একদিন মহান
আল্লাহ তা’য়ালা জমিনবাসিকে লক্ষ্য করে ক্বছম করা শুরু
করলেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা পুরো কায়েনাতের মালিক,গোলামদের
প্রতি হুকুমই যথেষ্ট ছিলো, কিন্তু মালিক এক্সট্রা এটেনশন
চাইলেন, তিনি এমন কিছু বলতে চান যা সবার শোনা জরুরী, তাই তিনি ক্বছমের উপর ক্বছম করা
শুরু করলেন এইভাবেঃ (وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا، وَالْقَمَرِ إِذَا تَلَاهَا، وَالنَّهَارِ إِذَا
جَلَّاهَا، وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَاهَا، وَالسَّمَاءِ وَمَا بَنَاهَا،
وَالْأَرْضِ وَمَا طَحَاهَا، وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا، فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا
وَتَقْوَاهَا) ক্বছম সূর্যের এবং তার কিরণের, ক্বছম চাঁদেরঃ যখন সে
সূর্যের পেছনে পেছনে চলে, ক্বছম দিনেরঃ যখন সে তাকে আলোকিত করে, ক্বছম রাতেরঃ যখন সে তাকে ঢেকে
দেয়, ক্বছম আকাশের
এবং যিনি তা নির্মাণ করেছেন উনার, ক্বছম পৃথিবীর এবং যিনি একে বিছিয়ে দিয়েছেন উনার,
আরো ক্বছম নফছের এবং যিনি
তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন উনার, অতঃপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাকে ইলহাম করেছেন গুনাহের (নার) ও তাক্বওয়ার (নূর) সম্পর্কে। (ছুরাহ আশ-শামছ ৯১:১-৮)
ক্বছম শেষ, মানুষ
মেন্টালি রেডি শোনার জন্য, এতগুলো ক্বছমের পর তিনি যেটা বলতে
চান, এবার সেটা বলা শুরু করলেনঃ (قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا، وَقَدْ خَابَ
مَنْ دَسَّاهَا) নিশ্চয়ই কামিয়াব হয়েছে সেই
ব্যক্তি, যে তার নফছের তাজকিয়া করেছে, আর যে তাকে (অর্থাৎ নফছকে) কলুষিত করেছে সে-ই বরবাদ হয়েছে। (ছুরাহ আশ-শামছ ৯১:৯-১০)
এই আয়াত
শরীফদ্বয় প্রমাণ করেন যে, নফছের মধ্যে দুইটি বিপরীত
শক্তি রয়েছে একটি ফুজুর (পাপ ও খারাপ প্রবৃত্তি যা নার উৎপন্ন করে) এবং অন্যটি
তাক্বওয়া (আল্লাহভীতি যা নূর উৎপন্ন করেন)। এরপর বলছেন যে ব্যক্তি তার নফছকে পরিশুদ্ধ করতে
সক্ষম হবে, সেই সফলকাম হবে, আর
যে ব্যক্তি তার নফছকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হবে, সে
ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
এখন
জানার বিষয়, নফছ আসলে কি?
নফছের পরিচয়
বর্ননা করতে গেলে বলতে হয়ঃ নফছ হলো মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও লোভ, লালসা, কামনা বাসনার মূল কেন্দ্র। এটি কোন দৃশ্যমান বস্তু নয়, কিন্তু এর ক্রিয়াকর্মে তা অনুভূত হয়, যেমন
বাতাস দৃশ্যমান নয় কিন্তু অনুভূত হয়। মানুষের আত্মিক উন্নতি এবং আধ্যাত্মিক সাফল্যের জন্য নফছের পরিশুদ্ধি অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। নফছ এমন এক শক্তি, যা মানুষকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার
নৈকট্যে নিয়ে যেতে পারে ফলে সে আহছানি তাক্বউইম এর মাক্বাম লাভ করবে অথবা তাকে
ধ্বংসের অতল গহ্বরে ফেলতে পারে আছফালা ছাফিলিনে। নফছ মানুষের ইচ্ছাশক্তি, প্রবৃত্তি এবং আত্মিক চেতনার মূল চালিকাশক্তি। পবিত্র আল-ক্বুরআন ও হাদিছ শরীফে নফছ সম্পর্কে
সুস্পষ্ট আলোচনা এসেছে এবং এটিকে পরিশুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও নফছকে মানব সত্তার মূল গুরুত্বপূর্ণ
উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা মানুষের আত্মিক
উন্নতি ও অধঃপতনের জন্য দায়ী। নফছ একদিকে মানুষকে পাপের দিকে আহ্বান করে, আবার
অন্যদিকে একে সংযম ও পরিশুদ্ধির মাধ্যমে সবচেয়ে সহজে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নৈকট্যে লাভ করা যায়।
স্মরণীয় যে, নফছ মানবদেহের কোন একটি অংশ নয়, বরং এটি
মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক ভয়ানক শক্তি, যা মানুষের
শরীফ/নাপাক সকল চিন্তা, চেতনা, অনুভূতি
ও কাজকর্মকে পরিচালিত করে। যদিও এটি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কুদরত
দ্বারা সৃষ্ট এক অদৃশ্য বিষয়, তার পরেও নফছ ও রূহ এক জিনিস
নয়। বরং নফছ হলো রূহ ও দেহের
যৌথ ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট একটি আলাদা সত্তা, যা
মানুষের শারীরিক, পার্থিব ও আধ্যাত্মিক জীবনকে প্রভাবিত করে। এই নফছের প্রকৃতি অত্যন্ত জটিল এবং এটি একদিকে
পবিত্র হলেও অন্যদিকে এটি পাপাচার ও প্রবৃত্তির দ্বারা কলুষিত হতে পারে। এটি এমন এক সত্তা, যার মাধ্যমে মানুষ ভালো এবং মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।
হাক্বীক্বতে নফছ
মূলত মানুষের ইচ্ছাশক্তি যা দেখা যায়না কিন্তু বুঝা যায়, অস্তিত্ব আছে, আছে ক্ষমতা শক্তি,
যেমন রয়েছে বায়ুর। জগতের প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই নফছের দুটি বিপরীতমূখি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান
রয়েছেঃ
১) নাফছুদ দুনিয়া।
২) নাফছুল আখিরাহ।
নাফছুদ দুনিয়া
হচ্ছে জীবনাত্মা আর নাফছুল আখিরাহ হচ্ছে রূহ যা মূলত আমরে কুনের অন্তর্ভুক্ত। মূলে নফছ পবিত্র হলেও এই নফছ যখন ষড়রিপুর
আক্রমণের স্বীকার হয়, তখন তা নাপাক নারের ভান্ডারে
পরিণত হয়।
১. শাহওয়াত (شَهْوَةٌ)
কামঃ নফছের অবৈধ ও লাগামহীন জৈবিক বা মানসিক আকাঙ্ক্ষা।
২. গ্বদ্বব (غَضَبٌ)
ক্রোধঃ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে অন্তরের আগুনের বহিঃপ্রকাশ।
৩. ওয়াহম (وَهْمٌ)
মোহ/মায়াঃ ভ্রম, ভুল ধারণা, নশ্বর বা অবাস্তব জিনিসকে আসল, স্থায়ী, বা বাস্তব মনে করার ধোঁকা।
৪. ত্বমা’য় (طَمَعٌ) মোহঃ লোভাতুর আশা, অন্যের থেকে পাওয়ার লালসা, সৃষ্টির কাছে
প্রত্যাশা রাখা বা নশ্বর বস্তুর মোহে অন্ধ হওয়া।
৫. তাকাব্বুর (تَكَبُّـرٌ)
অহংকারঃ নিজেকে বড় মনে করা এবং সত্যকে অস্বীকার করা।
৬. হাছাদ (حَسَدٌ)
হিংসাঃ অন্যের নিয়ামত দেখে অন্তরে ঈর্ষা ও তা ধ্বংসের কামনা করা।
কিন্তু যদি
তাজকিয়ার মাধ্যমে একে ষড়রিপুর আক্রমণ থেকে বের করা যায়, তাহলে তা পুনরায় পাকিজা নূরের অধিকারী হয়। ষড়রিপুযুক্ত ইচ্ছা মানুষকে নাপাকির নারের দিকে
ধাবিত করে। পক্ষান্তরে ষড়রিপুমুক্ত
ও খোদাপ্রাপ্তির ইচ্ছা মানুষকে মুক্বাররবিনদের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়। কিন্তু মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নৈকট্য লাভ করতে হলে মানুষকে কঠোর সাধনা অর্থাৎ
রিয়াজত-মাশাক্কাত ও মুরাক্ববাহ-মুশাহাদার মাধ্যমে হাসিল করতে হয়। কেননা, মহান
আল্লাহ তা’য়ালা নিজের হাক্বীক্বত মানুষের মধ্যেই লুকিয়ে
রেখেছেন, যা পবিত্র আল-ক্বুরআনে মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই বলেন এইভাবেঃ (فَاِذَا سَوَّیۡتُهٗ وَ نَفَخۡتُ فِیۡهِ مِنۡ رُّوۡحِیۡ
فَقَعُوۡا لَهٗ سٰجِدِیۡنَ) অতএব আমি যখন আদম য়ালাইহিছ ছালাম
উনাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেব এবং উনার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা উনার প্রতি ছেযদায় পড়ে যেও। (ছুরাহ আল-হিজর ১৫/২৯) রূহ তো ফুকে দিলেন অতঃপর
আমাদেরকে আসমান থেকে জমিনে পাঠিয়ে দিলেন, কেনো?
সেটাও মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি স্পষ্ট করেই
বলছেন এইভাবেঃ (وَ
فِی الۡاَرۡضِ اٰیٰتٌ لِّلۡمُوۡقِنِیۡنَ وَ فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ ؕ اَفَلَا
تُبۡصِرُوۡنَ) মুউক্বিনীন যারা উনাদের জন্যে
দুনিয়ার জমিনে রয়েছে বহু নিদর্শন এবং (এর আগচেয়েও বড় নিদর্শন হচ্ছে স্বয়ং আমি
আল্লাহ তা’য়ালাই) তোমাদের নিজেদের মধ্যে (অবস্থান করি),
তবুও কি তোমরা চক্ষুষ্মান হবে না?। (ছুরাহ আজ-জারিয়াত ৫১/২০-২১) আর শাইখ আব্দুল
ক্বদির জিলানী রহমাতুল্লাহী য়ালাইহি উনার কিতাব ছিররুল আছরারে বলেছেনঃ (مَنْ عَرَفَ نَفْسَهُ فَقَدْ عَرَفَ رَبَّهُ) যে নিজের নফছকে চিনতে পেরেছে সে তার রব তা’য়ালা উনাকে চিনতে পেরেছে। (ছিররুল আছরার, পৃষ্ঠা
নং ১৮) অর্থাৎ যে নিজের নফছের হাক্বীক্বত জেনে গেছে, সে মূলত
মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহু উনার পরিচয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তাই ছ্বুফীরা যখন রিয়াযত-মাশাক্কাত দ্বারা
তাজকিয়া করে ক্বলবের সপ্তম স্তরে নাফছীর মাক্বামে উপনীত হন, তখনি তিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার
দিদার অন্তরদৃষ্টি দ্বারা লাভ করে থাকেন।
এদিকে আমরা দিন
রাত এক করে ফেলছি হাজারো য়া’মলের পিছনে ছুটতে
গিয়ে তাজকিয়া না করে, কিন্তু মালিক বলেই যাচ্ছেন (قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ اسْمَ
رَبِّهِ فَصَلَّىٰ) কামিয়াব হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে নফছের তাজকিয়া লাভ করেছে এবং (প্রথমত) তার রব তা’য়ালা উনার নামের জিকির করেছে, অতঃপর সে নামাজ পড়েছে। (ছুরাহ আল-য়া’লা
৮৭/১৪-১৫)
অজ্ঞতা থাকলে
জেনে নিতে হবে যে, নফছ ও রূহের মধ্যে আসমান
জমিনের পার্থক্য রয়েছে যদিও অনেক শরিয়তী মুল্লারা এটা মনে করে থাকে যে, নফছ/রূহ একিই জিনিস, কিন্তু বাস্তবতা হলো নফছ ও রূহ
দুটি ভিন্ন সত্তা। নফছ য়া’লমে খলক্ব (সৃষ্টি জগৎ) এর
বস্তু যা পিতার জীবনকনা থেকে সৃষ্টি হয়; আর রূহ য়া’লমে আমর (কুন ফায়া কুন-এর জগৎ)-এর বস্তু, এটা সরাসরি
মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার থেকে আগত। নফছ ও রূহকে এক মনে করার কোন সুযোগ নাই, কেননা তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির বস্তু। রূহ য়া’লমে আমর
থেকে এসেছেন, আর নফছ য়া’লমে খলক্ব-এর
অন্তর্ভুক্ত কেননা এটা এইখানে সৃষ্ট। রূহের প্রকৃতি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার
নির্দেশের সাথে সম্পর্কিত, কিন্তু নফছ মানুষের ইচ্ছাশক্তির
সাথে সংযুক্ত। দুইটা দুই জগতের বাসিন্দা যা অনেকেরই অজানা। রূহের বর্ননা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَ یَسۡـَٔلُوۡنَكَ عَنِ الرُّوۡحِ ؕ قُلِ
الرُّوۡحُ مِنۡ اَمۡرِ رَبِّیۡ وَ مَاۤ اُوۡتِیۡتُمۡ مِّنَ الۡعِلۡمِ اِلَّا
قَلِیۡلًا) (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) এই (ইহুদীরা) আপনার কাছে “রূহ” সম্পর্কে জানতে চায়, আপনি তাদের বলে দিন, রূহ হচ্ছে আমার রব তা’য়ালা উনার আদেশ সম্পর্কিত একটি বিষয়, (আর) মহান
আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে তোমাদের যে জ্ঞান দেওয়া
হয়েছে তা খুবই কম। (ছুরাহ আল-বনী ইছরাঈল ১৭/৮৫)
এই আয়াত শরীফ
থেকে বোঝা যায় যে, রূহ সরাসরি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নির্দেশে পরিচালিত হয় এবং এটি মানুষের মধ্যে এক বিশেষ ধরণের
আত্মিক শক্তি তথা প্রাণ সঞ্চালক হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে, নফছ
মানুষের ইচ্ছাশক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়। অর্থাৎ নফছ মানুষের পার্থিব ও শারীরিক অনুভূতির
সাথে জড়িত, যেখানে রূহ কেবল প্রাণ সঞ্চালক প্লাস
হাইয়ার ডাইমেনশনের কাজকর্মের সাথে জড়িত। নফছ যদি পরিশুদ্ধ হয়, তবে তা রূহের শক্তিকে বৃদ্ধি করে এবং মানুষকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নৈকট্যে পৌঁছে দেয়, কেননা রূহ ব্যতিত মহান আল্লাহ পাক উনার সাথে সরাসরি কানেকশনের
অন্য কোন পন্থাই নাই মানুষের, কেননা এটা য়া’লমে আমরের মাল, দেহ+নফছ য়া’লমে
খলক্বের, যে যেখানের সে কেবল সেখানেই যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। পক্ষান্তরে, নফছ যদি
কলুষিত হয়, তবে তা শয়তানের দাসত্ব গ্রহণ করে এবং মানুষকে
ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। নফছ হলো সেই জিনিস যা খোদ য়া’জাজিলকেও
ইবলিছে পরিণত করে দিয়েছে। ইবলিছকে তার নফছই গোমরাহ করেছে, সেই
হিসেবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সরাসরি প্রথম বিদ্রোহী হলো
নফছ। এই নফছ কতটুকু ভয়ানক যে, যদি সে একবার মুতাকাব্বির হয় তাহলে সে কত ভয়ানক হতে পারে তার
প্রমাণ পাওয়া যায় ইবলিছের জীবনী ঘাটলেঃ
একদা পাপিষ্ঠ
ইবলিছ মূছা য়ালাইহিছ ছালামের নিকট উপস্হিত হয়ে বলতে লাগলঃ হে মূছা য়ালাইহিছ ছালাম
আপনাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা রিছালাত ও নবুয়্যাতের
সম্মানে ভূষিত করেছেন, আপনার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন”। হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম বললেন, তা তো অবশ্যই; কিন্তু তোমার উদ্দেশ্য কি?
তুমি আমার কাছে কি চাও? এবং তুমি কে? ইবলিছ বললো, “হে মূছা য়ালাইহিছ ছালাম!, আপনি আপনার রব তা’য়ালা উনার কাছে বলুন যে, আপনার একজন মাখলুক তাওবাহ করতে চায়”। তখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা মূছা য়ালাইহিছ ছালামের নিকট ওহী প্রেরণ করলেনঃ “হে মূছা য়ালাইহিছ ছালাম! আপনি তাকে বলে দিন যে, মহান
আল্লাহ তা’য়ালা তোমার আর্জি কবুল করেছেন। অতঃপর তাকে হুকুম করুন, সে যেন আদম য়ালাইহিছ ছালামের কবরে গিয়ে কবরকে সম্মুখে রেখে
ছেযদা করে। যদি সে এভাবে ছেযদা করে
নেয়, তা হলেও আমি তার তাওবাহ কবুল করে নিবো এবং
তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবো”।
হযরত মূছা
য়ালাইহিছ ছালাম ইবলিছকে এ কথা জানালে সে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল এবং দম্ভের
সাথে বলতে লাগল, “হে মূছা য়ালাইহিছ ছালাম! আমি
আদম য়ালাইহিছ ছালামকে বেহেস্তে ছেযদা করি নাই, এখন উনার
মৃত্যুর পর আমি উনাকে কবরে গিয়ে ছেযদা দেব?” বলে সে চলে যায়।
আরেকটি ঘটনা
বর্ণিত আছে যেঃ ইবলিছকে যখন দোযখে নিক্ষেপ করার পর কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে, তখন জিজ্ঞাসা করা হবে, “হে ইবলিছ মহান
আল্লাহ তা’য়ালা উনার আযাব কেমন লাগে? সে
বলবে, “অত্যন্ত কঠিন, এর চেয়েও অধিক
কঠিন কোন আযাব হতেই পারেনা”। এ সময় ইবলিছকে বলা হবে, “হযরত আদম য়ালাইহিছ ছালাম তো
বেহেস্তে আছেন, তুমি এখনও উনাকে ছেযদা করে মাফ চেয়ে নাও,
তোমাকে মাফ করে দেওয়া হবে। এ কথার পরও সে হযরত আদম য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে
ছেযদা করতে অস্বীকার করবে। আরেক রেওয়াতে বর্ণিত আছে, “মহান আল্লাহ তা'য়ালা ইবলিছকে এক লক্ষ বছর পর পর দোযখ হতে বাহিরে আনবেন এবং হযরত আদম
য়ালাইহিছ ছালাম উনাকেও বাহিরে আনা হবে। অতঃপর উনাকে ছেযদা করার হুকুম দেওয়া হবে
ইবলিছকে। তখনও বার বার ইবলিছ তা
করতে অস্বীকার করবে এভাবে পুনঃ পুনঃ জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
এই যে ঘাউড়ামি? ঔদ্ধত্বপনা, তাকাব্বুর, কিসের জন্যে? নফছের জন্যে। হুবুহু আমাদের সাথেও হয়, যখন নফছ মালিক আল্লাজী উনার নিকট তা বিক্রি করা হয়, তখন সে মাটির মতো হয়ে যায়, আনুগত্যে, রেজা সন্তুষ্টিতে বিলীন থাকে, আর যখন তা ইবলিছের
নিকট বিক্রি করা হয় তখন সে ঘাউড়ামি, ঔদ্ধত্বপনা, তাকাব্বুরি প্রকাশ করে। অতএব, মূলে নফছ আমাদের শত্রু, তাকে যে বন্ধু বানাতে পারে সেই কামিয়াব হয়।
অতএব নফছ মানুষের
পার্থিব জীবন ও আধ্যাত্মিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি যদি পরিশুদ্ধ করা যায়, তবে মানুষ আখিরাতে সফল হবে। আর যদি নফছকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে শয়তান তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। একারণে তাজকিয়া, জিকির,
ঈবাদাত ও আত্মসংযমের মাধ্যমে নফছকে পরিশুদ্ধ করা জরুরি।
প্রথমতো মানুষ
মূলত ৩ জিনিসের সম্মিলিত এক রূপ। রূহ, শরীর ও নফছ। আর এই ৩ জিনিসের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দেখো, মানুষের
ব্যক্তিত্ব এই পুরো কায়েনাতের বিপরীতে মূলত য়া’লমেরই দরজা
রাখে। যদি গভীর দৃষ্টিপাত করা
যায় তাহলে দেখা যাবে যে মানুষের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে জমিন বিদ্যমান, আসমান ও বিদ্যমান। এই মানুষের ভেতরই রয়েছে য়া’লমে মুনখফিদ, আবার য়া’লমে বালা। য়া’লমে আছগর যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে য়া’লমে য়া’লা। মানুষের শরীর+নফছের সম্পর্ক মূলত য়া’লমে নাছুৎ অর্থাৎ এই দুনিয়ার সাথে, যাকে
আমরা য়া’লমে খলক্ব বলে থাকি। কিন্তু রূহ হলো য়া’লমে আমরের জিনিস। এখন এইযে রূহ আমাদের মধ্যে বিদ্যমান, এটা তো
ঐশ্বরিক এক শক্তি, এর খাবার হচ্ছেন নূর যা জিকরে ইলাহীর
মাধ্যমেই তৈরি হয়। কিন্তু নফছ হিসেবে যে মাখলুক বিদ্যমান, সে
বিশাল এক ফিত্না মানুষের জীবনে। সকল প্রকার খারাপ কাজের মারকাজ বা রাজধানী হলো এই নফছ, যেখান থেকে দেহরাজ্যের প্রত্যেক নগরে বন্দরে ফিতনা, ফ্যাসাদের উৎপত্তি হয়। নফছের কারণে মানুষ সাধারণত দুই ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকে। একটি কারণ হলো ফাছাহাতে নফছ, আর অন্যটি হলো হাওয়া-এ নফছ। ফাছাহাতে নফছ হচ্ছেঃ অজ্ঞতা, জাহেলিপনা ও মুর্খতা, অর্থাৎ মানুষ যখন
আপন নফছ থেকে বেখবর থাকে তখন তাকে ফাছাহাতে নফছ বলে। আর হাওয়ায়ে নফছের মানে হলো মানুষ নফছের খায়েশাত, নফছের গোলামী, নফছের পূজারী হয়ে যায়। আর নফছের এই দুটি কাজই মানুষের ধ্বংসের মূল
কারণ হয়ে থাকে দুনিয়া ও আখিরাতে। আর একারণেই নফছ শিকারী ছ্বুফীরা নফছের ছুরত যে যেরূপ দেখেছেন সেরূপ মিছালই পেশ
করেছেন। কেউ বলেছেন ষাঁড়ের মতো, কেউ বলেছেন শেয়ালের মতো, কেউ বলেছেন
কুকুরের মতো, কেউ বলেছেন শুকরের মতো দেখেছি। স্মরণীয় যে, এইসব
মূলত য়া’লমে মিছালের ছুরত। মূলত নফছের মধ্যে যার যে খাছলত বা বৈশিষ্ট্য
রয়েছে সেটা যে পশুর সাথে মিলে তার রূপেই নফছকে দেখতে পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ যার মধ্যে কিনা, বদ, বুগজ ও হাছাদ থাকবে তার নফছকে
কুকুরের মতই দেখা যাবে, যাতে করে ব্যক্তি জেনে ফেলে যে তার
নফছের কোন ত্বহারাত প্রয়োজন। আর যে তার নফছকে শেয়ালের ছুরতে দেখতে পাবে সে বুঝবে যে তার মধ্যে আইয়্যারি, মাক্কারি, চতুরি, চুরি-চামারি,
ছ্যাঁচড়ামি, চালাকি, ধোঁকা
বিদ্যমান। আর যে দেখবে তার নফছ
ষাঁড়ের মতো সে বুঝবে তার মধ্যে গোয়ারমি, নষ্টামি
বিদ্যমান, কারণ ষাঁড়ের নিকট মা বোনও বাকী গাভীর মতো। আর যার নফছ সে খিঞ্জিরের তথা শুকরের ছুরতে
দেখবে সে বুঝবে সে হারাম হালালের পরোয়া করেনা, পাক
নাপাকের পরোয়া করেনা যা পায় তাই গিলে, তাই করে, তাই খায়। অতএব ব্যক্তিভেদে নফছের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ হয় এইসব পশুর ছুরতে যারা নফছকে দেখার
মতো ঈলম মহান আল্লাহ তা’য়ালা হতে অর্জন করে থাকেন। তাই প্রত্যেকের উচিৎ তার নফছের হাল জানার জন্যে
হয় সে নফছ শিকারি হবে নাহয় সেই মুর্শিদে কামিলের নিকট নিজেকে সঁপে দিবে যিনি নফছকে
শিকার করার ঈলম রাখেন। কারণ কেউ যদি তার নফছ এর হাল সম্পর্কে না জানে, আর
জানার পরেও তা পাক পবিত্র না করে, তাহলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে সে কোন দিন-ও হাসিল করতে পারবেনা। নফছ সম্পর্কে যে ব্যক্তি অনবগত তার জন্য নফছের
বিরুদ্ধে লড়াই করা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। কেননা, নফছের পরিচিতি হলো মা’য়রিফাতে ইলাহীর তোরণ দ্বার। কেননা, রব তা’য়ালা উনার
পরিচয় লাভ করা যে ফরজ তা আজকের দিনে অনেক য়া’লীম-উ’লামাও জানেনা। সুতরাং উনার পরিচয় লাভ করতে হলে সর্ব প্রথম নফছের পরিচয় লাভ করা ফরজ হবে। কারণ কিতাবে পাওয়া যায়, (مَنْ عَرَفَ
نَفْسَهُ فَقَدْ عَرَفَ رَبَّهُ) যে নিজের নফছকে চিনতে
পেরেছে সে তার রব তা’য়ালা উনাকে চিনতে পেরেছে। (ছিররুল আছরার, পৃষ্ঠা
নং ১৮) কারণ মানুষ যতক্ষন তার নফছের ব্যাপারে গ্বাফীল থাকে, জ্ঞানহীন
থাকে, বেখবর থাকে, ততক্ষন সে নফছের
পূজা থেকে বের হতে পারেনা। এখন যে জানেইনা তার নফছের হাল কি, এর
মধ্যে কি কি নাপাকি, নষ্টামি, হারামিপনা,
শারারাত বিদ্যমান, ধ্বংস বিদ্যমান, সে কীভাবে তার নফছকে পাক পবিত্র করবে? কীভাবে সে
মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে চলতে পারবে? কীভাবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুম আহকাম মেনে
চলবে? একারণেই মহান আল্লাহ পাক উনাকে জানার জন্য সর্বপ্রথম
আপন নফছকে জানার কথা বলেছেন ছ্বুফিয়ায়ে কিরামগণ। নিজের মনোরাজ্যের অভ্যন্তরে যেনো ডুব দিয়ে দেয়, কারণ মনোরাজ্যের অভ্যন্তরে ডুব দেওয়া ব্যতিত , নফছের ভেতরের হাল হাক্বীক্বত জানা ব্যতিত
সে যতোই খোদাকে তালাশ করুক, ঘুরে ফিরে সে নিজেকেই
খুঁজে পাবে তার আমিত্বে, অহংকারে, গুরুরে,
কামনা বাসনায় অথচ সম্মুখেই থাকবেন মালিক হিজাবের অন্তরালে অন্তপূরে। ছুলত্বানুল আরেফিন হযরত বায়োজিদ বোস্তামি
রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলতেন, যখনই আমি খোদাকে তালাশ করতে
বের হতাম তখন আমি নিজেকে ব্যতিত কিছুই খোঁজে পেতাম না। অতঃপর ২০ বছর নফছের উপর রিসার্চ করে এই মাক্বামে
পৌছেছি যে, এখন যখনই উনার তালাশে বের হই, তখন উনাকে ছাড়া আর কাউকেই খোঁজে পাইনা হাক্বিক্বতে।
এখন
অনেকে প্রশ্ন করতে পারে যে নফছকে কীভাবে চিনতে পারবো?
নফছ চিনার অনেক
ত্বরীক্বা-ই রয়েছে, আর প্রত্যেক ত্বরীক্বা-ই
অসাধারণ। ছ্বুফিয়ায়ে কিরামগণ
বলেছেন, মুর্শিদে কামিল ব্যতিত নফছকে কাবু করা,
নফছকে পাক পবিত্র করা, নফছের গোলামী পরিত্যাগ
করা প্রায় অসম্ভব বা অনেক কঠিন কাজ। কারণ নফছ হলো আপন য়া’লমে বাদশাহ আর শয়তান তার উজির,
আর মানুষ হলো সেই বাদশার প্রজা। আর এই বাদশাহ ও উজিরের বিপরীতে মুর্শিদে কামিল
ব্যতিত কারো কোন ক্ষমতাই চলেনা। কারণ মুর্শিদে কামিলই প্রথমে এই দুই বাদশাহ ও উজিরের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন
উনার রূহানী জ্বালাল দ্বারা যখন মুরীদ বাইয়াতের মাধ্যমে আত্মসমর্পন করে, ফলে হাক্ব তালাশি মুরীদ খুব সহজেই নফছের গোলামী থেকে নাজাত
পেয়ে যায়। মানুষ যাদের পিছনে নামাজ
পড়ে নিজেকে মুছলিম হিসেবে ভাবে, সেই মোল্লা সমাজের
অধিকাংশই নফছ সম্পর্কে কোন ধারনাই রাখেনা, কিন্তু রূহানিয়াতে
মুর্শিদে কামিল এমন ব্যক্তি হয়ে থাকেন যিনি মুরীদকে অল্প দিনে এমন সব ঈলম আতা করেন
যে নফছের সকল রাজ তার সম্মুখে দিনকে দিন খুলতেই থাকে। আর সে নফছের পরিচয় সম্পর্কে ভালো করেই অবগত হতে
থাকে। কারণ মুর্শিদে কামিল
তাকে মুরাক্ববায় বসার মতো রুজু আতা করেন, জিকিরের
অনুমতি দেন যার ফলে ইছমে জাত আল্লাহ, তাওহীদি হতে পাছ আনফাছ
ও জিকরে হু দ্বারা ইশকের মাক্বামে ফায়েজ হয়ে খুব সহজে সে নফছের হাক্বীক্বত বুঝে
ফেলে, নফছের সাথে শত্রুতা হয়, তাকে
দমনে সে উন্মাদ হয়ে ওঠে।
এবার
আমরা জানবো নফছ কত প্রকার ও কী কী?
মনে রাখতে হবে যে, নফছ একটি হলেও তার রয়েছে অনেক ক্বিছিম তোমারই অযুদে। তোমার একই দেহের ভেতরে তোমার নফছের আণ্ডারে
সাতটি সত্তা বসবাস করছে। প্রত্যেকটিই তোমার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য লড়াই করছে। এই মুহূর্তে, তুমি
যখন লিখাটা পড়তেছো, তখন এই সত্তাগুলোর যেকোন একটি তোমার উপর
প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় আছে। আর সেটিই তোমার সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে, তোমার
উপলব্ধিকে রঙ দিচ্ছে, তুমি কী চাইবে আর কি করবে, কাকে ভয় করবে তা নির্ধারণ করছে। অথচ সম্ভবত তুমি এটাও জানো না যে, আসলে কোন সত্তাটি এখন তোমার ভেতরে কর্তৃত্ব করছে। আর এই সবগুলোর সম্মিলিত রূপ হচ্ছে নফছ।
নফছ একটি আরবি
শব্দ। নফছ শব্দের অনুবাদ অনেকে
প্রাণ বা আত্মা করে থাকে, কিন্তু আমার মতে ইহা সঠিক নয়। বরং প্রাণ বা আত্মা হলো সেই অলৌকিক বস্তু রূহ, যা মানুষের দেহে ফুঁকে দিয়ে প্রাণের সঞ্চার করা হয়, যেমন হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ মাতৃগর্ভে বাচ্চার বয়স যখন ১২০ দিন হয়, তখন একজন ফেরেশতা য়ালাইহিছ ছালাম উনাকে মহান আল্লাহ পাক সেখানে প্রেরণ
করেন যিনি ঐ বাচ্চার রিজিক, য়া’মল,
হায়াৎ এবং সৌভাগ্য/দূর্ভাগ্য হওয়ার তাক্বদীর লিখে দেন। (ثُمَّ يَنْفُخُ
فِيهِ الرُّوحَ) তারপর তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করা হয়। (বুখারী শরীফ ৭৪৫৪) আর নফছের ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক কালামুল্লাহ শরীফে বলেনঃ
(كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ) প্রত্যেক নফছকে মৃত্যুর স্বাধ গ্রহণ করতে হবে। (ছুরাহ
আলে ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩/১৮৫) অর্থাৎ নফছ এমন জিনিস যার
মৃত্যু হবে, কিন্তু রূহ এমন জিনিস যার কখনো
মৃত্যু হবেনা, একারণেই রূহ আর নফছকে একিই জিনিস বলা আমার
কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ প্রাণ আছে এমন প্রত্যেকটি জিনিস মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে, কিন্তু নফছ ঐ জিনিস না যা মানুষকে জীবিত রাখে, বরং মানুষকে জীবিত রাখে রূহ, কারণ রছুলে পাক
ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (إِنَّ الرُّوحَ إِذَا قُبِضَ تَبِعَهُ
الْبَصَرُ) যখন রূহ কবয করা হয় তখন তার
দৃষ্টিশক্তিও চলে যায়। (মুছলিম শরীফ ৯২০, ইবনে মাজাহ শরীফ ১৪৫৪) হাদিছ
শরীফে এও এসেছেন যে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে
যখন রূহ সম্পর্কে ইহুদীরা জিজ্ঞেস করলো, তখন মহান আল্লাহ তা‘আলা ওয়াহি নাযিল করেনঃ (وَيَسْـَٔلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ ۖ قُلِ الرُّوحُ مِنْ
أَمْرِ رَبِّى وَمَآ أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا) (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) এই
(ইহুদীরা) আপনার কাছে “রূহ” সম্পর্কে
জানতে চায়, আপনি তাদের বলে দিন, রূহ
হচ্ছে আমার রব তা’য়ালা উনার আদেশ সম্পর্কিত একটি বিষয়,
(আর) মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে
তোমাদের যে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তা খুবই কম। (ছুরাহ আল বনী-ইছরাঈল ১৭/৮৫)
অতএব স্পষ্ট হয়ে
গেলো যে রূহ হচ্ছে আমরে কুনের অন্তর্ভুক্ত কিন্তু নফছ আমরে কুনের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং নফছ হচ্ছে রূহ ও দেহের সম্মিলিত জীবিত
প্রাণের একটি বিষয় যা কেবল প্রাণীর জীবদ্দশায় বিদ্যমান থাকে। আর এই নফছের কারণেই মানুষ যান্নাত যাহান্নাম
নির্ধারণ করে তার জীবদ্দশায়। অর্থাৎ প্রাণী হচ্ছে রূহ ও দেহের সম্মিলিত একটি রূপ যার শুরু ও শেষ হয় রূহ
ফুঁকার ও ফেরত নেওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু যখন প্রাণ বিদ্যমান থাকে তখন সেখানে যে প্রবৃত্তি বিদ্যমান থাকে সেটাই
মূলত নফছ। কিছু মানুষ মনে করে যে
নফছ জিনিসটা পুরোটাই খারাপ, কিন্তু নফছ মানেই খারাপ এরূপ
নয়। নফছকে মানুষ নিজে যতক্ষন
খারাপ রাখে সে ততক্ষনই খারাপ থাকে। নফছের অনেক প্রকার রয়েছে, কেউ কেউ ৩/৪
প্রকারের বলেছেন, তবে আমি আমার ঈলম দিয়ে আল-ক্বুরআনে ৭ ধরণের
নফছ পেয়েছি। যার মধ্যে সবচেয়ে
নিকৃষ্ট হলো নফছে আম্মারাহ, আর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট নফছ হলো,
নফছে কামিলা/রহমানিয়া। মহান আল্লাহ তা’য়ালা কালামুল্লাহ শরীফে এই ৭
প্রকারের নফছের ব্যাপারে জ্ঞানীদের ইশারা দিয়েছেন যাতে করে তারা তা অনুধাবন করে
কামিয়াবি হাসিল করে।
প্রত্যেক ইনছান
নফছের সাতটি স্বতন্ত্র স্তরের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। অধিকাংশ মানুষ প্রথম বা দ্বিতীয় স্তরেই জীবন
কাটিয়ে দেয়; তারা কখনো টেরই পায় না যে এরও
ঊর্ধ্বেও আরো স্তর আছে। কেউ কেউ তৃতীয় বা চতুর্থ স্তর পর্যন্ত পৌঁছে মনে করে এবার বুঝি গন্তব্যে এসে
গেছি। কিন্তু অতি অল্পসংখ্যক
মানুষ সপ্তম স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে; সেখানে “আমি” বা পৃথক সত্তার ধারণাটাই এত বিস্তৃত সত্যের
মধ্যে বিলীন হয়ে যায় যে, তাকে আর “স্বতন্ত্র
সত্তা” বলা প্রায় অর্থহীন হয়ে পড়ে।
যারা খুব মনোযোগ
দিয়ে এই আলোচনা পড়বে তারা আলোচনার শেষে বুঝতে পারবে, ঠিক
এখন কোন স্তর থেকে সে পরিচালিত হচ্ছে। তোমাকে সেই স্তরে কে আটকে রেখেছে, এবং পরের স্তরে উঠতে কী প্রয়োজন। কারণ, একবার
নফছের হাক্বীক্বত অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পড়লে, তা আর না-দেখার
ভান করে থাকা যাবে না। তখন প্রতিটি মুহূর্তই হয়ে ওঠবে একেকটি নির্বাচন, যেখানে
আছো সেখানেই থাকবে, নাকি আরো ওপরে উঠবে।
প্রথম স্তরঃ নফছে
আম্মারা প্রবৃত্তির নির্দেশদাতা নফছ। প্রায় সবাই এখান থেকেই শুরু করে, আর
অধিকাংশ মানুষ সারাজীবন এ স্তরেই রয়ে যায়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা
আল-ক্বুরআনে এই স্তরটির কথা সরাসরি উল্লেখ করেছেনঃ (وَمَآ أُبَرِّئُ نَفْسِىٓ ۚ إِنَّ
النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌۢ بِالسُّوٓءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّىٓ ۚ إِنَّ رَبِّى
غَفُورٌ رَّحِيمٌ) (হযরত ইউছূফ য়ালাইহিছ ছালাম
বললেন) আমি আমার নফছকে নির্দোষ মনে করি না। নিশ্চয়ই (মানুষের) নফছ (মানুষকে) খারাপ কাজ করতে প্ররোচিত করে, তবে তার কথা আলাদা যার প্রতি আমার রব তা’য়ালা তিনি অনুগ্রহশীল। নিঃসন্দেহে আমার রব তা’য়ালা বড়ই ক্ষমাশীল পরম দয়ালু
মেহেরবান। (ছুরাহ আল-ইউছূফ
য়ালাইহিছ ছালামঃ ১২/৫৩) অর্থাৎ নফছ মানুষকে কুপ্রবৃত্তি ও জৈবিক কামনার দিকে যেতে, লিপ্ত হতে প্ররোচিত করে, যাকে নফছে
আম্মারাহ হিসেবে আল-ক্বুরআনের উক্ত আয়াত শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট নফছ। আর এই নফছে আম্মারার যারা ১০০% অনুসারী তারাই
হচ্ছে সৃষ্টির সবচেয়ে বড় মুশরিক নফছের পূজারী। মহান আল্লাহ তা’য়ালা
বলেনঃ (أَرَءَيْتَ
مَنِ ٱتَّخَذَ إِلَـٰهَهُۥ هَوَىٰهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا أَمْ
تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ ۚ إِنْ هُمْ إِلَّا
كَٱلْأَنْعَـٰمِ ۖ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا)
(পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি কি সেই ব্যক্তির
প্রতি লক্ষ্য করেন নি? (যে) তার নফছের খায়েশাতকে
(তার) নিজের খোদা বানিয়ে নিয়েছে; তবুও কি আপনি তার কাজের
জিম্মাদার হতে চান? (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া
আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি কি সত্যিই মনে করেন, (যে) তাদের
অধিকাংশ লোক (আপনার কথা) শুনে কিংবা (এর মর্ম তারা) বুঝে; (আসলে)
ওরা হচ্ছে পশুর মতো, বরং (কোনো কোনো ক্ষেত্রে) তারা (তার
চাইতেও) অধিক পথভ্রষ্ট। (ছুরাহ আল-ফুরক্বনঃ ২৫/৪৩-88) কি মনে হচ্ছে যারা আম পাবলিক ঈলম নাই, দ্বীন বুঝেনা এরূপ মানুষেরাই নফছের পূজারী হয় কেবল? না না না মোটেও না, বরং আমাদের সম্মুখে থাকা বিশাল
বিশাল টাইটেল ওয়ালা টেলিভিশন, ফেবু, ইউটিউব,
স্টেইজ মুল্লা, কথিত পীর, বাবারা এদের চেয়েও বড় নফছের পূজারী, তাদের ব্যাপারে
তো এমন কথা-ও মহান আল্লাহ পাক বলে দিচ্ছেন যে তাদের সারা পৃথিবীর ঈলম কেউ ঢেলে
দিলেও কাজ হবেনা, তাদের হিদায়েত তো মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া আর কেউ দিতে পারবেনা যেখানে আম পাবলিকদের জন্য তারা মুর্শিদ
পাবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মহান আল্লাহ পাক। এইসব কথিত ডিগ্রিধারী, খারেজী ছালাফি, ওহাবী, আহলে-ক্বুরআন আহলে হাদীছের অনুসারী গোস্তাখ ও দেওবন্দি গোমরাহির উপর
ইস্তিক্বামত থাকা উ’লামায়ে ছু-দের ব্যাপারে বলতেছেনঃ (أَفَرَءَيْتَ مَنِ ٱتَّخَذَ إِلَـٰهَهُۥ هَوَىٰهُ
وَأَضَلَّهُ ٱللَّهُ عَلَىٰ عِلْمٍۢ وَخَتَمَ عَلَىٰ سَمْعِهِۦ وَقَلْبِهِۦ
وَجَعَلَ عَلَىٰ بَصَرِهِۦ غِشَـٰوَةًۭ فَمَن يَهْدِيهِ مِنۢ بَعْدِ ٱللَّهِ ۚ
أَفَلَا تَذَكَّرُونَ) পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহ
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি কি সেই ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য করেছেন? যে তার নফছের খায়েশাতকে (তার) নিজের খোদা বানিয়ে নিয়েছে;
এবং (পর্যাপ্ত পরিমাণ দ্বীনি) জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাকে গোমরাহ করে দিয়েছেন, তার কান ও তার
অন্তরে তিনি মোহর মেরে দিয়েছেন, তার চোখে তিনি পর্দা এঁটে
দিয়েছেন; এমন ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পর আর কে আছে (যে) তাকে হেদায়েতের পথ দেখাবে? এরপরেও কি তোমরা কোনো উপদেশ গ্রহণ করবে না? (ছুরাহ
আল-যাছিয়া ৪৫/২৩)
ব্যবহৃত (أَرَءَيْتَ)
অর্থাৎ আপনি কি দেখেছেন? এখন ব্যবহৃত রআইতা শব্দটির উৎস
কি? উৎসমূল হলো (رَأَيْ) এখন, র’আ, আর র’ইয়া কয় ধরণের হয়? দুই ধরণের।
১) নাজ্বর (نَظَرٌ)
দ্বারাঃ অর্থাৎ সামনে যা কিছু আছে দৃষ্টি দিয়ে সেগুলোকে দেখা।
২) বাছ্বর (بَصَرٌ)
দ্বারাঃ অর্থাৎ পেছনের জিনিসকে যে দেখায়। মানে এমন জিনিস নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা বা দেখা যা অলরেডি ঘটে গেছে পেছনে।
আরাআঈতা (أَرَءَيْتَ)
আপনি কি দেখেছেন? চিন্তা ভাবনা করেছেন? (مَنِ) যে, (ٱتَّخَذَ)
বানিয়ে ফেলেছে, (إِلٰهَهُۥ) নিজের মা’য়বুদ বা খোঁদা, (هَوٰىهُ) আপন নফছের
খায়েশাতকে বা প্রবৃত্তিকে। আপনি কি সেই লোকের অবস্থা লক্ষ্য করেছেন? এমন
ব্যক্তির হালতের উপর কি দৃষ্টিপাত করেছেন? যে তার
প্রবৃত্তিকে বা নিজের নফছের কামনা বাসনাকে নিজের ইলাহ বানিয়ে রেখেছে? (اَفَاَنۡتَ) এরপরেও কি আপনি, (تَکُوۡنُ) হবেন, (عَلَیۡهِ) তার জন্যে (وَكِيلً) উকিল, অভিভাবক, জিম্মাদার, নিগাহবান?
এখন কাউকে ইলাহ
বানানোঃ এর হাক্বীক্বী মানে বা অর্থ কি? কাউকে
মা’য়বুদ বানানোর মানে কি আমরা কি জানি?
এর অর্থ হলো যাকে
নিজের জীবনের চেয়েও বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়। মা’য়বুদ কে হয়ে থাকে? যাকে
মানুষ তার সামান্য সময়ের জিন্দেগিতেও সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়, মূল্যায়ন করে, যার হুকুম আহকামকে বিনা চু-চেরায় মেনে
নেয়, প্রত্যেকটি আদেশ নিষেধ হুবুহু পালন করে থাকে। (مَعْبُود) মা’য়বুদ শব্দটি কি থেকে এসেছে? (عَبْد) য়া’বদ থেকে। আর য়া’বদ কে
হয়ে থাকে? “গোলাম” অর্থাৎ ইনছান যার
গোলামী, দাসত্ব কবুল করে নেয় মনে প্রাণে। হোক সেটা মানুষের নফছের খায়েশাত, বা অন্য কোন মানুষ, কিংবা পাথরের দেব
দেবী। অথবা আসল রব তা’য়ালা উনার।
আর কাউকে মা’য়বুদ বানানোর মানে হলো, তাকে জীবনের
সবকিছুর উপর এহমিয়াত (গুরুত্ব, ভ্যালু) দেওয়া। সবচেয়ে উঁচু দরজা দেওয়া, সবচেয়ে উঁচুতে স্থান দেওয়া। উনার মোকাবেলায়, উনার
বিপরীতে বাকি সবকিছুই উনার নিচে চলে আসা। বাকি সবকিছুর এহমিয়াত কমে যাওয়া, গুরুত্ব কমে যাওয়া, ভ্যালু কমে যাওয়া,
আন-ইম্পরট্যান্ট হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ উনার বিপরীতে বাকি সবকিছুর দরজা
সেকেন্ডারি হওয়া, আন-ইম্পরট্যান্ট হওয়া। অর্থাৎ গোলাম তার মা’য়বুদ উনার বিপরীতে সব সময় বাকি সবকিছুকে সেকেন্ডারি হওয়া,
আন-ইম্পরট্যান্ট, গুরুত্বহীন মনে করে থাকে। সবচেয়ে বেশী ভয়, সবচেয়ে
বেশী মুহব্বত তার নিকট তার মা’য়বুদ উনারই বিদ্যমান থাকে,
যেকোন বিষয় মা’য়বুদ উনার বিপরীতে অবস্থান
করলে সেটা যতো গুরুত্বপূর্ণ বা দামি হোক সে কোনক্রমেই তার এহমিয়াত দেবে না।
এটি সেই নফছ, যা নিজের কামনা-বাসনার সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত হয়ে থাকে এবং
সেগুলোর বিরোধিতা করার কোনো শক্তি তার থাকে না। যা চায়, তা-ই
চায়, এখনই। কোনো তাড়না জাগলে, সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর করতে
হবে। যেনো এক বন্য প্রাণী, যে নিছক প্রবৃত্তির টানেই চলছে, অথচ সে
টেরই পাচ্ছে-না যে সে চালিত হচ্ছে নফছে আম্মারার আন্ডারে।
এই স্তরে নফছ খুব
সরল এক নীতিতে কাজ করে। আনন্দের পেছনে ছোটা, কষ্ট এড়িয়ে চলা, অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করা, এবং যেকোনো মূল্যে
অহমকে রক্ষা করা। এ স্তরের মানুষ নিজের স্বার্থসিদ্ধি হলে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই মিথ্যা বলে। প্রতারণা করে, চুরি
করে, অন্যকে কষ্ট দেয়, অথচ অন্তরে
প্রকৃত অনুতাপ থাকে না; ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়টাই শুধু থাকে। তার নৈতিকতা সম্পূর্ণ বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণনির্ভর। কেউ দেখছে, কিংবা
শাস্তির আশঙ্কা আছে তখন সে ভালো আচরণ করে। আর যখনই মনে করে পার পেয়ে যাবে, অমনি সব সংযম ভেঙে যায়। এ স্তরের মানুষ মানেই যে প্রকাশ্য অপরাধী বা
চিহ্নিত দুষ্ট এমন নয়। তাদের অনেকেই সামাজিকভাবে সফল, এমনকি
বাহ্যিকভাবে খুব ধার্মিকও হতে পারে। তারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, দানও করে; কিন্তু সবকিছুই যেন লেনদেনের হিসাব। তারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ঈবাদত করে যান্নাত পাওয়ার আশায় বা যাহান্নামের ভয়ে;
মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি প্রকৃত
ভালোবাসা থেকে নয়। তারা মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহারও করে তখনই, যখন
তাতে নিজেদের কোনো লাভ হয়। যেন ধর্মচর্চাকেই তারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনার সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি বানিয়ে ফেলেছে, আমি এটা করলাম,
আপনি আমাকে ওটা দিন। এখানে ভেতরকার কোনো প্রকৃত রূপান্তর ঘটছে না; কেবল
পুরস্কার ও শাস্তিভিত্তিক আচরণ-সংশোধন চলছে।
এই স্তরের সবচেয়ে
বড় বৈশিষ্ট্য হলোঃ নিজের ভেতরের প্রক্রিয়াগুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতনতা। মানুষটি জানেই না, সে যা করছে কেন তা করতেছে। সে প্রতিক্রিয়াশীল, স্বয়ংক্রিয়, যান্ত্রিক। কেউ অপমান করল তৎক্ষণাৎ রাগে বিস্ফোরিত হলো; উদ্দীপনা আর প্রতিক্রিয়ার মাঝে কোনো বিরতি নেই। কোনো আকাঙ্ক্ষা জাগল তা তার জন্য সত্যিই
কল্যাণকর কি না তা যাচাই না করেই ছুটল তার পেছনে। যেন ইচ্ছা-তাড়নার সুতোয় বাঁধা এক পুতুল, কিন্তু সে নিজেই ভাবছে আমি তো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।
এ স্তরের
ট্র্যাজেডি হলোঃ এখানকার মানুষ জানেই না যে সে বন্দী। সে নিজের কামনাকেই নিজের আসল কণ্ঠ মনে করে। নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোকে ন্যায্য বলে ধরে নেয়। আনন্দের পেছনে ছোটা আর কষ্ট এড়িয়ে চলাকেই সে
প্রজ্ঞা ভাবতে থাকে। সে নফছের সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে যায় যে, তাকে
আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করার সামর্থ্য আর থাকে না। এই স্তর ভাঙতে হলে প্রয়োজন এক ধাক্কা এক সংকট, এক ক্ষতি, এমন কোনো মুহূর্ত, যখন মানুষ হঠাৎ নিজেকে স্পষ্টভাবে দেখতে পায় এবং যা দেখে তাতে শিউরে ওঠে।
দ্বিতীয় স্তরঃ
নফছে লাওয়ামাহ নিজেকে তিরস্কারকারী নফছ। এটাই জাগরণের স্তর। যে নফছ অন্যায় করার পর মানুষের হৃদয়ে অনুশোচনার উদ্রেক করে। আবার গুনাহে লিপ্ত হয় আবার লজ্জিত হয়,মোট কথা সে গুনাহ ছাড়তেও চায় আবার জানায় বা অজানায় গুনাহে
লিপ্ত হয়েও পেরেশানীতে থাকে। যদি নফছ সম্পূর্ণ শান্ত হতে নাও পারে, কিন্তু
ঐ অবৈধ কামনা বাসনা গুলো প্রতিহত করতে থাকে এবং সেগুলোর মোকাবিলা করতে থাকে তখন
তাকে নফছে লাওয়ামা বলে আখ্যায়িত করা হয়। কেননা সে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আনুগত্য ও ঈবাদাতে ত্রুটি করার কারণে নিজকে তিরস্কার
ও ভর্ৎসনা করতে থাকে। কিন্তু যদি দেখা যায় যে নফছ তার অবৈধ কামনা বাসনা গুলোর সাথে মোকাবিলা করা
থেকে বিরত হয়ে গেছে এবং তার সাথে সন্ধি স্থাপন করছে, শয়তানের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে তাহলে সে এখনো নফছে আম্মারায়-ই
রয়েছে বলে বুঝতে হবে। তবে এ নফছ থেকেও পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে চিকিৎসা করতে হবে। পবিত্র আল-ক্বুরআনেও এ স্তরের উল্লেখ আছে
এইভাবেঃ (وَلَا أُقْسِمُ
بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ) আমি শপথ করছি সেই বিবেকবান নফছের, যে ভুল করলে নিজেকেই দোষারোপ করে। (ছুরাহ আল-ক্বিআমাহ ৭৫:২) নফছে আম্মারা থেকে যদি
বের হয়ে নফছ এই স্তরে আসতে পারে তাহলে সে ইছলামের বেসিক লেবেলে পৌঁছে যায়, অর্থাৎ সে গুনাহ করলেও তাকে মুছলিম হিসেবে মানা যায়। কেননা এই স্তরে মানুষ নিজের দিকে ফিরে তাকানোর
ক্ষমতা অর্জন করে এবং ভুল করলে প্রকৃত অপরাধবোধ অনুভব করে। সে আর আগের মতো সম্পূর্ণ অচেতন যন্ত্রমানব থাকে
না; সে এখন নিজের কাজকে দেখতেও পারে, বিচারও করতে পারে। এটি যেমন মুক্তির সূচনা, তেমনি যন্ত্রণারও
শুরু।
দ্বিতীয় স্তরের
মানুষ সারাক্ষণ ভেতরে এক দ্বন্দ্বে ভোগে। তার এক অংশ এখনো স্বার্থপর কামনার দিকে টানে, আর
আরেক অংশ সেটিকে ভুল বলে ধিক্কার দেয়। সে গুনাহ করে, তারপর
তীব্র অনুশোচনায় ভেঙে পড়ে। বদলে যাওয়ার অঙ্গীকার করে, তারপর সেই অঙ্গীকারই
ভঙ্গ করে। তাওবাহ করে, আর না করার প্রতিশ্রুতি দেয়, তারপরও
কয়েক দিন বা কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই আবার সেই একই ভুলে ফিরে যায়। এটি একই ব্যক্তির ভেতরে ভালো-মন্দের ক্লাসিক
সংঘর্ষ।
অধিকাংশ ধার্মিক
মানুষ আসলে এই স্তরেই আটকে থাকে। তারা আন্তরিক মুছলিম, সত্যিই ভালো হতে চায়; কিন্তু তাদের ভেতরে যেন এক গৃহযুদ্ধ চলছে। তারা রমজানে খাঁটি নিয়তে রোজা রাখে, হুমাজার প্রথম আয়াত শরীফ শুনে, মানে,
তারপর রমজান শেষ হতেই প্রতিবেশীর গীবত করে। নামাজে কিজবের আয়াত শরীফ শোনে ভয়ে কেঁদে ফেলে, আবার পরদিন দোকানে ক্রেতার সঙ্গে মিথ্যা বলে যায়। তারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সঙ্গে সত্যিকারের সংযোগের মুহূর্তও অনুভব করে,
কিন্তু তারপরই আবার গ্বাফলতি ও গুনাহর পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যায়।
এই স্তরের
মনস্তত্ত্ব হলো আত্মদোষারোপ। মানুষটি নিজের ভুলের জন্য নিজেকেই ক্রমাগত দোষ দেয়, লজ্জা পায়, মানসিকভাবে নিজেকে শাস্তি
দেয়। ফলে একটি চক্র তৈরি হয়ঃ
গুনাহ, অপরাধবোধ, তাওবা,
কিছুদিনের উন্নতি, আবার পতন, তারপর আরো বেশি অপরাধবোধ। অনেকে এই সংগ্রামকেই আত্মিক অগ্রগতি ভেবে বসে। তারা ভাবে, গুনাহ
করে কষ্ট পাচ্ছে অতএব তারা এগোচ্ছে। অথচ প্রকৃত পরিবর্তন ছাড়া কেবল খারাপ লাগা মানে হচ্ছে আত্ম-নির্যাতনের আবেগী
ঘূর্ণিপাকেই ঘোরা।
এই দ্বিতীয়
স্তরের অন্যতম ফাঁদ হলো এই আত্মদোষারোপই একসময় আরামদায়ক পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। “আমি তো গুনাহগার, চেষ্টা
করি, আবার ব্যর্থ হই, তবু অন্তত চেষ্টা
তো করছি” এমন ভাবনার মধ্যেও এক সূক্ষ্ম অহংবোধ রয়েছে। মানুষটি পতন ও তাওবার এই চক্রের প্রতিই আসক্ত
হয়ে পড়ে, কারণ এতে সে একধরনের আধ্যাত্মিক নাটকের
নায়ক হয়ে থাকতে পারে। প্রকৃতরূপে বদলে যেতেও সে ভীত হয়ে পড়ে কারণ সত্যিই বদলে গেলে তবে সে কে হবে? তার পরিচিত ব্যর্থতা, অপরাধবোধ আর
আত্মদ্বন্দ্ব ছাড়া সে নিজের সত্তাকে কীভাবে চিনবে?
এই স্তর ভাঙতে
হলে নফছের সঙ্গে যুদ্ধ করা থেকে সরে এসে তাকে বোঝার দিকে যেতে হবে। তুমি যেটির সঙ্গে একাত্ম, সেটিকে অতিক্রম করতে পারবে না। যতক্ষণ তুমি ভাবছ “আমি এমন এক মানুষ, যে কামনার সঙ্গে লড়ছি”
ততক্ষণ তুমি সেই লড়াইয়ের মধ্যেই আটকে থাকবে। তোমাকে এমন সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তুমি বুঝতে পারো কামনাও নফছেরই এক ছ্বিফাত, আবার যে সত্তা কামনাকে বিচার করছে, সেও নফছেরই আরেক
ছ্বিফাত। আর তুমি হচ্ছো সেই চেতনা, যে এই দুটোকেই প্রত্যক্ষ করছে। এই “সাক্ষীস্বরূপ
সচেতনতা’ই তৃতীয় স্তরের দরজা খুলে দেয় এক সময়।
তৃতীয় স্তরঃ নফছে
মুলহিমাহ অনুপ্রাণিত নফছ। এখানে এসে অন্তর্দ্বন্দ্বের লাগাতার কোলাহল কিছুটা স্তিমিত হতে শুরু করে। মানুষ প্রকৃত কল্যাণ আর আপাত কল্যাণ, এ দুটির মাঝে পার্থক্য করার ক্ষমতা অর্জন করে। পবিত্র আল-ক্বুরআনে এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন, এ স্তরেই অন্তর্দৃষ্টি জেগে ওঠে; মানুষ
এমন এক গভীর উৎস থেকে পথনির্দেশ পেতে শুরু করে, যা তার
শর্তবদ্ধ মানসিকতার চেয়েও গভীর। যে পরিশুদ্ধ নফছ সর্বদা মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনার পক্ষ থেকে “ইলহাম” দ্বারা
পরিচালিত হয়। যে নফছ আপন ইচ্ছায় কোন কর্মই করে না তাকে “নফছে
মুলহিমাহ” বলে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রত্যক্ষ বাণী
দ্বারা তার প্রতিটি কর্ম-কান্ড পরিচালিত হয়। এই পর্যায়ের নফছ পাপ পুণ্যের ঊর্ধ্বে চলে যায়। কারণ যা আদিষ্ট হয় তাই সে করে, মানবীয় কোন ইচ্ছা সেখানে থাকে না। এর ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি আল-ক্বুরআনে এইভাবেই বলেছেনঃ (وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا، فَأَلْهَمَهَا
فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا) আর ক্বছম নফছের এবং যিনি তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন উনার, অতঃপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাকে ইলহাম
করেছেন গুনাহের (নার) ও তাক্বওয়ার (নূর) সম্পর্কে। (ছুরাহ আশ-শামছ ৯১:৭-৮) একারণেই এই স্তরের মানুষ
এতটুকু আত্মসংযম অর্জন করে যে তাকে আর সারাক্ষণ কামনার সঙ্গে হাতাহাতি করতে হয় না। কামনা আসে, কিন্তু
তা জাগার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করে ফেলার মধ্যে একটি ফাঁক তৈরি হয়। সে রাগ অনুভব করতে পারে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রাগের বশবর্তী হয়ে পড়ে না। আকর্ষণ অনুভব করে, কিন্তু লালসার দাস হয়ে যায় না। ভয় আসে, কিন্তু
তাতে পঙ্গু হয়ে পড়ে না। নফছ এখনো আছে, এখনো উদ্দীপনা তৈরি করছে;
তবে আচরণের উপর তার আর নিঃশর্ত কর্তৃত্ব নেই।
এ স্তরের সবচেয়ে
বড় পরিবর্তন হলো, মানুষ বুঝতে শেখে, কামনার বিরুদ্ধে কেবল শক্তি প্রয়োগ করলে অনেক সময় তা আরো প্রবল হয়ে ওঠে;
কিন্তু তাকে বুঝতে শুরু করলে তা অনেক সময় নিজেই গলে যায়। যেমন, নিষিদ্ধ
কোনো কিছু খাওয়ার প্রবল তাড়নার সঙ্গে লড়াই না করে সে জিজ্ঞেস করে এটা আসলে কী?
সত্যিকারের ক্ষুধা, নাকি ভেতরের কোনো শূন্যতা,
যা নিজেকে ভরাতে চাইছে? কামনার দিকে কৌতূহল
নিয়ে তাকালে, বিচারক দৃষ্টিতে নয়, বরং
বোঝার দৃষ্টিতে তাকালে অনেক সময় দেখা যায়, কামনাটি নিজেই
মুছে যাচ্ছে। কারণ তার আসল টান বস্তুটির জন্য ছিল না; ছিল
অন্তরের এক অমীমাংসিত অবস্থার সমাধান খোঁজার জন্য।
এই অনুপ্রাণিত
নফছ এমন নির্দেশনাও পায়, যা যুক্তিবাদী মনকে পাশ কাটিয়ে
সরাসরি অন্তরে এসে পৌঁছায়। তুমি হয়তো একটি ব্যবসায়িক চুক্তিতে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলে, হঠাৎ বুকের ভেতর এক স্পষ্ট “না” অনুভব করলে, যদিও তার পক্ষে কোনো যৌক্তিক কারণ তখনও
তোমার জানা ছিল না। পরে দেখা গেল, চুক্তিটি ছিল প্রতারণামূলক। তুমি হয়তো কোনো অপরিচিত মানুষকে সাহায্য করতে
আকৃষ্ট হলে, অথচ তার কোনো বাহ্যিক কারণ ছিল
না; পরে বোঝা গেল, ঠিক সেই মুহূর্তে
তার ঠিক সেই সাহায্যটিই প্রয়োজন ছিল, যা তুমি দিতে পারতে। এটি অলৌকিক কিছু নয়; বরং তোমার চেতনা এমন এক তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে,
যেখানে সীমাবদ্ধ বুদ্ধি একা পৌঁছাতে পারে না।
এ স্তরের মানুষ
নিয়মিতভাবে অর্থবহ কাকতালীয়তার স্বাদ পেতে থাকে। কারো কথা মনে হলো, কিছুক্ষণ পরই সে যোগাযোগ করল। কোনো বইয়ের প্রয়োজন হলো, অচিরেই সেটি সামনে এসে গেল। কোনো প্রশ্ন জাগল, আর তার উত্তর মিলে গেল পাশের কারো কথোপকথন থেকে। যখন কেউ কেউ নফছে লাওয়ামায় বাস্তবেই উন্নীত হয়, তখন চেতনা অহমিকেন্দ্রিক ইচ্ছার বদলে ঐশী ইচ্ছার সঙ্গে
সামঞ্জস্যে আসে, তখন বিশ্বজগৎ-ও যেন তার প্রতি সাড়া দিতে
শুরু করে। তুমি যখন বাস্তবতাকে
নিজের কামনার ছাঁচে জোর করে ঢোকাতে চাওয়া বন্ধ করো, তখন
বাস্তবতাই তোমার প্রকৃত প্রয়োজনের চারপাশে নিজেকে সংগঠিত করতে শুরু করে।
তবে তৃতীয় স্তরের
বিপদও আছে আধ্যাত্মিক অহং। তুমি দ্বিতীয় স্তরের যুদ্ধ অতিক্রম করেছো, অন্তর্দৃষ্টি
পাচ্ছো, জীবন কিছুটা সহজতর ও সুরেলা মনে হচ্ছে, এমন অবস্থায় মনে হতেই পারে, “আমি তো পৌঁছে গেছি!”
অনেক অনুসন্ধানী ঠিক এই স্তরেই স্থায়ী ক্যাম্প গেড়ে বসে। তারা অনুপ্রেরণার উপহারগুলো উপভোগ করে, কিন্তু উচ্চতর স্তরগুলোর জন্য যে গভীর অহংমৃত্যু দরকার,
তা থেকে পিছিয়ে থাকে। তৃতীয় স্তর আরামদায়ক; কিন্তু চতুর্থ থেকে সপ্তম স্তর
পর্যন্ত উঠতে হলে অনেক বেশি সমর্পণ তাছলিমিয়াত দরকার।
চতুর্থ স্তরঃ
নফছে মুত্বমাইন্নাহ প্রশান্ত নফছ। নফছে মুত্বমাইন্নাহ হলো মানুষের ঐ নফছ যা ক্বলবের নূরে এমনিভাবে নূরানী হয় যে, যাবতীয় মন্দ স্বভাব ঐটা থেকে দূরীভূত হয়ে যায় এবং যাবতীয়
সচ্চরিত্রের দ্বারা চরিত্রবান হয়ে যায়। যখন নফছ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমের অধীনে সম্পূর্ণ শান্ত ও সুদৃঢ় হয়ে যায়
এবং যাবতীয় কু-রিপুর আক্রমণে সৃষ্ট দৈন্য-দশা ও দুর্ভাবনা থেকে মুক্ত এবং পবিত্র
হয়ে যায় তখন তাকে নফছে মুত্বমাইন্নাহ নামে আখ্যায়িত করা হয়। এটি নফছের প্রথম সেই স্তর, যাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা আল-ক্বুরআনে
স্পষ্টভাবে প্রশংসা করেছেন, নফছের এ স্তরেই মানুষ প্রকৃত
অন্তঃশান্তি লাভ করে। এটি কামনা দমন করার শান্তি নয়, যুদ্ধ
জিতে নেওয়ার শান্তিও নয়; বরং সামঞ্জস্যের শান্তি। যে নফছ সকল কালিমা থেকে মুক্ত এবং যাবতীয় মহৎ
ভাবনায় পরিতৃপ্ত। যার কোন ভয় ও
দুঃশ্চিন্তা থাকেনা। মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি এই নফছ
সন্তুষ্ট থাকে সকল হালতে আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা এইসব নফছের
উপর সব সময় রাজি-খুশী থাকেন। এই প্রকৃতির নফছের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা’য়ালা
বলেনঃ (يَا
أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ، ارْجِعِي إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةً
مَرْضِيَّةً، فَادْخُلِي فِي عِبَادِي، وَادْخُلِي جَنَّتِي)
হে নফছে মুত্বমাইন্নাহ, তুমি তোমার রব তা’য়ালা উনার নিকট ফিরে আসো সন্তুষ্টচিত্তে ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত হয়ে। অতঃপর আমার (নেক) বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে
যাও। আর প্রবেশ করো আমার
(অনন্ত) যান্নাতে। (ছুরাহ আল-ফাযরঃ
৮৯/২৭-৩০)
এখানে নফছ এতটাই
শৃঙ্খলিত হয়ে গেছে যে, স্বাভাবিকভাবেই সে তা-ই চায়,
যা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনি চান। কর্তব্য আর আকাঙ্ক্ষার মাঝে আর কোনো বিচ্ছেদ
থাকে না। চতুর্থ স্তরের মানুষকে
জিকির>নামাজ>জাকাত>রোজা>হাজ্জের জন্য নিজের সঙ্গে লড়তে হয় না;
প্রত্যেক ফরজ ঈবাদাতই তার কাঙ্ক্ষিত অবস্থান হয়ে যায়। ধৈর্য্য ধরতে নিজেকে জোর করতে হয় না; ধৈর্য্য তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে। দান করতে বাধ্য করতে হয় না; উদারতা তার ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রবাহিত হয়। ইছলামের আদেশগুলো আর বাইরের চাপ হিসেবে অনুভূত
হয় না; সেগুলো তার হৃদয়ের অভ্যন্তরীণ প্রবণতায়
পরিণত হয়। শরী’য়তের বিধান আর হৃদয়ের ঝোঁক যেন একাকার হয়ে যায়।
প্রতিক্রিয়াশীল
নফছের মৃত্যু হয় এই স্তরে, আগের স্তরগুলোতে তুমি সারাক্ষণ
কোনো না কোনো প্রলোভন, উত্তেজনা বা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায়
আটকে থেকেছিলে। জীবন একদিকে ঠেলে, তুমি অন্যদিকে ঠেলে দাও। কিন্তু চতুর্থ স্তরে এসে এই প্রতিক্রিয়াশীলতা
শেষ হয়। ঘটনা ঘটে, আর তুমি তার উত্তর দাও; কিন্তু সেই
উত্তর অস্থির আবেগের ঘূর্ণি থেকে নয়, বরং গভীর শান্ত এক
কেন্দ্র থেকে আসে। কেউ তোমাকে অপমান করলে রাগের বিস্ফোরণ আসে না; বরং
পরিস্থিতিকে দক্ষতার সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে রকম
পরিষ্কার বোধ জেগে ওঠে। মূল্যবান কিছু হারালে আতঙ্ক নয়, বরং
ভরসা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ সামনে আসে।
এই প্রশান্ত নফছ
ঐশী গুণাবলিকে এত গভীরভাবে আত্মস্থ করে ফেলে যে, সেগুলো
তার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটে ওঠে। ধৈর্য্য আর আলাদা চেষ্টা নয়; এটাই তার মূল সত্তা। শোকর আর বাধ্যতামূলক অনুশীলন নয়; এটাই তার স্বাভাবিক দৃষ্টি। সে সবকিছুকেই উপহার হিসেবে দেখতে শুরু করে, কারণ সে আর অভিজ্ঞতাগুলোকে “আমি চাই”
আর “আমি চাই না” এভাবে
ভাগ করে না। যা আসছে, সেটাকেই সে মুহূর্তের প্রয়োজন বলে গ্রহণ করে, এবং সমত্ববোধ নিয়ে তার সম্মুখীন হয়।
তবে এখনো এটি “একটি সত্তা”। পরিশুদ্ধ, পরিমার্জিত, সুন্দর সত্তা, কিন্তু এখনো এক “আমি” আছে, যার বৈশিষ্ট্য আছে। এ স্তরের মানুষ বলতে পারে “আমি প্রশান্তিতে আছি।” এবং সেটি সত্যও। কিন্তু এখনো তো একজন “আমি” আছে, যে এ কথা
বলছে। উচ্চতর স্তরগুলো এসে এই
সূক্ষ্ম “আমি” বোধটিকেও গলিয়ে
দেবে। চতুর্থ স্তর হলো
ব্যক্তিগত আত্মার পরিপূর্ণতা; পঞ্চম স্তর হলো
ব্যক্তিসত্তার অতীতের এক গভীর বাস্তবে প্রবেশ।
পঞ্চম স্তরঃ নফছে
রদ্বিয়াহ সন্তুষ্ট নফছ। এ স্তরে এসে এক অসাধারণ রূপান্তর ঘটে। মানুষ নিজের জীবনে কী ঘটবে আর কী ঘটবে না এ নিয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রায়
হারিয়ে ফেলে। এটি ভাঙা বা নিষ্ক্রিয়
হয়ে যাওয়ার কারণে নয়; বরং এ গভীর উপলব্ধি থেকে যে,
মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনি যা নির্ধারণ করেন,
তা-ই তার নিজের পছন্দের চেয়ে উত্তম। পবিত্র আল-ক্বুরআনে এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন মহান
আল্লাহ তা’য়ালাঃ (ارْجِعِي إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةً
مَرْضِيَّةً) তোমার রব তা’য়ালা উনার নিকট ফিরে আসো সন্তুষ্টচিত্তে ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত
হয়ে। এটি নিছক “মেনে নেওয়া” নয়; বরং
সবকিছুর প্রতিই সক্রিয় সন্তুষ্টি এমনকি কঠিন ও বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর প্রতিও। এ স্তরের মানুষ ভয়াবহ কোনো সংবাদ পেলে, যেমনঃ “মরণব্যাধির ঘোষণা, অর্থনৈতিক ধস, বিশ্বাসঘাতকতা” তবুও
তার প্রতিক্রিয়া হয় আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। এটি ভান করা কৃতজ্ঞতা নয়, কিংবা আধ্যাত্মিকতার আড়ালে অনুভূতি দমন করাও নয়; বরং কষ্টের মধ্যেও ঐশী হিকমতের প্রতি প্রকৃত সন্তুষ্টি। সে সহজতার চেয়ে কঠিনতাকেই অনেক সময় বড় উপহার
হিসেবে দেখতে শুরু করে, কারণ কঠিনতা যে গতিতে আত্মিক
পরিশুদ্ধি ঘটায়, স্বাচ্ছন্দ্য তা পারে না। সে অসুস্থতায় যেমন মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি ছ্ববর করে, তেমনি
পরীক্ষায় পড়লেও অন্তর থেকে শুকর করে।
তবে এটিকে সেই
ভূয়া বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা যাবেনা, যেখানে
কেউ নিজের প্রকৃত অনুভূতি চেপে রেখে কৃত্রিমভাবে বলে, সব ঠিক
আছে। পঞ্চম স্তরে মানুষের
মানবিক অনুভূতি নিঃশেষ হয়ে যায় না। প্রিয়জন মারা গেলে কষ্ট হয়, শরীর আহত হলে
যন্ত্রণা লাগে, ক্ষতি হলে দুঃখও হয়। কিন্তু এই সব অনুভূতির গভীরে এক অটল সন্তুষ্টি
লুকিয়ে থাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নির্ধারিত
তাক্বদীরের প্রতি। অনুভূতিগুলো যেন আকাশে ভেসে যাওয়া মেঘ; কিন্তু
আকাশ নিজে পরিষ্কার ও প্রশান্ত থাকে।
এই স্তরে এসেই “আলহামদুলিল্লাহি য়া’লা কুল্লি হাল”
সব অবস্থায়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রশংসা
এ বাক্যটি নিছক মুখের শব্দ থাকে না; জীবন্ত বাস্তবতায় রূপ
নেয়। মানুষটি নিজেকে জোর করে
এ কথা বলে না; বরং সে সত্যি সত্যি এটাই অনুভব
করে। প্রতিটি মুহূর্ত, তার বিষয়বস্তু যেমনই হোক, সত্যিকারের
প্রশংসার সঙ্গে গ্রহণ করে। কারণ সে আপাত মঙ্গল-অমঙ্গলের আড়ালের ঐশী পরিপূর্ণতাকে স্পর্শ করতে শুরু করেছে।
এ স্তরের মানুষ
আর নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য বেশি দু’য়া করতে
চায় না। তার প্রার্থনা যেন
একটিতেই এসে ঠেকে, “হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আপনি যা চান তাই হোক। এটি উদাসীনতা নয়; বরং
ঐ বিশ্বাস যে, ঐশী ইচ্ছাই তার চূড়ান্ত যাত্রার জন্য
সর্বোত্তম জিনিসটি বেছে নেবেন, যদিও তার সীমিত বোধ অন্য কিছু
চাইতে পারে। যদি সে কোনো নির্দিষ্ট
চাওয়াও পেশ করে, তা খুব হালকাভাবে খেলাচ্ছলে,
এবং ঠিক বিপরীতটিও ঘটতে পারে এ সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ স্বীকার করে,
মাথায় রাখে।
পঞ্চম স্তরে হৃদয়
খাঁটি সোনার মতো নমনীয় হয়ে যায়; তাকে যেকোনো আকারে
গড়া যায়, কোনো ভেতরকার প্রতিরোধ ছাড়াই। মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনি স্বাচ্ছন্দ্য পাঠান, আর সে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে। কঠিনতা পাঠান তাও সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে। দান করেন, আবার
ফিরিয়েও নেন; দরজা খোলেন, আবার বন্ধও
করেন; মর্যাদা কেড়ে নেন, আবার বিনীতও
করেন, আর প্রতিটি অবস্থাতেই সে যেনো বলে, “আমার জ্ঞান যদি আপনার জ্ঞানের মতো হতো, তবে আমিও
এটাই বেছে নিতাম”।
তবে এখানে
সূক্ষ্ম আরেকটি বিপদ আছে, আধ্যাত্মিক বস্তুবাদ। কেউ ভাবতে পারে, কষ্টকে
যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারছি, দার্শনিকভাবে মেনে নিতে
পারছি, অতএব আমি বুঝি এ স্তরে পৌঁছে গেছি। কিন্তু তাক্বদীরের প্রতি সত্যিকারের সন্তুষ্টি
শুধু চিন্তায় নয়, শরীরেও প্রকাশ পায়। কঠিন সংবাদ শুনেও তোমার মুখ আলোকিত হয়ে ওঠে; পরীক্ষা এলে তোমার বুক সঙ্কুচিত না হয়ে প্রশস্ত হয়; প্রতিকূলতায় তোমার প্রাণশক্তি নিভে না গিয়ে বরং জেগে ওঠে। যদি তুমি কেবল অভিনয় করো, তোমার দেহ সেটা জানবে।
ষষ্ঠ স্তরঃ নফছে
মারদ্বিয়্যাহ এটা সেই নফছ, যে নফছকে স্বয়ং মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনিও সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেছেন। পঞ্চম স্তরে নফছ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি সন্তুষ্ট; আর ষষ্ঠ স্তরে
মহান আল্লাহ তা’য়ালা নফছের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। মানুষ এমনভাবে ঐশী ইচ্ছার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়
যে, সে যেনো নিখাদ এক মাধ্যম হয়ে ওঠে। তার কাজগুলো আর নিছক “তার নিজের কাজ” বলে মনে হয় না; যেন মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ইচ্ছাই তার মাধ্যমে
দুনিয়ায় কাজ করছে। পবিত্র আল-ক্বুরআনে এমন মানুষদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ) (এমন মানুষদের সম্পর্কেই বলা হয়েছে) মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, আর
তারাও উনার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। (ছুরাহ আল-মুযাদালাহ ৫৮/২২) এই স্তরের মানুষ আর ব্যক্তিগত এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে
না। সে কোনো আত্মিক অবস্থা
অর্জনের জন্য কাজ করে না, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি “কামানোর” হিসাবেও কাজ করে না, ছ্বওয়াব জমা করার মনোভাবেও নয়। তার অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ
স্বাভাবিকভাবেই তার ভেতর থেকে উদ্ভূত হয়, যেমন
একটি গাছ চেষ্টা না করেই ফল দেয়। তার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি শ্বাসই ঈবাদাতে রূপ নেয়। কারণ সে আলাদা করে “ঈবাদাত করার চেষ্টা” করছে না; বরং তার অস্তিত্বই ঈবাদাতে পরিণত হয়েছে।
ছ্বুফিয়ায়ে
কিরাম সাধারণত আবদালদের স্তরের সঙ্গে এই
নফছকে তুলনা করেছেন। সেই গোপন ওলিদের স্তর, যাদের উপস্থিতির মাধ্যমেই
পৃথিবী টিকে থাকে। তারা অনেক সময় খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন, কেউ
ছ্বুফী, কেউ এখনো ত্বলিবুল য়ী’লম,
কেউ রিক্সা চালক, কেউ দোকানদার, কেউ কৃষক, কেউ ফকিরের রূপে। কিন্তু তাদের চেতনা এতটাই নির্মল যে, তাদের মাধ্যমে ঐশী রহমত পৃথিবীতে প্রবাহিত হয়। তারা দু’য়া করলে
তার প্রভাব দেখা যায়। তারা পরামর্শ দিলে তাতে নববী অন্তর্দৃষ্টির ছাপ পাওয়া যায়। তারা শুধু উপস্থিত থাকলেই অনেক সমস্যা সহজ হয়ে
আসে। এ স্তরে মানুষ মহান
আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে একপ্রকার প্রত্যক্ষ
নিশ্চিততা অনুভব করে যে, তিনি তার প্রতি সন্তুষ্ট। এটি আবশ্যকভাবে শব্দ, দর্শন বা কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে আসে না; বরং
এমন এক অবিচল নিশ্চিততা হিসেবে আসে, যার ভিত্তি যুক্তি বা
বাহ্যিক প্রমাণ নয়। সে শুধু জানে আমি সঠিক পথে আছি, আমি
সামঞ্জস্যে আছি, আমি ধারণ করে রাখার মাক্বামে ফায়েজ হয়েছি। এই অন্তর্নিহিত নিশ্চিততাই তাকে এমন সব
পরীক্ষার মধ্যেও টিকিয়ে রাখে, যা নিম্নস্তরের
নফছের অধিকারী হলে অনেক আগেই তাকে ভেঙে ফেলত।
ষষ্ঠ স্তরের
বৈপরীত্য হলো, মানুষটি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে খুশি করার চেষ্টা করা ছেড়ে দিয়েছে, অথচ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনি তার প্রতি সন্তুষ্ট। কারণ “আমি
চেষ্টা করছি উনাকে সন্তুষ্ট করতে” এই ভাবনাতেই তো এখনো
দ্বৈততা আছেঃ একদিকে আমি, অন্যদিকে সেই সত্তা যাকে আমি
সন্তুষ্ট করতে চাই। কিন্তু ষষ্ঠ স্তরে এসে এই দ্বৈততা এতটাই ক্ষীণ হয়ে যায় যে, তোমার ইচ্ছা আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনার ইচ্ছা আলাদা করে চেনা দুষ্কর হয়ে পড়ে। তুমি তা-ই চাও, যা
তিনি চান; কারণ উনার চাওয়াই যেনো তোমার চাওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেকে
প্রকাশ করছে। এ স্তরের মানুষ সাধারণত নিজের অবস্থান আড়াল করেই রাখে। কারণ “ওলি”
বা “মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনার প্রিয় বান্দা” হিসেবে পরিচিতি পেলে অহং আবার সক্রিয় হয়ে
উঠতে পারে। তাই তারা সাধারণ পোশাক
পরে, সহজভাবে কথা বলে, এমন
সব সমাবেশও এড়িয়ে চলে যেখানে মানুষ তাদের আধ্যাত্মিক তারকায় পরিণত করতে পারে। তারা অদৃশ্য মাধ্যম হয়েই থাকতে পছন্দ করে; সম্মান, স্বীকৃতি, খ্যাতি, কিছুতেই তাদের আগ্রহ থাকে না। তাদের একমাত্র চিন্তা থাকে, প্রত্যেক মুহূর্তে আহাদী ক্যাবলে কানেক্টেড থাকা।
সপ্তম স্তরঃ নফছে
কামিলা পূর্ণতা-প্রাপ্ত নফছ। এখানে এসে নফছের যাত্রা শেষ হয়, তখন
কেবল রহস্য শুরু হয়। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, “পূর্ণতা” মানে সমাপ্ত বা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ, এমন
পূর্ণ সমর্পণ, যাতে নফছ নিজেই ঐশী নূরের জন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে
পরিণত হয়। এ স্তরের মানুষ সেই
সত্তা, যে আল-ইনছানুল কামিল বা পূর্ণ মানুষ;
এমন এক সম্পূর্ণ আয়না, যাতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সব নাম ও গুণ কোনো বিকৃতি ছাড়াই প্রতিফলিত হয়। তবে আমি এটাকে নফছে রহমানিয়াও বলি।
রহমান আল্লাহ তা’য়ালা উনার একটি বিশেষ গুণবাচক নাম। অর্থঃ দয়া, করুণা
ইত্যাদি। একজন ছ্বুফী এই পর্যায়ে
এসে পূর্ণ মুক্তি লাভ করেন এবং পরমাত্মার স্বভাব লাভ করেন অর্থাৎ সর্বদা
বাকাবিল্লাহ-এর স্তরে অবস্থান করেন এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জাতের সাথে মিশে গিয়ে পূর্ণ আউলিয়াত্ব অর্জন করেন। এই স্তরের মানুষদেরকে লক্ষ্য করেই আমার মতে
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেনঃ (صِبۡغَۃَ اللّٰهِ ۚ وَ مَنۡ اَحۡسَنُ مِنَ
اللّٰهِ صِبۡغَۃً ۫ وَّ نَحۡنُ لَهٗ عٰبِدُوۡنَ)
এটাই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনারই রঙ; আর রঙের দিক থেকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার চেয়ে
উত্তম আর কে আছে? (আর যারা এই রঙ হাক্কীক্বীভাবে গ্রহণ করে
তারা বলে) আর আমরা তো কেবল উনারই ঈবাদাতকারী। (ছুরাহ আল-বাক্বারহ ২/১৩৮) উক্ত আয়াত শরীফের মূল
ভাষ্য হলেনঃ (تَخَلَّقُوا
بِأَخْلَاقِ اللَّهِ) তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার গুনে গুণান্নীত হও। অর্থাৎ অবশেষে পরিশুদ্ধতার শেষ পরিণতি মহান
আল্লাহ তা’য়ালা উনার জাতে ফানা হয়ে যাওয়া। এই ফানা ফিল্লাহ-র জগতে সকল বহু এক-এ পরিণত হয়ে
যায়। একজন আধ্যাত্মিক সাধকের
জন্যে সাধনার পথ পরিক্রমায় শেষ ও চুড়ান্ত সন্তুষ্টির মাক্বাম হচ্ছে এই নফছে
রহমানির ফল। আমিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে
নফছের কু-প্রবৃত্তিমূলক কামনা বাসনার পরিপূর্ণ বিরোধীতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসে
পরিশুদ্ধতার শেষ গন্তব্য স্থল হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার রঙে রঙ্গিন হয়ে যাওয়া। মানুষ যখন শতভাগ গ্বইরুল্লাহ এর রঙ ছেড়ে মহান
আল্লাহ তা’য়ালা উনার রঙে রঞ্জিত হয়, তখন সেখানে আর সে থাকেনা, আমরা একটি ওয়ালে রঙ দিয়ে
কি করি? ওয়াল কে কেবল রাঙাই? না বরং
ওয়ালের ত্রুটি বিচ্যুতিকেও নাই করে দেই। এ স্তরে এসে “আমি
কে?” এই প্রশ্নের এমন উত্তর মেলে, যাতে
প্রশ্নটিই গলে যায়। মানুষ নিজেকে জানতে পারে এমন এক সাময়িক রূপ হিসেবে, যার মাধ্যমে শাশ্বত চেতনা নিজেকে অভিজ্ঞ করছে। সে এক অর্থে কিছুই নয়, তার নিজস্ব স্বাধীন অস্তিত্ব নেই, স্থায়ী
স্বতন্ত্র পরিচয় নেই, পৃথক ইচ্ছাও নেই। আবার অন্য অর্থে সে সবকিছু সমগ্র
বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যেন এক বিন্দু সচেতনতায় সঙ্কুচিত হয়ে তার মধ্যে প্রকাশিত। সে এমন এক ঢেউ, যে
নিজের সাগরকে চিনে ফেলেছে; এমন এক রশ্মি, যে নিজের সূর্যকে জেনে গেছে; এমন এক শব্দ, যে বুঝে ফেলেছে সে আসলে সেই নিঃশ্বাসের প্রকাশ, যে
তাকে উচ্চারণ করছে। এ স্তরের নফছের অধিকারী মানুষকে সাধারণত কোনো শ্রেণিবিভাগে ধরা যায় না। সে কি বিনয়ী, না
আত্মবিশ্বাসী? দুটোই, আবার কোনো একটিও
নয়। সে কি আনন্দিত, না দুঃখিত? সে সব আবেগকেই ধারণ করতে
পারে, কিন্তু কোনো একটিতে আবদ্ধ নয়। সে কি সক্রিয়, না
নিষ্ক্রিয়? সে ঐশী ইচ্ছার সঙ্গে চলে; তাই
কখনো প্রবল কর্মোদ্যম, কখনো সম্পূর্ণ স্থিরতা। তাকে নির্দিষ্ট কোনো ছাঁচে ধরতে যাওয়া যেন
হাতের মুঠোয় পানি ধরে রাখতে চাওয়ার মতো। সে তরল, আকারহীন, মুহূর্তের প্রয়োজন অনুযায়ী সাড়া দেয়; কোনো জমাট
ব্যক্তিগত ধাঁচে আবদ্ধ থাকে না।
প্রতিটি যুগে
পূর্ণভাবে এ স্তরকে ধারণকারী নফছের অধিকারী কেবল একজনই হোন। তবে অন্যরা ক্ষণিকের জন্য এই স্তরের স্পর্শ
পেতে পারে, বা এর কিছু দিক ধারণ করতে পারে। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া
ছাল্লাম ছিলেন এই নফছের চূড়ান্ত অধিকারী, মানুষ কী
আর তা হতে পারে, তিনিই পূর্ণতম ও চূড়ান্ত প্রকাশ। অন্য যে-ই সপ্তম স্তরের ছোঁয়া পায়, সে মূলত মুহাম্মাদী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া
ছাল্লাম হাক্বীক্বতে শরিক হয়ে তবেই তা পায়; অর্থাৎ সময়কে
অতিক্রম করে বিস্তৃত সেই পূর্ণমানবের দেহের একেকটি কোষের মতো হয়ে। এ স্তরে অলৌকিকতা আর আলাদা ঘটনা মনে হয় না। তা এ কারণে নয় যে, ব্যক্তি নিজে কোনো স্বতন্ত্র শক্তির অধিকারী হয়ে গেছে;
বরং বাস্তবতা এমন এক চেতনার প্রতি সাড়া দেয়, যা
তার নিজ উৎসের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যে আছে। সে বৃষ্টির জন্য দু’য়া করে, আর বৃষ্টি হয়। কিন্তু সে কোনো জাদু করছে না; বরং বাস্তবতার অন্তর্লীন প্রস্তুতিকে পড়ে নিয়ে তার প্রকাশে
ভাষা দিচ্ছে। সে ঘটনার আগেই কিছু কিছু বিষয় অনুভব করতে পারে, কারণ
সে এমন স্তরে সংযুক্ত, যেখানে সময়ের বিচ্ছিন্ন মুহূর্তগুলো
একত্রে উন্মুক্ত। সে উপস্থিতির মাধ্যমেই শিফা দেয়, কারণ
তার চেতনায় ঐশী রহমত নিবিড়ভাবে বহন হয়ে আসে।
তবে সপ্তম স্তরের
সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো সম্পূর্ণ স্বাভাবিকতা। সে সব আধ্যাত্মিক অবস্থান ও মর্যাদা অতিক্রম
করে আবার একেবারে সাধারণ জীবনে ফিরে আসে। ক্ষুধা পেলে খায়, ক্লান্ত হলে ঘুমায়, প্রয়োজন হলে কাজ করে, সময় হলে বিশ্রাম নেয়। সে “জাগ্রত”
থাকার চেষ্টা করে না, আলাদা কোনো বিশেষ
সচেতনতা ধরে রাখার চেষ্টাও করে না। কারণ সে উপলব্ধি করেছে “নূরপ্রাপ্তি” আর “অজ্ঞতা” দুটোই ধারণামাত্র;
আর তার বাস্তবতা এই ধারণাগুলোরও অতীত। তাই সে মুহূর্তে মুহূর্তে নতুন, নির্দোষ, মুক্তভাবে বেঁচে থাকে।
তবে মনে রাখতে
হবে, সপ্তম স্তর চেষ্টার দ্বারা অর্জন করা যায়
না। কারণ “চেষ্টা” মানেই তো কেউ একজন কোনো লক্ষ্য
অর্জনের জন্য চেষ্টা করছে। কিন্তু সপ্তম স্তর সেই অবশিষ্ট বাস্তবতা, যা সব
চেষ্টা থেমে গেলে, সব অনুসন্ধান নিভে গেলে, সব “হয়ে ওঠার প্রয়াস” শেষ হয়ে
গেলে অবশিষ্ট থাকে। আগের স্তরগুলোর মাধ্যমে তুমি নিজেকে প্রস্তুত করতে পারো বাধাগুলো সরাতে পারো, চেতনাকে পরিশুদ্ধ করতে পারো। কিন্তু চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটে রহমতে, ইচ্ছাশক্তিতে নয়। একদিন হঠাৎ তুমি বুঝতে পারবে, তুমি আর কোনো কিছুর দিকে উঠছ না; বরং যা
খোঁজছিলে, তুমি সবসময়ই তাই ছিলে।
এখন প্রশ্নঃ তুমি
কোন স্তরে আছো, তা বুঝবে কীভাবে? তোমাকে কিছু নির্দিষ্ট আত্মপরীক্ষা করলেই বুঝতে পারবেঃ
প্রথমত, তোমার ঈবাদাতের প্রেরণা কী? যদি
যাহান্নামের ভয় বা যান্নাতের আকাঙ্ক্ষা না হয় তবে তুমি প্রথম স্তরে। যদি নিজের ব্যর্থতা নিয়ে অপরাধবোধ হয়, তবে দ্বিতীয় স্তরে। যদি পাপ বুঝে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টায়
থাকো, তবে তৃতীয় স্তরে। যদি ঈবাদাত তোমার স্বাভাবিক প্রবণতায় পরিণত হয়ে
যায়, তবে চতুর্থ স্তরে। আর যদি সবকিছুই ঈবাদাত মনে হতে থাকে তবে তুমি
পঞ্চম বা তারও ঊর্ধ্বে।
দ্বিতীয়ত, কষ্টের প্রতি তোমার প্রতিক্রিয়া কী? যদি
তুমি বিদ্রোহ করো, ভেঙে পড়ো তবে প্রথম বা দ্বিতীয় স্তর। যদি ধৈর্য ধরো, কিন্তু
ভেতরে ক্ষোভ থাকে তবে তৃতীয় স্তর। যদি সত্যিকারের শান্তি থাকে তবে চতুর্থ স্তর। যদি কষ্টের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জাগে তবে পঞ্চম
স্তর। আর যদি সহজতা ও কঠিনতাকে
আলাদা করে উপহার হিসেবে দেখাই বন্ধ হয়ে যায় দুটোকেই সমান দান মনে হয় তবে ষষ্ঠ বা
সপ্তম স্তরের স্পর্শ আছে।
তৃতীয়ত, তোমার আকাঙ্ক্ষাগুলোর সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কেমন? যদি সেগুলো তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করে, প্রথম স্তর। যদি সারাক্ষণ সেগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়, দ্বিতীয় স্তর। যদি তুমি সেগুলোকে দেখতে পারো, অথচ
সবসময় তাদের অনুসরণ না-ও করো, তৃতীয় স্তর। যদি আকাঙ্ক্ষাগুলো পরিশুদ্ধ হয়ে কল্যাণের সঙ্গে
সামঞ্জস্যে আসে, চতুর্থ স্তর। আর যদি “কামনা”
আর “শৃঙ্খলা” এই
পার্থক্যটিই ক্রমে গলে যায়, তবে পঞ্চম বা তারও ঊর্ধ্বে।
চতুর্থত, তুমি কত ঘনঘন নিজের কথাই ভাবো? যদি
তোমার মন সারাক্ষণ নিজের প্রয়োজন, উদ্বেগ, ভাবমূর্তি ও ব্যক্তিগত গল্প নিয়েই ব্যস্ত থাকে তবে তুমি নিম্নস্তরগুলোতে
আছো। যদি আত্মকেন্দ্রিকতার
পরিমাণ অনেক কমে যায়, আর তুমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজের
বাইরে কোনো বৃহত্তর বাস্তবতায় ডুবে থাকতে পারো তবে তুমি চতুর্থ বা পঞ্চম স্তরের
দিকে এগোচ্ছ। আর যদি “তুমি তোমাকে তোমার মধ্যে খুঁজে
না পাও” তবে তুমি ষষ্ঠ বা সপ্তম স্তরের সীমানা ছুঁয়ে আছো মনে
করতে পারো।
তবে এই সাত স্তর
মানে এমন নয় যে, তুমি একটি স্তর একবার পেরিয়ে
গেলে চিরতরে পরের স্তরে উঠে গেলে আর নিচে নামবেনা। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ একইসঙ্গে ভিন্ন
ভিন্ন স্তর থেকে কাজ করতে পারে। আধ্যাত্মিক বিষয়ে হয়তো তোমার নফছ চতুর্থ স্তরে আছে, কিন্তু ব্যবসায়িক আচরণে এখনো দ্বিতীয় স্তরে। শারীরিক কষ্ট সহ্য করার ক্ষেত্রে হয়তো পঞ্চম
স্তরের ছাপ আছে, কিন্তু অহমে আঘাত লাগলে সঙ্গে
সঙ্গে প্রথম স্তরে নেমে যাও। কাজ হলো নিজ সত্তার প্রতিটি ক্ষেত্রকে ধীরে ধীরে উচ্চতর মানে উন্নীত করা।
এই স্তরগুলোর
পরিচয় দানের মূল উদ্দেশ্য আত্মবিচারের জন্য, আত্মদম্ভ
বা অন্যকে হেয় করার জন্য নয়। প্রথম স্তরের কেউ “খারাপ” নয়,
আর সপ্তম স্তরের কেউ “শ্রেষ্ঠ” বলেই সব কথা শেষ হয়ে যায় না। প্রতিটি স্তরেরই প্রয়োজন আছে; প্রতিটি স্তর এমন
কিছু শেখায়, যা সেই স্তর পার না হলে শেখা সম্ভব নয়। যেমন স্কুলের শ্রেণি ডিঙিয়ে দিলে পাঠ বোঝা যায়
না, তেমনই এই পথেও স্তর এড়িয়ে যাওয়ার শর্টকাট
নেই। বিশ্বজগৎ তোমাকে ঠিক সেই
স্তরেই রেখেছে, যা তোমার বর্তমান শিক্ষার জন্য
প্রয়োজনীয়। আসল বিষয় হলো সৎ
আত্মসমীক্ষা এবং প্রকৃত আগ্রহ। অতএব, তুমি যেখানে আছো সেটিকে স্পষ্টভাবে দেখো। নিজের বাস্তব অবস্থার চেয়ে বেশি উন্নত ভেবে বসো
না ওটাই আধ্যাত্মিক অহং। আবার নিম্নস্তরে আছ বলে হতাশও হয়ো না, সবাই
সেখান থেকেই শুরু করেছে। বরং নিজের বর্তমান অবস্থানটি পরিষ্কার করে বোঝো, কী
তোমাকে সেখানে আটকে রেখেছে তা চিনে নাও, তারপর পরের স্তরের
দিকে একটিমাত্র সত্যিকারের পদক্ষেপ নাও। সেই এক ধাপ তুলতে বহু বছরও লেগে যেতে পারে তাতে
অসুবিধা নেই। কারণ এ যাত্রাতেই
গন্তব্য নিহিত।
এই সাতটি স্তর
আসলে কিন্তু নফছের সাতটি আলাদা সত্তা নয়; বরং
তুমি আসলে কে, তা ভুলে যাওয়ার ও মনে করার সাতটি মাত্রা। প্রথম স্তরে তুমি পুরোপুরি ভুলে গিয়েছ। সপ্তম স্তরে পুরোপুরি স্মরণে ফিরে এসেছো। আর মাঝের প্রতিটি স্তর হলো বিচ্ছিন্নতার স্বপ্ন
থেকে ধীরে ধীরে জেগে ওঠা, এবং সেই সত্যকে চিনে ফেলা,
যা তুমি সবসময়ই ছিলে।
নফছ যতক্ষণ
কু-রিপুর তাড়নামুক্ত থাকে, ততক্ষণ সে থাকে রূহের প্রতি
অমনযোগী। অর্থাৎ নফছের মনোযোগ
ক্বলবের ভিতরের দিকে না হয়ে তা থাকে বহির্মুখী। এ অবস্থায় নফছ স্বেচ্ছাচারী হয়। তখন রূহের কোন নির্দেশ তাঁর উপরে প্রভাব
বিস্তার করতে পারে না। সাধনার দ্বারা এরূপ স্বেচ্ছাচারী নফছ যখন রূহের প্রতি মনোযোগী হয়, তখন তার খেয়াল থাকে ক্বলবের ভিতরের দিকে। ফলে ক্বলবের প্রথম স্তরে অবস্থিত কু-রিপু সমূহ
এই নফছের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, তখন সে
শয়তানের কুমন্ত্রণা মুক্ত হয়।
নফছ এরূপ অবস্থার
প্রতি ঈঙ্গিত করেই রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম
বলেছিলেনঃ তোমাদের সাথে যেমন শয়তান আছে, আমার
সাথেও তেমনি লাগানো ছিলো কিন্তু আমার শয়তান মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনার দয়ায় মুছলমান হয়েছে, তোমাদের শয়তান এখনও মুছলমান হয়নি। অর্থাৎ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া
আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নফছের উপর উনার রূহের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল, রূহের ইচ্ছানুযায়ী তিনি নফছকে পরিচালিত করেছেন। যদি কোন মানুষ জিহাদুন নাফছ দ্বারা নিজের নফছের
বিপদগামী অবস্থা অনুধাবন করে, তাকে সংশোধন করে
রূহের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতো; তাহলে রূহের সহায়তায় সেই নফছ
মহান রব তা’য়ালা উনার সন্ধান লাভ করতো। অর্থাৎ মানুষ নফছকে পরিশুদ্ধ করে রূহের সহায়তায়
নিজের ভিতরে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রহস্য
উদঘাটন সক্ষম হয়। কিন্তু মানুষের জন্ম জন্মান্তরের শত্রু ক্বরীন সম্পর্কে মানুষ সবচেয়ে বেশী
গ্বাফীল যার হাতে থাকে তার নফছের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
এখন জানার বিষয়
হলো মানবদেহে পুরুষ ও মহিলাদের নফছের মাক্বাম কি এক? আর
যদি ভিন্ন হয় তাহলে পুরুষ ও নারীর নফছের অবস্থান দেহের কোন জায়গায় বিদ্যমান?
উত্তরঃ পুরুষের
নফছের মাক্বাম হলো তার নাভিমূল। আর মহিলাদের নফছের মাক্বাম হলো তার সিনা।
আত্মশুদ্বির উপায়সমূহঃ
প্রথমতঃ আমিত্ব
থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে নফছের কু-প্রবৃত্তিমূলক কামনা বাসনার পরিপূর্ণ বিরোধীতা
করা একান্ত কর্তব্য। নফছকে কয়েকটি প্রক্রিয়ায় পরিশুদ্ধ করা যায়ঃ
১. তাওবাহঃ
তাওবার অর্থ হল অনুতপ্ত হওয়া, লজ্জিত হওয়া,
প্রত্যাবর্তন করা ইত্যাদি। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কাছে অপরাধ স্বীকারের মধ্য দিয়ে বিনয়ের সাথে ক্ষমা
প্রার্থনা করার নাম হলো তাওবাহ। নফছের পরিশুদ্ধির পথে প্রথম কাজটি হলো সকল গুনাহ থেকে তাওবাহ করে সৎ পথে টিকে
থাকার সংকল্প ঘোষণা করা।
২. জিকিরঃ
জিকিরের আভিধানিক অর্থ হল স্মরণ করা। শরীয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনার স্মরণ করাকে জিকির বলা হয়। জিকির এর ৫ ক্যাটাগরি রয়েছে তন্মধ্যে সবচেয়ে য়া’লা
দরজার জিকির হলেন ক্বলবি জিকির, এই জিকির আবার বিভিন্ন ধরনের
হয়ে থাকে। যে ধরনের জিকির নীরবে
হয়ে থাকে তাকে জিকিরে খফী বলা হয়। আর যে ধরনের জিকির উচ্চ শব্দে উচ্চারিত হয় তা জিকিরে জালী। এ দু-ধরনের জিকিরের মাধ্যমে বান্দা নিজের নফছকে
পূত-পবিত্র করতে পারে। বিভিন্ন প্রকার জিকির ত্বরীক্বাহ-এর নিয়ম অনুযায়ী করা হয়। তাই এর জন্যে কোন মুর্শিদের শরণাপন্ন হতে হবে। এই জিকির আবার সকল য়া’মল ঈবাদাতের চেয়েও শ্রেষ্ট।
৩. তাক্বওয়া
অবলম্বনঃ তাক্বওয়া শব্দের অর্থ হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনাকে ভয় করা, সাবধান থাকা, সতর্ক থাকা,
বিরত থাকা ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনার ভয়ে যাবতীয় পাপকার্য থেকে বিরত থাকার নাম হল তাক্বওয়া। তাওবার ফলাফল ধরে রাখার পথ হচ্ছে এই তাক্বওয়া। (السَّالِكُ
إِلَى اللهِ) ছালিকু ইলাল্লাহ এভাবে নফছকে পরিশুদ্ধ করণে এগিয়ে যায়।
৪. পবিত্র
আল-ক্বুরআন তিলাওয়াতঃ (وَعَنِ
ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى
اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ هَذِهِ الْقُلُوبَ تَصْدَأُ كَمَا يَصْدَأُ
الْحَدِيدُ إِذَا أَصَابَهُ الْمَاءُ» . قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا
جِلَاؤُهَا؟ قَالَ: «كَثْرَةُ ذِكْرِ الْمَوْتِ وَتِلَاوَةِ الْقُرْآنِ) আল-ক্বুরআন তিলাওয়াত হল নফল ঈবাদাতের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ
ঈবাদাত। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ লোহার উপর যেমন মরিচা পড়ে তেমনিভাবে মানুষের
অন্তরের উপর মরিচা পড়ে। আর এই মরিচা দূর করার উপায় হল বেশি বেশি করে ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত এবং
মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা। (মিশকাতুল মাছাবিহ ২১৬৮, শুয়াইবুল ইমান)
৫. শোকর আদায়
করাঃ শোকর শব্দের অর্থ হল কৃতজ্ঞতা। মহান আল্লাহ তা’য়ালা একজন মানষকে যে হাত,
পা, চোখ, নাক, কান, মুখ, বাতাস, রিজিক, পানি দিয়েছেন তার জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নাম হল সাধারণভাবে শোকর। শোকর আদায়ের মধ্য দিয়ে একজন বান্দা আত্মশুদ্ধিতা
অর্জন করতে পারে। ছালিকু ইলাল্লাহ
ব্যক্তিকে সর্বদা শোকরের মধ্যে থাকতে হবে।
রূহানিয়াতের একটি
বিষয় হলো, যতক্ষন আপনার নফছ পাক হয়নি, ততক্ষন পর্যন্ত আপনার ভুল, ভ্রান্তি, গুনাহের জন্য মালিক মহান আল্লাজী উনার পক্ষ থেকে ক্ষমার আশা থাকে, অর্থাৎ আপনার নফছ নাপাক তাই ভুল, ভ্রান্তির সম্ভাবনা
রয়েছে। এই কথাটা বুঝার চেষ্টা
করুন, উদাহরণস্বরূপ, যেরূপ
বাচ্চারা যখন ছোট থাকে, তখন গুরুতর কোন ভুল করে ফেললেও আমরা
তাদের ক্ষমা করে দেই, একে অন্যকেই বলি কি করবেন ছোট বাচ্চা
অবুঝ, বুঝেনাই বাদ দেন। আমরা জানি শিশুরা অবুজের মতো অনেক জিনিস করে
থাকে, তাই না? কিন্তু যখন
তারা বড় হয়ে একই ভুল করে, তখন কেউ তাদের ক্ষমা করে না,
তখন তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, এখন তো তুমি বড়
হয়ে গেছো, এখন কেন এমন কাজ করছো। অনুরূপ আইন বিদ্যমান রয়েছে আধ্যাত্মিক জগতে বা
রূহানীয়াতে, যতক্ষণ না নফছ পাক হয়েছে,
ততক্ষণ আপনাকে ছাড় দেওয়া হবে। সেই অবস্থাই চলে আসে যে, এর নফছ তো পাকই না। অতএব, আপনার
সমস্ত ভুল-ভ্রান্তি এবং পাপকে ক্ষমা করা হয়।
কিন্তু, একবার নফছ পাক হয়ে গেলে, আপনি আর পাপ
করতে পারবেন না। আমাকে জিজ্ঞাসা করুন কেন? কারণ যে জিনিস
তোমাকে দিয়ে পাপ করাতো তা তো নষ্ট হয়ে গেছে, এরপরেও তুমি
কিভাবে পাপ করবে? সুতরাং, একবার নফছ
পাক হয়ে গেলে, আপনাকে অবশ্যই সতর্ক হয়ে যেতে হবে, আর একবার নফছ পাক হয়ে গেলে আপনাকে দুইটি জিনিস বুঝতে হবে। প্রথমত, পাপ
কাজের দিকে ধাবিত হতে নফছ আপনাকে উৎসাহ/নির্দেশ দেয়। তো এই নফছ যখন পাক-পবিত্র হয়ে যাবে, তখন কী হবে? এখন আর আপনার নফছ আপনাকে
খারাপ কাজের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য করবে না, উৎসাহ/নির্দেশ
দিবেনা। এখন আপনার খুশিতে ঈদ
পালনের কথা মনে হচ্ছে তাইনা? ছুবহানআল্লাহ,
বিষয়টা কিন্তু এরূপ না, আসল জীবন তো তখনই শুরু
হবে।
তো দেহের ভেতরে
থাকা নফছ পাক হয়ে গেলে হাক্বীক্বতে তখন কি হবে আমাদের? তখন বাহিরে যে জিনিসগুলি আছে, আমাদের
চারপাশে ঘুরতেছে, এই জিনিসগুলি আমাদের অন্তরে প্রলোভনের জন্ম
দেওয়ার চেষ্টা করবে। আচ্ছা, আপনার নফছ পাক হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও আপনার চারপাশের পরিবেশে এমন কিছু বিদ্যমান রয়েছে যা আপনাকে
প্রলুব্ধ করবে, করে চলেছে। কিছু জিনিস আছে এমন যা আপনার জিবে পানি এনে
দেবে। এখন, আপনার নফছ পাক হয়ে গেছে, কিন্তু আপনার
চারপাশের জগত, দুনিয়া এখনও অপবিত্র-নাপাক। নফছ তো পাক হয়ে গেছে, সে তো আর এখন আপনাকে বিরক্ত করছে না, কিন্তু
এখনও আপনার চারপাশে হুর-পরীরা ঘোরাফেরা করছে যা আপনাকে প্রলুব্ধ করে। বাহ্যিক প্রলোভনের আক্রমণ বিদ্যমান। আর এর শাস্তি ভয়ানক, মারাত্নক।
নফছ পরিশুদ্ধির
পদ্ধতি ও কামিল মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তাঃ
নফছ মানুষের
আত্মার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা শয়তান ও ফেরেশতা
য়ালাইহিছ ছালাম দ্বারা প্রভাবিত হয়। এটি যদি পরিশুদ্ধ করা যায়, তবে মানুষ সফলকাম
হবে, আর যদি কলুষিত হয়, তবে
ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। এজন্য একজন কামিল মুর্শিদের অধীনে নফছের তাজকিয়া (পরিশুদ্ধি) করা জরুরি।
নফছ পরিশুদ্ধির
প্রধান উপায়, জিকির ও মুর্শিদ কামিলের
নির্দেশনাঃ
নফছ পরিশুদ্ধ
করার প্রধান উপায় জিকির, কিন্তু এটি একমাত্র উপায় নয়। বরং সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা ছাড়া জিকিরও
কার্যকর হয় না। এটি অনেকটা অসুস্থ
ব্যক্তিকে শুধু ঔষুধের নাম বলে দেওয়ার মতো, অথচ রোগ
নির্ণয় ও সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া ঔষুধ তার কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। এজন্য, নফছের
তাজকিয়া বা পরিশুদ্ধির জন্য কেবল জিকিরই যথেষ্ট নয়, বরং একজন
কামিল মুর্শিদ বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের দিকনির্দেশনা ও সঠিক তরবিয়াত অত্যন্ত
প্রয়োজনীয়।
নফছ পরিশুদ্ধ
করার জন্য কামিল মুর্শিদের প্রয়োজনীয়তাঃ
√ নফছের চিকিৎসা কেবল ঈবাদাত বা জিকিরের মাধ্যমে সম্ভব নয়,
যদি না তা একজন যোগ্য আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হয়। যেমন, শরীরের
রোগ হলে মানুষ ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞের কাছে যায়, তেমনি নফছের
রোগ থাকলে একজন যোগ্য মুর্শিদের সান্নিধ্যে আসতে হয়। নফছ পরিশুদ্ধ করা শুধুমাত্র জিকিরের মাধ্যমে
সম্ভব নয়। বরং এটি সঠিক প্রশিক্ষণ
এবং একজন কামিল মুর্শিদের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়।
√ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ) যে ব্যক্তি আমার দিকে ফিরে আসে, তার
পথ অনুসরণ করো। (ছুরাহ আল-লুকমান য়া'লাইহিছ ছালাম ৩১:১৫) এই আয়াত
শরীফ প্রমাণ করেনঃ নফছের পরিশুদ্ধির জন্য কামিল পথপ্রদর্শকের অনুসরণ আবশ্যক। কামিল মুর্শিদ বা যোগ্য ওলি ছাড়া আত্মশুদ্ধির
প্রকৃত পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
√ আরেক আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা
বলেনঃ (يَا
أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ) হে ঈমানদারগণ! মহান আল্লাহ তা’য়ালা
উনাকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:১১৯) এই আয়াত শরীফ থেকে বোঝা
যায়ঃ আত্মশুদ্ধির জন্য কামিল ব্যক্তিদের সান্নিধ্য আবশ্যক।
কামিল মুর্শিদের
নির্দেশনায় নফছ পরিশুদ্ধ করার ধাপসমূহ হলোঃ
১) তাশখিছ্ব (রোগ
নির্ণয়)
√ মুর্শিদ প্রথমে শিষ্য বা মুরীদের নফছের প্রকৃতি বোঝেন এবং তার
দুর্বলতা নির্ণয় করেন। অতঃপর মুর্শিদ তার মুরীদের নফছের রোগ নির্ণয় করেন।
√ নফছের রোগ শনাক্ত না করে যদি জিকিরের পরামর্শ দেওয়া হয়,
তবে তা কখনো কার্যকর হয় না।
২) তারবিয়াত
(তারবিয়ত বা প্রশিক্ষণ)
√ কামিল মুর্শিদ একজন শিষ্যকে কিভাবে নিজের নফছের বিরুদ্ধে লড়াই
করতে হবে তা শিখিয়ে দেন। জিকির, মুরাক্বাবা, মুজাহাদা,
খলওয়া (নির্জন ঈবাদাত) ইত্যাদির মাধ্যমে নফছকে পরিশুদ্ধ করার
ব্যবস্থা করা হয়।
৩) তাজকিয়া
(নফছের শুদ্ধিকরণ)
√ মুর্শিদি তাজকিয়া ব্যতিত
নফছে আম্মারা থেকে মুতমাইন্নার স্তরেও উত্তরণ অসম্ভব। এটি একজন অভিজ্ঞ মুর্শিদের নির্দেশনা ছাড়া কোন
অবস্থায়ই সম্ভব নয়। হাদীছ শরীফে রছুলে পাক
ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ فَإِذَا أُصِيبَ
دَوَاءُ الدَّاءِ بَرَأَ بِإِذْنِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ)
নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেক রোগের জন্য ওষুধ
রেখেছেন, তবে তা সঠিক পদ্ধতিতে গ্রহণ করতে হবে। (ছ্বহিহ মুছলিম শরীফ ২২০৪) এই হাদীছ শরীফের
শিক্ষা অনুযায়ী, নফছের কলুষতা দূর করাও
একপ্রকার চিকিৎসা। একে সুস্থ করতে হলে সঠিক পদ্ধতি ও পথপ্রদর্শক আবশ্যক।
রছুলে পাক
ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো তাজকিয়া, ছ্বহাবায়ে
কিরাম রদ্বীআল্লাহু য়া’নহুমদের আত্মশুদ্ধির জন্য উনার সরাসরি ছ্বহবত-ই ছিলো মূল, য়া’মল ঈবাদাতের চেয়ে। তিনি নিজে ছ্বহাবী রদ্বীআল্লাহু য়া'নহুমদের তাজকিয়া (পরিশুদ্ধি) করতেন, তাদের
রূহানিয়াত বাড়াতেন এবং সঠিক য়া’মলের দিকনির্দেশনা দিতেন।
কালামুল্লাহ শরীফ
রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে ছ্বহাবি
রদ্বীআল্লাহু য়া'নহুমদের সরাসরি মুর্শিদরূপে
কিজন্যে প্রেরণ করেছিলেন তা বর্ণনা করতেছেন মহান আল্লাহ তা’য়ালা
এইভাবেঃ (ہُوَ
الَّذِیۡ بَعَثَ فِی الۡاُمِّیّٖنَ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ
اٰیٰتِہٖ وَ یُزَکِّیۡہِمۡ وَ یُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ وَ اِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ
مُّبِیۡنٍ) তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি জাহিল আরবদের মধ্যে থেকে তাদেরই একজনকে রছুল বানিয়ে
পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের উপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করেন। আর তাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করেন, এবং পবিত্র কিতাব (আল-ক্বুরআনের জাহেরি বাতেনী) ঈলম শিক্ষা
দেন, ও (বাতেনী য়ী’লম বোঝার) হিকমত বা
প্রজ্ঞার দীক্ষাও দেন। অথচ এ লোকগুলোই (রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আসার)
আগে (পর্যন্ত) সুস্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত ছিলো। (ছুরাহ আল-জুমু’য়াহ
৬২/২) মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি একিই বিষয়ে আরো স্পষ্ট করেই
বলেনঃ (كَمَاۤ
اَرۡسَلۡنَا فِیۡكُمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡكُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡكُمۡ اٰیٰتِنَا وَ یُزَكِّیۡكُمۡ
وَ یُعَلِّمُكُمُ الۡكِتٰبَ وَ الۡحِكۡمَۃَ وَ یُعَلِّمُكُمۡ مَّا لَمۡ
تَكُوۡنُوۡا تَعۡلَمُوۡنَ) (সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্যে)
যেভাবে আমি তোমাদের মধ্যে থেকেই একজনকে রছুল বানিয়ে পাঠিয়েছি, যিনি তোমাদের উপর আমার আয়াত শরীফ সমূহ তিলাওয়াত করবেন,
আর তোমাদের নফছ ও ক্বলবের তাজকিয়া করে দেবেন, এবং
পবিত্র কিতাব (আল-ক্বুরআনের জাহেরি বাতেনী) ঈলম শিক্ষা দিবেন আর (বাতেনী য়ী’লম বোঝার) হিকমত বা প্রজ্ঞার দীক্ষা সহ এমন বিষয়েরও দীক্ষা দিবেন, যা এর আগে তোমরা জানতেই না। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২/১৫১)
এই আয়াত শরীফ
থেকে স্পষ্ট হয়ঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মূল
কাজ ছিলো মানুষের ক্বলব ও নফছকে পরিশুদ্ধ করা অর্থাৎ তাজকিয়া করা। শুধু নামাজ, রোজা
করলেই নফছ শুদ্ধ হয় না, বরং একজন কামিল মুর্শিদের নির্দেশনা
আবশ্যক।
কামিল মুর্শিদ
ছাড়া জিকির করলে কি হয়?
❌ যদি কোনো মুর্শিদে কামিলের
নির্দেশনা ছাড়া মানুষ জিকির করতে থাকে, তাহলে তিনটি ক্ষতি
হতে পারেঃ
১) নফছ নিজের ভুল
বুঝতে পারবে নাঃ
√ অনেক সময় মানুষ ভাবে, সে ভালো অবস্থায়
আছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার নফছ শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আছে।
√ কামিল মুর্শিদ ছাড়া এই আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।
√ একা একা জিকির করলে নফছ শুদ্ধ হতে পারে না, বরং একজন আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষকের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। এখান থেকে আরও বোঝা যায় যে, আত্মশুদ্ধির জন্য একজন কামিল ব্যক্তির সান্নিধ্য নেওয়া আবশ্যক।
২) আত্মগরিমা
(রিয়া) ও অহংকার জন্ম নেয়ঃ
√ নিজে নিজে জিকির করলে অনেক সময় রূহানিয়াতের পরিবর্তে
আত্মম্ভরিতা বৃদ্ধি পায়।
√ এটি নফছের জন্য আরও ক্ষতিকর হয়।
৩) নফছের প্রকৃত
শুদ্ধি ঘটে নাঃ
√ কেবল জিকির করলেই নফছ শুদ্ধ হয় না, বরং
মুর্শিদের দীক্ষায় সঠিক য়া’মল গ্রহণ করলেই কেবল নফছ উন্নত
হয়। শায়খ আব্দুল ক্বদির জিলানী
রহমতুল্লাহী য়া’লাইহি বলেছেনঃ তুমি যদি নিজের
নফছের চিকিৎসা করতে চাও, তবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার এক নেক বান্দার কাছে যাও, যার রূহানিয়াত
দ্বারা তোমার অন্তর নূরানী হবে। (গুনিয়াতুত ত্বলিবীন, পৃষ্ঠা ৩৮৭)
উপসংহারঃ
√ নফছ পরিশুদ্ধ করার প্রধান উপায় জিকির, তবে
এটি সঠিক পরিচালনা ছাড়া যথাযথ ফল দেয় না।
√ নফছের প্রকৃত শুদ্ধির জন্য একজন কামিল মুর্শিদের সান্নিধ্য
আবশ্যক।
√ ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বীআল্লাহু য়া’নহুম
যেভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার থেকে
আত্মশুদ্ধির শিক্ষা নিয়েছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরও
মুর্শিদে কামিলের মুরীদিয়াত গ্রহণ করতে হবে।
√ যারা মুর্শিদ ছাড়া আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করে, তারা নিজের নফছের ফাঁদে খুব দ্রুত পড়ে যায়।

0 ফেইসবুক: