Thursday, October 29, 2026

কর্পোরেট দাস-দাসীদের চেয়ে ইছলামের প্রকৃত দাস-দাসীদের মর্যাদা ও ফায়দা কি কম?

নাস্তিকদের দাসপ্রথা-সংক্রান্ত আপত্তির জবাবে কুরআন শরীফ, ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ, ফিক্বহ ও সমসাময়িক বাস্তবতার আলোকে একটি পর্যালোচনা

সূচিপত্র

১। স্বাধীনতার নামে আধুনিক দাসত্ব।

২। ইউরোপের নারীদের স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি।

৩। আমেরিকার নারীরা কি শোষণমুক্ত?

৪। সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের নীরব নির্যাতন।

৫। রিজিকের অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্যের পেরেশানি এবং নেককার মানুষের তত্ত্বাবধানে জীবন।

৬। ছুরাহ মুমিনূনে স্ত্রী ও দাসীর সহবাসের শরয়ী স্বীকৃতি।

৭। ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার তাফছীর এবং ছুরাহ মায়ারিজের বিধান।

৮। ছুরাহ নিছায় স্ত্রী ও দাসীর সম্পর্ক এবং সহবাসের বিধান।

৯। দাসীর ঈমান, সম্ভ্রম, বিবাহ ও মোহর।

১০। দাসীর সঙ্গে বৈধ সহবাস ও পতিতাবৃত্তির পার্থক্য।

১১। দুই মালিকের অধীনে একজন দাসী এবং সহবাসের নিষেধাজ্ঞা।

১২। বিবাহিত দাসী ও ইছতিবরার বিধান।

১৩। দাসীর নিজস্ব শারীরিক ও দাম্পত্য চাহিদা।

১৪। উম্মে ওয়ালাদ ও সন্তানের অধিকার।

১৫। স্ত্রী ও দাসীর স্বীকৃত মর্যাদা ও অধিকারের তুলনা।

১৬। হযরত আবু হুরায়্রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার দাসত্বের আকাঙ্ক্ষা।

১৭। ইছলামে দাসের খাদ্য, পোশাক ও শ্রমের অধিকার।

১৮। ইছলামে দাস-দাসীর উপর প্রহারের বিধান।

১৯। ইসরায়েলের কারাগারে দীর্ঘদিন বন্দি ফিলিস্তিনিরা।

২০। যাকাত, দাসমুক্তি এবং বন্দিমুক্তির বিধান।

২১। দাসীকে শিক্ষা, মুক্তি ও বিবাহের দ্বিগুণ ছ্বওয়াব।

২২। নেককার দাস-দাসীর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ।

২৩। ইছলাম কি দাসপ্রথার স্রষ্টা?

২৪। নাস্তিক সমালোচকদের প্রতি আমাদের প্রশ্ন।

২৫। উপসংহার ও দলিলপঞ্জি।

প্রথম অধ্যায়। স্বাধীনতার নামে আধুনিক দাসত্ব

নাস্তিকরা খুব সুকৌশলে মা মালাকাত আইমানুকুম এর ব্যখ্যা হিসেবে ইছলাম বর্বর, যৌন দাসীর প্রথা রহিত করেনি, ক্বুরআন হাদিছ রহিত করেনি, ভাবখানা এমন যে ইছলামই এর মূল স্রষ্টা ছিলেন, আর আমরা দাসপ্রথার পক্ষে, আল্লাহ তায়ালা ও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যা রহিত করেন নাই উক্ত হিকমতের বিপরিতে সারা কায়েনাত নাস্তিক এর মতো আচরণ করলেও আমাদের ইমানে কোন দুর্বলতা নাই, মহান আল্লাহ তায়ালা হক্ব, উনার হাবিব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম সেই হক্বের মুহর।

প্রথমে দেখবো স্বাধীনতার নামে আধুনিক দাসত্ব।

ইছলামে দাসপ্রথার বিধান নিয়ে এক শ্রেণির নাস্তিক ও ইছলামবিরোধী সমালোচক আপত্তি উত্থাপন করেন। উনাদের আলোচনায় দাসত্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন দাসের জন্য কোনো মানবিক অধিকারই স্বীকৃত হতে পারে না এবং আধুনিক বেতনভিত্তিক কর্মসংস্থান মাত্রই স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা।

আমাদের প্রথম প্রশ্ন, কেবল আইনগতভাবে স্বাধীন পরিচয় লাভ করলেই কি একজন মানুষের জীবন স্বাধীন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে যায়?

যে নারী চাকরি হারানোর ভয়ে নিজের উপর সংঘটিত যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে পারেন না, যে গৃহকর্মী বিদেশে গিয়ে নিয়োগকর্তার ঘরে বন্দির মতো জীবনযাপন করেন, যে যুবতী অর্থনৈতিক অসহায়ত্বে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন, উনাদের স্বাধীনতার বাস্তব মূল্য কতটুকু?

এখানে একটি পার্থক্য শুরুতেই পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। আধুনিক চাকরিজীবী আইনগত অর্থে দাস নন। 'কর্পোরেট দাসত্ব' বলতে আমরা অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, শোষণ এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য সংকুচিত হওয়ার অবস্থাকে বোঝাচ্ছি।

আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে, শরীয়ত সম্পূর্ণ অনুসরণকারী নেককার মালিকের অধীনে দাস-দাসীর প্রাপ্য অধিকার এবং বাস্তবে শোষিত আধুনিক শ্রমিকের অবস্থার তুলনা।

প্রথমেই প্রশ্ন করা প্রয়োজন, একটি মানুষের জন্য স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কী? তিনি স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবেন, কাজ নির্বাচন করতে পারবেন এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন, নিশ্চয়ই এগুলো স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তাঁর মাথার উপর ছাদ না থাকলে, প্রতিদিন খাবারের নিশ্চয়তা না থাকলে কিংবা উপার্জনের জন্য প্রতিনিয়ত অপমান ও নির্যাতন সহ্য করতে হলে তাঁর সেই স্বাধীনতা কতখানি কল্যাণ বয়ে আনছে?

কোনো ব্যক্তি আইনগতভাবে স্বাধীন, কিন্তু জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। অপরদিকে অন্য একজন ব্যক্তি ঐতিহাসিক দাসপ্রথার অধীনে থেকেও নিয়মিত খাদ্য, উপযুক্ত পোশাক, নিরাপদ বাসস্থান ও মানবিক আচরণ লাভ করছেন। এই দুটি নির্দিষ্ট অবস্থার তুলনায় বস্তুগত কল্যাণের প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই সামনে আসে।

এখানে একটি যুক্তি পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। দ্বিতীয় ব্যক্তির খাদ্য ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তা প্রথম ব্যক্তির দুর্দশার তুলনায় উত্তম হতে পারে। কিন্তু এর দ্বারা দাসত্বের সমস্ত সীমাবদ্ধতা বিলুপ্ত হয়ে যায় না। ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তবুও এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে, আধুনিক সমাজ যখন দাসপ্রথাকে সমালোচনা করে, তখন সেই সমাজের নিজস্ব শ্রমশোষণ, গৃহকর্মীদের নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি এবং অসহায় মানুষের আশ্রয়হীনতাকে কতটা গুরুত্ব দেয়?

ইছলাম দাসপ্রথার মূল স্রষ্টা নয়। ইছলামের আবির্ভাবের বহু পূর্ব থেকেই বিভিন্ন সভ্যতায় দাসত্ব বিদ্যমান ছিল। ইছলামী শরীয়ত সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে দাস-দাসীদের খাদ্য, পোশাক, শ্রম, বিবাহ, মুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ে বিধান দিয়েছে।

অতএব, ইসলামী দাসপ্রথার আলোচনা করতে হলে শুধু মালিকানার বিষয় নয়, মালিকের উপর নির্ধারিত দায়িত্ব এবং দাস-দাসীর স্বীকৃত অধিকারগুলোকেও একই সঙ্গে বিচার করতে হবে।

দ্বিতীয় অধ্যায়। ইউরোপের নারীদের স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যরাষ্ট্রে পরিচালিত এবং ২০২৪ সালে প্রকাশিত বৃহৎ জরিপে ১,১৪,০২৩ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, কর্মজীবী বা পূর্বে কর্মজীবী নারীদের ৩০.৮ শতাংশ জীবনের কোনো পর্যায়ে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই হার ৪১.৬ শতাংশ। পুরুষ সহকর্মীর দ্বারা ১৫.৮ শতাংশ, পুরুষ ব্যবস্থাপক বা তত্ত্বাবধায়কের দ্বারা ৭.৪ শতাংশ এবং কর্মক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট অন্য পুরুষের দ্বারা ৯.৩ শতাংশ নারী হয়রানির অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

সূত্রঃ ইউরোস্ট্যাট, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক অধিকারবিষয়ক সংস্থা এবং ইউরোপীয় লিঙ্গসমতা ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণা, ইউরোপীয় ইউনিয়নে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা জরিপ, ২০২৪।

এই পরিসংখ্যানগুলো একই নারী একাধিক শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহন করে। তাই শতাংশগুলো যোগ করে মোট নির্যাতনের হার নির্ধারণ করা যাবে না। কিন্তু মূল প্রশ্ন অক্ষত থাকে। যে সমাজ কর্মক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতা ও সমমর্যাদার কথা বলে, সেই সমাজে এত বিপুলসংখ্যক নারী কেন কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হন?

২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের ১১ শতাংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণ কোনোটিতেই যুক্ত ছিলেন না।

এদিকে ইউরোস্ট্যাটের ২০২৬ সালে প্রকাশিত অপর একটি বিশ্লেষণে ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের ১৬.২ শতাংশ কর্মশক্তির বাইরে এবং আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় অনুপস্থিত ছিলেন, যেখানে পুরুষদের হার ৬.৯ শতাংশ।

অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং কর্মক্ষেত্রের অনিরাপত্তা বাস্তব সমস্যা। এগুলোকে স্বাধীনতার স্লোগানে অস্বীকার করা যায় না।

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের উপর যৌন হয়রানির অভিযোগ শুধু অপরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নয়। সহকর্মী, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক এবং কর্মক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিরাও এসব অভিযোগের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, একজন নারী জীবিকা অর্জনের জন্য যে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাসম্পর্ক কখনো তাঁর নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।

ধরা যাক, একজন তরুণী একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় তাঁর বেতনের উপর নির্ভরশীল। এমন অবস্থায় কর্মস্থলের কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করলে তিনি প্রতিবাদ করতে গিয়ে চাকরি হারানোর আশঙ্কা অনুভব করতে পারেন।

এখানে তাঁকে আইনগতভাবে স্বাধীন বলা হলেও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা বাস্তবে তাঁর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্যকে দুর্বল করতে পারে। অবশ্য এ ধরনের নির্যাতন আধুনিক শ্রম আইনের অধীনেও নিষিদ্ধ এবং অনেক কর্মী আইনগত প্রতিকার লাভ করেন। কিন্তু আইন থাকা এবং প্রত্যেক অসহায় ব্যক্তির পক্ষে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া এক বিষয় নয়।

তৃতীয় অধ্যায়। আমেরিকার নারীরা কি শোষণমুক্ত?

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউইয়র্কভিত্তিক এম্পায়ার স্টেট জরিপে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির উল্লেখযোগ্য হার পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশিত ২০২৫ সালের গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ২২.৩ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, নারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এই হার ছিল ৩২.৬ শতাংশ। অর্থাৎ, পূর্বোক্ত ২২.৩ শতাংশ সমগ্র জরিপে অংশগ্রহণকারীদের হার; শুধু নারীদের নয়।

তরুণীদের বেকারত্বের পাশাপাশি গৃহহীনতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন ও নগর উন্নয়ন বিভাগের ২০২৫ সালের গণনা অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০২৫-এর একটি নির্দিষ্ট রাতে ৭,৪৫,৬৫২ জন মানুষ গৃহহীন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২,৬৬,৩২০ জন আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান করছিলেন।

এই সংখ্যাগুলো নারী-পুরুষ মিলিয়ে। তাই এগুলোকে শুধু নারীদের গৃহহীনতার পরিসংখ্যান বলা যাবে না।

কিন্তু এগুলো এমন একটি বাস্তবতা প্রকাশ করে, যেখানে প্রচুর রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও আইনগত স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষের মৌলিক আশ্রয় নিশ্চিত হয়নি।

আমাদের প্রশ্ন, মানুষের জীবনের সফলতা নির্ধারণে কেবল ব্যক্তিস্বাধীনতার ঘোষণা যথেষ্ট, নাকি খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপত্তা ও মানবিক সম্মানের বাস্তব নিশ্চয়তাও জরুরি?

একজন নারী স্বাধীনভাবে নিজের বাসস্থান নির্ধারণ করতে পারেন, কিন্তু সেই বাসস্থানের ভাড়া পরিশোধের অর্থ নেই। তিনি স্বাধীনভাবে কাজ অনুসন্ধান করতে পারেন, কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান তাঁকে নিয়োগ দিচ্ছে না। তিনি স্বাধীনভাবে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন, কিন্তু চিকিৎসার ব্যয় বহনের সামর্থ্য নেই। এমন বাস্তবতা স্বাধীনতার মূল্য অস্বীকার করে না, বরং প্রমাণ করে যে স্বাধীনতার সঙ্গে মৌলিক প্রয়োজন পূরণের কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

বিশেষত অর্থনৈতিকভাবে অসহায় তরুণীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার প্রভাব গভীর হতে পারে। একজন নারীর নিয়মিত আয় না থাকলে তাঁকে আত্মীয়স্বজনের আশ্রয়, অস্থায়ী বাসস্থান, সামাজিক সহায়তা কিংবা অন্যের আর্থিক অনুগ্রহের উপর নির্ভর করতে হতে পারে। এই নির্ভরশীলতা কখনো অন্য ব্যক্তির শোষণের সুযোগ সৃষ্টি করে।

চতুর্থ অধ্যায়। সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের নীরব নির্যাতন

২০২৫ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সৌদি আরবে কাজ করে দেশে ফেরা ৭২ জন কেনীয় গৃহকর্মীর সাক্ষাৎকারভিত্তিক গবেষণা প্রকাশ করে।

তাঁদের বর্ণনায় খাদ্যবঞ্চনা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চলাফেরায় বাধা, পাসপোর্ট আটক, মারধর, যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণের ঘটনা পাওয়া যায়। একজন নারী তাঁর নিয়োগকর্তার দ্বারা একাধিকবার ধর্ষিত হওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন।

২০২৬ সালে ফিলিপিনো গৃহকর্মীদের সাক্ষাৎকারেও অনুরূপ নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ঐ বছরের জুলাই মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা ১৯ জন ফিলিপিনো নারীর অভিজ্ঞতা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এগুলো প্রমাণ করে না যে সৌদি আরবের অধিকাংশ গৃহকর্মী ধর্ষণের শিকার। কিন্তু গুরুতর নির্যাতনের নথিভুক্ত ঘটনা যে রয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না।

এখন মূল তুলনাটি করুন।

যে নারী বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নিজের নিয়োগকর্তা বা পরিবারের সদস্যের দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছেন, স্বাধীনতার পরিচয় থাকা সত্ত্বেও যিনি নির্যাতন থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না, তাঁর অবস্থার সঙ্গে শরীয়ত সম্পূর্ণ অনুসরণকারী একজন নেককার মালিকের অধীনে দাসীর নির্ধারিত খাদ্য, শ্রম ও সম্মানের অধিকার তুলনা করুন।

এটি প্রতিষ্ঠিত যে, দ্বিতীয় অবস্থায় উল্লিখিত অধিকারগুলো রক্ষা করা হলে প্রথম অবস্থার নির্যাতনগুলো সেখানে অনুপস্থিত থাকবে।

তবে এই তুলনা দিয়ে দাসীর ব্যক্তিস্বাধীনতা বা যৌন আত্মনিয়ন্ত্রণের সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয় না। সেগুলো পৃথক ফিক্বহী আলোচনার বিষয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে অনেক নারী দৈনিক ষোলো ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। কারও ছুটি ছিল না, কারও চলাফেরা সীমিত করা হয়েছিল এবং অনেকের পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। যখন কোনো নারী নিজের কাজের স্থানেই বাস করেন, তখন নিয়োগকর্তার কর্তৃত্ব শুধু কর্মঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর ঘুম, বিশ্রাম, খাদ্যগ্রহণ, চলাফেরা এবং বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের উপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে ইসলামী শরীয়তের ঐতিহাসিক দাসপ্রথায় মালিকের উপর খাদ্য, পোশাক ও সামর্থ্যের অতিরিক্ত শ্রম না চাপানোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। নেককার মালিকের অধীনে শরয়ী বিধান যথাযথভাবে পালিত হলে একজন দাসীর জন্য এমন কিছু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যা নির্যাতিত গৃহকর্মী বাস্তবে পাচ্ছেন না।

তবে আধুনিক গৃহকর্মী নির্যাতনের প্রতিকার হিসেবে দাসত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না। অসহায় নারীর জন্য স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেই নিরাপদ বাসস্থান, খাদ্য, ন্যায়সংগত কর্মসংস্থান এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।

পঞ্চম অধ্যায়। রিজিকের অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্যের পেরেশানি এবং নেককার মানুষের তত্ত্বাবধানে জীবন

একটি বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। মানুষের জীবনে স্বাধীনতার গুরুত্ব অস্বীকার না করেও প্রশ্ন করা যায়, স্বাধীনতার পরিচয় থাকা সত্ত্বেও যদি একজন নারী নিজের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে না পারেন, তাহলে তাঁর সেই স্বাধীনতার বাস্তব কল্যাণ কতটুকু?

ধরা যাক, একজন নারী সম্পূর্ণ স্বাধীন। কিন্তু তিনি দরিদ্র। তাঁর নিজস্ব বাসস্থান নেই, নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা নেই, আগামীকাল কোথা থেকে খাবার সংগ্রহ করবেন সেই নিশ্চয়তা নেই। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে তাঁকে চিন্তা করতে হয়, আজ কোথায় কাজ পাবেন, কার কাছে সাহায্য চাইবেন, বাড়িভাড়া কীভাবে পরিশোধ করবেন এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসার অর্থ কোথা থেকে আসবে।

তাঁর দিন শুরু হয় রিজিকের পেরেশানি দিয়ে এবং রাত শেষ হয় পরবর্তী দিনের অনিশ্চয়তায়।

এমন জীবনে খাদ্যের অভাবের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তির অভাবও গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। উপার্জনের অনিশ্চয়তা, ঋণের চাপ, আশ্রয় হারানোর আশঙ্কা এবং নিরাপত্তাহীনতা একজন মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের মধ্যে রাখতে পারে।

এখন বিপরীত একটি পরিস্থিতি কল্পনা করুন।

ঐতিহাসিক ইসলামী শরীয়তের অধীনে একজন নেককার, সম্পদশালী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির বৈধ মালিকানায় একজন দাসী রয়েছেন। মালিক মহান আল্লাহ পাককে ভয় করেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নির্দেশ অনুসরণ করেন এবং দাসীর প্রতি নিজের দায়িত্ব যথাযথ পালন করেন।

তিনি দাসীকে নিজের খাবার থেকে খাবার দেন, নিজের পোশাকের মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাক দেন, সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেন না এবং তাঁর সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করেন না। তাঁর দৈনন্দিন প্রয়োজনের দায়িত্ব মালিক গ্রহণ করেছেন। তিনি অনাহারে থাকছেন না, রাত কাটানোর জন্য পথে পথে ঘুরছেন না, প্রতিদিন নতুন নিয়োগকর্তার সন্ধানে বের হতে হচ্ছে না।

এই দুটি নির্দিষ্ট অবস্থার মধ্যে কে অধিক স্থিতিশীল জীবনযাপন করছেন?

প্রথম নারী আইনগতভাবে স্বাধীন হলেও তাঁর জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলো অনিশ্চিত। দ্বিতীয় নারী আইনগতভাবে অধীনস্থ হলেও তাঁর খাদ্য, পোশাক ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাস্তবে নিশ্চিত রয়েছে। সুতরাং খাদ্য, আশ্রয়, দৈনন্দিন স্থিতিশীলতা এবং অনাহারের আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকার বিচারে দ্বিতীয় নারীর জীবন প্রথম নারীর চেয়ে উত্তম হতে পারে।

এই যুক্তির জন্য সমস্ত ঐতিহাসিক দাসীর জীবন সুখের ছিল, এমন দাবি করার প্রয়োজন নেই। কারণ এখানে তুলনা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট নির্যাতনপূর্ণ বা অভাবগ্রস্ত জীবন এবং একটি নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধানে নিশ্চিত মৌলিক সুবিধাপ্রাপ্ত জীবনের মধ্যে।

একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হচ্ছে রিজিকের অনিশ্চয়তা। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি খাদ্য, কাজ, বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসার অর্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হয়, তাহলে তাঁর সময় ও মানসিক শক্তির বড় অংশ সেই সংগ্রামে ব্যয় হতে পারে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয়, বিশ্রাম এবং দায়িত্ব অনুযায়ী অবসর থাকলে তিনি শিক্ষা, ইবাদত, জিকির এবং আত্মশুদ্ধির কাজে অধিক মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

একজন নেককার মালিক যদি তাঁর অধীনস্থ দাসীকে শুধু খাদ্য ও পোশাকই না দেন, বরং কুরআন শরীফের শিক্ষা, দ্বীনি ইল্ম এবং ইবাদতের উপযুক্ত পরিবেশও প্রদান করেন, তাহলে সেই পরিবেশে দাসীর দ্বীনি উন্নতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এখানে কল্যাণের কারণটি সঠিকভাবে নির্ণয় করা জরুরি। খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া কল্যাণকর। কিন্তু এই কল্যাণ লাভের জন্য কাউকে অন্য মানুষের সম্পত্তিতে পরিণত করাই একমাত্র পথ নয়। একজন দ্বীনদার ব্যক্তি কোনো দরিদ্র স্বাধীন নারীকে সাহায্য করতে পারেন, নিরাপদ বাসস্থান দিতে পারেন, শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। এতে সেই নারীর মৌলিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি ব্যক্তিস্বাধীনতাও বজায় থাকে।

অতএব, যে ঐতিহাসিক দাসী নেককার মালিকের অধীনে যথাযথ সুবিধা লাভ করেছেন, তাঁর সেই সুবিধাগুলোকে অস্বীকার করা যায় না। একই সঙ্গে এসব সুবিধার জন্য দাসত্বকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবেও উপস্থাপন করা যায় না। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচার হচ্ছে, দাসী পরিচয় একজন মানুষকে খাদ্য, পোশাক, দ্বীনি শিক্ষা, ইবাদত এবং আখিরাতের মর্যাদা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বঞ্চিত করে না।

ষষ্ঠ অধ্যায়। ছুরাহ মুমিনূনে স্ত্রী ও দাসীর সহবাসের শরয়ী স্বীকৃতি

নাস্তিকদের দাসপ্রথা-সংক্রান্ত আপত্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে, (مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ) অর্থাৎ ডান হাতের মালিকানাধীনদের সঙ্গে সহবাসের বিধান। এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কুরআন শরীফের যে বিধানের উপর আপত্তি উত্থাপন করা হচ্ছে, সেই বিধানের মূল ইবারত, প্রাচীন তাফছীর এবং ফিক্বহী ব্যাখ্যাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।

মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ (وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ ۝ إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ ۝ فَمَنِ ابْتَغَىٰ وَرَاءَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْعَادُونَ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ আর তাঁরা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী। তবে নিজেদের স্ত্রীগণ অথবা নিজেদের ডান হাতের মালিকানাধীনদের ক্ষেত্রে তাঁরা নিন্দিত নন। অতঃপর যে ব্যক্তি এর বাইরে অন্বেষণ করে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী। (সূত্রঃ ছুরাহ আল-মুমিনূন, ২৩:৫-৭)

এখানে গভীরভাবে লক্ষণীয়, মহান আল্লাহ পাক প্রথমে মুমিনদের লজ্জাস্থান হেফাজতের গুণ বর্ণনা করেছেন। অতঃপর দুটি পৃথক সম্পর্কের উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি হচ্ছে أَزْوَاجِهِمْ, অর্থাৎ নিজেদের স্ত্রীগণ। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, (مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ) অর্থাৎ নিজেদের ডান হাতের মালিকানাধীন দাসীগণ।

এরপর উভয় শ্রেণির প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেনঃ (فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ নিশ্চয়ই তাঁরা নিন্দিত নন।

এই বাক্যটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে স্ত্রী এবং ঐতিহাসিক শরীয়তের বৈধ মালিকানাধীন দাসীকে সহবাসের দুটি স্বীকৃত সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বৈধতার সীমার মধ্যে নিন্দার অবকাশ নেই বলা হয়েছে।

একজন স্ত্রী বিবাহের মাধ্যমে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন। অন্যদিকে ঐতিহাসিক দাসী-মালিক সম্পর্কের ভিত্তি ছিল তৎকালীন স্বীকৃত মালিকানা এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শরয়ী শর্ত। এই দুটি সম্পর্কের আইনগত ভিত্তি এক নয়। তবুও সহবাসের বৈধতার প্রসঙ্গে উভয়কে একই আয়াতে উল্লেখ করার তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না।

এখানে দাসীকে কেবল শ্রমের যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বরং একজন পুরুষের বৈধ ব্যক্তিগত সম্পর্কের আলোচনায় তাঁর অবস্থানও স্বীকৃত হয়েছে। অতএব, দাসীর সঙ্গে ঐতিহাসিক শরয়ী শর্ত পূরণকারী সহবাসকে নিজেই নিন্দনীয় অথবা অবৈধ সম্পর্ক বলে উপস্থাপন করা আয়াতের প্রাচীন ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কিন্তু একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। একই আয়াতে উল্লেখিত হওয়া মানেই স্ত্রী ও দাসীর সমস্ত আইনগত অধিকার সমান হওয়া নয়। স্ত্রীর মোহর, উত্তরাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং বিবাহসংক্রান্ত অন্যান্য অধিকার দাসীর অবস্থার সঙ্গে অভিন্ন ছিল না।

সুতরাং এখানে প্রতিষ্ঠিত বিষয়টি হচ্ছে, সহবাসের নির্দিষ্ট বৈধতার বিধানে স্ত্রী ও দাসীর দুটি স্বতন্ত্র সম্পর্ককে পাশাপাশি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি দাসীর শরয়ী অবস্থান সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কিন্তু তাঁর সকল অধিকারের প্রশ্নে পৃথক আয়াত, হাদিছ এবং ফিক্বহী বিধানও বিবেচনা করতে হবে।

সপ্তম অধ্যায়। ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার তাফছীর এবং ছুরাহ মায়ারিজের বিধান

ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি ছুরাহ আল-মুমিনূনের ৬ নম্বর আয়াতের তাফছীরে বলেছেনঃ (إِلَّا مِنْ أَزْوَاجِهِمُ اللَّاتِي أَحَلَّهُنَّ اللَّهُ لِلرِّجَالِ بِالنِّكَاحِ) অর্থাৎ, বিবাহের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক যেসব স্ত্রীকে পুরুষদের জন্য বৈধ করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ছাড়া।

এরপর তিনি (أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ) সম্পর্কে লিখেছেনঃ (يَعْنِي بِذَلِكَ إِمَاءَهُمْ) অর্থাৎ, এর দ্বারা তাঁদের দাসীদের বোঝানো হয়েছে।

এরপর (فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ) সম্পর্কে বলেছেনঃ (فَإِنَّهُ غَيْرُ مُوَبَّخٍ عَلَى ذَلِكَ، وَلَا مَذْمُومٍ، وَلَا هُوَ بِفِعْلِهِ ذَلِكَ رَاكِبٌ ذَنْبًا يُلَامُ عَلَيْهِ) অর্থাৎ, ঐ নির্ধারিত বৈধ সম্পর্কের কারণে তিনি তিরস্কৃত নন, নিন্দিত নন এবং এমন কোনো পাপেও লিপ্ত নন, যার জন্য তাঁকে নিন্দা করা হবে।

হযরত ইবনে আব্বাছ রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি আরও বর্ণনা করেছেনঃ (رَضِيَ اللَّهُ لَهُمْ إِتْيَانَهُمْ أَزْوَاجَهُمْ، وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ পাক তাঁদের জন্য নিজেদের স্ত্রীগণ এবং মালিকানাধীন দাসীদের সঙ্গে সহবাস অনুমোদন করেছেন। সূত্রঃ তাফছীরে ত্ববারী, ছুরাহ আল-মুমিনূন, ২৩:৬।

এখানে ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার ব্যাখ্যা এবং হযরত ইবনে আব্বাছ রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে উদ্ধৃত বর্ণনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দাসীর সঙ্গে ঐতিহাসিক শরয়ী শর্তানুযায়ী সহবাসের স্বীকৃতি কেবল পরবর্তী ফক্বীহদের উদ্ভাবিত কোনো মত নয়। কুরআন শরীফের আয়াতের প্রাচীন তাফছীরেই এর সরাসরি আলোচনা রয়েছে।

এই আয়াতের আলোচনায় আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দাসীকে একই বৈধতার প্রসঙ্গে উল্লেখ করার ফলে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের জন্য নির্দিষ্ট শরয়ী স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই স্বীকৃতিকে মালিকের সব ধরনের আচরণের অনুমোদন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ ঐতিহাসিক শরীয়তে যৌথ মালিকানাধীন দাসীর সহবাস, বিবাহিত দাসীর সহবাস, গর্ভাবস্থার ইছতিবরা এবং অন্যান্য শর্তের পৃথক বিধান রয়েছে।

এখন দেখা যাক, এই মূলনীতিটি কুরআন শরীফে আর কোথায় এসেছে। মহান আল্লাহ পাক ছুরাহ আল-মায়ারিজে ইরশাদ করেছেনঃ (وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ ۝ إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ ۝ فَمَنِ ابْتَغَىٰ وَرَاءَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْعَادُونَ)

অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ আর তাঁরা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী। তবে নিজেদের স্ত্রীগণ অথবা নিজেদের ডান হাতের মালিকানাধীনদের ক্ষেত্রে তাঁরা নিন্দিত নন। অতঃপর যে ব্যক্তি এর বাইরে অন্বেষণ করে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।

সূত্রঃ ছুরাহ আল-মায়ারিজ, ৭০:২৯-৩১।

এখানে ছুরাহ মুমিনূনের একই বিধান পুনরুল্লেখিত হয়েছে। মহান আল্লাহ পাক স্ত্রী এবং বৈধ মালিকানাধীন দাসীকে দুটি স্বতন্ত্র সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তারপর নির্ধারিত বৈধতার সীমার মধ্যে উভয়ের প্রসঙ্গে নিন্দার অবকাশ নেই বলে ঘোষণা করেছেন।

অতএব, এই বিধান কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার অস্পষ্ট ইঙ্গিত নয়। এটি কুরআন শরীফে একাধিক স্থানে উল্লেখিত সহবাসসংক্রান্ত আইনগত স্বীকৃতি। যে ব্যক্তি ইছলামের দাসপ্রথা নিয়ে আলোচনা করবেন, তাঁকে এই আয়াতগুলোর মূল শব্দ ও প্রাচীন তাফছীর বিবেচনায় আনতে হবে।

অষ্টম অধ্যায়। ছুরাহ নিছায় স্ত্রী ও দাসীর সম্পর্ক এবং সহবাসের বিধান

মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ (فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ অতঃপর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একজন স্ত্রী অথবা তোমাদের ডান হাতের মালিকানাধীনদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকো। এটি অবিচারের আশঙ্কা থেকে দূরে থাকার অধিক নিকটবর্তী। সূত্রঃ ছুরাহ আন-নিছা, ৪:৩, আয়াতের উদ্ধৃত অংশ।

এই আয়াতে একাধিক বিবাহের প্রেক্ষাপটে ন্যায়বিচারের বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্ত্রী এবং বৈধ মালিকানাধীন দাসীদের পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে একটি মৌলিক বিষয় হচ্ছে, বিবাহের দায়িত্ব এবং ঐতিহাসিক দাসী-মালিকানা সম্পর্কের দায়িত্ব এক ধরনের ছিল না।

ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি এই আয়াতের তাফছীরে একাধিক স্ত্রীর ইনছাফ এবং দাসীর ক্ষেত্রে দায়িত্বের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। এখানে স্ত্রী ও দাসীকে একই আইনগত পরিচয়ের অধিকারী করা হয়নি। কিন্তু দাসীর সঙ্গে ঐতিহাসিক শরয়ী শর্তানুযায়ী ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্বীকৃতিও অস্বীকার করা হয়নি।

এবার ছুরাহ আন-নিছার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ (وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۖ كِتَابَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ আর বিবাহিতা নারীগণও তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তবে তোমাদের ডান হাতের মালিকানায় আসা নারীগণ ব্যতীত। এটি তোমাদের উপর মহান আল্লাহ পাকের নির্ধারিত বিধান। সূত্রঃ ছুরাহ আন-নিছা, ৪:২৪, আয়াতের উদ্ধৃত অংশ।

তাফছীরী ব্যাখ্যাঃ ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি এই ব্যতিক্রমের ব্যাখ্যায় বিশেষভাবে যুদ্ধবন্দিনী নারীদের প্রসঙ্গ, পূর্ববর্তী বিবাহের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ফিক্বহী বিধান আলোচনা করেছেন। এই ব্যাখ্যা আয়াতের সরাসরি অনুবাদের অংশ নয়।

এখানে বন্দিত্বের পূর্ববর্তী বিবাহ, বন্দিত্বের পর সেই সম্পর্কের অবস্থান এবং সহবাসের শর্ত সম্পর্কে ফিক্বহী মতামত রয়েছে। অতএব, কোনো দাসী অন্য পুরুষের সঙ্গে বৈধভাবে বিবাহিত থাকা অবস্থায় তাঁর মালিক অবাধে সহবাস করতে পারবেন, এমন সাধারণ সিদ্ধান্ত এই আয়াত থেকে গ্রহণ করা যাবে না। কারণ বিবাহিত দাসীর সঙ্গে মালিকের সহবাসের নিষেধাজ্ঞা প্রাচীন ফিক্বহে আলোচিত হয়েছে।

শরীয়তের যে অনুমোদন যে অবস্থার জন্য নির্ধারিত, সেটিকে সেই অবস্থার মধ্যেই বিচার করতে হবে। এই শর্ত অক্ষুণ্ণ রেখেই বলা যায়, ছুরাহ নিছার আয়াতগুলোতে স্ত্রী, দাসী, বিবাহ এবং ঐতিহাসিক যুদ্ধবন্দিনী নারীদের সম্পর্কসংক্রান্ত পৃথক বিধান রয়েছে।

নবম অধ্যায়। দাসীর ঈমান, সম্ভ্রম, বিবাহ ও মোহর

মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ (وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ مِنْكُمْ طَوْلًا أَنْ يَنْكِحَ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ فَمِنْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ مِنْ فَتَيَاتِكُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ۚ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِكُمْ ۚ بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুমিন নারীকে বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে না, সে তোমাদের অধীনস্থ মুমিন দাসীদের মধ্য থেকে বিবাহ করতে পারে। মহান আল্লাহ পাক তোমাদের ঈমান সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। তোমরা একে অপরেরই অন্তর্ভুক্ত।

অতঃপর মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ (فَانْكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ مُحْصَنَاتٍ غَيْرَ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ সুতরাং তাঁদের মালিকদের অনুমতিক্রমে তাঁদের বিবাহ করো এবং যথাযথভাবে তাঁদের মোহর প্রদান করো। তাঁরা হবেন সম্ভ্রম রক্ষাকারিণী, প্রকাশ্যে অবৈধ যৌন সম্পর্ককারিণী নন এবং গোপন অবৈধ সঙ্গী গ্রহণকারিণীও নন। সূত্রঃ ছুরাহ আন-নিছা, ৪:২৫, আয়াতের নির্বাচিত অংশ।

এই আয়াতে দাসীর ঈমান, সম্ভ্রম, বিবাহ এবং মোহরের বিষয় একত্রে এসেছে। প্রথমেই লক্ষণীয়, দাসীকে, (فَتَيَاتِكُمُ الْمُؤْمِنَاتِ) অর্থাৎ তোমাদের মুমিন দাসীগণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে তাঁর ঈমানদার পরিচয় স্বীকৃত হয়েছে। অতঃপর (بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ) বলে ঈমান ও মানবিক সম্পর্কের সাধারণ ভিত্তি স্মরণ করানো হয়েছে।

একজন দাসী সামাজিকভাবে অধীনস্থ হলেও ঈমান, তাক্বওয়া ও নেক আমলের অধিকারী হতে পারেন। মহান আল্লাহ পাকের নিকট তাঁর মর্যাদা কেবল মালিকানার অবস্থান দ্বারা নির্ধারিত হয় না।

এরপর দাসীর বিবাহের প্রসঙ্গ এসেছে। এখানে বিবাহের জন্য মালিকের অনুমতি এবং মোহরের বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, দাসী বৈধ বিবাহের সম্পর্কের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। আয়াতে (أُجُورَهُنَّ) শব্দ দ্বারা এই বিবাহের প্রেক্ষাপটে মোহর বোঝানো হয়েছে।

আরও লক্ষণীয়, আয়াতে (مُحْصَنَاتٍ) শব্দটি এসেছে, যার দ্বারা সম্ভ্রম রক্ষাকারিণী নারীর অর্থ আলোচিত হয়েছে। এখানে দাসী পরিচয়কে সম্ভ্রমহীনতার পরিচয় বানানো হয়নি। বরং তাঁর সম্ভ্রম রক্ষার বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই আয়াতের আলোচনায় আরেকটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। এখানে দাসীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ দেওয়ার বিধান আলোচিত হচ্ছে। অপরদিকে ছুরাহ মুমিনূন ও ছুরাহ মায়ারিজে ঐতিহাসিক মালিক-দাসী সম্পর্কের নির্দিষ্ট সহবাসসংক্রান্ত স্বীকৃতি এসেছে। দুটি বিধান পৃথক।

দশম অধ্যায়। দাসীর সঙ্গে বৈধ সহবাস ও পতিতাবৃত্তির পার্থক্য

ঐতিহাসিক ইসলামী দাসপ্রথায় দাসীর সঙ্গে শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃত সহবাস এবং দাসীকে যৌন বাণিজ্যের জন্য অন্য পুরুষদের নিকট ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ (وَلَا تُكْرِهُوا فَتَيَاتِكُمْ عَلَى الْبِغَاءِ إِنْ أَرَدْنَ تَحَصُّنًا لِتَبْتَغُوا عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۚ وَمَنْ يُكْرِهْهُنَّ فَإِنَّ اللَّهَ مِنْ بَعْدِ إِكْرَاهِهِنَّ غَفُورٌ رَحِيمٌ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ আর তোমাদের দাসীরা যদি নিজেদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে চায়, তাহলে পার্থিব জীবনের সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করো না। আর যে ব্যক্তি তাঁদের বাধ্য করে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তাঁদের উপর সংঘটিত সেই জবরদস্তির পর ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূত্রঃ ছুরাহ আন-নূর, ২৪:৩৩, আয়াতের উদ্ধৃত অংশ।

তাফছীরী ব্যাখ্যাঃ এখানে ক্ষমা ও রহমত জবরদস্তির শিকার দাসীদের জন্য; তাঁদের বাধ্যকারী মালিকের অন্যায়ের জন্য ক্ষমা ঘোষিত হয়নি। ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি লিখেছেনঃ (وَوِزْرُ مَا كَانَ مِنْ ذَلِكَ عَلَيْهِمْ دُونَهُنَّ) অর্থাৎ, সেই অপরাধের পাপের বোঝা বাধ্যকারীদের উপর, নারীদের উপর নয়। সূত্রঃ তাফছীরে ত্ববারী, ২৪:৩৩।

ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি এই আয়াতের তাফছীরে দাসীদের অবৈধ যৌন কাজে বাধ্য করার ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন। হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ঘটনাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি দাসীর মালিক হয়েছেন বলেই কি তিনি তাঁকে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে অন্য পুরুষদের নিকট যৌন কাজে বাধ্য করতে পারেন? আয়াতে এই কাজের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

অন্যদিকে ছুরাহ মুমিনূন এবং ছুরাহ মায়ারিজে ঐতিহাসিক বৈধ মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে নির্ধারিত সহবাসের স্বীকৃতি এসেছে। এই দুই বিধানকে এক করে ফেলা যায় না। দাসীকে অন্য পুরুষদের নিকট যৌন বাণিজ্যে বাধ্য করা এক বিষয়। আর ঐতিহাসিক শরয়ী শর্ত পূরণকারী নির্দিষ্ট মালিক-দাসী সম্পর্কের স্বীকৃতি অন্য বিষয়।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। দাসী হওয়ার অর্থ তাঁর উপর পরিবারের প্রত্যেক পুরুষের সহবাসের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়। মালিকের পিতা, ভাই, পুত্র, বন্ধু কিংবা অন্য পুরুষ কেবল সেই মালিকের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে দাসীর সঙ্গে সহবাসের অধিকারী হয়ে যান না। এমনকি দুইজন ব্যক্তি যৌথভাবে একজন দাসীর মালিক হলেও হানাফি ফিক্বহ অনুযায়ী তাঁদের কেউই শুধু সেই যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে সহবাসের অনুমতি লাভ করেন না।

তবে এখানে পৃথক প্রশ্ন রয়েছে। দাসীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা নিষিদ্ধ হওয়ার আয়াত থেকে মালিকের সঙ্গে তাঁর প্রত্যেক সহবাসে স্বাধীন সম্মতি অপরিহার্য শর্ত ছিল, এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয় না। প্রাচীন ফিক্বহে মালিকানা এবং সহবাসের অনুমোদন যে কাঠামোর মধ্যে ছিল, সেখানে দাসীর স্বাধীন সম্মতি আধুনিক স্বাধীন বিবাহের মতো একই আইনগত অবস্থানে ছিল না।

অতএব, নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সহবাসের শরয়ী বৈধতা, দাসীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার নিষেধাজ্ঞা এবং দাসীর স্বাধীন যৌন আত্মনিয়ন্ত্রণ তিনটি পৃথক আলোচ্য বিষয়। প্রথম দুটি বিষয়ে কুরআন শরীফে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তৃতীয় বিষয়ে প্রাচীন ফিক্বহের প্রকৃত অবস্থান এবং আধুনিক নৈতিক মূল্যায়ন পৃথকভাবে আলোচনা করতে হবে।

একাদশ অধ্যায়। দুই মালিকের অধীনে একজন দাসী এবং সহবাসের নিষেধাজ্ঞা

ইছলামী শরীয়তের ঐতিহাসিক দাসী-মালিক সম্পর্ক সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, একজন দাসীর যদি দুইজন মালিক থাকেন, তাহলে উভয়েই কি সেই দাসীর সঙ্গে সহবাস করতে পারবেন?

এখানে হানাফি ফিক্বহের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। ধরা যাক, একজন দাসী দুইজন ব্যক্তির যৌথ মালিকানাধীন। একজনের মালিকানার অংশ অর্ধেক এবং অপরজনের অংশও অর্ধেক। এমন অবস্থায় মালিকানার অংশ থাকার কারণে কি উভয় ব্যক্তি সহবাসের অধিকার লাভ করেন?

হানাফি ফিক্বহ অনুযায়ী উত্তর হচ্ছে, না। ইমাম ছারাখছী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি “আল-মাবছূত্ব” গ্রন্থে যৌথ মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে সহবাস নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান আলোচনা করেছেন। মূল বিধানের বক্তব্য হচ্ছেঃ (وَلَا يَحِلُّ لِوَاحِدٍ مِنَ الشَّرِيكَيْنِ وَطْءُ الْجَارِيَةِ الْمُشْتَرَكَةِ) অর্থাৎ, যৌথ মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে দুই অংশীদারের কারও সহবাস হালাল নয়।

সূত্রঃ আল-মাবছূত্ব, যৌথ মালিকানাধীন দাসীর সহবাসসংক্রান্ত আলোচনা।

এই বিধান অনুযায়ী, দুই মালিকের কেউই শুধু যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে সহবাসের অধিকারী হন না। একই সময়ে নয়, পৃথক সময়েও নয়। এমনকি একজন অংশীদার অপরজনকে সহবাসের অনুমতি দিলেও কেবল সেই অনুমতির কারণে বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ মালিকানার অংশবিশেষ এবং সহবাসের বৈধ অধিকার এক বিষয় নয়। নির্ধারিত শরয়ী শর্ত পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।

এই বিধানটি দাসীর সহবাসসংক্রান্ত আলোচনায় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ এর দ্বারা বোঝা যায়, ঐতিহাসিক ইসলামী ফিক্বহে দাসীর উপর একাধিক ব্যক্তির মালিকানা থাকা মানেই তাঁর সঙ্গে একাধিক পুরুষের সহবাসের স্বীকৃতি নয়।

কোনো দাসী দুই ব্যক্তির যৌথ মালিকানাধীন হওয়ার কারণে তাঁকে দুই পুরুষের যৌন ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত বলে উপস্থাপন করা হানাফি ফিক্বহের বিধানের বিরুদ্ধে। তবে যৌথ মালিকানার অধীনে সহবাস নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান থেকে একক মালিকানাধীন দাসীর স্বাধীন সম্মতির প্রশ্নের স্বয়ংক্রিয় নিষ্পত্তি হয় না। সেটি পৃথক আলোচনা।

দ্বাদশ অধ্যায়। বিবাহিত দাসী ও ইছতিবরার বিধান

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো মালিক নিজের দাসীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ দিলে তিনি কি সেই দাসীর সঙ্গে পূর্বের মতো সহবাসের অধিকার রাখবেন?

প্রাচীন ফিক্বহে বিবাহিত দাসীর সঙ্গে মালিকের সহবাসের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইমাম ইবনুল মুনযির রহমতুল্লাহী য়ালাইহি “আল-আওছাত্ব” গ্রন্থে এ বিষয়ে আলিমদের ঐকমত্য উদ্ধৃত করেছেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, দাসীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হলে তাঁর বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করে মালিকের নিজের সহবাসের অধিকার বহাল থাকে না। অর্থাৎ, দাসীর বিবাহ এবং মালিকের সহবাসসংক্রান্ত অধিকার একসঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহাল থাকে না। এটি দাসীর ব্যক্তিগত সম্পর্কসংক্রান্ত শরয়ী সীমা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ছুরাহ আন-নিছার ২৫ নম্বর আয়াতে দাসীর বিবাহ, মোহর এবং সম্ভ্রমের আলোচনা এসেছে। সেই আয়াতের সঙ্গে এই ফিক্বহী বিধানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

এর পাশাপাশি ঐতিহাসিক সহবাসের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা ও ইছতিবরার বিধানও গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আবু ছাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (لَا تُوطَأُ حَامِلٌ حَتَّى تَضَعَ، وَلَا غَيْرُ ذَاتِ حَمْلٍ حَتَّى تَحِيضَ حَيْضَةً) অর্থাৎ, গর্ভবতী বন্দিনীর সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে সহবাস করা যাবে না। আর যিনি গর্ভবতী নন, তাঁর একবার ঋতুস্রাব না হওয়া পর্যন্ত সহবাস করা যাবে না। সূত্রঃ ছুনান আবু দাউদ, হাদিছ ২১৫৭।

এই বিধানকে ইছতিবরা বলা হয়। ঐতিহাসিক বন্দিনী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা ও বংশপরিচয়ের বিষয় বিবেচনায় এই বিধান নির্ধারিত হয়েছে। অতএব, মালিকানা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সব অবস্থায় সহবাসের অনুমতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, এমন ধারণা সঠিক নয়।

গর্ভাবস্থা, পূর্ববর্তী সম্পর্ক এবং নির্ধারিত অপেক্ষার সময়ের বিষয়গুলোও সংশ্লিষ্ট ফিক্বহী বিধানের অন্তর্ভুক্ত। এখানে ইছতিবরা গর্ভাবস্থা ও বংশপরিচয়সংক্রান্ত বিধান। এটি নিজে দাসীর স্বাধীন সম্মতির নিশ্চয়তা নয়।

ত্রয়োদশ অধ্যায়। দাসীর নিজস্ব শারীরিক ও দাম্পত্য চাহিদা

এখন আমরা এমন একটি প্রশ্নের দিকে আসব, যা দাসীর নিজের প্রয়োজন এবং মানবিক কল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ধরা যাক, একজন সম্ভ্রান্ত, সম্পদশালী ও দ্বীনদার ব্যক্তির অধীনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক দাসী রয়েছেন। মালিক তাঁকে পরিবারের সদস্যদের মতো সম্মান করেন। উত্তম খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদান করেন। তাঁর সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করেন না। সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেন না। তাঁর দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থাও করেন।

কিন্তু মালিক নিজে তাঁর সঙ্গে সহবাস করেন না। একই সঙ্গে অন্যত্র বিবাহের ব্যবস্থাও করেন না। মালিকের ব্যক্তিগত অহংকার অথবা সামাজিক মর্যাদাবোধের কারণে তিনি দাসীকে অন্য কারও সঙ্গে বিবাহ দিতে আগ্রহী নন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই নারীর নিজের শারীরিক ও দাম্পত্য চাহিদার কী হবে? তিনি দাসী বলে কি তাঁর যৌন চাহিদা নেই? তাঁর স্নেহ, দাম্পত্যজীবন এবং শারীরিক সম্পর্কের প্রয়োজন কি অস্বীকার করা হবে? মালিক যদি তাঁর খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন, তাহলে কি সেই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই তাঁর সমস্ত মানবিক প্রয়োজন পূর্ণ হয়ে যায়?

এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে কুরআন শরীফের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ (وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ۚ إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ আর তোমাদের মধ্যে অবিবাহিতদের এবং তোমাদের নেককার দাস ও দাসীদের বিবাহের ব্যবস্থা করো। তাঁরা অভাবগ্রস্ত হলে মহান আল্লাহ পাক নিজ অনুগ্রহে তাঁদের অভাব দূর করে দেবেন। আর মহান আল্লাহ পাক প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। সূত্রঃ ছুরাহ আন-নূর, ২৪:৩২।

এই আয়াতে স্বাধীন নারী-পুরুষের পাশাপাশি নেককার দাস ও দাসীদের বিবাহের ব্যবস্থা করার নির্দেশ এসেছে। এখানে দাস-দাসীদের দাম্পত্যজীবনের বিষয় বাদ দেওয়া হয়নি। ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি এই আয়াতের তাফছীরে স্বাধীন নারী-পুরুষের পাশাপাশি নেককার দাস ও দাসীদের বিবাহের ব্যবস্থা করার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

এরপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফিক্বহী আলোচনা পাওয়া যায় ইমাম ইবনে কুদামাহ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার *আল-মুগ্বনী* গ্রন্থে। তিনি আলোচনা করেছেন, কোনো দাসী নিজের মালিকের কাছে বিবাহের দাবি করলে এবং মালিক তাঁর সঙ্গে সহবাসও না করলে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তাঁর আলোচিত হাম্বলি ফিক্বহী অবস্থানে এমন দাসীর প্রয়োজন বিবেচনা করে মালিককে বিবাহের ব্যবস্থা করা, বৈধতার শর্ত পূরণ হলে দাম্পত্য প্রয়োজনের সমাধান করা অথবা মালিকানা থেকে তাঁকে বের করে দেওয়ার বিকল্পগুলোর মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করার বিধান রয়েছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেনঃ (وَلِأَنَّ حَاجَتَهَا قَدْ تَشْتَدُّ إِلَى ذَلِكَ، فَأُجْبِرَ عَلَى دَفْعِهَا، كَالْإِطْعَامِ وَالْكِسْوَةِ) অর্থাৎ, কারণ তাঁর এই প্রয়োজন তীব্র হতে পারে। তাই খাদ্য ও পোশাকের প্রয়োজন পূরণের মতো এই প্রয়োজনের ব্যবস্থাও করতে মালিককে বাধ্য করা হবে। সূত্রঃ আল-মুগ্বনী, কিতাবুন নিছাহ, মাসআলা ৫২২৮।

এখানে ইমাম ইবনে কুদামাহ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি দাসীর শারীরিক ও দাম্পত্য প্রয়োজনকে সরাসরি স্বীকার করেছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তিনি সেই প্রয়োজনের সঙ্গে খাদ্য ও পোশাকের প্রয়োজনের তুলনা করেছেন।

একজন মানুষ যেমন খাদ্য ছাড়া জীবনযাপন করতে গিয়ে কষ্টের শিকার হতে পারেন, তেমনি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বৈধ দাম্পত্যজীবনের প্রয়োজনও তীব্র হতে পারে। তবে ব্যক্তি বিশেষে যৌন চাহিদা ভিন্ন। প্রত্যেক নারী একইভাবে যৌনসম্পর্ক চান, এমন ধারণা করা যাবে না। তাঁর নিজের আকাঙ্ক্ষা এবং কল্যাণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখিত ফিক্বহী আলোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়, অন্তত একটি প্রাচীন ফিক্বহী ধারায় দাসীর দাম্পত্য ও শারীরিক প্রয়োজনকে গুরুতর মানবিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

এখন পূর্বোক্ত উদাহরণে ফিরে আসা যাক। মালিক দাসীকে খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থান দিচ্ছেন, কিন্তু তাঁর নিজের দাম্পত্য প্রয়োজনের কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছেন। এই অবস্থায় ইমাম ইবনে কুদামাহ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার আলোচিত বিধান অনুযায়ী বিষয়টি বিচারিক প্রতিকারের প্রশ্নেও পৌঁছাতে পারে। তিনি মালিক অস্বীকার করলে বিচারক কর্তৃক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেছেন।

তবে এই বিধান চার মাযহাবের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নয়। শাফিয়ী ও মালিকী ফিক্বহে দাসীর দাবির ভিত্তিতে মালিককে বিবাহ দিতে বাধ্য করার বিষয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। হানাফি ফিক্বহেও একই হাম্বলি অবস্থান হুবহু প্রযোজ্য, এমন সিদ্ধান্তের জন্য পৃথক মূল ইবারত প্রয়োজন।

অতএব, এখানে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা হলো, দাসীর শারীরিক ও দাম্পত্য প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি প্রাচীন ফিক্বহী ভিত্তি রয়েছে। এটি থেকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়ার নৈতিক অনুমোদন প্রতিষ্ঠিত হয় না। একজন দাসী কেবল শ্রমের অধীনস্থ মানুষ নন। তিনি নিজস্ব অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজনের অধিকারী একজন মানুষ।

চতুর্দশ অধ্যায়। উম্মে ওয়ালাদ ও সন্তানের অধিকার

ঐতিহাসিক ইসলামী ফিক্বহে দাসীর সঙ্গে বৈধ সম্পর্ক থেকে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে মাতার আইনগত অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে পারত। এখানে أُمُّ الْوَلَدِ পরিভাষাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এর দ্বারা এমন দাসীকে বোঝানো হয়, যিনি নিজের মালিকের সন্তান প্রসব করেছেন এবং উম্মে ওয়ালাদ হওয়ার নির্ধারিত শরয়ী শর্ত পূর্ণ হয়েছে। হানাফি ফিক্বহ অনুযায়ী, যথাযথভাবে সন্তানের পিতৃপরিচয় প্রতিষ্ঠিত হলে সেই সন্তান স্বাধীন হিসেবে গণ্য হন। উম্মে ওয়ালাদকে সাধারণ দাসীর মতো বিক্রি করার অনুমতি থাকে না। মালিকের মৃত্যুর পর তিনি স্বাধীন হয়ে যান।

ইমাম কাছানী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি “বাদায়িউছ ছ্বানায়ি” গ্রন্থে এবং ইমাম ছারাখছী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি “আল-মাবছূত্ব” গ্রন্থে উম্মে ওয়ালাদ, সন্তানের নছব এবং মুক্তিসংক্রান্ত বিধান আলোচনা করেছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ঐতিহাসিক দাসী-মালিক সম্পর্কের সম্ভাব্য পরিণতি কেবল সহবাসে সীমাবদ্ধ ছিল না। সন্তানের পিতৃপরিচয়, স্বাধীনতা, মাতৃত্বের স্বীকৃতি এবং পরবর্তী মুক্তির বিধানও সংশ্লিষ্ট ফিক্বহী ব্যবস্থার অংশ ছিল।

অতএব, বৈধ মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে সহবাস থেকে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সেই সন্তান অনিবার্যভাবে দাস হিসেবে গণ্য হতেন, এমন দাবি সঠিক নয়। উম্মে ওয়ালাদের বিধান অনুযায়ী সন্তানের পিতৃপরিচয় প্রতিষ্ঠিত হতে পারত এবং মায়ের অবস্থাতেও বিশেষ পরিবর্তন আসত।

তবে উম্মে ওয়ালাদ হওয়ার অর্থ স্ত্রী হওয়া নয়। এই অবস্থায়ও তিনি বিবাহিত স্বাধীন স্ত্রীর সমস্ত অধিকার লাভ করতেন না। মালিকের জীবদ্দশায় তাঁর স্বাধীনতার উপর নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা বহাল থাকত। এই বিধানগুলোর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে তাই অধিকার ও অবশিষ্ট সীমাবদ্ধতা উভয়ই বিবেচনাযোগ্য।

পঞ্চদশ অধ্যায়। স্ত্রী ও দাসীর স্বীকৃত মর্যাদা ও অধিকারের তুলনা

এখন পর্যন্ত আলোচিত কুরআনী আয়াত, হাদিছ শরীফ এবং ফিক্বহী বিধান একত্র করলে একটি বিষয় সুস্পষ্ট। মহান আল্লাহ পাক ছুরাহ মুমিনূন এবং ছুরাহ মায়ারিজে স্ত্রী ও বৈধ মালিকানাধীন দাসীকে একই সহবাসসংক্রান্ত বৈধতার আলোচনায় উল্লেখ করেছেন। এটি ঐতিহাসিক ইসলামী শরীয়তে দাসীর সঙ্গে নির্ধারিত সহবাসের একটি স্বীকৃতি।

একজন স্ত্রী বিবাহের মাধ্যমে স্বামীর সঙ্গে বৈধ সম্পর্কের অধিকারী হন। অন্যদিকে ঐতিহাসিক দাসী-মালিক সম্পর্কের নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি ছিল মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট শরয়ী শর্ত। সহবাসের বৈধতার প্রসঙ্গে উভয় সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তাঁদের সমস্ত অধিকার অভিন্ন করা হয়নি।

একজন স্বাধীন স্ত্রীর মোহর, বিবাহসংক্রান্ত অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং উত্তরাধিকারের স্বতন্ত্র বিধান রয়েছে। অন্যদিকে দাসীর খাদ্য, পোশাক, শ্রমের সীমা, বিবাহ, সন্তানের নছব এবং মুক্তিসংক্রান্ত পৃথক বিধান রয়েছে। তাই দাসীকে স্ত্রীর সমস্ত অধিকারের সমান অধিকারী বলা যেমন যথার্থ নয়, তেমনি তাঁর কোনো অধিকার নেই বলাও সঠিক নয়।

একজন স্বাধীন স্ত্রী যদি নিজের সংসারে অনাহার, অবহেলা, অপমান এবং নির্যাতনের শিকার হন, আর একজন ঐতিহাসিক দাসী যদি নেককার মালিকের অধীনে পর্যাপ্ত খাদ্য, পোশাক, নিরাপদ বাসস্থান, সম্মানজনক আচরণ এবং সন্তানের নছবসংক্রান্ত অধিকার লাভ করেন, তাহলে বাস্তব কল্যাণের কয়েকটি ক্ষেত্রে দ্বিতীয় নারীর অবস্থা প্রথম নারীর চেয়ে উত্তম হতে পারে। কিন্তু এই উদাহরণ থেকে সব অবস্থায় দাসী হওয়াকে স্ত্রী হওয়ার চেয়ে উচ্চতর মর্যাদা বলা যাবে না।

কারণ ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, বিবাহের অধিকার এবং যৌন আত্মনিয়ন্ত্রণও মানুষের গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণের অংশ। এই দিকগুলোতে স্বাধীন স্ত্রীর আইনগত অবস্থান ঐতিহাসিক দাসীর অবস্থার সমান ছিল না।

এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বৈধতার স্বীকৃতি, মানবিক অধিকার এবং বাস্তব কল্যাণকে একত্রে বিচার করা। কেবল মালিকানার পরিচয় দিয়ে দাসীর সমস্ত কল্যাণ অস্বীকার করা যথার্থ নয়। আবার শুধু খাদ্য, আশ্রয় ও মালিকের সদাচরণ দিয়ে তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়াও যথার্থ নয়।

ষোড়শ অধ্যায়। হযরত আবু হুরায়্রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার দাসত্বের আকাঙ্ক্ষা

দাসপ্রথা সম্পর্কে সমালোচনা করার আগে একটি ছ্বহীহ হাদিছ শরীফের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। হযরত আবু হুরায়্রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিতঃ (لِلْعَبْدِ الْمَمْلُوكِ الصَّالِحِ أَجْرَانِ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْحَجُّ وَبِرُّ أُمِّي، لَأَحْبَبْتُ أَنْ أَمُوتَ وَأَنَا مَمْلُوكٌ) অর্থাৎ, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নেককার দাসের জন্য দুটি ছ্বওয়াব রয়েছে।

অতঃপর হযরত আবু হুরায়্রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! মহান আল্লাহ পাকের পথে জিহাদ, হজ্জ এবং আমার মায়ের খিদমত না থাকলে আমি দাস অবস্থায় মৃত্যুবরণ করাকে পছন্দ করতাম।

সূত্রঃ ছ্বহীহ বুখারী, হাদিছ ২৫৪৮; ছ্বহীহ মুসলিম, হাদিছ ১৬৬৫।

এখানে শেষোক্ত বক্তব্যটি যদিও হযরত আবু হুরায়্রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার নিজস্ব বক্তব্য। রছুলে পাক উনার নির্দেশ নয়, কিন্তু একটা বিষয় ক্লিয়ার, উনি এই মাছালা জানতেন, ব্যক্তি চাইলে কারো দাস হতে পারে তার জৈবিক প্রয়োজনে।

এছাড়া এর তাৎপর্য গভীর। যিনি দাসত্বের বিধান সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তিনি নেককার দাসের আখিরাতের ছ্বওয়াবকে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন যে, নির্দিষ্ট তিনটি দায়িত্বের প্রতিবন্ধকতা না থাকলে দাস হিসেবেই মৃত্যুবরণ করতে আগ্রহী হতেন।

অর্থাৎ, ইছলামের দৃষ্টিতে সামাজিক স্বাধীনতার মর্যাদা এবং মহান আল্লাহ পাকের নিকট আখিরাতের মর্যাদা অভিন্ন বিষয় নয়। কোনো দাস মহান আল্লাহ পাকের নিকট এমন মর্যাদা লাভ করতে পারেন, যা অনেক স্বাধীন ব্যক্তি লাভ করতে পারবেন না।

এই হাদিছ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য দাসত্ব কামনার নির্দেশ নয়; বরং দাসত্বের অধীনেও অসাধারণ আখিরাতের মর্যাদা অর্জনের সুস্পষ্ট প্রমাণ।

এই বর্ণনার অর্থ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বিবেচনা করা প্রয়োজন। হযরত আবু হুরায়্রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার বক্তব্য থেকে নেককার দাসের দ্বিগুণ ছ্বওয়াবের প্রতি আকাঙ্ক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু একজন স্বাধীন ব্যক্তি নিজের জৈবিক প্রয়োজনের কারণে আইনগতভাবে নতুন করে অন্য কারও দাসে পরিণত হতে পারেন, এমন বিধান এই হাদিছ থেকে প্রমাণিত হয় না।

বরং ছ্বহীহ বুখারীর ২২২৭ নম্বর হাদিছে স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে। অতএব, দাসের দ্বিগুণ ছ্বওয়াবের আকাঙ্ক্ষা এবং স্বাধীন মানুষের নতুন করে দাসত্বে প্রবেশের বৈধতা দুটি পৃথক প্রশ্ন। এই পার্থক্য অক্ষুণ্ণ রেখেও হযরত আবু হুরায়্রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার বক্তব্যের আখিরাতসংক্রান্ত তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সপ্তদশ অধ্যায়। ইছলামে দাসের খাদ্য, পোশাক ও শ্রমের অধিকার

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (إِنَّ إِخْوَانَكُمْ خَوَلُكُمْ جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلَا تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ فَأَعِينُوهُمْ) অর্থাৎ, তোমাদের অধীনস্থরা তোমাদের ভাই। মহান আল্লাহ পাক তাদের তোমাদের অধীন করেছেন। যার অধীনে তার ভাই রয়েছে, সে যেন তাকে নিজে যা খায় তা থেকে খাওয়ায় এবং নিজে যা পরিধান করে তা থেকে পরিধান করায়। তাদের সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দিও না। যদি এমন কাজ দাও, তবে তাদের সাহায্য করো। সূত্রঃ ছ্বহীহ বুখারী, হাদিছ ২৫৪৫।

এখানে খাদ্য, পোশাক এবং শ্রমের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। আরও এসেছেঃ (لِلْمَمْلُوكِ طَعَامُهُ وَكِسْوَتُهُ، وَلَا يُكَلَّفُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا يُطِيقُ) অর্থাৎ, দাসের খাদ্য ও পোশাক তার প্রাপ্য এবং তাকে সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজ দেওয়া যাবে না। সূত্রঃ ছ্বহীহ মুসলিম, হাদিছ ১৬৬২।

সুতরাং শরীয়তের নির্ধারিত অধিকার অনুযায়ী দাসকে খাওয়ানো বা পোশাক দেওয়া মালিকের নিছক দয়া নয়। এটি দায়িত্ব।

এখন সেই গৃহকর্মীর দিকে তাকান, যিনি কাজের জন্য বিদেশে গিয়ে দৈনিক ষোলো ঘণ্টার বেশি শ্রম দেন, অথচ পর্যাপ্ত খাবার, বিশ্রাম কিংবা নিরাপদ আশ্রয় পান না। তিনি কাগজে স্বাধীন। কিন্তু তাঁর উপর নিয়োগকর্তার বাস্তব নিয়ন্ত্রণ এতটাই প্রবল হতে পারে যে, শোষণ থেকে বেরিয়ে আসার পথও বন্ধ হয়ে যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এমন নির্যাতিত কর্মীর তুলনায় শরীয়তের বিধান পূর্ণভাবে পালনকারী নেককার মালিকের অধীনে একজন দাসের খাদ্য, পোশাক এবং শ্রমের অধিকার কি কম? এই নির্দিষ্ট অধিকারগুলোর ক্ষেত্রে উত্তর হচ্ছে, না।

এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ছ্বহীহ বুখারীর ২৫৪৫ নম্বর হাদিছের বর্ণনায় হযরত আবু যার গিফারী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু এবং উনার অধীনস্থ ব্যক্তির পরিধানে অনুরূপ পোশাকের ঘটনা এসেছে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে।

এখানে নিজের খাবার থেকে অধীনস্থ ব্যক্তিকে খাওয়ানো এবং নিজের পোশাকের অনুরূপ পোশাক প্রদানের কথা এসেছে। অর্থাৎ, দাসকে ন্যূনতম খাদ্য দিয়ে কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখাই এই নববী শিক্ষার পূর্ণ বক্তব্য নয়। বরং তাঁর প্রতি সম্মানজনক আচরণ এবং তাঁর মানবিক প্রয়োজনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।

আরও লক্ষণীয়, সামর্থ্যের অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি নির্দেশ এসেছে। যদি কঠিন কাজ দেওয়া হয়, তাহলে সেই কাজে সাহায্য করার কথাও বলা হয়েছে। অতএব, একজন নেককার মালিকের অধীনে দাসের জীবন কেমন হওয়া উচিত, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই হাদিছগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আধুনিক পৃথিবীতে অনেক স্বাধীন শ্রমিক দীর্ঘ সময় কাজ করার পরেও যথাযথ খাদ্য, বিশ্রাম কিংবা নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন না। এই পরিস্থিতির সঙ্গে শরীয়তের বিধান যথাযথভাবে পালনকারী নেককার মালিকের অধীনে দাসের খাদ্য, পোশাক ও শ্রমের সুরক্ষার তুলনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে।

ঐতিহাসিক দাসের ক্ষেত্রে মালিকের উপর প্রয়োজনীয় ভরণপোষণের দায়িত্ব ছিল। অন্যদিকে আধুনিক বেতনভিত্তিক কর্মসংস্থানে কর্মীর জীবনের বহু ব্যয় তাঁর নিজস্ব উপার্জন থেকে বহন করতে হয়। তবে আধুনিক শ্রমিকও বেতন, কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তা এবং শ্রমসংক্রান্ত অন্যান্য আইনি অধিকার রাখেন। ফলে তুলনাটি করতে হবে নির্দিষ্ট অধিকার ও বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে।

অষ্টাদশ অধ্যায়। ইছলামে দাস-দাসীর উপর প্রহারের বিধান

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (مَنْ لَطَمَ مَمْلُوكَهُ أَوْ ضَرَبَهُ فَكَفَّارَتُهُ أَنْ يُعْتِقَهُ) অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নিজের দাসকে চপেটাঘাত করে অথবা প্রহার করে, তার কাফফারা হচ্ছে তাকে মুক্ত করে দেওয়া। সূত্রঃ ছ্বহীহ মুসলিম, হাদিছ ১৬৫৭।

এটি অন্যায় প্রহারের বিরুদ্ধে গুরুতর নববী সতর্কবাণী। ইছলামী শরীয়ত দাসকে নির্যাতনের প্রশ্নে নীরব থাকেনি। তার উপর নির্দিষ্ট আচরণবিধি আরোপ করেছে এবং দাসমুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ নেক আমলের মর্যাদা দিয়েছে।

এখানে মালিকের কর্তৃত্বের পাশাপাশি তাঁর আচরণের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে এসেছে। দাসকে অন্যায়ভাবে প্রহার করার পর সেই কাজের কাফফারা হিসেবে মুক্ত করার নির্দেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিছটির বর্ণনাকারী হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা নিজেও একজন অধীনস্থ ব্যক্তিকে মুক্ত করেছিলেন বলে বর্ণনায় এসেছে।

তবে কাফফারার বিধান এবং প্রত্যেক প্রহারের ঘটনায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তি কার্যকর হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন এক নয়। ফক্বীহদের মধ্যে এর আইনগত প্রয়োগ সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। এই পার্থক্য বজায় রেখেও একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। দাসের উপর অন্যায় প্রহার এমন কোনো বিষয় নয়, যাকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উপেক্ষা করেছেন।

একজন নেককার মালিকের কর্তব্য হচ্ছে নিজের অধীনস্থ ব্যক্তির প্রতি শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী আচরণ করা। এখানে ব্যক্তিগত ক্রোধ, অপমান কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারকে স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে গণ্য করা যায় না।

ঊনবিংশ অধ্যায়। ইসরায়েলের কারাগারে দীর্ঘদিন বন্দি ফিলিস্তিনিরা

এবার সমসাময়িক বিশ্বের একটি গুরুতর বাস্তবতার দিকে তাকানো যাক।

২০২৬ সালের এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি কারাগারে ১৯৮৬ সাল থেকে বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিরা রয়েছেন। ইব্রাহিম বায়াদসা এবং আহমদ আবু জাবেরের নাম দীর্ঘতম বন্দিত্বের তালিকায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া বহু ফিলিস্তিনি একুশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দি রয়েছেন।

ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’ত্সেলেম ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত “Living Hell” প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি বন্দিদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, খাদ্যবঞ্চনা এবং চিকিৎসাবঞ্চনার গুরুতর অভিযোগ ও সাক্ষ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটিতে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েলি আটককেন্দ্রে মারা যাওয়া অন্তত ৮৪ জন শনাক্ত ফিলিস্তিনির তথ্য রয়েছে।

এখন একটি কাল্পনিক তুলনা বিবেচনা করুন। একজন ব্যক্তি যদি দশকের পর দশক কারাগারে প্রহার, অপমান, খাদ্যবঞ্চনা এবং অনিরাপত্তার মধ্যে জীবনযাপন করেন, আর অন্যদিকে কোনো পরিবারের অধীনে তাঁর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, শারীরিক নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত থাকে, তাহলে বস্তুগত কল্যাণ ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষার বিচারে দ্বিতীয় জীবন অবশ্যই প্রথমটির চেয়ে উত্তম হতে পারে।

কিন্তু এই যুক্তি থেকে বলা যায় না যে, ইসরায়েলি কোনো পরিবারের দাস বানিয়ে দিলে ফিলিস্তিনি বন্দিরা বাস্তবেই ভালো থাকবেন। কারণ সেই পরিবার কী আচরণ করবে, তা অজানা। উপরন্তু মালিকানা নিজেই ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করবে।

এই তুলনার উদ্দেশ্য দাসত্ব সৃষ্টি করা নয়। বরং দেখানো, আধুনিক কারাব্যবস্থার অধীনে ব্যক্তির উপর এমন নির্যাতন সংঘটিত হতে পারে, যা শরীয়তের নির্ধারিত দাস-দাসীদের মানবিক অধিকারসংক্রান্ত বিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। আর ফিলিস্তিনি বন্দিদের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম দাবি হওয়া উচিত ন্যায়বিচার, অবৈধ আটক ও নির্যাতনের অবসান এবং প্রাপ্য মুক্তি।

এখানে বিশেষভাবে বিবেচনাযোগ্য, আধুনিক কারাব্যবস্থায় বন্দিদের জন্যও খাদ্য, চিকিৎসা, মানবিক আচরণ ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায়।

কোনো ব্যক্তি বন্দি হওয়ার কারণে কি তাঁর খাদ্য, চিকিৎসা, শারীরিক নিরাপত্তা এবং মানবিক সম্মানের প্রয়োজন বিলুপ্ত হয়ে যায়? অবশ্যই নয়। একইভাবে ঐতিহাসিক দাসত্বের অধীনে থাকা ব্যক্তির খাদ্য, পোশাক এবং মানবিক আচরণের প্রয়োজনও বিলুপ্ত হয়নি।

তবে ফিলিস্তিনি বন্দিদের অন্য কোনো ব্যক্তির দাসে পরিণত করাই উত্তম সমাধান, এমন সিদ্ধান্ত আসে না। তাঁদের ন্যায়বিচার, নির্যাতনের অবসান এবং প্রাপ্য মুক্তির দাবিই মূল বিষয়।

বিংশ অধ্যায়। যাকাত, দাসমুক্তি এবং বন্দিমুক্তির বিধান

মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ (إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ নিশ্চয়ই যাকাত নির্ধারিত হয়েছে দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত, যাকাত আদায়ের কর্মী, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তির খাত, ঋণগ্রস্ত, মহান আল্লাহ পাকের পথে এবং মুছাফিরের জন্য। এটি মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। আর মহান আল্লাহ পাক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। সূত্রঃ ছুরাহ আত-তাওবাহ, ৯:৬০।

এখানে (وَفِي الرِّقَابِ) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি এই আয়াতের তাফছীরে মুকাতাব দাসকে মুক্তির অর্থ দিয়ে সহায়তার মতটি প্রাধান্য দিয়েছেন। পাশাপাশি হযরত ইবনে আব্বাছ রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে যাকাতের অর্থে দাসমুক্তির অনুমোদনসংক্রান্ত বক্তব্যও উদ্ধৃত করেছেন।

অন্যদিকে হানাফি ইমাম কাছানী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উল্লেখ করেছেন, যাকাত আদায়ের জন্য মালিকানা হস্তান্তর জরুরি হওয়ায় সরাসরি দাস ক্রয় করে মুক্ত করাকে যাকাতের বিকল্প গণ্য করা যাবে না; কিন্তু মুকাতাব দাসকে অর্থ দিয়ে মুক্ত হতে সাহায্য করা যাবে।

অর্থাৎ, এখানে মাযহাবভেদে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিক্বহী মতপার্থক্য রয়েছে। তবে একটি মৌলিক বিষয় সর্বসম্মুখে পরিষ্কারঃ দাসমুক্তি ইছলামী শরীয়তে কল্যাণকর কাজ এবং এর জন্য অর্থ ব্যয়ের বিভিন্ন শরয়ী ব্যবস্থা রয়েছে।

মহান আল্লাহ পাক আরও ইরশাদ করেছেনঃ (فَكُّ رَقَبَةٍ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ দাসমুক্ত করা। সূত্রঃ ছুরাহ আল-বালাদ, ৯০:১৩।

এখানে দাসমুক্তিকে কল্যাণকর আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, ঐতিহাসিক শরীয়তে দাসত্বের বিধান থাকার পাশাপাশি দাসমুক্তির জন্যও কুরআনী নির্দেশ, উৎসাহ এবং আর্থিক ব্যবস্থা ছিল। এই দুটি বিষয় একত্রে আলোচনা করাই পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি।

বন্দিমুক্তির সরাসরি নববী নির্দেশ

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (أَطْعِمُوا الْجَائِعَ، وَعُودُوا الْمَرِيضَ، وَفُكُّوا الْعَانِيَ) অর্থাৎ, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাও এবং বন্দিকে মুক্ত করো।

সূত্রঃ ছ্বহীহ বুখারী, হাদিছ ৫৩৭৩।

এখানে الْعَانِيَ দ্বারা বন্দি বোঝানো হয়েছে। সুতরাং বন্দিমুক্তির জন্য বৈধ উপায়ে অর্থ ব্যয়, মুক্তিপণ প্রদান বা প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে নববী নির্দেশের ভিত্তি রয়েছে।

বর্তমান ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের সরাসরি ঐতিহাসিক দাস-দাসী হিসেবে গণ্য করে কেনাবেচা করা যায় না। তবে তাঁদের মুক্তির জন্য বৈধ আর্থিক সহায়তা ও প্রচেষ্টার শরয়ী ভিত্তি আলোচনা করা যায়। সেই ব্যয়কে যাকাত হিসেবে গণ্য করা যাবে কি না, তা পৃথক ফিক্বহী যাচাইয়ের বিষয়।

এই হাদিছ শরীফের মধ্যে ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া এবং বন্দিকে মুক্ত করার নির্দেশ একই সঙ্গে এসেছে। মানুষের উপর কর্তৃত্ব বা বন্দিত্বের অবস্থা থাকলেও তাঁর মানবিক প্রয়োজন উপেক্ষিত হওয়ার কথা নয়।

একবিংশ অধ্যায়। দাসীকে শিক্ষা, মুক্তি ও বিবাহের দ্বিগুণ ছ্বওয়াব

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (أَيُّمَا رَجُلٍ كَانَتْ لَهُ جَارِيَةٌ فَأَدَّبَهَا فَأَحْسَنَ تَأْدِيبَهَا، وَأَعْتَقَهَا وَتَزَوَّجَهَا، فَلَهُ أَجْرَانِ) অর্থাৎ, যে ব্যক্তির দাসী রয়েছে, (যদি) সে তাকে উত্তম আদব শিক্ষা দেয়, অতঃপর মুক্ত করে এবং তাকে বিবাহ করে, তার জন্য দ্বিগুণ ছ্বওয়াব রয়েছে। সূত্রঃ ছ্বহীহ বুখারী, হাদিছ ২৫৪৭।

এই হাদিছে মুক্তিদাতা ব্যক্তির দ্বিগুণ ছ্বওয়াবের কথা বলা হয়েছে। এখানে দাসীর শিক্ষা, মুক্তি এবং বিবাহের বিষয়কে সম্মানজনক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

এই হাদিছের মধ্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দাসীকে উত্তম আদব ও শিক্ষা প্রদান করা। দ্বিতীয়ত, তাঁকে মুক্ত করা। তৃতীয়ত, মুক্তির পর তাঁকে বিবাহ করা। এই কাজগুলোর সমন্বয়ের জন্য দ্বিগুণ ছ্বওয়াবের ঘোষণা এসেছে।

অর্থাৎ, দাসী হওয়ার কারণে তাঁর শিক্ষার প্রয়োজন বিলুপ্ত হয়নি। তিনি শিক্ষাগ্রহণ করতে পারেন, দ্বীনি ইল্ম অর্জন করতে পারেন, নেককার জীবনযাপন করতে পারেন এবং মুক্তি লাভ করতে পারেন।

হাদিছ শরীফে মুক্ত করে বিবাহ করার জন্য বিশেষ ছ্বওয়াবের কথা এসেছে। অতএব, ঐতিহাসিক দাসী-মালিক সম্পর্কের স্বীকৃতি যেমন ছিল, তেমনি দাসীকে মুক্ত করে বিবাহ করার বিশেষ মর্যাদাও ছিল। এই দুই বিধানকে পৃথকভাবে বুঝতে হবে।

এবং ছুরাহ আন-নূরের ৩৩ নম্বর আয়াতে মুকাতাবার ব্যবস্থা ও দাসীদের জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত করার নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এসব বিধান একত্র করলে পরিষ্কার হয়, দাসত্বের অধীনে থাকা ব্যক্তিকে কেবল শ্রমশক্তি হিসেবে দেখাই ইছলামী শরীয়তের পূর্ণ বক্তব্য নয়। তাঁর প্রতি কর্তব্য, নেককার জীবনের মর্যাদা এবং মুক্তির ব্যবস্থাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।

দ্বাবিংশ অধ্যায়। নেককার দাস-দাসীর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ

এবার দাস-দাসীদের আখিরাতের মর্যাদার বিষয় আলোচনা করা প্রয়োজন। ছ্বহীহ বুখারীর ২৫৪৭ নম্বর হাদিছ শরীফে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (وَأَيُّمَا عَبْدٍ أَدَّى حَقَّ اللَّهِ وَحَقَّ مَوَالِيهِ، فَلَهُ أَجْرَانِ) অর্থাৎ, যে দাস মহান আল্লাহ পাকের হক্ব এবং নিজের মালিকদের বৈধ হক্ব আদায় করেন, তাঁর জন্য দ্বিগুণ ছ্বওয়াব রয়েছে।

সূত্রঃ ছ্বহীহ বুখারী, হাদিছ ২৫৪৭।

এখানে মহান আল্লাহ পাকের হক্ব এবং মালিকের বৈধ হক্ব আদায়ের জন্য বিশেষ ছ্বওয়াবের কথা এসেছে। অর্থাৎ, একজন নেককার দাসের সামাজিক অধীনস্থতা তাঁর আখিরাতের মর্যাদা অর্জনের পথে অনিবার্য প্রতিবন্ধক নয়। বরং মহান আল্লাহ পাকের ইবাদত এবং নিজের উপর অর্পিত বৈধ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার মাধ্যমে তিনি বিশেষ ছ্বওয়াবের অধিকারী হতে পারেন।

হযরত আবু হুরায়্রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার পূর্বোক্ত বক্তব্যেও এই দ্বিগুণ ছ্বওয়াবের মর্যাদা বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে। একজন স্বাধীন মানুষ কেবল স্বাধীন হওয়ার কারণে সর্বাধিক নেককার হয়ে যান না। আবার একজন দাস সামাজিকভাবে অধীনস্থ হওয়ার কারণে তাঁর ঈমান, ইবাদত এবং তাক্বওয়ার মূল্য কমে যায় না।

মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেনঃ (إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাকের নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যিনি তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাক্বওয়ার অধিকারী। সূত্রঃ ছুরাহ আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩, আয়াতের উদ্ধৃত অংশ।

এই আয়াতে মহান আল্লাহ পাকের নিকট মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে তাক্বওয়ার কথা এসেছে। এখানে সামাজিক সম্পদ, স্বাধীনতার পরিচয় কিংবা পার্থিব ক্ষমতাকে মানুষের সর্বোচ্চ আখিরাতের মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড করা হয়নি। অতএব, একজন নেককার দাসী ঈমান, ইবাদত ও তাক্বওয়ার মাধ্যমে এমন মর্যাদা লাভ করতে পারেন, যা বহু স্বাধীন নারী-পুরুষ অর্জন করতে পারবেন না।

একই সঙ্গে স্বাধীন দরিদ্র মুমিন নারীর নেক আমল ও ধৈর্যের মর্যাদাও অস্বীকার করা যায় না। কোন ব্যক্তি আখিরাতে অধিক মর্যাদা লাভ করবেন, তার চূড়ান্ত বিচার মহান আল্লাহ পাকের।

মহান আল্লাহ পাক আরও ইরশাদ করেছেনঃ (مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ) অনুবাদ, ত্বরীক্বাহ আল-রাজঃ যে ব্যক্তি নেক আমল করে, পুরুষ হোক অথবা নারী, আর তিনি মুমিন হন, তাহলে অবশ্যই আমি তাঁকে উত্তম জীবন দান করব এবং অবশ্যই তাঁদের কৃত আমলসমূহের উত্তম প্রতিদান প্রদান করব। সূত্রঃ ছুরাহ আন-নাহল, ১৬:৯৭।

এই আয়াতে উত্তম জীবন এবং আখিরাতের প্রতিদানকে ঈমান ও নেক আমলের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। এখানে নারী-পুরুষ উভয়ের কথা রয়েছে। অতএব, একজন দাসী ঈমান ও নেক আমলের মাধ্যমে উত্তম জীবন এবং আখিরাতের প্রতিদানের অধিকারী হতে পারেন। কিন্তু এই প্রতিদান কেবল দাসী পরিচয়ের কারণে নয়, বরং ঈমান ও নেক আমলের কারণে।

এবার পুরো আলোচনাটি একটি বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বিবেচনা করা যাক। একজন স্বাধীন নারী দরিদ্র, গৃহহীন এবং কর্মহীন। তাঁকে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খাদ্য, আশ্রয়, কাজ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হয়। অন্যদিকে ঐতিহাসিক ইসলামী শরীয়তের অধীনে একজন নেককার মালিকের দাসী রয়েছেন, যাঁর খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, নিরাপত্তা এবং উপযুক্ত শ্রমের ব্যবস্থা রয়েছে। মালিক তাঁকে দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দিয়েছেন। তিনি নিয়মিত ইবাদত করতে পারেন এবং নিজের দায়িত্ব পালন করেন।

এই দুটি নির্দিষ্ট অবস্থার তুলনায় দ্বিতীয় নারীর জীবনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত সুবিধা ও স্থিতিশীলতা রয়েছে। তিনি অনাহারে থাকছেন না, আশ্রয়ের সন্ধানে পথে পথে ঘুরছেন না এবং নিজের দৈনন্দিন খাদ্যের জন্য প্রতিদিন নতুন কাজ অনুসন্ধানের প্রয়োজন হচ্ছে না। এমন পরিবেশে তাঁর ইবাদত ও দ্বীনি শিক্ষার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এবং তিনি যদি মহান আল্লাহ পাকের হক্ব ও নিজের উপর অর্পিত বৈধ দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে ছ্বহীহ হাদিছের আলোকে বিশেষ ছ্বওয়াবের অধিকারী হতে পারেন। এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাঁর দুনিয়ার কিছু মৌলিক সুবিধা এবং আখিরাতের বিশেষ ছ্বওয়াবের সুযোগ অস্বীকার করা যায় না।

তবে এখানে দ্বিতীয় নারীর সমস্ত অধিকার প্রথম নারীর চেয়ে বেশি, এমন সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রথম নারী স্বাধীন। তাঁর নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আইনগত অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে ঐতিহাসিক দাসীর সেই স্বাধীনতার উপর বিধিনিষেধ ছিল। অতএব, বস্তুগত কল্যাণ, ধর্মীয় মর্যাদা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা পৃথকভাবে বিচার করতে হবে।

এই তুলনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে, ঐতিহাসিক দাসত্বের অধীনে থাকা ব্যক্তি খাদ্য, পোশাক, দ্বীনি শিক্ষা, নেক আমল ও আখিরাতের মর্যাদা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বঞ্চিত হয়ে যান না। একজন নেককার মালিকের অধীনে তাঁর জীবন কোনো নির্যাতিত ও অভাবগ্রস্ত স্বাধীন ব্যক্তির জীবনের চেয়ে বাস্তব কল্যাণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উত্তম হতে পারে।

কিন্তু মানুষের খাদ্য ও আশ্রয়ের সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন করে দাসত্ব সৃষ্টি করা অপরিহার্য নয়। স্বাধীন অবস্থাতেও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। সুতরাং এখানে কল্যাণের প্রকৃত কারণ হচ্ছে, মানুষের প্রয়োজনীয় অধিকার ও সুরক্ষা বাস্তবে নিশ্চিত হওয়া। আর আখিরাতের মর্যাদার মূল ভিত্তি হচ্ছে ঈমান, তাক্বওয়া ও নেক আমল।

ত্রয়োবিংশ অধ্যায়। ইছলাম কি দাসপ্রথার স্রষ্টা?

ইছলামের দাসপ্রথা নিয়ে নাস্তিক সমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন হচ্ছে, ইছলাম কি দাসপ্রথা সৃষ্টি করেছিল? এর উত্তর হচ্ছে, না।

ইছলামের আবির্ভাবের বহু পূর্বে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, রোম এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দাসপ্রথা বিদ্যমান ছিল। এসব সভ্যতায় দাসত্বের কারণ, মালিকানার বিধান, দাসের শ্রম, সামাজিক অবস্থান এবং মুক্তির ব্যবস্থা একরকম ছিল না। কিন্তু একটি বিষয় ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত। ইছলাম দাসপ্রথার মূল স্রষ্টা নয়।

ইছলাম এমন একটি ঐতিহাসিক পরিবেশে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে দাসত্ব সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ ছিল। এই প্রেক্ষাপটে কুরআন শরীফ ও হাদিছ শরীফে দাস-দাসীদের খাদ্য, পোশাক, শ্রমের সীমা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বিবাহ, সন্তানের নছব, মুক্তি এবং কাফফারার বিধান এসেছে।

কিন্তু ইছলাম দাসপ্রথা সৃষ্টি করেনি, এই ঐতিহাসিক সত্য একাই দাসপ্রথার যাবতীয় নৈতিক প্রশ্নের নিষ্পত্তি করে না। পরবর্তী প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যমান দাসপ্রথার মধ্যে কোন বিধানগুলো অধিকার নির্ধারণ করেছে, কোন বিধানগুলো মুক্তির ব্যবস্থা দিয়েছে এবং কোন ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক মালিকানার কাঠামো বহাল রেখেছে।

যেখানে কুরআন শরীফে বৈধ মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে নির্দিষ্ট সহবাসের স্বীকৃতি রয়েছে, সেখানে সেই স্বীকৃতি অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। যেখানে দাসীর বিবাহ, খাদ্য, পোশাক এবং সম্ভ্রমের বিষয়ে বিধান রয়েছে, সেগুলোকেও গোপন করার সুযোগ নেই। একইভাবে যেখানে দাসীর ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর ঐতিহাসিক বিধিনিষেধ ছিল, সেগুলোকেও অস্বীকার করা যাবে না।

চতুর্বিংশ অধ্যায়। নাস্তিক সমালোচকদের প্রতি আমাদের প্রশ্ন

আপনারা ইছলামের দাসপ্রথার আলোচনা করবেন, অথচ দাসের খাদ্য ও পোশাকের অধিকার গোপন করবেন কেন?

দাসকে অতিরিক্ত শ্রম না দেওয়ার নববী নির্দেশ উল্লেখ করবেন না কেন?

অন্যায় প্রহারের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী বাদ দেবেন কেন?

দাসমুক্তির কুরআনী বিধান, যাকাতের খাত এবং নেককার দাসের দ্বিগুণ ছ্বওয়াবের আলোচনা এড়িয়ে যাবেন কেন?

হযরত আবু হুরায়্রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার দাস হিসেবে মৃত্যুবরণ করার আকাঙ্ক্ষার ছ্বহীহ বর্ণনা আলোচনায় আনবেন না কেন?

আর আধুনিক শ্রমব্যবস্থার কথা বলার সময় যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, জোরপূর্বক শ্রম, বেতন আটকে রাখা, গৃহহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কারানির্যাতনের বাস্তব উদাহরণগুলো অস্বীকার করবেন কোন যুক্তিতে?

এখানে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। আপনারা ছুরাহ আল-মুমিনূন এবং ছুরাহ আল-মায়ারিজের أَزْوَاجِهِمْ এবং (مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ) পরিভাষা দুটির আলোচনা করবেন, অথচ একই আয়াতে উভয় সম্পর্কের বৈধ সহবাসসংক্রান্ত স্বীকৃতির বিষয়টি উল্লেখ করবেন না কেন?

মহান আল্লাহ পাক যখন (فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ) ইরশাদ করেছেন, তখন ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি উনার প্রাচীন তাফছীর বিবেচনায় আনবেন না কেন?

দাসীকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার বিরুদ্ধে ছুরাহ আন-নূরের ৩৩ নম্বর আয়াতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই বিধানটি উল্লেখ করবেন না কেন?

যৌথ মালিকানাধীন দাসীর সঙ্গে দুই অংশীদারের কারও সহবাস বৈধ নয়, হানাফি ফিক্বহের এই বিধানটি আলোচনা করবেন না কেন?

দাসীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হলে মালিকের সহবাসের পূর্ববর্তী অধিকার বহাল থাকে না, সেই বিধান উল্লেখ করবেন না কেন?

দাসীর সন্তান জন্মগ্রহণের পর উম্মে ওয়ালাদের বিধান এবং সন্তানের স্বাধীনতার বিষয়টি আলোচনায় আনবেন না কেন?

ছুরাহ আন-নিছার ২৫ নম্বর আয়াতে দাসীর ঈমান, সম্ভ্রম, বিবাহ ও মোহরের বিধান রয়েছে। তাহলে দাসীকে শুধু যৌনতার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে উপস্থাপন করবেন কেন?

ছুরাহ আন-নূরের ৩২ নম্বর আয়াতে দাস-দাসীদের বিবাহের ব্যবস্থা করার নির্দেশ এসেছে। সেই আয়াতের গুরুত্ব অস্বীকার করবেন কেন?

ইমাম ইবনে কুদামাহ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি দাসীর নিজস্ব দাম্পত্য প্রয়োজনের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এই ফিক্বহী আলোচনাটিকে বিবেচনায় আনবেন না কেন?

আর আধুনিক স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠত্বের আলোচনা করতে গিয়ে স্বাধীন মানুষের খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপত্তা ও জীবিকার বাস্তব অনিশ্চয়তাকে উপেক্ষা করবেন কোন যুক্তিতে?

আমরা দাবি করছি না যে প্রত্যেক ঐতিহাসিক মালিক নেককার ছিলেন কিংবা প্রত্যেক স্বাধীন শ্রমিক নির্যাতিত।

আমরা আরও দাবি করছি না যে খাদ্য-পোশাকের নিশ্চয়তা ব্যক্তিস্বাধীনতার সমস্ত বিকল্প হতে পারে।

আমাদের দাবি স্পষ্ট।

ইছলামের দাসপ্রথাকে বিচার করতে হলে দাস-দাসীর উপর আরোপিত বিধিনিষেধ যেমন আলোচনা করতে হবে, তেমনি তাঁদের জন্য নির্ধারিত অধিকার, মর্যাদা, মালিকের দায়িত্ব, নেক আমলের ছ্বওয়াব এবং মুক্তির শরয়ী পথও আলোচনা করতে হবে।

আর আধুনিক স্বাধীনতাকে ইছলামের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করলে সেই স্বাধীনতার অধীনে সংঘটিত শোষণ ও নির্যাতনের বাস্তবতাকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে।

শুধু নামের স্বাধীনতা মানুষের পূর্ণ কল্যাণের নিশ্চয়তা নয়। ব্যক্তিস্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপত্তা ও সম্মান সবগুলোই বিচার্য।

ইছলামী শরীয়ত দাস-দাসীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অধিকার ও দায়িত্বের বিধান দিয়েছে। সেই বিধানগুলো গোপন রেখে ইসলামের বিরুদ্ধে একতরফা রায় দেওয়া পূর্ণাঙ্গ বিচার হতে পারে না।

একই সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও একটি দায়িত্ব রয়েছে। শরীয়তের যে বিধান যে অবস্থার জন্য স্বীকৃত, সেটিকে সেই অবস্থার মধ্যেই ব্যাখ্যা করতে হবে। স্ত্রী এবং দাসীকে একই সহবাসসংক্রান্ত বৈধতার আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু তাঁদের সমস্ত আইনগত অধিকার অভিন্ন করা হয়নি।

দাসীর খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও মুক্তির বিধান রয়েছে, কিন্তু সেই অধিকারগুলোর অস্তিত্ব তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতার ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাকে বিলুপ্ত করে না। আর ঐতিহাসিক সহবাসের স্বীকৃতি থাকলেও দাসীর স্বাধীন সম্মতির প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া যায় না।

পঞ্চবিংশ অধ্যায়। উপসংহার

এই দীর্ঘ আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইসলামী শরীয়তে ঐতিহাসিক দাস-দাসীদের অবস্থানকে কেবল মালিকানার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে বিচার না করা। এখানে খাদ্য, পোশাক, শ্রমের সীমা, অন্যায় প্রহারের বিরুদ্ধে সতর্কবাণী, বিবাহ, দাম্পত্য প্রয়োজন, সন্তানের নছব, উম্মে ওয়ালাদের বিধান, শিক্ষা, দাসমুক্তি এবং আখিরাতের ছ্বওয়াবের বিষয় রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলোর একটি হচ্ছে, মহান আল্লাহ পাক ছুরাহ আল-মুমিনূন ও ছুরাহ আল-মায়ারিজে স্ত্রী এবং বৈধ মালিকানাধীন দাসীকে একই সহবাসসংক্রান্ত বৈধতার বিধানে উল্লেখ করেছেন। এটি ঐতিহাসিক ইসলামী শরীয়তে দাসীর সঙ্গে নির্ধারিত শর্তের অধীনে সহবাসের স্বতন্ত্র স্বীকৃতি।

একই সঙ্গে স্ত্রী ও দাসীর সমস্ত অধিকার সমান ছিল, এমন দাবিও মূল আয়াত থেকে প্রতিষ্ঠিত নয়। ঐতিহাসিক দাসী-মালিক সম্পর্কের শর্ত, দাসীর বিবাহ, ইছতিবরা, যৌথ মালিকানার নিষেধাজ্ঞা এবং উম্মে ওয়ালাদের বিধান সবগুলো একত্রে বিবেচনা করতে হবে।

একজন নেককার মালিক শরীয়তের বিধান অনুসরণ করে নিজের অধীনস্থ দাসীর খাদ্য, পোশাক, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে সেই দাসীর বাস্তব জীবন কোনো অনাহারগ্রস্ত, আশ্রয়হীন কিংবা নির্যাতিত স্বাধীন নারীর জীবনের চেয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অধিক স্থিতিশীল হতে পারত। তাঁর দ্বীনি শিক্ষা ও ইবাদতের সুযোগও তৈরি হতে পারত। আর নেককার দাসের জন্য দ্বিগুণ ছ্বওয়াবের হাদিছ শরীফ আখিরাতের বিশেষ মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

কিন্তু এর দ্বারা দাসত্বকে স্বাধীনতার চেয়ে সর্বাবস্থায় উত্তম বলা যায় না। কারণ মানুষের কল্যাণের মধ্যে খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তার পাশাপাশি নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, বিবাহের অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং যৌন আত্মনিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ।

একজন স্বাধীন দরিদ্র নারীর খাদ্য ও আশ্রয়ের প্রয়োজন পূরণ করতে তাঁকে অন্য ব্যক্তির সম্পত্তিতে পরিণত করা অপরিহার্য নয়। দ্বীনদার মানুষ তাঁকে স্বাধীন অবস্থাতেই খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সম্মানজনক জীবনের সুযোগ প্রদান করতে পারেন।

অতএব, একজন নেককার মালিকের তত্ত্বাবধানে ঐতিহাসিক দাসীর নির্দিষ্ট কল্যাণ স্বীকার করা এবং আজকের দিনে মানুষের স্বাধীনতা বজায় রেখে তাঁর মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করার পক্ষে থাকা পরস্পরবিরোধী নয়।

আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, ইছলামী শরীয়তের দাস-দাসীসংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে সমালোচনা করতে হলে প্রাসঙ্গিক কুরআনী আয়াত, ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ, প্রাচীন তাফছীর এবং ফিক্বহের মূল আলোচনা পূর্ণাঙ্গভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। কেবল সহবাসের অনুমোদন উল্লেখ করে খাদ্য, পোশাক, সম্ভ্রম, শিক্ষা, সন্তান, মুক্তি এবং আখিরাতের মর্যাদার বিধানগুলো গোপন করা যথার্থ নয়। একইভাবে শুধু এসব অধিকার উল্লেখ করে ঐতিহাসিক দাসীর ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাও গোপন করা যাবে না।

পূর্ণাঙ্গ দলিলভিত্তিক আলোচনাই একতরফা সমালোচনার যথার্থ জবাব।

প্রাথমিক দলিল ও গবেষণা-উৎস

কুরআন শরীফের আয়াতসমূহঃ ছুরাহ আল-মুমিনূন ২৩:৫-৭, ছুরাহ আল-মায়ারিজ ৭০:২৯-৩১, ছুরাহ আন-নিছা ৪:৩, ৪:২৪-২৫, ছুরাহ আন-নূর ২৪:৩২-৩৩, ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:৬০, ছুরাহ আল-বালাদ ৯০:১৩, ছুরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১৩ এবং ছুরাহ আন-নাহল ১৬:৯৭।

ছ্বহীহ হাদিছ শরীফের সূত্রঃ ছ্বহীহ বুখারী ২২২৭, ২৫৪৫, ২৫৪৭, ২৫৪৮ ও ৫৩৭৩; ছ্বহীহ মুসলিম ১৬৫৭, ১৬৬২ ও ১৬৬৫; ছুনান আবু দাউদ ২১৫৭।

তাফছীর ও ফিক্বহের মূল গ্রন্থসমূহঃ ইমাম ত্ববারী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি, জামিউল বায়ান; ইমাম ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহী য়ালাইহি, তাফছীরুল কুরআনিল আজীম; ইমাম ছারাখছী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি, আল-মাবছূত্ব; ইমাম কাছানী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি, বাদায়িউছ ছ্বানায়ি; ইমাম ইবনে কুদামাহ রহমতুল্লাহী য়ালাইহি, আল-মুগ্বনী; ইমাম ইবনুল মুনযির রহমতুল্লাহী য়ালাইহি, আল-আওছাত্ব ফিছ ছুনান ওয়াল ইজমা ওয়াল ইখতিলাফ।

ইউরোপের গবেষণা-উৎসঃ ইউরোস্ট্যাট, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক অধিকারবিষয়ক সংস্থা এবং ইউরোপীয় লিঙ্গসমতা ইনস্টিটিউটের যৌথ লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা জরিপ, ২০২৪। https://ec.europa.eu/eurostat/en/web/products-statistical-reports/w/ks-01-24-013

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা-উৎসঃ কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২৪ সালের এম্পায়ার স্টেট জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশিত ২০২৫ সালের গবেষণা। https://www.ilr.cornell.edu/public-impact/report-summary/racial-discrimination-sexual-harassment-and-intimate-partner-violence-workplace

মার্কিন আবাসন ও নগর উন্নয়ন বিভাগঃ ২০২৫ সালের গৃহহীনতা গণনা, প্রতিবেদন প্রকাশ ২৯ মে ২০২৬। https://www.hud.gov/news/hud-no-26-037

সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের নির্যাতনসংক্রান্ত উৎসঃ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, কেনীয় গৃহকর্মীদের প্রতিবেদন, ২০২৫। https://www.amnesty.org/en/documents/mde23/9222/2025/en/

 

ফিলিপিনো গৃহকর্মীদের সাক্ষ্যসংক্রান্ত প্রতিবেদন, ২০২৬। https://www.amnesty.org/en/documents/mde23/1197/2026/en/

ফিলিস্তিনি বন্দিসংক্রান্ত উৎসঃ বি’ত্সেলেম, Living Hell, জানুয়ারি ২০২৬। https://www.btselem.org/publications/202601_living_hell

প্রাথমিক ইসলামী দলিলের অনলাইন সংযোগঃ

https://sunnah.com/bukhari:2227

https://sunnah.com/bukhari:2545

https://sunnah.com/bukhari:2547

https://sunnah.com/bukhari:2548

https://sunnah.com/bukhari:5373

https://sunnah.com/muslim:1657a

https://sunnah.com/muslim:1662

https://sunnah.com/abudawud:2157

তাফছীরের অনলাইন সংযোগঃ

https://quran.ksu.edu.sa/tafseer/tabary/sura23-aya6.html

https://quran.ksu.edu.sa/tafseer/tabary/sura4-aya3.html

https://quran.ksu.edu.sa/tafseer/tabary/sura4-aya24.html

https://quran.ksu.edu.sa/tafseer/tabary/sura4-aya25.html

https://quran.ksu.edu.sa/tafseer/tabary/sura9-aya60.html

https://quran.ksu.edu.sa/tafseer/tabary/sura24-aya32.html

https://quran.ksu.edu.sa/tafseer/tabary/sura24-aya33.html

ফিক্বহী আলোচনার অনলাইন সংযোগঃ

https://www.islamweb.net/ar/library/content/15/4524

https://www.islamweb.com/ar/library/content/18/10643


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: