8.19.2018

আমেরিকান ডলার বর্জন করে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন করা এখন সময়ের দাবী


বিশ্বের যেকোন দেশ তার দেশের বাহিরে ভিন্ন কোন দেশের সঙ্গে কোনো ধরণের বাণিজ্য করতে চাইলে তা ডলারেই করতে হয়। তাই ডলারের বিপরীতে দরপতন হলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং রফতানি আয় কমে যায়। ফলে দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। তুরষ্কে আমেরিকার অবরোধের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে একিই বিষয়।

সাম্রাজ্যবাদীরা যদি কোন দেশের উপর আগ্রাসন চালাতে চায় তাহলে প্রথমে সেই দেশকে তার নিজের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করে। এরপর তারা সেটা কাজে লাগিয়ে ওই দেশকে তার পররাষ্ট্রনীতির প্রতি সমর্থন জানাতে বাধ্য করে। অর্থনৈতিক শাস্তি হিসেবে তারা যেমন সে দেশে আমদানি সীমিত করে দেয়, তেমনি কোনো দেশের পণ্যও বর্জন করে। একই সঙ্গে কৌশলগত রপ্তানি (বিরল খনিজ) বন্ধ করে দেয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ উসকে দেয়।

বাণিজ্যের বেলায় প্রকৃত মূল্যসম্পন্ন বস্তুর বিনিময় একদম শুরুতে ছিল স্রেফ দ্রব্যাদির বিনিময়। তারপর দ্রব্য ও সেবার বিনিময়ের সুবিধার্থে করে দিল স্বর্ণ, পাশাপাশি যারা দুর্দিনের জন্য সঞ্চয় করতে চাইতো তাদের জন্য স্বর্ণ মূল্যের মজুদ হয়েও থাকতে পারে।

ওইসব দিনে যাদের কাছে জমাকৃত স্বর্ণ ছিলো, সত্যিকার অর্থে তারাই শাসনব্যবস্থার মালিক ছিলো, তারাই আইন কানুন বানাতো, এবং বহাল তবিয়তে থাকতো। যুগের পর যুগ ধরে এই সাধারণ নিয়ম এর উল্টোটা ঘটে নি।

বর্তমানে স্বর্ণ আর মুদ্রা নয়, মুদ্রা হচ্ছে কাগজ। অন্তত এই সময়ের জন্য সত্য হচ্ছে, ‘যে টাকা ছাপায় সে শাসন করে। স্বর্ণের ব্যবহার না থাকলেও আর্থিক লাভালাভের প্রশ্ন আগের মতোই আছে; অন্য দেশগুলোকে উৎপাদন করতে এবং তাদের সামরিক শক্তি কমাতে বাধ্য করো এবং নিজেদের মুদ্রাব্যবস্থার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কমাও।

যেহেতু কাগুজে মুদ্রা হলো স্রেফ প্রতারণা, ‘প্রকৃত মূল্যহীন’, সুতরাং যেই দেশ আর্ন্তজাতিক মুদ্রার মালিক হবে সেই দেশের অবশ্যই প্রচুর সামরিকশক্তি থাকতে হবে যাতে করে পুরো ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখা যায়।

ল্যাটিন আমেরিকা ও দূর প্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে উইলিয়াম হাওয়ার্ড ট্যাফট ও তার প্রতিমন্ত্রী ফিল্যান্ডার সি নক্স ডলার কূটনিতির নকশা সাজিয়েছিল। পরে ম্যাককিনলে ১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে রীতিমত একটা যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিল। দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে একই সাথে ডলার ও কূটনীতির আগ্রাসী ব্যবহার ডলার কূটনীতিনামে পরিচিত হয়। ডলার কূটনীতিডলার আধিপত্যহয়ে উঠলো ।

কংগ্রেস ১৯১৩ সালে ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম চালু করে। এরপর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত নিরাপদ মুদ্রার নীতি পদ্ধতিগতভাবেই অবহেলা করা হয়েছে। এই পুরোটা সময়জুড়ে যুদ্ধে অর্থের যোগান দেয়া ও অর্থনীতিকে নিজেদের ইচ্ছেমতো চালানোর জন্য খুব সহজ একটি কাজ করেছে ফেডারেল রিজার্ভ; তারা যখন ইচ্ছে তখনই বাজারে মুদ্রা সরবরাহের পরিমাণ বাড়িয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর্ন্তজাতিক মুদ্রাবাজারে ডলারের মুরব্বিয়ানা একলাফে বহুগুণ বেড়ে যায়।

১৯৭১ সালে বিস্ময়করভাবে এমন এক নতুন ব্যবস্থা সাজানো হলো; যে ব্যবস্থায় কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই দুনিয়ার প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসাবে কাগুঁজে ডলার ছাপানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনুমতি পেয়ে গেল কাল্পনিক স্বর্ণমানে ডলার রূপান্তরযোগ্য হবে কিংবা এ ধরনের কোনো শর্ত ছাড়াই!

এর ফলেও ডলার-আধিপত্য বিস্তারের দরজা খুলে দিল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার প্রতি দেশগুলোর দোনোমোনো ভাব রয়েছে এবং সবাই নতুন কিছু একটা চাইছে এটা বুজতে পরে শীর্ষ মুদ্রা ব্যবস্থাপকরা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জোর সমর্থন পেয়ে একটা আচানক কাজ করে বসলো। তারা ওপেক-এর সাথে চুক্তি করলো যে, দুনিয়াজুড়ে তেল বেচা-কেনার ক্ষেত্রে শুধু মাত্র ডলারকেই বিনিময় মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা হবে। দুনিয়ার মুদ্রাগুলোর মধ্যে ডলারকে একটা বিশেষ জায়গা করে দিল এই চুক্তি।

ডলার তেলের ওপর উঠে দাঁড়াল। চুক্তিতে এই সুবিধার বদলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিল যে, তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই দেশগুলোকে অন্য রাষ্ট্রের আগ্রাসন ও আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকে সুরক্ষা দেবে। এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে আর্থিকভাবে প্রচুর লাভবান করার মাধ্যমে ডলারকে কৃত্রিম শক্তি যোগাল। যার ফলে বিশ্ববাজারে ডলারের প্রভাব বাড়লো এবং বিশাল ছাড়কৃত মূল্যে তেল ও অন্যান্য দ্রব্যাদি আমদানি করে নিজেদের মুদ্রাস্ফীতি রপ্তানি করার সুযোগ পেল। ১৯৮০ তে বিপর্যয় থেকে ডলার এমন বাঁচাই বাঁচলো যে সত্যিকারের ডলার আধিপত্যেরজমানা শুরু হলো। যে জমানা এখনো শেষ হয় নি।

ডলার প্রসঙ্গে বাইরের দেশগুলোর মানসিকতায় ইতোমধ্যেই বদল আসতে শুরু করেছে। উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো এখন আর মিত্রদেশগুলোর কাছ থেকে অর্থ পাওয়া সম্ভব না। এখন আমেরিকার যুদ্ধের বিপুল খরচ যোগাতে সারা দুনিয়ার রিজার্ভ মুদ্রা হিসাবে ডলারকেই দরকার ডলার আধিপত্য দরকার।

বর্তমানের আমেরিকার নাগরিকরা এবং চীন, জাপানসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকরা যে প্রায়ই মূল্যস্ফীতিতে ভোগে তার মানে হচ্ছে আমেরিকা সামরিক অভিযানের খরচ তাদের ট্যাক্স থেকে মেটানো হয়। এ অবস্থা চলতে পারে ততদিন, যতদিন না এই প্রতারণা আবিস্কৃত হয়, যতদিন বিদেশী উৎপাদকরা তাদের পণ্যের বিনিময়ে আমেরিকার ডলার না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

মুদ্রাব্যবস্থার এই প্রতারণার ফলে দেশে দেশে যে সাধারণ মানুষরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে , তাদের সামনে যাতে এটা প্রকাশ না হয়ে পড়ে সে লক্ষ্যে সম্ভব সবকিছুই করা হয়েছে। যে কারণে আমেরিকা অবিশ্বাস্য রকম সুবিধার মধ্যে আছে। আমেরিকা মূল্যবান দ্রব্য আমদানি করে ও এর বদলে আমেরিকার ক্রমশ অবচয়ের শিকার ডলার রপ্তানি করে।

আমেরিকার পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বর্তমান মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর ভর করে চলছে; যার মানে হলো ডলারের এই পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখতেই হবে। যে প্রক্রিয়া চালু আছে বলেই আমেরিকা উপকারি বন্ধুদের কাছ থেকে কম সুদে ধার নিয়ে চলছে, যারা কঠোর পরিশ্রম করে এবং তাদের প্রস্তুতকৃত দ্রব্যের বিনিময়ে আমেরিকার কাগুঁজে ডলার নেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে; ডলারের শ্রেষ্টত্ব নির্ভর করে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর ওপর আর শক্তিশালী সামরিক বাহিনী নির্ভর করে ডলারের ওপর।

আমেরিকার এই ডলার কুটনীতি এবং আধিপত্য ছুড়ে ফেলে দেওয়ার সময় এসেছে। এক ডলারের কুটনীতির মাধ্যমে আমেরিকা আজকে মুসলিম দেশসমুহে ইচ্ছেমত অবরোধ দিচ্ছে। মুসলমানদের সামনে সুযোগ এসেছে আমেরিকার ডলারকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা। মনে রাখতে হবে মুসলিম দেশসমুহের উপর নির্ভর করেই আমেরিকা-ইউরোপ টিকে আছে। অতএব তারা বাধ্য মুসলমানদের মুদ্রা গ্রহন করতে, মুসলমান নয়। পরিশেষে শুধু বলতে চাই ইউএস ডলার উত্থানে মুল শয়তান ছিলো সৌদি ওহাবী সরকার তবে তা আর কতদিন থাকছে?


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: