Wednesday, April 1, 2026

নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ ও খফীফাহঃ পরিচয়, পরিমাণ এবং ১০টি নাপাকির বিধান সাদাস্রাব সহ

বিষয়বস্তুঃ নাপাকির প্রকারভেদ এবং পবিত্রতা অর্জনের মাছ’আলা।

কিছু নাপাকি বা অপবিত্রতা এমন আছে যেগুলোকে (اَلنَّجَاسَةُ الْغَلِيظَةُ) ‘নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ’ বলা হয় এবং কিছু অপবিত্রতা এমন আছে যেগুলোকে (نَجَاسَةُ خَفِيفَة‘নাযাছাতে খফীফাহ’ বলা হয়। প্রত্যেক মুছলমানের এটি জানা উচিত যে, সারা বিশ্বে যে নাপাক জিনিসগুলো রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কোনটি গ্বলীজ্বাহ এবং কোনটি খফীফাহ। যাতে একজন মুছলিম নামাজ পড়ার সময় এই নাযাছাতগুলোর বিধান অনুযায়ী সঠিকভাবে য়া’মল করতে সক্ষম হয়।

নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ ও এর পরিমাণঃ

নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ, “গ্বলীজ্ব” (মোটা, ঘন, কঠিন, কড়া, রুক্ষ, ভারী-প্রকৃতির) শব্দটি থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, এগুলো এমন নাযাছাত যার বিধান শরীয়তে অত্যন্ত কঠোর। এটি সামান্য পরিমাণ লাগলেও নামাজ হবে না। গ্বলীজ্বাহ-এর ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হলোঃ

যদি কাপড়ে এক দিরহামের চেয়ে বেশি লেগে যায়, তাহলে ওই কাপড়ে নামাজ হবে না।

যদি ঠিক এক দিরহামের সমান এই নাযাছাত লেগে থাকে, তবে তা পরিষ্কার করা ওয়াযিব। এই অবস্থাতেই নামাজ পড়ে নিলে এটি ওয়াযিব তরক হবে এবং এই নামাজ ‘মাকরূহে তাহরীমী’ হিসেবে আদায় হবে।

যদি নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ এক দিরহামের চেয়ে কম হয়, তবে তা পরিষ্কার করা বা পবিত্র করা একটি বরকতময় ছুন্নাহ। কিন্তু কেউ যদি ওই সামান্য নাপাকি নিয়েই নামাজ পড়ে ফেলে, তবে তার নামাজ সঠিকভাবে আদায় হয়ে যাবে। 

এখন প্রশ্ন হলো, এই এক দিরহাম পরিমাণ কতটুকু?

তরল (Liquid) নাযাছাতের ক্ষেত্রেঃ তরল নাযাছাত (যেমন প্রস্রাব বা রক্ত) হলে, এক দিরহাম হলো হাতের তালুর গভীরতা। কেউ হাতের তালু একদম সোজা করে মেলে ধরে তাতে পানি ঢাললে, উপচে পড়া বন্ধ হওয়ার পর যতটুকু পানি আটকে থাকে, একেই হাতের তালুর গভীরতা বলা হয়। এই পরিমাণ বা এর সমান দাগ হলে তা এক দিরহাম হিসেবে গণ্য হবে।

কঠিন (Solid) নাযাছাতের ক্ষেত্রেঃ নাযাছাত যদি তরল না হয়ে কঠিন পদার্থ হয়, তবে এক দিরহামের ওজন হলো সাড়ে চার মাশা (গ্রামে কনভার্ট করলে ৪.২ বা ৪.৩ গ্রামের চেয়ে সামান্য বেশি)। এত ভারী বা ওজনের নাযাছাত কাপড়ে লেগে গেলে তা দূর করা ওয়াযিব।

নাযাছাতে খফীফাহ ও এর পরিমাণঃ

নাযাছাতে খফীফাহ ওই নাযাছাতগুলোকে বলা হয়, যার বিধান শরীয়ত খাফীফ বা হালকা রেখেছে। যদি কাপড়ে বা শরীরে অনেক বেশি লাগে, তবে নামাজ হবে না; কিন্তু অল্পস্বল্প লাগলে শরীয়ত তা মাফ রেখেছেন। খফীফাহ-এর ক্ষেত্রে নিয়ম হলোঃ

যে জায়গায় বা কাপড়ের যে অংশে লেগেছে, ওই অঙ্গের বা অংশের পুরো এক-চতুর্থাংশ (চার ভাগের এক ভাগ বা ২৫ শতাংশ) যদি ঘিরে ফেলে, তবে ওই কাপড়ে নামাজ হবে না। ২৫ শতাংশের বেশি হলেও নামাজ হবে না।

কিন্তু যদি ২৫ শতাংশের কম জায়গায় লাগে, তবে নামাজ হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, জামার হাতায় লাগলে পুরো হাতার ২৫ শতাংশের কম হলে নামাজ হবে, তবে উত্তম হলো এটিকেও ধুয়ে বা মুছে পরিষ্কার করে নেওয়া।

নাযাছাতে খফীফাহ-এর প্রকারভেদঃ

সারা বিশ্বের যত নাযাছাত রয়েছে, তার মধ্যে থেকে কেবল দুটি নাযাছাত, নাযাছাতে খফীফাহ-এর অন্তর্ভুক্তঃ

১. হালাল প্রাণীদের প্রস্রাবঃ আমরা যত হালাল প্রাণী খাই (যেমন গরু, বলদ, মহিষ, পুরুষ মহিষ, পাঁঠা, ছাগল), এদের প্রস্রাব নাযাছাতে খফীফাহ। এটি কাপড়ের অংশের পুরো ২৫ শতাংশ ঘিরে ফেললে তবেই নামাজের মাছ’আলা তৈরি হয়। হালাল প্রাণীর প্রস্রাবের তিন-চার ফোঁটা লাগলে নামাজে কোনো সমস্যা হবে না, তবে ধুয়ে নেওয়া উত্তম।

২. উঁচুতে উড্ডয়নকারী হারাম পাখির বিষ্ঠাঃ যেসব হারাম পাখি উঁচুতে উড়ে (যেমন চিল, কাক, বাজ বা শিকারী), এদের বিষ্ঠাও নাযাছাতে খফীফাহ। এর বিধান খুব কঠোর নয়। কাক বা চিলের বিষ্ঠা কাপড়ে লাগলে তা মুছে নিয়ে নামাজ পড়লেও নামাজ আদায় হয়ে যাবে।

(জ্ঞাতব্যঃ কিছু প্রাণী এমন আছে যাদের বিষ্ঠা বা শরীর সম্পূর্ণ পবিত্র। যেমন যেসব হালাল পাখি উঁচুতে উড়ে এবং শস্যদানা খায়, এরা শিকারি নয় (কবুতর, ময়না ইত্যাদি), এদের বিষ্ঠা পবিত্র। একইভাবে স্থলভাগের ছোটখাটো পোকামাকড় (তেলাপোকা, মশা, মাছি), এদের রক্ত বা বিষ্ঠাও পবিত্র। বাদুড়ের বিষ্ঠাও পবিত্র বলে অধিকাংশের মত। এদের মধ্যে নাপাকির কোনো বিষয় থাকে না।)

নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ-এর প্রকারভেদঃ

খফীফাহ-এর ওই দুটি প্রকার ছাড়া বাকি যত নাযাছাত আছে, সেগুলো সবই নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহর অন্তর্ভুক্ত। নিচে এর বিস্তারিত বর্ননা দেওয়া হলোঃ

১. মানুষের শরীরের বর্জ্যঃ মানুষের শরীর থেকে নির্গত হওয়া সব নাযাছাত গ্বলীজ্বাহ। যেমন, প্রস্রাব, বীর্য (মানি), মাজি, ওদি, মল, প্রবহমান রক্ত, পুঁজ, পেট থেকে নির্গত মুখভর্তি বমি (এমনকি তা একদিনের শিশুর দুধের বমি হলেও) এবং রোগাক্রান্ত চোখ থেকে বের হওয়া পানি। এর কোনোটিই খফীফাহ নয়।

২. হালাল প্রাণীর গোবর বা বিষ্ঠাঃ হালাল প্রাণীর প্রস্রাব খফীফাহ হলেও এদের গোবর, বিষ্ঠা বা ম্যাঙ্গনি (যেমন গরুর গোবর, ছাগলের বিষ্ঠা) নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ।

৩. নিচুতে উড্ডয়নকারী হালাল পাখির বিষ্ঠাঃ যেসব হালাল পাখি উঁচুতে উড়তে পারে না, নিচেই চলাফেরা করে (যেমন মুরগি, হাঁস), এদের বিষ্ঠা নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ।

৪. স্থলভাগের প্রাণীর প্রবহমান রক্তঃ যেকোনো স্থলভাগের প্রাণীর (তা হালাল হোক বা হারাম) প্রবহমান রক্ত সম্পূর্ণ নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ। গরু বা ছাগল জবেহ করার পর যে রক্ত প্রবাহিত হয়, তা গ্বলীজ্বাহ। তবে মাছের ভেতরে থাকা লাল তরলকে শরীয়ত রক্ত হিসেবে গণ্য করে না, তাই মাছের রক্ত কাপড়ে লাগলে কাপড় নাপাক হবে না, পবিত্রই থাকবে।

৫. মদ (খামার): আঙ্গুরের রস ইত্যাদি দিয়ে বানানো মদ নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ। এটি মল ও প্রস্রাবের মতোই সবচেয়ে ঘৃণ্য নাপাকি। প্রস্রাব লাগলে যেমন কাপড় নাপাক হয়, মদ লাগলেও তেমনি কাপড় নাপাক হয়ে যায়।

৬. মৃত প্রাণী (মুরদার) এর গোশত ও চর্বি: যেকোনো মৃত প্রাণী (তা হালাল বা হারাম যাই হোক) এবং শরীয়তসম্মত উপায়ে “বিছমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” না পড়ে জবেহ করা প্রাণীর গোশত ও চর্বি নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ। (তবে মুছলিম বা আহলে কিতাব কর্তৃক সঠিকভাবে জবেহ করা হালাল প্রাণীর গোশত ও চর্বি পবিত্র)। শুকর (Pig) নিজ সত্তায় নাপাক (নাযিছুল আঈন), তাই তাকে হালাল পদ্ধতিতে জবেহ করলেও তার গোস্ত, চর্বি ও সবকিছু নাপাক।

৭. হিংস্র প্রাণীর লালাঃ ছিঁড়ে-ফেড়ে খাওয়া হিংস্র চতুষ্পদ প্রাণী (যেমনঃ কুকুর, সিংহ, চিতা, নেকড়ে), এদের লালা প্রস্রাবের মতোই নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ।

উপসংহারঃ নাযাছাতে খফীফাহ মাত্র দুই প্রকার, এছাড়া বাকি সব নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ। এই বিধানগুলো ভালোভাবে স্মরণ রাখলে খুব সহজেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে, কোন নাযাছাত ধুয়ে নামাজ পড়তে হবে এবং কোন নাযাছাতের ক্ষেত্রে পরিষ্কার না করে নামাজ পড়লেও তা আদায় হয়ে যাবে।

আরেকটি বিষয় মনে আসায় এড করে দিচ্ছি, বিষয় নারীদের রিলেটেড, সাদাস্রাব এর হুকুম কি? মাজি ও সাদা স্রাবের হুকুম কি এক?

না, মাজি এবং স্বাভাবিক সাদা স্রাবের হুকুম এক নয়এই দুটির মাঝে পবিত্রতা এবং নাপাকির দিক থেকে সুস্পষ্ট ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে

নিচে বিস্তারিত মাছ’আলা পেশ করা হলোঃ

১. মাজি (مَذِي) এর হুকুমঃ

মাজি হলো এমন একটি আঠালো ও পাতলা তরল, যা নারী বা পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই যৌন উত্তেজনা বা কামভাবের কারণে নির্গত হয়

পবিত্রতার বিধানঃ মাজি সর্বসম্মতভাবে নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ (মারাত্মক নাপাকি) এর অন্তর্ভুক্ত।

কাপড় ও শরীরের বিধানঃ এটি শরীরে বা কাপড়ে লাগলে তা নাপাক হয়ে যাবেপূর্বের মাছ’আলায় বর্ণিত এক দিরহামের হিসাব অনুযায়ী এটি ধুয়ে পবিত্র করা আবশ্যক (পরিমাণ অনুযায়ী ফরজ, ওয়াযিব বা ছুন্নত)

অজু ও গোসলঃ মাজি নির্গত হলে অজু নিশ্চিতভাবে ভেঙে যায়, তবে এর কারণে গোসল ফরজ হয় না

২. স্বাভাবিক সাদা স্রাব (Leukorrhea/Vaginal Discharge) এর হুকুমঃ

সাদা স্রাব (আরবি ফিকহী পরিভাষায় যাকে “রুতুবাতুল ফারজ” বলা হয়) হলো নারীদের যৌনাঙ্গের বাইরের বা ভেতরের অংশ থেকে নির্গত স্বাভাবিক স্বচ্ছ বা সাদা তরল, যা কোনো কামভাব বা উত্তেজনার কারণে বের হয় না; বরং এটি একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া

পবিত্রতার বিধানঃ হানাফি মাজহাবের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ফতোয়া (ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনার মত) অনুযায়ী, নারীদের এই স্বাভাবিক সাদা স্রাব সম্পূর্ণ পবিত্রশরীয়তের দৃষ্টিতে এটিকে ঘাম বা থুথুর মতোই পবিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়

কাপড় ও শরীরের বিধানঃ যেহেতু এটি পবিত্র, তাই এই স্বাভাবিক সাদা স্রাব কাপড়ে বা শরীরে লাগলে কাপড় বা শরীর নাপাক হয় নাএটি ধুয়ে ফেলা বাধ্যতামূলক নয়, তবে পরিচ্ছন্নতার স্বার্থে ধুয়ে নেওয়া বা মুছে নেওয়া উত্তম

অজু ও গোসলঃ এটি নির্গত হলে গোসল ফরজ হয় নাতবে এর কারণে অজু ভাঙবে কি না, তা নিয়ে ফকিহদের মাঝে সূক্ষ্ম মতভেদ রয়েছেজমহুর ও সতর্কতামূলক মত হলো, এটি বের হলে নতুন করে অজু করে নেওয়া উচিত

বিশেষ সতর্কতাঃ যদি সাদা স্রাবের সাথে রক্ত মিশ্রিত থাকে, কিংবা তা যদি কোনো রোগের কারণে দুর্গন্ধযুক্ত বা অস্বাভাবিক রঙের হয়, অথবা যদি তা যৌন উত্তেজনার কারণে বের হয় (যা মূলত মাজি), তবে তা অবশ্যই নাপাক বলে গণ্য হবে এবং তাতে অজু ভেঙে যাবে

এখন কোন সাদা তরল কি তা কিভাবে কেউ বুঝবে?

মাজি বা মজি (مَذِي) শব্দের অর্থ কেবল “সাদা তরল” নয়ফিকহী পরিভাষায় তরলের রং, ঘনত্ব এবং নির্গমনের কারণ অনুযায়ী এদের আলাদা আলাদা নাম রয়েছেবিষয়টির সুস্পষ্ট পার্থক্য নিচে পেশ করছিঃ

মাজি (مَذِي): এটি সাধারণত স্বচ্ছ (রংহীন), পাতলা এবং আঠালো একটি তরলএটি কামভাব বা যৌন উত্তেজনা শুরু হলে (চরম সীমায় পৌঁছানোর আগে) নির্গত হয়নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এটি হতে পারেএটি নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ এবং এটি বের হলে অজু ভেঙে যায়, তবে গোসল ফরজ হয় না

মানি বা বীর্য (مَنِي): পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত ঘন এবং সাদা বর্ণের তরল (নারীদের ক্ষেত্রেও ঘন সাদা বা কিছুটা হলদেটে বা ভিন্ন রঙেরও হতে পারে), যা চরম উত্তেজনার সাথে সজোরে নির্গত হয়এটি নির্গত হলে গোসল ফরজ হয়

ওয়াদই (وَدْي): এটি একটি সাদা, ঘন এবং ঘোলাটে তরল, যা সাধারণত প্রস্রাবের পর বা অনেক সময় ভারি কোনো কাজ করার কারণে নির্গত হয়এতে কামভাবের কোনো সম্পর্ক থাকে নাএটিও নাযাছাতে গ্বলীজ্বাহ এবং এটি বের হলে অজু ভেঙে যায়, তবে গোসল ফরজ হয় না

অতএব ফিকহের ভাষায় নির্দিষ্ট করে “সাদা তরল” বলতে সাধারণত মানি অথবা ওয়াদই-কে বোঝায়আর “মাজি” হলো উত্তেজনার শুরুতে নির্গত হওয়া স্বচ্ছ ও আঠালো তরল


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: