3.07.2017

আপনাদের কি পাবনা-সিরাজগঞ্জের প্রজাবিদ্রোহের কথা মনে আছে?

বিদ্রোহটা হয়েছিল সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে। তৎকালীন শাহজাদপুরের জমিদার ছিল ঠাকুর পরিবার (রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবার)। এই ঠাকুর পরিবার যে কতটা অত্যাচারি প্রজা-শোষক জমিদার ছিল তা তাদের করের মাত্রা দেখলেই বুঝা যায়। তখনকার আমলে আশপাশের জমিদারির তুলনায় শাহজাদপুরের খাজনার হার ছিল দ্বিগুন এবং অযৌক্তিকও বটে। ১৮৭২ সালে ঠাকুররা এই বাড়তি খাজনার ওপর আরো অধিকমাত্রায় খাজনার হার বাড়িয়ে দেন। এই বাড়তি খাজনা জমির বিঘাপ্রতি এক টাকা থেকে বেড়ে একবারে একটাকা আট আনায় গিয়ে দাঁড়াল। এতেও ঠাকুর পরিবারের লোভ সংবরণ হলো না। এই বাড়তি আট আনার ওপর আরো চার আনা খাজনা বিঘাপ্রতি বাড়ানো হলো। যার ফলে প্রজারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিলেন।

ঠাকুর পরিবার শাহজাদপুরের জমিদারি ক্রয় করার পরথেকেই নানা অজুহাতে প্রজাদের ওপর খাজনা বাড়াতেই থাকে। যেমন স্বপন বসু ঠাকুর পরিবারের বিভিন্ন কর সম্পর্কে লিখেছেন, “জমিদারবাবুরা নতুন নতুন যেসব কর গরীব প্রজাদের কাছ হতে আদায় করতেন তা হৃদয় বিদারক । নানা নামের করগুলি ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত । যেমন গ্ররুর গাড়ি করে মাল পাঠালে ধুলো উড়তো, তাই গাড়ির মালিককে যে কর দিতে হোত তার নাম ধুলট। প্রজা নিজেদের জায়গায় গাছ লাগালেও তাকে একটি কর দিতে হোত, তার নাম চৌথ। গরীব প্রজারা আখেড় গুড় তৈ্রী করলে যে কর লাগতো তা ইক্ষুগাছ কর। হতভাগ্য প্রজাদের গরু মোষ মরে গেলে ভাগাড়ে সেই মৃত পশু ফেলার পর যে কর লাগতো তা হোল ভাগাড়ে কর। নৌকোয় মাল উঠালে বা নামালে সে করের নাম ছিল কয়ালী। ঘাটে নৌকা ভিড়ালে একটি কর লাগতো তার নাম খোটাগাড়ি কর। জমিদারের সঙ্গে দেখা করতে হলে একরকমের কর দিয়ে সম্মান জানাতে হোত, তার নাম নাজরানা। জমিদার কোনও কারণে হাজতে গেলে তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে প্রজাদের একটি কর দিতে হোত, তার নাম গারদ সেলামিইত্যাদি।” (গণ অসন্তোষ ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ, পৃষ্টা-১৬৫)

খাজনা আদায় করার ব্যাপারে ঠাকুররা ছিলো অন্যদের চেয়েও বেশি মাত্রায় কঠোর। প্রজারা নির্ধারিত কর না দিতে পারলে তা আদায় করার জন্য ঠাকুর পরিবার প্রাইভেট সশস্ত্র বাহিনীও পুষতো।

বিদ্রোহের সময় প্রজারা ঠাকুরবাড়িতে অত্যাচারের প্রতিশোধ নেবার বিক্ষিপ্ত চেষ্টা করলে তা ব্যর্থ হয়।

ক্ষিপ্ত প্রজাদের ভয়ে ঠাকুরবাড়ি থেকে বৃটিশ সরকারকে জানানো হোল যে, একদল শিখ বা পাঞ্জাবী প্রহরী পাঠাবার ব্যাবস্থা করা হোক । মঞ্জুর করা হল সঙ্গে সঙ্গে । সশস্ত্র শিখ প্রহরী দিয়ে ঠাকুরবাড়ি রক্ষা করা হোল আর কঠিনহাতে নির্মম পদ্ধতিতে বর্ধিত কর আদায় করাও সম্ভব হল । ঠাকুরবাড়ির জন্য শ্রী অশোক চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘অথচ এরাও কৃষকদের উপর থার্ড ডিগ্রি (প্রচন্ড প্রহার) করতে পিছপা হননি, কর ভার চাপানোর প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অধিকার করেছেন, পরন্তু ভয় দেখিয়ে কর আদায়ের জন্য এবং বিদ্রোহীদের মোকাবেলার জন্য একদল শিখপ্রহরী নিযুক্ত করেছিলেন। (প্রাক্ ব্রিটিশ ভারতীয় সমাজ, পৃষ্টা-১৩২)


তখনকার জমিদারদের মধ্যে ঠাকুররাই ছিল সবচেয়ে অত্যাচারী জমিদার। প্রজাপীড়ক জমিদার ঠাকুর পরিবার সম্পর্কে বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ডঃ আহমদ শরীফ পশ্চিম বাংলার স্বাধীন বাংলাপত্রিকায় একটি ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। তিনি বলেনজমিদার হিসেবে ঠাকুর পরিবার ছিল অত্যাচারী। গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল। বুট পরে প্রজাকে লাথি মেরেছেন,পায়ে দলেছেন দেবেন ঠাকুর।এটাই রেকর্ড করেছিল হরিনাশ মজুমদার। যিনি মহর্ষি বলে পরিচিত, তিনি এ রকমভাবে মানুষকে পদাঘাতে দলিত করেন। গ্রাম জ্বালাবার কথাও আছে। আবুল আহসান চৌধুরীর কাছে এর সমস্ত ডকুমেন্ট আছে। সমগ্র ঠাকুর পরিবার কখনো প্রজার কোনও উপকার করে নাই। স্কুল করা,দীঘি কাটানো এসব কখনো করে নাই। পদ্মার চরের মুসলমান প্রজাদের কাবু করার জন্য নমশূদ্র প্রজা এনে বসতি স্থাপনের সাম্প্রদায়িক বুদ্ধি ও কবির মাথা থেকে এসেছিল।কাঙাল হরিনাথ মজুমদার তার গ্রাম্য বার্তা প্রকাশিকাপত্রিকায় ঠাকুর পরিবারের প্রজা পীড়নেরর কথা লেখে ঠাকুর পরিবারের বিরাগভাজন হয়েছিল।” (দৈনিক বাংলাবাজার, ১৪ এপ্রিল ও ১মে ৯৭ দ্রষ্টব্য)


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: