Saturday, April 11, 2026

পহেলা বৈশাখ পালন করা কুফরী তাই জেনে শোনে বুঝে তা পালন করলে মুরতাদ হতে হবে

বিষয়ঃ নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, হ্যাপি নিউ ইয়ার, থার্টি-ফাস্ট নাইট ও এজাতীয় নববর্ষ-উৎসবের শরয়ী হুকুম

সম্মানিত পবিত্র দ্বীন ইছলামেঃ নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, হ্যাপি নিউ ইয়ার, থার্টি ফাস্ট নাইট, পহেলা মুহাররম কিংবা বছরের প্রথম দিনকে নববর্ষ-উৎসব হিসেবে পালন করা মুছলমানের জন্য জঘন্য নাজায়িয, হারাম, এবং ঈমান-ইছলাম ধ্বংসকারী কুফরী রীতির অন্তর্ভুক্তকারণ এসব মুছলমানদের শরীয়তসম্মত ঈদ বা ঈবাদাত নয়; বরং বিজাতীয়, বিধর্মীয়, মুশরিকী ও কুফরী সংস্কৃতি, আচার, প্রতীক, ও উৎসবপদ্ধতির অনুসরণঅতএব, যে ব্যক্তি জেনে-শুনে, বুঝেও, ইচ্ছাকৃতভাবে এসব নববর্ষীয় কুফরী রীতিতে শরীক হয়, তা সমর্থন করে, তা বৈধ মনে করে, বা মুছলমানদের জন্য পালনযোগ্য বলে প্রচার করে, সে ঈমানবিধ্বংসী ফিতনার মধ্যে পতিত হয় এবং শরীআতের দৃষ্টিতে ভয়াবহ হুকুমের আওতায় পড়ে

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে মুছলিম নামধারী বহু লোককে দেখা যায়, তারা নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, পহেলা মুহাররম, হ্যাপি নিউ ইয়ার, কিংবা অন্য কোনো বর্ষশুরুকে আনন্দ-উৎসব, শুভেচ্ছা, সাজসজ্জা, বিশেষ খাদ্য, বিশেষ পোশাক, বাজারি আয়োজন, শোভাযাত্রা, ও সাংস্কৃতিক দিবস হিসেবে পালন করেঅথচ মুছলমানদের জন্য শরীয়ত নির্ধারিত উৎসব দুইটি; এর বাইরে বিজাতীয় নববর্ষ-পালন মুছলিম পরিচয়, মুছলিম স্বাতন্ত্র্য, এবং পবিত্র দ্বীনের কামালিয়্যাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহেরই নামএ কারণে এ বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করা, এর কুফরী ও শিরকী ভিত্তি উন্মোচন করা, এবং মুছলমানদেরকে এ ফিতনা থেকে দূরে থাকতে বলা ঈমানী দায়িত্ব

এই আলোচনায় প্রমাণ করা হবে যে, নওরোজ ও পহেলা বৈশাখের মতো নববর্ষ-উৎসব মুছলমানদের কোনো শরীআতসম্মত উৎসব নয়; বরং এর শেকড় মজুসী, মুশরিকী, বিধর্মীয় ও বিজাতীয় সংস্কৃতির মধ্যে প্রোথিতআরও দেখানো হবে যে, এ দিবসগুলোর সাথে বহু শিরকী ও পূজামূলক উপাদান জড়িত, এবং বিধর্মীদের সাথে তাশাব্বুহ বা সাদৃশ্য ইছলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধঅতএব, এ বিষয়ের শরয়ী হুকুম বুঝতে হলে আবেগ নয়, বরং ক্বুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, আকাবিরে উম্মতের ইবারত, ইতিহাস, এবং সুস্পষ্ট লজিকের আলোকে বিষয়টি বিচার করতে হবে

পহেলা বৈশাখের শিরকী ও বিজাতীয় উপাদানের তালিকাঃ

পহেলা বৈশাখ কোনো নিরীহ, শূন্য, বা ধর্মমুক্ত দিবস নয়; বরং এর সাথে বহু শিরকী, পূজামূলক, বিজাতীয়, মুশরিকী, ও বিধর্মীয় উপাদান জড়িয়ে আছেআপনি যে তালিকা দিয়েছেন, তা হলোঃ-

১) হিন্দুদের ঘটপূজা,

২) হিন্দুদের গণেশ পূজা,

৩) হিন্দুদের সিদ্ধেশ্বরী পূজা,

৪) হিন্দুদের ঘোড়ামেলা,

৫) হিন্দুদের চৈত্রসংক্রান্তি পূজা-অর্চনা,

৬) হিন্দুদের চড়ক বা নীল পূজা বা শিবের উপাসনা ও সংশ্লিষ্ট মেলা,

৭) হিন্দুদের গম্ভীরা পূজা,

৮) হিন্দুদের কুমীরের পূজা,

৯) হিন্দুদের অগ্নিনৃত্য,

১০) ত্রিপুরাদের বৈশুখ,

১১) মারমাদের সাংগ্রাই ও পানি উৎসব,

১২) চাকমাদের বিজু উৎসব,

যার সম্মিলিত রূপ বৈসাবি,

১৩) হিন্দু ও বৌদ্ধদের উল্কিপূজা,

১৪) মজুসী তথা অগ্নি-উপাসকদের নওরোজ,

১৫) হিন্দুদের বউমেলা,

১৬) হিন্দুদের মঙ্গলযাত্রা,

১৭) হিন্দুদের সূর্যপূজা

এই তালিকার উদ্দেশ্য হলো একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট করা: পহেলা বৈশাখকে শুধু “একটা লোকজ দিন” বা “সাংস্কৃতিক আনন্দ” বলে চালিয়ে দেওয়া যায় নাকারণ যখন কোনো দিনকে ঘিরে এত বিপুল পূজা, আচার, প্রতীক, শোভাযাত্রা, দেব-দেবীর স্মারক, অগ্নি-উপাসনামূলক ঐতিহ্য, এবং বিধর্মীয় সামষ্টিক অনুষ্ঠান যুক্ত থাকে, তখন সে দিন বাস্তবে একটি শূন্য সাংস্কৃতিক দিন থাকে না; বরং বহুধা বিজাতীয় ধর্ম-সংস্কৃতির বাহক হয়ে দাঁড়ায়অতএব, মুছলমানের জন্য এই দিনের প্রতি নিরপেক্ষতার দাবিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়; কেননা বাস্তবে দিনটি নিরপেক্ষ নয়, বরং শিরকী ও বিধর্মীয় রঙে রঞ্জিত

যেমনঃ অমঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত বিভিন্ন মূর্তি বা মোটিফের প্রতীকী অর্থগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করছিঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে আয়োজিত অমঙ্গল শোভাযাত্রায় সাধারণত আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, প্রতিবাদ, অশুভ শক্তি দমন এবং শান্তির আকাঙ্ক্ষাকে এই মূর্তিগুলোর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার দাবী করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য থাকে অকল্যাণকে দূর করে কল্যাণের আবাহন। যেমনঃ

পেঁচাঃ পেঁচাকে সাধারণত সমৃদ্ধি, মঙ্গল এবং প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এটি ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে লোকজ ঐতিহ্যে সুপরিচিত, যা সমাজ ও জীবনে প্রাচুর্য এবং সৌভাগ্য নিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে

বাঘঃ বাঘ হলো অপরিমেয় সাহস, শক্তি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের প্রতীক সমাজের নানা অসঙ্গতি, স্বৈরাচার, জুলুম ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বীরদর্পে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা হিসেবে বাঘের মুখোশ বা বিশাল মূর্তি ব্যবহার করা হয়

হাতিঃ হাতিকে ঐশ্বর্য, আভিজাত্য, বিশালতা এবং সমৃদ্ধির প্রতীক ধরা হয় এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি সুন্দর, স্থিতিশীল ও সুখী ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়

সূর্যঃ সূর্য হলো নতুন জীবনের সূচনা এবং অন্ধকারের বুক চিরে আলোর আগমনের প্রতীকযাবতীয় গ্লানি, হতাশা, জরাজীর্ণতা ও অন্ধকার মুছে ফেলে নতুন বছরে নতুন উদ্যমে পথচলার প্রত্যয় প্রকাশ পায় সূর্যের মূর্তিতে

পাখি বা ঘুঘুঃ পাখি মূলত শান্তি, স্বাধীনতা এবং মুক্ত বিহঙ্গের মতো উন্মুখ মনের প্রতীক এটি একটি বাধাহীন, স্বাধীন ও শান্তিপূর্ণ সমাজের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে

রাক্ষস বা অশুভ মোটিফঃ কুমির, সাপ বা রাক্ষসের মতো বিভৎস মূর্তিগুলো সমাজ ও রাষ্ট্রের অশুভ শক্তি, ধ্বংসাত্মক মনোভাব এবং নেতিবাচক দিকগুলোকে প্রতিনিধিত্ব করে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে এই অশুভ শক্তিকে বিতাড়িত করার এবং পরাস্ত করার প্রতীকী বার্তা দেওয়া হয়

মা ও শিশু - টেপা পুতুলঃ চিরায়ত বাংলার মাটির তৈরি টেপা পুতুল কিংবা মা ও শিশুর মূর্তি মাতৃত্ব, স্নেহ, মমত্ববোধ এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি যত্নশীলতা ও আবহমান গ্রামীণ সংস্কৃতির রূপ তুলে ধরে

উক্ত শিরকী য়া’মল ১০০% কালিমা-এ ইমানে-মুফাছছালের বিপরীতে আক্বিদাহ পোষণ করায়ঃ (اٰمَنْتُ بِاللهِ وَمَلَآئِكَتِهٖ وَكُتُبِهٖ وَرُسُلِهٖ وَالْیَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْقَدْرِ خَیْرِهٖ وَشَرِّهٖ مِنَ اللهِ تَعَالٰی وَالْبَعْثِ بَعْدَ الْمَوْتِ) আমি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর, উনার ফিরিশতাগণের উপর, উনার কিতাবসমূহের উপর, উনার রছূলগণের উপর, আখিরাত দিবসের উপর, তাক্বদীরের ভাল ও মন্দ সবই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে এর উপর, এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর ঈমান আনলাম

অতএব এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লজিক হলোঃ মুছলমানদের জন্য এ দিনে শরীয়তসম্মত কোনো ঈদ, নির্ধারিত ঈবাদত, ছুন্নাহ শরীফ-প্রমাণিত আনন্দ, বা উম্মতের স্বীকৃত শা’য়াইর নেই অর্থাৎ একদিকে এ দিনের সাথে বহু বিধর্মীয় উপাদান জড়িত, অন্যদিকে মুছলমানদের জন্য এতে কোনো শরয়ী ভিত্তি নেই। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় যে দিনের ভিতর বিজাতীয় পূজা আছে, কিন্তু মুছলমানের ঈদ নেই; যে দিনের মধ্যে শিরকী শোভাযাত্রা আছে, কিন্তু ছুন্নাত মুবারক নেই; যে দিনের চারপাশে দেব-উপাসনামূলক ইতিহাস আছে, কিন্তু ইছলামী দলিল নেই মুছলমান কেন সেই দিনকে বিশেষ সাজ, বিশেষ খাদ্য, বিশেষ আনন্দ, বিশেষ শুভেচ্ছা, বা বিশেষ সামাজিক আবেগের মাধ্যমে গ্রহণ করবে?

আমাদের মনে রাখতে হবে, পহেলা বৈশাখে “কাফিরদের বিভিন্ন পূজা ও অনুষ্ঠান বিদ্যমান, কিন্তু মুছলমানদের এই দিনে কোনো অনুষ্ঠানই নাই” এই কথাটির তাৎপর্য গভীর, কারণ এর দ্বারা বোঝানো হচ্ছে মুছলমান যদি এই দিনকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করে, তবে সে নিজ শরীআতের নির্ধারিত ঈদ অনুসরণ করছে না; বরং এমন এক দিনে যোগ দিচ্ছে, যার পরিচয় অন্য কওমের ইতিহাস, রীতি, এবং পূজামূলক চিহ্নে ভারী এইখানে “মিল” বা “তাশাব্বুহ” কেবল বাহ্যিক নয়; বরং দিনটির অন্তর্নিহিত ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বোঝাও নিজের জীবনে টেনে নেওয়া

বিশেষ পোশাক, বিশেষ খাবার, বিশেষ বাজার, বিশেষ ছাড়, বিশেষ উৎসবী অংশগ্রহণ এসব কিছুই তখন আর নিরপেক্ষ থাকে না কারণ এগুলো একটি দিনকে দিন থেকে উৎসবে, আর উৎসবকে পরিচয়ে পরিণত করে পহেলা বৈশাখ যদি বাস্তবে শিরকী, বিজাতীয়, ও মুশরিকী উপাদানের বাহক হয়, তবে সেই দিনের সাথে উৎসবী একাত্মতা গড়ে তোলা মুছলমানের জন্য ভয়াবহ বিচ্যুতি

সুতরাং এই ভাগের খোলাছা হলোঃ পহেলা বৈশাখকে ঘিরে যে উপাদানগুলোর তালিকা আপনি পেশ করেছেন, তা দেখায় যে এ দিবস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; বরং বহু শিরকী, পূজামূলক, বিজাতীয়, ও বিধর্মীয় ধারার সম্মিলনস্থল মুছলমানের জন্য যেখানে শরীআতসম্মত ঈদ নির্ধারিত, সেখানে এ ধরনের দিবসকে উৎসবময় করা, সামাজিক আবেগে ভাসানো, বা নিজস্ব সংস্কৃতি বলে গ্রহণ করা ইছলামী স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বরং মুছলমানের করণীয় হলো এ ধরনের দিবসের অন্তর্নিহিত বাস্তবতা বুঝা, শিরকী ও বিজাতীয় উপাদানগুলো চিনে নেওয়া, এবং তা থেকে নিজেকে ও পরিবারকে দূরে রাখা।

পবিত্র দ্বীন ইছলামই একমাত্র পূর্ণ ও মনোনীত দ্বীনঃ

পবিত্র দ্বীন ইছলাম কোনো মানব-রচিত মতবাদ, জাতিগত সংস্কৃতি, লোকাচার, কিংবা সমাজ-উদ্ভূত প্রথার নাম নয়; বরং এটি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত একমাত্র মনোনীত, পরিপূর্ণ, সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত, অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত দ্বীনএই দ্বীনই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নিকট গ্রহণযোগ্য; এ দ্বীনের বাইরে যেকোনো ধর্মীয় রীতি, আচার, উৎসব, বা অনুকরণমূলক ব্যবস্থা বাতিল, অগ্রহণযোগ্য, এবং মুছলমানের জন্য পরিত্যাজ্যসুতরাং মুছলমানের জন্য নিজস্ব শরীআতসম্মত ঈদ, ঈবাদত, শা’য়াইর ও পরিচয় থাকা সত্ত্বেও অন্য ধর্ম, অন্য কওম, বা অন্য জাতির আচার-অনুষ্ঠানকে গ্রহণ করা শুধু সাংস্কৃতিক দুর্বলতা নয়; বরং দ্বীনের পূর্ণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো

মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ মুবারক করেনঃ (إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلْإِسْلَامُ) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন হচ্ছেন পবিত্র দ্বীন ইছলাম। (ছুরাহ আলে-ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩:১০) এই আয়াত শরীফ-এর সুস্পষ্ট বক্তব্য হলেন গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড একটিইঃ দ্বীন হিসেবে পবিত্র দ্বীন ইছলাম। অতএব, ইছলাম বহির্ভূত তাহযীব-তামাদ্দুন, রীতি-নীতি, উৎসব, উপাসনামূলক ধারা, এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চিহ্নকে মুছলমানের জীবনে স্থান দেওয়া মানে সেই একক গ্রহণযোগ্য দ্বীনের সীমা দুর্বল করাযখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই বলে দিয়েছেন কোন দ্বীন গ্রহণযোগ্য, তখন মুছলমানের কাজ হচ্ছে সেই দ্বীনকেই যথেষ্ট মনে করা; তার বাইরে কোনো ঐতিহ্য, কোনো বর্ষবরণ, কোনো বিজাতীয় সংস্কৃতি/কালচার বা কোনো লোকাচারকে দ্বীনসম্মত রূপ দেওয়ার চেষ্টা না করা

এদিকে আবার মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ ٱلْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي ٱلْآخِرَةِ مِنَ ٱلْخَاسِرِينَ) যে ব্যক্তি ইছলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন তালাশ করে, তা কখনোই তার থেকে গ্রহণ করা হবে না; এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (ছুরাহ আলে-ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩:৮৫) এই আয়াত শরীফ দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইছলাম ছাড়া অন্য ধর্মীয় রীতি, অন্য ধর্মীয় পরিচয়, অন্য উৎসব-পদ্ধতি, বা অন্য কওমের (شَعَائِر) শা’য়াইরকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা মুছলমানের জন্য ভয়াবহ ভ্রষ্টতাকারণ এখানে শুধু “অন্য ধর্ম গ্রহণ” নয়; বরং “অন্য ধর্মীয় রীতি-নীতি তালাশ” করাকেও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছেঅতএব, মুছলমানের জীবনে ইছলাম যথেষ্ট হওয়া সত্ত্বেও নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, Happy New Year, বা এজাতীয় বর্ষবরণকে মূল্যবান, মর্যাদাপূর্ণ, কিংবা পালনযোগ্য মনে করা এই আয়াত শরীফের আলোকে গুরুতর বিচ্যুতি

এখন কথা হলোঃ আরবী ‘শা’য়াইর’ (شَعَائِر) শব্দটি হলো ‘শাঈরাহ’ (شَعِيرَة) শব্দের বহুবচনএর আভিধানিক অর্থ হলো চিহ্ন, নিদর্শন বা আলামতশরীয়তের পরিভাষায় ওই সমস্ত বিষয় বা কার্যাবলীকে ‘শা’য়াইরুল্লাহ’ বলা হয়, যা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দ্বীনের বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক এবং যা উনার আনুগত্য ও ঈবাদাতের স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে সাব্যস্ত

১. পবিত্র কুরআনের আলোকেঃ

মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেছেনঃ (ذٰلِكَ  وَ مَنۡ یُّعَظِّمۡ شَعَآئِرَ اللّٰهِ فَاِنَّهَا مِنۡ تَقۡوَی الۡقُلُوۡبِ) যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নিদর্শনসমূহের (শা’য়াইরুল্লাহ) প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, তবে তা তো তার ক্বলবের তাক্বওয়া থেকেই উৎসারিত। (ছুরাহ আল-হাজ্জ, আয়াত শরীফ ২২:৩২)

২. শা’য়াইর-এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহঃ

মুফাচ্ছিরীনে কেরাম এবং ইমামগণের বর্ণনা অনুযায়ী শা’য়াইর প্রধানত কয়েক ধরণের হতে পারেঃ

  • স্থানভিত্তিক নিদর্শন, যেমনঃ পবিত্র কা’য়বা শরীফ, পবিত্র মদিনা শরীফ, হাযরে আছ্বওয়াদ, মাক্বামে ইব্রাহীম, ছ্বফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়, আরাফাত, মিনা-মুজদালিফা, উহুদ, বদরের প্রান্তর, হেরা গূহা, গ্বার-এ ছাওর এমনকি হক্বানী অলী আউলিয়া উনাদের মাজার শরীফ ইত্যাদি।
  • কর্মভিত্তিক নিদর্শন, যেমনঃ হজ্ব, উমরাহ, ক্বুরবানী এবং ছ্বলাত (নামাজ) ক্বুরআন, হাদিছ শরীফদ্বয়ের তিলাওয়াত ইত্যাদি।
  • সময়ভিত্তিক নিদর্শন, যেমনঃ ১২ই রবিউল আউওয়াল শরীফ, রগ্বাইব শরীফ, মিরাজ শরীফ, বরাত শরীফ, ক্বদর শরীফ, জুমু’য়ার শরিফ-এর দিন, রমজান শরিফ মাস, জিলহাজ্জ শরিফ-এর ১০ দিন, উহুদ, বদর, ক্রুসেড মুহররমুল হারাম শরিফ-এর ১০ তারিখ তথা আশুরা ও কারবালা শরিফ-এর দিন ইত্যাদি।
  • ব্যক্তিবর্গঃ আম্বিয়ায়ে কেরাম য়ালাইহিমুছ ছালাম এবং হক্বানী আউলিয়ায়ে কেরাম রহমাতুল্লাহি য়ালাইহিগণও মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বড় নিদর্শন বা শা’য়াইর-এর অন্তর্ভুক্ত, কারণ উনাদের দেখলেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কথা স্মরণ হয়। 

৩. শা’য়াইর-এর গুরুত্বঃ

ইমাম তবারী এবং ইবনে কাছীর রহমাতুল্লাহি য়ালাইহি উনাদের তাফছীর অনুযায়ী, ‘শা’য়াইর’ হলো সম্মানিত দ্বীন ইছলাম-এর ওইসব বিশেষ কর্ম যা পালন করার মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের ঈমান ও আনুগত্য প্রকাশ করেরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নাহ অনুযায়ী এগুলোর প্রতি যথাযথ আদব (সম্মান) প্রদর্শন করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য

সারকথা হলো, যা কিছু দেখলে বা পালন করলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার এবং উনার দ্বীনের মহিমা অন্তরে জাগ্রত হয়, তাকেই সহজ কথায় শা’য়াইর বলা হয়

এখন জানার বিষয় হলো পহেলা বৈশাখের শা’য়াইর কি? অমঙ্গলশোভাযাত্রায় যে মুর্তি দেখো, বেপর্দা বেহায়া নারী দেখো, থার্টিফার্স্ট নাইটে জে বেহায়াপনা উন্মাদনা দেখো এইসব কি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার শা’য়াইর? অথচ ১৫০০ বছর আগেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা স্পষ্ট বলেই দিয়েছেনঃ (ٱلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلْإِسْلَامَ دِينًا) আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে কামিল বা পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নি’য়ামাত পূর্ণ করে দিলাম, এবং ইছলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। (ছুরাহ আল-মা’ইদাহ ৫:৩) এই আয়াত শরীফ আপনার আমার সকল বেদ্বীন তাহযীব-তামাদ্দুন, রীতিনীতিকে বাতিল করে দিচ্ছেন, কেননা দ্বীন যখন মুকাম্মিল, তখন মুছলমানদের জন্য আনন্দের দিন, সামষ্টিক ঈবাদাত, পরিচয়ের উৎসব, এবং উম্মতের শা’য়াইর সবই শরীয়তে নির্ধারিতএখন যদি কেউ সেই পূর্ণ দ্বীনের বাইরে গিয়ে নতুন উৎসব, নতুন ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উদযাপন, নতুন বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, বা বিজাতীয় কালচার, ঐতিহ্যকে মুছলমানদের জীবনে জায়গা দিতে চায়, তাহলে সে কার্যত এই পূর্ণতার দাবিকে অস্বীকার করার পথেই হাঁটেঅর্থাৎ, দ্বীন যদি পূর্ণ হয়, তবে বাইরে থেকে নতুন উৎসব ধার নেওয়ার প্রয়োজন কোথায়? আর যদি প্রয়োজন মনে হয়, তবে তাতেই বোঝা যায় দ্বীনকে যথেষ্ট মনে করা হয়নি

এখানে মূল লজিকটি অত্যন্ত স্পষ্টইছলামে যা নেই, অথচ অন্য কওমের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ সেটিকে মুছলমানের জন্য “স্বাভাবিক” বা “সাংস্কৃতিক” বলে গ্রহণ করা বিপজ্জনককারণ ইছলাম শুধু নামাজ-রোযার নাম নয়; ইছলাম হলেন পূর্ন জীবনব্যবস্থা, পরিচয়, আনুগত্য, ও স্বাতন্ত্র্যের নাম-ও। উৎসব হলো পরিচয়ের প্রকাশ্য ভাষাযে কওম যেসব দিনকে, বিশেষ পোশাক, বিশেষ শুভেচ্ছা, বিশেষ খাবার, বিশেষ উৎসব, বিশেষ মিছিল, বিশেষ আনন্দ, ও বিশেষ সাংস্কৃতিক মর্যাদায় পালন করে, সে কার্যত সেই দিনগুলোর মাধ্যমে নিজের পরিচয়ই ঘোষণা করেঅতএব মুছলমান যদি আল্লাহ পাক উনার নির্ধারিত আইয়্যামুল্লাহ/ঈদ ছেড়ে বা তার বাইরে গিয়ে অন্য কওমের দিন/পূজা-পার্বনকে উৎসবময় করে, তবে তা নিছক “একটা দিন পালন” থাকে না; বরং তা পরিচয়গত সরে যাওয়া হয়ে দাঁড়ায়

সুতরাং উপরোক্ত আয়াত শরীফগুলীর খোলাছা হলেনঃ ইছলামই একমাত্র হক্ব, একমাত্র গ্রহণযোগ্য, এবং একমাত্র পূর্ণ দ্বীনতাই ইছলাম বহির্ভূত রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্টান, উৎসব, ও নববর্ষ-পদ্ধতিকে মুছলমানের জীবনে স্থান দেওয়া শরী’য়াতের রূহের বিরোধীমুছলমানের জন্য দ্বীন-ইছলাম যথেষ্ট; দ্বীন ইছলামের সকল ঈদই যথেষ্ট; শরী’য়াতের নির্ধারিত শা’য়াইর যথেষ্টএর বাইরে বিজাতীয় উৎসবকে মর্যাদা দেওয়া মানে দ্বীনের কামালিয়্যাতের ওপর আঘাত করা, মুছলিম স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করা, এবং ধীরে ধীরে কুফরী সংস্কৃতির প্রতি হৃদয় নরম করে ফেলা

আমরা তো দেড় হাজার বছর পরের মুছলমান, যারা ইছলামের মহানায়ক, যাদের উপর মহান আল্লাহ তায়ালা উনি সন্তুষ্ট সেই ছ্বহাবিদের পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়নি বিজাতীয় নিয়ম কানুনে আটকে থাকার বেলায়। বরং মহান আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করেই বলেনঃ (يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا ادْخُلُوا فِى السِّلْمِ كَآفَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوٰتِ الشَّيْطٰنِ ۚ إِنَّهُۥ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ) হে মুওমিনগণ! তোমরা পূর্ণরূপে সম্মানিত দ্বীন ইছলামের প্রবেশ কর, আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলো না, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:২০৮)

উক্ত আয়াত শরীফ কেন নাযিল হয়েছে আমরা কি জানি? আসুন জেনে নেই?

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ছালাম রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু ছিলেন ইহুদিদের প্রধান য়া’লিমদের একজনপূর্ববর্তী আসমানী কিতাব তথা তাওরাত শরীফ, জাবুর শরীফ এবং ইনজিল শরীফ এমনকি কথিত আছে প্রায় ১০০ খানা ছ্বহীফা ছিল উনার ঠোটস্থ-কণ্ঠস্থ

তিনি পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব থেকে আখেরী নবী রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ মুবারক সম্পর্কে অবগত ছিলেনযখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজেকে প্রকাশ করলেন, তখন আবদুল্লাহ ইবনে ছালাম রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব থেকে উনার বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণাদি সমস্ত কিছু মিলিয়ে নিলেনএরপর তিনি যখন নিশ্চিত হলেন যে, ইনিই আখেরী নবী রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম, তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ছালাম রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-এর নিকট আর্জি পেশ করলেন, যেন উনাকে দ্বীন ইছলামে দাখিল করে নেওয়া হয়রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আর্জি কবুল করে উনাকে মুছলমান বানিয়ে দিলেন। ছুবহানআল্লাহ!

এরপর একদিন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ছালাম রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-এর গৃহ মুবারকের বাইরে বসে রয়েছেনএমতাবস্থায় হাদিয়া হিসেবে কিছু উটের গোশত আসলোরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উটের গোশতের একটি অংশ গৃহ মুবারকের অভ্যন্তরে পাঠিয়ে দিলেন, বাকিটা উপস্থিত ছ্বহাবী রদ্বিআল্লাহু য়া’নহুম উনাদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন

ইহুদীদের ধর্মে উটের গোশত খাওয়া নিষেধ থাকায় পূর্বে তিনি কখনো তা খান নাইতাই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ছালাম রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-এর নিকট আর্জি পেশ করলেন, “ইহুদীদের জন্য উটের গোশত খাওয়া নিষেধ হওয়ার কারণে আমি কখনো উটের গোশত খাইনিএখন নতুন করে উটের গোশত খেতে আমার কেমন জানি বোধ হচ্ছেদয়া করে উটের গোশত খাওয়া থেকে আমাকে রুখসত দিন

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ছালাম রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু তিনি বারংবার আর্জি পেশ করতে লাগলেন, কিন্তু নবীজী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তিনি নিশ্চুপ রইলেন এর মধ্যেই সেই আয়াত শরীফ-ই রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার উপর নাযিল হলোমহান আল্লাহ তা’য়ালা হুসিয়ার করে দিলেনঃ (يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا ادْخُلُوا فِى السِّلْمِ كَآفَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوٰتِ الشَّيْطٰنِ ۚ إِنَّهُۥ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ) হে মুওমিনগণ! তোমরা পূর্ণরূপে সম্মানিত দ্বীন ইছলামের প্রবেশ কর, আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলো না, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:২০৮)

এখানে বিষয়টি হলো, উটের গোশত খাওয়াটা কিন্তু ফরয কিংবা ওয়াযিব নয়এমনকি উটের গোশত খাওয়াটা ছুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ-ও নয়তার পরও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ছালাম রদ্বিআল্লাহু য়া’নহুকে ছাড় দেয়া হলো না, বলা হলো পরিপূর্ণরূপে সম্মানিত দ্বীন ইছলামে দাখিল হয়ে যেতে

সেক্ষেত্রে বর্তমানে যারা ফরয-ওয়াযিব তরক্ব করছে, হারাম কাজ করছে, তাদের কী ফায়ছালা হবে? যদি ইহুদী নিয়ম অনুযায়ী উটের গোশত না খাওয়াটা গ্রহণযোগ্য হতে না পারে একজন মুহাদ্দিছ ছ্বহাবী উনার বেলায়, সেক্ষেত্রে বর্তমানে যারা বিধর্মীদের তর্য ত্বরিক্বাহ অনুসরণ করছে, তাদের ক্ষেত্রে কী ফায়ছালা হতে পারে?

মানুষ মনে করে, আরে কাফির মুশরিকদের ইছলামের শত্রু মনে না করলে কি সমস্যা হবে, কাফির মুশরিকদের মুহব্বত করলেই কি ইমান চলে যাবে? নামাজ না পড়লে, রোজা না রাখলে, সামান্য ছুন্নাত পালন না করলে কি হবে, টিভি সিনেমা দেখলে কি হবে, পূজায় একটু গেলে কীই বা আর হয়! একটু প্রসাদ খেলে কী আর হয় এমন! নাউজুবিল্লাহ! ঐ একটুও গ্রহণ করা যাবে না, যদি মুছলমান হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে হয়, সেক্ষেত্রে পরিপূর্ণরূপে সম্মানিত দ্বীন ইছলামে দাখিল হয়ে যেতে হবেদ্বীন ইছলাম সরল পথবিশিষ্ট সোজাসুজি দাখিল হয়ে যাওয়ার ধর্ম, এটি দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার ধর্ম নয়দুই নৌকায় পা দিলে কখনো সফলতা আসবে নাবর্তমান মুছলমানদের মধ্যে এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার প্রবণতার কারণেই আজকে গোটা মুছলিম উম্মাহ মাঝসাগরে পড়ে হাবুডুব খাচ্ছে

এবার নওরোজ বা নববর্ষের ঐতিহাসিক উৎস সম্পর্কে জানবোঃ

নওরোজ বা নববর্ষ মুছলমানদের নিজস্ব কোনো শরীআতসম্মত উৎসব নয়; বরং এর উৎস পারস্যের অগ্নি-উপাসক মজুসীদের মধ্যেঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, প্রাচীন পারস্যের সম্রাট জামশীদ খৃষ্টপূর্ব বহু শতাব্দী আগে এ নওরোজ প্রবর্তন করে, এবং তখন থেকেই এটি কাফিরদের আনন্দ-উৎসব, বর্ষবরণ, এবং জাতীয় দিবস হিসেবে প্রচলিত হয়ে আসেঅতএব, নওরোজের শেকড় ইছলামী নয়; বরং মজুসী ও বিধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে প্রোথিত যদি নতুন বছর ইছলামের শা’য়ইর হতেন তাহলে সরাসরি মহান আল্লাহ তায়ালাই তা নির্ধারন করে দিতেন, কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা মাস, সাপ্তাহিক দিন, সপ্তাহের ১০ দিন কে, এবং বিশেষ দিনকে গুরুত্বপূর্ন শা’য়ইর হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তিনি আ’রবী ক্যালেন্ডার পর্যন্ত নাযিল করেন নাই।

তাছাড়া, নওরোজ কেবল একটি প্রাচীন পারসিক প্রথাই ছিল না; বরং তা দীর্ঘকাল ধরে ধর্মনিরপেক্ষ আনন্দ-উৎসব হিসেবেও পালিত হয়েছেঅর্থাৎ এর ভেতরে ইছলামী শা’য়াইর, ঈদ, ছুন্নাত, বা উম্মতে মুহাম্মদী (ছ্বল্লাল্লাহু য়া’লাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) এর কোনো স্বতন্ত্র ঈবাদতগত ভিত্তি নেইপারস্যে এটি জাতীয় বর্ষবরণ, সামাজিক আনন্দ, এবং লোকাচারিক উৎসব হিসেবে টিকে ছিল; পরবর্তীতে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল এবং ভারত উপমহাদেশে পৌঁছেসুতরাং নওরোজের ঐতিহাসিক চরিত্র নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এটি মুছলমানদের দ্বীনি পরিচয়ের নয়; বরং বিজাতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা

ভারত উপমহাদেশে নওরোজের বিস্তার বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায় বাদশাহ হুমায়ূনের আমলে, যখন পারস্য-সম্পৃক্ত শিয়া প্রভাব রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক রীতিনীতিতে প্রবেশ করতে থাকেতখন ইরানী শিয়াদের আগমন, দরবারি প্রভাব, এবং সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নওরোজ উৎসবও সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েঅর্থাৎ এ উৎসব মুছলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত শরীয়তসম্মত য়া’মল হিসেবে উপমহাদেশে জন্ম নেয়নি; বরং বহিরাগত প্রভাব, রাজদরবারি সংস্কৃতি, এবং পারসিক-শিয়ী ধারার মাধ্যমে প্রবেশ করেছে

এরপর আকবরের আমলে নববর্ষ বা নওরোজ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়সুলতানী আমলে এ দেশের সমাজজীবনে নওরোজ বা নববর্ষ-উৎসবের উল্লেখ ছিল না; কিন্তু আকবর তার আকবরী সন ও ফসলী সন প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নওরোজকে রাষ্ট্রীয় রূপ দেয়ফরমান জারি করে শহর-গ্রামে ভোজ, উৎসব, ও আনুষ্ঠানিকতার নির্দেশ দেওয়া হয়অতএব, এই নববর্ষ-সংস্কৃতি ইছলামী খিলাফত, ছুন্নাহ, বা ছ্বহাবায়ে কিরামের আমল থেকে আসেনি; বরং এক কাফির শাসকের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রবর্তনের মাধ্যমেও এর প্রসার ঘটেছে নতুন বছর যদি গুরুত্বপুর্ন হতো তাহলে ছ্বহাবিরাই পহেলা মুহররম শরীফ তা পালন করতেন, উনারা না করলেও যেকোন ইমাম-মুস্তাহিদ কিংবা অলী আউলিয়ারাও তা করতেন, কিন্তু এর সাথে সম্মানিত দ্বীন ইছলামের কোন সম্পর্ক কোন কালেই ছিলো না এটা সবাই বুঝেছেন, কেবল বুঝতে অক্ষম আজকের জাহিল মুল্লা ও তাদের অনুসারী মুছলমানেরা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, প্রাক-মুঘল যুগে ভারতবর্ষে নওরোজ পালনের কোনো নির্ভরযোগ্য দৃষ্টান্ত-ও জানা যায় নাঅর্থাৎ এটি এ ভূখণ্ডের মুছলমানদের প্রাচীন দ্বীনি রীতি ছিল নাএকইভাবে বলা হয়েছে যে, মুছলিম চন্দ্র হিজরী বর্ষপঞ্জিতে নওরোজ কখনো গৃহীত হয়নিফলে নওরোজকে মুছলমানদের উৎসব, ইছলামী নববর্ষ, বা গ্রহণযোগ্য মুছলিম সংস্কৃতি হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাসবিরোধীমুছলমানদের ইতিহাসে ৫৫ টা ঈদ আছে, আইয়্যামুল্লাহ আছেন, হিজরী সন আছে, কিন্তু নওরোজকে শরীয়তসম্মত উৎসব হিসেবে কোন কালেই গৃহীত হওয়ার প্রমাণ নেই

এখানে একটি অত্যন্ত শক্ত লজিক দাঁড়ায়কোনো কওমের উৎসবের পরিচয় বুঝতে হলে দেখতে হয় তার উৎপত্তি কোথায়, কারা তা প্রবর্তন করেছে, কোন সভ্যতা তা বহন করেছে, এবং উম্মতে মুছলিমার মধ্যে তা শরীআতসম্মত শা’য়াইর হিসেবে আদৌ গৃহীত হয়েছে কি নানওরোজের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে: এর উৎস মজুসীদের মধ্যে, বিস্তার পারসিক-শিয়ী প্রভাবে, এবং উপমহাদেশে মুশরিকদের পূজা পার্বনেরও প্রচলন হয় রাজদরবারি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়; অথচ মুছলমানদের ঈবাদাত, ঈদ, ছুন্নাহ, বা স্বীকৃত শরয়ী শা’য়াইরের মধ্যে এর স্থান নেইঅতএব, এটিকে “শুধু ক্যালেন্ডারের দিন” বলে হালকা করা যায় না; বরং এর পেছনে একটি স্পষ্ট বিধর্মীয়, বিজাতীয়, ও ইছলাম-বহির্ভূত ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে

সুতরাং উক্ত আলোচনার খোলাছা হলোঃ নওরোজ ও এজাতীয় নববর্ষ মুছলমানদের নিজস্ব উৎসব নয়; বরং মজুসী, পারসিক, মুশরিক-হিন্দু ও শিয়ী-প্রভাবিত, এবং পরবর্তীতে ধর্মনিরপেক্ষ-রাজকীয় সংস্কৃতির বহনকারী একটি বহিরাগত রীতিযে জিনিসের উৎপত্তি ইছলামে নয়, বিস্তার ইছলামের দ্বারা নয়, এবং গ্রহণযোগ্যতা মুছলিম শা’য়াইরের মধ্যে নয়, তাকে মুছলমানদের জন্য শরীয়তসম্মত উৎসব বানানোর কোনো সুযোগ নেইবরং ইতিহাসই সাক্ষ্য দিচ্ছে এটি বিধর্মীদের রীতি, আর মুছলমানের কাজ হচ্ছে তা থেকে দূরে থাকা, নিজের সংস্কৃতি বলে গ্রহণ করা নয়।

নববর্ষ পালন যে দ্বীন বিরোধী তা হাদীছ শরীফেও স্পষ্ট পাওয়া যায়ঃ

নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, এবং এজাতীয় বিজাতীয় নববর্ষ-পালনের অসারতা, নিষিদ্ধতা, এবং মুছলমানের জন্য এর ভয়াবহতা শুধু ঐতিহাসিক পর্যালোচনা দ্বারা নয়; বরং হাদীছ শরীফের দলিল দ্বারাও স্পষ্ট হয়ে যায়কারণ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নাহ শরীফ মুছলমানদের জন্য শুধু ঈবাদাত-পদ্ধতি নয়, বরং উৎসব, পরিচয়, সামাজিক রীতি, এবং অন্য জাতির সাথে সীমারেখাও নির্ধারণ করে দেনঅতএব, এ বিষয়ে হাদীছ শরীফের দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

প্রথম দলিল হলো হযরত আনাছ রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু বর্ণিত হাদীছ শরীফতিনি বলেনঃ (قَدِمَ رَسُولُ ٱللَّهِ - صَلَّى ٱللّٰهُ عَلَيْهِ وَ اٰلِهِ وَسَلَّمَ ٱلْمَدِينَةَ وَلَهُمْ يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا، فَقَالَ: مَا هَذَانِ ٱلْيَوْمَانِ؟ قَالُوا: كُنَّا نَلْعَبُ فِيهِمَا فِي ٱلْجَاهِلِيَّةِ، فَقَالَ رَسُولُ ٱللَّهِ صَلَّى ٱللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ ٱللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ ٱلْأَضْحَىٰ وَيَوْمَ ٱلْفِطْرِ) অর্থাৎ, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মদীনা শরীফে আগমন করলেন; তখন তাদের দু’টি দিন ছিল যাতে তারা খেলাধুলা ও আনন্দ করততখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন কী? তারা বলল, আমরা জাহিলিয়্যাতের যুগে এ দু’দিন আনন্দ করতামতখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেন, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদেরকে এ দু’টির বদলে তার চেয়ে উত্তম দু’টি দিন দিয়েছেন, ঈদুল আদ্বহা ও ঈদুল ফিতর(আবু-দাউদ শরীফ ১১৩৪, নাছাই শরীফ ১৫৫৬, মুছনাদে আহমাদ ১২০০৬, ১৩৬২২)

এই হাদীছ শরীফের ব্যাখ্যা হিসেবে অনেক ইমাম ঐ দু’টি দিন নওরোজ ও মেহেরজান ছিল বলেছেন এখন খেয়াল করুন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মুশরিকদের উৎসবকে মোটেও এলাও করলেন না, সাথে সাথে সম্মানিত দ্বীন ইছলামের দুই দ্বীনের সাথে রিপ্লেইছ করে দিলেন। এই পুরো যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো, জাহিলী ও বিজাতীয় আনন্দ-উৎসবকে আমাদের জন্যে বাতিল করা; বরং মুছলমানদের জন্য পৃথক ঈদ নির্ধারিত হয়েছেসুতরাং মুছলমানের পরিচয় আলাদা, তার উৎসবও আলাদা

এই হাদীছ শরীফ থেকে আমার যে ইস্তিদলাল দাঁড়ায় তা হলোঃ যখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা ও উনার রছুল ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মুছলমানদের জন্য দু’টি উত্তম দিবস নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তখন বিজাতীয় বর্ষশুরু, জাহিলী উৎসব, বা বিধর্মীদের আনন্দদিবসকে মুছলমানদের জীবনে স্থান দেওয়ার অবকাশ নেইবদল দেওয়ার অর্থই হলো পূর্বের বাতিল রীতিকে ছেড়ে দিয়ে শরয়ী বিকল্প গ্রহণ করাঅতএব, শরীয়ত যখন মুছলমানকে ঈদ দিয়েছে, তখন নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, বা Happy New Year-এর মতো দিবসকে উৎসব বানানো শরীয়তসম্মত ঈদের ওপর অতিরিক্ত আরেকটি বিজাতীয় রীতি চাপিয়ে দেওয়ার শামিল এমনকি উক্ত হাদিছ শরীফ থেকে এটাও প্রমাণিত যে যদি কাফেরদের এমন কোন উৎসব এর দিন থাকে যেটায় আজ মুছলমান লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে, সেটার পরিবর্তে ঐ দিন যদি সম্মানিত দ্বীন ইছলামের কোন আইয়্যামুল্লাহ থাকে বা না থাকলে খোঁজে বের করে প্রতিষ্টা করাই নববী ছুন্নাহ।

দ্বিতীয় দলিল হলো আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু থেকে বর্ণিত সেই বর্ণনা, যেখানে এসেছেঃ (مَنْ بَنَى فِي أَرْضِ الْمُشْرِكِينَ وَصَنَعَ نَيْرُوزَهُمْ وَمَهْرِجَانَهُمْ وَتَشَبَّهَ بِهِمْ حَتَّى يَمُوتَ وَهُوَ كَذَلِكَ حُشِرَ مَعَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ) অর্থাৎ, যে ব্যক্তি অনারবদের দেশে গিয়ে তাদের নওরোজ ও মেহেরজান উদযাপন করে, তাকে তাদের সাথেই উঠানো হবে (আছ ছুনানুল কুবরা ১৮৮৬৩ (অধ্যায়: কাফিরদের উৎসব ও তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন বর্জন) ছালাফিদের গুরু ইবনে তাইমিয়ার ব্যাখ্যা-ও এসেছে যে, এই হাদীছ শরীফ মুছলমানদের জন্য কাফিরদের উৎসব পালন হারাম হওয়া প্রমাণ করেকারণ, যখন মুছলমানের জন্য আলাদা ঈদ নির্ধারিত হয়েছে, তখন কাফিরদের উৎসবের সাথে আনন্দ, সম্মান, বা অংশগ্রহণের মিল রাখা বৈধ হতে পারে না

এই বর্ণনা দ্বারা যে স্তম্ভটি দাঁড়ায় তা হলোঃ কেবল “দিন” পালন নয়; বরং তাদের উৎসবকে উৎসব হিসেবে নেওয়াই সমস্যাঅর্থাৎ, কোনো দিবসের ক্যালেন্ডার জানা এক কথা; কিন্তু সেই দিবসকে বিশেষ মর্যাদা, বিশেষ উদযাপন, বিশেষ সম্মান, এবং বিশেষ সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে পালন করা আরেক কথাহাদীছ শরীফের ভাষা এই দ্বিতীয় জিনিসটির ভয়াবহতা দেখায়কারণ এখানে কেবল অনুকরণ নয়, বরং “তাদের নওরোজ” ও “তাদের মেহেরজান”কে নিজের আমলে রূপান্তর করার কথা এসেছেসুতরাং মুছলমানের জন্য বিজাতীয় নববর্ষকে আনন্দ-উৎসব বানানো হালকা সাংস্কৃতিক বিষয় নয়

তৃতীয় দলিল হলো হযরত জাবির রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু উনার বর্ণিত হাদীছ শরীফ, যেখানে হযরত উমর রদ্বিআল্লাহু য়া’নহু ইহুদীদের কিছু ধর্মীয় কথা লিখে রাখার প্রসঙ্গ তুললে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন যে, তিনি উম্মতের নিকট নির্মল, স্পষ্ট, পরিপূর্ণ দ্বীন নিয়ে এসেছেন; এমনকি হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালামও আজ থাকলে উনাকেও এ দ্বীন অনুসরণ করতে হতোএই হাদীছ শরীফ প্রমাণ করেন যে, মুছলমানের জন্য ইহুদী-নাছারার ধর্মীয় ধারা, বিধর্মীদের আচার, বা তাদের বিশেষ রীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই; কারণ ইছলাম নিজেই পরিপূর্ণ

বিশয়টি ছিলো এমনঃ (أَمُتَهَوِّكُونَ فِيهَا يَا ابْنَ الْخَطَّابِ؟ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً، لَا تَسْأَلُوهُمْ عَنْ شَيْءٍ، فَيُخْبِرُوكُمْ بِحَقٍّ فَتُكَذِّبُوا بِهِ، أَوْ بِبَاطِلٍ فَتُصَدِّقُوا بِهِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَوْ أَنَّ مُوسَى كَانَ حَيًّا، مَا وَسِعَهُ إِلَّا أَنْ يَتَّبِعَنِي) রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ হে ইবনুল খাত্তাব, আপনি কি এতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পতিত হচ্ছেন? সেই সত্তার কছম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয়ই আমি আপনাদের নিকট এ দ্বীনকে একেবারে উজ্জ্বল, নির্মল ও সুস্পষ্ট রূপে নিয়ে এসেছিআপনারা তাদের নিকট কোনো বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন না; কারণ তারা হয়তো আপনাদেরকে কোনো সত্য কথা বলবে, আর আপনারা তা মিথ্যা মনে করে অস্বীকার করবেন; অথবা তারা কোনো বাতিল কথা বলবে, আর আপনারা তা সত্য ভেবে গ্রহণ করে বসবেন। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যদি মূছা য়ালাইহিছ ছালামও (আজকে) জীবিত থাকতেন, তবে উনার জন্যেও আমাকে অনুসরণ করা ছাড়া আর কোনো অবকাশ থাকতো না ছুবহানআল্লাহ (মুছনাদে আহমাদ, মুছান্নাফ ইবনু আবী শাইবাহ, এবং ছুনান আদ-দারিমী)

এই হাদীছ শরীফ খুবই সুস্পষ্টঃ যখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আনীত দ্বীন “بَيْضَاءَ نَقِيَّةً” অর্থাৎ উজ্জ্বল, নির্মল, পরিপূর্ণ, তখন মুছলমান কেন অন্য জাতির উৎসব, অন্য ধর্মের বর্ষবরণ, বা বিজাতীয় সাংস্কৃতিক শা’য়াইরের দিকে ফিরবে? এখানে শুধু ধর্মবদলের কথা নয়; বরং “বাইরে থেকে নেওয়ার মানসিকতা”-কেও ধাক্কা দেওয়া হয়েছেঅতএব মুছলমানের জন্য ইছলামের বাইরে উৎসব-পরিচয় খোঁজা এই হাদীছ শরীফের রূহের পরিপন্থী

চতুর্থ দলিল হলো তাশাব্বুহর হাদীছ শরীফঃ (مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ) যে ব্যক্তি কোনো ক্বওমের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত (আবু দাউদ শরীফ ৪০৩১) এর মানে হলো যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ক্বওমের স্বতন্ত্র রীতি-নীতি, আচার-আচরণ, বেশ-ভূষা ও সংস্কৃতিগত বৈশিষ্ট্যে তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ, ঐ ব্যক্তি আর উম্মতে মুহাম্মাদীর অন্তর্ভুক্ত নয়, যে বিজাতীয়দের সাথে সাদৃশ্য রাখে যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের দলভুক্ত এবং তার হাশর-নাশর তাদের সাথেই হবে একারণেই সাদৃশ্য বা তাশাব্বুহ ইছলামে হালকা বিষয় নয়; বরং তা মানুষের অন্তর্গত পরিচয়, ভালোবাসা, এবং অনুসরণের দিককে প্রকাশ করে

অতএব এইখানে আমার ইস্তিদলাল হচ্ছেঃ পহেলা বৈশাখ, নওরোজ, Happy New Year, এবং এজাতীয় নববর্ষ যদি বিধর্মীদের রীতি, পূজা, আনন্দ, সামাজিক প্রতীক, বা ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ হয়, তাহলে মুছলমানের জন্য এ দিনগুলোকে বিশেষ পোশাক, বিশেষ খাদ্য, বিশেষ শোভাযাত্রা, বিশেষ বাজারি আয়োজন ও বিশেষ শুভেচ্ছার মাধ্যমে পালন করা তাশাব্বুহর অন্তর্ভুক্ত হবেতাশাব্বুহ মানে শুধু বাহ্যিক একরকম হওয়া নয়; বরং তাদের উৎসবকে নিজের সামাজিক আনন্দে রূপান্তর করা

পঞ্চম দলিল হিসেবে আমি আশূরা শরীফের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে পারিঃ ইহুদীরা আশূরা শরীফে একটি রোযা রাখত; নবী করিম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মুছলমানদের রোযা রাখার অনুমতি দিলেন, কারণ রোযা মুছলমানদেরও ঈবাদত; কিন্তু ইহুদীদের সাথে সাদৃশ্য না রাখার জন্য ভিন্নতা রাখার কথাও বলেছেনআমার উদ্দেশ্য এখানে স্পষ্টঃ এমনকি একটি বৈধ ঈবাদাতের ক্ষেত্রেও বিজাতীয়দের সাথে পূর্ণ মিল রেখে চলা প্রশ্রয় পায়নি নবী করিম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কাছে; বরং স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার শিক্ষা এসেছেসেখানে বিধর্মীদের নিজস্ব উৎসব, শিরকী অনুষ্ঠান, বা বর্ষবরণে সাদৃশ্য রক্ষা করার কোনো সুযোগই থাকে না

ষষ্ঠ দলিল হিসেবে ছ্বহীহ মুছলিম শরীফের সেই হাদীছ শরীফ পেশ করা যায়, যেখানে বলা হয়েছে, ফিতনা এমন আসবে যে মানুষ সকালে মুওমিন, সন্ধ্যায় কাফির, অথবা সন্ধ্যায় মুওমিন, সকালে কাফির হয়ে যাবে; সামান্য দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীন বিকিয়ে দেবে(بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ، يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا، أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا، يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا) তোমরা নেক আমলের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও, ঐসব ফিতনা এসে পড়ার আগেই যা অন্ধকার রাতের খণ্ডখণ্ড অংশের মতো হবেতখন একজন মানুষ সকালে মুওমিন থাকবে, সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে; অথবা সন্ধ্যায় মুওমিন থাকবে, সকালে কাফির হয়ে যাবেসে দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থের বিনিময়ে নিজের দ্বীন বিকিয়ে দেবে (মুছলিম শরীফ ১১৮, একই অর্থে তিরমিযী শরীফের ২১৯৫-এও এসেছে) এই হাদীছ শরীফ আমি নববর্ষ-পালনের প্রসঙ্গে আনার কারণ হলোঃ মানুষ অনেক সময় সরাসরি আক্বীদা বদলায় না; বরং আনন্দ, সংস্কৃতি, সামাজিক চাপ, বাজারি আবহ, জাতিগত আবেগ, ও পরিবেশের টানে ধীরে ধীরে এমন কিছুকে গ্রহণ করে ফেলে যা ঈমানের জন্য ধ্বংসাত্মকতাই এ ধরনের দিবসকে “সামান্য সংস্কৃতি” বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়; বরং এগুলো কখনো কখনো ফিতনার দরজা হয়ে ওঠে

সুতরাং এই অংশের খোলাছা হলোঃ হাদীছ শরীফের দলিলগুলো সম্মিলিতভাবে তিনটি বিষয় প্রমাণ করেপ্রথমত, মুছলমানের উৎসব নির্ধারিত; জাহিলী বা বিজাতীয় উৎসবের পরিবর্তে ঈদ দেওয়া হয়েছে, ঈদ/উৎসব বানাতে হলেও মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সাথে ঐ দিবসের সম্পর্ক থাকা লাগবে। দ্বিতীয়ত, বিজাতীয়দের সাথে সাদৃশ্য রাখা, বিশেষত তাদের উৎসবকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করা, কঠোরভাবে নিন্দিততৃতীয়ত, ইছলাম পরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ইহুদী-নাছারা বা অন্য বিধর্মীদের রীতি-নীতি, উৎসব, বা চিহ্নের দিকে ঝুঁকে পড়া মুছলমানের স্বাতন্ত্র্য ও ঈমানের জন্য বিপজ্জনকঅতএব, নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, Happy New Year, থার্টি ফাস্ট নাইট, বা এজাতীয় নববর্ষ-পালনকে শরীয়তের আলোকে নিরীহ বা গ্রহণযোগ্য বলা যায় না; বরং হাদীছ শরীফের সামগ্রিক মর্মই এগুলো থেকে মুছলমানকে পৃথক থাকতে নির্দেশ করে

উ’লামাহ ও ফুক্বাহার ইবারতঃ

এ বিষয়ে শুধু ক্বুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফই নয়; বরং আকাবিরে উ’লামাহ, ফুক্বাহায়ে কিরাম, এবং মাযহাবের ইমামগণের ইবারতও অত্যন্ত কঠোর। কারণ তারা নওরোজ, মেহেরজান, এবং কাফিরদের উৎসবকে শুধু “একটি সামাজিক দিবস” হিসেবে দেখেননি; বরং এতে তাশাব্বুহ, সম্মান, অন্তর্ভুক্তি, এবং ধীরে ধীরে কুফরী রীতির প্রতি নরম হয়ে যাওয়ার ভয় দেখেছেন। অতএব, এ বিষয়টিকে হালকা মনে করা ফুক্বাহায়ে উম্মতের ভাষার সঙ্গে সঙ্গত নয়।

ইমাম ফখরুদ্দীন উছমান বিন আলী আয যাইলায়ী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি বলেনঃ “নওরোজ ও মেলার নামে কিছু দেয়া নাজায়িযএ দুই দিনের নামে প্রদত্ত হাদিয়া হারাম; বরঞ্চ কুফর” এই ইবারতের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীরকারণ এখানে কেবল উৎসবে অংশগ্রহণ নয়; বরং নওরোজ বা অনুরূপ দিবসকে “একটি বিশেষ দিবস” ধরে তাকে কেন্দ্র করে হাদিয়া, সম্মান, বা বিশেষ লেনদেন করাকেও ভয়াবহ পর্যায়ে দেখা হয়েছেঅর্থাৎ ফুক্বাহার চোখে সমস্যাটি কেবল আমোদ-উৎসব নয়; বরং ঐ দিনের তাকরীম বা বিশেষ মর্যাদা দানআর যখন কোনো দিন বিধর্মীদের প্রতীকী দিবস, তখন তাকে সম্মানিত রূপে গ্রহণ করাই ইছলামী স্বাতন্ত্র্যের বিপরীত

ইমাম আবু হাফস্ কবীর রহমতুল্লাহী য়ালাইহি বলেনঃ নওরোজ বা বছরের প্রথম দিন উপলক্ষে যদি কেউ একটা ডিমও দান করে, তবে তার ৫০ বৎসরের য়া’মল থাকলেও তা বরবাদ হয়ে যাবে” দ্বিতীয়ত, “যে ব্যক্তি নওরোজের দিন এমন কিছু খরিদ করল যা সে পূর্বে খরিদ করত না, এর মাধ্যমে সে যদি ঐ দিনকে সম্মান করতে চায় তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে” এই ইবারতগুলোর কেন্দ্রীয় শিক্ষা হলো সমস্যা শুধু কোনো “বড় পূজা” বা “প্রকাশ্য শিরক” নয়; বরং ঐ দিবসকে দিবস হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া, তার জন্য আলাদা কেনাকাটা, আলাদা আয়োজন, আলাদা উপঢৌকন, আলাদা আবেগ এসবই ভয়াবহঅর্থাৎ নওরোজ বা এজাতীয় দিবসের সাথে সামান্য সম্মানসূচক সংযুক্তিও ফুক্বাহা হালকা চোখে দেখেননি

ওহাবী ছালাফিদের গুরু ইবনে তাইমিয়ার উক্ত হাদীছের ভিত্তিতে বলেছে, মুছলমানদের জন্য কাফিরদের উৎসব পালন হারাম। কারণ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম জাহিলী যুগের উৎসব বহাল রাখেননি; বরং তার পরিবর্তে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা দিয়েছেন। এখানকার মূল লজিক হলোঃ “বদল” শব্দের অর্থ একটিকে ছেড়ে অপরটি গ্রহণ করা; দুইটিকে একসাথে চালু রাখা নয়। অতএব, যখন মুছলমানের জন্য ঈদ নির্ধারিত, তখন বিজাতীয় নববর্ষ, মুশরিকদের উৎসব, বা কাফিরদের বিশেষ দিবসকে পাশাপাশি বহাল রাখা শরীয়তের রূহের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

এই সম্পর্কিত হাদিছগুলো পর্যালোচনা করে যা পাওয়া যায়, ফাতহুল বারিতে ইবনু হাজার রহমতুল্লাহী য়ালাইহির বক্তব্য থেকে আমি যা বুঝলামঃ মুশরিকদের উৎসবসমূহে খুশী হওয়া কিংবা তাদের মতো উৎসব করা হাদীছ শরীফের দ্বারা অপছন্দনীয় প্রমাণিতএখানেও কেন্দ্রীয় বিষয় “অংশগ্রহণ” যতটা, তার চেয়েও বেশি “আবেগিক সহমত” ও “উৎসবী সম্মতি”কারণ কেউ যদি নিজে পূজা না-ও করে, কিন্তু ঐ দিনকে ঘিরে আনন্দিত হয়, সাজে, সামাজিকভাবে একাত্মতা দেখায়, বিশেষ আয়োজন করে, এবং দিনটিকে নিজ পরিচয়ের অংশ বানায়, তাহলে সে বাস্তবে ঐ উৎসবের সামাজিক রং নিজের উপরই মাখছে

হাম্বলি মাযহাবের ফিক্বহ গ্রন্থ ‘আল-ইকনা’-তে বলা হয়েছেঃ ইহুদি-নাছারাদের উৎসবে উপস্থিত হওয়া, ঐ উপলক্ষে তাদের কাছে বিক্রি করা, এবং তাদের উৎসবের জন্য তাদেরকে উপহার দেওয়া হারাম। অর্থাৎ কাফিরদের উৎসবে যোগদান করা, সেই দিন উপলক্ষে বেচা-বিক্রি করা ও উপহার বিনিময় করাও হারাম এই ইবারত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণকারণ এর দ্বারা বোঝা যায় শুধু ধর্মীয় আচারেই শরীক হওয়া নয়; বরং সেই উৎসবকে ঘিরে বাজার, বেচাকেনা, উপহার, সামাজিক বিনিময় সবই উৎসবায়নের অংশঅতএব, কেউ যদি বলে “আমি তো শুধু ব্যবসা করছি”, “আমি তো শুধু অফার দিচ্ছি”, “আমি তো শুধু উপহার দিচ্ছি”, তাহলে ফুক্বাহার চোখে সেটিও নিরীহ নয়; বরং ঐ দিনকে বিশেষ দিবস হিসেবে মেনে নেওয়ার একটি কৌশলী রূপঅতএব পহেলা বৈশাখে বিশেষ ছাড়, বিশেষ কেনাকাটা, বিশেষ খাদ্য, বিশেষ পোশাক-যে হারাম কাজের অন্তর্ভুক্ত তা আর বলার দরকার পড়েনা

আরও এসেছে, কাযী আবুল মাহাছেন হাছান মানছূর হানাফী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি বলেনঃ “যে ব্যক্তি ঐ দিনে এমন কোনো বস্তু ক্রয় করে, যা সে অন্যদিন ক্রয় করত না, অথবা ঐ দিনে কাউকে কোনো হাদিয়া দেয় যদি এর দ্বারা সে দিনটিকে ঐ কাফিরদের ন্যায় তা’যীম করতে চায়, তবে সে কুফর করল। আর যদি ক্রয়ের দ্বারা ভোগ-বিলাস/বিনোদন এবং হাদিয়ার দ্বারা প্রচলিত রেওয়াজমতো পারস্পরিক ভালোবাসা উদ্দেশ্য হয়, তবে তা কুফর নয়; কিন্তু কুফ্ফারের সঙ্গে সাদৃশ্যের কারণে তা মাকরূহ”। এই ইবারতের তাৎপর্য হলো উৎসবের দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ কেনাকাটা, বিশেষ উপহার, বিশেষ বাজারি অংশগ্রহণ এসবকে ফুক্বাহা খুব সূক্ষ্মভাবে বিচার করেছেনকেননা এ সকল কাজ বাহ্যত ছোট হলেও, বাস্তবে দিনটিকে সামাজিক মর্যাদা দেয়, উৎসবী আবহকে শক্তিশালী করে, এবং মানুষের মনে ঐ দিনটির প্রতি স্বাভাবিকতা ও ভালোবাসা তৈরি করে

এইসব ইবারতকে একত্র করলে একটি সুস্পষ্ট ফিক্বহী লজিক দাঁড়ায়নওরোজ, মেহেরজান, বা কাফিরদের উৎসবের ভয়াবহতা কেবল এই জন্য নয় যে সেখানে পূজা আছে; বরং এই জন্যও যে, মুছলমান যখন কোনো দিনকে বিশেষ দিবস হিসেবে গ্রহণ করে, তার জন্য আলাদা কেনাকাটা করে, আলাদা খাবার তৈরি করে, আলাদা পোশাক পরে, আলাদা শুভেচ্ছা দেয়, আলাদা ছাড় দেয়, আলাদা উপহার চালু করে, তখন সে সেই দিনকে তাকরীম দিচ্ছেআর বিধর্মীদের উৎসবকে তাকরীম দেওয়া শরীয়তে একটি অত্যন্ত গুরুতর বিচ্যুতি

সুতরাং এই অংশের খোলাছা হলোঃ উ’লামায়ে কিরাম ও ফুক্বাহায়ে কিরাম নওরোজ ও এজাতীয় কাফিরদের উৎসবকে হালকা সামাজিক বিষয় মনে করেননিবরং তারা এ দিনগুলোর নামে উপঢৌকন, বেচাকেনা, বিশেষ কেনাকাটা, বিশেষ সম্মান, বিশেষ আনন্দ, এবং অনুকরণমূলক অংশগ্রহণকে হারাম, নাজায়িয, মাকরূহ, এমনকি কুফরীর পর্যায়েও আলোচনা করেছেনঅতএব, পহেলা বৈশাখ, নওরোজ, Happy New Year, এবং এজাতীয় বিজাতীয় নববর্ষকে “লোকজ”, “নিরীহ”, বা “শুধু সংস্কৃতি” বলে পাশ কাটিয়ে দেওয়া ফুক্বাহায়ে উম্মতের ভাষার সঙ্গে যায় নাবরং তাদের ইবারতই প্রমাণ করে মুছলমানের জন্য এ ধরনের উৎসব থেকে দূরে থাকা, তা বর্জন করা, এবং অন্যকেও সতর্ক করা জরুরি

তাশাব্বুহর বাস্তব রূপঃ

তাশাব্বুহ মানে শুধু কোনো কওমের মতো পোশাক পরা বা বাহ্যিকভাবে সামান্য মিল রেখে চলা নয়; বরং তাদের বিশেষ দিন, বিশেষ উৎসব, বিশেষ রীতি, বিশেষ প্রতীক, বিশেষ খাদ্য, বিশেষ আনন্দ, এবং বিশেষ সামাজিক প্রকাশকে নিজের জীবনে জায়গা দেওয়াপহেলা বৈশাখ বা নওরোজের মতো দিবসগুলোতে মুছলমানরা যখন বিশেষ পোশাক পরে, বিশেষ খাবার খায়, বিশেষ বাজার করে, বিশেষ ছাড় দেয়, বিশেষ শুভেচ্ছা চালু করে, অথবা বিশেষ সামাজিক আবহ তৈরি করে, তখন তারা শুধু একটি দিন পার করে না; বরং ঐ দিনটিকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করেআর এই গ্রহণই তাশাব্বুহর বাস্তব রূপ এবং তাদের হয়ে যাওয়া।

এইখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, “পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিশেষ পোশাক পরিধান করা, ব্যবসা-বাণিজ্য করা, দ্রব্যমূল্যে বিশেষ ছাড় দেওয়া, ইলিশ-পান্তা খাওয়া, ফলমুল খাওয়া” এসব নিছক সামাজিক রীতি-নীতি নয়; বরং বিজাতীয় ও বিধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে মিল, অংশগ্রহণ, এবং একাত্মতার বহিঃপ্রকাশঅর্থাৎ কোনো মুছলমান যদি সাধারণ দিনে মাছ-ভাত খায়, তা এক কথা; কিন্তু “পহেলা বৈশাখ বলে” ইলিশ-পান্তা বা বিশেষ কোন খাদ্যকে উৎসবী চিহ্ন বানানো আরেক কথাসাধারণ দিনে কাপড় পরা এক কথা; কিন্তু “বর্ষবরণ বলে” বিশেষ পোশাক, বিশেষ রং, বিশেষ সাজ-সজ্জা, বা বিশেষ সাজে আত্মপ্রকাশ করা আরেক কথাএখানেই তাশাব্বুহ কেবল বাহ্যিক মিল না থেকে প্রতীকী মিল হয়ে যায়

এখানে মূল লজিকটি হলোঃ কোনো কাজ নিজে নিজে সবসময় একই হুকুম বহন করে না; বরং কেন, কখন, কোন প্রেক্ষিতে, এবং কোন দিবসকে ঘিরে তা করা হচ্ছে এটিও বিবেচ্যযেমন, সাধারণভাবে কেনাকাটা করা এক কথা; কিন্তু নওরোজ বা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে “এ দিনের সম্মানে” বিশেষ কেনাকাটা করা আরেক কথাসাধারণভাবে উপহার দেওয়া এক কথা; কিন্তু কোনো বিজাতীয় দিবসকে কেন্দ্র করে বিশেষ উপঢৌকন দেওয়া আরেক কথাসাধারণভাবে খাবার খাওয়া এক কথা; কিন্তু “বর্ষবরণ” উপলক্ষে সেই খাবারকে প্রতীকে পরিণত করা আরেক কথাঅতএব, তাশাব্বুহর আলোচনা কেবল বস্তুগত সাদৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং উৎসবী মাহিয়্যাত-এর সাথে সংযোগ স্থাপন করাই এখানে আসল

অতএব, পহেলাবৈশাখ উপলক্ষে বিশেষ পোশাক পরিধান করা, ব্যবসা-বাণিজ্য করা, দ্রব্যমূল্যে বিশেষ ছাড় দেয়া, ইলিশ-পান্তা খাওয়া, ফলমুল খাওয়া সবকিছুই বিজাতীয় ও বিধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে তাশাব্বুহ বা মিল হিসেবে হারামের অন্তর্ভুক্ত”। এটি মূলত পুরো আলোচনার বাস্তব রূপকারণ অনেকেই মনে করে, “আমি তো পূজা করছি না; শুধু ঘুরতে গেলাম”, “আমি তো শিরক করছি না; শুধু পান্তা খেলাম”, “আমি তো ধর্ম বদলাইনি; শুধু নতুন জামা পরলাম”, “আমি তো পূজায় শরীক হইনি; শুধু অফার দিলাম” কিন্তু এই সব “শুধু” মিলে মিলে একটি কওমের উৎসবকে সামাজিকভাবে শক্তিশালী করে, বৈধতা দেয়, এবং মানুষের হৃদয়ে দিনটির জন্য আলাদা মর্যাদা তৈরি করেএইখানেই তাশাব্বুহর ভয়াবহতা

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাশাব্বুহ সবসময় বড় ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না; বরং ছোট ছোট স্বাভাবিকতা দিয়ে শুরু হয়প্রথমে বলা হয়, “শুধু শুভেচ্ছা”, পরে “শুধু পোশাক”, তারপর “শুধু খাবার”, তারপর “শুধু ঘুরতে যাওয়া”, তারপর “শুধু শোভাযাত্রা দেখা”, তারপর “এ তো আমাদের সংস্কৃতি” এইভাবে মানুষ ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে আর হাক্ব ও বাতিলের সীমারেখা অনুভূত হয় না ইছলামচ্যুতি অনেক সময় এক লাফে আসে না; বরং স্বাভাবিককৃত বিজাতীয় অংশগ্রহণের সিঁড়ি বেয়ে আসে

এখানে “তাদের সাথে মিল রেখে” এই বাক্যাংশটিরও গভীর তাৎপর্য আছেকারণ ইছলামে নিষিদ্ধ সাদৃশ্য শুধু তখন নয়, যখন কেউ প্রকাশ্যে বলে “আমি তাদের একজন”; বরং তখনও, যখন সে তাদের দিবস-এর জন্য নিজের আচরণ বদলায়, নিজের সামাজিক প্রকাশ বদলায়, নিজের ভোগের ধরন বদলায়, নিজের বাজার বদলায়, নিজের আয়োজন বদলায়, এবং নিজের পরিবারকে ঐ দিনের আবহে ঢুকিয়ে দেয়এর ফলে সে সেই দিনকে দিন হিসেবে নয়, বরং একটি চিহ্নিত উৎসব দ্বীন হিসেবেই গ্রহণ করেআর মুছলমানের জন্য সমস্যাটি সেখানেইকারণ শরীয়ত তাকে নিজস্ব ৫৫ টা ঈদ দিয়েছেন; চাইলে সে ঈদের দিন বানাতে পারছে ক্বুরআন ছুন্নাহ অনুসারে, এর পরেও যদি সে বিজাতীয়দের বর্ষবরণে নিজেকে মিশিয়ে দেয়, তবে সে শরীয়ত-নির্ধারিত আনন্দ থেকে সরে গিয়ে অন্য কওমের উৎসব স্রোতে পা রাখছে

অতএব এখন যেটা বলবো সেটা একেবারে স্পষ্টঃ যদি কোনো মুছলমান তাদের সাথে মিল রেখে পহেলা বৈশাখ পালন করে তবে শরীয়ত-এর দৃষ্টিতে সে আর মুছলমান থাকতে পারে না”। এই কথার মর্ম হলো, সমস্যা দিনটায় নয়; সমস্যা হলো জেনে-শুনে, বুঝে, বিজাতীয় উৎসবী কাঠামোর ভেতর প্রবেশ করাতাই আপনি বারবার কারণ হিসেবে শিরকী উপাদান, পূজামূলক ঐতিহ্য, তাশাব্বুহ, এবং সম্মানসূচক অংশগ্রহণকে সামনে এনেছেনএই ভাগের কাজই হলো সেই বাস্তব প্রবেশদ্বারগুলোকে দেখিয়ে দেওয়া

সুতরাং এই ভাগের খোলাছা হলোঃ তাশাব্বুহর বাস্তব রূপ কেবল বিশ্বাসের মৌখিক ঘোষণা নয়; বরং বিশেষ দিনকে বিশেষভাবে পালন করা, বিশেষ পোশাক, বিশেষ খাদ্য, বিশেষ বাজারি আয়োজন, বিশেষ ছাড়, বিশেষ আবেগ, এবং বিশেষ সামাজিক একাত্মতার মাধ্যমে বিজাতীয় উৎসবকে নিজের জীবনে স্থান দেওয়াঅতএব, পহেলা বৈশাখ, নওরোজ, Happy New Year, এবং এজাতীয় নববর্ষে অংশগ্রহণের বাহ্যিক রূপগুলোকে “ছোট” বা “সামান্য” মনে করা ভুল; কারণ এগুলোই বাস্তবে একটি কুফরী বা বিজাতীয় উৎসবকে মানুষের জীবনে স্বাভাবিক, গ্রহণযোগ্য, এবং প্রিয় করে তোলেমুছলমানের জন্য করণীয় হলো শুধু শিরকী আচার বর্জন নয়; বরং সেই আচারকে শক্তিশালী করে এমন সমস্ত উৎসবী সাদৃশ্য থেকেও দূরে থাকা

আপত্তির জবাবঃ অন্যদের তৈরি জিনিস ব্যবহার করি, তাহলে তাদের উৎসব কেন নয়?

এখানে অনেকে একটি বহুলপ্রচলিত আপত্তি তুলে থাকেতারা বলেঃ “আমরা যে কম্পিউটার, গাড়ি, প্লেন, কাপড়, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ইত্যাদি অমুছলিম দের তৈরি জিনিস ব্যবহার করছি, সেগুলো যদি হারাম না হয়, তাহলে তাদের নববর্ষ, সংস্কৃতি, বা সামাজিক উৎসব বর্জন কেন? জিনিস নিলে সংস্কৃতিও নেব এতে আপত্তি কোথায়?” বাহ্যিকভাবে এই প্রশ্নটিকে অনেকে যুক্তিসঙ্গত মনে করে; কিন্তু বাস্তবে এটি একটি মৌলিক পার্থক্যকে গুলিয়ে ফেলেকারণ তৈরি জিনিস আর ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক রীতি এক নয়; উপকরণ আর পরিচয় এক নয়; মালসামানা ব্যবহার আর বিজাতীয় উৎসব গ্রহণ এক নয়

এ কারণেই এ আপত্তির জবাবের প্রথম বাক্যই হওয়া উচিতঃ কোনো বস্তুর উৎপাদনকারী কে এটি এক বিষয়; আর কোনো রীতি, উৎসব, বা প্রতীকের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক মাহিয়্যাত কী এটি আরেক বিষয়গাড়ি, কম্পিউটার, কাপড়, ঘড়ি, ঘর, প্রযুক্তি, অস্ত্র, ও যন্ত্রপাতি এসব দুনিয়াবী উপকরণএগুলো মানুষের উপকার, ব্যবহার, প্রয়োজন, এবং বৈধতার ভিত্তিতে বিচার করা হয়পক্ষান্তরে কোনো বর্ষবরণ, উৎসব, শুভেচ্ছা-পদ্ধতি, শোভাযাত্রা, বিশেষ দিবস, বিশেষ খাবার, বিশেষ সাজ, বা প্রতীকী উদযাপন এসব বস্তু নয়; বরং পরিচয়, সংস্কৃতি, এবং আনুগত্যের প্রকাশতাই একটিকে অন্যটির কিয়াছে ফেলা ভুল কেননা, নাবী করিম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মিশরের সূতি কাপড় পরিধান করেছেন, ইয়েমেনী চাদর ব্যবহার করেছেন, এবং রোম-পারস্যের যুদ্ধাস্ত্রও ব্যবহার করেছেনঅর্থাৎ, অন্য সভ্যতা বা অন্য জাতির তৈরি উপকরণ ব্যবহার করা নিজে নিজে হারাম নয়এর দ্বারা বোঝা যায় শরীয়ত উপকরণকে তার উৎপত্তির কারণে নিষিদ্ধ করে না; বরং তার ব্যবহার, প্রকৃতি, এবং শরয়ী হুকুম দ্বারা বিচার করেঅতএব “অমুকের তৈরি” হওয়াই যদি হারামের কারণ হতো, তাহলে অনেক দুনিয়াবী প্রয়োজনীয় জিনিসই বাতিল হয়ে যেত

কিন্তু এখানেই মূল পার্থক্যটি ধরতে হবেএখানে আসলে দু’টি বিষয় আছেঃ

১) অন্যদের তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার করাঃ এটি এক ধরনের দুনিয়াবী উপযোগের বিষয়

২) অন্যদের নিয়মনীতি, উৎসব, সংস্কৃতি, ও রীতিনীতি গ্রহণ করা, এটি পরিচয়গত, মানসিক, ও সামাজিক অনুসরণের বিষয়

যারা এই দুইয়ের পার্থক্য ধরতে পারে না, তারাই এ ধরনের প্রশ্ন করে থাকেকারণ বস্তুগত ব্যবহার মানেই মূল্যবোধগত আত্মসমর্পণ নয়; কিন্তু উৎসবী অংশগ্রহণ বহু সময় সেই আত্মসমর্পণেরই সামাজিক রূপ

এখানে একটি শক্ত লজিক আছেকেউ যদি অন্যের তৈরি কলম ব্যবহার করে, তাতে সে সেই কলম-নির্মাতার ধর্ম নেয় নাকেউ যদি অন্যের তৈরি গাড়িতে চড়ে, তাতে সে সেই জাতির উৎসবের অনুসারী হয় নাকেউ যদি অন্যের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তাতে সে তাদের বর্ষবরণ, প্রতীক, বা আচারকে নিজের বলে মানে নাকিন্তু যখন কেউ তাদের নববর্ষে বিশেষ শুভেচ্ছা দেয়, তাদের উৎসব উপলক্ষে বিশেষ সাজে সজ্জিত হয়, বিশেষ খাদ্য গ্রহণ করে, বিশেষ সামাজিক অংশগ্রহণ করে, বা তাদের প্রতীকী দিবসকে নিজের জীবনে মর্যাদা দেয়, তখন সে কেবল বস্তু ব্যবহার করছে না; বরং তাদের একখণ্ড পরিচয়কে নিজের জীবনে জায়গা দিচ্ছেএখানেই পার্থক্য

মুছলমান সবকিছু গ্রহণ করবে এমন কোনো সুযোগ নেই; বরং যা শরীয়তসম্মত, তা গ্রহণ করবে; যা শরীয়তসম্মত নয়, তা বর্জন করবেএই কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণকারণ ইছলাম মানুষকে অন্ধ বর্জনও শেখায় না, আবার অন্ধ গ্রহণও শেখায় নাইছলাম শেখায় তাময়ীয হাক্ব-বাতিল, হালাল-হারাম, উপযোগ-অনুকরণ, উপকরণ ও সংস্কৃতি এসবের পার্থক্যতাই অন্যদের তৈরি কোনো জিনিস প্রয়োজনের কারণে ব্যবহার করা যায় বলেই তাদের উৎসব, রীতি, ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতীকও গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে এ কথা বলা ফিক্বহী বিচারে দুর্বল এবং যুক্তিগত বিচারে ভ্রান্ত

এইখানে আরেকটি সূক্ষ্ম কথা আছেবস্তু ব্যবহারে সাধারণত উৎপাদনকারী মুখ্য নয়; কিন্তু উৎসব, রীতি, ও প্রতীকে উৎপত্তি, মাহিয়্যাত, এবং অর্থ মুখ্যযেমন, এক টুকরো কাপড়ের কোনো ধর্মীয় পরিচয় নাও থাকতে পারে; কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দিবস, নির্দিষ্ট শোভাযাত্রা, নির্দিষ্ট প্রতীক, নির্দিষ্ট বর্ষবরণ, বা নির্দিষ্ট পূজামূলক ঐতিহ্য এসবের অর্থ আছে, ইতিহাস আছে, পরিচয় আছেসুতরাং কাপড়ের সাথে উৎসবের, যন্ত্রের সাথে পূজার, গাড়ির সাথে বর্ষবরণের তুলনা করাই ভুল তুলনা

এই আপত্তির জবাবের সারকথা হলোঃ মুছলমানের জন্য হালাল উপকরণ গ্রহণের অনুমতি আছে, কিন্তু হারাম রীতি গ্রহণের অনুমতি নেই; উপকারী প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ আছে, কিন্তু বিজাতীয় উৎসবকে নিজের উৎসব বানানোর সুযোগ নেই; বস্তু ব্যবহার করা যায়, কিন্তু শরীয়তবিরোধী সংস্কৃতি গ্রহণ করা যায় না। অতএব, “যেহেতু তাদের তৈরি গাড়ি ব্যবহার করি, তাই তাদের নববর্ষও করব” এই কথা যুক্তি নয়; বরং দুই ভিন্ন প্রকৃতির জিনিসকে এক কাতারে ফেলার চেষ্টা

সুতরাং এই ভাগের খোলাছা হলো: অন্যদের তৈরি জিনিস ব্যবহার আর তাদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক রীতি গ্রহণ এক কথা নয়প্রথমটি দুনিয়াবী প্রয়োজন, উপযোগ, ও বৈধতার প্রশ্ন; দ্বিতীয়টি পরিচয়, আনুগত্য, তাশাব্বুহ, ও উৎসবী একাত্মতার প্রশ্নতাই নাবী কারিম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার উপকরণ ব্যবহারের দৃষ্টান্ত দ্বারা কেউ নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, Happy New Year, বা এজাতীয় বর্ষবরণ-উৎসবকে বৈধ প্রমাণ করতে পারে নাবরং এই আপত্তির সঠিক জবাব হলো উপকরণ নেওয়া আর উৎসব নেওয়া এক নয়; বস্তু ব্যবহার আর সংস্কৃতি গ্রহণ এক নয়; কাজেই অন্যদের তৈরি জিনিস ব্যবহার করার দোহাই দিয়ে বিজাতীয় নববর্ষ-পালনকে শরীয়তসম্মত বলার সুযোগ নাই

মূলত এখানে দু্ইটি বিষয় আছেঃ

১) কাফিরের তৈরী জিনিসপত্র, (যায়েজ)

২) কাফিরদের নিয়মনীতি বা সংস্কৃতি (নাজায়েজ)।

যারা এ দুটি বিষয়ের পার্থক্য ধরতে পারে না তারাই এ ধরনের প্রশ্ন করে থাকে এখানে মনে রাখতে হবে হাদীস শরীফে আছেঃ “নিশ্চয়ই দুনিয়ার সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে আপনাদের (মুছলমানদের) জন্য, আর আপনাদের সৃষ্টি করা হয়েছে আখেরাতে মহান আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য” অর্থ্যাৎ সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে মুছলমানদের জন্য, এমনকি কাফিররাও মুসলমানদের খাদিম সেজন্য খাদিম মনিবকে অনেককিছু বানিয়ে দিতে পারে মুছলমান সবকিছু গ্রহণ করবে এমন কোন কারণ নাই যেগুলো শরীয়ত সম্মত সেগুলোই গ্রহণ করবে, যে জিনিস শরীয়ত সম্মত নয় (যেমন মদ) সেগুলো গ্রহণ করবে না অপরদিকে মাল-সামানা ব্যবহার করতে পারলেও সংস্কৃতি বা নিয়ম নিতি রিতি নিতির ব্যাপারে কাফিরদের থেকে কোন কিছুই গ্রহণ করা যাবে না এবং কেউ যদি গ্রহণ করে তবে উপরক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীছ শরীফ অনুসারে সে মুরতাদ ও কাফির বলে গণ্য হবে তাই ইছলামী শরীয়ত অনুসারে ইচ্ছেকৃত, জেনে, শোনে, বুঝে যদি কেউ পহেলা বৈশাখ পালন করে, তাহলে সে মুরতাদ বা ইছলামচ্যূত হয়ে যাবে।

আর মুর্তাদের শাস্তি হচ্ছেঃ

১) তার জীবনের সমস্ত নেক আমল বাতিল হয়ে যাবে

২) পবিত্র হজ্জ করলে তা বাতিল হয়ে যাবে

৩) স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে, এরপর সন্তান হলে জারজ সন্তান হবে

৪) ওয়ারিস সত্ত্ব বাতিল হয়ে যাবে

৫) মারা গেলে জানাজা পরা যাবে না, কেউ ঐ ব্যক্তির জানাজা পরলে সেও মুরতাদ হয়ে যাবে

৬) তাকে মুছুলিম উপায়ে কবর দেয়া যাবে না, কুকুর বিড়ালের মত মাটির নিচে পুতে রাখতে হবে

আহলে জিকির, সতর্কতা, ও ঈমানী দায়িত্বঃ

এ পর্যায়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসেদ্বীনের সূক্ষ্ম, ভয়াবহ, এবং ঈমান-সম্পর্কিত মাছআলা মানুষ নিজের খেয়াল, সামাজিক প্রথা, রাষ্ট্রীয় প্রচার, লোকের অভ্যাস, বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার চাপে দাঁড়িয়ে নির্ধারণ করতে পারে নাবরং এ ধরনের বিষয়ে ফিরে যেতে হয় আহলে জিকির, হাক্বপন্থী য়া’লিম, এবং শরীয়ত-দরদী বুযুর্গদের দিকেকারণ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দ্বীন মানুষকে অনুমানভিত্তিক চালানোর জন্য দেননি; বরং হাক্ব চিনে নেওয়ার জন্য দলিল, বোধ, এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দান করেছেন মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেনঃ (فَسۡـَٔلُوٓا۟ أَهۡلَ ٱلذِّكۡرِ إِن كُنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ) (দ্বীনের কোন বিষয়ে) যদি তোমরা না জানো, তবে (যারা) আহলে জিকর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো। (ছুরাহ আন-নাহল ১৬:৪৩, ছুরাহ আল-আম্বিয়া ২১:৭) অর্থাৎ দ্বীন শিখতে হলে এমন লোকদের কাছে যেতে হবে, যারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মা’য়রীফাত এর সাথে শরীয়তও বোঝেন, ঈমানের ক্বদর বোঝেন, হাক্ব-বাতিলের পার্থক্য বোঝেন, এবং দুনিয়ার চাপে ফতোওয়া বদলায়ও না

এই কারণেই আমার লিখায় খুব কঠোরভাবে বলা হয়েছে যে, যারা ধর্মব্যবসায়ী, নিজ প্রয়োজনে ফতোওয়া ঘুরিয়ে ফেলে, নিজেরাই ঠিকমতো য়া’মল করে না, বেপর্দা চলে, হারাম কাজে লিপ্ত থাকে, কিংবা হারাম কুফরী ব্যবস্থার রাজনীতিতে ডুবে থাকে তাদের থেকে এ ধরনের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা যাবে নাএই বক্তব্যের ভেতরের মূল শিক্ষা হলো, “দ্বীনকে নিরাপদ রাখতে হলে দ্বীন শেখার উৎসকেও নিরাপদ রাখতে হবে”কারণ কোনো মাছআলার ভয়াবহতা তখনই মানুষের সামনে সত্যভাবে ফুটে ওঠে, যখন তা বলার ব্যক্তি নিজেই দ্বীনের ওজন বুঝে, ঈমানের মর্যাদা বোঝে, এবং বাতিলকে “কালচার”, “আধুনিকতা”, “প্রগতিশীলতা”, বা “জাতীয় ঐতিহ্য” নামে সাজিয়ে দিতে চায় নাঅতএব, নববর্ষ, নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, এবং এজাতীয় উৎসবের বিষয়ে হাক্ব জানতে হলে হাক্ক্বানী য়া’লিম ও আহলে জিকিরের শরণ নেওয়াই মুছলমানের করণীয়

আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক হলো এ ধরনের কুফরী ও বিজাতীয় রীতির বিরুদ্ধে সতর্ক করা শুধু একটি মতামত প্রচার নয়; বরং এটি মুছলমানের ঈমানী দায়িত্ব কারণ, যখন কোনো কাজ মানুষের ঈমান, পরিচয়, স্বাতন্ত্র্য, এবং পরিবার-সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, তখন চুপ থাকা আমানতের খিয়ানত হয়ে দাঁড়ায় যদি এসব উৎসবের কারণে অসংখ্য মুছলমান গোমরাহি, তাশাব্বুহ, শিরকী সংস্কৃতির প্রতি নরম হওয়া, এবং ঈমানের ভয়াবহ বিপদের মধ্যে ঢুকে পড়ে, তাহলে তাদেরকে সতর্ক করা, সত্যটি জানানো, এবং ফিতনার মুখোশ খুলে দেওয়া প্রত্যেক সচেতন মুছলমানের উপর এক প্রকার ঈমানী দাবি হয়ে যায়।

এই দায়িত্বের দলিল হিসেবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার এই আয়াত শরীফ পেশ করছিঃ (كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِٱلْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ) তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত; মানুষের কল্যাণের জন্য তোমাদেরকে বের করা হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে” (ছুরাহ আলে ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম, আয়াত ৩:১১০) এর দ্বারা বোঝা যায়, মুছলমানের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল নামাজ-রোযায় নয়; বরং সমাজকে হাক্বের দিকে ডাকা, এবং মুনকার থেকে ফিরিয়ে রাখার মধ্যেওঅতএব, যদি নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, Happy New Year, থার্টি ফাস্ট নাইট, বা এজাতীয় বর্ষবরণ-উৎসব বাস্তবে ঈমান-ধ্বংসী, বিজাতীয়, শিরকী, বা মুছলিম  স্বাতন্ত্র্যবিরোধী রীতি হয়ে থাকে, তবে তা থেকে মানুষকে সতর্ক করা সরাসরি এই আয়াত শরীফের মাক্বছাদের অন্তর্ভুক্ত

অনেকেই মনে করেঃ “আমি নিজে তো করছি না, অন্যরা করলে আমার কী?” কিন্তু এ দৃষ্টিভঙ্গি উম্মাহ-সচেতন ঈমানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ যখন একটি বাতিল রীতি ধীরে ধীরে সমাজে “স্বাভাবিক”, “গ্রহণযোগ্য”, “লোকজ”, “জাতীয়”, কিংবা “শিশুদের আনন্দ” নামে ঢুকে পড়ে, তখন কেবল ব্যক্তিগত বর্জন যথেষ্ট হয় না; বরং সত্য উচ্চারণ, সতর্কতা, এবং ফিতনার নাম-পরিচয় উন্মোচন করাও জরুরি হয়ে পড়ে। নতুবা একসময় সমাজের বড় অংশ এমন এক জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে শিরকী উপাদানকেও সংস্কৃতি বলা হয়, আর বিজাতীয় উৎসবকেও ঐতিহ্য বলে সাফাই দেওয়া হয়। মুছলমান যদি নিজে না জাগে, তবে তার ঘর, সন্তান, সমাজ, এবং পরবর্তী প্রজন্ম ধীরে ধীরে বাতিলের স্রোতে ভেসে যাবে।

পরিশেষে নববর্ষ-পালন, নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, এবং এজাতীয় দিবসগুলোকে হালকা করে দেখা যাবে না। কারণ এগুলো কেবল আনন্দের দিন নয়; বরং পরিচয়ের দিন, আনুগত্যের দিন, হৃদয়ের নরম হয়ে যাওয়ার দিন, এবং বহু সময় শিরকী ও মুশরিকী উপাদানের সাথে আপসের দিন। তাই মানুষকে সতর্ক করার কাজও হালকা ভাষায় হয় না; বরং দলিল, ইতিহাস, ফুক্বাহার ইবারত, এবং বাস্তবতার আলোকে স্পষ্ট ভাষায় করতে হয়।

সুতরাং এই ভাগের খোলাছা হলোঃ এ ধরনের মাছআলায় মানুষকে নিজের মন, পরিবেশ, রাষ্ট্রীয় প্রচার, বা লোকাচারের কাছে নয়; বরং আহলে জিকির, হাক্ক্বনী য়া’লিম, এবং শরীয়তের বিশ্বস্ত বাহকদের কাছে ফিরে যেতে হবেএকই সঙ্গে, যখন সমাজে বিজাতীয় ও কুফরী রীতি উৎসবের নামে ঢুকে পড়ে, তখন তা থেকে নিজে বাঁচা এবং অন্যকে বাঁচানোর জন্য সতর্ক করা মুছলমানের ঈমানী দায়িত্বঅতএব, নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, Happy New Year, এবং এজাতীয় নববর্ষ-উৎসবের বিরুদ্ধে দলিলভিত্তিক সতর্কতা উচ্চারণ করা কোনো বাড়াবাড়ি নয়; বরং (أَمْرٌ بِالْمَعْرُوفِ نَهْيٌ عَنِ الْمُنْكَرِ) এরই অংশ

উপসংহারঃ উপর্যুক্ত ক্বুরআন শরীফের আয়াত শরীফ, হাদীছ শরীফের দলিল, নওরোজের ঐতিহাসিক উৎস, আকাবিরে উ’লামাহ ও ফুক্বাহায়ে কিরামের ইবারত, পহেলা বৈশাখে বিদ্যমান শিরকী ও বিজাতীয় উপাদানের বাস্তবতা, তাশাব্বুহর ভয়াবহতা, এবং “অন্যদের তৈরি জিনিস” ও “অন্যদের সংস্কৃতি”র পার্থক্য—এই সবকিছু একত্রে বিচার করলে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, Happy New Year, থার্টি ফাস্ট নাইট, কিংবা এজাতীয় যেকোনো নববর্ষ-উৎসব মুছলমানদের জন্য শরীয়তসম্মত নয়; বরং তা বিজাতীয়, বিধর্মীয়, মুশরিকী, এবং কুফরী রীতির অন্তর্ভুক্তঅতএব, এসবকে উৎসব হিসেবে গ্রহণ করা, মর্যাদা দেওয়া, আনন্দের দিন বানানো, অথবা মুছলমানদের জীবনে বৈধ সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা গুরুতর ভ্রষ্টতা

এ ফয়ছালার ভিত্তি একাধিকপ্রথমত, পবিত্র দ্বীন ইছলামই একমাত্র পূর্ণ, পরিপূর্ণ, এবং গ্রহণযোগ্য দ্বীন; অতএব ইছলামের বাইরে অন্য ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব তালাশ করার অবকাশ নেইদ্বিতীয়ত, নাবী কারিম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম জাহিলী উৎসবের বদলে মুছলমানদের জন্য দুই ঈদ নির্ধারণ করেছেন; সুতরাং মুছলমানের উৎসবের ক্ষেত্রেও স্বাতন্ত্র্য আবশ্যকতৃতীয়ত, তাশাব্বুহ বা বিজাতীয়দের সাথে সাদৃশ্য রাখতে হাদীছ শরীফে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছেচতুর্থত, নওরোজ ও পহেলা বৈশাখের শেকড় এবং বাস্তব রূপ শিরকী, মুশরিকী, মজুসী, বা বিধর্মীয় উপাদানে ভারীপঞ্চমত, উ’লামায়ে কিরাম এইসব দিবসের নামে উপহার, বেচাকেনা, বিশেষ আয়োজন, এবং উৎসবী সম্মানকেও ভয়াবহ বিচ্যুতি হিসেবে গণ্য করেছেনঅতএব, এ বিষয়ে নরম ভাষায় “এটা শুধু সংস্কৃতি” বলা দলিল, ইতিহাস, এবং ফিক্বহ তিনটির সাথেই অসঙ্গত

সুতরাং মুছলমানের উপর আবশ্যক হলো নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, Happy New Year, থার্টি ফাস্ট নাইট, কিংবা অন্য যেকোনো বিজাতীয় নববর্ষ-উদযাপন সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা; এ উপলক্ষে বিশেষ পোশাক, বিশেষ খাদ্য, বিশেষ বাজার, বিশেষ ছাড়, বিশেষ শুভেচ্ছা, বিশেষ শোভাযাত্রা, এবং বিশেষ সামাজিক আবেগ সৃষ্টি করা থেকেও বিরত থাকা; এবং পরিবার, সন্তান, স্বজন, ও সমাজকে এ ফিতনা থেকে দূরে রাখতে সচেষ্ট থাকাকারণ, অনেক সময় মানুষ সরাসরি শিরক বা কুফর ঘোষণা করে না; বরং ধীরে ধীরে বিজাতীয় রীতিকে “সংস্কৃতি” নামে গ্রহণ করতে করতে ঈমানের সীমানা দুর্বল করে ফেলেতাই সতর্কতা, বর্জন, এবং স্পষ্ট অবস্থান এই তিনটিই এ বিষয়ে মুছলমানের নিরাপদ পথ

আরও স্পষ্টভাবে বলা যায়, মুছলমানের জন্য নিজের ঈদ/আইয়্যামুল্লাহই যথেষ্ট, নিজের শরীয়তই যথেষ্ট, নিজের দ্বীনই যথেষ্টসে অন্যদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু তাদের উৎসব গ্রহণ করতে পারে না; অন্যদের তৈরি উপকরণ ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু তাদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সাথে একাকার হতে পারে না; সাধারণ জীবনযাপন করতে পারে, কিন্তু শিরকী ও বিজাতীয় দিবসকে সম্মানিত উৎসবে পরিণত করতে পারে নাতাই মুছলমানের করণীয় হলো হাক্বকে হাক্ব বলা, বাতিলকে বাতিল বলা, দ্বীনের পূর্ণতায় সন্তুষ্ট থাকা, এবং নতুন বর্ষের নামে নতুন ফিতনা নিজের ঘরে টেনে না আনা

অতএব, নওরোজ, পহেলা বৈশাখ, Happy New Year, থার্টি ফাস্ট নাইট, পহেলা মুহাররমকে নববর্ষ-উৎসব বানানো, অথবা এজাতীয় বিজাতীয় বর্ষবরণকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে গ্রহণ করা মুছলমানের জন্য হারাম, নাজায়িয, এবং ঈমানের জন্য ভয়াবহ বিপজ্জনকআর মুছলমানের ঈমানী দায়িত্ব হলো এ ধরনের রীতি বর্জন করা, অন্যকে বর্জন করানো, এবং আহলে জিকির ও হাক্বপন্থী য়া’লিমদের দলিলভিত্তিক নির্দেশনার আলোকে দ্বীনকে নিরাপদ রাখা(وَٱللّٰهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ) মহান আল্লাহ তায়ালা-ই সঠিক বিষয়টি সবচেয়ে ভালো জানেন


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: