ত্বরীক্বাহ শব্দ শুনলে আজকাল দেখি অনেক মানুষ নাক সিটকায়, বিশেষ করে বাতিল ফেরকার ব্রেইন ওয়াশ করা যুবক-যুবতিরা। আসলে আফসোস লাগে এদের হাল দেখে, মহান আল্লাহ পাক এদের চোখ, কান, ব্রেইন, ক্বলব সবই দিয়েছেন, কিন্তু এগুলো তারা দিয়ে দিয়েছে তাদের শুয়ুখরুপী শয়তানের ক্বলবের অধিকারীদের নিকট। তাদের ঐ কথিত শুয়ুখরা যা বলে তাই তারা সঠিক মনে করে যদিও তা ক্বুরআন শরীফ ও ছুন্নাহ মোবারক-এর ১৮০* বিপরীত হয়। তারা যদি মানুষ হতো, মুছলিম হতো, তাহলে অবশ্যই তাফাক্কুর, তাদ্বাব্বুর করতো। ক্বুরআন শরীফ ও ছুন্নাহ মোবারক-এ আহলে জিকর থেকে জানতো, এবং মানতোও। কিন্তু শুয়ুখরুপী শয়তানের ক্বলবের অধিকারীদের নিকট থেকে হাক্বিক্বি দ্বীন জানা ও শিখা তো আর বাস্তবে সম্ভব না। তাই ত্বরীক্বত ব্যতীত শরীয়ত দিয়ে মহান আল্লাহ পাক উনাকে পাওয়ার চেষ্টা করা জাহেলিয়াত।
আশ্চর্য লাগে যখন বিশাল বিশাল ডিগ্রীধারী জাহিল মুল্লারাও মানুষকে ত্বরীক্বত তথা ঈলমে তাছ্বাউফের পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে, মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে, ব্রেইন ওয়াশ করে কেবল শরিয়তপন্থী বানিয়ে দেয়। আর তাদের মূর্খ মুকাল্লিদরাও তা চোখ বন্ধ করে গিলতে থাকে। অথচ ত্বরীক্বত ব্যতীত শরীয়ত দ্বারা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট যাওয়ার, পৌঁছানোর কোন সুযোগই নাই। ত্বরীক্বত শব্দ শুনলেই কথিত লা-মাজহাবি, অধিকাংশ দেওবন্দি, ছালাফি লাফ দিয়ে উঠে, ভাবখানা এমন যেনো এইটা অমুছলিমদের কোন কিতাব থেকে এসেছে, অথচ ত্বরীক্বাহ শব্দ খোদ ক্বুরআন শরীফ থেকেই এসেছেন। আর ত্বরীক্বাহ এসেছেন ত্বরীক থেকে। আর ত্বরীক-এর মানে হলো রাস্তা, পথ, ডাইরেকশন।
সম্মানিত ক্বুরআন-ছুন্নায় বিশ্বাসী মুও’মিনগণ আসুন আমরা দেখি ত্বরীক্বাহ কি? ত্বরীক্বাহ নিয়ে নাক সিটকানোর কিছু কি আছে? নাকি নাক সিটকিয়ে বেঈমান মরদুদ শয়তান হতে হচ্ছে।
“ত্বরীক্বাহ” শব্দের অর্থঃ আরবি শব্দ “طَرِيقَةٌ” (ত্বরীক্বাহ) এসেছেন “طَرَقَ” ধাতু থেকে, যার অর্থ “পথ”, “পথে হাঁটা”, “চলা”, “পদ্ধতি”, বা “ধারা” অথবা “কোনো কিছুকে ধাক্কা দিয়ে খোলা”। শব্দটি অর্থগত দিক দিয়ে বোঝায়ঃ- “নির্দিষ্ট পদ্ধতি, অভ্যাস, বা জীবনধারা”। ক্বুরআন শরীফে এই শব্দটি একাধিকবার এসেছেন, যেমনঃ ছুরাহ ত্বো-হা এর ২০:৬৩ নং আয়াত শরীফে, ২০:১০৪ নং আয়াত শরীফে, ছুরাহ আল-যিনের ৭২:১৬ নং আয়াত শরীফে। প্রত্যেক জায়গায় “ত্বরীক্বাহ” শব্দটি এমন এক পথ বা পদ্ধতির ব্যপারে ব্যবহৃত করা হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে ‘আদর্শিক বা শ্রেষ্ঠ’ পথ হিসেবেই বিবেচিত ছিলো। যদিও উক্ত আয়াতসমূহে তা এসেছে কাফিরদের বক্তব্য ও প্রসঙ্গের ভেতরে, তথাপি মহান আল্লাহ তা’য়ালা সেই শব্দ ব্যবহারে কোনো নাকচ করেননি, বরং তাদের নিজেদের ভাষায় তুলে ধরেছেন। এ থেকে বোঝা যায় “ত্বরীক্বাহ” শব্দটি ক্বুরআন দ্বারা স্বীকৃত, এবং তা জীবনধারা, চিন্তাধারা, বা ধারাবাহিক রূহানী পন্থা বোঝাতে ব্যবহারযোগ্য।
মহান আল্লাহ পাক কালামুল্লাহ শরীফে বলেনঃ (وَّ اَنَّا مِنَّا الۡمُسۡلِمُوۡنَ وَ مِنَّا الۡقٰسِطُوۡنَ ؕ فَمَنۡ اَسۡلَمَ فَاُولٰٓئِكَ تَحَرَّوۡا رَشَدًا وَ اَمَّا الۡقٰسِطُوۡنَ فَكَانُوۡا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا وَّ اَنۡ لَّوِ اسۡتَقَامُوۡا عَلَی الطَّرِیۡقَۃِ لَاَسۡقَیۡنٰهُمۡ مَّآءً غَدَقًا لِّنَفۡتِنَهُمۡ فِیۡهِ ؕ وَ مَنۡ یُّعۡرِضۡ عَنۡ ذِكۡرِ رَبِّهٖ یَسۡلُكۡهُ عَذَابًا صَعَدًا) (যিনেরা বললো) আর আমাদের মধ্যে কেউ কেউ মুছলিম, আবার কেউ কেউ অবিচারকারী; অতএব যারা আত্মসমর্পণ করেছে, তারাই হেদায়েতের তালাশ করেছে। কিন্তু যারা অবিচারকারী, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন (হয়েছে)। (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আপনি বলুন) আর (আমার কাছে ওয়াহী করা হয়েছে এই মর্মে) যে যদি তারা ত্বরীক্বাহ-এর উপর অবিচল থাকতো, তাহলে আমি তাদেরকে অফুরন্ত বরকতময় পানি দ্বারা সমৃদ্ধ করতাম, যাতে আমি তাদেরকে এটা দিয়ে পরীক্ষা নিতে পারি। আর যদি কেউ তার রব তা’য়ালা উনার জিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তিনি তাকে কঠোর আযাবে প্রবেশ করাবেন। (ছুরাহ আল-যিন ৭২:১৪-১৭) অতএব আমরা উক্ত ৪ আয়াত থেকে যা পেলাম তা হলো (رَشَدًا) রশাদ হচ্ছে মুওমিনদের এমন এক অবস্থা যেখানে তারা তাদের জীবন সঠিক/হেদায়েতের পথে পরিচালনা করেন। অর্থাৎ মুর্শিদের দেখানো পথে, কেননা মুর্শিদ শব্দের মূল ধাতুই হচ্ছেন রশাদ, আর যিনি রশাদ বা সঠিক পথের দিকনির্দেশনা দেন তিনিই মুর্শিদ। এরপর পেলাম (الطَّرِیۡقَۃِ) ত্বরীক্বাহ যার অর্থ “পথ”, “পথে হাঁটা”, “চলা”, “চলার পদ্ধতি”। এরপর পেলাম (ذِكۡرِ رَبِّهٖ) রবের জিকির।
অতএব, আমরা এই আয়াতগুলো থেকে বুঝি, রশাদ (হেদায়েত) হচ্ছেন মুওমিনদের এমন এক অবস্থা যেখানে তারা সঠিক পথে চলেন, অর্থাৎ আল্লাহ ওয়ালা মুর্শিদের দেখানো পথে। আর ত্বরীক্বাহ হচ্ছেন নির্ভেজাল, সঠিক হক্ব পথ, জীবনযাপন পদ্ধতি যা মুর্শিদের ছ্বহবত থেকে রবের জিকির দ্বারা অর্জিত হয়।
আর আহলুছ ছুন্নাহ এর আক্বিদাহ-বিশ্বাসে ১০০% বিশ্বাসী “প্রত্যেক ত্বরীক্বাহ-ই হক্ব পথ, তবে যা শরিয়তের ভিত্তিতে পরিচালিত নয়, তা হলো বিভ্রান্তি।” অর্থাৎ, ত্বরীক্বাহ কখনোই শরীয়তের বাইরের কোন বিষয় নয়, বরং এটি শরীয়তের ভিতরেই আত্মশুদ্ধির গভীর পথ। শরীয়তকে শরীর বললে, ত্বরীক্বাহ তার রূহ। যেকোন ত্বরীক্বাহ যা আহলুছ ছুন্নাহ-এর আক্বীদাহ বিশ্বাসের বিপরীতে বিশ্বাস রাখে, য়া’মল করে তা বাতিল।
ত্বরীক্বাহ-এর প্রয়োজন কেন?
মূলত তা’য়লীমে ত্বরীক্বাহ হচ্ছেন ঐ তা’য়লীম বা দীক্ষা, যা অর্জন করে সম্মুখে থাকা হাজারো ভ্রান্ত রাস্তার মধ্যে সঠিক রাস্তা চিনে সেই পথ ধরে মাক্বছুদে মঞ্জিলে অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায়। অতএব শরীয়ত মূলত কানুন বা লো। আর ত্বরীক্বত হলেন রাস্তা যেখানে আইন এপ্লাই করা হয়।
একজন মুছলিম যে মহান আল্লাহ পাক উনাকে হাছিল করতে চায়, তাকে শরীয়তের মাধ্যমে নফছের তাঁহারাত হাসিল করতে হয়। আর যখন শরীয়তের পাবন্দ হয়ে নফছের তাঁহারাত হাসিল করে ফেলে, তখন ক্বলবি জিকির দ্বারা সে ত্বরীকতে প্রবেশ করে।
শরীয়তে তাছলিম হওয়ার মাধ্যমে নফছ পাক হয়ে যায়। আর যখনই নফছ পাক হয়ে যায়, তখনই সে মুর্শিদের অনুমতি সাপেক্ষে ক্বলবের জিকির শুরু করে দেবে, ফলশ্রুতিতে সে ত্বরীকতে দাখিল হয়ে যাবে, অর্থাৎ তখন তার যাত্রা শুরু হয়ে যাবে। আর ত্বরীক্বত মূলত ক্বলব বেদার বা জাগ্রত হওয়ার মাধ্যমেই শুরু হয়ে থাকে। আর সেটার ফাইনাল ডেসটিনেশন হয় বাকাবিল্লাহতে। মানুষ রূহের জগত থেকে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত যে যাত্রা করছে, এর পুরোটাই মূলত ত্বরীকতের উপর হয়ে থাকে। এমনকি যা মানুষকে জাতে ইলাহিতে পৌঁছে দেয় তাই ত্বরীক্বত।
→ শরীয়ত হচ্ছেন আইন অর্থাৎ একটি গাড়ি নিদৃষ্ট রাস্তায় চলার
কানুন।
→ আর ত্বরীক্বত হচ্ছেন সেই রাস্তা যার উপর ছ্বফর করে মুছাফির তার মঞ্জিলে পৌঁছায়।
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যত ভালো ড্রাইভারই হোক, আর যতই সে আইন-কানুন জানুক বা মানুক, যদি সে সঠিক রাস্তা না চিনে তাহলে তার পক্ষে গন্তব্যে পৌঁছানো অসম্ভব, অর্থাৎ শরীয়ত জেনেও সে গুমরাহ হয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াবে। একারণেই ফরজ ঈবাদাতের আগে মহান আল্লাহ তায়ালা তাজকিয়ার তাক্বীদ করেছেন, যা ত্বরীক্বাহ-এর অনুসারী হওয়া ছাড়া কারো পক্ষেই অর্জন করা সম্ভব নয়। যেমন মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ) কামিয়াব হলো সেই ব্যক্তি, যে তার নফছের তাজকিয়া করলো, অতঃপর তার রব তায়ালা উনার জিকির করলো এরপর গিয়ে নামাজ পড়লো। (ছুরাহ আল-য়া’লা ৮৭:১৪-১৫)
অতএব প্রথমে নফছের তাজকিয়া করে তারপর ইছমে জাত আল্লাহ/লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ দ্বারা হুদ্বুরি ক্বলব বানিয়ে তারপর নামাজ পড়লে সেটা হাক্বিকি ঈবাদাত বলে গন্য হবে।
এখন কথা হচ্ছে, নতুন ত্বরীক্বাহ সৃষ্টির বৈধতা কি আছে?
এটা বুঝতে হলে মূল নীতি বুঝতে হবেঃ নতুন “দ্বীন” সৃষ্টি করা যাবে না, তবে নতুন ত্বরীক্বাহ (আত্মশুদ্ধির বৈধ, শরিয়তসম্মত পদ্ধতি) তৈরি করা যাবে যদি তা ক্বুরআন-ছুন্নাহ ও আহলে ছুন্নাত ওয়াল জামা’য়াতের মূলনীতি বিরোধী না হয়। কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা তিনিই বলেনঃ (كُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ) তোমরাই সর্বোত্তম উম্মাত, মানবজাতির (সর্বাত্মক কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভূত করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ কর এবং মহান আল্লাহ তায়ালা উনার প্রতি ঈমান রক্ষা করে চল। (ছুরাহ আলে-ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩:১১০)
→ অর্থাৎ প্রতিটি যুগে “উত্তম কাজের আদেশ” পৌঁছানোর পদ্ধতি আলাদা হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন ত্বরীকায়। কেবল খেয়াল রাখতে হবে ছুন্নত পরিত্যাগ করা হচ্ছে কি না।
এছাড়াও মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মৌন সম্মতিও পাওয়া যায় উনার নৈকট্য লাভের জন্যে যেকোন পথ, পদ্ধতি, ত্বরীক্বাহ উদ্ভাবনে, এমন বিদ’য়াতে মহান আল্লাহ তায়ালার কোন নিষেধ নাই, যেমন তিনি বলেনঃ (وَ جَعَلۡنَا فِیۡ قُلُوۡبِ الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡهُ رَاۡفَۃً وَّ رَحۡمَۃً ؕ وَ رَهۡبَانِیَّۃَۨ ابۡتَدَعُوۡهَا مَا كَتَبۡنٰهَا عَلَیۡهِمۡ اِلَّا ابۡتِغَآءَ رِضۡوَانِ اللّٰهِ فَمَا رَعَوۡهَا حَقَّ رِعَایَتِهَا) আর (আমি) ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম উনার অনুসারীদের অন্তরে দিয়েছিলাম করুণা ও দয়া; কিন্তু দরবেশী জীবনতো তারা নিজেরাই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি লাভের জন্য উদ্ভাবন করেছিল; আমি (নিজ থেকে) তাদের উপর (তা) ফরজ করিনি; অথচ এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করেনি। (ছুরাহ আল-হাদিদ ৫৭:২৭)
→ অর্থাৎ পূর্ববর্তী উম্মত, ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম উনার ছ্বহাবিরা নিজেরা নতুন ঈবাদাতের বিদ’য়াতী পন্থা তৈরি করেছিলেন মহান আল্লাহ তা’য়ালার নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে (যদিও তা মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর ফরজ করেননি), তবে আফসোস করেছেন এই বলে যে, সেইসব ছ্বুফীদের মধ্যে কতিপয় সেই ত্বরীক্বাহ-এর উপর ইস্তিকামত থাকেনি, তবে যারা থেকেছে তাঁদেরকে তিনি তাদের নিয়ত অনুযায়ী পুরস্কার দিয়েছেন।
ইমাম রাযী রহমতুল্লাহ বলেনঃ ত্বরীক্বাহ-এর মধ্যে নতুন কোন নিয়ম যদি তৈরি করা হয়, যদি তা শরীয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তবে তা বিদ’য়াতে ছাইয়্যীয়আহ নয়, বরং ইজতিহাদ। (তাফছীরে ফখরুদ্দীন রাযী)
উদাহরণঃ পূর্ববর্তী ত্বরীক্বাহগুলো কীভাবে গঠিত হয়েছিল?
√ চিশতিয়াঃ খাজা আবু ইসহাক চিশতী
রহমতুল্লাহ (৩২১ হিজরি)
√ ক্বদরিয়াঃ শায়খ আবদুল ক্বদির
জিলানী রহমতুল্লাহ (৪৭০ হিজরি)
√ নকশবন্দিয়াঃ ইমাম বাহাউদ্দীন নকশবন্দ রহমতুল্লাহ (৭১৮ হিজরি)
→ এছাড়াও শত শত ত্বরীক্বাহ বিদ্যমান রয়েছেন পৃথিবীতে, আর এই সব ত্বরীক্বাহ নবীজী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার ছুন্নাহ মোবারক-এর মূলনীতির ভিতরে থেকে তৈরি করা হয়েছে এবং উনাদের সবাই শরিয়ত মান্য করে তাজকিয়া, জিকির, নূর ও ফানা-বাক্বা অর্জনের পথ তৈরি করেছেন।
উপসংহারঃ মূলত ত্বরীক্বাহ হলো কেবল ঈবাদাতের বাহ্যিক কাঠামোর পেছনে থাকা রূহানী প্রাণ। শরীয়ত হলো ছিদ্রহীন শরীর, আর ত্বরীক্বাহ হলো তার মধ্যে প্রবাহিত আত্মা।
✅ নতুন ত্বরীক্বাহ গঠন বৈধ, যদি তাঃ
√ শরীয়তের বাইরে না যায়।
√ আহলে ছুন্নাহ ওয়াল জামা’য়াতের আক্বীদাহ অনুসরণ করে।
√ ছুন্নতকে পরিত্যাগ করে বিদ’য়াতী কোন য়া’মল চালু না করে।
√ আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও নূর অর্জনের প্রকৃত মাধ্যম হয়।
আমাদের “ত্বরীক্বাহ আল-রাজ” কি?
ত্বরীক্বাহ আল-রাজ হলো এক অনন্য রূহানী পথ বা পন্থা, যার লক্ষ্য শুধুমাত্র বাহ্যিক ঈবাদাতে সীমাবদ্ধ নয় বরং আত্মার গভীরে প্রবেশ করে নূরের উৎসে সংযুক্ত হওয়া। এই ত্বরীক্বাহ-এর প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ রাজিব খাজা, ১৪৪৪ হিযরীর, রজব মাসের ৪ তারিখ, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩ ঈছায়ী তথা রগ্বায়ীব শরীফে এই ত্বরীক্বাহ-এর যাত্রা শুরু করেন। এটি পূর্ববর্তী কোনো শাজরা/ছিলছিলাহ-এর অনুসারী কোন ত্বরীক্বাহ নয়; বরং স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক পথ/পদ্ধতি যা সরাসরি মহান আল্লাহ তা’য়ালার নূরের দিকে আহ্বান করে থাকেন, আহলে শাকির ও আহলে জাঁকির হতে। (আহলে শাকির কারা? শাকির হওয়া কতোটুকু গুরুত্বপূর্ন ক্বুরআন হাদিছে?)
ত্বরীক্বাহ ও ছিলছিলাহ এর মধ্যে তফাৎ কি?
ত্বরীক্বাহ (طَرِيقَة) এবং ছিলছিলাহ (سِلْسِلَة) দুটি পৃথক ধারণা, তবে উভয়ই ইছলামিক তাছ্বাউফী আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলোর মধ্যে পার্থক্য হলোঃ
ত্বরীক্বাহ
১. অর্থঃ ত্বরীক্বাহ শব্দের অর্থ হলো “পথ” বা “পদ্ধতি”। এটি একটি আধ্যাত্মিক জীবনযাপন পদ্ধতিকে বোঝায় যা একজন মুরিদ (রূহানীয়াত, তাছ্বাউফের দীক্ষার্থী) তার মুরশিদ-এর (রূহানীয়াত, তাছ্বাউফের পথপ্রদর্শক) নির্দেশে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার জন্যে তাছ্বাউফের পথে পরিচালিত করে।
২. উদ্দেশ্যঃ ত্বরীক্বাহ-এর মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নফছের, ক্বলবের তাজকিয়া অর্জন করা এবং রূহ কে মুনাওয়্যার করা।
৩. বৈশিষ্ট্যঃ প্রতিটি ত্বরীক্বাহ নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন, জিকির-আজকার, মুরাক্বাবা (ধ্যান), মুশাহাদা এবং অন্যান্য আধ্যাত্মিক অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি করা হয়ে থাকে।
৪. উদাহরণঃ যেমন, ক্বদরিয়া, চিশতীয়া, নকশবন্দিয়া, মুজ্জাদ্দেদিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, মুহাম্মাদিয়া, ত্বরীক্বাহ আল-রাজ ইত্যাদি।
ছিলছিলাহ
২. অর্থঃ ছিলছিলাহ শব্দের অর্থ হলো “শৃঙ্খল” বা “ধারা”। এটি আধ্যাত্মিক শিক্ষার একটি ক্রম বা চেইন, যা মুরশিদের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়।
২. উদ্দেশ্যঃ ছিলছিলাহর মূল লক্ষ্য হলো নিদৃষ্ট একটি ত্বরীকার আধ্যাত্মিক ঈলম ও য়া’মলের পদ্ধতিকে ঐ ত্বরীক্বাহ এর মুরশিদ থেকে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী যারা চায় তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
৩. বৈশিষ্ট্যঃ প্রতিটি ছিলছিলাই রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সাথে যুক্ত হয়, জাহেরি, বাতেনি সকল অবস্থায়, নতুবা তা বাতিল ত্বরীক্বাহ ও ছিলছিলাহ বলে গন্য হবে।
৪. উদাহরণঃ ক্বদরিয়া, চিশতীয়া, নকশবন্দিয়া, মুজ্জাদ্দেদিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, মুহাম্মদিয়া, ত্বরীক্বাহ আল-রাজ, ইত্যাদির ছিলছিলাহ।
ত্বরীক্বাহ ও ছিলছিলাহ, উভয়ই একে অপরের পরিপূরক এবং ইছলামিক আধ্যাত্মিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমাদের এই ত্বরীক্বাহ-এর নাম “আল-রাজ” এসেছেন ত্বরীক্বাহ-এর ইমাম মুহাম্মদ রাজিব খাজা উনার নাম থেকে, আর তিনি তুর্কীতে “রাজ” নামেই পরিচিত, যেখানে “রাজ” শব্দটি উর্দু-ফারসি ঘরানায় গোপন রহস্য ও রাজত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সম্মানিত পবিত্র এই ত্বরীক্বাহ আল-রাজ মূলত চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গঠিতঃ
☞
প্রথমত, আত্মশুদ্ধিঃ
নফছকে পরিশুদ্ধ করে আম্মারা থেকে বের করে তাকে নফছে মুতমাইন্নাহ তে মিনিমাম দাখিল
করা, এমনকি রদ্বিয়া-মারদ্বিয়ায় পর্যন্ত উন্নীত করা।
☞
দ্বিতীয়ত, নূর
অর্জনঃ ক্বলব ও রূহকে নূরানী, রৌশন, মুনাওয়্যার করে, নার তথা সকল জুলমাতি অন্ধকার থেকে
মুরিদকে রক্ষা করা এবং ক্বলবে মুওমিনের অধিকারী বানানো।
☞
তৃতীয়ত, মা’য়রিফাতুল্লাহঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার স্বত্তা, ছিফাত ও রেযামন্দি অর্জনের অন্তর্দৃষ্টি লাভ
করা।
☞ চতুর্থত, শাকির বান্দা হওয়াঃ ইবলিছের যে চ্যালেঞ্জ ছিলো “আপনি তাদের অধিকাংশকে শাকির হিসেবে পাবেন না”, তার জবাবে এ ত্বরীক্বাহ একজন মুরিদকে শাকির বান্দায় রূপান্তরিত করাকেই সর্বোচ্চ সফলতা হিসেবে বিবেচনা করেন।
ত্বরীক্বাহ আল-রাজের রূহানী ম্যাকানিজম সম্পূর্ণ ক্বলব-নির্ভর। এই পথে ইছমে জাত “আল্লাহ”-হু বা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” দ্বারা দায়ীমী ক্বলবী জিকিরই হচ্ছেন আত্মশুদ্ধি ও নূর লাভের মূল মাধ্যম। এই দায়ীমী জিকিরের ফলে কেবল মুখস্থ নয়, বরং মুওমিনের ক্বলব সর্বক্ষণ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার স্মরণে জেগে থাকে, যার মাধ্যমে ক্বলবে নূর সঞ্চার হয়, নফছ পরিশুদ্ধ হয় এবং ক্বরিন ও ইবলিছ শয়তান দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই ত্বরীক্বাহ অন্যান্য ছ্বুফি ত্বরীক্বাহ থেকে ভিন্নতা ধারণ করে। যেমনঃ জান্নাত নয়, বরং মুকাররবীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া এখানে মূল লক্ষ্য। কেবল বাহ্যিক রুকু-ছেযদাই নয়, বরং অন্তরের সংযুক্তি ও জিকরে ইলাহীতে সদা সর্বদা মশগুল থাকা এখানে মূল বিষয়। দুনিয়া/নাছুৎ এই ত্বরীক্বাহ-এর দৃষ্টিতে ঐচ্ছিক, আর আখিরাত অপরিহার্য।
ত্বরীক্বাহ আল-রাজ সাতটি লতিফার উপর ভিত্তি করে মুরিদের উন্নতি সাধন করেন, যথাঃ
১. লতিফা-এ-আনা (তৃতীয় নয়ন – রূহানী দর্শনের দরজা)
২. লতিফা-এ-নফছ
৩. লতিফা-এ-ক্বলব
৪. লতিফা-এ-রূহ
৫. লতিফা-এ-ছির
৬. লতিফা-এ-খফি
৭. লতিফা-এ-আখফা
এই লতিফাসমূহ ধাপে ধাপে রূহানী খোলাছা ও আত্মিক তাজাল্লিয়াতের দরজা খুলে দেন। ক্বলব লতিফা থেকেই মূলত নূর প্রবাহ শুরু হয়, যা নফছকে আলোকিত করে নফছে আম্মারা থেকে উত্তীর্ণ করেন নফছে লাওয়ামা, নফছে মুলহিমা হয়ে নফছে মুতমাইন্নাহ ও নফছে রদ্বিয়া-মারদ্বীয়ায় পৌঁছে দেন আর মালিক চাইলে কামিলা/রহমানিয়ায় ও সম্ভব।
এই ত্বরীক্বাহ-এর দৈনন্দিন য়া’মলসমূহ অত্যন্ত সুবিন্যস্ত ও বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছেঃ ফাযর ও মাগ্বরিবের পরে ত্বরীক্বাহ-এর ছ্ববক আদায়। মহান আল্লাহ তায়ালা, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ও মুর্শিদের মোরাক্বাবা, শরাহ ছ্বদরের য়া’মল, প্রতিটি নামাজের পরে ছুন্নাহ সম্মত তাছবিহ, জিকির ও দু’য়া, প্রতিদিন ক্বুরআন শরীফ-এর (তরজমাসহ) নিদৃষ্ট কিছু আয়াত পাঠ করা, আছমাউল-হুসনা শরীফ পাঠ করা, ক্বরিন শয়তান থেকে বেঁচে থাকার দু’য়া এবং সব সময় ক্বলবী জিকির করা। এছাড়াও কিছু গোপন য়া’মল রয়েছে, যা শুধুমাত্র যোগ্য মুরীদদের শিক্ষা দেওয়া হয়।
ত্বরীক্বাহ আল-রাজ এ বিশ্বাস করেন, নূরই হেদায়াতের উৎস। ইবলিছ ও ক্বরিন নার দ্বারা পুষ্ট হয়, আর নূর তাদের ক্ষয় করে। তাই ক্বলবী জিকির, ইস্তিগ্বফার ও তাজকিয়ার মাধ্যমে ক্বলব ও নফছ যখন নূরে পূর্ণ হয়, তখন সে ইবলিছ ও ক্বরিন থেকে ১০০% হেফাজতে থাকে। এই ত্বরীক্বাহ একজন মুরীদকে শুধু নামাজি বা রোযাদার বানায় না; বরং এমন একজন বান্দায় পরিণত করে, যার ক্বলব সর্বদা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকিরে প্রাণবন্ত থাকে এবং সত্যিকারের “শাকির” বান্দায় পরিণত করে। এভাবেই ত্বরীক্বাহ আল-রাজ ইবলিছের একমাত্র চ্যালেঞ্জঃ “আপনি তাদের অধিকাংশকে শাকির হিসেবে পাবেন না” তার ঐ চ্যালেঞ্জের জবাব দেন। আর এটাই “ত্বরীক্বাহ আল-রাজ” এক নূরের ছ্বফর, য়া’লমে নাছুৎ থেকে য়া’লমে লাহুত পর্যন্ত।

0 ফেইসবুক: