মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভুলে যারা হারাম খেলাধুলা, ক্রিকেট ও ফুটবলে মগ্ন, তাদের পরিণতি কী?
প্রবাসে অফলাইনে অবস্থান করেও খেলা নামক ভয়াবহ ও দ্বীনবিরোধী ফিতনা থেকে যেন রেহাই পাওয়ার উপায় নেই। ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা অন্য কোনো খেলা নিয়ে মানুষের যে উন্মাদনা দেখি, একজন মুছলিম কীভাবে এমন উন্মাদনায় ডুবে থাকতে পারে, তা আমার বুঝেই আসে না।
আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, বাজার ধরে রাখার চিন্তায় থাকা কথিত ওয়ায়েজ ও উলামায়ে ছূ’রা এই খেলাধুলার ভয়াবহ দিকগুলো কখনোই মুছলিম উম্মাহর যুবসমাজের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরে না। তারা যুবকদের ইমান, য়া’মল, আখলাক্ব ও আখিরাত রক্ষার চেষ্টা না করে উল্টো নিজেরাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসব খেলা দেখে, কাফির মুশরিক খেলোয়াড় ও দলগুলোর অন্ধ সমর্থকে পরিণত হয় এবং যুবসমাজকে একই পথে উৎসাহিত করে।
কোনো অমুছলিম ব্যক্তি বা দলের সাধারণ পার্থিব সফলতা দেখা আর তাদের প্রতি এমন অন্ধ মুহব্বত পোষণ করা এক বিষয় নয়, যে মুহব্বতের কারণে একজন মুছলিম মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভুলে যায়, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আদর্শ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, নামাজ নষ্ট করে এবং কাফির ফাছিক্বদের চালচলন নিজের জীবনের আদর্শ বানিয়ে নেয়। দ্বিতীয় অবস্থাটি ইমানের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ।
মুছলিম উম্মাহকে খেলাধুলায় মত্ত রেখে ইছলামের শত্রুরা যে কতভাবে ইছলামের ক্ষতি করে যাচ্ছে, আজকের খেলাধুলায় মত্ত ফাছিক্ব যুবসমাজ তা বুঝতেই পারছে না। মুছলিম উম্মাহর সবচেয়ে মূল্যবান তিনটি সম্পদ হলো সময়, জ্ঞান ও মাল। অথচ আজ এই তিনটি সম্পদের বিরাট অংশ এমন এক বিনোদনশিল্পের হাতে বন্দী, যার পরিচালনা, অর্থনীতি, প্রচারব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ প্রধানত ইহুদী নাছারা এবং ধর্মহীন পুঁজিবাদী শক্তির হাতে।
আফসোস হয়, কুরআন শরীফ ও হাদিছ শরীফে এত নছ্বিহত মওজুদ থাকা সত্ত্বেও মুছলিম সমাজে এই উন্মাদনা কীভাবে বিদ্যমান থাকে!
আসুন, খেলাধুলার ব্যাপারে কুরআন শরীফ ও ছুন্নাহ মুবারকে আমাদের জন্য কী দিকনির্দেশনা রয়েছে, মুওমিনের জীবন সম্পর্কে ইছলামের মূলনীতি কী এবং খেলাধুলায় মত্ত থাকার শরয়ী পরিণতি কী, তা দলিলের আলোকে দেখি।
সকল খেলাধুলা এক হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়ঃ
আলোচনার শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। এখানে শরীর সুস্থ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যায়াম, আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ, যুদ্ধপ্রস্তুতি, সাঁতার, তীরন্দাজি, অশ্বারোহণ, পরিবারের সদস্যদের হক্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে বৈধ ক্রীড়া কৌতুক অথবা শরীয়ত অনুমোদিত কোনো উপকারী কার্যক্রমের বিরোধিতা করা হচ্ছে না।
এখানে নিন্দিত খেলাধুলা বলতে সেই খেলাধুলাকে বোঝানো হচ্ছে, যা নিছক লাহও, লায়িব ও লাগ্বও, যার কোনো শরীয়তসম্মত উদ্দেশ্য নেই, যা মানুষকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির, নামাজ, দ্বীনি দায়িত্ব ও আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে গ্বাফিল করে এবং যার সঙ্গে সময়ের অপচয়, অর্থের অপচয়, বেপর্দা, সতর প্রদর্শন, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, গান বাজনা, জুয়া, বাজি, গালিগালাজ, বিদ্বেষ, দলপূজা ও খেলোয়াড়পূজার মতো অসংখ্য হারাম বিষয় জড়িত। বর্তমান ক্রিকেট ও ফুটবল সংস্কৃতি সাধারণভাবে এই নিন্দিত শ্রেণির সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
যেসব ক্রীড়া হাক্বের অন্তর্ভুক্ত এবং যেসব ক্রীড়া বাতিলঃ
রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (مَا يَلْهُو بِهِ الرَّجُلُ الْمُسْلِمُ بَاطِلٌ إِلَّا رَمْيَهُ بِقَوْسِهِ وَتَأْدِيبَهُ فَرَسَهُ وَمُلَاعَبَتَهُ أَهْلَهُ فَإِنَّهُنَّ مِنَ الْحَقِّ) অর্থাৎ একজন মুছলিম ব্যক্তি যেসব ক্রীড়া কৌতুকের মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রাখে, সেগুলো সবই বাতিল। তবে তার ধনুক দিয়ে তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ, নিজের ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিজের আহলের সঙ্গে ক্রীড়া কৌতুক করা এর ব্যতিক্রম। কারণ এগুলো হাক্বের অন্তর্ভুক্ত।
১.
ধনুক দিয়ে তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ।
২.
জিহাদ, সফর ও প্রয়োজনীয় কাজের জন্য ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
৩. নিজের স্ত্রী ও আহলের সঙ্গে বৈধ ক্রীড়া কৌতুক করা।
√ জামে’য় আত তিরমিযী শরীফ
- ১৬৩৭, মানঃ ছ্বহীহ
√ ছুনান ইবন মাজাহ শরীফ - ২৮১১, মানঃ হাছান
হাদিছ শরীফে একদিকে বলা হয়েছেঃ (بَاطِلٌ) অর্থাৎ বাতিল। অন্যদিকে অনুমোদিত বিষয়গুলো সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ (فَإِنَّهُنَّ مِنَ الْحَقِّ) অর্থাৎ এগুলো হাক্বের অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং এখানে নিছক কম উপকারী ও বেশি উপকারী কাজের তুলনা করা হয়নি। বরং বাতিলের বিপরীতে হাক্বকে দাঁড় করানো হয়েছে। যেসব বাহ্যিক ক্রীড়া শরীয়তসম্মত উদ্দেশ্য, পরিবার রক্ষা, আত্মরক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা, জিহাদি প্রস্তুতি অথবা হালাল প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত, সেগুলো হাক্বের অন্তর্ভুক্ত। আর যে খেলাধুলা উদ্দেশ্যহীন লাহও, লাগ্বও ও সময়নাশী ব্যস্ততা, তা বাতিল।
এখন প্রশ্ন হলো, বাতিল হওয়ার পরও কি একজন মুওমিনের জন্য জেনেশুনে তাতে মগ্ন থাকা বৈধ হতে পারে?
মুওমিনের সমগ্র জীবনই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্যঃ
মুওমিনের জীবনে এমন কোনো স্বাধীন অঞ্চল নেই, যেখানে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুম কার্যকর হবে না। ঈবাদাত মানে শুধু নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত অথবা তাছবিহ তাহলীল নয়।
একজন মুওমিন হালাল রিজিকের জন্য কাজ করলে, পরিবারের ভরণপোষণ করলে, স্ত্রী সন্তানদের হক্ব আদায় করলে, শরীর সুস্থ রাখার উদ্দেশ্যে ঘুমালে, হালাল খাবার খেলে, দ্বীনি নিয়তে জ্ঞান অর্জন করলে, এমনকি দোয়া পড়ে শৌচাগারে প্রবেশ করলেও তা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে য়িবাদতে পরিণত হয়।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) অর্থাৎ আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানী, আমার সমগ্র জীবন এবং আমার মৃত্যু সবই সমগ্র কায়েনাতের রব মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্য।
√ ছুরাহ, আল আনয়াম - ৬:১৬২
আয়াত শরীফে শুধু নামাজ ও কুরবানীর কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে, (وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي), আমার জীবন ও আমার মৃত্যু মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্য।
অতএব মুওমিনের দিনের কিছু সময় মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্য আর বাকি সময় উদ্দেশ্যহীন বাতিল, খেলাধুলা ও গ্বাফলতের জন্য, এমন ধারণা ইছলামের উবূদিয়্যাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সফল মুওমিন লাগ্বও থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখেঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা সফল মুওমিনদের পরিচয় দিতে বলেনঃ (وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ) অর্থাৎ এবং উনারা এমন মুওমিন, যাঁরা অনর্থক, নিষ্ফল, বাতিল ও অকল্যাণকর কথা এবং কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখেন।
√ ছুরাহ, আল মুওমিনূন - ২৩:৩
اللَّغْوِ শুধু মুখের অনর্থক কথাবার্তা নয়। এর মধ্যে এমন কথা, কাজ ও ব্যস্ততাও অন্তর্ভুক্ত, যার কোনো শরীয়তসম্মত উপকার নেই, যা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক নয় এবং যা মানুষের মূল্যবান জীবন নষ্ট করে।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা সফল মুওমিনের পরিচয় হিসেবে বলেননি যে, তিনি মাঝে মাঝে লাগ্বও থেকে বিরত থাকেন। বরং বলেছেন, তিনি লাগ্বও থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখেন। অর্থাৎ মুওমিনের স্বভাবই হলো অনর্থক ও বাতিল কাজ প্রত্যাখ্যান করা।
অতএব কোনো কাজ সম্পর্কে শুধু এতটুকু বললেই যথেষ্ট নয় যে, এর মধ্যে সরাসরি জুয়া নেই অথবা এটি নামাজের ভেতরে করা হচ্ছে না। বরং প্রশ্ন করতে হবে, কাজটির মধ্যে কি হাক্বিক্বী দুনিয়াবি অথবা আখিরাতের উপকার রয়েছে? নাকি তা কেবল সময়, মনোযোগ, চিন্তাশক্তি, মুহব্বত ও মালকে বাতিল কাজে ব্যয় করছে?
এই তিনটি মূলনীতি একত্রে রাখলে হুকুমটি পরিষ্কার হয়ে যায়।
প্রথমত,
উদ্দেশ্যহীন ক্রীড়া কৌতুককে হাদিছ শরীফে বাতিল বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত,
সফল মুওমিনকে লাগ্বও থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয়ত, মুওমিনের সমগ্র জীবন মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্য উৎসর্গীকৃত।
সুতরাং শরীয়ত অনুমোদিত ও উপকারী ক্রীড়া ব্যতীত নিছক সময় কাটানোর জন্য বাতিল খেলাধুলায় মগ্ন থাকা মুওমিনের জন্য বৈধ হতে পারে না। আর ক্রিকেট ও ফুটবলের বর্তমান উন্মাদনার সঙ্গে যখন নামাজ নষ্ট করা, জুয়া, বেপর্দা, সতর দেখা, গান বাজনা, অপচয়, অন্ধ অনুকরণ এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির থেকে গ্বাফলত যুক্ত হয়, তখন তা একাধিক স্বতন্ত্র কারণে হারাম হয়ে যায়।
কেউ মানুক অথবা না মানুক, এতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং সম্মানিত দ্বীন ইছলামের কোনো ক্ষতি হবে না। সারা পৃথিবীর কথিত য়া’লিম, মুল্লা, মুর্শিদ, বাবা ও বক্তারা একত্রিত হয়ে কোনো বাতিলকে জায়িয বললেও তা জায়িয হয়ে যাবে না। হাক্বের মাপকাঠি মানুষের সংখ্যা নয়, বরং কুরআন শরীফ ও ছুন্নাহ মুবারকের দলিল।
হিসাব নিকটবর্তী, অথচ মানুষ খেলাধুলায় নিমগ্নঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُعْرِضُونَ مَا يَأْتِيهِمْ مِنْ ذِكْرٍ مِنْ رَبِّهِمْ مُحْدَثٍ إِلَّا اسْتَمَعُوهُ وَهُمْ يَلْعَبُونَ) অর্থাৎ মানুষের হিসাব গ্রহণের সময় নিকটবর্তী হয়ে এসেছে, অথচ তারা গ্বাফলতির মধ্যে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। তাদের রবের পক্ষ থেকে যখনই তাদের কাছে কোনো নতুন স্মরণিকা আসে, তখন তারা তা শোনে এমন অবস্থায় যে, তারা তখনও খেল তামাশায় নিমগ্ন।
√ ছুরাহ, আল আম্বিয়া য়ালাইহিমুছ ছালাম - ২১:১-২
মানুষের কৃতকর্মের হিসাব নেওয়ার দিন ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে। অথচ তারা এ ব্যাপারে উদাসীন। কোনো সতর্কবাণী তাদের অন্তরকে জাগ্রত করছে না। দুনিয়ার চাকচিক্য, ব্যবসা, বিনোদন, প্রতিযোগিতা ও খেলাধুলা তাদের এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, আখিরাতের কথা তাদের মনে থাকে না।
আখিরাতের প্রস্তুতির অর্থ হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ওপর পরিপূর্ণ ইমান আনা, উনার ফরযসমূহ যথাসময়ে আদায় করা, নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিটি মুহূর্তকে হিসাবের দিনের পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করা। কিন্তু যারা খেলাধুলার সময়সূচি জানে, খেলোয়াড়দের জীবনকাহিনি জানে, দলের পরিসংখ্যান জানে, অথচ নামাজের মাসআলা, কুরআন শরীফের অর্থ ও নিজেদের আখিরাতের প্রয়োজন জানে না, তারা কীভাবে হিসাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে?
তাফছিরসমূহে এই আয়াতের সারকথা হলো, মানুষ আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে অমনোযোগী, দুনিয়ার চাকচিক্যে নিমজ্জিত এবং ইমানের দাবি পূরণ থেকে উদাসীন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে ওহী ও নছ্বিহত আসছে, অথচ তারা অন্তর দিয়ে তা গ্রহণ করছে না।
রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজের দুটি আঙুল মুবারক পাশাপাশি করে বলেনঃ (بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ هَكَذَا) অর্থাৎ আমাকে এবং ক্বিআমতকে এভাবে প্রেরণ করা হয়েছে।
√ ছ্বহীহ বুখারী শরীফ - ৬৫০৩
অর্থাৎ উনার আগমন এবং ক্বিআমতের মধ্যে দূরত্ব অত্যন্ত সামান্য। এখন জানার বিষয় হলো, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কি ক্বিআমতের নিকটতার সংবাদ এ জন্য দিয়েছিলেন যে, উম্মত ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্রিকেট ও ফুটবলে মত্ত থাকবে? নাকি এ জন্য দিয়েছিলেন, যেন মানুষ গ্বাফলত থেকে জেগে উঠে আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করে?
মানুষ কি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার আযাব থেকে নিরাপদ হয়ে গেছে?
মহান আল্লাহ তা’য়ালা কুরআন শরীফের বিভিন্ন স্থানে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, মানুষকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে, সে দুনিয়ায় কেন এসেছে এবং তার দায়িত্ব কী।
গ্বাফলত, খেল তামাশা ও অবাধ্যতায় মত্ত জনপদগুলোর ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (أَفَأَمِنَ أَهْلُ الْقُرَىٰ أَنْ يَأْتِيَهُمْ بَأْسُنَا بَيَاتًا وَهُمْ نَائِمُونَ أَوَأَمِنَ أَهْلُ الْقُرَىٰ أَنْ يَأْتِيَهُمْ بَأْسُنَا ضُحًى وَهُمْ يَلْعَبُونَ) অর্থাৎ জনপদগুলোর অধিবাসীরা কি এতটাই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, রাত্রিবেলায় যখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে, তখন তাদের ওপর আমার আযাব এসে পড়বে না? অথবা জনপদগুলোর অধিবাসীরা কি এতটাই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, দিনের মধ্যভাগে যখন তারা খেল তামাশায় নিমগ্ন থাকবে, তখন তাদের ওপর আমার আযাব এসে পড়বে না?
√ ছুরাহ, আল আ’য়রাফ - ৭:৯৭-৯৮
আউযুবিল্লাহ! কী ভয়াবহ সতর্কবাণী! আজ মানুষ যখন স্টেডিয়ামে অথবা পর্দার সামনে খেলা নিয়ে উন্মত্ত, নামাজের সময় অতিক্রম করছে, বেপর্দা ও অর্ধনগ্ন নারীদের দেখছে, চোখ ও অন্তরের যিনায় লিপ্ত হচ্ছে, গালিগালাজ করছে এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার স্মরণ থেকে সম্পূর্ণ গ্বাফিল হয়ে আছে, তখন কি সে নিশ্চিত যে, ঐ অবস্থায় তার মৃত্যু আসবে না?
কোনো ভূমিকম্প, দুর্ঘটনা, হৃদরোগ অথবা অন্য কোনো বিপদ যদি হঠাৎ এসে যায় এবং তাওবাহ করার পূর্বেই ঐ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তখন তার কী হবে?
কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট খেলার আযাব বলা আমাদের কাজ নয়। কিন্তু আয়াত শরীফের সতর্কতা অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। মানুষ ঘুমন্ত অথবা খেল তামাশায় নিমগ্ন থাকাকালেও মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পাকড়াও এসে যেতে পারে। অতএব গুনাহ ও গ্বাফলতের অবস্থায় নিরাপদ বোধ করা ভয়াবহ আত্মপ্রবঞ্চনা।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ مَا لَهُ مِنْ دَافِعٍ يَوْمَ تَمُورُ السَّمَاءُ مَوْرًا وَتَسِيرُ الْجِبَالُ سَيْرًا فَوَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِلْمُكَذِّبِينَ الَّذِينَ هُمْ فِي خَوْضٍ يَلْعَبُونَ يَوْمَ يُدَعُّونَ إِلَىٰ نَارِ جَهَنَّمَ دَعًّا هَذِهِ النَّارُ الَّتِي كُنْتُمْ بِهَا تُكَذِّبُونَ) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আপনার রবের আযাব অবশ্যম্ভাবী। তা প্রতিহত করার মতো কেউই নেই। যেদিন আসমান প্রচণ্ডভাবে আন্দোলিত হবে এবং পাহাড়সমূহ দ্রুত চলতে থাকবে। সেদিন মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা বাতিল আলোচনায় ডুবে খেল তামাশায় মত্ত ছিল। যেদিন তাদের ধাক্কা দিতে দিতে জাহান্নামের আগুনের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। বলা হবে, এটাই সেই আগুন, যাকে তোমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে।
√ ছুরাহ, আত্ব ত্বূর - ৫২:৭-১৪
এই আয়াতের সরাসরি বিষয় শুধু মাঠের খেলাধুলা নয়। এখানে (فِي خَوْضٍ يَلْعَبُونَ) দ্বারা বাতিল আলোচনা, মিথ্যাচার ও গ্বাফলতপূর্ণ তামাশায় ডুবে থাকার অবস্থাও বোঝানো হয়েছে। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেট ও ফুটবল উন্মাদনা যখন মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই বাতিল আলোচনা, তর্ক, বিদ্বেষ, উচ্ছ্বাস ও গ্বাফলতে ডুবিয়ে রাখে, তখন তা এই নিন্দিত চরিত্রের বাস্তব উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়।
নাউযুবিল্লাহ! এরপরও মুছলিম দাবিদার কোনো ব্যক্তি কীভাবে নিজের মূল্যবান জীবন জাহিলি খেলাধুলার উন্মাদনায় ধ্বংস করতে পারে?
কায়েনাতকে খেল তামাশার জন্য সৃষ্টি করা হয়নিঃ
ইবলিশ মানুষকে কুরআন শরীফ ও ছুন্নাহ মুবারক অধ্যয়ন থেকে বিরত রাখতে তাকে হারাম ক্রীড়া কৌতুকে মত্ত রেখেছে। মানুষ ভুলেই গেছে, তাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে। সে ভুলে গেছে, যমীনে তাকে দায়িত্বশীল বানানো হয়েছে, তার মাধ্যমে হাক্ব ও ইনছাফ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অগণিত মুওমিন মুছলিম এই দ্বীনের জন্য নিজেদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করেছেন।
আজ অনেক মানুষ এমনভাবে জীবন কাটায়, যেন তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে ক্রিকেট, ফুটবল, সিনেমা, গান, হাসি তামাশা ও বিনোদন দেখার জন্য। অথচ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ) অর্থাৎ আমি আসমানসমূহ, যমীন এবং এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু রয়েছে, সেগুলোকে ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি।
√ ছুরাহ, আদ দুখান - ৪৪:৩৮
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরও বলেনঃ (وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ لَوْ أَرَدْنَا أَنْ نَتَّخِذَ لَهْوًا لَاتَّخَذْنَاهُ مِنْ لَدُنَّا إِنْ كُنَّا فَاعِلِينَ) অর্থাৎ আমি আসমান, যমীন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী কোনো কিছুই খেল তামাশার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি। আমি যদি কোনো ক্রীড়া কৌতুকের বস্তু গ্রহণ করতে চাইতাম, তবে আমার নিকট থেকেই তা গ্রহণ করতাম, যদি আমাকে এমন কিছু করতেই হতো।
√ ছুরাহ, আল আম্বিয়া য়ালাইহিমুছ ছালাম - ২১:১৬-১৭
এই আয়াতগুলো সরাসরি মানুষের প্রত্যেক বৈধ আনন্দকে নিষিদ্ধ করার আয়াত নয়। বরং এগুলোর মূল বক্তব্য হলো, এই কায়েনাত উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি হয়নি। সৃষ্টি, জীবন, মৃত্যু ও হিসাব সবকিছুর পেছনে মহান হিকমত রয়েছে।
কিন্তু এখান থেকেই মুওমিনের জন্য এক বিশাল শিক্ষা আসে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা যখন কায়েনাতকে উদ্দেশ্যহীন খেল তামাশার জন্য সৃষ্টি করেননি, তখন মানুষ কীভাবে নিজের সমগ্র জীবনকে উদ্দেশ্যহীন খেল তামাশার বস্তু বানাতে পারে? যে জীবন মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্য হওয়ার কথা, সে জীবন কীভাবে ক্রিকেট ও ফুটবলের সময়সূচির অধীন হতে পারে?
দুনিয়ার জীবন খেল তামাশা, আখিরাতই উত্তমঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ) অর্থাৎ দুনিয়ার এই জীবন খেলাধুলা ও তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। আর যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আখিরাতের আবাসই উত্তম। অতএব তোমরা কি বুঝবে না?
√ ছুরাহ, আল আনয়াম - ৬:৩২
আসলেই কি আমরা বুঝব না? দুনিয়ার জীবনকে এখানে খেল তামাশা বলা হয়েছে, কারণ এটি অস্থায়ী। মানুষ যা কিছু নিয়ে গর্ব করে, তা একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এই অস্থায়ী জীবনের মধ্যেই আখিরাতের স্থায়ী ফল নির্ধারিত হচ্ছে।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের বাতিল থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য পেয়ারে হাবীব রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে পাঠিয়েছেন এবং ক্বিআমত পর্যন্ত পথনির্দেশ হিসেবে কুরআন শরীফ হাদিয়া করেছেন, যেন আমরা ইবলিশের ধোঁকায় পড়ে গেলেও ফিরে আসতে পারি।
আনাছ ইবন মালিক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু থেকে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (لَسْتُ مِنْ دَدٍ وَلَا الدَّدُ مِنِّي بِشَيْءٍ يَعْنِي لَيْسَ الْبَاطِلُ مِنِّي بِشَيْءٍ) অর্থাৎ আমি বাতিল ক্রীড়া কৌতুক ও উদ্দেশ্যহীন তামাশার অন্তর্ভুক্ত নই এবং সেসবও আমার আদর্শের অন্তর্ভুক্ত নয়। অর্থাৎ বাতিলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
√ আল আদাবুল মুফরাদ - ৭৮৫
এখানে الدَّدُ দ্বারা উদ্দেশ্যহীন ক্রীড়া কৌতুক, লাহও ও বাতিল ব্যস্ততা বোঝানো হয়েছে। এর শিক্ষা হলো, বাতিল বিনোদন নববী আদর্শের অংশ নয়। যে ব্যক্তি বাতিল খেলাধুলায় ডুবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আদর্শ, ছুন্নাহ মুবারক, নামাজ ও দ্বীনি দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে নিজের কাজের মাধ্যমে নববী আদর্শ থেকে দূরত্ব সৃষ্টি করে।
একজন মুছলিমের জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে যে, সে দুনিয়ার একটি বল, একটি দল অথবা একজন খেলোয়াড়ের কারণে নিজের নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আদর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
শয়তানের খেল দেখানো স্বপ্নের হাদিছঃ
রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (إِذَا لَعِبَ الشَّيْطَانُ بِأَحَدِكُمْ فِي مَنَامِهِ فَلَا يُحَدِّثْ بِهِ النَّاسَ) অর্থাৎ শয়তান যখন তোমাদের কারো সঙ্গে তার স্বপ্নের মধ্যে খেল তামাশা করে, তখন সে যেন তা মানুষের কাছে বর্ণনা না করে।
√ ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ - ২২৬৮
এই হাদিছ শরীফে সাধারণ খেলাধুলার ফিক্বহী হুকুম বর্ণনা করা হয়নি। এখানে এমন একটি অর্থহীন, ভয়ানক ও হাস্যকর স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে, যা শয়তান মানুষকে দেখায়। অতএব শুধু এই হাদিছ দিয়ে ক্রিকেট অথবা ফুটবল হারাম প্রমাণ করা হবে না।
তবে হাদিছটি আলোচনার মধ্যে রাখার একটি শিক্ষামূলক কারণ রয়েছে। শয়তান মানুষের মনকে অর্থহীন, ভয়ানক ও বিভ্রান্তিকর দৃশ্যের মাধ্যমে ব্যস্ত করে। দুনিয়ার জীবনেও সে মানুষের সামনে এমন অসংখ্য ব্যস্ততা সাজিয়ে দেয়, যার মধ্যে কোনো হাক্বিক্বী কল্যাণ নেই। মুওমিনকে তাই শুধু কাজের বাহ্যিক নাম নয়, তার উৎস, উদ্দেশ্য ও পরিণতি বুঝতে হবে।
দ্বীনকে খেল তামাশায় পরিণত করার পরিণতিঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَذَرِ الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَهُمْ لَعِبًا وَلَهْوًا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَذَكِّرْ بِهِ أَنْ تُبْسَلَ نَفْسٌ بِمَا كَسَبَتْ لَيْسَ لَهَا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ وَإِنْ تَعْدِلْ كُلَّ عَدْلٍ لَا يُؤْخَذْ مِنْهَا أُولَئِكَ الَّذِينَ أُبْسِلُوا بِمَا كَسَبُوا لَهُمْ شَرَابٌ مِنْ حَمِيمٍ وَعَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْفُرُونَ) অর্থাৎ যেসব লোক নিজেদের দ্বীনকে খেল তামাশা ও ক্রীড়া কৌতুকে পরিণত করেছে এবং দুনিয়ার জীবন যাদের প্রতারিত করেছে, আপনি তাদের ছেড়ে দিন। তবে এই কুরআন শরীফ দ্বারা তাদের স্মরণ করাতে থাকুন, যাতে কোনো ব্যক্তি নিজের অর্জিত কর্মকাণ্ডের কারণে ধ্বংসের হাতে সমর্পিত না হয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া তার কোনো অভিভাবক ও সুপারিশকারী থাকবে না। সে মুক্তিপণ হিসেবে সবকিছু দিলেও তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে না। এরাই নিজেদের অর্জিত কর্মের কারণে ধ্বংসের হাতে সমর্পিত হয়েছে। তাদের কুফরের কারণে তাদের জন্য রয়েছে ফুটন্ত পানীয় ও যন্ত্রণাদায়ক আযাব।
√ ছুরাহ, আল আনয়াম - ৬:৭০
এই আয়াত শরীফের সরাসরি বিষয় হচ্ছে, দ্বীনকে তামাশা বানানো এবং দুনিয়ার প্রতারণায় পড়ে আখিরাত ভুলে যাওয়া। অতএব প্রত্যেক খেলোয়াড়কে এই আয়াতের কাফিরদের সমান ঘোষণা করা যাবে না।
কিন্তু যে খেলাধুলা মানুষকে দ্বীন ভুলিয়ে দেয়, নামাজ ত্যাগ করায়, হারামকে স্বাভাবিক বানায় এবং এমন এক জীবনধারা সৃষ্টি করে, যেখানে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমের চেয়ে ম্যাচ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, সে খেলাধুলা মানুষের দ্বীনকে বাস্তবেই খেল তামাশার স্তরে নামিয়ে আনে।
এরপরও কি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দেওয়া জীবনকে নিছক ক্রীড়া কৌতুকে নষ্ট করে আখিরাতকে ফুটন্ত পানি ও মর্মন্তুদ শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে? আমাদের শাস্তি সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে না বলে কি আমরা মনে করি, আমরা ছাড় পেয়ে গেছি?
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (فَذَرْهُمْ يَخُوضُوا وَيَلْعَبُوا حَتَّىٰ يُلَاقُوا يَوْمَهُمُ الَّذِي يُوعَدُونَ) অর্থাৎ অতএব আপনি তাদের ছেড়ে দিন। তারা বাতিল আলোচনায় ডুবে থাকুক এবং খেল তামাশায় মত্ত থাকুক, যতক্ষণ না তারা সেই দিনের সাক্ষাৎ পায়, যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছে।
√ ছুরাহ, আয যুখরুফ - ৪৩:৮৩
অর্থাৎ যারা হিদায়াতের আহ্বান গ্রহণ করতে চায় না, তাদের সাময়িকভাবে নিজেদের বাতিল ব্যস্ততায় মগ্ন থাকতে দেওয়া হয়েছে। এটি অনুমোদন নয়, বরং ভয়াবহ ধমক। তারা সেই দিন চোখ খুলবে, যেদিন তাদের আচরণের পরিণাম সামনে এসে উপস্থিত হবে।
এই কথাগুলো কোনো মনগড়া বয়ান নয়, কোনো কথিত টেলিভিশন মুল্লার বানানো কথা নয়। কায়েনাতের মালিক মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَهُمْ لَهْوًا وَلَعِبًا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا فَالْيَوْمَ نَنْسَاهُمْ كَمَا نَسُوا لِقَاءَ يَوْمِهِمْ هَذَا وَمَا كَانُوا بِآيَاتِنَا يَجْحَدُونَ) অর্থাৎ যারা নিজেদের দ্বীনকে খেল তামাশা ও ক্রীড়া কৌতুকে পরিণত করেছিল এবং দুনিয়ার জীবন যাদের প্রতারিত করেছিল, আজ আমি তাদের সেভাবেই পরিত্যাগ করব, যেভাবে তারা এ দিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিল এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিল।
√ ছুরাহ, আল আ’য়রাফ - ৭:৫১
এখানে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ভুলে যাওয়ার অর্থ মানুষের মতো স্মৃতি হারিয়ে ফেলা নয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা সবকিছু জানেন। এখানে অর্থ হলো, তাদেরকে রহমত, সাহায্য ও মুক্তি থেকে বঞ্চিত করে শাস্তির মধ্যে পরিত্যাগ করা হবে।
তুমি আমাকে ভুলেছিলে, আজ আমি তোমাকে পরিত্যাগ করবঃ
আবূ হুরাইরা রদ্বিআল্লাহু য়ানহু থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিছ শরীফে এসেছে, ক্বিআমতের দিন মহান আল্লাহ তা’য়ালা কোনো এক বান্দাকে বলবেনঃ আমি কি তোমাকে সম্মানিত করিনি? নেতৃত্ব দিইনি? তোমাকে বিবাহের ব্যবস্থা করে দিইনি? তোমার জন্য ঘোড়া ও উট নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিইনি? তোমাকে কি প্রভাব ও স্বাচ্ছন্দ্য দিইনি? সে বলবে, জি, অবশ্যই। তখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলবেন, তুমি কি বিশ্বাস করতে যে, তোমাকে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে? সে বলবে, না। তখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলবেনঃ (فَالْيَوْمَ أَنْسَاكَ كَمَا نَسِيتَنِي) অর্থাৎ আজ আমি তোমাকে পরিত্যাগ করব, যেভাবে তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে।
√ ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ - ২৯৬৮
ক্বিআমতের মাঠে যদি কোনো ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রহমত থেকে পরিত্যাগ করেন, এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর হতে পারে না। মানুষ দুনিয়ায় সব খেলোয়াড়ের নাম মনে রেখেছে, সব ম্যাচের তারিখ মনে রেখেছে, সব দলের পয়েন্ট মনে রেখেছে, কিন্তু নিজের রব মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভুলে গেছে। নামাজের সময় ভুলে গেছে। মৃত্যুর কথা ভুলে গেছে। ক্ববরের কথা ভুলে গেছে। হিসাবের দিন ভুলে গেছে। তাহলে সে কীভাবে আশা করে যে, ক্বিআমতের দিন মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বিশেষ রহমত লাভ করবে?
ক্রিকেট ও ফুটবল উন্মাদনার বাস্তব ক্ষতিঃ
আজ মুছলিম বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা দেখা যায় ক্রিকেট ও ফুটবল নিয়ে।
প্রথমত, প্রত্যেক খেলোয়াড় শারীরিক ঝুঁকির মধ্যে থাকে। খেলার সময় দুর্ঘটনা, মাথায় আঘাত, হৃদরোগ এবং আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে। কেউ গুনাহের পরিবেশে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য তাওবাহর সুযোগ নাও থাকতে পারে।
দ্বিতীয়ত, খেলাধুলার কারণে নামাজ, জিকির, তাছবিহ তাহলীল, কুরআন শরীফ অধ্যয়ন, পরিবার, হালাল রিজিক এবং দ্বীনি দায়িত্ব অবহেলিত হয়।
তৃতীয়ত, অধিকাংশ পেশাদার ক্রিকেট ও ফুটবলে পুরুষের শরয়ী সতর যথাযথভাবে আবৃত থাকে না। দর্শকের সামনে শরীর প্রদর্শিত হয়।
চতুর্থত, স্টেডিয়াম ও সম্প্রচারে বেপর্দা নারী, অশ্লীল বিজ্ঞাপন, গান বাজনা এবং নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা থাকে।
পঞ্চমত, ম্যাচকে কেন্দ্র করে জুয়া, বেটিং, অর্থের বাজি এবং হারাম ব্যবসার বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে।
ষষ্ঠত, মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন একটি দৃশ্য দেখে, যাতে তার দ্বীন, দুনিয়া, জ্ঞান অথবা আখিরাতের কোনো হাক্বিক্বী উপকার নেই।
সপ্তমত, খেলাধুলার কারণে মুসলমানদের মধ্যে দলীয় বিদ্বেষ, গালিগালাজ, মারামারি, জাতীয়তাবাদী অহংকার এবং কখনো রক্তপাত পর্যন্ত হয়।
অষ্টমত, মুছলিম যুবসমাজ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আদর্শের পরিবর্তে কাফির, মুশরিক, ফাছিক্ব ও ধর্মহীন খেলোয়াড়দের অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তি বানায়।
তাদের মতো চুল কাটে, তাদের পোশাক পরে, তাদের নামের জার্সি পরে, তাদের ছবি ঘরে রাখে, তাদের ট্যাটু অনুকরণ করে, তাদের জন্য কাঁদে এবং তাদের বিজয়কে নিজের দ্বীনি বিজয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। নাউযুবিল্লাহ!
মুওমিনের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আদর্শঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا) অর্থাৎ নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ, সেই ব্যক্তির জন্য যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি ও আখিরাতের দিন প্রত্যাশা করে এবং অধিক পরিমাণে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির করে।
√ ছুরাহ, আল আহযাব - ৩৩:২১
আয়াত শরীফে উত্তম আদর্শের সঙ্গে তিনটি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।
১)
মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টির আশা।
২)
আখিরাতের দিনের আশা।
৩) মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে অধিক পরিমাণে জিকির করা।
এখন যারা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার অনুসরণ বাদ দিয়ে খেলোয়াড়দের অনুসরণে চুল কাটে, পোশাক পরে, ট্যাটু আঁকে, তাদের মুহব্বতে অন্ধ হয়, খেলার কারণে নামাজ ভুলে যায়, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির থেকে গ্বাফিল হয়ে যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকে এবং হাজার হাজার টাকা অপচয় করে স্টেডিয়ামে গিয়ে বেপর্দা পরিবেশে খেলা দেখে, তারা কি এই আয়াতের দাবি পূরণ করছে?
যেসব খেলোয়াড়ের মুহব্বতে তারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির থেকে গ্বাফিল হচ্ছে এবং রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার অনুসরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, সেই খেলোয়াড়রা কি ক্বিআমতের দিন তাদের কোনো উপকার করতে পারবে? কস্মিনকালেও না।
যারা দ্বীনকে তামাশা বানায়, তাদের অন্তরঙ্গ অভিভাবক বানানো নিষিদ্ধঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبًا مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ أَوْلِيَاءَ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ اتَّخَذُوهَا هُزُوًا وَلَعِبًا ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَا يَعْقِلُونَ) অর্থাৎ হে ইমানদারগণ! তোমাদের পূর্বে যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা তোমাদের দ্বীনকে হাসি তামাশা ও খেলাধুলার বস্তু বানিয়েছে এবং অন্যান্য কাফিরদের তোমরা অন্তরঙ্গ অভিভাবক ও বন্ধু বানিও না। তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভয় করো, যদি তোমরা প্রকৃত মুওমিন হয়ে থাকো। আর যখন তোমরা নামাজের জন্য আহ্বান করো, তারা সেটিকেও হাসি তামাশা ও খেলাধুলার বস্তু বানায়। এর কারণ হলো, তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা বুঝে না।
√ ছুরাহ, আল মায়িদাহ - ৫:৫৭-৫৮
এখানে সাধারণ মানবিক সদাচরণ, ব্যবসা অথবা প্রতিবেশীর হক্বের কথা বলা হয়নি। নিষেধ করা হয়েছে এমন ওয়ালায়াত, অন্তরঙ্গ আনুগত্য ও আদর্শিক বন্ধুত্ব, যার ফলে মুওমিন কাফিরদের দ্বীনবিরোধী জীবনধারা গ্রহণ করে।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, যারা সম্মানিত দ্বীন ইছলামকে হাসি তামাশার বস্তু বানায়, তাদের আদর্শিক অভিভাবক বানানো যাবে না।
অথচ আজ মুছলিমরা এমন খেলোয়াড়দের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত, যারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি ইমান রাখে না, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে মানে না, প্রকাশ্যে হারাম জীবনযাপন করে এবং মুছলিম যুবকদের কাছে নিজেদের জীবনধারাকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে।
তাই ইহুদী, নাছারা, কাফির মুশরিক ও ধর্মহীন বিনোদনশিল্পের ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। দুনিয়ার জীবন একটি পরীক্ষার স্থান। মানুষের প্রকৃত ও স্থায়ী জীবন হলো আখিরাতের জীবন।
আখিরাতই প্রকৃত জীবনঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَمَا هَٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ) অর্থাৎ দুনিয়ার এই জীবন খেল তামাশা ও ক্রীড়া কৌতুক ছাড়া কিছুই নয়। আর নিশ্চয়ই আখিরাতের আবাসই প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত।
√ ছুরাহ, আল য়ানকাবূত - ২৯:৬৪
যে পার্থিব জীবন মানুষকে আখিরাত সম্পর্কে অন্ধ করে দেয় এবং আখিরাতের সম্বল সঞ্চয় থেকে উদাসীন রাখে, তার মূল্য শিশুদের সাময়িক খেলার চেয়ে বেশি নয়।
কাফির ও দুনিয়াপূজারীরা পার্থিব জীবনের সুখ অর্জনের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে। কিন্তু মৃত্যু এলে তারা শূন্য হাতে আখিরাতের পথে যাত্রা করে। শিশুরা যেমন সারাদিন ধুলাবালির ঘর বানিয়ে খেলা করে, এরপর সন্ধ্যায় খালি হাতে বাড়ি ফিরে যায়, তেমনি দুনিয়ার মানুষও দুনিয়ার খেলায় ক্লান্ত হয়, কিন্তু আখিরাতের জন্য কিছুই অর্জন করে না।
অতএব এমন নেক য়া’মল করা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে আখিরাতের জীবন সুন্দর হবে। যদি মানুষ আখিরাতের বাস্তবতা জানত, তাহলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভুলে ফালতু খেলাধুলায় জীবন নষ্ট করত না।
এই রোগের ঔষধ হলো কুরআন শরীফ, ছুন্নাহ মুবারক ও শরীয়তের জ্ঞান অর্জন করা। কিন্তু যে ব্যক্তি দিনরাত খেলাধুলা, ক্রীড়া কৌতুক, খেলোয়াড়ের খবর এবং ম্যাচের আলোচনায় মত্ত, সে কখন ইলম অর্জন করবে?
ইমান ও তাক্বওয়ার বিনিময় রয়েছে, বাতিল খেলার কোনো মূল্য নেইঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (إِنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا يُؤْتِكُمْ أُجُورَكُمْ وَلَا يَسْأَلْكُمْ أَمْوَالَكُمْ) অর্থাৎ দুনিয়ার জীবন তো খেলাধুলা ও তামাশা মাত্র। আর যদি তোমরা ইমান আনো এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করো, তবে তিনি তোমাদের প্রতিদান প্রদান করবেন এবং তোমাদের সমস্ত ধনসম্পদ তোমাদের কাছে চাইবেন না।
√ ছুরাহ, মুহাম্মদ - ৪৭:৩৬
আয়াতের বক্তব্য হলো, দুনিয়ার জীবন অস্থায়ী। স্থায়ী মূল্য ইমান ও তাক্বওয়ার। মানুষের সম্পদ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রয়োজন নেই। বরং মানুষ নিজের কল্যাণের জন্য ব্যয় ও য়া’মল করে।
খেলাধুলা ও হাসি তামাশার ধোঁকার কোনো স্থায়ী ভিত্তি নেই। আজ একটি দল জিতেছে, কাল হেরেছে। আজ একজন খেলোয়াড় নায়ক, কাল মানুষ তাকে ভুলে গেছে। কিন্তু এই খেলায় ব্যয় হওয়া মানুষের জীবন আর কোনো দিন ফিরে আসবে না।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ) অর্থাৎ তোমরা জেনে রাখো, দুনিয়ার জীবন খেলাধুলা, হাসি তামাশা, বাহ্যিক সৌন্দর্য, পরস্পরের মধ্যে গর্ব ও অহংকারের প্রতিযোগিতা এবং ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা মাত্র।
√ ছুরাহ, আল হাদীদ - ৫৭:২০
এখানে দুনিয়ার প্রতিটি হালাল কাজকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং দুনিয়াকে জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বানানোর পরিণতি দেখানো হয়েছে। যারা দুনিয়ার ক্রীড়া কৌতুক, সৌন্দর্য, অহংকার ও প্রতিযোগিতাকেই জীবনের আসল লক্ষ্য বানায়, তাদের কাছে আখিরাতের কোনো মূল্য থাকে না।
লাহও ও ব্যবসার কারণে রছুলে পাক উনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে যাওয়াঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً أَوْ لَهْوًا انْفَضُّوا إِلَيْهَا وَتَرَكُوكَ قَائِمًا قُلْ مَا عِنْدَ اللَّهِ خَيْرٌ مِنَ اللَّهْوِ وَمِنَ التِّجَارَةِ وَاللَّهُ خَيْرُ الرَّازِقِينَ) অর্থাৎ যখন তারা কোনো ব্যবসার পণ্য অথবা ক্রীড়া কৌতুকের আয়োজন দেখতে পায়, তখন তারা সেদিকে ছুটে যায় এবং আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে যায়। আপনি বলুন, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কাছে যা রয়েছে, তা ক্রীড়া কৌতুক ও ব্যবসা উভয়টি থেকে উত্তম। আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনিই সর্বোত্তম রিজিকদাতা।
√ ছুরাহ, আল যুমু’য়াহ - ৬২:১১
এই আয়াতের ঘটনায় রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম জুমু’য়ার খুত্ববাহ প্রদান করছিলেন। তখন একটি বাণিজ্যিক কাফেলা আগমন করলে লোকেরা কাফেলার দিকে চলে যায় এবং উনার কাছে মাত্র বারোজন ব্যক্তি অবশিষ্ট থাকেন। আয়াত শরীফ নাযিল করে মহান আল্লাহ তা’য়ালা জানিয়ে দিলেন, উনার কাছে যা রয়েছে, তা ব্যবসা ও লাহও উভয়টি থেকে উত্তম।
এখানে একটি বিরাট শিক্ষা রয়েছে। ব্যবসা নিজে হালাল। কিন্তু হালাল ব্যবসাও যখন জুমু’য়ার খুত্ববাহ ও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সঙ্গ ত্যাগ করার কারণ হলো, তখন তা নিন্দিত হয়েছে। তাহলে যে ক্রিকেট ও ফুটবল নিজেই বাতিল লাহও, আর তার কারণে নামাজ, জুমু’য়াহ, কুরআন শরীফ, পরিবার ও আখিরাতের প্রস্তুতি নষ্ট হচ্ছে, তার হুকুম কত ভয়াবহ হবে?
জাহিলিয়্যাতের খেলাধূলার পরিবর্তে ইছলামী ঈদঃ
আনাছ রদ্বিআল্লাহু য়ানহু থেকে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মদীনা শরীফে আগমন করার পর দেখতে পেলেন, মদীনাবাসীর দুটি দিন ছিল, যেদিন তারা খেলাধুলা ও আমোদপ্রমোদ করত। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এই দুটি দিন কী? তারা বলল, জাহিলিয়্যাতের যুগে আমরা এই দুটি দিনে খেলাধুলা করতাম।
তখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেনঃ (إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ) অর্থাৎ নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা এই দুটি দিনের পরিবর্তে তোমাদের জন্য তার চেয়েও উত্তম দুটি দিন হাদিয়া করেছেন, ঈদুল আদ্বহার দিন এবং ঈদুল ফিত্বরের দিন।
√ ছুনান আবূ দাঊদ শরীফ -
১১৩৪
√ ছুনান আন নাছাঈ শরীফ - ১৫৫৬
এই হাদিছ শরীফের সরাসরি বিষয় হলো জাহিলিয়্যাতের দুটি বার্ষিক উৎসবের পরিবর্তে মুছলিমদের জন্য দুটি ইছলামী ঈদ প্রদান করা হয়। এর শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট। মুছলিমদের পরিচয় জাহিলিয়্যাতের আমোদপ্রমোদ দ্বারা নির্ধারিত হবে না। মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের নিজস্ব দ্বীন, নিজস্ব ঈদ, নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব আনন্দ এবং নিজস্ব জীবনব্যবস্থা দিয়েছেন।
আজ মুছলিমরা যদি নিজেদের ইছলামী পরিচয় ভুলে বিশ্বকাপ, ক্রিকেট লীগ ও ফুটবল ক্লাবের উৎসবকে নিজেদের সবচেয়ে বড় আনন্দ বানায়, তাহলে তারা আবার জাহিলি সংস্কৃতির দিকে ফিরে যাচ্ছে।
শেষ সতর্কবাণীঃ
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (فَذَرْهُمْ يَخُوضُوا وَيَلْعَبُوا حَتَّىٰ يُلَاقُوا يَوْمَهُمُ الَّذِي يُوعَدُونَ يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا كَأَنَّهُمْ إِلَىٰ نُصُبٍ يُوفِضُونَ خَاشِعَةً أَبْصَارُهُمْ تَرْهَقُهُمْ ذِلَّةٌ ذَٰلِكَ الْيَوْمُ الَّذِي كَانُوا يُوعَدُونَ) অর্থাৎ অতএব আপনি তাদের ছেড়ে দিন। তারা বাতিল আলোচনায় ডুবে থাকুক এবং খেল তামাশায় মত্ত থাকুক, যতক্ষণ না তারা সেই দিনের সাক্ষাৎ পায়, যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছে। যেদিন তারা ক্ববরসমূহ থেকে দ্রুত বের হয়ে আসবে, যেন তারা কোনো নির্ধারিত লক্ষ্যস্থলের দিকে দ্রুত ছুটে যাচ্ছে। তাদের দৃষ্টি থাকবে অবনত, অপমান ও লাঞ্ছনা তাদের আচ্ছন্ন করে রাখবে। এটাই সেই দিন, যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছিল।
√ ছুরাহ, আল মা’য়ারিজ - ৭০:৪২-৪৪
এখানে نُصُبٍ দ্বারা শিকারের লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং এমন কোনো স্থাপিত লক্ষ্য অথবা নিদর্শন বোঝানো হয়েছে, যার দিকে মানুষ দ্রুত ছুটে যায়। ক্বিআমতের দিন মানুষ ক্ববর থেকে সেভাবেই দ্রুত বের হয়ে আসবে।
আয়াত শরীফের হাক্বিক্বত হলো, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যখন মানুষকে বিশুদ্ধ দ্বীনের পথে আহ্বান করছিলেন, তখন বাতিল আলোচনা ও খেল তামাশায় মত্ত লোকেরা উনার আহ্বানকে গুরুত্ব দিচ্ছিল না। মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে সান্ত্বনা দিয়ে জানালেন, আপনি তাদের আচরণে মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না। আপনি আপনার দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে থাকুন। তারা যদি নিজেদের বাতিল ব্যস্ততায় পড়ে থাকতে চায়, তবে একদিন তাদের প্রতিশ্রুত দিনের সাক্ষাৎ পেতেই হবে।
আর উম্মত হিসেবে আমাদেরও সেই নবীওয়ালা কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। ছ্ববর, হিকমত ও দৃঢ়তার সঙ্গে ক্রিকেট, ফুটবল, খেল তামাশা ও ক্রীড়া উন্মাদনায় মত্ত পথভ্রষ্ট যুবসমাজকে ফিরে আসার আহ্বান জানাতে হবে।
কেউ সাড়া দিলে তার নিজের কল্যাণ হবে। কেউ সাড়া না দিলে তার ক্ষতি সে নিজেই বহন করবে। আমাদের দায়িত্ব হাক্ব কথা পৌঁছে দেওয়া।
উপসংহারঃ মুওমিনের সমগ্র জীবন মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্য। মুওমিনের কোনো সময়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমের বাইরে নয়। হালাল রিজিক অর্জন ঈবাদাত। পরিবারের হক্ব আদায় ঈবাদাত। শরীর রক্ষা ঈবাদাত। ঘুম, খাবার ও বিশ্রামও সঠিক নিয়ত ও শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে য়িবাদতে পরিণত হয়।
কিন্তু উদ্দেশ্যহীন বাতিল খেলাধুলা, যা মানুষকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার স্মরণ থেকে গ্বাফিল করে, সময় ও মাল নষ্ট করে, নামাজ নষ্ট করে, বেপর্দা ও সতর দেখায়, জুয়া ও বাজির বাজার সৃষ্টি করে, কাফির ফাছিক্বদের অন্ধ অনুকরণ শেখায় এবং আখিরাতের প্রস্তুতি ধ্বংস করে, তা ঈবাদাত নয়। তা হাক্ব নয়। তা বাতিল এবং হারাম।
বিশেষত বর্তমান ক্রিকেট ও ফুটবলকেন্দ্রিক উন্মাদনা শুধু একটি বলের খেলা নয়। এটি সময়, জ্ঞান, মাল, পরিচয়, মুহব্বত ও আনুগত্য নিয়ন্ত্রণকারী একটি পূর্ণাঙ্গ বাতিল সংস্কৃতি।
অতএব এখনো সময় আছে। খেলোয়াড়ের নাম ভুলে কুরআন শরীফ শিখুন। ম্যাচের সময়সূচি ভুলে নামাজের সময়সূচি স্মরণ করুন। ক্লাবের পতাকা নামিয়ে কলিমার পতাকা, নববী পতাকা, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নাহ মুবারক এর বাণী প্রচার করুন। স্টেডিয়ামের টিকিটের অর্থ পরিবার, গরিব মিছকীন ও দ্বীনের কল্যাণে ব্যয় করুন। খেলার পরিসংখ্যানের পরিবর্তে নিজের জীবনের য়া’মলের হিসাব নিন। কারণ খেলা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ম্যাচ আসতে পারে, কিন্তু জীবন শেষ হওয়ার পর আর কোনো দ্বিতীয় সুযোগ আসবে না।
মহান
আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে সকল প্রকার বাতিল, লাগ্বও, লাহও, খেল তামাশা ও হারাম
ক্রীড়া উন্মাদনা থেকে হেফাজত করুন। আমাদের সময়, জ্ঞান,
মাল, চিন্তা, মুহব্বত ও সমগ্র জীবন উনার সন্তুষ্টি অনুযায়ী ব্যয় করার তাওফীক্ব
হাদিয়া করুন। আমীন।

0 ফেইসবুক: