Saturday, August 2, 2014

কাফির, মুশরিক, মুনাফিক্ব, মুর্তাদ, আহলে কিতাব ও ফাছিক্ব কাদেরকে বলে?

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জন্য। শতকোটি দরূদ ও ছালাম পেশ করছি আমাদের প্রাণের আক্বা, নূরে মুজাছছাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার উপর; আর উনার পবিত্র আহলে বাইত শরীফ য়ালাইহিমুছ ছালাম, খোলাফায়ে রাশেদীন, ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বিআল্লাহু য়া’নহুমা এবং ক্বিআমত পর্যন্ত উনাদের য়া’মল-আক্বিদায় অনুসরণকারীদের উপর।

সংজ্ঞা, পার্থক্য ও অত্যন্ত জরুরী সতর্কতাঃ দ্বীনের আলোচনায় “কাফির”, “মুশরিক”, “মুনাফিক্ব”, “মুর্তাদ”, “আহলে কিতাব” ও “ফাছিক্ব” এ শব্দগুলো অনেক ব্যবহৃত হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বহু ক্ষেত্রে এগুলো ঈলম ছাড়া, উছূল ছাড়া, এবং শর্ত-প্রতিবন্ধকতা না বুঝেই ব্যবহার করা হয়। ফলে হাক্ব কথা বলার বদলে মানুষ কখনো মারাত্মক জুলুম, কখনো সীমালঙ্ঘন, আবার কখনো নিজের ইমানের জন্যেও বিপদের দরজা খুলে ফেলে।

এই কারণে আগে একটি মূলনীতি বুঝে নেওয়া দরকারঃ

সাধারণ সংজ্ঞা বলা এক কথা, আর নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর চূড়ান্ত হুকুম বসানো আরেক কথা।

শরীয়তের পরিভাষাগুলোর অর্থ জানা জরুরী, কিন্তু স্পেসিফিক/ব্যক্তি-নির্দিষ্ট তাকফীর, তাফছীক্ব, বা তাবদী’য় এগুলো খেলাচ্ছলে এপ্লাইয়ের বিষয় নয়।

নিচে প্রতিটি পরিভাষা আলাদা করে সহজ, স্পষ্ট ও দলীলসম্মতভাবে তুলে ধরা হলো।

১) কাফির কাকে বলে?

কাফের শব্দটা মূলত “কুফর” শব্দের চূড়ান্ত রূপ“কুফর” শব্দের অর্থ হলো সত্যকে ঢেকে ফেলা, অস্বীকার করা, বা প্রত্যাখ্যান করাআর যে ব্যক্তি কুফর করে, অর্থাৎ সত্যকে অস্বীকার করে, তাকে কাফের বলা হয় শরঈ অর্থে কাফির হলো সেই ব্যক্তি, যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, গ্বইব, উনার ফেরেশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ, উনার নাজিলকৃত কিতাবসমূহ ও সেগুলোর হুকুম আহকাম, উনার নবী-রছুল য়ালাইহিমুছ ছালামগণ, আখিরাত, তাক্বদিরের ভালো/মন্দ, যিন জাতী, যান্নাত/যাহান্নাম বা দ্বীনের এমন কোনো জরুরী, অকাট্য ও সর্বজনবিদিত বিষয়কে অস্বীকার করে, যা অস্বীকার করলে ইছলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যেতে হয় এগুলো যে করে করে তাকে কাফের বলা হয়। যেমনঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَاَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ) নিশ্চয়ই যারা কুফর করেছে, আপনি তাদেরকে সতর্ক করুন বা না করুন, উভয়টাই তাদের জন্যে সমান, তারা ইমান আনবে না (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:৬) মহান আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেনঃ (إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنْ أَهْلِ ٱلْكِتَـٰبِ وَٱلْمُشْرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيهَآ‌) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কুফর করেছে এবং মুশরিকরাও যাহান্নামের আগুনের মধ্যে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। (ছুরাহ আল-বাইয়্যিনাহ ৯৮:৬)

অতএব যে ব্যক্তি ইছলামের মৌলিক সত্যকে অস্বীকার করে, সে কাফির। তবে এইখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো কোনো বক্তব্য বা বিশ্বাস কুফর হতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট ব্যক্তি তৎক্ষণাৎ কাফির হয়ে গেছে এ কথা বলার আগে বিস্তারিত যাচাই আবশ্যক। কারণ অজ্ঞতা, ভুল ব্যাখ্যা, জবরদস্তি, মানসিক অক্ষমতা, ভাষাগত অস্পষ্টতা, বা প্রমাণ না পৌঁছানোর বিষয় হুকুমকে প্রভাবিত করতে পারে।

২) মুশরিক কাকে বলে?

যে শিরক করে তাকে মুশরিক বলে। “শিরক” শব্দের অর্থ শরীক করা, অংশীদার বানানো। মুশরিক হলো সেই ব্যক্তি, যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সত্তা, গুণ, হক্ব, ঈবাদাত, ক্ষমতা, বা উপাস্যতার বেলায়/মধ্যে কাউকে শরীক বানায়; অর্থাৎ এমনভাবে কাউকে দাঁড় করায়, যা একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা উনারই জন্যে খাছ। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ (إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِۦ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٲلِكَ لِمَن يَشَآءُ) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সাথে শরীক করা হলে তা ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্যান্য (যেকোন) অপরাধ যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করে দেন। (ছুরাহ আন-নিছা ৪:৪৮) আরোও ইরশাদ করেনঃ (اِنَّهٗ مَنۡ یُّشۡرِكۡ بِاللّٰهِ فَقَدۡ حَرَّمَ اللّٰهُ عَلَیۡهِ الۡجَنَّۃَ) নিশ্চয়ই যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সাথে শরীক করে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তার জন্য যান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। (ছুরাহ আল-মাইদাহ ৫:৭২)

এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝা জরুরীঃ

প্রত্যেক মুশরিকই কাফির; কিন্তু প্রত্যেক কাফিরই মুশরিক নয়।

কারণ কুফর একটি বিস্তৃত পরিভাষা, আর শিরক কুফরের একটি বিশেষ ও ভয়াবহ ধরন।

সুতরাং যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জন্যে নির্ধারিত ঈবাদাত অন্যের জন্যে করে, বা কাউকে স্বাধীনভাবে গ্বাইবদাতা, রিযিকদাতা, সর্বশক্তিমান, বা উপাস্যের মর্যাদায় দাঁড় করায়, সে শিরকের মধ্যে পতিত হয়। তবে এখানেও ব্যক্তি-নির্দিষ্ট হুকুমে একই সতর্কতা প্রযোজ্য।

৩) মুনাফিক্ব কাকে বলে?

নেফাক্ব এর অধিকারী ব্যক্তিকে শরীয়তের পরিভাষায় মুনাফিক্ব বলা হয়ে থাকে। আর “নিফাক্ব” অর্থ দ্বিমুখীতা, কপটতা, বাহিরে একরূপ আর ভিতরে আরেকরূপ হওয়া। শরঈভাবে মুনাফিক্ব দুই প্রকারঃ

১) ই‘য়তিক্বদী মুনাফিক্বঃ যে ব্যক্তি মুখে মুছলিম দাবি করে, কিন্তু অন্তরে ইমান রাখে না। বাহিরে মুছলিম, ভিতরে কাফির। এরা প্রকৃতপক্ষে কুফরের মধ্যেই আছে। যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ (إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ) অর্থাৎ নিশ্চয়ই মুনাফিকরা যাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। (ছুরাহ আন-নিছা ৪:১৪৫)

২) য়া’মলী মুনাফিক্বঃ যে ব্যক্তির মধ্যে মুনাফিক্বদের কিছু স্বভাব পাওয়া যায়; যেমন মিথ্যা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, আমানতের খিয়ানত করা, ঝগড়ার সময় সীমালঙ্ঘন করা ইত্যাদি। এতে মানুষ গুনাহগার হয়, ভয়ংকর রোগে আক্রান্ত হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাকে ই‘য়তিক্বদী মুনাফিক্ব বা কাফির বলা যাবে এটা সঠিক নয়। সম্মানিত হাদীছ শরীফে এসেছেনঃ (آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ) মুনাফিক্বের আলামত তিনটিঃ “যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে, আর যখন আমানত দেওয়া হয় খিয়ানত করে। (বুখারী শরীফ ৬০৯৫, মুছলিম শরীফ ৫৯এ)

অতএব “মুনাফিক্ব” শব্দটি খুব ভয়ংকর শব্দ। কোনো ভুল, পাপ, দুর্বলতা, বা রাজনৈতিক মতভেদ দেখেই কাউকে মুনাফিক্ব বলা ঈলমী কাজ নয়। ই‘য়তিক্বদী নিফাক্ব প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন বিষয়।

৪) মুর্তাদ কাকে বলে?

যে ব্যক্তি রিদ্দাহ করে তাকে মুর্তাদ বলে। রিদ্দাহ এর অধিকারী ব্যক্তিকে শরীয়তের পরিভাষায় মুর্তাদ বলা হয়ে থাকেআর “রিদ্দাহ” অর্থ ফিরে যাওয়া, অর্থাৎ মুছলিম হওয়ার পর ইছলাম থেকে বের হয়ে কুফরির দিকে ফিরে যাওয়া শরঈ অর্থে মুর্তাদ হলো সেই ব্যক্তি, যে মুছলিম হওয়ার পর এমন কথা, বিশ্বাস, বা কাজ করে, যার দ্বারা সে ইছলাম থেকে বের হয়ে যায়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَمَن يَرْتَدِدْ مِنكُمْ عَن دِينِهِۦ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُوْلَـٰٓئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَـٰلُهُمْ فِى ٱلدُّنْيَا وَٱلْأَخِرَةِ‌ۖ وَأُوْلَـٰٓئِكَ أَصْحَـٰبُ ٱلنَّارِ‌ۖ هُمْ فِيهَا خَـٰلِدُونَ) তোমাদের মধ্যে যে নিজ দ্বীন থেকে ফিরে যায়, অতঃপর কাফির অবস্থায় মারা যায় তাদের য়া’মল দুনিয়া ও আখিরাতে বরবাদ হয়ে যায়। আর এরাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:২১৭)

আর হাদীছ শরীফে এসেছেনঃ (مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ) যে ব্যক্তি তার দ্বীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করো। (ছ্বহীহ আল-বুখারী শরীফ, ইবনে মাজাহ ২৫৩৫, নাছাই শরীফ ৪০৫৯, ৪০৬১, ৪০৬২, ৪০৬৩, ৪০৬৪) কিন্তু এখানেও উছূল আছে। “মুর্তাদ” বলার আগে দেখা হবেঃ

সে কী বলেছে?

কোন অর্থে বলেছে?

সে জানত কি না?

তাকে বুঝানো হয়েছে কি না?

সে জোরের মুখে ছিল কি না?

ভুল উচ্চারণ, ভাষাগত অস্পষ্টতা, বা অজ্ঞতার কারণে হয়েছে কি না?

অর্থাৎ রিদ্দাহর সাধারণ সংজ্ঞা বলা সহজ, কিন্তু নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর রিদ্দাহর হুকুম দেওয়া য়া’লিম, ক্বাযী, ও শরঈ বিচারব্যবস্থার বিষয়। সাধারণ মানুষের খেয়ালখুশির বিষয় নয়।

৫) আহলে কিতাব কারা?

আহলে কিতাব বলা হয় মূলত সেইসব সম্প্রদায়কে, যারা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের দাবিদার; বিশেষ করে ইয়াহূদ ও নাছারা। আল-ক্বুরআনুল কারীমে এদেরকে আলাদা পরিচয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (قُلْ يَـٰٓأَهْلَ ٱلْكِتَـٰبِ تَعَالَوْاْ إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَآءِۭ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا ٱللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِۦ شَيْــًٔا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ ٱللَّهِ‌ۚ فَإِن تَوَلَّوْاْ فَقُولُواْ ٱشْهَدُواْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ) (ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি তাদের বলে দিন, “হে আহলে কিতাব (ইহুদী ও নাছারা, ছাবায়ী), আসো এমন একটি ন্যায়সঙ্গত ও সমান কথার দিকে, যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে অভিন্ন আর তা হলো, আমরা মহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কারো ঈবাদাত করবো না, উনার সাথে কোনো কিছুকেই শরীক করবো না, এবং আমাদের কেউ মহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অপর কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করবো না” অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে বলে দিন, “তোমরা সাক্ষী থাকো যে, নিশ্চয়ই আমরা মুছলমান (ছুরাহ আলে-ঈমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩:৬৪)

তবে “আহলে কিতাব” বলা মানে এই নয় যে তারা নাজাতপ্রাপ্ত বা সঠিক আক্বীদার উপর রয়েছে। বরং হুযূর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার রিছালাত অস্বীকার করলে তারা কুফরের মধ্যেই থাকবে। সুতরাং “আহলে কিতাব” একটি পরিচয়গত শরঈ শ্রেণী; এটি “মুওমিন” হওয়ার সমার্থক নয়।

৬) ফাছিক্ব কাকে বলে?

যারা ফিছক্বের অধিকারী তাদের ফাছিক্ব বলা হয়। “ফিছক্ব” শব্দের অর্থ হলোঃ অবাধ্যতা, সীমা ভঙ্গ করা, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমের বাইরে চলে যাওয়া। শরঈ অর্থে ফাছিক্ব হলো সেই মুছলিম, যে কবীরা গুনাহে লিপ্ত, বা প্রকাশ্যে গুনাহ করতে অভ্যস্ত, কিন্তু এমন কুফরে লিপ্ত হয়নি যা তাকে ইছলাম থেকে বের করে দেয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (أَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَمَنْ كَانَ فَاسِقًا ۚ لَا يَسْتَوُونَ) অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মুওমিন, সে কি ফাছিক্বের মতো? তারা উভয়ে সমান নয়। (ছুরাহ আছ-ছেযদাহ ৩২:১৮)

অর্থাৎ ফাছিক্ব ব্যক্তি মুছলিম হতে পারে, কিন্তু সে নাফরমান, পাপী, ও ভয়ংকর ঝুঁকির মধ্যে আছে। তার গুনাহ বড়, তার পরিণতি আশঙ্কাজনক, কিন্তু তাকে সঙ্গে সঙ্গে কাফির বলা হবে না যতক্ষণ না তার মধ্যে পরিষ্কার নওয়াকিযে ইছলাম পাওয়া যায়। যেমনঃ যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে হারাম কাজে লিপ্ত, কবীরা গুনাহকে হালকা ভাবে, তাওবাহ ছাড়া গুনাহে ডুবে থাকে, শরীয়তের আদব-আহকাম ভেঙে জীবন কাটায় সে ফাছিক্ব হতে পারে। কিন্তু “ফাছিক্ব” আর “কাফির” এক জিনিস নয়, এ পার্থক্য না বুঝলে ভয়াবহ ফিতনা তৈরি হয়।

তবে এইখানে একটা কথা, ফাছিক্বে আছলি বলে একটা বিষয় আছে, যা সাধারণত শোনা যায়না। কেনো তা আমার জানা নাই, তবে আমি জানানোর প্রয়োজন মনে করছি। যখন কেউ ফাছিক্বে আছলি হয়ে যায়, তখন তার জন্যে হেদায়েতের দরজা চিরস্থায়ী বন্ধ হয়ে যায়। যেমনঃ (وَمَا يُضِلُّ بِهِۦٓ إِلَّا ٱلْفَـٰسِقِي) বস্তুতঃ ফাছিক্বদের ব্যতীত অন্য কাউকে তিনি গুমরাহ করেন না। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:২৬) অন্যখানে বলেনঃ (وَٱللَّهُ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلْفَـٰسِقِينَ) আর মহান আল্লাহ তায়ালা (কখনো) ফাছিক্ব সম্প্রদায়কে হেদায়াত প্রদান করেন না। (ছুরাহ আল-মাইদাহ ৫:১০৮, আত-তাওবাহ ৯:২৪)

পরিশেষেঃ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাঃ সংজ্ঞা আর ব্যক্তি-নির্দিষ্ট হুকুম এক নয়। এই জায়গাটিতেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা হয়। অনেকেই মনে করেন, “অমুক কথা কুফর” শুনলেই “অমুক ব্যক্তি কাফির” ব্যস, ব্যাপার শেষ। অথচ আহলুছ ছুন্নাহ এর উছূল তা নয়। সঠিক পদ্ধতি হলোঃ

প্রথমে দেখা হবে বক্তব্য, বিশ্বাস, বা কাজটি নিজে কুফর/শিরক/ফিছক্ব কি না।

তারপর দেখা হবে এই ব্যক্তি কি সেই অর্থই বুঝেছে?

তার কাছে দলীল পৌঁছেছে কি না?

অজ্ঞতা, ভুল, জবরদস্তি, ভুল ব্যাখ্যা, ভাষাগত সমস্যা আছে কি না?

হুজ্জাত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না?

প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছে কি না?

এইসব না দেখে ব্যক্তি-নির্দিষ্ট তাকফীর করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

সম্মানীত হাদীছ শরীফে এসেছেনঃ (إِذَا قَالَ الرَّجُلُ لِأَخِيهِ: يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا) অর্থাৎ, যখন কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে বলে, “হে কাফির”, তখন এ কথাটি দু’জনের একজনের উপরই ফিরে যায়। (বুখারী শরীফ ৬১০৩, মুছলিম শরীফ ৬০বি, তিরমিযি শরীফ ২৬৩৭) অর্থাৎ তাকফীর কোন মজার বিষয় নয়, গালি নয়, আবেগের কথা নয়, ফেসবুকি স্লোগানও নয়। এটা শরঈ হুকুম; ভুল করলে তার ভয়াবহ পরিণতি আছে।

কিছু সাধারণ ভুল ধারণার জবাবঃ একটি বড় ভুল হলোঃ সব বড় পাপীকে কাফির মনে করা। এটি খারিজী ধাঁচের বিচ্যুতি। কবীরা গুনাহ মানুষকে ফাছিক্বে-আম করতে পারে, কিন্তু সবসময় কাফির বানায় না। আরেকটি ভুল হলোঃ রাজনৈতিক মতভেদ, সামাজিক অবস্থান, বা বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতাকেও সরাসরি “নিফাক্ব” বলে দেওয়া। নিফাক্বের সংজ্ঞা শরঈ; এটা শুধু কারও অমুক দলে থাকা বা অমুক মত রাখা দিয়ে প্রমাণিত হয় না।

আবার কেউ কেউ “আহলে কিতাব” শব্দ শুনে মনে করে তারা বুঝি ইমানদারদের মতোই। এটাও ভুল। আহলে কিতাব একটি পরিচয়গত শ্রেণী, নাজাতের গ্যারান্টি নয়। আরও একটি ভুলঃ মুশরিক ও কাফিরকে সর্বদা একেবারে একইভাবে ব্যবহার করা। যদিও মুশরিক অবশ্যই কুফরের মধ্যে, তবু সব কাফিরকে মুশরিক বলা সবসময় শুদ্ধ নয়।

উপসংহারঃ “কাফির”, “মুশরিক”, “মুনাফিক্ব”, “মুর্তাদ”, “আহলে কিতাব” ও “ফাছিক্ব” এসব শব্দের অর্থ জানা জরুরী, কারণ দ্বীন বুঝতে হলে শরঈ পরিভাষা বুঝতেই হবে। কিন্তু এগুলো মুখস্থ করে মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া, আন্দাজে হুকুম দেওয়া, বা আবেগে তাকফীর করা ইছলামের পথ নয়।

হক্ব কথা বলতে হবে, বাতিলকে বাতিল বলতে হবে, কুফরকে কুফর বলতে হবে, শিরককে শিরক বলতে হবে, দ্বীনের বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। কিন্তু একইসাথে উছূলও মানতে হবে। কারণ প্রত্যেক কুফরী কথা বলা ব্যক্তি অবিলম্বে কাফির সাব্যস্ত হয়ে যায় না, যতক্ষণ না শর্তসমূহ পূর্ণ হয় এবং প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর হয়। এ ভারসাম্য হারালে মানুষ কখনো মুরজিয়াহ হয়ে যায়, আবার কখনো খারিজী স্বভাবের ফিতনায় পড়ে যায়।

অতএব পথ একটাইঃ-

ঈলমের সাথে কথা বলা,

আল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ মুবারক এর আলোকে কথা বলা,

আহলুছ ছুন্নাহ এর উছূল মেনে কথা বলা,

এবং ব্যক্তি-নির্দিষ্ট হুকুমে তাড়াহুড়া না করা।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে হাক্ব বুঝার তাওফীক দান করুন, হাক্বের উপর অটল রাখুন, বাতিলকে বাতিল হিসেবে চিনার নূর দান করুন, এবং জিহ্বা ও কলমকে সীমালঙ্ঘন থেকে হেফাজ্বত করুন। আমীন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: