপলব্ধি করা যায়। মানুষ যেমন ষড় রিপু সমৃদ্ধ একটি জৈবিক সত্তাতেমনি সে একটি বিবেকবান নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সত্তা। মানুষের দেহ জগতের চিকিৎসা ও আরাম-আয়েশের উপকরণ তাই কমবেশী সর্বত্র প্রায় সমান হলেও তার মনোজগতের চিকিৎসা ও সুখ-দুঃখের অনুভূতি সবার জন্য সমান নয়। মনোজগতে শয়তানের তাবেদার হয়ে সে অনেক সময় তার বাহ্যিক দেহ জগতকে ধ্বংস করে দেয়। মূলতঃ মনোজগতে লালিত ধারণা ও বিশ্বাসই মানুষের কর্মজগতে প্রতিফলিত হয়। তাই দয়াময় আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রিয় সৃষ্টি মানুষের সার্বিক জীবন সঠিক পথে পরিচালনার জন্য যুগে যুগে নবী আলাইহিমুস সালাম গণের মাধ্যমে এলাহী হেদায়াত সমূহ পাঠিয়েছেন। প্রাকৃতিক দ্বীন-এর মত এই দ্বীনও অপরিবর্তনীয় ও চিরকল্যাণময়। আর সেটাই হলো ইসলামের বাহ্যিক মানবিক দিক। উক্ত মানবিক দিক পরিচালনার উদ্দেশ্যে যে দ্বীন নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের মাধ্যমে প্রেরিত হয়েছেতা গ্রহণ ও পালনের স্বাধীন এখতিয়ার মানুষকে দেওয়া হয়েছে (কাহফ ১৮/২৯দাহর ৭৬/৪)

এ দ্বীন বা শরীআতের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণে মানুষ দুনিয়ায় শান্তি পাবে ও আখেরাতে জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আর তা অমান্য করলে দুনিয়ায় অশান্তি ভোগ করবে ও পরকালে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধীভূত হবে (বাক্বারাহ ২/৩৮-৩৯তাগাবুন ৬৪/ ৯-১০)

বলা বাহুল্যএ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিই মানুষের সৃষ্টির সেরা’ হওয়ার মূল কারণ। এতেই তার পরীক্ষা এবং এতেই তার জান্নাত বা জাহান্নাম। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় দিক হলো এ পৃথিবীতে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা। কেননা তাকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার খলীফা’ হিসেবেই দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে[28] এ দুনিয়াকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার ইচ্ছা অনুযায়ী সুন্দরভাবে আবাদ করা এবং অহীর বিধান অনুযায়ী সার্বিক জীবন পরিচালনার মাধ্যমে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করাই তার প্রধান কাজ। খেলাফতের এ দায়িত্ব সে ব্যক্তি জীবনে যেমন পালন করবেসামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও তেমনি পালন করবে। সর্বত্র সে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার বিধানের প্রতি আনুগত্যশীল বান্দা হিসাবে নিজেকে  প্রমাণ করবে। এই গুরু দায়িত্ব আসমান-যমীনপাহাড়-পর্বত কেউ গ্রহণ করতে সাহসী হয়নি। মানুষ স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল (আহযাব ৩৩/৮২)। কিন্তু দুনিয়ায় এসে এর চাকচিক্য দেখে মানুষ মোহগ্রস্ত হয়ে গেছে ও আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার খেলাফতের দায়িত্ব পালনের কথা ভুলে গেছে কেউবা তাতে অলসতা দেখাচ্ছেকেউবা অস্বীকার করছে। তবুও ক্বিয়ামত-প্রাক্কাল অবধি একদল লোক চিরদিন থাকবেযারা এ দায়িত্ব পালন করে যাবে[29] আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনوَمِمَّنْ خَلَقْنَا أُمَّةٌ يَهْدُونَ بِالْحَقِّ وَبِهِ يَعْدِلُونَ-  ‘আমরা যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের মধ্যে একটি দল রয়েছেযারা সত্য পথ দেখায় ও সেমতে ন্যায়বিচার করে’ (রাফ ৭/১৮১)। অতঃপর তিনি বলেনسَنَفْرُغُ لَكُمْ أَيُّهَا الثَّقَلاَنِ ‘হে জিন ও ইনসান! অতিসত্বর আমরা তোমাদের ব্যাপারে মনোনিবেশ করব’ (রহমান ৫৫/৩১)। অর্থাৎ একটি বিশেষ মুহূর্তে দুনিয়াতে তোমাদের পরীক্ষা গ্রহণের এই ধারা সহসাই বন্ধ হয়ে যাবে এবং তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে। সেদিন আমার সুক্ষ্ম বিচারের হাত থেকে তোমরা কেউই রেহাই পাবে না

জিনদের আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আগেই সৃষ্টি করেন আগুন থেকে। তারাও ছিল স্বাধীন এখতিয়ার সম্পন্ন। কিন্তু তারা অবাধ্যতা করেছিল। অনেকে জিনকে চর্ম চক্ষুতে দেখতে পায় না বলে তাদেরকে অস্বীকার করে। অথচ বহু জিনিষ রয়েছে যা মানুষ বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখতে পায় না। তাই বলে তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যায় না। যেমন বিদ্যুৎবায়ু প্রবাহবস্ত্তর স্বাদ ও গন্ধ ইত্যাদি। মানুষের নবীই জিনদের নবী। তাদের মধ্যে মুমিনকাফিরফাসিক সবই রয়েছে। জিনেরা যে এলাকায় বাস করে সে এলাকার মানুষের ভাষা তারা বুঝে। নবুঅতের দশম বছরে ত্বায়েফ থেকে ফেরার পথে নাখলা’ উপত্যকায় জিনেরা রাসূলের কণ্ঠে সূরা রহমান শুনেছিল ও যতবারই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা فَبِأَىِّ آلاَءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ বলেছেনততবারই তারা জবাবে বলেছিললা বেশাইয়িন মিন নিআমিকা রববানা নুকাযযিবু ফালাকাল হাম্দ[30] তারা মানুষের কথা শোনেবুঝে ও উপলব্ধি করে। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার কিতাব জিন ও ইনসান সবার জন্য। অতএব তাদের পরিণতি ও মানুষের পরিণতি একই

বস্ত্ততঃ আদম আলাইহিস সাল্লাম ও বনি আদম হলো আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার সর্বাধিক প্রিয় ও সেরা সৃষ্টি। মৃত্যুকাল অবধি তাকে এ দুনিয়ার পরীক্ষাগারে অবস্থান করতে হবে একজন সজাগ ও সক্রিয় পরীক্ষার্থী হিসাবে। মৃত্যুর পরেই তার ক্বিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। ভাল-মন্দ কর্মের সুযোগ আর থাকবে না। তাই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রেরিত অহীর বিধান মেনে চলে কল্যাণময় জীবন পরিচালনার মাধ্যমে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার সেরা সৃষ্টির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়াই বুদ্ধিমান মানুষের কর্তব্য

মনে রাখতে হবে যে, ‘আমরা সবাই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার জন্য এবং আমরা সবাই তাঁর দিকেই ফিরে যাব’ (বাক্বারাহ ২/১৫৬)। আমাদের  ছালাত,  আমাদের কুরবানী আমাদের জীবনআমাদের মরণ সবকিছুই কেবলমাত্র বিশ্বপ্রভু আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার জন্য’ (আনআম ৬/১৬৩)। জান্নাত থেকে নিক্ষিপ্ত বনি আদম আমরা যেন পুনরায় জান্নাতে ফিরে যেতে পারিকরুণাময় আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সেই তাওফীক দান করুন- আমীন!!

দুনিয়াবী ব্যবস্থাপনায় আদম আলাইহিস সাল্লামঃ হাফেয শামসুদ্দীন যাহাবী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার الطب النبوى কিতাবে বলেনমানুষের দুনিয়াবী জীবনে প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার শিল্পকর্ম অহীর মাধ্যমে কোন না কোন নবী আলাইহিস সালাম উনার হাতে শুরু হয়েছে। অতঃপর যুগে যুগে তার উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। সর্বপ্রথম আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার উপরে যে সব অহী নাযিল করা হয়েছিলতার অধিকাংশ ছিল ভূমি আবাদ করাকৃষিকার্য ও শিল্প সংক্রান্ত। যাতায়াত ও পরিবহনের জন্য চাকা চালিত গাড়ী সর্বপ্রথম আদম আলাইহিস সাল্লাম আবিষ্কার করেন। কালের বিবর্তনে নানাবিধ মডেলের গাড়ী এখন চালু হয়েছে। কিন্তু সব গাড়ীর ভিত্তি হলো চাকার উপরে। বলা চলে যেসভ্যতা এগিয়ে চলেছে চাকার উপরে ভিত্তি করে। অতএব যিনি প্রথম এটা চালু করেনতিনিই বড় আবিষ্কারক। আর তিনি ছিলেন আমাদের আদি পিতা প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হযরত আদম আলাইহিস সাল্লাম। যা তিনি অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছিলেন[31]  আদম আলাইহিস সাল্লামের যুগে পৃথিবীর প্রথম কৃষিপণ্য ছিল তীন’ ফল। ফিলিস্তীন ভূখন্ড থেকে সম্প্রতি প্রাপ্ত সে যুগের একটি আস্ত তীন ফলের শুষ্ক ফসিল পরীক্ষা করে একথা প্রমাণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তীন’ ফলের শপথ করেছেন। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের আদি পিতার উপরে শান্তি বর্ষণ  করুন- আমীন!

আদম আলাইহিস সাল্লাম পুত্রদ্বয়ের কাহিনীঃ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ.  ‘আপনি ওদেরকে (আহলে কিতাবদেরকে) আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার পুত্রদ্বয়ের যথার্থ কাহিনী শুনিয়ে দিন। যখন তারা উভয়ে কুরবানী পেশ করল। অতঃপর তাদের একজনের কুরবানী কবুল হলো। কিন্তু অপরজনের কুরবানী কবুল হলো না। তখন একজন বললআমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। জবাবে অপরজন বললআল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা কেবলমাত্র আল্লাহভীরুদের থেকেই কবুল করেন’ (মায়েদাহ ২৭)। যদি তুমি আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াওআমি তোমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াবো না। আমি বিশ্বপ্রভু  আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনাকে ভয় করি’ (২৮)। আমি মনে করি এর ফলে তুমি আমাকে হত্যার পাপ ও তোমার অন্যান্য পাপসমূহের বোঝা নিয়ে জাহান্নামবাসী হবে। আর সেটাই হলো অত্যাচারীদের কর্মফল’ (২৯)। অতঃপর তার মন তাকে ভ্রাতৃহত্যায় প্ররোচিত করল এবং সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো’ (৩০)। অতঃপর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা একটি কাক পাঠালেন। যে মাটি খনন করতে লাগল এটা দেখানোর জন্য  যে  কিভাবে  সে  তার  ভাইয়ের  মৃতদেহ দাফন করবে। সে বললহায়! আমি কি এই কাকটির মতোও হতে পারলাম নাযাতে আমি আমার ভাইয়ের মৃতদেহ দাফন করতে পারি। অতঃপর সে অনুতপ্ত হলো’ (মায়েদাহ ৫/২৭-৩১)

কুরআনের উক্ত বর্ণনা ছাড়াও জাইয়িদ’ (উত্তম) সনদ সহ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ও আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে মওকূফ’ সূত্রে যা যা বর্ণিত হয়েছে এবং হাফেয ইবনে কাছীর যাকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী একাধিক বিদ্বানগণের মশহূর’ বক্তব্য বলে স্বীয় তাফসীরে ও তারীখে উল্লেখ করেছেনসে অনুযায়ী আদম আলাইহিস সাল্লাম পুত্রদ্বয়ের নাম ছিল ক্বাবীল ও হাবীল (قابيل وهابيل ) এবং ক্বাবীল ছিল আদম আলাইহিস সাল্লামের প্রথম সন্তান ও সবার বড় এবং হাবীল ছিল তার ছোট

হত্যাকান্ডের কারণঃ এ বিষয়ে কুরআন যা বলেছে তা এই যেদুভাই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার নামে কুরবানী করেছিল। কিন্তু আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা একজনের কুরবানী কবুল করেনঅন্যজনেরটা করেননি। তাতে ক্ষেপে গিয়ে একজন অন্যজনকে হত্যা করেযার কুরবানী কবুল হয়েছিল

উল্লেখ্য যেসে যুগে কুরবানী কবুল হওয়ার নিদর্শন ছিল এই যেআসমান থেকে একটি আগুন এসে কুরবানী নিয়ে অন্তর্হিত হয়ে যেত। যে কুরবানীকে উক্ত অগ্নি গ্রহণ করত নাসে কুরবানীকে প্রত্যাখ্যাত মনে করা হ। ক্বাবীল কৃষিকাজ করত। সে কার্পণ্য বশে কিছু নিকৃষ্ট প্রকারের শস্যগম ইত্যাদি কুরবানীর জন্য পেশ করল। হাবীল পশু পালন করত। সে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার মহববতে তার উৎকৃষ্ট দুম্বাটি কুরবানী করল। অতঃপর আসমান থেকে আগুন এসে হাবীলের কুরবানীটি নিয়ে গেল। কিন্তু কাবীলের কুরবানী যেমন ছিলতেমনি পড়ে রইল। এতে ক্বাবীল ক্ষুব্ধ হলো এবং হাবীলকে বললلَأقْتُلَنَّكَ ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। হাবীল তখন তাকে উপদেশ দিয়ে মার্জিত ভাষায় বললإِنَّمَا يَتَقَبَّلُ الله ُمِنَ الْمُتَّقِينَ، لَئِن بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لَأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তাক্বওয়াশীল বান্দাদের থেকে (কুরবানী) কবুল করে থাকেন। এক্ষণে যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হওতবে আমি তোমাকে পাল্টা হত্যা করতে উদ্যত হব না। কেননা আমি বিশ্বচরাচরের পালনকর্তা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনাকে ভয় করি’ (মায়েদাহ ৫/২৭-২৮)

ইবনে আববাস (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বলেনহাবীলের কুরবানী দেওয়া দুম্বাটিই পরবর্তীতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কর্তৃক ইসমাঈলকে কুরবানীর বিনিময় হিসাবে জান্নাত থেকে পাঠানো হয়[32]

আহলে কিতাব-এর মধ্যে যুগ যুগ ধরে প্রসিদ্ধি আছে যেহত্যাকান্ডের স্থলটি ছিল উত্তর দামেষ্কে ক্বাসিয়ূন’ (قاسيون ) পাহাড়ের একটি গুহায়। যা আজও রক্তগুহা’ (مغارة الدم ) নামে খ্যাত। যদিও এর কোন নিশ্চিত ভিত্তি নেই[33]

কুরতুবী বলেনক্বাবীল স্রেফ হিংসা বশে হাবীলকে হত্যা করেছিল। সে চায়নি যেছোট ভাই হাবীল তার চাইতে উত্তম ব্যক্তি হিসাবে সমাজে প্রশংসিত হৌক (তাফসীর কুরতুবী) ইবনি কাছীর বলেনইতিপূর্বে মায়েদাহ ২০ হতে ২৬ আয়াত পর্যন্ত ৭টি আয়াতে মূসার প্রতি বনি ইস্রাঈলের অবাধ্যতা এবং তার শাস্তি স্বরূপ তীহ প্রান্তরে তাদের দীর্ঘ ৪০ বছরের বন্দীত্ব বরণের লাঞ্ছনাকর ইতিহাস শুনানোর পর মদীনার ইহুদীদেরকে আদম আলাইহিস সাল্লাম পুত্রদ্বয়ের পারস্পরিক হিংসার মর্মান্তিক পরিণামের কথা শুনানো হয়েছে একারণে যেতারা যেন স্রেফ হিংসা বশে শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-উনার অবাধ্যতা না করে এবং পবিত্র কোরআন উল কারিমকে অস্বীকার না করে’ (তাফসীর ইবনি কাছীর)। কেননা তারা শেষনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনাকে চিনলেও তাকে মানেনি স্রেফ এই হিংসার কারণে যেইস্রাঈল বংশে তাঁর জন্ম না হয়ে ইসমাঈল বংশে জন্ম হয়েছিল। এই জ্ঞাতি হিংসা ইহুদীদেরকে মুসলমানদের চিরশত্রুতে পরিণত করেছে। একইভাবে কেবল মাত্র হিংসার কারণেই কাবীল তার সহোদর ছোট ভাই হাবীলকে খুন করেছিল এবং পৃথিবীতে প্রথম হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল। কেবল ইহুদী-নাছারা নয়যুগে যুগে ইসলাম-বিদ্বেষী সকলের অবস্থা প্রায় একইরূপ। আজকের বিশ্বের অশুভ শক্তি বলয় সর্বত্র ইসলামের ও ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে যেভাবে বিষোদ্গার করে যাচ্ছেতা কেবলি সত্যের বিরুদ্ধে মিথ্যার চিরন্তন হিংসার আধুনিক রূপ মাত্র

উল্লেখ্য যেআদম আলাইহিস সাল্লাম উনার শরীওতের বিরোধিতা করে কাবিল নিজের যমজ সুশ্রী বোনকে জোর করে বিয়ে করার জন্য এবং উক্ত বিয়ের দাবীদার হাবীলকে পথের কাঁটা মনে করে তাকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য হাবীলকে কাবীল হত্যা করে ছিলো বলে যে আছার’ সমূহ ইবনি জারীরকুরতুবীইবনি কাছীর প্রভৃতি তাফসীরের কিতাবে বর্ণিত হয়েছেতার সবগুলিই মুরসাল’, যঈফ ও মওযূ। ইবনি কাছীর বলেনএগুলি স্রেফ ইস্রাঈলী উপকথা মাত্র এবং পরবর্তীতে মুসলমান হওয়া সাবেক ইহুদী পন্ডিত কাব আল-আহবার থেকে নকলকৃত[34] যদিও আল্লাহ্‌ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তিনি হক্বিকত জানেন।

আইয়ূব সাখতিয়ানী বলেনউম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্যে এই আয়াতের উপর আমলকারী প্রথম ব্যক্তি হলেন তৃতীয় খলীফা হযরত ওছমান ইবনি আফফান (ইবনি কাছীর)। যিনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এবং নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও বিদ্রোহীদের দমনে মদীনাবাসীকে অস্ত্রধারণের অনুমতি দেননি। ফিৎনার সময় বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়ানো ব্যক্তির চেয়ে উত্তম’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার এরূপ নির্দেশনা প্রসঙ্গে হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াকক্বাছ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বলেনহে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যখন আমাকে হত্যার জন্য আমার ঘরে ঢুকে কেউ আমার দিকে হাত বাড়াবেতখন আমি কি করবনূরে মুজাসসাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনكُنْ كَخَيْرِ ابْنَىْ آدَمَ ‘তুমি আদম আলাইহিস সাল্লামের দুই পুত্রের মধ্যে উত্তমটির মত হও’ (অর্থাৎ হাবীলের মত মৃত্যুকে বরণ কর)। অতঃপর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র কোরআনুল কারিম থেকে সূরা মায়েদাহ ২৮ আয়াতটি পাঠ করে শুনালেন[35]

ইবনি কাছীর রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন যেএই সব আছার’ একথা দাবী করে যেআদম আলাইহিস সাল্লাম উনার পুত্রদ্বয়ের কুরবানী বিশেষ কোন কারণ বশে ছিল না বা কোন নারীঘটিত বিষয় এর মধ্যে জড়িত  ছিল না। কুরআনের প্রকাশ্য অর্থ উক্ত কথা সমর্থন করেযা মায়েদাহ ২৭ আয়াতে  বর্ণিত  হয়েছে।  অতএব  পূর্বাপর বিষয় সমূহ দ্বারা একথাই স্পষ্ট হয় যেভ্রাতৃ হত্যার কারণ ছিল স্রেফ এই হিংসা বশতঃ যেহাবীলের কুরবানী কবুল হয়েছিলকিন্তু ক্বাবীলের কুরবানী কবুল হয়নি (তাফসীর ইবনে কাছীর)। যদিও এতে হাবীলের কোন হাত ছিল না। ভালোর প্রতি এই হিংসা ও আক্রোশ মন্দ লোকদের মজ্জাগত স্বভাব। যা পৃথিবীতে সর্ব যুগে বিদ্যমান রয়েছে। এর ফলে ভালো লোকেরা সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চূড়ান্ত বিচারে তারাই লাভবান হয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে মন্দ লোকেরা সাময়িকভাবে লাভবান হলেও চূড়ান্ত বিচারে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। নির্দোষ হাবীলকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে ক্বাবীল তার আক্রোশ মিটিয়ে সাময়িকভাবে তৃপ্তিবোধ করলেও চূড়ান্ত বিচারে সে অনন্ত ক্ষতির মধ্যে পতিত হয়েছে। সেদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনفَأَصْبَحَ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ- ‘অতঃপর সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো’ (মায়েদাহ ৫/৩০)

নূরে মুজাসসাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনلاَ تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا إلاَّ كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا لِأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ الْقَتْلَ، رواه البخاريُّ- ‘অন্যায়ভাবে কোন মানুষ নিহত হলে তাকে খুন করার পাপের একটা অংশ আদম আলাইহিস সাল্লামের প্রথম পুত্রের আমলনামায় যুক্ত হয়। কেননা সেই-ই প্রথম হত্যাকান্ডের সূচনা করে[36] তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তির উপর তার ভাইয়ের সম্মানহানি বা অন্য কোন প্রকারের যুলুম রয়েছেসে যেন তার থেকে আজই তা মুক্ত করে নেয়সেইদিন আসার আগেযেদিন তার নিকটে দীনার ও দিরহাম (স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা) কিছুই থাকবে না (অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে)। যদি তার নিকট কোন সৎকর্ম থাকেতবে তার যুলুম পরিমাণ নেকী সেখান থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। আর যদি তার কোন নেকী না থাকেতাহলে মযলূমের পাপ সমূহ নিয়ে যালেমের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে[37]

উক্ত মর্মে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে وَلَيَحْمِلُنَّ اَتْْقَاَلَهُمْ وَأَثْقَاَلاً مَّعَ أَثْقَالِهِمْ وَلَيُسْئَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوْا يَفْتَرُوْنَআর তারা অবশ্যই নিজেদের পাপভার বহন করবে ও তার সাথে অন্যদের পাপভার এবং তারা যেসব মিথ্যারোপ করেসে সম্পর্কে ক্বিয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে’ (আনকাবূত ২৯/১৩)

 শিক্ষণীয় বিষয়ঃ

(১) ক্বাবীল ও হাবীলের উক্ত কাহিনীর মধ্যে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির তাড়নায় প্ররোচিত হওয়ার ও তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ নিহিত রয়েছে

(২) অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা যে সর্বাপেক্ষা জঘন্য পাপ এবং তওবা ব্যতীত হত্যাকারীর কোন নেক আমল আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা কবুল করেন না,  তার প্রমাণ রয়েছে

(৩) আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালাভীরু ব্যক্তিগণ অন্যায়ের পাল্টা অন্যায় করেন নাবরং আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার উপরে ভরসা করেন ও তাঁর নিকটেই তার বদ্লা কামনা করেন

(৪) অন্যায়ের ফলে অন্যায়কারী এক সময় অনুতপ্ত হয় ও দুনিয়াতে সে অন্তর্জ্বালায় দগ্ধীভূত হয় এবং আখেরাতে জাহান্নামের খোরাক হয়

(৫) নেককার ব্যক্তিগণ দুনিয়ার দুঃখ-কষ্টকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার পরীক্ষা মনে করেন এবং এতে ধৈর্য ধারণ করেন

(৬) মযলূম যদি ধৈর্য ধারণ করেতবে তার গোনাহ সমূহ যালেমের ঘাড়ে চাপে এবং দুই জনের পাপের শাস্তি যালেমকে একাই ভোগ করতে হয়

(৭) মানুষ মারা গেলে কবর দেওয়াই আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা  উনার প্রদত্ত চিরন্তন বিধান। ইসলামী শরীআতে এই বিধান রয়েছে (আবাসা ৮০/২১)। অতএব মৃত মানুষকে পুড়িয়ে ভস্ম করা বা কাটা ছেড়া করা উক্ত আবহমান কালব্যাপী এলাহী সুন্নাতের স্পষ্ট  লংঘন

(৮) অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যার এই সিলসিলা ক্বাবীলের মাধ্যমে শুরু হয় বিধায় ক্বিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ অন্যায়ভাবে খুন হবেসকল হত্যাকারীর পাপের বোঝা ক্বাবীলের আমলনামায় চাপানো হবে। অতএব অন্যায়ের সূচনাকারীগণ সাবধান!

মৃত্যু ও বয়সঃ নূরে মুজাসসাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি বলেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম দিন হলো জুমআর দিন। এ দিনেই আদম আলাইহিস সাল্লাম উনাকে সৃষ্টি করা হয়েছেএ দিনেই উনার মৃত্যু হয়েছে এবং এ দিনেই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে... [38] আদম আলাইহিস সাল্লাম উনাকে এক হাযার বছর বয়স দেওয়া হয়েছিল। রূহের জগতে দাঊদ (আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি নিজের বয়স থেকে ৪০ বছর তাকে দান করেন। ফলে অবশিষ্ট ৯৬০ বছর তিনি জীবিত ছিলেন[39]

আদম আলাইহিস সাল্লাম-উনার জীবনী থেকে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহঃ

১. তিনি সরাসরি আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার দুহাতে গড়া এবং মাটি হতে সৃষ্ট। তিনি জ্ঞানসম্পন্ন ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসাবে জীবন লাভ করেছিলেন

২. তিনি ছিলেন মানব জাতির আদি পিতা ও প্রথম নবী

৩. তিনি জিন জাতির পরবর্তী প্রতিনিধি হিসাবে এবং দুনিয়া পরিচালনার দায়িত্বশীল খলিফা হিসাবে প্রেরিত হয়েছিলেন

৪. দুনিয়ার সকল সৃষ্ট বস্ত্তর নাম অর্থাৎ সেসবের জ্ঞান ও তা ব্যবহারের যোগ্যতা তাকে দান করা হয়েছিল

৫. জিন ও ফিরিশতা সহ সকল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য  সৃষ্টির উপরে মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। সকলে তাদের অনুগত ও তাদের সেবায় নিয়োজিত

৬. আদম আলাইহিস সাল্লাম উনাকে জান্নাতে সৃষ্টি করা হয়। যা পৃথিবীর বাইরে আসমানে সৃষ্ট অবস্থায় তখনও ছিলএখনও আছে

৭. জান্নাতে আদমে আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার পাঁজরের হাড় থেকে তার জোড়া হিসাবে স্ত্রী হাওয়া (আলাইহিস সালাম)কে সৃষ্টি করা হয়। সেকারণ স্ত্রী জাতি সর্বদা পুরুষ জাতির অনুগামী এবং উভয়ে পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট

৮. আদম আলাইহিস সাল্লাম ও হাওয়া আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনাদেরকে আসমানী জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নামিয়ে দেওয়া হয় এবং পৃথিবীর নাভিস্থল মক্কার সন্নিকটে নামান উপত্যকায় অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে ক্বিয়ামত পর্যন্ত জন্মগ্রহণকারী সকল মানুষের ক্ষুদ্রদেহী অবয়ব সৃষ্টি করে তাদের নিকট থেকে আহদে আলাস্ত্ত’ অর্থাৎ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার প্রতি দাসত্বের স্বীকৃতি ও প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়

৯. মানুষ হলো পৃথিবীর একমাত্র জ্ঞান সম্পন্ন প্রাণী। তাকে ভাল ও মন্দ দুটিই করার ইচ্ছাশক্তি ও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে

১০. আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার মধ্যে মানবত্ব ও নবুওয়াতের নিষ্পাপত্ব উভয় গুণ ছিল। তিনি শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা  উনার নিষেধাজ্ঞার কথা সাময়িকভাবে ভুলে গিয়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেয়ে অনুতপ্ত হন ও তওবা করেন। তওবা কবুল হবার পরে তিনি নবুঅত প্রাপ্ত হন। অতএব নিঃসন্দেহে তিনি নিষ্পাপ ছিলেন। একইভাবে আদম আলাইহিস সাল্লাম উনার আওলাদগণ পাপ করে তওবা করলে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তা মাফ করে থাকেন

১১. আদম আলাইহিস সাল্লাম উনাকে সিজদা না করার পিছনে ইবলীসের অহংকার ও তার পরিণতিতে তার অভিশপ্ত হওয়ার ঘটনার মধ্যে মানুষকে অহংকারী না হওয়ার শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে

১২. জৈবিক ও আধ্যাত্মিক দিকের সমন্বয়ে মানুষ একটি অসাধারণ সত্তাযা অন্য কোন সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নয়

১৩. ঈমানদার বান্দাগণ ক্বিয়ামতের দিন বিচার শেষে পুনরায় জান্নাতে ফিরে যাবে

১৪. দুনিয়াবী ব্যবস্থাপনার সকল জ্ঞান আদম আলাইহিস সাল্লাম উনাকে দেওয়া হয়েছিল এবং তার মাধ্যমেই পৃথিবীতে প্রথম ভূমি আবাদ ও চাকা চালিত পরিবহনের সূচনা হয়

১৫. সবকিছুই সৃষ্টি হয়েছে মানুষের সেবার জন্য। আর মানুষ সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা  উনার দাসত্বের  জন্য

দলিল সমূহ নিচে দেওয়া হলো, যে যে যায়গা হতে সংগ্রহ করে পোষ্ট করা হয়েছে

[1]. মুমিনূন ২৩/১২ছাফফাত ৩৭/১১রহমান ৫৫/১৪তীন ৯৫/৪ ইত্যাদি
[2]. নিসা ৪/১মুত্তাফাক্ব আলাইহমিশকাত হা/৩২৩৮ বিবাহ’ অধ্যায় নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার’ অনুচ্ছেদ। আদম আলাইহিস সাল্লাম এর মূল উপাদান হলো  মাটিতাই তাকে আদম আলাইহিস সাল্লাম’ বলা হয়। পক্ষান্তরে হাওয়া (আলাইহিস সালাম)র মূল হলেন আদম আলাইহিস সাল্লামযিনি তখন জীবন্ত ব্যক্তি। তাই তাকে হাওয়া (আলাইহিস সালাম)’ বলা হয়যা হাই’ (জীবন্ত) থেকে উৎপন্ন (কুরতুবী)বাক্বারাহ ৩৫আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/৬২ পৃঃ
[3].  ইবনি কাছীর,  আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (বৈরুত:দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহতাবি)  ১/৬৭
[4]. আহমাদত্বাবারাণীমিশকাত হা/৫৭৩৭ ক্বিয়ামতের অবস্থা’ অধ্যায় সৃষ্টির সূচনা ও নবীগণের আলোচনা’ অনুচ্ছেদ
[5]. তিরমিযীআহমাদআবুদাঊদ মিশকাত হা/২১২ ইল্ম’ অধ্যায়
[6]. আহমাদমিশকাত হা/৪২ ঈমান’ অধ্যায়
[7]. মুসলিমমিশকাত হা/৫৫১৬ ফিতান’ অধ্যায়
[8]. যথাক্রমে সূরা বাক্বারাহ ২/৩১-৩৭= ৭আলে ইমরান ৩/৩৩,৫৯মায়েদাহ ৫/২৭-৩২= ৬রাফ ৭/১১১৯২৬২৭৩১৩৫১৭২-৭৩= ৮হিজর ১৫/২৬-৪২= ১৭ইসরা ১৭/৬১৭০ইয়াসীন ৩৬/৬০।  সর্বমোট = ৫০টি
[9]. ইবনি কাছীরআল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/৬৫
[10]. বুখারী হা/৪৭২৭ তাফসীর’ অধ্যায়সূরা কাহফ
[11]. মুত্তাফাক্ব আলাইহমিশকাত হা/৬৮ ঈমান’ অধ্যায় ওয়াসওয়াসা’ অনুচ্ছেদ
[12]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/৬৬
[13]. নিসা ৪/১মুত্তাফাক্ব আলাইহমিশকাত হা/৩২৩৮ বিবাহ’ অধ্যায় ১০ম অনুচ্ছেদ
[14]. তাফসীর ইবনে জারীর (বৈরুত: ১৪০৬/১৯৮৬) ৮/১০৯ পৃঃসূরা আরাফ ৭/ ২২
[15]. মুত্তাফাক্ব আলাইহমিশকাত হা/৪৩৩-৪৩৪ পবিত্রতা’ অধ্যায় গোসল’ অনুচ্ছেদ
[16]. মুত্তাফাক্ব আলাইহমিশকাত হা/৮২ ঈমান’ অধ্যায় তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ
[17]. আহমাদমিশকাত হা/১২১ ঈমান’ অধ্যায় তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ
[18]. আয়াতটি হলঃ وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُوْرِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُواْ بَلَى شَهِدْنَا أَن تَقُولُواْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِيْنَ.  আর যখন তোমার পালনকর্তা বনি আদম আলাইহিস সাল্লামের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদের বের করে আনলেন এবং নিজের উপর তাদের প্রতিজ্ঞা করালেন আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই’? তারা বললঅবশ্যই। আমরা এ বিষয়ে অঙ্গীকার করছি’ আর এটা এজন্যযাতে তোমরা ক্বিয়ামতের দিন একথা বলতে না পারো যেবিষয়টি আমাদের জানা ছিল না’ (রাফ ৭/১১২)
[19]. মালেকআহমাদতিরমিযীআবুদাঊদমিশকাত হা/৯৫ ঈমান’ অধ্যায় তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ
[20]. আহমাদমিশকাত হা/১১৯ তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ
[21]. মুত্তাফাক্ব আলাইহমিশকাত হা/৯০ ঈমান’ অধ্যায়, ‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ
[22]. যেমন নূরে মুজাসসাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনعلى فطرة الاسلام ‘ইসলামের উপর’ ছহীহ ইবনি হিববান হা/১৩২শুআয়েব আরনাঊত্ব বলেনরাবীগণ সকলে বিশ্বস্ত
[23]. মুসলিম হা/২৮৬৫ জান্নাতের বিবরণ’ অধ্যায়অনুচ্ছেদ ১৬আহমাদ হা/১৬৮৩৭
[24]. আলবানীছহীহ তিরমিযী হা/১২২৪মিশকাত হা/৪১৫৭ আক্বীক্বা’ অনুচ্ছেদ
[25]. আহমাদমওকূফ ছহীহমারফূ হুকমীমিশকাত হা/১২২ তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ
[26]. মায়েদাহ ৫/৮২ক্বাছাছ ২৮/৫২-৫৪তাফসীর ত্বাবারী ২০/৫৬ পৃ: তাফসীর ইবনি কাছীরত্বাবারী ৩২+৮=৪০ জন এবং ইবনি কাছীর ৭০ জন বলেছেন
[27]. মুফতী মুহাম্মাদ শফীতাফসীর মাআরেফুল কুরআন (বঙ্গানুবাদ সংক্ষেপায়িত : মদীনা ত্বাইয়েবা ১৪১৩/১৯৯৩)পৃঃ ৩৪০
[28]. বাক্বারাহ ২/৩০আনআম ৬/১৬৫ফাত্বির ৩৫/৩৯
[29]. মুসলিমহা/১৯২০ নেতৃত্ব’ অধ্যায়
[30]. তিরমিযী হা/৩৫২২ তাফসীর’ অধ্যায় সূরা রহমানসনদ হাসানসিলসিলা ছহীহাহ হা/২১৫০
[31]. তাসফীর মাআরেফুল কুরআন পৃঃ ৬২৯
[32]. তাফসীর ইবনি কাছীরমায়েদাহ ২৭-৩১ আয়াতগৃহীত। তাফসীর ইবনি জারীরআব্দুল্লাহ ইবনি আমর (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) হতেসনদ জাইয়িদ
[33]. ইবনি কাছীরআল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহতাবি) ১/৮৭ পৃঃ
[34]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/৮৭ পৃঃ
[35]. আবুদাঊদ হা/৪২৫৭৫৯৬২ ফিতান’ অধ্যায়তিরমিযী হা/২২০৪ইবনি মাজাহ হা/৩৯৬১ সনদ ছহীহ
[36]. বুখারী হা/৩৩৩৫মুসলিমতিরমিযীইবনি মাজাহমিশকাত হা/২১১ ইল্ম’ অধ্যায়
[37]. বুখারী হা/২৪৪৯মিশকাত হা/৫১২৬ শিষ্টাচার’ অধ্যায় যুলুম’ অনুচ্ছেদ ২১
[38]. মুওয়াত্ত্বাআবুদাঊদতিরমিযীনাসাঈমিশকাত হা/১৩৫৯সনদ ছহীহ, ‘ছালাত’ অধ্যায় জুম’ অনুচ্ছেদ

[39]. তিরমিযীমিশকাত হা/১১৮ তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদসনদ ছহীহতিরমিযী হা/৩০৭৬ তাফসীর সূরা আরাফ। একই হাদীছ মিশকাত হা/৪৬৬২ শিষ্টাচার’ অধ্যায় সালাম’ অনুচ্ছেদে এসেছে। যেখানে আদম আলাইহিস সাল্লাম তার বয়স থেকে ৬০ বছর দান করেন’ বলা হয়েছে। তিরমিযী হাদীছটিকে হাসান গরীব’ বলেছেন ছাহেবে মিরক্বাত ও ছাহেবে তোহফা উভয়ে বলেন যে, ‘৪০ বছর দান করার হাদীছ অগ্রগণ্য (الأرجح)। দ্রঃ তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৫০৭২-এর ব্যাখ্যা

In Saudi they wanted to show the approx size of Adam (A.S) by making a garment in his size. This was the idea of Hamdan with the help of 4 tailors. It took 18 days and 40 rolls of cloths were needed. The length of the garment is 29 meters: 9m between the shoulders, 12m width of the bottom, 10m length of the sleeves and 2m width of neck.

Narrated by Abu Hurayrah (R.A): Rasoolullah Sallallahu Alaihi Wasallam said: Allah created Adam in His image sixty cubits (about 30 metres) in height. When He created him, He said to him, Go and greet that group of angels sitting there, and listen (to) what they will say in reply to you, for that will be your greeting and the greeting of your offspring. Adam Alaihi Wasallam (went and) said As-Salaam Alaykum (peace be upon you).They replied As-Salaamu-alayka wa Rahmatullaah (peace and Allaah's Mercy be on you). So they increased it to Wa Rahmatullaah. The Prophet Sallallaahu alayhi wa sallam added, So whoever will enter paradise, will be of the shape and picture of Aadam. Since then the creation of Adam’s (as) offspring (i.e. stature of human beings) has been diminished continuously up to the present time. Saheeh Bukhari Vol 8 Hadeeth No: 6227
In Saudi they wanted to show the approx size of Adam (A.S) by making a garment in his size.
In Saudi they wanted to show the approx size of Adam (A.S) by making a garment in his size.
In Saudi they wanted to show the approx size of Adam (A.S) by making a garment in his size.
In Saudi they wanted to show the approx size of Adam (A.S) by making a garment in his size.
In Saudi they wanted to show the approx size of Adam (A.S) by making a garment in his size.
In Saudi they wanted to show the approx size of Adam (A.S) by making a garment in his size.
In Saudi they wanted to show the approx size of Adam (A.S) by making a garment in his size.
In Saudi they wanted to show the approx size of Adam (A.S) by making a garment in his size.

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ পোষ্ট টা পড়ে যদি ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট বক্স এ আপনার মতামত জানাবেন আর আপনার বন্ধু বান্দব দের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন্নাআসসালামু আলাইকুমফি আমানিল্লাহ !!! আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুজ দান করুন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

1 comment:

  1. kono Nabi rasul alaihimus salam Unara Kolar Jukto Jama Poren nai

    ReplyDelete