8.21.2018

পবিত্র কুরবানী মূলত কি এবং কেনো প্রতি বছর তা করতে হয়ঃ দলিল ভিত্তিক আলোচনা


পবিত্র কুরবানী হলো ১০০% আত্মসমর্পণের ও মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বড় মাধ্যম। আত্মত্যাগ, আত্মউৎসর্গ, সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, মৈত্রী, সম্প্রীতি, ভালবাসা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সর্বোপরি মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য লাভের সুমহান মহিমাময় চির অম্লান এই ভাস্বর কুরবানী। পবিত্র কুরবানী ইসলামী জীবনের ইবাদতের এক তাৎপর্যপূর্ণ গৌরবের প্রধান উৎস। পবিত্র কুরবানী হচ্ছেন আমাদের আদি পিতা আবুল বাশার আদম সফিউল্লাহ আলাইহিস সালাম ও উনার স্বীয় পুত্র হাবিল আলাইহিস সালাম ও কাবিল লানতুল্লাহি আলাইহি এবং মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম খলিলুল্লাহ আলাইহিস সালাম ও উনার আদর্শবান শাহজাদা হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম উনার আত্মত্যাগের মহান স্মৃতি বিজড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ দিনটি বছর ঘুরে মুসলিম জাতির নিকট মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি অবিচল আস্থা-বিশ্বাস ও জীবনের সর্বস্ব উৎসর্গের মাধ্যমে মহান মহিয়ানের নৈকট্য লাভের বার্তা নিয়ে হাজির হন।

পবিত্র কুরবানীর আভিধানিক অর্থঃ আরবী কুরবানশব্দটি উর্দু বা ফারসিতে কুরবানী শব্দরূপে রূপান্তরিত হয়েছেন। যার অর্থ সান্নিধ্য, নৈকট্য। আর কুরবানশব্দটি কুরবাতুনশব্দ থেকে নির্গত। আরবী কুরবানকুরবাতুনউভয় শব্দের শাব্দিক অর্থ সান্নিধ্য লাভ করা, নিকটবর্তী হওয়া, নৈকট্য লাভ করা। ইসলামী শরিয়ার পরিভাষায় পবিত্র কুরবানী ঐ মাধ্যমকে বলা হয়, যার দ্বারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নৈকট্য অর্জন ও উনার ইবাদতের জন্য হালাল কোন জন্তু যবেহ করা হয়। (মুফরাদাত লি ইমাম রাগিব; আল-কামুসূল মুহিত)

পবিত্র কুরবানীর সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ অর্থ হলো রক্ত প্রবাহিত করা, ত্যাগ স্বীকার করা, উৎসর্গ করা ইত্যাদিও। মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন উনার নৈকট্য অর্জন ও উনার ইবাদাতের জন্য পশু জবেহ করাকেই মূলত কুরবানী বলা হয়। আর এজন্যই সামর্থ্যবানদের উপর অন্তত একটি কুরবানী করা ওয়াজিব আর ইচ্ছেকৃত ওয়াজিব তরক করা বড় কবিরা গুনাহ। ইমাম আবু হানীফা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মতেও কুরবানী করা ওয়াজিব। কারন মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন উনার নবীকেও কুরবানী করতে নির্দেশ দিয়েছেন যা শুধু উনার জন্য নয় বরং সমস্থ উম্মতের জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশ। বলেছেনঃ আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সলাত আদায় করুণ ও কুরবানী করুন।(সূরা আল কাওসার শরীফঃ আয়াত শরীফ ২)

পবিত্র কুরআন শরীফে কুরবানীশব্দটি কুরবানবলে তিন জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। যথাঃ পবিত্র সূরা মায়েদা শরীফের ২৭নং আয়াত শরীফে, সূরা আহকাফের ২৮নং আয়াত শরীফে ও সূরা আলে ইমরান আলাইহিস সালামের ১৮৩নং আয়াত শরীফে। অনুরূপভাবে কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে এর সমার্থ্যবোধক বহু শব্দ পরিলক্ষিত হয়। যেমনঃ-

১. নাহরুনঅর্থে। সূরা কাউছার শরীফের ২নং আয়াত শরীফ মহান আল্লাহ পাক বলেন, ‘‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশে সলাত আদায় করুন ও কুরবানী করুন।’’ এ অর্থে কুরবানীর দিনকে ইয়ামুন নাহরবলা হয়।

২. নুসুকঅর্থে। সূরা আনয়ামের ১৬২নং আয়াত শরীফে এসেছে ‘‘আপনি বলুন, আমার সলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সবই বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক মহান আল্লাহ পাক উনারই জন্য নিবেদিত।’’

৩. মানসাকুনঅর্থে। সূরা হজ্জ শরীফের ৩৪নং আয়াত শরীফে বলা হয়েছে, ‘‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর বিধান রেখেছি।’’

৪. উদহিয়্যাঅর্থে। হাদীস শরীফে এ শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। এ অর্থে কুরবানীর ঈদকে ঈদুল আদ্বহাবলা হয়।

ইসলামিক শরীয়তে কুরবানী বলতে জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১১/১২ তারিখ আসর পর্যন্ত আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশে হালাল জন্তু (উট, গরু, বকরী, ভেড়া প্রভৃতি) যবেহ করা বুঝায়।

কুরবানীর শুরুঃ মহান আল্লাহ পাক উনার নবী হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কুরবানী করার পরীক্ষা থেকেই বর্তমান পদ্ধতির কুরবানীর সূচনা হয়েছে। আর মহান আল্লাহ পাক উনার উদ্দেশ্যে পশু জবেহ করা তিন প্রকার হতে পারেঃ

১. হাদী
২. কুরবানী
৩. আকীকাহ।

তাই কুরবানী বলা হয় ঈদুল আদ্বহার দিনগুলোতে নির্দিষ্ট প্রকারের গৃহপালিত পশু মহান আল্লাহ পাক উনাত নৈকট্য অর্জনের জন্য জবেহ করাকে।

ইসলামী শরীয়তে এটি ইবাদাত হিসেবে সিদ্ধ, যা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন শরীফে এসেছে আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সলাত আদায় করুন ও পশু কুরবানী করুন।(সূরা আল কাওসার শরীফঃ আয়াত শরীফ ২)

বলুন, আমার সলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ পাক উনারই উদ্দেশ্যে। উনার কোন শরীক নাই এবং আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি আর আমিই প্রথম মুসলিম।(সূরা আনআমঃ ১৬২-১৬৩)

হাদীস শরীফে এসেছে বারা ইবনে আযিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়াল আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈদের সলাতের পর কুরবানীর পশু জবেহ করল তার কুরবানী পরিপূর্ণ হল এবং সে মুসলিমদের আদর্শ সঠিকভাবে পালন করল। (বুখারী শরীফ ৫৫৪৫, মুসলিম শরীফ ১৯৬১)

আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজ হাতে দুটি সাদা কালো বর্ণের দুম্বা কুরবানী করেছেন। তিনি বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলেছেন। তিনি পা দিয়ে দুটো কাঁধের পাশ চেপে রাখেন। (বুখারী শরীফ ৫৫৬৫, মুসলিম শরীফ ১৯৬৬) তবে বুখারীতে সাদা-কালোশব্দের পূর্বে শিংওয়ালাকথাটি উল্লেখ আছে।

কুরবানীর প্রাক-ইতিকথাঃ কুরবানীর ইতিহাস মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই লক্ষ্য করা যায়। কুরবানীর প্রথম ঘটনাটি ঘটে আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার স্বীয় দুই পুত্র হাবিল আলাইহিস সালাম ও কাবিলের মাধ্যমে। ঘটনাটির বর্ণনা কুরআনে এভাবে এসেছে- ‘‘আদম আলাইহিস সালামের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত আপনি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দিন, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল হলো না। তাদের একজন বলল,  আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বললেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি তো সংযমীদের কুরবানীই কবুল করে থাকেন।’’ (সূরা মায়েদা শরীফ, আয়াত শরীফ ২৭)

কুরআনে বর্ণিত হাবিল আলাইহিস সালাম ও কাবিল কর্তৃক সম্পাদিত কুরবানীর ঘটনা থেকেই মূলত কুরবানীর ইতিহাস গোড়াপত্তন হয়েছে। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের ওপর এ বিধান জারি ছিল। মহান আল্লাহ পাক বলেন, ‘‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানীর বিধান রেখেছিলাম।’’

কুরবানীর প্রচলন আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালামে সময় থেকে শুরু হলেও মুসলিম জাতির কুরবানী মূলত হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এবং স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামে কুরবানীর স্মৃতি অনুকরণ ও অনুসরণে চালু হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক যুগে যুগে প্রেরিত অসংখ্য নবী-রাসুল আলাইহিমাস সালামকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাদের মধ্যে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম প্রতিটি পরীক্ষায় পাহাড়সম ধৈর্য্য ও ত্যাগের মাধ্যমে কৃতকার্য হয়েছিলেন। এ সম্পর্কে কুরআন শরীফে এসেছে ‘‘যখন হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে উনার পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করেন, তখন তিনি তা পূর্ণ করলেন, তখন তিনি(মহান আল্লাহ পাক) বললেন, আমি তোমাকে মানব জাতির নেতা বানিয়ে দিলাম।’’ (বাকারাহ শরীফ, আয়াত শরীফ ১২৪)

হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কুরবানী প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের বাণী- ‘‘দুজনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিল আর হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন তাঁকে কাত করে শুইয়ে দিলেন। তখন আমি উনাকে ডেকে বললাম, হে হযরত ইবরাহিম! আলাইহিস সালাম আপনিতো স্বপ্নকে সত্য প্রমাণিত করে দেখালেন। এভাবেই আমি সৎ কর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে পুত্রকে ছাড়িয়ে নিলাম(পিতার থেকে)। আর আমি উনাকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখলাম।’’ (সূরা আস সাফ্ফাত, আয়াত শরীফ ১০৩-১০৮)

সুতরাং যুগ যুগ ধরে এই যে পবিত্র কুরবানীর পদ্ধতি প্রচলিত হয়ে আসছে। তা মহান আল্লাহ পাক উনারই নির্দেশের আলোকে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘটনা থেকে মুসলিম জাতির কুরবানীর প্রচলন শুরু হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কুরবানীর ইতিহাস ততটাই প্রাচীন যতটা মানব জাতির ইতিহাস। মানবমন্ডলীর জন্য রবের পক্ষ থেকে যত শরীয়ত নাযিল হয়েছে, প্রত্যেক শরীয়তের মধ্যে কুরবানীর বিধান জারি ছিল। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদাতে এ ছিল একটি অপরিহার্য অংশ।

কুরবানীর উদ্দেশ্যঃ কুরবানীর দুধরনের উদ্দেশ্য রয়েছে। পার্থিব ও অপার্থিব। অপার্থিব উদ্দেশ্য হল মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশ প্রতিপালন। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রসূল, কুল কায়েনাতের যনি আক্বা হাবীবুল্লাহ হুজুরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নাত মুবারক কে বুলন্দ রাখা। রাসূল পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একটি হাদীস শরীফে এভাবে এসেছে ‘‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে কাছেও না আসে।’’ (ইবনে মাজাহ শরীফ)

পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমেও দাতা রবের নৈকট্য লাভ করে থাকেন। পবিত্র আল কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট ওদের গোশত-রক্ত পৌঁছায় না। বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া বা খোদাভীতি।’’ (সূরা হজ্জ শরীফ, আয়াত শরীফ ৩৭)

সুতরাং মহান রবের সন্তুষ্টি লাভ, ত্যাগের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে আত্মসমর্পণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং পশু-প্রবৃত্তিকে দমন করে তাকওয়া অর্জন কুরবানীর মূল লক্ষ্য। কুরবানীর পার্থিব উদ্দেশ্য হল পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গরীব-মিসকিন, অভাবীদের আনন্দ দান, নিজে কুরবানীর গোশত খাওয়া ও স্বজনদেরকে গোশত খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পাক বলেন, ‘‘যাতে ওরা ওদের কল্যাণ লাভ করে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে মহান আল্লাহ পাক উনার নাম স্মরণ করে তার দেয়া পশুগুলো যবেহ করার সময়। অতপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুস্থ-অভাবীদের আহার করাও।’’ (সূরা হজ্জ, আয়াত শরীফ ২৮)

কুরবানীর বিধানঃ কুরবানী শরিয়াতসম্মত এ ব্যাপারে আউওয়াল থেকে আখের পর্যন্ত সকল ওলামায়ে কিরাম ইমাম মুস্তাহিদ এক মত। তবে কুরবানী ফর/ওয়াজিব নাকী সাধারণ সুন্নাত এ ব্যাপারে দুটি মত পাওয়া যায়।

একটি মত হল, কুরবানী ওয়াজিব। ইমাম আবু হানিফা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, সহ অনেক ইমামের মত এটা। তাদের দলিল হল, আল কুরআনের বাণী ‘‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশে সলাত আদায় করুন ও কুরবানী করুন।’’ (সূরা আল কাউসার) হাদীসে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহিও ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘হে মানবমন্ডলী! প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্ব হল প্রতি বছর কুরবানী করা।’’ (ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)

অপর মতে, কুরবানী সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। ইমাম শাফেয়ী রহিমাহুল্লাহ, ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ সহ অধিকাংশ ওলামাদের মত এটা। তবে তারা আরো বলেছেন, সামর্থ্য থাকা অবস্থায় কুরবানী পরিত্যাগ করা মাকরূহ। সামর্থ্য থাকার পরও যদি কোন জনপদের লোকের সম্মিলিতভাবে কুরবানী পরিত্যাগ করে তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। তাদের দলিল হল রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমাদের মাঝে যে কুরবানী করতে চায়, জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কুরবানী সম্পন্ন করার আগে তার কোন চুল ও নখ না কাটে।’’ (সহীহ মুসলিম শরীফ)

যাদের ওপর কুরবানী ওয়াজিব বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহঃ যে ব্যক্তির ওপর নিম্নোক্ত শর্তাবলী পাওয়া যাবে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।
১. মুসলিম হওয়া।
২. স্বাধীন হওয়াঃ গোলাম বা দাস-দাসীর ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।
৩. মুকিম হওয়াঃ মুসাফিরের ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।
৪. সামর্থ্যবান বা ধনী হওয়াঃ গরীব বা মিসকিনের ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।

উল্লেখ্য যে, কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয় বরং কুরবানীর দিন ব্যয়ের উদ্ধৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তুর নিসাব পরিমাণ মালিক হলে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব। দৈনন্দিন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মালিককে নিসাব মালিক বলা হয়।

কুরবানী বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলীঃ কুরবানী মুসলিমদের আর্থিক ইবাদতসমূহের অন্যতম ইবাদত। আর কোন ইবাদত কবুলের পূর্ব শর্ত দুটি, যা কুরআন শরীফ ও হাদিস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।

(১) ইখলাস বা একমাত্র আল্লাহ পাক উনার উদ্দেশ্যেই হওয়া। যেমন সূরা মায়িদার ২৭নং আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ মহান আল্লাহ পাক তিনি তো মুক্তাদীদের কুরবানীই কবুল করে থাকেন।

(২) তা যেন মহান আল্লাহ পাক ও উনার রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নির্দেশিত বিধি-বিধান অনুযায়ী হয়। আল্লাহ তায়ালা সূরা কাহফের ১১০নং আয়াতে বলেন যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষ্য কামনা করে, সে যেন সৎ কর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে অংশীদার না করে

বাহ্যিকভাবে কুরবানী সহীহ বা শুদ্ধ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে, তারমধ্যেঃ-

১. এমন পশু দ্বারা কুরবানী দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেগুলো হল দুম্বা, ভেড়া, ছাগল, গরু, মহিষ, উট। পবিত্র কুরআনের পরিভাষায় এগুলোকে বাহীমাতুল আনআমবলা হয়। কুরআন শরীফে এসেছে, মহান আল্লাহ তয়ালা বলেনঃ প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানীর বিধান করে দিয়েছি, যাতেকরে তিনি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দান করেছেন, সেগুলোর ওপর যেন তারা মহান আল্লাহ পাক উনার নাম উচ্চারণ করে। (সূরা হজ্জ, আয়াত শরীফ ৩৪)

গুণগত দিক দিয়ে উত্তম কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট, অধিক গোশত সম্পন্ন, নিখুত ও দেখতে সুন্দর হওয়া।

২. শরিয়তের দৃষ্টিতে পশুর নির্দিষ্ট বয়স হতে হবে। যেমন উট পাঁচ বছরের হওয়া, গরু বা মহিষ দুই বছরের হওয়া, দুম্বা, ভেড়া, ছাগল এক বছরের হওয়া। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা অবশ্যই নির্দিষ্ট বয়সের পশু কুরবানী করবে। তবে তা তোমাদের জন্য দুষ্কর হলে ছয় মাসের মেষশাবক কুরবানী করতে পার।(সহীহ মুসলিম শরীফ)

৩. কুরবানীর পশু যাবতীয় দোষ-ত্রুটি মুক্ত হতে হবে। যেমন হাদিস শরীফে আছে, বারা ইবনে আযেব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন। অতপর বললেনঃ চার ধরনের পশু দিয়ে কুরবানী না জায়েজ। অন্ধ, যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগাক্রান্ত, যার রোগ স্পষ্ট, পঙ্গু, যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত, যার কোন অংগ ভেঙ্গে গেছে। (তিরমিজি শরীফ)

৪. ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়ে কুরবানী করলে তা মাকরূহ হবে। যেমন শিং ভাঙ্গা, লেজ কাটা, কান কাটা ইত্যাদি।

৫. যে পশু কুরবানী করা হবে তার ওপর মালিকের পূর্ণ স্বত্ব থাকতে হবে, বন্ধকি পশু, জব্দ করা পশু বা পথে পাওয়া পশু দ্বারা কুরবানী করলে কুরবানী হবে না।

কুরবানীর নিয়মাবলীঃ কুরবানীর জন্য পশু পূর্বেই নির্দিষ্ট করতে হবে। মুখের উচ্চারণ দ্বারা এভাবে বলা যায়, এ জন্তুটি আমি কুরবানীর জন্য নির্দিষ্ট করলাম। কিন্তু আমি এ পশুটি কুরবানীর জন্য রেখে দেবএ কথা দ্বারা পশু নির্দিষ্ট হবে না। কাজের মাধ্যমেও পশু নির্দিষ্ট করা যায়। যেমন- কুরবানীর নিয়তে পশু ক্রয় করা এবং কুরবানীর নিয়তে পশু যবেহ করা। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়াবলী খেয়াল রাখতে হবেঃ-

উক্ত পশু কুরবানী ব্যতীত অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না। যেমন, দান করা, বিক্রি করা। তবে কুরবানী ভালভাবে আদায়ের জন্য তার চেয়ে উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা যাবে।

কুরবানীর পশুর মালিক ইন্তিকাল করলে তার উত্তরাধিকারীদের (ওয়ারিশ) দায়িত্ব হল তা বাস্তবায়ন করা।

নিদৃষ্ট করা কুরবানীর পশুর থেকে কোন উপকার ভোগ করা যাবে না। যেমনঃ দুধ বিক্রি করা, কৃষি কাজে ব্যবহার করা, সাওয়ারি হিসেবে ব্যবহার করা, চামড়া বিক্রি করা, পশম বিক্রি করা। তবে পশম বিক্রি করলে তার টাকা সদকা করে দিতে হবে অথবা চামড়া নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারবে।

কুরবানী দাতার অবহেলার কারণে পশু দোষযুক্ত হলে বা হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে তার দায়িত্ব হল তার মত বা তার চেয়ে উত্তম পশু ক্রয় করে কুরবানী করা।

যদি পশুটি হারিয়ে যায় অথবা চুরি হয়ে যায় আর কুরবানীদাতার ওপর পূর্ব থেকেই কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকে তাহলে সে কুরবানী থেকে অব্যাহতি পাবে। আর যদি ওয়াজিব ছিল না কিন্তু সে কুরবানীর নিয়তে পশু ক্রয় করেছে তাহলে চুরি হলে, মারা গেলে বা হারিয়ে গেলে তাকে আবার পশু কিনে কুরবানী করতে হবে।

কুরবানীর পশুর অংশ (গোশত, চর্বি, দড়ি, চামড়া ইত্যাদি) বিক্রয় করা বৈধ হবে না। কারণ, তা মহান আল্লাহ পাক উনার উদ্দেশ্যে নিবেদিত বস্তু। তাই কোনভাবেই পুনরায় তা নিজের ব্যবহারে ফিরিয়ে আনা বৈধ নয়।

পশু ক্রয় করার পর যদি তার বাচ্চা হয়, তাহলে মায়ের সাথে তাকেও কুরবানী করতে হবে অথবা সদকা করে দিতে হবে।

কুরবানীর সময়সীমাঃ কুরবানী নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত একটি ইবাদত। এ সময়ের পূর্বে যেমন কুরবানী আদায় হবে না তেমনি পরে করলেও আদায় হবে না।

ঈদের সলাত আদায় করার পর থেকে কুরবানীর সময় শুরু হয়। সলাত শেষ হওয়ার সাথে সাথে পশু কুরবানী না করে সালাতের খুৎবা দুটি শেষ হওয়ার পর যবেহ করা উত্তম। কেননা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরকম করেছেন। হাদিস শরীফে এসেছেঃ জুনদুব ইবনে সুফিয়ান আল-বাজালি রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানীর দিন সলাত আদায় করলেন অতঃপর খুৎবা দিলেন তারপর পশু যবেহ করলেন। (সহীহ বুখারী শরীফ)

আর কুরবানীর সময় শেষ হবে জিলহজ্জ মাসের তের তারিখের সূর্যাস্তের সাথে সাথে। সুতরাং কুরবানীর পশু যবেহ করার সময় হল, চারদিন অর্থাৎ জিলহজ্জ মাসের দশ, এগারো, বারো এবং তের তারিখ। এ মতটিই সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন আইয়ামে তাশরীকের প্রতিদিন যবেহ করা যায়। (আহমদ শরীফ) আইয়ামে তাশরীক বলতে কুরবানীর পরবর্তী তিনদিন বুঝায়।

সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত হয়, কুরবানীর পরবর্তী তিনদনি কুরবানীর পশু যবেহ করা যায়। ইবনুল কাইয়ূম রহিমাহুল্লাহ বলেন, হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম তিনি বলেছেনঃ কুরবানীর দিন হল "ঈদুল আযহার দিন ও পরবর্তী তিনদিন। অধিকাংশ ইমাম ও আলেমদের এটাই মত। তবে যারা কুরবানীর সময়সীমা তিনদিন (দশ, এগারো ও বার তারিখ) বলেন, তাদের মতের সমর্থনে কোন প্রমাণ ও মুসলিমদের ঐকমত্য (ইজমা) প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

কুরবানীর গোশত বণ্টনঃ কুরবানীর গোশত বণ্টন ও খাওয়া সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর এবং দুস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও। (সূরা হজ্জ, আয়াত শরীফ ২৮)। রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ কর। (সহীহ বুখারী শরীফ)

আহার করাওবাক্য দ্বারা অন্যদেরকে খাওয়ানো, দান করা বুঝানো হয়েছে। তবে কুরআন ও হাদীসে নির্দিষ্ট করে কতটুকু খাবে এবং দান করবে তা বলা হয়নি। উলামায়ে কেরাম কুরবানীর গোশ্ত তিন ভাগে ভাগ করে একভাগ নিজের খাওয়া, এক ভাগ দুস্থ, গরিব, অভাবীদের জন্য দান করা এবং অপর ভাগ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীকে উপহার দেয়া মুস্তাহাব বলেছেন।

কুরবানীর গোশ্ত যতদিন ইচ্ছা সংরক্ষণ করা যাবে। তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা যাবে না বলে যে হাদীস রয়েছে তার হুকুম রহিত হয়ে গেছে।

কুরবানীতে অংশীদার হওয়াঃ কুরবানীতে অংশীদার হওয়া সম্পর্কে একাধিক হাদীস শরীফ থেকে প্রমাণ লক্ষ্য করা হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, ‘‘আমরা রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে এক সফরে ছিলাম। এমতাবস্থায় কুরবানীর ঈদ উপস্থিত হল। তখন আমরা সাতজনে একটি গরু ও দশজনে একটি উটে শরীক হলাম। (নাসাঈ শরীফ, তিরমিজি শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ)

জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, ‘‘আমরা আল্লাহর রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে হজ্জ ও উমরার সফরে ছিলাম। তখন আমরা একটি গরু ও উটে সাতজন করে শরীক হয়েছিলাম। (সহীহ মুসলিম শরীফ)

মৃত ব্যক্তির পক্ষে কুরবানীঃ কুরবানী মূলত যথাসময়ে জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অবশ্য ইচ্ছা করলে তার মৃত আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকেও কুরবানী করা যেতে পারে। এটা জায়েয ও সওয়াবের কাজ। যেহেতু রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবাগণ নিজেদের এবং পরিবার-পরিজনদের পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন। কুরবানী একটি সদকা। মৃত ব্যক্তির জন্য সদকা ও কল্যাণমূলক কাজ প্রয়োজন ও এটা তার জন্য উপকারী। অনেক সময় দেখা যায় ব্যক্তি নিজেকে বাদ দিয়ে মৃত ব্যক্তির পক্ষে কুরবানী করেন। এটা মোটেই ঠিক নয়। ভাল কাজ নিজেকে দিয়ে শুরু করতে হয় তারপর অন্যান্য জীবিত ও মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে করা যেতে পারে। হাদীসে এসেছে আয়েশা সদ্দিকা আলাইহাস সালাম ও আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কুরবানী দিতে ইচ্ছা করলেন তখন দুটি দুম্বা ক্রয় করলেন। যা ছিল বড়, হৃষ্টপুষ্ট, শিংওয়ালা, সাদা-কাল বর্ণের এবং খাসি। একটি তিনি উনার নিজের জন্য এবং অন্যটি উম্মতের জন্য কুরবানী করলেন, যারা মহান আল্লাহ পাক উনার একত্ববাদ ও উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েছে, অন্যটি উনার নিজের ও পরিবারবর্গের জন্য কুরবানী করেছেন। (ইবনে মাজাহ শরীফ)

কুরবানীর পশু যবেহকালে লক্ষণীয় কতিপয় দিকঃ

১. কুরবানীদাতা যদি শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে ভালভাবে যবেহ করতে পারে, তাহলে নিজের কুরবানীর পশু নিজেই যবেহ করবেন। কেননা আমাদের প্রিয়নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে যবেহ করেছেন। আর কুরবানী করা মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হওয়ায় প্রত্যেকের কুরবানী নিজে যবেহ করার চেষ্টা করা উচিত। তবে কুরবানীর পশু যবেহ করার দায়িত্ব অন্যকে অর্পণ করা জায়েয আছে। কেননা, হাদীস শরীফ এসেছে ‘‘রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেষট্টিটি কুরবানীর পশু নিজ হাতে যবেহ করে বাকিগুলো যবেহ করার দায়িত্ব হযরত আলী কাররামাল্লহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম উনাকে অর্পণ করেছেন।’’ (সহীহ মুসলিম শরীফ)

২. পশুর প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করা। এমন ব্যবস্থা নিয়ে যবেহ করা, যাতে পশুর অধিক কষ্ট না হয়। যবেহ যেন খুব তীক্ষ্ম ধারালো ছুরি দ্বারা করা হয়, যাতে সহজেই প্রাণ ত্যাগ করতে পারে। বধ্য পশুর সম্মুখে ছুরি শান দেয়া মাকরূহ। যেহেতু নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছুরি শান দিতে এবং তা পশু থেকে গোপন করতে আদেশ করেছেন এবং বলেছেন ‘‘যখন তোমাদের কেউ যবেহ করবে, তখন সে যেন তাড়াতাড়ি করে’’। (ইবনে মাজাহ শরীফ) একইভাবে একটি পশুকে অন্য একটি পশুর সামনে যবেহ করা এবং  যবেহ স্থানে টেনে নিয়ে যাওয়াও মাকরূহ।

৩. কুরবানীর পশু যদি উট হয়, তাহলে তাকে বাম পা বাঁধা অবস্থায় দাঁড় করে নহর করতে হবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা কালামুল্লাহ শরীফে বলেছেন-‘‘সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান অবস্থায় তাদের ওপর তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনার নাম উচ্চারণ কর’’। ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, এর অর্থ হল তিনি পায়ে দাঁড়িয়ে থাকবে আর সামনের বাম পা বাঁধা থাকবে। বিস্তারিত দেখুন (তাফসিরে ইবনে কাসির সূরা হজ্জ ৩৬ নং আয়াত শরীফ)

৪. যবেহকালে পশুকে কিবলামুখী করে শয়ন করাতে হবে। অন্যমুখী শুইয়েও যবেহ করা সিদ্ধ হবে। যেহেতু কিবলামুখী না করে শুইয়ে যবেহ করা হারাম হওয়ার কোন বিশুদ্ধ প্রমাণ নেই। (আহকামুল ইযহিয়্যাহ)

৫. যবেহ করার সময় বিসমিল্লাহ বলতে হবে। কারণ এটা বলা ওয়াজিব। কারণ আল্লা তায়ালা বলেছেন ‘‘যাতে আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি তা হতে তোমরা আহার করো না, এটা অবশ্যই পাপ’’। (সহীহ বুখারী শরীফ) যবেহকালীন সময়ে বিসমিল্লাহর সাথে আল্লাহু আকবরযুক্ত করা মুস্তাহাব। হাদীস শরীফে এসেছে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি শিংওয়ালা ভেড়া যবেহ করলেন, তখন বিসমিল্লাহও আল্লাহু আকবরবললেন। (সুনানে দারেমী শরীফ)

৬. যবেহ হতে রক্ত প্রবাহিত হওয়া জরুরি। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘যা খুন বহায় এবং যাতে আল্লাহর নাম নেয়া হয় তা ভক্ষণ করো’’ (সহীহ বুখারী শরীফ)। রক্ত প্রবাহিত ও শুদ্ধ যবেহ হওয়ার জন্য চারটি অঙ্গ কাটা জরুরি; শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং পার্শ্বস্থ দুটি মোটা শিরা।

৭. প্রাণ ত্যাগ করার পূর্বে পশুর অন্য কোন অঙ্গ কেটে কষ্ট দেয়া হারাম। ঘাড় মটকানো, পায়ের শিরা টাকা, চামড়া ছাড়ানো ইত্যাদি কাজ জান যাওয়ার আগে বৈধ নয়। যেহেতু পশুকে কষ্ট দেয়া আদৌ বৈধ নয়। পশু পালিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলেও ঘাড় মটকানো যাবে না। বরং তার বদলে কিছুক্ষণ ধরে রাখা অথবা চেপে রাখা যায়। যবেহ করার সময় পশুর মাথা যাতে বিচ্ছিন্ন না হয় তার খেয়াল করা উচিত। তা সত্ত্বেও যদি কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে তা হালাল হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। যবাই ছেড়ে দেয়ার পর কোন পশু উঠে পালিয়ে গেলে তাকে ধরে পুনরায় যবেহ করা হালাল।

কুরবানীর শিক্ষাঃ মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম উনার কলিজার টুকরা প্রিয় সন্তান হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে মহান আল্লাহ পাক উনার রাহে কুরবানী দেয়ার সুমহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেভাবে ঈমানী অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মানব জাতিকে আত্মত্যাগের শিক্ষা দিয়ে গেছেন, সে আদর্শ ও প্রেরণায় আমরা আমাদের জীবনকে ঈমানী আলোয় উদ্ভাসিত করব, এটাই পবিত্র কুরবানীর মৌলিক শিক্ষা। ত্যাগ ছাড়া কখনোই কল্যাণকর কিছুই অর্জন করা যায় না। মহান ত্যাগের মধ্যেই রয়েছে অফুরন্ত প্রশান্তি। ত্যাগ ছাড়া কখনোই কল্যাণকর কিছুই অর্জন করা যায় না। কুরবানী আরও শিক্ষা দেয় যে, দুনিয়াবী সকল মিথ্যাচার, অনাচার, অবিচার, অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন, হানাহানি, স্বার্থপরতা, দাম্ভিকতা, অহমিকা, লোভ-লালসা ত্যাগ করে পৃথিবীতে শান্তি ও সাম্যের পতাকা সমুন্নত রাখতে। পশু কুরবানী মূলত নিজের কু-প্রবৃত্তিকে কুরবানী করার প্রতীক। কুরবানী আমাদেরকে সকল প্রকার লোভ-লালসা, পার্থিব স্বার্থপরতা ও ইন্দ্রিয় কামনা-বাসনার জৈবিক আবিলতা হতে মুক্ত ও পবিত্র হয়ে মহান স্রষ্টার প্রতি নিবেদিত বান্দা হওয়ার প্রেরণা যোগায় এবং সত্য ও হকের পক্ষে আত্মোৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করে। কুরবানীর সার্থকতা এখানেই। তাই পশু গলায় খঞ্জর চালানোর সাথে সাথে যাবতীয় পাপ-পঙ্কিলতা, কুফর, শিরক, বিদআত, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, পরনিন্দা-পরচর্চা, পরশ্রীকাতরতা, সংকীর্ণতা, গর্ব-অহংকার, কৃপণতা, ধনলিপ্সা, গীবতের মত পশুসুলভ আচরণ সযত্নে লালিত হচ্ছে তারও কেন্দ্রমূলে ছুরি চালাতে হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি মুহূর্তে স্রষ্টার আনুগত্য ও খোদাভীতির দ্বিধাহীন শপথ গ্রহণ করতে হবে।

সমাপ্তিলগ্নে আমরা এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, কুরবানী নিছক কোন আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, বরং আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, আত্মসমর্পণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি কোন কপোল-কল্পিত উপাখ্যান বা কল্পনা ফানুসের ফলশ্রুতি নয় বরং এ কুরবানীর সংস্কৃতির প্রবর্তক স্বয়ং মহান রাববুল আলামীন। মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম যে অবিস্মরণীয় ত্যাগ, মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি অবিচল আস্থা ও আনুগত্যের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সেই স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় ও পালনীয়কল্পে কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। শুধু পশুর গলায় ছুরি চালানোতে কোন সার্থকতা নেই, বরং হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, অহমিকা-দাম্ভিকতা, অবৈধ অর্থ লিপ্সা, পরচর্চা-পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতাসহ যাবতীয় মানবীয় পশুত্বের গলায় ছুরি চালাতে পারলেই কুরবানী সার্থকতা বয়ে আনবে।

আর শেষ করার আগে পবিত্র কুরবানী সম্পর্কিত কিছু পোষ্ট আপনাদের সাথে শেয়ায় করছি প্রয়োজন মনে করলে পড়ুন এবং শেয়ার করুন।











সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: