8.27.2018

আন্তর্জাতিক বানিজ্যে ডলার পরিত্যাগের হিড়িক পড়েছে, এখন থেকে চিন-বাংলাদেশ নিজ মুদ্রায় করবে ব্যবসা


আমেরিকান আগ্রাসনের বিপরীতে অত্যন্ত খুশির একটি খবর হলো এখন থেকে চীন থেকে যেকোন মালামাল আমদানির জন্য ডলারেআর ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হবে না। সরাসরি চীনা মুদ্রা ইউয়ান দ্বারা ঋণপত্র খোলা যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হয়েছে বলে মনে করছি। কারন এতোদিন চিন থেকে মালামাল আমদানির জন্য প্রথমে ডলার ক্রয় করতে হতো এতে অনেক সময় দেখা যেতো ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী টাকার মান কমে গেছে, যার দরুন ১ ডলার ৮১/৮২ টাকার যায়গায় ৮৪/৮৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। দেখতে পারেনঃ [https://www.youtube.com/watch?v=SrWpJfe27UA]

তবে এই ঝামেলার আর লসের দিন প্রায় শেষের দিকে কারন এখন থেকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা দেশি টাকা দিয়ে সরাসরি চীনা মুদ্রা কিনবেন এবং তা দিয়েই ঋণপত্র খুলবেন। বিপরীতে চীনা ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশি টাকায় তাদের ঋণপত্র খুলবেন। অর্থাৎ চীন-বাংলাদেশ আমদানি-রফতানি ব্যবসার ক্ষেত্রে ডলারের আর কোন প্রয়োজন নেই। খবরে বলা হয়েছে, এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-খরচ কমবে, সময়ের অপচয়ও রোধ হবে। বলা বাহুল্য, এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত; যার জন্য বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোকে একটা ইউয়ানঅ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। যারা বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন; তাদের মতে, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কার্যত চীনা মুদ্রা ইউয়ানকেআন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হল। অবশ্য ইউয়ানআন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। স্পেশাল ড্রইয়িং রাইটসহিসেবে যে কয়টি মুদ্রাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তার মধ্যে চীনা ইউয়ানও আছে। আর আমাদের ক্ষেত্রে ইউয়ানধীরে ধীরে গুরুত্ব লাভ করেছে। দেখতে পারেন [https://for.tn/2dIXTRt]

প্রতিবেশী দেশ হওয়ার দরুন ঘটনাক্রমে চীন ও ভারত আমাদের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি হয় চীন থেকে, তারপরই ভারতের স্থান। চীন থেকে আমদানির পরিমাণ সর্বশেষ হিসাবে এক লাখ কোটি টাকারও বেশ কিছুটা বেশি। ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ হবে মোটামুটি ৬০-৬৫ হাজার কোটি টাকা। তথ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ২৮-৩০ শতাংশ আমদানিই চীন থেকে। এ সূত্রেই চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান সিদ্ধান্তটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল বয়ে আনবে বলে অনেকেই মনে করছেন। আর এ মুহূর্তে বর্তমান সিদ্ধান্তে চীন ও বাংলাদেশ উভয়ই উপকৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2PDPrla]

তবে অনেকদিন যাবত চীনা ইউয়ানবড় একটা চাপের মধ্যে আছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন যাবত। এর শেষ পরিণতি কী হবে তা এখন পর্যন্ত কেউ ই জানে না। তবে দৃশ্যতই চীনা অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে। চীনের পুরো উন্নয়নই রফতানি নির্ভর এবং দুর্ভাগ্যক্রমে এই রফতানির বড় বাজারই হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর একারণেই যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতএব যুক্তরাষ্ট্র চীনা আমদানির ওপর কর বসিয়েছে। পাল্টা কর বসিয়েছে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর। এর ফলাফল কী হবে, আমরা জানি না। কিন্তু চীনকে তার অর্থনীতি ঢেলে সাজাতে হচ্ছে। এর মধ্যেই চীনা মুদ্রা ইউয়ানেরমূল্য পতন হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটের বিপরীতে বেশ কিছুদিন যাবত চীনা ব্যবসায়ী ও সাপ্লাইয়াররা বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বলছিলেন ইউয়ানেএলসি খোলার জন্য। অর্থাৎ ডলারকে পরিহার করার জন্য। এটা করলে চীনের ওপর ডলারের চাপ কিছুটা কমবে। এ উদ্দেশ্যে চীন পাকিস্তানের সঙ্গেও আমদানি-রফতানি ক্ষেত্রে ইউয়ানব্যবহারে সম্মত হয়েছে। দেখতে পারেন [https://cnb.cx/2wsxInU]

এদিকে বাংলাদেশেও চলছে ডলার সংকট। সংকটটি বেশ পুরনো। গত বেশ কিছুদিনের মধ্যে প্রবল চাপের মুখে বাংলাদেশের টাকার মূল্য অবমূল্যায়িত হয়েছে। ৭৯-৮০ টাকার জায়গায় এখন প্রায় ৮৪/৮৫ টাকা দিয়ে এক ডলার কিনতে হচ্ছে। এর কারণ খুব সহজ। আমদানি ঋণপত্র ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। অথচ এর বিপরীতে রফতানি আয় বেড়েছে কম হারে। রফতানি আয় একই বছরে বেড়েছে ৬ শতাংশেরও কম। আরেকটা উৎস থেকে ডলার আয় হয়; আর সেটা হচ্ছে রেমিটেন্স। রেমিটেন্স আয় বেড়েছে ১৬-১৭ শতাংশ হারে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, আমদানির পরিমাণ খুবই বেশি। বেসরকারি খাতের আমদানি যেমন বেশি, তেমনি আমদানি বেশি সরকারি খাতেরও। সরকারের হাতে রয়েছে বেশ কিছু অবকাঠামোর কাজ। এর জন্য বিশাল বিশাল আমদানির দরকার হচ্ছে। অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতের আমদানিও বাড়ছে। সর্বোপরি রয়েছে একটা বড় এলসি এবং তা হচ্ছে রূপপুর আণবিক প্রকল্পেরজন্য। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী দেশ থেকে টাকা পাচার করার জন্য বেশি বেশি আমদানি এলসিকরছে। ফলে ডলার সংকট দেখা দিয়েছে। সংকটটি শুধু ডলারের নয়। ব্যাংকে-ব্যাংকেও দেখা দিয়েছে তারল্য সংকট। অনেক বেসরকারি ব্যাংকের ফান্ড নেই। তারা ঋণ দিয়েছে বেশি অথচ আমানত সংগ্রহের পরিমাণ কম। বছরখানেক ধরে এটা ঘটে যাচ্ছে। সরকারি ব্যাংকে ফান্ডআছে, কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে ঋণের নিষেধাজ্ঞা জারি আছে বলে জানা যায়। এ প্রবল তারল্য সংকট মোকাবেলায় সরকার বেসামাল হয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে নানা সুবিধা দিতে শুরু করে। এরই মধ্যে আবার সুদনীতি নিয়ে সরকার কড়াকড়ি আরোপ করে। ঋণের ওপর ৯ শতাংশ সুদ করতে হবে এবং আমানতের ওপর ৬ শতাংশ। এসব কারণে ব্যাংকিং খাত এখন এক অস্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে। টাকার সংকট যেমন আছে, তেমনি চলছে ডলারের সংকট। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2wq9Ql4]

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৩২-৩৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমিত হয়ে আছে। এর থেকে বেশি নিচে রিজার্ভকে নামানো যাবে না। এদিকে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি সর্বকালীন রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। একইভাবে রেকর্ড ভঙ্গ করেছে ব্যালেন্স অব পেমেন্টপরিস্থিতিও। অবস্থা এমন হয়েছে যে, ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) মতো প্রতিষ্ঠানও ডলারের অভাবে এলসিখুলতে পারছে না। বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের এলসিখুলতে অস্বীকৃত হয়েছে। এটা খুবই খারাপ খবর। কারণ তারা তেল আমদানি করে, যা ছাড়া যাতায়াত ও মালামাল পরিবহন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রয়োজন মতো ডলার দিতে পারছে না। এদিকে ডলারের টানাটানিতে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির চাপ অনুভূত হচ্ছে। বিদেশে চিকিৎসার খরচ, পর্যটকদের ভ্রমণ খরচ ও বিদেশে পড়াশোনার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। যারা বিদেশ থেকে স্বল্পকালীন ঋণ এনেছে, তাদের ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুদ এবং আসল উভয়ই। সরকারের ঋণের বোঝাও বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে ইউয়ানে ব্যবসা আমাদের সংকটকে কি কিছুটা লাঘব করবে? দেখতে পারেন [https://reut.rs/2o9m2Tt]

উল্লেখ্য, সারা বিশ্বেই চলছে এক অস্থিতিশীলতা। সর্বসাম্প্রতিক সমস্যা হচ্ছে তুরস্কের লিরার। লিরাতুরস্কের মুদ্রার নাম। তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা চলছে। আমেরিকান এক এজেন্ট ধর্মযাজককে তুরস্ক জেলে পুরে রেখেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার মুক্তি চায় যেকোন মুল্যে। কিন্তু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান তা করবেন না। যুক্তরাষ্ট্র ক্ষ্যাপে গিয়ে তুরস্কের সঙ্গেও বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছে। তুরস্ক থেকে আমদানিকৃত স্টিল এবং এলুমিনিয়ামের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আমদানি কর বসিয়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে তুরস্ক। এ সংকটে পড়ে তুরস্কের কারেন্সি লিরারমূল্য পতন শুরু হয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় তুরস্কের সমস্যা গিয়ে পড়ছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর। মজার বিষয়, এর প্রভাব পড়েছে ভারতীয় অর্থনীতিতেও, যা আমাদের জন্যও বেশ গুরুত্ব বহন করে। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2PEfI31]

দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ভারতের আমদানি খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে ডলারের দামে। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দাম অনেকটাই পড়ে গেছে। এক বছর আগে যেখানে এক ডলারের বিপরীতে মাত্র ৬৪-৬৫ ভারতীয় রুপি পাওয়া যেত; সে জায়গায় এখন পাওয়া যাচ্ছে ৭০ রুপিরও ওপরে। বলা বাহুল্য, এর প্রভাব আমাদের ওপর পড়ছে। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান কমলে দৃশ্যত আমাদের লাভ। কারণ আমরা ভারত থেকে এক বছরে ৬০-৬৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য সরকারিভাবে আমদানি করি। ভারতীয় রুপির দাম কমলে আমাদের আমদানিকারকের লাভ। পর্যটক যারা, তাদের লাভ। যারা অধ্যয়নের জন্য ভারতে যায়, অথবা যায় চিকিৎসার জন্য, তাদের লাভ। কারণ ৮৪ টাকা দিয়ে ডলার কিনে পাওয়া যায় ৭০-৭১ ভারতীয় রুপি। বিনিময় হার ৮০ শতাংশের ওপরে। বেশ ভালো বিনিময় হার। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2Mz4hM8]

কিন্তু এ সবই অঙ্কের কথা। বাস্তবে ভারতীয় বাজার কেমন- তা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। রিজার্ভ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ৪ শতাংশ। কিন্তু তা এর মধ্যে পাঁচ শতাংশের বেশি বলে কাগজে দেখলাম। অর্থাৎ বিনিময়পত্রের দাম বাড়ছে। তাহলে আমাদের আমদানিকৃত পণ্যের দামও বাড়বে। ভারত থেকে আমরা প্রচুর ভোগ্যপণ্য আমদানি করি। এর মধ্যে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মসলা ইত্যাদি রয়েছে। ভারতে এ সবের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে বাংলাদেশেও তা ঘটবে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতাও আমাদের বর্তমান ডলার সংকটকে উসকে দিচ্ছে। এ অবস্থায় সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরিভাবে প্রয়োজন। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2PzTxel]


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: