3.15.2017

পবিত্র দ্বীন ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের পরে স্বামীর নামের অংশ লাগাতে বাধ্য করা অনৈসলামিক কুফুরী

আমাদের দেশেও ভিবিন্ন সেকুল্যার দেশের মতো নতুন এক রিতি চালু হয়েছে ইদানিং যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয় যেমন মুসলিম নারীদের অনেকেই বিয়ের পর নিজের নাম পরিবর্তন করে স্বামীর নামকে নিজের নামের অংশ বানাতে অনেক কে বাধ্য করা হয়। আজকের দুনিয়ায় ইহা একটি মারাত্মক ফিত্নায় পরিণত হয়েছে। যেমনঃ মুহম্মদ বদিউজ্জামান উনার মেয়ের নাম আক্বিকা করে রেখেছিলেন আহমদ শায়লা জামান কিন্তু দেখা গেলো মুহম্মদ বদিউল কবির নামে একজনের সাথে তার বিয়ের পর তার নাম হয়ে যায় মিসেস কবির বা শায়লা কবির। কিন্তু জেনে রাখা উচিৎ যে ইসলামী শরীআর দৃষ্টিতে এটা ঠিক নয়। মুসলিম নারীদের উপর ওয়াজিব হচ্ছে বিয়ের পরেও তারা তাদের পৈতৃক নাম ঠিক রাখা। কারণ এটা তার একেবারেই নিজস্ব, এখানে স্বামীর কোন শেয়ার নেই। নামই তার বংশ পরিচয় বহন করে। আজকে স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে এবং আরেকজনের সাথে বিবাহ হলে কি বার বার নাম পাল্টবে? তার চেয়েও বড় কথা আমরা যদি উম্মুল মুমিনিন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের দিকে তাকাই তাহলে উনাদের ১৩ জনের কারো নামের সাথে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নামের নয় বরং উনাদের পিতার অংশই বিদ্যমান পাই যেমন আয়শা সিদ্দিকা আলাইহাস সালাম, আর যদি রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কলিজার টুকরা আমাদের নয়নের মনি মা ফাতেমে তুজ্জ যাহ্‌রা উনার দিকেও তাকাই সেইখানেও পাবনা।

অথচ আমরা বিদেশি সংস্কৃতি বিশেষ করে পশ্চিমাবিশ্বকে অনুসরণ করতে গিয়ে এমন অনেক বিষয় অনুকরণ করছি যেগুলোর বিষয়ে ইসলামী শরীআর কোন ভিত্তি নেই। বরং সেগুলো একান্তই তাদের চর্চিত বিষয় যা আমাদের জন্য হারাম কারন রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে বা তাদের কৃষ্টি কালচার অনুসরন করে সে তাদেরই দলভুক্ত বা অন্তর্ভুক্ত (আবু দাউদ শরীফঃ ২/৫৫৯)। অথচ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তি হলো পবিত্র আল কুরআন এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব সরকারে দোআলম নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র সুন্নাহ মুবারক এবং উনার আদেশ নির্দেশ, কর্ম ও অনুমোদন। অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কেরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম ও তাবেয়ীন রহিমাহুল্লাহ আলাইহিমদের কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি যাকে শরীআর পরিভাষায় সুন্নাহবলা হয়। ইসলামী শরীআর এ দুটি অন্যতম প্রধান উৎসের কোথাও এর অনুমোদন বা সমর্থন পাওয়া যায় না। নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের জীবনাচারেও এর কোন নজির নেই। যদি স্বামীর নামে পরিচিত হওয়া বা স্বামীর নাম নিজের নামের সাথে যুক্ত করা আভিজাত্য বা মর্যাদার ব্যাপার হতো, তাহলে আমি উপরে আগেও বলেছি যে আমাদের প্রিয়নবী সাহাবায়ে কেরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম আহলিয়া তথা উম্মাহাতুল মুমিনীন আলাইহিন্নাস সালামগণও উনাদের নামের সাথে নূরে মুজাসসাম হাবিবুল্লাহ হুযুরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম যুক্ত করতেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো উনাদের কেউই তা করেননি। বরং প্রত্যেকে নিজেদের পিতার নামেই পরিচিত ছিলেন যদিও উনাদের কারো কারো কারো পিতা কাফির ছিল। সুতরাং আমরা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এমন কোন বিষয় অবলম্বন করতে পারি না যার অনুমোদন উত্তম যুগে ছিল না। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা আলাইহাস সালাম তিনি উনার নিকাহ মুবারকের পর উনার পৈত্রিক নাম পরিবর্তন করে আয়েশা মুহাম্মদরাখেননি। বরং তিনি উনার পিতা আবুবকর সিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেছেন।

বাবা কর্তৃক প্রদত্ত নাম ঠিক রাখার জন্য মহান আল্লাহ পাক সুবাহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন এর বিপরিতে গিয়ে স্বামীর নাম রাখতে বাধ্য করা কুফুরি। কারণ ঐ নামটি ব্যক্তির বংশের পরিচায়ক। আর সবথেকে বড় কথা হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক তিনি মহাগ্রন্ত পবিত্র আল কুরআন বলছেনঃ তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক। এটাই মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে ন্যায়সঙ্গত। যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে তোমাদের কোন বিচ্যুতি হলে তাতে তোমাদের কোন গোনাহ নেই, তবে ইচ্ছাকৃত হলে ভিন্ন কথা। মহান আল্লাহ পাক তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।(আল-কুরআন, ৩৩:৫) এই আয়াত শরীফটি পালকপুত্রদেরকে তাদের প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেননা যারা বর্তমানে তাদের লালন-পালন করছেন বা ভরণ-পোষণ যোগান দিচ্ছেন, প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের পিতা নন। বরং যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছেন তারাই তাদের আসল পিতা। অনুরূপভাবে মেয়েরাও তাদের  পিতার পরিচয়ে পরিচিত হবেন স্বামীর পরিচয়ে নন। এখানে পালক পুত্রকে প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ প্রমাণ করে যে, স্ত্রীদেরকেও তাদের পিতার নামে ডাকতে হবে কারন পবিত্র আল কুরআন উনার একটি আয়াত শরীফের অনেক দিক থাকে যা কুরআন সুন্নাহর জ্ঞানে পরিপূর্ণ আলেম উলামারা জানেন।

হযরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে বলতে শুনেছেন যে, রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেনঃ যে কেউ নিজেকে বাবার নাম ছাড়া অন্য নামে ডাকবে তার উপর মহান আল্লাহ পাক, ফিরিশতা আলাইহিমুস সালাম ও সমগ্র মানুষের লানত বর্ষিত হবে।(মুসনাদে আহমাদ) ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও এই হাদীস শরীফটি হযরত সাদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

হযরত সাদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত আবু বাকরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, উনারা প্রত্যেকে বলেছেনঃ আমার দুকান শুনেছে এবং আমার অন্তর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এ কথা সংরক্ষণ করেছে যে, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজেকে নিজের পিতা ছাড়া অন্যের সাথে সংযুক্ত করে তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে।(ইবনে মাজাহ শরীফ) আবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেনঃ যে কেউ নিজের বাবা ব্যতীত অন্যের পরিচয়ে পরিচয় দেয় সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না, যদিও জান্নাতের সুঘ্রাণ সত্তর বছর হাঁটার রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে। (মুসনাদে আহমাদ শরীফ)

এমন অনেক হাদীস শরীফ রয়েছে যেখানে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নারীদেরকে তাদের পিতার নামে ডেকেছেন। যখন পবিত্র আল কুরআনের আয়াত শরীফ আপনি আপনার নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করে দিন(আল-কুরআন, ২৬:২১৪) নাজিল হয়, তখন রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার আত্মীয় স্বজনদের প্রত্যেককে তাদের পিতার নামের ডেকেছিলেন বিস্তারিত ব্যখা করে বোঝানোর জন্যে।

দ্বিতীয় খলীফা হযরত ফারূকে আজম আলাইহিস সালাম উনার শাসনামলের একটি বিখ্যাত ঘটনা হাদীস শরীফের বর্ণনায় এসেছে। তা হলো তিনি একরাতে যখন প্রজাদের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য বের হলেন তখন একজন মহিলার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যিনি স্বামীর বিরহে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিলেন। তিনি পরদিন সকালে মহিলাটির খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য লোক পাঠালেন। তাঁকে বলা হলো এ মহিলা হলেন অমুকের মেয়ে অমুক। তাঁর স্বামী আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে রয়েছেন। (সুনানে সাঈদ ইবনে মানসুর) এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো মহিলাটি বিবাহিত ছিলেন। তাঁর পরিচয়ের ক্ষেত্রে বলা হলো অমুকের মেয়ে অমুক। একথা বলা হলো না যে, অমুকের স্ত্রী অমুক।

আরো যে সকল কারণে নারীদের বাবার নামে পরিচিত হওয়া উচিত তা হলোঃ
১. স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে কোন রক্ত সম্পর্ক থাকে না কিন্তু বাবা-মেয়ের রক্ত সম্পর্ক চিরদিনের।
২. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে মনোমালিন্য হলে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে তখন এই নাম থাকে না।
৩. স্বামী  মারা গেলে স্ত্রী অন্য পুরুষকে বিয়ে করতে পারে, তখন এই নামের কী দশা হবে তা সহজেই অনুমেয়।
৪. স্বামী তো বিয়ের পর নিজের নাম পরিবর্তন করে না, তাহলে নারী কেন করবে? এটা কি নারী অধিকারের লংঘন নয়?

আলোচ্য লিখায় নতুন একটি বিষয়কে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করা হলো। মুসলিম সমাজের উচিত ইসলামকে পুরোপুরি অনুসরণ করা। আর যারা পরিপূর্ণ ইসলাম মানতে চান তাদের উচিত এসব বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকা। যাতে করে কোন অজুহাতেই আমরা সত্য ও সঠিক পথ সিরাতুল মুস্তাকীমথেকে বিচ্যুত না হই।


মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের সবাইকে পবিত্র দ্বীন ইসলামের সঠিক জ্ঞান অর্জনের তৌফিক দিন আমিন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: