6.26.2016

অন্যকে ফতওয়া দিতে গিয়ে কি আপনি নিজেই ঈমানহারা হয়ে যাচ্ছেন???

অন্যকে ফতওয়া দিতে গিয়ে কি আপনি নিজেই ঈমানহারা হয়ে যাচ্ছেন???
অন্যকে ফতওয়া দিতে গিয়ে কি আপনি নিজেই ঈমানহারা হয়ে যাচ্ছেন???
আজকাল প্রায়শই দেখা যায় অনলাইন মুফতিতে ভরে গেছেন, অনলাইনে মুক্ত আলোচনা ও মুক্ত মত প্রকাশ সহজ হয়ে যাওয়ায় এই বিপত্তি হয়েছে। যে একটি কোরআন হাদিস কি তাও জানেনা সেও আজকাল দেখাযায় এমন সব উলামায়ে কেরামের বিরুদ্বে হারাম, বিদয়াত, শিরক কুফরির ফতওয়া দেয় অথচ খুঁজলে দেখা যাবে তাদের মলের ও যোগ্য না এরা অথচ যাদের বিরুদ্বে ফতওয়া দেওয়া হয় তাদের ইসলাম থেকে বাহির করলে আজকে ১৪০০ বছর পরে আর সঠিক দ্বীন ইসলাম কে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে।

শুধু তাদের নয় আজকাল কেউ যদি কোনো হারাম কাজ ও করে থাকে, তাহলেও সাধারণ মানুষের কি তাদের ফতওয়া দেওয়ার ক্ষমতা আছে? একজন এম বি  বি এস ডাক্তার ব্যতীত যেমন রোগ নির্ণয় আর তার ঔষদ দেওয়ার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাই এবং দিলে মৃত্যু অনিশ্চিত ঠিক তেমনি ফতওয়া দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে ফতওয়া দিলে নিজের ঈমান থাকবে কিনা এইটা সহজেই অনুমেও।

হারাম, হালাল, শিরক, বিদয়াত, কুফুরী সহ অন্যান্য সম সাময়িক বিষয়ে ফতওয়া প্রদানের জন্য যে সর্বনিম্ন জ্ঞান থাকতে হবে তা কি তাদের আছে যারা ঠাস করেই কমেন্টে কাফের, মুশ্রিক, শিরকের ফতওয়া মারে? অথবা তার কি সেই মুফতির সাথে যোগাযোগ আছে যে সে ফতওয়া দেওয়ার আগে মুফতিকে জিজ্ঞেস করে নেয়?

এবার আসুন ফতোয়া দেওয়ার যে সর্বনিম্ন যোগ্যতা প্রয়োজন সেগুলো কি কি? এবং তা কি আমাদের আছে?

১/ পবিত্র আল কোরআন উল কারিম এবং সুন্নাহ মোবারক সম্পর্কে ব্যাপক  জ্ঞান থাকতে হবে।  এটা বলতে আসলে এটা বুঝায় না যেতার সকল সুন্নাহ কণ্ঠস্থ থাকতে হবেবরং এই যোগ্যতা থাকা যথেষ্ট যেতিনি সুন্নাহগুলিকে বিশ্বস্ত কিতাবগুলিতে খুঁজে পেতে সহ্মম  এবং সুন্নাহগুলির ভাষ্য  এবং বিষয়বস্তুর সঙ্গে সুপরিচিতবিশেষ করে প্রধানতম হাদীসের  সংকলন সমুহ (সহীহ আল বুখারী, সহীহ  মুসলিম, সুনান আবু দাউদ, সুনান আল  তিরমিজি, সুনান আল  নাসায়ী এবং সুনান ইবনে মাজাহ) এবং বাকি সব সহিহ কিতাব গুলি  ইত্যাদি।  এছাড়াও তার, হাদীসের সহীহ  দ্বয়ীফের ঞ্জান থাকতে হবে।

২/ হাক্কানি উলামায়ে কেরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগন উনাদের পবিত্র ইজমার (ঐক্যমত্য)  বিষয়গুলো সম্পর্কে জ্ঞান  থাকতে হবে।

৩/  সম্মানিত আরবি ভাষায় ভালো দখল  থাকতে হবে।  এর মানে এটা নয় যে, আরবী মুখস্হ  থাকলেই হবে।  বরং তাকে আরবী ভাষা, ভাষার অলংকার এবং তার  গঠন প্রণালি বুঝতে পারার  যোগ্যতা থাকতে হবে।

৪/ সম্মানিত উসুলে ফীকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র  এর মূলনীতি) ও কিয়াসের ঞ্জান  থাকতে হবে, কারণ এগুলো হল  শরীয়ী সিদ্ধান্ত প্রদানের মূল  ভিত্তি।

৫/ নাসেখ/মানসুখ সম্পর্কে ঞ্জান  থাকতে হবে এবং কি কি বিষয়  মানসুখ হয়েছে তা জানতে হবে। 

উপরের জ্ঞান ব্যতীত কেউ ফতওয়া দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের সবথেকে দামি সম্পদ ঈমান কে হারানোর সম্ভাবনা শতভাগ। কারন হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছেঃ হযরত আবূ হুরাইরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি না জেনে ফতোয়া দেবে, তার গুনাহ মুফতীর উপর বর্তাবে । (আবু দাউদ শরীফঃ হাদিস শরীফ নং ৩৬১৫)

অর্থাৎ উদাহরণ স্বরূপ কেউ যদি কারো বিদয়াত বা কবিরা গুনাহ বা হারাম কাজের বদলে কাফের/মুশরিক ফতওয়া দেয় তাহলে মুফতি নিজেই কাফের হয়ে যাবে, যেমন হাদিস শরীফে বলা হয়েছেঃ হযরত আবূ যার রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেনো একজন অপর জনকে ফাসিক বলে গালি না দেয় এবং একজন অন্যজনকে কাফির বলে ফতোয়া না দেয়। কেননা, অপরজন যদি তা না হয়, তবে তার দেওয়া ফতোয়া অনুসারে সে নিজেই তা হয়ে যাবে। (মুসলিম শরীফ ১/২৭, হাঃ ৬১, আহমাদ শরীফ ২১৫২১) (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৬১০, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ- ৫৫০৬) আরও (বুখারী শরফি ও মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফঃ ৪৬০৬ অধ্যায়ঃ জিহ্বার সংযম, গীবত গাল-মন্দ প্রসঙ্গে)

আর সবথেকে বড় কথা হলো যেকোনো কিছুই আপনি আপনার নিজের মতে মতে খারাপ বা ভালো বলতে পারবেন না এবং কাউকে বিনা দলিলে দোষী করতেও পারবেন না কারনঃ মহান আল্লাহ পাক তিনি কালামিল্লাহ শরীফে ইরশাদ মুবারক করেন, هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ٥ অর্থঃ যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে দলিল পেশ করো। (সম্মানিত সূরা বাক্বারা শরীফঃ সম্মানিত আয়াত শরীফ ১১১)

এতএব কাউকে দোষী বা অপরাধী অথবা তাকে বাতিল গুনাহগার সাব্যস্থ করতে হলে অবশ্যই দলিল পেশ করতে হবে নিজে নিজে অনুমান বা ধারনা করে বললে হবেনা কারন মহান আল্লাহ পাক তিনি কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ মোবারক করেনঃ হে ইমানদারগন! তোমরা অধিক ধারণা থেকে দূরে থাকো। কারণ কোনো কোনো ধারণা পাপ। (পবিত্র সুরা আল হুজুরাত শরীফঃ আয়াত শরীফ ১২)। 

উপরের আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার ব্যখা প্রদান করেছেন এই মর্মে যেঃ পবিত্র আল কোরআনে যে অনুমান করতে নিষেধ করা হয়েছে তা হচ্ছে অন্যের সম্পর্কে মন্দ ধারণা ও অপবাদ দেওয়া বা ফতওয়া দেওয়া যা সে নয়। যে মন্দ বিষয়ের কোনো প্রমাণ নেই, সে বিষয়ে কেবলই অনুমানের ওপর ভর করে কিছু বলে দেওয়া বা ফতওয়া দেওয়াকেই এ আয়াত শরীফে বারণ করা হয়েছে। 

শুধু আল কোরআন নয় এমনকি হাদিস শরিফেও কঠোর ভাবে নিষেদ করা হয়েছে যেমনঃ বোখারি শরীফ ও মুসলিম শরিফের একটি হাদিস শরীফে বলা হয়েছেঃ তোমরা মন্দ ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা মন্দ ধারণাই হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য মিথাচার। (সহিহ মুসলিম শরিফঃ হাদিস শরীফ নং: ৬৭০১)

আর যারাই বিদ্বেষবশত কারো পিছনে লেগে থাকেন অথচ সে তা নয় তাদের ব্যপারে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মোবারক করেনঃ যে বিষয়ে তোমাদের কোনো জ্ঞান (জানাশোনা) নেই সে বিষয়ের পেছনে পড়ো না; নিশ্চয় কান, চোখ ও হূদয়প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে" (পবিত্র সূরা আল-ইসরা শরীফঃ আয়াত শরীফঃ ৩৬)।

পরিশেষে একটি কথা বলেই শেষ করছি যে নিজে তো দিবেন না এমনকি এমন কারো ফতওয়ার সাথে তাল মিলাবেন না যা ইসলাম সম্মত নয় কারন আজকের যুগে ইলিম ওয়ালা ঈমানদার আলিম পাওয়া সহজসাধ্য বিষয় নয় যেমন হাদিস শরীফে বলা হয়েছেঃ ইসমাঈল ইবন আবু উওয়ায়েস রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেনঃ আমি রাসূলাল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনাকে বলতে শুনেছি যে মহান আল্লাহ পাক তিনি বান্দার অন্তর থেকে ইলম বের করে উঠিয়ে নেবেন না, বরং আলিমদের উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই ইলম উঠিয়ে নেবেন। যখন কোন আলিম বাকী থাকবে না তখন লোকেরা জাহিলদেরই আলিম/ইসলামিক স্কলার হিসেবে গ্রহণ করবে। এবং তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে আর তারা না জেনেই ফতোয়া দিবে। ফলে তারা নিজেরাও গোমরাহ হবে, আর অপরকেও গোমরাহ করবে। ফিরাবরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হিশাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সুত্রেও অনুরুপ বর্ণিত আছে। (বুখারী শরীফ, ১ম খণ্ড, হাদিস শরীফ নং-১০১, ইলম অধ্যায়)

আর উপরের আয়াত শরীফ, হাদিস শরীফ গুলো পড়ে, শোনার পরেও যারা গো ধরবে এবং নিজের অহংকার আর জিদের বশবর্তী হয়ে তা মানতে নারাজ হবে তাদের ব্যপারে মহান আল্লাহ পাক টি নি স্পষ্ট বলেই দিয়েছেনঃ প্রত্যেক মিথ্যাবাদী পাপাচারীর দুর্ভোগসে মহান আল্লাহ পাক উঁনার আয়াত শরীফ সমূহ শুনে, অতঃপর অহংকারী হয়ে জেদ ধরে, যেনো সে আয়াত শরীফ শুনেনিঅতএব, তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিনযখন সে আমার কোন আয়াত শরীফ অবগত হয়, তখন তাকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করেএদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতাদের সামনে রয়েছে জাহান্নামতারা যা উপার্জন করেছে, তা তাদের কোন কাজে আসবে না, তারা মহান আল্লাহ পাঁক উঁনার পরিবর্তে যাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে(ইবলিশের অনুসারিদের) তারাও নয়তাদের জন্যে রয়েছে মহাশাস্তিএটা সৎপথ প্রদর্শন, আর যারা তাদের পালনকর্তার আয়াত শরীফসমূহ অস্বীকার করে, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (সূরা আল জাসিয়া শরীফঃ আয়াত শরীফ ৭-১১)

যারা মহান আল্লাহ পাক উনার আয়াত শরীফ সমূহ ও উনার সাক্ষাত অস্বীকার করে, তারাই উনার রহমত থেকে নিরাশ হবে এবং তাদের জন্যেই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে (সূরা আল আনকাবুত শরীফঃ আয়াত শরিফ ২৩) 

এবং যারা কিতাবের অর্ধেক মানে এবং নিজের বিপক্ষে যাওয়ার কারনে বাকি অর্ধেক মানেনা তাদের ব্যপারে মহান আল্লাহ পাঁক তিনি পবিত্র সুরা বাক্বারার ৮৫ নাম্বার আয়াত শরিফে এরশাদ মোবারক করেনঃ তবে কি তোমরা কিতাবের কিয়দাংশ বিশ্বাস করো এবং কিয়দাংশ অবিশ্বাস করো? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দূগর্তি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই আর কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবেআল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন

হে মহান আল্লাহ পাক আপনি আমাদের সকলকে হক্ক বোঝা ও মানার তৌফিক দান করুন আমিন ইয়া রাবাল আলামিন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: