5.25.2015

মহা সম্মানিত পবিত্র লাইলাতুন নিস্ফ মিং শা’বান, ভাগ্য রজনী বা তক্বদির ফায়সালার রাত।


মহা সম্মানিত পবিত্র লাইলাতুল বরাত বা ভাগ্য রজনী সম্পর্কে যারা জানেন না তারা জেনে নিন। পবিত্র শবে বরাত (شب برات) শব্দের অর্থ হচ্ছে মুক্তির রাতবা নাজাতের রাত।পবিত্র শবে বরাত শরীফ হচ্ছে সম্মানিত দ্বীন ইসলামের বিশেষ রাত্রিসমূহের মধ্যে একটি ফযীলতপূর্ণ রাত্র যা পবিত্র শাবান মাস উনার চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত্রিতে উদযাপিত হয়ে থাকে।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘(দুনিয়াতে) পাঁচটি রাত এমন আছে; যে রাতগুলোতে বান্দা দোয়া করলে মহান আল্লাহ তালা ফিরিয়ে দেন না বা এই পাচটি রাত দোয়া কবুলের জন্য খাসঅর্থাৎ বান্দার দোয়া কবুল অবশ্যই করেন যতি তা হালাল দোয়া হয়ে থাকেরাতগুলো হলেনঃ (১) (সপ্তাহিক) জুমুয়াহ শরীফের রাত; (২) রজব শরীফ মাসের প্রথম রাত; (৩) শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত, (৪) ঈদুল ফিতরের রাত এবং (৫) ঈদুল আজহার রাত’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক)।

আর পবিত্র কুরআন শরীফের ভাষায় এই শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত-কে [لَيْلَةٍ مُّبَارَ‌كَةٍ] লাইলাতিম মুবারাকাহ'’ বা বরকতময় রজনীএবং পবিত্র হাদীছ শরীফের ভাষায় পবিত্র শবে বরাত শরীফকে [لَيْلَة النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ] লাইলাতুন নিস্ফ মিং শাবানবা পবিত্র শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতবলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেনঃ [اِنَّا اَنْزَلْنَاه فِـىْ لَيْلَةٍ مُّبَارَ‌كَةٍ ۚ اِنَّا كُنَّا مُنْذِرِ‌يْنَ ◌ فِيْهَا يُفْرَ‌قُ كُلُّ اَمْرٍ‌ حَكِيْمٍ ◌ اَمْرً‌ا مّنْ عِنْدِنَا ۚ اِنَّا كُنَّا مُرْ‌سِلِيْنَ]
অর্থঃ নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনী তে (পবিত্র শবে বরাত শরীফ উনার মধ্যে) পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছি অর্থাৎ নাযিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর আমিই ভয় প্রদর্শনকারী। উক্ত বরকতময় রাত্রিতে আমার পক্ষ থেকে সমস্ত প্রজ্ঞাময় বিষয়গুলো ফায়ছালা করা হয়। আর নিশ্চয়ই আমিই প্রেরণকারী।” (পবিত্র সূরা দুখান শরীফঃ পবিত্র আয়াত শরীফ -)

আর পবিত্র হাদীছ শরীফ এর মধ্যে বর্ণিত রয়েছেঃ [عن ام الـمؤمنين حضرت عائشة عليها السلام قالت فقدت رسول الله صلى الله عليه وسلم ليلة فاذا هو بالبقيع فقال اكنت تـخافين ان يـحيف الله عليك ورسوله قلت يا رسول الله صلى الله عليه وسلم انـى ظننت انك اتيت بعض نسائك فقال ان الله تعالى ينزل لَيْلَة النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ الى السماء الدنيا فيغفر لاكثر من عدد شعر غنم كلب]
অর্থঃ উম্মুল মুমিনীন সাইয়্যিদাতুনা হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে কোন এক রাত্রিতে রাত্রিযাপন করছিলাম। এক সময় উনাকে বিছানা মুবারক- না পেয়ে আমি মনে করলাম যে, তিনি হয়তো অন্য কোন উম্মুল মুমিনীন আলাইহাস সালাম উনার পবিত্র হুজরা শরীফ উনার মধ্যে তাশরীফ মুবারক নিয়েছেন। অতঃপর আমি তালাশ করে উনাকে পবিত্র জান্নাতুল বাক্বীতে পেলাম। সেখানে তিনি উম্মতের জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। অবস্থা দেখে আমি স্বীয় পবিত্র হুজরা শরীফে ফিরে আসলে তিনিও ফিরে এসে আমাকে বললেন, আপনি কি মনে করেছেন, মহান আল্লাহ পাক সুবহানাহূ ওয়া তায়ালা উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা আপনার সাথে আমানতের খিয়ানত করেছেন! আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো অপর কোন হুজরা শরীফ উনার মধ্যে তাশরীফ মুবারক নিয়েছেন। অতঃপর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র শাবান মাস উনার ১৫ তারিখ রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর তিনি বনী কালবের মেষের গায়ে যতো পশম রয়েছে তার চেয়ে অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন।” (তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, রযীন শরীফ, মিশকাত শরীফ)

অতএব প্রমাণিত হলো যে, পবিত্র কুরআন শরীফ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যেই পবিত্র শবে বরাত শরীফ উনার কথা উল্লেখ আছে। তবে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে পবিত্র শবে বরাত শরীফকে [لَيْلَة مُّبَارَ‌كَة] লাইলাতিম মুবারকাহআর পবিত্র হাদীছ শরীফ এর মধ্যে [لَيْلَة النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ] লাইলাতুন নিস্ফ মিং শাবানবলা হয়েছে।

অনেকে বলে থাকে যে, পবিত্র সূরা দুখান শরীফে উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা পবিত্র শবে ক্বদর শরীফ কে বুঝানো হয়েছে। কেননা উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফের মধ্যে বলা হচ্ছে যে, “আমি পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছি....আর পবিত্র কুরআন শরীফ যে পবিত্র শবে ক্বদর শরীফে নাযিল হয়েছে তা পবিত্র সূরা ক্বদর শরীফএর মধ্যেও উল্লেখ আছে।

মূলত যারা উপরোক্ত মন্তব্য করে থাকে তারা নিজের অজ্ঞতা আর ইসলামী জ্ঞান না থাকা এবং পবিত্র সূরা দুখান শরীফএর উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ এর ব্যাখ্যা না জানা না বুঝার কারণেই এমন করে থাকে। মহান আল্লাহ পাক তিনি যে পবিত্র সূরা দুখান শরীফএর মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেছেন, “আমি বরকতময় রজনীতে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছিইহার ব্যাখ্যামূলক অর্থ হলো, “আমি বরকতময় রজনীর মধ্যে পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করার ফায়ছালা করেছি বা বা সিদ্ধান্ত নিয়েছি

আর পবিত্র সূরা ক্বদর শরীফউনার মধ্যে যে ইরশাদ মুবারক করেছেন, “আমি পবিত্র শবে ক্বদর পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করেছিএর ব্যাখ্যামূলক অর্থ হলো, “আমি পবিত্র শবে ক্বদর শরীফ পবিত্র কুরআন শরীফ লাওহে মাহফূয থেকে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে অবস্থিত বাইতুল ইজ্জত উনার মধ্যে একসাথে নাযিল করি

অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনি লাইলাতিম মুবারকাহ বা পবিত্র শবে বরাত শরীফ পবিত্র কুরআন শরীফ নাযিল করার সিদ্ধান্ত নেন আর পবিত্র শবে ক্বদর শরীফে লওহে মাহফূয থেকে বাইতুল ইজ্জত উনার মধ্যে নাযিল করেন।

এজন্যে হযরত মুফাসসিরীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা পবিত্র শবে বরাত শরীফ উনাকে [ليلة التجويز] অর্থাৎ ফায়ছালার রাত আর পবিত্র শবে ক্বদর শরীফ উনাকে [ليلة التنفيذ] অর্থাৎ জারী করার রাত বলে উল্লেখ করেছেন। কেননা পবিত্র শবে বরাত শরীফ উনার মধ্যে যে সকল বিষয়ের ফায়ছালা করা হয় তা পবিত্র সূরা দুখান শরীফ উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফের মধ্যেই উল্লেখ আছে। যেমন ইরশাদ মুবারক হয়েছেঃ [فِيْهَا يُفْرَ‌قُ كُلُّ اَمْرٍ‌ حَكِيْمٍ] উক্ত রাত্রির মধ্যে প্রজ্ঞাসম্পন্ন সব বিষয়ের ফায়ছালা করা হয়।

উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফএর ব্যাখ্যায় পবিত্র হাদীছ শরীফ এর মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছেঃ [فيها ان يكتب كل مولود من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ان يكتب كل هالك من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ترفع اعمالـهم وفيها تنزل ارزاقهم] পবিত্র শবে বরাত শরীফে ফায়ছালা করা হয় কতজন সন্তান আগামী এক বছরে জন্মগ্রহণ করবে এবং কতজন সন্তান মৃত্যুবরণ করবে। রাত্রির মধ্যে বান্দাদের আমলসমূহ উপরে উঠানো হয় অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার শাহী দরবার শরীফ- পেশ করা হয় এবং রাত্রিতে বান্দাদের রিযিকের ফায়ছালা করা হয়।সুবহানাল্লাহ! (বায়হাক্বী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

কাজেই, মহান আল্লাহ পাক তিনি যেহেতু বলেছেন যে, বরকতময় রাত্রি উনার মধ্যে সব কাজের ফায়ছালা করা হয় আর উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও যেহেতু বলেছেন যে, পবিত্র শবে বরাত শরীফ উনার মধ্যেই সব বিষয় যেমন- হায়াত, মউত, রিযিক, আমল ইত্যাদি যা কিছু মানুষের প্রয়োজন হয়ে থাকে তার ফায়ছালা করা হয় সেহেতু বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, “পবিত্র সূরা দুখান শরীফউনার উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ দ্বারা পবিত্র শবে বরাত শরীফকেই বুঝানো হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!

সূরা দুখান - নং পবিত্র আয়াত শরীফ এর মধ্যে বর্ণিত লাইলাতিম মুবারাকাহদ্বারা অনুসরণীয় মুফাসসিরীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা পবিত্র শবে বরাত  শরীফকেই বুঝিয়েছেন যার হাদিসী পরিভাষা লাইলাতুন নিস্ফ মিং শাবান

[لَيْلَة مُّبَارَ‌كَة] পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত ছাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত ইকরামা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা বলেনঃ [هى لَيْلَة النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ وسـمى ليلة الرحـمة لَيْلَةٍ مُّبَارَ‌كَةٍ وليلة الصك] লাইলাতিম মুবারাকাহ দ্বারা লাইলাতুন নিস্ফ মিং শাবান তথা অর্ধ শাবানের রাত (ফার্সি ভাষার পবিত্র শবে বরাত শরীফ) কে বুঝানো হয়েছে এবং নামকরণ করা হয়েছে [لَيْلَةُ الرَّحْـمةُ] (লাইলাতুর রহমাহ) তথা রহমতের রাত, [لَيْلَة مُّبَارَ‌كَة] (লাইলাতিম মুবারাকাহ) তথা বরকতের রাত [لَيْلَةُ الصَّكّ] (লাইলাতুছ ছক) বা ভাগ্য লিপিবদ্ধকরণের রাত তথা ভাগ্য রজনী।

উল্লেখ্য, [ليلة مباركة] (বরকতপূর্ণ রাত) দ্বারা পবিত্র শবে বরাত শরীফ তথা ভাগ্য রজনী উনাকে বুঝানো হয়েছে তার যথার্থ প্রমাণ বহন করে পরবর্তী পবিত্র আয়াত শরীফের মধ্যে [يُفْرَ‌قُ] (বণ্টন করা হয়) শব্দ মুবারক দ্বারা। কেননা তাফসীর জগতের সব তাফসীর শরীফ এর মধ্যে সমস্ত মুফাসসিরীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা [يُفْرَ‌قُ] শব্দ মুবারক উনার তাফসীর করেন [يُكْتَبُ] (লেখা হয়), [يُفَصَّلُ] (ফায়ছালা করা হয়), [يتجوز] (বণ্টন বা নির্ধারণ করা হয়), [يبرم] (বাজেট করা হয়) [فصيلة] (নির্দেশনা দেয়া হয় বা ফায়ছালা করা হয়) ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে।

কাজেই [يُفْرَ‌قُ] শব্দ মুবারক এর অর্থ ব্যাখ্যার দ্বারা আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল যে, [لَيْلَة مُّبَارَ‌كَة] দ্বারা [لَيْلَة النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ] অর্ধ শাবানের রাত, বা শবে বরাত তথা ভাগ্য রজনীকেই বুঝানো হয়েছে। যেই মুবারক রাতের মধ্যে সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্যসমূহ সামনের এক বছরের জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়, আর সেই ভাগ্যলিপি অনুসারে পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাস এর [لَيْلَة الْقَدْرِ‌] বা পবিত্র শবে ক্বদর শরীফের রাত/দিনে তা চূড়ান্ত বা এপ্রুভ করা হয়। এজন্য [لَيْلَة النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ] বা অর্ধ শাবান উনার রাত কে [ليلة التجويز] (নির্ধারণের বা বৈধকরণের রাত) এবং [لَيْلَة الْقَدْرِ‌] উনাকে [ليلة التنفيذ] (নির্ধারিত বিষয় কার্যকরী করার রাত বা বৈধকরণ বিষয় কার্যকরীকরণের রাত) বলা হয়। কিতাব সূত্রঃ (তাফসীরে মাযহারী শরীফ, তাফসীরে খাযিন শরীফ, তাফসীরে রূহুল মায়ানী শরীফ তাফসীরে রূহুল বায়ান শরীফ)

[لَيْلَة مُّبَارَ‌كَةٍ] এর ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর, তাফসীরে মাযহারী শরীফ এর ৮ম খন্ডের ৩৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছেঃ [قال عكرمة هى لَيْلَةِ النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ يبرم فيه امر السنة وينسخ الاحياء من الاموات فلا يزاد فيهم ولا ينقص منهم احد. روى البغوى عن مـحمد بن الـميسرة بن الاخفس ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال يقطع الاجال من شعبان الى شعبان حتى ان الرجل لينكح و يولد له ولقد اخرج اسـمه فى الـموتى.
وروى ابو الضحى عن حضرت ابن عباس رضى الله تعالى عنه ان الله يقضى الاقضية فى لَيْلَةِ النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ ويسلمها الى اربابـها فى لَيْلَةِ الْقَدْرِ]
অর্থঃ হযরত ইকরামা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, (পবিত্র সূরা দুখান শরীফ উনার ৩য় আয়াত শরীফ) [لَيْلَة مُّبَارَ‌كَة] হচ্ছে ১৫ই শাবান উনার রাত অর্থাৎ পবিত্র শবে বরাত শরীফ এর রাত। রাত্র এর মধ্যে সারা বছরের কাজ কর্মের ফায়ছালা করা হয় এবং কতজন জীবিত থাকবে কতজন মারা যাবে তারও ফায়ছালা করা হয়। অতঃপর ফায়ছালার থেকে কোন কিছু বেশি করা হয় না এবং কোন কমতিও করা হয় না। অর্থাৎ কোন প্রকারের পরিবর্তন পরিবর্ধন করা হয় না। হযরত ইমাম বাগবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন, হযরত মুহম্মদ ইবনে মাইসারা ইবনে আখফাস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে; তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, পবিত্র শাবান মাসে পরবর্তী শাবান মাস পর্যন্ত মৃত্যুর ফায়ছালা করে দেয়া হয়। এমনকি লোকেরা যে বিবাহ করবে, সে বছর তার থেকে কতজন সন্তান জন্মগ্রহণ করবে তার তালিকা এবং তার মৃত্যুর তালিকাও প্রস্তুত করা হয় ওই বছরে অর্ধ শাবান এর রাতে অর্থাৎ পবিত্র শবে বরাত শরীফ এর মধ্যে।

হযরত আবূ দ্বহা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বর্ণনায় এসেছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, পবিত্র শাবান উনার মধ্যবর্তী অর্থাৎ ১৫ই শাবান উনার রাতে বা পবিত্র শবে বরাত শরীফ মহান আল্লাহ পাক তিনি সমস্ত কিছুই ফায়ছালা করেন। আর পবিত্র রমাদ্বান শরীফ পবিত্র ক্বদর শরীফ রাতে সে ফায়ছালার বাস্তবায়ন করার জন্য বাস্তবায়নকারীদের কাছে অর্পণ করেন।সুবহানাল্লাহ!
তাফসীরে মাযহারী শরীফ উনার ৮ম খন্ডের ৩৬৭ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছেঃ [انـها لَيْلَة النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ ... وما روى عن القاسم بن مـحمد عن ابيه او عمه عن جده عن رسول الله صلى الله عليه وسلم انه قال ينزل الله جل ثناؤه لَيْلَةِ النّصْف مِنْ شَعْبَانَ الى السماء الدنيا فيغفر لكل نفس الا انسانا فى قلبه شحناه او مشركا بالله]
অর্থঃ অনেকেই বলেছেন [لَيْلَة مُّبَارَ‌كَة] তথা বরকতপূর্ণ রাতই হচ্ছে অর্ধ শাবান উনার রাত (১৫ই শাবান উনার রাত) এবং রাত উনার বুযূর্গী সম্পর্কে পবিত্র হাদীছ শরীফের মধ্যে বর্ণিত আছে, হযরত মুহম্মদ ইবনে কাসিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পিতার মাধ্যমে অথবা উনার চাচার মাধ্যমে বর্ণনা করেন। উনার পিতা অথবা চাচা উনার পিতামহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি আবার নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে বর্ণনা করেছেন। আর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, অর্ধ শাবান (১৫ই শাবান) উনার রাতে মহান আল্লাহ পাক তিনি পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন অর্থাৎ রহমতে খাছ নাযিল করেন। তবে ওই সব লোকদের ক্ষমা করেন না, যাদের অন্তরে হিংসা রয়েছে অর্থাৎ হিংসুকদের এবং মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে শরীককারীদের তথা মুশরিকদেরকে ওই অর্ধ শাবান বা পবিত্র শবে বরাত শরীফ উনার মধ্যে ক্ষমা করেন না।” (তাফসীরে বাগবী শরীফ)

বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে মাযহারী শরীফউনার ১০ম খন্ডে উল্লেখ আছে যেঃ [قيل (للحسين بن الفضل) فما معنى لَيْلَةِ الْقَدْرِ‌ قال سوق الـمقادير الى الـمواقيت وتنفيذ القضاء الـمقدر يعنى اطلاع الـملائكة الـموكلة على الامور فى تلك الليل ما قدر الله تعالى امر السنة فى عباده وبلاده الى السنة المقبلة و قال عكرمة تقدير الـمقادير وابرم الامور فى لَيْلَةِ النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فيها ينسخ الاحياء من الاموات فلا يزداد فيهم ولا ينقص منهم ويؤيده مارواه البغوى ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال يقطع الاجال من شعبان الى شعبان حتى ان الرجل لينكح ويولد له ولقد خرج اسـمه فى الـموتى قبت لعل تقدير الـمقادير بنحو من الانـجاء او بعضها فى لَيْلَةِ النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ وتقديرها كلها وتسليمها الى اربابـها انـما هو فى لَيْلَة الْقَدْرِ‌
وروى ابو الضحى عن ابن عباس رضى الله تعالى عنه ان الله يقضى الاقضية لَيْلَةِ النّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ ويسلمها الى اربابـها فى لَيْلَةِ الْقَدْرِ‌ كذا ذكر البغوى وقال الزهرى سـميت بـها للعظمة والشرف قال الله تعالى وما قدرو الله حق قدره اى ما عظموه وقيل لان العمل الصالـح فيه يكون اذا قدر عند الله] হযরত হাসান ইবনে ফদ্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে পবিত্র ক্বদর শরীফ উনার রাত বা পবিত্র শবে ক্বদর শরীফ উনার অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জবাবে বলেন, স্থিরকৃত ফায়ছালাকে তার নির্ধারিত সময়ের দিকে পরিচালনা এবং নির্ধারিত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন বা জারী করার রাতই হচ্ছে পবিত্র ক্বদর শরীফ এর রাত। অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনি বান্দাদের আগামী এক বছরের যাবতীয় কিছুই ১৫ই শাবানের রাত বা পবিত্র শবে বরাত শরীফে নির্ধারণ বা ফায়ছালা করেন, আর পবিত্র শবে ক্বদর শরীফ উনার মধ্যে সে নির্ধারিত বিষয়সমূহকে বাস্তবায়ন করার জন্য বাস্তবায়নকারী ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের হাতে অর্পণ করেন।

হযরত ইকরামা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, পূর্বে স্থিরকৃত যাবতীয় বিষয়গুলোর যথাসময়ে নির্ধারণ এবং যাবতীয় বিষয়ের ফায়ছালা হয়ে থাকে অর্ধ শাবান বা ১৫ই শাবান উনার রাত (পবিত্র শবে বরাত শরীফ) এবং আরো তালিকা প্রস্তুত করা হয় মৃত জীবিতদের। এই তালিকা থেকে কোন বৃদ্ধিও করা হয় না এবং কোন কমতিও করা হয় না অর্থাৎ ওই তালিকার কোন পরিবর্তন করা হয় না। হযরত ইকরামা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার উক্তির সমর্থনে হযরত বাগবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয় যে, সেখানে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “এক অর্ধ শাবান হতে পরবর্তী বছরের অর্ধ শাবান পর্যন্ত মৃত্যুর তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এমনকি ব্যক্তির বিবাহ এবং সে বছর তার কি সন্তান জন্মলাভ করবে এবং সে বছর কখন মৃত্যুবরণ করবে তার যাবতীয় তালিকাও প্রস্তুত করা হয় পবিত্র শবে বরাত শরীফ উনার মধ্যে। তাদেরও নাম থাকে যারা ওই সময়ে বিবাহ করার পর ইন্তিকাল করবে।

গ্রন্থকার বলেন, আমি উভয়ের পূর্ণ বা আংশিক সামঞ্জস্যে বলি, সম্ভবত নির্ধারিত বিষয়ের ন্যূনতম পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হয় অর্ধ শাবান বা ১৫ই শাবান উনার রাতে আর পবিত্র ক্বদর শরীফের মুবারক রাতে নিশ্চিতরূপে বাস্তবায়ন করার জন্য তালিকা পেশ করা হয় বাস্তবায়নকারী ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের হাত মুবারক-এ। অর্থাৎ পবিত্র শবে বরাত শরীফে সমস্ত কিছু ফায়ছালা করা হয়। আর পবিত্র ক্বদর শরীফে জারী বা কার্যকরীকরণের জন্য তালিকা কার্যকরী ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের হাতে অর্পণ করা হয়।

কেননা প্রসঙ্গে হযরত আবূ দ্বহা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বর্ণনায় এসেছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, অর্ধ শাবানের রাত অর্থাৎ পবিত্র শবে বরাত শরীফে মহান আল্লাহ পাক তিনি সব বিষয়ের ফায়ছালা অর্থাৎ তালিকা প্রস্তুত করেন। আর পবিত্র ক্বদর শরীফের রাতের মধ্যে তা কার্যকরী করার জন্য ওই তালিকা অর্পণ করেন বাস্তবায়নকারী ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের হাত মুবারক-এ। এরূপ পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেন মুফাসসিরকুল শিরোমণি ইমাম হযরত বাগবী রহমতুল্লাহি আলাইহি।

ইমাম যুহরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, লাইলাতুল ক্বদর (মহিমান্বিত রাত) নামকরণ করা হয়েছে উনার শ্রেষ্ঠত্ব মহিমা অনুসারে। যেমন মহান আল্লাহ পাক তিনি (পবিত্র সূরা আনয়াম শরীফ উনার ৯১তম পবিত্র আয়াত শরীফের মধ্যে) বলেন, [وَمَا قَدَرُواْ اللّهَ حَقَّ قَدْرِهِ] তারা মহান আল্লাহ পাক উনাকে যথার্থ তাযীম তথা সম্মান মুবারক দেয়নি। অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনি যেমন মহান মর্যাদা মুবারক মর্তবা মুবারক পাওয়ার অধিকারী সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। (এখানে ক্বদর শব্দ মুবারক অর্থ হল মহত্ত্ব বা মর্যাদা)কাজেই, যারা বলে থাকে পবিত্র সূরা ক্বদর শরীফ উনার মধ্যে যে [لَيْلَة الْقَدْرِ‌] শব্দগুলো উল্লেখ আছে তার দ্বারা শুধু ভাগ্য রজনী উনাকে বুঝানো হয়েছে অন্য কোন রাত্রিকে ভাগ্য রজনী হিসেবে সাব্যস্ত করা যাবে না। তাদের এরূপ উক্তি মোটেও শুদ্ধ নয়। বরং চরম জিহালতপূর্ণ কথা। অথচ উল্লিখিত তাফসীর শরীফের আলোকে জানা গেল যে, [لَيْلَة الْقَدْرِ] বলতে এখানে সম্মানিত মহিমান্বিত রাত্রিকে বুঝানো হয়েছে। যা পবিত্র রমাদ্বান শরীফের শেষের দশ দিনের বিজোড় রাত্রির মধ্যে নিহিত। তাই সুস্পষ্টভাবে বুঝা গেল যে, পবিত্র সূরা ক্বদর শরীফ [لَيْلَة الْقَدْرِ‌] লফয দ্বারা ভাগ্য রজনী বা ভাগ্য নির্ধারণের রাত নয়। বরং মহিমান্বিত বা মর্যাদার রাত। কেননা পবিত্র ক্বদর শরীফ রাতে নেক মল মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে মর্যাদাপূর্ণ।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: