২০০২ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় আমেরিকান বাহিনীর হাতে এমন এক অস্ত্র ছিল, যার নাম কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যম তেমনভাবে উচ্চারণই করেনি। সেটি কোনো বোমা ছিল না, কোনো মিসাইলও ছিল না। সেটি ছিল একটি আওয়াজ। ইরাকি সৈন্যরা, যারা বাঙ্কারের ভেতরে লুকিয়ে ছিল, যারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল, তারা হঠাৎ নিজেদের মাথার ভেতরে একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। সেখানে কোনো স্পিকার ছিল না, কোনো রেডিওও ছিল না। কিন্তু ভেতর থেকে যেন একটি আওয়াজ এলো “আল্লাহ তোমাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিচ্ছেন।” আর তারা আত্মসমর্পণ করল।
এখানে আমি কোনো গল্প বলছি না, কোনো কল্পকাহিনীও বলছি না। যে কথা বলা হচ্ছে, তা এই দাবি নিয়ে বলা হচ্ছে যে এ ধরনের প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিবন্ধিত পেটেন্ট রেকর্ডের আওতায় বহু আগেই এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো, যদি ২০০২ সালেই এমন প্রযুক্তি কারো মাথার ভেতরে “আল্লাহ”র কণ্ঠস্বরের মতো কিছু পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে ২০২৬ সালে আকাশে আলোক-প্রক্ষেপণ, হলোগ্রাম বা দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি দেখিয়ে মানুষকে এই বিশ্বাসে আনা কি অসম্ভব যে হযরত ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম-এর নুযূল হয়ে গেছে?
এই প্রশ্নকে হালকাভাবে নেওয়া বোকামি হবে। কারণ দুনিয়ায় এই মুহূর্তে শত শত কোটি মানুষ এমন আছে, যারা কোনো না কোনো আসমানি ঘটনার অপেক্ষায় আছে। মুছলিমরা অপেক্ষা করছে। খ্রিষ্টানরাও অপেক্ষা করছে। তারা এমন এক প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আছে, এমন এক মসীহার অপেক্ষায় আছে, যিনি এসে দুনিয়াকে সোজা করবেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, পথভ্রষ্টতাকে ভেঙে দেবেন। কিন্তু সমস্যা হলো শুধু এই অপেক্ষাই নেই; এই অপেক্ষাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মতো প্রযুক্তিও এখন পৃথিবীতে উপস্থিত। আর যাদের হাতে সেই প্রযুক্তি আছে, তারা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, ভয়, আশা, মসীহা-প্রত্যাশা, এবং অলৌকিক ঘটনার প্রতি মানসিক দুর্বলতা সবই জানে। তারা জানে মানুষ কী দেখতে চায়, কী শুনতে চায়, কী বিশ্বাস করতে চায়। আর সেই কারণেই প্রোজেক্ট ব্লু বিম নামের আলোচিত ধারণাটিকে একেবারে তুচ্ছ করে দেওয়ার সুযোগ নেই।
আজ আমি শুধু প্রোজেক্ট ব্লু বিমের নাম বলছি না। আমি বলছি সেই প্রযুক্তিগত ভিত্তির কথা, সেই মানসিক প্রস্তুতির কথা, সেই ঐতিহাসিক বিন্যাসের কথা, যেগুলো মিলে এমন এক বিশ্বব্যাপী প্রতারণাকে সম্ভব করে তুলতে পারে। আর আমার বক্তব্য হলো, এই প্রস্তুতি আজকের নয়; এর শিকড় প্রায় দুই হাজার বছর আগেই পুঁতে দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে তিনটি বিষয় বুঝে নেওয়া দরকার। দাবি করা হয়, এগুলো সবই নিবন্ধিত, লিপিবদ্ধ, এবং সরকারি রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত পেটেন্ট। এরপরই বোঝা যাবে কেন এগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম যে পেটেন্টের কথা বলা হয়, সেটি হলো US Patent 3951134। বলা হয়, এটি ১৯৭৪ সালে দাখিল করা হয় এবং ১৯৭৬ সালে মঞ্জুর করা হয়। এর বিষয়বস্তু হিসেবে যে কথা সামনে আনা হয় তা হলো মানুষের মস্তিষ্কীয় তরঙ্গ দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রভাবিত করা। অর্থাৎ প্রযুক্তির এমন এক ধাপ, যেখানে মানুষের মানসিক সংকেত দূর থেকেই নজরদারি ও পরিবর্তনের চিন্তা করা হয়েছে।
এরপর আসে দ্বিতীয় পেটেন্ট US Patent 5159703। এটি ১৯৮৯ সালে দাখিল হয় এবং ১৯৯২ সালে মঞ্জুর হয়। এটিকে বলা হয় এমন এক নিঃশব্দ অবচেতন প্রভাব ব্যবস্থা, যেখানে বাইরে কোনো শব্দ শোনা যাবে না, কিন্তু লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তি নিজের ভেতরে প্রভাব অনুভব করবে। বাইরে কেউ কিছু শুনবে না; কিন্তু যাকে লক্ষ্য করা হয়েছে, সে-ই শুনবে, সে-ই প্রভাবিত হবে।
তারপর আসে তৃতীয় পেটেন্ট US Patent 6470214। এটি ১৯৯৬ সালে দাখিল হয় এবং ২০০২ সালে মঞ্জুর হয়। একে বলা হয় রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি শ্রবণ-প্রভাব বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও যন্ত্র। সহজ ভাষায়, এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে মাঝখানে প্রচলিত কোনো যোগাযোগমাধ্যম ছাড়াই মানুষের মাথার ভেতরে সরাসরি শব্দের মতো প্রভাব তৈরি করা যায়। আরও বলা হয়, এ ধরনের প্রযুক্তি ইরাক যুদ্ধে মানসিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
এখন এখানে বড় প্রশ্নটি হলো: যদি ১৯৭৬ থেকে ২০০২ সালের মধ্যেই এসব প্রযুক্তি প্রকাশ্য রেকর্ডে থেকে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে গোপন অবস্থায় কী আছে? কারণ সাধারণ নিয়ম হলো যা প্রকাশিত হয়, তা-ই কোনো রাষ্ট্র বা আধিপত্যবাদী শক্তির সর্বোচ্চ সক্ষমতা নয়; বরং অনেক সময় তা কেবল তাদের অর্জনের সামান্য অংশমাত্র।
এবার আসি প্রোজেক্ট ব্লু বিমের দিকে।
যারা আগে থেকেই এই নাম শুনেছেন, তাদের জন্য এটি পুনরালোচনা। আর যারা শোনেননি, তাদের জন্য পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। ১৯৯৪ সালে কানাডীয় সাংবাদিক সার্জ মনাস্ট একটি বহুল আলোচিত দাবি সামনে আনেন। তিনি বলেন, নাসা এবং দুনিয়ার প্রভাবশালী গোপন শক্তিগুলোর একটি পরিকল্পনা আছে, এবং তারা সেটি চারটি ধাপে বাস্তবায়ন করতে চায়।
প্রথম ধাপ হলো ভুয়া প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার। উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর সব ধর্মকে ধীরে ধীরে অবিশ্বাস্য করে তোলা। মানুষকে এমন সব তথাকথিত আবিষ্কার দেখানো হবে, যেন সে মনে করে আসমানি ধর্মগুলোর ইতিহাস ভেঙে পড়েছে। তাকে এমন সব ইতিহাস শেখানো হবে, যেন নাবীগণের ইতিহাস, মানবতার সূচনা, আসমানি কিতাবের বয়ান সবই কেবল প্রাচীন কল্পকাহিনী।
এখানে একটি বিষয় খেয়ালযোগ্য। একদিকে মানুষকে লক্ষ লক্ষ বছর, কোটি কোটি বছর, এমনসব সময়সীমার গল্প শোনানো হয়; অন্যদিকে এমনও গবেষক আছেন, যারা পৃথিবীকে তুলনামূলকভাবে নবীন বলে দেখার চেষ্টা করেছেন। ইহুদি বর্ষপঞ্জিও একটি সীমিত সময়সীমা ধরে চলে এবং তার শুরু হযরত আদম য়ালাইহিছ ছালাম থেকে ধরে। অর্থাৎ বিরোধটা কেবল বিজ্ঞান ও ধর্মের নয়; বরং ইতিহাসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, মানুষের সূচনাকাহিনী কে লিখবে, সেই লড়াইও বটে। প্রথম ধাপের মূল লক্ষ্য তাই মানুষের ধর্মীয় নিশ্চিততা ভেঙে দেওয়া।
দ্বিতীয় ধাপ হলো আকাশে মসীহার প্রতিচ্ছবি দেখানো। দাবি করা হয়, আকাশে প্রতিটি ধর্মের প্রতীক্ষিত মুক্তিদাতার মতো দৃশ্য তুলে ধরা হবে। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছুকে একত্র করে একটি বিশ্বজনীন আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের ছবি দাঁড় করানো হবে। আপনি যদি আজকের পৃথিবী লক্ষ্য করেন, দেখবেন আকাশে ড্রোনের সাহায্যে আলোর নকশা, বিশাল আলোক-প্রদর্শনী, মাঝআকাশে দৃশ্য নির্মাণ এসব এখন আর কল্পকথা নয়। মানুষ আকাশে আলো দেখলে বিস্মিত হয়, আবেগপ্রবণ হয়, সহজেই প্রভাবিত হয়। এখন এই একই পদ্ধতি যদি ধর্মীয় প্রত্যাশার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তার মানসিক প্রভাব কতটা তীব্র হতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়।
তৃতীয় ধাপ হলো মানুষের ভেতরে “ঐশী কণ্ঠস্বর” সৃষ্টি করা। এখানে আগের পেটেন্টগুলোকে প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। বক্তব্য হলো, যদি আকাশে কোনো আলোকময় প্রতিচ্ছবি দেখানো হয়, আর সেই একই সময়ে নির্দিষ্ট মানুষদের মাথার ভেতরে কোনো নির্দেশের মতো কিছু পৌঁছে দেওয়া হয়, তাহলে তারা সেটিকে আসমানি নির্দেশ বলেই ধরে নিতে পারে।
চতুর্থ ধাপ হলো ভুয়া ভিনগ্রহী আক্রমণ। অর্থাৎ এমন একটি সাজানো বৈশ্বিক সংকট তৈরি করা, যার মাধ্যমে নতুন বিশ্বব্যবস্থা, নতুন আনুগত্য, নতুন আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব, এমনকি নতুন ধরনের বিশ্ব-উপাস্য পর্যন্ত দাঁড় করানো যেতে পারে এমনটাই এই তত্ত্বের দাবি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিনগ্রহী প্রাণী, অজানা উড়ন্ত বস্তু, গোপন নথি, সামরিক স্বীকারোক্তি, বড় বড় আলোচনামঞ্চে এসব প্রসঙ্গের পুনরাবৃত্তি বেড়েছে। যেন মানুষকে ধীরে ধীরে এমন একটি কাহিনির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সার্জ মনাস্টকে পরবর্তীতে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তিনি মারা যান, তার মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত হয়নি, এবং তার নথিপত্র জব্দ করা হয়েছিল এমন দাবিও এই আলোচনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। আমি এখানে সেই ঘটনার বিচার করছি না; আমি দেখাচ্ছি, কী ধরনের বক্তব্য নির্মাণ করা হয়েছে এবং কেন অনেক মানুষ সেটিকে গুরুত্ব দেয়।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আসে। প্রযুক্তি থাকলেই তো হবে না। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ কেন একটি ভুয়া মসীহার পেছনে হাঁটতে যাবে? কেন তারা সেটিকে সত্যি বলে মেনে নেবে?
আমার বক্তব্য হলো কারণ তাদের প্রস্তুতি আজ থেকে শুরু হয়নি। তাদের মানসিক, ধর্মতাত্ত্বিক, চিত্রভিত্তিক, এবং মসীহা-প্রত্যাশী প্রস্তুতি বহু শতাব্দী ধরে গড়ে তোলা হয়েছে।
এখানে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক সামনে আসে ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দের নাইসিয়ার কাউন্সিল। রোমান সম্রাট কনস্টান্টিন একটি সভা ডাকলেন। সেখানে ৩১৮ জন বিশপ অংশ নিলেন। এখন প্রশ্ন হলো, কেন একজন সম্রাট খ্রিষ্টধর্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে বসবেন? কেন তিনি ঠিক করবেন, ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম কে ছিলেন?
সেই সভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য ছিল ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম-এর পরিচয়। আর এখানেই এমন এক ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো জোরদার করা হয়, যা পরে ত্রিত্ববাদের প্রতিষ্ঠিত রূপে পৌঁছে যায়। যারা এই ধারার সঙ্গে একমত হয়নি, তাদের নির্বাসিত করা হয়েছিল এমন কথাও ইতিহাস আলোচনায় বারবার উঠে আসে।
এখানে আরেকটি বহুল উচ্চারিত দাবি হলো অনেকগুলো ইনজিল বা গসপেল পেশ করা হয়েছিল, কিন্তু অনুমোদন দেওয়া হয় মাত্র অল্প কয়েকটিকে; বাকিগুলো বাতিল করা হয়, ধ্বংস করা হয়। এই দাবির সব খুঁটিনাটি নিয়ে আলাদা ঐতিহাসিক আলোচনা হতে পারে, কিন্তু আমার বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু অন্য জায়গায়। সেটি হলো: যখন ধর্মীয় বয়ানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঢুকে পড়ে, তখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটি সম্পাদিত ধর্মীয় কল্পচিত্র উত্তরাধিকারসূত্রে পায়। তখন তারা যে মসীহার অপেক্ষা করে, সেটিও অনেক সময় ওহির নির্মল ধারাবাহিকতার মসীহা নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে গড়া এক চিত্র।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ যদি বহু শতাব্দী আগে থেকেই মানুষের কল্পনায় এমন এক প্রত্যাবর্তনের ছবি গড়া হয়ে থাকে, যার সঙ্গে আলো, আসমান, অলৌকিকতা, উজ্জ্বল অবয়ব, স্বর্গীয় আবহ, সবকিছু জড়িয়ে আছে, তাহলে আজকের প্রযুক্তি সেই ছবি অনুকরণ করার জন্য একেবারে প্রস্তুত মঞ্চ পেয়ে যায়।
এরপর আসে ডেড সি স্ক্রোলস-এর প্রসঙ্গ। ১৯৪৭ সালে কুমরানের মরুভূমিতে এক রাখাল গুহার ভেতরে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করে। পরে এগুলো ডেড সি স্ক্রোলস নামে পরিচিত হয়। কিন্তু বলা হয়, বহু বছর সাধারণ মানুষের জন্য এগুলোর পূর্ণ প্রবেশাধিকার খোলা হয়নি। প্রশ্ন হলো, কেন?
এই আলোচনায় দাবি করা হয়, কারণ ঐসব পাণ্ডুলিপিতে এমন উপাদান ছিল, যা ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম-কে খোদা নয়, বরং নাবী হিসেবে বুঝতে সহায়তা করে। এখানে কিছু গবেষকের নামও আনা হয়, যাতে বোঝানো যায় যে বহু আগেই কিছু নথি এমন ইঙ্গিত বহন করছিল, যা ইসলামের বক্তব্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামের বক্তব্য তো সুস্পষ্ট হযরত ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বান্দা এবং নাবী। যদি ইতিহাসের চাপা পড়ে থাকা কিছু নথিও সেই দিকেই ইঙ্গিত করে, তবে এর অর্থ দাঁড়ায় বিশ্বের একটি বড় অংশ যে মসীহার প্রতীক্ষায় আছে, তার ধারণাটিই হয়তো বহু আগে সম্পাদিত ও বিকৃত করা হয়েছে।
এখন সবকিছু একত্রে চিন্তা করুন।
যদি আকাশে এক আলোকময় অবয়ব দেখানো হয়, যদি তাকে আসমান থেকে অবতরণরত বলে উপস্থাপন করা হয়, যদি তার চারপাশে অলৌকিক পরিবেশ তৈরি করা হয়, যদি সামাজিক মাধ্যমে হাজারো ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যদি মানুষের মাথার ভেতরে কোনো কণ্ঠস্বর বা নির্দেশের অনুভূতি তৈরি করা যায়, তাহলে কোটি কোটি মানুষ সেটিকে সত্য বলে ধরে নিতে পারে। কারণ প্রতারণা তখন কেবল প্রযুক্তি দিয়ে হবে না; তা হবে মানুষের বহু শতাব্দী ধরে প্রস্তুত করা ধর্মীয় প্রতীক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে।
আজ মাঝআকাশে আলোক-প্রক্ষেপণ সম্ভব। কৃত্রিম ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। মানুষের কণ্ঠস্বর প্রায় হুবহু নকল করা সম্ভব। সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তে লক্ষ-কোটি মানুষের মনে একই বয়ান ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব। যদি এসবকিছুকে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এটি আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় সম্মিলিত প্রতারণা-ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু এখানেই এমন একটি উপাদান আছে, যা এই পুরো পরিকল্পনার সঙ্গে মেলে না। আর সেটি হলো ক্বুরআন মজীদ।
যারা ইনজিলের ওপর কর্তৃত্ব করেছে এমন দাবি আছে। যারা ধর্মীয় পাঠ বাছাই করেছে এমন দাবি আছে। যারা বহু নথি চাপা দিয়েছে এমন অভিযোগ আছে। কিন্তু ক্বুরআন মজীদকে তারা পরিবর্তন করতে পারেনি। পাঠ-সংরক্ষণে, মুখস্থধারায়, তিলাওয়াতের ধারাবাহিকতায়, এবং উম্মাহর ঐকমত্যে ক্বুরআন এমনভাবে সংরক্ষিত যে সেটিকে মানুষের ইচ্ছামতো পাল্টে ফেলা যায়নি।
অনেকে এখানে সংখ্যাতাত্ত্বিক গঠন, উনিশ-ভিত্তিক বিন্যাস, এবং ক্বুরআনের অভ্যন্তরীণ রচনাশৈলীর কথাও তোলেন। সে আলোচনা স্বতন্ত্রভাবে দীর্ঘ। কিন্তু মূল বক্তব্য একটাই ক্বুরআন এমন এক কিতাব, যাকে মানুষের সম্পাদনায় অন্য রূপে বদলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এই কারণেই ইসলামে মসীহা-ধারণাকে ইচ্ছামতো পাল্টে দেওয়া যায়নি।
ইছলাম হযরত ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম-এর প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে অস্পষ্ট কথা বলে না। ইছলাম আবছা ইশারা দিয়ে থেমে যায় না। ইছলাম নির্দিষ্ট আলামত দেয়, নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট দেয়, নির্দিষ্ট বর্ণনা দেয়। ফলে কেউ আকাশে আলো দেখাল, বিশাল আকৃতি দেখাল, মানুষের মনে কণ্ঠস্বর ঢুকিয়ে দিল, আর সামাজিক মাধ্যমে হৈচৈ তুলল এতেই একজন সচেতন মুছলিম বলে দেবে না যে এটাই হযরত ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম।
কারণ ইসলামে দলীল আছে। নাছ আছে। আলামত আছে। ছ্বহীহ বর্ণনা আছে। দামিশ্কের দিক, সময়, দজ্জালের ফিতনার প্রেক্ষাপট এসব এত স্পষ্টভাবে এসেছে যে আলোর প্রদর্শনী দিয়ে, যন্ত্রের কৌশল দিয়ে, কৃত্রিম শব্দ দিয়ে, সামাজিক উন্মাদনা দিয়ে তা নকল করা গেলেও প্রকৃত আসমানি ঘটনা বানানো যাবে না। সাজানো দৃশ্য আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নিদর্শন এক জিনিস নয়।
তাই আমি এই লেখার শেষে এসে মানুষকে শুধু ভয় দিয়ে ছেড়ে দিতে চাই না। হ্যাঁ, ভয় পাওয়ার জায়গা আছে। কারণ প্রতারণা বাস্তব। প্রযুক্তি বাস্তব। মানসিক যুদ্ধ বাস্তব। ইতিহাসভিত্তিক প্রস্তুতি বাস্তব। মানুষের প্রতীক্ষাকে অস্ত্র বানানোর সম্ভাবনাও বাস্তব। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও বাস্তব একজন সচেতন মুছলিমকে ধোঁকা দেওয়া সবচেয়ে কঠিন।
শয়তানি প্রকল্প সবসময় জাহেল জনতাকে চায়। প্রমাণহীন আবেগপ্রবণ জনতাকে চায়। ইতিহাস না-জানা জনতাকে চায়। ক্বুরআন না-পড়া জনতাকে চায়। হাদীছ না-জানা জনতাকে চায়। আলামত না-বোঝা জনতাকে চায়। কারণ তারা আলো দেখলে মুগ্ধ হবে, আওয়াজ শুনলে মেনে নেবে, ভিড় দেখলে স্রোতে ভাসবে।
কিন্তু যে মুছলিম ক্বুরআন জানে, যে মুছলিম দজ্জালের ফিতনার প্রকৃতি বোঝে, যে মুছলিম ওহি ও প্রতারণার পার্থক্য চিনে, যে মুছলিম জানে আসমানি দাবি আবেগ দিয়ে নয়, দলীল দিয়ে যাচাই করতে হয় তাকে সহজে বোকা বানানো যায় না।
এই কারণেই আজকের জরুরি কাজ আতঙ্ক ছড়ানো নয়; বরং প্রস্তুত হওয়া। ঈলমে প্রস্তুত হওয়া। ক্বুরআনে প্রস্তুত হওয়া। ছুন্নাহ মোবারক-এর আলোকে প্রস্তুত হওয়া। আলামত বোঝায় প্রস্তুত হওয়া। বিশেষভাবে ছূরাহ কাহাফ-এর প্রথম ১০ আয়াতকে জীবনের অংশ বানানো। কারণ রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম দজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য এ বিষয়ে উম্মতকে আগেই সতর্ক করে গিয়েছেন।
আজকের যুবকদের বড় অংশ এসব কিছু জানে না। তাদের বিদ্যালয় শেখায় না। মহাবিদ্যালয় শেখায় না। বিশ্ববিদ্যালয় শেখায় না। পরিবারে এই আলোচনা হয় না। বন্ধুমহলেও হয় না। ফলে এই কথাগুলোকে স্বাভাবিক আলোচনার অংশ করতে হবে। এগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে। কারণ প্রতারণার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা হলো আগেই সত্যটি জেনে রাখা।
মানুষকে জানতে হবে, কীভাবে তাকে ধোঁকা দেওয়া হতে পারে। মানুষকে জানতে হবে, কেন কোনো বিশ্বজনীন আধ্যাত্মিক প্রদর্শনী দেখে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নত করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মানুষকে জানতে হবে, আসমানি দাবির বিচার আলো দিয়ে নয়, দলীল দিয়ে হয়; হৈচৈ দিয়ে নয়, ওহির মিজান দিয়ে হয়; ভাইরাল দৃশ্য দিয়ে নয়, সহীহ নছের ভিত্তিতে হয়।
আমার বক্তব্যের সারকথা একটাই: প্রোজেক্ট ব্লু বিম সত্যিই বাস্তবায়িত হবে কি হবে না, সেটি দ্বিতীয় প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন হলো এমন কিছু বাস্তবায়ন করার মতো প্রযুক্তি, মানসিক প্রস্তুতি, সংবাদ-নিয়ন্ত্রণ, দৃশ্য-নির্মাণ, এবং বিশ্বজনীন প্রতীক্ষা কি ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে? আমার উত্তর অনেকাংশে হ্যাঁ। আর এই কারণেই মুছলিমদের এখনই সতর্ক হওয়া দরকার।
যদি প্রতারণা আসে, তবে তা কেবল যন্ত্রের ভাষায় আসবে না; তা আসবে ধর্মের ভাষায়, আশার ভাষায়, মুক্তির ভাষায়, নূরের ভাষায়, অলৌকিকতার ভাষায়। আর সেই কারণেই এর মোকাবিলাও হবে কেবল প্রযুক্তি-আলোচনায় নয়; বরং ক্বুরআন, ছুন্নাহ্, ইতিহাস, এবং বাছীরতের মাধ্যমে।
যে কওম মরুভূমি থেকে উঠে রোমান সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে, সেই কওম আবারও জেগে উঠতে পারে যদি সে জানে তার বিরুদ্ধে কী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যে যুবক আজ আলামত জানে না, কাল সে-ই হয়তো সাজানো অলৌকিক দৃশ্যের সামনে মাথা নত করবে। আর যে যুবক আজ ক্বুরআনের আলোয় চোখ খুলে নেয়, কাল সে-ই প্রথম বুঝে ফেলবে এটি নূর নয়, এটি ফিতনা; এটি নুযূল নয়, এটি সাজানো প্রতারণা; এটি হিদায়াত নয়, এটি নিয়ন্ত্রিত ধোঁকা।
এ সময় ভয় পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় নয়। এ সময় চোখ খোলার সময়। এ সময় ক্বুরআনের দিকে ফেরার সময়। এ সময় দজ্জালের ফিতনাকে গল্প ভেবে অবহেলা করার গাফলত থেকে বেরিয়ে আসার সময়। কারণ যার হাতে দৃশ্য, শব্দ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আলোক-প্রক্ষেপণ, কণ্ঠ নকল, সংবাদ-সমন্বয়, মানসিক যুদ্ধ সে যদি মানুষের ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষাকেও অস্ত্র বানাতে শেখে, তাহলে সামনে যা আসবে তা শুধু রাজনৈতিক প্রতারণা হবে না; তা হবে আত্মিক পরিসরের প্রতারণা।
তবুও আশার জায়গা আছে। কারণ শয়তানি পরিকল্পনা যত জটিলই হোক, হক্বের মিজান তার চেয়ে স্পষ্ট। যারা জানে, তারা টিকে। যারা চিনে, তারা বাঁচে। যারা ক্বুরআন আঁকড়ে ধরে, তারা প্রতারণার কুয়াশায় হারিয়ে যায় না।
তাই আজ দরকার ক্বুরআন শরীফকে হাতে নেওয়া, ছূরাহ কাহাফকে জীবনে
নেওয়া, দজ্জালের ফিতনার আলামত বুঝা, দৃশ্য-ভিত্তিক প্রতারণার ওপর অন্ধ ঈমান না আনা,
এবং এই আলোচনা উম্মাহর ভেতরে ছড়িয়ে দেওয়া। কারণ সচেতন মুমিনই আজকের সবচেয়ে
বড় প্রতিরোধ।

0 ফেইসবুক: