পবিত্র রমজান মাস হচ্ছেন মুত্তাক্বী হওয়ার মাস, এ মাসে রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খল পরানো হয়। এ মাসের অন্যতম ঈবাদাত তারাউয়্যীহ নামাজ। শুধু রমজান মাসেই এ নামাজ সম্মানিত মুছলমানেরা আদায় করে থাকেন। একারণে অনেকেরই উক্ত নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া ও মোনাজাত মনে থাকে না। তাই তারাউয়্যীহ নামাজের নিয়ত, দোয়া ও মোনাজাত তুলে ধরা হলোঃ
তারাউয়্যীহ নামাজ পড়ার নিয়মঃ
রমজানে প্রতিদিন ঈশার ফরজ নামাজ পড়ার পরে বিতর নামাজের আগে তারাউয়্যীহ’র নামাজ পড়তে হয়। তারাউয়্যীহ নামাজ দুই রাকাত করে ২০ রক’য়াত পড়তে হয়। প্রত্যেক দুই রক’য়াতের পর ছালাম ফেরানো হয়। এভাবে চার রাকাত পড়ার পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও দোয়া-দুরুদ ইস্তিগ্বফার পড়া হয়।
তারাউয়্যীহ নামাজের নিয়তঃ
ইছলামে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কাজ বা ঈবাদাত মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হলে তা সঠিক নিয়তের সঙ্গে করতে হয়। নিয়ত ছাড়া কোনো ঈবাদাত পূর্ণাঙ্গ হয় না, কারণ ঈবাদাতের মূল শর্তই হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জনের ইচ্ছা। তাই তারাউয়্যীহ নামাজের জন্যেও নিয়ত করা আবশ্যক। নিয়ত মনে মনে বাংলাতেও করা যায়। তবে আমাদের দেশে তারাউয়্যীহ নামাজের প্রচলিত আরবি নিয়ত রয়েছে। রমজান শরীফ মাসের তারাউয়্যীহ নামাজের নিয়ত, একা, ইমামের পিছনে, ও ইমামের নিয়তের ত্বরীকাহ নিম্নে প্রদান করা হলোঃ
একা (ইমাম ছাড়া)
আরবি
উচ্চারণঃ (نَوَيْتُ أَنْ أُصَلِّيَ لِلَّهِ تَعَالَى رَكْعَتَيْ صَلَاةِ
التَّرَاوِيحِ سُنَّةُ رَسُولِ اللَّهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا إِلَى جِهَةِ
الْكَعْبَةِ الشَّرِيفَةِ اللَّهُ أَكْبَرُ)
বাংলা
উচ্চারণঃ নাওয়াইতু আন উছ্বল্লিয়া
লিল্লাহি তা’য়ালা রক’য়াতাই ছ্বলাতিত তারাউয়ীহি ছুন্নাতু রছুলিল্লাহি তা’য়ালা
মুতাওয়াজ্জিহান ইলা যিহাতিল কা’য়বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
বাংলা অনুবাদঃ আমি মহান আল্লাহ পাক উনার উদ্দেশ্যে দুই রক’য়াত তারাউয়ীহ ছুন্নত নামায পড়ার নিয়ত করলাম, যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নত, কা’য়বা শরীফের দিকে মুখ করে, আল্লাহু আকবার।
ইমামের পিছনে (ইমাম সহ)
আরবি
উচ্চারণঃ (نَوَيْتُ أَنْ أُصَلِّيَ لِلَّهِ تَعَالَى رَكْعَتَيْ صَلَاةِ
التَّرَاوِيحِ سُنَّةُ رَسُولِ اللَّهِ تَعَالَى اِقْتَدَيْتُ بِهَذَا الْإِمَامِ
مُتَوَجِّهًا إِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيفَةِ اللَّهُ أَكْبَرُ)
বাংলা
উচ্চারণঃ নাওয়াইতু আন উছ্বল্লিয়া
লিল্লাহি তা’য়ালা রক’য়াতাই ছ্বলাতিত তারাউয়ীহি ছুন্নাতু রছুলিল্লাহি তা’য়ালা
ইক্তাদাইতু বিহাজাল ইমামি মুতাওয়াজ্জিহান ইলা যিহাতিল কা’য়বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু
আকবার।
বাংলা অনুবাদঃ আমি মহান আল্লাহ পাক উনার উদ্দেশ্যে ইমামের অনুসরণ করে দুই রক’য়াত তারাউয়ীহ ছুন্নত নামায পড়ার নিয়ত করলাম, যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নত, কা’য়বা শরীফের দিকে মুখ করে, আল্লাহু আকবার।
যিনি ইমামতি করবেন, সেই ইমামের নিয়তঃ
আরবি
উচ্চারণঃ (نَوَيْتُ أَنْ أُصَلِّيَ لِلَّهِ تَعَالَى رَكْعَتَيْ صَلَاةِ
التَّرَاوِيحِ سُنَّةُ رَسُولِ اللَّهِ تَعَالَى أَنَا إِمَامُ الْمُقْتَدِينَ
مُتَوَجِّهًا إِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيفَةِ اللَّهُ أَكْبَرُ)
বাংলা
উচ্চারণঃ নাওয়াইতু আন উছ্বল্লিয়া
লিল্লাহি তা’য়ালা রক’য়াতাই ছ্বলাতিত তারাউয়ীহি ছুন্নাতু রছুলিল্লাহি তা’য়ালা আনা
ইমামুল মুক্তাদীনা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা যিহাতিল কা’য়বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার।
বাংলা অনুবাদঃ আমি মহান আল্লাহ পাক উনার উদ্দেশ্যে দুই রক’য়াত তারাউয়ীহ ছুন্নত নামায পড়ার নিয়ত করলাম, যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নত, আমি মুক্তাদিদের ইমাম হিসেবে কা’য়বা শরীফের দিকে মুখ করে, আল্লাহু আকবার।
তারাউয়্যীহ নামাজের নিয়ত আরবিতে করা আবশ্যক বা বাধ্যতামূলক নয়। বাংলাতেও উপরোক্ত বাক্যে নিয়ত করা যাবে। উল্লেখ্য, নিয়ত মুখে উচ্চারণ করাও বাধ্যতামূলক নয়, তবে উত্তম ও আন্তরিক ইতমিনান দেয়।
তারাউয়্যীহ নামাজের দোয়া
তারাউয়্যীহ নামাজে প্রতি চার রাকাত পর পর বিশ্রাম নেওয়া হয়। এ সময় নিম্নোক্ত দোয়া পড়ার প্রচলন রয়েছে আমাদের সাব-কন্টিনেন্টে। দোয়াটি হলোঃ
আরবি
উচ্চারণঃ (سُبْحَانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ، سُبْحَانَ ذِي
الْعِزَّةِ وَالْعَظَمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ
وَالْجَبَرُوتِ، سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِي لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوتُ
أَبَدًا أَبَدًا، سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّنَا وَرَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ)
বাংলা উচ্চারণঃ ছুব্হানাযিল মুলকি
ওয়াল মালাকুতি, ছুব্হানাযিল ঈজ্যাতি ওয়াল আ’জ্বমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল ক্বুদরতি ওয়াল কিব্রিয়া-ই ওয়াল যাবারূত, ছুব্হানাল
মালিকিল হাইয়্যিল্লাযী লা ইয়ানামু ওয়া লা ইয়ামূতু আবাদান আবাদা, ছুব্বূহুন ক্বুদ্দূছুন রব্বুনা ওয়া রব্বুল মালা-ইকাতি ওয়ার রূহ।
বাংলা অর্থঃ সমস্থ নাপাকি থেকে পবিত্র যিনি, তিনি রাজত্ব ও মালাকুত (দৃশ্য-অদৃশ্য জগতের কর্তৃত্ব)-এর অধিকারী। সমস্থ নাপাকি থেকে পবিত্র যিনি, তিনি ইজ্যত (মহাশক্তি), আজ্বমত (মহানতা), হায়বত (গাম্ভীর্য-ভীতি), কুদরত (ক্ষমতা), কিবরিয়া (মহিমা) ও জাবারূত (পরাক্রম)-এর অধিকারী। সমস্থ নাপাকি থেকে পবিত্র সেই জীবন্ত বাদশাহ, যিনি ঘুমান না এবং মৃত্যুবরণ করেন না, কখনোই নয়, কখনোই নয়। তিনি পরম পবিত্র, পরম মহিমান্বিত। তিনি আমাদের রব এবং ফেরেশতাদের ও রূহ-এর ও রব।
মনে রাখতে হবে, তারাউয়্যীহ নামাজ বিশুদ্ধ হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে এই দোয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। এই দোয়া না পড়লে তারাউয়্যীহ নামাজ হবে না, কোনও অবস্থায় এমন মনে করা যাবে না। মূলত এ দোয়ার সঙ্গে তারাউয়্যীহ নামাজ হওয়া কিংবা না হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা জাস্ট ফজিলতের দোয়া, পারফেক্ট টাইমে পারফেক্ট দোয়া।
এ সময় চাইলে এ দোয়ার পরিবর্তে কুরআন-হাদিসে বর্ণিত যেকোনো দোয়াই পড়া যাবে। ইছলামিক স্কলারদের মতে, তারাউয়্যীহ নামাজে চার রাকাত পর পর বিশ্রামের সময়টিতে কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া, দুরুদ, তওবা,-ইস্তিগ্বফারগুলোই পড়া উত্তম।
তারাউয়্যীহ নামাজের মোনাজাত
তারাউয়্যীহ নামাজের প্রতি চার রাকাত পর পর দোয়া করা যায়, আবার পুরো নামাজ শেষেও দোয়া করা যায়। তবে বর্তমানে দেশের মসজিদগুলোতে নামাজ শেষে দোয়া পড়া হয়, মানুষের সময় নাই তাই দিন দিন সবকিছু শর্টকাট করে ফেলছে। তারাউয়্যীহ নামাজের দোয়ার মতো বহুল প্রচলিত একটি মোনাজাতও রয়েছে। সেটি হলোঃ
আরবি
উচ্চারণঃ (اَللّٰهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَنَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
يَا خَالِقَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ بِرَحْمَتِكَ يَا عَزِيزُ يَا غَفَّارُ يَا
كَرِيمُ يَا سَتَّارُ يَا رَحِيمُ يَا جَبَّارُ يَا خَالِقُ يَا بَارُّ اَللّٰهُمَّ
أَجِرْنَا وَخَلِّصْنَا مِنَ النَّارِ يَا مُجِيرُ يَا مُجِيرُ يَا مُجِيرُ
بِرَحْمَتِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ)
বাংলা
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা ইন্না
নাছআলুকাল যান্নাতা ওয়া না’ঊযু বিকা মিনান নার, ইয়া খলিক্বল যান্নাতি ওয়ান নার, বিরহমাতিকা
ইয়া আ’যীযু ইয়া গ্বফ্ফার, ইয়া কারীমু ইয়া ছাত্তার, ইয়া রহীমু ইয়া যাব্বার, ইয়া খলিক্বু
ইয়া বার্, আল্লাহুম্মা আযিরনা ওয়া খলিছনা মিনান নার, ইয়া মুযিরু ইয়া মুযিরু ইয়া মুযির,
বিরহমাতিকা ইয়া আরহামার রহিমীন।
বাংলা অর্থঃ হে মহান আল্লাহ তায়ালা! আমরা আপনার কাছে যান্নাত চাই এবং যাহান্নাম থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই। হে যান্নাত ও যাহান্নামের স্রষ্টা! আপনার রহমতে হে পরাক্রমশালী, হে অতিশয় ক্ষমাশীল, হে মহান দাতা, হে পর্দাকারী, হে দয়ালু, হে প্রবল প্রতাপশালী, হে স্রষ্টা, হে অতিশয় নেক-পরোপকারী! হে মহান আল্লাহ তায়ালা! আমাদেরকে যাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা/আশ্রয় দিন এবং সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করে দিন। হে রক্ষাকারী! হে রক্ষাকারী! হে রক্ষাকারী! আপনার রহমতে হে সর্বাধিক দয়ালু।
উল্লেখ্য,
আমাদের সমাজে অনেকে মনে করেন তারাউয়্যীহ নামাজ সঠিক নিয়মে আদায়ের জন্য নামাজ শেষে মোনাজাতে
এই দোয়াটি পড়া আবশ্যক। এমন ধারণা বা
বিশ্বাস মোটেও ঠিক নয়, এরূপ মনে করা বিদ’য়াত। তাই দোয়াটি পড়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তারাউয়্যীহ
নামাজ হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন তারাউয়্যীহ নামাজের প্রতি চার রাকাত পর পর পড়া
দোয়াটির সঙ্গে তারাউয়্যীহ বিশুদ্ধ হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।

0 ফেইসবুক: