
আমাদের
আজকের আলোচনা হলো পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে কেন্দ্র করে। আপনারা অনেকেই অবগত আছেন, আমি সাধারণত সেই দলের কেউ
নই যারা মনে করেন কালামুল্লাহ শরীফের মধ্যে জাহেরিভাবে যা দেখা যায় তাই যথেষ্ট, এবং
পূর্ববর্তী উলামায়ে-কেরামগণের তাফছীরই শেষ কথা। বরং আমি ক্বুরআন শরীফ নিয়ে তাফাক্কুর ও তাদাব্বুর
করতে পছন্দ করি, কারণ মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই মানুষকে উনার কালাম নিয়ে গভীরভাবে
চিন্তা করার আহ্বান জানিয়েছেন, আহ্বান বললে ভুল হবে বরং তাফাক্কুর ও তাদাব্বুর না
করার উপর তিরস্কার করে বলেনঃ (اَفَلَا یَتَدَبَّرُوۡنَ
الۡقُرۡاٰنَ اَمۡ عَلٰی قُلُوۡبٍ اَقۡفَالُهَا) তারা কি (পবিত্র কিতাব) আল-ক্বুরআন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির
করে না? নাকি তাদের ক্বলবসমূহে তালা লাগানো আছে? (ছুরাহ আল কিতাল ৪৭/২৪ ও ছুরাহ
আন-নিছা ৪/৮২) এই আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে ক্বুরআনের উপর
তাদাব্বুর করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রত্যেক ইনছানকে, সাথে যে ব্যক্তি ক্বুরআন নিয়ে চিন্তা করে না, তার হৃদয়ের
উপর তালা থাকার কথা বলা হয়েছে। এখন যারা মনে
করে যে কিছু পূর্ববরতি ইমামদের জন্যেই চিন্তা ফিকির করা খাছ ছিলো, তারা তাফছীর
লিখে আমাদের উদ্ধার করে গেছেন, আমরা এখন চিন্তা ফিকির থেকে মুক্ত, যে দেওয়া হয়েছে
তা চোখ বুঝেই গেলা হবে, নাহলে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়ে যাবে, তারা উক্ত
আয়াত অস্বীকার করে মুরতাদ হয়ে যাক আমার কিছুই করার নাই। এছাড়াও আমি পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফের ক্ষেত্রে পারস্পরিক
আয়াতগত রাবতা অন্বেষণকেও জরুরি মনে করি। আমি
এ কথাও মনে করি না যে, ক্বুরআন শরীফের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কেবল কিছু নির্দিষ্ট
পূর্ববর্তী ব্যক্তির হাতেই চিরতরে সমাপ্ত হয়ে গেছে, আর পরবর্তীদের কাজ শুধু তা
কপি-পেস্ট করা, কেননা খোদ মহান আল্লাহ তায়ালাই সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেনঃ (كِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰهُ اِلَیۡكَ مُبٰرَكٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِهٖ وَ
لِیَتَذَكَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ) এটি
একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে
গভীরভাবে চিন্তা করে এবং (কেবল) উলুল আলবাবেরাই (এর থেকে) নছীহত গ্রহণ করে। (ছুরাহ আছ-ছ্বদ ৩৮/২৯) ক্বুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার
অন্যতম উদ্দেশ্যই হলোঃ “আয়াতসমূহ নিয়ে তাফাক্কুর-তাদাব্বুর করা, হিদায়াত গ্রহণ করা”
কেননা মহান আল্লাহ তায়ালাই বলছেনঃ (كَذٰلِكَ
یُبَیِّنُ اللّٰهُ لَكُمُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّكُمۡ تَتَفَكَّرُوۡنَ) এভাবেই মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য
(উনার) আয়াতসমূহ খুলে খুলে বর্ননা করেন, যাতে তোমরা তাফাক্কুর করো। (ছুরাহ আল বাক্বারাহ ২/২১৯) এর পরে আর কিছু বলার
দরকার আছে বলে কনে করিনা তাদের যারা বলবে আপনি কি পূর্বর্তি ইমামদের মতামতের চেয়ে
বেশী বুঝেন, কারন এই ধরণের কথাবার্তা মহান আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশিত
তাফাক্কুর-তাদাব্বুর এর হুকুম কে ডিমোরালাইজড করে মানুষকে ক্বুরআন নিয়ে চিন্তা
ফিকির করা থেকে দূরে সরাই রাখে। মনে রাখতে
হবে যে, কালামুল্লাহ শরীফ এমন আজিম এক কিতাব, যার মধ্যে প্রত্যেক যুগেই নতুন করে
ভাবার, বোঝার এবং উপলব্ধি করার সুযোগ রয়েছে। এই কালামের মধ্যে এমন দিগন্ত রয়েছে, যা প্রত্যেক
যুগে নতুনভাবে উন্মোচিত হতে পারে। কিছু অর্থ
আছে, যা আউওয়াল থেকে আখির পর্যন্ত সমভাবে সত্য; আবার কিছু স্তর আছে, যা গভীর
তাদাব্বুরে নতুন আলো দেয়, দিতে পারে। অনেক বিষয়ে
প্রথম যুগ ও শেষ যুগ একই অর্থ উপলব্ধি করতে পারে, আবার অনেক বিষয়ে নতুনভাবে
সম্পর্ক ও ইঙ্গিত আবিষ্কার হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এই
কারণে আল-ক্বুরআনের কোনো ব্যাখ্যা যদি ক্বুরআন, হাদীছ এবং ছুন্নাহ দ্বারা
সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হয়, তাহলে সেই বিষয়ে ভিন্নমত বা ইখতিলাফ করার সুযোগ
থাকে। যদি কোনো মত আল-ক্বুরআনের ভাষা, প্রসঙ্গ এবং লজিকের
সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেই মতকে আলোচনায় উপস্থাপন করাও দোষের কিছু
নয়। কেউ যদি তা গ্রহণ না করেন, তাতেও সমস্যা নেই; কারণ ক্বুরআনের
তাফছীরের ইতিহাসে বহু বিষয়ে বিভিন্ন মত বিদ্যমান ছিল এবং তা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ
করা হয়েছে। সুতরাং যত বড় ইমামই কোনো
ব্যাখ্যা দিয়ে থাকুন না কেন, যদি সেই ব্যাখ্যা আল-ক্বুরআন, ছুন্নাহ ও ছ্বহীহ হাদীছ,
এবং আয়াত শরীফের অভ্যন্তরীণ লজিক দ্বারা এমনভাবে প্রমাণিত না হয় যে সেখানে আর কোনো
শক্তিশালী ভিন্নমতের সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না, তাহলে ঈলমী ও মানতেকি ইখতিলাফের দরজা
বন্ধ হয়ে যায় না। কেউ যদি তা মেনে নিতে না পারেন,
সেটি ভিন্ন কথা; কিন্তু দলিলভিত্তিক ভিন্নমতের অধিকার অস্বীকার করার কোন সুযোগ নাই।
এবার
আসি মূল বিষয়েঃ পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন এক রাত, যার মর্যাদা ও মাহাত্ম্য
স্বয়ং মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি উনার কালামুল্লাহ শরীফে নিজেই ঘোষণা করেছেন। এই রাতকে তিনি শুধু বরকতময়ই বলেননি, বরং একে হাজার
মাসের চেয়েও উত্তম বলে অভিহিত করেছেন। এই
রাতের সাথে জড়িয়ে আছে পবিত্র ক্বুরআন শরীফের নুযূল, ফেরেশতা য়ালাইহিমুছ-ছালাম উনাদের
ও রূহ-এর অবতরণ, হিকমতপূর্ণ আমরের প্রবাহ, এবং ফাযর পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশেষ ছালামতি। তাই লাইলাতুল ক্বদর শরীফের আলোচনা কেবল ফজিলতের
আলোচনা নয়; বরং এটি ক্বুরআনিক নযম, আসমানী তদ্ববীর, এবং রূহানী বাস্তবতার আলোচনা।
আমার
দৃষ্টিতে, লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে বুঝতে হলে শুধু একটি ছুরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে
চলবে না। বরং ছুরাহ আল-ক্বদর, ছুরাহ
আল-বাক্বারাহ, ছুরাহ আদ-দুখন, এমনকি ছুরাহ আল-ফাযরের শুরুতেও যে ইশারা ও কছমসমূহ
এসেছেন, সেগুলোকে পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতর রেখে দেখতে হবে। তখনই বোঝা যাবে, লাইলাতুল ক্বদর কেবল একটি বিচ্ছিন্ন
ফজিলতের রাত নন; বরং এটি ক্বুরআনের বহু আয়াতের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা এক মহিমান্বিত
কেন্দ্রবিন্দু।
লাইলাতুল
ক্বদর শরীফ পবিত্র রমজান শরীফ মাসের একটি বেজোড় রাতের সাথেই খাছ, এই রাতে ফেরেশতা
য়ালাইহিমুছ-ছালাম ও রূহ-এর অবতরণ হয়, হিকমতপূর্ণ আমরের চূড়ান্ত রাত এটি, এবং এই
রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও বরকতে পরিপূর্ণ থাকে ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত। ফলে এই আলোচনায় আমরা ক্বুরআনের ভাষা, আয়াতগুলোর
পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বাস্তব ঈবাদতের ধারাবাহিকতা সামনে রেখে বিষয়টি বোঝার
চেষ্টা করব।
এখানে
রাতই মূল, দিন নয়। এই রাতের সাথে সম্পর্কিত হয়েছে
ফেরেশতাগণের অবতরণ, আমরের অবতরণ, সালামতির বিস্তার, এবং ফাযর পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব। শুধু তা-ই নয়, সহীহ সুন্নাহয় এই রাতকে শেষ দশকের
বেজোড় রাতসমূহের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। অর্থাৎ
এখানে আমরা একটি সম্পূর্ণ রাত-কেন্দ্রিক বিষয় দেখতে পাই: রাত, বেজোড় রাত, ফাযর
পর্যন্ত শান্তির স্থায়িত্ব, এবং আসমানী নুযূল। এই সমগ্র কাঠামোকে সামনে রেখে ক্বুরআনের সংশ্লিষ্ট
আয়াতসমূহকে একসাথে পড়লে একটি গভীর রাবতা প্রকাশ পায়, যা সাধারণ জাহেরি পঠনের চেয়ে
অনেক বেশি সুসংহত।
লাইলাতুল ক্বদর শরীফ সম্মানিত দ্বীন ইছলামের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রাতগুলোর একটি। মহান আল্লাহ তায়ালা
এই রাতকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং ক্বুরআন শরীফে সরাসরি এর আলোচনা করেছেন। এই রাতের সাথে ক্বুরআন নাযিলের সম্পর্ক রয়েছে
এবং এই রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। এই রাতের মধ্যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে বিশেষ
রহমত, বরকত এবং মাগ্বফিরাত নাযিল হয়। ফেরেশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ এবং রূহ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নির্দেশে অবতরণ করেন
এবং এই রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও কল্যাণে পূর্ণ থাকে ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত।
রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উম্মাহকে
এই রাত অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিশেষভাবে রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের
মধ্যে এই রাত খুঁজতে বলেছেনঃ (تَحَرَّوْا
لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ) হযরত আঈশা
ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম থেকে বর্নিত তিনি বলেনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি
ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, “তোমরা রমজান শরীফ মাসের শেষ দশ রাতে লাইলাতুল
ক্বদর শরীফ তালাস করো”। উনার থেকে বর্নিত অন্য হাদীছ শরীফে এসেছেনঃ (تَحَرَّوْا لَيْلَةَ
الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ) (বুখারী
শরীফ ২০১৭, ২০১৮ মুছলিম শরীফ ১১৬৯) এছাড়াও এই রাতের গুরুত্ব কি পরিমাণ বেশী তা এই
হাদীছ শরীফেই প্রমাণ পাওয়া যায়ঃ (الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ
الأَوَاخِرِ يَعْنِي لَيْلَةَ الْقَدْرِ-
فَإِنْ ضَعُفَ أَحَدُكُمْ أَوْ عَجَزَ فَلَا يُغْلَبَنَّ عَلَى السَّبْعِ الْبَوَاقِي) হযরত ইবনে
উমর রদ্বিআল্লাহু আনহুমা থেকে বর্নিত তিনি বলেন, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি
ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা এটিকে শেষ দশ রাতে অনুসন্ধান কর। যদি তোমাদের কেউ দুর্বল
হয়ে পড়ে বা অক্ষম হয়, তবে যেন শেষ সাত রাত থেকেও বঞ্চিত না হয়”। (মুছলিম শরীফ ১১৬৫)
এখন প্রশ্ন আসে যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম
নিজে কীভাবে অনুসন্ধান করতেন?
হযরত আয়িশা রদ্বিআল্লাহু আনহা বলেনঃ (كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى
اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ الْأَوَاخِرُ أَحْيَا
اللَّيْلَ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ وَشَدَّ مِئْزَرَهُ) রমজান শরীফের শেষ দশ রাত শুরু হলে রছুলে
পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজে রাত জাগতেন এবং উনার
পরিবারকেও রাত জাগাতেন এবং ঈবাদতে খুবই মনোযোগী হয়ে যেতেন। (বুখারী শরীফ ২০২৪, মুছলিম
শরীফ ১১৭৪) এতে বোঝা গেলো নিজে কেবল লম্বা ছিয়াম ক্বিয়ামে শেষ দশ রাত কাটালেই
হবেনা, সাথে বৌ বাচ্চাকেও জাগ্রত রাখতে হবে, ঈবাদাত করাতে হবে। আর এই কারণে মুছলিম উম্মাহ যুগ যুগ ধরে রমজান
শরীফের শেষ দশ রাতে বিশেষভাবে ঈবাদতে মনোনিবেশ করে থাকেন।
এই আলোচনায় আমরা লাইলাতুল ক্বদর শরীফের প্রকৃতি, পবিত্র আল-ক্বুরআনের আলোকে এর ব্যাখ্যা, ছুরাহ ক্বদর শরীফ ও ছুরাহ ফাযর শরীফের আয়াত শরীফগুলোর পারস্পরিক
সম্পর্ক, এবং এই রাতের ফজিলত ও আমল
নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব।
ছুরাহ ক্বদর শরীফঃ মূল পরিচয় ও
ব্যাখ্যা।
লাইলাতুল ক্বদর শরীফের প্রকৃত পরিচয় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে
এসেছেন ছুরাহ ক্বদর শরীফের
মধ্যেঃ (إِنَّا
أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ، وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ،
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ
وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ، سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ
مَطْلَعِ الْفَجْرِ) নিশ্চয়ই আমি (পবিত্র) এই আল-ক্বুরআনকে লাইলাতুল ক্বদর শরীফেই নাযিল
করেছি। (ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আর আপনি কি জানেন
লাইলাতুল ক্বদর শরীফ কী? (মূলত) লাইলাতুল ক্বদর শরীফ হচ্ছেন হাজার মাসের চেয়েও উত্তম
(এক রাত), এই (রাত)-এর মধ্যে মালাইকাহ ও রূহ তাদের রব তা’য়ালা উনার সব ধরনের আদেশ নিয়ে
(যমীনে) অবতরণ করেন, (সেই আদেশবার্তা হচ্ছেন চিরন্তন) প্রশান্তি, (আর) তা ফাযরের সূর্যদয়
পর্যন্ত (অব্যাহত) থাকেন। (ছুরাহ আল-ক্বদর ৯৭/১-৫) মহান আল্লাহ তা’য়ালা এখানে ঘোষণা করেছেন যে ক্বুরআন শরীফ নাযিল করা হয়েছে
লাইলাতুল ক্বদরের রাতে। এই ঘোষণা থেকেই বোঝা যায় যে এই রাত কেবল একটি সাধারণ রাত
নয়; বরং এটি এমন একটি রাত যার
সাথে আসমানি ওহীর সূচনা এবং মানবজাতির হিদায়াতের ইতিহাস গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই ছুরায় আরও বলা হয়েছে যে লাইলাতুল ক্বদর শরীফ হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ এই রাতের মধ্যে যে ঈবাদত করা হয় তা দীর্ঘ সময়ের ঈবাদতের
চেয়েও অধিক মর্যাদা লাভ করতে পারে। এর
মাধ্যমে বোঝা যায় যে আল্লাহ তায়ালা উম্মাহকে এমন একটি সুযোগ দিয়েছেন যেখানে অল্প
সময়ের মধ্যে অনেক বড় সওয়াব অর্জন করা সম্ভব। আমরা যদি একটু ফিকির করি তাহলে দেখবো যে ১
হাজার মাসে ৮৩ বছর ৪ মাস হয়। আর আমরা যদি উম্মতে মুহাম্মাদির গড় আয়্যু যাচাই করি
তাহলে হাদীছ শরীফে যা পাওয়া যায় তা হলোঃ (أَعْمَارُ أُمَّتِي مَا بَيْنَ
السِّتِّينَ إِلَى السَّبْعِينَ، وَأَقَلُّهُمْ مَنْ يَجُوزُ ذَلِكَ) হযরত আবু হুরায়রা
রদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ
আমার উম্মতের অধিকাংশ মানুষের বয়স হবে ষাট থেকে সত্তর বছরের মধ্যে; তবে অল্পসংখ্যকই
এর বেশি অতিক্রম করবে”। (তিরমিযি শরীফ ৩৫৫০, ইবনে মাজাহ শরীফ ৪২৩৬) এতে বোঝা গেলো
একজন উম্মতে মুহাম্মাদির হায়াত যদি ৮৩ বছর হয় যা সর্বোচ্চ বয়স বলা যায়, তাহলে তার
সারা জীবনেও যদি সে ১ বার লাইলাতুল ক্বদর শরীফ পেয়ে যায় তাহলে সে কামিয়াব।
এদিকে ইমাম ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহী য়ালাইহি বর্ণনা করেন যে, কিছু আলেম
বলেনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পূর্ববর্তী উম্মতের
দীর্ঘ জীবনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তারা শত শত বছর ঈবাদত করার সুযোগ পেতেন। তখন উনার উম্মতের স্বল্প
আয়ুর কথা বিবেচনা করে মহান আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুল ক্বদর দান করেন, যাতে অল্প আয়ু
থাকা সত্ত্বেও উম্মতে মুহাম্মদী বিশাল সওয়াব অর্জন করতে পারে। তিনি আরও একটি বর্ণনাও
উল্লেখ করেন যেখানে বলা হয়ঃ একজন বনি ইছরাইলের ব্যক্তি হাজার মাস জিহাদে লিপ্ত
ছিলেন, তখন মহান আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুল ক্বদর শরীফের আয়াত নাযিল করেন এবং জানান
যে এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আর তাবারিতে আছে এই রাতের ঈবাদত এমন হাজার মাসের ঈবাদতের চেয়েও উত্তম, যেখানে
লাইলাতুল ক্বদর নেই।
এরপর বলা হয়েছে যে এই রাতে ফেরেশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ এবং রূহ অবতরণ
করেন তাদের রবের নির্দেশে। এর অর্থ হলো এই রাতের মধ্যেই মহান আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে বিভিন্ন আমর বা সিদ্ধান্ত নাযিল হয় এবং
আসমানি ব্যবস্থার একটি বিশেষ কার্যক্রম সংঘটিত হয়। এই কারণে এই রাতকে একটি
আসমানি ব্যবস্থাপনার রাত হিসেবেও বোঝা যায়।
মহান
আল্লাহ তায়ালা ছুরাহ আল-বাক্বারাহ শরীফের মধ্যে স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, “ক্বুরআন নাযিল
করা
হয়েছে রমজান শরীফ মাসে (شَهۡرُ
رَمَضَانَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ فِیۡهِ الۡقُرۡاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ
مِّنَ الۡهُدٰی وَ الۡفُرۡقَانِ) রমজান
শরীফ মাস এমন একটি মাস, যাতে পবিত্র আল-ক্বুরআন নাযিল করা হয়েছে; আর এই ক্বুরআন মানবজাতির
জন্য হেদায়াতের দিশা প্রদানকারী, হেদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহের বাহক এবং হক্ব ও
বাতিলের পার্থক্য নির্ধারণকারী ছিফাত ফুরক্বন শরীফও নাযিল করা হয়েছে (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৮৫)। আর ছুরাহ আল-ক্বদর
শরীফের প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (اِنَّاۤ
اَنۡزَلۡنٰهُ فِیۡ لَیۡلَۃِ الۡقَدۡرِ) তিনি ক্বুরআন শরীফ নাযিল করেছেন “লাইলাতুল ক্বদর” শরীফে।
এখন ক্বুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার “রাত” যদি রমজান শরীফের মধ্যেই হয়, এবং ক্বুরআন নিজেই সেই
নাযিলের রাতকে “লাইলাতুল ক্বদর” নামে চিহ্নিত করেন, তাহলে ছুরাহ দুখনের “লাইলাতুম মুবারকাহ” দ্বারা
পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ অনুসারেই “শবে বরাত” প্রমাণিত হয়। পবিত্র শবে বরাত বা ভাগ্য
রজনীকে স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি স্বীয় কিতাবের ছুরাহ আদ দুখন শরীফের ৩-৪ নং আয়াত
শরীফের মাঝে (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) “বরকত পূর্ণ রাত” হিসেবে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (حٰمٓ وَ الۡكِتٰبِ الۡمُبِیۡنِ إِنَّآ أَنزَلْنٰهُ فِى لَيْلَةٍ
مُّبٰرَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) হা-মীম, কছম কিতাবে মুবিনের, নিশ্চয়ই আমি ইহাকে এক বরকতপূর্ণ রাত্রিতে নাজিল
করেছি, নিশ্চয় আমি (যাহান্নাম থেকে) সতর্ককারী, (আর) এই রাত্রিতে সমস্ত হিকমতপূর্ণ
কাজসমূহের ফায়সালা করা হয়। (ছুরাহ আদ
দুখন শরিফঃ আয়াত শরীফ ৪৪/১-৪)
ছুরাহ
আদ-দুখনের “কিতাবুল মুবিন” কী, তা আলাদা করে অনুমান করার দরকার নেই; পরের আয়াতেই
মহান আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন যে, সেই কিতাবের বৈশিষ্ট্য হলো এতে প্রত্যেক
হিকমতপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা নির্ধারিত হয়। সুতরাং
এখানে পাঠযোগ্য ক্বুরআন নয়, বরং তাকদীর ও আমর-সংক্রান্ত ডিভাইন রেকর্ডের কথাই বলা
হয়েছে। এছাড়াও
ক্বুরআনের আয়াতের গঠন থেকে সরাসরি বোঝা যায় যে (وَالْكِتَابِ
الْمُبِينِ) দ্বারা
পাঠযোগ্য ক্বুরআন (যা আমরা পড়ি) বোঝানো হয়নি, বরং তাক্বদীর ও আমর-সংক্রান্ত
ডিভাইন রেকর্ড (আসমানী লাওহ বা লাওহে মাহফুজ থেকে বর্ষীয় ফয়সালা) বোঝানো হয়েছে। পবিত্র ক্বুরআনের আয়াতের গঠন থেকে স্পষ্ট প্রমাণ
হলেনঃ ছুরাহ আদ-দুখন ৪৪:২ এ (وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ) আর সেই সুস্পষ্ট কিতাবের কছম। আর ৪৪:৪ নং আয়াত শরীফে (فِيهَا
يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) এই
মুবারক রাতে প্রত্যেক হিকমতপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা নির্ধারিত/বণ্টিত/পৃথক করা হয়।
এখন
২ নং আয়াত শরীফে কিতাবিল মুবীন এর কছম করার পর ৪ নং আয়াত শরীফে সরাসরি (فِيهَا) এই রাতে
(يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) বলা হয়েছে। এখানে আমর
হাকীম (হিকমতপূর্ণ বিষয়/ফয়সালা) বলতে তাক্বদীর, রিজিক, আজল, মওত, যুদ্ধ-শান্তি
ইত্যাদি সবকিছুর বার্ষিক ফয়সালা বোঝানো হয়েছে, যা লাওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতাদের
কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাছাড়া কিতাবিল মুবীন যদি পাঠযোগ্য ক্বুরআন হতো তাহলে
৪ নং আয়াতে (يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) এর সাথে সরাসরি মিলত না, কারণ ক্বুরআন নাযিল হওয়ার রাতে
ক্বুরআনের ফয়সালা বণ্টন হয় না, বরং ক্বুরআন নিজেই হেদায়াত ও ফুরক্বন। কিন্তু আয়াতের গঠন থেকে স্পষ্ট যে কছমের পরের
বর্ণনা (ফয়সালা নির্ধারণ) কিতাবিল মুবীনের সাথে যুক্ত, এবং এটা লাওহে মাহফুজ-এর
রেকর্ড (যা মুবীন/স্পষ্ট, কোনো অস্পষ্টতা নেই)।
প্রথমত,
ক্বুরআন ১০০% নিশ্চিতভাবে বলেছেন যে ক্বুরআন নাযিল হয়েছেন লাইলাতুল ক্বদরের রাতে, এখানে
কোনো দ্বিধা নেই। ছুরাহ বাক্বারাহ ২:১৮৫ নং আয়াত
শরীফ স্পষ্ট করে দেন যে পবিত্র আল-ক্বুরআন রমজান শরীফ মাসে নাযিল হয়েছেন, এবং
ছুরাহ ক্বদর শরীফের ৯৭:১ নং আয়াত শরীফ সেই নাযিলের রাতকে নাম দিয়ে চিহ্নিত করেছেন
লাইলাতুল ক্বদর বলে। এই দুই আয়াত একসাথে পড়লে
ক্বুরআনের নুযূলের সময় ও রাত উভয়ই নির্ধারিত হয়ে যায়। সুতরাং “ক্বুরআন নাযিল” ইস্যুতে লাইলাতুল ক্বদর
ছাড়া অন্য কোনো রাতকে বসানোর গ্রামাটিক বা ক্বুরআনিক সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত,
ছুরাহ ক্বদর শরীফের ৯৭:৪ নং আয়াত শরীফে ব্যবহৃত বাক্যাংশ (مِنْ كُلِّ أَمْرٍ) আর
ছুরাহ দুখান ৪৪:৪ নং আয়াত শরীফে ব্যবহৃত (كُلُّ
أَمْرٍ حَكِيمٍ) এই
দুইটার মধ্যে গ্রামাটিক পার্থক্যই প্রমাণ করে যে দুই আয়াত শরীফ একই স্তরের ঘটনা
বর্ণনা করছেন না। ক্বদর শরীফের আয়াতে পাকে (مِنْ) এসেছেন,
যা আরবিতে (تَبْعِيض) তাবঈদ্ব
বোঝায়, অর্থাৎ “সমস্ত আমর থেকে” বা “নির্ধারিত আমরগুলোর মধ্য থেকে”। এখানে আমরগুলো আগেই নির্ধারিত ধরে নিয়ে, সেগুলোর
একটি অংশ নিয়ে ফেরেশতাদের নাযিল হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিপরীতে, দুখনের আয়াতে (كُلُّ) এসেছেন কোনো (مِنْ) ছাড়াই, এবং তার সাথে (حَكِيمٍ) ছিফাত
যুক্ত হয়েছেন। এর মানে, এখানে আমরগুলোর মধ্য থেকে কিছু নয়, বরং
সমস্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ আমর নিজেই আলাদা করে নির্ধারিত হচ্ছেন। গ্রামার অনুযায়ী এক জায়গা নির্বাচন/কার্যকরকরণ, আর
অন্য জায়গা নির্ধারণ/শ্রেণীবিভাগ।
তৃতীয়ত,
এই গ্রামাটিক পার্থক্যের কারণে লাইলাতুল ক্বদর ও লাইলাতুল মুবারকাহকে একই রাত
বানালে ভাষাগত সংঘর্ষ তৈরি হয়। যদি দুই রাত
একই হতো, তাহলে ক্বুরআন একই জায়গায় হয় (كُلُّ
أَمْرٍ حَكِيمٍ) রাখতেন,
নয়তো (مِنْ كُلِّ أَمْرٍ) তবুও দুই জায়গায় দুই রকম গঠন ব্যবহার করতেন না। আরবি ভাষায় যখন কাজের স্তর আলাদা হয়, তখনই এই ধরনের
পার্থক্য আসে। ফলে ক্বুরআন শরীফের গ্রামার
নিজেই ইঙ্গিত দেন যে, এক রাতে আমর নির্ধারণ, আরেক রাতে সেই নির্ধারিত আমরগুলোর
কার্যকরী প্রবাহ।
এখন
দেখবো তাফছিরে ইমামদের থেকে কি পাওয়া যায়, যেহেতু ক্বুরআন হাদিছ এর দলিলে অনেকে
বুঝেনা, সেই বেবুঝদের জন্যে বুঝদারদের অভিমত পেশ করবো।
উক্ত
আয়াত শরীফের মধ্যে বর্ণিত (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) ‘লাইলাতিম মুবারকাহ’ শব্দ দ্বারা তাবেঈ
হযরত ঈকরমা রহমাতুল্লাহী য়ালাইহি বলেনঃ (هَى
لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ وَسَمَّى لَيْلَةَ الرَّحْمَةِ وَاللَّيْلَةِ
المُبَارَكَةِ وَلَيْلَةِ الصَّكِّ)
অর্থাৎ “লাইলাতিম মুবারকাহ দ্বারা লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান তথা অর্ধ শাবানের
পবিত্র রাত (শবে বরাতকে) বুঝানো হয়েছে যেমন (لَيْلَةُ
الرَّحْمَة) (লাইলাতুর
রহমাহ) তথা রহমতের রাত, (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) লাইলাতুল মুবারকাহ তথা বরকতের রাত। (لَيْلَةُ الصَكَّ) (লাইলাতুছ ছ্বক) ভাগ্য লিপিবদ্ধকরণের রাত তথা ভাগ্য
রজনী।” আর (لَيْلَةٍ
مُّبٰرَكَةٍ)
(বরকতপূর্ণ রাত) দ্বারা পবিত্র শবে বরাত তথা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে তার যথার্থ
প্রমাণ বহন করে তার পরবর্তী আয়াত শরীফের يُفْرَقُ (নির্ধারিত/স্থির করা হয়) শব্দ দ্বারা। কেননা
তাফসীর জগতের প্রায় সকল তাফসীরে সমস্ত মুফাছছীরীনে কিরাম উনারা يُفْرَقُ শব্দের
তাফছীর করেন يَكْتُبَ
ইয়াকতুব (বন্টন বা নির্ধারণ করা হয়) يُبْرِمُ (বাজেট
করা হয়) “فَيْصَلَه” (নির্দেশনা
দেয়া হয় বা ফায়সালা করা হয়) ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে। কাজেই
يُفْرَقُ শব্দের
অর্থ ও তার ব্যাখ্যার দ্বারা আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল যে, (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ)
দ্বারা (لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ) অর্ধ শা’বানের রাত, বা পবিত্র শবে বরাত তথা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো
হয়েছে। যেই রাতে সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্যগুলো সামনের এক
বৎসরের জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়, আর সেই ভাগ্য লিপি অনুসারে রমজান শরীফ মাসে (لَيْلَةُ الْقَدْرِ) বা
শবে ক্বদরের রাত্রে তা চালু করা হয়। এ জন্য (لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ) অর্ধ শাবানের রাতকে (لَيْلَةُ
التَجْوِيْز)
(নির্ধারণের বা বৈধকরণের রাত) এবং (لَيْلَةُ
الْقَدْرِ) কে (لَيْلَةُ التَنْفِيْذِ) (নির্ধারিত ফয়সালা কার্যকরী করার রাত বা বৈধকরণ বিষয়ের কার্যকারীকরণের
রাতও) বলা হয়। (তথ্য সূত্রঃ তাফসীরে মাযহারী, তাফসীরে
খযিন, তাফসীরে রুহুল মায়ানী ও রুহুল বায়ান শরীফদ্বয়।)
আর
(لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) এর ব্যাখায় বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর, তাফসীরে মাযহারী শরীফ উনার
অষ্টম খণ্ডের ৩৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছেঃ (قَالَ
عِكْرِمَةُ:
هِيَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، يُبْرَمُ
فِيهَا أَمْرُ السَّنَةِ، وَيُنْسَخُ الْأَحْيَاءُ مِنَ الْأَمْوَاتِ، فَلَا
يُزَادُ فِيهِمْ وَلَا يُنْقَصُ مِنْهُمْ أَحَدٌ. رَوَى
الْبَغَوِيُّ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمَيْسَرَةِ بْنِ الْأَخْفَسِ، أَنَّ رَسُولَ
اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يُقْطَعُ الْآجَالُ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى شَعْبَانَ، حَتَّى إِنَّ
الرَّجُلَ لَيَنْكِحُ وَيُولَدُ لَهُ، وَلَقَدْ أُخْرِجَ اسْمُهُ فِي الْمَوْتَى. وَرَوَى أَبُو الضُّحَى عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ اللَّهَ يَقْضِي
الْأَقْضِيَةَ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَيُسَلِّمُهَا إِلَى
أَرْبَابِهَا فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ.) অর্থাৎ “প্রখ্যাত তাবেঈ
হযরত ঈকরমা রহমাতুল্লাহী য়ালাইহি তিনি বলেন, (ছুরাহ দুখন শরীফের ৩ নং আয়াত শরীফে
বর্ণীত (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) হচ্ছেন ১৫ই শা’য়বানের পবিত্র রাত তথা পবিত্র শবে বরাত বা
লাইলাতুল বরাতের রাত। এই পবিত্র
রাত্রে সারা বৎসরের কাজ কর্মের ফায়সালা করা হয় কতজন জীবিত থাকবেন, কতজন মারা যাবেন
তারও ফায়সালা করা হয়। অতঃপর এ
ফায়ছালার থেকে কোন কিছু আর কম বেশি করা হয় না আগামী এক বছর। ইমাম হযরত বাগাবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি তিনি বর্ণনা
করেছেন, হযরত মুহম্মদ ইবনে মাইসারা ইবনে আখফাশ রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার থেকে। তিনি বলেন, “রছুলুল্লাহ্ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া
আলিহি ওয়া ছাল্লাম তিনি ইরশাদ মোবারক করেন, শা’য়বান মাসে পরবর্তী শা’বান মাস
পর্যন্ত মৃত্যুর ফায়ছালা করে দেয়া হয়। এমনকি
লোকেরা যে বিবাহ করবে, সেই বৎসর তার থেকে কত জন সন্তান জন্মগ্রহণ করবেন তার তালিকা
এবং তার মৃত্যুর তালিকাও প্রস্তুত করা হয় ওই বৎসরে অর্ধ শাবানের রাতে তথা শবে
বরাতে”। আর আবুদ্বহা এর বর্ণনায় এসেছে হযরত আব্দুল্লাহ
ইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহু তিনি বলেন, পবিত্র শা’য়বানের মাঝামাঝি অর্থাৎ ১৫ই
শা’বানের রাতে তথা শবে বরাতে মহান আল্লাহ তায়ালা সমস্ত কিছুই ফায়ছালা করেন, আর রমজান
শরীফ শরীফে ক্বদরের রাতে (শবে ক্বদরে) সেই ফায়ছালার তালিকা (কপি) বাস্তবায়ন করার
জন্য বাস্তবায়নকারী ফেরেশতা য়ালাইহিমুছ ছালামদের কাছে অর্পণ করা হয়”।
তাফছীরে
মাদিরকে (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) এ আয়াতাংশের তাফসীরে উল্লেখ আছেঃ (وَهَذِهِ
اللَّيْلَةُ مُفَرَّقُ كُلِّ أَمْرٍ حَكيمٍ وَمَعْنَى يُفَرِّقُ يَفْصِلُ
وَيَكْتُبُ كُلَّ أَمْرٍ مِنْ ارِّزاقِ العِبادِ واِجالَهُمْ وَجَميعُ
أَمْوَرِهِمْ مِنْ هَذِهِ اللَّيْلَةِ الَّى لَيْلَةِ الْقَدْرَالَتَى تَجَى فَى
اَلْسَنَّتِ المُقْبِلَةِ)
অর্থাৎ লাইলাতিম মুবারকাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্ধ শা’বানের পবিত্র রাত তথা
শবেবরাত এবং এই মুবারকময় রাতে সকল প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়সমূহের ফায়সালা করা হয়। যেমন
(إِنَّآ أَنزَلْنٰهُ فِى لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ ۚ إِنَّا
كُنَّا مُنذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) আয়াত শরীফের মধ্যে যে يُفْرَقُ শব্দ
মহান আল্লাহ তায়ালা ব্যবহার করেছেন, এর অর্থ হচ্ছে يُفَصَّلُ তথা ফায়ছালা করা, এবং يُكْتَبُ
(ইউকতাবু) তথা লেখা হয় প্রত্যেক
বান্দাদের রিযিক বা জীবিকাসমূহ। তাদের
মৃত্যুর সময় সীমাও লেখা হয় এবং সমস্ত বিষয়ের তালিকা লেখা হয় এই মুবারক রাতে, তথা
শবে বরাতে। আর পবিত্র ক্বদর শরীফের রাতে
তথা মর্যাদাবান রাতে ওই সমস্ত ফায়সালাকৃত বিষয়গুলো চালু করা হয় তথা কার্যকরী করা
হয় যা সামনের এক বৎসর পর্যন্ত চলতে থাকে।
(তথ্য সূত্রঃ তাফসীরু হাশিয়াতিল খাযিন ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১১২)
উল্লেখ্য
যে, যদিও কেউ কেউ (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) দ্বারা (لَیۡلَۃُ الۡقَدۡرِ) বুঝে থাকেন, কিন্তু এই রাত মূলত সেই রাত নন,
বরং (لَیۡلَۃُ الۡقَدۡرِ) দ্বারা শবে বরাতের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন বা কার্যকরী করার
রাতকেই বুঝানো হয়েছে।
যেমন
এ প্রসঙ্গে পবিত্র ছুরাহ ক্বদর শরীফের তাফসীরে, বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর, তাফসীরে
খাযিনের ৪র্থ খণ্ডের ৩৯০ পৃষ্ঠায় ইমাম উল্লেখ করেছেনঃ (فقيل
له (للحسين بن الفضل)
فما معنى ليلة القدر قال سوق المقادير الى المواقيت
وتنفيذ القضاء المقدر) “হযরত
হুসাইন ইবনে ফযল রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলো ‘লাইলাতুল ক্বদর’-এর
অর্থ কি? তিনি উত্তরে বলেন, পূর্বে স্থিরীকৃত সিদ্ধান্তসমূহ নির্ধারিত সময়ের দিকে
পরিচালনা করা এবং পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্তের যথার্থ বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে পবিত্র
ক্বদর শরীফের রাতের অর্থ।” কাজেই
উল্লিখিত দলীলের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, অর্ধ শা’বানের রাত হচ্ছেন لَيْلَةُ
الْتَجْوِيْزِ তথা অনুমোদনের রাত। আর লাইলাতুল ক্বদর হচ্ছেন لَيْلَةُ
الْتَنْفِيْذِ তথা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের রাত।
“তাফসীরে
নাযমুদ দুরা শরীফ” কিতাব উনার ৭ম খণ্ডের ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছেঃ (اَوْ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبانَ) অর্থাৎ “লাইলাতিম মুবারাকা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্ধ শা’বানের
রাত তথা ১৪ই শা’বানের দ্বিবাগত রাত।” উক্ত তাফসীরে
৭ম খণ্ডের ৬৪ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছেঃ (قال
وروى ابو الضحى عنه ان الله تعالى يقضى الاقضية فى ليلة النصف من شعبان فيسلمها
الى اربابها فى ليلة القدر وقال الكرمانى فيسلمها الى اربابها وعمالها من الملائكة
ليلة السابع والعشرين من شهر رمضان) অর্থাৎ
“হযরত ইমাম বাগবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি তিনি বলেন- হযরত আবু দ্বহা রহমতুল্লাহি
য়ালাইহি উনার থেকে পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক
তিনি অর্ধ শা’বানের রাতে তথা শবে বরাত উনার রাত্রে যাবতীয় বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ
করে থাকেন। আর ক্বদর শরীফের রাতে তথা শবে
ক্বদরে সেই সিদ্ধান্তকে কার্যকরী তথা বাস্তবায়ন করার জন্য তালিকা পেশ করেন
বাস্তবায়নকারী ফেরেশতাদের হাতে। হযরত ইমাম
কিরমানী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি তিনি বলেন, পূর্ব সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার জন্য
বাস্তবায়নকারী ফেরেশতা য়ালাইহিমুছ ছালাম উনাদের হাতে যেই রাত্রিতে তালিকা পেশ করা
হয়, সেই রাত্রিটি হচ্ছেন রমজান মাসের ২৭ তারিখের রাত।
আর ছুরাহ ক্বদর শরীফের শেষ আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, এই রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও কল্যাণে পূর্ণ থাকে ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত। এখানে একটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করার মতো এই রাতের শেষ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ফাযরের মাধ্যমে। অর্থাৎ লাইলাতুল
ক্বদর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিদ্যমান থাকেন, এবং সেই সময়সীমা হলেন রাতের শুরু থেকে ফাযর পর্যন্ত।
এই পুরো ছুরাহটি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এখানে তিনটি
মৌলিক বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছেঃ এই রাতের সাথে ক্বুরআন নাযিলের সম্পর্ক, এই রাতের অসাধারণ মর্যাদা, এবং এই রাতের মধ্যে আসমানি ব্যবস্থার বিশেষ কার্যক্রম আগামি ১ বছরের তাক্বদিরের
ফায়সালা শুরুর রাত। এই
তিনটি বিষয় মিলিয়ে লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে ইছলামের ইতিহাসে একটি অনন্য ও বিশেষ রাত হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
এবার আসি ছুরাহ ফাযরের
কছমগুলোর বিশ্লেষণ
ছুরাহ ফাযরের শুরুতেই মহান আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কছম করেছেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَالْفَجْرِ، وَلَيَالٍ عَشْرٍ،
وَالشَّفْعِ وَالْوَتْرِ، وَاللَّيْلِ إِذَا يَسْرِ، هَلْ فِي ذَٰلِكَ قَسَمٌ لِذِي
حِجْرٍ، أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ) কছম ফাযরের, কছম দশ রাতের, কছম জোড় ও বেজোড়
(রাতের), কছম (সেই) রাতের যখন তা গমন করে; এতে কি বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য কছমের
বিষয় নেই? আপনি কি দেখেননি আপনার রব তা’য়ালা ‘য়া’দ’ জাতির সাথে কী করেছিলেন। (ছুরাহ আল-ফাযর ৮৯/১-৬)
অর্থাৎ ক্বুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে, ফাযরের কছম, দশ রাতের কছম, জোড় ও বেজোড় রাতের কছম, এবং সেই রাতের কছম যা চলে যায়। ক্বুরআনের কছমগুলো কখনোই এলোমেলোভাবে আসে
না; বরং এগুলোর মধ্যে একটি গভীর
অর্থপূর্ণ ধারাবাহিকতা থাকে। এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এই কছমগুলো একটি নির্দিষ্ট
সময়চক্রকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে।
প্রথমেই বলা হয়েছে ফাযরের কছম। ফাযর এমন একটি মুহূর্ত যা
রাতের সমাপ্তি এবং দিনের সূচনার সীমারেখা। অর্থাৎ রাতের একটি নির্দিষ্ট পরিণতি বা সমাপ্তির দিকে
ইঙ্গিত এখানে উপস্থিত। এরপর বলা হয়েছে “দশ রাত”-এর কথা। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো আল-ক্বুরআন এখানে “দিন” শব্দ ব্যবহার করেনি; বরং স্পষ্টভাবে “রাত” শব্দ ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুরু থেকেই রাতকে ঘিরে। এরপর মহান আল্লাহ তায়ালা
বলেছেন জোড় ও বেজোড়ের কথা। এই অংশটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন কোনো ধারাবাহিক
সময়ের মধ্যে জোড় ও বেজোড়ের কথা বলা হয়,
তখন
বোঝা যায় যে সেই সময়ের মধ্যে এমন একটি বিন্যাস রয়েছে যেখানে প্রতিটি অংশ
গণনাযোগ্য এবং পর্যায়ক্রমিক। সবশেষে বলা হয়েছে সেই রাতের কথা যা অতিক্রম করে চলে যায়। এখানে আবারও “রাত” শব্দটি এসেছে এবং সেই
রাতের অতিক্রম বা চলে যাওয়ার দৃশ্যকে সামনে আনা হয়েছে।
এই চারটি কছম একত্রে লক্ষ্য করলে একটি ধারাবাহিক দৃশ্য তৈরি
হয়ঃ একটি রাতের সময়কাল, সেই রাতগুলোর একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা, সেই সংখ্যার মধ্যে জোড় ও বেজোড়ের বিন্যাস, এবং শেষে ফাযরের মাধ্যমে সেই রাতের সমাপ্তি। ফলে বোঝা যায় যে
এখানে একটি নির্দিষ্ট ধরনের রাতভিত্তিক সময়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
এই পর্যায়ে যখন আমরা ক্বুরআনের অন্য আয়াতগুলোর সাথে
সম্পর্ক খুঁজে দেখি, বিশেষ করে ছুরাহ
ক্বদর শরীফের সাথে, তখন একটি স্বাভাবিক
মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ সেখানে বলা হয়েছে একটি বিশেষ রাতের কথা যা ফাযর
পর্যন্ত স্থায়ী থাকে, এবং সেই রাতকে এমন
একটি সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে যেখানে বেজোড় রাতের বিষয়টি
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই কারণে ছুরাহ ফাযরের কছমগুলোর এই ধারাবাহিকতা কেবল একটি
সাধারণ সময়ের উল্লেখ নয়; বরং একটি বিশেষ
রাতকেন্দ্রিক সময়চক্রের দিকে ইঙ্গিত করে, “যেখানে রাত, জোড়-বেজোড় বিন্যাস
এবং ফাযরের সমাপ্তি” এই তিনটি বিষয় একত্রে উপস্থিত থাকে।
“লায়ালিন
আশর” - প্রচলিত
তাফসিরের দাবী ও তার বিশ্লেষণ
ছুরাহ ফাযরের শুরুতে আল্লাহ তায়ালা যখন “দশ রাত”-এর কছম করেছেন, তখন বহু তাফসির গ্রন্থে এর ব্যাখ্যা হিসেবে জিলহজ্জ শরীফ মাসের প্রথম দশ
দিনের কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু মতের মধ্যে মুহররমুল হারাম শরীফ মাসের প্রথম দশ দিনের কথাও
উল্লেখ করা হয়েছে। তাফছিরের ইতিহাসে এই মতগুলো
বিদ্যমান আছে এবং সেগুলোকে সম্মান রেখেই আলোচনায় উল্লেখ করছি দ্বীমতহিসেবে। যখন ক্বুরআনের ভাষা, প্রসঙ্গ এবং বাস্তবতার সাথে এগুলো মিলিয়ে দেখা হয়, তখন কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।
প্রথমত, যদি এটি জিলহজ্জ শরীফ মাসের প্রথম দশ দিন
হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সেখানে মূল
গুরুত্ব দেওয়া হয় আরাফার দিন এবং ঈদুল আজহার দিনের উপর। এই দুটি দিনের ফজিলত অত্যন্ত
বড় এবং তা সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ছুরাহ ফাযরের আয়াতে “দিন” শব্দ ব্যবহার করা হয়নি; বরং স্পষ্টভাবে “রাত” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ক্বুরআনের ভাষা যখন একটি
নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেন, তখন সেই শব্দের অর্থকে অন্য
দিকে সরিয়ে নেওয়া সহজ নয়। যদি এখানে “রাত” বলা হয়ে থাকে,
তাহলে
তার আলোচনাও স্বাভাবিকভাবে রাতকেন্দ্রিক হওয়ার কথা।
দ্বিতীয়ত, যদি এই দশ দিনের
মধ্যে বিশেষ কোনো তাৎপর্য থাকে যার জন্য আল্লাহ তায়ালা কছম করেছেন, তাহলে প্রশ্ন আসে এই দশটির মধ্যে কেন কেবল দুইটি দিনই প্রধান হয়ে
দাঁড়াবে এবং বাকি আটটির আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য আলোচনায় থাকবে না। ক্বুরআনে যখন কোন কিছুর কছম করা হয়, তখন সাধারণত সেই বিষয়টির ভেতরে একটি স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ
তাৎপর্য থাকে। কিন্তু
যদি দশটির মধ্যে মাত্র এক বা দুইটি বিষয়ই কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, তাহলে কছমের পূর্ণ অর্থ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।
একইভাবে যদি এটিকে মুহররমুল হারাম শরীফ মাসের প্রথম দশ দিন হিসেবে
ধরা হয়, তাহলেও একই ধরনের সমস্যা দেখা
যায়। মুহররমুল হারাম শরীফ মাসের মধ্যে সবচেয়ে
আলোচিত ঘটনা হলো দশ মুহররমুল হারাম শরীফের দিন। কিন্তু এখানে আবারও “রাত”-এর কথা চলে আসে, অথচ মুহররমুল হারাম শরীফ মাসের দশ রাতের মধ্যে এমন কোনো ধারাবাহিক রাতভিত্তিক ঈবাদতের
ঐতিহ্য উম্মাহর মধ্যে দেখা যায় না যা ছুরাহ ফাযরের কছমের ভাষার সাথে সুস্পষ্টভাবে
মিল খায়।
আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ছুরাহ ফাযরের কছমগুলোর মধ্যে “জোড় ও বেজোড়”-এর কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু যদি এই দশ
রাতকে জিলহজ্জ শরীফ বা মুহররমুল হারাম শরীফের সাথে যুক্ত করা হয়, তাহলে সেই সময়ের সাথে জোড়-বেজোড় রাতভিত্তিক ঈবাদতের কোনো
সুপরিচিত ধারাবাহিকতা দেখা যায় না। অথচ ক্বুরআনের কছমগুলোর ধারাবাহিকতা দেখলে মনে হয় যে এখানে
এমন একটি সময়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যেখানে রাতগুলোর গণনা, জোড়-বেজোড় বিন্যাস এবং রাতের অতিক্রম, এই সবকিছুই একটি বাস্তব ঈবাদতের
প্রেক্ষাপটে উপস্থিত। ১৫০০ বছরের ইতিহাসে কোন ফেরকার কোন য়া’মলেও রমজান শরীফ ছাড়া টানা ১০ রাতের
কোন স্পেশাল, স্পেসিফিক য়া’মল খুঁজে পাওয়া যাবেনা, ছুন্নী, শিয়া, ওহাবী-ছালাফি
কিংবা দেওবন্দী ফেরকার মধ্যেও।
এই কারণে যখন ক্বুরআনের ভাষা, প্রসঙ্গ এবং বাস্তব ঐতিহাসিক য়া’মলের ধারাকে একত্রে দেখা হয়, তখন “লায়ালিন য়া’শর” অর্থাৎ দশ রাতের বিষয়টি নিয়ে পুনরায় চিন্তা করার দরজা
খোলা থাকে। কারণ
ক্বুরআনের কছমগুলো সাধারণত এমন বিষয়ের উপর করা হয় যা মানুষের কাছে স্পষ্ট অর্থ ও
গভীর তাৎপর্য বহন করে।
রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের সাথে ক্বুরআনিক
মিল
যখন ছুরাহ ফাযরের কছমগুলোকে ক্বুরআনের অন্য আয়াত ও ইছলামের বাস্তব ঈবাদাতের ধারার সাথে মিলিয়ে দেখা
হয়, তখন একটি বিষয় খুব
স্বাভাবিকভাবে সামনে আসে, রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের সাথে এই কছমগুলোর ভাষা ও কাঠামোর একটি গভীর
সামঞ্জস্য রয়েছে।
প্রথমত, এখানে বলা হয়েছে “লায়ালিন য়া’শর”-অর্থাৎ দশ রাত। রমজান শরীফের শেষ দশ
রাত ইছলামের ইতিহাসে এমন
একটি সময়কাল যেখানে মুছলিম উম্মাহ বিশেষভাবে ঈবাদতের দিকে মনোনিবেশ করে (সকল ফেরকা, হোক হক্ব
কিংবা বাতিল)। রছুলে
পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এই দশ রাতের সময় ঈবাদতের মাত্রা
বাড়িয়ে দিতেন, নিজেও রাত জেগে ঈবাদত
করতেন এবং পরিবারকেও জাগিয়ে তুলতেন। ফলে বাস্তব য়া’মলের দিক থেকেও এই দশ রাত একটি সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ
সময়কাল।
দ্বিতীয়ত, ছুরাহ ফাযরে “শাফ‘ ও ওয়াতর” অর্থাৎ জোড় ও বেজোড়ের কছম করা হয়েছে। ছ্বহীহ হাদীছসমূহে লাইলাতুল
ক্বদরকে বিশেষভাবে বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে, বিশেষ করে রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের মধ্যে, যা আমরা পূর্বে উল্লেখ
করেছি। ফলে জোড় ও বেজোড়
রাতের এই ধারণাটি এখানে বাস্তব ঈবাদতের ধারার সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে।
তৃতীয়ত, ছুরাহ ফাযরে বলা
হয়েছে সেই রাতের কছম যা অতিক্রম করে চলে যায়। এই কথাটি রাতের একটি
প্রবাহমান সময়চক্রকে নির্দেশ করে, যেখানে রাত আসে,
অতিবাহিত
হয়, এবং শেষে ফাযরের মাধ্যমে তার
সমাপ্তি ঘটে। লাইলাতুল
ক্বদর সম্পর্কেও ক্বুরআনে ছুরাহ ক্বদর শরীফে বলা হয়েছে যে এই সেই রাত যা ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত শান্তি ও বরকতে পূর্ণ থাকে। ফলে রাতের শুরু থেকে ফাযর
পর্যন্ত এই সময়সীমা দুটি ছুরাহর মধ্যেই একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যায়।
আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। রমজান শরীফের শেষ দশ রাত এমন
একটি সময় যখন উম্মাহর মধ্যে ধারাবাহিক রাতভিত্তিক ঈবাদতের একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য
বিদ্যমান। কিয়ামুল
লাইল, ক্বুরআন শরীফের তিলাওয়াত, দোয়া, ইস্তিগফার, এই সব য়া’মল মূলত রাতকে কেন্দ্র করেই
সম্পাদিত হয়। ফলে
“রাত”, “দশ রাত”, “জোড়-বেজোড়”, এবং “রাতের অতিক্রম” এই চারটি ধারণা বাস্তব ঈবাদতের একটি সুসংগত কাঠামো তৈরি করে।
এই দিকগুলো একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে ছুরাহ ফাযরের কছমগুলোর
ভাষা ও ছুরাহ ক্বদরের আলোচনার মধ্যে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়। সেখানে রাতের গুরুত্ব, ফাযর পর্যন্ত সময়সীমা, এবং বেজোড় রাতের বিশেষ তাৎপর্য এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সাথে মিল খুঁজে পায়।
লাইলাতুল ক্বদর শরীফের রাজ রহস্য
লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন একটি রাত যার প্রকৃত মর্যাদা ও
গভীরতা মানুষের সাধারণ উপলব্ধির বাইরে। ক্বুরআনে এই রাতকে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যাতে বোঝা
যায় এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়;
বরং
প্রতি বছর পুনরাবৃত্ত হওয়া একটি আসমানি রহস্যময় সময়। এই রাতের মধ্যে ফেরেশতাগণ
অবতরণ করেন এবং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিভিন্ন আমর বা সিদ্ধান্ত নাযিল হয়। এই কারণে বহু আলেম
এটিকে আসমানি ব্যবস্থাপনার একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই রাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নির্দিষ্টভাবে গোপন রাখা
হয়েছে।
যদিও ক্বুরআনে
এর মর্যাদা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে,
তবুও
সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। বরং নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে এই রাতকে অনুসন্ধান করতে হবে। এর মধ্যে একটি গভীর
হিকমত রয়েছে। যদি
নির্দিষ্ট রাতটি স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হতো,
তাহলে
মানুষ কেবল সেই একটি রাতেই ঈবাদতে মনোযোগ দিত। কিন্তু যখন এটি গোপন রাখা হয়েছে, তখন মুমিনকে একাধিক রাত জেগে ঈবাদত করতে হয়। এর ফলে ঈবাদতের
পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি আরও গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।
আরও একটি রহস্য এখানে লক্ষ্য করা যায়। ক্বুরআনে এই রাতকে “ক্বদর” নামে অভিহিত করা
হয়েছে।
আরবি
ভাষায় “ক্বদর” শব্দের মধ্যে মর্যাদা,
নির্ধারণ
এবং পরিমাপ এই তিনটি অর্থই নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ এই রাত এমন একটি রাত যেখানে মহান মর্যাদা প্রকাশ
পায়, আসমানি ব্যবস্থার বিভিন্ন
বিষয় নির্ধারিত হয় এবং মানবজীবনের জন্য বিশেষ বরকত নাযিল হয়।
এই কারণেই ক্বুরআনে বলা হয়েছে যে এই রাত হাজার মাসের
চেয়েও উত্তম। এর
অর্থ কেবল সময়ের তুলনা নয়; বরং এই রাতের
আধ্যাত্মিক মূল্য এত বেশি যে এটি মানুষের দীর্ঘ জীবনের ঈবাদতের সমতুল্য হতে পারে। আল্লাহ তায়ালার
রহমতের একটি বিশেষ নিদর্শন হলো তিনি উম্মতে মুহাম্মদীকে এমন একটি রাত দান করেছেন যার
মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে অসাধারণ সওয়াব অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে কেবল একটি পবিত্র
রাত হিসেবে দেখলে পূর্ণ অর্থ প্রকাশ পায় না। বরং এটি এমন একটি সময় যখন
আসমান ও জমিনের মধ্যে রহমতের বিশেষ সংযোগ সৃষ্টি হয়, মানুষের দোয়া কবুল হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং বান্দা
তার রবের নিকট ফিরে যাওয়ার এক বিরল সুযোগ লাভ করে।
লাইলাতুল ক্বদর শরীফের ফজিলত
লাইলাতুল ক্বদর শরীফ ইসলামের ইতিহাসে এমন একটি রাত যার
মর্যাদা মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং ক্বুরআন শরীফে ঘোষণা করেছেন। এই রাতের ফজিলত এত
বেশি যে ক্বুরআনে পুরো একটি ছুরাহ নাযিল করা হয়েছে এই রাতের মর্যাদা বর্ণনা করার
জন্য।
হাদীছ শরীফেও এই রাতের অসাধারণ মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا
وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ) যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল ক্বদরের রাতে ঈবাদতে
দাঁড়ায়, আল্লাহ তায়ালা তার পূর্বের
গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। (বুখারী শরীফ ১৯০১ মুছলিম শরীফ ৭৬০)
এই হাদীছ শরীফ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই রাত কেবল ছ্বওয়াব অর্জনের সুযোগ নয়; বরং এটি গুনাহ মাফের একটি বিশেষ সুযোগও। আর এই কারণেই রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমজান শরীফের শেষ দশ রাতে ঈবাদতের প্রতি বিশেষ
গুরুত্ব দিতেন। তিনি
এই সময়ে রাত জাগতেন, অধিক ঈবাদত করতেন এবং
পরিবারকেও ঈবাদতের জন্য জাগিয়ে তুলতেন। এই সব দিক বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে লাইলাতুল ক্বদর শরীফ
আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য একটি মহান রহমত ও অমূল্য নিয়ামত।
লাইলাতুল ক্বদর শরীফের য়া’মল
লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন একটি রাত, যেখানে একজন মুমিনের জন্য ঈবাদত, দোয়া এবং তওবার দরজা বিশেষভাবে খুলে দেওয়া হয়। এই রাতকে কেন্দ্র করে
যে আমলগুলো করা হয় সেগুলোর মূল ভিত্তি হলো ক্বুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ এবং রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার ছুন্নাহ।
প্রথমত, এই রাতে সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ রাতের নামাজ। প্রিয় নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমজান শরীফের শেষ দশ রাতে বিশেষভাবে রাত জেগে ঈবাদত করতেন। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে
তিনি এই সময়ে নিজের ঈবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন এবং পরিবারকেও ঈবাদতের জন্য জাগিয়ে তুলতেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়
যে এই রাতকে ঘুমিয়ে কাটানো নয়, বরং ঈবাদতের মাধ্যমে
জীবন্ত করে তোলা উচিত।
দ্বিতীয়ত, ক্বুরআন তিলাওয়াত এই
রাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। কারণ এই রাতের সাথে ক্বুরআন শরীফ নাযিলের সম্পর্ক রয়েছে। তাই এই রাতে বেশি বেশি ক্বুরআন
তিলাওয়াত করা, তার অর্থ নিয়ে চিন্তা করা
এবং আল্লাহর কালামের সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক দৃঢ় করা অত্যন্ত বরকতময় কাজ।
তৃতীয়ত, পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর
শরীফের দোয়া ও ইস্তিগফার হলেন সেই রাতের একটি বিশেষ য়া’মল। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে
উম্মুল মু’মিনীন হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়া’লাইহাছ ছালাম একবার জিজ্ঞেস
করেছিলেন যদি তিনি লাইলাতুল ক্বদর শরীফ পান তাহলে কী দোয়া করবেন। তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে একটি দোয়া শিক্ষা দিয়েছিলেনঃ (اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي) (আল্লাহুম্মা ইন্নাকা য়া’ফুউন্ন তুহিব্বুল
য়া’ফওয়া ফা’য়ফু য়া’ন্নীই) অর্থাৎ হে মহান আল্লাহ
তা’য়ালা, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে
ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (ছুনান ইবনে মাজাহ ৩৮৫০) এই দোয়াটি লাইলাতুল
ক্বদরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দোয়া হিসেবে বিবেচিত।
চতুর্থত, যিকির ও তাসবিহ এই
রাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঈবাদত। “ছুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”,
“আল্লাহু
আকবার”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এই ধরনের জিকিরের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার স্মরণে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারে। বিশেষ করে ইস্তিগফার করা এই রাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি গুনাহ মাফের রাত।
পঞ্চমত, ইতিকাফ এই রাতগুলোর
সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ছুন্নাহ। রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমজান শরীফের শেষ দশ দিন
ইতিকাফ করতেন। এর
উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে গিয়ে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ঈবাদতে
নিজেকে নিয়োজিত করা।
সবশেষে বলা যায়,
লাইলাতুল
ক্বদর শরীফ এমন একটি রাত যা একজন মুমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। যে ব্যক্তি এই রাতকে
গুরুত্ব দেয়, ঈবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট
ফিরে আসে এবং আন্তরিকভাবে তওবা করে, তার জন্য এই রাত রহমত,
মাগফিরাত
এবং নাজাতের এক অসাধারণ সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।
এই কারণে মুমিনের জন্য উচিত রমজান শরীফের শেষ দশ রাতকে
বিশেষভাবে মূল্য দেওয়া, বেজোড় রাতগুলোতে
অধিক মনোযোগ দেওয়া এবং ফাযর পর্যন্ত ঈবাদতের পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা। কারণ এই রাত কখন এসে
যায় তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না, কিন্তু যে ব্যক্তি
অনুসন্ধান করে সে-ই এর বরকত লাভ করার সম্ভাবনা বেশি রাখে। (মহান আল্লাহ তায়ালা
তিনিই সবকিছু পারফেক্ট জানেন।)