বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি একটি বক্তব্যে ইছলামের ইতিহাস সংক্রান্ত এমন কিছু দাবি করেছেন, যা কেবল ভুল নয় বরং সচেতন বা অসচেতনভাবে ইতিহাস বিকৃতির পর্যায়ে পড়ে। বিষয়টি এখানে ব্যক্তিগত মতামতের নয়; বরং এটি তথ্য, ইতিহাস ও ধর্মীয় সততার প্রশ্ন।
তারেক রহমানের বক্তব্যটা কেবল “ভুল বলা” পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যা হলোঃ কে এই ভুল বলছেন, কোন জায়গা থেকে বলছেন, আর কোন নৈতিক অবস্থান নিয়ে বলছেন।
তারেক রহমান কোন সাধারণ রেন্ডম বক্তা নন। তিনি একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা। একই সঙ্গে তিনি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি, যারা ইতিহাসের প্রশ্নে অস্বাভাবিক রকম সংবেদনশীল। জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে যখন ভিন্ন ব্যাখ্যা হাজির হয়, বিএনপি তখন যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কারও অজানা নয়। সেখানে তারা যখন স্পষ্ট ভাষায় ইতিহাস বিকৃতি করে তা কি মানা যায়?
এখানে একটি রাজনৈতিক তুলনা না টানলে বিষয়টির প্রকৃত গভীরতা বোঝা যাবে না। তারেক রহমান হলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পুত্র। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করে আসছে। এই দাবিকে যখন আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে, তখন বিএনপি শিবিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তারা এটিকে ইতিহাস বিকৃতি, রাজনৈতিক অপপ্রচার এবং শহীদের অসম্মান বলে আখ্যায়িত করে।
ঠিক এখানেই প্রশ্নটা উঠে আসেঃ যারা নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাস বিকৃত হলে মানতে নারাজ, তারা যখন ইছলামের ইতিহাস নিয়ে কথা বলেন, তখন কি একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে না? একজন মুছলিম কি তখন নীরব দর্শক হয়ে থাকবে? যে দল নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রশ্নে এতটাই সংবেদনশীল, তারা যদি ইছলামের ইতিহাস বিকৃত করে, তাহলে একজন মুছলিম কেন সেটি মেনে নেবে? রাজনৈতিক ইতিহাসের বিকৃতি যদি অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে নবী, ছ্বহাবা ও উম্মুল মু’মিনীনদের ইতিহাস বিকৃতি কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়?
এখন আসা যাক বক্তব্যের মূল দুইটি দাবির দিকে।
প্রথমত, তারেক রহমান বলেছেন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সম্মানিতা (আহলিয়া) স্ত্রী হযরত খাদিজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালাম ছিলেন একজন “কর্মজীবী নারী”। এটি ইছলামের ইতিহাসকে আধুনিক পুঁজিবাদী শব্দভাণ্ডারের ভেতর জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়ার একটি মারাত্মক অপচেষ্টা। এমনকি এই শব্দচয়নটাই বলে দেয় এটা ইতিহাস বর্ণনা নয়, বরং আধুনিক আইডিওলজি চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা।
ইছলামের ইতিহাসে আম্মাজান খাদিজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালাম কখনোই সেই অর্থে “কর্মজীবী নারী” ছিলেন না, যে অর্থে আজ এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। তিনি অফিসে চাকরি করতেন না, কোনো কর্পোরেট কাঠামোর অংশ ছিলেন না, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণকারী কোনো ক্যারিয়ারিস্ট ফিগার ছিলেন না। ইছলামের ইতিহাসে উনাকে কখনোই কর্মজীবী নারী, বিজনেসওম্যান বা আধুনিক পুঁজিবাদী পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। উনাকে এই পরিচয়ে উপস্থাপন করা মানে বর্তমান সময়ের ক্যাটাগরি দিয়ে অতীতকে জোর করে মাপা।
তিনি ছিলেন একজন সম্মানিতা সম্পদশালী নারী, যিনি মুদারাবাভিত্তিক বিনিয়োগে সম্পৃক্ত ছিলেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইছলাম গ্রহণের পর তিনি নিজের সমস্ত সম্পদ ইছলামের জন্য উৎসর্গ করে দেন। উনার মর্যাদা কখনোই “উপার্জন” বা “ইনভেস্টমেন্ট” দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। উনার শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা কখনোই অর্থনৈতিক সক্রিয়তায় নির্ধারন হয়নি; বরং নির্ধারত হয়েছে উনার ত্যাগ, আখলাক, এবং রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন দ্বারা।
হযরত খাদিজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালাম-কে আজকের “ওয়ার্কিং উইমেন” ফ্রেমে ঢোকানো মানে উনার পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু সরিয়ে ফেলা। এটি ইতিহাস ব্যাখ্যা নয়, এটি ইতিহাসকে নিজের প্রয়োজনমতো রি-ডিজাইন করা। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সম্মানিতা আহলিয়া আমাদের সম্মানিতা আম্মাজান উনার উপর আধুনিক পুঁজিবাদী পরিভাষা চাপিয়ে দেওয়া কেবল তথ্যগত ভুলই নয়; বরং এটি উনার ব্যক্তিত্ব, অবস্থান ও ঐতিহাসিক পরিচয়কে বিকৃত করে উপস্থাপন করার শামিল। সহজ ভাষায় বললে, এটি অপবাদমূলক ফ্রেমিং।
আম্মাজান হযরত খাদিজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালাম ইছলামের ইতিহাসে পরিচিত ছিলেন “ত্বাহিরা” অর্থাৎ পবিত্রা হিসেবে। তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার কাছে পছন্দনীয় ছিলেন উনার তাক্বওয়া, আহাল (স্বামীর) প্রতি আনুগত্য, ত্যাগ ও খেদমতের কারণে। তিনি কষ্ট করে পাহাড় বেয়ে খাবার নিয়ে যেতেন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার জন্য। উনার মর্যাদা গঠিত হয়েছে ঈমান, দ্বীনের জন্যে ত্যাগ ও দাম্পত্য আনুগত্যের মাধ্যমে, কোনো আধুনিক কর্মজীবী পরিচয়ের মাধ্যমে নয়। স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা জিব্রাঈল য়ালাইহিছ ছালাম দ্বারা উনাকে ছালাম দিয়েছেন যার দৃষ্টান্ত বিরল নারী জাতির পুরো হিউম্যান ইতিহাতে।
দ্বিতীয়ত, তারেক রহমান দাবি করেছেনঃ বদরের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম। এটি নিঃসন্দেহে একটি মারাত্বক তথ্যগত ভুল।
ঐতিহাসিকভাবে এটি সুস্পষ্ট যে হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম বদরের যুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলেন না, কেননা সেসময় তিনি উপযুক্তই ছিলেন না। বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরি দ্বিতীয় সনে, যখন উনার বয়স ও জীবনপরিস্থিতি বিবেচনায় এমন কোনো ভূমিকার প্রশ্নই ওঠে না। সাধারণত উহুদ ও পরবর্তী কিছু যুদ্ধে নারীদের সেবামূলক কাজের বর্ণনা পাওয়া যায়, কিন্তু বদরের যুদ্ধে নয়।
বিএনপির অনেকে হয়তো বলবে, এটি একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল। তর্কের খাতিরেও যদি ধরে নেই এটি একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল, তাহলেও যেটা স্পষ্ট হবে সেটা হলো এই বক্তব্যের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-সামাজিক ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করা হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম উষ্ট্রের যুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলেন, কিন্তু কখনোই নেতৃত্বের অর্থে নয়। তিনি কোনো সেনাপতি ছিলেন না, কোনো কমান্ডার ছিলেন না, সম্মুখযুদ্ধ পরিচালনাকারী তো নয়ই। তিনি সেখানে ছিলেন একজন সম্মানিতা ফিগার হিসেবে, উনার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও অবস্থানের কারণে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোঃ হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম উনার জীবনের পরবর্তী সময়ে এই যুদ্ধে সম্পৃক্ত থাকার জন্য সারা জীবন আফসোস করেছেন। তিনি কখনোই এটিকে গৌরবের বিষয় হিসেবে দেখেননি, না প্রতিষ্টা করতে চেয়েছিলেন কখনো তারেক রহমান সাহেবের মতো। বরং এটিকে নিজের জীবনের একটি ইজতিহাদি ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবেই মনে করেছেন সবসময়।
অথচ আজ কোন মানুষ যদি এই ঘটনাকে ব্যবহার করে নারী নেতৃত্বের পক্ষে ধর্মীয় রেফারেন্স দাঁড় করাতে চায়। এটি দুঃখজনক, এবং বললে অত্যুক্তি হবে না, বরং প্যাথেটিক।
আমাদের বদনসিব হচ্ছে মুছলিম প্রধান এই দেশের কোন রাজনৈতিক নেতাই সম্মানিত দ্বীন ইছলামের আলোকে কখনো রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা করে না। মানুষের বিশ্বাস, আক্বিদা ও মূল্যবোধকে তারা গুরুত্ব দেয় না। উল্টো প্রয়োজন অনুসারে ধর্মকে ব্যবহার করে, আর সুযোগ পেলেই তার বিকৃতি ঘটায়।
আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, যেহেতু আমরা হাক্বিকি ক্বুরআন ছুন্নাহ এর অনুসারী, দুনিয়াবি রাজনীতির সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই, তাই আপনারা যেভাবে ইচ্ছা রাজনীতি করুন। আপনারা নারীদের নেতৃত্ব দিয়ে আসমানে তুলতে চান তুলুল, সেটা নিয়ে লুকোচুরি করার দরকার নাই, সরাসরিই তা বলুন। আপনারা পশ্চিমা ন্যারেটিভ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চান সেটাও স্পষ্টভাবে বলুন। কিন্তু দয়া করে ইছলামকে আপনাদের রাজনৈতিক এজেন্ডার একমাত্র টার্গেট বানাবেন না।
ইছলাম কারো প্রোপাগান্ডা টুল নয়। ইছলামিক বিষয়-আশয় যারা ইছলামকে জানে, মানে, বিশ্বাস ও য়া’মল দিয়ে ধারণ করে, সেই বিষয়গুলোর ফায়সালা কেবলই তাদের উপর ছেড়ে দিন।
নচেৎ একটি ভয়াবহ অশনিসংকেত সামনে দেখতে পাচ্ছি। ইতিহাস সাক্ষী আগুন নিয়ে খেললে, আগুনের তাপ প্রথমে হাত গরম করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাতই পুড়িয়ে দেয়।
এছাড়াও আপনার রিসেন্ট কিছু বক্তব্য অত্যন্ত বিরক্তিকর, যেমনঃ আপনি বলেছেনঃ ফরিদপুরে সয়াবিন বেশি হয়, অথচ বাস্তবতা হলো ফরিদপুরে ভুট্টা বেশি হয়। আপনি বলেছেনঃ কুমিল্লাতে ইপিজেড করবেন। অথচ বাস্তবতাঃ হলো কুমিল্লাতে অলরেডি ইপিজেড আছে। আপনি বলেছেনঃ উত্তরবঙ্গের স্বপ্ন তিস্তাব্যারেজ করবো। অথচ বাস্তবতা হলোঃ উত্তরবঙ্গে তিস্তাব্যারেজ আছে। আপনি বলেছেনঃ যশোরে পুনরায় চিনিকল চালু করবেন। অথচ বাস্তবতা হলোঃ যশোরে কোনকালেই চিনিকল ছিলো না। আপনি বলেছেনঃ আমাকে ভোট দিন। আমি নারীর ক্ষমতায়ন করবো। অথচ বাস্তবতা হলোঃ আপনার স্ত্রী ডা. জোবায়দা বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে প্রথম হয়েও এখন গৃহিণী। কোন প্রফেশনাল হিসেবে ডাক্তারি করেন না। আপনার মেয়ে জাইমা ব্যারিস্টার হওয়ার পরেও কোথাও আইন প্র্যাক্টিস করেন না। এদেশে একজন মানবীক নারী ডাক্তার, নারী ব্যরিষ্টার পাওয়া স্বপ্নের মতো অথচ আপনি নিজের ঘরে সেটা প্রতিষ্টা করেননি, সেখানে বাহীরে করবেন গ্যারান্টি দেওয়া কি লজিক্যাল?
যাইহোক, আপনাকে আরো তথ্যনির্ভর নেতা হতে হবে, নাহলে আজকে দেশের মানুষ হাসছে, কালকে দুনিয়া আসবে, কারণ আপনি যখন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বক্তব্য দিবেন, তখন বিদেশিরা আপনার বক্তব্যের বিরোধিতার আগে এটা ভাব্বেনা আমি তো বাংলাদেশে থাকি উনার ভুলের বিপরীতে আমি যদি কিছু বলি তাহলে উনার দলের লোকেরা আমাকে হয়রানি করবে, মারধর করবে, মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেবে, বরং আপনাকে উল্টাপাল্টা ইতিহাসবিকৃতীর কারনে ভাঁড় সাজিয়ে দেবে, একজন গ্রহণযোগ্য নেতা হবে এমন যার হক্ব কথার সামনে বিরোধী হয় কেটে দুই ভাগ হবে নতুবা তাসলীম হবে।
পরিশেষে
এটাও বলবো, যে জনাব তারেক রহমান, বাংলাদেশের মানুষের ৯৫% মুছলমান এবং অধিকাংশই
ছুন্নী, যাদের মধ্যে খুব অল্প পরিমাণে জামায়াত (অহাবী মৌদুদিপন্থী), জামায়াতের
বিরোধিতা করেন ভালো কথা, কিন্তু এর জন্যে ইছলাম কে টার্গেট ব্যবহার করা ছেড়ে দিন, জামায়াত
ইছলামের কোন ঠিকা নেয়নি, আওয়ামীলীগের পতন হয়েছিলো যুলুমের কারনে, আর সবচেয়ে বড়
যুলুম হলো খোঁদার সাথে যুলুম করা, আর ইছলামের বিপরীতে প্রত্যেকটা কাজই খোদার উপর
যুলুমের নামান্তর। আপনি হয়তো আগামিতে ক্ষমতায় চলে আসবেন, প্রধানমন্ত্রী হবেন, তবে
সেটাও সর্বচ্চো হলে হাছিনার মতো ১৫/২০ বছর, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহান আল্লাহ
পাক, এটা ভুলে যাবেন না, আপনার উচিৎ ভুল বক্তব্যের বিপরীতে রুজু হওয়া, মানুষকে
জানিয়ে দেওয়া আমার তথ্যে ভুল ছিলো আমাকে ক্ষমা করবেন বাংলাদেশের মুছলিমগণ।

0 ফেইসবুক: