12.04.2019

মন্দিরে নামাজ পড়া যায়েজ নামক উদ্ভট ফতোয়ার পোস্টমর্টেম


বর্তমানে আমরা যে যামানায় বসবাস করছি তা আখেরী যামানার চেয়ে কোন অংশে কম বলে মনে হচ্ছেনা। তবে আমরা যে কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি তা সবচেয়ে ভালো জানেন মহান আল্লাহ পাক। দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ২৬ নভেম্বর ২০১৯ তারিখেঃ আপনি যা জানতে চেয়েছেন শিরোনামে প্রশ্নোত্তর আকারে এসেছে। তা নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রশ্নঃ মন্দিরে নামাজ পড়লে কি আদায় হবে?

উত্তরঃ আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের জন্য সমগ্র জায়গাকেই নামাজের উপযোগী বানিয়ে দিয়েছেন। তাই জলে-স্থলে, পাহাড়ে ও মহাশূন্যের যেকোনো পবিত্র জায়গায়ই নামাজ পড়লে তা আদায় হবে। অতএব, কোনো কারণে মন্দির বা বিধর্মীদের উপাসনালয়েও নামাজ পড়লে তা আদায় হয়ে যাবে। যদিও প্রয়োজন ছাড়া সেখানে নামাজের জন্য যাওয়া অনুচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে সমগ্র জমিনকেই আমাদের জন্য উপাসনালয় ও পবিত্রতার বস্তু (তায়াম্মুমের জন্য) হিসেবে বানানো হয়েছে।অর্থাৎ যেকোনো পবিত্র জায়গায়ই নামাজ শুদ্ধ হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৫)। তবে মূর্তি, ছবি বা উপাস্য বাতি ইত্যাদি সামনে নিয়ে নামাজ পড়া মাকরুহে তাহরিমি। কেননা এতে সেগুলো উপাসনাসদৃশ হয়ে যায়। তবে নামাজ আদায় হয়ে যাবে। (লিঙ্ক এখানে)

কালের কন্ঠের ফতোয়াদানকারী মৌলুভী-যে কোন পর্যায়ের জাহিল সেটা বুঝতেছিনা তবে যেটা মনে হয় সে মূর্খতার কারনে এ ফতোয়া দেয়নি বরং মুসলমানরা সুযোগ পেলে যেন মন্দিরে গিয়ে নামায পড়ে তার পথ প্রশস্ত করার চেষ্টা করেছে। মন্দির হচ্ছে শিরকের আড্ডা হিন্দুদের পুজার স্থান। এখানে রয়েছে তাদের বিভিন্ন তথাকথিত কাল্পনিক দেব দেবীর মূর্তি। সেই সাথে বিভিন্ন নাপাকী বিষয়বস্তুতে ভরপুর থাকে মন্দিরগুলি। এখানে কি করে নামায পড়া যায়? মহান আল্লাহ পাক উনার দুনিয়ায় কি নামায পড়ার জায়গার অভাব রয়েছে?

জেনে রাখা প্রয়োজন যে, ফতেহ মক্কা তথা পবিত্র মক্কা শরীফ বিজয়ের পর যখন হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কাবা শরীফ আসলেন তখন তিনি সব মূর্তি ধ্বংস না করে নামাজ আদায়তো দূরের কথা সেখানে প্রবেশই করেননি।

হাদিস শরীফে এসেছেঃ [عن جابر ان النبى صلى الله عليه وسلم امر عمربن الخطاب زمن الفتح وهو بالبطحاء ان يأتى الكعبة فيمحو ك صورة فيها فلم يد خلها النبى صلى الله عليه وسلم حتى محيت كل صورة فيها]
অর্থঃ হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা শরীফ বিজয়ের সময় হযরত ফারূকে আযম অমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম উনাকে হুকুম করলেন, তিনি যেন পাথর দিয়ে ক্বাবা ঘরের সমস্ত মূর্তি বা চিত্রগুলি ধ্বংস করে দেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র ক্বাবা ঘরের মুর্তি বা চিত্রগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত ক্বাবা ঘরে প্রবেশ করলেন না। (আবু দাউদ শরীফ ২য় খন্ড ২১৯ পৃষ্ঠা)

এ হাদীছ শরীফ থেকে প্রমাণ হলো, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছবি, মূর্তি ধ্বংস না করা পর্যন্ত পবিত্র ক্বাবা ঘরেই প্রবেশ করেননি। আর কালেরকন্ঠের মৌলুভী মন্দিরে নামাজের আয়োজন করছে। নাউযুবিল্লাহ!!!

এবার আসুন দেখি, ছবি ও মূর্তি যুক্ত স্থানে নামাজের ব্যাপারে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনাদের কি অবস্থান ছিলোঃ [عن عيسى بن حميد قال سال عقبة الحسن قال ان فى مسجدنا ساحة فيها تصاوير قال انحروها]
অর্থঃ হযরত ঈসা বিন হুমাইদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত ওকবাতুল হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, আমাদের মসজিদে প্রাণীর ছবিযুক্ত একখানা কাপড় রয়েছে। তখন হযরত ঈসা বিন হুমাঈদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, তুমি (মসজিদ থেকে) ওটা সরিয়ে ফেল। (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ২/৪৬)

আরো বলা হয়েছেঃ [عن ابى عثمان قال حدثتنى لبابة عن امها وكانت تخدم عثمان بن عفان ان عثمان ابن عفان كان يصلى الى تابوت فيه تماثيل فامربه فحك]
অর্থঃ হযরত আবু উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত- তিনি বলেন, লোবাবাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মাতা হতে আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, উনার মাতা হযরত ওসমান যুন্নুরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম উনার খেদমতে ছিলেন, আর হযরত ওসমান যুন্নুরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম প্রাণীর ছবিযুক্ত একটি সিন্দুকের দিকে নামায পড়ছিলেন। অতঃপর হযরত ওসমান যুন্নুরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম-এর নির্দেশে ওটা নিঃচিহ্ন করে ফেলা হলো। (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ২/৪৬)

হাদীস শরীফে আরো বলা হয়েছেঃ [ﻋﻦ ﻣﻘﺴﻢ ﺭﺣﻤﺖ ﺍﻟﻠﻪ ﻗﺎﻝ ﻗﺎﻝ ﻋﺒﺎﺱ ﻳﺼﻠﻲ ﻓﻲ ﺑﻴﺖ ﻓﻴﻪ ﺗﻤﺎﺛﻴﻞ]
অর্থঃ হযরত মুকসিম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন, যে ঘরে প্রানীর ছবি থাকে সে ঘরে নামাজ পড়বে না। (মুছান্নাফে আবী শায়বা-আল বাব আছ ছলাতু ফিল বাইতি ফীহি তামাছিল - ১ম খন্ড- ৩৯৮ পৃষ্ঠা)

মন্দিরতো দূরের কথা মসজিদে বা নিজ গৃহেও যদি ছবি বা মূর্তি থাকতো হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারা সেটা ধ্বংস করে ফেলে পুনরায় নামায আদায় করতেন।

এবার আসুন দেখা যাক, বির্ধমীদের উপাসানালয়ে প্রবেশ বিষয়ে কোন বর্ণনা আছে কিনা?

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছেঃ [وَقَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ إِنَّا لَا نَدْخُلُ كَنَائِسَكُمْ مِنْ أَجْلِ التَّمَاثِيلِ الَّتِي فِيهَا الصُّوَرُ]
অর্থঃ হযরত ফারূকে আযম অমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম বর্ণনা করেন, আমরা তোমাদের গির্জায় এ কারনে প্রবেশ করি না কারন তাতে মূর্তি রয়েছে। (বুখারী শরীফ- কিতাবুস সালাত- ১১৮ পৃষ্ঠা)।

আমিরুল মুমিনিন হযরত ফারূকে আযম অমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম উনাকে সিরিয়াতে এক খৃষ্টান নেতা দাওয়াত করলে তিনি এ কথা বলেন। (ফতহুল বারী ১/৬৩৩)

মূর্তি থাকার কারনে আমিরুল মুমিনিন হযরত ফারূকে আযম অমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম খ্রিষ্টানদের গির্জায় প্রবেশ করার ব্যাপারে নিষেধ করেছেন। গির্জায় কেবল কল্পিত দুটি মূর্তি থাকে, সেই তুলনায় মন্দিরে কত বেশি কল্পিত মূর্তি, ছবি, নাপাকী রয়েছে তা সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন।

এখানেই শেষ না, লামাযহাবীদে মুরুব্বী মুহম্মদ সালেহ মুনজিদ তার ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেঃ [إذا تيسر وجود غير الكنائس ليُصلى فيها لم تجز الصلاة في الكنائس ونحوها ، لأنها معبد للكافرين يعبدون فيه غير الله ، ولما فيها من التماثيل والصور]
অর্থঃ গীর্জা ব্যাতিত অন্য স্থানে প্রার্থনা করা সম্ভব হলে গীর্জা ইত্যাদিতে প্রার্থনার অনুমতি দেওয়া যাবে না। কারণ এটি কাফেরদের মন্দির, যারা আল্লাহ পাক উনার বদলে অন্যের উপাসনা করে। এবং এর মধ্যে মূর্তি ও ছবি রয়েছে। (ফাতাওয়া ইসলামী সুওয়াল জাওয়াবঃ প্রশ্ন ২১৮৯)

বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে ওলীতে গলিতে, প্রতি মহল্লা, শহরে বন্দরে, গ্রামে অসংখ্য অগনিত মসজিদ ও মুসলমানদের গৃহ থাকার পরও কেন মন্দিরে গিয়ে নামায পড়াকে বৈধ বানাতে হবে?

তবে কি তারা ভবিষ্যতে মন্দিরে হিন্দুদের পুজার সাথে সাথে মুসলমানদের নামাযের আয়োজন করতে চাইছে?


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 facebook: