10.09.2018

 ৬৫’র যুদ্ধে ব্যর্থতার পর আইয়ূব খানের পুনর্জীবন লাভ, ছয় দফার হাক্বীক্বত ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি (২)

৬৫’র যুদ্ধে ব্যর্থতার পর আইয়ূব খানের পুনর্জীবন লাভ, ছয় দফার হাক্বীক্বত ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি (২)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর) ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্রবলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একটি উপাধি রয়েছে। এই উপাধি তিনি অর্জন করেছিলেন আইয়ূবের সেনাশাসনের বিরুদ্ধে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে একত্রিত করে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা এনডিএফগঠনের মাধ্যমে। পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সোহরাওয়ার্দীর সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্যতায় শঙ্কিত হয়ে আইয়ূব সরকার তাকে কারারুদ্ধ করেছিল। কারাগারে থাকাকালীন সোহরাওয়ার্দীর হৃদরোগ দেখা দেয়। ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দী এজন্য হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে লন্ডন গমন করেন।

শেখ মুজিব শুরুতে ফ্রন্টের কার্যক্রমে খুব উৎসাহী ছিলেন, কিন্তু কিছুদিন না যেতেই তিনি ফ্রন্টের আরেকজন শরিক ভাসানীর অনুকরণে ফ্রন্টের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করতে লাগলেন। লন্ডনে সোহরাওয়ার্দীর হৃদরোগের চিকিৎসার সময়েও তিনি সেখানে গিয়েছিলেন ফ্রন্ট ভেঙে আওয়ামী লীগ নিয়ে বের হয়ে আসার প্রস্তাব নিয়ে। আতাউর রহমান খান এ প্রসঙ্গে স্বৈরাচারের দশ বছরগ্রন্থের ২৬৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেনঃ শেখ মুজিব খুব পীড়াপীড়ি করেছিলেন। কিন্তু নেতা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, যদি পার্টি রিভাইভ করা হয়, তা হলে আমি পাকিস্তানে ফিরে যাব না। আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারব না। দেশে ফিরে গিয়ে এনডিএফ এর কাজ কর।

কিন্তু লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে বৈরুতে হোটেলকক্ষে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হয়, আর এই সুযোগেই শেখ মুজিব ফের অস্থির হয়ে উঠলেন পার্টি রিভাইভের জন্য। ওদিকে আবুল মনসুর আহমদ তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, পার্টি রিভাইভ করতে এনডিএফের আরেকজন শরিক ভাসানীর ন্যাপও মুখিয়ে আছে, সুতরাং আগেভাগে পার্টি রিভাইভ করে এনডিএফ ভাঙার দায় যেন আওয়ামী লীগ একা না নেয়। কিন্তু শেখ মুজিবের তর সইছিল না, নিষেধ সত্ত্বেও তিনি আগেভাগে আওয়ামী লীগ দলটিকে পুনরুজ্জীবিত করলেন। এ প্রসঙ্গে আতাউর রহমান খান তার বইয়ের ২৯৬-২৯৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেনঃ সরকারী মহল খুশীতে বাগবাগ। কনভেনশন লীগের (আইয়ূব খানের সরকারী দল) প্রেসিডেন্ট জবর খাঁ  জবর খুশী হলেন। তিনি ও তার সেক্রেটারী হাশিম উদ্দিন অভিনন্দন জানালেন। মর্নিং নিউজ’ (সরকারপন্থী পত্রিকা) শেখ মুজিবের ছবি ছাপাল।

আয়ুব খাঁরও খুশী হবার কথা। তিনি প্রাণপণে এটা চেয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে যে সংগ্রামের হুমকি দিয়েছিল, সেটা বাদ দিয়ে নিজেদের মধ্যে ঘরোয়া সংগ্রামের যে সূত্রপাত করা হল, এতে নিশ্চয় তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

এর পর যথারীতি ন্যাপও রিভাইভড হয়ে গেল। কথা ছিল এক সঙ্গে হবার। যাতে কেউ কারও উপর দোষ চাপাতে না পারে। কিন্তু ন্যাপ টেক্কা মারল। চালাকী করে পিছে রইল। দোষটা ষোলআনা চাপল আওয়ামী লীগের ঘাড়ে।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবকে সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী হিসেবে তুলে ধরে গর্ববোধ করে থাকে। কিন্তু তৎকালীন ইতিহাসের নিরিখে আমরা দেখতে পাই যে, সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পূর্বে দেয়া নির্দেশও শেখ মুজিব ভঙ্গ করেছিলেন, যার ফলে অবধারিতভাবে লাভবান হয়েছিলেন সেনাশাসক আইয়ূব খান।

আরেকটি ঘটনা আতাউর রহমান খান উল্লেখ করেছেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময়কার। সে সময়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী ছিলেন শেখ মুজিব। আইয়ূব খানের গদি তখন টলটলায়মান। এ অবস্থায় পরিস্থিতি সামলাতে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে বৈঠকে বসতে চাইলেন তিনি। বন্দী শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে আইয়ূব খানের বৈঠকে নেয়া হবে, এমন অপমানজনক সিদ্ধান্ত হলো। শেখ মুজিব তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন, তাকে উৎসাহ দিলেন ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়া।

কিন্তু অন্যান্য বন্দীরা তার তীব্র প্রতিবাদ জানালেন, বললেন মামলা প্রত্যাহার না হলে কিছুতেই আইয়ূবের সাথে এক টেবিলে বসা যাবে না। শেষ পর্যন্ত সঙ্গী বন্দিদের চাপের মুখে শেখ মুজিব প্যারোলে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। পরিশেষে আইয়ূব খান মামলা প্রত্যাহার করলে শেখ মুজিব তার সাথে মিটিংয়ে যোগদান করেন।

এখানে প্রশ্ন হতেই পারে, শেখ মুজিব কেন প্যারোলে আইয়ূব খানের সাথে মিটিং করার অসম্মানজনক প্রস্তাবে শুরুতে রাজী হয়েছিলেন? উত্তরটি দেয়া কঠিন কিছু নয়।

পরিশেষে বলতে হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। ছয় দফা প্রণয়নের পর আইয়ূববিরোধী সম্মেলন যখন ভেঙে গেল, তারপর আইয়ূব খান একে কেন্দ্র করে উস্কানীমূলক বক্তব্য দিতে লাগল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য। এ প্রসঙ্গে আতাউর রহমান খান বইয়ের ৩৫৮-৩৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেনঃ যুদ্ধের পর আয়ুব খাঁ লাহোরে কোনো জনসভা করতে সাহস করেন নাই। যুদ্ধের গ্লানি, অপরিসীম ধ্বংস ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চয়ই তাকে অভিভূত করার কথা। যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধা করতে না পেরে রাজনীতি ক্ষেত্রে নামলেন। শত্রুর সাথে আপোষ নিষ্পত্তি সম্পন্ন করে দেশবাসীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করলেন।

প্রথমঃ ছয় দফা। এর বিরুদ্ধে বক্তৃতা করলেন। ছয় দফা পাকিস্তানের ধ্বংসকামী। এর উদ্দেশ্য পূর্ব পাকিস্তানকে পৃথক ও স্বাধীন করা।

দুই নম্বরঃ পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ বা সিভিল ওয়ারের আশঙ্কা। কার সাথে, কোথায়, কবে তা কিছু বললেন না। তিনিই বা কোথা থেকে এ গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য আবিষ্কার করেছেন তাও জানা গেল না। উত্তরে আমরাও বললাম,যদি গৃহযুদ্ধ বেঁধেই যায় তা হলে তার দায়িত্বও ষোল আনা আপনাকে নিতে হবে। অন্য কেউ এর বিন্দু বিসর্গও জানে না।

সম্বিৎ ফিরে পাবার পর এ বিষয়ে আর বেশী বাড়াবাড়ি করেন নাই। ভাবলেন, কথাটা বড় বেমৌকা হয়ে গেছে। গুলি ফসকে গেছে।

তিন নম্বরঃ জাতীয় সংহতি-ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন। কোথায় অসংহতি? তবুও সংহতি সংহতি বলে চীৎকার উঠেছে কায়েমী স্বার্থবাদী মহলে। আসল সমস্যা সমাধান না করার এ সব বাহানা।

এই সব বিভ্রান্ত-প্রচারণা কিছুদিনের জন্য দেশের প্রভূত ক্ষতি সাধন করে। মানুষের ভেতর অনাস্থা, অবিশ্বাস সৃষ্টি করা হয়। ভবিষ্যৎ মঙ্গল সম্বন্ধে সকলেই সন্দিহান হয়ে পড়ে। বিশ্বাসের গোড়া একবার নড়ে উঠলে, আর তাকে শক্ত করা যায় না।

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! আইয়ূব খান যতগুলো বক্তব্য দিয়েছিল, তথা পূর্ব পাকিস্তানের পৃথকীকরণ, গৃহযুদ্ধ এবং জাতীয় অসংহতি, প্রত্যেকটিই একাত্তরে তীব্র সত্য হয়ে দেখা দিল। আতাউর রহমান খান বইটি প্রকাশ করেছিলেন ১৯৭০ সালে, মুক্তিযুদ্ধ তখনও হয়নি। তিনি তাই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে কোথায় গৃহযুদ্ধ! কোথায় অসংহতি! মূলত পাকিস্তানী সেনাশাসকেরা যেই ছক সাজিয়েছিল ক্ষমতা ধরে রাখতে, তা তারা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল। আইয়ূব খান হয়তো ভেবেছিল, ছয় দফা দিয়ে তার বিরোধীদলের জমায়েত বানচাল করা হবে, আবার এই ছয় দফাকে উছিলা করে গৃহযুদ্ধ ও অসংহতির হুজুগ তুলে পূর্ব পাকিস্তানকে শত্রু দেখিয়ে বিক্ষুব্ধ পশ্চিম পাকিস্তানকে ঠাণ্ডা করাও সম্ভবপর হবে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে শত্রু বানাতে গিয়ে পরিশেষে পাকিস্তানই ভেঙে গেল। ধূর্ত রাজনীতিবিদ ও স্বৈরাচারী শাসকদের পর্দার আড়ালের কূটকৌশলের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের লক্ষ লক্ষ মুসলমান শহীদ হলো।

আসলে এই যে তন্ত্র-মন্ত্রের জাল, তথা গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-স্বৈরতন্ত্র ইত্যাদি, এসবের সাজানো ছকেই মুসলমানরা ঘুরপাক খাচ্ছে, ব্যবহৃত হচ্ছে, হত্যা ও সম্ভ্রমহানির শিকার হচ্ছে। আতাউর রহমান খান তার বইতে লিখেছেন, যখন আইয়ূব খান ভারতের সাথে অস্ত্রবিরতি চুক্তি করলেন, তখন লাহোরে পাকিস্তানী সেনাদের বিধবা স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা মিছিল করেছিল এই বলে যে, তাদের স্বামীরা শাহাদাতের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে নাই। অকারণে তাদের মূলবান জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। অর্থাৎ স্বামী-সন্তান হারানোর পর তাদের বোধ হয়েছিল যে, তারা বৃথা মরীচিকার পেছনে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছে, পুরোটাই ছিল রাজনীতিবিদদের নিজস্ব স্বার্থের খেলা মাত্র।

এই বোধ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মাঝেই জাগ্রত হতে হবে। বর্তমানে তারা সকলেই ফাঁকা অন্তঃসারশূন্য বস্তুর জন্য লড়ছে, অর্থ ও জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। হোক সে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ছয় দফা কিংবা সাতচল্লিশের পাকিস্তান আন্দোলন, প্রচলিত ইতিহাসের বয়ান কর্তৃক বিরাট মহিমা প্রদানের আড়ালে বাস্তবে সবই অন্তঃসারশূন্য। কারণ এগুলোর জন্ম হয়েছে রাজনীতি তথা তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে, আর তন্ত্রমন্ত্র থেকে উদ্ভূত সংগ্রাম, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক আন্দোলন সবই পর্দার আড়ালের খেল মাত্র। এসব থেকে মুসলমানদের লাভ করার কিছুই নেই। একমাত্র খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওয়াত থেকেই মুসলমান তার অভীষ্ট লক্ষ্য, দুনিয়া ও আখিরাত উভয়েরই, আদায় করে নিতে পারে।

10.05.2018

৬৫’র যুদ্ধে ব্যর্থতার পর আইয়ূব খানের পুনর্জীবন লাভ, ছয় দফার হাক্বীক্বত ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি (১)

৬৫’র যুদ্ধে ব্যর্থতার পর আইয়ূব খানের পুনর্জীবন লাভ, ছয় দফার হাক্বীক্বত ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি (১)


ইতিহাস দুপ্রকার, প্রচলিত ইতিহাস ও বাস্তব ইতিহাস। প্রচলিত ইতিহাস তৈরী হয় শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য, জনগণের মগজ ধোলাইয়ের জন্য, যার মাধ্যমে কখনোই প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তব ইতিহাস হয় নিষিদ্ধ ইতিহাস, সরকার কর্তৃক তার প্রচার নিষিদ্ধ হয়। অর্থাৎ বাস্তব ইতিহাস হলো মুখ, আর প্রচলিত ইতিহাস হচ্ছে তাকে আড়াল করে রাখা মুখোশ।

আমাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাসে ছয় দফার ভূমিকা অপরিসীম। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী এর মাধ্যমেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দাবি উত্থাপিত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু যদি বলা হয় যে, ছয় দফা উত্থাপিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বার্থে নয়, বরং আইয়ূব খানের শাসনকাল দীর্ঘায়িত করার জন্য? বাস্তব ইতিহাস কিন্তু তা-ই বলে থাকে।

৬৫র যে পাক-ভারত যুদ্ধ, তা সংঘটিত হয়েছিল কাশ্মীরের বিরোধকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধে আইয়ূব খান জনগণের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল কাশ্মীরকে পাকিস্তানে এনে দেয়ার। কিন্তু শেষপর্যন্ত আইয়ূব খান তৎকালীন কমিউনিস্ট রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের আমন্ত্রণে ভারতের সাথে অস্ত্রবিরতি চুক্তি সম্পাদন করে। তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার অন্তর্ভূক্ত তাসখন্দে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়। যেই কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ, চুক্তিতে সেই কাশ্মীরের নামও উল্লেখ করা হয়নি।

এতে করে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের জনগণ তীব্র আইয়ূববিরোধী হয়ে উঠে, কারণ ভারত পশ্চিম পাকিস্তানেই মূল আক্রমণ করেছিল, বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো আক্রমণ হয়নি। তৎকালীন সময়ের একজন উল্লেখযোগ্য রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খান রচিত স্বৈরাচারের দশ বছরবইতে সে সময়কার ঘটনাবলীর উল্লেখ রয়েছে। তিনি ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের চীফ মিনিস্টার। তিনি তার বইয়ের ৩৫৪-৩৫৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেনঃ

পশ্চিম পাকিস্তানে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অসংখ্য শহর বাজার গ্রাম ধ্বংস হয়েছে। বিদেশ থেকে আমদানী করা অতি মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেরা সৈনিক নিহত হয়েছেন। পৃথিবীর কোনো যুদ্ধে নাকি এত অল্প সময়ে এত অফিসার নিহত হয় নাই। তাদের স্থান পূরণ করা সম্ভব হবে না।

তাই, পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিরূপ। এত ক্ষয়ক্ষতির পর আয়ুব খাঁ সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে অপমানজনক একটি ঘোষণায় স্বাক্ষর করলেন। যে সব সৈনিক কর্মচারী শহীদ হয়েছেন তাদের বিধবা স্ত্রী ও পরিবারবর্গ এক মিছিল বার করল লাহোর শহরে। ধ্বনি তুলল, আমাদের স্বামী পুত্র ফেরত দাও।

১৯৫৮ সালে আইয়ূব খান ক্ষমতায় আসার পরই সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে এবং রাজনীতিবিদদের ক্ষমতাচ্যুত করে। সমগ্র দেশে সেনাবাহিনী কর্তৃক রাজনীতিবিদদের সমালোচনা শুরু হয়ে যায় এই বলে যে, এদের দিয়ে পাকিস্তানের কোনো উন্নতি হবে না, সুতরাং এদেরকে পদচ্যুত করে সেনাশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আলোচ্য বইয়ের লেখক আতাউর রহমান খানও পূর্ব পাকিস্তানের চীফ মিনিস্টারপদ হারায় আইয়ূব খানের সেনাশাসনের ফলে।

সুতরাং পঁয়ষট্টির যুদ্ধের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিকে তৎকালীন রাজনীতিবিদরা সেনাশাসনের বিরুদ্ধে বিরাট সুযোগ হিসেবে ধরে নিল। যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তান ছিল আইয়ূব খানের বিশেষ বিরোধী, সে কারণে লাহোরে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ কর্তৃক ডাকা হলো নিখিল পাকিস্তান জাতীয় কনফারেন্স। এই সম্মেলন প্রসঙ্গে আতাউর রহমান খান তার বইয়ের ৩৫৫-৩৬০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেনঃ

জামাত, নিজাম ও কাউন্সিল লীগ যোগদানের সম্মতি দিল। আওয়ামী লীগের দোমনাভাব। শেখ মুজিবের মতামতই দলের মত। প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন অভিমত নাই। শেখ মুজিব কনফারেন্সে যোগদানে অসম্মতি জ্ঞাপন করলেন।...

পরদিন সংবাদপত্রে দেখি, শেখ মুজিব সদলবলে লাহোর যাচ্ছেন। প্রায় চৌদ্দ পনেরো জন এক দলে। ব্যাপার কি? হঠাৎ মত পরিবর্তন! মতলবটা কি?

লাহোর কনফারেন্স শুরু হল গভীর উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে। অধিবেশন চলাকালে শেখ মুজিব হঠাৎ একটি বোমা নিক্ষেপ করলেন-ছয় দফা। এই দাবী যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, এই সম্মেলন ও এই সময় তার উপযোগী নয়-সম্পূর্ণ অবান্তর।

লাহোর কনফারেন্স বানচাল হয়ে গেল। নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবকেই এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, শেখ মুজিব সরকার পক্ষ থেকে প্ররোচিত হয়ে এই কর্ম করেছেন। লাহোর পৌঁছার সাথে সাথে আয়ুব খাঁর একান্ত বশংবদ এক কর্মচারী শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করে কি মন্ত্র তার কানে ঢেলে দেয় যার ফলেই মুজিব সব উলটপালট করে দেয়। তারা এও বলে যে আওয়ামী লীগের বিরাট বাহিনীর লাহোর যাতায়াতের ব্যয় সরকারের নির্দেশে কোন একটি সংশ্লিষ্ট সংস্থা বহন করে। আল্লাহু আলীমুল গায়েব।

লাহোর কনফারেন্সের নিস্ফলতা পাকিস্তানের রাজনীতির ইতিহাসের একটা কলঙ্কময় অধ্যায়। সে দিন পরিস্থিতি এমনি উত্তেজনাপূর্ণ ছিল যে কনফারেন্স সাফল্যের সাথে সম্পাদিত হলে দেশময় যে বিরাট বৈপ্লবিক আন্দোলন শুরু হয়ে যেত, তার মুখে সরকারের টিকে থাকা দায় হতো। নেতৃত্বের কোন্দলে সরকারই একমাত্র লাভবান। সরকার আরও স্থিতিশীলতা লাভ করল।

উল্লেখ্য, আতাউর রহমান খান কর্তৃক স্বৈরাচারের দশ বছরগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে। তখনও কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়নি, ফলে শেখ মুজিব তখনও কিংবদন্তী নেতার আসনে সমাসীন নন। সুতরাং উপরোক্ত বর্ণনাগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাছাড়া আতাউর রহমান খান নিজেই ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতা, ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দলটির সহসভাপতি।

আমরা জানি যে, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ার পরও শেখ মুজিবকে ক্ষমতা দেয়া হয়নি। প্রচলিত ইতিহাসে একে উল্লেখ করা হয় পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক বাঙালিদের ক্ষমতা না দিতে চাওয়ার ইচ্ছাকে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সাতচল্লিশে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে আটান্নতে আইয়ূব সরকার ক্ষমতায় আসার আগপর্যন্ত এই দশ-এগারো বছর সময়ের মধ্যেই তিনজন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে। তারা হলেন খাজা নাজিমুদ্দীন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বগুড়ার মুহম্মদ আলী। সুতরাং নিছক বাঙালিবিদ্বেষ নয়, শেখ মুজিবকে ক্ষমতা না দেয়ার নিশ্চয়ই অন্য কোনো কারণ উপস্থিত ছিল।

শেখ মুজিবকে ক্ষমতা না দেওয়ার জন্য যাকে মূল দায়ী করা হয়, সেই জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিল আইয়ূব সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ৬৫র যুদ্ধের পর ভারতের সাথে অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে তার কোনই সম্মতি ছিল না। কিন্তু আইয়ূব খানের জোরাজুরিতে সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সোভিয়েত রাশিয়ার তাসখন্দে গিয়ে চুক্তি করে আসে এবং এর পরপরই সে আইয়ূব খানের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে। পরবর্তীতে পাকিস্তানের আইয়ূববিরোধী আন্দোলনে সে পশ্চিম পাকিস্তান অংশে মূল ভূমিকা পালন করে।

উল্লেখ্য, সত্তরের নির্বাচন ছিল আইয়ূব খানকে ক্ষমতাচ্যুত করার ফসল। এখন লাহোর কনফারেন্স বানচাল করে আইয়ূব খানের সেনাশাসনকে স্থিতিশীলতাদান করেছিলেন শেখ মুজিব, আইয়ূববিরোধী হিসেবে জুলফিকার আলী ভুট্টো তা ভালো করেই জানতো। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিটি রাজনীতিবিদ ছিল এ কারণে শেখ মুজিবের প্রতি রুষ্ট। সুতরাং তারা স্বাভাবিকভাবেই আইয়ূব খানের ক্ষমতাচ্যুতির পর শেখ মুজিবের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়াটা চাইবে না। এছাড়াও আতাউর রহমান খান তার বইতে শেখ মুজিবের আরেকটি কীর্তি আলোচনা করেছেন, তা হলো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গঠিত আইয়ূব সরকার বিরোধী ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টবা এনডিএফভেঙে দেয়া। (আগামী পর্বে সমাপ্ত)

8.27.2018

আন্তর্জাতিক বানিজ্যে ডলার পরিত্যাগের হিড়িক পড়েছে, এখন থেকে চিন-বাংলাদেশ নিজ মুদ্রায় করবে ব্যবসা

আন্তর্জাতিক বানিজ্যে ডলার পরিত্যাগের হিড়িক পড়েছে, এখন থেকে চিন-বাংলাদেশ নিজ মুদ্রায় করবে ব্যবসা


আমেরিকান আগ্রাসনের বিপরীতে অত্যন্ত খুশির একটি খবর হলো এখন থেকে চীন থেকে যেকোন মালামাল আমদানির জন্য ডলারেআর ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হবে না। সরাসরি চীনা মুদ্রা ইউয়ান দ্বারা ঋণপত্র খোলা যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হয়েছে বলে মনে করছি। কারন এতোদিন চিন থেকে মালামাল আমদানির জন্য প্রথমে ডলার ক্রয় করতে হতো এতে অনেক সময় দেখা যেতো ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী টাকার মান কমে গেছে, যার দরুন ১ ডলার ৮১/৮২ টাকার যায়গায় ৮৪/৮৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। দেখতে পারেনঃ [https://www.youtube.com/watch?v=SrWpJfe27UA]

তবে এই ঝামেলার আর লসের দিন প্রায় শেষের দিকে কারন এখন থেকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা দেশি টাকা দিয়ে সরাসরি চীনা মুদ্রা কিনবেন এবং তা দিয়েই ঋণপত্র খুলবেন। বিপরীতে চীনা ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশি টাকায় তাদের ঋণপত্র খুলবেন। অর্থাৎ চীন-বাংলাদেশ আমদানি-রফতানি ব্যবসার ক্ষেত্রে ডলারের আর কোন প্রয়োজন নেই। খবরে বলা হয়েছে, এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-খরচ কমবে, সময়ের অপচয়ও রোধ হবে। বলা বাহুল্য, এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত; যার জন্য বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোকে একটা ইউয়ানঅ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। যারা বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন; তাদের মতে, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কার্যত চীনা মুদ্রা ইউয়ানকেআন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হল। অবশ্য ইউয়ানআন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। স্পেশাল ড্রইয়িং রাইটসহিসেবে যে কয়টি মুদ্রাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তার মধ্যে চীনা ইউয়ানও আছে। আর আমাদের ক্ষেত্রে ইউয়ানধীরে ধীরে গুরুত্ব লাভ করেছে। দেখতে পারেন [https://for.tn/2dIXTRt]

প্রতিবেশী দেশ হওয়ার দরুন ঘটনাক্রমে চীন ও ভারত আমাদের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি হয় চীন থেকে, তারপরই ভারতের স্থান। চীন থেকে আমদানির পরিমাণ সর্বশেষ হিসাবে এক লাখ কোটি টাকারও বেশ কিছুটা বেশি। ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ হবে মোটামুটি ৬০-৬৫ হাজার কোটি টাকা। তথ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ২৮-৩০ শতাংশ আমদানিই চীন থেকে। এ সূত্রেই চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান সিদ্ধান্তটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল বয়ে আনবে বলে অনেকেই মনে করছেন। আর এ মুহূর্তে বর্তমান সিদ্ধান্তে চীন ও বাংলাদেশ উভয়ই উপকৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2PDPrla]

তবে অনেকদিন যাবত চীনা ইউয়ানবড় একটা চাপের মধ্যে আছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন যাবত। এর শেষ পরিণতি কী হবে তা এখন পর্যন্ত কেউ ই জানে না। তবে দৃশ্যতই চীনা অর্থনীতি চাপের মধ্যে আছে। চীনের পুরো উন্নয়নই রফতানি নির্ভর এবং দুর্ভাগ্যক্রমে এই রফতানির বড় বাজারই হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর একারণেই যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতএব যুক্তরাষ্ট্র চীনা আমদানির ওপর কর বসিয়েছে। পাল্টা কর বসিয়েছে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর। এর ফলাফল কী হবে, আমরা জানি না। কিন্তু চীনকে তার অর্থনীতি ঢেলে সাজাতে হচ্ছে। এর মধ্যেই চীনা মুদ্রা ইউয়ানেরমূল্য পতন হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটের বিপরীতে বেশ কিছুদিন যাবত চীনা ব্যবসায়ী ও সাপ্লাইয়াররা বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বলছিলেন ইউয়ানেএলসি খোলার জন্য। অর্থাৎ ডলারকে পরিহার করার জন্য। এটা করলে চীনের ওপর ডলারের চাপ কিছুটা কমবে। এ উদ্দেশ্যে চীন পাকিস্তানের সঙ্গেও আমদানি-রফতানি ক্ষেত্রে ইউয়ানব্যবহারে সম্মত হয়েছে। দেখতে পারেন [https://cnb.cx/2wsxInU]

এদিকে বাংলাদেশেও চলছে ডলার সংকট। সংকটটি বেশ পুরনো। গত বেশ কিছুদিনের মধ্যে প্রবল চাপের মুখে বাংলাদেশের টাকার মূল্য অবমূল্যায়িত হয়েছে। ৭৯-৮০ টাকার জায়গায় এখন প্রায় ৮৪/৮৫ টাকা দিয়ে এক ডলার কিনতে হচ্ছে। এর কারণ খুব সহজ। আমদানি ঋণপত্র ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। অথচ এর বিপরীতে রফতানি আয় বেড়েছে কম হারে। রফতানি আয় একই বছরে বেড়েছে ৬ শতাংশেরও কম। আরেকটা উৎস থেকে ডলার আয় হয়; আর সেটা হচ্ছে রেমিটেন্স। রেমিটেন্স আয় বেড়েছে ১৬-১৭ শতাংশ হারে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, আমদানির পরিমাণ খুবই বেশি। বেসরকারি খাতের আমদানি যেমন বেশি, তেমনি আমদানি বেশি সরকারি খাতেরও। সরকারের হাতে রয়েছে বেশ কিছু অবকাঠামোর কাজ। এর জন্য বিশাল বিশাল আমদানির দরকার হচ্ছে। অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতের আমদানিও বাড়ছে। সর্বোপরি রয়েছে একটা বড় এলসি এবং তা হচ্ছে রূপপুর আণবিক প্রকল্পেরজন্য। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী দেশ থেকে টাকা পাচার করার জন্য বেশি বেশি আমদানি এলসিকরছে। ফলে ডলার সংকট দেখা দিয়েছে। সংকটটি শুধু ডলারের নয়। ব্যাংকে-ব্যাংকেও দেখা দিয়েছে তারল্য সংকট। অনেক বেসরকারি ব্যাংকের ফান্ড নেই। তারা ঋণ দিয়েছে বেশি অথচ আমানত সংগ্রহের পরিমাণ কম। বছরখানেক ধরে এটা ঘটে যাচ্ছে। সরকারি ব্যাংকে ফান্ডআছে, কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে ঋণের নিষেধাজ্ঞা জারি আছে বলে জানা যায়। এ প্রবল তারল্য সংকট মোকাবেলায় সরকার বেসামাল হয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে নানা সুবিধা দিতে শুরু করে। এরই মধ্যে আবার সুদনীতি নিয়ে সরকার কড়াকড়ি আরোপ করে। ঋণের ওপর ৯ শতাংশ সুদ করতে হবে এবং আমানতের ওপর ৬ শতাংশ। এসব কারণে ব্যাংকিং খাত এখন এক অস্থিতিশীলতার মধ্যে রয়েছে। টাকার সংকট যেমন আছে, তেমনি চলছে ডলারের সংকট। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2wq9Ql4]

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৩২-৩৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমিত হয়ে আছে। এর থেকে বেশি নিচে রিজার্ভকে নামানো যাবে না। এদিকে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি সর্বকালীন রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। একইভাবে রেকর্ড ভঙ্গ করেছে ব্যালেন্স অব পেমেন্টপরিস্থিতিও। অবস্থা এমন হয়েছে যে, ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) মতো প্রতিষ্ঠানও ডলারের অভাবে এলসিখুলতে পারছে না। বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের এলসিখুলতে অস্বীকৃত হয়েছে। এটা খুবই খারাপ খবর। কারণ তারা তেল আমদানি করে, যা ছাড়া যাতায়াত ও মালামাল পরিবহন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রয়োজন মতো ডলার দিতে পারছে না। এদিকে ডলারের টানাটানিতে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতির চাপ অনুভূত হচ্ছে। বিদেশে চিকিৎসার খরচ, পর্যটকদের ভ্রমণ খরচ ও বিদেশে পড়াশোনার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। যারা বিদেশ থেকে স্বল্পকালীন ঋণ এনেছে, তাদের ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুদ এবং আসল উভয়ই। সরকারের ঋণের বোঝাও বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে ইউয়ানে ব্যবসা আমাদের সংকটকে কি কিছুটা লাঘব করবে? দেখতে পারেন [https://reut.rs/2o9m2Tt]

উল্লেখ্য, সারা বিশ্বেই চলছে এক অস্থিতিশীলতা। সর্বসাম্প্রতিক সমস্যা হচ্ছে তুরস্কের লিরার। লিরাতুরস্কের মুদ্রার নাম। তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা চলছে। আমেরিকান এক এজেন্ট ধর্মযাজককে তুরস্ক জেলে পুরে রেখেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার মুক্তি চায় যেকোন মুল্যে। কিন্তু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান তা করবেন না। যুক্তরাষ্ট্র ক্ষ্যাপে গিয়ে তুরস্কের সঙ্গেও বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছে। তুরস্ক থেকে আমদানিকৃত স্টিল এবং এলুমিনিয়ামের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আমদানি কর বসিয়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে তুরস্ক। এ সংকটে পড়ে তুরস্কের কারেন্সি লিরারমূল্য পতন শুরু হয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকায় তুরস্কের সমস্যা গিয়ে পড়ছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর। মজার বিষয়, এর প্রভাব পড়েছে ভারতীয় অর্থনীতিতেও, যা আমাদের জন্যও বেশ গুরুত্ব বহন করে। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2PEfI31]

দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ভারতের আমদানি খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে ডলারের দামে। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দাম অনেকটাই পড়ে গেছে। এক বছর আগে যেখানে এক ডলারের বিপরীতে মাত্র ৬৪-৬৫ ভারতীয় রুপি পাওয়া যেত; সে জায়গায় এখন পাওয়া যাচ্ছে ৭০ রুপিরও ওপরে। বলা বাহুল্য, এর প্রভাব আমাদের ওপর পড়ছে। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান কমলে দৃশ্যত আমাদের লাভ। কারণ আমরা ভারত থেকে এক বছরে ৬০-৬৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য সরকারিভাবে আমদানি করি। ভারতীয় রুপির দাম কমলে আমাদের আমদানিকারকের লাভ। পর্যটক যারা, তাদের লাভ। যারা অধ্যয়নের জন্য ভারতে যায়, অথবা যায় চিকিৎসার জন্য, তাদের লাভ। কারণ ৮৪ টাকা দিয়ে ডলার কিনে পাওয়া যায় ৭০-৭১ ভারতীয় রুপি। বিনিময় হার ৮০ শতাংশের ওপরে। বেশ ভালো বিনিময় হার। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2Mz4hM8]

কিন্তু এ সবই অঙ্কের কথা। বাস্তবে ভারতীয় বাজার কেমন- তা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। রিজার্ভ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ৪ শতাংশ। কিন্তু তা এর মধ্যে পাঁচ শতাংশের বেশি বলে কাগজে দেখলাম। অর্থাৎ বিনিময়পত্রের দাম বাড়ছে। তাহলে আমাদের আমদানিকৃত পণ্যের দামও বাড়বে। ভারত থেকে আমরা প্রচুর ভোগ্যপণ্য আমদানি করি। এর মধ্যে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মসলা ইত্যাদি রয়েছে। ভারতে এ সবের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে বাংলাদেশেও তা ঘটবে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতাও আমাদের বর্তমান ডলার সংকটকে উসকে দিচ্ছে। এ অবস্থায় সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরিভাবে প্রয়োজন। দেখতে পারেন [https://bit.ly/2PzTxel]