11.17.2017

মিলাদুন্নবীর যারা বিরোধিতা করে তারা কি কাফের আবু লাহাবের সমপরিমাণ নেয়ামত পাবে যাহান্নামে?

একবার নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন- সেই পবিত্র সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তানের চেয়ে বেশি প্রিয় হই অর্থাৎ সে যদি তার পিতা এবং পুত্র হতে আমাকে বেশি মুহব্বত না করে।' অন্য হাদিস শরীফেও এসেছেঃ তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে পিতা, সন্তান ও সমস্থ মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই অর্থাৎ তুমরা যদি তোমাদের পিতা এবং পুত্র এবং সমস্থ মানুষ হতে আমাকে বেশি মুহব্বত না করো। অন্য আরেকটি হাদিস শরীফে এসেছেঃ তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে পিতা, সন্তান ও সমস্থ মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই অর্থাৎ তুমরা যদি তোমাদের পিতা এবং পুত্র এবং সমস্থ মানুষ হতে আমাকে বেশি মুহব্বত না করো।

সূত্রঃ বুখারি শরীফঃ হাদিস শরীফ নং ১৩/১৪/১৫/ ও  মুসলিম শরীফঃ হাদিস শরীফ নং ১৭৮। আরো দেখতে পারেনঃ মুসলিম শরীফঃ হাদিস শরীফ নং ৪৪ এবং মিশকাত শরীফঃ হাদিস শরীফ নং ৭।

যাইহোক উপরের হাদিস শরীফ খানা যখন রাসুলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করছিলেন তখন ঐ সময় হযরত ফারূকে আজম আলাইহিস সালাম তিনি রাসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন ইয়া রাসুলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জীবন ব্যতীত আপনি আমার নিকট সবকিছু থেকে অধিক প্রিয়। তখন নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনি বললেন, না, যাঁর হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম! আপনার কাছে আমি যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয় না হবো ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি পূর্ণ মুমিন হতে পারবেন না। তখন হযরত ফারূকে আজম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! এখন আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও বেশী প্রিয়। নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে হযরত ফারূকে আজম আলাইহিস সালাম এখন আপনি সত্যিকারের ঈমানদার হলেন।

সুত্রঃ বুখারী শরীফঃ হাদিস শরীফ নং ৬৬৩২ শপথ ও মানত অধ্যায়।

ব্যখাঃ উপরের হাদিস শরীফ এর ব্যখা হচ্ছে দ্বিতীয় খলীফা হযরত ফারূকে আজম আলাইহিস সালাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখন রাসুলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছিলেন যে ইয়া রাসুলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমি সবকিছু থেকে আপনাকে বেশি মুহব্বত করি কিন্তু এখন পর্যন্ত আমি আমার জীবনের থেকে আপনাকে বেশি মুহব্বত করতে পারিনি। উত্তরে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলেছিলেন, হে হযরত ফারূকে আজম আলাইহিস সালাম, সেক্ষেত্রে আপনি এখনও ঈমানদার হতে পারেননি।

নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুখে এই কথা শুনে হযরত ফারূকে আজম আলাইহিস সালাম তিনি কাঁদতে লাগলেন, একদম শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন। নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তখন উনাকে নিজের কাছে ডাকলেন, উনার বুকের উপর হাত মুবারক স্থাপন করলেন। ফয়েজে ইত্তিহাদী প্রদান করলেন। সাথে সাথে হযরত ফারূকে আজম আলাইহিস সালাম সচকিত হয়ে বললেন, এখন আমি শুধু একজন উমর ই নই, আরো শত-সহস্র উমর আপনার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। সুবহানআল্লাহ!!

আমি আমার পূর্বের অনেক পোস্টে আলোচনা করেছিলাম নিসবত বা সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে। দ্বীন ইসলাম হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব হুযুরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সাথে নিসবত স্থাপনের ধর্ম। এই নিসবত কিভাবে স্থাপিত হয়? হযরত ফারূকে আজম আলাইহিস সালাম উনার নিসবত স্থাপিত হয়েছিল উনার বুকের উপর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাত মুবারক স্থাপনের মাধ্যমে। হযরত সিদ্দীকে আক্ববর আলাইহিস সালাম তিনি যখন মিরাজ শরীফের ঘটনাকে বিনা দ্বিধায় মেনে নিলেন, তখন উনাকে সিদ্দীকউপাধি দেয়া হলো। এর মাধ্যমে উনার নিসবত স্থাপিত হল।

উল্লেখ্য, নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে এই নিসবত স্থাপন করলে তা কখনো বৃথা যায় না, এমনকি ফাসিক কিংবা কাফির হলেও না। বুখারী শরীফের একখানা সহিহ হাদীস শরীফ রয়েছে আবু লাহাবকে নিয়ে। তাতে রয়েছে, রইসুল মুফাসসিরিন হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেছেনঃ যে আবু লাহাবের মৃত্যুর এক বছর পর আমি তাকে স্বপ্নে দেখলাম, সে তখন জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে আমি দেখতে পাই সে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবু লাহাব, তুমি কেমন আছ?

সে উত্তর দিল, আপনাদের ছেড়ে আসার পর আমি এতটুকু শান্তি পাইনি, কিন্তু প্রতি সোমবার আমার এই কষ্ট লাঘব করা হয়। কারণ নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেদিন জন্মগ্রহন(বিলাদত শরীফ/মিলাদুন নবী) করেন সেদিন ছিলো সোমবার আর উনার আগমন সংবাদ নিয়ে এসেছিল আমার বাঁদী হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা। তখন আমি আবু লাহাব, আমার ভাতিজার আগমন সংবাদে খুশি হয়ে হযরত সুয়াইবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনাকে দুই আঙ্গুলের ইশারায় আজাদ করেছিলাম এবং নির্দেশ দিয়েছিলাম দুধপান করানোর জন্য। সে জন্য প্রতি সোমবার আমার এই দুই আঙ্গুলের ফাঁক থেকে বেহেশতী নহরের সুমিষ্ট ঠাণ্ডা পানি প্রবাহিত করা হয়। সেই পানি আমি চুষে পান করলে আমার এক সপ্তাহের আযাবের কষ্ট আমি ভুলে যাই। দলিল সূত্রঃ (বুখারী শরীফ, ফতহুল বারী, ৯ম খ-, ১১৮ পৃঃ ওমদাতুল ক্বারী, শরহে বুখারী ২য় খণ্ডের ৯৫ পৃষ্ঠা) (https://sunnah.com/bukhari/67/39)

অর্থাৎ আবু লাহাব এই যে একটি নিসবত স্থাপন করলো নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আগমনে খুশি প্রকাশ করে, এর কারণে সে কাফির হয়েও জাহান্নামে ঠিকই প্রতি সোমবার বেহেশতী নহরের পানি পান করতে পারছে। অর্থাৎ নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে যে আমরা নবী হিসেবে পেলাম, তিনি যে দুনিয়াতে আগমন করলেন, এই জন্য খুশি প্রকাশ করলে উনার সাথে নিসবত স্থাপিত হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছেঃ- (يايها الناس قد جاءتكم موعظة من ربكم وشفاء لما فى الصدور وهدى ورحمة للمؤمنين. قل بفضل الله وبرحمته فبذالك فليفرحوا هو خير مما يجمعون) হে মানবজাতি, তোমাদের নিকট মহান আল্লাহ পাক উনার তরফ থেকে নসীহতকারী, অন্তরের শিফা দানকারী এবং মুমিনদের জন্য রহমত ও হিদায়েত দানকারী আগমন করেছেন। সুতরাং তোমরা এই ফযল ও রহমত লাভ করার কারনে খুশি প্রকাশ করো, যা তোমাদের সঞ্চিত সমস্ত আমল থেকে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম হবে। (সূরা ইউনূস শরীফঃ ৫৭, ৫৮ নং আয়াত শরীফ)

উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরিফ উনার তাফসিরঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি এই আয়াত শরিফ উঁনার তাফসীরে বলেন এখানে খালিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাঁক তিনি উঁনার অনুগ্রহ (ফাদ্বলুল্লাহ) দ্বারা ইলমে দ্বীন কে বুঝিয়েছেন আর (রহমত) দ্বারা সরকারে দুআলম সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামান নাবীঈন নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উঁনাকে বুঝানো হয়েছে।

দলিল সুত্রঃ (তাফসীরে রুহুল মায়ানী, তাফসীরে কবির ও ইমাম সূয়ূতী কৃত তাফসীর-ই আদ দুররুল মুনছুর, ৪র্থ খন্ড- ৩৬ পৃষ্ঠায় ও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন)।

এর পরেও অনেক গুমরাহ আছে তারা বলে রহমতদ্বারা নাকি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামান নাবীঈন নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বুঝানো হয়নি। নাউযুবিল্লাহ

এতএব যারা রহমত হিসেবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামান নাবীঈন নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অস্বীকার করতে চায় তারা কি জানেনা সেরা রহমত কে?

একথা তো খালিক মালিক রব মহান আল্লাহ পাঁক তিঁনি স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেনঃ- وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ (সূরা আম্বিয়া শরিফ উনার ১০৭ নং আয়াত শরিফে) "আমি আপনাকে (সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামান নাবীঈন নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সমস্থ কায়েনাতের জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি" অর্থাৎ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামান নাবীঈন নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিঁনি আমাদের জন্য খাস রহমত। আর মহান আল্লাহ পাঁক তিঁনি সুরা ইউনুস শরিফ উনার ৫৮ নং আয়াত শরিফে এ রহমত পাওয়ার কারনেই খুশি প্রকাশ করতে বলেছেন যা আমাদের জমাক্রিত সমস্থ সবকিছু হতে উত্তম দুনিয়া এবং আখেরাতের জীবনে।

পাঠকগন লক্ষ্য করুন ৫৭ নং আয়াত শরীফে যাঁর আগমনের কথা বলা হয়েছে, সমস্ত বিশুদ্ধ তাফসীর এর কিতাব অনুযায়ী তিনি হচ্ছেন নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যাঁর আগমন উপলক্ষ্যে খুশী হওয়া বা আনন্দ উদযাপন করাটা ৫৮ নং আয়াত শরীফ অনুযায়ী خير مما يجمعون অর্থাৎ আমাদের জমাকৃত সমস্ত নেক আমল থেকে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম বলা হয়েছে। এটি এমন এক আমল, যা আবু লাহাবের মতো কাট্টা কাফির মালউন এর কুফরীও যাকে মিটিয়ে দিতে পারে নাই।

এতএব আমার আর কিছুই বলার নাই যারা মনে করেন ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থাৎ নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আগমনের দিনে শরীয়ত সম্মত উপায়ে হালাল পন্থায় খুশী প্রকাশ করা ফরজ তারা পালন করুন আর যারা মনে করেন প্রয়োজন নাই তারা টিভি সিনেমা গান বাজনা প্রেম পিরিতি ডেটিং ফেটিং করে ১২ই রবিউল আউয়াল কে ইগোনোর করেন তাতে আমরা ঈদে মিলাদুন্নবী পালনকারীরা কাউকে বাঁধা দেবনা, কারন নেক আমল হোক আর বদ আমল হোক যাই করেন তা আপনি একাই ভোগ করবেন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: