11.21.2017

সুমহান বরকতময় ঐতিহাসিক পবিত্র পহেলা রবীউল আউওয়াল শরীফ ‘পবিত্র হিজরত মুবারক’ দিবস


মহান আল্লাহ পাক তিনি কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ মুবারক করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার নিদর্শন সম্বলিত দিবসগুলিকে স্মরণ করিয়ে দিন সমস্ত কায়িনাতকেনিশ্চয়ই এর মধ্যে ধৈর্যশীল ও শোকরগোজার বান্দা-বান্দীদের জন্য ইবরত ও নছীহত রয়েছে

সুমহান বরকতময় ঐতিহাসিক পবিত্র পহেলা রবীউল আউওয়াল শরীফ- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র মক্কা শরীফ থেকে পবিত্র মদীনা শরীফে পবিত্র হিজরত মুবারককরার সম্মানিত দিন হিজরতশব্দটি হিজরান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছেসাধারণভাবে দেশত্যাগ করাকে হিজরতবলা হয়সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার পরিভাষায় হিজরত বলা হয়, ফিতনা-ফাসাদের আশঙ্কায় অথবা সম্মানিত দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশত্যাগ করে অন্য কোনো দেশে গমন করামূলত সম্মানিত দ্বীন উনার কারণে কোনো দেশত্যাগ করাও হিজরতের অন্তর্ভুক্ত

সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার দুশমন কাফির-মুশরিকরা গোপনে বৈঠক করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, আগামীকাল ভোরবেলা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার পবিত্র হুজরা শরীফ থেকে যখন বাইরে বের হয়ে আসবেন তখন হঠাৎ হামলা করে উনাকে শহীদ করা হবেনাউযুবিল্লাহ! কাফির-মুশরিকদের এসব গোপন সিদ্ধান্তের কথা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জানতে পারেনকারণ তিনি তো ছহিবে মুত্তালা আলাল গাইবঅতঃপর সেই প্রতিক্ষিত সময়টি এলো যখন তিনি পবিত্র মক্কা শরীফ থেকে পবিত্র মদীনা শরীফে পবিত্র হিজরত মুবারক করার বিষয়ে পবিত্র ওহী মুবারক উনার মাধ্যমে নির্দেশ মুবারক পেলেনএদিকে পবিত্র হিজরত উনার ছয় মাস পূর্ব থেকেই তিনি হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম উনাকে জানিয়ে রাখেন যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম উনাকেও হিজরত করতে হবেতাই তিনি পূর্ব থেকেই হিজরত করার জন্যে দুটি উষ্ট্রী এবং কিছু পাথেয় তৈরি করে রাখেন

নির্দিষ্ট রাতে কাফিররা যখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হুজরা শরীফ ঘেরাও করলোরাত যখন গভীর হলো, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র হুজরা শরীফ থেকে বের হলেনসে সময় তিনি পবিত্র সূরা ইয়াসীন শরীফ উনার একটি পবিত্র আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করছিলেনতিনি এক মুঠো মাটি হাতে নিয়ে শাহাতিল ওয়াজুহ(মুখমন্ডল আচ্ছন্ন হয়ে যাক) এ কথা মুবারক বলে কাফির-মুশরিকদের দিকে ছুঁড়ে মারলেন এবং তাদের ব্যুহ ভেদ করে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে গেলেনসে সময় মহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক কুদরতে অবরোধকারীরা যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো; ফলে তারা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বেরিয়ে যেতে দেখতে পেলো নাপ্রথমে তিনি হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম উনার গৃহে গমন করলেন এবং সেখান থেকে উনাকে নিয়ে পবিত্র মক্কা শরীফ উনার বাইরে গিয়ে পবিত্র ছওর পর্বত গুহায় তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করলেন

ভোরবেলা কাফির-মুশরিকরা জানতে পেলো- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র মক্কা শরীফ ছেড়ে চলে গেছেনতারা উনার সন্ধানে চারদিকে ছুটাছুটি শুরু করলোতারা খুঁজতে খুঁজতে পবিত্র ছওরপর্বতের কাছে গেলোতাদের পদধ্বনি শুনে হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, ‘ইয়া রসূলাল্লাহ! ইয়া হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! কাফির-মুশরিকরা যদি আমাদেরকে দেখে ফেলে?’ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন- চিন্তার কোনো কারণ নেইকেননা মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের সঙ্গে রয়েছেনমহান আল্লাহ পাক উনার মুবারক কুদরতে গুহামুখে এমন কতকগুলো নিদর্শন মুবারক ফুটে উঠলো যে, তা দেখে কাফির-মুশরিকরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লোতাদের মনে ধারণা জন্মালো যে, এ গুহার ভেতরে কেউ প্রবেশ করেননিতাই তারা ফিরে গেলোসুবহানাল্লাহ! তিন দিন তিন রাত নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম উনারা সেখানে অবস্থান মুবারক করেনচতুর্থ দিন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ছওর পর্বত গুহা থেকে বের হয়ে এক রাত এক দিন পথ চললেনপরদিন দুপুর বেলা রোদের তেজ প্রখর হয়ে উঠলে বিশ্রামের জন্যে একটি বৃহদাকার পাথরের ছায়ায় উনারা কিছুক্ষণ অবস্থান মুবারক করলেনঅদূরেই একটি গোয়ালা ছিল; তার বকরী থেকে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি দুধ পান করলেন

অতঃপর সেখান থেকে তিনি আবার রওয়ানা হলেনতিনি সামনে পা মুবারক বাড়াতেই সোরাকা বিন জাশিম নামক জনৈক কুরাইশ হঠাৎ উনাকে দেখে ফেললোসে পুরস্কারের লোভে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্ধানে বেরিয়েছিলসে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখতে পেয়েই ঘোড়া ছুটিয়ে দিলোকিন্তু ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলসে আবার নিজেকে সামলে নিলো এবং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর হামলা করার জন্যে তৈরি হলোনাউযুবিল্লাহ! কিন্তু এবারও সামনে এগুতেই তার ঘোড়া হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে বসে গেলএবার সোরাকা শংকিত হয়ে উঠলো এবং বুঝতে পারলোব্যাপারটা মোটেই সুবিধাজনক নয়তার পক্ষে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর হামলা করা কিছুতেই সম্ভবপর নয়সে অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়লো এবং নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে আত্মসমর্পণ করে ক্ষমা ভিক্ষা চাইলোনূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেনসুবহানাল্লাহ!

নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক আগমন বার্তা পূর্বেই পবিত্র মদীনা শরীফ পৌঁছেছিলতাই গোটা পবিত্র মদীনা শরীফ উনার মুবারক শুভাগমনের জন্যে প্রতিক্ষমান ছিলেনছোট-বড় সবাই প্রতিদিন সকালে শহরের বাইরে গিয়ে জমায়েত হতেন এবং দুপুর পর্যন্ত ইন্তেজার করে ফিরে আসতেনঅবশেষে একদিন উনাদের সেই প্রতিক্ষিত শুভ মুহূর্তটি এসেই পড়লোদূর থেকে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তাশরীফ মুবারক নেয়ার আলামত দেখে গোটা শহরটি তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলোপ্রত্যেক প্রতিক্ষাকারী হৃদয় উজাড় করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে স্বাগত জানালেন এই বলে যে, “ত্বলায়াল বাদরু আলাইনা, মিন ছানিয়াতিল বিদায়িওয়াজাবাত শুকরু আলাইনা, মাদায়া লিল্লাহি দাঈসুবহানাল্লাহ!

নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খিদমত মুবারক করার সৌভাগ্য কে লাভ করবেন? এর সমাধান মোটেই সহজসাধ্য ছিল নাকিন্তু নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মুবারক সমাধান দিয়ে বললেন যে, আমার সম্মানিত উষ্ট্রী যে সৌভাগ্যবান ব্যক্তির গৃহের সামনে দাঁড়াবে, এ খিদমত মুবারক করার সৌভাগ্য তিনিই লাভ করবেনঘটনাক্রমে এ সৌভাগ্যটুকু লাভ করলেন হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুসুবহানাল্লাহ! বর্তমানে যেখানে মসজিদে নববী শরীফ অবস্থিত, উনার নিকটেই ছিল উনার মুবারক গৃহগৃহ মুবারকটি ছিল দ্বিতল বিশিষ্টনূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিশ্রাম মুবারকের জন্যে তিনি উপরের তলাটি পেশ করেনকিন্তু যিয়ারত প্রার্থীদের আসা-যাওয়ার সুবিধার্থে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিচের তলায় থাকা পছন্দ করলেননূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি প্রায় সাত মাস এখানে মুবারক অবস্থান করেনসুবহানাল্লাহ!

মূলকথা হলো সুমহান বরকতময় ঐতিহাসিক পবিত্র পহেলা রবীউল আউওয়াল শরীফ- নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র মক্কা শরীফ থেকে পবিত্র মদীনা শরীফে পবিত্র হিজরত মুবারককরার সম্মানিত দিনএ উপলক্ষে সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে- পবিত্র মীলাদ শরীফ, পবিত্র ক্বিয়াম শরীফ মাহফিল করে পবিত্র হিজরত মুবারকউনার আলোচনা মুবারক করে ইবরত-নছীহত হাছিল করাআর সরকারের জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে- পবিত্র হিজরত মুবারক উনার বিষয়টি সমস্ত পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি এ পবিত্র দিবসটি পালনের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: