আপনি সারা জীবন ধরে জিকির করছেন; আঙুলে গুনেছেন, নামাজের পর তাছবিহ পাঠ করেছেন। হাজারো বার ছুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলেছেন। কিন্তু আপনার ভেতরে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? কারণ আধ্যাত্মিক দীক্ষা আমাদের বলেন যে, প্রকৃত জিকির জবানে নয় বরং তা হয় ক্বলবে (হৃদয়ে)। আর জিকির যখন ক্বলবে পৌঁছে যায়, তখন সবকিছু বদলে যায়। আপনার সিনা নূরে ভরে যায়, দুশ্চিন্তা দূর হয় এবং আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর কোনো শব্দ ছাড়াই মিলে যায়। আপনি তখন আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে খুঁজতে থাকেন না, কারণ আপনি অনুভব করেন যে তিনি কখনোই আপনার থেকে অনুপস্থিত ছিলেন না, বরং আপনি বুঝেন আপনার মধ্যেই তিনি রয়েছেন বিদ্যমান।
আজ আমি ক্বলবি জিকিরের সেই গোপন রহস্য উন্মোচন করব যা ছুফিয়ায়ে কেরামগণ ইশারা-ইঙ্গিতে বললেও খুব কমই ব্যাখ্যা করেন। কারণ একবার আপনার ক্বলব যদি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকিরে জারি হয়ে যায়, তবে আপনার পুরো অস্তিত্বই একটি ঈবাদতে পরিণত হয়। কেননা হাদিছ শরীফে স্পষ্ট এসেছেনঃ (وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ. أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ) নু’মান ইবনু বশীর রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, “তোমরা জেনে রাখ, নিশ্চয়ই শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা রয়েছে, যখন তা ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। (তোমরা) জেনে রাখ, সেই গোশতের টুকরাটি হল ক্বলব। (বুখারী শরীফ ৫২, মুছলিম শরীফ ১৫৯৯, মুছনাদে আহমাদ ১৮৩৯৬, ১৮৪০২)।
এবার আমরা জিকিরের ক্যাটাগরি সম্পর্কে জানবো, মূলত জিকিরের ৫ টি ক্যাটাগরি রয়েছে ত্বরীকাহ আল-রাজ এর মতেঃ
১) আজ-জিকরুল-মুহাঋক (الذِّكْرُ الْمُحَرِّكُ): এটা হলো জিকিরের সর্বনিম্ন স্থর, যদি কোন বান্দা এই স্তরেও না থাকে, তাহলে সে বরবাদ হয়ে গেছে। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’য়ালাকে যদিও সব সময় মাইন্ড স্মরণে রাখেনা কিন্তু যখনই কোন কিছু আল্লাহ তা’য়ালাকে স্বরণ করিয়ে দেয়, বা দ্বীন বিরোধী কিংবা দ্বীনি কোন হুকুম আহকাম সম্মুখে আসে। তখন সাথে সাথে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার স্মরণ এক্টিভেট হয়ে যায়, উনার ভয়ে হারাম কাজ থেকে সে বিরত থাকে, ফরজ ওয়াজিব হুকুম হলে আদায় করে।
২) আজ-জিকরুল মা’য়নাউ-ই (الذِّكْرُ الْمَعْنَوِي): এই মাক্বামে মাইন্ড মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ধারণ করে রাখে। এই লেবেলের জিকিরে বান্দা নাম তো উচ্চারণ করেনা কিন্তু মাইণ্ডের একটা অংশ সব সময় রব তায়ালা উনার বিষয়ে জাগ্রত থাকে।
৩) আজ-জিকরুল লিছানী (الذِّكْرُ اللِّسَانِي): এটি হলো মূল জিকির শুরুর স্তর। আপনার জবান বলছে ছুবহানাল্লাহ কিংবা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, কিন্তু মন পড়ে আছে দুনিয়াবি কাজের চিন্তায়। আপনার ঠোঁট নড়ছে, আঙ্গুল চলছে তাছবিহ এর দানায়, কিন্তু ক্বলব অনুপস্থিত ডিএক্টিভেট। তবে এই জিকিরেরও মূল্য আছে, কেননা এটি বীজ বপন করে। কিন্তু পানি ছাড়া যেমন বীজ ফলে না, তেমনি একাগ্রতা ছাড়া এই জিকির পূর্ণতা পায় না।
৪) আজ-জিকরুল য়া’ক্বলি (الذِّكْرُ الْعَقْلِيُّ): এখানে আপনি সচেতন। আপনি যা বলছেন তা বুঝতে পারছেন। আপনি যখন “আল্লাহ” “ইল্লাল্লাহ” “ছুবহানাল্লাহ” “আলহামদুলিল্লাহ” “আল্লাহু আকবার” কিংবা “আস্তাগ্বফিরুল্লাহ” বলেন, তখন আপনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার তাওহীদ, ইলাহীয়াত, পাক-পবিত্রতা, উনার প্রশংসা, বড়ত্ব, ক্ষমার বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন, বুঝেন, ফিল করেন। এটি অনেক উত্তম, কিন্তু এটিও শেষ গন্তব্য নয়। কারণ মস্তিষ্ক কেবল বিশ্লেষণ করে, এটি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার উপস্থিতি অনুভব করতে পারে না।
৫) আজ-জিকরুল ক্বলবি (الذِّكْرُ الْقَلْبِيُّ) এখানেই প্রকৃত পরিবর্তন ঘটে। ক্বলব কোনো বিশ্লেষণ করে না, বরং সে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কুদরতের সাক্ষী হয়; সে হাক্বিকতের স্বাদ আস্বাদন করে। যখন জিকির ক্বলবে পৌঁছে যায়, তখন জিকিরকারী হারিয়ে যায় এবং কেবল যাঁর জিকির করা হচ্ছে সেই “মাজকুর” (আল্লাহ) বিদ্যমান থাকেন। তখন আপনি “আল্লাহ” বলেন না, বরং মহান আল্লাহ তা’য়ালাই স্বয়ং আপনার মাধ্যমে নিজের জিকির করেন। আর এটাই সবচেয়ে য়া’লা দরজার জিকির। আর উক্ত জিকিরের সবচেয়ে বড় বেনিফিট হলো এই মাক্বামে বান্দা যখন তার রব তায়ালা উনার নাম ক্বলব দিয়ে উচ্চারন করে, কেবল তখনই সেখানে নূর উৎপন্ন হয়, যা বাকি ৪ মাক্বামে অসম্ভব।
ক্বলব বা হৃদয়ের পরিচয়?
আমরা যে লতিফা-এ-ক্বলবের কথা বলি, তা কিন্তু রক্ত সঞ্চালনকারী গোশতপিণ্ড নয়। বরং আমাদের এই অযুদের মধ্যে রয়েছে দুই ধরণের ক্বলবঃ
- ক্বলবে ছানোবারীঃ বুকের বাম পাশের গোশতপিণ্ড (জৈবিক)।
- ক্বলবে হাক্বিকীঃ রূহানি বা আধ্যাত্মিক হৃদয়/মন, যা নূরের তৈরি এবং যা বান্দার রূহকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হাক্বিকতের সাথে যুক্ত করে। এখানেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নূর নাযিল হয়।
আবূ হুরায়রাহ রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত তিনি বলেনঃ (إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ فَإِذَا هُوَ نَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ وَتَابَ سُقِلَ قَلْبُهُ وَإِنْ عَادَ زِيدَ فِيهَا حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ وَهُوَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَ اللَّهُ: كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ) রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে, তখন তার ক্বলবে একটি কালো দাগ বসে যায়। অতঃপর যদি সে (গুনাহ থেকে) সরে আসে, ইস্তিগফার করে এবং তওবা করে, তবে তার ক্বলব পালিশ হয়ে যায়। আর যদি সে আবার (গুনাহে) ফিরে যায়, তবে সেই দাগ বাড়তে থাকে এমনকি তা তার ক্বলবকে (সম্পূর্ণ) ঢেকে ফেলে। আর এটাই সেই ‘র’না’ (মরিচা/আবরণ), যার কথা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উল্লেখ করেছেন, “কখনোই নয়; বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরের উপর মরিচা জমিয়ে দিয়েছে।” (তিরমিজি শরীফ ৩৩৩৪ ও ছুরাহ আল-মুত্বফফিফীন ৮৩/১৪)
ত্বরীকাহ আল-রাজ এর ক্বলবি জিকিরের পদ্ধতি (মুরিদ-দের জন্যে)
১. নিয়ত শুদ্ধ করাঃ একমাত্র উদ্দেশ্য হবে “আমি মহান আল্লাহ
তা’য়ালা উনার কুদরতের সাক্ষী হতে চাই”।
২. খামোশ থাকাঃ নিরিবিলি জায়গায় চোখ বন্ধ করে শান্ত হয়ে
বসা।
৩. ক্বলবের স্থান নির্ধারণঃ মুরিদ তার ডান হাতের শাহাদত
আঙ্গুল বুকের বাম পাশের স্থনের ২ আঙ্গুল নিচে লতিফা-এ-ক্বলবের ওপর রাখবে এবং সমস্ত
মনোযোগ সেখানে নিবদ্ধ করবে।
৪. ইছমে জাতের জিকিরঃ মনে মনে “আল্লাহ” শব্দটি উচ্চারণ করবে।
এটি জবান/জিহ্বা কিংবা গলা দিয়ে নয়, বরং সরাসরি ক্বলবের ভেতর থেকে আসছে বলে অনুভব
করতে হবে।
৫. পাছ আন ফাছের জিকির অর্থাৎ নিঃশ্বাসের সাথে জিকিরঃ নিঃশ্বাস
ভেতরে নেওয়ার সময় “ইয়া আল্লাহ” বা “শুধু আল্লাহ” এবং ছাড়ার সময় “হু” বলবে। মনে
রাখতে হবে নিঃশ্বাস হলো দেহ ও রূহের মধ্যবর্তী সেতু।
৬. খামোশিতে নিমগ্ন হওয়াঃ ১৫-২০ মিনিট জিকিরের পর শান্ত হয়ে বসে থাকবে। এই নীরবতাতেই জিকিরের আসল ফল পাওয়া যায়।
নূর প্রবেশের আলামতঃ
যখন নূর প্রবেশ করে, তখন শরীরে এক প্রকার উষ্ণতা অনুভূত হয়, প্রত্যেক লোমকূপ দিয়ে শিতল এক পরশ ঢুকে যা কুরবতে খাছ-এর চেয়েও কোটিগুন বেশী প্রাশান্তির। এমনকি কোনো কারণ ছাড়াই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে এবং শরীরে অদ্ভুত এক হালকা ভাব আসে। দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায় এবং অন্যের প্রতি দয়া ও মায়া সৃষ্টি হয়। পবিত্র ছুরার আয়াত শরীফগুলোর নতুন নতুন নিগূঢ় অর্থ তত্ব প্রকাশ পেতে থাকে। এর চূড়ান্ত নিদর্শন হলো, তুমি আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে খুঁজতে থাকো না, বরং প্রতি মুহূর্তে উনার উপস্থিতির অনুভব তোমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। যেমন মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র আল ক্বুরআন এইভাবেই বলেছেনঃ (اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ اِذَا ذُكِرَ اللّٰهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَاِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ اٰيٰتُهٗ زَادَتْهُمْ اِيْمَانًا وَّعَلٰي رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ) নিশ্চয়ই মুমিন তো তারাই, যখন (তাদের সম্মুখে) মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির করা হয়, তখন তাদের অন্তর কেঁপে ওঠে; (অতঃপর) যখন তাদের সামনে উনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি করে; আর তারা তাদের রব তা’য়লা উনার উপরই ভরসা করে। (ছুরাহ আল-আনফাল ৮/২)
একজন জাকিরের জিকির দ্বারা নূর লাভের পথে বাধা কী?
ক্বুরআন হাদিছের মধ্যে ছাকনি দিলে যা পাওয়া যায় তা হলোঃ
১. রিয়াঃ লোক দেখানোর ইচ্ছা।
২. গুনাহঃ নিয়মিত তাওবা-ইস্তিগ্বফার না করে গুনাহ দিয়ে
ক্বলবে মরিচা তৈরি করা।
৩. গ্বফলতঃ জিকিরের সময় অন্য চিন্তায় মশগুল থাকা।
৪. দুনিয়ার প্রতি আসক্তিঃ পরিবার, অর্থ, ক্ষমতা বা মানুষের প্রতি অতিরিক্ত টান ক্বলবকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দিকে ফিরতে দেয় না।
পরিশেষেঃ ক্বলব হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ঘর। কিন্তু মানুষ সেই ঘর দুনিয়াবি চিন্তা আর লালসার আসবাবপত্র দিয়ে ভরে রেখেছে। জিকির মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে বাইরে থেকে ক্বলবে আনে না, বরং ক্বলব থেকে দুনিয়ার আবর্জনা সরিয়ে দেয় যাতে বান্দা দেখতে পায় যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তো আগে থেকেই সেখানে বিদ্যমান ছিলেন, যা আমি আমার নাপাকির মরিচা দিয়ে ঢেকে রেখেছিলাম এতদিন। জিকিরের রাজ, রহস্য, ক্বুরআন হাদিছের আলোকে জানতে চাইলে পড়ুনঃ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দৃষ্টিতে জিকিরের চেয়ে বড় ঈবাদাত আছে?

0 ফেইসবুক: