Sunday, September 4, 2022

নামায ব্যতীত মুসলিম থাকা কি সম্ভব? শরীয়ত কি বলেন?

আমাদের সমাজে অধিকাংশ দ্বীনি বিষয়ে আজকাল আবেগ দিয়ে ফায়সালা করতে দেখা যায়, অথচ দ্বীন আবেগ নয় বরং শরীয়ত নির্ভর। দ্বীন চলে কুরআন সুন্নাহ অনুসারে। কুরআন সুন্নাহ যা অনুমোদন অনুমতি দেয়না, তা সমাজ ও আবেগ অনুমতি দিলে বা যায়েজ বললে তা কখনোই যায়েজ হয়ে যাবেনা।

এরূপ একটি বিষয় নামায, যা অধিকাংশ মানুষ আবেগ দিয়ে বিচার করে থাকে নাউযুবিল্লাহ। সমাজের অপরিচিত মানুষের কথা বাদ দিলাম, আজকাল নামায পরিত্যাগ করা পরিবারের মানুষদের ও আমাদের অনেক ভাই বোন মুসলিম মনে করে থাকেন অথচ বিষয়টা ১৮০” ডিগ্রি শরিয়ত বিরোধী একটি আক্বিদাহ। নামায পরিত্যাগ করে কোন মানুষের পক্ষে মুসলিম থাকা কোন মতেই সম্ভব না। কিন্তু সাধারণ মানুষের কথা বাদ দিলাম, দেখা যায় অনেক আলীম উলামাও এই বিষয়ে জ্ঞান রাখেনা। সে সারা দুনিয়া ওয়াজ নসিহত, দ্বীনের তাবলীগ করে বেড়াচ্ছে অথচ তার বাপ ভাই নামায পড়েনা। এদের কেউ মারা গেলে মুসলমানদের গোরস্থানে দাফন হয়, সেই আলীম দেখা যায় বে নামাজি ভাই, বোন, মা, বাপের জানাজার নামায পড়ে দোয়াও করে থাকে, অথচ বাস্তবতা হলো, বে নামাজির মৃত্যু হয় মুশরিকদের হালতে, অর্থাৎ এলাকায় কোন হিন্দু মারা গেলে যে হিসেবে সে মারা যায়, সেই একিই হিসেবে বে নামাজি মুসলিম নামধারী পরিবারের সদস্যটিও মারা যায়। অথচ আবেগ দিয়ে তার কূলখানি দোয়া মাহফিল করা হয়ে থাকে যার এক রতিও কোন কাজে আসবেনা।

অথচ যে কাজের ব্যপারে আল্লাহ পাঁক পরিবারের বে নামাজি মানুষ জীবিত থাকা অবস্থায় নির্দেশ দিয়েছেন, সেই কাজের ব্যপারে অনেক আলীম উলামাই আজকাল গাফেল। মহান আল্লাহ পাঁক বলেনঃ (یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَ اَہۡلِیۡکُمۡ نَارًا وَّ قُوۡدُہَا النَّاسُ وَ الۡحِجَارَۃُ عَلَیۡہَا مَلٰٓئِکَۃٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا یَعۡصُوۡنَ اللّٰہَ مَاۤ اَمَرَہُمۡ وَ یَفۡعَلُوۡنَ مَا یُؤۡمَرُوۡنَ) “হে ঈমানদারগণ! (১) তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে আর তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে (২) রক্ষা কর যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতা। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তা তারা অমান্য করে না, আর তারা তাই করে, তাদেরকে যা করার জন্য আদেশ দেয়া হয়”। (আল কুরআন ৬৬/৬)

আসুন দেখি উক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে কি বলা হয়েছে

১) এই আয়াতে পাঁকে সাধারণ মুসলিমদেরকে বলা হয়েছে, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর। অতঃপর জাহান্নামের আগুনের ভয়াবহতা উল্লেখ করে অবশেষে এ কথাও বলা হয়েছে যে, যারা জাহান্নামের যোগ্য পাত্র হবে, তারা কোন শক্তি, দলবল, খোশামোদ অথবা ঘুষের মাধ্যমে জাহান্নামে নিয়োজিত কঠোরপ্রাণ ফেরেশতাদের কবল থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। এই ফেরেশতাদের নাম ‘যাবানিয়া’। এ আয়াত শরীফ থেকে প্রকাশ পায় যে, মহান আল্লাহ তা’আলার আযাব থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য প্রচেষ্টা চালানোর মধ্যেই কোন মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য সীমাবদ্ধ নয়। বরং যে পরিবারটির নেতৃত্বের বোঝা তার কাঁধে স্থাপন করেছেন আল্লাহ পাঁক তার সদস্যরাও যাতে মহান আল্লাহ তা’আলার প্রিয় মানুষরূপে গড়ে উঠতে পারে সাধ্যমত সে শিক্ষা দেয়াও তার উপর ওয়াজিব। রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল বা দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্ত লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। শাসকও রাখাল বা দায়িত্বশীল, তাকে তার অধীনস্ত লোকদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। নারী তার স্বামীর বাড়ী এবং তার সন্তান-সন্ততির তত্ত্বাবধায়িকা, তাকে তাদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।” (বুখারী শরীফ ৮৯৩, ৫১৮৮)

আয়াতের শুরতেই মু’মিনদের পালনীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। আর তা হল, নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ এবং সংশোধন করার সাথে সাথে পরিবারের লোকদেরকেও পরিশুদ্ধ এবং সংশোধন করতে হবে এবং তাদেরকে ইসলামী শিক্ষা ও তরবিয়ত দেওয়ার প্রতি যত্নবান হতে হবে। ২) যাতে করে তারা জাহান্নামের জ্বালানী হওয়া থেকে বেঁচে যায়। মহান আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন, তোমরা তাদেরকে সেসব কাজ করতে নিষেধ কর এবং যেসব কাজ করতে আদেশ করেছেন, তোমরা পরিবার-পরিজনকেও সেগুলো করতে আদেশ কর। এই কর্মপন্থা তাদেরকে জাহান্নামের অগ্নি থেকে রক্ষা করতে পারবে। (ইবন কাসীর) আর এই কারণেই রসূলে পাঁক ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম আদেশ করেছেন, “তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে নামায আদায় করার নির্দেশ দাও। আর যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়ে যাবে, তখন (নামায আদায় না করলে) তাদেরকে একারণে বেত্রাঘাত করবে। আর তাদের ঘুমানোর স্থানকেও পৃথক করে দিবে। (আবু দাউদ শরীফ ৪৯৫, মুসনাদে আহমাদ শরীফ ২/১৮০) অনুরূপভাবে পরিবার পরিজনকে নামাজের সময়, রোজার সময় হলে স্মরণ করিয়ে দেয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম যখনই বিতর পড়তেন তখনি আয়েশা সিদ্দিকা আলাইহাস সালামকে ডাকতেন এবং বলতেন, “হে আয়েশা! দাঁড়াও এবং বিতর আদায় কর।” (মুসলিম শরীফ ৭৪৪, মুসনাদে আহমাদ ৬/১৫২) এছাড়াও হাদিস শরীফে এসেছে, রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহ্ ঐ ব্যক্তিকে রহমত করুন, যে নিজে রাতে সালাত আদায় করতে দাঁড়িয়েছে, এবং তার স্ত্রীকে জাগিয়েছে, সে যদি দাঁড়াতে অস্বীকার করে তার মুখে পানি ছিটিয়েছে। আল্লাহ ঐ মহিলাকেও রহমত করুন যে, নিজে রাতে সালাত আদায় করতে দাঁড়িয়েছে এবং তার স্বামীকে জাগিয়েছে, যদি সে দাঁড়াতে অস্বীকার করে তার মুখে পানি ছিটিয়েছে।” (আবু দাউদ শরীফ ১৪৫০, ইবনে মাজাহ ১৩৩৬)

এবার মুল বিষয়ে চলে আসি, যেমন মহান আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ (اَحَسِبَ النَّاسُ اَنۡ یُّتۡرَکُوۡۤا اَنۡ یَّقُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا) মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে দেয়া হবে? (আল কুরআন ২৯/২) না ব্যপারটা এরূপ না, বরং শুধু মহান আল্লাহ তা’আলা ও রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামের উপর ঈমান আনলেই হবে না, বরং মহান আল্লাহ তা’আলা ও রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম উনাদের হুকুম আহকামগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মানা লাগবে।

নামাযের ব্যপারে মহান আল্লাহ তাআলার স্পষ্ট ভাষ্য হচ্ছেঃ ( فَاِنۡ تَابُوۡا وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّکٰوۃَ فَاِخۡوَانُکُمۡ فِی الدِّیۡنِ) অতঃপর যদি তারা (মুশরিকরা) তাওবাহ করে এবং নামাজ আদায় করে এবং যাকাত প্রদান করে তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই; (১) আর আমি জ্ঞানী লোকদের জন্য (আমার) আয়াতসমূহ স্পষ্টরূপে বর্ণনা করে থাকি। (আল কুরআন ৩/৮১)

১) এখানে মহান আল্লাহ পাঁক যা বলতে চেয়েছেন তা হচ্ছে, কাফেররা যত শক্রতাই করে থাকুক, যত নিপীড়নই চালাক, যখন সে মুসলিম হয়ে যাবে, তখন মহান আল্লাহ তা’আলা যেরূপ তাদের কৃত অপরাধগুলো ক্ষমা করে দেন, তেমনি সকল তিক্ততা ভুলে তাদের ভ্রাতৃ-বন্ধনে আবদ্ধ করা এবং ভ্রাতৃত্বের সকল দাবী পূরণ করা মুসলিমদের উপর ওয়াজিব। এ শর্ত পূরণ করার ফলে তাদের উপর হাত তোলা ও তাদের জান-মাল নষ্ট করাই শুধু তোমাদের জন্য হারাম হয়ে যাবে না, বরং তার অধিক ফায়দা এই হবে যে, তারা অন্যান্য মুসলিমদের সমান হতে পারবে। কোনরূপ বৈষম্য ও পার্থক্য থাকবে না।

এছাড়াও এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত বা মুসলিম হওয়ার যে কয়টি শর্ত রয়েছে, এর মধ্যে প্রথম, কুফর ও শির্ক থেকে তাওবাহ্। দ্বিতীয় নামায কায়েম করা, তৃতীয় যাকাত আদায় করা। কারণ, “ঈমান ও তাওবাহ হল গোপন বিষয় এর যথার্থতা সাধারণ মুসলিমের জানার কথা নয়। তাই ঈমান ও তাওবার দুই প্রকাশ্য আলামতের উল্লেখ করা হয়, আর তা হল, নামায ও যাকাত। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলেনঃ এ আয়াত সকল কেবলানুসারী মুসলিমের রক্তকে হারাম করে দিয়েছে। (তাবারী; ফাতহুল কাদীর) অর্থাৎ যারা নিয়মিত নামায ও যাকাত আদায় করেন এবং ইসলামের বরখেলাফ কথা ও কর্মের প্রমাণ পাওয়া যায় না, সর্বক্ষেত্রে তারা মুসলিমরূপে গণ্য, তাদের অন্তরে সঠিক ঈমান বা মুনাফিকী যাই থাক না কেন। আবু বকর সিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম যখন মুসলিম নামধারী কথিত কিছু যাকাত অস্বীকারকারী সাহাবীদের বিরুদ্ধে জ্বিহাদের ঘোষণা দেন, তখন অনেকের অন্তর দ্বিধাদন্দে পতিত হলে এ আয়াত শরীফ দ্বারা তিনি তাদের অস্ত্ৰধারনের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে সাহাবায়ে কেরামের সন্দেহ নিরসন করেছিলেন। (তাবারী)

অতএব স্পষ্ট হয়ে গেলো নামায যারা পরিত্যাগ করেছে তারা মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ নামায হল তাওহীদ ও রিসালতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করার পর ইসলামের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, যা মহান আল্লাহ তা’আলার প্রধান হক। নামাযের পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও ফরযকৃত রুকন হল যাকাত, যা অস্বীকার করায় কিছু লোককে মুরতাদ ঘোষণা করে আবু বকর সিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম উনার খিলাফতকালে তাদের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ ঘোষণা করেন, তখন হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম তখন বলেনঃ আপনি (সে সব) লোকদের বিরুদ্ধে কিভাবে যুদ্ধ করবেন (যারা সম্পূর্ণ ধর্ম পরিত্যাগ করেনি, বরং কেবল যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে মাত্র)? অথচ রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ “কলিমা শরীফ” পাঠের আগ পর্যন্ত মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ আমাকে দেয়া হয়েছে, যে কেউ তা পাঠ করলো, সে তার সম্পদ ও জীবন আমার পক্ষ থেকে নিরাপদ করে নিলো। তবে ইসলামের বিধান লঙ্ঘন করলে (শাস্তি দেয়া যাবে), আর তার অন্তরের গভীর (হৃদয়াভ্যন্তরে কুফরী বা পাপ লুকানো থাকলে এর) হিসাব-নিকাশ মহান আল্লাহ তা’আলার যিম্মায় (বুখারি শরীফ ১৩৯৯)। তাছাড়া মুসলিমদের রক্ত ঝরানো অন্য মুসলিমের উপর হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এইভাবে, “মুসলামনদের হত্যা করা কুফুরি” (বুখারি শরীফ ৬০৪৪)। তখন আবু বক্বর সিদ্দিক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ মহান আল্লাহ তা’আলার শপথ! তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই আমি যুদ্ধ করবো যারা নামায ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, কেননা যাকাত হল সম্পদের উপর আরোপিত হক্ব। মহান আল্লাহ তা’আলার কসম। যদি তারা একটি মেষ শাবক যাকাত দিতেও অস্বীকৃতি জানায় যা রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামের কাছে তারা দিত, তাহলে যাকাত না দেয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই যুদ্ধ করবো। ‘উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আলাইহিস সালাম তখন বলেনঃ মহান আল্লাহ তা’আলার কসম, মহান আল্লাহ তা’আলা আবু বকর সিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আলাইহিস সালামের হৃদয় বিশেষ জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত করেছেন বিধায় উনার এ দৃঢ়তা, এতে আমি বুঝতে পারলাম উনার সিদ্ধান্তই যথার্থ। (বুখারি শরীফ ১৪০০) আর উনার এই দৃঢ়তার হেতু ছিলো এই আয়াত শরীফ ( فَاِنۡ تَابُوۡا وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّکٰوۃَ فَاِخۡوَانُکُمۡ فِی الدِّیۡنِ) অতঃপর যদি তারা (মুশরিকরা) তাওবাহ করে এবং নামাজ আদায় করে এবং যাকাত প্রদান করে তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। (আল কুরআন ৩/৮১)

খুবই স্পষ্ট বিষয়, যাকাতের অবস্থান দ্বীনে নামাযের পরে, আগে নয়, সেই যাকাত আদায় করতে না চাইলে যদি মুরতাদ হয়ে যায়, তাদের সাথে জ্বিহাদ ফরজ হয়, তাহলে যে নামায ছেঁড়ে দিলো সে যে মুরতাদ হয়ে গেলো এতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ হাদিসে রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামে এসেছে, “আমাদের ও তাদের (কাফেরদের) মধ্যে যে চুক্তি রয়েছে তা হলো নামায। অতএব যে ব্যক্তি নামায পরিত্যাগ করলো, সে কুফরী করলো।” (আবু দাউদ শরীফ ১০৭৯) তিনি আরো বলেন, “মু’মিন বান্দা ও শিরক-এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে নামায বর্জন করা। অতএব যে ব্যক্তি নামায পরিত্যাগ করলো, সে অবশ্যই শিরক করলো।” (আবু দাউদ শরীফ ১০৮০) আরো বলা হয়েছে, “(মু’মিন) বান্দা ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য হল নামায পরিত্যাগ করা।” (মিশকাত ৫৭৯, মুসলিম শরীফ ৮২, আবু দাউদ শরীফ ৪৬৭৮, নাসাঈ শরীফ ৪৬৮, তিরমিজি শরীফ ২৬২০, ইবনে মাজাহ শরীফ ১০৭৮) অতএব স্পষ্ট হয়ে গেলো যে যারা নামায পরিত্যাগ করেছে তারা শিরক করে কুফরে লিপ্ত হয়ে যায়, আর যারা কুফরের হালে মৃত্যুবরন করবে তারা মুশরিক বলেই গন্য হবে, কে মানলো কে মানলনা এইসব দেখার টাইম নাই।

মহান আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ ( مُنِیۡبِیۡنَ اِلَیۡهِ وَ اتَّقُوۡهُ وَ اَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ لَا تَکُوۡنُوۡا مِنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ) তোমরা একনিষ্টভাবে উনারই অভিমুখী হও এবং শুধু উনাকেই ভয় করো, তোমরা নামায কায়েম করো এবং কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়োনা। (আল কুরআন ৩০/৩১) অর্থাৎ, ঈমান, মহান আল্লাহ তা’আলার ভয় (তাকওয়া ও পরহেযগারী) এবং নামায ত্যাগ করে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেয়ো না। আমরা সবাই জানি মুশরিক এক দরজা দ্বীন ইসলামে, এছাড়াও আমাদের অনেকের ধারণা যে শিরক আর কুফর হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট দরজা, কিন্তু না এর চেয়েও জঘন্য দরজা হচ্ছে নিফাকের, কারণ নিফাক শিরক আর কুফরের চেয়েও মারাত্বক দরজা মুনাফিকের সবচেয়ে উঁচু স্থান। এর জন্য এর শাস্তিও সবচেয়ে জঘন্য, ৭ দোযখের মধ্যে সবচেয় নিকৃষ্ট হচ্ছে যাহান্নাম যেখানে কোন মুসলিম তো দূর অমুসলিম ও প্রবেশ করাবেন না মহান আল্লাহ তা’আলা। সেটা মুনাফিকদের জন্যেই বরাদ্দ, ভাবা যায়। আর যারা নামায পরিত্যাগ করে তারা মুনাফিক ও হয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহ তা’আলা আল বলেনঃ ( اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰهَ وَ هُوَ خَادِعُهُمۡ ۚ وَ اِذَا قَامُوۡۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوۡا کُسَالٰی ۙ یُرَآءُوۡنَ النَّاسَ وَ لَا یَذۡکُرُوۡنَ اللّٰهَ اِلَّا قَلِیۡلًا) নিশ্চয় মুনাফিকগণ মহান আল্লাহ তা’আলাকে ধোঁকা দিতে চায়। কিন্তু (বাস্তবতা হলো) তারা নিজেরাই নিজেদের ধোঁকা দেয়। আর যখন তারা নামাজে দণ্ডায়মান হয়, তখন (তারা) অলসভাবেই দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় (আমরা মহান আল্লাহ তা’আলার স্মরণে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু) তারা মহান আল্লাহ তা’আলাকে (খুব) কমই স্মরণ করে। (আল কুরআন ৪/১৪২) উক্ত আয়াতের শানে নুযুলে রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “এটা মুনাফিকের নামায, এটা মুনাফিকের নামায, এটা মুনাফিকের নামায। সে বসে বসে সূর্যের অপেক্ষা করতে থাকে। অবশেষে যখন সূর্য শয়তানের দু’টি শিঙের মধ্যবর্তী স্থানে (অস্ত যাওয়ার কাছাকাছি সময়ে) পৌঁছে, তখন (ত্বরিঘড়ি) উঠে চারটি ঠোকর মেরে নেয়; এর দ্বারা সে (মূলত) খুব কমই মহান আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করে থাকে। (মুয়াত্তা মালিক ১৫/৪৮, আবু দাউদ শরীফ ৩১৩, মিশকাত ৫৯৩, তিরমিজি শরীফ ১৬০, নাসাঈ শরীফ ৫১১, মুসলিম শরীফ ৬২২) ফিকিরের বিষয় দেখানো নামাযের বেলায় যদি এই হয় অবস্থা তাহলে যারা ছেঁড়ে দিলো তাদের কি হতে পারে তা বলার কোন প্রয়োজন ই নাই উপস্থাপিত অসংখ্য অগণিত আয়াত ও হাদিসের স্পষ্ট হুকুমের বিপরীতে, এর পরেও দেখুন রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুনাফিকদের জন্য ফজর ও ‘ইশার নামায অপেক্ষা অধিক ভারী নামায আর নেই। এ দু’ নামাযের কী ফযীলত, তা যদি তারা জানতো, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা উপস্থিত হতো।” (বুখারি শরীফ ৬৫৭, মুসলিম শরীফ ৬৫১বি, রিয়াদুস ছ্বলেহীন ১০৭৩, বুলুগ আল মারাম ২/৩০৬)

কি একটা অবস্থা চিন্তা করে দেখেন, যারা মুনাফিক তাদের জন্যে ফজর ও ইশার নামায অনেক কষ্টের তাই তারা আদায় করতে চায়না, আর যারা করে থাকে লোক লজ্জার ভয়ে তারাও সেই (আল কুরআন ৪/১৪২) অনুসারে কেবল লোক দেখানোর জন্য দাঁড়ায় নাউযুবিল্লাহ। এখন যারা কোন নামায ই পড়েনা তাদের ব্যপারে কি আর কোন দলিল পেশ করা লাগে? এতো এতো স্পষ্ট দলিল দেওয়ার পরে? অথচ সামান্য ফিকির করলেই দেখা যাবে, মুসলিম শরীফ ৬২২ এর হাদিসে যে বলা হয়েছে “এটা মুনাফিকের নামায” এর মানে হলো, যেহেতু এরা মুসলিম সেজে থাকতে বাধ্য ছিলো তাই কোন রকম চারটি ঠোকর মেরে নেয় যাতে নামায না পড়ার কারণে কেউ অমুসলিম হিসেবে গন্য না করে, কারণ এই (মিশকাত ৫৭৯, মুসলিম শরীফ ৮২, আবু দাউদ শরীফ ৪৬৭৮, নাসাঈ শরীফ ৪৬৮, তিরমিজি শরীফ ২৬২০, ইবনে মাজাহ শরীফ ১০৭৮) হাদিস গুলির মধ্যে নামায না পড়া মানুষেরা মুশরিক বলে সাব্যস্থ হয়ে আছে রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম দ্বারা সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের নিকটে। সেই যামানায় রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামের উপস্থিতিতে মুনাফিকদেরও সেই সাহস হয়নি যে তারা নামায ছেঁড়ে দেবে কারণ তাদের জানা ছিলো যে নামায পরিত্যাগকারি কাফির, আমরা যদি নামায ছেঁড়ে দেই তাহলে আমাদের কুফর প্রকাশ হয়ে যাবে মুসলিম মিল্লাতের সম্মুখে তাই কষ্ট হলেও তারা পড়ত, কিন্তু তাদের তো কষ্ট হতো একারণেই মহান আল্লাহ পাঁক আল কুরআনে আর রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম হাদিস শরীফে এদের মুনাফিকির স্পষ্ট বিবরণ দিয়েছেন। এর পর আর কোন দলিল, কোন কথা বলার থাকেইনা। এখন যারা নিজেকে মুসলিম বলে অথচ নামায পড়েনা, তারা যদি ঈমান নিয়ে মরতে চায় তাহলে এই মুহূর্তে তাওবা করে নামায শুরু করে দিক শেষ দম বের হওয়ার পূর্বে, নতুবা এই নামায পরিত্যাগ করা অবস্থায় যদি মৃত্যু হয় তাহলে সে মুশরিক অবস্থায় কুফরের হালেই দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। মহান আল্লাহ পাঁক উনার নিকট পানাহ চাই আমাদের বেনমাজিন না বানান, মুনাফিক নামাজিও না বানান।

বিঃদ্রঃ আমি আমার কোন লিখার মধ্যে হাদিসের রেফারেন্সে সহিহ, হাসান ব্যতীত দ্বয়ীফ হাদিস দলিল হিসেবে দেইনা, যদি কখনো কারো চোখে পড়ে তাহলে আমাকে জানাবেন, ইন’শা-আল্লাহ ইডিট করে দেব, তবে অবশ্যই তা একা গোস্তাখ কাজ্জাব আল্বানির মতে হলে হবেনা।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: