9.01.2016

জেনে নিন পবিত্র কুরবানী কি এবং কুরবানীর দলিলভিত্তিক যাবতিও মাসলা মাসাইল


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিমঃ আসসালামু আলাইকুম, সবাই ভাল আছেন আশা করি। কোরবানি কাকে বলে? এর হুকুম কি? এর ইতিহাস সম্পর্কে আজ লেখব যদি মহান আল্লাহ পাক তিনি ক্ষমতা দেন। প্রথমে জেনে নেই পবিত্র কোরবানি কাকে বলা হয় ও উনার হুকুম কিউনার ইতিহাস কি?

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন, ‘মহান আল্লাহ পাক তিনি আজহার দিনকে এ উম্মতের জন্য মনোনীত করে এতে ঈদ প্রবর্তনের জন্য আমাকে আদেশ করছেন।যে বিষয়গুলো ঈদুল আজহা উনাকে স্বার্থক ও আলোকোজ্জ্বল করেছে তার মধ্যে পবিত্র কোরবানি অন্যতম বিধান।

কোরবানি কি?

কোরবানি এটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হলঃ
, নৈকট্য অর্জন করা
, কাছে আসা
, পুন্য

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, যে কাজের মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন করা যায় তাকে কোরবানি বলা হয়। কোরবানির অপর নাম হলঃ اُضْحِيَّة যার অর্থ হলঃ

,জবাই করা
, উৎসর্গ করা
, শিকার করা
, পাকড়াও করা
, নৈকট্য অর্জন করা

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়,
هِيَ ذَبْحُ حَيَوَانٍٍِ مَّخْصُوْصٍِ فِيْ وَقْتٍِ مَّخْصُوْصٍٍٍِ بِطَرِقٍِ مَخْصُوصٍِ
নির্দিষ্ট সময়ে,নির্দিষ্ট পন্থায়, নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে  اُضْحِيَّة বলে। (ফাতওয়ায়ে শামি)
কোরবানি উম্মতে মুহাম্মদির জন্য কোনো বিশেষ প্রথা বা অভিনব হুকুম নয়। পুর্ববর্তি উম্মতদের উপরও ছিল। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
وَلِكُلِّ أُمَّةٍۢ جَعَلْنَا مَنسَكًۭا لِّيَذْكُرُوا۟ ٱسْمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلْأَنْعَـٰمِ ۗ فَإِلَـٰهُكُمْ إِلَـٰهٌۭ وَٰحِدٌۭ فَلَهُۥٓ أَسْلِمُوا۟ ۗ وَبَشِّرِ ٱلْمُخْبِتِينَ
আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে পবিত্র কোরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা মহান আল্লাহ পাক উনার দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময় মহান আল্লাহ পাক উনার নাম উচ্চারণ করে। অতএব তোমাদের মহান আল্লাহ পাক তো একমাত্র আল্লাহ পাক সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও। [পবিত্র সূরা হাজ্জ শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৪]

কোরবানীর হুকুম কি ? ওয়াজিব না সুন্নত ? এ বিষয়ে ইমাম ও ফকীহদের মাঝে দুটো মত রয়েছে।

প্রথম মত : কোরবানি ওয়াজিব।

ইমাম আওযায়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম লাইস রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখের মত এটাই। আর ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম আহমদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে আরো একটি মত বর্ণিত আছে যে তারাও ওয়াজিব বলেছেন।

কারন (এক) মহান আল্লাহ পাক তিনি নির্দেশ দিয়েছেনঃ
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنْحَرْ
অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কোরবানী করুন। [পবিত্র সূরা কাওসার শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ ২]

আর মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন উনার নির্দেশ পালন যদিও ফরজ কিন্তু খেত্র বিশেষ ওয়াজিব হয়ে থাকে।

কারন (দুই)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ، وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا»
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না সে যেনো আমাদের ঈদগাহের ধারে না আসে। [মুসনাদ আহমাদ শরীফ, ইবনে মাজা শরীফ - ৩১২৩ হাদিস শরীফটি হাসান]
যারা পবিত্র কোরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস শরীফটি একটি সতর্ক-বাণী। তাই কোরবানি ওয়াজিব যদি সামর্থ্য থাকে।

কারন (তিন) নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেনঃ-
: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ عَلَى كُلِّ أَهْلِ بَيْتٍ فِي كُلِّ عَامٍ أُضْحِيّة
: হে মানব সকল ! প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্ব হলো প্রতি বছর কোরবানি দেয়া। [মুসনাদে আহমাদ শরীফ, ইবনে মাজা শরীফ - ৩১২৫ হাদিস শরিফটি হাসান]

দ্বিতীয় মতঃ কোরবানি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।

এটা অধিকাংশ উলামাদের মত। এবং ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি - উনাদের প্রসিদ্ধ মত। কিন্তু এ মতের প্রবক্তারা আবার বলেছেনঃ সামর্থ্য থাকা অবস্থায় কোরবানি পরিত্যাগ করা মাকরূহ।

যদি কোন জনপদের লোকেরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সম্মিলিতভাবে কোরবানি পরিত্যাগ করে তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। কেননা, কোরবানি হলো পবিত্র ইসলাম উনার একটি মহান নিদর্শন।

যারা কোরবানি সুন্নত বলেন তাদের দলিলঃ

(এ) নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেনঃ إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ وَعِنْدَهُ أُضْحِيَّةٌ يُرِيدُ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلَا يَأْخُذَنَّ شَعْرًا، وَلَا يَقْلِمَنَّ ظُفُرًا
তোমাদের মাঝে যে কোরবানি করতে চায়, যিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কোরবানি সম্পন্ন করার আগে তার কোন চুল ও নখ না কাটে। [মুসলিম শরীফঃ হাদিস শরীফ নং - ১৯৭৭]

এ হাদিস শরীফে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি-এই (যে কোরবানি করতে চায়) কথা দ্বারা বুঝে আসে এটা ওয়াজিব নয়।

(দুই) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি উনার উম্মতের মাঝে যারা কোরবানি করেনি তাদের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছেন। তার এ কাজ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে কোরবানি ওয়াজিব নয়।

ইবনে উসাইমীন উভয় পক্ষের দলিল-প্রমাণ উল্লেখ করার পর বলেঃ এ সকল দলিল-প্রমাণ পরস্পর বিরোধী নয় বরং একটা অন্যটার সম্পূরক। সারকথা হল যারা কোরবানিকে ওয়াজিব বলেছেন তাদের প্রমাণাদি অধিকতর শক্তিশালী। আর সালাফি ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মতও এটাই।

কোরবানির ইতিহাসঃ কোরবানির বিষয়টি মানব ইতিহাসের মতো অতি প্রাচীন। হজরত আদম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পুত্রদ্বয় হাবিল আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং কাবিল আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মাধ্যমে সর্বপ্রথম কোরবানির সূচনা হয়। সে সময় কোরবানির নিয়ম ছিল অন্য রকম। ভেড়া, দুম্বা, শস্য বা গম ইত্যাদি কোরবানির জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে পেশ করা হতো। যার কোরবানি কবুল হতো মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুমে আকাশ হতে আগুন এর এক লুক্কা এসে তা ভস্মীভূত করে দিতো। আর যারটা কবুল হতো না তারটা পড়েই থাকতো। হজরত নূহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হজরত ইয়াকুব আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হজরত মূসা আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাদের সময়েও কোরবানির প্রচলন ছিলো। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনি মহান আল্লাহ পাক উনার প্রেমে প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক অবিস্মরণীয় সোনালি ইতিহাস সৃষ্টি করে গিয়েছেন যার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে আমাদের আজকের পবিত কোরবানিতে।

হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম -উনার প্রিয় বস্তু কোরবানিঃ হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বপ্নযোগে উনার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দেয়ার জন্য আদিষ্ট হন। এ জন্য তিনি তিন দিনে শত শত উট কোরবানি করলেন কিন্তু তা মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে কবুল হলো না। বারবারই স্বপ্নযোগে আদেশ করা হলো, ‘তোমার প্রিয়বস্তু কোরবানি করো।হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝতে পারলেন, বৃদ্ধ বয়সে প্রাপ্ত একমাত্র প্রাণাধিক প্রিয় সন্তান এবং হজরত হাজেরা আলাইহাস সালাম নির্বাসিত হয়ে বহু কষ্টে লালিত নয়নের মণি হজরত ইসমাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন সেই প্রিয় বস্তু। আত্মত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মা হাজেরা আলাইহাস সালাম কোরবানির জন্য কলিজার টুকরা পুত্রকে সাজিয়ে নিলেন। কিশোর ইসমাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জানকে মহান আল্লাহ পাক উনার রাহে বিলিয়ে দিয়ে আত্মত্যাগের বিস্ময়কর ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। পবিত্র কুরআন শরীফে ওই বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী? বলো। তিনি বললেন, আব্বাজান! আপনি যে বিষয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে আদিষ্ট হয়েছেন, তা পূর্ণ করুন। ইনশাআল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। যখন তারা উভয়ে আত্মসমর্পণ করলেন এবং পিতা কাত করে পুত্রকে শোয়ালেন, তখন আমি তাকে ডাকলাম, হে ইব্রাহিম! নিশ্চয়ই আপনি স্বপ্নকে সত্য পরিণত করে দেখিয়েছেন। আমি বিশিষ্ট বান্দাদের এরূপ পুরস্কার প্রদান করে থাকি। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল বড় পরীক্ষা। আর ইসমাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার পরিবর্তে একটি শ্রেষ্ঠ জবেহর পশু দান করলাম।’ (পবিত্র সূরা সাফফাত শরীফঃ আয়াত শরীফ ১০২ থেকে ১০৭)।

আল্লাহু আকবার তাকবিরঃ হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কলিজার টুকরা পুত্রের গলায় ছুরি চালান, তখন হজরত জিব্রাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশে বেহেশত থেকে একটা দুম্বা নিয়ে রওনা হলেন। উনার মনে ভয় ছিলো না জানি পৃথিবীতে পৌঁছার আগেই ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবেহ এর কাজ শেষ করে দেন! আর এ জন্যই জিব্রাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকাশ থেকে উচ্চস্বরে ধ্বনি দিতে থাকেন আল্লাহু আকবার। এমন মধুর ধ্বনি শুনে হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার  হজরত ইসমাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম পিতার মুখে তাওহিদের বাণী শুনতে পেয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলেন আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।হজরত জিব্রাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং দুই নবীর কালামগুলো মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে এতই পছন্দনীয় হলো যে, কিয়ামত পর্যন্ত ঈদুল আজহার দিনগুলোতে বিশ্ব মুসলিমের কণ্ঠে ওই কালাম শরীফ উচ্চারিত হতে থাকবে।

সুন্নতে ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লামঃ মহান আল্লাহ পাক উনার প্রেমিক হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ধারালো ছুরি হজরত ইসমাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একটি পশমও কাটতে পারেনি। তার পরিবর্তে মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুমে হযরত জিব্রাইল আমীন আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেহেশত থেকে জান্নাতি দুম্বা এনে দিলে তিনি তা কোরবানি করেন। হজরত ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রাণ প্রিয় পুত্রকে কোরবানি দেয়ার কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার প্রেমের গভীরতা কতো তাই প্রমাণ করেছেন। তাই অনন্তকাল ধরে কোরবানির এ মডেল সুন্নতে ইব্রাহিম হিসেবে বিশ্বের সব মুসলমান উনাদের কাছে আজ স্মরণীয়, বরণীয় এবং অবশ্য পালনীয় হয়ে আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। ইনশাআল্লাহ।

সাহাবাদের কোরবানি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, ‘সুন্নাতা আবিকুম ইবরাহিমঅর্থাৎ এটা তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার প্রতিষ্ঠিত আদর্শ (ইবনে মাজাহ শরীফ)।

হজরত ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার কোরবানি মূলত মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে একটি মহান পরীক্ষাস্বরূপ ছিল।

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে এরশাদ মুবারক হয়েছেঃ- إِنَّ هَـٰذَا لَهُوَ ٱلْبَلَـٰٓؤُا۟ ٱلْمُبِينُ
নিশ্চয়ই এটা ছিল সুস্পষ্ট পরীক্ষা’ (পবিত্র সূরা সাফফাত শরীফ- পবিত্র আয়াত শরীফ-১০৬)।

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার পবিত্র সূরা আস সাফফাত শরীফ উনার ৯৯ থেকে ১১৩ নম্বর আয়াত শরীফে হজরত ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার কোরবানি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। একান্ত প্রার্থনায় ৮৬ বছর বয়সে হজরত ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পুত্র ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে লাভ করেন। তাফসিরে মাজহারির বর্ণনা মতে, হজরত ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বয়স যখন ১৩ বছর (মাত্র বালেগ), তখন পিতা ইব্রাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বপ্নে দেখেন, তিনি প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জবাই করছেন। (কোনো কোনো তাফসিরে বর্ণিত আছেঃ এ স্বপ্ন হজরত ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে তিনবার দেখানো হয়)। আম্বিয়া কেরামের স্বপ্ন যেহেতু ওহি হিসেবে গণ্য, তাই তিনি ৯৯ বছর বয়সে প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার সর্ব সম্মতিক্রমে মহান আল্লাহ পাক উনার আদেশ পালনার্থে প্রস্তুত হন। কিন্তু শয়তান পিতা-পুত্রের সে সাধনায় বাদ সাধে। মহামহিম মহান আল্লহ পাক তিনি সে অগ্নিপরীক্ষায় পিতা ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও পুত্র ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের আত্মত্যাগ যেনো ব্যর্থতায় পরিণত হয়, শয়তান সেই লক্ষ্যে উনাদের তিনবার ধোঁকা দেয়। প্রতিবারেই পিতা-পুত্র পর্বতসম ঈমানী চেতনা নিয়ে সে চক্রান্ত প্রতিহত করেন। ২১টি প্রস্তর নিক্ষেপে শয়তানকে নিরাশ করে উনারা সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। (এ জন্যই হাজিরা মিনায় শয়তানকে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করেন।) তাদের উভয়ের প্রতি মহান আল্লাহ পাক খুশি হয়ে পুত্র ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিবর্তে ফেরেস্তাদের দ্বারা আনীত পশু কোরবানির ব্যবস্থা করেন।

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মতের কোরবানি হজরত ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কোরবানিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। হজরত ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার গোটা জীবন ছিল কোরবানি তথা অতুলনীয় আত্মোৎসর্গ ও আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। প্রিয় পুত্র ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কোরবানি করা ছিল ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জীবনের অসংখ্য কোরবানির চরম ও শ্রেষ্ঠতম ঘটনা।

কোরবানিইসলামউভয়‌ আনুগত্য, আত্মসমর্পণ, আত্মত্যাগ ও উৎসর্গীকরণের অর্থ বোঝায়। তাই পবিত্র কুরআন শরীফে ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কোরবানির এ মহান আদর্শ ইসলামশব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত। এরশাদ হয়েছেঃ                      إِذْ قَالَ لَهُۥ رَبُّهُۥٓ أَسْلِمْ ۖ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ ٱلْعَـٰلَمِينَ
অর্থাৎ, উনার প্রতিপালক যখন উনাকে (ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে) বলছিলেন আত্মসমর্পণ করো, তিনি বললেন, বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম(পবিত্র সূরা বাকারাহ শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ-১৩১)। এই আয়াত শরীফ প্রমাণ করে যে, ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মিল্লাতের মৌলিক নীতি ও স্বরূপ ইসলামশব্দের মধ্যেই নিহিত। (মারেফুল কুরআন, মাওলানা মহিউদ্দীন খান অনূদিত পৃষ্ঠা ৬৭) শুধু তাই নয়, হজরত ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে দোয়া করছিলেনঃ- رَبَّنَا وَٱجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَآ أُمَّةًۭ مُّسْلِمَةًۭ لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَآ ۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের উভয়কে (ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসমাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুসলিম (আনুগত্যশীল) করুন এবং আমাদের বংশধর থেকেও একদলকে আনুগত্যকারী করুন।’ (পবিত্র সূরা বাকারা শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ-১২৮)।

আজকের মুসলমান উনারি দোয়ার ফসল। আগেই তিনি এ জাতির নাম মুসলমান রেখেছিলেন।

পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফে এরশাদ মোবারক হয়েছেঃ- مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَٰهِيمَ ۚ هُوَ سَمَّىٰكُمُ ٱلْمُسْلِمِينَ
এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই ধর্ম। তিনিই ইতঃপূর্বে তোমাদের মুসলমাননামকরণ করেছেন এবং এতেও (পবিত্র কুরআন শরীফে) এ নাম রাখা হয়েছে (পবিত্র সূরা হজ্জ শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ-৭৮)।

ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জীবনাদর্শে মুগ্ধ হয়ে মহান আল্লাহ পাক তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উম্মতদের উনার আদর্শের প্রতি দীক্ষিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ মোবারক হয়েছেঃ قُلْ صَدَقَ ٱللَّهُ ۗ فَٱتَّبِعُوا۟ مِلَّةَ إِبْرَٰهِيمَ حَنِيفًۭا وَمَا كَانَ مِنَ ٱلْمُشْرِكِينَ
বলো মহান আল্লাহ পাক সত্য বলেছেন, অতঃপর একনিষ্ঠভাবে ইবরাহিমী মিল্লাত অনুসরণ করো’ (পবিত্র সূরা আল ইমরান শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ-৯৫)।

পবিত্র সূরা মুমতাহিনা শরীফ উনার মধ্যে এরশাদ মোবারক হয়েছে নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য হজরত ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মধ্যে উৎকৃষ্ট আদর্শ বিদ্যমান রয়েছে’ (পবিত্র আয়াত শরীফ-৪)

কোরবানির বিস্তারিত মাসয়ালা।

কোরবানি কার ওপর ওয়াজিবঃ যার ওপর ফিতরা ওয়াজিব তার ওপর কোরবানিও ওয়াজিব। মুসলিম, বালেগ, জ্ঞানবান নিজ বাড়িতে অবস্থানকারী ব্যক্তির স্বাভাবিক সাংসারিক প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ছাড়া ঈদুল আজহার দিনে নিসাব পরিমাণ(সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রোপ্য বা সমপরিমান সম্পদ) মাল থাকলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। কমপক্ষে একটি বকরি, ভেড়া বা দুম্বা কোরবানি করতে হবে। আর যদি গরু/মহিষ/উট কোরবানি করে তবে তা উত্তম অথবা প্রতিটি গরু/মহিষ/উটে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারেন।

কোরবানির শর্তাবলিঃ
(১) এমন পশু দ্বারা কোরবানি দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেগুলো হলো উট, মহিষ, গরু, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এগুলোকে পবিত্র আল কোরআন উনার ভাষায় বলা হয় বাহীমাতুল আনআম।যেমন এরশাদ মোবারক হয়েছেঃ-                                                                                                                                                                              وَلِكُلِّ أُمَّةٍۢ جَعَلْنَا مَنسَكًۭا لِّيَذْكُرُوا۟ ٱسْمَ ٱللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلْأَنْعَـٰمِ
আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছিঃ তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর উপর যেনো তারা মহান আল্লাহ পাক উনার নাম উচ্চারণ করে। (পবিত্র সূরা হজ্ব শরীফঃ পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৪)

হাদিস শরীফে এসেছেঃ-قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً، إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ، فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ
তোমরা অবশ্যই নির্দিষ্ট বয়সের পশু কোরবানি করবে। তবে তা তোমাদের জন্য দুষ্কর হলে ছয় মাসের মেষ-শাবক কোরবানি করতে পারো। [মুসলিম শরীফঃ হাদিস শরীফ ১৯৬৩]

আর মহান আল্লাহ পাক উনার রাসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ছাড়া অন্য কোন জন্তু কোরবানি করেননি ও কোরবানি করতে বলেননি। তাই কোরবানি শুধু এগুলো দিয়েই করতে হবে।

ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি-উনার মতে কোরবানির জন্য সর্বোত্তম জন্তু হলো শিংওয়ালা সাদা-কালো দুম্বা। কারণ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধরনের দুম্বা কোরবানি করেছেন বলে বোখারি ও মুসলিম শরীফে হাদীছ শরীফ এসেছে। উট ও গরু-মহিষে সাত ভাগে কোরবানি দেয়া যায়। যেমন হাদিস শরীফে এসেছেঃ- عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: «نَحَرْنَا بِالْحُدَيْبِيَةِ، مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، الْبَدَنَةَ، عَنْ سَبْعَةٍ، وَالْبَقَرَةَ، عَنْ سَبْعَةٍ»
আমরা হুদাইবিয়াতে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ছিলাম। তখন আমরা উট ও গরু দ্বারা সাত জনের পক্ষ থেকে কোরবানি দিয়েছি। [ইবনে মাজা শরীফ- ৩১৩২, হাদিস শরীফটি সহিহ]

গুণগত দিক দিয়ে উত্তম হল কোরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট, অধিক গোশত সম্পন্ন, নিখুঁত, দেখতে সুন্দর হওয়া।

(২) শরিয়তের দৃষ্টিতে কোরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি। উট পাঁচ বছরের হতে হবে। গরু বা মহিষ দু বছরের হতে হবে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা হতে হবে এক বছর বয়সের।
(৩) কোরবানির পশু যাবতীয় দোষ-ত্রুটি মুক্ত হতে হবে। যেমন হাদিস শরীফে এসেছেঃ-
عَنْ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَأَشَارَ بِأَصَابِعِهِ -، وَأَصَابِعِي أَقْصَرُ مِنْ أَصَابِعِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يُشِيرُ بِأُصْبُعِهِ يَقُولُ: ” لَا يَجُوزُ مِنَ الضَّحَايَا: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ عَرَجُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَجْفَاءُ الَّتِي لَا تُنْقِي
হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার সাহাবি বারা ইবনে আযেব রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন তারপর বললেনঃ চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে পরিপূর্ণ হবে নাঅন্ধ ; যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগাক্রান্ত ; যার রোগ স্পষ্ট, পঙ্গু ; যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত ; যার কোন অংগ ভেংগে গেছে। নাসায়ি শরীফ উনার বর্ণনায় আহতশব্দের স্থলে পাগলউল্লেখ আছে।  [তিরমিজি শরীফ-১৫৪৬, নাসায়ি শরীফ- ৪৩৭১, হাদিস শরীফটি সহিহ]

আবার পশুর এমন কতগুলো ত্রুটি আছে যা থাকলে কোরবানি আদায় হয় কিন্তু মাকরূহ হবে। এ সকল দোষত্রুটিযুক্ত পশু কোরবানি না করাই উত্তম। ত্রুটিগুলো হল শিং ভাংগা, কান কাটা, লেজ কাটা, ওলান কাটা, লিংগ কাটা ইত্যাদি।

(৪) যে পশুটি কোরবানি করা হবে তার উপর কোরবানি দাতার পূর্ণ মালিকানা সত্ত্ব থাকতে হবে। বন্ধকি পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া পশু দ্বারা কোরবানি আদায় হবে না।

কোরবানির নিয়মাবলিঃ কোরবানির পশু কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করা, কোরবানির জন্য পশু পূর্বেই নির্ধারণ করতে হবে। এর জন্য নিম্নোক্ত দুটো পদ্ধতির একটি নেয়া যেতে পারে।

(ক) মুখের উচ্চারণ দ্বারা নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। এভাবে বলা যায় যে এ পশুটি আমার কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করা হল।তবে ভবিষ্যৎ বাচক শব্দ দ্বারা নির্দিষ্ট হবে না। যেমন বলা হল—‘আমি এ পশুটি কোরবানির জন্য রেখে দেবো।

(খ) কাজের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা যায় যেমন কোরবানির নিয়তে পশু ক্রয় করলো অথবা কোরবানির নিয়তে জবেহ করল। যখন পশু কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট করা হলো তখন নিম্নোক্ত বিষয়াবলী কার্যকর হয়ে যাবে।

প্রথমতঃ এ পশু কোরবানি ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না, দান করা যাবে না, বিক্রি করা যাবে না। তবে কোরবানি ভালভাবে আদায় করার জন্য তার চেয়ে উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা যাবে।

দ্বিতীয়তঃ যদি পশুর মালিক ইন্তেকাল করেন তাহলে তার ওয়ারিশদের দায়িত্ব হল এ কোরবানি বাস্তবায়ন করা।

তৃতীয়তঃ এ পশুর থেকে কোন ধরনের উপকার ভোগ করা যাবে না। যেমন দুধ বিক্রি করতে পারবে না, কৃষিকাজে ব্যবহার করতে পারবে না, সওয়ারি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না, পশম বিক্রি করা যাবে না। যদি পশম আলাদা করে তাবে তা সদকা করে দিতে হবে, বা নিজের কোন কাজে ব্যবহার করতে পারবে, বিক্রি করে নয়।

চতুর্থতঃ কোরবানি দাতার অবহেলা বা অযুহাতের কারণে যদি পশুটি দোষযুক্ত হয়ে পড়ে বা চুরি হয়ে যায় অথবা হারিয়ে যায় তাহলে তার কর্তব্য হবে অনুরূপ বা তার চেয়ে ভাল একটি পশু ক্রয় করা।

আর যদি অবহেলা বা অযুহাতের কারণে দোষযুক্ত না হয়ে অন্য কারণে হয়, তাহলে দোষযুক্ত পশু কোরবানি করলে চলবে।

যদি পশুটি হারিয়ে যায় অথবা চুরি হয়ে যায় আর কোরবানি দাতার উপর পূর্ব থেকেই কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে তাহলে সে কোরবানির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করবে। আর যদি পূর্ব থেকে ওয়াজিব ছিল না কিন্তু সে কোরবানির নিয়তে পশু কিনে ফেলেছে তাহলে চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে অথবা হারিয়ে গেলে তাকে আবার পশু কিনে কোরবানি করতে হবে।

কোরবানির ওয়াক্ত বা সময়ঃ কোরবানি নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত একটি এবাদত। এ সময়ের পূর্বে যেমন কোরবানি আদায় হবে না তেমনি পরে করলেও আদায় হবে না। অবশ্য কাজা হিসেবে আদায় করলে অন্য কথা।

, যারা ঈদের সালাত আদায় করবেন তাদের জন্য কোরবানির সময় শুরু হবে ঈদের সালাত আদায় করার পর থেকে। যদি ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে কোরবানির পশু জবেহ করা হয় তাহলে কোরবানি আদায় হবে না। যেমন হাদিস শরীফে এসেছেঃ- عَنِ البَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ فِي يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا، وَمَنْ نَحَرَ قَبْلَ الصَّلاَةِ فَإِنَّمَا هُوَ لَحْمٌ قَدَّمَهُ لِأَهْلِهِ، لَيْسَ مِنَ النُّسْكِ فِي شَيْءٍ» فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ يُقَالُ لَهُ أَبُو بُرْدَةَ بْنُ نِيَارٍ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، ذَبَحْتُ وَعِنْدِي جَذَعَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُسِنَّةٍ، فَقَالَ: «اجْعَلْهُ مَكَانَهُ وَلَنْ تُوفِيَ أَوْ تَجْزِيَ عَنْ أَحَدٍ بَعْدَكَ»
বারা ইবনে আযেব রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ আমি শুনেছি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুতবাতে বলেছেনঃ এ দিনটি আমরা শুরু করব সালাত দিয়ে। অতঃপর সালাত থেকে ফিরে আমরা কোরবানি করব। যে এমন আমল করবে সে আমাদের আদর্শ সঠিকভাবে অনুসরণ করল। আর যে এর পূর্বে জবেহ করল সে তার পরিবারবর্গের জন্য গোশতের ব্যবস্থা করল। কোরবানির কিছু আদায় হল না। [বোখারি শরীফ- ৯৬৫]

, সালাত শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরবানি পশু জবেহ না করে সালাতের খুতবা দুটি শেষ হওয়ার পর জবেহ করা ভালো। কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এ রকম করেছেন।

হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে এসেছেঃ- عَنْ جُنْدَبٍ، قَالَ: صَلَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ النَّحْرِ، ثُمَّ خَطَبَ، ثُمَّ ذَبَحَ، فَقَالَ: «مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ، فَلْيَذْبَحْ أُخْرَى مَكَانَهَا، وَمَنْ لَمْ يَذْبَحْ، فَلْيَذْبَحْ بِاسْمِ اللَّهِ»
সাহাবি জুনদাব ইবনে সুফিয়ান আল-বাজালী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেনঃ নবী কারীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরবানির দিন সালাত আদায় করলেন অতঃপর খুতবা দিলেন তারপর পশু জবেহ করলেন। [বোখারি শরীফ- ৯৮৫]

جُنْدَبَ بْنَ سُفْيَانَ البَجَلِيَّ، قَالَ شَهِدْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ النَّحْرِ، فَقَالَ: «مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ فَلْيُعِدْ مَكَانَهَا أُخْرَى، وَمَنْ لَمْ يَذْبَحْ فَلْيَذْبَحْ»
জুনদাব ইবনে সুফিয়ান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমি কোরবানির দিন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ছিলাম। তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নামাজের পূর্বে জবেহ করেছে সে যেন আবার অন্য স্থানে জবেহ করে। আর যে জবেহ করেনি সে যেন জবেহ করে। [বোখারি শরীফ- ৫৫৬২]

, আর কোরবানির সময় শেষ হবে যিলহজ মাসের তেরো তারিখের সূর্যাস্তের সাথে সাথে। অতএব কোরবানির পশু জবেহ করার সময় হলো চার দিন। যিলহজ মাসের দশ, এগারো, বার ও তেরো তারিখ। এটাই উলামায়ে কেরামের নিকট সর্বোত্তম মত হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে। কারণঃ
এক. মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন ইরশাদ মুবারক করেনঃ-                                                                                                                                                          لِّيَشْهَدُوا۟ مَنَـٰفِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا۟ ٱسْمَ ٱللَّهِ فِىٓ أَيَّامٍۢ مَّعْلُومَـٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلْأَنْعَـٰمِ
যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদের চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে মহান আল্লাহ পাক উনার নাম উচ্চারণ করতে পারে।’ [পবিত্র সূরা হজ্ব শরীফঃ পবিত্র আয়াত শরীফ ২৮]

এ আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় ইমাম বোখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেনঃ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেনঃ এ আয়াত শরীফে নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে বুঝায় কোরবানির দিন ও তার পরবর্তী তিন দিন।’ [ফাতহুল বারী, ২য় খন্ড, পৃ-৫৬১]

অতএব এ দিনগুলো মহান আল্লাহ পাক উনার কোরবানির পশু জবেহ করার জন্য নির্ধারণ করেছেন।

, আইয়ামে তাশরীকের প্রতিদিন জবেহ করা যায়।’ [আহমদ শরীফ- ৪/৮২, হাদিস শরীফটি সহিহ]

আইয়ামে তাশরীক বলতে কোরবানির পরবর্তী তিন দিনকে বুঝায়।

কোরবানির পরবর্তী তিন দিনে সওম পালন জায়েজ নয়। এ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে এ তিন দিনে কোরবানি করা যাবে।

*রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলিহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ আইয়ামে তাশরীক হলো খাওয়া, পান করা ও মহান আল্লাহ পাক উনার জিকির করার দিন।
এ দ্বারা বুঝে নিতে পারি যে, যে দিনগুলো মহান আল্লাহ পাক তিনি খাওয়ার জন্য নির্ধারণ করেছেন সে দিনগুলোতে কোরবানির পশু জবেহ করা যেতে পারে।

সাহাবায়ে কেরামগণ উনাদের আমল দ্বারা প্রমাণিত হয়, কোরবানির পরবর্তী তিনদিন কোরবানির পশু জবেহ করা যায়। ইবনুল কায়্যিম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেনঃ হযরত আলি কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম তিনি বলেছেনঃ কোরবানির দিন হলো ঈদুল আজহার দিন ও তার পরবর্তী তিন দিন।অধিকাংশ ইমাম ও আলেমদের এটাই মত। যারা বলেন, কোরবানির দিন হলো মোট তিন দিন; যিলহজ মাসের দশ, এগারো ও বার তারিখ। এবং বার তারিখের পর জবেহ করলে কোরবানি হবে না, তাদের কথার সমর্থনে কোন প্রমাণ নেই ও মুসলিমদের ঐক্যমত (ইজমা) প্রতিষ্ঠিত হয়নি। [যাদুল মাআদ, ২য় খন্ড, পৃ-৩১৯]

মৃত ব্যক্তির পক্ষে কোরবানিঃ মূলত কোরবানির প্রচলন জীবিত ব্যক্তিদের জন্য। যেমন আমরা দেখি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উনার সাহাবাগণ নিজেদের পক্ষে কোরবানি করেছেন। অনেকের ধারণা কোরবানি শুধু মৃত ব্যক্তিদের জন্য করা হবে। এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। তবে মৃত ব্যক্তিদের জন্য কোরবানি করা জায়েজ ও একটি সওয়াবের কাজ। কোরবানি একটি সদকা। আর মৃত ব্যক্তির নামে যেমন সদকা করা যায় তেমনি তার নামে কোরবানিও দেয়া যায়।

যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য সদকার বিষয়ে হাদিসে এসেছেঃ-                                    عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَجُلًا أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّ أُمِّيَ افْتُلِتَتْ نَفْسَهَا وَلَمْ تُوصِ، وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ، أَفَلَهَا أَجْرٌ، إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا؟ قَالَ: «نَعَمْ»
আয়েশা সিদ্দিকা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিতঃ এক ব্যক্তি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন হে মহান আল্লাহ পাক উনার রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার মা হঠাৎ ইন্তেকাল করেছেন। কোন অসিয়ত করে যেতে পারেননি। আমার মনে হয় তিনি কোন কথা বলতে পারলে অসিয়ত করে যেতেন। আমি যদি এখন উনার পক্ষ থেকে সদকা করি তাতে কি তার সওয়াব হবে ? তিনি উত্তর দিলেনঃ হ্যাঁ। [মুসলিম শরীফ-১০০৪]

মৃত ব্যক্তির জন্য এ ধরনের সদকা ও কল্যাণমূলক কাজের যেমন যথেষ্ট প্রয়োজন ও তেমনি তাঁর জন্য উপকারী।

এমনিভাবে একাধিক মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াব প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি কোরবানি করা জায়েজ আছে। অবশ্য যদি কোন কারণে মৃত ব্যক্তির জন্য কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে তাহলে তার জন্য পূর্ণ একটি কোরবানি করতে হবে।

অনেক সময় দেখা যায় ব্যক্তি নিজেকে বাদ দিয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য কোরবানি করেন। এটা মোটেই ঠিক নয়। ভাল কাজ নিজেকে দিয়ে শুরু করতে হয় তারপর অন্যান্য জীবিত ও মৃত ব্যক্তির জন্য করা যেতে পারে। যেমন হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে এসেছেঃ আয়েশা সিদ্দিকা আলাইহাস সালাম ও আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদের থেকে বর্ণিত যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোরবানি দিতে ইচ্ছা করলেন তখন দুটো দুম্বা ক্রয় করলেন। যা ছিল বড়, হৃষ্টপুষ্ট, শিংওয়ালা, সাদা-কালো বর্ণের এবং খাসি। একটি তিনি উনার ঐ সকল উম্মতের জন্য কোরবানি করলেন; যারা মহান আল্লাহ পাক উনার একত্ববাদ ও তার রাসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েছে, অন্যটি উনার নিজের ও পরিবার বর্গের জন্য কোরবানি করেছেন। [ইবনে মাজা শরীফ]

মৃত ব্যক্তি যদি তার সম্পদ থেকে কোরবানি করার অসিয়ত করে যান তবে তার জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।

অংশীদারির ভিত্তিতে কোরবানি করাঃ  যাকে ভাগে কোরবানি দেয়াবলা হয়।

ভেড়া, দুম্বা, ছাগল দ্বারা এক ব্যক্তি একটা কোরবানি করতে পারবেন। আর উট, গরু, মহিষ দ্বারা সাত জনের নামে সাতটি কোরবানি করা যাবে।

অংশীদারি ভিত্তিতে কোরবানি করার দুটি পদ্ধতি হতে পারেঃ

(এক) সওয়াবের ক্ষেত্রে অংশীদার হওয়া। যেমন কয়েক জন মুসলিম মিলে একটি বকরি ক্রয় করল। অতঃপর একজনকে ঐ বকরির মালিক বানিয়ে দিল। বকরির মালিক বকরিটি কোরবানি করল। যে কজন মিলে বকরি খরিদ করেছিল সকলে সওয়াবের অংশীদার হল।
(দুই) মালিকানার অংশীদারির ভিত্তিতে কোরবানি। দু জন বা ততোধিক ব্যক্তি একটি বকরি কিনে সকলেই মালিকানার অংশীদার হিসেবে কোরবানি করল। এ অবস্থায় কোরবানি শুদ্ধ হবে না। অবশ্য উট, গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি জায়েজ আছে।

মনে রাখতে হবে কোরবানি হল একটি এবাদত ও মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন উনার নৈকট্য লাভের উপায়। তাই তা আদায় করতে হবে সময়, সংখ্যা ও পদ্ধতিগত দিক দিয়ে শরিয়ত অনুমোদিত নিয়মাবলি অনুসরণ করে। কোরবানির উদ্দেশ্য শুধু গোশত খাওয়া নয়, শুধু মানুষের উপকার করা নয় বা শুধু সদকা (দান) নয়। কোরবানির উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন উনার একটি মহান নিদর্শন উনার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার নির্দেশিত পদ্ধতিতে আদায় করা।

তাই, আমরা দেখলাম কীভাবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোশতের বকরি ও কোরবানির বকরির মাঝে পার্থক্য নির্দেশ করলেন। তিনি বললেন যা সালাতের পূর্বে জবেহ হল তা বকরির গোশত আর যা সালাতের পরে জবেহ করা হয় তা কোরবানির গোস্ত।

কোরবানির পশু জবেহ করার নিয়মাবলিঃ কোরবানি দাতা নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবেহ করবেন, যদি তিনি ভালভাবে জবেহ করতে পারেন। কেননা রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে জবেহ করেছেন। আর জবেহ করা মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের নিজের কোরবানি নিজে জবেহ করার চেষ্টা করা উচিত।

ইমাম বোখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেনঃ সাহাবি আবু মুসা আশআরী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজের মেয়েদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন নিজ হাতে নিজেদের কোরবানির পশু জবেহ করেন।’ [ফাতহুল বারী ১০/২১]

উনার এ নির্দেশ দ্বারা প্রমাণিত হয় মেয়েরা কোরবানির পশু জবেহ করতে পারেন। তবে কোরবানি পশু জবেহ করার দায়িত্ব অন্যকে অর্পণ করা জায়েজ আছে। কেননা সহিহ মুসলিমের হাদিস শরীফে এসেছে রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেষট্টিটি কোরবানির পশু নিজ হাতে জবেহ করে বাকিগুলো জবেহ করার দায়িত্ব হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম উনাকে অর্পণ করেছেন। [মুসলিম শরিফঃ- ১২১৮]

জবেহ করার সময় যে সকল বিষয় লক্ষণীয়ঃ

(১) যা জবেহ করা হবে তার সাথে সুন্দর আচরণ করতে হবে, তাকে আরাম দিতে হবে। যাতে সে কষ্ট না পায় সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। পবিত্র হাদীছ শরীফে এসেছে ,সাহাবি শাদ্দাদ ইবনে আউস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত যে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি বলেছেন কোরবানি দাতা নিজের কোরবানির পশু নিজেই জবেহ করবেন, যদি তিনি ভালভাবে জবেহ করতে পারেন। কেননা রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে জবেহ করেছেন। আর জবেহ করা মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের নিজের কোরবানি নিজে জবেহ করার চেষ্টা করা উচিত।

ইমাম বোখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেনঃ সাহাবি আবু মুসা আশআরী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজের মেয়েদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন নিজ হাতে নিজেদের কোরবানির পশু জবেহ করেন।’[ ফাতহুল বারী ১০/২১] বলেছেনঃ মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন সকল বিষয়ে সকলের সাথে সুন্দর ও কল্যাণকর আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
إِنَّ اللهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ، وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ» ،
অতএব তোমরা যখন হত্যা করবে তখন সুন্দরভাবে করবে আর যখন জবেহ করবে তখনও তা সুন্দরভাবে করবে। তোমাদের একজন যেনো ছুরি ধারালো করে নেয় এবং যা জবেহ করা হবে তাকে যেন প্রশান্তি দেয়। [মুসলিম শরীফ-১৯৫৫]

(২) যদি উট জবেহ করতে হয় তবে তা নহর করবে। নহর হল উটটি তিন পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে আর সম্মুখের বাম পা বাধা থাকবে। তার বুকে ছুরি চালানো হবে। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেনঃ সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান অবস্থায় তাদের উপর তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর।’ [মুসলিম শরীফ-১৯৫৫]

ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেনঃ এর অর্থ হল তিন পায়ে দাঁড়িয়ে থাকবে আর সামনের বাম পা বাধা থাকবে। [তাফসীর ইবনে কাসির]

উট ছাড়া অন্য জন্তু হলে তা তার বাম কাতে শোয়াবে। ডান হাত দিয়ে ছুরি চালাবে। বাম হাতে জন্তুর মাথা ধরে রাখবে। মোস্তাহাব হল জবেহকারী তার পা জন্তুটির ঘারে রাখবে। যেমন ইতিপূর্বে আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত বোখারি শরীফ উনার হাদিস শরীফে আলোচনা করা হয়েছে।

(৩) জবেহ করার সময় বিসমিল্লাহ বলতে হবে।
কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেনঃ- فَكُلُوا۟ مِمَّا ذُكِرَ ٱسْمُ ٱللَّهِ عَلَيْهِ
অর্থাৎ, ‘যার উপর মহান আল্লাহ পাক উনার নাম মুবারক (বিসমিল্লাহ) উচ্চারণ করা হয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কর।’ [পবিত্র সূরা আনআম শরিফঃ আয়াত শরীফ ১১৮]
জবেহ করার সময় তাকবীর বলা মোস্তাহাব। যেমন হাদিসে এসেছেঃ- জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত তিনি বলেন একটি দুম্বা আনা হলো। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে জবেহ করলেন এবং বললেন বিসমিল্লাহ ওয়া আল্লাহু আকবর, হে আল্লাহ ! এটা আমার পক্ষ থেকে। এবং আমার উম্মতের মাঝে যারা কোরবানি করতে পারেনি তাদের পক্ষ থেকে। [আবু দাউদ শরীফ]

অন্য হাদিস শরীফ এসেছেঃ عَنْ أَنَسٍ قَالَ: «ضَحَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ، وَيُسَمِّي وَيُكَبِّرُ، لَقَدْ رَأَيْتُهُ يَذْبَحُهُمَا بِيَدِهِ وَاضِعًا عَلَى صِفَاحِهِمَا قَدَمَهُ» ، قُلْتُ: أَنْتَ سَمِعْتَهُ؟ قَالَ: نَعَمْ                                                                           নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি শিংওয়ালা ভেড়া জবেহ করলেন, তখন বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বললেন। [সুনানে দারামী- ১৯৮৮, হাদিস শরীফটি সহিহ]

জবেহ করার সময় বিসমিল্লাহ আল্লাহু আকবর পাঠের পরاللّهُمَّ هَذَا مِنْكَ وَلَكَ—(হে মহান আল্লাহ পাক এটা আপনার তরফ থেকে, আপনারই জন্য) বলা যেতে পারে। যার পক্ষ থেকে কোরবানি করা হচ্ছে তার নাম উল্লেখ করে দোয়া করা জায়েজ আছে। এ ভাবে বলা—‘হে মহান আল্লাহ পাক আপনি অমুকের পক্ষ থেকে কবুল করে নিন।যেমন হাদীছ শরীফে এসেছে আয়েশা সিদ্দিকা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরবানির দুম্বা জবেহ করার সময় বললেনঃ- بِاسْمِ اللهِ، اللهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ، وَآلِ مُحَمَّدٍ، وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ، ثُمَّ ضَحَّى بِهِ
মহান আল্লাহ পাক উনার নামে, হে মহান আল্লাহ পাক! আপনি হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উনার পরিবার-পরিজন এবং উনার উম্মতের পক্ষ থেকে কবুল করে নিন।’ [মুসলিম শরীফ- ১৯৬৭]

কোরবানির গোশত কারা খেতে পারবেনঃ- মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেনঃ- فَكُلُوا۟ مِنْهَا وَأَطْعِمُوا۟ ٱلْبَآئِسَ ٱلْفَقِيرَ
অতঃপর তোমরা উহা হতে আহার কর এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্থকে আহার করাও।’ [পবিত্র সূরা হজ্ব শরীফ পবিত্র আয়াত শরীফ ২৮]

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরবানির গোশত সম্পর্কে বলেছেনঃ- قَالَ: «كُلُوا وَأَطْعِمُوا وَادَّخِرُوا
তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ কর।’ [বোখারি শরীফ-৫৫৬৯]

আহার করাওবাক্য দ্বারা অভাবগ্রস্থকে দান করা ও ধনীদের উপহার হিসেবে দেয়াকে বুঝায়। কতটুকু নিজেরা খাবে, কতটুকু দান করবে আর কতটুকু উপহার হিসেবে প্রদান করবে এর পরিমাণ সম্পর্কে কোরআন শরীফ উনার আয়াত ও হাদিস শরীফে কিছু বলা হয়নি। তাই উলামায়ে কেরাম বলেছেনঃ কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজেরা খাওয়া, এক ভাগ দরিদ্রদের দান করা ও এক ভাগ উপহার হিসেবে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের দান করা মোস্তাহাব।

কোরবানির গোশত যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যাবে। কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা যাবে না’—বলে যে হাদিস শরীফ রয়েছে তার হুকুম রহিত হয়ে গেছে। তাই যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

এমনকি সালাফি ইমাম ইবনে তাইমিয়ার এই ব্যপারে একটি ব্যাখ্যা আছে। সে বলেছেঃ  সংরক্ষণ নিষেধ হওয়ার কারণ হল দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষের সময় তিন দিনের বেশি কোরবানির গোশত সংরক্ষণ করা জায়েজ হবে না। তখন সংরক্ষণ নিষেধসম্পর্কিত হাদিস অনুযায়ী আমল করতে হবে। আর যদি দুর্ভিক্ষ না থাকে তবে যতদিন ইচ্ছা কোরবানি দাতা কোরবানির গোশত সংরক্ষণ করে খেতে পারেন। তখন সংরক্ষণ নিষেধ রহিত হওয়াসম্পর্কিত হাদিস শরীফ অনুযায়ী আমল করা হবে।

কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া, চর্বি বা অন্য কোন কিছু বিক্রি করা জায়েজ নয়। কসাই বা অন্য কাউকে পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির গোশত দেয়া জায়েজ নয়।

হাদীছ শরীফে এসেছেঃ- عَنْ عَلِيٍّ، قَالَ: «أَمَرَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ أَقُومَ عَلَى بُدْنِهِ، وَأَنْ أَتَصَدَّقَ بِلَحْمِهَا وَجُلُودِهَا وَأَجِلَّتِهَا، وَأَنْ لَا أُعْطِيَ الْجَزَّارَ مِنْهَا» ، قَالَ: «نَحْنُ نُعْطِيهِ مِنْ عِنْدِنَا»
তার প্রস্তুত করণে তার থেকে কিছু দেয়া হবে না।’ [মুসলিম-১৩১৭] তবে দান বা উপহার হিসেবে কসাইকে কিছু দিলে তা না-জায়েজ হবে না।

অংশীদারী বা ভাগে কুরবানি দেওয়ার বিধান বা নিয়ম।

অংশীদারির ভিত্তিতে কুরবানী কারাকে ভাগে কুরবানী দেয়াবলা হয়। ভেড়া, দুম্বা, ছাগল দ্বারা এক পরিবারের পক্ষ থেকে একটা পশু কুরবানী করতে পারবেন। আর উট, গরু, মহিষ দ্বারা সাত জনের নামে সাতটি কুরবানী করা যাবে। তবে অংশীদারি ভিত্তিতে কুরবানী করার দুটি পদ্ধতি হতে পারেঃ

১. সওয়াবের ক্ষেত্রে অংশীদার হওয়া। যেমন-কয়েক জন মুসলিম মিলে একটি বকরি ক্রয় করল। অতঃপর একজনকে ঐ বকরির মালিক বানিয়ে দিল। বকরির মালিক বকরিটি কুরবানী করল। যে কজন মিলে বকরি খরিদ করেছিল সকলে সওয়াবের অংশীদার হলো।
২. মালিকানার অংশীদারির ভিত্তিতে কুরবানী। দুজন বা ততোধিক ব্যক্তি একটি বকরি কিনে সকলেই মালিকানার অংশীদার হিসেবে কুরবানী করল। এ অবস্থায় কুরবানী শুদ্ধ হবে না।

কিন্তু উট, গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কি জায়েজ না নাজায়েয? অর্থাৎ উট বা গরুর এক সপ্তাংশ একটি পরিবারের তরফ থেকে যথেষ্ট হবে কি? – সে ব্যাপারে উলামাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ বলেন, যথেষ্ট নয়। কারণ, তাতে ৭ জনের অধিক ব্যক্তির শরীক হওয়া বৈধ নয়। তা ছাড়া পরিবারের তরফ থেকে একটি পূর্ণ দম’ (জান) যথেষ্ট হবে। আর ৭ ভাগের ১ ভাগ পূর্ণ দমনয়। (ফাতাওয়া মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম, ৬/১৪৯)।
তবে অধিকাংশ গ্রহণযোগ্য ইমাম রহ্মতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের মতে একটি মেষ বা ছাগের মতই এক সপ্তাংশ উট বা গরু যথেষ্ট হবে। (শুমাইমিরী, মাজালিসু আশরি যিলহাজ্জাহ, পৃ. ২৬; আল-মুমতেইবনে উসাইমীন, ৭/৪৬২-৪৬৩)।

মূলত এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে উলামাগণ দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেনঃ

১ম পক্ষ: মুসাফির ও মুক্বীম উভয় অবস্থায় ১টি উট বা গরু বা মহিষে ৭ জন বা ৭টি পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করাকে যথেষ্ট মনে করেন।

২য় পক্ষ: মুসাফির অবস্থায় উট বা গরু বা মহিষে ৭ জন বা ৭জনের পক্ষ থেকে কুরবানী করাকে যথেষ্ট মনে করেন।

কিন্তু এ পক্ষ মুক্বীম উভয় অবস্থায় ১টি উট বা গরু বা মহিষে ৭টি পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করাকে যথেষ্ট মনে করেন না। এদের মতানুযায়ী, মুক্বীম অবস্থায় একটি পরিবারের পক্ষ থেকে একটি পশুই কুরবানী করতে হবে।

কুরবানীতে অংশগ্রহণ ও সাত ভাগা প্রসংগে প্রথম পক্ষের প্রমাণাদি ও বক্তব্যঃ অন্যান্য ইবাদতের ন্যায় কুরবানীকেও মহান আল্লাহ পাক বিভিন্নভাবে আদায় করার বিধান দান করেছেন। ফলে আমরা উট, গরু, ছাগল ,ভেড়া, দুম্বার যেকোন একটা কুরবানী করতে পারি, আবার সবগুলো একসাথেও করতে পারি। আবার এককভাবে উট, গরু, মহিষ কুরবানী করতে না পারলেও সাত জন অংশগ্রহণ করতে পারি। কিন্তু একটি জন্তুতে সাত জনের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে নানাবিধ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যেমন বলা হয়ে থাকে, শুধু সফরের অবস্থায় সাত জন অংশগ্রহণ করতে পারবে, তবে তাদের একই পরিবারের অন্তর্ভূক্ত হতে হবে, বিভিন্ন পরিবারের হলে নয়। এ বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই-

ইবনু আববাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে এক সফরে ছিলাম । এমতাবস্থায় কুরবানীর ঈদ উপস্থিত হলো। তখন আমরা সাতজনে একটি গরু ও দশজনে একটি উটে শরীক হলাম। (তিরমিযী শরীফ, নাসাঈ শরীফ, ইবনু মাজাহ শরীফ)।
হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একটি গরু সাতজনের পক্ষ কুরবানী করা যাবে। (তিরমিযী শরীফ)

হাদীছ শরীফে বর্ণিত সাতজনে একটি গরুতে শরীক হয়েছিলামএ সাতজন শব্দের অর্থ বুঝতেই অনেকে ভূল করেছেন এবং মনে করেছেন একটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাতের অধিক হলে সেই পরিবারের জন্য একটি গরু বা উট যথেষ্ট নয়; অথচ একটি গরু বা উট শুধু এক পরিবার নয়, বরং সাতটি পরিবারের জন্য যথেষ্ট । আর সেই পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা যতই হোক না কেনো। কারণ হাদীস শরীফে সাতজন বলতে সাতজন কর্তা ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যাদের প্রত্যেকে একেকটা পরিবারের মালিক। যেমন-আপনি এক পরিবারের কর্তা, সুতরাং আপনার উপরই কুরবানীর বিধান বলবৎ হবে । আপনার সন্তান ও স্ত্রীর উপর এ বিধান বলবৎ হবে না। তবে হ্যাঁ তাদের কারো নামে যদি এ পরিমাণ সম্পদ থাকে যে, তারা কুরবানী দেয়ার সমর্থ্য রাখে। তবে কারো কারো মতে তাদের উপর কুরবানীর বিধান বলবৎ হয়ে যাবে। তিরমিযী শরীফে লিখিত আবু আইয়ুব হতে বর্ণিত সহীহ হাদীস শরীফ দ্বারা এ কথাই সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, যা নিম্নরূপঃ

আতা বিন ইয়াসার রহ্মতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমি আবু আইয়ুব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাকে প্রশ্ন করলাম যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে কুরবানি কিভাবে করা হতো? তখন তিনি বললেন, এক ব্যক্তি তার ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে একটি একটি ছাগল কুরবনী করত, সেখান থেকে তারা খেত এবং অন্যদের খাওয়াত, আর মানুষ এভাবে আনন্দিত হতো ও গর্ববোধ করত। আর সে প্রথা বর্তমানকাল পর্যন্ত চলে আসছে।

ইমাম শাওকানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি নায়লুল আওতার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সঠিক কথা হচ্ছে যে, একটি ছাগল একটি পরিবারের থেকে যথেষ্ট হবে যদিও তারা ১০০ জনের পরিবার অথবা ততধিক হয়। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নাতের এটাই ফায়সালা। (তুহফাতুল আহওয়াযী, ৫/৯২)।

ইবনুল কাইয়িম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তরীক্বা হচ্ছে যে, একটি ছাগল এক ব্যক্তি ও তার পরিবারের সকল সদস্যের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে যদি তাদের সংখ্যা অনেক হয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী, ৫/৯১)।

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যুগে এক ব্যক্তি যেহেতু একটি ছাগলের কুরবানীতে অংশগ্রহণ করত ও সাত ব্যক্তি একটি গরু কিংবা উটে অংশগ্রহণ করত, সুতরাং সাধারণ ভাবেই বুঝা যায় যে, একটি ছাগল এক ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য যখন যথেষ্ট ছিল, তখন সাত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি গরু কেন যথেষ্ট হবে না। ইবনে আববাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হাদীছ শরীফে বর্ণিত যে সমস্ত সাহাবায়ে কেরামগণ সাতজন করে একটি গরুতে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের লোক ছিলেন।

জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘গরু সাত জনের পক্ষ হতে এবং উট সাত জনের পক্ষ হতে কুরবানী করা যাবে।’ (মুসলিম শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ)।

ভারতবর্ষের মুহাদ্দিস আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘অবশ্যই উট এবং গরুর কুরবানীতে বিভিন্ন পরিবারের অংশগ্রহণ প্রমাণিত যেমন ছাগলে একই পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ প্রমাণিত। (তুহফাতুল আহওয়াযী, ৫/৯৩)।

আল্লামা নবাব সিদ্দিক হাসান খান ভুপালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উট এবং গরুর কুরবানীতে সাত ব্যক্তির অংশগ্রহণ সঠিক যদিও তারা বিভিন্ন পরিবারের হয়ে থাকে। (আর-রওযাতুন নাদিয়াহ, পৃ. ১২৮)।

ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মন্তব্য করেন যে, ১টি জন্তুতে সাতজনের অংশগ্রহণের উপর বিজ্ঞ সাহাবা কেরামের আমল প্রমাণিত এবং পরবর্তীতে ইমাম সুফইয়ান সাওরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইবনুল মুবারাক রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আহমাদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইসহাক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর উপর আমল করেছেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী, পৃ ৮৮)।

তাছাড়া, একটি গরু যে সাতটি ছাগলের সমান তা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারাও প্রমাণিতঃ ইবনু আববাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ললাম উনার কাছে এসে বলল যে, আমার উপর একটি হজ্জের পশু কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে আছে কিন্তু আমি তা ক্রয় করতে পারছি না। তখন নবী করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নির্দেশ প্রদান করলেন যেন সে সাতটি ছগল ক্রয় করে সেগুলোকে যবেহ করে। (আহমাদ শরীফ, ইবনু মাজাহ)।

ইমাম নববী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যায় বলেন, একটি গরু সাতজনের পক্ষ যথেষ্ট হবে, আর প্রতিটা গরু সাতটি ছাগলের স্থলাভিষিক্ত হবে।

লক্ষনীয় যে, আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, ওবায়দুল্লাহ রহমানী মুবারকপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি, নবাব সিদ্দিক হাসান খান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখ উলামায়ে কিরাম কেউই কুরবানীর ভাগাভাগিতে অংশগ্রহণের সাথে সফরের কোন শর্তের কথা উল্লেখ করেননি।

এমনকি ওয়াহাবি সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ওলী পরিষদের স্থায়ী কমিটিনামক ফাতাওয়া বোর্ড ফাতাওয়া প্রদান করেছে যে, ‘একটি পরিবারের হোক কিংবা বিভিন্ন পরিবারের হোক এবং তারা আত্মীয়ই হোক কিংবা অনাত্মীয় হোক।’ (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়েমাহ, ১১/৪০১)।

আর ইবনু উসাইমীন বলে একটি ছাগল একজনের পক্ষে যথেষ্ট এবং উট এবং গরুর সাত ভাগের এক ভাগ ঐ পরিমাণ যথেষ্ট যে পরিমাণের জন্য একটি ছাগল যথেষ্ট। (আহকামুল উযহিয়্যাহ ওয়ায যাকাত, পৃ. ৭)।

দ্বিতীয় পক্ষের প্রমাণাদি ও বক্তব্যঃ

(ক) নিজের ও নিজ পরিবারের পক্ষ হতে একটি পশুই যথেষ্টঃ

এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীসে মা আয়িশা সিদ্দিকা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একটি শিংওয়ালা সুন্দর সাদা - কালো দুম্বা আনতে বললেন, অতঃপর এ দুআ পড়লেন-(মহান আল্লাহ পাক উনার নামে, হে মহান আল্লাহ পাক! আপনি হুযুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও উনার পরিবার-পরিজন এবং উনার উম্মতের পক্ষ থেকে কবূল করে নিন।এরপর উক্ত দুম্বা কুরবানী করলেন। (সহীহ মুসলীম শরীফ, হাদীস শরীফ নং ১৯৬৭)।

বিদায় হজ্জে আরাফার দিনে সমবেত জনমন্ডলীকে উদ্দেশ্য করে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লল্লাম বলেন, ‘হে জনগণ! নিশ্চয়ই প্রত্যেক পরিবারের উপরে প্রতি বছর একটি করে কুরবানী ও আতীরাহ।ইমাম আবু দাউদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘আতীরাহপ্রদানের হুকুম পরে রহিত করা হয়। [তিরমিযী শরীফ, আবু দাউদ শরীফ প্রভৃতি, মিশকাত শরীফ, হা/১৪৭৮; এ হাদীস শরীফটির সনদ শক্তিশালী’ (ইবনু হাজার, ফতহুল বারী, ১০/৬); সনদ হাসান, আলবানী, সহীহ নাসাঈ, হ/৩৯৪০; সহীহ আবু দাউদ, হা/২৪২১; সহীহ তিরমিযী, হা/১২২৫; সহীহ ইবনু মাজাহ, হা/২৫৩৩]।

সাহাবায়ে কেরামগণদের মধ্যে পরিবার পিছু একটি করে বকরী কুরবানী করার রেওয়াজ ছিল। যেমন- সাহাবী আবু আইয়ুব আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, ‘একজন লোক একটি বকরী দ্বারা নিজের ও নিজের পরিবারের পক্ষ হতে কুরবানী দিতেন। অতঃপর তা খেতেন ও অন্যকে খাওয়াতেন এবং এভাবে লোকেরা বড়াই করত। এ নিয়ম নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার যুগ হতে চলে আসছে যেমন তুমি দেখছ। (সহীহ তিরমিযী শরীফ, হা/১২১৬; সহীহ ইবনু মাজাহ শরীফ, হা/২৫৪৬; মিরআত শরীফ, ২/৩৬৭, ৫/১১৪) ।

একই মর্মে ধনাঢ্য সাহাবী আবু সারীহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে সহীহ সনদে বর্ণিত ইবনু মাজার একটি হাদীস শরীফ উনার উদ্রিতি করে ইমাম শাওকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ‘সঠিক কথা হচ্ছে, একটি বকরি একটি পরিবারের পক্ষ হতে যথেষ্ট, যদিও সে পরিবারের সদস্য সংখ্যা শতাধিক হয় এবং এভাবেই নিয়ম চলে আসছে। (সহীহ ইবনু মাজাহ শরীফ, হ/২৫৪৭; নায়লুল আওতার শরীফ, ৬/১৪৪)।

মিশকাত শরিফের ভাষ্যকার ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘যারা একটি ছাগল একজনের জন্য নির্দিষ্ট বলেন এবং উক্ত হাদীস শরীফগুলোকে একক ব্যক্তির কুরবানীতে পরিবারের সওয়াবে অংশীদার হওয়ার তাবীলকরেন বা খাস হুকুম মনে করেন কিংবা হাদীস শরীফগুলোকে মানসূখবলতে চান, তাদের এ সব দাবী প্রকাশ্য সহীহ হাদীসের বিরোধী এবং তা প্রত্যাখ্যাত ও নিছক দাবী মাত্র । (মিরআত শরীফ, ২/৩৫১, ৫/৭৬)।

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় মুক্বীম অবস্থায় নিজ পরিবার ও উম্মতের পক্ষ হতে দুটি করে খাসি এবং হজ্জের সফরে মিনায় গরু ও উট কুরবানী করেছেন। (মুত্তাফাক্বুন আলাইহ, মিশকাত শরীফ, হা/১৪৫৩; বুখারী শরীফ, ১/২৩১; সহীহ আবূ দাউদ শরীফ, হা/১৫৩৯)।

(খ) কুরবানীতে শরীক হওয়াঃ আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, ‘আমরা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল উনার সাথে সাথে এক সফরে ছিলাম। এমতাবস্থায় কুরবানীর ঈদ উপস্থিত হলো। তখন আমরা সাতজনে একটি গরু ও দশজনে একটি উটে শরীক হলাম। (তিরমিযী শরীফ, নাসাঈ শরীফ, ইবনু মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ, হা/১৪৬৯; সনদ সহীহ)।

জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, ‘আমরা মহান আল্লাহ পাক উনার রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে হজ্জ ও উমরার সফরে সাথী ছিলাম। তখন আমরা একটি গরু ও উটে সাতজন করে শরীক হয়েছিলাম। (সহীহ মুসলিম শরীফ, হা/১৩১৮) সফরে সাত বা দশজন মিলে একটি পরিবারের ন্যায়, যাতে গরু ও উটের মতো বড় পশু যবেহ ও কুটাবাছা এবং গোশত বণ্টন সহজ হয়। জমহুর বিদ্বানগণের মতে হজ্জের হাজিদের ন্যায় কুরবানীতেও শরীক হওয়া চলবে। (মিরআত শরীফ, ২/৩৫৫, ৫/৮৪)।

আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, নুরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হজ্জের সফরে মিনায় নিজ হাতে ৭টি উট (অন্য বর্ণনায় এরও অধিক) দাড়ানো অবস্থায় নহরকরেছেন এবং মদীনায় (মুক্বীম অবস্থায়) দুটি সুন্দর শিংওয়ালা খাসি কুরবানী করেছেন। মা আয়েশা সিদ্দিকা আলাইহাস সালাম বলেন, বিদায় হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ললাম উনার সফরসঙ্গী স্ত্রী ও পরিবারের পক্ষ হতে একটি গরু কুরবানী করেন। (বুখারী শরীফ, ১/২৩১; সহীহ আবু দাউদ শরীফ, হা/১৫৩৯) অবশ্য মক্কায় (মিনায়) নহরকৃত উটগুলো সাহাবীগণের পক্ষ থেকেও হতে পারে।

আলোচনাঃ ইবনু আববাস রদ্বিইয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হাদীস শরীফটি নাসাঈ শরীফ, তিরমিযী শরীফ ও ইবনু মাজাহ শরীফে, জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত হাদীস শরীফটি সহীহ মুসলিম শরীফ ও আবু দাউদ শরীফে এবং আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত হাদীস শরীফটি সহীহ বুখারীতে সংকলিত হয়েছে। সহীহ মুসলিম ও সহীহ বুখারী শরীফে যথাক্রমে হজ্জমানসিকঅধ্যায়ে এবং সুনানে কুরবানীঅধ্যায়ে হাদীস শরীফগুলো এসেছে। যেমনঃ-

(১) তিরমিযী কুরবানীতে শরীক হওয়াঅধ্যায়ে ইবনু আববাস, জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ও হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম থেকে মোট তিনটি হাদী এনেছেন।

(২) ইবনু মাজাহ শরীফ উক্ত মর্মের শিরোনামে ইবনু আববাস, জাবির, আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়লা আনহুম  ও মা আয়েশা সিদ্দিকা আলাইহাস সালাম হতে যে পাঁচটি হাদীছ শরীফ (৩১৩১-৩৪ নং) এনেছেন, তার সবগুলোই সফরে কুরবানী সংক্রান্ত।

(৩) নাসাঈ শরীফে কেবলমাত্র ইবনু আববাস ও জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়লা আনহুম উনাদের থেকে পূর্বের দুটি হাদীস শরীফ (২৩৯৭-৯৮ নং) এনেছেন।

(৪) আবু দাউদ শরীফে শুধুমাত্র জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর পূর্ববর্ণিত সফরে কুরবানীর হাদীস শরীফটি এনেছেন। তিনটি সহীহ সনদে (২৮০৭-৯ নং), যার মধ্যে ২৮০৮ নং হাদীস শরীফটিতে কোন ব্যাখ্যা নেই।

বিভ্রাটের কারণঃ মিশকাত শরীফে ইবনু আববাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর সফরের হাদীস শরীফটি (১৪৬৯ নং) এবং জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণিত ব্যাখ্যাশুন্য হাদীস শরীফটি (১৪৫৮ নং ) সংকলিত হয়েছে। সম্ভবত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণিত মুত্বলাক্ববা ব্যাখ্যাশুন্য হাদীস শরীফটিকে ভিত্তি করেই মুক্বীম অবস্থায় গরু বা মহিষে সাতভাগা কুরবানীর নিয়ম চালু হয়েছে। অথচ, ভাগের বিষয়টি সফরের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা ইবনু আববাস ও জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণিত বিস্তারিত হাদীসে শরীফে উল্লেখিত হয়েছে। (মিশকাত শরীফ, হা/১৪৬৯; মুসলিম শরীফ, হা/১৩১৮; বুখারী শরীফ, ১/২৩১) আর একই রাবীর বর্ণিত সংক্ষিপ্ত হাদীস শরিফের স্থলে বিস্তারিত ও ব্যাখ্যা সম্বলিত হাদীস শরীফ দলীলের ক্ষেত্রে গ্রহণ করাই মুহাদ্দিসগণের সর্ববাদীসম্মত রীতি।

তাছাড়া, মুক্বীম অবস্থায় মদীনায় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরাম কখনো ভাগে কুরবানী করেছেন বলেও জানা যায় না। ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি কুরবানীতে শরীক হওয়ার বিষয়টিকে মাকরূহ মনে করতেন। (মুয়াত্বা মালেক, পৃ. ২৯৯)।

উভয় পক্ষের প্রদানকৃত দলীল সমূহের পর্যালোচনাঃ মুক্বীম অবস্থায় সাতটি পরিবারের সকল সদস্যের পক্ষ থেতে সাতটি ভাগ দিয়ে একটি উট বা গরু বা মহিষ ক্রয় করে করে কুরবানী করার ব্যাপারে উপরে উল্লেখিত উভয় পক্ষের উপস্থাপিত প্রমাণিত প্রমাণাদিকে বিশ্লেষণমূলক পর্যলোচনা করলে যে বিষয়টি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়, তা হচ্ছে, জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণিত আবু দাউদ শরিফের ব্যাখ্যা শূন্য হাদীস শরীফটির কারণেই মুসাফির ও মুক্বীম অবস্থায় কুরবানীতে ভাগাভাগি নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রথমতঃ এ হাদীস শরীফটিতে কেবল বলা হচ্ছে, ‘গরুতে সাতজন আর উটে সাতজন
এখানে সফর না মুক্বীম তা বলা হয়নি। কিন্তু এটি যে সফরের হাদীস তা জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণিত অন্যান্য হাদীসগুলো দ্বারা প্রমাণিত।

দ্বিতীয়তঃ জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণিত সফরের হাদীস শরীফগুলো ইমাম আবূ দাউদ যে অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন এ ব্যাখ্যাশূন্য হাদীস শরীফটিও সে অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন।

সর্বোপরি, উভয় পক্ষের মতের স্বপক্ষে উপস্থাপিত দলীলাদি পর্যালোচনা করলে আমাদের সামনে তিনটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, তা হলোঃ

১. সফর ও মুক্বীম অবস্থায় একটি পরিবারের পক্ষ থেকে একটি পশু কুরবানি করার ব্যাপারে উভয় পক্ষই একমত।

২. ভাগে কুরবানি জায়েয।

৩. সফর ও মুক্বীম অবস্থায় সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ভাগে একটি পশু কুরবানি করা যায়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু কথা না বললেই নয়, তা হলো- হাদীছ শরীফে বলা হয়েছে, ‘‘সাতজনের পক্ষ থেকে’ (মুসলিম, মিশকাত, হা/১৪৫৮), কিন্তু আমাদের সমাজে কুরবানি করা হচ্ছে সাত পরিবারের পক্ষ থেকে। বলা যায়, সফর অবস্থাতেও সাত পরিবারের পক্ষ থেকে অনুমতি নেই। আরো স্পষ্ট হলো, সাত জনের প্রেক্ষাপট কেবল সফর অবস্থায় সৃষ্টি হয়। মুক্বীম অবস্থায় কুরবানী পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত, যেমন- নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম করতেন।

মূলত, এক্ষেত্রে সফরের হাদীসগুলোকে আম হিসেবে ধরা যাচ্ছে না। কারণ, এ হাদীস শরীফগুলো রাসূলুল্লা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও উনার সাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ মুক্বীম অবস্থায় যে ভাগে কুরবানী করতেন, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন হাদীস শরীফ নেই। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বছর দুটি করে খাসি কুরবানী করতেন। (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত, হা/১৪৫৩) অথচ, দঃখের বিষয় বর্তমানে কেবল সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে নয়; বরং মুক্বীম অবস্থায় সাত পরিবারের বর্তমানে কেবল সাত ব্যক্তির পক্ষ থেকে নয়; বরং মুক্বীম অবস্থায় সাত পরিবারের ৭-এর অধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে একটি গরু কুরবানী দেওয়া হচ্ছে।

আজকাল পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ছাগল কুরবানীর সাথে একটি গরুর ভাগা নেওয়া হচ্ছে মূলত গোশত বেশী পাবার স্বার্থে। নিয়তযখন গোশত খাওয়া, তখন কুরবানীর উদ্দেশ্য কিভাবে হাছিল হবে? কুরবানী হলো পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার সুন্নাত, যা তিনি পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার জীবনের বিনিময়ে করেছিলেন। আর তা ছিলো মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ হতে পাঠানো একটি পশুর জীবন অর্থাৎ দুম্বা। অতএব ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নাতের অনুসরণে নিজের ও নিজ পরিবারের পক্ষ হতে মহান আল্লাহ পাক উনার রাহে একটি জীবন তথা একটি পূর্ণাঙ্গ পশু কুরবানী দেওয়া উচিত, পশুর দেহের কোন খন্ডিত অংশ নয়।

পরিশেষে, মনে রাখতে হবে কুরবানী হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত ও মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন উনার নৈকট্য লাভের উপায়। তাই তা আদায় করতে হবে সময়, সংখ্যা ও পদ্ধতিগত দিক দিয়ে শরীয়ত অনুমোদিত নিয়মাবলি অনুসরণ বা শুধু সদকা (দান) নয়।। কুরবানির উদ্দেশ্য শুধু গোশত খাওয়া নয়, শুধু মানুষের উপকার করা নয় বা শুধু সদকা (দান) নয়। কুরবানির উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন উনার একটি মহান নিদর্শন এবং উনার রাসূলের নির্দেশিত পদ্ধতিতে আদায় করা। ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালা।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: