Wednesday, April 1, 2026

নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ ও খফীফাহঃ পরিচয়, পরিমাণ এবং ১০টি নাপাকির বিধান সাদাস্রাব সহ

নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ ও খফীফাহঃ পরিচয়, পরিমাণ এবং ১০টি নাপাকির বিধান সাদাস্রাব সহ

বিষয়বস্তুঃ নাপাকির প্রকারভেদ এবং পবিত্রতা অর্জনের মাছ’আলা।

কিছু নাপাকি বা অপবিত্রতা এমন আছে যেগুলোকে (اَلنَّجَاسَةُ الْغَلِيظَةُ) ‘নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ’ বলা হয় এবং কিছু অপবিত্রতা এমন আছে যেগুলোকে (نَجَاسَةُ خَفِيفَة‘নাযাছাতে খফীফাহ’ বলা হয়। প্রত্যেক মুছলমানের এটি জানা উচিত যে, সারা বিশ্বে যে নাপাক জিনিসগুলো রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কোনটি গ্বলীজ্বাহ এবং কোনটি খফীফাহ। যাতে একজন মুছলিম নামাজ পড়ার সময় এই নাযাছাতগুলোর বিধান অনুযায়ী সঠিকভাবে য়া’মল করতে সক্ষম হয়।

নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ ও এর পরিমাণঃ

নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ, “গ্বলীজ্ব” (মোটা, ঘন, কঠিন, কড়া, রুক্ষ, ভারী-প্রকৃতির) শব্দটি থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, এগুলো এমন নাযাছাত যার বিধান শরীয়তে অত্যন্ত কঠোর। এটি সামান্য পরিমাণ লাগলেও নামাজ হবে না। গ্বলীজ্বাহ-এর ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হলোঃ

যদি কাপড়ে এক দিরহামের চেয়ে বেশি লেগে যায়, তাহলে ওই কাপড়ে নামাজ হবে না।

যদি ঠিক এক দিরহামের সমান এই নাযাছাত লেগে থাকে, তবে তা পরিষ্কার করা ওয়াযিব। এই অবস্থাতেই নামাজ পড়ে নিলে এটি ওয়াযিব তরক হবে এবং এই নামাজ ‘মাকরূহে তাহরীমী’ হিসেবে আদায় হবে।

যদি নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ এক দিরহামের চেয়ে কম হয়, তবে তা পরিষ্কার করা বা পবিত্র করা একটি বরকতময় ছুন্নাহ। কিন্তু কেউ যদি ওই সামান্য নাপাকি নিয়েই নামাজ পড়ে ফেলে, তবে তার নামাজ সঠিকভাবে আদায় হয়ে যাবে। 

এখন প্রশ্ন হলো, এই এক দিরহাম পরিমাণ কতটুকু?

তরল (Liquid) নাযাছাতের ক্ষেত্রেঃ তরল নাযাছাত (যেমন প্রস্রাব বা রক্ত) হলে, এক দিরহাম হলো হাতের তালুর গভীরতা। কেউ হাতের তালু একদম সোজা করে মেলে ধরে তাতে পানি ঢাললে, উপচে পড়া বন্ধ হওয়ার পর যতটুকু পানি আটকে থাকে, একেই হাতের তালুর গভীরতা বলা হয়। এই পরিমাণ বা এর সমান দাগ হলে তা এক দিরহাম হিসেবে গণ্য হবে।

কঠিন (Solid) নাযাছাতের ক্ষেত্রেঃ নাযাছাত যদি তরল না হয়ে কঠিন পদার্থ হয়, তবে এক দিরহামের ওজন হলো সাড়ে চার মাশা (গ্রামে কনভার্ট করলে ৪.২ বা ৪.৩ গ্রামের চেয়ে সামান্য বেশি)। এত ভারী বা ওজনের নাযাছাত কাপড়ে লেগে গেলে তা দূর করা ওয়াযিব।

নাযাছাতে খফীফাহ ও এর পরিমাণঃ

নাযাছাতে খফীফাহ ওই নাযাছাতগুলোকে বলা হয়, যার বিধান শরীয়ত খাফীফ বা হালকা রেখেছে। যদি কাপড়ে বা শরীরে অনেক বেশি লাগে, তবে নামাজ হবে না; কিন্তু অল্পস্বল্প লাগলে শরীয়ত তা মাফ রেখেছেন। খফীফাহ-এর ক্ষেত্রে নিয়ম হলোঃ

যে জায়গায় বা কাপড়ের যে অংশে লেগেছে, ওই অঙ্গের বা অংশের পুরো এক-চতুর্থাংশ (চার ভাগের এক ভাগ বা ২৫ শতাংশ) যদি ঘিরে ফেলে, তবে ওই কাপড়ে নামাজ হবে না। ২৫ শতাংশের বেশি হলেও নামাজ হবে না।

কিন্তু যদি ২৫ শতাংশের কম জায়গায় লাগে, তবে নামাজ হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, জামার হাতায় লাগলে পুরো হাতার ২৫ শতাংশের কম হলে নামাজ হবে, তবে উত্তম হলো এটিকেও ধুয়ে বা মুছে পরিষ্কার করে নেওয়া।

নাযাছাতে খফীফাহ-এর প্রকারভেদঃ

সারা বিশ্বের যত নাযাছাত রয়েছে, তার মধ্যে থেকে কেবল দুটি নাযাছাত, নাযাছাতে খফীফাহ-এর অন্তর্ভুক্তঃ

১. হালাল প্রাণীদের প্রস্রাবঃ আমরা যত হালাল প্রাণী খাই (যেমন গরু, বলদ, মহিষ, পুরুষ মহিষ, পাঁঠা, ছাগল), এদের প্রস্রাব নাযাছাতে খফীফাহ। এটি কাপড়ের অংশের পুরো ২৫ শতাংশ ঘিরে ফেললে তবেই নামাজের মাছ’আলা তৈরি হয়। হালাল প্রাণীর প্রস্রাবের তিন-চার ফোঁটা লাগলে নামাজে কোনো সমস্যা হবে না, তবে ধুয়ে নেওয়া উত্তম।

২. উঁচুতে উড্ডয়নকারী হারাম পাখির বিষ্ঠাঃ যেসব হারাম পাখি উঁচুতে উড়ে (যেমন চিল, কাক, বাজ বা শিকারী), এদের বিষ্ঠাও নাযাছাতে খফীফাহ। এর বিধান খুব কঠোর নয়। কাক বা চিলের বিষ্ঠা কাপড়ে লাগলে তা মুছে নিয়ে নামাজ পড়লেও নামাজ আদায় হয়ে যাবে।

(জ্ঞাতব্যঃ কিছু প্রাণী এমন আছে যাদের বিষ্ঠা বা শরীর সম্পূর্ণ পবিত্র। যেমন যেসব হালাল পাখি উঁচুতে উড়ে এবং শস্যদানা খায়, এরা শিকারি নয় (কবুতর, ময়না ইত্যাদি), এদের বিষ্ঠা পবিত্র। একইভাবে স্থলভাগের ছোটখাটো পোকামাকড় (তেলাপোকা, মশা, মাছি), এদের রক্ত বা বিষ্ঠাও পবিত্র। বাদুড়ের বিষ্ঠাও পবিত্র বলে অধিকাংশের মত। এদের মধ্যে নাপাকির কোনো বিষয় থাকে না।)

নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ-এর প্রকারভেদঃ

খফীফাহ-এর ওই দুটি প্রকার ছাড়া বাকি যত নাযাছাত আছে, সেগুলো সবই নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহর অন্তর্ভুক্ত। নিচে এর বিস্তারিত বর্ননা দেওয়া হলোঃ

১. মানুষের শরীরের বর্জ্যঃ মানুষের শরীর থেকে নির্গত হওয়া সব নাযাছাত গ্বলীজ্বাহ। যেমন, প্রস্রাব, বীর্য (মানি), মাজি, ওদি, মল, প্রবহমান রক্ত, পুঁজ, পেট থেকে নির্গত মুখভর্তি বমি (এমনকি তা একদিনের শিশুর দুধের বমি হলেও) এবং রোগাক্রান্ত চোখ থেকে বের হওয়া পানি। এর কোনোটিই খফীফাহ নয়।

২. হালাল প্রাণীর গোবর বা বিষ্ঠাঃ হালাল প্রাণীর প্রস্রাব খফীফাহ হলেও এদের গোবর, বিষ্ঠা বা ম্যাঙ্গনি (যেমন গরুর গোবর, ছাগলের বিষ্ঠা) নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ।

৩. নিচুতে উড্ডয়নকারী হালাল পাখির বিষ্ঠাঃ যেসব হালাল পাখি উঁচুতে উড়তে পারে না, নিচেই চলাফেরা করে (যেমন মুরগি, হাঁস), এদের বিষ্ঠা নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ।

৪. স্থলভাগের প্রাণীর প্রবহমান রক্তঃ যেকোনো স্থলভাগের প্রাণীর (তা হালাল হোক বা হারাম) প্রবহমান রক্ত সম্পূর্ণ নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ। গরু বা ছাগল জবেহ করার পর যে রক্ত প্রবাহিত হয়, তা গ্বলীজ্বাহ। তবে মাছের ভেতরে থাকা লাল তরলকে শরীয়ত রক্ত হিসেবে গণ্য করে না, তাই মাছের রক্ত কাপড়ে লাগলে কাপড় নাপাক হবে না, পবিত্রই থাকবে।

৫. মদ (খামার): আঙ্গুরের রস ইত্যাদি দিয়ে বানানো মদ নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ। এটি মল ও প্রস্রাবের মতোই সবচেয়ে ঘৃণ্য নাপাকি। প্রস্রাব লাগলে যেমন কাপড় নাপাক হয়, মদ লাগলেও তেমনি কাপড় নাপাক হয়ে যায়।

৬. মৃত প্রাণী (মুরদার) এর গোশত ও চর্বি: যেকোনো মৃত প্রাণী (তা হালাল বা হারাম যাই হোক) এবং শরীয়তসম্মত উপায়ে “বিছমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” না পড়ে জবেহ করা প্রাণীর গোশত ও চর্বি নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ। (তবে মুছলিম বা আহলে কিতাব কর্তৃক সঠিকভাবে জবেহ করা হালাল প্রাণীর গোশত ও চর্বি পবিত্র)। শুকর (Pig) নিজ সত্তায় নাপাক (নাযিছুল আঈন), তাই তাকে হালাল পদ্ধতিতে জবেহ করলেও তার গোস্ত, চর্বি ও সবকিছু নাপাক।

৭. হিংস্র প্রাণীর লালাঃ ছিঁড়ে-ফেড়ে খাওয়া হিংস্র চতুষ্পদ প্রাণী (যেমনঃ কুকুর, সিংহ, চিতা, নেকড়ে), এদের লালা প্রস্রাবের মতোই নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ।

উপসংহারঃ নাযাছাতে খফীফাহ মাত্র দুই প্রকার, এছাড়া বাকি সব নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ। এই বিধানগুলো ভালোভাবে স্মরণ রাখলে খুব সহজেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে, কোন নাযাছাত ধুয়ে নামাজ পড়তে হবে এবং কোন নাযাছাতের ক্ষেত্রে পরিষ্কার না করে নামাজ পড়লেও তা আদায় হয়ে যাবে।

আরেকটি বিষয় মনে আসায় এড করে দিচ্ছি, বিষয় নারীদের রিলেটেড, সাদাস্রাব এর হুকুম কি? মাজি ও সাদা স্রাবের হুকুম কি এক?

না, মাজি এবং স্বাভাবিক সাদা স্রাবের হুকুম এক নয়এই দুটির মাঝে পবিত্রতা এবং নাপাকির দিক থেকে সুস্পষ্ট ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে

নিচে বিস্তারিত মাছ’আলা পেশ করা হলোঃ

১. মাজি (مَذِي) এর হুকুমঃ

মাজি হলো এমন একটি আঠালো ও পাতলা তরল, যা নারী বা পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই যৌন উত্তেজনা বা কামভাবের কারণে নির্গত হয়

পবিত্রতার বিধানঃ মাজি সর্বসম্মতভাবে নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ (মারাত্মক নাপাকি) এর অন্তর্ভুক্ত।

কাপড় ও শরীরের বিধানঃ এটি শরীরে বা কাপড়ে লাগলে তা নাপাক হয়ে যাবেপূর্বের মাছ’আলায় বর্ণিত এক দিরহামের হিসাব অনুযায়ী এটি ধুয়ে পবিত্র করা আবশ্যক (পরিমাণ অনুযায়ী ফরজ, ওয়াযিব বা ছুন্নত)

অজু ও গোসলঃ মাজি নির্গত হলে অজু নিশ্চিতভাবে ভেঙে যায়, তবে এর কারণে গোসল ফরজ হয় না

২. স্বাভাবিক সাদা স্রাব (Leukorrhea/Vaginal Discharge) এর হুকুমঃ

সাদা স্রাব (আরবি ফিকহী পরিভাষায় যাকে “রুতুবাতুল ফারজ” বলা হয়) হলো নারীদের যৌনাঙ্গের বাইরের বা ভেতরের অংশ থেকে নির্গত স্বাভাবিক স্বচ্ছ বা সাদা তরল, যা কোনো কামভাব বা উত্তেজনার কারণে বের হয় না; বরং এটি একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া

পবিত্রতার বিধানঃ হানাফি মাজহাবের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ফতোয়া (ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার মত) অনুযায়ী, নারীদের এই স্বাভাবিক সাদা স্রাব সম্পূর্ণ পবিত্রশরীয়তের দৃষ্টিতে এটিকে ঘাম বা থুথুর মতোই পবিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়

কাপড় ও শরীরের বিধানঃ যেহেতু এটি পবিত্র, তাই এই স্বাভাবিক সাদা স্রাব কাপড়ে বা শরীরে লাগলে কাপড় বা শরীর নাপাক হয় নাএটি ধুয়ে ফেলা বাধ্যতামূলক নয়, তবে পরিচ্ছন্নতার স্বার্থে ধুয়ে নেওয়া বা মুছে নেওয়া উত্তম

অজু ও গোসলঃ এটি নির্গত হলে গোসল ফরজ হয় নাতবে এর কারণে অজু ভাঙবে কি না, তা নিয়ে ফকিহদের মাঝে সূক্ষ্ম মতভেদ রয়েছেজমহুর ও সতর্কতামূলক মত হলো, এটি বের হলে নতুন করে অজু করে নেওয়া উচিত

বিশেষ সতর্কতাঃ যদি সাদা স্রাবের সাথে রক্ত মিশ্রিত থাকে, কিংবা তা যদি কোনো রোগের কারণে দুর্গন্ধযুক্ত বা অস্বাভাবিক রঙের হয়, অথবা যদি তা যৌন উত্তেজনার কারণে বের হয় (যা মূলত মাজি), তবে তা অবশ্যই নাপাক বলে গণ্য হবে এবং তাতে অজু ভেঙে যাবে

এখন কোন সাদা তরল কি তা কিভাবে কেউ বুঝবে?

মাজি বা মজি (مَذِي) শব্দের অর্থ কেবল “সাদা তরল” নয়ফিকহী পরিভাষায় তরলের রং, ঘনত্ব এবং নির্গমনের কারণ অনুযায়ী এদের আলাদা আলাদা নাম রয়েছেবিষয়টির সুস্পষ্ট পার্থক্য নিচে পেশ করছিঃ

মাজি (مَذِي): এটি সাধারণত স্বচ্ছ (রংহীন), পাতলা এবং আঠালো একটি তরলএটি কামভাব বা যৌন উত্তেজনা শুরু হলে (চরম সীমায় পৌঁছানোর আগে) নির্গত হয়নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এটি হতে পারেএটি নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ এবং এটি বের হলে অজু ভেঙে যায়, তবে গোসল ফরজ হয় না

মানি বা বীর্য (مَنِي): পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত ঘন এবং সাদা বর্ণের তরল (নারীদের ক্ষেত্রেও ঘন সাদা বা কিছুটা হলদেটে বা ভিন্ন রঙেরও হতে পারে), যা চরম উত্তেজনার সাথে সজোরে নির্গত হয়এটি নির্গত হলে গোসল ফরজ হয়

ওয়াদই (وَدْي): এটি একটি সাদা, ঘন এবং ঘোলাটে তরল, যা সাধারণত প্রস্রাবের পর বা অনেক সময় ভারি কোনো কাজ করার কারণে নির্গত হয়এতে কামভাবের কোনো সম্পর্ক থাকে নাএটিও নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ এবং এটি বের হলে অজু ভেঙে যায়, তবে গোসল ফরজ হয় না

অতএব ফিকহের ভাষায় নির্দিষ্ট করে “সাদা তরল” বলতে সাধারণত মানি অথবা ওয়াদই-কে বোঝায়আর “মাজি” হলো উত্তেজনার শুরুতে নির্গত হওয়া স্বচ্ছ ও আঠালো তরল

Sunday, March 29, 2026

পবিত্র উমরাহ পালনের নিয়ম কানুন ও ফজিলত

পবিত্র উমরাহ পালনের নিয়ম কানুন ও ফজিলত

উমরাহ শব্দের অর্থ হচ্ছে, সম্মানিত পাক-পবিত্র স্থানের জিয়ারত করাইছলামী শরীয়াহ-এর পরিভাষায় মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বছরের যে কোনো সময় মাছযিদুল হারাম শরীফ গমন করে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকাণ্ড সম্পাদন করাকে উমরাহ বলা হয়সম্মানিত দ্বীন ইছলামে উমরাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঈবাদাত

একজন মুছলিম হিসেবে কেনো আপনাকে উমরাহ করতে হবে?

উমরাহ’এর ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (وَ اَتِمُّوا الۡحَجَّ وَ الۡعُمۡرَۃَ لِلّٰهِ) অর্থাৎ, তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই হাজ্জ ও উমরাহ পালন করো। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৯৬) অর্থাৎ হাজ্জ ও উমরাহ-এর ইহরাম বেঁধে নেওয়ার পর তা পূর্ণ করা ওয়াযিব, যদিও তা (হাজ্জ ও উমরাহ) নফল হয়ে থাকে

মহান আল্লাহ পাক উৎসাহ দিলেও উমরাহ-এর সবচেয়ে বড় বেনিফিট হচ্ছেন গুনাহের কাফফারাদেখুন হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ(كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ) মানুষ মাত্রই গুনাহগারযেমন আনাছ রদ্বিআল্লাহু য়ানহু থেকে বর্ণিত, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, মানুষ মাত্রই গুনাহগার (অপরাধী)আর গুনাহগারদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছেন তাওবাকারীগণ। (তিরমিজি শরীফ ২৪৯৯) রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি আরো বলেছেনঃ (وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ) যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, আমি উনার ক্বছম করে বলছি, তোমরা যদি পাপ না করতে তবে অবশ্যই মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের নিশ্চিহ্ন করে এমন সম্প্রদায় বানাতেন, যারা পাপ করে ক্ষমা চাইতেন এবং তিনি তাদের মাফ করে দিতেন। (মুছলিম শরীফ ৬৮৫৮) এর মানে এই নয় যে মানুষকে গুনাহের ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে, ইচ্ছাকৃত গুনাহে লিপ্ত হওয়ার প্রেরণা যোগানো হচ্ছে, বরং আমরা এমন এক জাতী যারা গুনাহ করতেছি, গুনাহগার জাতী, তাই গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দিকে আমরা যেন ফিরে আসি, তাওবাহ করি এবং পরিশুদ্ধ হই এটাই বোঝানো হয়েছেআর সামর্থ্যবানদের গুনাহ মাফের সবচেয়ে গ্যারান্টিযুক্ত পন্থা হলো মহান আল্লাহ পাক উনার ঘরের জিয়ারতে চলে যাওয়া কেননা আবু হুরারাহ রদ্বিআল্লাহু য়ানহু থেকে বর্ণিত, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম বলেছেনঃ (الْعُمْرَةُ إِلَى الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُمَا) ‘‘উমরাহঃ এক উমরাহ থেকে অন্য উমরাহর মধ্যবর্তী সময়ে যত গুনাহের কাজ করা হয়, তার কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) করেন। (বুখারি শরীফ ১৬৫৮, ১৭৭৩, মুছলিম শরীফ ১২৪৯, ৩১৫৯, ৩১৮০, ১৩৪৯, তিরমিযি শরীফ ৯৩৩, নাছা শরীফ ২৬২২, ২৬২৩, ২৬২৯, ইবনে মাজাহ শরীফ ২৮৮৭, ২৮৮৮, মুছনাদে আহমাদ শরীফ ৭২০৭, ৯৬২৫, ৯৬৩২, মুআত্তা মালিক ৭৭৬, দারেমী ১৭৯৫)

উমরাহ যারা করতে চান তাদের জন্যে সবচেয়ে উত্তম সময় হচ্ছেন পবিত্র রমজান শরীফের মাসনবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম থেকে ছ্বহীহ হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, রমজান শরীফ মাসের উমরাহ ছ্বওয়াবের দিক দিয়ে হাজ্জের সমান। (মিশকাত শরীফ ২৫০৯) তিনি আরো বলেনঃ (فَإِنَّ عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ تَقْضِي حَجَّةً مَعِي) রমজান শরীফ মাসে উমরাহ পালন করা আমার সাথে হাজ্জ করার সমান। (বুখারী শরীফ ১৮৬৩; মুছলিম শরীফ ২৫৬ ও ৩০৩৯)

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম চারটি উমরাহ করেছেন বলে হাদিছ শরীফে পাওয়া যায় (اعْتَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرْبَعٌ عُمَرٍ كُلُّهُنَّ فِي ذِي الْقَعْدَةِ إِلَّا الَّتِي كَانَتْ مَعَ حَجَّتِهِ: عُمْرَةً مِنَ الْحُدَيْبِيَةِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ وَعُمْرَةً مِنَ الْعَامِ الْمُقْبِلِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ وَعُمْرَةً مِنَ الْجِعْرَانَةِ حَيْثُ قَسَّمَ غَنَائِمَ حُنَيْنٍ فِي ذِي الْقَعْدَةِ وَعُمْرَةً مَعَ حَجَّتِهِ) তবে এর প্রত্যেকটিই তিনি জিলক্বদ শরীফ মাসে করেছেনপ্রথমটি হুদায়বিয়ার উমরাহ, যা ষষ্ঠ হিজরীতে করেছেনমুশরিকদের প্রতিরোধের কারণে বাইতুল্লাহ শরীফের হাজরি দিতে পারেন নি, হুদায়বিয়ার ময়দানেই ইহরাম ত্যাগ করেছিলেনদ্বিতীয় উমরাহ পরবর্তী বছর করেছেনতৃতীয় উমরাহ হুনাইন থেকে ফেরার পথে জিরানা থেকে ইহরাম বেঁধে করেছিলেনচতুর্থটি বিদায় হাজ্জের সাথে করেছেন (মিশকাত শরীফ ২৫১৮)

রমজান শরীফ মাসে উমরাহ করার এত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম এই পবিত্র মাসে উমরাহ থেকে বিরত থাকার মতো কষ্ট কেবল আমাদের জন্যেই সহ্য করেছিলেন, কেননা রমজান শরীফ মাসে যদি তিনি উমরাহ করতে যেতেন, তাহলে সমস্ত উম্মত এই মাসেই ছুন্নত পালনের নিমিত্তে উমরাহ আদায়ের জন্য রমজান শরীফেই তৎপর হয়ে উঠতেনফলে একই সাথে উমরাহ করা ও রোজা রাখা উম্মতের জন্য কষ্টকর হয়ে যেতউম্মাতের উপর কষ্টকর হয়ে যাবে এই আশঙ্কায় তিনি অত্যন্ত পছন্দনীয় একটি য়ামল ছেড়ে দিলেনতাছাড়া রমজান শরীফ মাসে উমরাহ'এর চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ঈবাদাতে তিনি মশগুল থাকতেনএছাড়াও বছরে তিনি একটির বেশী উমরাহ করেছেন বলে কোন হাদিছ শরীফ এখনো আমার চোখে পড়েনাই

শুধু উমরাহ-ই নয়, যেকোন ঈবাদাত বা য়ামলের পূর্বে তার ব্যাপারে পূর্ণ অবগত হওয়া বাধ্যতামূলকঈবাদাতের ক্ষেত্রে, যে ঈবাদাত করা হবে সেটা কোন ক্যাটাগরির এবং এর মধ্যে ফরজ, ওয়াযিব, ছুন্নাহ কি কি বিদ্যমান রয়েছে তা জানা আবশ্যকনতুবা য়ামল করার পর দেখা যাবে কোন একটা মিসিং বা ছুটে গেছে, তখন আর আফসোসের সীমা রইবেনা

পবিত্র উমরাহ-এর নিয়তে ইহরাম বাধার পর থেকে উমরাহ সম্পাদন পর্যন্ত যা যা নিষিদ্ধঃ মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (ٱلْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَـٰتٌۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِى ٱلْحَجِّۗ وَمَا تَفْعَلُواْ مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ ٱللَّهُۗ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيْرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقْوَىٰۚ وَٱتَّقُونِ يَـٰٓأُوْلِى ٱلْأَلْبَـٰب) অর্থাৎ: পবিত্র হাজ্জের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি মাস আছে(১) এসব মাসে যে লোক পবিত্র হাজ্জের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার জন্য স্ত্রী সহবাস জায়েজ নয়। (২) জায়েজ নয় কোনো ফাছিকি কাজ করা (৩) এবং ঝগড়া-বিবাদ করাও পবিত্র হাজ্জের সেই সময় জায়েজ নয়। (৪) আর তোমরা যা কিছু সৎকাজ কর, মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি তো তা জানেন। (৫) আর তোমরা পাথেয় সঙ্গে নিয়ে নাও। (৬) নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছেন মহান আল্লাহ পাক উনার ভয় (তাক্বওয়া)আর আমার ভয় (তাক্বওয়া অবলম্বন) করতে থাকো, হে জ্ঞানী লোকেরা! তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোন পাপ নেই। (৭)

আয়াত শরীফের ব্যাখা নিচে বর্ণনা করা হলোঃ

(১) যারা পবিত্র হাজ্জ অথবা উমরাহ করার নিয়্যতে ইহরাম বাঁধেন, তাদের উপর এর সকল অনুষ্ঠানক্রিয়াদি সম্পন্ন করা ওয়াজিব হয়ে পড়েএ দুটির মধ্যে উমরাহর জন্য কোন সময় নির্ধারিত নেইবছরের যে কোন সময় তা আদায় করা যায়কিন্তু পবিত্র হাজ্জের মাস এবং এর অনুষ্ঠানাদি আদায়ের জন্য সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারিত রয়েছেকাজেই এ আয়াত শরীফের শুরুতেই বলে দেয়া হয়েছে যে, পবিত্র হাজ্জের ব্যাপারটি উমরাহর মত নয়এর জন্য কয়েকটি মাস রয়েছে, সেগুলো প্রসিদ্ধ ও সুবিদিতআর তা হচ্ছে শাউওয়াল শরীফ, যিল্‌ক্বদ শরীফ ও জিলহাজ্জ শরীফপবিত্র হাজ্জের মাস শাওয়াল শরীফ হতে আরম্ভ হওয়ার অর্থ হচ্ছে, এর পূর্বে পবিত্র হাজ্জের ইহ্‌রাম বাঁধা জায়েয নয়

২) (رَفَث), ‘রফাছএকটি ব্যাপক শব্দ, যাতে স্ত্রী সহবাস ও তার আনুষাঙ্গিক কর্ম, স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা, এমনকি খোলাখুলিভাবে সহবাস সংক্রান্ত আলাপ আলোচনাও এর অন্তর্ভুক্তইহরাম অবস্থায় এ সবই হারামহাদীছ শরীফে এসেছে, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ) যে কেউ এমনভাবে পবিত্র হাজ্জ সম্পাদন করবে যে, তাতে রফাছ’, ‘ফুছুকজিদালতথা অশ্লীলতা, পাপ ও ঝগড়া ছিল না, সে তার হাজ্জ থেকে সে দিনের ন্যায় ফিরে আসল যেদিন তাকে তার মা জন্ম দিয়েছিলেন। (বুখারী শরীফঃ ১৫২১, মুছলিম শরীফ ১৩৫০)

৩) (فُسُوق) ফুছুকএর শাব্দিক অর্থ বের হওয়াআল ক্বুরআনের  পরিভাষায় নির্দেশ লংঘন বা নাফরমানী করাকে ফুছুকবলা হয়সাধারণ অর্থে যাবতীয় পাপকেই ফুছুক বলেতাই অনেকে এস্থলে সাধারণ অর্থই নিয়েছেনকিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ফুছুকশব্দের অর্থ করেছেন, “সে সকল কাজ-কর্ম যা ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধস্থান অনুসারে এ ব্যাখ্যাই যুক্তিযুক্তকারণ সাধারণ পাপ ইহরামের অবস্থাতেই শুধু নয়; বরং সবসময়ই নিষিদ্ধযে সমস্ত বিষয় প্রকৃতপক্ষে নাজায়েয ও নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু ইহরামের জন্য নিষেধ ও নাজায়েয, তা হচ্ছে ছয়টিঃ

(ক) স্ত্রী সহবাস ও এর আনুষাঙ্গিক যাবতীয় আচরণ; এমনকি খোলাখুলিভাবে সহবাস সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা

(খ) স্থলভাগের জীব-জন্তু শিকার করা বা শিকারীকে বলে দেয়া

(গ) নখ বা চুল কাটা

(ঘ) সুগন্ধি দ্রব্যের ব্যবহারএ চারটি বিষয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই এহ্‌রাম অবস্থায় হারাম বা নিষিদ্ধঅবশিষ্ট দুটি বিষয় পুরুষের সাথে সম্পৃক্ত

(ঙ) সেলাই করা কাপড় পোষাকের মত করে পরিধান করা

(চ) মাথা ও মুখমণ্ডল আবৃত করা

আলোচ্য ছয়টি বিষয়ের মধ্যে স্ত্রী সহবাস যদিও ফুছুকশব্দের অন্তর্ভুক্ত, তথাপি একে রফাছশব্দের দ্বারা স্বতন্ত্রভাবে এজন্যে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, ইহরাম অবস্থায় এ কাজ থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণকেননা, এর কোন ক্ষতিপূরণ বা বদলা দেয়ার ব্যবস্থা নেইকোন কোন অবস্থায় এটা এত মারাত্মক যে, এতে পবিত্র হাজ্জই বাতিল হয়ে যায়অবশ্য অন্যান্য কাজগুলোর কাফ্‌ফারা বা ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছেআরাফাতে অবস্থান শেষ হওয়ার পূর্বে স্ত্রী সহবাস করলে পবিত্র হাজ্জ ফাছেদ হয়ে যাবেগাভী বা উট দ্বারা এর কাফ্‌ফারা দিয়েও পরের বছর পুনরায় হাজ্জ করতেই হবেএজন্যেই (فَلَا رَفَثَ) শব্দ ব্যবহার করে একে স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করা হয়েছে

৪) (جِدَال) শব্দের অর্থ একে অপরকে পরাস্ত করার চেষ্টা করাএ জন্যেই বড় রকমের বিবাদকে (جِدَال) বলা হয়এ শব্দটিও অতি ব্যাপককেউ কেউ এস্থলে ফুছুকজিদালশব্দদ্বয়কে সাধারণ অর্থে ব্যবহার করে এ অর্থ নিয়েছেন যে, ‘ফুছুকজিদালসর্বক্ষেত্রেই পাপ ও নিষিদ্ধ, কিন্তু ইহরামের অবস্থায় এর পাপ গুরুতরপবিত্র দিনসমূহে এবং পবিত্র স্থানে, যেখানে শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ঈবাদাতের জন্য আগমন করা হয়েছে এবং লাব্বাইকাল্লাহুম্মা লাব্বাইকবলা হচ্ছে, ইহরামের পোষাক তাদেরকে সবসময় এ কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, তোমরা এখন ইবাদাতে ব্যস্ত, এমতাবস্থায় ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি অত্যন্ত অন্যায় ও চরমতম নাফরমানীর কাজ। (মারিফুল কুরআন)

৫) ইহরামকালে নিষিদ্ধ বিষয়াদি বর্ণনা করার পর উল্লেখিত বাক্যে হিদায়াত করা হচ্ছে যে, পবিত্র হাজ্জের পবিত্র সময় ও স্থানগুলোতে শুধু নিষিদ্ধ কাজ থেকেই বিরত থাকা যথেষ্ট নয়, বরং সুবর্ণ সুযোগ মনে করে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকর ও ঈবাদাত এবং সৎকাজে সদা আত্মনিয়োগ করতুমি যে কাজই কর না কেন, মহান আল্লাহ তায়ালা তা জানেনআর এতে তোমাদেরকে অতি উত্তম প্রতিদানও দেয়া হবে

৬) এ আয়াতে ঐ সমস্ত ব্যক্তির সংশোধনী পেশ করা হয়েছে যারা পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ করার জন্য নিঃস্ব অবস্থায় বেরিয়ে পড়েঅথচ দাবী করে যে, আমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উপর ভরসা করছিপক্ষান্তরে পথে ভিক্ষাবৃত্তিতে লিপ্ত হয়নিজেও কষ্ট করে এবং অন্যকেও পেরেশান করেতাদেরই উদ্দেশ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, পবিত্র হাজ্জের উদ্দেশ্যে সফর করার আগে প্রয়োজনীয় পাথেয় সাথে নেয়া বাঞ্ছনীয়, এটা তাওয়াক্কুলের অন্তরায় নয়বরং মহান আল্লাহ পাক উনার উপর ভরসা করার প্রকৃত অর্থই হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক প্রদত্ত আসবাব পত্র নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সংগ্রহ ও জমা করে নিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর ভরসা করারছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম থেকে তাওয়াক্কুলের এই ব্যাখ্যাই বর্ণিত হয়েছে

৭) অর্থাৎ আমার শাস্তি, আমার পাকড়াও, আমার লাঞ্ছনা থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখকেননা, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে চলে না, আমার নিষেধ থেকে দূরে থাকে না তাদের উপর আমার আযাব অবধারিত। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৯৭)

স্মরণীয় যে, হাজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধার পরে, হাজ্জ সম্পাদন পর্যন্ত যেসকল কাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে তার প্রত্যেকটা নিষেধ উমরাহ-এর ইহরাম বাঁধার পর থেকে উমরাহ সম্পাদন পর্যন্ত উমরাহর বেলায় ও প্রযোজ্যপার্থক্য শুধু এতোটুকু যে হাজ্জের ইহরাম কেবল নিদৃষ্ট ৩ মাসেই বাধা যায়, যা লম্বা সময় থাকে, আর উমরাহর ইহরাম ১২ মাসই বাধা যায় যা মিকাত থেকে সম্পাদন পর্যন্ত সর্বচ্চো ৪/৫ ঘন্টা থাকে

আমরা এখন অবগত যে হাজ্জের মতো উমরাহ-এর ইহরাম বাঁধাও প্রত্যেক হাজীর জন্যে ফরজ, আর এর মধ্যকার হুকুম আহকাম জারি/একটিভেট হয় ইহরাম এর নিয়ত করার সাথে সাথেইতবে ইহরামের পূর্বে কিছু বিষয় আছে যেগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, নতুবা হাজ্জ/উমরাহ ছ্বহিহভাবে করলেও তা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে

প্রাক হাজ্জ/উমরাহ প্রস্তুতি

আন্তরিকতার সাথে হাজ্জ/উমরাহ করার নিয়ত করুন

আপনার অতীতের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হন এবং ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে বিরত থাকার নিয়ত করুন

হাজ্জ/উমরাহ উদ্দেশ্যে আপনার হালাল উপার্জন আছে তা নিশ্চিত করুন

অতীতের সকল কাযা নামায, রোজা ও যাকাত আদায় করার সংকল্প করুন

মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজনদের কাছে ক্ষমা চান যারা আপনার দ্বারা জীবনে চলার পথে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন

সম্পদ থাকলে উত্তরসূরিদের জন্যে লিখিতভাবে একটি উইল/অছিয়ত তৈরি করুন, দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষী দ্বারা স্বাক্ষরিত করে আপনার আইনজীবী বা নিকটাত্মীয় কার হাতে তুলে দেন

এমন এক ছ্বফরের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করুণ যেখানে অনুভূতি হবে এমন যে আপনি সমস্থ পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন হয়ে কেবল এক মহান আল্লাহ পাক উনার দিকেই ধাবিত হচ্ছেন

হাজ্জ/উমরাহ করার সম্পর্কে জানুন এবং কিভাবে তা পালন করতে হয় তা মুখস্থ করুণ

হাজ্জ/উমরাহ-এর প্রতি হুব্ব/মুহব্বত পোষণ করাও মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট আত্মসমর্পণ ও উত্তম য়ামল বলে বিবেচিত তাই হুব্বে হাজ্জ/উমরাহ পোষণ করুণ

শারীরিকভাবে ফিট হোনস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস ও তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস করুন, এবং তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠাও

হাজ্জ/উমরাহ এর জন্য প্রয়োজনীয় দ্বোআ ও যিকর আগে থেকেই শেখা শুরু করুন

আপনার পরিবারের যারা আপনার উপর নির্ভরশীল তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করে যাবেন

কোনো ঋণ থাকলে তা পরিশোধ বা এর ব্যবস্থা করে যাবেন

আপনার পাসপোর্ট চেক করুনপাসপোর্টের মেয়াদ থাকতে হবে ৬ মাস থেকে

প্রস্থানের তারিখ

আপনার সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি ফটোকপি করুন

রেগুলার কোন ঔষধ খেলে প্রেসক্রিপশন সহ পর্যাপ্ত ঔষধ সাথে করে নিন

পর্যাপ্ত পরিমাণ পথখরচ নিয়ে বের হোননগদ বা কার্ড ভালো করে পরিক্ষা করে সুরক্ষিত স্থানেই সব সময় সাথে রাখুন

বাড়ি ছাড়ার আগে লজ্জাস্থান, বগল থেকে অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করুণচুল দাড়ি ছাটাই করে পরিপাটী হোননখ কাটুন

গোসল করুন এবং শরীরে সুগন্ধি লাগান

ইহরামের পোশাক পরে নিন, যদি পরে পরতে অসুবিধা হয়

ছ্বফরের জন্যে দুই রকত নফল নামায পড়ুন। (নিশ্চিন্তে যাত্রা ও হাজ্জ/উমরাহ-এর গ্রহণযোগ্যতার জন্য এই দোয়া পাঠ করতে পারেন (بِسۡمِ اللّٰهِ تَوَكَّلۡتُ عَلَی اللَّهِ لَاحَوۡلَ وَلَاقُوَّةَإِلَّابِاللَّهِ) বিছমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু য়া’লাল্লাহি, লা হাওলা ওয়া লা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ

নিজেকে মানসিকভাবে স্থির রাখতে একিই সময় একাধিক কাজ করা থেকে বিরত থাকুন

আপনার মধ্যে থাকা অহংকার ও হিংসা-বিদ্বেষ কে একেবারে পরিত্যাগ করতে মানুষকে স্মরণ করে করে মাফ করে দিনআমিত্ব পরিত্যাগ করুণ, নিজে ক্ষমাশীল হয়ে মহান রবের ক্ষমার প্রত্যাশা করুণ

মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে সময় কাটানোর মতো আহমকি কাজ পরিত্যাগ করে, জিকির, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত, নফল নামায, দু’য়া, মুরকবার জন্য প্রতিদিনের রুটিন তৈরি করুণ পবিত্র ভূমীতে কখন কি করবেন

হালকা থাকুনপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে রাখুন

প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য একটি হালকা ব্যাকপ্যাক যেমন নগদ টাকা, মোবাইলের এপ্স ব্যবহারকারী না হলে একটি ছোট ক্বুরআন শরীফ, একটি ছোট দ্বোআর বই, হালকা ওজনের জায়নামায, টিস্যু, একটি ছোট উমরাহ/হাজ্জ গাইড, হালকা শুকনো খাবার ইত্যাদি সাথে রাখুন

সময় ও টাকা থাকলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ও সম্মানিত দ্বীন ইছলামের স্মৃতিময় স্থানগুলিও যিয়ারত করার প্লান করুণ

উল্লেখযোগ্য স্মৃতিময় স্থানগুলীঃ জান্নাতুল বাকী, জান্নাতুল মুয়াল্লা, গ্বারে হেরা, হিজরতের গ্বা, বদর শরীফ, উঁহুদ শরীফ-এর প্রান্তর, যে ঘরে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদত শরীফ হয়েছিলো সেই ঘর মুবারক সহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থানসমূহ

উমরাহ-এর সহজ ত্বরীক্বাহ

শুধু উমরাহ-ই নয়, যেকোন ঈবাদাত বা য়ামলের পূর্বে তার ব্যাপারে পূর্ণ অবগত হওয়া বাধ্যতামূলকঈবাদাতের ক্ষেত্রে, যে ঈবাদাত করা হবে সেটা কোন ক্যাটাগরির এবং এর মধ্যে ফরজ, ওয়াজিব, ছুন্নাহ কি কি বিদ্যমান রয়েছে তা জানা আবশ্যকনতুবা য়ামল করার পর দেখা যাবে কোন একটা মিসিং বা ছুটে গেছে, তখন আর আফসোসের সীমা রইবেনাতাই পবিত্র উমরাহ করতে যে জিনিষগুলি বাধ্যতামূলক জানতে হবে, এবার আমরা সেই পবিত্র উমরাহ-এর রুকনগুলো জানবো

পবিত্র উমরাহ-এর ফরজ, ওয়াজিব, ছুন্নত ও মুস্তাহাব কি কি?

পবিত্র উমরাহ-এর ফরজ রুকনঃ

১) নিয়ত সহ তালবিয়া দ্বারা ইহরামে প্রবেশ করা

২) ক্বাবা শরীফের তাওয়াফ করা

৩) তাওয়াফের অন্তত ৪ চক্কর আদায় করা (কিছু হানাফি মতে ফরজ)

পবিত্র উমরাহ এর ওয়াজিব ও আবশ্যক আমলসমূহঃ

১) মীকাত থেকে ইহরামে প্রবেশ করা

২) ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকা

৩) তাওয়াফের ৭ চক্কর পূর্ণ করা

৪) তাওয়াফের সময় অজু সহ পবিত্র থাকা

৫) তাওয়াফের সময় ছতর ঢাকা

৬) সামর্থ্য থাকলে পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করা

৭) তাওয়াফের সময় ক্বাবা শরীফকে বাম পাশে রাখা

৮) হাতীমের বাইরে দিয়ে তাওয়াফ করা

৯) প্রত্যেক চক্কর হাযারে আছওয়াদ থেকে শুরু করে সেখানেই শেষ করা

১০) তাওয়াফের পর দুরকত নামায আদায় করা

১১) ছ্বফা মারওয়া উনাদের ছায়ই করা

১২) ছায়ই-কে তাওয়াফের পরে আদায় করা

১৩) ছায়ই-কে ইহরামের পরে আদায় করা

১৪) ছায়ই-এর ৭ চক্কর পূর্ণ করা

১৫) ছায়ই-কে ছ্বফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় শেষ করা

১৬) সামর্থ্য থাকলে পায়ে হেঁটে ছায়ই করা

১৭) কছর/হলক্ব করা

পবিত্র উমরাহ-এর ছুন্নত ও মুস্তাহাবসমূহঃ

১) ইহরামের আগে গোছল করা; না পারলে অজু করা

২) নখ কাটা

৩) বগল ও নাভির নিচের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা

৪) চুল/দাঁড়ি আঁচড়ানো বা পরিপাটি করা

৫) পুরুষদের জন্য গোঁফ ছাঁটা

৬) পুরুষদের জন্য শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করা

৭) পুরুষদের জন্য পরিষ্কার/ধোয়া সাদা সেলাইবিহীন কাপড় পরা

৮) ইহরামের আগে দুই রকত নামায আদায় করা

৯) তালবিয়া অন্তত একবার বলার পর বেশি বেশি তালবিয়া পড়া

১০) অবস্থা পরিবর্তনের সময় সময় তালবিয়া পড়া

১১) তালবিয়া তিনবার পড়ার পর ছালাওয়াত(দুরুদ শরীফ) পাঠ করা

১২) মক্কা শরীফে প্রবেশের আগে গোছল করা

১৩) মাছযিদুল হারাম শরীফ উনাতে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা

১৪) সম্ভব হলে বাবুছ ছালাম দিয়ে প্রবেশ করা

১৫) ক্বায়বা শরীফ প্রথম দেখার সময় তাকবীর, তাহলীল ও দোয়া করা

১৬) পুরুষদের জন্য উমরাহ-এর তাওয়াফের সব চক্করে (اِضْطِبَاع) ইদ্বত্বিবায় করা। (ইদ্বত্বিবায় হলো তাওয়াফের সময় পুরুষ মুহরিমের জন্য চাদর পরার একটি বিশেষ পদ্ধতিএর তরীকা হলোঃ উপরের চাদরটি ডান বগলের নিচ দিয়ে বের করে বাম কাঁধের উপর ফেলে দেওয়া, যাতে ডান কাঁধ খোলা থাকে এবং বাম কাঁধ ঢাকা থাকেঅর্থাৎ সহজ ভাষায়ঃ এক কাঁধ খোলা, এক কাঁধ ঢাকা এই অবস্থা-ই ইদ্বত্বিবা।)

১৭) পুরুষদের জন্য প্রথম ৩ চক্করে রমল করা। (রমল করা হলো, তাওয়াফের প্রথম ৩ চক্করে পুরুষদের একটু দ্রুত, ছোট ছোট পদক্ষেপে, কাঁধ হালকা দুলিয়ে, শক্তি-সামর্থ্য প্রকাশ করে হাটাএটা দৌড়ানো নয়আবার একেবারে স্বাভাবিক ধীর হাঁটাও নয়বরং মাঝামাঝি এক ধরনের চটপটে, দৃঢ় ভঙ্গির চলা।)

১৮) হাযারে আছওয়াদ শরীফে চুম্বন করা

১৯) চুম্বন সম্ভব না হলে স্পর্শ করা

২০) স্পর্শ সম্ভব না হলে ইশারা করা

২১) প্রত্যেক চক্করের শেষে হাযারে আছওয়াদের ইস্তিলাম করা। (হাযারে আছওয়াদ শরিফ-এর ইস্তিলাম বলতে সংক্ষেপে হাযারে আছওয়াদ শরীফকে সম্মান জানানোর ছুন্নত য়ামল বোঝায়এর আদায় কয়েকভাবে হয়ঃ সুযোগ হলে সরাসরি স্পর্শ ও চুম্বন করা, এটা সম্ভব না হলে হাত দিয়ে স্পর্শ করে সেই হাত চুম্বন করা, আর এটাও সম্ভব না হলে দূর থেকে উনার দিকে মুখ করে ইশারা করা এবং তাকবীর বলে তাওয়াফের চক্কর শুরু করাঅর্থাৎ, সহজ ভাষায়ঃ ইস্তিলাম = চুম্বন, বা স্পর্শ, বা দূর থেকে ইশারার মাধ্যমে হলেও হাযারে আছওয়াদ শরীফের হক আদায় করা।)

২২) তাওয়াফে বেশি বেশি জিকির, দোয়া ও ছালাওয়াত (দুরুদ শরীফ) পাঠ করা

২৩) ইয়েমেনী কোণ স্পর্শ করা

২৪) ইয়েমেনী কোণ স্পর্শ করা সম্ভব না হলে উনার দিকে ইশারা না করা

২৫) তাওয়াফের পর দু-রকাত নামায বিলম্ব না করে আদায় করা

২৬) যমযমের পানি পান করা

২৭) ছ্বফা ও মারওয়া শরীফে ক্বিবলামুখী হয়ে তাকবীর, তাহলীল ও দোয়া করা

২৮) পুরুষদের জন্য দুই সবুজ নিশানের মাঝে দ্রুত চলা

২৯) ছায়ইর মধ্যে বেশি বেশি জিকির ও দোয়া করা

৩০) পুরুষদের জন্য কছরের চেয়ে হলক্ব করা উত্তম

মীকাত

প্রত্যেক ঈবাদাত এর পূর্বে নিয়ত করা ফরজ, উমরাহ-ও যেহেতু ঈবাদাত সেহেতু এর জন্যেও নিয়ত করা বাধ্যতামূলকউমরাহ-এর নিয়ত করতে হয় মীকাত-এর সীমানা অতিক্রমের আগে আর মীকাত হলো নির্ধারিত সীমারেখাহাজ্জ ও উমরাহ-এর দুই ধরনের মীকাত রয়েছেঃ

১) মীকাতে জামানি (সময়ের মীকাত)

২) মীকাতে মাকানি (স্থানের মীকাত)

সময়কেন্দ্রিক মীকাত হলো তিনটিঃ

১) শাওয়াল শরীফ

২) জিলক্বদ শরীফ ও

৩) জিলহাজ্জ মাসের ১০ জিলহাজ্জ পর্যন্ততবে তা কেবল হাজ্জের জন্যেআর উমরাহ-এর মীকাতের সময় সারা বছর

স্থানগত মীকাত পাঁচটিঃ হাজ্জ ও উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা গমনকারীদের পবিত্র কাবা শরীফ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূরত্ব থেকে উমরাহ-এর নিয়তে ইহরাম বাঁধতে হয়, ওই জায়গাগুলোকে আরবি পরিভাষায় মিকাত (স্থানগত সীমানা) বলা হয়

মীকাতের জন্য পাঁচটি নির্ধারিত স্থান রয়েছেরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজে এসব স্থান নির্ধারণ করেছেনআবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াচ্ছ মীকাত হিসেবে যে ৫ টি স্থানকে নির্ধারিত করেছেন তা হচ্ছেঃ

১) মদিনা বাসীর জন্য জুল-হুলাইফা” (বর্তমান নামঃ আবইয়ারে আলী)প্রথম মীকাত জুলহুলাইফাএ স্থানটি এখন আবইয়ারে আলীনামে পরিচিতএটি মসজিদে নববী থেকে ১০ কিমি দূরে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এবং মক্কা শহর থেকে ৪২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিতমদিনাবাসী এবং এ পথ দিয়ে যারা আসেতারা এখান থেকে ইহরাম বাঁধবেমক্কা শহর থেকে এটাই সবচেয়ে দূরতম মিকাত

২) ছিরিয়া-বাসীর জন্য জুহফা” (বর্তমান নামঃ রাবেগ)দ্বিতীয় মিকাত আল জুহফাএ জায়গাটি লোহিত সাগর থেকে ১০ কিলোমিটার ভেতরে রাবেগশহরের কাছেজুহফাতে বর্তমানে চলাচল বন্ধ হয়ে গেছেতাই রাবেগনামক স্থান থেকে এখন লোকেরা ইহরাম পরেজম্মুম উপত্যকার পথ ধরে মক্কা শহর থেকে এ স্থানটি ১৮৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিতএখান থেকে যেসব দেশের মানুষ ইহরাম বাধতো তা হলোঃ ছিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন, মিশর, সুদান, মরক্কো, আফ্রিকার দেশগুলো এবং সৌদি আরবের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু এলাকাবাসী, যারা মদিনার পথ ধরে আসে না, তারাও এখান থেকে ইহরাম বাঁধবে

৩) নজদ-বাসীর জন্য কারনুল মানাজিল” (বর্তমান নামঃ আছ ছাইলুল কাবির)তৃতীয় মীকাত কারনুল মানাজিলবর্তমানে এটি আছ ছাইলুল কাবিরনামে প্রসিদ্ধমক্কা শরীফ থেকে এর দূরত্ব ৭৮ বা ৮৫ কিলোমিটারএখান থেকে যেসব দেশের লোকেরা ইহরাম বাঁধবেঃ

ক) রিয়াদ, দাম্মাম ও তায়েফ

খ) কাতার

গ) কুয়েত

ঘ) আমিরাত

ঙ) বাহরাইন

চ) ওমান

ছ) ইরাক

জ) ইরানসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো

কারনুল মানাজিলের অন্তর্ভুক্ত ওয়াদি মুহরিমনামে দ্বিতীয় আরেকটি স্থান থেকে লোকেরা ইহরাম বাঁধেএটা তায়েফ-মক্কা রোডে হাদাএলাকা হয়ে মক্কা গমনের পথে মক্কা থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিতএখানে সর্বাধুনিক ও বৃহদাকার মসজিদ, অজু-গোসল ও গাড়ি পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত সুবিধা আছেএটা নতুন মীকাত নয়; বরং কারনুল মানাজিল’-এর অংশবিশেষ

৪) ইয়েমেন-বাসীর জন্য ইয়ালামলাম” (বর্তমান নামঃ ছাদিয়া)এটি একটি উপত্যকার নামএ জায়গা মক্কা শরিফ থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিতএলাকাটি বর্তমানে সাদিয়ানামেও পরিচিতএখান থেকে যেসব দেশের লোকেরা ইহরাম বাঁধবেঃ

ক) ইয়েমেন

খ) বাংলাদেশ

গ) ভারতবর্ষ

ঘ) চীন

ঙ) ইন্দোনেশিয়া

চ) মালয়েশিয়া

ছ) দক্ষিণ এশিয়াসহ পূর্ব দিকের দেশগুলো

৫) ইরাকবাসীর জন্য জাতু ইরকএটা মক্কা শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিতএটি এখন আর ব্যবহৃত হচ্ছে নাএটা ছিল ইরাকবাসীদের মীকাততারা এখন তৃতীয় মিকাত আছ ছাইলুল কাবিরব্যবহার করে

সূত্রঃ (বুখারি শরীফ ১৫২৪, ১৫২৬, মুছলিম শরীফ ১১৮১, আবু দাউদ শরীফ ১৭৩৯)

নোটঃ হাজ্জ ও উমরাহ-এর উদ্দেশে মক্কা শরীফে গমনকারীদের জন্য ইহরাম না বেঁধে মিকাত অতিক্রম করা বৈধ নয়যদি কোনো ব্যক্তি ইহরাম না বেঁধে মীকাত অতিক্রম করে ভেতরে চলে আসে তবে তার উচিত মীকাতে ফিরে গিয়ে ইহরাম বাঁধাএ অবস্থায় তার ওপর ক্ষতিপূরণ হিসেবে পশু কুরবানীকরা ওয়াজিব হবে নাতবে মীকাতে ফিরে না গিয়ে যেখানে আছে সেখান থেকে ইহরাম বাঁধলে হাজ্জ ও উমরাহ হয়ে গেলেও তার ওপর পশু কুরবানীকরা ওয়াজিব হবে

ইহরাম

পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ-এর ঈবাদাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রথম রুকনই হলো ইহরামইহরাম সম্পর্কে আমাদের অনেকের কোনো ধারণাই নেইঅথচ হাজ্জ ও উমরাহ পালনে ইহরাম বাঁধা হলো ফরজসংক্ষেপে ইহরাম কি? তার পরিচয় ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলোঃ

ইহরাম (اَلْاِحْرَامُ) শব্দটি মূলত হারাম (حَرَامٌ) শব্দ থেকে এসেছেযার অর্থ হলো কোনো জিনিসকে নিজের ওপর হারাম বা নিষিদ্ধ করে নেয়াআর এ ইহরামই পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ-এর প্রধান ও প্রথম ফরজ কাজপুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা সুতীর কাপড় আর নারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় শালীন পোশাক পরিধান করাই হলো ইহরামপুরুষদের মাথা খালি থাকবে, আর নারীদের চেহারায় নিকাব ও হাতে মোজা পরবেনা। (তবে ওড়না দিয়ে চেহারা হাত ডেকে রাখবে এমনভাবে যে ওড়না চেহারা যেনো স্পর্শ না করে)অনেকে মহিলা মাছালা না বোঝার ফলে তাওয়াফের সময় চেহারার আবরণ খোলা রাখে এবং সৌন্দর্য প্রকাশ করে থাকেন, এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ-হারাম কাজএমন পবিত্র জায়গায় এবং মহান ঈবাদাতের সময় মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বিধান লঙ্ঘন কিভাবে করা সম্ভব?) আর পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ পালনকারী ব্যক্তি ইহরামের মাধ্যমে নিজের ওপর আহলিয়ার সহিত নিসবতে খাছ সহ মাথার চুল, হাতের নখ, গোঁফ, বগল ও নাভির নিচের ক্ষৌর কর্যাদি, সুগন্ধি ব্যবহার, সেলাই করা পোশাক পরিধান এবং শিকার করাসহ কিছু বিষয়কে পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ সম্পাদনের আগ পর্যন্ত হারাম করে নেয়া

স্মরণীয় যে, উল্লেখিত কাজগুলোর পাশাপাশি পবিত্র হাজ্জ কিংবা উমরাহ-এরমধ্যে যেটি আদায় করার ইচ্ছা পোষণ করা হবে; তার নিয়ত করে উচ্চস্বরে বার বার তালবিয়া পাঠ করাকেই ইহরাম বলে

ইহরামের প্রয়োজনীয়তাঃ নামায শুরুর জন্য যেমন তাকবিরে তাহরিমা (আল্লাহু আকবার) বলে নামায শুরু হয়তেমনি পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ-এর জন্যেও ইহরাম বেধে পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ শুরু করা হয়তাকবিরে তাহরিমার দ্বারা স্বাভাবিক অবস্থার হালাল ও বৈধ কাজগুলি যেভাবে নামাজি ব্যক্তির জন্য নামায আদায়ের সময় হারাম হয়ে যায়ঠিক তেমনি ইহরাম বেধে, মীকাতে নিয়ত করার মাধ্যমেই পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ পালনকারী ব্যক্তির জন্যও স্বাভাবিক অবস্থার অনেক হালাল কাজও হারাম হয়ে যায়এ কারণেই পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ-এর জন্য ইহরামকে ফরজ করা হয়েছে

শুধু পবিত্র হাজ্জ বা উমরাহ-এর সংকল্প করলেই কেউ মুহরিম হবে নাযদিও সে নিজ দেশ থেকে ছ্বফর শুরুর সময় পবিত্র হাজ্জের নিয়ত করেতেমনি শুধু সুগন্ধি ত্যাগ অথবা তালবিয়া পাঠ আরম্ভ করলেই মুহরিম হবে নাএ জন্য বরং তাকে পবিত্র হাজ্জের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করার নিয়ত করতে হবেতাই পবিত্র হাজ্জ ও উমরা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি গোসল ও পবিত্রতা অর্জন করে ইহরামের কাপড় পরিধান করবেন, অতঃপর পবিত্র হাজ্জের/উমরাহ-এর নিয়ত করবেনস্মরণীয় যে ইহরামের নিয়তের আগে ইহরামের উদ্যেশ্যে দুই রকয়াত নামায পড়া ছুন্নত

কেউ বিমানে চড়ে পবিত্র হাজ্জ/উমরায় গেলে মুহরিম (অজু সহ ইহরামের পোশাক পড়া অবস্থায়) মীকাতের সিমানায় ঢুকলেই উমরাহ-এর নিয়ত করে মুহরিম হয়ে যাবেনির্ধারিত মীকাত থেকে (সম্ভব হলে) গোসল করে অথবা অজু করে নেয়াপুরুষরা সেলাইবিহীন ২টি কাপড় পড়বেআর নারীরা পর্দাসহ শালীন পোশাক পড়বেঅতঃপর ২ রকআত নামায পড়ে ইহরামের নিয়ত করে নেবেঃ (اَللَّهُمَّ اِنِّي اُرِيْدُ العُمْرَةَ فَيَسِّرْهُ لِيْ وَ تَقَبَّلْهُ مِنِّي) আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল উমরতা ফাইয়াছছির-হু-লি ওয়াতাক্বব্বাল-হু মিন্নিইকেউ শুধু এটা পাঠ করলেও হবে মীকাতে প্রবেশ করেলাব্বাইকা আল্লাহুম্মা উমরাহ (لَبَّيْكَ اللّٰهُمّٰ  عُمْرَةً) অতঃপর তাওয়াফের আগ পর্যন্ত উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করবেঃ (لَبَّيْكَ اَلْلَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ إِلَهَ اْلْحَقِّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ ذَا الْمَعَارِجِ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَك) লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লাহাল হাক্কি লাব্বাইক, লাব্বাইকা জাল মায়ারি, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’য়মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারীকা লাকঅথবা (لَبَّيْكَ اَلْلَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَك) লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’য়মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারীকা লাক

(ইহরামের পোষাক বিমানে চড়ার আগেই পড়ে নেওয়া আমার মতে উত্তম, বিমানে স্বল্প যায়গা থাকে, যাত্রি বেশী এবং ওয়াশ রূম ফ্রি না থাকলে অনেকে পোশাক অজু করে হাজীর হতে হতে বিমান মীকাতের সীমানা অতিক্রম করে ফেললে আবার মীকাতের স্থানে ফিরে আসতে হবে যা অনেক ঝামেলার বিষয়।)

তাওয়াফ

১) মরাহ-এর উদ্দেশ্যে মসজিদে হারামে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করে এ দ্বোয়া পড়াঃ (بِسْمِ اللهِ وَ الصّلَاةُ وَ السَّلَامُ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ أعُوْذُ بِاللهِ الْعَظِيْم وَ بِوَجْهِهِ الْكَرِيْمِ وَ سُلْطَانِهِ الْقَدِيْمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ اَللهُمَّ افْتَحْ لِىْ اَبْوَابَ رَحَمَتِكَ) উচ্চারণঃ বিছমিল্লাহি ওয়াছ্ ছ্বলাতু ওয়া ছালামু য়া’লা রছুলিল্লাহআউজুবিল্লাহিল য়া’জিম ওয়া বি-ওয়াজহিহিল কারিম ওয়া ছুলত্বানিহিল ক্বদিমি মিনাশশায়ত্বানির রজিমআল্লাহুম্মাফতাহলি আবওয়াবা রহমাতিকপাক পবিত্র অবস্থায়, অজুর সহিত ক্বাবা শরীফ-এর নিকটে হাজীর হয়ে মুহব্বতের সহিত মহান আল্লাহ তায়ালা উনার আজিমুশ্বান এই বরকতপূর্ন ঘরের প্রতি দৃষ্টিপাত কর বাইতুল্লাহ শরীফ-এর দিকে তাকিয়ে এই দোয়াটি পড়ুনঃ (اَللّٰهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ، وَمِنْكَ السَّلَامُ، فَحَيِّنَا رَبَّنَا بِالسَّلَامِ. اَللّٰهُمَّ زِدْ هٰذَا الْبَيْتَ تَشْرِيفًا وَتَعْظِيمًا وَتَكْرِيمًا وَمَهَابَةً، وَزِدْ مَنْ شَرَّفَهُ وَكَرَّمَهُ مِمَّنْ حَجَّهُ أَوِ اعْتَمَرَهُ تَشْرِيفًا وَتَعْظِيمًا وَبِرًّا)

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আংতা ছালামু ওয়া মিনকাছ ছালাম, ফা-হাইয়্যিনা রব্বানা বিছ-ছালামআল্লাহুম্মা জিদ হাজাল বাইতা তাশরিফা ওয়া তায়জ্বীমা ওয়া তাকরিমা ওয়া মুহাবাতা, ওয়া জিদ মান শার্‌-রফাহু ওয়া কার্‌-রমাহু মিম্মান হাজ্জাহু ওয়ায়-তামারহু তাশরিফা ওয়া তাকরিমা ওয়া তায়জ্বীমা ওয়া বির্‌রা

অর্থঃ হে মহান আল্লাহ তায়ালা, আপনিই ছালাম; আর ছালাম আপনার কাছ থেকেই আসেঅতএব, হে আমাদের রব, আমাদেরকে ছালামের সহিত জীবিত রাখুনহে মহান আল্লাহ তায়ালা, এই ঘরকে আরো তাশরীফ, তায়জ্বী, তাকরীম ও মাহাবা দান করুনআর যারা এই ঘরকে হাজ্জ বা মরাহ-এর মাধ্যমে সম্মানিত ও মর্যাদাবান করেছে, তাদেরকেও আরো তাশরীফ, তায়জ্বীম এবং নেকী দান করুন (বাইহাকী শরীফ, ছুনান আল কুবরাঃ ৫/৭৩) ঢোকার পূর্বেই সকল প্রকার নাপাকি থেকে পবিত্র হয়ে অজু করুন তারপর মাছজিদুল হারাম শরীফে প্রবেশ করে কা’য়বা শরীফ-এর দিকে এগিয়ে যান

মুহরিম ব্যক্তি অন্তরে তাওয়াফের নিয়ত করে তাওয়াফ শুরু করবেকেননা, অন্তরই নিয়তের মূল স্থানউমরাহকারী মুহরিম তাওয়াফ শুরুর পূর্ব মুহূর্তে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দেবে

তাওয়াফের জন্য হাযারে আছওয়াদের কাছে পৌঁছার পর সেখানকার আমলগুলো নিম্নরূপে করার চেষ্টা করবেন

ক. ভিড় না থাকলে হাযারে আছওয়াদের কাছে গিয়ে তা চুম্বন করে তাওয়াফ শুরু করবেনহাযারে আওয়াদ শরীফ চুম্বনের পদ্ধতি হল, হাযারে আওয়াদ শরিফ-এর ওপর দু-হাত রাখবেনবিমিল্লাহি আল্লাহু আকবারবলে আলতোভাবে চুম্বন করবেন। (বুখারী শরীফ ৩/৪৭৫) হাযারে আওয়াদ শরীফ চুম্বনের সময় বিছমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার (بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ) বলবেন (বুখারী শরীফ ৩/৪৭৬, আত-তালখিছুল হাবীরঃ ২/২৪৭)

খ. ভিড় ঠেলে হাযারে আছওয়াদে পৌঁছে চুম্বন করা কষ্টকর হলে ডান হাত দিয়ে তা স্পর্শ করবেন এবং হাতের যে অংশ দিয়ে স্পর্শ করেছেন সে অংশ চুম্বন করবেন। (বুখারী শরীফঃ ১৬০৬; মুছলিম শরীফঃ ১২৬৮)

গ. যদি হাত দিয়েও হাযারে আওয়াদ স্পর্শ করা সম্ভব না হয়, লাঠি জাতিয় কিছু দিয়ে তা স্পর্শ করবেন এবং লাঠির যে অংশ দিয়ে স্পর্শ করেছেন সে অংশ চুম্বন করবেন। (বুখারী শরীফঃ ১৬০৮)

ঘ. তবে আজকাল ক্বাবা শরীফের ভিড় বেড়ে গেছে তাই বর্তমান সময়ে হাযারে আছওয়াদ চুম্বন ও স্পর্শ করা উভয়টাই অত্যন্ত কঠিন এবং অনেকের পক্ষেই দুঃসাধ্যতাই এমতাবস্থায় হাযারে আছওয়াদের বরাবর এসে দূরে দাঁড়িয়ে উনার দিকে মুখ ফিরিয়ে ডান হাত উঁচু করে, বিছমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার (بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ) বলে ইশারা করবেনপূর্বে হাযারে আছওয়াদ বরাবর যমীনে একটি খয়েরি রেখা ছিল বর্তমানে তা উঠিয়ে দেয়া হয়েছেতাই হাযারে আছওয়াদ বরাবর মাছজিদুল হারামের কার্নিশে থাকা সবুজ বাতি দেখে হাযারে আছওয়াদ বরাবর এসেছেন কি-না তা নির্ণয় করবেন

ঙ. প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে যদি হাযারে আছওয়াদে চুম্বন করা বা হাতে স্পর্শ করা সম্ভব না হয়, তাহলে মানুষকে কষ্ট দিয়ে এ কাজ করতে যাওয়া অনুচিত হবেএতে অনেকের খুশূ তথা বিনয়ভাব নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং তাওয়াফের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারেআর এটাকে কেন্দ্র করে কখনো কখনো ঝগড়া-বিবাদ এমনকি মারামারি পর্যন্ত শুরু হয়ে যায়তাই এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিতকারণ ঝগড়া, গালিগালাজ ইহরাম অবস্থায় হারাম ফাসেকি কাজের অন্তর্ভুক্ত, যার কারণে উমরাহ বাতিল হয়ে যায়

তাওয়াফের শুরুর নিয়ত/দু’য়াঃ (اَللَّهُمَّ إيمَانًا بِكَ وَتَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاءً بِعَهْدِكَ وَاتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مُحَمَّدٍ صَلَّى ٱللّٰهُ عَلَيْهِ وَ اٰلِهِ وَسَلَّمَ) (আল্লহুম্মা ঈমানাম্ম বিকা ওয়া তাছ্বদীকাম্ম বি-কিতাবিক, ওয়া ওয়া ফাআম্ম বিয়াহদিকা ওয়াত্ তিবায়ান্ন লি ছুন্নাতি নাবিয়্যিকা মুহাম্মাদিন ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম)অর্থাৎ আয় আল্লাহ পাক, আপনার ওপর ঈমানের কারণে, আপনার কিতাবের সত্যায়ন, আপনার সাথে কৃত অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন এবং আপনার নবী মুহাম্মদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নতের অনুসরণ করে তাওয়াফ শুরু করছি

২. হাযারে আছওয়াদ চুম্বন, স্পর্শ অথবা ইশারা করার পর ক্বাবা শরীফ হাতের বাঁয়ে রেখে তাওয়াফ শুরু করবেনতাওয়াফের আসল লক্ষ্য মহান আল্লাহ তায়ালা উনার আনুগত্য ও উনার প্রতি মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা এবং উনারই সামনে নিজকে সমর্পন করাতাওয়াফের সময় নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার হালের মধ্যে বিনয়-নম্রতা ও হীনতা-দীনতা প্রকাশ পেতচেহারায় ফুটে উঠত আত্মসমর্পনের আবহপুরুষদের জন্য তাওয়াফের প্রতিটি চক্করে ইযতিবা এবং প্রথম তিন চক্করে রমল করা ছুন্নত। (বুখারী শরীফ ৭৯৫১)

ইদ্বত্বিবায় হলো, গায়ের চাদরকে ডান বগলের নিচে দিয়ে নিয়ে বাম কাধে ফেলা, যাতে ডান কাঁধ খালি হয়ে যায়আর রমল হলো, ঘনঘন পা ফেলে কাঁধ হেলিয়ে সামান্য-দ্রুতগতিতে চলা যাতে অলসতা প্রাকাশ না পায় বরং উৎফুল্ল ভাব প্রকাশ পাওয়াক্বা’য়বা শরীফের কাছাকাছি স্থানে রমল করা সম্ভব না হলে দূরে থেকেই রমল করা উচিত

৩. রুকনে ইয়ামানী অর্থাৎ হাযারে আছওয়াদ-এর আগের কোণের বরাবর এলে সম্ভব হলে তা ডান হাতে স্পর্শ করা। (রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করার সময় بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُবিছমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলা উত্তমবাইহাকী শরীফ ৫/৭৯; তালখীছুল হাবীর ২/২৪৭।) প্রতি চক্করেই এর বরাবর এসে সম্ভব হলে এরকম করা

৪. হাযারে আছওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী কেন্দ্রিক য়ামলসমূহ প্রত্যেক চক্করে করা ছুন্নত, কারণ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এমনই করেছেনরুকনে ইয়ামানী থেকে হাযারে আছওয়াদ পর্যন্ত রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পড়তেন (رَبَّنَاۤ اٰتِنَا فِی الدُّنۡیَا حَسَنَۃً وَّ فِی الۡاٰخِرَۃِ حَسَنَۃً وَّ قِنَا عَذَابَ النَّارِ ) রব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনিয়া হাছানাতাও ওয়া ফিল-আখিরতি হাছানাহ, ওয়াকিনা আযাবান্ন নার।) অর্থাৎ, হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিনআর আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন’ (আবূ দাউদ শরীফ ১৮৯২) সুতরাং এদুই রুকনের মধ্যবর্তী স্থানে প্রত্যেক চক্করে উক্ত দু’য়াটি পড়া ছুন্নততবে তাওয়াফের চক্করের অবশিষ্ট সময়ে বেশি বেশি করে দুয়া করবেনআলহামদুলিল্লাহ্‌ পাঠ করবেনদূরুদ শরীফ, নামায ও ছালাম পাঠ করবেনক্বুরআন শরীফের তিলাওয়াতও করতে পারেনমোটকথা, যে ভাষা আপনি ভাল করে বোঝেন, আপনার মনের আকুতি যে ভাষায় সুন্দরভাবে প্রকাশ পায় সে ভাষাতেই দুয়া করবেনরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (إِنَّمَا جُعِلَ الطَّوَافُ بِالْبَيْتِ وَبَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ وَرَمْىُ الْجِمَارِ لإِقَامَةِ ذِكْرِ اَللَّهَ) বাইতুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ, ছ্বফা-মারওয়াহ উনার মধ্যে ছায়ই ও জিমারায় পাথর নিক্ষেপের বিধান মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিির কায়েমের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে (তিরমিযী শরীফ ৯০২, জামেউল উমূলঃ ১৫০৫।) হাজ্জ/উমরাহ-তে দুয়া ও জিকির অনুচ্চ স্বরে হওয়া উচিৎ বলে মনে করি

৫. ক্বা’য়বা ঘরের নিকট দিয়ে তাওয়াফ করা উত্তমতা সম্ভব না হলে দূর দিয়ে তাওয়াফ করবেকেননা, মছযিদুল হারাম শরীফ পুরোটাই তাওয়াফের স্থানসাত চক্কর শেষ হলে, ডান কাঁধ ঢেকে ফেলুন, যা ইতিপূর্বে খোলা রেখেছিলেনস্মরণীয় যে, শুধু তাওয়াফে কুদূম ও উমরাহ-এর তাওয়াফেই ইযতিবার বিধান রয়েছেঅন্য কোন তাওয়াফে ইযতিবা নেই, রমলও নেই

(তাওয়াফে কুদূম হলো মক্কা শরীফে পৌঁছে হজ্জের আগে যে আগমনী তাওয়াফ করা হয়একে তাওয়াফে তাহিয়্যাহ-ও বলা হয়, অর্থাৎ মক্কা শরীফ আগমনের সম্ভাষণস্বরূপ তাওয়াফহানাফি-মাজহাব মতে এটি ছুন্নত, “ফরজ বা ওয়াজিব নয়”হানাফি মতে এটি মূলত সেই হাজীর জন্য, যে বাইরে থেকে মক্কা শরীফ এসে হজ্জ করবেনআর আহলে মক্কা শরীফ বা মিকাতের ভেতরে অবস্থানকারী ব্যক্তির জন্য তাওয়াফে কুদূম নেই, কারণ তাদের ক্ষেত্রে “আগমন” অর্থে কুদূম সাব্যস্ত হয় না)

৬. সাত চক্কর তাওয়াফ শেষ করে মাকামে ইবরাহীমের দিকে অগ্রসর হবেনকারণ মহান আল্লাহ পাক আল ক্বু‌রআনে বলেনঃ (وَ اتَّخِذُوۡا مِنۡ مَّقَامِ اِبۡرٰهٖمَ مُصَلًّی) মাকামে ইবরাহীমকে তোমরা নামাজের স্থান বানাও। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ:১২৫) মাকামে ইবরাহীমকে নিজের ও বাইতুল্লাহ শরিফ-এর মাঝখানে রাখবেনযদিও তা দূর থেকে হয়তারপর নামাজের নিষিদ্ধ সময় না হলে দু-রক’য়ানামায আদায় করবেননামাজের প্রথম রক’য়াতে ছুরা ফাতেহা শরিফ-এর পর ছুরাহ কাফিরূন (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ) ও দ্বিতীয় রক’য়াতে ছুরাহ ফাতেহা শরিফ-এর পর ছুরা ইখলাছ শরীফ (قُلْ هُوَ اللهُ أحَدٌ) পড়া ছুন্নত। (তিরমিযী শরীফ ৮৬৯) এ দুই রকয়াত নামাযের সওয়াব সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, কেউ যখন তাওয়াফের পর দুই রকয়াত নামায আদায় করবে, তা ইমাল য়ালাইহিছ ছালামের বংশের একজন গোলাম আযাদ করার সমতুল্য বলে গণ্য হবে’ (হীহুত-তারগীব ওয়াত-তারহীবঃ ১১১২)

তবে মাকামে ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালামে জায়গা না পেলে মাছযিদুল হারাম শরিফ-এর যে কোনো স্থানে পড়লেও চলবে। (এই নামাযটি হানাফী মাহাবে ওয়াজিব, অন্যান্য মাহাবে ছুন্নত) তবে মানুষকে কষ্ট দেওয়া যাবে নাপথে-ঘাটে যেখানে সেখানে নামায আদায় করা যাবে নামাকরূহ সময় হলে এ দু-রকআত নামায পরে আদায় করে নিন

৭. নামায শেষ করে যমযমের কাছে যাওয়া, উনার পানি দাঁড়িয়ে পান করা ও মাথায় ঢালা ছুন্নতে রছুলে পাক ছ্বাল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম

যমযমের পানি পান করার আদবঃ যমযমের পানি কেবলামুখী হয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নাম নিয়ে দাঁড়িয়ে পান করাপেট ভরে যমযমের পানি পান করা, কারণ মুনাফিকরা পেট ভরে যমযমের পানি পান করে না। (ইবনে মাজাহ শরীফ ৩০৬১) নিয়ম হচ্ছে তিন শ্বাসে পান করা এবং পেট ভরে পান করাযমযমের পানি পানের পূর্বে এই দুয়া পড়াঃ (اللَّهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا وَاسِعًا، وَشِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ) আল্লাহুম্মা ইন্নীই আছআলুকা ‘য়িলমান্ন নাফিয়া, ওয়াছিয়া, ওয়া শিফা আম্ম মিন কুল্লি দাআ পান করা শেষ হলে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার প্রশংসা করাহে মহান আল্লাহ তায়ালা! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, বিস্তৃত সম্পদ ও সকল রোগ থেকে শিফা কামনা করছি। (দারা কুতনীঃ ২৭৩৮) পানি পান করার পর মাথায়ও কিছু পানি ঢালুনকেননা রছুলুল্লাহ‌ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি আলিহি ওয়াসাল্লা এরূপ করতেন। (মুনাদে আহমাদ ৩/৩৯৪) অতঃপর পূণরায় হাযারে আছওয়াদের কাছে এসে ডান হাতে তা স্পর্শ করুনএটা ছুন্নত, তবে আজকের ভিড় ঠেলে আদায় করা সম্ভব না হলে কোন গুনাহ নাই। (মুলিম শরীফঃ ১২১৮ ও ১২৬২)

ছ্বফা-মারওয়া ছা’য়

শরীয়তসম্মত ও ছুন্নতী পন্থায় ছায়ইর কাজ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলককিছু লোক মনে করেন, ছায়ই ছ্বফা পাহাড় থেকে শুরু হয়ে মারওয়া থেকে ফিরে আবার ছ্বফাতে এসেই এক চক্কর পুরো হয়, এটি সুস্পষ্ট ভুল য়ামলসঠিক হলো, ছ্বফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত যাওয়া এক চক্কর এবং মারওয়া থেকে ঘুরে আবার ছ্বফায় এলে তার দুই চক্কর পূর্ণ হয়

ছ্বফা পাহাড়ে উঠে প্রথমে বিছমিল্লাহ-এর সহিত এই আয়াত পড়ুনঃ (إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ، أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللهُ بِهِ) ইন্নাছ্বফা ওয়াল মারওয়াতা মিন্ শায়া-ইরিল্লাহআবদাউ বিমা বাদাআল্লাহু বিহ। (নিশ্চয়ই ছ্বফা মারওয়া মহান আল্লাহ পাক উনার  নিদর্শনআমি শুরু করছি মহান আল্লাহ পাক যা দিয়ে শুরু করেছেন।) (ছুরা বাকারাঃ ২/১৫৮)

এরপর ছ্বফা পাহাড়ে উঠে বাইতুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে (মুলিম শরীফঃ ১২১৮) মহান আল্লাহ তায়ালা উনার তাওহীদের, বড়ত্বের ঘোষণা ও প্রশংসা করে বলবেনঃ (اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، لَآ إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ اْلَحمْدُ يُحْيِىْ وَيُمِيْتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ، لَآ إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ) (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু লাহুল্ মুল্কু ওয়ালাহুল হাম্দু য়ুহ-ইই ওয়া য়্যুমীতু ওয়াহুয়া য়ালা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বদীর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহ, নযাজা ওয়াদাহু, ওয়া নাছ্বরা য়াবদাহু, ওয়াহাজামাল আহজাবা ওয়াহদাহ।) আল্লাহ পাক মহান, আল্লাহ পাক মহান, আল্লাহ পাক মহান! মহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোন সত্যিকারের ইলাহ নেই, তিনিই একউনার কোন শরীক নেইরাজত্ব উনারইপ্রশংসাও কেবল উনারতিনিই জীবন ও মৃত্যু দানকারীআর তিনিই সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবানমহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, একক তিনি, উনার কোনো শরীক নেইতিনি উনার অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন; উনার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রু-দলগুলোকে পরাজিত করেছেন। (নাছাই শরীফ ২/২২৪; ২/ ৬২৪; মুছলিম শরীফ ২/২২২, মুসনাদে আহমদঃ ৩/৩৮৮) আর দু’য়া করার সময় উভয় হাত তুলে দ্বোয়া করবেন। (আবু দাউদ শরীফঃ ১/৩৫১)

উপরে উল্লেখিত দ্বোয়াটি এবং দুনিয়া-আখিরাতের জন্য কল্যাণকর যেকোনো দুয়া সামর্থ্য অনুযায়ী তিন বার পড়তে হবেনিয়ম হলোঃ আরবি দ্বোয়া একবার পড়ে তার সাথে সামর্থ্য অনুযায়ী অন্য দুয়া পড়বেন যেকোন ভাষায়তারপর আবার ঐ দ্বোয়াটি পড়ে তার সাথে অন্য দ্বোয়া পড়বেনএভাবে তিন বার পাঠ করবেন এটাই ছুন্নাহ। (মুলিম শরীফঃ ২১৩৭)

ছ্বফা পাহাড়ে দ্বোয়া শেষ হলে মারওয়ার দিকে ছায়ই করা শুরু করবেন, হাটার সময় যেসব দ্বোয়া আপনার মনে আসে এবং আপনার কাছে সহজ মনে হয় তা-ই পড়বেনছ্বফা পাহাড় থেকে নেমে কিছু দূর এগোলেই ওপরে ও ডানে-বামে সবুজ বাতি জ্বালানো দেখবেনএকে বাতনে ওয়াদী (উপত্যকার কোল) বলা হয়এই জায়গাটুকুতে পুরুষ হাজীগণ দৌড়ানোর মত করে দ্রুত গতিতে হেঁটে যাবেনপরবর্তী সবুজ বাতির আলামত সামনে পড়লে চলার গতি স্বাভাবিক করবেনতবে মহিলারা এই জায়গাটুকুতেও চলার গতি স্বাভাবিক রাখবেনসবুজ দুই আলামতের মাঝে চলার সময় নিচের দ্বোয়াটি পড়বেনঃ (رَبِّ اغْفِرْلِ وَارْحَمْنِ، إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ) (রাবিবগ্ফিরলি‌ ওয়ার্হামনি, ইন্নাকা আন্তাল আয়াজ্যুল আকরম।) হে আমার রব, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার উপর রহম করুননিশ্চয়ই আপনি অধিক শক্তিশালী ও সম্মানিত। (ইবন আবী শাইবাঃ ৪/৬৮; বাইহাকী শরীফ ৫/৯৫, তাবারানী শরীফ, আদ্ দুয়াঃ ৮৭)

অতঃপর এখান থেকে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে মারওয়া পাহাড়ে উঠবেনমারওয়ায় উঠার পরে কাবাঘরের দিকে মুখ করে দুই হাত তুলে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার তাওহীদের, বড়ত্বের ঘোষণা ও প্রশংসা করে বলবেনঃ (اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ، لَآ إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ اْلَحمْدُ يُحْيِىْ وَيُمِيْتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ، لَآ إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ) (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু লাহুল্ মুল্কু ওয়ালাহুল হাম্দু য়ুহ-ইই ওয়া য়্যুমীতু ওয়াহুয়া য়ালা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বদীর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহ, নযাজা ওয়াদাহু, ওয়া নাছ্বারা য়াবদাহু, ওয়াহাজামাল আহজাবা ওয়াহদাহ।) আল্লাহ পাক মহান, আল্লাহ পাক মহান, আল্লাহ পাক মহান! মহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোন সত্যিকারের ইলাহ নেই, তিনিই একউনার কোন শরীক নেইরাজত্ব উনারইপ্রশংসাও কেবল উনারতিনিই জীবন ও মৃত্যু দানকারীআর তিনিই সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবানমহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, একক তিনি, উনার কোনো শরীক নেইতিনি উনার অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন; উনার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রু-দলগুলোকে পরাজিত করেছেন। (নাছাই শরীফ ২/২২৪; ২/ ৬২৪; মুছলিম শরীফ ২/২২২, মুসনাদে আহমদঃ ৩/৩৮৮) আর দু’য়া করার সময় উভয় হাত তুলে দোয়া করবেন। (আবু দাউদ শরীফঃ ১/৩৫১)

অতপর মারওয়া থেকে নেমে ছ্বফায় আসার পথে সবুজ বাতির কাছে পৌঁছলে সেখান থেকে আবার দ্রুত গতিতে চলবেনপরবর্তী সবুজ বাতির কাছে পৌঁছালে চলার গতি স্বাভাবিক করবেনছ্বফা পাহাড়ে এসে কাবাঘরের দিকে মুখ করে উভয় হাত তুলে আগের মত যিকর ও দুয়া করবেনছ্বফা মারওয়া উভয়টি দুয়া কবুলের জায়গাতাই উভয় জায়গাতে বিশেষভাবে দুয়া করার চেষ্টা করবেনএকই নিয়মে ছায়ইর বাকি চক্করগুলোও আদায় করবেন

হলক করা

ছা’য়ই শেষ হওয়ার পর মাথার চুল ছোট বা মুণ্ডন করে নেবেনবিদায় হাজ্জের সময় তামাত্তুকারী ছ্বহাবীগণ চুল ছোট করেছিলেনহাদিছ শরীফ এসেছেঃ (فَحَلَّ النَّاسُ كُلُّهُمْ وَقَصَّرُوْا) অতঃপর সমস্ত মানুষ হালাল হয়ে গেল এবং তারা চুল ছোট করে নিল’ (মুলিম শরীফ ১২১৮) সে হিসেবে তামাত্তু হাজীর জন্য উমরাহ-এর পর মাথার চুল ছোট করা উত্তমযাতে হাজ্জের পর মাথার চুল কামানো যায়মাথায় যদি একেবারেই চুল না থাকে তাহলে শুধু ক্ষুর চালাবেনচুল ছোট করা বা মুণ্ডন করার পর গোছল করে স্বাভাবিক সেলাই করা কাপড় পরে নেবেনহাজী হলে ৮ জিলহাজ্জ পর্যন্ত হালাল অবস্থায় থাকবেনআর মহিলারা মাথার প্রতিটি চুলের গোছার অগ্রভাগ থেকে আঙ্গুলের কর পরিমাণ কর্তন করবেন; এর চেয়ে বেশি নয়। (মুছান্নাফে ইবন আবী শাইবাহঃ ৩/১৪৭)

উপরোক্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার মাধ্যমে মুহরিমের উমরাহ পূর্ণ হয়ে যাবেতিনি যদি তামাত্তু হাজ্জকারী বা স্বতন্ত্র উমরকরী হন, তবে তার জন্য ইহরাম অবস্থায় যা নিষিদ্ধ ছিল তার সব হালাল হয়ে যাবেপক্ষান্তরে যদি কিরান বা ইফরাদ হাজ্জকারী হন, তাহলে এখন তিনি চুল ছোট বা মাথা মুণ্ডন করবেন নাবরং জিলহাজ্জ শরীফ-এর ১০ তারিখ (কুরবানীর দিন) পাথর মারার পর প্রথম হালাল না হওয়া পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকবেনআর এ সময়ে বেশি বেশি তাওবা-ইস্তেগফার, নামায, ছ্বদাকা, তাওয়াফ ইত্যাদি নেক কাজে নিয়োজিত থাকবেনবিশেষ করে জিলহাজ্জ শরীফের প্রথম দশদিন, যেগুলোতে নেক কাজ করলে অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ছ্বওয়াব হাসিল হয়