
আজকাল দেখা যায় ভ্রান্ত ফেরকার মানুষ কাউকে কালিমা পড়িয়ে জাহেরি নামাজ শিখিয়ে নিজেকে বিশাল মুবাল্লিগ্ব ভাবা শুরু করে, এই আহাম্মক মুল্লাদের ধারণা নামাজ পড়লেই জান্নাত কনফার্ম, নামাজের চেয়ে বড় কোন কিছুই নাই দ্বীন ইছলামে। কিন্তু বিষয়টা কি এরকম? মোটেও না। বরং মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন উনার ঈবাদতের জন্যে, কিন্তু মুছলিম ব্যতীত কেউই এই মুহুর্তে উনার ঈবাদাতকারি বলে গন্য হচ্ছেনা। আর মুছলমানদের মধ্যে তাদের ঈবাদাতই কবুল হয় যারা মুত্তাকী পরহেজগার। যেমন কালামুল্লাহ শরীফে এসেছেনঃ (اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللّٰهُ مِنَ الۡمُتَّقِیۡنَ) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা কেবল মুত্তাকীদের (য়া’মলই) কবুল করেন। (ছুরাহ আল-মায়েদাহঃ ৫:২৭)।
অর্থাৎ যে য়া’মলে ইখলাছ থাকবেনা সেটা যত দামি য়া’মলই হোক না কেন, তা কর্পুরের মতো উড়ে যাবে। মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (وَ قَدِمۡنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوۡا مِنۡ عَمَلٍ فَجَعَلۡنٰهُ هَبَآءً مَّنۡثُوۡرًا) আর আমি তাদের সমস্ত য়া’মলের দিকে মনোনিবেশ করবো, যেসব (ইখলাছবিহিন) য়া’মল তারা (দুনিয়ায়) করে এসেছে, (অতঃপর) আমি সেগুলোকে ধূলিকণার মতো নিষ্ফল করে দেব। (ছুরাহ আল-ফুরক্বন ২৫/২৩) এই হলো য়া’মলের শেষ পরিণতি, যা রোবটের মতো করেও কোন ফায়দা পাওয়া যাবেনা ক্বিয়ামতের দিন। তবে এর চেয়েও ভয়ানক বিষয় হলো, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম একবার ছ্বহাবিদের বললেনঃ (لَنْ يُنَجِّي أَحَدًا مِنْكُمْ عَمَلٌ، قَالُوا: وَلاَ أَنْتَ يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: وَلاَ أَنَا، إِلاَّ أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللَّهُ مِنْهُ بِرَحْمَةٍ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَاغْدُوا وَرُوحُوا، وَشَيْءٌ مِنَ الدُّلْجَةِ، وَالْقَصْدَ الْقَصْدَ تَبْلُغُوا) তোমাদের কাউকে তার (নেক) য়া’মল (মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ক্রোধ থেকে) মুক্তি দিতে পারবে না, ছ্বহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম, আপনিও কি (শুধু য়া’মলের মাধ্যমে মুক্তি পাবেন না)?” তিনি বললেন, “না, আমিও না”, যদি না মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে উনার রহমতে আচ্ছাদিত করেন, তাই হক্বের পথে অবিচল থাকো এবং (যদি নফছকে পুরোপুরি পরিশুদ্ধ করতে না পারো) তবে যতদূর সম্ভব মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রহমত লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাও; সকালে, বিকালে এবং রাতের কিছু অংশেও (এ থেকে গ্বফিল হয়ো না); মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, তাহলেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। (বুখারি শরীফ ৬৪৬৩, মুছলিম শরীফ ২৮১৬, নাসাঈ শরীফ ১৮৩৯)
অতএব স্পষ্ট হয়ে গেলো যে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিকট যদি কেউ তার য়া’মল পৌছাতে চায় তাহলে তার উচিৎ আগে সে মুত্তাকী হবে। আর মুত্তাকী হলেই সে নাজাত পাবে, কেননা প্রত্যেক মুত্তাকিই পাক পবিত্র রূহ, নফস ও ক্বলবের অধিকারী। বর্নিত হাদিছ শরীফে স্পষ্ট বলাই আছে যে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিকট নেক য়া’মলের ও কোন দাম নাই যদি না বান্দার নফস পাক হয়, এবং মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমত তালাশের চেষ্টায় সে লিপ্ত থাকে, কেননা ক্বিয়ামতের দিন “তোমাদের কাউকে তার (নেক) য়া’মল (মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ক্রোধ থেকে) মুক্তি দিতে পারবে না” বলা হয়েছে উক্ত হাদিছ শরীফে, এটা বলে শুধু বাহ্যিক য়া’মলের দিকে ছোটা কে রিজেক্ট করে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে হাদিছ শরীফে এও এসেছে যেঃ (إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي) নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর বিজয়ী হয়েছেন। (বুখারি শরীফ ৭৪২২, ৭৪৫৩, ৭৫৫৪, মুছলিম শরীফ ২৭৫১, ইবনে মাজাহ ১৮৯)
অতএব শারীরিক যেকোন য়া’মলই হোক সেটা দিয়ে নাজাত পাওয়া অসম্ভব যদি না মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার রহমত আমাদের আতা করেন। এখন জানার বিষয় হলো রহমত লাভের সবচেয়ে সহজ ত্বরীকাহ কি? নামাজ নাকি জিকির? নামাজ কি জিকিরের চেয়েও বড় ঈবাদাত? ক্বুরআন ছুন্নাহ নামাজের মাকাম ও জিকিরের মাকাম সম্পর্কে কি বলেন?
বনী ইছরাঈলের এক আউলিয়া, ছূফী জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহু ছিলেন খ্রিষ্টান এক ছূফী ঈবাদাতগুযার মানুষ, তিনি একটি ঈবাদাতগাহ বানিয়েছিলেন যার নাম সোমায়াঃ একবার তিনি সেখানে নামাযরত ছিলেন। এমন সময় উনার মা উনার নিকট এসে উনাকে ডাকলে তিনি (মনে মনে) বললেন, “হে আমার রব! আমার মা ও আমার নামায (দুইটাই আমার নিকট গুরুত্বপূর্ণ; কোনটিকে প্রাধান্য দেই, আপনি মায়ের মনে সুমতি দিন)।’ সুতরাং তিনি নামাযে মশগুল থাকলেন। আর তার মা ফিরে গেলেন।
পরের দিন আবারো উনি নামাযে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় উনার মা এসে ডাক দিলেন, ‘জুরাইজ!’ তিনি (মনে মনে) বললেন, “হে আমার রব! আমার মা ও আমার নামায (এখন আমি কী করি?)’ সুতরাং তিনি নামাযে মশগুল থাকলেন। ঐদিনও উনার মা চলে গেলেন।
তৃতীত দিনে তিনি আবারো নামাযে ব্যস্ত থাকা অবস্থায় উনার মা এসে ডাক দিলেন, “জুরাইজ!’ তিনি (মনে মনে) বললেন, “হে আমার রব! আমার মা ও আমার নামায (এখন আমি কী করি?)’ সুতরাং তিনি নামাযে মশগুল থাকলেন।
তখন (তিন তিন টা দিন সাড়া না পেয়ে উনার মা উনাকে বদ দো’আ দিয়ে) বললেন, “হে আল্লাহ তায়ালা! বেশ্যাদের মুখ না দেখা পর্যন্ত আপনি ওকে মৃত্যু দিবেন না’। অতঃপর উনার মা চলে গেলেন।
এদিকে দিন দিন বনী ইস্রাঈলের মধ্যে জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহু ও উনার একনিষ্ট ঈবাদাত বন্দেগীর কথা চর্চা হতে লাগলো। ঐ সময় বনী ইস্রাঈলের মধ্যে এক অসম্ভব সুন্দরী বেশ্যা মহিলা ছিল, যার দৃষ্টান্তমূলক রূপ-সৌন্দর্য ছিল। (তাকে ইবলিশ জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে তখন উস্কে দিলে) সে বলল, “তোমরা চাইলে আমি ওকে ফিতনায় ফেলতে পারি”। যারা মুমিন ছিলেন, উনারা বললেন এটা তুমি কখনই করতে পারবেনা, সুতরাং সে তার জিদ কে বাস্তবে রূপ দিতে একদিন জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহুর ঈবাদাতগাহে চলে গেলো এবং নিজেকে উনার নিকট উন্মুক্ত করে পেশ করল। কিন্তু জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহু তার প্রতি ভ্রূক্ষেপও করলেন না। এতে সে চটে যায় এবং এক রাখালের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দেয় যে, জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহুর খানকায় আসা যাওয়া করতো। সে তার অযুদ সমর্পণ করলে রাখাল তার সাথে ব্যাবিচার করলো, এর ফলে ঐ বেশ্যা গর্ভবতী হয়ে গেল। অতঃপর সে যখন সন্তান ভূমিষ্ঠ করল, তখন লোকেরা জিজ্ঞাসা করতে লাগলো, এটা কিরূপে হলো? সে বলল, “এটি জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহুর সন্তান”। নাউযুবিল্লাহ!!!
অতঃপর লোকেরা সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু সন্তানসহ সেই নারীকে রাজ-দরবারে উপস্থিত করলো। রাজা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কার ঔরসে এ শিশুর জন্ম? সে বললো, জুরাইজের ঔরসে। রাজা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ঈবাদাতগাহবাসী জুরাইজ? সে বললো, হাঁ। রাজা নির্দেশ দিলেন, উপাসনালয়টি ভেঙ্গে দাও এবং তাকে আমার নিকট হাযির করো। সুতরাং লোকেরা জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহুর কাছে এসে তাকে আশ্রম হতে বেরিয়ে আসতে বললো। (তিনি বেরিয়ে এলে) তারা উনার আশ্রম ভেঙ্গে দিলো এবং উনাকে মারতে লাগলো এবং তার দুই হাত রশি দিয়ে তার ঘাড়ের সাথে বেঁধে তাকে নিয়ে রাজ-দরবারে চললো। পথে পতিতা নারীরা সামনে পড়লো, তিনি তাদের দেখে মৃদু হাসলেন। তারাও তাকে লোকজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখলো। রাজ দরবারে পৌঁছে জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহু আশ্চর্য হয়ে বললেন, “কী ব্যাপার রাজা”? (এ শাস্তি কিসের?) রাজা বললো, “আপনি এই বেশ্যার সাথে ব্যাবিচার করেছেন এবং তার ফলে সে সন্তান জন্ম দিয়েছে।’ তিনি বললেন, “সন্তানটি কোথায়?’ অতঃপর লোকেরা শিশুটিকে নিয়ে এলে তিনি বললেন, “আমাকে দুই রাকায়াত নামায পড়তে দাও।’ সুতরাং উনাকে সুযোগ দেওয়া হলো এবং তিনি নামায পড়ে শিশুটির কাছে এসে তার পেটে খোঁচা মেরে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওহে শিশু! তোমার পিতা কে?’ সে জবাব দিল, “অমুক রাখাল’।
এবার রাজা বলেন, আমরা কি আপনার খানকাহ সোনা দ্বারা নির্মাণ করে দিবো? তিনি বলেন, না। রাজা পুনর্বার বলেন, তবে রূপা দ্বারা? তিনি বলেন, না। রাজা বলেন, তবে আমরা সেটিকে কি করবো? তিনি বলেন, তা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিন, মাটির ঝুপড়ী যেমন ছিলো তেমন। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, তবে আপনার মৃদু হাসির কারণ কি? তিনি বলেন, মৃদু হাসির পেছনে একটা ঘটনা আছে যা আমার জানাই ছিল। আমার মায়ের অভিশাপই আমাকে এই পরিস্থিতিতে পতিত করেছে। অতঃপর তিনি সকল ঘটনা তাদেরকে অবহিত করেন। (বুখারী ১২০৬, মুসলিম ৬১৮৮, ২৫৫০বি)
এই হলো নামাজ এর মাক্বাম, জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহু এ বিপদের সম্মুখীন হয়েছিলেন মায়ের বদ দোয়ায়। উনার উপর ওয়াজিব ছিল নামাজ ভেঙ্গে মায়ের ডাকে সাড়া দেওয়া। নফল ঈবাদাত-বন্দেগী অপেক্ষা পিতামাতার হুকুম পালন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রছুলে পাক রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেনঃ (لَوْ كَانَ جُرَيْجٌ الرَّاهِبُ فَقِيهًا عَلَامًا لَعَلِمَ أَنْ إِجَابَتَهُ أَنْهَا أَفْضَلُ مِنْ عِبَادَةِ رَبِّهِ) ছূফী জুরায়জ যদি আলেম ও ফকীহ হতেন, তবে তিনি জানতেন যে, তার মায়ের ডাকে সাড়া দেওয়াই তার রবের ইবাদতের চেয়ে উত্তম ছিল ঐসময়।
পিতামাতার আদেশ শরীআতবিরোধী না হলে তা মানা ফরয। জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহুর দ্বারা এ ব্যাপারে ত্রুটি হয়ে গেছে। উনার এ ত্রুটি উনার মা ক্ষমা করে দিলে হয়তো কিছুই হত না, মহান আল্লাহ তাআলাও ক্ষমা করে দিতেন। মায়ের পক্ষে সেটাই ছিল উত্তম। সন্তানকে বদ দোআ দিতে নেই। মায়ের বদ দোআ অমোঘ। তা লেগেই যায়। সুতরাং জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহুর প্রতি মায়ের বদ দোআ লেগে গেল এবং উনার ছূফী জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত নাপাক একটি ঘটনাটি ঘটে গেল।
এবার আমরা আল কুরআনে কি পাওয়া যায় তা দেখবো। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَجِیۡبُوۡا لِلّٰهِ وَ لِلرَّسُوۡلِ اِذَا دَعَاكُمۡ لِمَا یُحۡیِیۡكُمۡ ۚ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ یَحُوۡلُ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ وَ قَلۡبِهٖ وَ اَنَّهٗۤ اِلَیۡهِ تُحۡشَرُوۡنَ) হে ঈমানদারগণ! তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা এবং রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যা তোমাদের (ক্বলবকে) জীবন্ত করে। আর জেনে রাখো, মহান আল্লাহ তা’য়ালা মানুষ ও তার ক্বলবের মাঝখানে অন্তরায় হয়ে যান। আর নিশ্চয় উনার নিকটই তোমাদেরকে সমবেত করা হবে। (ছুরাহ আল-আনফাল ৮/২৪)
উক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে পাওয়া যায়ঃ (يُحَدِّثُ عَنْ أَبِي سَعِيدِ بْنِ الْمُعَلَّى، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم مَرَّ بِهِ وَهُوَ يُصَلِّي فَدَعَاهُ قَالَ فَصَلَّيْتُ ثُمَّ أَتَيْتُهُ قَالَ فَقَالَ " مَا مَنَعَكَ أَنْ تُجِيبَنِي " . قَالَ كُنْتُ أُصَلِّي . قَالَ " أَلَمْ يَقُلِ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ { يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ } لأُعَلِّمَنَّكَ أَعْظَمَ سُورَةٍ مِنَ الْقُرْآنِ أَوْ فِي الْقُرْآنِ " . شَكَّ خَالِدٌ " قَبْلَ أَنْ أَخْرُجَ مِنَ الْمَسْجِدِ " . قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَوْلَكَ . قَالَ " { الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ } وَهِيَ السَّبْعُ الْمَثَانِي الَّتِي أُوتِيتُ وَالْقُرْآنُ الْعَظِيمُ) রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম একবার আবু সাঈদ ইবনে মু'আল্লা রদ্বিআল্লাহু আনহুর পাশ দিয়ে গমন করছিলেন, যখন তিনি নামায আদায় করছিলেন, তখন তিনি উনাকে ডাকলেন, কিন্তু আবু সাঈদ ইবনে মু'আল্লা রদ্বিআল্লাহু আনহু নামায শেষ করে রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-এর কাছে এলেন, তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “তোমাকে কিসে বাধা দিলো যে তুমি সঙ্গে সঙ্গে আমার ডাকে সাড়া দিলে না?”, তিনি বললেন, “আমি তো নামাযে ছিলাম, তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “মহান আল্লাহ তা’য়ালা কি বলেননিঃ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা এবং রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যা তোমাদের (ক্বলবকে) জীবন্ত করে?”, এরপর রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “আমি তোমাকে কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ ছুরাহ শেখাবো, এরপর যখন তিনি মসজিদ থেকে বের হতে চাইলেন, আবু সাঈদ ইবনে মু'আল্লা রদ্বিআল্লাহু আনহু উনাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “তা হলো ‘আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল য়া’লামীন’ এটি সেই সাতটি পুনরাবৃত্ত আয়াত, যা আমাকে বিশেষভাবে দান করা হয়েছে এবং এটি হচ্ছে ‘আল-ক্বুরআনুল আজীম’ অর্থাৎ মহিমান্বিত ক্বুরআনের মূল অংশ। (আবু দাউদ শরীফ ১৪৫৮)
একিই আয়াতের তাফছিরে হুবুহু আরেকটি হাদিছ পাওয়া যায় অন্য একজন ছ্বহাবির ব্যপারেঃ (عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ عَلَى أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " يَا أُبَىُّ " . وَهُوَ يُصَلِّي فَالْتَفَتَ أُبَىٌّ وَلَمْ يُجِبْهُ وَصَلَّى أُبَىٌّ فَخَفَّفَ ثُمَّ انْصَرَفَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ السَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " وَعَلَيْكَ السَّلاَمُ مَا مَنَعَكَ يَا أُبَىُّ أَنْ تُجِيبَنِي إِذْ دَعَوْتُكَ " . فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي كُنْتُ فِي الصَّلاَةِ . قَالَ " أَفَلَمْ تَجِدْ فِيمَا أَوْحَى اللَّهُ إِلَىَّ أَنِ (استَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ ) " . قَالَ بَلَى وَلاَ أَعُودُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ . قَالَ " تُحِبُّ أَنْ أُعَلِّمَكَ سُورَةً لَمْ يَنْزِلْ فِي التَّوْرَاةِ وَلاَ فِي الإِنْجِيلِ وَلاَ فِي الزَّبُورِ وَلاَ فِي الْفُرْقَانِ مِثْلُهَا " . قَالَ نَعَمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ . قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " كَيْفَ تَقْرَأُ فِي الصَّلاَةِ " . قَالَ فَقَرَأَ أُمَّ الْقُرْآنِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا أُنْزِلَتْ فِي التَّوْرَاةِ وَلاَ فِي الإِنْجِيلِ وَلاَ فِي الزَّبُورِ وَلاَ فِي الْفُرْقَانِ مِثْلُهَا وَإِنَّهَا سَبْعٌ مِنَ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنُ الْعَظِيمُ الَّذِي أُعْطِيتُهُ " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ . وَفِي الْبَابِ عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ وَفِيهِ عَنْ أَبِي سَعِيدِ بْنِ الْمُعَلَّى) রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রদ্বিআল্লাহু আনহু)-এর কাছে আসলেন, তখন তিনি নামায আদায় করছিলেন; রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে ডাকলেন, তিনি ফিরে তাকালেও (ডাকের) জবাব দিলেন না; অতঃপর তিনি দ্রুত নামায শেষ করে রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, আছ-ছালামু য়ালাইকুম ইয়া রছুলাল্লাহ। রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “ওয়া য়ালাইকুমুছ ছালাম, হে উবাই! আমি যখন তোমাকে ডাকলাম, তখন কি কারণে তুমি সাড়া দিলে না?” তিনি বললেন, “ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম, আমি তখন নামাযে ছিলাম”। তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “তুমি কি সেই আয়াত পড়োনি, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা এবং রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যা তোমাদের (ক্বলবকে) জীবন্ত করে?" তখন হযরত উবাই (রদ্বিআল্লাহু আনহু) বললেন, “অবশ্যই, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! (আমি তা পড়েছি) এবং ইনশাআল্লাহ, আর এমনটি করবো না”।
এরপর রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “তুমি কি চাও, আমি তোমাকে এমন একটি ছুরাহ শিখিয়ে দেবো, যা তাওরাত, ইনজিল, যবূর কিংবা মহিমান্বিত ফুরক্বনেও এর অনুরূপ নেই?” তিনি বললেন, “জি হ্যাঁ, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম”। তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “নামাযে তুমি কী পড়ো?” তখন হযরত উবাই (রদ্বিআল্লাহু আনহু) “ছুরাহ আল-ফাতিহা” পাঠ করলেন, তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! এই ছুরার মতো কিছুই তাওরাত, ইনজিল, যবূর বা মহিমান্বিত ফুরক্বনে নাযিল হয়নি; এটি ‘ছাবউল মছানি’ (সাত পুনরাবৃত্ত আয়াত) এবং এটি ‘আল-ক্বুরআনুল আজিম’ (মহান ক্বুরআন), যা আমাকে দান করা হয়েছে”। (তিরমিযি শরীফ ২৮৭৫) (তাফসীর ইবন কাসীর, তাফসীর আত-তাবারী, তাফসীর আল-কুরতুবী, তাফসীর আল-বাগভী, তাফসীর আস-সা’দী)
উক্ত হাদিছ দুটিই ছ্বহিহ ছ্বনদ ও মতনে বর্নিত হয়েছে, তবে আবু ছাঈদ ইবনে মুয়াল্লা রদ্বিআল্লাহু আনহুর যায়গায় অনেকে আবু ছাঈদ খুদরি রদ্বিআল্লাহু আনহুর কথা বলেছেন। হাদীস বিশারদ হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহী উনার মতে, এই হাদীসটি মূলত আবু ছাঈদ ইবনু মু’আল্লা রদ্বিআল্লাহু আনহুর থেকে এসেছে। তিনি ফাতহুল বারী ও তাহযীবুত তাহযীব-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এটি আবু ছাঈদ ইবনু মু’আল্লা রদ্বিআল্লাহু আনহুর ঘটনা। যদিও কিছু মুহাদ্দিস আবু ছাঈদ আল-খুদরী রদ্বিআল্লাহু আনহুর নামে ভুল করে সংযুক্ত করেছেন। কিন্তু আমাদের নাম নিয়ে কোন কাজ নাই, আমাদের কাজ হলো রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কি বলেছেন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। কারণ নামের কারণে মুল সাবজেক্ট পরিবর্তন হচ্ছেনা।
যাইহোক উক্ত আয়াত শরীফে যে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা এবং রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যা তোমাদের (ক্বলবকে) জীবন্ত করে? এর বিপরীতে দুই সাহাবীর ঘটনা পাওয়া গেলো যেখানে তারা নামাজে রত ছিলেন, অথচ নামাজ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ঈবাদাত, এটা জেনেও রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তাদের নামাজ পড়া অবস্থায় ডাকলেন, আজকে যদি আমরা রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার জামানায় থাকতাম তাহলে শিউর কথিত মুফতি মুহাদ্দিস আর মুল্লারা এই মন্তব্য করতো যে নবী তো গাইরুল্লাহ, নামাজ আল্লাজীর ঈবাদাত, আগে নামাজ পরে নবী, নাউযুবিল্লাহ। অথচ আল কুরআনের একটি আয়াত আমি পেয়েছি যেখানে মহান আল্লাহ পাক এক নবীর দিকে ফেরেশতা প্রেরণ করেন যখন তিনি নামাজে রত ছিলেন, ফেরেশতারা চাইলে ঐ সংবাদ নামাজ শেষ হওয়ার পরেও দিতে পারতেন, কিন্তু তারা উপস্থিত হয়েই ডাক দিলেন, নামাজের কোন লেহাজ করলেন না, যা খোদ মহান আল্লাহ পাক বলতেছেন এইভাবেঃ (فَنَادَتۡهُ الۡمَلٰٓئِكَۃُ وَ هُوَ قَآئِمٌ یُّصَلِّیۡ فِی الۡمِحۡرَابِ) অতঃপর ফেরেশতারা উনাকে ডাক দিলেন (এমন এক সময়ে) যখন তিনি মিহরাবে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছিলেন। তো তিনি কি নামাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন? নামাজে আছি পরে জবাব দেবো, নামাজের চেয়ে কি বড় ঈবাদাত আছে? ফেরেশতারা কি আমাকে দেখেনা আমি নামাজ পড়ি এরূপ কোন চিন্তা করছিলেন? না, তিনি ফরজ নামাজ ছেড়ে জবাব দিলেন পরের আয়াতেই এসেছেঃ (قَالَ رَبِّ) অর্থাৎ তিনি সাথে সাথে জবাবে বললেন হে আমার রব। (ছুরাহ আলে ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩/৩৯-৪০) এই শব্দটি প্রমাণ করে যে, হযরত জাকারিয়া য়ালাইহিছ ছালাম ফেরেশতাদের কথার জবাব দিয়েছেন। আয়াতে ফেরেশতাদের ডাকের উত্তর দিয়েছেন নামায থামিয়ে। নবী যাকারিয়া য়ালাইহিছ ছালামের ঘটনার সাথে আবু ছাঈদ ইবনে মু'আল্লা ও উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিআল্লাহু আনহুমাদের ঘটনাগুলোর সাথে মিল পাওয়া যায়, যেখানে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাদের ডাক দিলে তারা প্রথমে নামায চালিয়ে যান, কিন্তু পরে বুঝতে পারেন যে, মহান আল্লাহ পাক নিজেই বলতেছেন ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা এবং রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যা তোমাদের (ক্বলবকে) জীবন্ত করে?
মহান আল্লাহ তা’য়ালার নাজিলকৃত এই আয়াত থেকে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে?
১) এই আয়াতে “যখন তিনি তোমাদের এমন বিষয়ের দিকে ডাকেন, যা তোমাদের (ক্বলবকে) জীবন্ত করে” এই অংশে মূল বিষয় কী?
➡ মূল বিষয় হলো “ক্বলবকে জীবন্ত করা”।
➡ সরাসরি মহান আল্লাহ তা’য়ালা এবং রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-এর ডাক গুরুত্বপূর্ণ, তবে মূল উদ্দেশ্য হলো সেই বিষয় যা মানুষের ক্বলবকে জীবন্ত করে।
➡ যে ডাক ক্বলবকে জীবন্ত করবে, সেটিই মূল, ডাকদাতা হিসেবে শুধু মহান আল্লাহ তায়ালা ও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম খাছ নন।
২) বর্তমানে যখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম দুনিয়াতে নেই, তাহলে এই আয়াতের হুকুম কি বন্ধ হয়ে গেছে?
➡ না, কখনোই না!
➡ এই আয়াত চিরন্তন। কারণ, মূল বিষয় হলো ক্বলবকে জীবন্ত করা এবং এই জীবন্ত করার প্রক্রিয়া ক্বিয়ামত পর্যন্ত চলবে।
➡ যারা এই দায়িত্ব বহন করবেন, তারা এই আয়াত শরীফের হুকুমের আওতায় থাকবেন।
তাহলে বাস্তব প্রয়োগ কী?
✅ কেউ যদি এমন বিষয়ের দিকে ডাক দেন যা ক্বলবকে জীবন্ত করবে, তাহলে সেটাই এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন হবে।
উদাহরণঃ একজন মুর্শিদ যদি কাউকে তাযকিয়া, তাসফিয়া ও হিদায়াতের দিকে ডাকেন, যা তার ক্বলবকে জীবন্ত করবে, তাহলে সেটিও এই আয়াতের আওতায় পড়বে, এবং সেই ডাকে সাড়া দেবে নামাজ ছেড়ে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (يُحْيِيكُمْ) “যা তোমাদের জীবন্ত করবে”। এখানে (يُحْيِيكُمْ) শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। এই শব্দ শুধু বাহ্যিক জীবন নয়, বরং আত্মিক ও রূহানী জীবনকেও বুঝায়। তাই যে ডাক মানুষের ক্বলবকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নূর দিয়ে জীবন্ত করবেন, সেটিই এই আয়াতের আসল উদ্দেশ্য।
তাহলে কি সাধারণ কোনো মানুষের ডাকও কি এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে?
না, শুধুমাত্র সেই ডাক অন্তর্ভুক্ত হবে যা মানুষের ক্বলবকে হিদায়াতের নূর দ্বারা জীবন্ত করবেন। যদি কোনো ডাক দুনিয়াবি বিষয় বা সাধারণ দ্বিনি বিষয়েও হয়, তাহলে তা এই আয়াতের উদ্দেশ্য নয়। শুধুমাত্র সেই ডাকে সাড়া দেওয়া গ্রহণযোগ্য যা ক্বলবকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দিকে ফিরিয়ে দেয় এবং আধ্যাত্মিক জীবন প্রদান করেন।
✔ এই আয়াত কেবল নবী করীম ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যুগে সীমাবদ্ধ নয়।
✔ ক্বিয়ামত পর্যন্ত যারা মানুষকে ক্বলবের হিদায়াত ও আত্মিক জীবনের দিকে ডাকবেন, তাদের ডাকও এই আয়াত শরীফের অন্তর্ভুক্ত।
✔ এই আয়াতের মূল বিষয় “ক্বলবকে জীবন্ত করা” সুতরাং, যে ডাক এটি বাস্তবায়ন করবেন, সেটায় সাড়া দিতে হবে।
✔ এমন কেউ যদি ডাক দেয় যার মাধ্যমে মানুষের ক্বলব জীবন্ত হয়, তাহলে তিনি এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন। আর নফছ কে হত্যা করে ক্বলব কে জিন্দা করার একমাত্র এভিলিটি সকল জামানায় শুধু মুর্শিদের থাকবে।
তো এতক্ষন যে ক্বুরআন হাদিছ আমরা ঘাটালাম, এর ফলাফল কি? ফলাফল হলো জুরাইজ রদ্বিআল্লাহু আনহু নামাজ অবস্থায় মায়ের ডাকে সাড়া দিলেন না, ফলে মায়ের অভিশাপ লেগে যায়, নামাজের চেয়ে মায়ের ডাকে জবাব দেওয়াটা মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট ছিলো বড় ঈবাদাত, অতঃপর দুই ছ্বাহাবির খোদ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ডাকে নামাজ ছেড়ে জবাব না দেওয়ায় রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তাদের কুরআনের আয়াত শুনিয়ে দেন যে তোমাদের যদি ডাকা হয় এমন কিছুর দিকে যা তোমাদের ক্বলব কে জীবন্ত করে, তাহলে নামাজ ছেড়ে সেটায় তাৎক্ষনিক সাড়া দাও, আর যাকারিয়া য়ালাইহিছ ছালাম নবী ছিলেন, উনি জানতেন যে মহান আল্লাহ পাক উনার ডাকের বিপরীতে উনার নামাজের কোন ভ্যলুই নাই।
মনে আছে আমরা প্রথমেই জেনেছিলাম, নেক য়া’মলও জান্নাতে নিতে পারবেনা, না রক্ষা করতে পারবে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ক্রোধ থেকে, বরং রক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অছিলা হলেন মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমত। এখন নামায দ্বারা রহমত লাভের ব্যপারে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বাণী হচ্ছেনঃ (وَ اَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتُوا الزَّكٰوۃَ وَ اَطِیۡعُوا الرَّسُوۡلَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ) আর তোমরা নামাজ কায়েম কর, জাকাত দাও এবং রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার আনুগত্য কর, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হতে পার। (ছুরাহ আন-নূর ২৪:৫৬) এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নামাজ মহান আল্লাহ তা’য়ালার রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম, কিন্তু কথা হলো কোন নামাজ? নামাজ পড়লেই কি রহমত লাভ করা যাবে? মহান আল্লাহ পাক তো এই নামাজিদের ব্যপারেই বলতেছেনঃ (اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰهَ وَ هُوَ خَادِعُهُمۡ ۚ وَ اِذَا قَامُوۡۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوۡا كُسَالٰی ۙ یُرَآءُوۡنَ النَّاسَ وَ لَا یَذۡكُرُوۡنَ اللّٰهَ اِلَّا قَلِیۡلًا) নিশ্চয়ই মুনাফিকরা মহান আল্লাহ তায়ালাকে ধোঁকা দিতে চায়, অথচ তিনি তাদেরকে (তাদেরই) ধোঁকায় ফেলে রাখেন। আর যখন তারা নামাজের জন্য দাঁড়ায়, তখন খুব অলসভাবেই দাঁড়ায়; (মূলত) তারা লোক দেখানোর জন্যেই নামাজ পড়ে আর তারা খুব অল্প পরিমানে মহান আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করে থাকে। (ছুরাহ আন-নিসা ৪:১৪২) দেখা যাচ্ছে, ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েও তার কোন উন্নতি হয়নি, বরং সে ঐসকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে যাদের আল্লাহ পাক ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার পরেও মুনাফিক বলতেছেন “ছুরাহ আন-নিছার ৪:১৪২” আয়াতে, সাথে (فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ) অতএব দুর্ভোগ সেইসব নামাযীদের জন্য, যারা তাদের নামাযে গ্বফিল (অর্থাৎ নামাজে তাদের ক্বলব মওজুদ থাকেনা)। (ছুরাহ আল-মাউন ১০৭/৪-৭) উক্ত আয়াতের ব্যখায় একটি মশহুর হাদিছের ব্যখ্যা পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছেঃ (لَا صَلَاةَ إِلَّا مَعَ حُضُورِ الْقَلْبِ) সেই নামায নামাযই নয় যেখানে ক্বলবের উপস্থিতি থাকেনা। আর হাদিছ শরীফেও এর মূল বক্তব্য পাওয়া যায়, যেমন হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন “আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ (عَنْ عَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " إِنَّ الرَّجُلَ لَيَنْصَرِفُ وَمَا كُتِبَ لَهُ إِلاَّ عُشْرُ صَلاَتِهِ تُسْعُهَا ثُمُنُهَا سُبُعُهَا سُدُسُهَا خُمُسُهَا رُبُعُهَا ثُلُثُهَا نِصْفُهَا) নিশ্চয়ই একজন ব্যক্তি নামায থেকে ফিরে আসে, অথচ তার জন্য (ছ্বওয়াব হিসেবে) কেবল দশমাংশ, নবমাংশ, অষ্টমাংশ, সপ্তমাংশ, ষষ্ঠাংশ, পঞ্চমাংশ, চতুর্থাংশ, তৃতীয়াংশ, বা অর্ধেক অংশই লেখা হয়। (ছুনান আবু দাউদ ৭৯৬, মুসনাদে আহমদ ১৮৪২৩) উক্ত হাদিছ শরীফ প্রমাণ করে কেবল জাহেরি নামাজ, ইমামের পিছনে দাঁড়িয়ে রুকু সেজদা করা মোটেও মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা নামাজ হলেন নূর, হাদিছ শরীফে স্পষ্ট বলা হয়েছেঃ (الصَّلَاةُ نُورٌ) নামাজ হচ্ছেন নূর। (মুছলিম শরীফঃ ২২৩) এখন যদি নূর হাছিল করা না যায় তাহলে নফল তো দূরের বিষয় ফরজ নামাজ পড়েও মুনাফিক গ্বফিলদের কাতারেই স্থান হবে। ভাবা যায়? যেখানে খুশু খুজু ওয়ালা নামাজি ছ্বহাবিয়ে ইসা য়ালাইহিছ ছালাম, ছ্বহাবিয়ে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আবু ছাঈদ ইবনে মু’আল্লা ও উবাই ইবনে কাব রদ্বিআল্লাহু আনহুমাদের নামাজ রিজেক্ট হয়ে যাচ্ছে, সেখানে নামাজ যদি তাদের পিছনে পড়া হয় যারা নার ওয়ালা? যাদের ব্যপারে মহান আল্লাহ পাক উনার স্পষ্ট বাণী হলেনঃ (اِنَّ الَّذِیۡنَ یَكۡتُمُوۡنَ مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ مِنَ الۡكِتٰبِ وَ یَشۡتَرُوۡنَ بِهٖ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ۙ اُولٰٓئِكَ مَا یَاۡكُلُوۡنَ فِیۡ بُطُوۡنِهِمۡ اِلَّا النَّارَ وَ لَا یُكَلِّمُهُمُ اللّٰهُ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَ لَا یُزَكِّیۡهِمۡ ۚۖ وَ لَهُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ) নিশ্চয়ই যারা মহান আল্লাহ তা’য়ালার নাযিল করা কিতাবের অংশবিশেষ গোপন করে এবং এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে, তারাই হচ্ছে সেসব লোক যারা নার দিয়ে নিজেদের পেট ভর্তি করে। ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাদের পবিত্রও করবেন না, এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (ছুরাহ বাক্বারাহ ২/১৭৪) আর ছুরাহ আলে ইমরানের ৩/৭৭ নং আয়াতে এক ধাপ বাড়িয়ে বলেনঃ (وَ لَا یَنۡظُرُ اِلَیۡهِمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَ لَا یُزَكِّیۡهِمۡ ۪ وَ لَهُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ) আর মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং ক্বিয়ামতের দিন তাদের দিকে (ফিরেও) তাকাবেন না, আর তাদেরকে পাক-পবিত্রও করবেন না এবং তাদের জন্যই রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।
এখন যার ইমাম হওয়ার মূল উদ্যশ্যই হলো টাকা উপার্জন তারা ক্বুরআন পাঠের বিনিময়ে কি করতেছে? পেটে নার ঢুকাচ্ছে। রেগুলার ইমামের আলাপ বাদ দিলাম, যত হাফিজ তারাউয়্যি পড়ায় আমাদের দেশে, তাদের সারা বছরের মূল টার্গেটই হলো রমজান শরীফের মাসের ইনকাম। আমি একজন হাফেজও চিনিনা যার মূল টার্গেট থাকে নূর বর্ষন, আপনারা চিনলে চিনতে পারেন। এখন এইসব ইমামের হাল কি হবে মহান আল্লাহ পাক বলেছেন, মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং ক্বিয়ামতের দিন তাদের দিকে (ফিরেও) তাকাবেন না, আর তাদেরকে পাক-পবিত্রও করবেন না এবং তাদের জন্যই রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। এখন যে ইমাম এর ক্বিয়ামতের দিনের ব্যপারে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলতেছেন (وَ لَا یُزَكِّیۡهِمۡ) তিনি তাদের নফস কে, ক্বলব কে পরিশুদ্ধ করবেন না তার পেছনে নামাজ পড়ে আপনি আউলিয়া নাকি দেউলিয়া হবেন সেটা কোন বিশাল গবেষণার বিষয় নয়, ক্বলবে সামান্য নাড়াচাড়া করলেই বুঝা যাবে। এখন ফিকিরের বিষয় হলো ঐসকল য়া’লীমের পেছনে নামাজ পড়ে তুমি কি নূর কামাচ্ছো যে নিজে নার কামাচ্ছে? আর নামাজের মূল উদ্যশ্যে কি? মহান আল্লাহ পাক কি বলেন? তিনি বলেনঃ (وَأَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ لِذِكْرِى) আর আমার স্বরনের উদ্যেশ্যেই তোমরা নামায কায়েম করো। (ছুরাহ ত্বোহা ২০:১৪) অর্থাৎ নামাজ পড়ার মূল উদ্যেশ্যই মহান আল্লাহ পাক উনার জিকিরের জন্যে বলতেছেন, সেখানে কেউ যদি অতি বুঝদার হয়, যে রোবটের মতো নার ওয়ালা ইমামের পিছে ক্বুরআন তিলাওয়াত শোনে বিশাল কামিয়াবি হাছিল করে ফেলতেছে মনে করে তাহলে তো কিছুই বলার নাই, খোদ মহান আল্লাহ পাক-ই বলতেছেনঃ (قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ) কামিয়াব হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে তার (নফছের, ক্বলবের) তাজকিয়া করল এবং (প্রথমত) তার রব তা’য়ালা উনার নামের জিকির করল, তারপর সে নামাজ পড়লো। (ছুরাহ আল-য়া’লা ৮৭/১৪-১৫) এখানে জিকিরকে নামাজের আগেই রেখেছেন মহান আল্লাহ তায়ালা, যা প্রমাণ করে আত্মশুদ্ধির মূলই হচ্ছেন জিকির, এরপর হলেন নামাজ। হযরত আবূ মূছা আশআরী রদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لاَ يَذْكُرُ مَثَلُ الْحَىِّ وَالْمَيِّتِ) যে ব্যক্তি তার রব তায়ালা উনার জিকির করে আর যে করে না তাদের পার্থক্য হলো জীবিত আর মৃত ব্যক্তির মতো। (বুখারি শরিফ ৬৪০৭, মুছলিম শরিফ ৭৭৯) অথচ নামাজের ব্যপারে ক্বুরআন হাদিছের কোথাও আমি পাইনি বলা হয়েছে নামাজ যারা পড়েনা তারা মৃত ক্বলবের অধিকারী, বরং বলা হয়েছেঃ (اِنَّ الصَّلٰوۃَ تَنۡهٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَ الۡمُنۡكَرِ ؕ وَ لَذِكۡرُ اللّٰهِ اَكۡبَرُ) নিশ্চয়ই ছ্বলাত (নামায) মানুষকে (সমস্ত) অশ্লীলতা ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখেন। আর মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির সবচেয়ে বড় ঈবাদাত। (ছুরাহ আল-আনকাবুত ২৯:৪৫)
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (فَاِذَا قَضَیۡتُمُ الصَّلٰوۃَ فَاذۡكُرُوا اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوۡدًا وَّ عَلٰی جُنُوۡبِكُمۡ ۚ فَاِذَا اطۡمَاۡنَنۡتُمۡ فَاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ ۚ اِنَّ الصَّلٰوۃَ كَانَتۡ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ كِتٰبًا مَّوۡقُوۡتًا) অতঃপর তোমরা যখন (যেকোন অস্বাভাবিক পরিস্তিতির) নামায থেকে ফারেগ হবে, তখন দাঁড়িয়ে, বসে এমনকি শোয়া অবস্থায় করট পাল্টানোর সময়ও সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির করতে থাকবে; এরপর যখন নিরাপদ হয়ে ইতমিনান লাভ করবে তখন নামায পূর্ণরূপে কায়েম করবে; নিশ্চয়ই নামায মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়েই ফরয। (ছুরাহ আন-নিছা ৪/১০৩) নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও যমীনের (নিখুঁত) সৃষ্টি এবং দিবা-রাত্রির অদলবদলের মাঝে উলিল আলবাবদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে এমনকি শোয়া অবস্থায় করট পাল্টানোর সময়ও সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির করে এবং আসমানসমূহ ও যমীনের এই সৃষ্টি (নৈপুণ্য) সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করে (এবং এসব দেখে তারা বলে), হে আমাদের রব, (সৃষ্টি জগত)-এর কোনো কিছুই আপনি অযথা পয়দা করেননি, আপনি সমস্ত সবকিছু থেকে পাক-পবিত্র, অতএব আপনি আমাদের জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে নিষ্কৃতি দান করুন। (ছুরাহ আলে-ইমরান ৩/১৯০-১৯১)
উক্ত আয়াত শরীফের তাফছীরে ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, মহান আল্লাহ তা’য়ালা যখনই কোন ফরয উনার বান্দাদের উপর অবধারিত করে দিয়েছেন তখনই সেটার একটা সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তারপর যারা সেটা করতে সক্ষম হবে না তাদেরকে ভিন্ন পথ বাতলে দিয়েছেন। ব্যতিক্রম শুধুমাত্র জিকরুল্লাহ-এর বেলায়। এই জিকির এর ব্যাপারটা হচ্ছেন, যতক্ষণ কেউ সুস্থ বিবেকসম্পন্ন থাকবে, ততক্ষণ মহান আল্লাহ তা’য়ালা কাউকে ওযর আপত্তি পেশ করার সুযোগ দেন নি। সর্বাবস্থায় উনার জিকির করতে হবে। দিন-রাত, জমিতে-পানিতে, জিকির চালিয়ে যেতে হবে। এ আয়াতের এটাই ভাষ্য। (তাবারী, আত-তাফসীরুস ছ্বহীহ)
আর এই জিকিরই যে সবচেয়ে বড় ঈবাদাত নামাজ নয়, এর প্রমাণ পাওয়া যায় হাদিছ শরীফে তালাশ করলে, যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকিরই সর্বোত্তম য়া’মল বলে ঘোষণা খোদ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম ছ্বহাবায়ে কেরাম রদ্বিআল্লাহু আনহুমদের দিচ্ছেন এই বলেঃ (أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ أَعْمَالِكُمْ وَأَزْكَاهَا عِنْدَ مَلِيكِكُمْ وَأَرْفَعِهَا فِي دَرَجَاتِكُمْ وَخَيْرٌ لَكُمْ مِنْ إِنْفَاقِ الذَّهَبِ وَالْوَرِقِ وَخَيْرٌ لَكُمْ مِنْ أَنْ تَلْقَوْا عَدُوَّكُمْ فَتَضْرِبُوا أَعْنَاقَهُمْ وَيَضْرِبُوا أَعْنَاقَكُمْ " . قَالُوا بَلَى . قَالَ " ذِكْرُ اللَّهِ تَعَالَى " . فَقَالَ مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ رضى الله عنه مَا شَيْءٌ أَنْجَى مِنْ عَذَابِ اللَّهِ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ) তিনি বললেন আমি কি তোমাদের এমন একটি জিনিসের কথা বলব না, যা তোমাদের সকল (নেক) য়া’মলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ; তোমাদের রবের কাছে সবচেয়ে পবিত্র; তোমাদের মর্যাদাকে আরও উঁচুতে উন্নতকারী; মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাস্তায় সোনা-রুপা খরচ করা থেকে এবং জিহাদের ময়দানে শত্রুর প্রাণ নেওয়া ও শত্রুর হাতে প্রাণ দেওয়া থেকেও উত্তম? সাহাবায়ে কেরাম রদ্বিআল্লাহু আনহুমরা বললেন, অবশ্যই বলুন। তখন রসূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম বললেন, তা হলো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির। তখন মু’আয ইবনে জাবাল রদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন, মহান আল্লাহ তা’আলার আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জিকরুল্লাহ-এর বিকল্প কোন জিনিস নেই। (তিরমিজি শরীফঃ ৩৩৭৭; ইবনে মাজাহ শরীফ ৩৭৯০) এই হলো নামাজের আর জিকিরের তফাৎ।
নফছের তাজকিয়া না করে, নামাজ দিয়ে আল্লাহ পাওয়া যাবে? অথচ হাদিছ শরীফে স্পষ্ট করেই রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলছেনঃ (يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ قَبْلَ أَنْ تَمُوتُوا وَبَادِرُوا بِالأَعْمَالِ الصَّالِحَةِ قَبْلَ أَنْ تُشْغَلُوا وَصِلُوا الَّذِي بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ رَبِّكُمْ بِكَثْرَةِ ذِكْرِكُمْ لَهُ وَكَثْرَةِ الصَّدَقَةِ فِي السِّرِّ وَالْعَلاَنِيَةِ تُرْزَقُوا وَتُنْصَرُوا وَتُجْبَرُوا أَلاَ لاَ تَؤُمَّنَّ امْرَأَةٌ رَجُلاً وَلاَ يَؤُمَّنَّ أَعْرَابِيٌّ مُهَاجِرًا وَلاَ يَؤُمَّ فَاجِرٌ مُؤْمِنًا) জাবির বিন আবদুল্লাহ রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমাদের উদ্দেশ্যে রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম খুতবা প্রদান করে বললেন, “হে মানুষ! তোমরা মৃত্যুর পূর্বেই মহান আল্লাহ তা’য়ালার দিকে ফিরে এসো (তাওবা করো)। ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার পূর্বেই নেক য়া’মল করো। তোমাদের ও তোমাদের রবের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করো অধিক পরিমাণে উনার জিকির করার মাধ্যমে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে অধিক দান-সদকা করার মাধ্যমে। (এর মাধ্যমে) তোমাদের রিযিক বৃদ্ধি করা হবে, তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে, তোমাদের অভাব পূরণ করা হবে। সাবধান! নারী পুরুষের, বেদুইন মুহাজিরের এবং পাপাচারী মুমিন ব্যক্তির ইমামতি করবে না। (ইবনে মাজাহ ১০৮১)
যারা মহান আল্লাহ পাক উনার জিকির করে তাদের ব্যপারে মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (فَٱذْكُرُونِىٓ أَذْكُرْكُمْ) সুতরাং তোমরা আমার জিকির করো, আমিও তোমাদের জিকির করব। (ছুরাহ আল-বাক্বারা ২:১৫২) মহান আল্লাহ পাক কিন্তু কোন যায়গায় বলেন নাই তোমরা আমার নামাজ পড়ো আমিও তোমাদের নামাজ পড়বো, বরং বলতেছেন (یٰۤاَیُّهَاالَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اذۡكُرُوا اللّٰهَ ذِكۡرًا كَثِیۡرًا وَّ سَبِّحُوۡهُ بُكۡرَۃً وَّ اَصِیۡلًا هُوَ الَّذِیۡ یُصَلِّیۡ عَلَیۡكُمۡ وَ مَلٰٓئِكَتُهٗ لِیُخۡرِجَكُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ؕ وَ كَانَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ رَحِیۡمًا) হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক পরিমাণে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির করো এবং সকাল-বিকাল উনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো। (তাহলে) তিনি তোমাদের উপর ছ্বলাহ পাঠ করবেন এবং উনার ফেরেশতারাও তোমাদের জন্য দোয়া করবেন, (যেন) তিনি তোমাদেরকে যুলমাতের (অন্ধকার) থেকে বের করে (হেদায়াতের) নূরের দিকে নিয়ে আসেন। নিশ্চয়ই তিনি মুমিনদের প্রতি বড়ই দয়াবান। (ছুরাহ আল-আহযাব ৩৩:৪১-৪৩)
এখন বুঝো অবস্থা? মহান আল্লাহ পাক বলতেছেন যে তোমরা অধিক পরিমাণে আমার জিকির করো তাহলে (هُوَ الَّذِیۡ یُصَلِّیۡ عَلَیۡكُمۡ) আমি তোমাদের উপর ছ্বলাত পাঠ করবো। তাজ্জুব এখন এই মূর্খ জাতীকে কে বুঝাবে তুই নার ওয়ালা য়া’লীমের পিছে নফল নামাজ পড়ে যখন নার কামাবি তখন তর ভাই ব্রাদার জিকিরের মাহফিলে বসে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির করে উল্টো আল্লাহ পাক উনার ছ্বলাত পাঠের নিয়ামত লাভ করছে।
নামাজে পড়লেই কি ক্ষমা পাওয়া যাবে? হাদিছ শরীফে এসেছে, (مَا مِنْ قَوْمٍ اجْتَمَعُوا يَذْكُرُونَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ، لَا يُرِيدُونَ بِذَلِكَ إِلَّا وَجْهَهُ، إِلَّا نَادَاهُمْ مُنَادٍ مِنَ السَّمَاءِ: أَنْ قُومُوا مَغْفُورًا لَكُمْ، قَدْ بُدِّلَتْ سَيِّئَاتُكُمْ حَسَنَاتٍ) যখন কোনো এক দল মানুষ মাহফিল সাজিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালার জিকির করে এবং তাদের উদ্দেশ্য কেবলমাত্র মহান আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি অর্জনই হয়, তখন আসমান থেকে একজন ফেরেশতা ঘোষণা করেনঃ (হ্যা জাকিরেরা) ‘তোমরা উঠে যাও, তোমাদের সমস্ত গুনাহকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে এবং তোমাদের (কৃত) গুনাহগুলি নেকিতে পরিণত করে দেওয়া হয়েছে। (মুছ্বনাদে আহমাদ ১২৪৫৩, আল-বাযযার ৬৪৬৭, আবু ইয়ালা ৪১৪১, ছ্বহিহ আত-তারগীব ১৫০৪, মাদখালিদের ইমাম আলবানীও একে সহিহ বলেছে।)
এছাড়াও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (إِنَّ لِلَّهِ مَلاَئِكَةً يَطُوفُونَ فِي الطُّرُقِ، يَلْتَمِسُونَ أَهْلَ الذِّكْرِ، فَإِذَا وَجَدُوا قَوْمًا يَذْكُرُونَ اللَّهَ تَنَادَوْا هَلُمُّوا إِلَى حَاجَتِكُمْ. قَالَ فَيَحُفُّونَهُمْ بِأَجْنِحَتِهِمْ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا. قَالَ فَيَسْأَلُهُمْ رَبُّهُمْ وَهْوَ أَعْلَمُ مِنْهُمْ مَا يَقُولُ عِبَادِي قَالُوا يَقُولُونَ يُسَبِّحُونَكَ، وَيُكَبِّرُونَكَ، وَيَحْمَدُونَكَ وَيُمَجِّدُونَكَ. قَالَ فَيَقُولُ هَلْ رَأَوْنِي قَالَ فَيَقُولُونَ لاَ وَاللَّهِ مَا رَأَوْكَ. قَالَ فَيَقُولُ وَكَيْفَ لَوْ رَأَوْنِي قَالَ يَقُولُونَ لَوْ رَأَوْكَ كَانُوا أَشَدَّ لَكَ عِبَادَةً، وَأَشَدَّ لَكَ تَمْجِيدًا، وَأَكْثَرَ لَكَ تَسْبِيحًا. قَالَ يَقُولُ فَمَا يَسْأَلُونِي قَالَ يَسْأَلُونَكَ الْجَنَّةَ. قَالَ يَقُولُ وَهَلْ رَأَوْهَا قَالَ يَقُولُونَ لاَ وَاللَّهِ يَا رَبِّ مَا رَأَوْهَا. قَالَ يَقُولُ فَكَيْفَ لَوْ أَنَّهُمْ رَأَوْهَا قَالَ يَقُولُونَ لَوْ أَنَّهُمْ رَأَوْهَا كَانُوا أَشَدَّ عَلَيْهَا حِرْصًا، وَأَشَدَّ لَهَا طَلَبًا، وَأَعْظَمَ فِيهَا رَغْبَةً. قَالَ فَمِمَّ يَتَعَوَّذُونَ قَالَ يَقُولُونَ مِنَ النَّارِ. قَالَ يَقُولُ وَهَلْ رَأَوْهَا قَالَ يَقُولُونَ لاَ وَاللَّهِ مَا رَأَوْهَا. قَالَ يَقُولُ فَكَيْفَ لَوْ رَأَوْهَا قَالَ يَقُولُونَ لَوْ رَأَوْهَا كَانُوا أَشَدَّ مِنْهَا فِرَارًا، وَأَشَدَّ لَهَا مَخَافَةً. قَالَ فَيَقُولُ فَأُشْهِدُكُمْ أَنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ. قَالَ يَقُولُ مَلَكٌ مِنَ الْمَلاَئِكَةِ فِيهِمْ فُلاَنٌ لَيْسَ مِنْهُمْ إِنَّمَا جَاءَ لِحَاجَةٍ. قَالَ هُمُ الْجُلَسَاءُ لاَ يَشْقَى بِهِمْ جَلِيسُهُمْ) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালার কিছু ফেরেশতা রয়েছেন, যারা দুনিয়ার (জমিনে) পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ান এবং আহলে জিকীরদের সন্ধান করেন। যখন তারা এমন কোনো মাহফিল পেয়ে যান, যেখানে মহান আল্লাহ তা’য়ালার জিকির করা হচ্ছে, তখন তারা একে অপরকে ডেকে বলেন, ‘এসো, তোমাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা এখানে পাওয়া যাবে।’ এরপর তারা ওই জিকিরের মাহফিলকে নিজেদের ডানা দিয়ে বেষ্টন করে এবং (সে অবস্থা) দুনিয়ার আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এরপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসা করেন, যদিও তিনি তাদের চেয়ে উত্তমরূপে জানেন, ‘আমার বান্দারা (ওই মাহফিলে) কী বলছে?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘তারা আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছে, আপনার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্ব বর্ণনা করছে, আপনার প্রশংসা করছে এবং আপনার মাহাত্ম্য ঘোষণা করছে।’ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তারা কি আমাকে দেখেছে?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘না, আপনার কসম! তারা আপনাকে দেখেনি।’ আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তাহলে যদি তারা আমাকে দেখতো, তাহলে কী করতো?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘যদি তারা আপনাকে দেখতো, তাহলে তারা আরও অধিকভাবে আপনার জিকিরের মাহফিল সাজিয়ে আপনার মহিমার বর্ণনা করতো এবং আপনার উদ্দেশ্যে আরও বেশি তাসবীহ পাঠ করতো।’ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তারা আমার কাছে কী চাইছে?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘তারা আপনার নিকট জান্নাত প্রার্থনা করছে।’ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তারা কি জান্নাত দেখেছে?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘না, আপনার কসম! হে আমাদের রব! তারা জান্নাত দেখেনি।’ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তাহলে যদি তারা জান্নাত দেখতো, তাহলে কী করতো?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘যদি তারা জান্নাত দেখতো, তাহলে তারা জান্নাতের জন্য আরও বেশি আগ্রহী হতো, আরও বেশি তা পাওয়ার চেষ্টা করতো, এবং তা লাভের জন্য আরও গভীর আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতো।’ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তারা কী থেকে আশ্রয় চাইছে?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘তারা আপনার কাছে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছে।’ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তারা কি জাহান্নাম দেখেছে?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘না, আপনার কসম! তারা জাহান্নাম দেখেনি।’ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তাহলে যদি তারা জাহান্নাম দেখতো, তাহলে কী করতো?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘যদি তারা জাহান্নাম দেখতো, তাহলে তারা আরও বেশি তা থেকে পালানোর চেষ্টা করতো, এবং আরও বেশি (আপনার আজাবকে) ভয় করতো।’ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি, আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।’ তখন এক ফেরেশতা বলেন, ‘ওই মজলিসে একজন ব্যক্তি রয়েছে, যে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, সে কেবল কোনো প্রয়োজনের কারণে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলো।’ মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘তারা এমন এক জামায়াত, যাদের সাথে বসলে কেউ হতভাগা হতে পারে না (অর্থাৎ, যারা এই জিকিরের মজলিসে উপস্থিত হয়, তারা সকলেই আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভ করে)। (বুখারি শরীফ ৬৪০৮, মুছলিম শরীফ ২৬৮৯)
শুধু কি তাই? বরং যারা যেরূপ জিকির করে, মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের অনুরূপ স্মরণ করে থাকেনঃ যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির ও উনাকে স্মরণ করে, মহান আল্লাহ তায়ালাও সে ব্যক্তির কথা আলোচনা করেন। হাদিছ শরীফে এসেছে হজরত আবু হুরায়রা রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম বলেছেনঃ (يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي، وَأَنَا مَعَهُ إِذَا ذَكَرَنِي، فَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي، وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلأٍ ذَكَرْتُهُ فِي مَلأٍ خَيْرٍ مِنْهُمْ، وَإِنْ تَقَرَّبَ إِلَىَّ بِشِبْرٍ تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا، وَإِنْ تَقَرَّبَ إِلَىَّ ذِرَاعًا تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ بَاعًا، وَإِنْ أَتَانِي يَمْشِي أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً) মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা রাখে, আমি তার সঙ্গে তেমন ব্যবহারই করি। যখন সে আমার জিকির করে, আমি তার সঙ্গে থাকি। সে যদি মনে মনে আমার জিকির করে, আমিও তাকে অনুরূপ স্মরণ করি। সে যদি কোনো মজলিসে আমার জিকির করে, তাহলে আমি তার চেয়ে উত্তম মজলিসে (অর্থাৎ ফেরেশতা য়ালাইহিমুছ ছালামদের মজলিসে) তার কথা আলোচনা করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই, যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়; আমি তার দিকে দু হাত অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।’ (বুখারি শরীফ ৭৪০৫; মুসলিম শরীফ ২৬৭৫)।
অতএব স্পষ্ট হয়ে গেলো, নামায ও জিকিরের মধ্যে কোন তুলনাই চলেনা, যত ধরণের ঈবাদাত দ্বীনে যায়েজ করা হয়েছে, সবকিছুর মূলেই হলো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির, মূল মাক্বছাদই হলো উনার স্বরনে থাকা। এমন একজন জাকির খোঁজে পাওয়া যাবেনা যে বে-নামাজী, কেননা জাকির মূলত আশিক, আর আশিক কখনো বে-আদব হয়না হুকুম আহকামে, কিন্তু নামাজী আশিক নয় আবিদ, আর আবিদ হলেই আশিক হওয়া যায়না, অসংখ্য আবিদ রয়েছে যারা নামাজ পড়েও বে-আদব, হুকুম আহকামের পরওয়াই করেন। কায়েনাতের সবচেয়ে বড় আবিদ ছিলো আযাযিল, ইবাদত করতে করতে সবচেয়ে বড় মুতাকাব্বির হয়েছে। একারণেই নামাযি আবিদের কোন হেইসিয়াতই নাই আশিক জাকিরের সম্মুখে। আর আমার জানামতে মহান আল্লাহ পাক আল কুরআনের কোন স্থানে এরূপ বলেন নাই যে কেউ নামাজ ছেড়ে দিলে তার পেছনে শয়তান নিযুক্ত করে দিবেন অথচ উনার জিকিরের বেলায় বলতেছেনঃ (وَ مَنۡ یَّعۡشُ عَنۡ ذِكۡرِ الرَّحۡمٰنِ نُقَیِّضۡ لَهٗ شَیۡطٰنًا فَهُوَ لَهٗ قَرِیۡنٌ وَ اِنَّهُمۡ لَیَصُدُّوۡنَهُمۡ عَنِ السَّبِیۡلِ وَ یَحۡسَبُوۡنَ اَنَّهُمۡ مُّهۡتَدُوۡنَ حَتّٰۤی اِذَا جَآءَنَا قَالَ یٰلَیۡتَ بَیۡنِیۡ وَ بَیۡنَكَ بُعۡدَ الۡمَشۡرِقَیۡنِ فَبِئۡسَ الۡقَرِیۡنُ) যে ব্যক্তি দয়াময় মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার উপর ক্বরিন শয়তানকে মুছাল্লাত করে দেই, অতপর সে-ই (সর্বক্ষণ) তার সাথী হয় থাকে। অবশ্যই এরা তাদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে (যদিও) তারা নিজেরা মনে করে তারা বুঝি সঠিক পথের উপরই রয়েছে। (এ) ব্যক্তি যখন (কেয়ামতের দিন) আমার সামনে হাজির হবে, তখন সে (তার শয়তান সাথীকে দেখে) বলবে, হায় (কতো ভালোই না হতো) যদি (আজ) তোমার ও আমার মাঝে দুই উদয়াচলের ব্যবধান থাকতো, কতো নিকৃষ্ট সাথী (ছিলে তুমি আমার দুনিয়ার জীবনে)! (মহান আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে) বলা হবে, তোমরা যেহেতু (শয়তানকে সাথীরূপে গ্রহণ করে নিজেদের ওপর) যুলুম করেছো, তাই তোমরা (এই) আযাবেও একজন আরেকজনের অংশীদার হয়ে থাকো। (তবে) আজ এই (সয়তান)গুলো তোমাদের কোনো রকম উপকারেই আসবে না। (ছুরাহ আয যুখরুফ ৪৩/৩৬-৩৯) এছাড়াও মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন জিনিষ তার জীবনে সেটায় হাত দিয়ে দিবেন বলছেন এইভাবেঃ (وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِى فَإِنَّ لَهُۥ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُۥ يَوْمَ الْقِيٰمَةِ أَعْمٰى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِىٓ أَعْمٰى وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا قَالَ كَذٰلِكَ أَتَتْكَ ءَايٰتُنَا فَنَسِيتَهَا ۖ وَكَذٰلِكَ الْيَوْمَ تُنسٰى) মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (হ্যাঁ) যে ব্যক্তি আমার জিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, (আমার পক্ষ থেকে) তার জীবিকা সংকীর্ণ (করে দেওয়া) হবে। (সর্বোপরি) তাকে আমি ক্বিয়ামতের দিন অন্ধ বানিয়ে হাজির করবো। সে বলবে হে আমার রব! আপনি আমাকে আজ কেন অন্ধ বানিয়ে উঠালেন? (দুনিয়াতে) আমি তো চক্ষুসমান ব্যক্তিই ছিলাম। মহান আল্লাহ তায়ালা বলবেন, (আসলে দুনিয়াতে) তুমি এমনই (অন্ধই) ছিলে, তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ (যখন) এসেছিল, তখন তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হবে। (ছুরাহ ত্বোহা ২০/১২৪-১২৬)
অথচ জাকিরদের ব্যপারে বলা হচ্ছে যে, হাশরের মাঠে যখন সূর্য অনেক নিচে নেমে আসবে। মানুষ যখন পেরেশান হয়ে ছটফট ও ছোটাছুটি করতে থাকবে। সেই কঠিন সময়ে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকিরকারীরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার আরশের শীতল ছায়ায় পরম আরামে আশ্রয় লাভ করবে। হাদিস শরীফে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ (سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ، وَمِنْهُمْ: رَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ) মহান আল্লাহ তায়ালা ক্বিয়ামতের দিন সাত শ্রেণীর ব্যক্তিকে আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন। তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যে একান্তে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির করেছে এবং মহান আল্লাহ তায়ালা উনার স্মরণে যার চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়েছে।’ (বুখারি শরীফ ৬৬০, মুছলিম শরীফ ১০৩১)
পৃথিবীতে জান্নাতের বাগানঃ পৃথিবীতে জিকিরের মজলিস হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম। হাদিছ শরীফে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম বলেছেনঃ (أَلَا إِنَّ الدُّنْيَا مَلْعُونَةٌ مَلْعُونٌ مَا فِيهَا إِلاَّ ذِكْرَ اللَّهِ وَمَا وَالاَهُ وَعَالِمًا أَوْ مُتَعَلِّمًا) দুনিয়া ও দুনিয়ার সব বস্তু অভিশপ্ত, তবে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির ও উনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং আলেম ও তালেবে ইলম ছাড়া।’ (তিরমিজি শরীফ ২৩২২, ইবনে মাজাহ শরীফ ৪১১২, রিয়াদুছ ছ্বলেহীন ১৩৮৪)। অন্য হাদিছ শরীফে এসেছে, হজরত আনাছ রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম বলেনঃ () তোমরা যখন জান্নাতের বাগানের কাছ দিয়ে যাও, তখন সেখানে খুব বিচরণ কর। সাহাবায়ে কেরাম রদ্বিআল্লাহু আনহুমগণ বললেন, ইয়া রসুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম! জান্নাতের বাগান কী? তিনি বললেন, জিকিরের মজলিসমূহ।’ (তিরমিজি শরীফঃ ৩৫১০)
জিকির না করার কারণে আফসোস করা লাগবে এক সময়। দুনিয়ার জীবন যারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির ছাড়া অতিবাহিত করেছে, জান্নাতে তারা আফসোস করতে থাকবে। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম বলেনঃ (لَمْ يَتَحَسَّرْ أَهْلُ الْجَنَّةِ إِلَّا عَلَى سَاعَةٍ مَرَّتْ بِهِمْ لَمْ يَذْكُرُوا اللَّهَ تَعَالَى فِيهَا) জান্নাতে প্রবেশ করার পর জান্নাতবাসীরা দুনিয়ার কোনো জিনিসের জন্য আফসোস করবে না, শুধু ওই সময়ের জন্য আফসোস করবে, যে সময়টা সে দুনিয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির ছাড়া অতিবাহিত করেছে।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদঃ ১৬৭৪৬)
আর যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির করে তার উদাহরণ হচ্ছে জীবিত ব্যক্তির মতো। কারণ তার সময়গুলো পরকালে সংরক্ষিত হচ্ছে। আর যে ব্যক্তি জিকির করে না তার উদাহরণ মৃত ব্যক্তির মতো। কারণ মৃত ব্যক্তি যেমন কোনো য়া’মল বা কাজ করতে পারে না, তেমনি উদাসীন ব্যক্তির সময়গুলোও নিষ্ফল ও অসাড়। হাদিছ শরীফে এসেছে, হজরত আবু মুসা রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম বলেনঃ (مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لاَ يَذْكُرُ مَثَلُ الْحَىِّ وَالْمَيِّتِ) যে তার রবের জিকির করে আর যে করে না, তাদের উদাহরণ হচ্ছে জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো। (অর্থাৎ যে মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে স্মরণ করে সে যেন জীবিত। আর যে স্মরণ করে না সে যেন মৃত)।’ (বুখারি শরীফ ৬৪০৭, রিয়াদুছ ছ্বলেহীন ১৪৩৪)
তাছাড়া কেউ মুমিন কি না, সে সঠিক পথে রয়েছে কি না, এর প্রমান সে নিজেই পাবে মহান আল্লাহ পাক উনার জিকিরের মাধ্যমে। মহান আল্লাহ পাক বলেনঃ (یٰۤاَیُّہَاالَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اذۡکُرُوا اللّٰہَ ذِکۡرًا کَثِیۡرًا) হে মুমিনগণ তোমরা অধিক পরিমাণে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির করো। (ছুরাহ আল-আহযাব ৩৩/৪১) (কারন) (وَ الذّٰکِرِیۡنَ اللّٰہَ کَثِیۡرًا وَّ الذّٰکِرٰتِ ۙ اَعَدَّ اللّٰہُ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃً وَّ اَجۡرًا عَظِیۡمًا) অধিক পরিমাণে মহান আল্লাহ তায়ালার জিকিরকারী পুরুষ ও নারীদের জন্যেই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ক্ষমা ও বিরাট পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। (ছুরাহ আল-আহযাব ৩৩/৩৫) (اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ تَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ) আর (মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথের সন্ধানপ্রাপ্ত তারাই) যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের অন্তর মহান আল্লাহ তায়ালার জিকির দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, মহান আল্লাহ তায়ালার জিকির দ্বারাই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে। (ছুরাহ আর-রদ ১৩/২৮)
সুতরাং প্রতি মুহূর্তেই খুব বেশি বেশি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির করতে হবে। এতেই বান্দার সাফল্য ও কল্যাণ। শুধু আখিরাতের ব্যপারেই নয়, বরং মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ জিকিরের প্রতি মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ হলেনঃ (یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا لَقِیۡتُمۡ فِئَۃً فَاثۡبُتُوۡا وَ اذۡكُرُوا اللّٰهَ كَثِیۡرًا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ) হে মুমিনগণ, তোমরা যখন কোনো (শত্রু) দলের মুখোমুখি হও, তখন অবিচল থাকো; আর তোমরা অধিক পরিমাণে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার (ক্বলবী) জিকির করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। (ছুরাহ আল-আনফাল ৮/৪৫) চিন্তা করা যায়? আজকের মুজাহিদ কারা? ওহাবী ছ্বলাফি যারা তাছাউফের বিরোধিতাকারী, যারা জিকিরের ১৮০ ডিগ্রী উল্টো, তাহলে কীভাবে তারা বিজয় লাভ করবে?
এছাড়াও মসজিদে নামাজীর সাথে শয়তান মওজুদ থাকলেও, জাকিরের ধারে কাছেও শয়তান তো দূর ক্বরিন ও থাকেনা, এ বিষয়ে একটু ডিপলি নজর দিলে হাদিছেই তা পাওয়া যায়, যেমনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (إِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ يُصَلِّي فَلاَ يَدَعْ أَحَدًا يَمُرُّ بَيْنَ يَدَيْهِ فَإِنْ أَبَى فَلْيُقَاتِلْهُ فَإِنَّ مَعَهُ الْقَرِينَ) তোমাদের কেউ যখন নামাজ পড়ে, তখন সে যেনো তার সামনে দিয়ে কাউকে যেতে না দেয়। যদি সে অস্বীকার করে (বাধা মানতে না চায়) তবে সে যেনো তার সঙ্গে ঝগড়া করে। কেননা তার সঙ্গে তার সঙ্গী শয়তান (ক্বরিন) রয়েছে।’ (মুসলিম শরীফ ৫০৬) আর শয়তানকে সেজদা দেওয়া শিরক এর অন্তর্ভুক্ত। বোঝা গেলো নামাজ পড়ে উটা ব্যক্তি মসজিদে আরেক নামাযরত নামাযির সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছেনা কেননা তার সাথে তার ক্বরিন রয়েছে, কিন্তু জাকিরের বেলায় রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الشَّيْطَانُ جَاثِمٌ عَلَى قَلْبِ ابْنِ آدَمَ فَإِذَا ذَكَرَ اللَّهَ خَنَسَ وَإِذْا غَفَلَ وَسْوَسَ) শয়তান আদম সন্তানের ক্বলবের উপর জেঁকে বসে থাকে, কিন্তু যখন সে (তার ক্বলবে) মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির শুরু করে তখন সে কেটে পড়ে, তবে (মানুষ) যখন (জিকির অফ করে) গ্বফিল বা অমনোযোগী হয় তখন সে শয়তান (আবারো) তার ক্বলবে ওয়াছওয়াছা দিতে শুরু করে। (মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবাহ ৩৪৭৭৪, মিশকাতুল মাছাবিহ ২২৮১) অর্থাৎ রগে রগে দৌড়ে গিয়ে ক্বলবে হাটুগেড়ে বসে আর জিকির শুরু হলে পালিয়ে যায়, আর জিকির পুরোপুরি ছেড়ে দিলে ঐ গ্বফিলের উপর শয়তানেরা মুছাল্লাত হয়ে যায়, আর শয়তান মুছাল্লাত হলে কি হয় তাও মহান আল্লাহ পাক স্পষ্ট করে বলতেছেনঃ (اِسۡتَحۡوَذَ عَلَیۡهِمُ الشَّیۡطٰنُ فَاَنۡسٰهُمۡ ذِکۡرَ اللّٰهِ ؕ اُولٰٓئِکَ حِزۡبُ الشَّیۡطٰنِ ؕ اَلَاۤ اِنَّ حِزۡبَ الشَّیۡطٰنِ هُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ) (আসলে) শয়তান তাদের ওপর পুরোপুরিভাবেই প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে; ফলে তাদেরকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকির থেকে গাফেল করে দিতে সক্ষম হয়েছে। (অতএব জেনে রাখো) এরাই শয়তানের দল। (আর) সাবধান! (এদের থেকে, কেননা) অবশ্যই শয়তানের দল মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্ৰস্ত। (ছুরাহ আল-মুজাদালাহ ৫৮/১৯)
তাছাড়া অতিরিক্ত জিকির করার মাধ্যমেই কেবল সম্মানিত দ্বীন ইছলামের মাঝে শক্তভাবে নিবদ্ধ থাকা সম্ভব। কারণ বান্দা যখন অনবরত মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে ডাকবে এবং উনার জিকির করবে, তখন অন্যান্য সব কু-চিন্তা তার কলবে হানা দিতে ব্যর্থ হবে। একবার এক ছ্বহাবী বলেন, (إِنَّ شَرَائِعَ الإِسْلَامِ قَدْ كَثُرَتْ عَلَىَّ فَأَنْبِئْنِي مِنْهَا بِشَىْءٍ أَتَشَبَّثُ بِهِ. قَالَ: لَا يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ) ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! আমার জন্য ইছলামের শরিয়তের বিষয়াদি অতিরিক্ত হয়ে গেছে। সুতরাং আমাকে এমন একটি য়া’মল বলে দিন, যা আমি শক্তভাবে আঁকড়ে থাকতে পারি। তিনি বললেন, ‘সর্বদা তোমার জিহ্বা যেন মহান আল্লাহ য়াজ্জা ওয়া যাল্লা উনার জিকিরে সিক্ত থাকে’। (ইবনে মাজাহ শরীফ ৩৭৯৩)। আর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তিনি হাক্বিকি জাকীরিনেরা কেমন হবে এই বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন এইভাবেঃ (قَالَ رَسُوْلُ اللهِ- صَلَّى ٱللّٰهُ عَلَيْهِ وَ اٰلِهِ وَسَلَّمَ أكْثِرُوا ذِكْرُ اللهِ حَتَّى يَقُولُوا مَجْنُونٌ) অর্থাৎ, তোমরা এমনভাবে মহান আল্লাহ তায়ালার জিকির করো যেনো লোকে তোমাদের পাগল মনে করে। (মুসনাদে আহমদ ১১৬৫৩, ১১৬৭৪)
মনে রাখতে হবে সকল কৃত য়া’মলই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকরের অন্তর্ভুক্ত, তবে সবচেয়ে য়া’লা দরজার জিকির হলো ক্বলবি জিকির যেখানে বান্দা ১০০% অনলাইনে থাকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সাথে, আর তাদের মর্যাদা করা হয় উঁচু থেকে উঁচু যার প্রমাণ কুরআনের মধ্যেই রয়েছেঃ (فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَنْ تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ رِجَالٌ لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ) সেসব (পবিত্র) ঘরসমূহকে মহান আল্লাহ তা’আলা মর্যাদার উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করার আদেশ দিয়েছেন, যেখানে উনার নামের জিকির করা হয়, সেসব জায়গাসমূহে সকাল-সন্ধ্যা (যারা) উনার তাছবীহ পাঠ করেন। এরা হলেন সেইসব লোক, যাদেরকে বেচাকেনা, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কোনো কাজ কখনোই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকির থেকে গাফেল করতে পারে না, না পারে নামায কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা থেকে; কেননা তারা ভয় করেন সেই দিনকে, যেদিন ক্বলবসমূহ ও দৃষ্টিসমূহ উল্টেপাল্টে যাবে (অস্থির হয়ে যাবে)। (ছুরাহ আন নূর ২৪/৩৬-৩৭)
অতএব পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো মাক্বামে জাকির ও মাক্বামে ফাওয়াইলুল্লিল মুছ্বল্লীন কি।
Monday, March 2, 2026
এডমিন Rajib Khaja Official
আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।
0 ফেইসবুক: