Thursday, October 1, 2026

ঈলমের নিছবত আহলে জিকিরে হলেও হেদায়েত কেবল মুর্শিদে কামিলে

তোমার কি কখনো এটা জানার ইচ্ছা হয়েছে যে মহান আল্লাহ পাক কি তোমার ক্বলবে মুহর মেরে দিয়েছেন?

তোমার ভাগ্যে হেদায়েত আছে নাকি নাই, এটা বোঝার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছেন ক্বলবী জিকির। যদি তোমার ক্বলবে জিকির চালু হয় তবে এর অর্থ হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাকে হেদায়েতের জন্য নির্বাচিত করেছেন, আর যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও দেখো যে জিকির চালু হয়নি, তাহলে বুঝতে হবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাকে রিজেক্ট করেছেন।

এখন, এটা এমন কোন আহামরি ঈলম নয় যে এর জন্যে তোমাকে ইমামে আজম হতে হবে, কিংবা শাইখুল আকবার। বরং খুব সহজেই এটা বুঝতে পারবে যে, মহান আল্লাহ পাক তোমাকে আসলে হেদায়েত দিতে চান কি না, যখন তিনি তোমাকে হেদায়তে দিতে চাইবেন তখন হয় তুমি মুর্শিদে কামিলের কাছে চলে যাবে, নতুবা মুর্শিদকে তোমার নিকট পাঠিয়ে দেবেন। আর যদি অলরেডি মুর্শিদ থেকে থাকে, কিন্তু তোমার ক্বলব জিকির করতে চায়না, তখন কি হবে? ধরো তুমি তোমার মুর্শিদের কাছ থেকে জিকিরের ইজিন নিয়েছো, লম্বা সময় হয়ে গেছে কিন্তু তোমার জিকির চালুই হয়নি, তাহলে কি এর মানে রহমান মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাকে মুহর মেরে দিয়েছেন?

না, এর মানে এটা নয় যে তুমি মুহর খেয়েছো, বরং মহান আল্লাহ তা’য়ালা যদি তোমাকে প্রত্যাখ্যান করতেন, তাহলে তোমার আক্বিদাহ খারাপ হয়ে যেতো, অলি আল্লাহ রহমতুল্লাহী য়ালাইহিম উনাদের প্রতি মুহব্বত-ভালোবাসা-ইশক তোমার অন্তর থেকে খালি করে দিতেন, হেদায়েত পাওয়ার চেষ্টা, কৌশিস, বন্ধ হয়ে যেত, তালাশে মুর্শিদ জারি থাকতো না, হাসিলে মুর্শিদ খতম হয়ে যেত। নিজেকে হেদায়েতপ্রাপ্ত অলি আউলিয়াদের চেয়েও আফজাল, উত্তম, বড় মনে করতে শুরু করতে। অলি আউলিয়াদের প্রতি সম্মান, ইজ্জৎ মুহব্বত প্রদর্শন, উনাদের তাজিম খতম হয়ে যেত। যদি মহান আল্লাহ তা’য়ালা মুহর মেরে দিতেন তাহলে অহংকারী, মুতাকাব্বির হয়ে যেতে। দেখো, মহান আল্লাহ পাক ইবলিছকে মুহর মেরেছেন, কিন্তু জানার বিষয় হলো সে কি শিরক করেছিলো? বিদ’য়াত করেছিলো? ঈবাদাত করেনাই? মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি কি তার বদ আক্বিদাহ ছিলো? নাকি সে নাস্তিক হয়ে গিয়েছিলো? কোনটাই না, বরং সে মুতাকাব্বির হয়ে গিয়েছিলো। অতএব তুমিও যদি মহান আল্লাহ পাক কতৃক মুহরপ্রাপ্ত হও, তবে তুমিও মুতাকাব্বির হয়ে পড়বে। নাউযুবিল্লাহ

মহান আল্লাহ পাক কতৃক মুহরপ্রাপ্ত হওয়ার পরেও তুমি হেদায়েতের বিষয়ে চিন্তিত থাকবে এমনটা কখনোই হতে পারেনা। যতক্ষণ তুমি হেদায়েত পাওয়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন থাকবে, এর সহজ অর্থ হলোঃ মহান আল্লাহ পাক তোমাকে প্রত্যাখ্যান করেননি, তুমি মুহরপ্রাপ্তও নও। আর যদি দেখা যায় যে ক্বলবে জিকির জারিই হয়নি, তাও তুমি ভাবতে শুরু করে দিছো যে আমি সঠিক পথেই আছি, আমি কি কম বুঝি নাকি? বরং বাকি সবাই-ই ভুল তাহলে বুঝবে তোমার কাম খতম হয়ে গেছে, এটা আমার নয় খোদ মহান আল্লাহ তা’য়ালাই বলেনঃ (وَ مَنۡ یَّعۡشُ عَنۡ ذِکۡرِ الرَّحۡمٰنِ نُقَیِّضۡ لَہٗ شَیۡطٰنًا فَہُوَ لَہٗ قَرِیۡنٌ وَ اِنَّہُمۡ لَیَصُدُّوۡنَہُمۡ عَنِ السَّبِیۡلِ وَ یَحۡسَبُوۡنَ اَنَّہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ) যে ব্যক্তি দয়াময় মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার উপর ক্বরিনকে মুছাল্লাত করে দেই, অতপর সে-ই (সর্বক্ষণ) তার সাথী হয়ে থাকে। অবশ্যই এরা তাদেরকে (মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার) পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, (যদিও) তারা নিজেরা মনে করে তারা বুঝি সঠিক পথের ওপরই রয়েছে। (ছুরাহ আয-যুখরুফ ৪৩:৩৬-৩৭)

অতএব যার ক্বলব রহমান মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে নিজে হক্বের উপর আছে মনে করতেই পারে, কিন্তু বাস্তবে সে ক্বরিনের তাঁবেদার। আর মুহরপ্রাপ্তির আলামতও হলো জিকির জারিই নাই উল্টা জাকিরদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমিই হেদায়েতের উপর আছি, আমার চেয়ে দ্বীনের বিষয় কে বেশি জানে, এমন আক্বিদাহ বিশ্বাস রাখা। এরূপ হলে আল ক্বুরআনের ভাষায় বুঝে নেবে যে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমার ক্বলবে মুহর মেরে দিয়েছেন, কেননা তিনিই বলেনঃ (خَتَمَ اللّٰہُ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ) (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:৭) তখন আর কেউ হাজার বুঝালেও কাজ হবেনা, কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেনঃ (كَذَٰلِكَ يَطْبَعُ ٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ) এভাবেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেক অহংকারী, যবরদস্ত-অত্যাচারী ব্যক্তির ক্বলবের উপর মুহর লাগিয়ে দেন। (ছুরাহ আল-গ্বফির ৪০:৩৫)

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, যদি মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাকে প্রত্যাখ্যান না করে থাকেন বা তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হোন, তবে কেনো তোমার জিকির এখনো চালু হয়নি, বছরের পর বছর তুমি মুরিদ হয়ে আছো এর পরেও?

জিকির শুরু না হওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, সম্ভবত মহান রব তা’য়ালা তোমাকে পরীক্ষা করছেন, কারণ মহান আল্লাহ পাক কারো শুরুতে আবার কারো শেষ পর্যায়ে পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। তিনি হয়তো দেখাতে চাচ্ছেন যে তিনি তোমাকে পরীক্ষা করলে তুমি উনার জন্য কতদিন চেষ্টা করতে পারো? তিনি হয়তো তোমার ইস্তিকামত জানাতে চান তুমি কতোটুকু ছ্ববর নিয়ে পড়ে থাকো, যদি কয়েক মাসেও কিংবা বছরেও তোমার জিকির চালু না হয়, তবুও কি তুমি উনার পথে অবিচল থাকবে? তবুও কি তুমি উনাকে পরিত্যাগ করবে?

সুতরাং, ইহা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সাথে মহান রব তা’য়ালা উনার আচরণ। এটা একটা কারণ আমরা পেলাম। অন্য আরেকটি কারণ হতে পারে, যাকে তুমি মুর্শিদ মনে করছো, ত্বরীকার পথে তিনি হয়তো ঐ ঈলমের অধিকারী নন, বরং তিনি কেবল শরীয়তের ঈলমপ্রাপ্ত একজন শায়েখ, এখনো ত্বরীকার হাক্বিকি ঈলম উনাকে আতা করা হয়নি, মুর্শিদ বানানো হয়নি। ঘুমন্ত ক্বলবকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা তিনি আরশে ইলাহী থেকে এখনো লাভ করেন নাই। অনেক শায়েখ রয়েছেন যারা শরীয়তের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ কিন্তু ত্বরীকার নন। যারা ত্বরীকার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, যারা মাদানী নূরের নেটওয়ার্কে ২৪ ঘন্টা যুক্ত থাকেন, তারাই কেবল ক্বলবকে বেদার বা জাগ্রত করার অনুমতি এবং ক্ষমতা রাখেন। অনেক সময় শরীয়তের শায়েখ তার মুরিদকে বলে থাকেন ঠিক আছে আমি তোমাকে অনুমতি দিলাম যাও জিকির শুরু করে দাও। এর পর আর কোন খবর থাকেনা। তো যাইহোক যতটুকু বললাম এর থেকে স্পষ্ট বুঝে নেওয়ার কথা যে মহান আল্লাহ পাক কি তোমার ক্বলবে মুহর মেরে দিয়েছেন? নাকি পরিক্ষায় আছেন? নাকি মুর্শিদে কামিল যাকে মনে করছো তিনি আসলে মানুষ ভালো হলেও ছানোবর কলবকে বেদারের ক্ষমতা ওয়ালা ত্বরীক্বাহ এর মুর্শিদ নন।

এখন আমরা জানবো, মুর্শিদ কী? মুর্শিদ উনার হাক্বিক্বত কী?

মুর্শিদ সম্পর্কে সমাজের ভুল ধারণাঃ আমাদের প্রচলিত ইছলামিক সমাজে মুর্শিদ সম্পর্কে বড় ধরনের গোমরাহি, জাহেলিয়াত ও ভুল ধারণা বিদ্যমান। সাধারণ মানুষের কথা নাহয় বাদই দিলাম, অথচ কথিত দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক মানুষের ঈলমে পর্যন্ত মুর্শিদ উনার প্রকৃত হাক্বিক্বত স্পষ্টভাবে বিদ্যমান নেই, ফলে মানুষ অনেক সময় পীর, দরবেশ, শাইখ, হুজুর, য়া’লীম, উলামাহ, ইমাম, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাছছির, মুহাক্কিক্ব ও মুজতাহিদ, এসব লক্ববের সাথে মুর্শিদ উনার মাক্বামকে এক কাতারে গুলিয়ে ফেলে। অথচ হাক্বিক্বত হলো, এসব লক্বব মূলত দ্বীনি, ঈলমী, য়া’মলী, তা’য়লীমী, তাবলীগী বা গবেষণামূলক ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত; আর মুর্শিদ উনার মাক্বাম হলো ক্বলবের হেদায়েত, নফছের তাজকিয়াহ, আখলাকি ইছলাহ ও রূহানী ইরশাদের আলাদা এক খাছ ক্যাটাগরি। আর এই দুই ক্যাটাগরির মানুষের কাজই আলাদা।

প্রথম ক্যাটাগরি হলো আহলে জিকিরঃ উনাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র আল-ক্বুরআনের ছুরাহ আন-নাহল শরীফের ৪৩ নং আয়াত শরীফে এবং ছুরাহ আল-আম্বিয়া য়ালাইহিমুছ ছালাম-এর ৭ নং আয়াত শরীফে ইরশাদ করেনঃ (فَسْـَٔلُوٓا۟ أَهْلَ ٱلذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ) অর্থাৎ, দ্বীনের কোনো বিষয়ে যদি না জানো, তাহলে আহলে জিকিরদের থেকে জেনে নাও। (ছুরাহ আন-নাহল ১৬:৪৩, ছুরাহ আল-আম্বিয়া য়ালাইহিমুছ ছালাম ২১:৭)

এখন আমরা যদি পীর, দরবেশ, শাইখ, হুজুর, য়া’লীম, উলামাহ, ইমাম, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাছছির, মুহাক্কিক্ব ও মুজতাহিদদের সংজ্ঞা দেখি, তাহলে বুঝতে পারবো যে উনারা অধিকাংশই আহলে জিকিরের অন্তর্ভুক্ত, যদি উনারা হাক্বিক্বতে ঐসকল লক্ববের মাক্বামে ফায়েজ হয়ে থাকেন।

১. পীরঃ যিনি ছুন্নী মতাদর্শীদের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে পরিচিত, যিনি উনার অনুসারীদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য ছুন্নীয়তের তা’য়লীম দেন এবং ছুন্নাত মুবারক-এর উপর চলার দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

২. দরবেশঃ আধ্যাত্মিক সাধক বা ছ্বুফী, যিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করেন এবং দুনিয়ার ভোগবিলাস ত্যাগ করে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নৈকট্য লাভের জন্য চেষ্টা-সাধনা করে যান।

৩. হুজুরঃ সাধারণভাবে সম্মানসূচক উপাধি, যা সাধারণত য়া’লিম, শিক্ষক বা ইমামের বেলায় ব্যবহার হয়ে থাকে। এটি অনেক সময় স্থানীয়ভাবে ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হয়।

৪. শাইখঃ শব্দের মূল অর্থ বয়সের দিক থেকে প্রবীণ ব্যক্তি। কিন্তু পরে এর অর্থ প্রসারিত হয়ে দাঁড়িয়েছে: ঈলমে প্রবীণ, য়া’মলে প্রবীণ, অভিজ্ঞতায় প্রবীণ, সমাজে সম্মানিত, অথবা দ্বীনের বিষয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দ্বীন প্রচারক।

৫. য়া’লীমঃ ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানী ব্যক্তি, যিনি আল-ক্বুরআন, হাদীছ শরীফ, ফিক্বহ এবং অন্যান্য ইছলামি আইন-শাস্ত্রের বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখেন।

৬. উলামাঃ য়া’লিমদের সমষ্টিগত গোষ্ঠী, যারা সমাজে সম্মানিত দ্বীন ইছলামের প্রচার করেন এবং শরীয়তের সিদ্ধান্ত বা দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

৭. ইমামঃ মসজিদে নামাজের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি। পাশাপাশি তিনি মুছ্বল্লিদের মাঝে ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণ করেন এবং অন্য ক্ষেত্রে মুছলিম সমাজে ধর্মীয় নেতা হিসেবেও ভূমিকা পালন করেন।

৮. মুফতীঃ ইছলামিক আইন ও ফিক্বহের বিশেষজ্ঞ, যিনি শরীয়াহ আইন অনুযায়ী ফতোয়া প্রদান করেন।

৯. মুহাদ্দিছঃ হাদীছ শরীফের বিশেষজ্ঞ, যিনি হাদীছ শরীফ সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ছনদ ও মতন যাচাই করেন।

১০. মুফাছছিরঃ পবিত্র আল-ক্বুরআনের ব্যাখ্যাকারী, যিনি আল-ক্বুরআনের আয়াত শরীফসমূহের গভীর অর্থ, ভাষাগত দিক, নাযিলের প্রেক্ষাপট ও শরঈ প্রয়োগ অনুযায়ী বিশ্লেষণ করে তাফছীর প্রদান করেন।

১১. মুহাক্কিক্বঃ একজন গবেষক বা বিশেষজ্ঞ, যিনি ইছলামিক জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীল, বক্তব্য, সূত্র ও ব্যাখ্যা যাচাই করে প্রামাণিক বিশ্লেষণ প্রদান করেন।

১২. মুজতাহিদঃ এমন উচ্চ পর্যায়ের য়া’লিম, যিনি আল-ক্বুরআন ও হাদীছ শরীফের গভীর জ্ঞান, আ’রবী ভাষা, উছ্বূলে ফিক্বহ, ইযমা’য়, ক্বিয়াছ এবং শরীয়তের অন্যান্য প্রয়োজনীয় শাস্ত্রের ভিত্তিতে নতুন বা জটিল সমস্যার শরীয়াহ সম্মত সমাধান দিতে সক্ষম। তিনি নিজের গবেষণা ও ইযতিহাদের মাধ্যমে মাছআলার হুকুম নির্ণয় করেন।

এতক্ষণ যাদের আলোচনা করা হলো, উনাদের অধিকাংশই সম্মিলিতভাবে আহলে জিকিরের অন্তর্ভুক্ত, যারা হাক্বিক্বতে ঐসকল লক্ববের মাক্বামে ফায়েজ হয়ে আছেন। উনাদের কাজ কী, তা উনাদের লক্ববের ব্যাখ্যাতেই স্পষ্ট হয়ে যায়। কেউ ফতোয়া দেন, কেউ তাফছীর করেন, কেউ হাদীছ শরীফ যাচাই করেন, কেউ গবেষণা করেন, কেউ ইমামতি করেন, কেউ দ্বীনি তা’য়লীম দেন, কেউ নছীহত করেন। অর্থাৎ উনাদের ময়দান মূলত ঈলম, তা’য়লীম, শরীয়তের দিকনির্দেশনা, গবেষণা, য়া’মল এবং দ্বীনি খিদমতের ময়দান।

কিন্তু প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, পীর আর মুর্শিদ একই জিনিস। হাক্বিক্বতের দৃষ্টিতে এই ধারণা সঠিক নয়। পীর শব্দটি সমাজে অনেক সময় তাছ্বাউফ-সম্পর্কিত কোনো বুযুর্গ, দরবেশ, শাইখ বা আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু মুর্শিদ শব্দটি কেবল সামাজিক সম্মানসূচক উপাধি নয়; বরং হেদায়েত, তাজকিয়াহ, ক্বলবের ইছ্বলাহ, নফছের চিকিৎসা, জিকিরের তরবিয়ত এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ক্বুরবের পথে মুরীদকে পরিচালনার সাথে সম্পর্কিত খাছ মাক্বাম।

অতএব, প্রত্যেক পীর নামধারী ব্যক্তি মুর্শিদে কামিল নন। আবার প্রত্যেক শাইখ, হুজুর, য়া’লীম, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাছছির, মুহাক্কিক্ব বা মুজতাহিদও মুর্শিদে কামিল নন। উনারা প্রত্যেকে উনাদের নিজ নিজ ঈলমী বা য়া’মলী ময়দানে সম্মানিত হতে পারেন; কিন্তু মুর্শিদে কামিলের কাজ কেবল মাছআলা বলা, কিতাব পড়ানো, তাফছীর করা, হাদীছ শরীফ যাচাই করা, ফতোয়া দেওয়া বা ওয়াজ করা নয়। মুর্শিদে কামিলের মূল কাজ হলো বান্দার অন্তরের রোগ শনাক্ত করা, নফছের নাপাকি দূর করা, ক্বলবকে জিকিরমুখী করা, মুরীদকে গ্বাফলত থেকে বের করে হেদায়েতের পথে স্থাপন করা এবং ছুলুকের পথে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দিকে চালিত করা।

এই কারণে মুর্শিদকে সাধারণ লক্ববের তালিকায় রাখলে মুর্শিদ উনার হাক্বিক্বত আড়ালে পড়ে যায়। যেমন একজন মুফতীর কাজ ফতোয়া দেওয়া, মুহাদ্দিছের কাজ হাদীছ শরীফের ছনদ ও মতন যাচাই করা, মুফাছছিরের কাজ পবিত্র আল-ক্বুরআনের আয়াত শরীফের ব্যাখ্যা করা, মুহাক্কিক্বের কাজ দলীল ও বক্তব্য যাচাই করা; তেমনি মুর্শিদে কামিলের কাজ হলো হেদায়েত, তাজকিয়াহ ও রূহানী ইরশাদের ময়দানে মুরীদকে পরিচালনা করা। তাই পীর, দরবেশ, শাইখ, হুজুর, য়া’লীম, উলামা, ইমাম, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাছছির, মুহাক্কিক্ব ও মুজতাহিদ এসব লক্ববের আলোচনা একদিকে থাকবে; আর মুর্শিদে কামিল উনার আলোচনা আলাদা মাক্বামে থাকবে।

সমাজে মুর্শিদ সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে কারণ মানুষ লক্বব ও মাক্বামের পার্থক্য বুঝতে পারেনি। লক্বব বাহ্যিক পরিচয় হতে পারে, কিন্তু মাক্বাম হলো হাক্বিক্বত। কেউ পীর নামে পরিচিত হলেই মুর্শিদে কামিল হয়ে যান না; কেউ শাইখ বা য়া’লীম হলেই ক্বলবের চিকিৎসক হয়ে যান না; কেউ মুফতী বা মুহাদ্দিছ হলেই নফছের তাজকিয়া-এর মুরুব্বী হয়ে যান না। মুর্শিদে কামিল হলেন তিনি, যিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে হেদায়েত, ইরশাদ, তাজকিয়াহ ও ক্বলবী তরবিয়তের খাছ মাক্বামে প্রতিষ্ঠিত।

এইজন্য সংক্ষেপে বলা যায়ঃ প্রত্যেক মুর্শিদে কামিল আহলে জিকিরের অন্তর্ভুক্ত হলেও, প্রত্যেক আহলে জিকির মুর্শিদে কামিল নন।

২ নং ক্যাটাগরিঃ মুর্শিদ উনার ক্বুরআনিক পরিচয় ও হেদায়েতের সাথে খাছ নিছবত।

এবার আসি ২ নং ক্যাটাগরিতে, যেখানে কেবল মুর্শিদ রয়েছেন। মুর্শিদ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র আল-ক্বুরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, উনার মাক্বাম কী। মূলত মহান আল্লাহ তা’য়ালা যখন উনার কোনো বান্দার প্রতি দয়া করেন এবং তাকে হেদায়েতের পথে নিতে চান, তখন তিনি তাকে হেদায়েতের মাধ্যম আতা করেন। আর যে বান্দা গোড়ামী, বিদ্বেষ, অহংকার ও গুমরাহির উপর অটল থাকে, মহান রব তা’য়ালা তাকে হেদায়েতের তাওফীক থেকে বঞ্চিত করেন। ফলে তার জন্য কোনো সত্য পথপ্রদর্শক কার্যকর থাকেন না।

পবিত্র আল-ক্বুরআনের ছুরাহ আল-কাহাফ শরীফের ১৭ নং আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (مَن يَهْدِ ٱللَّهُ فَهُوَ ٱلْمُهْتَدِ ۖ وَمَن يُضْلِلْ فَلَن تَجِدَ لَهُۥ وَلِيًّۭا مُّرْشِدًۭا) অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’য়ালা যাকে হেদায়েত দান করেন, একমাত্র সেই হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়। আর যাকে তিনি গুমরাহির উপর ছেড়ে দেন, (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) তার জন্য দ্বীনের অভিবাবকরূপে আপনি কোনো মুর্শিদ (খুঁজে) পাবেন না, (যিনি তাকে হেদায়েত দিবেন)। (ছুরাহ আল-কাহাফ ১৮:১৭)

এই আয়াত শরীফে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, মহান আল্লাহ তা’য়ালা হেদায়েত ও গুমরাহির প্রসঙ্গে (وَلِيًّا مُّرْشِدًا) শব্দ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ এখানে মুর্শিদ কোনো সাধারণ সামাজিক উপাধি নয় বরং হেদায়েতের সাথে সম্পর্কিত এক খাছ মাক্বাম। আহলে জিকিরের সাথে যেমন দ্বীনের অজানা বিষয় জিজ্ঞাসা করার নিছবত স্থাপন করা হয়েছে, তেমনি এই আয়াত শরীফে হেদায়েতের সাথে মুর্শিদ উনার খাছ নিছবত স্থাপন করা হয়েছে। এখান থেকেই বুঝা যায়, আহলে জিকির দ্বীনের ঈলমী জিজ্ঞাসার মারকাজ হলেও মুর্শিদে কামিল হলেন হেদায়েত, তাজকিয়াহ, ক্বলবী ইছ্বলাহ ও রূহানী ইরশাদের খাছ মারকাজ।

আমরা যদি সম্মানিত দ্বীন ইছলামের শুরুতে তাকাই তাহলে আমরা দেখতে পাই, মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু য়া’নহুম উনাদের জন্য সর্বপ্রথম মুর্শিদরূপে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে আতা করেছেন। তিনি একদিকে ছিলেন মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রছুল ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম, অন্যদিকে উম্মতের মু’য়াল্লিম, মুজাক্কী, হাদী এবং মুর্শিদে আ’য়জ্বম। তিনি প্রথমেই মাছআলা শেখাননি; তিনি আয়াত মুরিদের উপর পাঠের ঈলম ওয়ালা ছিলেন, যার ফলে ক্বলবে নূর গেছে, নফছের তাজকিয়াহ হয়েছে, জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে মানুষকে ইমান, নূর, হিকমত ও হেদায়েতের পথে এনেছেন। যেমনঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولٗا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٖ مُّبِينٖ) তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি জাহিল আরবদের মধ্যে থেকে তাদেরই একজনকে রছুল বানিয়ে পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের উপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করেন। আর তাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল ক্বুরআনের জাহেরি বাতেনি) ঈলম শিক্ষা দেন, ও (বাতেনী ঈলম বোঝার) হিকমত বা প্রজ্ঞার দীক্ষাও দেন। অথচ এ লোকগুলোই (রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আসার) আগে (পর্যন্ত) সুস্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত ছিলো। (ছুরাহ আল-যুমু’য়াহ ৬২:২)

ক্বুরআনিক শব্দে মুর্শিদ অর্থ হলেন দ্বীনের পথপ্রদর্শক। যিনি নাপাককে পাক-পবিত্রতার পথে অর্থাৎ ছুলুকের পথে পরিচালনা করেন, যিনি আত্মদর্শনের পথ দেখিয়ে দেন, যিনি লা’য়নাতের মধ্যে ডুবে থাকা নফছকে রহমতের সাগরের দিকে ফেরান, যিনি গুমরাহ হয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়া বান্দাকে ছ্বিরাতুল মুস্তাক্বীমের দিশা দেন, তিনিই উক্ত আয়াতে বলা মুর্শিদ। এক কথায়, প্রত্যেক জামানায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দয়ায় যারা বান্দাদের জন্য পরপারের কান্ডারী হিসেবে মওজুদ থাকেন, হাক্বিক্বতে উনারাই হলে মুর্শিদ।

মুর্শিদ শব্দটি আ’রবী رُشْد ও إِرْشَاد থেকে সংশ্লিষ্ট। এর আভিধানিক অর্থ হলো হেদায়েত, সঠিক পথ, সত্যের দিশা, পথপ্রদর্শন। আ’রবী ভাষায় পথ দেখানো বা গাইড করার অর্থেও مُرْشِد ব্যবহৃত হয়। আর ইছলামি পরিভাষায় মুর্শিদ হলেন তিনি, যিনি মানুষকে গুমরাহির পথ থেকে হেদায়েতের পথে নিয়ে আসেন। শুধু বাহ্যিকভাবে নয় বরং ক্বলব, নফছ, য়া’মল, আদব ও ছুলুকের মাধ্যমে।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র আল-ক্বুরআনে ক্বলবের রোগ সম্পর্কে বলেনঃ (فِى قُلُوبِهِم مَّرَضٌۭ فَزَادَهُمُ ٱللَّهُ مَرَضًۭا) অর্থাৎ তাদের ক্বলবসমূহে রোগ রয়েছে, অতঃপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের রোগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। (ছুরাহ বাক্বারাহ ২:১০) আর হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (النُّعْمَانَ بْنَ بَشِيرٍ، يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏"‏ الْحَلاَلُ بَيِّنٌ وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ، وَبَيْنَهُمَا مُشَبَّهَاتٌ لاَ يَعْلَمُهَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ، فَمَنِ اتَّقَى الْمُشَبَّهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِيِنِهِ وَعِرْضِهِ، وَمَنْ وَقَعَ فِي الشُّبُهَاتِ كَرَاعٍ يَرْعَى حَوْلَ الْحِمَى، يُوشِكُ أَنْ يُوَاقِعَهُ‏.‏ أَلاَ وَإِنَّ لِكُلِّ مَلِكٍ حِمًى، أَلاَ إِنَّ حِمَى اللَّهِ فِي أَرْضِهِ مَحَارِمُهُ، أَلاَ وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ‏.‏ أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ) নু’মান ইবনে বশীর রদ্বিয়াল্লাহু য়া’নহু বলেন, আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, “নিশ্চয়ই হালাল বিষয় স্পষ্ট, আর হারাম বিষয়ও স্পষ্ট। আর এ দুটির মাঝখানে কিছু সন্দেহপূর্ণ বিষয় আছে, যা অনেক মানুষ জানে না। সুতরাং যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন এবং তার সম্মানকে নিরাপদ রাখে। আর যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে, তার অবস্থা সেই রাখালের মতো, যে নিষিদ্ধ চারণভূমির চারপাশে পশু চরায়; অচিরেই সে সেই নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সাবধান! প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত সীমানা থাকে। জেনে রাখো! মহান আল্লাহ তা’য়ালার জমিনে উনার সংরক্ষিত সীমানা হলো উনার হারামকৃত বিষয়সমূহ। সাবধান! শরীরের মধ্যে একটি গোশতপিণ্ড রয়েছে; সেটা ঠিক হয়ে গেলে পুরো শরীর ঠিক হয়ে যায়, আর সেটা নষ্ট হয়ে গেলে পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। আরো জেনে রাখো! সেটি হলো ক্বলব। (বুখারি শরীফ ৫২, মুছলিম শরীফ ১৫০০এ)

এই আয়াত শরীফ ও হাদিছ শরীফ থেকে সহজেই বোঝা যায়, মানুষের আসল সমস্যা মূলত বাহ্যিক য়া’মলে ঘাটতিতে নয় বরং ক্বলবের রোগই হলো সকল সমস্যার জড়/রুট। হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, বুগ্বজ, হাছাদ, রিয়া, কিবর, আমিত্ব, গ্বাফলত, নফছের পূজা এসবের প্রকাশ বাহ্যিকভাবে পেলেও মূলে এগুলো ক্বলব ও নফছের রোগ। আর এই রোগকে আল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ মুবারকের নূরানী ঔষধ দ্বারা শনাক্ত করে পরিচর্যা যিনি করেন, তিনিই মুর্শিদুম মিন যানিবিল্লাহ। আর উনার এই পরিচর্যার ময়দানকেই বলা হয় ঈলমে তাছ্বাউফ, যার মধ্যে ঈলমে শরীয়ত, ঈলমে ত্বরীক্বত, ঈলমে মা’য়রিফাত এবং ঈলমে হাক্বিক্বত নিজ নিজ মাক্বাম অনুযায়ী বিদ্যমান থাকেন।

ইনকারে মুর্শিদুম মিন যানিবিল্লাহঃ অর্থাৎ যে মুর্শিদকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা হেদায়েতের কাজে হাদীর মাক্বামে ফায়েজ করেন, উনার ব্যাপারে বিদ্বেষ রাখা অত্যন্ত ভয়ংকর। কারণ এটা কোনো সাধারণ ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষ নয় বরং হেদায়েতের একটি দরজা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার নাম। তবে এটাও সত্য যে বর্তমান সমাজে কিছু অসাধু ধর্মব্যবসায়ী, ভণ্ড পীর, ভণ্ড দরবেশ ও মিথ্যা দাবিদার, মানুষের সরলতাকে ব্যবহার করে প্রতারণা করছে, ফলত এদের কারণে অনেক মানুষ প্রকৃত মুর্শিদুম মিন যানিবিল্লাহ উনাকেও অস্বীকার করে বসে, কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত।

মসজিদে জুতা চুরি হয় বলে কেউ গোটা মসজিদ ত্যাগ করে না। ইছলামের নাম ব্যবহার করে কোনো ভ্রান্ত দল, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা ফিতনাবাজ গোষ্ঠী জমিনে ফেতনা সৃষ্টি করলে, তার কারণে কেউ গোটা ইছলামকে অস্বীকার করতে পারে না। ইছলামের ভেতরে খারাপ ব্যক্তি আছে বলে গোটা দ্বীনকে বাতিল বলা যায় না। তদ্রূপ, মুরীদ-মুর্শিদী হাক্ব বিষয়। এই হাক্ব বিষয়ের নামে ভণ্ড প্রতারকরা মুর্শিদ সেজে ভণ্ডামী করেছে বলে সম্পূর্ণ মুরীদ-মুর্শিদীকে ভ্রান্ত বলার কোন অনুমতি নাই, সুযোগ ও নাই।

মূলত আজ যারা মুরীদ-মুর্শিদীর বিরোধিতা করে, তাদের অনেকেই মুরীদ-মুর্শিদী কাকে বলে, মুর্শিদে কামিল কাকে বলে, আর ভণ্ড দাবিদার কাকে বলে, এই সংজ্ঞাগুলোই জানে না। যদি তারা হাক্বিক্বত জানতো, তাহলে প্রকৃত তাছ্বাউফকে অস্বীকার করতো না বরং মুর্শিদে কামিলের ছ্বহবত, গোলামী, আদব ও তরবিয়তের মধ্যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি অন্বেষণ করতো।

একজন মূর্খ ব্যক্তি যদি নিজেকে সার্জন বা এমবিবিএস ডাক্তার দাবি করে, কোনো বুদ্ধিমান মানুষ তার হাতে নিজের পেটের টিউমার অপারেশন করতে দেবে? দেবে না, কেন? কারণ সে ডাক্তারের বৈশিষ্ট্য জানে। সে জানে, ডাক্তার হতে হলে শুধু দাবিই যথেষ্ট নয়, যোগ্যতা, শিক্ষা, অনুমোদন, অভিজ্ঞতা ও চিকিৎসার সক্ষমতা থাকতে হয়। অনুরূপ, কোনো ভণ্ড পীর, দরবেশ, বাবা বা য়া’লিম ‘‘মিন যানিবিল্লাহ’’ দাবি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করলে, তার কারণে খাঁটি মুর্শিদকে অস্বীকার করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং মিথ্যা দাবিদারকে বাদ দিয়ে সত্য মুর্শিদে কামিলকে চিনতে হবে।

অতএব, এই অধ্যায়ের সারকথা হলোঃ মুর্শিদ সাধারণ কোনো লক্বব নন। মুর্শিদ হলেন হেদায়েতের সাথে নিছবতপ্রাপ্ত, তাজকিয়ার ময়দানে প্রতিষ্ঠিত, ক্বলবী রোগের চিকিৎসক, নফছের ইছ্বলাহকারী এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে বান্দাকে পরিচালনাকারী রূহানী পথপ্রদর্শক। আহলে জিকির দ্বীনের ঈলমী জিজ্ঞাসার দরজা আর মুর্শিদে কামিল হেদায়েত, ইরশাদ, তাজকিয়াহ ও ছুলুকের দরজা।

হাক্বিক্বতে মুর্শিদ কে?

হাক্বিক্বতে মুর্শিদ হলেন তিনি, যিনি মারেন এবং জিন্দা করেন। এই কথা শুনে মূর্খ জাহিলেরা লাফ দিয়ে উঠলেও হাক্বিকি জ্ঞানে গুণান্বিত জ্ঞানীরা আগে জিজ্ঞাসা করবে, কীভাবে মারেন এবং কীভাবে জিন্দা করেন?

এর উত্তর হলোঃ মুর্শিদ নফছকে হত্যা করে ক্বলবকে জিন্দা করেন। অর্থাৎ তিনি মানুষের বাহ্যিক দেহকে হত্যা করেন না; বরং নফছে আম্মারাহ, আমিত্ব, তাকাব্বুরি, বুগ্বজ, হাছাদ, কিনা, বদ, বিদ’আত, রিয়া, গ্বাফলত, দুনিয়ার মোহ এবং নফছের পূজাকে হত্যা করেন। আর যে ক্বলব গ্বাফলতের অন্ধকারে মৃতের মতো পড়ে থাকে, সেই ক্বলবকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির, নূর, ছ্বহবত ও তাযকিয়ার মাধ্যমে জিন্দা করে দেন।

কেউ যদি হাক্বিক্বতে নিজেকে মুর্শিদ দাবি করেন, তাহলে উনার কথিত ছিলছিলাহ, খিলাফতনামা, বাহ্যিক পোশাক, খানকাহ, মুরীদের সংখ্যা, ওয়াজের খ্যাতি বা কিতাবের তালিকা-ই যথেষ্ট নয়। এইসব বাহ্যিক দাবির হাক্বিক্বতে কোনো মূল্য নেই, যতক্ষণ না তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে হেদায়েতের মাক্বামে প্রতিষ্ঠিত হবেন। মুর্শিদ হতে হলে শুধু দাবিই যথেষ্ট নয়; উনাকে এমন হতে হবে, যার ছ্বহবতে নফছের রোগ ধরা পড়ে, যার নজরে ক্বলবের গ্বাফলত ভাঙে, যার তরবিয়তে মুরীদ নিজের আমিত্ব থেকে মুক্তির পথ পায়, এবং যার ইরশাদে বান্দা গুমরাহির রাস্তা থেকে ছ্বিরাতুল মুস্তাক্বীমের দিকে ফিরে আসে।

কেউ যদি উক্ত ক্বুরআনিক আয়াত শরীফের ক্বায়িম মাক্বামে থাকা মুর্শিদ হোন, তাহলে বাহ্যিক পরিমাণের হিসাব দিয়ে উনাকে মাপা যাবে না। তিনি কত ক্বুরআন শরীফ পাঠ করালেন, কত হাদীছ শরীফ পড়ালেন, কত অজিফা দিলেন, কত বড় মজলিছ করলেন এসব নিজ নিজ জায়গায় ভালো হতে পারে; কিন্তু হেদায়েতের মূল পরিচয় এগুলো নয়। হেদায়েতের মূল পরিচয় হলো ক্বলবের পরিবর্তন, নফছের তাজকিয়াহ, ঈমানের নূর, জিকিরের হুযূর, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দিকে রুজু এবং গুনাহ থেকে বাস্তব ফিরে আসা।

শুধু বাহ্যিক নামাজ, বাহ্যিক রোজা, বাহ্যিক জাকাত, বাহ্যিক হজ্জ এসবকে যদি হেদায়েতের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করা হয়, তাহলে মুনাফিক্বরাও নামাজ পড়েছে; ছালাফি, আহলে হাদিছ, দেওবন্দি, শিয়া, কাদিয়ানি সবাই কোনো না কোনোভাবে নামাজ পড়ছে। বাহ্যিক নামাজ-ই যদি হেদায়েতের চূড়ান্ত প্রমাণ হতো, তাহলে এরা সবাই হেদায়েতের উপর রয়েছে বলে মানতে হতো। অথচ বাস্তবতা হলো, বাহ্যিক য়া’মল ইছলামের স্তম্ভ হলেও, এই স্তম্ভগুলোর বুনিয়াদ হলো ঈমান, নূর এবং ক্বলবের হেদায়েত। ক্বলব যদি নূর থেকে খালি থাকে, নফছ যদি আম্মারায় থাকে, আর য়া’মল যদি রিয়া, গ্বাফলত, তাকাব্বুরি ও আমিত্বে ভরা থাকে, তাহলে সেই য়া’মল বাহ্যিক কাঠামো মাত্র; তার ফাউন্ডেশন অনুপস্থিত, যেকোন সময় ধ্বসে পড়বে।

তাই আভ্যন্তরীণ ভিত্তিই মূল ভিত, যার উপর বাহ্যিক সুতুন দাঁড়িয়ে থাকে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَمَن يُؤْمِنۢ بِٱللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُۥ) অর্থাৎ, আর যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি ঈমান আনে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তার ক্বলবকে হেদায়েত দান করেন। (ছুরাহ আত-তাগ্বাবুন ৬৪:১১) এখানে হেদায়েতের সম্পর্ক সরাসরি ক্বলবের সাথে স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু মুখের দাবি, বাহ্যিক পরিচয়, দলীয় নাম, পোশাক, মসজিদে উপস্থিতি, মাদ্রাসার সনদ, ওয়াজের মঞ্চ এসব হেদায়েতের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। হেদায়েত তখনই হাক্বিক্বতে আসে, যখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার ক্বলবকে হেদায়েত দেন। আর এই ক্বলবী হেদায়েতের পথে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দয়ায় যিনি বান্দাকে পরিচালনা করেন, তিনিই মুর্শিদে কামিল। এই কারণে পবিত্র আল ক্বুরআনে বেদুঈন আরবদের একটি দলের দাবির জবাবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (قَالَتِ ٱلْأَعْرَابُ ءَامَنَّا ۖ قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا۟ وَلَٰكِن قُولُوٓا۟ أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ ٱلْإِيمَٰنُ فِى قُلُوبِكُمْ) অর্থাৎ, বেদুঈনরা বলেছে, আমরা ঈমান এনেছি। হে আমার হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম, আপনি বলে দিন, তোমরা এখনো ঈমান আনোনি; বরং বলো, আমরা ইছলাম গ্রহণ করেছি। কারণ এখনো ঈমান তোমাদের ক্বলবে প্রবেশ করেনি। (ছুরাহ আল-হুযুরাত ৪৯:১৪)

এই আয়াত শরীফ একেবারে স্পষ্ট করে দিল যে বাহ্যিকভাবে ইছলাম গ্রহণ করা আর ঈমান ক্বলবে প্রবেশ করা এক জিনিস নয়। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে মুছলমান হতে পারে, নামাজ পড়তে পারে, রোজা রাখতে পারে, জাকাত দিতে পারে, হজ্জ করতে পারে; কিন্তু ঈমানের নূর যদি ক্বলবে প্রবেশ না করে, নফছ যদি তাজকিয়াহ না হয়, ক্বলব যদি গ্বাফলত থেকে মুক্ত না হয়, তাহলে সে এখনো হেদায়েতের পূর্ণ হাক্বিক্বত লাভ করেনি।

তাই মুর্শিদ হলেন তিনি, যিনি নজর দিয়ে, ছ্বহবত দিয়ে, জিকিরের তরবিয়ত দিয়ে, আদব শিক্ষা দিয়ে এবং আল-ক্বুরআন-ছুন্নাহ শরীফের নূরানী চিকিৎসার মাধ্যমে ক্বলবকে পাক করেন এবং নফছকে হত্যা করেন। এখানে নফছকে হত্যা করার অর্থ হলো নফছে আম্মারাহ এর শাসন ভেঙে দেওয়া, নফছের খাহেশাতকে দমন করা, আমিত্বকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া এবং বান্দাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার গোলামীতে ফিরিয়ে আনা। মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র আল-ক্বুরআনে মুমিনের ইমানের মিছাল দিয়ে বলেনঃ (أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌۭ وَفَرْعُهَا فِى ٱلسَّمَآءِ) অর্থাৎ, হে আমার হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম, আপনি কি দেখেননি, কীভাবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা কালিমা ত্বয়্যিবাহ শরীফের মিছাল পেশ করেছেন? তা একটি পাক-পবিত্র বৃক্ষের মতো, যার মূল সুদৃঢ় এবং যার শাখা-প্রশাখা আসমানে বিস্তৃত। (ছুরাহ ইব্রাহীম য়ালাইহিছ ছালাম ১৪:২৪) এই আয়াত শরীফ থেকে বুঝা যায়, কালিমা ত্বয়্যিবাহ শরীফ কেবল জিহ্বার উচ্চারণ নয়; বরং এর একটি মূল আছে, আর সেই মূল ক্বলবে স্থির হতে হয়। যতক্ষণ কালিমা ত্বয়্যিবাহ নূর রূপে ক্বলবে প্রতিষ্ঠিত না হয়, ততক্ষণ ঈমানের হাক্বিক্বত পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় না। বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে য়া’মল করা সহজ; কিন্তু ক্বলবে ঈমানের নূর প্রতিষ্ঠিত করা, নফছকে তাজকিয়াহ করা এবং ক্বলবকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকিরে জীবিত করা এটাই মুর্শিদী তরবিয়তের আসল ময়দান, তাই যিনি এই কাজ করতে পারেন না, তিনি মুর্শিদ নন। তিনি হয়তো বক্তা হতে পারেন, য়া’লিম হতে পারেন, মুফতী হতে পারেন, শাইখ হতে পারেন, নামধারী পীরও হতে পারেন, ছিলছিলাহ এর খিলাফতপ্রাপ্তও হতে পারেন, কিন্তু মুর্শিদে কামিল নন। আর যদি মুর্শিদ হওয়ার দাবি করেন অথচ মুরীদের নফছের চিকিৎসা করতে পারেন না, ক্বলবকে জিকিরমুখী করতে পারেন না, গ্বাফলত থেকে বের করতে পারেন না, হেদায়েতের পথে স্থাপন করতে পারেন না তাহলে তিনি মিথ্যা দাবিদার।

সুতরাং হাক্বিক্বতে মুর্শিদ হলেন ক্বলবের চিকিৎসক, নফছের ক্বাতিল, রূহের মুরুব্বী, তাজকিয়াহ এর মুজাক্কী এবং হেদায়েতের পথপ্রদর্শক। বাহ্যিক লক্বব, ছিলছিলাহ, পোশাক, খ্যাতি, মঞ্চ, মুরীদের সংখ্যা, ওয়াজ, কিতাব বা অজিফার পরিমাণ দিয়ে মুর্শিদকে মাপা যায় না। মুর্শিদের পরিচয় হলোঃ তিনি নফছকে ভাঙেন, ক্বলবকে জিন্দা করেন, বান্দাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দিকে ফিরিয়ে দেন, এবং মুরীদকে ছ্বিরাতুল মুস্তাক্বীমে স্থাপন করেন।

এখন প্রশ্ন হলো এই মুর্শিদে-কামিল পেতে হলে কী করতে হয়?

মুর্শিদ পেতে হলে বাই’য়াত গ্রহণ করতে হয়। বাই’য়াত কোনো নতুন বানানো বিষয় নয় বরং পবিত্র আল-ক্বুরআনে বাই’য়াতের বিষয় সরাসরি এসেছে। ছুরাহ আল-ফাতহ শরীফের ১০ নং আয়াত শরীফ, ছুরাহ আল-ফাতহ শরীফের ১৮ নং আয়াত শরীফ এবং ছুরাহ আল-মুমতাহিনা শরীফের ১২ নং আয়াত শরীফে বাই’য়াতের বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

আ’রবী بَيْعَة শব্দটি একটি ইছলামী পরিভাষা। এর অর্থ হলো আনুগত্যের চুক্তি করা, আনুগত্যের শপথ করা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আনুগত্যের স্বীকৃতি দেওয়া। এর মূল ধাতু হলো بيع। এই ধাতু পবিত্র আল-ক্বুরআনে অনেক জায়গায় কেনাবেচা, বিক্রয়, লেনদেন, চুক্তি, অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই সম্মানিত দ্বীন ইছলামে বাই’য়াত বলতে বোঝায় নিজেকে কোনো হাক্ব নেতৃত্ব, হাক্ব ইমাম, হাক্ব আমীর বা হাক্ব মুর্শিদের আনুগত্যে সমর্পণ করার অঙ্গীকার।

তবে বাই’য়াত মূলত দুই প্রকারঃ বাই’য়াতে শরীয়ত এবং বাই’য়াতে মা’রিফাত।

বাই’য়াতে শরীয়ত হলো শরীয়তী জামা’য়াত, খিলাফত ও আমীরের সাথে সম্পর্কিত বাই’য়াত। উদাহরণস্বরূপ, যদি জমিনে ইছলামী খিলাফত বিদ্যমান থাকে, অথবা কোনো স্থানে শরয়ীভাবে খিলাফত বা আমীরের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন খলিফা বা আমীরের নিকট বাই’য়াত করে এক আক্বিদা ও এক জামা’য়াতে যুক্ত থাকা ফরয দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়। জামা’য়াত পরিত্যাগ করা জাহেলিয়াতের রাস্তা। তবে যদি ইছলামী খিলাফত বিদ্যমান না থাকে, তাহলে সেই নির্দিষ্ট রূপের বাই’য়াত সবার উপর একইভাবে ফরয থাকে না।

বাই’য়াতে মা’রিফাত হলো ঈলমে তাছ্বাউফ অর্জন করে নিজেকে ইছ্বলাহ করার জন্য কামিল মুর্শিদ তালাশ করে উনার হাতে বাই’য়াত হওয়া, যেনো নিজের নফছ পাক হয়, ক্বলব ছালীম হয় এবং নফছ মুতমাইন্নাহ-এর পথে আসে। তবে এই বাই’য়াত বাই’য়াতে শরীয়তের মতো সবার উপর একই মাত্রায় ফরয নয়। অর্থাৎ যারা কামিল মুর্শিদ ছাড়া নিজেকে পাক রাখতে পারে, ক্বলবকে ছালীম করতে পারে, নফছকে মুতমাইন্নাহর পথে নিতে পারে, ঈলমে শরীয়ত ও ঈলমে মা’রিফাত হাছিল করে সেই অনুযায়ী চলার যোগ্যতা রাখে, তাদের জন্য বাই’য়াতে মা’রিফাত ঐ অর্থে ফরয নয়। কিন্তু যারা নফছের পূজারী হয়ে আছে, যাদের নিজের নফছকে দমন করার ক্ষমতা নেই, যাদের ক্বলব গ্বাফলত, অহংকার, বুগ্বজ, হাছাদ, আমিত্ব, তাকাব্বুরি ও নফছানিয়াতে ডুবে আছে, তাদের জন্য কামিল মুর্শিদের ছ্বহবত ও বাই’য়াত বাধ্যতামূলক প্রয়োজন হয়ে যায়।

কারণ নফছের পূজা হাক্বিকতে সবচেয়ে ভয়ংকর শিরকের দরজা। এটি এমন শিরক, যা বান্দা নিয়মিত করে যায়, অথচ বুঝতেই পারে না যে সে নিজের নফছকেই নিজের উপর হুকুমদাতা বানিয়ে ফেলেছে। একারণেই ঈলমে তাছ্বাউফে বাই’য়াতের হাক্বিকত হলো নিজের নফছ, ক্বলব ও রূহকে মুর্শিদের নিকট সোপর্দ করা। অর্থাৎ নিজের আমিত্ব, নিজের খেয়াল, নিজের খাহেশাত, নিজের নফছানী সিদ্ধান্ত, এসব মুর্শিদের তরবিয়তের সামনে জমা দিয়ে দেওয়া, যেনো মুর্শিদে কামিল উনার নজর, ছ্বহবত, যিকির, আদব ও আল-কুরআন ও ছুন্নাহ মুবারক-এর নূরানী চিকিৎসার মাধ্যমে মুরীদকে পাক-পবিত্র করে দেন।

এ কাজই মহান আল্লাহ তা’য়ালা খোদ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মাধ্যমে করিয়েছেন। এ বিষয়ে পবিত্র আল-ক্বুরআনের ছুরাহ আল-বাক্বারাহ শরীফের ১৫১ নং আয়াত শরীফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (كَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِیۡكُمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡكُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡكُمۡ اٰیٰتِنَا وَ یُزَكِّیۡكُمۡ وَ یُعَلِّمُكُمُ الۡكِتٰبَ وَ الۡحِكۡمَۃَ وَ یُعَلِّمُكُمۡ مَّا لَمۡ تَكُوۡنُوۡا تَعۡلَمُوۡنَ) (সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্যে) যেভাবে আমি তোমাদের মধ্যে থেকেই একজনকে রছূল বানিয়ে পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদের উপর আমার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করবেন, আর তোমাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করে দেবেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল ক্বুরআনের জাহেরি বাতেনি) ঈলম শিক্ষা দেবেন আর (বাতেনী ঈলম বোঝার) হিকমত বা প্রজ্ঞার দীক্ষা সহ এমন বিষয়েরও দীক্ষা দিবেন, যা এর আগে তোমরা জানতেই না। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ শরীফঃ ২:১৫১)

এই আয়াত শরীফে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পাঁচটি মৌলিক কাজ স্পষ্টভাবে এসেছে।

প্রথমতঃ (يَتْلُواْ عَلَيْكُمْ ءَايَٰتِنَا) তিনি তোমাদের উপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আয়াত শরীফসমূহ তিলাওয়াত করেন। অর্থাৎ তিনি উম্মতকে ওহী, আল-ক্বুরআন, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কালাম ও হুকুমের সাথে সংযুক্ত করেন। এটি শুধু শব্দ পাঠ নয় বরং বান্দার সামনে রব তায়া’লা উনার নির্দেশ, হেদায়েত ও নূর পেশ করা।

দ্বিতীয়তঃ (وَيُزَكِّيكُمْ) তিনি তোমাদের তাজকিয়াহ করেন। এই অংশটি মুর্শিদী মাক্বামের সবচেয়ে শক্ত দলীলের মধ্যে একটি। কারণ এখানে শুধু শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়নি বরং নফছকে পাক করা, ক্বলবকে গ্বাফলত থেকে মুক্ত করা, অন্তরের রোগ দূর করা এবং বান্দাকে রূহানীভাবে পরিশুদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। মুর্শিদে কামিলের কাজও এই নববী কাজের অনুসরণে মুরীদের নফছের ইছ্বলাহ ও ক্বলবের তাজকিয়াহ করা।

তৃতীয়তঃ وَيُعَلِّمُكُمُ ٱلْكِتَٰبَ তিনি তোমাদের কিতাব শিক্ষা দেন। অর্থাৎ পবিত্র আল-ক্বুরআনের জাহেরি হুকুম, শরীয়তের বিধান, হালাল-হারাম, আদব, য়া’মল এবং দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান শিক্ষা দেন। এখান থেকে বোঝা যায়, সত্য মুর্শিদ কখনো শরীয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন না। যিনি শরীয়তহীন, তিনি মুর্শিদ নন।

চতুর্থতঃ وَٱلْحِكْمَةَ তিনি হিকমত শিক্ষা দেন। হিকমত হলো কিতাবের হুকুমকে সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে, সঠিক আদবের সাথে জীবনে বাস্তবায়নের কৌশল। অনেকেই কিতাবের শব্দ জানে, কিন্তু হিকমত জানে না। অনেকেই হুকুম জানে, কিন্তু নফছের রোগের কারণে সেই হুকুমকে নিজের জীবনে স্থাপন করতে পারে না। মুর্শিদে কামিল মুরীদকে শুধু কথা শেখান না বরং কিতাব ও হিকমতের আলোকে চলার তরবিয়ত দেন।

পঞ্চমতঃ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُواْ تَعْلَمُونَ তিনি তোমাদের এমন বিষয় শিক্ষা দেন, যা তোমরা জানতে না। অর্থাৎ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শিক্ষা কেবল বাহ্যিক তথ্যের শিক্ষা ছিল না। বরং এমন ঈলম, হিকমত, আদব, তাজকিয়াহ ও রূহানী উপলব্ধি ছিল, যা মানুষ নিজে নিজে অর্জন করতে পারতো না। এখান থেকেই বোঝা যায়, মুর্শিদী তরবিয়তের ময়দান শুধু বই, পুস্তকের ময়দান নয় এটি ছ্বহবত, আদব, নজর, ইছ্বলাহ ও ক্বলবী পরিবর্তনের ময়দান।

সুতরাং ২:১৫১ আয়াত শরীফে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যে নববী দায়িত্ব এসেছে, তা হলোঃ আয়াত শরীফ তিলাওয়াত, নফছের তাজকিয়াহ, কিতাব শিক্ষা, হিকমত শিক্ষা এবং অজানা ঈলম শিক্ষা। এই পাঁচটি দিক একত্র করলে স্পষ্ট হয় যে তিনি উম্মতের জন্য শুধু মু’য়াল্লিম ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন মুর্শিদে আ’য়জ্বম, মুজাক্কী এবং হেদায়েতের সর্বোচ্চ নববী মারকাজ। এই আয়াত শরীফে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নববী কাজ ৫ ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রথমতঃ তিনি উনার মুরিদ্দের উপর আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করেন।

দ্বিতীয়তঃ তিনি নফছের তাজকিয়াহ করেন।

তৃতীয়তঃ তিনি কিতাবের জাহির-বাতিন শিক্ষা দেন।

চতুর্থতঃ তিনি হিকমতের দীক্ষা দেন।

পঞ্চমতঃ তিনি মা’য়রিফাতের দীক্ষাও দেন।

এখানেই মুর্শিদী তরবিয়তের মূল নকশা রয়েছে। কারণ মুর্শিদে কামিলও নববী ওয়ারিছ হিসেবে মুরীদের উপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুম-আহকামের আয়াত শরীফ তিলাওয়াত করেন, তাদের নফছের তাজকিয়াহ করেন, তাদের আল-ক্বুরআনের জাহিরি-বাত্বিনি ঈলম শিক্ষা দেন এবং সেই ঈলম অনুযায়ী জমিনে চলার হিকমত ও মা’য়রিফাতের দীক্ষাও দেন। অর্থাৎ মুর্শিদে কামিল যতক্ষণ-না নফছকে পাক করে দেবেন, যতক্ষণ না নফছের তাজকিয়াহ করে দেবেন, অথবা মুরীদের নফছ যতক্ষণ না পাক-পবিত্র হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার ঈবাদতের আসল রূহ ও কামিয়াবি প্রকাশ পাবে না। মানুষ হয়তো ভাবতে পারে, আমি তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, তাহলে কেনো আমি কামিয়াব হবো না? কিন্তু মহান আল্লাহ তা’য়ালা তো স্পষ্ট বলে দিয়েছেনঃ (قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ) নিশ্চয়ই সেই (ব্যক্তি) কামিয়াব হয়েছে, যে (তাঁর নফছের) তাজকিয়াহ করেছে। এরপর সঙ্গে সঙ্গে বলা হয়েছেঃ (وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِۦ فَصَلَّىٰ) আর সে তার রব মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নামের জিকির করেছে, অতঃপর ছ্বলাত আদায় করেছে। (ছুরাহ আল-আ’য়লা ৮৭:১৪-১৫)

এখানে ক্রমটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণঃ প্রথমে তাজকিয়াহ, তারপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নামের জিকির, তারপর ছ্বলাত। অর্থাৎ আগে নফছের তাজকিয়াহ হবে, ক্বলবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নামের জিকির জারি হবে, তারপর সেই ছ্বলাত থেকে কামিয়াবির ফল প্রকাশ পাবে। নফছ নাপাক, ক্বলব গ্বাফীল, অন্তর রিয়া ও আমিত্বে ভরা এই অবস্থায় বাহ্যিক নামাজ আদায় হলেও তার আসল রূহ, নূর ও ফায়েজ থেকে মানুষ বঞ্চিত থাকে।

মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বাণী হচ্ছেনঃ (وَ اَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّكٰوۃَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ) আর তোমরা নামাজ কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আনুগত্য করো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হতে পার। (ছুরাহ আন-নূর ২৪:৫৬) এই আয়াত শরীফ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নামাজ মহান আল্লাহ তা’য়ালার রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম, কিন্তু কথা হলো কোন নামাজ? নামাজ পড়লেই কি রহমত লাভ করা যাবে? মহান আল্লাহ পাক তো এই নামাজিদের ব্যপারেই বলতেছেনঃ (اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰهَ وَ هُوَ خَادِعُهُمۡ ۚ وَ اِذَا قَامُوۡۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوۡا كُسَالٰی ۙ یُرَآءُوۡنَ النَّاسَ وَ لَا یَذۡكُرُوۡنَ اللّٰهَ اِلَّا قَلِیۡلًا) নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মহান আল্লাহ তায়ালাকে ধোঁকা দিতে চায়, অথচ তিনি তাদেরকে (তাদেরই) ধোঁকায় ফেলে রাখেন। আর যখন তারা নামাজের জন্য দাঁড়ায়, তখন খুব অলসভাবেই দাঁড়ায়; (মূলত) তারা লোক দেখানোর জন্যেই নামাজ পড়ে আর তারা খুব অল্প পরিমানে মহান আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করে থাকে। (ছুরাহ আন-নিসা ৪:১৪২) দেখা যাচ্ছে, ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েও তার কোন উন্নতি হয়নি, বরং সে ঐসকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে যাদের আল্লাহ পাক ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার পরেও মুনাফিক বলতেছেন “ছুরাহ আন-নিছার ৪:১৪২” আয়াতে, উক্ত আয়াতের ব্যখায় একটি মশহুর হাদিছের ব্যখ্যা পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছেঃ (لَا صَلَاةَ إِلَّا مَعَ حُضُورِ الْقَلْبِ) সেই নামায নামাযই নয় যেখানে ক্বলবের উপস্থিতি থাকেনা। এই কারণেই মাশাইখে তাছ্বাউফ বলেছেনঃ (لَا صَلَاةَ إِلَّا بِحُضُورِ الْقَلْبِ) অর্থাৎ, হুযূরি ক্বলব ব্যতীত নামাজের রূহ পূর্ণ হয় না। (যাদুত তাক্বওয়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২২; নূরুল আছরার, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫) আর হাদিছ শরীফেও এর মূল বক্তব্য পাওয়া যায়, যেমন হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন “আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ (عَنْ عَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ "‏ إِنَّ الرَّجُلَ لَيَنْصَرِفُ وَمَا كُتِبَ لَهُ إِلاَّ عُشْرُ صَلاَتِهِ تُسْعُهَا ثُمُنُهَا سُبُعُهَا سُدُسُهَا خُمُسُهَا رُبُعُهَا ثُلُثُهَا نِصْفُهَا) নিশ্চয়ই একজন ব্যক্তি নামায থেকে ফিরে আসে, অথচ তার জন্য (সওয়াব হিসেবে) কেবল দশমাংশ, নবমাংশ, অষ্টমাংশ, সপ্তমাংশ, ষষ্ঠাংশ, পঞ্চমাংশ, চতুর্থাংশ, তৃতীয়াংশ, বা অর্ধেক অংশই লেখা হয়। (ছুনান আবু দাউদ ৭৯৬, মুসনাদে আহমদ ১৮৪২৩) উক্ত হাদিছ শরীফ প্রমাণ করে কেবল জাহেরি নামাজ, ইমামের পিছনে দাঁড়িয়ে রুকু সেজদা করা মোটেও মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা নামাজ হলেন নূর, হাদিছ শরীফে স্পষ্ট বলা হয়েছেঃ (الصَّلَاةُ نُورٌ) নামাজ হচ্ছেন নূর। (মুছলিম শরীফঃ ২২৩) এখন যদি নূর হাছিল করা না যায় তাহলে নফল তো দূরের বিষয় ফরজ নামাজ পড়েও মুনাফিক গ্বফিলদের কাতারেই স্থান হবে। অথচ এই নামাজ ৯৯.৯৯% মানুষ পড়ে ছ্বওয়াব/নেকীর আশায়, অথচ নামাজ এর মূল প্রাপ্তি হলো নূর, যদি নূর হাছিল না হয় তাহলে নামাজ কেবল নেকি দিলে সেই নেকি কোন কাজেই আসবেনা। আখিরাতে নেকীর চেয়েও আনলিমিটেড গূন বেশী দরকারি জিনিস হলেন নূর, যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি বলেনঃ (يَوْمَ يَقُولُ ٱلْمُنَـٰفِقُونَ وَٱلْمُنَـٰفِقَـٰتُ لِلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱنظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِن نُّورِكُمْ قِيلَ ٱرْجِعُواْ وَرَآءَكُمْ فَٱلْتَمِسُواْ نُورًا فَضُرِبَ بَيْنَهُم بِسُورٍ لَّهُۥ بَابُۢ بَاطِنُهُۥ فِيهِ ٱلرَّحْمَةُ وَظَـٰهِرُهُۥ مِن قِبَلِهِ ٱلْعَذَاب يُنَادُونَهُمْ أَلَمْ نَكُن مَّعَكُمْ‌ۖ قَالُواْ بَلَىٰ وَلَـٰكِنَّكُمْ فَتَنتُمْ أَنفُسَكُمْ وَتَرَبَّصْتُمْ وَٱرْتَبْتُمْ وَغَرَّتْكُمُ ٱلْأَمَانِىُّ حَتَّىٰ جَآءَ أَمْرُ ٱللَّهِ وَغَرَّكُم بِٱللَّهِ ٱلْغَرُورُ) সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা ঈমানদারদের বলবে তোমরা আমাদের জন্য একটু থামো, যাতে আমরা তোমাদের নূর থেকে কিছু আলো গ্রহণ করতে পারি। তখন বলা হবে তোমরা আজ পারলে দুনিয়ায় ফিরে যাও, তারপর সেখানে গিয়ে নূর খুঁজো। অতঃপর তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে, যার একটি দরজা থাকবে। প্রাচীরের ভেতরের দিকে থাকবে মহান আল্লাহ তা’য়ালার রহমত, আর বাইরের দিকে থাকবে আযাব। তারা মুমিনদের ডেকে বলবে আমরা কি দুনিয়ার জীবনে তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না? মুমিনরা বলবে হ্যাঁ, অবশ্যই ছিলে; কিন্তু তোমরাই নিজেদেরকে ফিতনায় ফেলেছিলে, সুযোগের অপেক্ষায় ছিলে, সন্দেহ পোষণ করেছিলে, আর মিথ্যা আশা-আকাঙ্ক্ষা তোমাদের ধোঁকায় রেখেছিল; শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহ তা’য়ালার ফায়সালা এসে গেল। আর সেই মহা প্রতারক শয়তান তোমাদেরকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা সম্পর্কেও ধোঁকায় ফেলে রেখেছিল। (ছুরাহ আল-হাদীদ ৫৭:১৩-১৪)

এই নূর-ই হলেন সবকিছুর মূল, উহার তালাশ, উহা হাছিল-ই মূল কাজ, কিন্তু আফসোস হচ্ছে, এই নূর লাভ করে একজন মানুষ নিজে যে নূরানি হবে এর কোন ধারনাও নাই, না মানুষ জানে নূর কি, না জানে নূর লাভ না করলে তার দুনিয়া আখিরাত সব বরবাদ, আর জানবেই বা কি করে? ওহাবি/ছালাফি বিদআতিরা তো নবীজিকেই নূরানী মানে না, আর যারা মানে সেই ধর্মব্যবসায়ী পির, বাবা, শায়েখরাতো ব্রেইন ওয়াশ করে নিজেদের কেবল নূরানী হিসেবে মুরিদ্দের নিকট উপস্থাপন করে, তাদের মাথায় কেবল এটাই ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তোমাদের পির সাপই ও উনার আওলাদই কেবল নূরানী, তোমরা তো মাটির পুতলা, নাউযুবিল্লাহ, অথচ খোদ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নূরে মুজাছছাম হয়েও নূরের জন্যে কেমন আহাজারি করেছেন প্রত্যেক দিন শেষ রাতে তাহাজ্জুদের পর দোয়া সেজদায় এর প্রমাণ তো হাদিছেই মিলে, দিনি দোয়া করতেন এইভাবেঃ (اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا، وَفِي لِسَانِي نُورًا، وَفِي سَمْعِي نُورًا، وَفِي بَصَرِي نُورًا، وَمِنْ فَوْقِي نُورًا، وَمِنْ تَحْتِي نُورًا، وَعَنْ يَمِينِي نُورًا، وَعَنْ شِمَالِي نُورًا، وَمِنْ أَمَامِي نُورًا، وَمِنْ خَلْفِي نُورًا، وَاجْعَلْ فِي نَفْسِي نُورًا، وَأَعْظِمْ لِي نُورًا، وَعَظِّمْ لِي نُورًا، وَاجْعَلْ لِي نُورًا، وَاجْعَلْنِي نُورًا، اللَّهُمَّ أَعْطِنِي نُورًا، وَاجْعَلْ فِي عَصَبِي نُورًا، وَفِي لَحْمِي نُورًا، وَفِي دَمِي نُورًا، وَفِي شَعْرِي نُورًا، وَفِي بَشَرِي نُورًا، اللَّهُمَّ اجْعَلْ لِي نُورًا فِي قَبْرِي، وَنُورًا فِي عِظَامِي، وَزِدْنِي نُورًا، وَزِدْنِي نُورًا، وَزِدْنِي نُورًا، وَهَبْ لِي نُورًا عَلَى نُورٍ) হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আমার ক্বলবকে নূরানি করুন, আমার জিহ্বাকেও নূরানি করুন, আমার শ্রবণশক্তিকেও নূরানি করুন, আমার দৃষ্টিশক্তিকেও নূরানি করুন। আমাকে উপর দিক থেকে নূর আতা করুন, আমাকে নিচের দিক থেকেও নূর আতা করুন, আমাকে ডান দিক থেকেও নূর আতা করুন, আমাকে বাম দিক থেকেও নূর আতা করুন, আমাকে সামনের দিক থেকেও নূর আতা করুন, আমাকে পেছনের দিক থেকেও নূর আতা করুন। এবং আমার নফসের মধ্যেও নূর স্থাপন করুন। আমার জন্য নূরকে আজ্বিম করে দিন, আমার জন্য নূরকে বিস্তৃত করুন, আমার জন্য আপনি নূর নির্ধারণ করুন, আর আমাকে নূরানি করে দিন। হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আমাকে নূর আতা করুন। আমার স্নায়ুতে নূর দিন, আমার গোশতে নূর দিন, আমার রক্তে নূর দিন, আমার চুলে নূর দিন, আমার চামড়ায় নূর দিন। হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আমার ক্ববরে আমার জন্য নূর আতা করুন, আমার হাড়ের মধ্যেও নূর দান করুন, আমার নূরকে আরও বাড়িয়ে দিন, আমার নূরকে আরও বাড়িয়ে দিন, আমার নূরকে আরও বাড়িয়ে দিন, আর আমাকে নূরের উপর নূর দান করুন।

ছ্বহীহ বুখারী ৬৩১৬; ছ্বহীহ মুছলিম ৭৬৩, বিশেষ করে ৭৬৩a, ৭৬৩j, ৭৬৩l; ছুনান আবী দাউদ ১৩৫৩; ছুনান নাছাঈ: ১১২১। কবর ও হাড়ের নূরের অংশ জামে তিরমিযী ৩৪১৯-এ এসেছে; “زِدْنِي نُورًا” অংশ আল-আদাবুল মুফরাদে এসেছে; আর “وَهَبْ لِي نُورًا عَلَى نُورٍ” অংশ ফাতহুল বারীতে ইবন আবী ‘আছিমের কিতাবুদ দু‘য়ার সূত্রে উল্লেখিত হয়েছে।

এছাড়াও উক্ত আয়াত শরীফ এর দিকে তাকালে দেখাই যাচ্ছে একজন আরেকজনের কাছে নূর খুঁজবে নেকি নয়, এই নূরই হাছিল করতে হয় প্রত্যেক ঈবাদাতের থেকে। অর্থাৎ ক্বলব, দিল বা হৃদয় যেটাই বলা হোক, নামাজে যদি ক্বলব হাজির না থাকে, তাহলে সেই নামাজ বাহ্যিকভাবে আদায় হলেও তার আসল ফায়দা থেকে মানুষ বঞ্চিত থাকে। আর আজ সমাজে এটাই দেখা যাচ্ছে। পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ ۗ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ) নিশ্চয়ই নামাজ (মানুষকে) অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে, আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকিরই সর্বশ্রেষ্ঠ। (ছুরাহ আল-য়া’নকাবুত ২৯:৪৫) এটা ক্বুরআন শরীফই বলছেন। এখন আমরা যদি আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ এবং প্রতিবেশী অঞ্চলের বহু মুছলিমের অবস্থার দিকে তাকাই, তাহলে বাস্তবতা চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। অনেকে লম্বা দাড়ি রাখে, মাদ্রাসার শিক্ষক হয়, ইমামতি করে, ওয়াজ করে, বাহ্যিক য়া’মল করে। অথচ একই সাথে অন্তরে হিংসা, বিদ্বেষ, বুগ্বজ, হাছাদ, কিনা, বদ ধারণ করে রাখে। কেউ কেউ তো আবার জঘন্য হারাম কাজ, অশ্লীলতা, ব্যভিচার, দুর্বলদের উপর জুলুম, এমনকি শিশুদের উপর ভয়াবহ অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। আবার অনেকে টেলিভিশন, সিনেমা, নাটক, খেলাধুলা, ফেইসবুক, ইউটিউব এবং দুনিয়াবি গ্বাফলতে মত্ত থাকে, কথিত শরীরচর্চা বা বিনোদনের নামে নিজের ক্বলবকে নষ্ট করে।

তাদের জিজ্ঞাসা করা দরকার, তোমরা তো চল্লিশ বছর ধরে নামাজ পড়ছো, তাহলে তোমাদের নামাজ কেনো তোমাদেরকে এসব খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখলো না? কারণ বাহ্যিক নামাজ আছে, কিন্তু ক্বলবে ইমানের নূর নেই; নামাজের কাঠামো আছে, কিন্তু হুযূরি ক্বলব নেই। য়া’মল আছে, কিন্তু তাজকিয়াহ নেই। ছেযদা আছে, কিন্তু নফছ ভাঙেনি। এই কারণেই সেই নামাজ মানুষকে বাঁচানোর পরিবর্তে তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ) অতএব দুর্ভোগ সেইসব নামাযীদের জন্য, যারা তাদের নামাযে গ্বফিল (অর্থাৎ নামাজে তাদের ক্বলব মওজুদ থাকেনা)। (ছুরাহ আল-মাউন ১০৭:৪-৭) একই বাস্তবতা রোজার ক্ষেত্রেও দেখা যায়। একজন মানুষ যদি পঞ্চাশ বছর বয়সী হয়, তাহলে সে হয়তো চল্লিশ বছর ধরে রোজা রাখছে। এমন কাউকে জিজ্ঞাসা করা হোক বিশেষ করে হুজুর, ইমাম, ওয়াজী, বাবা টাইপের কাউকে হে ভাই, চল্লিশ বছরের রোজা কি আপনাকে মুত্তাকী বানাতে পেরেছে? আপনাকে পরহেজগার, তাক্বওয়ার অধিকারী, নফছের উপর বিজয়ী বানাতে পেরেছে? অনেকের উত্তর হবে, না ভাই, এখনো মুত্তাকী হতে পারিনি। তাহলে প্রশ্ন হলো, চল্লিশ বছর ধরে রোজা রাখলেন, কিন্তু এখনো কেনো মুত্তাকী হতে পারলেন না?

এই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের আগে সেইসব মানুষের নিজেদের করা দরকার, যারা ব্রেইনে ইলমের ভাণ্ডার নিয়ে বসে আছে, অথচ ক্বলব ভরা নারে। আমাদের অঞ্চল বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ এসব জায়গায় কত রোজাদার আছে। কিন্তু আশেপাশে ইমাম, মুয়াজ্জিন, নামাজী, ইফতার করানো লোকদের মধ্যে সত্যিকারের মুত্তাকী কয়জন দেখা যায়? মহান আল্লাহ তা’য়ালা তো বলেছেনঃ (وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ) আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা মুত্তাকীদের বন্ধু। (ছুরাহ আল-যাছিয়াহ ৪৫:১৯)

একজন আলেম বা বাহ্যিকভাবে পরহেজগার ব্যক্তি ধরা যাক, যাকে মানুষ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বন্ধু, উনার আউলিয়া মনে করে। সে চল্লিশ বছর ধরে রমজান শরীফে রোজা রাখছে, কোনো রোজা কাজা করেনি। কিন্তু যদি তার ক্বলব এখনো অহংকার, আমিত্ব, হিংসা, দুনিয়ার মোহ, বদখাসলত, রিয়া ও নফছানিয়াতে ভরা থাকে, তাহলে তার রোজা তাকে কোথায় নিয়ে গেল? সে সাহরীতে পেট ভরে খেয়ে রোজার বাহ্যিক কাঠামো পালন করলো, কিন্তু রোজার উদ্দেশ্য তাক্বওয়া হাছিল করলো না। এ কেমন রোজা?

মহান আল্লাহ তা’য়ালা তো রোজার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে বলেছেনঃ (يَٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারো। (ছুরাহ বাক্বারাহ ২:১৮৩) অতএব রোজার ফল যদি তাক্বওয়া হয়, তাহলে চল্লিশ বছরের রোজার পরও যদি তাক্বওয়া না আসে, তাহলে বুঝতে হবে বাহ্যিক ক্ষুধা হয়েছে, কিন্তু নফছের তাজকিয়াহ হয়নি।

যাকাতের ক্ষেত্রেও একই কথা। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ ۖ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٞ لَّهُمْ ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ) হে আমার হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম, আপনি তাদের ধন-সম্পদ থেকে ছ্বদাক্বা গ্রহণ করুন। এটা তাদেরকে বাহ্যিক গুনাহ থেকে পাক করবে এবং এর মাধ্যমে আপনি তাদের নফছের তাজকিয়াহ করবেন। আর আপনি তাদের জন্য দোয়া করুন; নিশ্চয়ই আপনার দোয়া তাদের জন্য প্রশান্তি। মহান আল্লাহ তা’য়ালা সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:১০৩)

এই আয়াত শরীফে জাকাত ও ছ্বদাক্বার মধ্যে তাজকিয়ার নিছবত স্পষ্ট। এখানে শুধু সম্পদ দেওয়া নয়; বরং গ্রহণকারী হক্ব ব্যক্তিত্ব, উনার দোয়া, উনার তাজকিয়াহ এবং মুমিনের অন্তর-পরিশুদ্ধির বিষয়ও এসেছে। অর্থাৎ যাকাত শুধু টাকা বিলানো নয়; এটি পাক হওয়া, নফছের বখিলি ভাঙা, আমিত্ব কমানো, সম্পদের আসক্তি দূর করা এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টির পথে অর্থ ব্যবহার করার তরবিয়ত।

আজ যদি আমাদের দেশের সম্পদশালীদের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর ধরে নিজের মনমতো যাকাত দিয়েছে, অথচ নফছের তাজকিয়াহ হাছিল করতে পারেনি। উল্টো অহংকার, তাকাব্বুরি, আমিত্ব, বুগজ, হাসাদ, মুনাফেকি, নফছের পূজা, গীবত, পরচর্চা, পরনিন্দা, চোগলখুরি, মিথ্যাচার ও দুনিয়ার লোভ তাদের মধ্যে রয়ে গেছে। তাহলে বুঝতে হবে, যাকাতের বাহ্যিক কাঠামো হয়েছে, কিন্তু তাজকিয়াহ-এর হাক্বিকত আসেনি।

এবার হজ্জের দিকে তাকানো যাক। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (الْحَجُّ أَشْهُرٞ مَّعْلُومَٰتٞ ۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ ۗ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٖ يَعْلَمْهُ اللَّهُ ۗ وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَىٰ ۚ وَاتَّقُونِ يَٰٓأُولِي الْأَلْبَٰبِ) পবিত্র হজ্জের জন্য নির্ধারিত মাসসমূহ রয়েছে। যে ব্যক্তি এই মাসসমূহে হজ্জের নিয়ত করে, তার জন্য হজ্জের মধ্যে স্ত্রী সহবাস, ফাসেকি কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ জায়েজ নয়। তোমরা যা কিছু সৎকাজ করো, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তা জানেন। আর তোমরা পাথেয় গ্রহণ করো; নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাক্বওয়া। হে জ্ঞানীগণ, তোমরা আমাকেই ভয় করো। (ছুরাহ বাক্বারাহ ২:১৯৭)

আজ বহু মানুষ হজ্জে যায়, কিন্তু হজ্জের রূহ নিয়ে যায় না। সামান্য কিছু মানুষ আছে যারা সারাজীবন পবিত্র হজ্জের জন্য আকাঙ্ক্ষা করে, মুহব্বতভরে প্রতিটি কদম রাখে মক্কা-মদিনায়, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার যিকিরে, কান্নায়, তাওবায়, তাক্বওয়ার ফিকিরে সময় কাটায়। কিন্তু বহু মানুষ পবিত্র হজ্জকেও বেড়ানো, সেলফি, ভিডিও, রিয়া, সামাজিক সম্মান ও দুনিয়াবি প্রদর্শনের মাধ্যমে তামাশায় পরিণত করে। ক্বাবা শরীফ, মদীনা শরীফ, ইহরাম, এসব অবস্থাতেও অনেকে জিকির-ফিকিরে না থেকে ফেইসবুক, ইউটিউব, দুনিয়াবি গাফলত ও নফছানী আড্ডায় পড়ে থাকে। এইভাবে কি তাক্বওয়া হাছিল হয়? এইভাবে কি কামিয়াবি আসে?

অথচ মহান আল্লাহ তা’য়ালা মালিক হয়ে একবার বললেই পারতেন, তোমরা নফছের তাজকিয়াহ করো, নফছকে পাক করো, নফছের নাপাকি দূর করো। কিন্তু তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে, নফছের তাজকিয়াহ-এর গুরুত্ব বুঝাতে, একের পর এক কসম করে জ্বালালী শানে ইরশাদ করেন।

একদিন মহান আল্লাহ তা’য়ালা জমিনবাসিকে লক্ষ্য করে ক্বছম করা শুরু করলেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা পুরো কায়েনাতের মালিক,গোলামদের প্রতি হুকুমই যথেষ্ট ছিলো, কিন্তু মালিক এক্সট্রা এটেনশন চাইলেন, তিনি এমন কিছু বলতে চান যা সবার শোনা জরুরী, তাই তিনি ক্বছমের উপর ক্বছম  করা শুরু করলেন এইভাবেঃ (وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا، وَالْقَمَرِ إِذَا تَلَاهَا، وَالنَّهَارِ إِذَا جَلَّاهَا، وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَاهَا، وَالسَّمَاءِ وَمَا بَنَاهَا، وَالْأَرْضِ وَمَا طَحَاهَا، وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا، فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا) ক্বছম  সূর্যের এবং তার কিরণের, ক্বছম  চাঁদেরঃ যখন সে সূর্যের পেছনে পেছনে চলে, ক্বছম  দিনেরঃ যখন সে তাকে আলোকিত করে, ক্বছম  রাতেরঃ যখন সে তাকে ঢেকে দেয়, ক্বছম  আকাশের এবং যিনি তা নির্মাণ করেছেন উনার, ক্বছম  পৃথিবীর এবং যিনি একে বিছিয়ে দিয়েছেন উনার, আরো ক্বছম  নফছের এবং যিনি তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন উনার, অতঃপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাকে ইলহাম করেছেন গুনাহের (নার) ও তাক্বওয়ার (নূর) সম্পর্কে। (ছুরাহ আশ-শামছ ৯১:১-৮)

ক্বছম  শেষ, মানুষ মেন্টালি রেডি শোনার জন্য, এতগুলো ক্বছমের পর তিনি যেটা বলতে চান, এবার সেটা বলা শুরু করলেনঃ (قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا، وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا) নিশ্চয়ই কামিয়াব হয়েছে সেই ব্যক্তি, যে তার নফছের তাজকিয়া করেছে, আর যে তাকে (অর্থাৎ নফছকে) কলুষিত করেছে সে-ই বরবাদ হয়েছে। (ছুরাহ আশ-শামছ ৯১:৯-১০)

এখান থেকে একেবারে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল যে কামিয়াবি কেবল তখনই সম্ভব, যখন নফছে তাহারাত আসবে, নফছ পাক-পবিত্র হবে। নাপাক নফছ কখনো কামিয়াব হবে না। কারণ নফছ নাপাক থাকলে সেটা নফছে আম্মারাহ অবস্থায় থাকে। আর নফছ আম্মারায় হলে ক্বলব হয় ছানোবর, অর্থাৎ ঘুমন্ত দিল। ঘুমন্ত, গাফেল, নাপাক ক্বলবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নূর ও জিকিরের হাক্বিকত অবস্থান করে না। ক্বলবকে ছালীম বানাতে হয়; আর ক্বলব ছালীম তখনই হয়, যখন নফছ তাজকিয়াহ-এর পথে গিয়ে মুতমাইন্নাহ-এর দিকে অগ্রসর হয়।

এখন চিন্তা করে দেখুন, হাদীছ শরীফে এসেছেঃ (لَا تَصْحَبُ الْمَلَائِكَةُ رُفْقَةً فِيهَا كَلْبٌ وَلَا جَرَسٌ) রহমতের ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ সেই সফরকারী কাফেলার সাথে অবস্থান করেন না, যাতে কুকুর বা ঘণ্টা থাকে। (মুসলিম শরীফ ৫৩৬৪; আবু দাউদ ২৫৪৭, ২৫৫৫)

এ তো হলো বাইরের সফরের কথা। মানুষের ঘরের মধ্যেও রহমতের ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ প্রবেশ করেন না, যদি সেখানে নাপাক বা নিষিদ্ধ বস্তু বিদ্যমান থাকে। হাদীছ শরীফে এসেছেঃ (لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلَا صُورَةٌ) রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যে ঘরে কুকুর থাকে এবং যে ঘরে ছবি বা মূর্তি থাকে, সে ঘরে রহমতের ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ প্রবেশ করেন না। (বুখারী শরীফ ৩৩২২; মুছলিম শরীফ ৫৬৩৬)

এতেও যদি ফিকির না আসে, তাহলে জিব্রাঈল য়ালাইহিছ ছালাম উনার ঘটনা দেখুন। আয়িশাহ সিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিব্রাঈল য়ালাইহিছ ছালাম কোনো এক নির্দিষ্ট সময়ে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নিকট আগমনের ওয়াদা করলেন, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে তিনি আসলেন না। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার হাতে একটি লাঠি ছিল, তিনি তা হাত থেকে ফেলে দিয়ে বললেন, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ওয়াদা ভঙ্গ করেন না, উনার রছুলগণও করেন না। এরপর তিনি চারদিকে লক্ষ্য করে উনার খাটের নিচে একটি কুকুরছানা দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, হে আয়িশাহ ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম, এই কুকুরছানাটি এখানে কখন প্রবেশ করলো? আয়িশাহ সিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম বললেন, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কসম, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। তখন তিনি আদেশ দিলে সেটি বের করে দেওয়া হলো। এরপর জিব্রাঈল য়ালাইহিছ ছালাম আগমন করলেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, আপনি আমাকে ওয়াদা করেছিলেন, আমি আপনার অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু আপনি আসলেন না। জিব্রাঈল য়ালাইহিছ ছালাম বললেন, আপনার গৃহে অবস্থানরত কুকুরটি আমার জন্য বাধা ছিল। কারণ যে ঘরে কুকুর বা ছবি-মূর্তি থাকে, আমরা সে ঘরে প্রবেশ করি না। (মুসলিম শরীফ ৫৪০৪)

এখন সাধারণ মুসলিম বাদ দিলাম, একজন আলেমেরও কতটুকু ফিকির করা প্রয়োজন তা চিন্তা করুন। যদি সামান্য একটি নাপাক প্রাণী, ছবি বা মূর্তি মানুষের ঘরে থাকলে রহমতের ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ প্রবেশ করেন না, এমনকি ফেরেশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণের সর্দার জিব্রাঈল য়ালাইহিছ ছালামও ওয়াদা করেও আসেন না, তাহলে মানবদেহের মধ্যে থাকা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ঘর মানুষের দিল বা ক্বলব যদি নাপাক থাকে, সেখানে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নূর, রহমত, জিকিরের হাক্বিকত এবং কুরব কীভাবে অবস্থান করবেন?

সুতরাং নফছ ও ক্বলবের নাপাকি কোনো ছোট বিষয় নয়। বাহ্যিক ঘরে নাপাক বস্তু থাকলে রহমতের ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ প্রবেশ করেন না; আর মানুষের ক্বলব যদি অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, বুগজ, হাসাদ, কিনা, রিয়া, আমিত্ব, দুনিয়ার মোহ, নফছের পূজা ও গাফলতে নাপাক হয়ে থাকে, তাহলে সেই ক্বলবে হেদায়েতের নূর কীভাবে স্থায়ী হবে?

এই নাপাক ক্বলব ও নফছকে মুর্শিদে কামিল ব্যতীত আসমানের নিচে সকল আলেম এবং সকল কিতাবের হাফিজ মিলেও পাক করতে পারবে না। কারণ কিতাবী ইলম এক জিনিস, আর নফছের চিকিৎসা আরেক জিনিস। ফতোয়া এক জিনিস, আর ক্বলবের ইছলাহ আরেক জিনিস। হাদীছ শরীফ মুখস্থ করা এক জিনিস, আর মুরীদের নফছ ভেঙে তাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে ফিরিয়ে দেওয়া আরেক জিনিস। এই কাজ মুর্শিদে কামিলের কাজ; যিনি নফছকে হত্যা করেন, ক্বলবকে জিন্দা করেন, মুরীদকে যিকিরে বসান, ছোহবতে রাখেন, আদব শেখান, নফছের রোগ ধরিয়ে দেন এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে সুলুক করান।

মুর্শিদ, বাই’য়াত এবং অস্বীকারকারীদের পরিণামঃ

সুতরাং মুর্শিদ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে এক বিশেষ নেয়ামত। মহান আল্লাহ তা’য়ালা যাকে হেদায়েতের পথে নিতে চান, তাকে হেদায়েতের মাধ্যম, ওলী ও মুর্শিদের সান্নিধ্য দান করেন। আর যাকে তিনি তার গোড়ামী, বিদ্বেষ ও গুমরাহির কারণে পথভ্রষ্টতার উপর ছেড়ে দেন, তার জন্য কোনো সত্য পথপ্রদর্শক কার্যকর হয় না। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَمَن يُضْلِلِ ٱللَّهُ فَمَا لَهُۥ مِنْ هَادٍ) অর্থাৎ, আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা যাকে পথভ্রষ্টতার উপর ছেড়ে দেন, তার জন্য কোনো হেদায়েতকারী নেই। (ছুরাহ আর-র’য়দ ১৩:৩৩, ছুরাহ আজ-জুমার ৩৯:৩৬, ছুরাহ আল-মুওমিন ৪০:৩৩) তিনি আরো ইরশাদ করেনঃ (وَمَن يُضْلِلِ ٱللَّهُ فَمَا لَهُۥ مِن وَلِيٍّ مِّنۢ بَعْدِهِ) অর্থাৎ, আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা যাকে পথভ্রষ্টতার উপর ছেড়ে দেন, এরপর তার জন্য আর কোনো দ্বীনের অভিবাবক থাকবেনা। (ছুরাহ আশ-শূরা ৪২:৪৪)

এখানে বিষয়টি স্পষ্ট যে হেদায়েত, ওয়ালী, হাদী ও মুর্শিদের সম্পর্ক কোনো সাধারণ সামাজিক সম্পর্ক নয়; বরং এটি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দয়া ও তাওফীকের সাথে সম্পর্কিত। যে ব্যক্তি হেদায়েতের দরজাকে সম্মান করে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তার জন্য হেদায়েতের মাধ্যম খুলে দেন। আর যে ব্যক্তি বিদ্বেষ, গোড়ামী ও অহংকারের কারণে হাক্বকে অস্বীকার করে, সে নিজের হাতে নিজের হেদায়েতের দরজা বন্ধ করে দেয়।

বাই’য়াত অস্বীকারকারীদের করুণ পরিণাম বর্ণনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হাবীব, তাওহীদের মুর্শিদ, দুই কুলের কান্ডারী রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেনঃ (وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً) অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মারা গেল, অথচ তার গলায় বাই’য়াতের বন্ধন রইলো না, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুর মতো মৃত্যুবরণ করলো। (মুছলিম শরীফ, বাবঃ উজূবু মুলাযামাতি জামা’য়াতিল মুছলিমীন; মিশকাত শরীফ)

এই হাদীছ শরীফ বাই’য়াতের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। বাই’য়াত মানে শুধু হাত রাখা নয়; বাই’য়াত মানে আনুগত্য, জামায়াত, শৃঙ্খলা, ইছ্বলাহ, আদব এবং হাক্ব নেতৃত্বের সাথে নিজেকে যুক্ত করা। শরীয়তের বাই’য়াতের ময়দান যেমন আমীর ও জামায়াতের আনুগত্যের সাথে সম্পর্কিত, তেমনি তাছ্বাউফের বাই’য়াতে মা’য়রিফাত মুর্শিদে কামিলের তরবিয়ত, ইছ্বলাহ, তাজকিয়াহ ও ক্বলবী চিকিৎসার সাথে সম্পর্কিত।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার নামে মাশায়েখের মাঝে প্রসিদ্ধ একটি ক্বওল বর্ণিত আছেঃ (مَنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ شَيْخٌ فَشَيْخُهُ الشَّيْطَانُ) অর্থাৎ, যার কোনো শায়েখ বা মুর্শিদ নেই, তার শায়েখ শয়তান। (তাফছীরে রূহুল বয়ান, ছুরাহ কাহাফ শরীফের ৬১ নং আয়াত শরীফের তাফছীর, ৫ম খণ্ড)

এই কথার অর্থ হলো, যে ব্যক্তি নফছের চিকিৎসার জন্য কোনো কামিল পথপ্রদর্শকের অধীনে নিজেকে সোপর্দ করে না, সে নিজের নফছ, খেয়াল, ওয়াছওয়াছা ও শয়তানী ধোঁকার হাতে পড়ে যাওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকে। কারণ নফছ নিজে নিজেকে চিনতে পারে না; রোগী নিজে নিজের সার্জারি করতে পারে না; অন্ধ নিজে নিজেকে রাস্তা দেখাতে পারে না। তাই মুর্শিদে কামিলের প্রয়োজন হাক্বিক্বতে নফছের চিকিৎসার প্রয়োজন।

এ কথাটি যে শুধু তাছাউফপন্থীদের বক্তব্য নয়, বরং মাশায়েখের ধারায় প্রসিদ্ধ তা এ থেকেও বুঝা যায় যে দেওবন্দি-ওহাবী ধারার অন্যতম ব্যক্তি রশীদ আহমদ গাংগুহীও তার লিখিত ইমদাদুস ছুলূক-এ এই বক্তব্য উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ তাছাউফ ও শাইখ-মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তা এমন বিষয়, যাকে ইতিহাসের বহু ধারার লোক মুখে অস্বীকার করলেও তাদের নিজস্ব গ্রন্থের ভিতরেই এর স্বীকৃতি পাওয়া যায়।

হযরত তালহা রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু সম্পর্কে মানাকিবী বর্ণনায় এসেছে, তিনি নিজের ইজতিহাদী ভুল স্বীকার করে আমীরুল মুওমিনীন হযরত মাওলা য়া’লী কাররামাল্লাহু ওয়াযহাহু য়া'লাইহিছ ছালাম উনার হাতে পুনরায় বাই’য়াত গ্রহণ করতে চাইলেন। কিন্তু মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার কারণে সরাসরি মাওলা কাররামাল্লাহু ওয়াযহাহু য়ালাইহিছ ছালাম উনার কাছে পৌঁছতে পারলেন না। তখন মাওলা য়া’লী কাররামাল্লাহু ওয়াযহাহু য়া'লাইহিছ ছালাম উনার এক সেনা সদস্য পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে তিনি তাকে ডেকে তার হাতে বাই’য়াতে তাজদীদ করলেন। এরপর তিনি ইন্তিকাল করলেন। মাওলা য়া’লী কাররামাল্লাহু ওয়াযহাহু য়ালাইহিছ ছালাম এই ঘটনা শুনে বললেনঃ (أَبَى اللهُ أَنْ يَدْخُلَ طَلْحَةُ الْجَنَّةَ إِلَّا وَبَيْعَتِي فِي عُنُقِهِ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা চাননি যে তালহা যান্নাতে প্রবেশ করুন, যতক্ষণ না আমার বাই’য়াত তার গলায় থাকে। (মুস্তাদরাক, মানাকিবে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ)

হযরত তালহা রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু একজন প্রখ্যাত ছ্বহাবী। তিনি নেক য়া’মলে, মর্যাদায়, ছ্বহবতে এবং ক্বুরবানীতে উঁচু মাক্বামের অধিকারী ছিলেন। তা সত্ত্বেও এই বর্ণনা বাই’য়াতের গুরুত্বকে সামনে আনে। ছ্বহাবী রদ্বিআল্লাহু য়ানহুম উনাদের যুগেই যদি বাই’য়াতের গুরুত্ব এত গভীরভাবে আলোচিত হয়, তাহলে বর্তমান ফিতনা-ফাছাদের যুগে আমাদের মতো দুর্বল, গুনাহগার, নফছের হাতে বন্দী মানুষের জন্য মুর্শিদে কামিলের হাতে বাই’য়াত হয়ে ইছ্বলাহ গ্রহণের প্রয়োজন কত বেশি তা চিন্তা করার বিষয়।

ইমাম আব্দুল করীম আল-কুশাইরী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি বলেন, মুরীদের কর্তব্য হলো মুর্শিদের প্রতি আদব বজায় রাখা। কারণ যার কোনো মুর্শিদ নেই, তার ইমাম বা পথপ্রদর্শক হয়ে যায় শয়তান। তিনি বলেনঃ (فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ أُسْتَاذٌ فَإِمَامُهُ الشَّيْطَانُ) অর্থাৎ, যার কোনো পথপ্রদর্শক নেই, তার ইমাম শয়তান। (আর-রিছালাতুল কুশাইরিয়্যাহ) এই বক্তব্যের হাক্বিক্বত হলোঃ মুরীদ যখন নিজেকে কোনো কামিল মুর্শিদের তরবিয়তের অধীনে দেয় না, তখন সে নিজের নফছকে মুর্শিদ বানিয়ে নেয়। আর নফছ যখন আপন মুর্শিদ হয়, তখন শয়তান তার ইমাম হয়ে যায়।

ইতিহাসে আউলিয়া কিরামের জীবনী দেখলেও এই সত্য স্পষ্ট হয়। যিনি পীরানে পীর, মাহবুবে ছুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গাউছে ছামদানী, গাউছুল য়া’জ্বম, গাউছুছ ছাক্বালাইন, হযরত শায়েখ ছাইয়্যিদ আব্দুল কাদের জিলানী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার সম্পর্কে মানাকিবী বর্ণনায় বহু উচ্চ মর্যাদা, কারামত ও রূহানী মাক্বামের কথা পাওয়া যায়। এত উচ্চ মাক্বামের অধিকারী হয়েও তিনি দুনিয়াতে এসে হযরত আবু ছাঈদ মাখজুমী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কাছে বাই’য়াত গ্রহণ করেছেন। এখান থেকে বোঝা যায়, বাই’য়াত দুর্বল মানুষের জন্যই শুধু নয়; বরং আউলিয়া কিরামের তরবিয়তের ধারাতেও বাই’য়াত একটি প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত পথ।

খাজা গরীবে নেওয়াজ, ছুলতানুল হিন্দ, আত্বায়ে রছুল (ছ্বল্লাল্লাহু য়া'লাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম), হযরত মুঈনদ্দীন হাছান চিশতী আজমিরী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি মুরীদ হয়েছিলেন হযরত ওসমান হারুনী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কাছে। খাজা কুতুবুদ্দীন বখ্তিয়ার ক্বাক্বী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি মুরীদ হয়েছিলেন খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কাছে। হযরত শেখ ফরীদ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি মুরীদ হয়েছিলেন কুতুবুদ্দীন বখ্তিয়ার ক্বাক্বী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কাছে। হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহী য়ালাইহি মুরীদ হয়েছিলেন শেখ ফরীদ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কাছে। ৩৬০ আউলিয়ার সর্দার হযরত শাহ জালাল রহমতুল্লাহী য়ালাইহি মুরীদ হয়েছিলেন ছাইয়্যিদ আহমদ কবীর রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কাছে। হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি মুরীদ হয়েছিলেন হযরত খাজা আবু আলী সিন্ধী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কাছে। হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি মুরীদ হয়েছিলেন হযরত খাজা বাকী বিল্লাহ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কাছে। হযরত ইমাম গাযযালী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি মুরীদ হয়েছিলেন হযরত শাইখ আবু য়া’লী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কাছে। এ ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে আউলিয়া কিরামের পথে বাই’য়াত, ছ্বহবত, আদব ও গোলামী কোনো প্রান্তিক বিষয় নয়; বরং তাজকিয়াহ এর পথে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত য়া’মলী বাস্তবতা।

এই পৃথিবীতে কামিল আউলিয়া কিরামের ধারাবাহিকতা দেখলে দেখা যায়, উনারা কেউ নিজেদের নফছের উপর ভরসা করে কামালিয়াত দাবি করেননি; বরং মুর্শিদের ছ্বহবত, বাই’য়াত, গোলামী, আদব ও তরবিয়তের পথে নিজেকে সোপর্দ করেছেন। হযরত শেখ ফরীদ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি দীর্ঘ ঈবাদত-বন্দেগীর পরও কুতুবুদ্দীন বখ্তিয়ার ক্বাক্বী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার দরবারে বাই’য়াত গ্রহণ করে দীর্ঘকাল গোলামী ও তরবিয়তের মাধ্যমে কামালিয়াতের পথে অগ্রসর হয়েছেন। যদি বাই’য়াত ছাড়া মহান আল্লাহ তা’য়ালা ও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ক্বুরবের পথ সহজে অর্জন করা যেত, তাহলে এসব আউলিয়া কিরামের বাই’য়াত গ্রহণের প্রয়োজন থাকতো না।

এ কারণেই গ্বাউছে পাক রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কিতাব ছিররুল আছরার-এর আলোচনায় ক্বলব জিন্দা করার জন্য পীর-মুর্শিদ গ্রহণের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং পীর-মুর্শিদ গ্রহণ করলে মুরীদ আউলিয়া কিরামের পথে চলার দরজা পায়; আর হাক্ব স্পষ্ট হওয়ার পরও যদি কেউ বিদ্বেষবশত মুর্শিদ, বাই’য়াত, তাছ্বাউফ ও আউলিয়ার পথকে অস্বীকার করে, তাহলে সে নিজের গলায় লা’য়নাতের মালা ঝুলিয়ে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়ে।

পীর-মুর্শিদ ও বাই’য়াত সম্পর্কে আল-ক্বুরআন-ছুন্নাহ শরীফ এবং আউলিয়া কিরামের য়া’মলী ধারায় এত দলীল থাকার পরও যারা মানতে নারাজ, যারা হাক্ব স্পষ্ট হওয়ার পরও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পথ, মুওমিনদের পথ, আউলিয়া কিরামের পথ এবং মুর্শিদী তরবিয়তের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাদেরকে সতর্ক করে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ ٱلْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِۦ جَهَنَّمَ ۖ وَسَآءَتْ مَصِيرًا) অর্থাৎ, যে ব্যক্তি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিরোধিতা করে, তার সামনে হেদায়েত স্পষ্ট হওয়ার পরও, এবং মুওমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সেই দিকেই ফিরিয়ে দিই যেদিকে সে ফিরেছে, আর তাকে যাহান্নামে প্রবেশ করাই; আর তা কতই নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল। (ছুরাহ আন-নিছা ৪:১১৫)

যারা বলে, আমরা কোনো পীর মানি না, মুর্শিদ মানি না, মাজহাব মানি না, ইমাম মানি না তারা মূলত হেদায়েতের প্রতিষ্ঠিত দরজাগুলো অস্বীকার করে। এ ধরনের মানুষ আল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ শরীফের নাম মুখে নিলেও বাস্তবে আল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ শরীফের ধারাবাহিক বুঝ, ইমামদের পথ, আউলিয়া কিরামের তরবিয়ত এবং মুওমিনদের ছাবীল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। হাশরের ময়দানে তারা অভিভাবকহীন, মুর্শিদহীন ও ইমামহীন হওয়ার ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিজেকে ঠেলে দেয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (يَوْمَ نَدْعُوا كُلَّ أُنَاسٍۭ بِإِمَامِهِمْ) অর্থাৎ, সেদিন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের ইমামের সাথে আহ্বান করবো। (ছুরাহ আল-ইছরা ১৭:৭১)

এই আয়াত শরীফে ইমাম শব্দটি হাশরের পরিচয়ের সাথে যুক্ত হয়েছে। তাই দুনিয়াতে মানুষ কাকে ইমাম বানায়, কাকে অনুসরণ করে, কার হাতে নিজেকে সোপর্দ করে, কোন মানহাজে চলে, কোন মুর্শিদের ছ্বহবতে থাকে এসব বিষয় সামান্য নয়। যে হাক্ব ইমামের পথে চলে, সে হাক্বের কাফেলায় উঠবে; আর যে নফছ, শয়তান, বিদ্বেষী মানহাজ, বেয়াদব দল ও আউলিয়া-বিদ্বেষী পথে চলে, সে সেই পথের সাথেই উঠার ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকবে।

আল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ শরীফে এত দলীল থাকার পরও যারা বাই’য়াতে রছুল ছ্বল্লাল্লাহু য়া'লাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার হাক্বিক্বত, মুর্শিদী তরবিয়ত, তাছ্বাউফ, আউলিয়া কিরামের পথ এবং মুওমিনদের ছাবীলকে অস্বীকার করে, সত্য প্রকাশ হওয়ার পরও সত্যকে পাশ কাটিয়ে যায়, তাদের চোখ থাকার পরও তারা অন্ধ, কান থাকার পরও তারা বধির। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (صُمٌّۢ بُكْمٌ عُمْىٌۭ فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ) অর্থাৎ, তারা বধির, বোবা ও অন্ধ; সুতরাং তারা ফিরে আসবে না। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৮) তাদের সীমালঙ্ঘন, বিদ্বেষ ও হাক্ব অস্বীকারের কারণে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের অন্তর, কান ও চোখের উপর মোহর মেরে দেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (خَتَمَ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ وَعَلَىٰ سَمْعِهِمْ ۖ وَعَلَىٰٓ أَبْصَٰرِهِمْ غِشَٰوَةٌۭ ۖ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌۭ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের অন্তরসমূহের উপর এবং তাদের শ্রবণশক্তির উপর মোহর মেরে দিয়েছেন; আর তাদের চোখের উপর আবরণ রয়েছে। এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি। (ছুরাহ বাক্বারাহ ২:৭) মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেনঃ (إِنَّ شَرَّ ٱلدَّوَآبِّ عِندَ ٱللَّهِ ٱلصُّمُّ ٱلْبُكْمُ ٱلَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নিকট সমস্ত জীবের মধ্যে নিকৃষ্টতম তারাই, যারা বধির, বোবা, যারা আক্বল ব্যবহার করে না। (ছুরাহ আল-আনফাল ৮:২২)

যারা আল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ শরীফের দলীল দেখার পরও না দেখার ভান করে, হাক্ব স্পষ্ট হওয়ার পরও বিদ্বেষবশত অস্বীকার করে, মুর্শিদ, বাই’য়াত, আউলিয়া কিরাম, মাজহাব ও ইমামদের পথকে উপহাস করে তারা মুনাফিক্বদের বৈশিষ্ট্যের দিকে এগিয়ে যায়। আর মুনাফিক্বদের পরিণাম সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (إِنَّ ٱلْمُنَٰفِقِينَ فِى ٱلدَّرْكِ ٱلْأَسْفَلِ مِنَ ٱلنَّارِ وَلَن تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই মুনাফিক্বরা যাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে; আর আপনি তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবেন না। (ছুরাহ আন-নিছা ৪:১৪৫) তিনি আরো বলেনঃ (بَشِّرِ ٱلْمُنَٰفِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا) অর্থাৎ, মুনাফিক্বদেরকে সুসংবাদ দিন যে তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (ছুরাহ আন-নিছা ৪:১৩৮)

আজ দুঃখের বিষয়, অনেকেই নিজেদের ছুন্নী, নবীপ্রেমিক, মিলাদপ্রেমিক, আউলিয়া-ভক্ত দাবি করে; কিন্তু বাস্তবে ওহাবী, লা-মাযহাবী, আউলিয়া-বিদ্বেষী, মুর্শিদ-বিদ্বেষী এবং রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শান-মান কমিয়ে দেখানো লোকদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে, তাদের সাথে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব স্থাপন করে। এটা কেমন নবীপ্রেম? এটা কেমন ছুন্নীয়ত?

নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুনঃ আপনার পিতার সম্পর্কে কেউ বাজে মন্তব্য করলে, আপনার পিতার সম্মান অস্বীকার করলে, আপনি কি তার সাথে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব রাখবেন? আপনার প্রিয়জনকে কেউ হেয় করলে, তার শান-শওকত, মান-মর্যাদা নিয়ে কটূক্তি করলে, আপনি কি তার সাথে সখ্যতা বজায় রাখবেন? আওয়ামীলিগ কি কখনো মুজিবের, বিএনপি কি কখনো জিয়ার, জামায়ত কি কখনো মওদুদি, গোলাম আজম, নিজামির দুষমনের সাথে গলায় গলায় পীরিত করবে? বরং নেতার শত্রু কর্মির শত্রু বলে বিবেচিত হয়। তাহলে যাকে ভালোবাসা ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না, স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা, বন্ধু-বান্ধব, জান-মাল সবকিছুর চেয়ে যাকে বেশি ভালোবাসার নামই ইমান, সেই রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শান-মান অস্বীকারকারীদের সাথে কিভাবে অন্তরঙ্গতা রাখা যায়?

হযরত আনাছ রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেনঃ (لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّىٰ أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ) অর্থাৎ, তোমাদের কেউ পরিপূর্ণ মুওমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই। (বুখারী শরীফ, মুছলিম শরীফ)

যেই নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম গুনাহগার উম্মতের জন্য এখনো রওজা মোবারকে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন, সেই নবীয়ে মুখতার, হাবীবে কিবরিয়া, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে যারা কটূক্তি করে, উনার শান-শওকত, মান-মর্যাদা, ছ্বলাতু ছালাম, বায়াতে রছুল ছ্বল্লাল্লাহু য়া'লাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং উনার নববী মাক্বামকে অস্বীকার করে, উনাকে যথাযথ আদবের সাথে না মেনে সাধারণ মানুষের কাতারে নামিয়ে আনতে চায় তাদের সাথে একজন সত্য নবীপ্রেমিক কীভাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব করতে পারে?

যেখানে নবীজিকে আল্লাহ তায়ালার সাথেই মুহব্বত করতে নির্দেশ স্বয়ং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনারঃ (قُلْ إِن كَانَ ءَابَآؤُكُمْ وَأَبْنَآؤُكُمْ وَإِخْوَٲنُكُمْ وَأَزْوَٲجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَٲلٌ ٱقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَـٰرَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَـٰكِنُ تَرْضَوْنَهَآ أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَجِهَادٍ فِى سَبِيلِهِۦ فَتَرَبَّصُواْ حَتَّىٰ يَأْتِىَ ٱللَّهُ بِأَمْرِهِۦ‌ۗ وَٱللَّهُ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلْفَـٰسِقِي) হে পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম, আপনি বলে দিন যদি তোমাদের পিতা-মাতা, তোমাদের সন্তান-সন্ততি, তোমাদের ভাই-বোন, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন ও বংশ-গোত্র, তোমাদের উপার্জিত ধন-সম্পদ, এমন ব্যবসা-বাণিজ্য যার লোকসানের আশঙ্কা তোমরা করো, এবং এমন ঘর-বাড়ি যা তোমরা পছন্দ করো, এসব যদি তোমাদের কাছে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, উনার রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালার পথে জিহাদের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়, তাহলে তোমরা অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ফায়সালা নিয়ে আসেন। আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত দান করেন না। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:২৪) এর পরেও যারা মুহব্বতের দাবীদার বলে উবাইয়ের মতো নামাজী, যাকাতি, হাজী সাজে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা এমন মুনাফিক্ব ও নবী-দুশমনদের ব্যাপারে এমন কঠোর ঘোষণা দিয়েছেন যে তাদের জানাযার নামাজ আদায় করতেও নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَلَا تُصَلِّ عَلَىٰٓ أَحَدٍۢ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَىٰ قَبْرِهِ) অর্থাৎ, তাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে আপনি কখনো তার জানাযার নামাজ পড়বেন না এবং তার ক্ববরের পাশে দাঁড়াবেন না। (ছুরাহ তাওবাহ ৯:৮৪)

অতএব, হাক্ব স্পষ্ট হওয়ার পর যারা মুর্শিদ, বাই’য়াত, আউলিয়া কিরাম, মাজহাব, ইমাম, তাছ্বাউফ এবং রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শান-মানকে অস্বীকার করে, তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা ইমানের জন্য বিপজ্জনক। ছুন্নী নবীপ্রেমিকের দায়িত্ব হলো, হাক্বকে হাক্ব জানা, বাতিলকে বাতিল জানা, আউলিয়া কিরামের পথকে সম্মান করা, মুর্শিদে কামিলের দরজাকে চিনা, এবং ওহাবী-লা-মাযহাবী বেয়াদব মানহাজ থেকে নিজের ইমান, ক্বলব ও পরিবারকে রক্ষা করা।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: