প্রথমেই পরিষ্কার করে দিচ্ছি, এই ঘটনায় স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তি আমাদের আলোচনার লক্ষ্য নয়। সে স্বপ্নে অথবা স্বপ্ন থেকে সদ্য জাগ্রত অবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে কী উচ্চারণ করেছিলো, তাতে সে কাফির হয়েছে কি না সেটিও এখানে মূল প্রশ্ন নয়। আমাদের প্রশ্ন একটিইঃ
রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম
উনার নাম ও নবুওয়াতের স্থানে নিজের নাম উচ্চারিত হওয়ার ভয়াবহ ঘটনাকে আশরাফ আলী
থানভী কেন সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাখ্যান না করে নিজের “ছুন্নাতের অনুসারী” হওয়ার সার্টিফিকেট বানালো?
দারুল ইফতা ডট ইনফো ইচ্ছাকৃতভাবে এই মূল প্রশ্ন এড়িয়ে
স্বপ্নদ্রষ্টা দায়ী কি না, ঘুমন্ত মানুষের উপর
শরিয়তের বিধান কার্যকর হয় কি না এবং স্বপ্নের বাহ্যিক রূপ ও তাবীর ভিন্ন হতে পারে
কি না, এসব অপ্রাসঙ্গিক ফালতু আলোচনা দিয়ে থানভীর
গোস্তাখানামূলক আচরণ আড়াল করার চেষ্টা করেছে। তাদের জবাবের সার্চ-রেকর্ডেও
প্রথমে “জাগ্রত ও নিদ্রিত অবস্থার” বিধান আলোচনা করা হয়েছে এবং শেষে স্বপ্নদ্রষ্টা “কুফরি বাক্য উচ্চারণ করেছে কি না” সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করা হয়েছে। অথচ অভিযোগ থানভীর জবাবের
বিরুদ্ধে।
মূল ঘটনাঃ আল-ইমদাদে যা সত্যিই লেখা আছে
ঘঠনাটি আশরাফ আলী থানভী সম্পাদিত মাসিক আল-ইমদাদ, সফর ১৩৩৬ হিজরি, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৫ এ প্রকাশিত হয়েছিল। মূল স্ক্যান এখনো সংরক্ষিত আছে।
চিঠির বক্তব্যের পূর্ণ মর্ম হলোঃ এক ব্যক্তি লিখেছে, সে স্বপ্নে কালিমায়ে ত্বইয়্যিবাহঃ (لَا إِلٰهَ
إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ) পড়তে গিয়ে “মুহাম্মাদুর রছুলুল্লাহ”-এর পরিবর্তে আশরাফ আলী থানভীর নাম উচ্চারণ করছিল। স্বপ্নের মধ্যেই তার
মনে হলো, সে ভুল করেছে এবং সঠিকভাবে
কালিমা পড়া দরকার। সে
পুনরায় সঠিক কালিমা পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার জিহ্বা
থেকে আবারও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নামের
পরিবর্তে আশরাফ আলীর নাম বের হলো। দুই-তিনবার একই ঘটনা ঘটল। এরপর সে স্বপ্নে থানভীকে
কয়েকজন মানুষের সঙ্গে সামনে দেখতে পেল। প্রবল আবেগ ও দুর্বলতায় সে মাটিতে পড়ে চিৎকার করল এবং ঘুম
থেকে জেগে উঠল।
জেগে ওঠার পরও তার শরীর অবশ ও দুর্বল ছিল। স্বপ্নের ভুলটি
সংশোধন করার উদ্দেশ্যে সে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম
উনার উপর দরূদ পড়তে চাইল। কিন্তু তার জিহ্বায় উচ্চারিত হলোঃ (اللَّهُمَّ صَلِّ
عَلَى سَيِّدِنَا وَنَبِيِّنَا وَمَوْلَانَا أَشْرَفِ عَلِيٍّ) অর্থাৎ, “হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আমাদের নেতা, আমাদের নবী ও আমাদের
মাওলা আশরাফ আলীর উপর দরূদ প্রেরণ করুন।”
লোকটি একটি বিষয় স্পষ্ট করেছিল যে,
সে তখন জাগ্রত ছিলো ঘুমন্ত নয়; তবে তার দাবি অনুযায়ী উচ্চারণটি ইচ্ছাকৃত ছিল না, সে নিজেকে অসহায় মনে করছিল এবং জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করতে
পারছিল না। পরের
দিন সে অনেক কেঁদেছে এবং থানভীর প্রতি তার ভালোবাসার আরও অনেক কারণ রয়েছে বলেও
লিখেছে।
মূল
স্ক্যান ও প্রকাশিত প্রতিলিপি উভয় জায়গাতেই এই বিবরণ পাওয়া যায়।
এত ভয়াবহ বিবরণের উত্তরে থানভী মাত্র লিখলোঃ (اس واقعہ میں
تسلی تھی کہ جس کی طرف تم رجوع کرتے ہو وہ بعونہ تعالیٰ متبع سنت ہے) অর্থাৎ: “এ ঘটনায় এ মর্মে সান্ত্বনা
ছিল যে, যার দিকে তুমি
প্রত্যাবর্তন করছো, তিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালার সাহায্যে ছুন্নাতের অনুসারী।” এটি কোনো বিরোধীপক্ষের বানানো
বাক্য নয়। দেওবন্দীদের
দারুল ইফতাগুলোও স্বীকার করেছে যে এই বাক্যটি থানভীর এবং ঘটনাটি আল-ইমদাদ, পৃষ্ঠা ৩৪–৩৫-এ রয়েছে।
এখন এইখানে স্বপ্নদ্রষ্টা নয়, থানভীর প্রতিক্রিয়াই
অপরাধের কেন্দ্র
লোকটি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজ বিশ্বাস থেকে আশরাফ আলীকে নবী বলেনি। বরং সে বারবার বলেছে, কথাটি ভুল, সে সঠিক কালিমা ও
দরূদ পড়তে চেয়েছিল এবং উচ্চারণটি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটেছে। কাজেই স্বপ্নদ্রষ্টার
তাকফির নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে কোন লাভ নেই।
বরং এখানেই প্রশ্ন আরও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়।
একজন লোক যখন আতঙ্কিত হয়ে জানাল যে তার মুখ থেকে থানভীর নাম
“রছুলুল্লাহ” এবং “নাবিয়্যিনা” শব্দের সঙ্গে বের হয়েছে, তখন একজন সত্যিকার মুর্শিদ বা য়ালিমের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কী হওয়ার কথা ছিল?
তিনি প্রথমেই বলতেনঃ (لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ الْعَلِيِّ
الْعَظِيمِ) এবং: (أَعُوذُ
بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ) তারপর স্পষ্টভাবে বলতেনঃ “এটি মারাত্মক শয়তানী
ওয়াছওয়াছা অথবা মনের বিকার। আমার নামকে রছুলে পাক উনার নাম ও নবুওয়াতের উপাধির স্থানে
উচ্চারণ করা প্রকাশ্যভাবে বাতিল ও কুফরি অর্থবোধক। তুমি একে কোনো শুভ স্বপ্ন মনে
করো না।
মহান
আল্লাহ তা’য়ালার আশ্রয় চাও, সঠিক কালিমা ও দরূদ পড়ো এবং আমার প্রতি এমন সীমালঙ্ঘনকারী
আসক্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করো।”
কিন্তু থানভী তা করেনি। সে শয়তান থেকে আশ্রয় চাইতে
বলেনি, বাক্যগুলোকে কুফরি ও বাতিল
বলে প্রত্যাখ্যান করেনি, নিজের নামের প্রতি
অতিরঞ্জিত আসক্তি থেকে লোকটিকে সতর্ক করেনি। বরং ঘটনাটির মধ্যে নিজের জন্য “তাসল্লী” বা ইতিবাচক নিশ্চয়তা
খুঁজে বের করেছে। আর এটিই মূল অপরাধ যা অনেকে বড় বড় য়ালীম
উলামাও ফিকির করেনাই পূর্বে এর জবাব যখন দিয়েছিলো।
ক্বুরআন ও ছুন্নাহ কী প্রতিক্রিয়া শিক্ষা দেন?
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَإِمَّا
يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللهِ ۚ إِنَّهُ سَمِيعٌ
عَلِيمٌ) অর্থাৎ, “শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে স্পর্শ করলে মহান
আল্লাহ তা’য়ালার আশ্রয় প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি
সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (ছুরাহ আল-আ’রাফ, ৭:২০০) একই নির্দেশ ছুরাহ
ফুছছিলাত ৪১:৩৬-এও রয়েছে। শয়তানী কুমন্ত্রণা বা ভয়াবহ অনিচ্ছাকৃত ধারণার শরয়ী চিকিৎসা
হলো মহান আল্লাহ তা’য়ালার আশ্রয় চাওয়া; সেটিকে নিজের আধ্যাত্মিক মর্যাদার প্রমাণ বানানো নয়।
আর উক্ত আয়াতের তাফছিরের হাদীছে এসেছেন, খোদ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রাতে তাহাজ্জুদের জন্য দাঁড়ালে তিনবার
তাকবীর বলতেন, তিনবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
বলতেন,
ছুবহানাল্লাহী ওয়া বিহামদিহী তিনবার বলতেন, তারপর বলতেনঃ (أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْثِهِ) অর্থাৎ আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার কাছে আশ্রয় চাই, তার কুমন্ত্রণা হতে, অহংকার হতে, তার হাতে মৃত্যু হওয়া থেকে। (আবু দাউদঃ ৭৬৪, ইবন মাজাহঃ ৮০৭, মুছনাদে আহমাদঃ ৪/৮৫)
রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম
বলেছেন, অপছন্দনীয় বা ভয়ংকর স্বপ্ন
শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে। এমন স্বপ্ন দেখলে বাম দিকে হালকাভাবে তিনবার থুতুর ভঙ্গি
করতে, শয়তান থেকে মহান আল্লাহ তা’য়ালার আশ্রয় চাইতে এবং তা প্রচার না করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
অতএব, এই ঘটনার
ছুন্নাহসম্মত প্রতিক্রিয়া ছিল
ইস্তিআযাহ, প্রত্যাখ্যান ও
সতর্কতা। থানভীর
প্রতিক্রিয়া ছিল নিজের প্রশংসামূলক
তাবীর।
দারুল ইফতার প্রথম ধোঁকাঃ “ঘুমন্ত ব্যক্তির উপর
বিধান নেই”
এটি এমন এক প্রশ্নের উত্তর, যা অভিযোগকারীরা করেইনি।
হ্যাঁ, স্বপ্নের মধ্যে
অনিচ্ছাকৃতভাবে কুফরি শব্দ উচ্চারণ করলে কাউকে কাফির বলা হয় না, আমরা বলিওনা। জাগ্রত অবস্থাতেও
প্রকৃতপক্ষে জিহ্বা ফসকে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো বাক্য বের হলে, কিংবা কোন হালে বল্লেও তার হুকুম ইচ্ছাকৃত
বিশ্বাস ও স্বীকৃতির মতো নয়।
কিন্তু এ নীতি থানভীর কাজকে কীভাবে বৈধ করে?
স্বপ্নদ্রষ্টা দায়মুক্ত ধরে নিলাম। কিন্তু থানভী তো ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নে জবাব দেয়নি। সে সচেতন অবস্থায়
চিঠিটি পড়েছে, বুঝেছে এবং প্রকাশের উপযোগী
লিখিত জবাব দিয়েছে। তার
জবাবই আলোচ্যঃ “এ ঘটনায় সান্ত্বনা আছে যে আমি
ছুন্নাতের অনুসারী।” কাজেই স্বপ্নদ্রষ্টার ঘুমন্ত বা অনিচ্ছাকৃত অবস্থা থানভীর
সচেতন, লিখিত ও সম্পাদিত বক্তব্যের
জন্য কোনো প্রতিরক্ষা নয়।
দ্বিতীয় ধোঁকাঃ “খারাপ স্বপ্নের ভালো তাবীর
হতে পারে”
দারুল ইফতা বলেছে,
কোনো
স্বপ্ন বাহ্যিকভাবে ভয়াবহ হলেও তার তাবীর ভালো হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে হযরত উম্মুল
ফদ্বল রদ্বিআল্লাহু য়ানহা উনার
স্বপ্ন এবং পায়ে শিকল দেখার ভালো তাবীর উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর কোনো আলাদা দলিল ছাড়াই
থানভীর তাবীরকে সেই সাধারণ নীতির অধীনে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এটি স্পষ্ট যুক্তিগত প্রতারণা। “কিছু ভয়াবহ স্বপ্নের ভালো তাবীর হয়” এই সাধারণ নীতি থেকে কখনো প্রমাণ হয় না যেঃ “রছুলে পাক উনার নামের স্থলে আশরাফ আলীর নাম এবং ‘আমাদের নবী আশরাফ আলী’
উচ্চারণের
তাবীর হলো আশরাফ আলী ছুন্নাতের অনুসারী।”
এই নির্দিষ্ট তাবীরের পক্ষে তারা ক্বুরআন, হাদীছ, ছ্বহাবি, তাবিয়ি অথবা কোনো স্বীকৃত তাবীরশাস্ত্রের নির্দিষ্ট নীতি তারা দেখাতে পারেনি।
হযরত ইউছুফ য়ালাইহিছ ছালাম উনার স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্রের
দ্বারা তাঁর ভাইদের বোঝানো হয়েছিল এটি ওহীর মাধ্যমে সত্যায়িত নবীর তাবীর। সেই ঘটনা দেখিয়ে কোনো ব্যক্তি
নিজের নামকে “রছুলুল্লাহ” ও “নাবিয়্যিনা” শব্দের সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে নিজের পক্ষে প্রশংসায় রূপান্তর
করতে পারে না,
এরূপ হলে সকল পির তাছ্বাউফের নামে এইসব শুরু করে দিলে ক্বুফরে ছেয়ে যাবে দুনিয়া। অথচ দারুল ইফতা “তাবীরের বিশেষজ্ঞ ও ছ্বহিবে বাতিনই প্রকৃত অর্থ বের করতে পারেন” বলে হযরত ইউছুফ য়ালাইহিছ ছালাম উনার স্বপ্নের উদাহরণ টেনেছে।
এটি দলিল নয়; এটি নিজের লোককে
ভুলের ঊর্ধ্বে বসানোর অপ-কৌশল।
তৃতীয় ধোঁকাঃ “মুতাবি‘য়ে ছুন্নাত বলায় নবীজীর গোলামিই প্রকাশ পেয়েছে”
দেওবন্দীদের জবাবে বলা হয়েছে,
থানভী “মুতাবি‘য়ে ছুন্নাত” শব্দ ব্যবহার করে নাকি বুঝিয়ে দিয়েছে যে সে রছুলে পাক
ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার গোলাম এবং উনার ছুন্নাতের অনুসারী।
প্রশ্ন হলো, লোকটি কি থানভীকে
জিজ্ঞেস করেছিলঃ “আপনি কি ছুন্নাতের অনুসারী?”
না।
লোকটি জানিয়েছিল,
তার
জিহ্বায় থানভীর নাম “রছুলুল্লাহ” এবং “নাবিয়্যিনা” শব্দের সঙ্গে বের হচ্ছে। থানভীর প্রথম দায়িত্ব ছিল এই
কুফরি বিন্যাসকে ঘৃণাসহ প্রত্যাখ্যান করা। প্রত্যাখ্যানের পরিবর্তে “আমি ছুন্নাতের অনুসারী” বললে মূল অপরাধ মুছে যায় না। কেউ বিষের বোতলের উপর “এটি ছুন্নাতের অনুসরণের প্রতীক” লিখে দিলে বিষ মধু
হয়ে যায় না।
স্বপ্ন শরয়ী দলিল নয় দেওবন্দীদের নিজেদের ফতোয়াই সাক্ষী
দেওবন্দী প্রতিষ্ঠান বানুরী টাউনের আরেকটি ফতোয়াতেই স্পষ্ট
বলা হয়েছেঃ কোনো স্বপ্ন শরয়ী
দলিল নয়; এমনকি স্বপ্নে রছুলে পাক
ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে দেখার দাবি করা হলেও, স্বপ্নের বক্তব্য দিয়ে নতুন কোনো শরয়ী বিধান বা নিশ্চিত
দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
তাহলে প্রশ্ন হলোঃ একটি স্বপ্ন যদি শরয়ী দলিল না হয়, তবে সেই স্বপ্ন থানভীর “ছুন্নাতের অনুসারী” হওয়ার সার্টিফিকেট হলো কীভাবে?
থানভী ছুন্নাতের অনুসারী কি না, সেটি তার ক্বুরআন-ছুন্নাহসম্মত আক্বীদা ও আমল দ্বারা প্রমাণিত হবে। কারও জিহ্বায় তার নাম
“রছুলুল্লাহ” ও “আমাদের নবী” হিসেবে বের হওয়া তার ছুন্নাত অনুসরণের দলিল হতে পারে না। এরূপ হলে সকল পির তাদের
মুরিদ্দের দিয়ে মিথ্যা স্বপ্ন বলাই মুহইয়্যুছ ছুন্নাহ হয়ে যাওয়ার সহজ দলিল পেয়ে
যায়। অথছ সেই লোক তার মুরিদ ও ছিলোনা।
নিজের পবিত্রতা ও মর্যাদার সার্টিফিকেট বানানোর নিষেধাজ্ঞা
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (فَلَا
تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ ۖ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَىٰ) অর্থাৎ: “তোমরা নিজেদের
পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো না; কে মুত্তাক্বী, তিনি সর্বাধিক জানেন।” (ছুরাহ আন-নাজম, ৫৩:৩২) এখানে থানভীর সামনে
একটি ভয়াবহ পরীক্ষা এসেছিল। একজন নামমাত্র অনুসারীর মনে তার প্রতি এমন অস্বাভাবিক আসক্তি সৃষ্টি হয়েছে যে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নাম ও নবুওয়াতের উপাধির জায়গায় থানভীর নাম চলে
আসছে।
একজন নফছ থেকে মুক্ত মুর্শিদ এই ঘটনায় নিজের জন্য প্রশংসা খুঁজত না। বরং নিজের নাম মুছে
দিয়ে লোকটিকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার দিকে
ফিরিয়ে দিত।
কিন্তু
থানভী নিজের আমিত্বকে সামনে এনে বলল, এ ঘটনায় তার ছুন্নাতের অনুসারী হওয়ার
সান্ত্বনা রয়েছে। এখানেই
নফছ, হাওয়া এবং আত্মমুগ্ধতার প্রকাশ।
থানভীর প্রতিক্রিয়া কোন জায়গায় কুফরের হুকুমে পৌঁছায়?
প্রথমে মূলনীতি পরিষ্কার করতে হবে।
ইচ্ছাকৃতভাবে এবং অর্থ মেনে কোনো মানুষকে “রছুলুল্লাহ” বা “আমাদের নবী” বলা নিঃসন্দেহে কুফর। দেওবন্দীদের নিজেদের
ফতোয়াও স্বীকার করেছে, জাগ্রত ও স্বেচ্ছাকৃত
অবস্থায় অন্য কাউকে নবী মেনে এ ধরনের কালিমা পড়লে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়।
হানাফি ফিক্বহের স্বীকৃত মূলনীতি হলোঃ (الرِّضَا
بِالْكُفْرِ كُفْرٌ) অর্থাৎ: “কুফরের প্রতি
সন্তুষ্ট হওয়াও কুফর।” রদ্দুল মুহতার ও
আল-বাহরুর
রাইক্ব-এ কুফরকে তার কুফরী অবস্থাসহ
সম্মান করা বা তাতে সন্তুষ্ট হওয়ার প্রসঙ্গে এই নীতি উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব, হুকুমটি এভাবে বুঝতে
হবেঃ কুফরি বাক্যকে কুফর
হিসেবে ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান না করে সেটিকে সঠিক, শুভ, প্রশংসনীয় অথবা নিজের
আধ্যাত্মিক মর্যাদার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হলে এটি “তাস্বীবুল কুফর” বা কুফরকে সঠিক/শুভ প্রতিপন্ন
করা এবং “রিদ্বা বিল-কুফর”-এর হুকুমে পৌঁছে যায়। আর রিদ্বা বিল-কুফর
নিজেই কুফর।
থানভীর লিখিত উত্তরে ওই কুফরি শব্দগুলোর কোনো প্রত্যাখ্যান
নেই। বরং সে বলেছে, ঘটনাটিতে “তাসল্লী” আছে এবং সেই তাসল্লী তার নিজের “মুতাবি‘য়ে ছুন্নাত” হওয়া। অর্থাৎ, যে ঘটনাটি শুনে তার কলিজা কেঁপে ওঠা, হাওক্বালাহ ও ইস্তিআযাহ পাঠ করা এবং নিজের নামকে নবুওয়াতের
শব্দ থেকে বিচ্ছিন্ন করা উচিত ছিল, সেই ঘটনাটিকেই সে নিজের
পক্ষে মঙ্গলসূচক বানিয়েছে।
এ কারণেই এটি নিছক “স্বপ্নের ভুল তাবীর” নয়। এটি কুফরি মাদ্দাকে আত্মপ্রশংসার মাধ্যমে সুন্দর, ইতিবাচক ও সান্ত্বনাদায়ক করে উপস্থাপন করা।
ফিক্বী ভাষায়, ইবারত ও আচরণের উপর
কুফরের হুকুম আসে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির চূড়ান্ত তাকফিরের ক্ষেত্রে তার
উদ্দেশ্য, কুফরি অর্থকে সত্য বলে গ্রহণ
করা এবং সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতাগুলো আলাদাভাবে বিচার করা হয়। এই পার্থক্য কুফরি ইবারতকে
নির্দোষ বানায় না; বরং শরয়ী বিচারে
ইবারতের হুকুম এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর হুকুমের পদ্ধতিকে পৃথক রাখে।
দারুল ইফতার সামনে সরাসরি প্রশ্ন
দারুল ইফতা ডট ইনফোর মুফতিদের কাছে কয়েকটি সরাসরি প্রশ্নঃ
প্রথমত, স্বপ্নদ্রষ্টা দায়ী
কি না
সেটি
নিয়ে এত আলোচনা করলে কেন, যখন অভিযোগ থানভীর
সচেতন লিখিত জবাবের বিরুদ্ধে?
দ্বিতীয়ত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নামের স্থলে “আশরাফ আলী রছুলুল্লাহ” এবং দরূদে “আমাদের নবী আশরাফ আলী”
উচ্চারণ
হওয়ার নির্দিষ্ট তাবীর “থানভী ছুন্নাতের অনুসারী” এটি কোন ক্বুরআনী আয়াত, কোন হাদীছ অথবা কোন স্বীকৃত তাবীরের কিতাবে রয়েছে?
তৃতীয়ত, থানভী কেন একবারও
বলেনিঃ “এটি শয়তানের কাজ;
মহান
আল্লাহ তা’য়ালার আশ্রয় চাও এবং আমার
নামের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না”? সে এর দ্বারা কোন দলিলে
নিজেকে ছুন্নতের উপর রয়েছে প্রমাণ করলো?
চতুর্থত, অপছন্দনীয় স্বপ্নে
ইস্তিআযাহ করার স্পষ্ট ছুন্নাহ বাদ দিয়ে নিজের প্রশংসামূলক তাবীর দেওয়া কোন
ছুন্নাতের অনুসরণ?
পঞ্চমত, স্বপ্ন শরয়ী দলিল নয়
বলে তোমরাই যখন ফতোয়া দেও, তখন এই স্বপ্ন থানভীর “মুতাবি‘য়ে ছুন্নাত” হওয়ার দলিল হলো কীভাবে?
ষষ্ঠত, মহান আল্লাহ তা’য়ালা যখন বলেছেন,
“নিজেদের পবিত্রতার
সার্টিফিকেট দিও না”, তখন থানভী কীভাবে নিজের নামকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ভয়াবহ
ঘটনাকেই নিজের ছুন্নাত অনুসরণের
সার্টিফিকেট বানাল?
চূড়ান্ত রায়
এই ঘটনায় স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তি আমাদের টার্গেট নয়। সে ইচ্ছাকৃতভাবে
আশরাফ আলীকে নবী হিসেবে বিশ্বাস করেছে এমন প্রমাণ নেই। বরং সে ভুলটি বুঝেছে, সংশোধন করতে চেয়েছে এবং অনিচ্ছাকৃত হওয়ার কথা বলেছে, সে সংশোধনের চেষ্টা করলে
থানবির পক্ষ থেকে উল্টো তাকে ভুলের মধ্যেই ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু থানভীর অপরাধ স্পষ্টঃ সে নবুওয়াতসূচক কুফরি বাক্য শুনে হাওক্বালাহ ও
ইস্তিআযাহ পাঠ করে তা প্রত্যাখ্যান করেনি।
সে লোকটিকে শয়তানী ওয়াছওয়াছা, মানসিক বিকার অথবা নিজের প্রতি সীমালঙ্ঘনকারী আসক্তি থেকে সতর্ক করেনি।
সে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম
উনার সম্মান রক্ষার্থে নিজের নামকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেনি।
বরং সে কুফরি অর্থবোধক ঘটনাটিকে নিজের “ছুন্নাতের অনুসারী”
হওয়ার
সান্ত্বনা ও সার্টিফিকেট বানিয়েছে।
সুতরাং দারুল ইফতার “ঘুমন্ত ব্যক্তির উপর
হুকুম নেই” অথবা “ভয়ংকর স্বপ্নের ভালো তাবীর হতে পারে” এ দুটি বক্তব্য থানভীর কাজের কোনো জবাব নয়। এগুলো মূল অভিযোগ
থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কৌশল প্রতারণা বৈ কিছুই না, আর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু
য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন প্রতারক আমার উম্মত নয়।
মূল অভিযোগ হলোঃ থানভী কুফরি বাক্যকে
প্রত্যাখ্যান না করে সেটিকে নিজের আধ্যাত্মিক প্রশংসায় রূপান্তর করেছে। কুফরকে তার কুফরি
বৈশিষ্ট্যসহ সঠিক, শুভ বা সান্ত্বনাদায়ক
মনে করা “রিদ্বা বিল-কুফর” ও “তাস্বীবুল কুফর”-এর অন্তর্ভুক্ত; আর হানাফি ফিক্বহের মূলনীতি
অনুযায়ী, “الرِّضَا
بِالْكُفْرِ كُفْرٌ”-কুফরের প্রতি
সন্তুষ্টিও কুফর।
এটাই সেই প্রশ্ন,
যার
জবাব দারুল ইফতা ডট ইনফো দেয়নি, (তবে এই লিখার আগে কেউ তাদের ধরেছে বলেও মনে হয়না)। বরং স্বপ্নদ্রষ্টাকে
সামনে এনে থানভীর আমিত্ব, আত্মপ্রশংসা ও
গোস্তাখানামূলক তাবীরকে আড়াল করেছে।

0 ফেইসবুক: