Thursday, October 1, 2026

হিদায়েতের হাক্বিকত, হুব্বে রছুল এবং ইমানে হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম

আজ “হিদায়েত” শব্দটি এমনভাবে বুঝতে হবে, যাতে এই শব্দ শুধু মুখের উচ্চারণ, ওয়াজের বাক্য, অথবা সাধারণ অনুবাদের একটি শব্দ হয়ে না থাকে। হিদায়েত হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রবূবিয়্যাতের এমন প্রকাশ, যার ছায়া শুধু মানুষের উপর নয়; পুরো কায়িনাতের উপর বিস্তৃত।

আমরা সাধারণত হিদায়েত বললেই বুঝি, মানুষকে দীন শেখানো, ঈমান শেখানো, নামায শেখানো, হালাল-হারাম শেখানো, জান্নাতের পথ ও জাহান্নামের ভয় দেখানো। এগুলো অবশ্যই হিদায়েতের অংশ। কিন্তু ক্বুরআন শরীফের ভাষায় হিদায়েতের পরিসর আরও বড়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা শুধু মানুষকে হিদায়েত দেননি; তিনি প্রত্যেক সৃষ্টিকে তার নিজ নিজ কাজ, স্বভাব, সীমা, গতি, দায়িত্ব ও গন্তব্যের দিকে হিদায়েত দিয়েছেন।

সূর্য তার পথ জানে। চাঁদ তার মানযিল জানে। আগুন তার স্বভাব জানে। পানি তার প্রবাহ জানে। বীজ মাটির অন্ধকার ফুঁড়ে আলো-হাওয়ার দিকে উঠতে জানে। মাছের বাচ্চা জন্মের পর সাঁতার জানে। পাখি বাসা বানাতে জানে। মৌমাছি চাক বানাতে জানে। শিশু জন্মের পর মায়ের দুধের দিকে মুখ নিতে জানে। দেহের রক্ত কোন পথে চলবে, চোখ কীভাবে আলো গ্রহণ করবে, কান কীভাবে শব্দ গ্রহণ করবে, ক্বলব কীভাবে ধুকধুক করবে এসব কোনো মানুষ বসে তাদের শেখায়নি। এটি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার তাক্বভীনি হিদায়েত।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى ۝ الَّذِي خَلَقَ فَسَوَّىٰ ۝ وَالَّذِي قَدَّرَ فَهَدَىٰ) অর্থাৎ, আপনি আপনার সর্বোচ্চ রবের নামের তাছবীহ পাঠ করুন। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তারপর সুবিন্যস্ত করেছেন। আর যিনি পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন, তারপর হিদায়েত দিয়েছেন। (ছুরাহ আল আ’লা ৮৭:১-৩)

এই আয়াত শরীফে প্রথমে সৃষ্টি, তারপর সুবিন্যাস, তারপর তাক্বদীর, তারপর হিদায়েত। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা’য়ালা শুধু বানান না; বানিয়ে নিয়ম দেন। শুধু অস্তিত্ব দেন না; অস্তিত্বের কাজও দেন। শুধু দেহ দেন না; দেহকে চালানোর ব্যবস্থা দেন। শুধু কায়িনাত সৃষ্টি করেন না; কায়িনাতকে তার নিজস্ব পথে চালান। এটাই রবূবিয়্যাত।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম উনার বক্তব্য নকল করে বলেনঃ (قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَىٰ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ، ثُمَّ هَدَىٰ) অর্থাৎ, হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম বললেন, আমাদের রব তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার সৃষ্টি-রূপ দিয়েছেন, তারপর তাকে হিদায়েত দিয়েছেন। (ছুরাহ ত্বহা ২০:৫০)

এখানে “كُلَّ شَيْءٍ” অর্থাৎ “প্রত্যেক বস্তু” শব্দটি গভীরভাবে বুঝো। শুধু মানুষ নয়। শুধু মুমিন নয়। শুধু নবী-রছুল নয়। বরং প্রত্যেক বস্তু। পুরো কায়িনাত। আসমান, জমিন, সূর্য, চাঁদ, আগুন, পানি, বাতাস, পশু, পাখি, বীজ, গাছ, দেহ, রক্ত, কোষ, অনুভূতি সবকিছু মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমে তার নিজ নিজ পথে চলছে।

কিন্তু মানুষের পরীক্ষা আলাদা। কায়িনাতের অনেক সৃষ্টি তাক্বভীনি হিদায়েতের অধীনে বাধ্য। সূর্য নিজের পথ অস্বীকার করে না। চাঁদ নিজের মানযিল ভুলে না। মাছ নিজের সাঁতার ভুলে না। বীজ নিজের অঙ্কুরোদ্গম ভুলে না। কিন্তু মানুষকে ইখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। মানুষ চাইলে সিজদায় পড়ে, চাইলে তাকাব্বুর করে। চাইলে ক্বুরআন শরীফের সামনে মাথা নত করে, চাইলে নিজের নফসকে ক্বুরআন শরীফের উপর বসিয়ে দেয়। চাইলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার দরবারে আদব শেখে, চাইলে বেয়াদবির অন্ধকারে পড়ে।

এই জন্য মানুষের জন্য শুধু ফিতরী হিদায়েত যথেষ্ট নয়। মানুষের জন্য ওহী দরকার, নবী দরকার, কিতাব দরকার, শরীয়ত দরকার, ছুন্নত দরকার, তাজকিয়া দরকার, সোহবতে সালিহ দরকার, মুর্শিদের নছিহত দরকার। কারণ মানুষের আকল আছে, কিন্তু আকল একা হিদায়েতের মালিক নয়। মানুষের চোখ আছে, কিন্তু চোখ ওসীলা। মানুষের কান আছে, কিন্তু কান ওসীলা। মানুষের ক্বলব আছে, কিন্তু ক্বলব যদি নফসের ধোঁয়ায় ঢেকে যায়, তবে হিদায়েতের নূর গ্রহণ করে না।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَاللهُ أَخْرَجَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ، لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا، وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ، لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের পেট থেকে এমন অবস্থায় বের করেছেন যে, তোমরা কিছুই জানতে না। আর তিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ এবং ক্বলবসমূহ সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা শুকর করো। (ছুরাহ আন নাহল ১৬:৭৮)

এখানে একটি তাছাউফী নুকতা আছে। আমরা বলি চোখ দেখে। কিন্তু চোখ নিজে দেখে না; চোখ ওসীলা। আমরা বলি কান শোনে। কিন্তু কান নিজে শোনে না; কান ওসীলা। আমরা বলি নাক ঘ্রাণ নেয়। কিন্তু নাক নিজে স্বাধীন নয়; নাক ওসীলা। আমরা বলি জবান স্বাদ নেয়। কিন্তু জবানও ওসীলা। আমরা বলি হাত স্পর্শ করে। কিন্তু হাতও ওসীলা। এগুলো মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার অতা করা মাধ্যম।

তাহলে তোমার ছোট দেহ যদি এই ওসীলাগুলো ছাড়া সঠিকভাবে কাজ করতে না পারে, তোমার আকলও বেইয়িব ওসীলা ছাড়া হিদায়েত পেতে পারে না। চোখ নষ্ট হলে দেখা ভুল হয়। কান নষ্ট হলে শোনা ভুল হয়। ওসীলা বিকৃত হলে আকলও বিকৃত খবর পায়। তাই আকলকে বেইয়িব ওসীলা দরকার। আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে যে ওসীলা আসে, সেটাই বেইয়িব। নবী বেইয়িব। ওহী বেইয়িব। ক্বুরআন শরীফ বেইয়িব। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নত বেইয়িব।

এখানেই নবুওয়তের প্রয়োজন। যে মানুষ বলে, আমি শুধু নিজের আকলে চলব, সে নিজের চোখকে সূর্য মনে করছে। আকল সম্মানিত, কিন্তু আকল ওহীর অধীন। আকল আলো গ্রহণ করে, আলো সৃষ্টি করে না। হিদায়েতের মালিক মহান আল্লাহ তা’য়ালা। হিদায়েতের দরজা নবুওয়ত। হিদায়েতের পূর্ণতম নমুনা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى، فَمَن تَبِعَ هُدَايَ، فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ) অর্থাৎ, আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট যখন হিদায়েত আসবেন, তখন যে আমার হিদায়েত অনুসরণ করবে, তাদের উপর কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না। (ছুরাহ আল বাক্বারাহ ২:৩৮)

এখানে শুধু বলা হয়নি, “হাদী আসবে।” বলা হয়েছে, “হিদায়েত আসবে।” হাদী কখনো কথা বলেন, কখনো চুপ থাকেন। ডাক্তার কখনো চিকিৎসা করেন, কখনো করেন না। খতীব কখনো খুতবা দেন, কখনো দেন না। কিন্তু হিদায়েত এমন মাক্বাম, যেখানে তাঁর প্রতিটি হালই পথ দেখায়।

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম শুধু একজন বক্তা নন। শুধু একজন আইনদাতা নন। শুধু একজন শিক্ষক নন। তিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে হিদায়েতের জীবন্ত নূরানী মাযহার। উনার কথা হিদায়েত, উনার নীরবতা হিদায়েত, উনার হাসি হিদায়েত, উনার রাগ হিদায়েত, উনার ক্ষমা হিদায়েত, উনার যুদ্ধ হিদায়েত, উনার শান্তি হিদায়েত, উনার ঘর হিদায়েত, উনার বাজার হিদায়েত, উনার মসজিদ হিদায়েত, উনার ছুন্নত হিদায়েত।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আপনি সরল-সঠিক পথের দিকে হিদায়েত করেন। (ছুরাহ আশ শূরা ৪২:৫২)

এখানে তাওহীদের আদব রাখতে হবে। ক্বলবে হিদায়েত সৃষ্টি করা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কাজ। কিন্তু হিদায়েতের দরজা, হিদায়েতের ঘোষণা, হিদায়েতের পূর্ণ নমুনা, হিদায়েতের তরবিয়ত, হিদায়েতের জীবন্ত ছুন্নত সব রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মাধ্যমে উম্মতের কাছে এসেছে। তাই রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে বাদ দিয়ে হিদায়েত খোঁজা মানে সূর্য বাদ দিয়ে আলো খোঁজা।

এই হিদায়েতের ইতিহাসও ক্বুরআন শরীফে ধাপে ধাপে দেখা যায়। হযরত আদম য়ালাইহিছ ছালাম এলেন, কিন্তু মানুষের ভিতরে নফস, হিংসা, হত্যা, আল্লাহর হুকুম থেকে সরে যাওয়ার প্রথম বড় শিক্ষা প্রকাশ পেল। হযরত নূহ য়ালাইহিছ ছালাম এলেন, তাওহীদের দিকে ডাকলেন, কিন্তু মানুষ বুতপরস্তিতে পড়ল। হযরত ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালাম এলেন, বুত ভাঙলেন, কিন্তু সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র, প্রকৃতি-এসবকে মাবূদ বানানোর ফিতনা সামনে এল। হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম এলেন, তাওহীদের দিকে ডাকলেন, কিন্তু বাছুর পূজার ফিতনা দেখা দিল। হযরত ঈছা য়ালাইহিছ ছালাম এলেন, মানুষকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দিকে ডাকলেন, কিন্তু উনার পর মানুষ উনাকেই আল্লাহর পুত্র বলে বসলো।

অর্থাৎ গোমরাহি ইতিহাসে রূপ বদলেছে। কখনো বুতপরস্তি, কখনো সূর্যপরস্তি, কখনো জানওয়ারপরস্তি, কখনো মানুষপরস্তি। বাতিলের পোশাক বদলেছে, কিন্তু মূল রোগ একঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া অন্যকে ইলাহের আসনে বসানো।

এরপর এলেন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম। উনি এক কালিমায় সব মিথ্যা ইলাহকে নাকচ করে দিলেন। তিনি বলেনঃ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।

যদি এক এক করে অস্বীকার করা হতো, তালিকা শেষ হতো না। সূর্য খোদা নয়, চাঁদ খোদা নয়, বুত খোদা নয়, জানওয়ার খোদা নয়, মানুষ খোদা নয়, ক্ষমতা খোদা নয়, টাকা খোদা নয়, বংশ খোদা নয়, দল খোদা নয়, নফস খোদা নয়, কবর খোদা নয়, প্রকৃতি খোদা নয়। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এক বাক্যে সব মিথ্যা খোদার জানাজা পড়ে দিলেন।

لَا إِلٰهَ

কোনো ইলাহ নেই।

إِلَّا اللهُ

মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া।

কিন্তু এখানে একটি বড় ভুল থেকে বাঁচতে হবে। কেউ যদি বলে, শুধু “لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ” মুখে বললেই ঈমান হয়ে যায়, তাহলে সে ঈমানের দরজাকে অসম্পূর্ণ বুঝেছে। কারণ আরবের বহু মুশরিকও স্বীকার করত, আসমান-জমিনের স্রষ্টা আল্লাহ। ক্বুরআন শরীফ নিজেই এই কথা বলেছে।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ، وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ، لَيَقُولُنَّ اللهُ) অর্থাৎ, আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন, আসমানসমূহ ও জমিন কে সৃষ্টি করেছেন এবং সূর্য ও চাঁদ কে অধীন করেছেন, তারা অবশ্যই বলবে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা। (ছুরাহ আল আনকাবূত ২৯:৬১) মহান আল্লাহ তা’য়ালা আবারো বলেনঃ (وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَهُمْ، لَيَقُولُنَّ اللهُ، فَأَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ) অর্থাৎ, আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তাদের কে সৃষ্টি করেছেন, তারা অবশ্যই বলবে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা। এরপরও তারা কীভাবে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে? (ছুরাহ আয যুখরুফ ৪৩:৮৭)

তাহলে প্রশ্ন হলো, তারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে সৃষ্টিকর্তা মানত, তবু মুমিন হলো না কেন? কারণ শুধু মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে খালিক বলা যথেষ্ট নয়। তাদের কুফরের মূল দরজা ছিল ইনকারে মুহাম্মাদ। তারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পাঠানো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে অস্বীকার করেছে। তাই তাদের তাওহীদের দাবি গ্রহণযোগ্য হয়নি।

সুতরাং ঈমানের কালিমা পূর্ণ হলোঃ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللهِ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রছুল।

প্রথম অংশ তাওহীদ। দ্বিতীয় অংশ রিছালত। তাওহীদ ও রিছালতকে আলাদা করলে ঈমান থাকে না। যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে মানার দাবি করে, কিন্তু মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পাঠানো রছুলকে অস্বীকার করে, সে আসলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমই অস্বীকার করল।

এই জন্য ঈমানের প্রাণ হলো হুব্বে রছুল। শুধু জবানী স্বীকার নয়, শুধু বাহ্যিক আমল নয়, শুধু ইলম নয়; ক্বলবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মুহব্বত ঈমানের জীবন।

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ، حَتَّىٰ أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ، وَوَلَدِهِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ) অর্থাৎ, তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়েও অধিক প্রিয় হই। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম)

হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার ঘটনা ঈমানের এই দরজাকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি বলেছিলেন, ইয়া রছুলাল্লাহ, আপনি আমার কাছে সবকিছুর চেয়ে প্রিয়, তবে আমার নিজের প্রাণ ছাড়া। তখন নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, না, সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় হই। তখন হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এখন আপনি আমার কাছে আমার নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। তখন নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, এখন, হে উমর।

এখানে গভীরভাবে চিন্তা করো। হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার কী ছিল না? কালিমা ছিল। নামায ছিল। রোজা ছিল। যাকাত ছিল। হজ্জ ছিল। জিহাদ ছিল। ছ্বহাবিয়্যাত ছিল। রছুলের সোহবত ছিল। তারপরও ঈমানের পূর্ণতার জন্য নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি হুব্বে রছুল দরকার হলো। তাহলে যে মানুষ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে ভালোবাসে না, সে ঈমানের দাবি কীভাবে করে? আর যে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে অস্বীকার করে, সে তাওহীদের দাবি করলেও নাজাতের দাবিদার কীভাবে হয়?

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ فَاتَّبِعُونِي، يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ، وَاللهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ) অর্থাৎ, আপনি বলুন, যদি তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভালোবাসো, তাহলে তোমরা আমার অনুসরণ করো; মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (ছুরাহ আলে ইমরান ৩:৩১)

এই আয়াতের মূল দলিলী পয়েন্টঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভালোবাসার দাবি সত্য হতে হলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার অনুসরণ জরুরি। শুধু “আমি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে ভালোবাসি” বলা যথেষ্ট নয়; সেই মহব্বতের ছিদক্ব প্রমাণ হয় فَاتَّبِعُونِي দ্বারা, অর্থাৎ “আমার অনুসরণ করো।”

সুতরাং ঈমানের মর্ম হলো তাওহীদ, তাছ্বদীক্বে রিছালত, তাকিবে রছুল, আনুগত্যে রছুল, আদবে রছুল। এগুলো আলাদা করলে ঈমান শুকিয়ে যায়।

এখন হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনার প্রসঙ্গ এই ঈমানের আলোচনার ভিতরেই বুঝতে হবে। আমাদের অবস্থান পরিষ্কারঃ আমরা হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনার ঈমানে বিশ্বাসী। কারণ ঈমানের প্রাণ হুব্বে রছুল, তাছ্ব্বদীক্বে রছুল, ইমদাদে রছুল, রক্ষায় রছুল, আদবে রছুল। আর হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনার জীবন এই সবকিছুর সাক্ষী।

প্রশ্ন হলো, কেউ কি দেখাতে পারবে যে হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে অস্বীকার করেছেন? তিনি কি কখনো বলেছেন, মুহাম্মাদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রছুল নন? তিনি কি কখনো বলেছেন, উনার দাওয়াত মিথ্যা? তিনি কি কখনো বলেছেন, উনার উপর ওহী আসে না? তিনি কি কখনো নবীজিকে কুরাইশের হাতে তুলে দিয়েছেন? তিনি কি কখনো কুরাইশের শিরকের পাশে দাঁড়িয়ে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন?

সবকিছুর উত্তর, এক বাক্যে হচ্ছেঃ না।

বরং তিনি রক্ষা করেছেন, আশ্রয় দিয়েছেন, পাশে দাঁড়িয়েছেন, নিজের গোত্রের চাপ সহ্য করেছেন, বয়কট সহ্য করেছেন, কুরাইশের আগ্রাসনের সামনে ঢাল হয়েছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার দাওয়াতের বাহ্যিক নিরাপত্তার অন্যতম বড় মাধ্যম হয়েছেন।

তাহলে প্রশ্ন হলোঃ যিনি অস্বীকার করেননি, তিনি মুনকির কীভাবে হলেন?

মুনকির মানে যে ইনকার করে। যে তাছ্বদীক্ব করেন, রক্ষা করেন, মুহব্বত করেন, সাহায্য করেন, নিজের সামাজিক অবস্থানকে রছুলের জন্য ঢাল বানান, তিনি কি মুনকির হতে পারেন? কেউ যদি বলে, তিনি অমুকের সামনে প্রকাশ্যে কালিমা পড়েননি, সেটি আরেক আলোচনা। কিন্তু “অমুকের সামনে কালিমা পড়েননি” আর “রছুলকে অস্বীকার করেছেন” এ দুই জিনিস এক নয়।

আমাদের কাছে আসল প্রশ্ন হলোঃ ইনকারে মুহাম্মাদ (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) কোথায়?

যদি ইনকার না থাকে, যদি হুব্বে রছুল পাওয়া যায়, যদি ইমদাদে রছুল পাওয়া যায়, যদি তাছ্বদীক্বে রছুলের জীবনব্যাপী সাক্ষ্য থাকে, তাহলে উনাকে মুশরিক বানানোর এতো তাড়াহুড়া কেনো?

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ، وَلَٰكِنَّ اللهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়েত দিতে পারেন না; বরং মহান আল্লাহ তা’য়ালা যাকে চান হিদায়েত দেন। (ছুরাহ আল ক্বাছাছ ২৮:৫৬)

আমাদের তাহক্বীক্বে এই আয়াত হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনার বিষয়ে নাযিল হয়েছে-এই দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু আলোচনার খাতিরে যদি কেউ ধরে নেয়, আয়াতটি সেই প্রসঙ্গে, তাহলেও আয়াতের শব্দ লুকানো যাবে না।

مَنْ أَحْبَبْتَ

অর্থাৎ, যাকে আপনি ভালোবাসেন।

তাহলে সেই ব্যাখ্যা ধরলেও হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম কে? মহবূবে রছুল। আর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ) অর্থাৎ, মানুষ যার সঙ্গে মুহব্বত রাখে, তার সঙ্গেই থাকবে। (ছ্বহীহ আল বুখারী, ছ্বহীহ মুছলিম)

এখন প্রশ্ন করো, হুব্বে রছুল ছাড়া ঈমান পূর্ণ নয়। যার প্রতি রছুলের মুহব্বত, যার ঘরে রছুলের আশ্রয়, যার বাহুতে রছুলের নিরাপত্তা, যিনি নবীজির জন্য কুরাইশের চাপ সহ্য করেছেন, তাকে জাহান্নামে পাঠানোর তাড়া কার?

এটি ছুন্নীয়তের আদব নয়। এটি রছুলের মহবূবের প্রতি ইনসাফ নয়। এটি হুব্বে রছুলের ভাষা নয়। আহলে বাইতের ঘরের প্রতি মুহব্বত ও আদব ছুন্নীয়তের ক্বলবের অংশ। কিন্তু এই মুহব্বত কখনো ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের অসম্মানের দরজা নয়। ছুন্নীয়তের ভারসাম্য হলোঃ রছুলের আহলে বাইতের মুহব্বত, ছ্বহাবায়ে কিরামের আদব, ক্বুরআন-ছুন্নাহর আনুগত্য, তাজকিয়ার মর্ম, এবং তাওহীদের নিরাপদ আক্বীদা।

হযরত হামযাহ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার ঘটনা এই আলোচনায় একটি শক্তিশালী নুকতা খুলে দেন। তিনি যখন আবু জাহলের মাথায় ধনুক দিয়ে আঘাত করলেন, কারণ সে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শানে বেয়াদবি করেছিল, তখন নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম সাহায্য গ্রহণ এবং “চাচা” সম্বোধনের সঙ্গে কালিমার শর্ত যুক্ত করেছিলেন এই মর্ম আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনার কাছে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজে অভিযোগ নিয়ে গেছেন, উনাকে চাচা বলেছেন, উনার সাহায্য চেয়েছেন। তাহলে যদি সাহায্য গ্রহণের শর্ত কালিমা হয়, চাচা সম্বোধনের শর্ত কালিমা হয়, তবে হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনার কালিমার নিছবত প্রমাণিত। অভিযোগ যদি থাকে, তা এতটুকুঃ তিনি অমুকের সামনে সাক্ষ্য বানিয়ে কালিমা পড়েননি। কিন্তু এটি বলা যাবে নাঃ তিনি রছুলকে অস্বীকার করেছেন।

কারণ জীবনব্যাপী রছুলের পাশে থাকা নিজেই সাক্ষ্য। রছুলকে রক্ষা করা সাক্ষ্য। রছুলের দাওয়াতকে আশ্রয় দেওয়া সাক্ষ্য। রছুলের বিরুদ্ধে কুরাইশের চাপ অস্বীকার করা সাক্ষ্য। রছুলের প্রতি মুহব্বত সাক্ষ্য। যে রছুলকে অস্বীকার করে, সে রছুলের জন্য জীবনব্যাপী ঢাল হয় না।

এখন আবার মূল হিদায়েতের ফ্লোতে ফিরে আসো। হিদায়েতের ইতিহাসে হযরত নূহ য়ালাইহিছ ছালাম উনার কিশতি একটি বিশাল রূপক। কিশতির ভিতরে নাজাত। কিশতির বাইরে হালাকত। কিশতির ভিতরে হক্ব। কিশতির বাইরে বাতিল। কিশতির ভিতরে নবীর আনুগত্য। কিশতির বাইরে নিজের বুদ্ধির পাহাড়।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা হযরত নূহ য়ালাইহিছ ছালাম উনার বক্তব্য নকল করে বলেনঃ (يَا بُنَيَّ ارْكَب مَّعَنَا، وَلَا تَكُن مَّعَ الْكَافِرِينَ) অর্থাৎ, হে আমার পুত্র, আমাদের সঙ্গে আরোহণ করো এবং কাফিরদের সঙ্গে থেকো না। (ছুরাহ হূদ য়ালাইহিছ ছালাম ১১:৪২) মহান আল্লাহ তা’য়ালা হযরত নূহ য়ালাইহিছ ছালাম উনার পুত্রের বক্তব্য নকল করে বলেনঃ (سَآوِي إِلَىٰ جَبَلٍ يَعْصِمُنِي مِنَ الْمَاءِ) অর্থাৎ, আমি এমন পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি থেকে রক্ষা করবে। (ছুরাহ হূদ য়ালাইহিছ ছালাম ১১:৪৩) মহান আল্লাহ তা’য়ালা হযরত নূহ য়ালাইহিছ ছালাম উনার বক্তব্য নকল করে বলেনঃ (لَا عَاصِمَ الْيَوْمَ مِنْ أَمْرِ اللهِ إِلَّا مَن رَّحِمَ) অর্থাৎ, আজ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুম থেকে রক্ষাকারী কেউ নেই, তবে যার উপর তিনি রহম করেন। (ছুরাহ হূদ য়ালাইহিছ ছালাম ১১:৪৩)

এই ঘটনা শুধু ইতিহাস নয়। এটি কিয়ামত পর্যন্ত হিদায়েতের নছিহত। হযরত নূহ য়ালাইহিছ ছালাম উনার রক্তের সম্পর্ক পুত্রকে বাঁচাতে পারেনি। নবীর ঘরের বাহ্যিক সম্পর্ক তাকে বাঁচাতে পারেনি। পাহাড়ের শক্তি তাকে বাঁচাতে পারেনি। নিজের বুদ্ধি তাকে বাঁচাতে পারেনি। নাজাত ছিল কিশতিতে, তিনি কিশতি ছেড়ে পাহাড় ধরেছিলেন।

যে নাজাতের জায়গা ছেড়ে নিজের বুদ্ধির পাহাড় ধরে, সে ডুবে যায়। যে নবীর কিশতি ছেড়ে নিজের অহংকারে ওঠে, সে ডুবে যায়। যে ক্বুরআন-ছুন্নত ছেড়ে নিজস্ব ব্যাখ্যার পাহাড়ে ওঠে, সে ডুবে যায়। যে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার দরবারের আদব ছেড়ে শুকনা তর্কের পাহাড় ধরে, সে ডুবে যায়।

নূহ য়ালাইহিছ ছালাম উনার কিশতির মর্ম হলো, নাজাত মহান আল্লাহ তা’য়ালা যেখানে রেখেছেন, সেখানে যেতে হবে। কিশতি ছাড়া পাহাড় কাজ দেয় না। নবীর আদেশ ছাড়া বুদ্ধি কাজ দেয় না। রছুলের দরবার ছাড়া শুকনা তাওহীদ কাজ দেয় না। ক্বুরআন-ছুন্নত ছাড়া তাছাউফ কাজ দেয় না। আহলে বাইতের আদব ছাড়া নবীপ্রেম পূর্ণ হয় না। ছ্বহাবায়ে কিরামের সম্মান ছাড়া ছুন্নীয়তের ভারসাম্য থাকে না।

আহলে বাইতের মুহব্বত ছুন্নীয়তের ক্বলবের নূর। এটি কোনো দলীয় স্লোগান নয়, কোনো বিদ্বেষের দরজা নয়। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ঘরের প্রতি মুহব্বত রাখা ঈমানের আদব। তবে একই সঙ্গে ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের সম্মান রাখা ছুন্নীয়তের অপরিহার্য ভারসাম্য। যে আহলে বাইতের নামে ছ্বহাবায়ে কিরাম উনাদের অপমান করে, সে ছুন্নীয়তের পথে নেই। আর যে ছ্বহাবায়ে কিরামের নামে আহলে বাইতের মুহব্বত কমায়, তার নবীপ্রেমও পরীক্ষা করা দরকার।

হিদায়েতের আরেকটি বড় দরজা হলো তরবিয়ত। হযরত নূহ য়ালাইহিছ ছালাম উলুল আযম রছুল। তারপরও উনার পুত্র গোমরাহ হলেন। এখানে বুঝতে হবে, রক্তের সম্পর্ক নাজাতের নিশ্চয়তা নয়। নবীর ঘরের বাহ্যিক সম্পর্কও যদি কিশতিতে না ওঠে, নাজাত দেয় না। আবার ঘরের তরবিয়তের প্রভাবও অস্বীকার করা যায় না। মা-বাবার কোলে, ঘরের ভাষায়, ঘরের নামাযে, ঘরের দরূদে, ঘরের ক্বুরআনে, ঘরের আদবে, ঘরের হালাল-হারামে, সন্তানের ক্বলব রঙ নেয়।

সন্তানকে শুধু জন্ম দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। নাম রাখলেই দায়িত্ব শেষ নয়। মাদরাসায় পাঠালেই দায়িত্ব শেষ নয়। ঘরে দীন না থাকলে সন্তানের ভিতরে দীন শক্ত হয় না। ঘরে দরূদ না থাকলে সন্তানের ক্বলবে ইশক জাগে না। ঘরে আহলে বাইতের আদব না থাকলে সন্তানের নবীপ্রেম অসম্পূর্ণ থাকে। ঘরে ছ্বহাবায়ে কিরামের সম্মান না থাকলে সন্তানের ছুন্নীয়ত বিকৃত হয়। ঘরে ক্বুরআন না থাকলে সন্তানের ফিতরত দুনিয়ায় ডুবে যায়।

যে ঘরে মা-বাবা নামাযে গাফিল, সন্তান নামাযকে কীভাবে বড় করবে? যে ঘরে গীবত খাবারের মতো চলে, সন্তান জবান কীভাবে পাক করবে? যে ঘরে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার দরূদ নেই, সন্তান নবীপ্রেম কোথা থেকে শিখবে?

তরবিয়ত হিদায়েতের ঘরোয়া দরজা। ঘর হলো প্রথম মাদরাসা। মায়ের কোলে প্রথম তাছাউফ। বাবার আখলাকে প্রথম ফিক্বহ। ঘরের নামাযে প্রথম ছুন্নত। ঘরের দরূদে প্রথম ইশক। ঘরের আহলে বাইতের মুহব্বত ও ছ্বহাবায়ে কিরামের আদবে প্রথম ছুন্নীয়ত।

তাহলে সার কথা কী?

হিদায়েত শুধু তথ্য নয়। হিদায়েত হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রবূবিয়্যাতের নূর, যা কায়িনাতকে তার পথে চালায় এবং মানুষকে ওহী, নবী, কিতাব, শরীয়ত, ছুন্নত ও তাজকিয়ার মাধ্যমে সিরাতুল মুস্তাক্বীমে ডাকে। হিদায়েত হলো কালিমার ভিতরে প্রবেশ করা। হিদায়েত হলো সব মিথ্যা ইলাহ ভাঙা। হিদায়েত হলো ইনকারে মুহাম্মাদ থেকে বাঁচা। হিদায়েত হলো হুব্বে রছুলকে প্রাণের চেয়েও বেশি করা। হিদায়েত হলো ক্বুরআন, ছুন্নত, আহলে বাইতের আদব, ছ্বহাবায়ে কিরামের সম্মান, মুর্শিদের তাজকিয়া, সব মিলিয়ে ছিরাত্বুল মুস্তাক্বীমে দাঁড়ানো।

পুরো কায়িনাত হিদায়েত মানছে। তুমি কি মানছ?

সূর্য নিজের পথে আছে, তুমি কি ছিরাত্বুল মুস্তাক্বীমে আছ? চাঁদ নিজের মানযিল মানে, তুমি কি নামাযের সময় মানো? মাছ তার সাঁতার জানে, তুমি কি নিজের বন্দেগি জানো? বীজ মাটির অন্ধকার ফুঁড়ে আলোতে ওঠে, তোমার ক্বলব কি নফসের অন্ধকার ফুঁড়ে রবের দিকে উঠছে? নূহ য়ালাইহিছ ছালাম উনার কিশতি নাজাত ছিল, তুমি কি নবীর কিশতিতে উঠেছ? হযরত নূহ য়ালাইহিছ ছালাম উনার পুত্র পাহাড় ধরেছিলেন, তুমি কি নিজের বুদ্ধির পাহাড় ধরে বসে আছ? কালিমা সব মিথ্যা খোদা ভাঙে, তোমার নফসের খোদা ভেঙেছে কি? হুব্বে রছুল ঈমানের প্রাণ, তোমার ক্বলবে সে প্রাণ আছে কি?

যদি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তোমার কাছে তোমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় না হন, তবে ঈমানের পূর্ণতা চাও। যদি তোমার জবানে কালিমা আছে, কিন্তু ক্বলবে হুব্বে রছুল নেই, তবে ক্বলবের চিকিৎসা করো। যদি আহলে বাইতের নাম শুনে মুহব্বত না জাগে, তবে নিজের নবীপ্রেম পরীক্ষা করো। যদি ছ্বহাবায়ে কিরামের সম্মান না থাকে, তবে নিজের ছুন্নীয়ত পরীক্ষা করো। যদি হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনার মতো রছুলের রক্ষককে অবহেলায় মুশরিক বলার সাহস হয়, তবে নিজের আদব পরীক্ষা করো।

আমাদের কথা পরিষ্কার।

ঈমান হুব্বে রছুল ছাড়া পূর্ণ নয়। ইনকারে মুহাম্মাদ ছাড়া কাউকে মুনকির বানানোর তাড়াহুড়া ইনসাফ নয়। যে রছুলকে অস্বীকার করেনি, বরং রক্ষা করেছে, মুহব্বত করেছে, পাশে দাঁড়িয়েছে, তাকে মুনকির বলা সহজ কথা নয়। হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনার ঈমান আমরা মানি, কারণ উনার জীবন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মুহব্বত, তাছ্বদীক্ব, রক্ষা ও সাহায্যের সাক্ষ্য।

হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আপনি পুরো কায়িনাতকে তার পথ দেখিয়েছেন। আমাদের ক্বলবকেও আপনার সিরাতুল মুস্তাক্বীমে চালিয়ে দিন। আমাদের চোখকে হক্ব দেখার চোখ দিন। কানকে হক্ব শুনার কান দিন। ক্বলবকে হিদায়েত কবুলের ক্বলব দিন। আকলকে ওহীর অধীন করুন। নফসকে কালিমার অধীন করুন।

হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আমাদেরকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি মুহব্বত করার তাওফীক দিন। উনার ছুন্নতের আনুগত্য দিন। উনার আহলে বাইতের মুহব্বত দিন। উনার ছ্বহাবায়ে কিরামের আদব দিন। উনার রক্ষকদের সম্মান করার ইনসাফ দিন। হযরত আবি তালিব য়ালাইহিছ ছালাম উনার শান বুঝার ক্বলব দিন।

হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আমাদের ঘরকে হিদায়েতের ঘর বানান। আমাদের সন্তানদের দীনী তরবিয়ত দিন। আমাদের জবানকে কালিমায় জীবিত রাখুন। আমাদের ক্বলবকে দরূদে ভিজিয়ে দিন। আমাদের নফসের পাহাড় ডুবিয়ে দিন, আর আমাদেরকে নাজাতের কিশতিতে উঠিয়ে দিন।

শেষ নিঃশ্বাসে আমাদের জবানে জারি করুনঃ

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللهِ

وَصَلَّى اللهُ تَعَالَىٰ عَلَىٰ خَيْرِ خَلْقِهِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ، وَعَلَىٰ آلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِينَ، بِرَحْمَتِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ۔

آمِيْنَ يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ۔


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: