10.29.2014

ইয়াযীদ সম্পর্কে জগৎবিখ্যাত ঈমামগনের সিদ্ধান্ত ।

ইয়াযীদ সম্পর্কে জগৎবিখ্যাত ঈমামগনের সিদ্ধান্তঃ (আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তালা যেন তার যা প্রাপ্য তা তাকে দেন এবং তার বাবা হযরত আমীরে মোয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতি সন্তুষ্ট হন)

বর্তমানে এটি পরিলক্ষিত হচ্ছে যে কিছু মানুষ আহলে বায়ত (নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-পরিজন)-উনাদেরর প্রতি নিজেদের প্রত্যক্ষ, এমন কি পরোক্ষ ঘৃণার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ এয়াযীদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দিতে সচেষ্ট এবং এরই ধারাবাহিকতায় তারা তাকে এক মহান ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিত্রিত করছেআল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তালা উনার অনুগ্রহে আমরা এই পোষ্টে ইসলাম উনার এই বিশ্বাসঘাতক (ইয়াযীদ) কীভাবে ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-উনাকে শহীদ করেছিলো এবং কীভাবে সে মদীনা মোনাওয়ারা উনাকে লণ্ডভণ্ড করে লুঠতরাজ চালিয়েছিলো সে সম্পর্কে আলোকপাত করবো

প্রথমতঃ আমরা নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একটি সহীহ হাদীস শরিফ পেশ করবো, যা মনোরম মদীনা মোনাওয়ারা নগরী উনাকে যে সব লোক লণ্ডভণ্ডকরে তাদের সম্পর্কে বর্ণনা দেয়

ইমাম আহমদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) হযরত সায়েব ইবনে খালেদ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)-উনার সূত্রে বর্ণনা করেন নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাদীস, তিনি এরশাদ ফরমান: যে যেকেউ অন্যায়ের প্রসার এবং মদীনাবাসী উনাদের হয়রানি বা ভীত-সন্ত্রস্ত করে, তার প্রতি আল্লাহর লানত (অভিসম্পাত), ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের এবং গোটা মানব জাতির (মোমেন বান্দাদের) লানত-ও” [মুসনাদ-এ-ইমাম আহমদ হাম্বল; ইবনে কাসীর রচিত আল-বেদায়া ওয়ান্ নেহায়া গ্রন্থের ৮ম খণ্ডের ২৭৪ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃতি অনুযায়ী]

পবিত্র আল কোরআন উল কারিমে ঘোষিত হয়েছে: নিশ্চয় যারা কষ্ট দেয় আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা ও উনার রাসূল নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে, তাদের প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উনার লানত (অভিসম্পাত) দুনিয়া ও আখেরাতে এবং আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তিনি তাদের জন্যে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন” [ পবিত্র সূরা আল-আহযাব, আয়াত শরিফ ৫৭]

নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে তাঁর দৌহিত্রকে নৃশংসভাবে শহীদ করা এবং তিনি যে স্থানকে হাররাম (পবিত্র) বলে ঘোষণা করেছেন সে জায়গা উনাকে তছনছ করার চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক আর কী-ই বা হতে পারে?

১/ - এয়াযীদের নানা ঘৃণ্য অপরাধ

ইবনে কাসীর ৬৩ হিজরীর (কারবালার) ঘটনা সম্পর্কে উনার নিজ তারিখগ্রন্থে লিখেনঃ ইবনে যুবাইর (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বলেন, ওহে মানুষেরা! তোমাদের আসহাবদেরকে হত্যা করা হয়েছে - ইন্না লিল্লাহে ইন্না ইলাইহে রাজেউন

ইয়াযীদ একটি ঘৃণিত ভুল কাজ করেছে মদীনা মোনাওয়ারাকে তিন দিনের জন্যে মোবাহহিসেবে কার্যকর করার লক্ষ্যে মুসলিম ইবনে উকবাকে আদেশ দিয়েএটি ছিল তার সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক ভুলঅনেক সাহাবা-এ-কেরাম ও তাঁদের সন্তানদের হত্যা করা হয়আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের মাধ্যমে ইয়াযীদ আমাদের প্রানের চেয়ে প্রিও নবি নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম) ও উনার সাথী উনাদের শহীদ করে; আর ওই তিন দিনে মদীনা মোনাওয়ারায় এমন সব গর্হিত অপরাধ সংঘটিত হয় যা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তিনি ছাড়া কেউই জানে নাইয়াযীদ তার শাসনকে মুসলিম ইবনে উকবাহের প্রেরণের মাধ্যমে সংহত করতে চেয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তালা তার ইচ্ছাকে পুরো হতে দেন নি এবং তাকে শাস্তি দিয়েছিলেনবস্তুতঃ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে মেরে ফেলেন যেমনিভাবে তিনি আগ্রাসী শহরগুলোকে (অর্থাৎ, ওই শহরগুলোর আক্রমণকারীদেরকে) নিজ কব্জায় নিয়েছিলেন; আর নিঃসন্দেহে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার কব্জা কঠোর ও বেদনাদায়ক” [আল-বেদায়া ওয়ান্ নেহায়া, ৮ম খণ্ড, ২৮৩ পৃষ্ঠা]

২/ - ইবনে যিয়াদও এয়াযীদের আচরণে বিরূপ

এয়াযীদের অপরাধ এতো গর্হিত ছিল যে এমন কি তার অনুগত উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ যাকে মুসলিম ইবনে আকীল ও পরবর্তী পর্যায়ে ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-উনার হত্যার জন্যে পাঠানো হয়েছিল, এবং যাকে পত্র মারফত ইয়াযীদ বলেছিল মক্কায় গিয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)-উনার ওপর আবরোধ দিতে, সেও তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিল: আল্লাহ সুবাহানহু ওয়া তায়ালা উনার শপথ যার হাতে কুল মাখলুকাতের প্রান শেই মহা পরাক্রমশালী বাদশা! আমি কোনো ফাসেক (পাপী ইয়াযীদ)-এর খাতিরে দুটো (অপ)-কর্মতে জড়াবো নাআমি ইতোমধ্যেই নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মেয়ের(আলাইহাস সালাম) উনার (ঘরের) নাতি(আলাইহিস সালাম) উনাকে হত্যা করেছি; আর এখন (সে নির্দেশ দিচ্ছে) বায়তুল হাররামের সাথে যুদ্ধ করতেতবে ইয়াযীদ যখন ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-উনাকে শহীদ করে, তখন তার মা মারজানা তাকে বলেন, ‘তুমি মরো গে! তুমি এই জঘন্য অপরাধ কীভাবে করতে পারলে?’ তিনি তাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেনইয়াযীদকে জানানো হয় যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা) তিনি তাঁর বিভিন্ন ভাষণে ইয়াযীদ সম্পর্কে বলতেন, সে একজন জালিয়াত, মদ্যপ, নামায তরককারী ও গায়িকা (ভ্রষ্টা) নারীদের সাহচর্যে অবস্থানকারী ব্যক্তি। [ইবনে কাসীর কৃত আল-বেদায়া ওয়ান্ নেহায়া’, ৮ম খণ্ড, ২৭৯ পৃষ্ঠা]

ইবনে কাসীর উনার থেকে আরও বর্ণনা করেনঃ মুসলিম ইবনে উকবা, যার অপর পরিচিতি আস্ সাইফ মুসরাফ বিন উকবা নামে (আল্লাহ এই বদ ও মূর্খ লোকের কল্যাণ না করুন, আমীন), সে এয়াযীদের আদেশে মদীনা মোনাওয়ারার আক্রমণকে বৈধতাদিয়েছিল তিন দিনের জন্যেআল্লাহ সুভাহানাহু ওয়া তালা ইয়াযীদকে জাযাখায়রমন্ঞ্জুর না করুন, আমীনসে বহু ন্যায়বান মানুষের হত্যা সংঘটন করে এবং মদীনার বিপুল মালামাল লুঠপাট করেএকাধিক বর্ণনায় এসেছে যে সে ওখানে প্রচুর ক্ষতি সাধন করে এবং অনেক ফাসাদের জন্ম দেয়এ ও উল্লেখিত হয়েছে যে (সাহাবী) হযরত মুয়াফল ইবনে সানান (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)-উনাকে ইবনে উকবার সামনে বেঁধে রাখা হয় এবং তারপর শহীদ করা হয়এই সময় সে বলে, ‘তুমি এয়াযীদের বন্ধু ছিলে, কিন্তু পরে তুমি তার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছ; তাই ইয়াযীদ তোমার প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন হয়েছে। [আল-বেদায়াহ ওয়ান্ নেহায়াহ, ৮ম খণ্ড, ২৮০ পৃষ্ঠা]

৩/ - নেতৃস্থানীয় তাবেঈ সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর প্রতি এয়াযীদের বৈরিতা

আল-মুদাইনী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন যে হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-কে নিয়ে আসা হয় মুসলিম বিন উকবার সামনেসে তাঁকে তার কাছে বায়াত (আনুগত্য) গ্রহণ করতে বলেতিনি এর জবাবে বলেন, “আমি (শুধু) সাইয়্যেদুনা হযরত আবু বকর (আলাইহিস সালাম) ও সাইয়্যেদুনা হযরত উমর ফারুক (আলাইহিস সালাম)-উনার সীরাতের (আদর্শের) প্রতি বায়াত নিতে পারিএমতাবস্থায় ইবনে উকবা তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেয়কিন্তু কেউ একজন (তাঁকে বাঁচাবার জন্যে) বলেন যে এই ব্যক্তি (হযরত সাঈদ) পাগলএতে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়। [ আল-বেদায়াহ ওয়ান্ নেহায়াহ, ৮ম খণ্ড, ২৮১ পৃষ্ঠা]

৪/ - শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)

ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) তাঁর রচিত আল-এমতাবিল আরবাঈনশীর্ষক বইয়ের পুরো শিরোনামই দিয়েছেন এয়াযীদের প্রতি লানতওতে তিনি লিখেন, “ইয়াযীদকে ভক্তি ও তার প্রশংসা বেদআতী-গোমরাহব্যক্তি ছাড়া আর কেউই করে না, যে ব্যক্তির বিশ্বাস একেবারেই শূন্যকেননা, এয়াযীদের এমন সব বৈশিষ্ট্য ছিল যার ভক্ত-অনুরক্ত হলে কুফর তথা অবিশ্বাসের যোগ্য হতে হয়এটা এই কারণে যে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার ওয়াস্তে ভালোবাসা এবং উনারি ওয়াস্তে ঘৃণা করা ঈমানেরই লক্ষণ” [দার আল-কুতুব আল-এলমিয়্যা, বৈরুত, লেবানন হতে ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী প্রণীত আল-এমতা বিল্ আরবাঈন আল-মাতবাইনাত আস্ সামাপুস্তকের ৯৬ পৃষ্ঠা]

ইমাম সাহেব (রহমতুল্লাহি আলাইহি) অন্যত্র লিখেন, “এয়াহইয়া ইবনে আব্দিল মুলক্ বিন আবি গানিয়্যা যিনি সিকা (নির্ভরযোগ্য) বর্ণনাকারীদের একজন’, তিনি সিকাবর্ণনাকারী নওফল বিন আবি আকরাব থেকে শুনেছেন: একবার খলীফা উমর ইবনে আবদিল আযীয (২য় উমর)-এর দরবারে মানুষেরা ইয়াযীদ ইবনে মুআবিয়া সম্পর্কে আলাপ করছিলেনওই সময় এক লোক ইয়াযীদকে আমীরুল মোমেনীন’ (ঈমানদারদের শাসক) খেতাবে সম্বোধন করেএটি শুনে খলীফা ২য় উমর (রাগান্বিত হয়ে) তাকে বলেন, “তুমি ইয়াযীদকে আমীরুল মোমেনীন ডেকেছ?” অতঃপর তিনি ওই লোককে ২০টি দোররা মারার হুকুম দেন। [ইমাম আসকালানী কৃত তাহযিবুত্ তাহযিব’, ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৩১৩ পৃষ্ঠা]

৫/ - ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার তারিখুল খুলাফাগ্রন্থে যা বলেন -

আপনি (ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম) শাহাদাত বরণ করেন এবং আপনার কর্তিত শির ইবনে যিয়াদের সামনে একটি থালায় করে আনা হয়আপনাকে যে ব্যক্তি হত্যা করেছে তার ওপর আল্লাহর লানত (অভিসম্পাত); আরও লানত ইবনে যিয়াদ ও এয়াযীদের ওপর” [ইমাম সৈয়ুতী রচিত তারিখুল খুলাফাগ্রন্থের ১৬৫ পৃষ্ঠা]

ইমাম সৈয়ুতী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) আরও লিখেন: হযরত নওফল বিন আবি ফিরায়াত (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেছেন যে একবার তিনি খলীফা উমর ইবনে আব্দিল আযীযের দরবারে বসেছিলেন; এমন সময় এক লোক ইয়াযীদকে আমীরুল মোমেনীনখেতাবে সম্বোধন করেএতে খলীফা (রাগান্বিত হয়ে) তাকে বলেন, “তুমি এই ব্যক্তিকে আমীরুল মোমেনীনবলো?” অতঃপর তিনি ওই লোককে ২০টি দোররা মারার আদেশ দেন৬৩ হিজরীতে ইয়াযীদ জানতে পারে যে মদীনাবাসী মুসলমানবৃন্দ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেনতাই সে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী পবিত্র নগরীতে প্রেরণ করে এবং মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেপবিত্র নগরী লুঠপাটের পরে সে তার বাহিনীকে পবিত্র মক্কায় পাঠায় সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)-উনাকে শহীদ করার জন্যেওই সময় হাররা’-এর ঘটনা ঘটেহাররায় কী ঘটেছিল আপনারা জানেন কি? এ প্রসঙ্গে (তাবেঈ) হযরত হাসসান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “মদীনা মোনাওয়ারায় হামলা হলে পরে কেউই নিরাপদ ছিলেন নাঅসংখ্য সাহাবী ও অন্যান্য মানুষ শহীদ হন এবং মদীনায় লুঠপাট হয়; আর সহস্র সহস্র কুমারী মেয়ের ইজ্জত নষ্ট করা হয়ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। ... নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এরশাদ মোবারক করেনঃ মদীনাবাসীকে যে কেউ (সন্ত্রাসের মাধ্যমে) হয়রানি বা ভীত-সন্ত্রস্ত করলে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা-ও তাকে অনুরূপ প্রতিদান দেবেন এবং তার ওপর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার লানত, ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের ও মানব জাতির (মোমেনদের) লানত-ও” (মুসলিম শরীফ)মদীনাবাসী মুসলমানবৃন্দ যে কারণে এয়াযীদের বায়াত গ্রহণ করেন নি, তা হলো সে অত্যধিক পাপাচারে লিপ্তছিলোআল-ওয়াকিদী সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ বিন খাযলাতাল গুসাইল (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার শপথ! আমরা এয়াযীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি যখন আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে আমাদের প্রতি আসমান থেকে পাথর নিক্ষেপ করা হবে’; কেননা, এয়াযীদী গোষ্ঠী তাদের মা, বোন ও কন্যাদের বিয়ে করা আরম্ভ করেছিল, প্রকাশ্যে মদ্যপান করছিল এবং নামাযও তরক করছিলইমাম যাহাবী বলেন, ইয়াযীদ মদ্যপান ও অন্যান্য কুকর্মে লিপ্তহবার পর মদীনাবাসীদের প্রতি জুলুম-নিপীড়ন করলে মক্কাবাসী মুসলমানবৃন্দও চারদিক থেকে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানআল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তালা এয়াযীদের জীবনে কোনো রহমত-বরকত দেন নি। (ইয়াযীদ মক্কা আক্রমণ করে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকেও শহীদ করে)। [ইমাম সৈয়ুতী প্রণীত তারিখুল খুলাফাগ্রন্থের ১৬৭ পৃষ্ঠা]

৬/ - আল্লামা মাহমূদ আলূসী তাঁর কৃত তাফসীরে রূহুল মাআনীকেতাবে সূরা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-উনার ২২-২৩ নং আয়াত শরিফগুলোর ব্যাখ্যায় বলেনঃ এয়াযীদের প্রতি লানতদেয়ার দালিলিক প্রমাণ এই আয়াত থেকেই বের করা হয়েছে, যেমনটি ইমাম আহমদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-উনার সূত্রে উল্লেখ করেছেন আল-বরযানজি (রহমতুল্লাহি আলাইহি) নিজ আল-আশআতপুস্তকে এবং আল-হায়তামী তাঁর আস্ সাওয়াইক্কগ্রন্থে এই মর্মে যে, ইমাম আহমদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-উনার পুত্র আবদুল্লাহ তাঁকে এয়াযীদের প্রতি লানত দেয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেনইমাম সাহেব বলেন, ‘তার প্রতি লানত দেয়া যাবে না কেন, যেখানে স্বয়ং আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তালা-ই পবিত্র কোরআন মজীদে তাকে লানত দিয়েছেন?’ আবদুল্লাহ আবার প্রশ্ন করেন, ‘কিতাবুল্লাহর ওই আয়াতটি তেলাওয়াত করুন যাতে আমি জানতে পারি কীভাবে এয়াযীদের প্রতি লানত দেয়া হলো?’ এমতাবস্থায় ইমাম আহমদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) নিম্নবর্ণিত আয়াতগুলো তেলাওয়াত করেন, ‘তবে কি তোমোদের এ লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে যে তোমরা শাসনক্ষমতা লাভ করলে পৃথিবীতে বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং আপন আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরা হচ্ছে ওই সব লোক যাদের প্রতি আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তালা উনার অভিসম্পাত (লানত) দিয়েছেন...’ (আল-কোরআন উল কারিম, আয়াত শরিফ ৪৭:২২-২৩)অতঃপর তিনি বলেন, ‘ইয়াযীদ যা করেছে তার থেকে বড় বিপর্যয় আর কী হতে পারে’?” [আল্লামা আলূসী কৃত তাফসীরে রূহুল মাআনীগ্রন্থের ৯ম খণ্ড, আল-কুরআন ৪৭:২২-২৩-এর ব্যাখ্যায়]

দ্বিতীয়তঃ আল্লামা আলূসী আরও বলেন, “আর আমি বলি, আমার ভাবনায় যা প্রাধান্য পায় তা হলো এই খবীস (ইয়াযীদ) আমাদের প্রানপ্রিয় নবি নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রেসালতের পক্ষে সাক্ষ্য দেয় নিআমার মতে, এয়াযীদের মতো লোককে লানত দেয়া সঠিক, যদিও তার মতো এতো বড় ফাসিকের কথা কল্পনা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়; আর এটাও স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে সে কখনোই তওবা করে নি; (উপরন্তু) তার তওবা করার সম্ভাবনাও তার ঈমান পোষণ করার সম্ভাবনার চেয়ে ক্ষীণতরএয়াযীদের পাশাপাশি ইবনে যিয়াদ, ইবনে সাআদ ও তার দল-বল এতে জড়িতঅবশ্যই অবশ্যই কেয়ামত দিবস অবধি এবং ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-উনার জন্যে (মোমেনদের) চোখের পানি যতোদিন ঝরবে ততোদিন পর্যন্ত আল্লাহর লানত তাদের সবার ওপর পতিত হোক; তাদের বন্ধু-বান্ধব, সমর্থক, দল-বল এবং ভক্তদের ওপরও পতিত হোক!” [তাফসীরে রূহুল মাআনী, ২৬তম খণ্ড, ৭৩ পৃষ্ঠা]

৭/ - ইমাম যাহাবীর ভাষ্য -

ইয়াযীদ ছিল এক জঘন্য নসিবী (আহলে বায়তকে ঘৃণাকারী)সে রাজত্ব আরম্ভ করে ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-উনাকে শহীদ করে এবং রাজত্বের ইতি টানে হাররা-এর ঘটনা দ্বারা (অর্থাৎ, মদীনা অবরোধ, যার দরুন সহীহ হাদীস মোতাবেক সে লানতের যোগ্য হয়)ফলে মানুষেরা তাকে ঘৃণা করতো; অধিকন্তু সে জীবনে রহমত-বরকত কিছুই পায় নি; ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-উনার শাহাদাতের পরে তার বিরুদ্ধে অনেকে অস্ত্র তুলে নেন - যেমনটি করেছিলেন মদীনাবাসীগণ, যাঁরা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার ওয়াস্তে (তার বিরুদ্ধে) রুখে দাঁড়ান” [‘সিয়্যার আল-আলম আন্ নুবালা’, ৪র্থ খণ্ড, ৩৭-৩৮ পৃষ্ঠা]

দ্বিতীয়তঃ ইমাম যাহাবী আরও লিখেন, “আমি বলি, ইয়াযীদ মদীনাবাসীদের সাথে যে আচরণ করেছিল, এবং ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম) ও উনার বংশধরদের যেভাবে হত্যা করেছিল, আর যেভাবে মদ্যপান ও গর্হিত কাজে লিপ্ত হয়েছিল, তাতে মানুষেরা তাকে ঘৃণা করতেন এবং তার বিরুদ্ধে একাধিকবার রুখে দাঁড়িয়েছিলেনআল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তালা এয়াযীদের জীবনে রহমত-বরকত দেন নি; উপরন্তু, আবু বিলাল মিরদাস্ বিন আদইয়া আল-হানযালী তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান” [তারিখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাত আল-মাশাহির ওয়াল্ আলম, ০০৫ খণ্ড,৩০ পৃষ্ঠা]

তৃতীয়তঃ ইমাম যাহাবী আরও লিখেন, “যিয়াদ হারসী বর্ণনা করে: ইয়াযীদ আমাকে মদ পান করতে দেয়আমি ইতিপূর্বে কখনোই এ রকম মদ পান করি নি; তাই তাকে জিজ্ঞেস করি কোথা থেকে সে এই মদের উপাদান সংগ্রহ করেছেইয়াযীদ জবাবে বলে, এটি মিষ্টি ডালিম, ইসপাহানের মধু, হাওয়াযের চিনি, তায়েফের আঙ্গুর ও বুরদাহ-এর পানি দ্বারা প্রস্তুতকৃতআহমদ ইবনে মাসামা বর্ণনা করেন: একবার ইয়াযীদ মদ্যপান করে নাচা আরম্ভ করে; হঠাৎ সে পড়ে যায় এবং তার নাক দিয়ে রক্ত বেরুতে আরম্ভ করে” [সিয়ার আল-আলম আন্ নুবালাহ, ০০৪ খণ্ড, ০৩৭ পৃষ্ঠা]

৮/ - ইয়াযীদ সম্পর্কে কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-উনার ভাষ্য -

মহান মুফাসসির ও সুবিখ্যাত গ্রন্থাবলীর প্রণেতা এবং সকল সুন্নী মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য ইসলামী জ্ঞান বিশারদ কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) পবিত্র আল কোরআন উল কারিমের ১৪:২৮ আয়াত শরিফ খানা উদ্ধৃত করেনঃ আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি যারা অকৃজ্ঞতাবশত আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা উনার অনুগ্রহকে বদল করেছে এবং আপন সম্প্রদায়কে ধ্বংসের ঘরে নামিয়ে এনেছে?” অতঃপর এর তাফসীরে হযরত পানিপথী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) লিখেন, “বনী উমাইয়া সব সময় কুফরীর ওপর উল্লাস প্রকাশ করেছিল; তবে আবু সুফিয়ান, আমীরে মোয়াবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু), আমর ইবনে আস্ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং অন্যান্যরা মুসলমান হয়েছিলেনপরবর্তীকালে ইয়াযীদ ও তার সাথীরা আল্লাহর এই নেয়ামত (আশীর্বাদ) প্রত্যাখ্যান করে আহলে বায়তের প্রতি বৈরিতার পতাকা উড়ায়; আর শেষমেশ ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-উনাকে শহীদ করে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সে আমাদের প্রানপ্রিয় নবি নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ধর্মকে অস্বীকার করে বসেইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-উনার শাহাদাতের পরে সে বলেঃ আমার পূর্বপরুষেরা বেঁচে থাকলে তাঁরা আজ দেখতেন কীভাবে আমি নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিবার ও বনী হাশেমের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিসে এ কথা ব্যক্ত করতে যে দ্বিচরণ শ্লোক ব্যবহার করে তার শেষাংশে আছে - বদরের যুদ্ধে আহমদ (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আমার পূর্বপুরুষদের সাথে যা কিছু করেছেন, তার বদলা আমি নেবো’ (নাউযুবিল্লাহ) সে মদ হালাল ঘোষণা করে এবং এর প্রশংসায় বলে, ‘যদি মোহাম্মদ (নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার)-উনার ধর্মে মদ হারাম হয়, তাহলে ঈসা ইবনে মরঈয়মের (আলাইহিস সালাম) উনার ধর্মে একে জায়েয জেনো” [তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, ২১১-২১২ পৃষ্ঠা]

৯/ - ইবনে কাসীরের ভাষ্য - ইবনে কাসীর তার রচিত আল-বেদায়াগ্রন্থের ৮ম খণ্ডের ১১৬৯ পৃষ্ঠায় যিকরে ইয়াযীদ বিন মোয়াবিয়াশীর্ষক অধ্যায়ে লিখেনঃ

বিভিন্ন বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে ইয়াযীদ দুনিয়ার কুকর্ম পছন্দ করতো; মদ্যপান করতো, গান-বাজনায় ছিল আসক্ত, দাড়িবিহীন ছেলেদের সাথে সমকামিতায় লিপ্ত, ঢোল বাজাতো, কুকুর পালতো, ব্যাঙের, ভালুকের ও বানরের লড়াই লাগিয়ে দিতোপ্রতিদিন সকালে সে মদ্যপ অবস্থায় বানরকে ঘোড়ার পিঠের সাথে বেঁধে ঘোড়াকে দৌড় দিতে বাধ্য করতো” [আল-বেদায়া ওয়ান্ নেহায়া, ৮ম খণ্ড, ১১৬৯ পৃষ্ঠা]

১০/ - ইবনে আসীরের মন্তব্য

ইবনে আসীর নিজ তারীখ আল-কামিলগ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ৪৫০ পৃষ্ঠায় মুনযির ইবনে যাবীর থেকে বর্ণনা করেনঃ

এটি সত্য যে ইয়াযীদ আমাকে ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) দিরহাম পুরস্কারস্বরূপ দিয়েছিল, কিন্তু এটি তার প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করা হতে আমাকে রুখবে নাআল্লাহর কসম, সে একজন মাতাল

১১/ - মাতালইয়াযীদ সম্পর্কে ইবনে জাওযীর মন্তব্য

ইবনে জাওযী তাঁর ওয়াফা আল-ওয়াফাকেতাবে বলেনঃ ইয়াযীদ তার চাচাতো ভাই উসমান বিন মোহাম্মদ বিন আবি সুফিয়ানকে মদীনার শাসক পদে নিয়োগ করেউসমান উপহার সামগ্রীসহ এক প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে এয়াযীদের কাছে তারই আনুগত্যের শপথ নেয়ার উদ্দেশ্যেকিন্তু প্রতিনিধি দলের প্রত্যাবর্তনশেষে এর সদস্যরা বলেন, ‘আমরা এমন এক লোকের সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছি যার কোনো ধর্ম নেই; সে মদ্যপান করে, বাদ্যযন্ত্র বাজায়, গায়িকা (ভ্রষ্টা নারী) ও কুকুর সাথে রাখেআমরা তার প্রতি আনুগত্যের শপথ প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা ঘোষণা করছিআবদুল্লাহ ইবনে আবি উমরু বিন হাফস মখযুমী বলেন, ‘ইয়াযীদ আমাকে উপহার সামগ্রী দিয়েছিলকিন্তু বাস্তবতা হলো, এই লোক আল্লাহর একজন শত্রু এবং মদ্যপআমি যেভাবে আমার এমামা (পাগড়ী) মাথা থেকে সরিয়ে ফেলছি, ঠিক একইভাবে তার থেকে নিজেকে আলাদা করবো

১২/ - কুসতুনতুনিয়া-বিষয়ক হাদীসের অপব্যাখ্যার অপনোদন

তিনি (নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উনাকে বলতে শুনেছেন, ‘নৌযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আমার সাহাবীদের প্রথম দলটি বেহেশতী হবেনূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরপর বলেন, ‘আমার সাহাবীদের মধ্যে প্রথম বাহিনী যারা (রোমক) সিজারের শহর (কুসতুনতুনিয়া তথা কনস্টানটিনোপোল/ইস্তাম্বুল) জয় করবে, তাদের গুনাহ মাফ করা হবে” [সহীহ বুখারী, ৪র্থ খণ্ড, হাদীস - ১৭৫]

প্রথমতঃ সিজারের শহর জয়ী প্রথম বাহিনীর মধ্যে ইয়াযীদ ছিল না, যেমনটি আবু দাউদের সুনানে বর্ণিত সহীহ হাদীসে বিবৃত হয়েছে: হযরত আসলাম আবি ইমরান (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বলেন, “আমরা কনস্টানটিনোপোল জয়ের উদ্দেশ্যে মদীনা হতে বের হইআবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালিদ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ছিলেন এই বাহিনীর প্রধান” [সুনানে আবি দাউদ, ২য় খণ্ড, হাদীস নং ২৫১২; আলবানীর মতো সালাফিও এই হাদীসকে সহীহ বলেছে তার তাখরিজপুস্তকে]

ইমাম তাবারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) নিজ তারিখগ্রন্থে বলেন -

আবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালিদ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)র সেনাপতিত্বে ৪৪ হিজরী সালে মুসলমান বাহিনী রোমে (কনস্টানটিনোপোল) প্রবেশ করেন এবং সেখানে গযওয়া (ধর্মযুদ্ধ) সংঘটিত হয়। [তারিখে তাবারী, ৪৪ হিজরীর ঘটনা, ০০৫ খণ্ড, ২১২ পৃষ্ঠা; কায়রোর দারুল মাআরিফপ্রকাশনী হতে প্রকাশিত]

অথচ ইয়াযীদ আরও বহু পরে ওখানে যায়উপরন্তু, তাকে সেখানে পাঠানো হয়েছিল শাস্তিস্বরূপ; আর সে ওই প্রথমে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের প্রতি বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছিল

ইমাম ইবনে আসীর (রহমতুল্লাহি আলাইহি) লিখেনঃ এই বছর, অর্থাৎ, ৪৯ বা ৫০ হিজরী সালে হযরত আমীরে মোয়াবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) রোমের (কনস্টানটিনোপোল) উদ্দেশ্যে এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেনতিনি এর দায়িত্বভার অর্পণ করেন সুফিয়ান বিন আউফের প্রতি এবং তাঁর ছেলে ইয়াযীদকে ওই বাহিনীর সাথে যেতে বলেনকিন্তু ইয়াযীদ অসুস্থ হওয়ার ভান করে এবং যেতে অস্বীকৃতি জানায়যোদ্ধারা যখন ক্ষুধা ও রোগ-ব্যাধিগ্রস্ত হন, তখন সে ব্যঙ্গ করে কবিতায় বলে, ‘ফারকুদওয়ানা-এ মহা গযবে তারা পতিত হয়েছে; তাদের জ্বর বা অন্য যা-ই কিছু হোক, তাতে আমার যায় আসে নাকেননা, আমি বসে আছি উচ্চ ফরাশে (ম্যাট্রেস); আর আমার বাহুবন্ধনে আছে উম্মে কুলসুম (এয়াযীদের স্ত্রীদের একজন)

হযরত আমীরে মোয়াবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) যখন এই কবিতার শ্লোক সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন তিনি ইয়াযীদকে শপথ গ্রহণ করতে ও কনস্টানটিনোপোলে সুফিয়ান ইবনে আউফের সাথে যোগ দিতে বাধ্য করেন, যাতে করে সেও ইসলামের মোজাহিদদের মোকাবেলাকৃত কঠিন পরীক্ষার অংশীদার হতে পারে’ (এটি এয়াযীদের প্রতি শাস্তি ছিল)এমতাবস্থায় ইয়াযীদ অসহায় হয়ে পড়ে এবং তাকে যুদ্ধে যেতে হয়; আর হযরত আমীরে মোয়াবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) তার সাথে আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করেন” [’তারিখে ইবনে আল-আসীর’, ৩য় খণ্ড, ১৩১ পৃষ্ঠা]

ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেনঃ আমি বলি, অসংখ্য সাহাবী () হযরত সুফিয়ান ইবনে আউফ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)-এর অধীনে যুদ্ধে গিয়েছিলেন এবং ইয়াযীদ ইবনে মোয়াবিয়ার নেতৃত্বে যান নি, কেননা সে তাঁদেরকে নেতৃত্বদানে অযোগ্য ছিল” [‘উমদাতুল কারী’, শরহে সহীহ আল-বোখারী, ১৪/১৯৭-১৯৮]

কনস্টানটিনোপোলে সেনা অভিযানের সার-সংক্ষেপ নিম্নরূপঃ

* প্রথম আক্রমণ পরিচালিত হয় ৪২ হিজরী সালেদ্বিতীয় দফায় আক্রমণ হয় ৪৩ হিজরীতে এবং এর সেনাপতি ছিলেন হযরত বসর বিন আবি আরকা(রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

* তৃতীয় অভিযান পরিচালনা করা হয় ৪৪ হিজরী সালে এবং এটি নেতৃত্ব দেন আবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালীদপরবর্তী অভিযান ছিল ৪৬ হিজরীতে যার সেনাপতি ছিলেন মালিক বিন আবদির্ রহমান ও আবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালীদ (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)

* ৪৭ হিজরীতে পরবর্তী অভিযান পরিচালনা করেন মালিক বিন হোবায়রা ও আবদুর রহমান বিন কায়েমী (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)৪৯ হিজরী সালে কনস্টানটিনোপোল তিনবার আক্রমণ করা হয়আর সর্বশেষ ৫০ হিজরীতে যে অভিযান পরিচালিত হয় তাতে ইয়াযীদ যোগ দেয়

হযরত আমীরে মোয়াবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ইয়াযীদকে আটক করে সিজারের ওখানে পাঠান, কারণ সে মোজাহিদীনবৃন্দের প্রতি বিদ্রূপ করতোতাই শাস্তিস্বরূপ তাকে ওখানে পাঠানো হয়েছিল, জ্বেহাদের জন্যে নয়

অতএব, ইয়াযীদ সপ্তম সেনা অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল, প্রথম অভিযানে নয় আর বোখারী শরীফে উল্লেখিত হয়েছে, “আমার উম্মতের মধ্যে সিজারের নগরী আক্রমণকারী প্রথম সেনা দলের পাপ-পঙ্কিলতা মাফ করা হবে

রেফারেন্স

আল-বেদায়া ওয়ান্ নেহায়া
ইবনে খালদুনের ইতিহাস
ইমাম ইবনে আসীরের ইতিহাস

১৩/ - এয়াযীদের কুরআন প্রত্যাখ্যান

নিচের রেফারেন্সগুলো দেখুন -

১. আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া ৮ম খণ্ড, ২০৪ পৃষ্ঠা, যিকর রাস আল-হুসাইন
২. মিনহাজ আস্ সুন্নাহ ২য় খণ্ড, ২৪৯ পৃষ্ঠা, যিকর ইয়াযীদ
৩. শরহে ফেকাহে আকবর, ৭৩ পৃষ্ঠা, যিকর ইয়াযীদ
৪. শরহে তাফসীরে মাযহারী, ৫ম খণ্ড, ২১ পৃষ্ঠা, সূরাহ ইবরাহীম
৫. শাযরাহ আল-যাহাব, ৬৯ পৃষ্ঠা, যিকরে শাহাদাতে হুসাইন
৬. মাকাতাহিল হুসাইন ২য় খণ্ড, ৫৮ পৃষ্ঠা, যিকরে শাহাদাতে হুসাইন
৭. তাযকিরায়ে খাওওয়াস, ১৪৮ পৃষ্ঠা
৮. তারীখে তাবারী ১১তম খণ্ড, ২১-২৩ পৃষ্ঠা, যিকর ২৮৪ হিজরী
৯. তাফসীরে রূহুল মাআনী (সূরা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)

১৪/ - তাফসীরে রূহুল মাআনী গ্রন্থটি ইয়াযীদকে কাফের ঘোষণা করে

আল্লামা আলূসী বলেন, ”অপবিত্র ইয়াযীদ নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রেসালতকে অস্বীকার করেছিলমক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারার মুসলমান সর্বসাধারণ এবং নূরে মুজাসসাম সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতাল্লিল আলামিন, শাফিউল মুজনবিন, সায়্যিদুল কাওনাইন, জনাবে মুহাম্মাদ আহাম্মদে মুস্তাফা হাবিবুল্লাহ হুজুরে পাক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিবার সদস্যদের প্রতি যে (অসভ্য ও বর্বর) আচরণ সে করেছিল, তাতে প্রমাণ হয় যে সে কাফের (অবিশ্বাসী) ছিল


এতএব এতসব দলিল আদ্বিল্লার পড়ে যদি কেউ যেনেশুনে এজিদের অনুসারি হয় তাহলে তার ফায়সালা আল্লাহ্‌ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা তিনিই ভালো জানেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ পোষ্ট টা পড়ে যদি ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট বক্স এ আপনার মতামত জানাবেন আর আপনার বন্ধু বান্দব দের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন্নাআসসালামু আলাইকুমফি আমানিল্লাহ !!! আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুজ দান করুন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: