Sunday, March 22, 2026

আহলে শাকির কারা? শাকির হওয়া কতোটুকু গুরুত্বপূর্ন ক্বুরআন হাদিছে?

আহলে শাকির কারা? শাকির হওয়া কতোটুকু গুরুত্বপূর্ন ক্বুরআন হাদিছে?

একজন মুছলিমকে যে শাকির হতে হবে, এই বিষয় খোদ অধিকাংশ য়ালীম উলামাও জানেনা, এখন যারা ঠিকাদার হয়ে বসে আছে তারা নিজে যদি না জানে, না মানে তাহলে তাদের আণ্ডারে থাকা গোলামেরা কীভাবে জানবে? খুবই আফসোসের বিষয়, আজকাল মানুষ নামাজী হচ্ছে, রোজাদার হচ্ছে, জাকাতি-হাজি হচ্ছে, কিন্তু শাকির হচ্ছেনা, অথচ তাকে যে শাকির হতে হবে সেটা সে নিজেও জানেনা, জানার সুযোগ থাকলেও অনেকে জাহিলিয়াতের কারনে মানতে চায়না। আল-ক্বুরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ পড়েই ভাবে আমি কত বার আলহামদুলিল্লাহ্‌ পড়ি, আমি তো অকৃতজ্ঞ বান্দা হতেই পারিনা। এই হলো অবস্থা, মুল্লারা যেরূপ বুঝাইছে, আর নফছ যেরূপে নিজের সুবিধামতো বুঝেছে, এর বাহীরে আর কোন বুঝ আছে, বা থাকতে পারে এটা তারা মানতেও রাজি না।

তারা যেসকল ভাড়াটিয়া মুল্লাদের অনুসরণ করে তাদের মতোই তারা কপিপেষ্ট, তাদের যখন বলা হয় যে একজন মুছলিম হিসেবে যদি পূর্নতা লাভ করতে চাও, তাহলে তোমাকে শাকির হতে হবে, নাহলে যতই নামাজ রোজা করো না কেন কোন কাজে আসবেনা, তারা তখন বলবে এটা আবার কি জিনিস আমরা তো কোন ওয়াজির মুখে এইসব শুনলাম না, ভাবখানা এমন যে ওয়াজিদের বয়ানের বাহীরে দ্বীন নাই, নাউজুবিল্লাহ। আসলে যাদের মূল উদ্দেশ্যে দুনিয়া হাছিল, যারা নফছের পূজায় লিপ্ত, তারা আল-ক্বুরআন শরীফের কথা শুনলেও বলবে এইসব তো আগে কখনো শুনলাম না, এটা হওয়ার গুরুত্ব কি পূর্বের ইমাম মুস্তাহিদগণ বুঝেন নাই? উনারা কি আল-ক্বুরআন শরীফ কম বুঝতেন?

আসলে তারা যদি আল-ক্বুরআন শরীফ নিয়ে গবেষণা করতো, মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ম্যাসেজ বুঝতো, বুঝার চেষ্টা করতো তাহলে জীবনেও এরূপ বকবক করতোনা। এরূপ মন্তব্য যারা করে তারা আজিমুশ্বান পবিত্র কিতাব আল ক্বুরআন শরীফকে অল্পকিছু মানুষের ঈলমের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলতে চায়, যা স্পষ্ট আল-ক্বুরআন শরীফের আয়াত বিরোধী আক্বিদাহ। মহান আল্লাহ তায়ালা তো বলেই দিয়েছেনঃ (اَفَلَا یَتَدَبَّرُوۡنَ الۡقُرۡاٰنَ اَمۡ عَلٰی قُلُوۡبٍ اَقۡفَالُهَا) তারা কি (পবিত্র কিতাব) আল-ক্বুরআন শরীফ সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করে না? নাকি তাদের ক্বলবসমূহে তালা লাগানো আছে? (ছুরাহ আল-কিতাল ৪৭:২৪ ও ছুরাহ আন-নিছা ৪:৮২) মহান আল্লাহ তায়ালা আরো বলেনঃ (كِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰهُ اِلَیۡكَ مُبٰرَكٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِهٖ وَ لِیَتَذَكَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ) (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং (কেবল) উলুল আলবাবেরাই (এর থেকে) নছীহত গ্রহণ করে। (ছুরাহ আছ-ছ্বদ ৩৮:২৯ আল-মুওমিনুন ২৩:৬৮) পবিত্র ক্বুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলোঃ আয়াতসমূহ নিয়ে তাফাক্কুর-তাদাব্বুর করা, হিদায়াত গ্রহণ করাকেননা মহান আল্লাহ তায়ালা উনিই বলেছেনঃ (كَذٰلِكَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ لَكُمُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّكُمۡ تَتَفَكَّرُوۡنَ) এভাবেই মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য (উনার) আয়াতসমূহ খুলে খুলে বর্ননা করেন, যাতে তোমরা তাফাক্কুর করো। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:২১৯)

এখন ঐসকল মানুষের নিকট যদি প্রশ্ন করা হয়, মহান আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষকে আল-ক্বুরআন শরীফের আয়াত শরীফ নিয়ে চিন্তা-ফিকির, তাফাক্কুর-তাদ্বাব্বুরের হুকুম দিচ্ছেন, এটাও বলতেছেন যে চিন্তা-ফিকির যে করোনা, ক্বলবে কি তালা মারা? তাহলে তারা কি এটা বলবে এটা তো কেবল ইমাম মুস্তাহিদ উনাদের কাজ ছিলো, তারা যা করার করে চিন্তা ফিকিরের চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দিয়েছেন। এরূপ বললে ইমান থাকবে?

যাইহোক, মহান আল্লাহ তায়ালা আল ক্বুরআন শরীফের আয়াত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার বিষয়টার নিছবত রেখেছেন জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকদের সাথে, তাই জাহিলদেরকে আল-ক্বুরআন শরীফের তাফাক্কুরি-তাদ্বাব্বুরি রূপ দেখানো অসম্ভব।

এবার আসো আমরা একটু ডিপ-লেবেলে গিয়ে দেখি পবিত্র আল ক্বুরআন শরীফ আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে কার কথা বলছেন, আর সেই শত্রুই বা আমাদের কি কি ক্ষতি করবে তার কোন কিছু পাওয়া যায় কি না।

কালামুল্লাহ শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন এইভাবেঃ (یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ کَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ) হে মুমিনগণ, তোমরা (সম্মানিত দ্বীন) ইছলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের (সবচেয়ে বড়) প্রকাশ্য শত্রু। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:২০৮, আল-আনয়াম ৬:১৪২)

মহান আল্লাহ পাক আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন, শত্রু হিসেবে সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য শত্রু হলো আযাযিল, তথা ইবলিশ শয়তান, এখন আমরা দেখবো সেই ইবলিশ আমাদের কি ক্ষতির কথা বলছে, মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (قَالَ فَبِمَاۤ اَغۡوَیۡتَنِیۡ لَاَقۡعُدَنَّ لَهُمۡ صِرَاطَکَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ ثُمَّ لَاٰتِیَنَّهُمۡ مِّنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ مِنۡ خَلۡفِهِمۡ وَ عَنۡ اَیۡمَانِهِمۡ وَ عَنۡ شَمَآئِلِهِمۡ ؕ وَ لَا تَجِدُ اَکۡثَرَهُمۡ شٰکِرِیۡنَ) ইবলিশ (মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে চ্যালেঞ্জ করে) বললো, যেহেতু আপনি এ (আদম য়ালাইহিছ ছালাম উনার) জন্যেই, আমাকে গোমরাহীতে নিমজ্জিত করলেন, (তাই) আমি এদের (সবাইকে গুমরাহ করার) জন্যে অবশ্যই আপনার (প্রদর্শিত প্রত্যেক) সরল পথের (বাকে বাকে ওঁৎ পেতে) বসে থাকবো অতঃপর (তাদের পথভ্রষ্ট করার জন্যে) অবশ্যই আমি তাদের কাছে আসবো, (আর আক্রমণ করবো) তাদের সম্মুখ দিক থেকে, তাদের পেছনের দিক থেকে তাদের ডান দিক থেকে, তাদের বাম দিক থেকে (এর ফলে) আপনি এদের অধিকাংশকেই শাকিরদের (অন্তর্ভুক্ত) পাবেন না। (ছুরাহ আল-আয়রফ ৭:১৬-১৭) অতএব এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, ইবলিশ শয়তান সকল বনী আদমকে চতুর্মুখী আক্রমণ করবে ফলে মানুষ আর শাকিরিনদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেনা।

উক্ত আয়াতে আমরা কি পেলাম? ইবলিশ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সাথে চ্যালেঞ্জ করেছে আমাদের বিষয়েঃ

১) সে আমাদের গুমরাহ করবে।

২) এর জন্যে সে ছিরাতুল মুস্তাক্বিমের প্রত্যেক বাঁকে বাঁকে ওঁত পেতে বসে থাকবে।

৩) চতুর্মুখি আক্রমণ করবে, সামনে-পিছে, ডানে-বামে, যেনো ছিরাতুল মুস্তাক্বিমের উপর চলতে না পারি।

৪) ফলে আমরা আর শাকির হতে পারবনা।

অর্থাৎ সে আমাদের ছিরাতুল মুস্তাক্বিম থেকে পথভ্রষ্ট করার জন্যে চতুর্মুখি আক্রমণ করবে যাতে আমরা শাকির না হই, আর প্রত্যেক দিন আমরা দৈনিক ৫ ওয়াক্ত ফরজ আর আনলিমিটেড নফলে কতবারই না বলছিঃ (اِهۡدِ نَا الصِّرَاطَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ) (হে পরওয়ারদিগার) অতএব আপনি আমাদেরকে ছিরাতুল মুছতাক্বীমের উপর ইস্তিকামত রাখুন। (صِرَاطَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمۡتَ عَلَیۡهِمۡ) সেইসব লোকদের পথে, যাদেরকে আপনি (আপনার পক্ষ থেকে) নিয়ামত আতা করেছেন। (ছুরাহ আল-ফাতিহা ১:৬-৭)

এখন নিয়ামত কি শাকির ব্যতীত কেউ পাবে? নাকি শাকির বান্দা ব্যতীত কেউ নিয়ামত বুঝবে?

এখন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে শাকিরীন কারা?” - এর উত্তর একবাক্যে দেওয়া যাবেনা, বরং ক্বুরআন শরীফ, হাদিছ শরীফ, এবং তাছাউফের আলোকে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে, তাই নিচে ৩ স্তরে ব্যাখ্যা করছিঃ

আল-ক্বুরআন শরীফের দৃষ্টিকোণ থেকে (شَاكِرِين) শাকিরীনকারা?

মূল শব্দ বিশ্লেষণঃ (شَاكِرِين) শব্দটি (شَاكِر) এর বহু-বচন।

মূল ধাতুঃ (ش-ك-ر) শা-কা-রা।

অর্থঃ কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীরা - কিন্তু কেবল মুখে নয়, বরং সর্বাবস্থায় আচার-আচরণ, য়ামল ও নফছ এবং ক্বলব দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই শুকর

আল-ক্বুরআন শরীফে ৩টি বিশেষ গুণ তাদের মাঝে উল্লেখ আছেঃ

১) তারা জিকিরকারী।

দলিলঃ (فَاذۡكُرُوۡنِیۡۤ اَذۡكُرۡكُمۡ وَ اشۡكُرُوۡا لِیۡ وَ لَا تَكۡفُرُوۡنِ) (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৫২)

ব্যাখ্যাঃ জিকির ও শুকর একসাথে এসেছে - জিকিরহীন ব্যক্তি শাকির হতে পারে না।

২) তারা য়া'মল ও ইখলাছের মাধ্যমে শুকর আদায় করে।

দলিলঃ (اِعۡمَلُوۡۤا اٰلَ دَاوٗدَ شُكۡرًا) (ছুরাহ আছ-ছাবা ৩৪:১৩)

য়া'মলদিয়েই শুকর আদায় করতে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র আলহামদুলিল্লাহ বললেই শাকির হওয়া যায় না।

৩) তারা য়ামলে গ্বফিল হবেনা।

দলিলঃ (وَ قَلِیۡلٌ مِّنۡ عِبَادِیَ الشَّكُوۡرُ) (ছুরাহ আছ-ছাবা ৩৪:১৩)

অধিকাংশ মানুষ গ্বফিল, কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বান্দাদের মধ্যে কেবল সামান্যই সত্যিকারের শাকির।

এছাড়াও মহান আল্লাহ তায়ালা শাকির হতে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ

মহান আল্লাহ তায়ালা হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে নির্দেশ দিচ্ছেনঃ (وَ كُنۡ مِّنَ الشّٰكِرِیۡنَ) (হে মূছা য়ালাইহিছ ছালাম) আর আপনি শাকিরিনদের অন্তর্ভুক্ত হোন। (ছুরাহ আল-আয়রফ ৭:১৪৪)

মহান আল্লাহ তায়ালা হযরত ইব্রাহীম য়ালাইহিছ ছালাম উনার ব্যাপারে সার্টিফিকেট দিচ্ছেনঃ (شَاكِرًا لِّاَنۡعُمِهٖ) (ইব্রাহীম য়ালাইহিছ ছালাম) তিনি ছিলেন (মহান আল্লাহ তায়ালা উনার) নিয়ামতের প্রতি শাকির (বান্দা)। (ছুরাহ আন-নাহ্‌ল ১৬:১২১)

মহান আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের নিয়ামত দিয়েছেন, দিয়ে প্রশ্ন করতেছেনঃ (فَهَلۡ اَنۡتُمۡ شٰكِرُوۡنَ) তবে কি তোমরা শাকির হবে না? (ছুরাহ আল-আম্বিয়া ২১:৮০)

এর উত্তর ও মহান আল্লাহ তায়ালা দিচ্ছেন যা আমাদের আদি পিতা-মাতা য়ালাইহিমাছ ছালাম উনারাই বলেছেনঃ (لَنَكُوۡنَنَّ مِنَ الشّٰكِرِیۡنَ) (বাবা আদম য়ালাইহিছ ছালাম ও আম্মাজান হাওয়া য়ালাইহাছ ছালাম উনারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন) আমরা অবশ্যই শাকিরদের অন্তর্ভুক্ত হব। (ছুরাহ আল-আয়রাফ ৭:১৮৯)

অন্য আয়াতে এই বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা কিছু মানুষের মিথ্যা ওয়াদাও তুলে ধরেছেন যারা বিপদে পড়লে শাকির হওয়ার ওয়াদা করে, বিপদ কেটে গেলে নাফরমান হয়ে যায়, যেমনঃ (لَنَكُوۡنَنَّ مِنَ الشّٰكِرِیۡنَ) আমরা অবশ্যই শাকিরদের অন্তর্ভুক্ত হব। (ছুরাহ আল-আনয়াম ৬:৬৩, ইউনুছ য়ালাইহিছ ছালাম ১০:২২)

শুধু কি তাই? অহংকারী বড়লোক, নফছের পূজারীরা যখন গরীব শাকিরদের দেখে কটাক্ষ করবে তখন মহান আল্লাহ তায়ালা বলবেনঃ (اَلَیۡسَ اللّٰهُ بِاَعۡلَمَ بِالشّٰكِرِیۡنَ) মহান আল্লাহ তায়ালা কি উনার শাকির বান্দাদের ব্যাপারে পূর্ণ অবগত না? (ছুরাহ আল-আনয়াম ৬:৫৩) অর্থাৎ তিনি কাফিরদের জবাব দিচ্ছেন, উনার বান্দাদের মধ্যে শাকির কারা সেটা তিনি ভালো করেই জানেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা আরো কঠিন ভাষায় হুমকি দিচ্ছেনঃ (اِنَّا هَدَیۡنٰهُ السَّبِیۡلَ اِمَّا شَاكِرًا وَّ اِمَّا كَفُوۡرًا) নিশ্চয়ই আমি মানুষকে হিদায়েতের পথ প্রদর্শন করেছি, (এখন তার নিজ ইচ্ছায়) হয় সে শাকির হবে, নয়তো কাফুর (নিয়ামত অস্বীকারকারী কাফের) হবে। (ছুরা আল-ইনছান/দাহর ৭৬:৩) এটা সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলান ছোলায়মান য়ালাইহিছ ছালাম, যা আল-ক্বুরআনে এইভাবে বর্নিত হয়েছেঃ (فَلَمَّا رَاٰهُ مُسۡتَقِرًّا عِنۡدَهٗ قَالَ هٰذَا مِنۡ فَضۡلِ رَبِّیۡ ۟ۖ لِیَبۡلُوَنِیۡۤ ءَاَشۡكُرُ اَمۡ اَكۡفُرُ ؕ وَ مَنۡ شَكَرَ فَاِنَّمَا یَشۡكُرُ لِنَفۡسِهٖ ۚ وَ مَنۡ كَفَرَ فَاِنَّ رَبِّیۡ غَنِیٌّ كَرِیۡمٌ) অতঃপর যখন তিনি (ছোলায়মান য়ালাইহিছ ছালাম) সিংহাসনটিকে উনার সামনে স্থিররূপে স্থাপিত দেখলেন, তখন তিনি বললেন, ‘এটি আমার রব তা'য়ালা উনার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি শাকির হই নাকি কাফুর হই’। আর যে ব্যক্তি শাকির হয়, সে তো কেবল তার নিজের কল্যাণের জন্যেই শাকির হয়; আর কেউ কাফুর হলে, (তাতে উনার কোনো ক্ষতি নেই)। নিশ্চয়ই আমার রব তা'য়ালা অভাবমুক্ত, পরম অনুগ্রহশীল (ছুরাহ আন-নামল ২৭:৪০)

আরো কঠিনভাবে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (فَاذۡكُرُوۡنِیۡۤ اَذۡكُرۡكُمۡ وَ اشۡكُرُوۡا لِیۡ وَ لَا تَكۡفُرُوۡنِ) অতএব (নিয়ামত লাভ করার ফলে) তোমরা আমার জিকির করো, আমিও তোমাদের জিকির করবো, আমার শাকির বান্দা হও, আমার প্রতি কুফরি করো না। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৫২)

এই যে হুমকিটা সেটা কি জন্যে জানেন? সেই নিয়ামতটা কি? তা এর আগের আয়াতেই আছে, (كَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡكُمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡكُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡكُمۡ اٰیٰتِنَا وَ یُزَكِّیۡكُمۡ وَ یُعَلِّمُكُمُ الۡكِتٰبَ وَ الۡحِكۡمَۃَ وَ یُعَلِّمُكُمۡ مَّا لَمۡ تَكُوۡنُوۡا تَعۡلَمُوۡنَ) (সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্যে) যেভাবে আমি তোমাদের মধ্যে থেকেই একজনকে রছূল বানিয়ে পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদের উপর আমার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করবেন, আর তোমাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করে দেবেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল ক্বুরআনর জাহেরি বাতেনি) ঈলম শিক্ষা দেবেন আর (বাতেনী য়ী’লম বোঝার) হিকমত বা প্রজ্ঞার দীক্ষা সহ এমন বিষয়েরও দীক্ষা দিবেন, যা এর আগে তোমরা জানতেই না। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ শরীফঃ ২:১৫১) একিই বিষয়ের আলাপই করছেন, তবে এইখানে স্পষ্ট করেই বলেছেন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম মুমিনদের জন্যে কি, যেমনঃ (لَقَدۡ مَنَّ اللّٰهُ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اِذۡ بَعَثَ فِیۡهِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡ اَنۡفُسِهِمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡهِمۡ اٰیٰتِهٖ وَ یُزَكِّیۡهِمۡ وَ یُعَلِّمُهُمُ الۡكِتٰبَ وَ الۡحِكۡمَۃَ ۚ وَ اِنۡ كَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা মু’মিনদের উপর বড় অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদেরই মধ্যে থেকে তাদেরই একজনকে রছূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের উপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করেনআর তাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল ক্বুরআনের জাহেরি বাতেনি) ঈলম শিক্ষা দেন আর (সেই অনুসারে চলার কৌশল) হিকমতেরও দীক্ষা দেনঅথচ এ লোকগুলোই (রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আসার) আগ (পর্যন্ত) সুস্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত ছিলো। (ছুরাহ আলে ইমরান ৩:১৬৪) এই আয়াত প্রমাণ করে, রছূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হলেন মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামতআর নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া করা ক্বুরআন শরীফ-এরই নির্দেশএই নির্দেশ কেবল হাক্বিকি ঈবাদতকারিই মানতে পারবে, লোক দেখানো আ’বিদ, নামাজী, মুল্লা, ওয়াজি, মুফতির পক্ষে সম্ভব না, যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ) তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার শুকরিয়া আদায় করো, যদি তোমরা উনারই ঈবাদত করে থাকো। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ শরীফঃ ২:১৭২)

এইখানে একটা গভীর তাফাক্কুরের (চিন্তাভাবনার) বিষয় হলো যে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে প্রেরণ, উনার আগমনকে আমাদের উপর বিশাল অনুগ্রহ করা হয়েছে মর্মে বলা হচ্ছে, এখন এই যে আমরা নিয়ামত লাভ করলাম, আমরা তো আজকাল উনার আগমনের দিবসকে পালন করে শাকির না হয়ে উল্টো বিদআত বলে ফতওয়া মেরে কাফুর হয়ে যাচ্ছি এর কোন খবর ও নাই, এটা ভালো করে বুঝতে হলে এই আয়াত শরীফটা বুঝতে হবেঃ (وَ لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا مُوۡسٰی بِاٰیٰتِنَاۤ اَنۡ اَخۡرِجۡ قَوۡمَكَ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ۙ وَ ذَكِّرۡهُمۡ بِاَیّٰىمِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّكُلِّ صَبَّارٍ شَكُوۡرٍ) অবশ্যই আমি হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে আমার নিদর্শনসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছিলাম, (উনাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম), আপনি আপনার জাতিকে (জাহেলিয়াতের) অন্ধকার থেকে (হেদায়েতের) নূরের দিকে নিয়ে আসুন এবং আপনি তাদেরকে মহান আল্লাহ তা'য়ালা উনার বিশেষ-বিশেষ দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিন; (কেননা, যারা) একান্ত ধৈর্যশীল ও বাস্তবেই শাকির, নিঃসন্দেহে তাদের জন্য এর মধ্যে অনেক নিদর্শন রয়েছে (ছুরাহ ইব্রাহিম য়ালাইহিছ ছালাম ১৪:৫) একেবারে পানির মত স্পষ্ট বিষয়, যেকোন নবীর জন্মদিন, তাদের অফাত দিবস, তাদের বড় বড় কারনামা, পাবলিকেলি নবী হওয়ার এনাউন্সমেন্ট, উনাদের থেকে প্রকাশিত কোন বিশাল মুজেজা, আসমানি আযাব-গজব, রহমত নাযিলের দিন, রাত সব এর অন্তর্ভুক্ত, এগুলো কেবল যারা বাস্তবেই শাকির তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব, যারা বুঝবেনা তারা জাহিলের মতো, অজ্ঞতা প্রকাশ করবে বিদয়াত এর ফতওয়া মেরে, আর শাকিরেরা, রগ্বায়ীব শরীফ, ঈদে মিলাদুন্নবী, মিরাজ শরীফ, বরাত শরীফ, ক্বদর শরীফ, বদ্বর শরীফ, উহুদ শরীফ, ফতেহ মক্কা শরীফ, হুদাইবিয়াহ শরীফ, ক্রুসেড, সহ সকল দিবস পালন করবে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার স্বরনে জিকির, নবীদের স্বরনে মিলাদ, ক্বুরআন ওয়াজ নছীহত করে। আর যারা ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়ে দৃঢ়পদ থেকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বীনের উপর কায়ীম থাকবে, তাদের ব্যাপারে এও বলছেনঃ (وَ سَیَجۡزِی اللّٰهُ الشّٰكِرِیۡنَ) আর মহান আল্লাহ তায়ালা শীঘ্রই শাকির বান্দাদের প্রতিদান দেবেন। (ছুরাহ আলে ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩:১৪৪-১৪৫) এমনকি মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই নিজেকে শাকির বলেছেনঃ (مَا یَفۡعَلُ اللّٰهُ بِعَذَابِكُمۡ اِنۡ شَكَرۡتُمۡ وَ اٰمَنۡتُمۡ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ شَاكِرًا عَلِیۡمًا) যদি তোমরা শাকির হও এবং ঈমান আনো তাহলে তোমাদেরকে আযাব দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা কী করবেন? মহান আল্লাহ তায়ালা তো নিজেই শাকির, সর্বজ্ঞ। (ছুরাহ আন-নিছা ৪:১৪৭)

তাছাড়া মহান আল্লাহ তায়ালা শাকিরদের সব সময় কাফেরদের বিপরীতে নিয়ে এসেছেন, কেননা নিয়ামতের দাতার ইঙ্কার কুফর, যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَ اِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّكُمۡ لَئِنۡ شَكَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّكُمۡ وَ لَئِنۡ كَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ) (স্মরণ করো,) যখন তোমাদের রব তায়ালা ঘোষণা দিলেন, যদি তোমরা শাকির হও তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের জন্য (আমার নিয়ামত) আরো বাড়িয়ে দেবো, আর যদি তোমরা কাফের হও (তাহলে জেনে রেখো), আমার আযাব বড়ই কঠিন!। (ছুরাহ ইব্রাহিম য়ালাইহিছ ছালাম, ১৪:৭) অর্থাৎ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়কারী হিসেবে নিজেকে পাক্কা শাকির বানালে নিয়ামত আরও বাড়ীয়ে দেওয়া হবে, আর যদি উল্টা পথে হাটো, ইনকার করে মুনকির হও তাহলে সেটা কুফর হবে, আর যারা নিয়ামতের বিপরীতে শাকির না হয়ে ইনকার করে কাফের হয় তাদের জন্যে তাদের রব তা’য়ালা উনার আযাব বড় ভয়ানক। মহান আল্লাহ তায়ালা তো খোদ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার দিকে মুখাতিব হয়ে বলেনঃ (بَلِ اللّٰهَ فَاعۡبُدۡ وَ كُنۡ مِّنَ الشّٰكِرِیۡنَ) কাজেই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ঈবাদাত করুন এবং শাকির বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হোন। (ছুরাহ আজ-জুমার ৩৯:৬৬) আর আগের আয়াত শরীফগুলিতে তিনি শিরক থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়ে উক্ত কথাটাই বলেন।

উক্ত আয়াত শরিফ-এর তাফছির হিসেবে হাদিছ শরীফে যা পাওয়া যায় তা হলোঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এত বেশি ক্বিয়ামুল লাইল আদায় করতেন যে উনার পা মুবারক ফুলে যেত লম্বা সময় দাঁড়ানোর ফলে, একদিন আম্মাজান আঈশা য়ালাইহাছ ছালাম জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার তো সামনে-পিছে কোন গুনাহ নাই! তাও কেন এমন করেন?” তিনি বললেনঃ (يَا عَائِشَةُ أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا) হে আঈশা, “আমি কি আমার রব তায়ালা উনার নিকট নিজেকে শাকির বান্দা হিসেবে প্রমাণ করবনা? (বুখারি শরীফ ৪৮৩৭, মুছলিম শরীফ ২৮১৯-২৮২০, তিরমিজি শরীফ ৪১২, ইবনে মাজাহ শরীফ ১৪২০, মিশকাতুল মাছাবিহ শরীফ ১২২০)

রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মিম্বরে বসে ইরশাদ করেনঃ (مَنْ لَمْ يَشْكُرِ الْقَلِيلَ لَمْ يَشْكُرِ الْكَثِيرَ، وَمَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللَّهَ، وَالتَّحَدُّثُ بِنِعْمَةِ اللَّهِ شُكْرٌ وَتَرْكُهَا كُفْرٌ، وَالْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ) যে ব্যক্তি ছোটো জিনিসের জন্য কৃতজ্ঞ নয়, সে বড় জিনিসের জন্যও কৃতজ্ঞ হবে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয় সে মহান আল্লাহ তাআলা উনার প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়। আর মহান আল্লাহ তাআলা উনার নিয়ামতের জিকির করা হলো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং সেগুলিকে উপেক্ষা করা হলো অকৃতজ্ঞতা। আর জামাআতবদ্ধভাবে বসবাস রহমত স্বরূপ এবং বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করা আযাব স্বরূপ। (মুছনাদে আহমদ শরীফ ১৭৯৮২)

ব্যাখ্যাঃ যিনি সর্বাধিক কৃতজ্ঞ, তিনিই সর্বোচ্চ জিকিরকারী। কৃতজ্ঞতা মানে শুধু শুকরিয়া, আলহামদুলিল্লাহ বলা নয়, বরং নফছ, রূহ, ক্বলব, য়ামল, সময়, মাল, জ্ঞান সবকিছু দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ঈবাদতে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া।

তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে শাকিরীন কারা?

মাক্বামে নফছেঃ যে নিজের নফছের তাঁবেদারি পরিত্যাগ করে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দেয়া অল্পতেও সন্তুষ্ট, সে নফছের মাক্বামে শাকির।

মাক্বামে ক্বলবেঃ যার ক্বলব মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকিরে জীবন্ত, এবং প্রত্যেক নিয়ামতের মধ্যে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার এ

ইহছান দেখে সে ক্বলবের মাক্বামে শাকির।

মাক্বামে রূহেঃ যে নূরের মাধ্যমে নিয়ামতকে চিনে নেয় এবং কেবল মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকেই নিয়ামতের উৎস হিসেবে স্বীকার করে, সে-ই শাকিরে য়ালা হয়।

শুকর অর্থ এই নয় যে তুমি শুধু মুখে মুখে আলহামদুলিল্লাহ বললে তা যথেষ্ট, বরং শুকর মানে তোমার প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহ পাক উনার হুকুমের আনুগত্যে নিযুক্ত থাকবে।

সারাংশঃ শাকিরীন কারা?

শাকিরীন সেইসব বান্দাঃ

যারা জিকিরে প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ জাকির।

যাদের আচরণ ও য়ামলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়।

যাদের নফছ কন্ট্রোলে, ক্বলব জীবিত, এবং রূহ নূরে পরিপূর্ণ।

যারা প্রতিটি নিয়ামতের মাঝে নিয়ামতদাতাকেই দেখে।

এবং যাদের সমস্ত প্রশংসা, ঈবাদাত, সেদাহ - সবই কেবল মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জন্য।

Friday, March 20, 2026

ক্বুরআন-ছুন্নাহ অনুসারে জাকাত না দেওয়ার কঠিন পরিণতি

ক্বুরআন-ছুন্নাহ অনুসারে জাকাত না দেওয়ার কঠিন পরিণতি

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাকে সম্পদ দান করেন পরীক্ষার জন্যসম্পদ নিজে কোনো সফলতা নয়; বরং সফলতা হলো সেই সম্পদের হক্ব আদায় করাআর সেই হক্বের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফরজ ঈবাদত হলো জাকাতজাকাত কোনো দয়া নয়, বরং এটি অসহায় ও বঞ্চিতদের নির্ধারিত অধিকার যা মহান আল্লাহ তা’য়ালা ধনীদের সম্পদের মধ্যে ফরজ করে দিয়েছেনযারা এই ফরজ আদায়ে অবহেলা করে, তাদের জন্য ক্বুরআন ও ছুন্নায় অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছেমূলত গরীবের হক্বটাই মহান আল্লাহ তায়ালা ধনীদের দিয়ে দেন যাতে তারা সেই আমানত তার প্রাপকের কাছে নফছের তাজকিয়ার জন্যে দিয়ে দেয়অধিকাংশ মানুষ ভাবে জাকাত মহান আল্লাহ পাক ফরজ করেছেন তাই দিতে হবে, কিন্তু ফরজ কেন, আর কিভাবে সঠিকভাবে দিতে হবে তারা সেটাই জানেনা (এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এটা পড়ুন)

প্রথমতো যারা মোটেও জাকাত দেয়না তাদের বিষয়ে পবিত্র আল-ক্বুরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছুরাহ আত-তাওবার মধ্যে স্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেনঃ (وَ الَّذِیۡنَ یَكۡنِزُوۡنَ الذَّهَبَ وَ الۡفِضَّۃَ وَ لَا یُنۡفِقُوۡنَهَا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۙ فَبَشِّرۡهُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ یَّوۡمَ یُحۡمٰی عَلَیۡهَا فِیۡ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوٰی بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَ جُنُوۡبُهُمۡ وَ ظُهُوۡرُهُمۡ ؕ هٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِاَنۡفُسِكُمۡ فَذُوۡقُوۡا مَا كُنۡتُمۡ تَكۡنِزُوۡنَ) আর যারা সোনা-রূপা জমা করে রাখে এবং তা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে ব্যয় করে না, আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিনক্বিয়ামতের দিন (তাদের) সেই সম্পদ যাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, তারপর তা দিয়ে তাদের কপাল, পার্শ্ব ও পিঠ দগ্ধ করা হবে; (এবং বলা হবে) এটাই তো (তোমার) সেই সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য জমিয়ে রেখেছিলে; সুতরাং এখন আস্বাদন করো তার স্বাধ যা তোমরা সঞ্চয় করতে”। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:৩৪-৩৫)

এ আয়াতে পাকে জমাকৃত স্বর্ণ ও রৌপ্যকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করার যে কঠোর সাজার উল্লেখ রয়েছে, তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তার এ সাজা তারই অর্জন করাঅর্থাৎ যে অর্থ সম্পদ অবৈধ পন্থায় জমা করা হয়, কিংবা বৈধ পন্থায় জমা করলেও তার জাকাত আদায় করা না হয়, সে সম্পদই তার জন্য আযাবের কারণ হয়হাদীছ শরীফে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যারা সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখে তাদেরকে সেই যাহান্নামের উত্তপ্ত পাথরের ছেকার সুসংবাদ দিন, যা যাহান্নামের আগুনের দ্বারা দেয়া হবেযা তাদের কারও স্তনের বোঁটার মধ্যে রাখা হবে, আর তা বের হবে দু কাঁধের উপরিভাগেআর দু কাঁধের উপরিভাগে রাখা হবে যা স্তনের বোঁটার মধ্য দিয়ে বের হবে। (মুছলিম শরীফ ৯৯২)

কোন কোন মুফাছছির বলেনঃ এ আয়াতে যে ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করার উল্লেখ এজন্যে করা হয়েছে যে, যে কৃপন ব্যক্তি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাহে খরচ করতে চায় না, তার কাছে যখন কোন ভিক্ষুক কিছু চায়; কিংবা ছ্বদকা তলব করে, তখন সে প্রথমে ভ্রুকুঞ্চন করে, তারপর পাশ কাটিয়ে তাকে এড়িয়ে যেতে চায়এতেও সে ক্ষান্ত না হলে তাকে পৃষ্ঠ দেখিয়ে চলে যায়এজন্যে বিশেষ করে এ তিন অঙ্গে আযাব দানের উল্লেখ করা হয়েছে। (তাফছীরে কুরতুবী)

আব্দুল্লাহ বিন উমার রদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন যে, এটা জাকাত ফরয হওয়ার পূর্বের আদেশযাকাতের হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পর জাকাত দ্বারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা মাল-সম্পদকে পবিত্র করার মাধ্যম বানিয়েছেনএই জন্য য়ু’লামাগণ বলেন, যে মাল থেকে জাকাত বের করা হবে সে মাল (আয়াতে নিন্দনীয়) ‘জমা করে রাখা’ মাল নয়আর যে মাল থেকে জাকাত বের করা হবে না, সে মালই হবে ‘জমা করে রাখা’ ধনভান্ডার; যার জন্য রয়েছে এই ক্বুরআনী ধমকসুতরাং হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘প্রত্যেক সোনা ও চাঁদীর অধিকারী ব্যক্তি যে তার হক্ব (জাকাত) আদায় করে না, যখন ক্বিয়ামতের দিন আসবে তখন তার জন্য ঐ সমুদয় সোনা-চাঁদীকে আগুনে দিয়ে বহু পাত তৈরী করা হবেঅতঃপর সেগুলোকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগা হবেযখনই সে পাত ঠান্ডা হয়ে যাবে তখনই তা পুনরায় গরম করে অনুরূপ দাগার শাস্তি সেই দিনে চলতেই থাকবে যার পরিমাণ হবে ৫০ হাজার বছরের সমান; যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দাদের মাঝে বিচার-নিষ্পত্তি শেষ করা হয়েছেঅতঃপর সে তার পথ দেখতে পাবে; হয় জান্নাতের দিকে না হয় দোযখের দিকে’’ (মুছলিম শরীফ ৯৮৭) ছ্বহিহ হাদীছ শরীফে এসেছেন যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা সম্পদ দান করেছেন, তারপর যে সেই সম্পদের জাকাত দিবে না, ক্বিয়ামতের দিন তার সম্পদ তার জন্য চক্ষুর পাশে দুটি কালো দাগবিশিষ্ট বিষাক্ত সাপে পরিণত হবে, তারপর সেটি তার চোয়ালের দু’পাশে আক্রমন করবে এবং বলতে থাকবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার গচ্ছিত ধন। (বুখারী শরীফ ১৪০৩)

অন্য হাদীছ শরীফে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যে কোন ব্যক্তি তাঁর উটের জাকাত দিবে না সে যেভাবে দুনিয়াতে ছিল তার থেকে উত্তমভাবে এসে তাকে পা দিয়ে মাড়াতে থাকবে, অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি ছাগলের জাকাত দিবে না সে যেভাবে দুনিয়াতে ছিল তার থেকেও উত্তমভাবে এসে তাকে তার খুর ও শিং দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকবেআর তোমাদের কেউ যেন ক্বিয়ামতের দিন তার কাধে ছাগল নিয়ে উপস্থিত না হয়, যে ছাগল চিৎকার করতে থাকবে, তখন সে বলবে, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! আর আমি বলব, আমি তোমার জন্য কোন কিছুরই মালিক নই, আমি তো তোমার কাছে বাণী পৌছিয়েছিআর তোমাদের কেউ যেন তার কাধে কোন উট নিয়ে উপস্থিত না হয়, যা শব্দ করছেতখন সে বলবে, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমি বলব, আমি তোমার জন্য কোন কিছুর মালিক নই, আমি তো তোমাদেরকে পৌছিয়েছি। (বুখারী শরীফ ১৪০২; মুছলিম শরীফ ৯৮৮)

আবার কৃপণতা ও জাকাত আটকে রাখার কুফল বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَ لَا یَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ یَبۡخَلُوۡنَ بِمَاۤ اٰتٰهُمُ اللّٰهُ مِنۡ فَضۡلِهٖ هُوَ خَیۡرًا لَّهُمۡ ؕ بَلۡ هُوَ شَرٌّ لَّهُمۡ ؕ سَیُطَوَّقُوۡنَ مَا بَخِلُوۡا بِهٖ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ وَ لِلّٰهِ مِیۡرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ) মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে তাদের যে প্রাচুর্য দিয়েছেন তা থেকে যারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে ব্যয় করতে যারা কার্পণ্য করে, তারা যেন কখনো এটা মনে না করে, এটা তাদের জন্যে কোনো কল্যাণকর কিছু হবেবরং এ (কৃপণতা আসলে) তাদের জন্যে খুবই অকল্যাণকর (হবে)কার্পণ্য করে তারা যা জমা করেছে, ক্বিয়ামতের দিন অচিরেই তা দিয়ে তাদের গলায় বেড়ি পরিয়ে দেয়া হবে, আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার তো কেবল মহান আল্লাহ তায়ালা উনারই জন্যে, আর তোমরা যা করো মহান আল্লাহ তায়ালা তা সম্পর্কে বেখবর নন। (ছুরাহ আলে ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩:১৮০) এই আয়াতে এমন কৃপণের কথা বলা হচ্ছে, যে মহান আল্লাহ পাক উনার দেওয়া সম্পদ উনার রাস্তায় ব্যয় করে নাএমন কি সেই মালের ওয়াজিব জাকাতও আদায় করে না

অনেক মানুষ হয়তো মানতেই পারবেনা যে সে যদি জাকাত ইনকার করে, কখনোই না দিয়ে মারা যায় তাহলে সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে, কেননা মহান আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেছেনঃ (فَاِنۡ تَابُوۡا وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّكٰوۃَ فَاِخۡوَانُكُمۡ فِی الدِّیۡنِ ؕ وَ نُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ) অতঃপর যদি তারা (মুশরিকরা) তাওবাহ করে এবং নামায আদায় করে এবং জাকাত প্রদান করে তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। আর আমি জ্ঞানীদের জন্য (আমার) আয়াতসমূহ খুলে খুলে বর্ণনা করি। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:১১) এছাড়াও মহান আল্লাহ তায়ালা ছুরাহ ফুছছিলাতে যা বলেছেন তা আরও ভয়াবহ, তিনি বলেনঃ (وَ وَیۡلٌ لِّلۡمُشۡرِكِیۡنَ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡتُوۡنَ الزَّكٰوۃَ وَ هُمۡ بِالۡاٰخِرَۃِ هُمۡ كٰفِرُوۡنَ) আর ধ্বংস মুশরিকদের জন্য যারা জাকাত আদায় করে না, মূলত তারাই আখিরাতে অবিশ্বাসী। (ছুরাহ ফুছছিলাত ৪১:৬-৭)

মুফাছছীরগণের মতে এখানে জাকাত না দেওয়াকে কুফর ও শিরকী আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছেকিন্তু আমি সোজা সাপ্টা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত বলেই মনে করি বলুনতো জাকাত মুছলিম নাকি মুশরিকদের উপর ফরজ? যদি মুছলিমদের উপর হয়ে থাকে তাহলে যারা জাকাত দেয় না তাদের কাম খতম, যদিও নামাজ, রোজা, হজ্জ করা হাজী হয়ে থাকে।

দুনিয়াবি ও সামাজিক শাস্তিঃ জাকাত না দেওয়া কেবল পরকালের আযাবই ডেকে আনে না, বরং দুনিয়াতেও রহমত কমিয়ে দেয়রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ লোকেরা যখন তাদের সম্পদের জাকাত বন্ধ করে দেয়, তখন আকাশ থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়; যদি পশু-পাখি না থাকত, তবে তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিতই হতো না” (ছুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ ৪০১৯)

শরয়ী ও ফিক্বহি সিদ্ধান্তঃ ইছলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জাকাত অস্বীকার করা কুফরি, আর অবহেলা করে আদায় না করা কঠিন ফাছিকি ও কবিরা গুনাহ বলেছেন ইমামগণ যদিও আমি অবহেলাও মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া মনে করছি

বলপ্রয়োগে আদায়ঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিআল্লাহু আনহু উনার ছুন্নাহ অনুযায়ী, কেউ জাকাত দিতে অস্বীকার করলে ইছলামী শাসক তা বলপ্রয়োগে আদায় করবেন

অতিরিক্ত দণ্ডঃ কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী (ছুনানে নাছাই শরীফ), জাকাত দিতে অস্বীকারকারীর থেকে জাকাতের পাশাপাশি দণ্ডস্বরূপ তার অর্ধেক মাল নিয়ে নেওয়ার বিধানও বর্ণিত হয়েছে

উপসংহারঃ অতএব জাকাত না দেওয়া কোনো সাধারণ আর্থিক ভুল নয়; এটি আখিরাত ধ্বংসকারী গুনাহ এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমের অবাধ্যতাআজ যা সঞ্চয়, কাল তা-ই আযাবের হাতিয়ারসুতরাং প্রতিটি সামর্থ্যবান মুছলিমের উচিত অবিলম্বে হিসাব করে জাকাত আদায় করা এবং অতীতের ভুলের জন্য খাঁটি তাওবাহ করা

হাদীছ শরীফ অনুযায়ী ছ্বলাতুত তাছবীহ-এর চার রক’য়াত নামাযের নিয়ম ও ফজিলত

হাদীছ শরীফ অনুযায়ী ছ্বলাতুত তাছবীহ-এর চার রক’য়াত নামাযের নিয়ম ও ফজিলত

হাদীছ শরীফে এই নামাজের অত্যন্ত ফজিলত বর্ণিত হয়েছেরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার চাচা হযরত আব্বাছ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে এই নামাজ শিক্ষা দিয়েছিলেন

একবার রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হযরত আব্বাছ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে বললেন, “হে আমার চাচাজান! আমি কি আপনাকে দেব না? আমি কি আপনাকে দান করবো না? আমি কি আপনাকে বিশেষভাবে অনুগ্রহ করবো না? আমি কি আপনার সাথে এমন দশটি গুণের কাজ করবো না, যা আপনি করলে মহান আল্লাহ তায়ালা আপনার গুনাহ মাফ করে দেবেন, এর প্রথমটিও এবং শেষটিও, পুরোনোটিও এবং নতুনটিও, ভুলবশত হওয়াটিও এবং ইচ্ছাকৃতটিও, ছোটটিও এবং বড়টিও, গোপনটিও এবং প্রকাশ্যটিও

সেই দশটি গুণের কাজ হলোঃ আপনি চার রকয়াত নামায পড়বেনপ্রত্যেক রকয়াতে ছুরাহ ফাতিহা শরীফের পর একটি ছুরাহ পড়বেনঅতঃপর প্রথম রকয়াতে কিরাআত শেষ করলে, যখন আপনি দাঁড়ানো অবস্থায় থাকবেন, তখন পাঠ করবেনঃ (سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ) ছুবহানাল্লাহী, আলহামদুলিল্লাহী, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবারপনেরো বার

তারপর আপনি রুকূ করবেন, তখন রুকূ অবস্থায় সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর রুকূ থেকে মাথা উঠাবেন, তখন সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর সিজদায় যাবেন, তখন সিজদা অবস্থায় সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর সিজদা থেকে মাথা উঠাবেন, তখন সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর আবার সিজদা করবেন, তখন সেটি দশ বার পাঠ করবেনতারপর মাথা উঠাবেন, তখন সেটি দশ বার পাঠ করবেনএভাবে প্রত্যেক রকয়াতে মোট পঁচাত্তর বার হবেআপনি এভাবেই চার রকয়াতে তা আদায় করবেন

এখন আপনার পক্ষে যদি সম্ভব হয়, তবে প্রতিদিন একবার এটি আদায় করুনযদি তা না পারেন, তবে প্রতি জুমুয়াহ শরীফে একবারযদি তা না পারেন, তবে প্রতি মাসে একবারযদি তা না পারেন, তবে প্রতি বছরে একবারযদি তাও না পারেন, তবে অন্তত আপনার জীবনে একবার হলেও পাঠ করবেন

আমাদের মধ্যে আরেকটি ত্বরীকাহ মশহুর, অনলাইনে/অফলাইনেসেটার হাক্বিকত কি?

বর্তমানে অনলাইনে/অফলাইনে হাদিছের চেয়ে ভিন্ন এক ত্বরীকাহ বা পদ্ধতির ছড়াছড়ি দেখা যায়, তার মূল কারণ হলো হাদীছ শরীফের বর্ণনার বৈচিত্র্য এবং মুজতাহিদ ইমামগণের ইজতিহাদ (গবেষণা), মূলত ছ্বলাতুত তাছবীহ সম্পর্কে প্রধানত দুটি ছ্বহীহ পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছেঃ

১. মূল হাদীছ শরীফের শব্দ বনাম প্রচলিত য়ামলঃ আবু দাউদ শরীফের ১২৯৭ নং হাদীছ শরীফে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নিজের শেখানো সরাসরি পদ্ধতি হলেন কিরাতের পর ১৫ বার এবং দ্বিতীয় সেজদার পর ১০ বার বসার (جَلْسَةُ الِاسْتِرَاحَةِ) নির্দেশ রয়েছে

অনলাইনে অনেক সময় মূল হাদীছ শরীফের এই সূক্ষ্ম বিন্যাসটি এড়িয়ে গিয়ে সহজলভ্য বা প্রচলিত ফিক্বহী কিতাবের পদ্ধতিটিই ঢালাওভাবে প্রচার করা হয়ফলে সাধারণ মানুষ মনে করে পদ্ধতি একটাই

২. ইমামগণের ইজতিহাদ ও সহজীকরণঃ অনলাইনে আমরা যে পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি দেখি (যেখানে কিরাতের আগে ১৫ বার এবং রুকুর আগে ১০ বার পড়ার কথা বলা হয়), সেটি মূলত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার বর্ণিত পদ্ধতি

ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার কিতাবে এই পদ্ধতিটি উল্লেখ করেছেনফক্বীহগণ এই পদ্ধতিটিকে পছন্দ করার কারণ হলোঃ এতে দ্বিতীয় সিজদার পর আর বসতে হয় না, সরাসরি পরবর্তী রকয়াতের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া যায়সাধারণ মানুষের জন্য নামাজের স্বাভাবিক রুকন বজায় রেখে এটি আদায় করা সহজ মনে করা হয়

৩. বর্ণনার পার্থক্যঃ মুহাদ্দিছীনগণ বলেন, ছ্বলাতুত তাছবীহ নিয়ে বিভিন্ন ছ্বহাবী রদ্বিআল্লাহু আনহুম উনাদের থেকে বর্ণিত হাদীছ শরীফ গুলোতে তাছবীহ পাঠের স্থান নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা আছে

আবু দাউদ শরীফে  ও ইবনে মাজাহ শরীফের বর্ণনায়ঃ কিরাতের পর ১৫ বার

তিরমিযী শরীফে ইবনে মুবারকের বর্ণনায়ঃ কিরাতের আগে ১৫ বার

সারকথাঃ অনলাইনে ভিন্নতা থাকার কারণ হলো, অধিকাংশ সাইট বা অ্যাপ কোনো একটি নির্দিষ্ট ফিক্বহী মাজহাব বা কোনো একজন ইমামের পছন্দ করা পদ্ধতিটি হুবহু কপি-পেস্ট করেআমরা মাজহাবি হলেও যেহেতু সরাসরি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শেখানো একটি পদ্ধতি বিদ্যমান তা শেয়ার করা ফরজ মনে করেছিকিন্তু উভয় পদ্ধতিতে আদায় হবে, তবে মূল পদ্ধতিতে ১০০% ছুন্নাহ মানা হবে

এখন আবার কেউ খারেজি ছালাফিদের মতো উনাকে তাকফিরে যেনো না যায়হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি (১১৮ হিজরী - ১৮১ হিজরী) ছিলেন ইছলামের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁকে মুহাদ্দিসগণ আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীছ” (হাদীছ  শরীফ শাস্ত্রের বিশ্বাসীদের নেতা) উপাধিতে ভূষিত করেছেন

ছ্বলাতুত তাছবীহ নামাযের বর্ণনার ক্ষেত্রে উনার নাম বিশেষভাবে পরিচিত, কারণ ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার ছুনান গ্রন্থে ছ্বলাতুত তাছবীহ অধ্যায়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার বর্ণিত পদ্ধতিটিই বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন

তবে আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার বর্ণিত পদ্ধতিটি তাওয়াত্তুর” (যুগ পরম্পরায় অকাট্যভাবে বর্ণিত) হিসেবে গণ্য নয়, বরং এটি ফিক্বহী কিতাবসমূহে মশহুর” (প্রসিদ্ধ) এবং মুস্তাহছান” (উত্তম বা পছন্দনীয়) পদ্ধতি হিসেবে গৃহীত

বিষয়টি আরও পরিষ্কার করার জন্য আরও খোলাখোলি ব্যাখ্যা করছিঃ

১. তাওয়াত্তুরবনাম মশহুর

তাওয়াত্তুরঃ এটি এমন বর্ণনা যা প্রত্যেক যুগে এত বিপুল সংখ্যক রাবী (বর্ণনাকারী) বর্ণনা করেছেন যে, তাতে ভুল হওয়া অসম্ভবছ্বলাতুত তাছবীহ নামাজের কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতিই তাওয়াত্তুরপর্যায়ে পড়ে না, কারণ এটি একটি নফল নামাজ

মশহুর ও মুস্তাহছানঃ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার পদ্ধতিটি ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার কিতাবে উল্লেখ করার কারণে এবং পরবর্তীতে ফক্বীহগণ (বিশেষ করে হানাফী ফক্বীহগণ) এটিকে সহজ মনে করে গ্রহণ করায় এটি জনসাধারণের মাঝে মশহুরবা সর্বাধিক পরিচিত হয়ে উঠেছে

২. কেন এই পদ্ধতিটি মশহুর হলো?

ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার ছুনান গ্রন্থে বলেনঃ ছ্বলাতুত তাছবীহ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক এবং আরও অনেক য়ালিম বর্ণনা করেছেন এবং তারা এর ফযীলত উল্লেখ করেছেনমূলত ইমাম তিরমিযী রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি যখন ছ্বলাতুত তাছবীহ অধ্যায়টি সাজান, তখন তিনি সরাসরি হাদীছ শরীফের (আবু দাউদ শরীফ, ১২৯৭) পাশাপাশি ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার য়া'মলকেও দলীল হিসেবে পেশ করেনফক্বীহগণ দেখেন যে, ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার পদ্ধতিতে সিজদা থেকে উঠে অতিরিক্ত বসতে (ইস্তিরাহাত) হয় না, যা নামাজের স্বাভাবিক গতির সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণএই কারণেই এটি অনলাইন এবং ফিক্বহী কিতাবগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার পদ্ধতির ছ্বলাতুত তাছবীহ-এর নিয়মঃ

তাছবীহঃ (سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ)

বাংলা উচ্চারণঃ ছুবহানাল্লাহী, ওয়ালহামদুলিল্লাহী, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার

নিয়াত ও ছানাঃ প্রথমে ৪ রকয়াত নামাজের নিয়ত করে ছুবহানাকা” (ছানা) পড়ার পর ১৫ বার তাছবীহটি পড়তে হবে

ছুরাহ পাঠের পরঃ এরপর আয়ুজুবিল্লাহ-বিছমিল্লাহ পড়ে ছুরাহ ফাতিহা শরীফ ও অন্য একটি ছুরাহ মিলিয়ে পড়ার পর রুকুতে যাওয়ার আগে দাঁড়ানো অবস্থায় আরও ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

রুকুতেঃ রুকুতে গিয়ে রুকুর তাছবীহ (ছুবহানা রব্বিয়াল য়াজীম) পড়ার পর ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

কওমায় (রুকু থেকে দাঁড়িয়ে): রুকু থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রব্বানা ওয়া লাকাল হামদপড়ার পর দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

প্রথম সিজদায়ঃ সিজদায় গিয়ে সিজদার তাছবীহ (ছুবহানা রব্বিয়াল য়ালা) পড়ার পর ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

জলসায় (দুই সেজদার মাঝে): প্রথম সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে বসে জলসার তাছবীহ আল্লাহুম্মাগ্বফিরলী ২ বারপড়ার পরে ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবে

দ্বিতীয় সিজদায়ঃ পুনরায় সিজদায় গিয়ে সিজদার তাছবীহ পাঠের পর ১০ বার তাছবীহ পড়তে হবেঅতঃপর রেগুলার নামাজের মতো সিজদা থেকে দাঁড়াবে

স্বরনীয় যেঃ দ্বিতীয় রকয়াতে জলসায় বসে আত্তাহিয়াতু + দুরুদ শরীফ পড়ে তৃতীয় রকয়াতে দাঁড়াবে

গুরুত্বপূর্ণ নোটঃ এইভাবে এক রকয়াতে মোট ৭৫ বার তাছবীহ সম্পন্ন হবে৪ রকয়াতে ৩০০ বার

সময়ঃ এই নামাজ প্রতিদিন একবার, যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে সপ্তাহে একবার, তাও না পারলে মাসে একবার, তাও না পারলে বছরে একবার, অথবা জীবনে অন্তত একবার হলেও পড়ার জন্য হাদীছ শরীফে তাগিদ দেওয়া হয়েছে