6.01.2016

তারাবির নামাজ কি ৮ রাকাত না ২০ রাকাত? সুন্নাহ কি বলে?

তারাবির নামাজ কি ৮ রাকাত না ২০ রাকাত? সুন্নাহ কি বলে?
তারাবির নামাজ কি ৮ রাকাত না ২০ রাকাত? সুন্নাহ কি বলে?

পবিত্র রমযান মাসে তারাবীর নামায কতো রাকাত পড়তে হয়, তা নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে বর্তমানে তাই মুসলমানদের ভালো করে জানা আবশ্যক যে বিগত ১৪শ বছর ধরে মুসলিম উম্মাহ ন্যূনতম ২০ রাকাত তারাবী নামায পড়ে আসছেন (এমনকি হারামাইন শরীফাইনেও) নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, উনার সাহাবায়ে কেরাম (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম), তবে তাবেঈন ও পূর্ববর্তী উলামা (রহমতুল্লাহি আলাইহিমগন) উনাদের যুগ থেকে এটি চলে আসছিলো; কিন্তু হেজাযে একটি নতুন ফেরকাহর উৎপত্তি-ই মুসলমানদের এতদসংক্রান্ত ঐক্যকে বিনষ্ট করেছেওই ফেরকাহর সম্বল একটিমাত্র হাদীস শরিফ যা তাহাজ্জুদনামায-সম্পর্কিত; কিন্তু তারা এটাকে তারাবির নামাজের হাদিস শরিফ বলে এই হাদীস শরিফের অপব্যাখ্যা করে তারাবীর নামাজেরস প্রতি আরোপ করে থাকে এবং মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করে ধোঁকা দিতে চায়কিন্তু তারাবীর নামায যে ২০ রাকআত, তা অজস্র দলিলের আলোকে আমরা নিচে দেখে নিব

তারাবীহ নামাযের ২০ রাকাতের পক্ষে একচেটিয়া দলিল প্রদর্শনের আগে আমরা দেখাবো যে ইসলামী শরীয়তে সুন্নাহশব্দটির ব্যাখ্যা একটি সহীহ হাদীস শরিফে কীভাবে এসেছেবিভ্রান্ত ফেরকার কিছু লোক তারাবীর নামাযের ব্যাপারটিতে নিজেদের অপযুক্তি খণ্ডন হতে দেখে আর কোনো উপায় না পেয়ে বলে, হযরত উমর (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ও অন্যান্য সাহাবা (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম)-বৃন্দের ধর্ম অনুশীলন এক কথা, আর নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার ধর্মচর্চা একদম আলাদা বিষয়আরেক কথায়, তারা সাহাবা-এ উনাকেরাম (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) গনকে নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার সাথে ভিন্নমত পোষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। (নাউযুবিল্লাহ)
কিন্তু এই অভিযোগকারীদের অবাক করে নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ মোবারক করেনঃ তোমরা আমার সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো এবং আমার সঠিক পথের অনুসারী খলীফাবৃন্দের(আবু বকর, উসমান, উমর, আলি রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগনের) সুন্নাহকেও” [সুনানে আবু দাউদ, ২য় খণ্ড, ৬৩৫ পৃষ্ঠা, সুনানে তিরমিযী, ২য় খণ্ড, ১০৮ পৃষ্ঠা, সুনানে দারিমী, ১ম খণ্ড, ৪৩ পৃষ্ঠা, ইবনে মাজাহ ও অন্যান্য]
দলিল-১: হযরত সাঈব ইবনে ইয়াযীদ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বলেন, “খলীফা হযরত উমর ফারূক (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার আমলে (রমযান মাসে) মুসলিম উম্মাহ ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামায এবং বিতরের নামাযও পড়তেন” [ইমাম বায়হাকী প্রণীত মারেফত-উস-সুনান ওয়াল্ আসার’, ৪র্থ খণ্ড, ৪২ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৫৪০৯]

ইমাম বায়হাকী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) অপর এক সনদে অনুরূপ একখানি রওয়ায়েত লিপিবদ্ধ করেছেনহযরত সাঈব ইবনে ইয়াযীদ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বলেন, “খলীফা হযরত উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার শাসনামলে রমযান মাসে মুসলমানগণ ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামায পড়তেনতিনি আরও বলেন, “তাঁরা মিঈন পাঠ করতেন এবং খলীফা হযরত উসমান ইবনে আফফান (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার শাসনামলে (নামাযে) দণ্ডায়মান থাকার অসুবিধা থেকে স্বস্তির জন্যে তাঁরা নিজেদের লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতেন” [ইমাম বায়হাকী রচিত সুনান আল-কুবরা’, ২য় খণ্ড, ৬৯৮-৯ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৪৬১৭] ইমাম নববী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, “এটির এ সনদ সহীহ”  [‘আল-খুলাসাতুল আহকাম’, হাদীস নং ১৯৬১]
ইমাম বদরুদ্দীন আয়নী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, “ইমাম বায়হাকী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) সহীহ সনদে সাহাবী হযরত সাঈব ইবনে ইয়াযীদ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে খলীফা হযরত উমর ফারূক (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার শাসনামলে মুসলিম উম্মাহ ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামায পড়তেন এবং তা খলীফা হযরত উসমান (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার শাসনামলেও প্রচলিত ছিলো” [উমদাতুল ক্কারী শরহে সহীহ আল-বোখারী’, ৫ম খণ্ড, ২৬৪ পৃষ্ঠা; দারুল ফিকর, বৈরুত, লেবানন হতে প্রকাশিত]
সালাফী আলেম আল-মোবারকপুরীও এই হাদীসটির সনদকে সহীহবলেছে এবং এর পক্ষে ইমাম নববী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার সমর্থনের কথা উদ্ধৃত করেছে [’তোহফাতুল আহওয়াযী’, ৩য় খণ্ড, ৪৫৩ পৃষ্ঠা; দারুল ফিকর, বৈরুত, লেবানন থেকে প্রকাশিত] ইমাম নববী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, “এই এ সনদে সকল রাবী তথা বর্ণনাকারী সিকাবা নির্ভরযোগ্য” [‘আসার আল-সুনান’, ২:৫৪]
দলিল-২: ইয়াহইয়া আমার (ইমাম মালেক) কাছে মালেক হতে বর্ণনা করেন যে এয়াযীদ ইবনে রুমান বলেছেন, “খলীফা হযরত উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার শাসনামলে মুসলমানবৃন্দ রমযান মাসের (প্রতি) রাতে ২৩ রাকআত (তারাবীহ ২০ ও বিতর ৩) নামায পড়তেন [ইমাম মালেক প্রণীত মুয়াত্তা মালেক’, সালাত অধ্যায়, মা জাআ ফী কায়ামে রমযান, ১ম খণ্ড, ১৫৯ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৩৮০]

ইমাম তিরমিযী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার অভিমত: ইসলামী জ্ঞান বিশারদদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে একমত হয়েছেন যে (তারাবীহ) নামায ২০ রাকআত, যা হযরত উমর ফারূক (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম), হযরত আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াযহু আলাইহিস সালাম) এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার অন্যান্য সাহাবা-এ উনাকেরাম (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) থেকে বর্ণিত হয়েছেহযরত সুফিয়ান সাওরী (রহমতুল্লাহি আলাইহি), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এবং ইমাম শাফেঈ (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-ও অনুরূপ মত পোষণ করেছেনইমাম শাফেঈ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন তিনি মক্কার অধিবাসীদেরকে ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামায পড়তে দেখেছেন [‘সুনানে জামেঈ আল-তিরমিযী’, রোযা সংক্রান্ত বই, রমযানের নামায অধ্যায়, ৩য় খণ্ড, ১৬৯ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৮০৬]

দলিল-৩: হযরত আবদুল আযীয বিন রাফিহতে বর্ণিত, তিনি বলেন: হযরত উবাই ইবনে কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) মদীনা মোনাওয়ারায় রমযান মাসে ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামাযের জামাতে ইমামতি করতেন [মোসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ৫ম খণ্ড, ২২৪ পৃষ্ঠা, ৭৭৬৬ নং হাদীস]

দলিল-৪: আবদুর রহমান সুলামী বর্ণনা করেন যে হয়রত আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াযহু আলাইহিস সালাম) রমযান মাসে কুরআন মজীদ তেলাওয়াতকারী হাফেযদের ডেকে তাদের মধ্যে একজনকে ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামায পড়াতে বলেছিলেন এবং নিজে বিতরের নামাযে ইমামতি করতেন। [ইমাম বায়হাকী কৃত সুনান আল-কুবরা’, ২য় খণ্ড, ৬৯৯ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৪৬২০]

দলিল-৫: হযরত হাসান বসরী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেনঃ খলীফা উমর ফারূক (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) রমযান মাসের (তারাবীহ) নামাযে হযরত উবাই ইবনে কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) উনার ইমামতিতে মানুষদেরকে জামাতে কাতারবদ্ধ করেন এবং তিনি (ইবনে কাব) ২০ রাকআত নামায পড়ান” [‘সিয়ার আল-আলম ওয়াল নুবালাহ’, ১ম খণ্ড, ৪০০-১ পৃষ্ঠা, হযরত উবাই ইবনে কাব (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার জীবনী] ইমাম নববী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ওপরের বর্ণনা সম্পর্কে বলেন: এর সনদ সহীহ” [‘আল-খুলাসাত আল-আহকাম’, হাদীস নং ১৯৬১]

দলিল-৬: হযরত আবূল হাসনা বর্ণনা করেন যে হয়রত আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াযহু আলাইহিস সালাম) জনৈক ব্যক্তিকে রমযান মাসে ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামাযে ইমামতি করার নির্দেশ দেন” [’মোসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা’, ৫ম খণ্ড, ২২৩ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৭৭৬৩]

দলিল-৭: হযরত নাফেইবনে উমর (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে ওয়াকীবর্ণনা করেন, তিনি বলেন: হযরত ইবনে আবি মুলাইকা (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) রমযান মাসে আমাদের জামাতের ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামাযে ইমামতি করতেন” [মোসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ৫ম খণ্ড, ২২৩ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৭৭৬৫]

দলিল-৮, ৯ ও ১০ এবং ভ্রান্তদের হাদীস অপপ্রয়োগের বিস্তারিত খণ্ডন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) বর্ণনা করেন যে নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে (প্রতি রাতে) নিজে নিজে ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামায আদায় করতেন এবং এরপর ৩ রাকআত বেতরের নামাযও পড়তেন  [‘সুনান আল-বায়হাকী, হাদীস নং ১২১০২]

হযরত ইবনে আব্বাস (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বর্ণনা করেন যে নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে ২০ রাকআত (তারাবীহ) নামায আদায় করতেন এবং এরপর ৩ রাকাত বেতরের নামাযও আদায় করতেন। [মোসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা’, ২য় খণ্ড, হাদীস নং ৭৬৯২]

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহাস সালাম) থেকে বর্ণিত, নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই রাতে ২০ রাকআত নামায মানুষের সাথে আদায় করেন; কিন্তু তিনি তৃতীয় রাতে আর বের হননিতিনি বলেন, আমি আশংকা করি যে এটি তোমাদের (সাহাবা-এ উনাকেরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন) প্রতি আবার বাধ্যতামূলক(ফরজ) না হয়ে যায় [ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) কৃত আল-তালখীস আল-হাবীর’, ২য় খণ্ড, হাদীস নং ৫৪০]

বিঃদ্রঃ ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এই হাদীস উদ্ধৃত করার পরে বলেন, “সকল মোহাদ্দেসীন (হাদীসের বিশারদ) হযরত আয়েশা (আলাইহাস সালাম) হতে এই বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন, তবে রাকআতের সংখ্যার ক্ষেত্রে নয়

আহলুল বেদআহ (বেদআতী গোষ্ঠী) আনন্দে আটখানা হয়ে বলে, দেখো, ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এই হাদীসটিকে সহীহ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু রাকআতের সংখ্যার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেননিঅতএব, তারাবীহর নামাযের রাকআতের সংখ্যা কতো তা প্রতিষ্ঠিত নয়
জবাব: প্রথমতঃ ইমাম ইবনে হাজর (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার এই কথা আমাদের বিরুদ্ধে নয়, বরং বেদআতীদের বিরুদ্ধে যায়কেননা, তারাবীহ নামায ২০ রাকআত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পক্ষে আমাদের কাছে একচেটিয়া দালিলিক প্রমাণ আছেঅথচ তারা দুটো দলিলকে বিকৃত করে কপটতার সাথে দাবি করে যে তারাবীহর নামায মাত্র ৮ রাকআত

তারাবীহ নামায সম্পর্কে বেদআতীদের প্রদর্শিত মূল দলিল হচ্ছে বোখারী শরীফের একখানা হাদীস, যাতে বিবৃত হয়েছে:

সহীহ বোখারী, তাহাজ্জুদ-বিষয়ক বই, ২য় খণ্ড, ২১তম বই, হাদীস নং ২৪৮ 
হযরত আবূ সালমা বিন আবদির রহমান (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) হতে বর্ণিত; তিনি বলেনঃ আমি মা আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহাস সালাম) উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার নামায কেমন ছিল? তিনি জবাবে বলেনআল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান, বা অন্যান্য মাসে কখনোই এগারো রাকআতের বেশি নামায পড়েন নি; তিনি চার রাকআত পড়তেন, সেগুলোর সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করো না; অতঃপর চার রাকআত পড়তেন, সেগুলোর সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য সম্পর্কেও আমাকে প্রশ্ন করো না; এবং এরপর তিনি তিন রাকআত নামায পড়তেনমা আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহাস সালাম) আরও বলেন, “আমি বল্লাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! বেতরের নামায পড়ার আগে কি আপনি ঘুমোন? তিনি উত্তরে বলেন, ’ওহে আয়েশা! আমার চোখ ঘুমোয়, কিন্তু আমার অন্তর (কলব্) জাগ্রত থাকে
সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন যে কেউই এখানে স্পষ্ট দেখতে পাবেন যে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহিস সালাম) তাহাজ্জুদ নামায সম্পর্কে আলোচনা করছিলেনকেননা, তিনি বলেন, বা অন্যান্য মাসে; অথচ সালাতুত্ তারাবীহ হলো শুধু রমযান মাসের জন্যেই নির্ধারিত নামাযযদিও আমরা এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করতে পারি এবং সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে পারি যে উপরোক্ত হাদীস শরীফ সুনির্দিষ্টভাবে তাহাজ্জুদ নামাযকে উদ্দেশ্য করেছে এবং তারাবীহ নামাযকে করেনি, তথাপি আমরা আরেকটি বিষয়ের দিকে এক্ষণে মনোযোগ দিতে আগ্রহীএই হাদীসটি ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার ওপরে উদ্ধৃত সিদ্ধান্তের আওতায় পড়ে, অর্থাৎ, “সকল মোহাদ্দেসীন (হাদীসের বিশারদ) হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহাস সালাম)  হতে এই বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন, তবে রাকআতের সংখ্যার ক্ষেত্রে নয়

এবার আমরা সহিহ (বোখারী ও মুসলিম) হতে দালিলিক প্রমাণগুলো যাচাই করবো
সহীহ বোখারী, ২য় খণ্ড, ২১তম বই, হাদীস নং ২৬১ 
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহাস সালাম) হতে বর্ণিত; তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের নামাযে তেরো রাকআত পড়তেন এবং ফজরের নামাযের আযান শোনার পর তিনি দুই রাকআত (হাল্কা, দীর্ঘ নয়) নামায আদায় করতেন

এই হাদীস প্রমাণ করে তাহাজ্জুদ (বেতর ছাড়াই) অন্ততপক্ষে ১০-১২ রাকআত-বিশিষ্ট নামাযঅথচ এই বেদআতীরা ৮ রাকআতকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার সুন্নাহ হিসেবে মনে করেএই কারণেই ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহাস সালাম) থেকে উপরোক্ত ২০ রাকআতের বর্ণনাসম্বলিত হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, কিন্তু রাকআতের সংখ্যার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেন নি

সহীহ বোখারী, ২য় খণ্ড, ২১তম বই, হাদীস নং ২৪০

মাসরুখ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বর্ণনা করেন, আমি মা আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহাস সালাম) উনাকে নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার রাতের নামায সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “ফজরের দুই রাকআত (অর্থাৎ সুন্নাহ) ছাড়াও ওই নামায ছিল সাত, নয় বা এগারো রাকআত-বিশিষ্ট
এটিও হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহাস সালাম) উনার হাদীস শরিফ এদতেরাব প্রমাণ করে (মানে সাত, নয়, নাকি এগারো তা স্থিরকৃত নয়); আর তারাবীহ কখনোই ৮ রাকআত বলে বিবেচনা করা যায় না, কারণ এর ২০ রাকআত হবার ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে

সহীহ মুসলিম, ৪র্থ বই, হাদীস নং ১৬১১

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (আলাইহাস সালাম) থেকে বর্ণিত যেরাতে রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার আদায়কৃত নামাযে রাকআত সংখ্যা ছিল দশতিনি বিতরের নামায এবং ফজরের দুই রাকআত (সুন্নাত) নামাযও আদায় করতেনআর এর যোগফল হচ্ছে তেরো রাকআত

সহীহ মুসলিম, ৪র্থ বই, হাদীস নং ১৬৮৬

আবূ জামরা (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বর্ণনা করেন: আমি হযরত ইবনে আব্বাস (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনাকে বলতে শুনেছি যে নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে তেরো রাকআত নামায পড়তেন

সহীহ মুসলিম, ৪র্থ বই, হাদীস নং ১৬৮৭

হযরত যায়দ বিন খালেদ আল-জুহানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন: নিশ্চয় আমি নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আদায়কৃত রাতের নামায প্রত্যক্ষ করতামতিনি প্রথমে সংক্ষিপ্ত দুই রাকআত নামায পড়তেন; অতঃপর দীর্ঘ, অতি দীর্ঘ দুই রাকআত পড়তেন; এর পরের দুই রাকআত পূর্ববর্তী দুই রাকআতের চেয়ে সংক্ষিপ্ত ছিল; পরবর্তী যে দুই রাকআত পড়তেন, তা আরও সংক্ষিপ্ত; তৎপরবর্তী দুই রাকআত আরও সংক্ষিপ্ত; এর পরে আরও দুই রাকআত পড়তেন যা আরও সংক্ষিপ্ত ছিল অতঃপর তিনি একটি রাকআত (বিতর) পড়তেন, যা সর্বসাকুল্যে তেরো রাকআত নামায হতো
ওপরে প্রদর্শিত আমাদের ৮ এবং ৯ নং দলিল, যার মধ্যে রয়েছে হযরত ইবনে আব্বাস (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) কর্তৃক সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রদত্ত ২০ রাকআত তারাবীহ নামাযের বর্ণনা, উভয় বর্ণনাতেই অবশ্য আবূ শায়বাহ (মহান মুহাদ্দীস ইবনে আবি শায়বাহর বাবা) নামে একজন রাবী (বর্ণনাকারী) আছেন যাঁর নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে মতভেদ রয়েছেঅধিকাংশ মুহাদ্দেসীন তাঁকে দুর্বলবিবেচনা করেছেনএমতাবস্থায় এই সকল বেদআতী লোকেরা আবারও আনন্দে লাফ দিয়ে বলে ওঠে যে আবূ শায়বাহ দুর্বল; তাই ২০ রাকআত তারাবীহ হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়তাদের কথার সমর্থনে তারা নিম্নের হাদীসটি প্রদর্শন করে:
হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বর্ণনা করেন, “নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে (এক রাতে) আট রাকআত ও বেতরের নামাযে ইমামতি করেনপরবর্তী রাতে আমরা মসজিদে সমবেত হই এই আশায় যে তিনি আবারও ইমামতি করার জন্যে বেরিয়ে আসবেনআমরা সেখানে সকাল পর্যন্ত অবস্থান করিঅতঃপর আমরা মসজিদের মাঝখানে এসে আরয করি, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা গত রাতে মসজিদে অবস্থান করেছি এই আশায় যে আপনি নামাযে ইমামতি করবেনপ্রত্যুত্তরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান, ‘নিশ্চয় আমি আশংকা করেছি এটি তোমাদের প্রতি অবশ্য পালনীয় না হয়ে যায়” [ইবনে খুযাইমাহ (২:১৩৮, হাদীস # ১০৭০), ইমাম তাবারানী কৃত মুআজম আস্ সাগীর (১:১৯০) এবং অন্যান্যরা]

এই বেদআতীরা নিজেদের হীন স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে যে কোনো হাদীসকে যয়ীফ (দুর্বল) ঘোষণা করতে মোটেও দেরি করে নাএখন আমরা হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) হতে জাল হাদীস বর্ণনাকারী সম্পর্কে আল-জারহ ওয়াত্ তাদীল-বৃন্দ কী বলেছেন তা দেখবো
এই হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী ঈসা ইবনে জারিয়াহ; মহান মোহাদ্দেসীনবৃন্দ ও আল-জারহ ওয়াত্ তাদীল-মণ্ডলীর অভিমত নিচে পেশ করা হলোঃ

হযরত ইয়াহইয়া বিন মঈন (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন: এই লোক কেউই নয় এবং সে যার কাছ থেকে হাদীস নিয়েছে এমন বর্ণনাকারীদের মধ্যে ইয়াকুব (শিয়াপন্থী) ছাড়া আর কাউকে আমি জানি না। [তাহযিবুত্ তাহযিব, ৪:৫১৮]

ইমাম আল-মিযযী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) প্রণীত তাহযিবুল কামালগ্রন্থে ইমাম আবূ দাউদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার বাণীও বিধৃত হয়েছে, যেখানে তিনি ঈসাকে মুনকার আল-হাদীস ঘোষণা করেনযথা, আবূ উবায়দ আল-আজরী ইমাম আবূ দাউদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার কথা উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন যে ঈসা বিন জারিয়াহমুনকার আল-হাদীস। [তাহযিব আল-কামাল, ১৪তম খণ্ড, ৫৩৩ পৃষ্ঠা]

ইমাম নাসাঈ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) নিজ দুআফা ওয়াল মাতরুকীনগ্রন্থে বলেন, “ঈসা বিন জারিয়াহ হাদীস গ্রহণ করেছে (শিয়া বর্ণনাকারী) ইয়াকুব আল-কুম্মী হতে; আর সে (ঈসা) হচ্ছে মুনকার” [ইমাম নাসাঈ কৃত দুআফা ওয়াল মাতরুকীন, ২:২১৫]

অতএব, ছয়টি বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হাদীসগ্রন্থের মধ্যে দুটির রচয়িতা (ইমাম আবূ দাউদ ও ইমাম নাসাঈ) ওই বর্ণনাকারীকে মুনকারুল হাদীসঘোষণা করেছেন বলে সপ্রমাণিত হলো
ঈসা বিন জারিয়াহ সম্পর্কে অন্যান্য উলামা-এ উনাকেরাম যা বলেছেন, তা নিম্নরূপ:
ইমাম আল-সাযী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ও ইমাম আল-উকাইলী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) দুআফা’ (দুর্বল/অ-নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী) উনার তালিকায় ঈসাকে উল্লেখ করেন
ইমাম ইবনে আদী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, তার বর্ণিত আহাদীস মাহফূয নয়। [তাহযিবুত্ তাহযিব, ৪:৫১৮]

ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) স্বয়ং বলেন, ঈসা বিন জারিয়াহ লাঈন’ (দুর্বলতাপ্রবণ, অর্থাৎ, অ-নির্ভরযোগ্য)। [তাকরিবুত্ তাহযিব, ১:৭৬৮]
এমন কি আলবানী ও হুসাইন সালীম আসাদের মতো শীর্ষস্থানীয় বাতিল-সালাফীরাও ঈসা বিন জারিয়াহ বর্ণিত এই হাদীসটিকে যয়ীফ বলেছেযেমন হুসাইন সালীম আসাদ মুসনাদে আবি এয়ালাগ্রন্থের নিজস্ব ব্যাখ্যামূলক তাহকীকপুস্তকে বলে, এর সনদ দুর্বল। [তাহকীক, ৩:৩৩৬, দারুল মামূন, দামেশক থেকে প্রকাশিত]

সুতরাং পরিদৃষ্ট হচ্ছে যে আল-জারহ ওয়াত্ তাদীল তথা হযরত এয়াহইয়া বিন মঈন (রহমতুল্লাহি আলাইহি), ইমাম নাসাঈ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ও ইমাম আবূ দাউদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার মতো কর্তৃত্বসম্পন্ন মহান উলামাবৃন্দ ঈসাকে দায়ীফ-ই শুধু নয়, বরং মুনকারুল হাদীস-ও বলেছ্নেএমতাবস্থায় সালাফীদের প্রদর্শিত এই বর্ণনাটি মওযুবা জাল বলেই সাব্যস্ত হয়!
উপমহাদেশে পরিচিত সালাফীআলেম মওলানা আবদুর রহমান মোবারকপুরী (মৃত্যু: ১৩৫৩ হিজরী) লিখেছে, যে বর্ণনাকারী (রাবী) মুনকারুল হাদীস বলে জ্ঞাত, তার বর্ণিত সমস্ত আহাদীস-ই প্রত্যাখ্যানযোগ্য। [এবকারুল মতন, ১৯১ পৃষ্ঠা]

অতএব, হযরত ইবনে আব্বাস (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ও হযরত জাবের (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বর্ণিত উভয় হাদীসই বড় জোর দুর্বল (শেষোক্ত জনের বর্ণনাটি বানোয়াট বলে প্রমাণিত); অধিকন্তু, ইমাম আবূ দাউদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার প্রদত্ত নিম্নের উসূলে হাদীসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী হযরত ইবনে আব্বাস (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার বর্ণিত হাদীসটি মকবূল বা গৃহীত বলে সাব্যস্ত হয়ইমাম আবূ দাউদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) একখানি হাদীস বর্ণনার পরে বলেন, যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত দুটি হাদীসের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা দেখা যায়তাহলে আমরা সেই রীতি গ্রহণ করি যেটি সাহাবা-এ কেরাম কর্তৃক সমর্থিত  [সুনানে আবি দাউদ, হাদীস নং ১৫৭৭ উনার অধীন]

এমতাবস্থায় হযরত ইবনে আব্বাস (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) হতে বর্ণিত হাদীসটি সমর্থিত হয়েছে, কেননা তা হযরত উমর (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু), হযরত উবাই বিন কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ও অন্যান্য আরও অনেকের বর্নিত হাদীসের সাথে মিলে যায়ওহাবীরা অবশ্য ইমাম মালেক (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার মুয়াত্তা মালেকহতে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে আরেকটি রেওয়ায়েত প্রদর্শন করে থাকেকিন্তু এই বর্ণনাটি হযরত উবাই বিন কাআব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার ২০ রাকআত তারাবীহ নামায পড়ানোর রীতি সম্পর্কে বর্ণিত একচেটিয়া আহাদীসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ
মুওয়াত্তা-এ-ইমাম মালেক, ৬ষ্ঠ বই, নম্বর ৬.২.৪

এয়াহইয়া আমার (ইমাম মালেক স্বয়ং) কাছে বর্ণনা করেন মালেক হতে, তিনি মোহাম্মদ ইবনে ইউসূফ হতে, এই মর্মে যে, হযরত সাইব ইবনে ইয়াযীদ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বলেন: খলীফা হযরত উমর ফারূক (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) হযরত উবাই ইবনে কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ও হযরত তামীম আদ্ দারী (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনাকে নির্দেশ দেন যেন তাঁরা রাতের এগারো রাকআত নামাযের জামাআতে ইমামতি করেনকুরআন তেলাওয়াতকারী (ইমাম) মিঈন (মধ্যম আকৃতির সূরার সমষ্টি) পাঠ করতেন যতোক্ষণ না আমরা দীর্ঘ সময় নামাযে দণ্ডায়মান হওয়ার দরুন নিজেদের লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতামভোর না হওয়া পর্যন্ত আমরা (মসজিদ) ত্যাগ করতাম না

এটি-ই সালাফীদের কাছে দ্বিতীয় বড় দলিলপরিতাপের বিষয় এই যে, আল-জারহ ওয়াত্ তাদীল এবং আসমাউর রেজাল জ্ঞানের শাস্ত্রগুলো সম্পর্কে অনবধান নিরীহ মুসলমান সর্বসাধারণকেই কেবল সালাফীরা ধোকা দিয়ে বিভ্রান্ত করতে পারে, কিন্তু আহলে সুন্নাতের জ্ঞান বিশারদগণ তাদেরকে এই জ্ঞানে সমুচিত শিক্ষা দেবেন

মুয়াত্তা মালেকগ্রন্থে লক্ষণীয় যে এর এ সনদ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘মোহাম্মদ বিন ইউসূফ ন সাইব ইবনে ইয়াযীদ’ (সাইব বিন ইয়াযীদ হতে মোহাম্মদ বিন ইউসূফ বর্ণিত)
মোসান্নাফ-এ-আবদির রাযযাকগ্রন্থে ওই একই বর্ণনা একই এসনাদ-সহ লিপিবদ্ধ আছে, কিন্তু তাতে বিবৃত হয়েছে: হযরত সাইব বিন এয়াযীদ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) হতে মোহাম্মদ বিন ইউসূফ বর্ণনা করেন যে, খলীফা হযরত উমর ফারূক (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) রমযান মাসে মানুষদেরকে হযরত উবাই ইবনে কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ও হযরত তামীম দারী (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার ইমামতিতে একুশ রাকআত নামায জামাতে আদায়েরনির্দেশ দেন। [মুসান্নাফে আবদির রাযযাক, ৪র্থ খণ্ড, ২৬০ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৭৭৩০]

অতএব, ‘মুয়াত্তা মালেকগ্রন্থে লিপিবদ্ধ বর্ণনা থেকেও ৮ রাকআত প্রমাণিত হয় না, বরং ওপরের রওয়ায়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে ২০ রাকআত তারাবীহর নামায-ই প্রমাণিত হয়এক্ষণে সালাফীদের কাছে খুলাফায়ে রাশেদীনের আর কোনো বর্ণনা নেই যা দ্বারা ৮ রাকআত তারাবীহ সাব্যস্ত করা যায়কাজেই মুয়াত্তা মালেকগ্রন্থে বর্ণিত রেওয়ায়েতটি মুদতারেবহিসেবে প্রমাণিত হয় এবং তাই এটি প্রামাণিক দলিল বলে গ্রহণের অযোগ্যঅনুগ্রহ করে ওপরে পেশকৃত বিভিন্ন রওয়ায়াতের একচেটিয়া দলিলগুলো দেখুন, যাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে হযরত উবাই ইবনে কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) ২০ রাকআত তারাবীহ আদায় করেছেনএমন কি সালাফীগুরু (তাদের শায়খুল ইসলাম’) ইবনে তাইমিয়াহ আল-মুজাসমী-ও এ সম্পর্কে বলে: এটি সপ্রমাণিত যে হযরত উবাই ইবনে কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) রমযান মাসে সাহাবা-এ উনাকেরাম (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম)-দের জামাআতে ২০ রাকআত তারাবীহ ও ৩ রাকআত বেতরের নামাযে ইমামতি করতেনঅতএব, অধিকাংশ উলামা-এ উনাকেরামের মাসলাক (রীতি-নীতি) এই যে, এটি-ই সুন্নাহ কেননা, হযরত উবাই ইবনে কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) এই ২০ রাকআতের ইমামতি করার সময় ওখানে উপস্থিত ছিলেন মোহাজির (হিজরতকারী) ও আনসার (সাহায্যকারী) সাহাবীবৃন্দ, কিন্তু তাঁদের একজনও এর বিরোধিতা করেন নি!” [ইবনে তাইমিয়াহ কৃত মজমুয়া-এ-ফাতাওয়া, ১:১৯১]

দলিল-১১: আল-হারিস (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বর্ণনা করেন যে তিনি রমযান মাসে ২০ রাকআত তারাবীহ নামায আদায় করতেন, আর ৩ রাকআত বেতরের নামাযেও ইমামতি করতেন এবং রুকূর আগে কুনুত পড়তেন। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ, ৫ম খণ্ড, ২২৪ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৭৭৬৭]

দলিল-১২ এবং তারাবীহর সংজ্ঞাঃ হযরত আবূ আল-বখতারী (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) থেকে বর্ণিত যে তিনি রমযান মাসে জামাআতে ৫ তারভিয়াত’ (অর্থাৎ, ২০ রাকআত তারাবীহ) নামাযের এবং ৩ রাকাত বেতরের নামাযের ইমামতি করতেন। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ, ৫ম খণ্ড, ২২৪ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৭৭৬৮]

বি:দ্র: তারাবীহ নামাযে প্রতি ৪ রাকআতে এক তারভিহ’ (বিশ্রামের সময়)পাঁচ তারভিহাতহলো ৫*৪=২০ রাকআত

দলিল-১৩: হযরত আতাইবনে রুবাহ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বলেন: আমি সব সময়-ই মানুষদেরকে ২৩ রাকআত (তারাবীহ) পড়তে দেখেছি, যাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল বেতরের নামায। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ, ৫ম খণ্ড, ২২৪ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৭৭৭০]
দলিল-১৪: হযরত শায়তার ইবনে শাকী হতে প্রমাণিত যে তিনি রমযান মাসে ২০ রাকআত তারাবীহ নামাযের জামাআতে এবং বেতরের নামাযেও ইমামতি করতেন। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, ৫ম খণ্ড, ২২২ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৭৭৬২]

দলিল-১৫: হযরত সাঈদ বিন উবাইদ বর্ণনা করেন যে হযরত আলী বিন রাবিয়াহ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) তাঁদেরকে ৫ তারভিহাত (২০ রাকআত তারাবীহ) নামাযে এবং ৩ রাকআত বেতরের নামাযেও ইমামতি করতেন। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ, ৫ম খণ্ড, ২২৪ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ৭৭৭২]

দলিল-১৬: ইবনে কুদামাহ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ২০ রাকআত তারাবীহ নামাযের পক্ষে যে এজমাহয়েছে, সে সম্পর্কে প্রমাণ পেশ করতে গিয়ে লিখেন:

আবূ আবদিল্লাহ (ইমাম আহমদ হাম্বল) উনার দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত দলিল হলো ২০ রাকআত (তারাবীহ); এ ব্যাপারে একই মত পোষণ করেন সর্ব-হযরত সুফিয়ান সাওরী (রহমতুল্লাহি আলাইহি), ইমাম আবূ হানিফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ও ইমাম শাফেঈ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম মালেক (রহমতুল্লাহি আলাইহি) উনার মতে এটি ৩৬ রাকআততিনি মদীনাবাসীর রীতি অনুসরণ করেনকেননা, সালেহ বলেন তিনি সেখানকার মানুষকে দেখেছিলেন ৪১ রাকআত কেয়ামুল্ লাইল (তারাবীহ) পালন করতে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ৫ রাকআত বেতরের নামায কিন্তু আমাদের প্রামাণ্য দলিল হচ্ছে খলীফা হযরত উমর ফারূক (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) মানুষদেরকে সমবেত করে হযরত ইবনে কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার ইমামতিতে ২০ রাকআত তারাবীহর নামায জামাআতে আদায় করিয়েছেন হযরত হাসসান (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার সূত্রে এও বর্ণিত হয়েছে যে খলীফা হযরত উমর (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) এভাবে ২০ রাত হযরত উবাই ইবনে কাব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার ইমামতিতে মানুষদেরকে জামাঅাতে নামায আদায় করিয়েছিলেন; আর তিনি (হযরত কাব) রমযানের নিসফে (ওই সময়) শেষ দশ দিন তারাবীহ নিজের ঘরে পড়তেনএই বর্ণনা ইমাম আবূ দাউদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি) ও হযরত সাইব ইবনে এয়াযীদ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার প্রদত্ত ইমাম মালেক (রহমতুল্লাহি আলাইহি) এয়াযীদ ইবনে রুমান থেকে এও বর্ণনা করেছেন যে, খলীফা হযরত উমর (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার শাসনামলে মানুষেরা ২৩ রাকআত তারাবীহ আদায় করতেন, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ৩ রাকআত বিতর 

ইবনে কুদামাহ আরও লিখেন: হয়রত আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াযহু আলাইহিস সালাম) হতে এও বর্ণিত হয়েছে যে তিনি জনৈক ব্যক্তিকে ২০ রাকআত তারাবীহর জামাআতে ইমামতি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেনঅতএব, ২০ রাকআত তারাবীহর ব্যাপারে এজমাপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছেঅধিকন্তু, সালেহ যে মদীনাবাসীদেরকে ৪১ রাকআত নামায পড়তে দেখেছিলেন, সে সম্পর্কে বলবোসালেহ দুর্বল এবং আমরা জানি না ৪১ রাকআতের এই বর্ণনা কে দিয়েছিলেন হতে পারে যে সালেহ কিছু মানুষকে ৪১ রাকআত পড়তে দেখেছিলেনকিন্তু এটি তো হুজ্জাত (প্রামাণ্য দলিল) হতে পারে না আমরা যদি ধরেও নেই যে মদীনাবাসী ৪১ রাকআত তারাবীহ (বেতরের ৫ রাকআত-সহ) পড়তেন, তবুও হযরত উমর (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) উনার নির্দেশ, যা তাঁর সময়কার সকল সাহাবা-এ উনাকেরাম (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগন) অনুসরণ করেছিলেন, তা-ই অধিকতর অনুসরণযোগ্যকয়েকজন উলামা বলেন যে মদীনাবাসী মুসলমানগণ ৩৬ রাকআত তারাবীহ পড়তেন যাতে মক্কাবাসী মুসলমানদের সাথে তা মিলে যায়; কেননা, মক্কাবাসীরা প্রতি রাকআত পড়ার পর তাওয়াফ করতেন এবং এভাবে তাঁরা ৭ বার তাওয়াফ করতেনমদীনাবাসী মুসলমানগণ ওই সময়ের মধ্যে (অর্থাৎ, একেক তওয়াফে) ৪ রাকআত আদায় করে নিতেন (নওয়াফিল)কিন্তু আমরা যেহেতু জানি যে সাহাবা-এ উনাকেরাম (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) ২০ রাকআত তারাবীহ পড়েছেন, সেহেতু আমাদের তা-ই মান্য করা আবশ্যক [ইবনে কুদামাহ প্রণীত আল-মুগনী, ২য় খণ্ড, ৬০৪ পৃষ্ঠা]

দলিল-১৭: আল-গুনিয়াতুত্ তালেবীন গ্রন্থে লেখা আছে: তারাবীহ নামাযের অন্তর্ভুক্ত ২০ রাকআতপ্রতি দুই রাকআতে প্রত্যেকের উচিত বৈঠকে সালাম ফেরানো; ফলে এ নামায ৫ তারউইহাত-বিশিষ্ট, যার প্রতি ৪ রাকআতে একটি তারভি (অর্থাৎ, ৫ বার চার রাকআত =২০)। [আল-গুনিয়াতুত্ তালেবীন, ২য় খণ্ড, ২৫ পৃষ্ঠা]

দলিল-১৮: ইমাম বোখারী (রহমতুল্লাহি আলাইহি) তাঁর আল-কুনাপুস্তকে রওয়ায়াত করেন: হযরত আবূ আল-খুসাইব (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) বর্ণনা করেন যে হযরত সুওয়াইদ বিন গাফালাহ (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) সব সময়-ই রমযান মাসে আমাদেরকে নিয়ে জামাআতে বিশ রাকআত তারাবীহ নামাযে ইমামতি করতেন। [আল-কুনা, ২য় খণ্ড, হাদীস নং ২৩৪]

এতএব উপরের এতসব দলিলাজিল্লাহ দ্বারা প্রমানিত হলো যে তারাবির নামাজ ২০ রাকাত ই পড়া সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতামত তাই এখন যদি কেউ ৮ রাকাত পড়ে তাহলে আল্লাহু রাব্বুল আলামিন ই ভালো জানেন তার ফায়ছালা তিনি কিভাবে করবেননিশ্চই যারা সাহাবা (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) গনের বিপক্ষে নিজের মনগড়া মতামত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করবেন না আর যা তিনি অপছন্দ করবেন তা আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন ও অপছন্দ করেন
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ পোষ্ট টা পড়ে যদি ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট বক্স এ আপনার মতামত জানাবেন আর আপনার বন্ধু বান্দব দের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন্না, আসসালামু আলাইকুম, ফি আমানিল্লাহ !!! আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক বুজ দান করুন


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।