Friday, July 3, 2026

জেফ্রি এপ্সটিনের অন্ধকার জগৎ-সমাচারঃ শুরু থেকে শেষ।

জেফ্রি এপ্সটিনের অন্ধকার জগৎ-সমাচারঃ শুরু থেকে শেষ।

জেফ্রি এডওয়ার্ড এপ্সটিনের কাহিনী কোনো সাধারণ অপরাধীর কাহিনী নয়এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যে মেধা, টাকা, প্রভাব, গোপন ক্যামেরা, দ্বীপ এবং ক্ষমতাবানদের অন্ধকার যোগাযোগ-জাল তৈরি করেছিলসে নিজের মেধাকে চরিত্র গঠনের পথে ব্যবহার করেনি, বরং মানুষের দুর্বলতা, ধনীদের গোপন লালসা, ক্ষমতাবানদের ভয়, মেয়েদের দারিদ্র্য, প্রশাসনের নীরবতা এবং আইনের ফাঁকফোকরকে নিজের সাম্রাজ্যের ইট-পাথর বানিয়েছিলবাইরে থেকে সে ছিল একজন অর্থ ব্যবস্থাপক, ধনী সমাজের পরিচিত মুখ, বিজ্ঞানী, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পী, রাজপরিবার এবং উচ্চবিত্ত মহলের সঙ্গে চলাফেরা করা এক রহস্যময় অর্থ-কারবারিকিন্তু ভেতরে ভেতরে সে গড়ে তুলেছিল নাবালিকা মেয়েদের মানসিকভাবে ফাঁদে ফেলা, শোষণ, ভয় দেখানো, টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করা, একজন মেয়ের মাধ্যমে আরেকজন মেয়েকে টেনে আনা, গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড রাখা এবং ক্ষমতাবানদের সঙ্গে নিজের বাঁচা-মরা জুড়ে দেওয়ার এক ভয়াবহ ব্যবস্থা২০১৯ সালে মার্কিন বিচার বিভাগ এপ্সটিনকে নাবালিকা যৌন পাচার ও পাচারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করেঅভিযোগে বলা হয়, ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে নিউইয়র্ক ও পাম বিচসহ বিভিন্ন স্থানে বহু নাবালিকা মেয়েকে টাকা দিয়ে যৌন কাজে প্রলুব্ধ বা বাধ্য করা হয়েছিল, এমনকি কিছু ভুক্তভোগীকেই অন্য নাবালিকা মেয়েদের আনতে টাকা দেওয়া হতো

এপ্সটিনের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের সি গেট এলাকায়সেখানে মূলত অভিবাসী ইহুদি সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল বেশিতার বাবা আশপাশের পার্কে ঘাস কাটার কাজ করতেনঅর্থাৎ এপ্সটিন কোনো বিলিয়নিয়ার পরিবারে জন্মায়নিসে জন্মেছিল সাধারণ এক শ্রমজীবী পরিবারেকিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার গণিতের মেধা ছিল ব্যতিক্রমীঅন্য ছাত্রদের তুলনায় সে এত দ্রুত এগোত যে দুই ক্লাস এড়িয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুল শেষ করেএরপর নিউইয়র্কের একটি মর্যাদাপূর্ণ কলেজের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হয়কিন্তু ভর্তি হওয়া আর পড়াশোনা শেষ করা এক জিনিস নয়তার অর্থকষ্ট ছিলকলেজের সঙ্গে সঙ্গে সে ট্যাক্সি চালাতপরে ফি দেওয়ার চাপ বাড়লে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভুয়া চেক জমা দেয়এ নিয়ে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি তার বিরুদ্ধে মামলা করে বলে উল্লেখ আছেখুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে কলেজ থেকে ঝরে পড়ে

এই ঝরে পড়া যুবকের সামনে এরপর খুলে যায় নিউইয়র্কের এক অভিজাত দরজাডালটন নামে একটি অভিজাত ব্যক্তিগত স্কুলে সে গণিতের শিক্ষক হিসেবে কাজ পায়ডালটন স্কুল ছিল এমন জায়গা, যেখানে আমেরিকার বড় ব্যবসায়ী, রাজনীতিক এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়তএমন স্কুলে সাধারণত শিক্ষক হতে হলে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি লাগেকিন্তু এপ্সটিনের গণিত মেধা এত বেশি আলোচিত ছিল যে পূর্ণ ডিগ্রি না থাকলেও সে সেখানে গণিত পড়ানোর সুযোগ পেয়ে যায়এই জায়গাটিই তার জীবনের প্রথম বড় সামাজিক সিঁড়িসে বুঝে যায়, মেধা দিয়ে শুধু চাকরি নয়, ক্ষমতাবান পরিবারের ঘরের দরজাও খোলা যায়

ডালটনে পড়ানো শুরু করার পর অভিভাবক-শিক্ষক বৈঠকে অনেক অভিভাবক তার বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হনতারা নিজেদের সন্তানদের জন্য তাকে ব্যক্তিগত শিক্ষক রাখতে শুরু করেনফলে এপ্সটিনের প্রবেশ শুরু হয় নিউইয়র্কের সবচেয়ে ধনী পরিবারের বাড়িগুলোতেকিন্তু এই মেধাবী মুখোশের নিচে অন্য এক চরিত্র তখনই দেখা দিতে শুরু করেস্কুলের ছাত্রছাত্রীরা কয়েক মাসের মধ্যেই একটি অস্বাভাবিক ধরন লক্ষ্য করেছোট বয়সের মেয়েদের সঙ্গে এপ্সটিনের আচরণ ছিল অদ্ভুতপ্রাক্তন ছাত্রদের কেউ কেউ পরে বলেন, শিক্ষক হয়েও সে কম বয়সী মেয়েদের সঙ্গে ফ্লার্ট করতক্যারি লরেন্স নামে এক প্রাক্তন ছাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, মেয়েদের প্রতি এপ্সটিনের অস্বাভাবিক আগ্রহ তার স্মৃতিতে বহু বছর পরও রয়ে যায়আরও কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্র পরবর্তী সময়ে একই ধরনের কথা বলেনএকাধিক অভিযোগ স্কুলের ভেতরে উঠতে থাকলে ১৯৭৬ সালের জুনে ডালটন স্কুল বিষয়টি প্রকাশ্যে না এনে এপ্সটিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তার পদত্যাগ নেয়

ডালটন থেকে বেরিয়ে এপ্সটিন বেকার হয়ে যায়, কিন্তু তার হাতে তখন ছিল এক মূল্যবান জিনিস, ধনী পরিবারের ঘরে প্রবেশের অভিজ্ঞতাBear Stearns নামে একটি ব্যবসা ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা এলান গ্রিনবার্গের সন্তানদের সে টিউশন পড়াতযেহেতু ডালটনের ভেতরের অভিযোগ তখন জনসমক্ষে আসেনি, এলান গ্রিনবার্গ তাকে Bear Stearns-এ চাকরি পাইয়ে দেনএখান থেকেই এপ্সটিন ওয়াল স্ট্রিটের অর্থজগতে ঢুকে পড়েঅফিসে ঢুকেই সে বুঝে যায়, এখানে শুধু হিসাব জানলেই হয় না, কাকে ব্যবহার করতে হয় তাও জানতে হয়অফিসের ভেতরে সে এমন মেয়েদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে থাকে, যারা তার যোগাযোগ-জাল ও পেশাগত উত্থান এগিয়ে নিতে কাজে আসতে পারেআর গ্রাহকদের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সে আকর্ষণীয় মেয়েদের পাঠাতএকই সময়ে সে নিজের বসের মেয়ে লিন গ্রিনবার্গের সঙ্গে সম্পর্ক শুরু করেআবার অফিসের ভেতরে পাওলু হেইল নামে এক প্রাক্তন মিস ইন্ডিয়ানাপোলিস ছিলো, যার বড় বড় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলএপ্সটিন তাকেও সম্পর্কের ফাঁদে ফেলেএক পর্যায়ে এপ্সটিন যা বলত, পাউলু তাই করত

কিন্তু Bear Stearns-এও তার জন্য সমস্যা তৈরি হয়আর্থিক অনিয়ম এবং প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ নিয়ে কমিটি বসতে শুরু করে১৯৮১ সালের ২৫ মার্চ এপ্সটিন কোম্পানি থেকে পদত্যাগ করেকিন্তু সে খালি হাতে বের হয়নিসে সঙ্গে নিয়ে বের হয় ধনীদের টাকা কোথায় রাখা হয়, কর কীভাবে এড়ানো বা কমানো হয়, বিদেশি আর্থিক যোগাযোগ-জাল কীভাবে কাজ করে, কাগুজে কোম্পানি ও বিদেশি ট্রাস্ট কীভাবে ব্যবহার হয়, এই পুরো কাঠামোর বাস্তব জ্ঞানচাকরি ছেড়ে সে আরেকটি সাধারণ চাকরি খুঁজতে যায়নিবরং ভাবল, এই জ্ঞান দিয়ে কোনো ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষকে ধরতে হবে, তার টাকা সামলাতে হবে, আর নিজের সাম্রাজ্য বানাতে হবে

এখানে পাউলু হেইল গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে ওঠেতার পরিচিত নিক লিসির মাধ্যমে এপ্সটিন লন্ডনে গিয়ে নিকের বাবা ডউগলাস লিসির সঙ্গে দেখা করেডউগলাস লিসি ছিল ব্রিটিশ অস্ত্র শিল্পের বড় নামসৌদি আরবের সঙ্গে আল ইয়ামামাহ অস্ত্র চুক্তির মতো বড় চুক্তির সঙ্গে তার নাম যুক্ত ছিলডউগলাস লিসির সঙ্গে দেখা করেই এপ্সটিন তার অর্থ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, ধনী গ্রাহকের মানচিত্র, বিদেশে কর ব্যবস্থাপনার কৌশল এবং আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ লুকানোর কাঠামো এমনভাবে তুলে ধরে যে ডউগলাস তাকে নিজের ব্যক্তিগত পরামর্শদাতা বানিয়ে নেনএকই মাসে এপ্সটিন Intercontinental Assets Group Inc নামে একটি কোম্পানি বানায় এবং ডউগলাস লিসির অস্ত্র চুক্তি সংক্রান্ত বিদেশি অর্থব্যবস্থা, কাগুজে কোম্পানি ও ট্রাস্ট ব্যবস্থাপনা শুরু করে

এই পর্যায় থেকে এপ্সটিনের হাতে প্রচুর টাকা আসতে থাকেশুধু টাকা নয়, সে প্রবেশ করে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসা, রাজনীতি ও অভিজাত বৃত্তের এমন জগতে, যেখানে সাধারণ মানুষের নামও উচ্চারিত হয় নাএখানেই সে বড় শিক্ষা পায়প্রতিটি নতুন পরিচয় তাকে আরেক স্তর ওপরে নিয়ে যায়প্রতিটি ধনী মানুষ আরেক দরজা খুলে দেয়প্রতিটি গোপন দুর্বলতা তাকে আরও নিরাপদ করেএপ্সটিনের পুরো সাম্রাজ্য দাঁড়াতে শুরু করে মানুষের দুর্বলতা, গোপন কামনা, অপরাধবোধ এবং ভয়কে পুঁজি করে

ধীরে ধীরে সে বিলাসী আসর, ব্যক্তিগত বিমানযাত্রা, দামি সফর, উচ্চবিত্তদের রাতের খাবারের আয়োজন, মডেল ও তরুণী নারীকে ধনী গ্রাহকদের সঙ্গে পাঠানো, এইসব আয়োজন শুরু করেসে নিজেকে এমন এক মানুষ হিসেবে দেখাতে থাকে, যার সঙ্গে থাকলে টাকা, নারী, গোপনীয়তা এবং প্রভাব সব পাওয়া যায়তার নিজের যৌন আসক্তি ছিল চরম মাত্রার বলে বহু ভুক্তভোগীর বর্ণনায় আসেসে এই আসক্তিকে মানুষের সামনে জৈবিক প্রয়োজনের মতো দেখাতঅনেক ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, সে নিজের ব্যবসায় মেয়েদের প্রায় মুদ্রার মতো ব্যবহার করত

১৯৮৪ সালের একটি অভিযোগমূলক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করছিSouth Carolina-এর Hilton Head Island-এ ব্যবসায়িক ভ্রমণে গিয়ে এপ্সটিন জেন ডই নামে এক অল্প বয়সী বেবি-সিটার মেয়ের দিকে নজর দেয়তাকে শিশুসেবার কাজের নামে ডাকেঅভিযোগ অনুযায়ী, পরে তাকে জোর করে অ্যালকোহল ও মাদক দেওয়া হয়, যৌন নির্যাতন করা হয়, নগ্ন ছবি তুলে ভয় দেখানো হয় এবং এরপর নিউইয়র্কে ধনী লোকদের আসরে নিয়ে গিয়ে অন্যদের সামনে শোষণের জন্য ব্যবহার করা হয়এই ধরনের অভিযোগ আদালতে সব ক্ষেত্রে একইভাবে প্রমাণিত নয়, তাই লেখার ভাষা সতর্ক হওয়া জরুরিকিন্তু এই বর্ণনা এপ্সটিনের ধরন বোঝায়দুর্বল বা অল্পবয়সী মেয়ে খুঁজে বের করা, প্রথমে কাজ বা সুযোগের নামে কাছে আনা, তারপর নিয়ন্ত্রণ, ছবি, ভয়, টাকা, ব্ল্যাকমেইল এবং শেষে ধনী গ্রাহকদের সঙ্গে তাকে যুক্ত করাএখান থেকেই এপ্সটিন বুঝে যায়, যদি ক্ষমতাবান মানুষকে নিজের অপরাধের অংশীদার বানানো যায়, তাহলে তার নিজের বাঁচা আর তাদের বাঁচা এক হয়ে যায়

১৯৯১ সালে নিউইয়র্কের এক উচ্চবিত্ত আসরে এপ্সটিনের পরিচয় হয় গিজলাইন ম্যাক্সউয়েলের সঙ্গেম্যাক্সউয়েল ছিল ব্রিটিশ বিলিয়নিয়ার ও গণমাধ্যম ব্যবসায়ী রবার্ট ম্যাক্সউয়েল-এর মেয়েছোটবেলা থেকেই সে বড় বড় রাজনীতিক, প্রধান নির্বাহী, বিলিয়নিয়ার, তারকা এবং অভিজাত সমাজের মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করতকিন্তু রবার্ট ম্যাক্সউয়েল-এর সন্দেহজনক মৃত্যুর পর তার পরিবারের আর্থিক সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে, একাধিক কেলেঙ্কারি সামনে আসে, পরিবার প্রায় দেউলিয়া হয়ে যায় এবং গিজলাইন ম্যাক্সউয়েল যুক্তরাজ্য ছেড়ে আমেরিকায় চলে আসেএপ্সটিনের জন্য এটি ছিল জ্যাকপটম্যাক্সউয়েল-এর হাতে ছিল সামাজিক দরজাএপ্সটিনের হাতে ছিল টাকাদুজনের প্রয়োজন এক হয়ে যায়খুব অল্প সময়ে এপ্সটিন ম্যাক্সউয়েল-কে নিজের প্রেমিকা বানায়তারপর ম্যাক্সউয়েল ধীরে ধীরে এপ্সটিনের পুরো কাজের সহযোগী হয়ে ওঠে২০২২ সালে ম্যাক্সউয়েল-কে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়বিচার বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, ম্যাক্সউয়েল ও এপ্সটিন মিলে নাবালিকা মেয়েদের প্রলুব্ধ করা, ভ্রমণে নেওয়া, মানসিকভাবে ফাঁদে ফেলা এবং যৌন নির্যাতনের ফাঁদে ফেলার কাজে অংশ নিয়েছিল

১৯৯২ সালে এপ্সটিন ও ম্যাক্সউয়েল এপ্সটিনের Palm Beach বাড়িতে একসঙ্গে থাকতে শুরু করেএই বাড়ি ছিল বিলাসবহুল, কিন্তু বিলাসের নিচে ছিল এক অদ্ভুত, নিয়ন্ত্রিত, ভীতিকর পরিবেশবাড়ির কর্মচারীদের জন্য ম্যাক্সউয়েল ৫৮ পৃষ্ঠার একটি নিয়মবই তৈরি করেসেখানে কর্মচারীদের এপ্সটিনের চোখে চোখ রেখে তাকানো নিষিদ্ধ ছিলকোথাও অন্যদিকে তাকিয়ে উত্তর দিতে হতোঅতিথি এলে কোনো অবস্থাতেই কথা বলা যাবে নাএপ্সটিনের সামনে কিছু খাওয়া যাবে নাসুগন্ধি বা শরীরের লোশন ব্যবহার করা যাবে নাবাড়ির বিষয়ে বাইরে কোনো কথা বলা যাবে নাকর্মচারীদের গোপনীয়তার চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হতোঅর্থাৎ এই বাড়ি শুধু বাড়ি ছিল না, এটি ছিল একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত এলাকা, যেখানে বাইরের নিয়মের বদলে এপ্সটিন ও ম্যাক্সউয়েল-এর নিয়ম চলত

এই বাড়ির আরেক ভয়ংকর দিক ছিল গোপন ক্যামেরাঘড়ি, টিস্যু পেপারের বাক্স, বাথরুম, এমনকি সাবানের বাক্সের মতো জায়গায়ও গোপন ক্যামেরা থাকার কথা বলা হয়েছেএসব ক্যামেরার তথ্য আলাদা ঘরে DVD ও টেপ আকারে সংরক্ষণ করা হতো বলে অভিযোগঘরের মধ্যে এক কক্ষে সরাসরি রেকর্ডিং দেখা যেত, যেখানে বসে এপ্সটিন সবকিছু পর্যবেক্ষণ করত বলে তার বাড়ির ব্যবস্থাপক জুয়ান আদালতে উল্লেখ করেছেনএসব অভিযোগের সব অংশ একেক আদালতি নথিতে একেকভাবে এসেছেকিন্তু ধরন পরিষ্কারগোপনীয়তা দেওয়া ছিল মুখোশ, আসল উদ্দেশ্য ছিল নজরদারি, রেকর্ড, নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য ব্ল্যাকমেইল

বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে এপ্সটিন ও ম্যাক্সউয়েল মিলে শিল্প বিদ্যালয়, সংগীত বিদ্যালয়, গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প এবং আর্থিক বা মানসিকভাবে দুর্বল মেয়েদের লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করেযেসব মেয়ের পরিবারে সমস্যা আছে, যাদের টাকার প্রয়োজন আছে, যারা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যারা মডেলিং বা শিল্প জগতে ঢুকতে চায়, তাদের কাছে যাওয়া হতোপ্রথম দিনেই আক্রমণ করা হতো নাপ্রথমে তিন-চারবার ডাকা হতোকেনাকাটা করানো, সিনেমা দেখানো, কথা বলা, পরিবার পর্যন্ত পৌঁছানো, বড় বোনের মতো আচরণ করা, বিশ্বাস তৈরি করা, এসব ছিল মানসিকভাবে ফাঁদে ফেলার প্রাথমিক ধাপম্যাক্সউয়েল মেয়েদের বোঝাত, সে তাদের বড় বোনের মতোবাড়ির ভেতরে নগ্ন মেয়েদের ছবি লাগানো থাকতপুলের কাছে ম্যাক্সউয়েল হঠাৎ অর্ধনগ্ন হয়ে বসত বলে ভুক্তভোগীর বর্ণনায় এসেছে, যাতে মেয়েরা এসবকে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করেঅশালীন স্বভাবের খেলা ও কাজ করানো হতোবলা হতো, যে যত স্বচ্ছন্দ হবে, সে তত বড় পুরস্কার পাবে

এরপর মেয়েদের শ্রেণিবিভাগ করা হতোকে সহজে নিয়ন্ত্রণে আসবে, কে টাকার লোভে নরম হবে, কে ভয় পেলে চুপ থাকবে, কে ঝুঁকে পড়বে, কে পারিবারিক সমস্যার কারণে কথা বলবে না, কে মডেলিংয়ের স্বপ্নে ধরা দেবে, এসব দেখা হতোমডেলিং বা কাজের নামে অর্ধনগ্ন ছবি তোলানো হতোএগুলো দিয়ে মডেলিং বই নামে ফাইল বানানো হতো, যা পরবর্তী সময়ে গ্রাহকদের কাছে পাঠানো হতো বলে অভিযোগঅল্প সময়েই এই বাড়িতে বড় বড় রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, অর্থ-কারবারি ও উচ্চবিত্ত লোকদের আসা শুরু হয়

যেসব মেয়েকে তারা যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণযোগ্য ভাবত, ম্যাক্সউয়েল তাদের বাড়ির ম্যাসাজ কক্ষে নিয়ে যেতসেখানে এপ্সটিন আগে থেকেই ম্যাসাজ টেবিলের ওপর শুয়ে থাকতম্যাক্সউয়েল নাকি প্রথমে নিজে ম্যাসাজ করে দেখাত, তারপর মেয়েকে একই কাজ করতে বলা হতোএরপর এপ্সটিন তাদের যৌনভাবে শোষণ করত বলে বহু ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেনপরে মেয়েদের স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা, টাকা দেওয়া, ভয় দেখানো, বা উচ্চমূল্যের গ্রাহকদের কাছে পাঠানো হতোকেউ ভয় পেলে, মুখ খুলতে চাইলে বা পালাতে চাইলে কখনও টাকা দিয়ে চুপ করানো হতো, কখনও হুমকি দেওয়া হতোমার্কিন বিচার বিভাগের ২০১৯ সালের অভিযোগেও বলা হয়, কিছু ভুক্তভোগীকেই অন্য মেয়েদের আনতে টাকা দেওয়া হতো, যাতে নাবালিকা মেয়েদের সরবরাহ চলতে থাকে

এই যোগাযোগ-জালের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল ছিল একজন মেয়ের মাধ্যমে আরেক মেয়েকে আনার ব্যবস্থাকয়েকটি স্কুলে কম বয়সী মেয়েদের আনার জন্য ম্যাসাজের নামে ৩০০ ডলার প্রস্তাব করা হতোযদি কোনো মেয়ে আরেক মেয়েকে নিয়ে আসে, তাকে ২০০ ডলার দেওয়া হতোএতে একটি পিরামিড কৌশলের মতো ব্যবস্থা তৈরি হয়যে মেয়ে যত বেশি মেয়ে আনবে, তার তত বেশি টাকা হবেটাকার প্রয়োজন, অল্প বয়স, অপরাধের প্রকৃতি না বোঝা এবং সমবয়সীদের চাপ, এসব মিলিয়ে মেয়েরা ফাঁদে আটকে যেত

১৯৯৫ সালে প্রথম বড় সমস্যা শুরু হয়New York Academy of Art-এ এপ্সটিন ও ম্যাক্সউয়েল দান করত, যাতে সেখানে থাকা মেয়েদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা যায়সেখানে তাদের পরিচয় হয় মারিয়া ফার্মারের সঙ্গেপ্রথমে মারিয়ার প্রচুর প্রশংসা করা হয়তার পেইন্টিং কেনা হয়পরে শিল্প-পরামর্শদাতার নামে তাকে কাজ দেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা শুরু হয়কাজ শুরু করার পর মারিয়া বাড়ির ভেতরে দেখেন, ছোট ছোট স্কুলের মেয়েরা লাইনে এসে ঢুকছেকেউ কেউ কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যাচ্ছেমারিয়া ম্যাক্সউয়েল-কে জিজ্ঞেস করেন, এসব কেন হচ্ছেম্যাক্সউয়েল তাকে বলে, তারা অল্প বয়সে মডেলিং পেশায় ঢুকতে আসে, আর যাদের নির্বাচন হয় না তারা কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়মারিয়া তখন কথাটি ছেড়ে দেন

একই সময় মারিয়া একদিন এপ্সটিনের অফিসে যানসেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে থেকেই বসে ছিলেনমারিয়া ঢোকার পর ট্রাম্প তার পায়ের দিকে তাকান বলে মারিয়া-র আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি আছেট্রাম্প এই দাবি অস্বীকার করেছেনএরপর এপ্সটিন এসে নাকি বলে, না, না, এটা তোমার জন্য নয়মারিয়া দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে থাকলে ট্রাম্প নাকি বলেন, আমি ভেবেছিলাম সে ১৬ বছরের

ম্যাক্সউয়েল পরে মারিয়া-র ছোট বোন এন্নী ফার্মারকেও শিক্ষামূলক কর্মসূচির নামে ডেকে আনেঅভিযোগ অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যে এন্নীকেও মানসিকভাবে ফাঁদে ফেলা হয় এবং ম্যাসাজ কক্ষে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয়এন্নী  প্রথমে চুপ থাকে, কারণ সে ভাবে তার বোনের চাকরি চলে যেতে পারেএকই মাসে মারিয়া-কেও নির্যাতনের চেষ্টা হয় বলে অভিযোগমারিয়া কোনোভাবে নিজেকে এক কক্ষে বন্ধ করে বাঁচিয়ে নেনপরে মারিয়া ও এন্নী  নিজেদের অভিজ্ঞতা পরিবারকে জানান১৯৯৬ সালের ২৯ আগস্ট পুরো Farmer পরিবার এপ্সটিন ও ম্যাক্সউয়েল-এর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেকিন্তু এপ্সটিন আগে থেকেই Palm Beach Police Department-এ বড় অঙ্কের দান দিচ্ছিল এবং তার যোগাযোগ অনেক বেড়ে গিয়েছিল, ফলে পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগপরের সপ্তাহে, ১৯৯৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তারা FBI-এর কাছে যায়সেখানেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নিপরবর্তী অনুসন্ধানে মারিয়া ফার্মারকে এপ্সটিন-এর বিরুদ্ধে প্রথমদিককার গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগকারীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে

১৯৯৭ সালের ১২ মে আলিসিয়া আরডেন নামে আরেক নারীকে মডেলিংয়ের নামে ডেকে নির্যাতনের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠেতিনিও পুলিশে অভিযোগ করেনএমন একাধিক ফোনকল ও অভিযোগ নিয়মিত পুলিশ স্টেশনে যেতে থাকেপুলিশ এক-দুবার আনুষ্ঠানিকভাবে যায়, কিন্তু বড় কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছেএই নীরবতাই এপ্সটিনকে আরও সাহসী করে

এই সময় Mar-a-Lago রিসোর্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর একটি আসরে এপ্সটিন ও ম্যাক্সউয়েল আমন্ত্রিত ছিলওই আসর সম্পর্কেও পরবর্তী সময়ে এক নারী অভিযোগ করেন, ট্রাম্প ও এপ্সটিন তাকে শোষণ করেছিলেন এবং পরে ভয় দেখানো হয়েছিলএই অভিযোগ জনসমক্ষে অনেক পরে আসে এবং ট্রাম্প তা অস্বীকার করেছেনতাই এটিও অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখযোগ্যতবে ট্রাম্প নিজে New York Magazine-কে বলেছিলেন, তিনি এপ্সটিন-কে ১৫ বছর ধরে চেনেন, সে terrific guy, এবং তার সুন্দর ও অল্পবয়সী মেয়ে পছন্দ, এমন মন্তব্য বহু প্রতিবেদনে উদ্ধৃত হয়েছেএই অংশে মূল শিক্ষা হলো, এপ্সটিন ধীরে ধীরে এমন পরিসরে ঢুকে গিয়েছিল যেখানে সমাজের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষরা তার সঙ্গে প্রকাশ্যে চলাফেরা করত

Mar-a-Lago-এর পোশাক পরিবর্তন কক্ষে ১৬ বছর বয়সী ভার্জিনিয়া গুঁফোরে কাজ করতেনম্যাক্সউয়েল তার দিকে নজর দেয়সে ভার্জিনিয়ার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে এবং বলে, তাদের একজন ম্যাসাজ করা মেয়ে দরকারঅভিজ্ঞতা না থাকলেও চলবেএক ম্যাসাজের জন্য ২০০ ডলার দেওয়া হবে এবং বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার সুযোগও মিলবেভার্জিনিয়ার অর্থকষ্ট ছিল, তাই তিনি রাজি হনকিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, কত বড় ফাঁদে তিনি ঢুকছেনপরে একই ধরনে তাকে মানসিকভাবে ফাঁদে ফেলা হয়, ম্যাসাজ কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং এপ্সটিন ও ম্যাক্সউয়েল তাকে নির্যাতন করে বলে ভার্জিনিয়া অভিযোগ করেন

এরপর ভার্জিনিয়াকে সিনড্রেলার মতো সাজিয়ে বলা হয়, আজ তোমাকে তোমার হ্যান্ডসাম প্রন্সের সঙ্গে দেখা করানো হবেপরে তাকে ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথের ছেলে প্রিন্স এন্ড্রুর কাছে নেওয়া হয় বলে ভার্জিনিয়া অভিযোগ করেনতিনি অভিযোগ করেন, প্রিন্স এন্ড্রু তাকে একাধিকবার ধর্ষন করেপ্রিন্স এন্ড্রু এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে২০২২ সালে ভার্জিনিয়া ও প্রিন্স এন্ড্রুর দেওয়ানি মামলা মীমাংসা হয়, যেখানে এন্ড্রু অপরাধ স্বীকার করেনি, কিন্তু ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়ার অবস্থাকে স্বীকার করে তার দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অনুদানের ব্যবস্থা হয়

ভার্জিনিয়া আরও দাবি করেছিলেন, তাকে বিল ক্লিন্টনের কাছেও পাঠানো কারণ বিল ক্লিন্টনের এপ্সটিন-এর বিমানে যাত্রার রেকর্ড আছে, যদিও ক্লিন্টনের পক্ষ থেকে দ্বীপে যাওয়ার দাবি অস্বীকার করা হয়েছে

ভার্জিনিয়া ও অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে শুধু যৌন শোষণের অভিযোগই ছিল না, বরং কোনো কারণ ছাড়াই মেয়েদের চাবুক দিয়ে মারা, শরীরে দাগ করা এবং Lolita নামে বিতর্কিত উপন্যাসের উদ্ধৃতি মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশে লিখে গ্রাহকদের কাছে পাঠানোর মতো ঘৃণ্য কাজের অভিযোগও আছেললিতা উপন্যাসটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের প্রতি বিকৃত আসক্তির গল্প ঘিরে বিতর্কিতএপ্সটিন নাকি এই উপন্যাসে এতটাই আচ্ছন্ন ছিল যে সেটির সংকেত বা উদ্ধৃতি মেয়েদের শরীরে লিখত

এই সময় এপ্সটিনের সামনে দুই বড় সমস্যা দাঁড়ায়প্রথম সমস্যা, আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে হোটেল, প্রাসাদোপম বাড়ি ও বিলাসবহুল রিসোর্টে অপরাধ চালাতে গেলে কর্মচারী, সেবক, ক্যামেরা, প্রতিবেশী, পুলিশ এবং আদালতের ঝুঁকি থাকেদ্বিতীয় সমস্যা, আমেরিকার ভেতরে ম্যাক্সউয়েল ও এপ্সটিন-এর বিরুদ্ধে মেয়েদের অভিযোগ দ্রুত বাড়ছিলআইনি চ্যালেঞ্জ ও জনসমক্ষে নজরদারি ধীরে ধীরে তার জন্য মাথাব্যথা হয়ে উঠছিলএই সময় The Villa Report-এর একটি নিবন্ধে এপ্সটিন Little Saint James নামে একটি ব্যক্তিগত দ্বীপ বিক্রির খবর দেখেএটি U.S. Virgin Islands অঞ্চলে Saint Thomas ও Saint John-এর মাঝামাঝি ছোট দ্বীপ১৯৯৮ সালের এপ্রিলে L.S.J. LLC নামে কোম্পানির মাধ্যমে দ্বীপটি ৭.৯৫ মিলিয়ন ডলারে কেনা হয়, এবং নথিতে এপ্সটিন-কে ওই কোম্পানির একমাত্র সদস্য বলা হয়েছে

দ্বীপ কেনার পর এপ্সটিন-এর লক্ষ্য ছিল এমন এক ব্যক্তিগত রাজ্য বানানো, যেখানে বড় মানুষরা নিজেদের দুনিয়া থেকে দূরে এসে কোনো বাইরের নজরদারি ছাড়া যা ইচ্ছা করতে পারেসে প্রাকৃতিক গাছপালা সরিয়ে চারপাশে বড় বড় পামগাছ লাগায়, যাতে দ্বীপের ভেতর দেখা না যায়পুরো দ্বীপকে অতি বিলাসবহুল গন্তব্য বানানো হয়বাইরে থেকে এটি বিলিয়নিয়ারদের খেলার জায়গা মনে হতোব্যক্তিগত পথ, নিষিদ্ধ প্রবেশ এলাকা, আলাদা ভবন, গোপনীয়তাকেন্দ্রিক নকশা, সব এমনভাবে করা হয় যাতে বাইরে কোনো কথা না যায়আশপাশে ডুবুরি দেখা গেলেও পাহারাদার গিয়ে তাড়িয়ে দিতদ্বীপের কার্যকলাপ নজরে রাখার জন্য গোপন ক্যামেরা বসানো হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে, যাতে ধনী লোকদের গোপন তথ্য এপ্সটিন-এর কাছে থাকে

দ্বীপের নির্মাণকাজ শেষ হলে পুরোনো কর্মীদের সরিয়ে ম্যাক্সউয়েল নিজে সাউথ আফ্রিকা গিয়ে ৭০ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে দ্বীপের কর্মী নিয়োগ করেদ্বীপে মেয়েদের আনার জন্য আলাদা কার্যব্যবস্থা তৈরি হয়প্রথমে যোগাযোগের জায়গা থাকত আমেরিকায় এপ্সটিন-এর বাড়িসেখানে স্কুল ও কলেজের মেয়েদের মানসিকভাবে ফাঁদে ফেলা হতোতারপর তাদের Saint Thomas-এর Cyril E. King Airport-এ আনা হতোসেখান থেকে এপ্সটিন-এর দ্বীপে নেওয়া হতোCustoms and Border Protection কর্মকর্তাদের সঙ্গে এমন ব্যবস্থা ছিল যে মেয়েদের আসা-যাওয়ায় প্রশ্ন করা হতো নাএমনকি একদিন এপ্সটিন ১১ বছর বয়সী এক মেয়েকে ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারে বসিয়ে নিয়ে গেলেও প্রশ্ন হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে

আমেরিকার বাইরে থেকে মেয়েদের আনার জন্যও ব্যবস্থা করা হয়েছিলH1B ভিসার একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি অপব্যবহার করে বাইরে থেকে মেয়েদের আনা হতো বলে দাবি করা হয়কাউকে মডেলিং কাজের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডাকা হতোকিন্তু ভিসা-সংক্রান্ত ঝামেলা ও মেয়েদের নিবন্ধন থাকার কারণে ঝুঁকি বাড়ছিলতাই এপ্সটিন নাকি মাইলস আলেকজেন্ডার নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে, যাতে মেয়েদের ভিসা ছাড়াই নৌকায় করে চোরাইভাবে আনা যায় এবং কোনো নিবন্ধন না থাকেকিন্তু শেষ পর্যন্ত মাইলস আলেকজেন্ডার রাজি না হওয়ায় পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়

যে মেয়ে একবার দ্বীপে পৌঁছাত, তার জন্য দ্বীপটি খোলা কারাগার হয়ে যেত বলে ভুক্তভোগীর বর্ণনায় এসেছেনামার পর পাসপোর্ট, ফোন, ইমেইল, পরিচয়পত্র, পাসওয়ার্ড নেওয়া হতো বলে অভিযোগস্বাস্থ্য পরীক্ষা করে চিকিৎসা-নথি রাখা হতোএক ১৫ বছরের মেয়ে একজন ধনী অতিথির কাছে যেতে অস্বীকার করলে তার খাবার বন্ধ করা হয় বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়সে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে খোলা সাগরে ঝাঁপ দেয়কিন্তু পাহারাদার তাকে ধরে ফিরিয়ে আনে এবং আবার অতিথির সামনে পাঠানো হয় বলে অভিযোগএইসব ঘটনা শোনা যায় ভুক্তভোগীর বর্ণনা ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে

এপ্সটিন তার দ্বীপে শুধু যোগাযোগ-জাল ও পরিচিতির ভিত্তিতে কাউকে ঢুকতে দিতঅতিধনী ও ক্ষমতাবান অতিথিদের বিমানবন্দর থেকে সাধারণভাবে আনা হতো নাতাদের জন্য ছিল ব্যক্তিগত জেটজেটটি বিশেষভাবে তৈরি ছিল, তার ভেতরে বিছানা ছিল, যাত্রার সময়েও দলগত যৌন কার্যকলাপের অভিযোগ আছেএই ব্যক্তিগত জেট নিয়ে গণমাধ্যম ভেতরে ভেতরে জানততাই আমেরিকান গণমাধ্যমে এর ডাকনাম হয় ললিতা এক্সপ্রেসফ্লাইট লগে অনেক বিখ্যাত মানুষের নাম এসেছে, কিন্তু ফ্লাইটে থাকা মানেই অপরাধ নয়অপরাধ প্রমাণের জন্য আদালতি প্রমাণ লাগেতবে এ কথা অস্বীকার করা কঠিন যে এপ্সটিন-এর ব্যক্তিগত ভ্রমণ-জাল তাকে ক্ষমতাবানদের কাছে অস্বাভাবিকভাবে কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল আর এই ফ্লাইট লগ প্রসঙ্গে বিল ক্লিন্টনের নাম বারবার আলোচনায় আসে

এপ্সটিন-এর সাক্ষাৎ, ভ্রমণ, প্রভাবশালী যোগাযোগ এবং মেয়েদের চলাচল সামলানোর কাজে লেসলি গ্রফ নামে এক সহকারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেনএপ্সটিন-সংক্রান্ত নথিতে এই নাম বারবার এসেছেকোন যোগাযোগ এপ্সটিন-এর জন্য দরকারি, কে ধনী, কে বিজ্ঞানী, কার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঠিক করতে হবে, কে দ্বীপে আসবে, কোন মেয়ের ভ্রমণ ঠিক করতে হবে, এইসব দাপ্তরিক কাজ তার মাধ্যমে চলত বলে অভিযোগ

২০০৫ সালের মার্চে বড় ভাঙন শুরু হয়Royal Palm Beach High School-এর মেয়েদের এপ্সটিন ও ম্যাক্সউয়েল দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্যবস্তু করছিলওই স্কুলে হালে নামে এক মেয়ে তার বন্ধুকে বলে, একটি বাড়িতে গিয়ে ম্যাসাজ দিলে ৩০০ ডলার পাওয়া যায়হালে বন্ধুকে নিয়ে যেতে চাইছিল, কারণ একজনের মাধ্যমে আরেকজনকে আনার ব্যবস্থা ছিলকোনো মেয়ে আরেক মেয়েকে নিয়ে গেলে সে ২০০ ডলার পেতহালে তার বন্ধুকে নিয়ে যায়সেখানে এপ্সটিন দুজনকেই শোষণ করে বলে অভিযোগযে মেয়ে গিয়েছিল সে ৩০০ ডলার পায়, হালে পায় ২০০ ডলারধীরে ধীরে এই মেয়ের মাধ্যমে মেয়ে আনার ব্যবস্থা পুরো স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে

স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিষয়টি জানতে পেরে এক মেয়েকে ডেকে তার ব্যাগ পরীক্ষা করেনপার্সের ভেতর ৩০০ ডলার পাওয়া যায়প্রধান শিক্ষক চিন্তিত হয়ে মেয়েটির সৎমাকে ডাকেন এবং পুরো বিষয় জানানএরপর স্কুল কর্তৃপক্ষ ও আশপাশের লোকেরা ২০০৫ সালের ১৪ মার্চ পুলিশের কাছে অভিযোগ করেজনচাপ তৈরি হয়প্রথমবার পুলিশ অভিযোগ নিবন্ধন করে এবং তদন্ত শুরু করেস্কুলের যেসব মেয়ে এপ্সটিন-এর কাছে গিয়েছিল তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়জানা যায়, গত দুই বছর ধরে এপ্সটিন অনেক মেয়েকে নির্যাতন করেছে বলে অভিযোগ

পুলিশ এরপর হালে-কে দিয়ে এপ্সটিন-এর বাড়িতে ভুয়া ফোন করায়বলা হয়, সে আরেক মেয়ের নাম দিতে চায়২০০৫ সালের ৫ এপ্রিল সকাল ১১টার সাক্ষাতের সময় ঠিক করা হয়এর উদ্দেশ্য ছিল এপ্সটিন-এর বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করাএকই সঙ্গে পুলিশ বর্জ্য সংগ্রহকারী সেবার একজনকে ব্যবহার করে এপ্সটিন-এর বাড়ির ময়লা সংগ্রহ করায়সেই ময়লা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ৫ এপ্রিলের সাক্ষাতের স্লিপ পাওয়া যায়তাতে হালে এবং S.G. আদ্যাক্ষরসহ সাক্ষাতের বিবরণ ছিলএতে পুলিশের হাতে প্রমাণ আসে

তদন্ত শেষে ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর সকাল ৯টা ৩৬ মিনিটে পুলিশ এপ্সটিন-এর বাড়িতে অভিযান চালায়ভুক্তভোগীরা যেভাবে ম্যাসাজ কক্ষ ও বাড়ির বিন্যাস বর্ণনা করেছিল, তা অনেকটা মিলে যায় বলে তদন্তে উঠে আসেবাড়িতে ছবি, যৌন সামগ্রী, স্কুলের মেয়েদের তালিকা, সাক্ষাতের বিবরণ, বিচ্ছিন্ন করা ক্যামেরা এবং অন্যান্য জিনিস পাওয়া যায়কিন্তু তদন্তকারীরা দেখেন, ক্যামেরাগুলো বিচ্ছিন্ননজরদারির ভিডিও সংরক্ষণ করা কম্পিউটার নেইশুধু তার আছেএর অর্থ, পরোয়ানার খবর এপ্সটিন আগেই পেয়েছিল বলে সন্দেহ তৈরি হয়এপ্সটিন রে বা রেইলি নামের ব্যক্তিগত গোয়েন্দার মাধ্যমে মূল কম্পিউটার ও নজরদারির ভিডিও সরিয়ে আমেরিকার ছয়টি আলাদা অঙ্গরাজ্যের গোপন সংরক্ষণাগারে লুকিয়ে রাখে বলে অভিযোগপরে Uncle Bob’s Storage কোম্পানির বিবৃতি থেকে বিষয়টি সামনে আসে বলে দাবি করা হয়েছেতবু অভিযান শেষে ভুক্তভোগীর বিবৃতি ও পাওয়া প্রমাণ মামলা শুরু করার জন্য যথেষ্ট ছিল

২০০৮ সালের ৩০ জুন এপ্সটিন-কে দোষী ধরে ১৮ মাসের সাজা দেওয়া হয়কিন্তু তার অপরাধের পরিমাণের তুলনায় এই সাজা ছিল অস্বাভাবিকভাবে কমএই সমঝোতামূলক দণ্ডচুক্তি পরবর্তী সময়ে প্রচণ্ড সমালোচিত হয়Miami Herald-এর সাংবাদিক জুলিয়া কে ব্রাউন তার Perversion of Justice অনুসন্ধানে দেখান, কীভাবে এপ্সটিনের মতো ধনী অপরাধী আইনি সুবিধা পেয়েছিল এবং বহু ভুক্তভোগীকে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল

জেলে গিয়ে এপ্সটিন সাধারণ বন্দির মতো আচরণ পায়নি বলে বহু প্রতিবেদনে এসেছেসাধারণ অপরাধী হলে তাকে কঠোর বন্দিত্বে রাখা হতোকিন্তু এপ্সটিন-কে আলাদা কক্ষ দেওয়া হয়, যা অনেক সময় খোলা থাকতসে বিশেষ ব্যবস্থাপনা এলাকায় একা টিভি দেখতজেলের গাড়ি রাখার জায়গায় একটি গাড়ি রাখা থাকত, যাতে বিছানা ছিলঅভিযোগ অনুযায়ী, সে ওই গাড়িতে মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটাত এবং কর্মকর্তারা দূরে থাকতএক নারী তার বিবৃতিতে এই বিষয় উল্লেখ করেছেন বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়সে জেলের দোকান থেকে শিশু মাপের নারীদের অন্তর্বাস কিনত বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়

২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর এপ্সটিন Florida Science Foundation-এর কাজের অজুহাতে জেল থেকে কাজের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি চায়তা অনুমোদিত হয়এরপর সে সপ্তাহে ছয় দিন, সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত, দিনে ১২ ঘণ্টা কাজের নামে জেল থেকে বাইরে যেতে পারতকার্যত সে শুধু রাতে ঘুমাতে জেলে ফিরতএমন গুরুতর অপরাধের পরও সে বাইরে ঘুরত এবং একই ধরনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল বলে অভিযোগজেলের নিয়ম ঠিকমতো না মানলেও ২০০৯ সালের ২ জুলাই ভালো আচরণ দেখিয়ে তাকে মাত্র ১৩ মাসে মুক্তি দেওয়া হয়

মুক্তির পরও অনেক ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে মামলা করছিলেনকিছু সাংবাদিকও তার বিষয়ে প্রতিবেদন করছিলেনএপ্সটিন সাংবাদিকদের ভয় দেখাতকারও বাড়ির সামনে কাটা বিড়ালের মাথা ফেলে রাখা, কারও কাছে গুলি বা অস্ত্র-সংক্রান্ত হুমকি পাঠানো, এমন অভিযোগও আসেউদ্দেশ্য ছিল, সাংবাদিকরা যেন তার বিরুদ্ধে লেখা বন্ধ করেকিন্তু তবু সাংবাদিকতা থামেনি

মুক্তির পরও এপ্সটিন তার অপরাধী মনোভাব বদলায়নি বলে অভিযোগLittle Saint James-এর পাশের Great Saint James দ্বীপ কিনে সেটির নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা করেএকই ধরনের কাঠামো সেখানে বানাতে চেয়েছিলপরবর্তী প্রকাশিত নথি ও প্রতিবেদনে দেখা যায়, এপ্সটিন তার Caribbean সম্পত্তিগুলোতে বড় ধরনের বিলাসবহুল নতুন নকশার পরিকল্পনা করছিলLittle Saint James ১৯৯৮ সালে ৭.৯৫ মিলিয়নে কেনা হয়েছিল, এবং পরে Great Saint James-ও তার সম্পত্তির তালিকায় যুক্ত হয় বলে প্রতিবেদনে এসেছে

২০১৮ সালের ২৮ নভেম্বর এপ্সটিন সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়Miami Herald-এর সাংবাদিক জুলিয়া কে ব্রাউন বহু ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে, নিজে অনুসন্ধান করে Perversion of Justice নামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেনএতে বলা হয়, আমেরিকার আদালত ও FBI-সহ ব্যবস্থার কিছু অংশ আইনকে খেলায় পরিণত করে এপ্সটিন-কে রক্ষা করেছেপ্রতিবেদন বের হওয়ার পর পুরো আমেরিকায় তুমুল আলোড়ন ওঠেজনমত গর্জে ওঠে২০১৮ সালের ৫ ও ৬ ডিসেম্বর রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় পক্ষের চাপের ফলে Department of Justice এপ্সটিন তদন্ত পুনরায় সামনে আনে

এইবার ভুক্তভোগীরা আরও খোলামেলা সামনে আসেনসাক্ষাৎকার দেনম্যাসাজ, নগদ টাকা দেওয়া, মেয়েদের সংগ্রহ, একজনের মাধ্যমে আরেকজনকে আনা, ভ্রমণের ব্যবস্থা, নির্যাতনের ধরন, সব বিস্তারিত আলোচনায় আসে২০১৯ সালের ৬ জুলাই বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে এপ্সটিন আবার গ্রেফতার হয়২০১৯ সালের ৮ জুলাই Manhattan federal court-এ তার বিরুদ্ধে নাবালিকা যৌন পাচার এবং নাবালিকা যৌন পাচারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়DOJ-এর অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে এপ্সটিন নাবালিকা মেয়েদের টাকা দিয়ে যৌন কাজে প্রলুব্ধ করত এবং কয়েকজন ভুক্তভোগীকে অন্য নাবালিকা মেয়েদের আনতে টাকা দিত

এপ্সটিনের গ্রেফতার মোড় ঘুরিয়ে দেয়পুরোনো অভিযোগ আবার জাতীয় আলোচনায় ফিরে আসেসরকারি কৌঁসুলিরা বিস্তৃত তদন্তের ইঙ্গিত দেনএকই সময়ে এপ্সটিন-এর ম্যানহাটনের বাড়ি, দ্বীপ এবং অন্যান্য সম্পত্তিতে অভিযান হয়পুলিশ নানা CD, নগ্ন ছবি, প্রমাণ, ভুয়া অস্ট্রিয়ান পাসপোর্ট এবং অদ্ভুত জিনিস পায়তার বাড়িতে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ছবি দিয়ে গর্ভনিরোধক রাখার দাবি এবং বিল ক্লিন্টন-কে নারীর পোশাকে দেখানো ছবি পাওয়ার কথাও আলোচিত হয়এসব বস্তু একা অপরাধ প্রমাণ করে না, কিন্তু এপ্সটিনের অদ্ভুত ক্ষমতামনস্ক, অপমানমূলক ও বিকৃত সামাজিক খেলা বোঝাতে এগুলো আলোচনায় এসেছে

প্রথমবার জেলের অভিজ্ঞতা এপ্সটিন-এর জন্য আরামদায়ক ছিলকিন্তু ২০১৯ সালে জনরোষ এত বেশি ছিল যে এবার তাকে আগের মতো সুবিধা দেওয়া সহজ হয়নিসে টাকা, ক্ষমতা, আইনজীবী, প্রভাব সব ব্যবহার করার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল২০১৯ সালের ১০ আগস্ট সকাল ৬টা ৩০ মিনিটের দিকে এপ্সটিন নিজের কক্ষে মৃত পাওয়া যায়Manhattan U.S. Attorney-এর বিবৃতি অনুযায়ী, তাকে কক্ষে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় এবং প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়কিন্তু মৃত্যুর পরিস্থিতি সন্দেহে ভরা ছিলএকই সময়ে ক্যামেরার সমস্যা, পাহারাদারের ব্যর্থতা, নজরদারির ঘাটতি, দায়িত্বহীনতা, সব মিলে সন্দেহ আরও বাড়েDOJ Inspector General-এর প্রতিবেদনে এপ্সটিন-এর হেফাজত, যত্ন ও তত্ত্বাবধান নিয়ে গুরুতর ব্যর্থতার কথা আসেদুই কারা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নথি জাল করার অভিযোগও আনা হয়

মৃত্যুর পর জনতার মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়কেউ বলে, সে আত্মহত্যা করেছেকেউ বলে, তাকে মরতে দেওয়া হয়েছেকেউ বলে, ক্ষমতাবান লোকেরা নিজেদের বাঁচাতে তাকে সরিয়ে দিয়েছেকিছু বন্দি পরে দাবি করেন, ভোরে তারা একজন কর্মকর্তাকে বলতে শুনেছিলেন, তুমি ওই লোককে মেরে ফেলেছএই ধরনের বক্তব্য প্রমাণিত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়, কিন্তু জনসন্দেহের অংশ হিসেবে উল্লেখযোগ্যসরকারি অবস্থান আত্মহত্যার দিকে, কিন্তু অবহেলা ও ক্যামেরা-ব্যর্থতা জনবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়

২০২০ সালের ২৯ জুন ইসরাইলি ক্যানাডিয়ান ব্যবসায়ী আরি ব্যান মেনাশী একটি সাক্ষাৎকারে দাবি করে, এপ্সটিন ও ম্যাক্সউয়েল ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের জন্য কাজ করত এবং আমেরিকার বড় বড় মানুষের ভিডিও ফাঁদ তৈরির জন্য বানাতো, যাতে ইছরাইল আমেরিকাকে প্রভাবিত করতে পারেFBI report number 90314 সম্পর্কেও জোরালো দাবি রয়েছে, যেখানে এপ্সটিন-কে মোসাদ এজেন্ট বলা হয়েছেআর গোপন ক্যামেরা, ক্ষমতাবান অতিথি, গোপন ভিডিও এবং ব্ল্যাকমেইলের সম্ভাবনা নিয়ে অভিযোগগুলো এই তত্ত্বকে জনতার কাছে আলোচনাযোগ্য করেছেতবে এগুলোও দাবির পর্যায়ে উল্লেখ করা জরুরি

এপ্সটিন মরলেও কাহিনী শেষ হয়নিগিজলাইন ম্যাক্সউয়েল ২০২০ সালে গ্রেফতার হয় এবং পরে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০২২ সালে ২০ বছরের সাজা পায়DOJ জানায়, ম্যাক্সউয়েল নাবালিকা মেয়েদের বিশ্বাস অর্জন করে এপ্সটিন-এর ফাঁদে পৌঁছে দিত এবং তাদের বিভিন্ন বাড়িতে ভ্রমণে নিয়ে যেত, যাতে তারা মানসিক ফাঁদ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যদি যোগাযোগ-জাল এত বড় হয়, তাহলে শুধু ম্যাক্সউয়েল কেন? যারা গিয়েছিল, যারা জানত, যারা চুপ ছিল, যারা সুবিধা পেয়েছিল, তাদের কী হলো?

এপ্সটিন ফাইলস নিয়ে জনচাপ বাড়তেই থাকেমানুষ দাবি করে, তদন্তের ছবি, নথি, ইমেইল, ভ্রমণ রেকর্ড, প্রমাণ, সব প্রকাশ করা হোক২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর এপ্সটিন Files Transparency Act আইনে পরিণত হয়এর ভিত্তিতে DOJ-কে এপ্সটিন সম্পর্কিত অগোপনীয় রেকর্ড, নথি, যোগাযোগ ও তদন্ত-উপাদান প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়FactCheck.org ২০২৫ সালের নভেম্বরে লিখেছে, হাউজ প্রায় সর্বসম্মতভাবে এই প্রকাশ-বিল পাস করে এবং পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেটিতে স্বাক্ষর করেDOJ পরে এপ্সটিন লাইব্রেরিতে-ও প্রকাশিত নথি প্রকাশ করে, যেখানে Data Set 1 থেকে Data Set 12 পর্যন্ত উপাদান রাখা হয়DOJ পেজের সর্বশেষ হালনাগাদ ২০২৬ সালের ৯ জুন দেখা যায় এবং সেখানে এপ্সটিন Library, DOJ Disclosures ও House Disclosures আলাদা করে রাখা আছে২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি DOJ জানায়, এপ্সটিন Files Transparency Act অনুযায়ী প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন পৃষ্ঠার প্রাসঙ্গিক উপাদান প্রকাশ করা হয়েছে

এই তথ্যভাণ্ডারগুলোর মধ্যে এপ্সটিন-এর ম্যানহাটনের বাড়ি, ভার্জিন আইসল্যান্ডের স্থাপনা, ছবি, হাতে লেখা নোট, ইমেইল এবং প্রভাবশালী যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা ওঠেData Set 9 নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়, কারণ সেখানে এপ্সটিন-এর ব্যক্তিগত ও প্রভাবশালী যোগাযোগের ইমেইলসমূহ ছিলএই ইমেইল নথিগুলোতে নানা বড় নাম আসে, যাদের সঙ্গে এপ্সটিন কথা বলছিল, তথ্য বিনিময় করছিল বা যোগাযোগ রাখছিলবিল গেটস সম্পর্কেও একটি খসড়া ইমেইল আলোচনায় আসে, যেখানে এপ্সটিন দাবি করেছিল রাশিয়ান মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগের পর গেটস যৌন রোগে আক্রান্ত হয়েছিল এবং এন্টবায়োটিক্স এপ্সটিন-এর মাধ্যমে চেয়েছিলো

নাস্তিক স্টেফেন হকিংসের নামও নথি ও অভিযোগের আলোচনায় আসেভার্জিনিয়া সম্পর্কিত অভিযোগের আলোচনায় স্টেফেন হকিংসের দ্বীপ সফর এবং গ্রুপসেক্স কার্যকলাপের প্রসঙ্গ এসেছেএটিও অভিযোগ ও আলোচনার ভাষায় উল্লেখযোগ্য, প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে নয়

এপ্সটিনের আরেক অদ্ভুত মানসিক বিকারগ্রস্ত দিক ছিলো কথিত মানব-উন্নয়নবাদ, জেনেটিকস এবং নিজের DNA ছড়িয়ে দেওয়ার বিকৃত স্বপ্নসে শিক্ষক, গবেষক, বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাইতআসরে সে এসব নিয়ে আলোচনা করতবিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, নিউ ম্যাক্সিকোর Zorro Ranch-এ সে এক সময় ২০ জন নারীকে নিজের DNA দিয়ে গর্ভবতী করাতে চেয়েছিলো, যাতে তার জিন বহনকারী নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়এই ধারণাকে বেবে রাঞ্চ ধরনের পরিকল্পনা বলা হয়The Guardian ২০১৯ সালে প্রতিবেদন করে, এপ্সটিন জেনেটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথাকথিত উন্নত মানবজাতি ধারণায় আগ্রহী ছিলএই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল বলে প্রমাণ নেই, কিন্তু তার অহংকার, বিজ্ঞানকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করার মনোভাব এবং নিজেকে মানবজাতির ওপর বসানোর মানসিকতা বোঝাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ

এই পুরো কাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ শিক্ষা হলো, এপ্সটিন শুধু একজন ব্যক্তি ছিল নাসে ছিল একটি পদ্ধতির নামসে মেধা ব্যবহার করেছে দরজা খোলার জন্যটাকা ব্যবহার করেছে আইন ও সম্মান কেনার জন্যদান ব্যবহার করেছে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার জন্যতরুণী ও নাবালিকা মেয়েদের ব্যবহার করেছে ধনী মানুষদের দুর্বল করার জন্যগোপন ক্যামেরা ব্যবহার করেছে গোপনীয়তার নামে নিয়ন্ত্রণের জন্যদ্বীপ ব্যবহার করেছে আইন ও সমাজের চোখ থেকে দূরে থাকার জন্যব্যক্তিগত জেট ব্যবহার করেছে চলাচল ও প্রবেশাধিকারের জন্যআইনজীবী ব্যবহার করেছে বিচারকে নরম করার জন্যআর ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করেছে নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য

এপ্সটিনের সঙ্গে যার নাম এসেছে, সবাই অপরাধী প্রমাণিত নয়এটাও সত্যকিন্তু এটাও সত্য, একজন দণ্ডিত যৌন অপরাধী কীভাবে এত বড় বড় মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করল, কীভাবে বছরের পর বছর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বাঁচল, কীভাবে ২০০৮ সালে এত নরম চুক্তি পেল, কীভাবে জেল থেকে কাজের নামে বাইরে যাওয়ার অনুমতি পেল, কীভাবে আবার ২০১৯ পর্যন্ত অভিজাত বৃত্তে ছিল, এসব প্রশ্ন আজও নৈতিকভাবে কাঁটার মতো বিঁধে আছে

এই কাহিনী আমাদের শেখায়, অপরাধ সবসময় অন্ধকার গলিতে হয় নাঅনেক সময় অপরাধ হয় দামি বাড়িতে, ব্যক্তিগত দ্বীপে, বিলাসবহুল রিসোর্টে, দানের রাতের খাবারে, শিল্প একাডেমির ছদ্মবেশে, বিজ্ঞান-অর্থায়নের আড়ালে, ব্যক্তিগত জেটের বিছানায়, আর নিরাপত্তা ক্যামেরায় ভরা প্রাসাদোপম বাড়ির বন্ধ দরজার পেছনেদরিদ্রের অপরাধ দ্রুত ধরা পড়ে, কিন্তু ধনীর অপরাধ অনেক সময় সুগন্ধি, স্যুট, দান, আইনি ভাষা, জনসংযোগের বিবৃতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার আড়ালে ঢেকে থাকে

শেষ পর্যন্ত এপ্সটিন মৃতম্যাক্সউয়েল জেলেকিছু নথি প্রকাশিতকিছু প্রশ্নের উত্তর আছেঅনেক প্রশ্ন এখনও নেইভুক্তভোগীরা বহু বছর কথা বলেছেন, অনেক সময় কেউ শুনেনিসাংবাদিকরা খুঁড়েছেন, জনতা চাপ দিয়েছে, আদালত নড়েছে, DOJ নথি প্রকাশ করেছেকিন্তু মূল প্রশ্ন এখনো দাঁড়িয়ে আছেকারা তাকে রক্ষা করেছিল? কারা জানত? কারা চুপ ছিল? কারা সুবিধা নিয়েছিল? কারা ভয় পেয়েছিল? আর সমাজ কি সত্যিই এমন আরেক এপ্সটিন তৈরি হওয়া ঠেকাতে প্রস্তুত?

এপ্সটিনের কাহিনী তাই শুধু এক ধনী পাপিষ্ঠের জীবনকাহিনী নয়এটি ক্ষমতার লালসা, নৈতিক পতন, আইনের অসম প্রয়োগ, নাবালিকা মেয়েদের ওপর নির্মম শোষণ, অভিজাত সমাজের ভণ্ডামি এবং মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে উন্মোচন করা এক ভয়ংকর দলিলযে সমাজ ক্ষমতাবানদের প্রবেশাধিকারকে সত্যের ওপর বসায়, সে সমাজে ভুক্তভোগীর কান্না অনেক দেরিতে শোনা যায়আর যখন শোনা যায়, তখন দেখা যায়, এক এপ্সটিনের পেছনে শুধু একজন মানুষ নয়, পুরো একটি অন্ধকার যোগাযোগ-জাল দাঁড়িয়ে ছিল