8.21.2018

কাগুজে মুদ্রার ফাঁকিবাজি ও এমেরিকান মূল্যহীন ডলারের ধোঁকাবাজী আর কতদিন???


অর্থনীতির ব্যপারে উচ্চমানের জ্ঞান রাখা অমর কায়েস বলেন, বর্তমান পৃথিবীর অর্থনীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য এই যে, সম্পদ এখন আর গোটা সমাজে প্রবাহিত হয় না। বরং এখন কেবলমাত্র ধনাঢ্যদের ভিতরেই সম্পদ প্রবাহিত হয়। ফলশ্রুতিতে পুরো বিশ্বজুড়ে ধনাঢ্যরা এখন স্থায়ীভাবে ধনী, আর দরিদ্ররা এখানে স্থায়ীভাবে দারিদ্রের কারাগারে বন্দী! দ্বিতীয়ত, এই ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থায় ধনীরা জোঁকের মতো গরীবের রক্তশোষণ করে আরো ধনী হতে থাকে। এমতাবস্থায় দরিদ্র জনগণ এমন নিঃস্ব অবস্থায় উপনীত হয় যে, তারা বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস, অসীম দূর্ভোগ এবং ঈমান ও মূল্যবোধ ধ্বংস হবার অবস্থার মুখোমুখি হয়। এহেন বৈষম্য ও শোষনমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোকে আমরা একটি নামীদামী জাহাজের সাথে তূলনা করতে পারি, যে জাহাজে সমগ্র মানবকূল চড়ে আছে। একটা ক্ষুদ্র ও সংখ্যালঘু অংশ যারা স্থায়ীভাবে ধনী এবং যারা প্রতিনিয়ত আরো ধনী হয়েই চলেছে, তারা অভূতপূর্ব বিলাসিতা ও নিরাপত্তার মাঝে প্রথম শ্রেণীতে ভ্রমণ করছে। তাদের রয়েছে প্রথম শ্রেণীর চিরস্থায়ী টিকেট। ধনীরা জাহাজখানি পরিচালনা করে। তারা তাদের সম্পদ ব্যবহার করে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। ঐ জাহাজের গণতন্ত্র হয়ে যায় ধনীদের শাসন, যার মানে দাঁড়ায় এক ধরনের অর্থনৈতিক বেশ্যাবৃত্তি!! কিন্তু ধনীরা নিজেরা সরাসরি শাসন করে না, বরং তারা আড়ালে আবডালে থেকে প্রতারণার মাধ্যমে, জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ও দলসমূহ, যাদেরকে তারা সমর্থন করে, যাদের উপর তারা অদৃশ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তাদের মাধ্যমে কার্যসিদ্ধি করে। ছায়া সরকারের মতন আর কি! আজকের পৃথিবীর রাজনৈতিক অর্থনীতির এটাই সত্যিকারের রুপ।

যাকগে মূল বক্তব্যে আসি, জাহাজের বাকী মানবকূল স্থায়ী দারিদ্রের শৃঙ্খলে আবদ্ধ এবং ডেকের নিচে জাহাজের মালামাল বহনের স্থানে থেকে উত্তরোত্তর বর্ধিষ্ণু দারিদ্র, বিপর্যয়, দূর্ভোগ ও কষ্টের ভেতর নিজেদের যাত্রা অব্যাহত রাখতে বাধ্য। অন্যরা যাতে তাদের পরিশ্রমের ফসলের উপর জীবনধারণ করতে পারে, ধনীরা যাতে বিলাসবহুল জীবনধারণ করতে পারে, সেজন্য তারা ক্রীতদাসের পারিশ্রমিকে পরিশ্রম করতে বাধ্য হয় (বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের অতি স্বল্প বেতনের ভয়াবহতাটা উপলব্ধি করুন)। মাদকদ্রব্য ও মাদকব্যবসায়ী সঙ্কুল পরিবেশে তারা ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার সাথে চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাস, গোলাগুলি, হত্যা ও নারী ধর্ষণের মতো পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করে।

যারা প্রথম শ্রেনিতে ভ্রমণ করে তাদের জন্য পরিস্কার পানীয়ের ব্যবস্থাসহ পয়সা দিয়ে লাভ করা যায় এমন উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকে। ব্যায়বহুল চিকিৎসা মৃতকে জীবনে ফিরিয়ে আনারমতো অলৌকিক কাজ করে যাচ্ছে এখানে। ডেকের নিচে মাল বহনের জায়গায় যারা রয়েছে তারা ব্যাকটেরিয়াপূর্ণ দূষিত পানি পানে বাধ্য হচ্ছে। রাসায়নিক দ্রব্য সম্বলিত খাবার ও পরিবর্তিত জিনের খাবার (জিন পরিবর্তিত চাল, বিটি বেগুন ইত্যাদি) তাদের বেশীমাত্রায় খেতে হচ্ছে। তারা অসুস্থ হয় কিন্তু চিকিৎসার ব্যায়ভার বহন করতে পারে না। চিকিৎসার খরচ জুটাতেও অনেককে শেষ সম্বলখানাও হারাতে হয়। তারা করুণ জীবন যাপন করে ও করুণ মৃত্যুবরণ করে। এই ধরনের সমাজ ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষেই এক নতুন ও শিল্পসম্মত অর্থনৈতিক দাসত্ব”, যাকে ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা ও ধোঁকার মাধ্যমে সমাজে বহাল তবিয়্যতে রাখা হয়েছে।

সর্বাগ্রে, যারা বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং যদিও মুক্ত ও সৎ বাজারএর বেদবাক্য গিতাপাঠ প্রচার করে তারা নিজেরাই মানুষের উপরে প্রতারামূলক কৃত্রিম কাগুজে নোটকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করার আঈনগত বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দিয়ে ঐ মুক্ত বাজারএর শর্ত ভঙ্গ করে। কাগুজে মুদ্রা প্রতিনিয়ত তার মূল্য হারায়। যখন দারিদ্রতা বৃদ্ধি পায় ও গভীরতম হয় তখন এই Secret বা ছায়া শাসকগোষ্ঠী মৌলিক চাহিদার দ্রব্যাদি, যেমন খাদ্যদ্রব্যাদি ইত্যাদির উপর এবং শ্রমবাজারের সর্বনিম্ন মজুরির আঈনের উপর মূল্যনিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। সরকার ও লুন্ঠনজীবী শ্রেণী, যারা স্থায়ীভাবে ধনী, তাদের বিরুদ্ধে যেনো ক্ষুধায় জর্জরিত জনগন বিদ্রোহে জেগে উঠতে না পারে কিংবা এমনতর শৈল্পিক অর্থনৈতিক দাসত্ব যেনো আঁচ করতে না পারে, সেজন্যেই তারা এটা করে থাকে।

এমন অর্থনৈতিক কাঠামোকে কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো এভাবে বর্ণনা করেছেন, “এর আগে কখনো মানবকূলের এমন বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বৈভব, সম্পদ ও ঐশ্চর্য্য তৈরি করার এমন অভাবনীয় সামর্থ ছিলো না, কিন্তু এর আগে পৃথিবীতে এমন বৈষম্য ও অসমতাও কখনো বিরাজমান ছিলো না। এই অর্থনৈতিক নিপীড়নের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করে তিনি আরো বলেন, “এই অন্যায্য অর্থনৈতিক বিন্যাসের বিচার করতে আরেকটি নুরেমবার্গের প্রয়োজন!

রাসূলে খোঁদা হাবীবুল্লাহ হুজুরে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীকে অর্থনৈতিক অবিচার ও নিপীড়ন মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দিয়ে যান। কেউ ক্রীতদাসের পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করতো না। সম্পদ কেবল ধনীদের মাঝেই প্রবাহিত হতো না, বরং গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা জুড়েই প্রবাহিত হতো। ধনাঢ্য ব্যাক্তিরা স্থায়ীভাবে ধনী থাকতো না এবং দরিদ্র ব্যাক্তিরাও স্থায়ীভাবে দরিদ্র থাকতো না। তখন সর্বনিম্ম মজুরি নির্ধারণ করার জন্য কোনো আঈনেরও প্রয়োজন ছিলো না। তখনকার বাজার ছিলো মুক্ত ও সুবিচারমূলক। বীজ বপন না করে কেউ ফসল ঘরে তুলতে পারতো না। মুদ্রার নিজস্ব মূল্য বা স্বকীয় মান ছিলো। আর তাই ব্যাঙ্কসমূহ ও লুন্ঠনজীবী শ্রেণী মুদ্রার মূল্যমান কমানোর জন্য ফন্দিফিকির করতে পারতো না। যার ফলে ঐ ধরনের বাজার ও অর্থনীতি কখনই মুদ্রাস্ফীতির স্বীকার হতো না। মজুরিসহ বাকী কোনো দ্রব্যমূল্যই নির্ধারণ করে দেওয়া হতো না। যাদের জীবনের দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা মেটানোর ক্ষমতা ছিলো না, তাদের কাজে লাগাবার জন্য সম্পদের উপর বাধ্যতামূলক করের মাধ্যমে সমাজকল্যানের লক্ষ্য অর্জিত হতো। কিন্তু তখনকার সমাজের মূল্যবোধ এটা নিশ্চিত করতো যে, যাদের (পরিশ্রমের সামর্থ) রয়েছে তারা সবসময়ই দান দক্ষিণার উপর বেঁচে থাকার অবস্থা থেকে নিজেদের বের করে আনার চেষ্টা চালাবে।

আজকের পৃথিবীর সকল সরকার যেখানে বিফল হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে সফল হয়েছিলেন। তিনি সফল হয়েছিলেন, কারণ তিনি রিবার উপর মহান আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করেছিলেন। তখন কোনো বীমা কোম্পানি (রিবার পরিচারিকা) ছিলো না, এবং তিনি কৃত্রিম (পেপার, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক) মুদ্রার পরিবর্তে আসল মুদ্রা ব্যবহার করে মুদ্রার মান বজায় রেখেছিলেন। ইসলামী যুগের প্রথম দিকের অবস্থা পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যখন আরবে পূর্ণাংগরূপে প্রতিষ্ঠিত করা হলো তখন মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে জাতীয় সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যার ফলে লোকেরা যাকাত গ্রহীতা খুঁজে বেড়াতো কিন্তু কোথাও তাদের সন্ধান পাওয়া যেত না। এমন একজন লোকের সন্ধান পাওয়া যেতোনা, যে নিজেই যাকাত দেয়ার যোগ্যতা ও ক্ষমতা অর্জন করেনি।

তাহলে রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদত্ত ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিপরীতে এহেন নিপীড়নমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোর যাত্রা শুরু কোত্থেকে এবং কারা ছায়ার মতো এ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে?

বিশ্বকে শাসন করতে হলে অর্থনৈতিক ভাবে অবশ্যই জবরদখল রাখতে হবে, তাই সকলের সম্পদ ও সময় (মুল্য) কে নিজের দখলে আনার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা যেখানে সকলে বাধ্য হয়ে জড়িয়ে যাবে আর সময় অতিবাহিতের সাথে সাথে সেই ব্যবস্থা অন্যের সম্পদ ও সময় হ্রাস করে অর্থনীতির অন্তরালের নায়কদের হাতে তুলে দিবে। আর এই ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা (International Monetary System) এর মাধ্যমে। এই সংস্থাই মূল্যহীন কাগুজে মুদ্রা দ্বারা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা দিনার ও দিরহাম কে (Gold & Silver) প্রতিস্থাপিত করেছে। যারা এই সিস্টেমকে প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের উপরে অন্যায় যুদ্ধও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই বিষয়ে লিবিয়ার গাদ্দাফি হলেন প্রকৃষ্ট উদাহরণঃ

দিনার ও দিরহামের মূল বৈশিষ্ট হল অন্তর্নিহিত মুল্য’ (Intrinsic Value) অর্থাৎ মুদ্রার মুল্য মুদ্রার ভিতরেই ছিল, গোল্ড ও সিলভার এর নিজস্ব একটি মুল্য আছে কিন্তু কাগজের কোন মুল্য নেই। আজ থেকে ১০০ বছর আগেও যদি কেউ আমাদের সম্পদ কেড়ে নিতে চাইতো তবে তাকে অবশ্যই আমাদের ঘরে বা পকেটে হাত দিতে হতো, কিন্তু এখন পকেটে হাত না দিয়েই টাকা কেড়ে নেয়া যায়, আর এটা সম্ভব হয়েছে শুধু মাত্র কাগুজে মুদ্রাব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমে, কারন এটার কোন অন্তর্নিহিত মুল্য নেই যেমন, বাবা পরিশ্রম করে ছেলের জন্য ৫০ লক্ষ টাকা জমিয়ে একটা লকারে রেখে দিয়েছেন আর বলেছেন ১০ বছর পর সে এই টাকা গুলো বের করে নিজের প্রয়োজন মিটাবে। ১০ বছর পর যখন ছেলে টাকা বের করলো তখন কিন্তু টাকা আর ৫০ লক্ষ থাকবে না। অর্থাৎ ১০ বছর আগে ৫০ লক্ষ টাকা দিয়ে যা কেনা যেত এখন সেটা দিয়ে তা কেনা যাবে না। কারন মুদ্রাস্ফীতি (Inflation)’র ফলে মুদ্রার মুল্যমান (Purchasing power) কমে গিয়েছে, তাই ১০ বছর পর সেই টাকার মুল্যমান হয়তো ৪৫ লক্ষতে ঠেকে গেছে। যদিও তার বাবা ৫০ লক্ষ টাকার জন্য ৫০ লক্ষ টাকারই পরিশ্রম ও সময় ব্যয় করে ফেলেছেন!

দুনিয়ায় সকলের সমান সম্পদ হবে এমন আশা করা যায় না। তবে সবাই, যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশ্রম, সময়, ও মূলধন দিয়ে সম্পদ আয় করার সমান সুযোগ পাবে এটাই মহান আল্লাহ পাক উনার বিধান। কিন্তু এই সমান সুযোগ (Equal Opportunity) এখন বাধাগ্রস্থ হয়েছে। কিছু মানুষের হাতে এখন রয়েছে এই সুযোগ, তাই এখন দেখা যাচ্ছে পাহাড় সমান বৈষম্য, ধনী ও গরীবের মধ্যে ব্যাপক অসমতা ফলে তৈরি হয়েছে ধনী দেশ ও গরীব দেশ। তাই আমরা দেখি বাংলাদেশের মত দেশে জন্ম হলেই সে গরীব হয়ে যায় আর আমেরিকায় জন্ম নিলেই ধনী, একটু ঘুরিয়ে বললে বলা হয় মুনিব ও দাস। এর জন্য আমরা সুদী ব্যবস্থা কে হয়ত দায়ী করবো কিন্তু আমরা একটু চিন্তা করলেই দেখতে পাবো এটার জন্য প্রধান ভাবে দায়ী হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা তথা আইএমএফ বা কাগুজে মুদ্রা বা সুন্নাহ মুদ্রার অনুপস্থিতি (সম্প্রতি গ্রীসকে ফতুর বানিয়েছে এই আইএমএফ)।

ইসলামে অনুমোদিত বা সুন্নাহ মুদ্রা আমরা তাকেই বলতে পারি যার মূল্য মুদ্রার ভিতরেই থাকে এবং তা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থায়ী থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সেই মুদ্রার যোগান ও চাহিদা মানুষের হাতে নয়, মানুষের স্রষ্টার হাতে থাকবে। That means, প্রকৃতি (Nature) বলে দিবে এখন কোনটার মুল্য মান কত হবে। কোন মানুষ মূল্যমান কে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখবে না। মুল্যমান হল একটা নির্দিষ্ট মুল্যে কতটুকু পন্য কেনা যায়। যেমন আজকে থেকে ১০ বছর আগে ৫ টাকা দিয়ে যা কেনা যেত এখন ৫ টাকা দিয়ে তা কেনা যায় না কারন মুল্যের মান অলরেডি কমে গেছে।

দিনার বা স্বর্ণ কে আমরা ইসলামিক মুদ্রা বা সুন্নাহ মুদ্রা বলতে পারি, কারন এটার মান কত হবে সেটা আল্লাহই নির্ধারণ করে দেন। যেমন কাগুজে মুদ্রার যত ইচ্ছা যোগান (supply) দেয়া যাবে, কিন্তু প্রকৃতি ঠিক করে দিবে স্বর্ণের উৎপাদন কত হবে। আর যেকোন জিনিসের যোগান ও চাহিদাই তার মান নির্ধারণ করে দেয়। আবার স্বর্ণ মুদ্রায়, মূল্য স্বর্ণের মধ্যেই থাকে এবং তার একটা স্থায়িত্বও আছে (Expected life) যা কাগুজে মুদ্রাই থাকেনা।
[The supply of Gold is limited but supply of Paper is unlimited for money] মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রন করে সরকার। আর যখন সরকার বেশি পরিমাণে কাগুজে মুদ্রা বাজারে ছাড়ে তখন মুদ্রার মুল্যমান কমতে থাকে, কিন্ত দিনার বা দিরহাম সরকার চাইলেই সরবরাহ করতে পারেনা কারন এর উৎপাদন সীমিত। মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে গেলে তাকে মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেইশন বলে, আর এর ফলে মুদ্রার মুল্যমান কমে যায়।

এদিকে ডলার যেহেতু একমাত্র মুদ্রা, যার মাধ্যমে তেল কেনা যাবে, তাই ডলার সরবরাহের পরিবর্তন পুরো বিশ্বের সকল কারেন্সি কে প্রভাবিত করে। বছরের পর বছর ডলারের মুল্যমান কমেই যাচ্ছে, ১৯১৩ সালে ১ ডলার দিয়ে যা কেনা যেত এখন শতকরা ৯৫ ভাগেরও কম কেনা যায়।

রাসূল ছল্লাল্লাহুয়া আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যুগে ১ দিনার (৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ) দিয়ে একটা ছাগল কেনা যেত আর ঐ ১ দিনার মূল্য দিয়ে আজও একটা ছাগল কেনা যাবে কারন এর কোন মূল্যমান হ্রাস হয়না।

কাগুজে মুদ্রা বা Paper money কখন ও কোথায় প্রথম ব্যবহার হয় এটা স্পষ্ট নয়, তবে ১৮০০ শতাব্দীতে ব্যাংক নোট প্রথমে দেখা যায়, ১৮৭০-১৯১৭ পর্যন্ত Classical gold standard এর অনুসরণে কাগুজে মূদ্রা ব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ সেন্ট্রাল ব্যাংক প্রথমে গোল্ড জমা করে রাখবে আর যত টুকু গোল্ড তাদের কাছে আছে ততটুকু কাগুজে মুদ্রা ছাপাবে (১০০% রিজার্ভ অনুপাত)। অর্থাৎ কাগুজে টাকা হল একটা চেকযা দিয়ে সব কিছু ক্রয় করা যাবে আর প্রয়োজনে ব্যাংকে জমা দিয়ে তার বিনিময়ে চেকে উল্লেখিত মূল্যের গোল্ড দাবী করা যাবে। তো এখানে এমন কোন সুযোগ নেই যে সরকার চাইলেই খেয়াল-খুশি মতন চেক বা কগুজে মুদ্রা প্রিন্ট করতে পারে, কারন যদি বেশি ছাপিয়ে দেয় তবে চেক/টাকার বিনিময়ে গোল্ড ফেরত দিতে ব্যার্থ হবে।

শুরুতে এভাবেই চলছিল, কিন্ত ১ম বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হলে মানুষ আর ব্যংকে যেতে পারতো না ফলে কাগুজে মুদ্রার বিনিময়ে গোল্ড পরিবর্তন করা কমে গেল আর চেক/কাগুজে মুদ্রার টাকা দিয়ে সবাই লেনদেন করা শুরু করলো, আর এই সুযোগে সরকার পাগলের মত মুদ্রা ছাপাতে লাগলো। এতে ইউরোপীয় দেশসমূহ মুদ্রাস্ফীতির সম্মুখীন হয়, আর জার্মানি তে Hyperinflation দেখা দেয়, জার্মান মার্কের মান এত কমে যায় যে একটা পত্রিকার দাম ১ মার্ক থেকে ১ বছর পর ৭ কোটি মার্ক হয়ে যায়, আর অনেকে কয়লার দাম বেশি হওয়ায় মার্ক/টাকা পুড়িয়ে খাবার রান্না করা শুরু করে। তাই ১৯১৬-১৯৪৪ পর্যন্ত আগের ১০০% রিজার্ভ সিস্টেম বাতিল হয়ে গিয়ে নতুন ব্যবস্থা চালু হল Gold Exchange Standard অর্থাৎ কত টুকু কাগুজে মুদ্রার বিনিময়ে ব্যাংক থেকে কতটুকু গোল্ড দাবী করা যাবে, সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারণ করে দিবে।

Children playing with stacks of hyperinflated currency during the Weimar Republic, 1922 (left) The currency lost its meaning. A wheel barrel became a wallet (right) যুদ্ধের সময়ে যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী ও যুদ্ধবিধ্বস্ত সকল দেশের প্রচুর নিত্যপন্য ও অস্ত্রের প্রয়োজন ছিল আর যেহেতু অ্যামেরিকা উভয় বিশ্বযুদ্ধেই প্রায় শেষের সময়ে অংশগ্রহণ করে তাই প্রয়োজনীয় মেটেরিয়ালস এর সামগ্রিক যোগান দাতা হয়ে গেল আমেরিকা। সে সময়ে স্বর্ণের মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্য হত তাই আমেরিকা খুব অল্প সময়ে অর্থনৈতিক ভাবে অনেক লাভবান হল, আর পন্যের বিনিময়ে বিশ্বের ২/৩ (Central Bank gold) স্বর্ণের রিজার্ভ কারী দেশ হয়ে গেল। আমেরিকার জাতীয় আয় (National Income) অকল্পনীয় ভাবে বেড়ে ১৯৩৩ সালে ৪৬ বিলিয়ন, থেকে ১৯৩৯ সালে ৭১ বিলিয়ন, পরে তা ১৯৪৩ সালে ১৪২ বিলিয়নে পৌঁছে গেলো অর্থাৎ মাত্র ১০ বছরে ৩ গুন আয় বৃদ্ধি!

যুদ্ধ অর্থনীতির জন্য খুব ভালো, যদি তুমি যুদ্ধের বাহিরে থেকে পন্য ও অস্ত্রের যোগান দাওএই নীতিতে বিশ্বাসী আমেরিকা তাই করলো। যুদ্ধ লাগাতে উস্কানি ঠিকি দিত তবে যুদ্ধে জড়াত না। যখন ফায়দা লুটা হয়ে যেত তখন আরও বেশী করে লুটার জন্য যুদ্ধ শামিল হয়ে জয় ছিনিয়ে নিত। প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা করেওছিলো তাইই।

যাইহোক, বাকি পুরো দুনিয়ার কাছে মাত্র ১ ভাগ স্বর্ণ রিজার্ভ থাকার কারনে ইউরোপের কোন দেশ আর আগের মত গোল্ড রিজার্ভ রেখে কাগুজে মুদ্রা ছাপাতে পারলো না ফলে পুরো বিশ্ব মনেটারি সিস্টেম আবার পতন ঘটলো। আর এর মধ্যেই আমেরিকা প্রচুর ডলার (কাগুজে মুদ্রা) ইউরোপের বাজারে ছেঁড়ে দিল।

এইভাবেই ১৯৪৪ সালে একটি কনফারেন্স ডেকে সকলের সম্মতিতে ডলার এর উপর ভিত্তি করে ব্রিটন উড (Bretton Woods) নামে একটি নতুন বিশ্ব মনেটারি/মুদ্রা সিস্টেম চালু হল। Gold Standard সিস্টেমে সকল দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক তাদের নিজস্ব কারেন্সি ছাপায় গোল্ড রিজার্ভ রেখে। যেমন- বাংলাদেশের টাকা/জাপানী ইয়েন/ডলার = গোল্ড (১ টাকার বিনিময়ের জন্য ব্যাংক তত পরিমাণ গোল্ড সংরক্ষণ করতো)। পরিশেষে ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচারড নিকসন, ডলারের সাথে গোল্ড রূপান্তরকে বাতিল করল এবং প্রস্তাব করল যে International Monetary fund (IMF) এর সহযোগিতায় আমেরিকা প্রয়োজন মাফিক ডলার ছাপাবে আর একটি নতুন মনেটারি সিস্টেম তৈরি করবে। তখন আবার Bretton Woods Agreement বাতিল হয়ে আবারো নতুন মনেটারি সিস্টেম আসলো যার নাম Dollar Standard! স্বর্ণের দাম হবে অনির্দিষ্ট। মানে মার্কেট অটোমেটিকালী স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করবে। সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ডলার হয়ে গেলো ভাসমান মুদ্রা, আর এখান থেকেই গোল্ডের উপর কোন ডিপেন্ডেন্সি আর রইলো না। ডলার আজ থেকে স্বর্ণ হতে স্বাধীনতা পেল।

Bretton Woods Agreement সিস্টেমে, বাংলাদেশের টাকা/জাপানী ইয়েন= ডলার = গোল্ড
আর নতুন প্রণীত Dollar Standard এ (বাংলাদেশের টাকা/জাপানী ইয়েন) = ডলার অপরদিকে সে সময়ে অ্যামেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারী ছিল বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তেলের দাম US Dollar এ নির্ধারণ করা হল। স্বর্ণ মুদ্রাকে চিরতরে কবরস্থ করার জন্য রিচার্ড নিক্সন সৌদি আরবের সাথে ঐকমতে এসে একটা চুক্তি (গদি কেড়ে নেয়ার হুমকী) সম্পাদন করে, চুক্তি অনুয়ায়ি এর পর থেকে তেল শুধু ডলারের মাধ্যমেই কিনা যাবে অন্য কোন কারেন্সি বা সম্পদ দিয়ে নয়, তো এর পরে পর্যায়ক্রমে OPEC এর সকল দেশ এই চুক্তির সাথে একমত হয়ে যায় আর তারপর থেকে ডলার পেট্রো-ডলারে রূপান্তর হয় ফলে US Dollar এর চাহিদা বাড়তে থাকে আর আমেরিকা তাদের অতিরিক্ত ছাপানো (মুদ্রাস্ফীতি) কাগুজে ডলার অন্য দেশে রপ্তানি শুরু করে।

আমেরিকা ইচ্ছামতো ডলার ছাপায় আর অন্য দেশের কাছে তা বিক্রি করে, এই ক্ষেত্রে তাদের কোন জবাবদিহীতা নাই। পৃথিবীর তাবৎ সম্পদ তারা শুধু কিছু টুকরো কাগজ বা গাছের পাতার বিনিময়ে কিনে নিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাস ফ্রিতে হাতাচ্ছে। আবার যখন ইচ্ছা বেশি ডলার ছাপিয়ে মুদ্রাস্ফীতি করে দেয়, ফলে গরিব দের সম্পদ চুরি হয়ে যায়। তাই মুদ্রাস্ফীতি/Inflation কে আমরা ম্যাক্রো লেভেলের (Macro) সুদও বলতে পারি, যা সময়ের সাথে সাথে মানুষের টাকা গ্রাস করে।

অথচ মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায় ভাবে গ্রাস করো না” (সূরা বাকারা-১৮৮)

পেট্রো-ডলারঃ আজ যখন কেউ পাকিস্তানি অথবা ইন্দোনেশিয়দেরকে তাদের নিজ নিজ দেশের অর্থনীতির করুণ অবস্থার জন্য দোষারোপ করেন, তখন সেটা সত্যিই খুব বেদনাদায়ক। কারণ এই অর্থনীতি সেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি নয়, ইহুদি-খ্রিস্টান মিত্র কর্তৃক প্রণীত আইএমএফের ষড়যন্ত্র মাত্র। কোনো দেশের সরকার সুদের বিনিময়ে আইএমএফ থেকে যে ঋণ নেয়, তা পরিশোধ করা ঐ দেশের পক্ষে উত্তরোত্তর কঠিন হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে এসব দেশ এমনভাবে ফাঁদে পড়ে যায় যে তারা আর কখনই এ ঋণ শোধ করতে পারে না, এবং এভাবে তারা ঐসকল দেশের দয়ার উপর নির্ভর করতে বাধ্য হয় যারা তাদের উপর বিশাল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। ঐসব দেশকে এই সন্দেহজনক ঋণদানের মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের উপর আরও গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। যেসব দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটে, মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলির কাছে ঐসব দেশের জমি, শ্রম, পণ্য আর বিভিন্ন সেবার মূল্য ক্রমেই কমতে থাকে। আর এভাবেই দেখা যায় পৃথিবীর একটা অংশ বিলাসিতার সাথে বসবাস করতে পারছে, আর পৃথিবীর বাকি অংশের মানুষ নিয়ত মূল্য হারাতে থাকা মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে দিন যাপন করছে। প্রতিনিয়ত তাদের ঘাম আর শ্রমের বিনিময়ে তারা এমন সব লুটেরাদের দাসে পরিণত হচ্ছে যারা চিরস্থায়ীভাবে ধনী, অর্থাৎ জীবনযাত্রায় চিরস্থায়ীভাবে জাহাজের প্রথম শ্রেণীর টিকেটের অধিকারী। এই ব্যবস্থায় ইহুদি-খ্রিস্টান শাসকগোষ্ঠি শুধু কাগজ ছাপিয়ে তাকে মুদ্রাহিসাবে চালিয়ে দেয়, এরপর তার একটা কাল্পনিক মূল্য নির্ধারণ করে দেয়, এবং এই প্রক্রিয়ায় তাদের খুশিমত সম্পদের মালিক হয়ে যায়।

যেসব দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ণ ঘটেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আই-এম-এফ) সেসব দেশকে ব্যাপকহারে বেসরকারীকরণে বাধ্য করে, যেন লুটেরারা খুব সহজেই ঐসব দেশগুলির তেল ও গ্যাসক্ষেত্র, বিদ্যূত ও টেলিফোন কোম্পানিগুলিকে কিনে (বা আয়ত্তে নিয়ে) নিতে পারে। আর যখন এসব ক্ষেত্রগুলি তাদের হাতে চলে যায়, তখন তা যায় তাদের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক অনেক কম মূল্যে।

ভেনিজুয়েলা এই ফাঁদ ধরতে পেরে IMF থেকে তার সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলো। সেসময় ইসলামের পন্ডিত (!) ব্যক্তিরা ছিলেন এ ব্যাপারে একদম নিরব! বর্তমানে ইসলামের রক্ষক দাবীকারী পন্ডিতেরা এমন অপরিশোধ্য কাগজি মুদ্রার বর্তমান ব্যবস্থাকে কখনই হারাম বলেন নি, এবং এটাও প্রতীয়মান হয় যে তারা ভবিষ্যতেও বলবেন না। কুরআনে বহু আয়াত আছে যেখানে সোনা এবং রূপাকে সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যে সম্পদকে স্বর্ণমুদ্রা দিনার ও রৌপ্যমুদ্রা দিরহাম রূপে ব্যবহার করা যায়। দেখুন ৩:৭৫, ১২:২০, ৩:১৪, ৩:৯১, ৯:৩৪, ৪৩:৩৩-৩৫, ৪:২০, ৭৬:২১, ৪৩:৫৩ ও ৪৩:৭১ এ সোনাকে মূল্যবান বলে গণ্য করা হয়েছে, যা উর্ধ্বলোক হতে প্রদান; ২২:২৩, ১৮:৩১, ১৭:৯৩।

আল কুরআনের উপ্রোক্ত বাণীগুলি এটাই প্রমাণ করে যে, সোনা এবং রূপা মহান আল্লাহ কর্তৃক যথেষ্ট মূল্য সহকারে সৃষ্ট হয়েছে, এবং এই জাগতিক পৃথিবীতে এদের অন্তর্নিহিত মূল্য বজায় থাকার পর পরবর্তী জগতেও সেই মূল্য থাকবে। আয়াতগুলি আরও নির্দেশ করে যে, মহান আল্লাহ পাক, বিজ্ঞতার সাথে সোনা ও রূপাকে অন্যান্য জিনিসের সাথে অর্থ হিসেবে ব্যবহারের জন্য সৃষ্টি করেছেন।

অপরদিকে সুন্নাহ-ভিত্তিক মুদ্রার ভিতরে তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে, যা আমি আগেও উল্লেখ করেছিঃ
১. এটা হবে কোন মূল্যবান ধাতু বা উপরোক্ত অন্য কোন দ্রব্য;
২. এর নিজস্ব মান থাকতে হবে; এবং
৩. এটা মহান আল্লাহ পাক উনারই সৃষ্ট জিনিসের মধ্যে হতে হবে যার মূল্যমান স্বয়ং মহান আল্লাহ পাকই নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যিনি সকল ধন-সম্পদের মালিক।

অথচ স্বীয়-মানসম্পন্ন মুদ্রা আজ বিশ্ব-অর্থব্যবস্থা হতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পবিত্র কুরআনে যে মুদ্রা’-র ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত, যার মূল্য পরবর্তী জগতেও বহাল থাকবে, সেই রকম মুদ্রা’-কে প্রত্যাখ্যান করার জন্য সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে দায়ী থাকতে হবে। কুরআনে উল্লেখিত সেই পবিত্র মুদ্রাব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করে তার স্থলে সম্পূর্ণ প্রতারণামূলক ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার মুদ্রাব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য মুসলমানদেরকে এরই মধ্যে ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে। এরূপ কাগুজে মুদ্রা ভিত্তিক সম্পূর্ণ ধোকাবাজি বা প্রতারণামূলক অর্থব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম। এটা গরীব মানুষের ঘাম (শ্রম) চুরি করার লাইসেন্স। উপর্যুপরি এই অর্থব্যবস্থা রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নত ও মহান আল্লাহ পাক উনার বাণীকে চ্যালেইঞ্জ করে। ফেরাউনও একই চ্যালেইঞ্জ করে শিরকের দোষে দুষ্ট হয়েছিলো। সুতরাং যতদিন মুসলমান তথা বিশ্বাসীরা এমন অর্থব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে না দিয়ে, কাগুজে মুদ্রাকে আঁকড়ে ধরে থাকবে ততদিন শিরক তাদের পিছু ছাড়বে না।

প্রকৃতপক্ষে আপনি ইন্ডাষ্ট্রিতে যা উৎপাদন করেন এবং যেই ফসল-ফলাদি উৎপন্ন করেন সেটাই হল আপনার প্রকৃত সম্পদ। সেই প্রকৃত সম্পদের সমতুল্য টাকা প্রিন্ট করা হয়, এর বেশী প্রিন্ট করলে জিনিসের দাম বেড়ে ইনফ্লেইশন হবে, মোট সম্পদ কখনো বাড়বে না। তবে আস্তে আস্তে একটু একটু করে টাকা প্রিন্ট করে বাজারে ছেড়ে দিলে কিন্তু মানুষ ইনফ্লেইশনটা টের পায় না যদি ইনফ্লেইশন হয়ে থাকেও। এবং সম্পদ উৎপাদন যদি টাকার প্রিন্ট করার হার থেকে বেশী হয়, তাহলে কিন্তু ইনফ্লেইশন না হয়ে ডিফ্লেইশন হবে (মানে জিনিসপত্রের দাম কমবে)।

মুদ্রা হিসেবে কাগুজে ডলার ব্যবহার করার রয়েছে ব্যাপক অসুবিধা। বিশেষত আমরা যারা অ-আমেরিকান, তাদের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। আমি পূর্বে আলোচনা করেছি, সব দেশকে ফরেইন রিজার্ভ আগে রাখতে হতো গোল্ডে। এখন সবাই রাখে ডলারে। গোল্ড থাকে আমেরিকায়। আমাদের ভল্টে থাকে শুধুই ডলার, যা কাগজ ছাড়া কিছুই নয়। এখন ধরেন, বাংলাদেশে ফরেইন রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলার। এই ২৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকৃত মূল্য মনে করেন ২৫ টন গোল্ড (ধরে নেন)। এখন, আমেরিকা নিজেদের যুদ্ধ পরিচালনা সংক্রান্ত ব্যয়, ইন্টারনাল ক্রাইসিস প্রভৃতি সামাল দেয়ার জন্য কোন উপায়ন্তর না পেয়ে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ছাপায়, এরপর এই ডলার সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ডলার ছাপানোয়, ডলারের মান কমে যায়, ব্যাপক ইনফ্লেইশন হয়। ফলে মনে করেন, মাত্র দশ মাসের মধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলারের মূল্য কমে মাত্র ১২ টন গোল্ড হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ যেকোন পণ্যের দাম ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে প্রায় দ্বিগুন হয়ে যাতে পারে বা আপনার জমাকৃত অর্থের মূল্য ভয়ংকরভাবে কমে যেতে পারে। এবং তা প্রতিনিয়ত কমছেও।

আমেরিকা ইচ্ছাকৃতভাবে ডলার প্রিন্ট করে নিজেদের ধার দেনা শোধ করছে এবং সেই সাথে সারা দুনিয়াই পেছন পকেট দিয়ে আমেরিকার যুদ্ধ এবং অন্যান্য ব্যয়ভার বহন করে চলেছে। আপনার চাকরি, ব্যবসাকৃত অর্জিত সম্পদ-কে ওয়াশিংটন ডিসির ফেডারেল রিজার্ভে বসে কিছু লোক ডলার প্রিন্ট করার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কমিয়ে দিচ্ছে বা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। সারা দুনিয়ার কিছুই করার নেই, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে।

01titel আসলে এইটাই দুনিয়ার সবচেবড় চৌর্যবৃত্তি! সারা মাস গতর খেটে তার বেতন দিয়ে পেট চলেনা, তার কারণ আমেরিকানদের ওয়াশিংটন ডিসিতে বসে কিছু লোকের ডলার প্রিন্ট করা। আমেরিকান ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক (সব প্রাইভেট ব্যাংকারদের এসোসিয়েশণ) অন্য ব্যাংকগুলোকে সেইভ করার জন্য যখনই এক ট্রিলিয়ন ডলার প্রিন্ট করার সিদ্ধান্ত নিবে, তখনই বুঝবেন, আসলে ওরা আপনার পকেট থেকে এই টাকা টান দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এটাও এক ধরণের রিবা বা সুদ! প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়া বা ষড়যন্ত্রমুলকভাবে দারিদ্র কোঠায় বন্দী করে রাখা।

শুধু ডলার প্রিন্ট করে সারা দুনিয়ায় তা ছড়ানোর ব্যবস্থাটা আছে বলেই আমেরিকা এখনও টিকে আছে। ইরাকে আর আফগানিস্তানে তো কত ট্রিলিয়ন খরচ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই, সারা দুনিয়ায় আমেরিকার ১৬ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ, তাও কোন সমস্যা নেই, কারণ আমেরিকা শুধু ডলার প্রিন্ট করে, প্রিন্ট করে ঋণ শোধ করে, আর যেই ইনফ্লেইশনটা হয়, তা সারা দুনিয়া একসাথে বহন করে, তাই আমেরিকার গায়ে লাগেনা। আপনি, আমি সবাই কিন্তু পরোক্ষভাবে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, ইসরাইল সব জায়গার যুদ্ধের খরচ আমেরিকাকে যুগিয়ে যাচ্ছি। কারণ আমরা ডলার ব্যবহার করছি। যতদিন গোল্ড ফিরে না আসে, অর্থাৎ দিনার ও দিরহাম ফিরে না আসে ততদিন এই ব্যবস্থাই চলবে।

বলা বাহুল্য, আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের গণতন্ত্র মূলত চিনি-আবৃত এক বিষ-বড়ি স্বরূপ! এই রাজনৈতিক গণতন্ত্র এমনভাবে কাজ করে, যাতে সুদভিত্তিক অর্থনীতির মাধ্যমে গণমানুষের উপর নিপীড়ন ও শোষণ অসীম সময়ের জন্য টিকে থাকে। ঐ অর্থনৈতিক নিপীড়নের সাথে প্রায় সর্বত্রই যুক্ত হয়েছে বর্ণবাদী ও জাতিগত নিপীড়ন! দরিদ্র জনগণ কখনই লুন্ঠনজীবী উচ্চশ্রেণীর ধনীদের কাছ থেকে, সত্যিকার রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পারবে না। যে ক্ষমতাবলে তারা অর্থনৈতিক নিপীড়নের সমাপ্তি ঘটাবে তাওও কখনো তাদের হস্তগত হবে না। তার কারণ ব্যায়বহুল নির্বাচন প্রচারণার সাফল্য ও বিপর্যয়ের মধ্যে যে পার্থক্য তা নির্ধারণ করে ঐ লুন্ঠনজীবী উচ্চশ্রেণীর ধনসম্পদ। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের নতুন সুখবর হলো অত্যাচারী ধনিক শ্রেণীটিই পৃথিবীর উত্তরাধীকারী হবে, ঘটছেও তাইই।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: