এই প্রশ্নটি সাধারণ প্রশ্ন নয়। এটি আক্বীদার প্রশ্ন, আদবের প্রশ্ন, ঈমানের প্রশ্ন। “নবী কি আমাদের মতো বাশার?” এই বাক্যটি বাহ্যিকভাবে ছোট, কিন্তু এর ভিতরে দুইটি পথ আছে। এক পথ আহলুছ ছুন্নাহর, আরেক পথ গোস্তাখীর। আহলুছ ছুন্নাহ বলেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশার, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ বাশার নন। তিনি বাশারিয়াতের পোশাকে নূরে মুজাছছাম, ছাইয়্যিদুল বাশার, আফদ্বলুল খালক্ব, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সবচেয়ে প্রিয় হাবীব।
এখন যদি কেউ বলে, নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশার নন, তাহলে সে কুরআন শরীফের প্রকাশ্য ভাষার বিরুদ্ধে গেলো। আবার যদি কেউ বলে, তিনি আমাদের মতোই সাধারণ বাশার, তাহলে সে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শান, মান, মর্যাদা কমিয়ে দিলো। সঠিক আক্বীদাহ হলো, তিনি বাশার, কিন্তু “আমাদের মতো” নন। কেননা পবিত্র ক্বুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلٰهُكُمْ إِلٰهٌ وَاحِدٌ) অর্থাৎ, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, আমি তো তোমাদের মতো একজন বাশার, তবে আমার ওপর ওহী নাজিল করা হয় (আর সে ওহীর মূল কথা হচ্ছেন), তোমাদের যিনি মাবুদ তিনি একক ইলাহ।
√ ছুরাহ আল কাহফ - ১৮:১১০
এই আয়াত শরীফ দিয়ে যারা বলে, “দেখুন, নবী তো আমাদের মতোই মানুষ,” তারা আয়াত শরীফের অর্ধেক দেখে, বাকিটা গোপন করে। আয়াত শরীফে বলা হয়েছে, بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ, অর্থাৎ বাশারিয়াতের দিক থেকে তোমাদের মতো; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা হয়েছে, يُوحَىٰ إِلَيَّ, অর্থাৎ কিন্তু আমার ওপর ওহী নাজিল করা হয়। এখানেই পার্থক্য। আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের উপর ওহী আসে না। আমরা বাশার, কিন্তু আমরা ছাইয়্যিদুল আম্বিয়া নই। আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের নাম আরশে লেখা নয়। আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের উপর ক্বুরআন শরীফ নাযিল করা হয়নি। আমরা বাশার, কিন্তু আমরা রহমাতাল্লিল য়ালামীন নই।
আর আয়াতে এই কথা বলা হয়নি যে, “তোমরাও আমার মতো।” বলা হয়েছে, “আমি তোমাদের মতো বাশার।” এই দুই বাক্যের মধ্যে আসমান জমিনের পার্থক্য রয়েছে। “আমি তোমাদের মতো বাশার” মানে, আমি খোদা নই, আমি মালাক নই, আমি তোমাদের কাছে বুঝার মতো, অনুসরণের মতো, জীবনযাপনের আদর্শ হিসেবে পাঠানো একজন রছুল। কিন্তু “তোমরাও আমার মতো” এই কথা কোথাও বলা হয়নি। সাধারণ মানুষকে নবীর মাক্বামের সমান করে দেওয়া এই আয়াতের উদ্দেশ্য নয়।
বাশার কেন বলা হয়েছে তা বুঝতে হলে এই আয়াতের শানে নুযূল ও প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা কেন উনার হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে দিয়ে বলালেন, “আমি তোমাদের মতো বাশার”? এই ঘোষণা কি উনার মাক্বাম কমানোর জন্য? নাকি উনার নবুওয়তকে রক্ষা করার জন্য?
এই জায়গায় আয়াতের প্রেক্ষাপট বুঝা জরুরি। কারণ কোনো আয়াত শরীফকে উনার শানে নুযূল, পরিবেশ, মুখাতিব বা যাদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে, তাদের আক্বীদা না বুঝে অর্থ ধরলে মানুষ ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।
তৎকালীন আরব, মক্কা, মুশরিক, ইহুদি, নাসারা, এদের আক্বীদাগত অবস্থা দেখুন। মানুষ পাথরের মূর্তি বানিয়ে পূজা করত। কাঠের মূর্তি বানিয়ে পূজা করত। নিজের হাতে বানানো বস্তুকে ইলাহ মনে করত। আটা ময়দা দিয়ে বানানো মুর্তি আবার ভুক লাগলে খেয়েও ফেলতো এমন নজির ও আছে। লাত, মানাত, উযযা, এসব মূর্তিকেতো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মেয়েও বলতো, উনার নৈকট্যের মাধ্যম হিসেবেও পূজা করত। কেউ চাঁদ, সূর্য, তারকা, গাছ, পশু, জড়বস্তু পর্যন্ত পূজা করত। অর্থাৎ তাদের সমস্যা ছিল, তারা মাখলূককে খলিকের মাক্বামে তুলত।
এমনকি আহলে কিতাবের মধ্যেই ইহুদিদের একটি দল তো হযরত উযাইর য়ালাইহিছ ছালাম উনার সম্পর্কে বলেছিল, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্র, নাউযুবিল্লাহ। নাসারারা হযরত ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম উনার সম্পর্কে বলেছিল, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পুত্র। ক্বুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের এই বাতিল দাবিকে উল্লেখ করে ইরশাদ করেনঃ (وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللهِ، وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللهِ، ذَٰلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ، يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ، قَاتَلَهُمُ اللهُ، أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ) অর্থাৎ, ইহুদিরা বলল, উযাইর আল্লাহর পুত্র; আর নাসারারা বলল, মসীহ আল্লাহর পুত্র। এটি তাদের মুখের কথা। তারা পূর্ববর্তী কাফিরদের কথার সাদৃশ্য করছে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের ধ্বংস করুন, তারা কোথায় ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
√ ছুরাহ আত তাওবাহ - ৯:৩০
এখন চিন্তা করুন, যেসব জাতি কোনো কোনো নবীর কিছু মু’জিযা দেখে নবীকে আল্লাহর পুত্র বলে ফেলেছে, তাদের সামনে যখন সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরছালিন, ইমামুল মুরছালিন, হাবীবে খোদা, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তাশরীফ আনলেন, যাঁর মু’জিযা পূর্ববর্তী নবীগণের সকলের সম্মিলিত মু’জিযার চেয়েও বেশী, যাঁর হাতে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হলো, যাঁর ইশারায় গাছ এগিয়ে এলো, পাথর ছালাম দিল, অল্প খাদ্যে বহু মানুষ তৃপ্ত হলো, আঙুল মুবারক থেকে পানি প্রবাহিত হলো, যাঁর উপর ক্বুরআন শরীফ নাযিল হলো, যাঁকে মি’রাজ শরীফে নেওয়া হলো, তখন বাতিল আক্বীদার লোকদের জন্য ঘুলু করার আশঙ্কা আরও বেশি ছিল। এইটা জাহিল গ্বইরে ছুন্নী খারেজীরা না বুঝলেও মহান আল্লাহ তায়ালা তো জানতেনই।
অতএব “قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ” আয়াত শরীফটি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মাক্বাম কমানোর জন্য আসেননি; বরং তাওহীদ রক্ষা করার জন্য এসেছেন। অর্থাৎ, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম), আপনি তাদের বলে দিন, আমি ইলাহ নই, আমি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পুত্র নই, আমি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার যাতের অংশ নই, আমি মাখলূক; আমি মানবজাতির মধ্যেই তাশরীফ এনেছি, যেনো তোমরা আমাকে অনুসরণ করতে পারো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলে দিন, “يُوحَىٰ إِلَيَّ”, আমার উপর ওহী নাযিল হয়। তাই আমি সাধারণ বাশার নই, আমি ওহীপ্রাপ্ত রছুল।
এখানে দুইটি বাতিল দরজা বন্ধ করা হয়েছে। প্রথম দরজা হলো, কেউ যেন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে ইলাহ না বানায়। দ্বিতীয় দরজা হলো, কেউ যেন উনাকে নিজের মতো সাধারণ মানুষ মনে না করে। প্রথম দরজা বন্ধ হয়েছে “بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ” দিয়ে। দ্বিতীয় দরজা বন্ধ হয়েছে “يُوحَىٰ إِلَيَّ” দিয়ে।
তাই আয়াতের সঠিক অর্থ হলোঃ আমি তোমাদের মতো বাশারিয়াতের পোশাকে তাশরীফ এনেছি, কিন্তু তোমাদের মতো সাধারণ মানুষ নই; আমার উপর ওহী নাযিল হয়, সেই ওয়াজি যা নূরের ভাণ্ডার অথচ দেখ চেয়ে তূর-এ-ছিনায়, নূরের এক ঝলকে ছ্বহাবি মৃত নবী মুছা কালিমুল্লাহ অজ্ঞন, অথচ আমি দিব্যি ২৩ বছর তোমাদের মধ্যে আনলিমিটেড নূর নিয়ে চলাফেরা করেছি। হ্যাঁ আমি মাখলূক, কিন্তু আফদ্বলুল মাখলূক। আমি বান্দা, কিন্তু আবদে খাছ। আমি মানুষ, কিন্তু ছাইয়্যিদুল বাশার। আমি ইলাহ নই, কিন্তু মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হাবীব ও রছুল।
মক্কার মুশরিকরা এমন কথাও বলত যে, রছুল আবার মানুষ কেন? ফেরেশতা কেন নন? কখনো বলত, তিনি খাবার কেন খান, বাজারে কেনো চলাফেরা করেন? পবিত্র ক্বুরআন শরীফে তাদের আপত্তিগুলো এইভাবে এসেছেনঃ (وَقَالُوا مَالِ هَٰذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ) অর্থাৎ, তারা বলল, এ কেমন রছুল যে, তিনি খাদ্য খান এবং বাজারে চলাফেরা করেন?
√ ছুরাহ আল ফুরক্বান - ২৫:৭
মুশরিকদের ভুল ছিল, তারা ভাবত রছুল হলে মানুষ হওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের ভুল ভাঙিয়ে দিলেন। রছুল মানুষই হবেন, কারণ মানুষকে হিদায়েত দিতে হলে মানুষের ভাষায়, মানুষের জীবনে, মানুষের সামনে, মানুষের অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে আসতে হবে। ফেরেশতা হলে মানুষ বলত, আমরা তো ফেরেশতা নই, আমরা কীভাবে অনুসরণ করব?
মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (قُلْ لَوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِّينَ، لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَّسُولًا) অর্থাৎ, পেয়ারে হাবিব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আপনি বলুন, যদি জমিনে ফেরেশতারা নিশ্চিন্তে চলাফেরা করত, তবে আমি অবশ্যই আসমান থেকে তাদের কাছে ফেরেশতাকেই রছুল হিসেবে নাযিল করতাম।
√ ছুরাহ আল ইছরা - ১৭:৯৫
অতএব নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বাশারিয়াত উনার মর্যাদা কমানোর জন্য নয়, বরং উনাকে অনুসরণযোগ্য করার জন্য। তিনি খেতেন, যেন উম্মত হালাল খাওয়ার আদব শিখে। তিনি ঘুমাতেন, যেন উম্মত ঘুমের ছুন্নত শিখে। তিনি বিবাহ করেছেন, যেন উম্মত পবিত্র পারিবারিক জীবন শিখে। তিনি বাজারে গেছেন, যেন উম্মত লেনদেনের আদব শিখে। তিনি কষ্ট পেয়েছেন, যেন উম্মত ছ্ববর শিখে। তিনি ঈবাদত করেছেন, যেন উম্মত বন্দেগি শিখে। তিনি বাশারিয়াতের পোশাকে এসেছেন, যেন উম্মত বলতে না পারে, “আমরা তো উনাকে অনুসরণ করতে পারব না।”
কিন্তু এই বাশারিয়াতকে ধরে কেউ যদি উনাকে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে নামিয়ে আনে, তাহলে সে কুরআনের অন্য আয়াতগুলো ভুলে যায়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে সাধারণ মানুষ বলেননি, বরং বলেছেনঃ (وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ) অর্থাৎ, আমি আপনাকে সকল য়ালমের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।
√ ছুরাহ আল আম্বিয়া - ২১:১০৭
আমরা কি সমগ্র য়ালামীন বা সমস্ত জগতের জন্য রহমত? না রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম সমস্ত কায়েনাতের জন্যে রহমত। তাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে হবেন?
আবার মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا) অর্থাৎ, বরকতময় তিনি, যিনি উনার বান্দার উপর ফুরক্বন নাযিল করেছেন, যাতে তিনি সমস্ত য়ালমের জন্য সতর্ককারী হন।
√ ছুরাহ আল ফুরক্বান - ২৫:১
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি পুরো য়ালামীন বা সমগ্র কায়েনাতের জন্য নাজীর? আমরা কি জিন, ইনছান, পূর্ব, পশ্চিম, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, সব জগতের জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে সতর্ককারী? না। এই মাক্বাম শুধু রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার, আম পাবলিক তো বহুত দূর ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৯২ পয়গম্বর ও না, ৩১২ মুরছাল ও না, ৪ উলুল আজ্বম রছুল ও উনার মতো না। তাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে বলছি?
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরও ইরশাদ করেনঃ (وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ মাক্বামে প্রতিষ্ঠিত।
√ ছুরাহ আল ক্বালাম - ৬৮:৪
আমাদের চরিত্রে দোষ আছে, ভুল আছে, নফছ আছে, গাফলত আছে, পরিবর্তন আছে। আর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মহান চরিত্রের সর্বোচ্চ মাক্বামে। তাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরও ইরশাদ করেনঃ (النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ) অর্থাৎ, নবী মুমিনদের নিজেদের প্রাণের চেয়েও অধিক নিকট ও অধিক অধিকারী।
√ ছুরাহ আল আহযাব - ৩৩:৬
আমরা কি কোনো মুমিনের নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক অধিকারী? না। এই মাক্বাম শুধু নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার। তাহলে “আমাদের মতো” কথাটি কোথায় দাঁড়ায়?
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরও ইরশাদ করেনঃ (إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ، يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা ও উনার ফেরেশতাগণ নবীর উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ, তোমরাও উনার উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে ছালাম পেশ করো।
√ ছুরাহ আল আহযাব - ৩৩:৫৬
আমাদের উপর কি মহান আল্লাহ তা’য়ালা ও ফেরেশতাগণ এভাবে দুরূদ শরীফ পাঠ করেন? আমাদের নাম শুনলে কি উম্মতের উপর দুরূদ পড়া মুহব্বতের আদব, ওয়াজিব হয়ে যায়? না। এই মাক্বাম কেবল রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার জন্য। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে তিনি আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নন। তিনি বাশার, কিন্তু ছাইয়্যিদুল বাশার। তিনি মাখলূক, কিন্তু আফদ্বলুল মাখলূক। তিনি বান্দা, কিন্তু য়াবদে খাছ। তিনি রছুল, তিনি হাবীব, তিনি শাফী, তিনি রহমাতুল্লিল য়ালামীন।
এখানে আরেকটি খুব সহজ, কিন্তু গভীর চিন্তার বিষয় আছে। যদি কেউ বলে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাদের মতোই সাধারণ বাশার, তাহলে তাকে জিজ্ঞাসা করা হোকঃ আপনি কি আমার কালিমা পড়তে পারেন? আমি কি আপনার কালিমা পড়তে পারবো?
অথচ আমি যদি বলিঃ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، فُلَانٌ رَسُولُ اللهِ) অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, “অমুক ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার রছুল” তাহলে এটা ঈমানদার বানাবে না, বরং অলরেডি মুছলিম হলে কাফের বানিয়ে দেবে। আপনি যদি আমার নাম নিয়ে কালিমা পড়েন, তাতেও ঈমান আসবে না, বরং যাবে। দুনিয়ার কোনো মানুষের নাম বাদ দিলাম, কোন পূর্বরতি নবী, রছুল উনাদের নাম দ্বারা কালিমা পড়লেও মানুষ মুছলমান হয় না। কিন্তু যখন বলা হয়ঃ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, হযরত মুহাম্মদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রছুল।
তখন মানুষ ঈমানের দরজায় প্রবেশ করে, মুছলমান হয়। এখন প্রশ্ন হলো, যাঁর নাম কালিমার অংশ, যাঁর রিছালাত স্বীকার না করলে ইমান পূর্ণ হয় না, যাঁকে না মানলে “لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ” বলার পরও নাজাতের দরজা খোলে না, তিনি কীভাবে আমাদের মতো সাধারণ বাশার হন?
আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের নাম কালিমায় নেই। আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের রিছালাত মানা ফরজ নয়। আমরা বাশার, কিন্তু আমাদের অস্বীকার করলে ঈমান নষ্ট হয় না। আর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এমন বাশার, যাঁর রিছালাত স্বীকার করা ঈমানের শর্ত। অতএব তিনি বাশার হলেও যে, আমাদের মতো সাধারণ বাশার নন এটা বাচ্চারাও বুঝবে।
এখানেই (بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ) এর সঠিক অর্থ পরিষ্কার হয়। তিনি ইলাহ নন, তিনি মাখলূক, তিনি মানবজাতির মধ্যেই তাশরীফ এনেছেন; কিন্তু উনার মাক্বাম এমন যে, উনার নাম ছাড়া কালিমা শরীফ পূর্ণ হয় না, উনার রিছালাত ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না, উনার অনুসরণ ছাড়া মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মহব্বতের দরজা খোলে না।
এখানে একটি হাদীছ শরীফ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এক প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেনঃ (إِنِّي لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ، إِنِّي أَبِيتُ يُطْعِمُنِي رَبِّي وَيَسْقِينِي) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের অবস্থার মতো নই। আমি রাত কাটাই, আমার রব আমাকে খাওয়ান এবং পান করান।
√ ছ্বহীহ আল বুখারী, কিতাবুস ছাওম; ছ্বহীহ মুছলিম, কিতাবুছ ছিয়াম।
এই হাদীছ শরীফ স্পষ্ট করে দেন, বাহ্যিক বাশারিয়াত আছে, কিন্তু নববী হাক্বিকত সাধারণ মানুষের মতো নয়। যেখানে সাধারণ মানুষ দুর্বল, সেখানে উনার মাক্বাম আলাদা। যেখানে সাধারণ মানুষ খাওয়া-পানার মুখাপেক্ষী, সেখানে উনার উপর রব্বানী ফয়েজের আলাদা তাছির আছে। তাই “তিনি আমাদের মতোই” বলা হাদীছ শরীফের বিরুদ্ধেও যায়।
আহলুছ ছুন্নাহর ভাষা হলো, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশারিয়াতের দিক থেকে মানুষ, কিন্তু হাক্বিকত, মাক্বাম, ঈলম, নূর, ওহী, ইছমত, আজ্বমত, শাফায়াত, রহমত, মর্যাদা, কুরব, খাছাইছ ও কামালাতের দিক থেকে আমাদের মতো নন। তিনি আমাদের মতো হলে উনার অনুসরণ ফরজ হতো না, উনার উপর দুরূদ পাঠের হুকুম এভাবে আসত না, উনার শানে বেআদবী করলে সমস্ত নেক য়ামল নষ্ট হওয়ার ভয় আসত না।
কুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ، وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ، أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ) অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ, (তোমরা যখন কথা বলো তখন) তোমাদের আওয়াজ যেনো (আমার) নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আওয়াজের চেয়ে উর্ধ্বে না যায়। এবং (তোমরা) নিজেদের মধ্যে একে অপরের সাথে যেভাবে উচ্চস্বরে (বা আদব ছাড়া) কথা বলো, অনুরূপ ভাষায়ও কথা বলনা; এমন যেনো কখনো না হয় যে তোমাদের সকল নেক য়ামল বা ইবাদত (শুধুমাত্র এই কারনেই) বরবাদ করে দেওয়া হবে, অথচ তোমরা তা জানতেও পারবেনা।
√ ছুরাহ আল হুজুরাত - ৪৯:২
যদি নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাদের মতো সাধারণ মানুষ হতেন, তাহলে উনার সামনে আওয়াজ উঁচু করলে য়ামল বিনষ্ট হওয়ার ভয় কেন? সাধারণ মানুষের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বললে আমল নষ্ট হয় না। কিন্তু নবীর দরবারে আদব এর খিলাফ হলে য়ামল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এখানেই বোঝা যায়, বাশারিয়াত আছে, কিন্তু সাধারণত্ব নেই। মানব রূপ আছে, কিন্তু মাক্বাম আলাদা। শরীর আছে, কিন্তু নূরানী, নূরে মুহাম্মাদী ওয়ালা উনি উনার মর্যাদাই আলাদা।
এই আয়াতের আসল শিক্ষা হলো, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সঙ্গে “আমাদের মতো” আচরণ করা যাবে না। উনার দরবারের আদব আলাদা। উনার নামের আদব আলাদা। উনার ছুন্নতের মর্যাদা আলাদা। উনার ক্ববর মুবারকের আদব আলাদা। উনার রওযা শরীফ সাধারণ কোন কবর নয়। উনার হায়াতে বারযাখী হক্ব। উনার উপর উম্মতের দরূদ পেশ হয়। উনার দরবারে বেয়াদবি দ্বীনের জন্য ভয়ংকর।
এখনো যারা বলে, “নবী তো আমাদের মতোই বাশার,” তাদের সামনে কিছু সরল প্রশ্ন রাখা দরকার।
আমরা কি মাটির নিচে ক্ববরে থাকা কোনো নবীকে দেখতে পাই, যেভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে ক্ববরের মধ্যে নামাযরত অবস্থায় দেখেছেন? ছ্বহীহ মুছলিমে আছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মি’রাজের রাতে হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে ক্ববরের মধ্যে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে দেখেছেন। আমরা কি এমন দেখতে পাই? না। তাহলে তিনি আমাদের মতো দৃষ্টিসীমার মানুষ কীভাবে?
আমরা কি ক্ববরবাসীর শাস্তি দেখতে বা শুনতে পাই, যেভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম দুই ক্ববরবাসীর শাস্তির খবর দিয়েছেন? ছ্বহীহ হাদীছে এসেছেন, তিনি দুই ক্ববরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে বললেন, তাদের শাস্তি হচ্ছে। একজন প্রস্রাব থেকে বাঁচত না, আরেকজন চুগলখোরি করত। আমরা কি ক্ববরের ভিতরের এই হাল দেখতে বা জানতে পারি? না। তাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?
আমরা কি ফেরেশতা দেখতে পাই? রেওয়ায়েতে এসেছেন, কোনো কোনো জানাযা ও বিশেষ মুহূর্তে এত ফেরেশতা নাযিল হয়েছেন যে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পা রাখার জায়গা না পেয়ে পা টিপে টিপে চলেছেন। আমরা কি ফেরেশতার নুযূল দেখি? আমাদের চোখ কি সেই নূরানী জগত দেখতে পারে? না। তাহলে আমাদের চোখ উনার চোখের মতো কীভাবে?
আমরা কি অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া, বাহ্যিক যানের সীমাবদ্ধতা ছাড়া, আনলিমিটেড গতিতে স্পেসস্যুট ছাড়া মহাশূন্য অতিক্রম করে আসমানের বাইরে গিয়ে, ছিদরাতুল মুনতাহার মাক্বাম পর্যন্ত গিয়ে, আবার মুহূর্তের মধ্যে ফিরে আসতে পারি? রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মি’রাজে গিয়েছেন। তিনি মাছযিদুল হারাম থেকে মাছযিদুল আক্বছা, সেখান থেকে আসমানসমূহ, তারপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কুরবের মাক্বামে গিয়েছেন, যেখানে ফেরেশতাদের সর্দার যাওয়ার সাহস করেন নাই ভয়ে যে ১ ইঞ্চি আগালে পুড়ে যাবেন। আমরা কি তা পারি, পারবো? না। তাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?
আমরা কি দুনিয়ায় বসে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখতে পাই? ছ্বহীহ হাদীছে এসেছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নামাযে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছেন। তিনি জান্নাতের আঙ্গুরের একটি থোকা ধরতে হাত বাড়িয়েছিলেন, পরে তা ছেড়ে দিয়েছেন। আমরা কি দুনিয়ার চোখে জান্নাতের ফল দেখতে পাই? আমরা কি জাহান্নামের দৃশ্য দেখতে পাই? আমাদের হাত কি মদিনা থেকে বাড়ালে জান্নাতের ফল ধরতে পারবে? না। তাহলে তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার কীভাবে?
আমরা কি উনার মতো সামনে ও পেছনে দেখতে পাই? ছ্বহীহ হাদীছে এসেছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, আমি আমার পেছনেও দেখি, যেমন সামনে দেখি। আমরা কি ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিশক্তির মালিক? আমরা কি পেছনের দৃশ্য সামনে দেখার মতো দেখতে পাই? না। তাহলে আমাদের দৃষ্টি উনার দৃষ্টির মতো কীভাবে?
আমরা কি আসমানের সেই শব্দ শুনতে পাই, যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম শুনেছেন? হাদীছ শরীফে এসেছেন, তিনি বলেছেন, আমি যা দেখি, তোমরা তা দেখ না; আমি যা শুনি, তোমরা তা শুন না। আসমান কড়মড় শব্দ করছে, আর তার জন্য তা করা যথার্থ; কারণ সেখানে চার আঙুল জায়গাও নেই, যেখানে কোনো ফেরেশতা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্য সিজদা বা ক্বিয়ামে নেই। আমরা কি এই শব্দ শুনি? না। তাহলে আমাদের শ্রবণশক্তি উনার শ্রবণশক্তির মতো কীভাবে?
এই প্রশ্নগুলো কোনো অতিরঞ্জন নয়। এগুলো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার খাছাইছ ও মো’জেজার দরজা। তিনি বাশার, কিন্তু এমন বাশার, যার দৃষ্টি সাধারণ দৃষ্টি নয়, যার শ্রবণ সাধারণ শ্রবণ নয়, যার মি’রাজ সাধারণ সফর নয়, যার হাল সাধারণ মানুষের হাল নয়, যার কুরব সাধারণ মাখলূকের কুরব নয়।
যারা বলে, “নবী তো আমাদের মতো বাশার,” তাদের ভুল হলো, তারা বাশার শব্দ ধরে নবুওয়ত, ওহী, ইছমত, নূর, রহমত, শাফায়াত, আদব, খাছাইছ সব ঢেকে দিতে চায়। অথচ ক্বুরআনের ভাষা ভারসাম্যপূর্ণ। একদিকে বলেন, তিনি বাশার, যাতে কেউ উনাকে খোদা না বানায়। অন্যদিকে বলে, তিনি রহমাতুল্লিল য়ালামীন, যাতে কেউ উনাকে সাধারণ না বানায়। একদিকে বলেন, উনার প্রতি ওহী আসে। অন্যদিকে বলেন, উনার অনুসরণ করলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ভালোবাসবেনঃ (قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ، فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ) অর্থাৎ, বলুন, যদি তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ করো, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের ভালোবাসবেন।
√ ছুরাহ আলে ইমরান - ৩:৩১
মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মুহব্বতের দরজা নবীর অনুসরণের সঙ্গে যুক্ত। তাহলে তিনি কি সাধারণ বাশার? না। তিনি সেই বাশার, যাঁর অনুসরণ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মুহব্বতের দরজা। তিনি সেই বাশার, যাঁর ছুন্নত দুনিয়া ও আখিরাতের নাজাত। তিনি সেই বাশার, যাঁর নামের সঙ্গে দুরূদ ছাড়া মুমিনের জবান পূর্ণ আদব পায় না।
এখন মূল সিদ্ধান্ত হলোঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বাশার, কারণ কুরআন শরীফে আছে। কিন্তু তিনি আমাদের মতো সাধারণ বাশার নন, কারণ কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা, আদব, নবুওয়ত, ওহী, ইছমত, আজ্বমত খাছাইছ এবং উনার মাক্বাম সবই প্রমাণ করেন যে তিনি ছাইয়্যিদুল বাশার।
বাশারিয়াত মানলে ঈমান ঠিক থাকে। সাধারণত্ব চাপালে আদব নষ্ট হয়। উনাকে খোদা বানানো কুফর, আর উনাকে নিজের মতো সাধারণ বানানো গোস্তাখী। আহলুছ ছুন্নাহ এই দুই বাতিল পথের মাঝখানে হক্বের পথ ধরে: তিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বান্দা ও রছুল, তিনি নূরে মুজাসসাম, তিনি ছাইয়্যিদুল আম্বিয়া, তিনি রহমতুল্লিল য়ালামীন, তিনি আফদ্বলুল খালক্ব, তিনি আমাদের মতো নন।
তাই যে কেউ কাহাফের শেষ আয়াত এর প্রথম অংশ পড়ে যদি বলে, “নবী আমাদের মতো,” তাহলে তাকে বলা হবেঃ আয়াত পুরো পড়ুন। (يُوحَىٰ إِلَيَّ) দেখুন। অন্য আয়াতগুলোও দেখুন। দুরূদের আয়াত শরীফ দেখুন। আদবের আয়াত শরীফ দেখুন। “নবী মুমিনদের নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক অধিকারী” আয়াত শরীফ দেখুন। “রহমাতাল্লিল য়ালামীন” আয়াত শরীফ দেখুন। “সমগ্র জগতের নাজীর” আয়াত শরীফ দেখুন। মি’রাজ শরীফ দেখুন। ক্ববরের হাল জানা দেখুন। ফেরেশতার নুযূল দেখুন। জান্নাত জাহান্নাম দেখুন। সামনে-পেছনে দেখার খাসিয়্যাত দেখুন। আসমানের শব্দ শুনার খাসিয়্যাত দেখুন। তারপর বুঝবেন, আয়াতের উদ্দেশ্য নবীর মাক্বাম কমানো নয়, বরং উনাকে খোদা বানানোর পথ বন্ধ করে নবুওয়তের মাক্বামে প্রতিষ্ঠা করা।
এখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার দোয়া-আন-নূরের দীর্ঘ রেওয়ায়েতের একটি সূক্ষ্ম শব্দের দিকে লক্ষ্য করুন। দোয়ার এসেছেঃ (أَللّٰهُمَّ أَعْطِنِي نُورًا، وَاجْعَلْ فِي عَصَبِي نُورًا، وَفِي لَحْمِي نُورًا، وَفِي دَمِي نُورًا، وَفِي شَعْرِي نُورًا، وَفِي بَشَرِي نُورًا) অর্থাৎ, হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আপনি আমাকে নূর দান করুন; আমার স্নায়ুকে নূর বানিয়ে দিন, আমার গোশতকে নূর বানিয়ে দিন, আমার রক্তকে নূর বানিয়ে দিন, আমার চুলকে নূর বানিয়ে দিন, আর আমার বাশারকে (অর্থাৎ আমার চামড়া ও বাহ্যিক মানবীয় আবরণকেও) নূর বানিয়ে দিন।
এখানে بَشَرِي শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজেই যখন বলেনঃ (وَفِي بَشَرِي نُورًا) তখন বুঝা যায়, بَشَر শব্দের একটি প্রকাশ্য অর্থ হলো মানুষের বাহ্যিক দেহাবরণ, চামড়া, দেহগত মানবীয় রূপ। অতএব কুরআন শরীফে যখন বলা হয়ঃ (قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ) অর্থাৎ, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, আমি তো তোমাদের মতো একজন বাশার, তবে আমার ওপর ওহী নাজিল করা হয়।
√ ছুরাহ আল কাহফ - ১৮:১১০
তখন এর অর্থ এই নয় যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাদের মতো সাধারণ মানুষ। বরং এর অর্থ হলো, উনি ইলাহ নন, উনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার যাতের অংশ নন, উনি ফেরেশতা নন; উনি মানবজাতির মধ্যেই বাশারিয়াতের বাহ্যিক পোশাকে তাশরীফ এনেছেন। কিন্তু সেই বাশারিয়াতও সাধারণ বাশারিয়াত নয়। কারণ উনার নিজের দোয়া মুবারকেই আছে, উনার স্নায়ুতে নূর, গোশতে নূর, রক্তে নূর, চুলে নূর, এমনকি উনার بَشَر বা বাহ্যিক দেহাবরণেও নূর।
তাই “বাশার” শব্দ দিয়ে উনার মাক্বাম কমানো যায় না। বরং বলা হবে, উনি বাশার, কিন্তু নূরানী বাশার। উনি মানুষ, কিন্তু ছাইয়্যিদুল বাশার। উনি মাখলূক, কিন্তু আফদ্বলুল মাখলূক। উনি বান্দা, কিন্তু আবদে খাছ। উনি আমাদের মতো দেহধারী মানব রূপে তাশরীফ এনেছেন, কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অন্তর্ভুক্ত নন; কারণ আমাদের উপর ওহী আসে না, আমাদের বাশারিয়াত নূরে মুহাম্মদীর মাক্বামে নয়, আমাদের দেহ দ্বীনের উৎস নয়, আমাদের জীবন শরীয়তের মাপকাঠি নয়।
অতএব (بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ) এর উদ্দেশ্য হলো তাওহীদ রক্ষা করা: যেন কেউ উনাকে ইলাহ না বানায়। আর (يُوحَىٰ إِلَيَّ) এর উদ্দেশ্য হলো নবুওয়তের মাক্বাম প্রতিষ্ঠা করাঃ যেন কেউ উনাকে সাধারণ মানুষ না বানায়। দোয়া-আন-নূরের ভাষা এই হাক্বিকতকে আরও স্পষ্ট করে দেন যে, নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বাশারিয়াতও নূরানী, উনার মানবীয় রূপও রব্বানী অতার আলোয় মুবারক, আর উনার বাহ্যিক দেহাবরণও সাধারণ মানুষের মতো নয়।
রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মানুষ, কিন্তু এমন মানুষ, যার মতো কোনো মানুষ নেই। তিনি বাশার, কিন্তু বাশারিয়াতের সর্দার। তিনি মাখলূক, কিন্তু মাখলূকের শ্রেষ্ঠজন। তিনি বান্দা, কিন্তু য়াবদে কামিল। তিনি রছুল, কিন্তু ছাইয়্যিদুল মুরছালীন। তিনি নবী, কিন্তু খতামুন নাবিয়্যীন। তিনি আমাদের মতো নন; বরং আমাদের ইমান, আমাদের য়ামল, আমাদের নাজাত, আমাদের মহব্বত, আমাদের আদব, সবকিছু উনার দরবারের সঙ্গে যুক্ত।
এটাই আহলুছ ছুন্নাহর আক্বীদা। এটাই আদবের পথ। এটাই ঈমানের নিরাপদ সীমা।