এবার আসুন মূল বিষয়ে চলে যাই। যে হাদিছের হাক্বিকত না বুঝে আবু তোহা আদনান বক্তব্য দিয়েছে তা হলোঃ “ইয়াহ্ইয়া ইবনু বুকায়র রহমতুল্লাহ আম্মাজান হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ওয়াছাল্লামের প্রতি সর্বপ্রথম যে ওহী আসে, তা ছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে ভোরের আলোর ন্যায় প্রকাশ পেত। তারপর উনার কাছে নির্জনতা প্রিয় হয়ে উঠে এবং তিনি (প্রায়) হেরা গুহায় নির্জনে (মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ইবাদতে নিমগ্ন) থাকতেন। আপন পরিবারের কাছে ফিরে আসা এবং কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ব্যতীত সেখানে তিনি একাধারে বেশ কয়েক রাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন।
তারপর খাদীজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালামের কাছে ফিরে এসে আবার অনুরূপ সময়ের জন্য কিছু খাদ্যসামগ্রী নিয়ে চলে যেতেন। এমনিভাবে “হেরা গুহায় অবস্থানকালে একদিন উনার নিকট (আল কুরআনের প্রথম) ওহী এলো। উনার কাছে ফিরিশতা (জিব্রাইল আমিন য়ালাইহিছ ছালাম) এসে বললেন, পাঠ করুনঃ রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ওয়াছাল্লাম বললেনঃ আমি বললাম, আমি পাঠক নই (বা আপনার হুকুমে পাঠ করবনা)। তিনি (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ওয়াছাল্লাম) বলেনঃ তারপর তিনি (জিব্রাইল য়ালাইহিছ ছালাম) আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হল। তারপর তিনি (য়ালাইহিছ ছালাম) আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পাঠ করুনঃ “আমি বললাম, আমি পাঠক নই (বা আপনার হুকুমে পাঠ করবনা)”। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিলেন যে, আমার অত্যন্ত কষ্ট হল। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পাঠ করুনঃ “আমি বললাম, আমি পাঠক নই (বা আপনার হুকুমে পাঠ করবনা)”। রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ওয়াছাল্লাম বলেন, তারপর তৃতীয়বার তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। এরপর ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ (اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ عَلَقٍ اِقۡرَاۡ وَ رَبُّکَ الۡاَکۡرَمُ) (হে নবী ছ্বল্লল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ওয়াসাল্লাম) “পাঠ করুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিন্ড হতে। পাঠ করুন, আর আপনার রব বড়ই অনুগ্রহশীল।” (আল কুরআনঃ ৯৬:১-৩) (অতঃপর রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ওয়াছাল্লাম তা পাঠ করলেন রবের হুকুম পালনার্থে)
তারপর যখন এ আয়াত নিয়ে রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ওয়াছাল্লাম বাড়িতে ফিরে এলেন। তখন উনার হার্ট কাঁপতেছিলো। তিনি খাদীজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালামের নিকট এসে বললেন, আমাকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দাও, আমাকে চাঁদর দিয়ে ঢেকে দাও। তিনি (য়ালাইহাছ ছালাম) উনাকে (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ওয়াছাল্লামকে) চাঁদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। অবশেষে উনার (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ওয়াছাল্লামের) অন্তর থেকে ভয় দূর হলে তিনি খাদীজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালামের নিকট সকল ঘটনা খুলে বললেন, তিনি (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) বলেন আমি নিজের উপর আশংকা বোধ করছি। খাদীজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালামকে বললেন, মহান আল্লাহ পাক উনার কছম, কক্ষনো না। মহান আল্লাহ পাক আপনাকে কক্ষনো অপমানিত করবেন না। আপনিতো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায় দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন।
এরপর উনাকে (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে) নিয়ে খাদীজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালাম উনার চাচাতো ভাই ওয়ারকা ইবনু নাওফেলের কাছে গেলেন, যিনি জাহিলী যুগে ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইবরানী ভাষা লিখতে জানতেন এবং মহান আল্লাহ পাকের তওফীক অনুযায়ী ইবরানী ভাষায় ইনজীল থেকে (আরবি) অনুবাদ করতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ এবং বয়সের দ্বরুন অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজাতুল কুবরা য়ালাইহাছ ছালাম উনাকে বললেন, হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ওয়ারাকা বিন নওফেল উনাকে (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ভাতিজা! আপনি কী দেখেছেন?’ রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যা দেখেছিলেন, সবই খুলে বললেন।
তখন ওয়ারাকা বিন নওফেল উনাকে (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) বললেন, ইনি সেই নামুস (দূত) যাঁকে মহান আল্লাহ পাক হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালামের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন যুবক থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন আপনার কওম আপনাকে বের করে দেবে। রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম (আশ্চর্য হয়ে) বললেনঃ তাঁরা কি আমাকে বের করে দিবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, অতীতে যিনিই আপনার মত (মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে) কিছু নিয়ে এসেছেন উনার সঙ্গেই শত্রুতা করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে আপনাকে প্রবলভাবে সাহায্য করব। এর কিছুদিন পর ওয়ারাকা বিন নওফেল রদ্বিআল্লাহু আনহু ইন্তেকাল করেন। আর কিছু দিনের জন্য ওহী আসা বন্ধ থাকে। তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এ অবস্থার কারণে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। “এমনকি আমরা এ সম্পর্কে উনার থেকে জানতে পেরেছি যে”, তিনি (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) পর্বতের চূড়া থেকে নিচে পড়ে যাবার জন্য একাধিকবার দ্রুত সেখানে চলে গেছেন। যখনই নিজেকে ফেলে দেয়ার জন্য পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিব্রাইল য়ালাইহিছ ছালাম উনার (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের) সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলতেন, হে মুহাম্মাদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! নিঃসন্দেহে আপনি মহান আল্লাহ তা’য়ালার রছুল। এতে উনার অস্থিরতা দূর হত এবং নিজ মনে শান্তিবোধ করতেন। তাই সেখান থেকে ফিরে আসতেন। ওয়াহীর বিরতির অবস্থা যখন উনার উপর দীর্ঘ হত তখনই তিনি ঐরূপ উদ্দেশে দ্রুত চলে যেতেন। যখনই তিনি পর্বতের চূড়ায় পৌঁছতেন, তখনই জিব্রাইল য়ালাইহিছ ছালাম উনার সামনে আত্মপ্রকাশ করে আগের মত বলতেন। (বুখারী শরীফ, হাদীছ নং-৬৯৮২)
এখন প্রশ্ন হলো খোদ রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার শরীয়তে আত্মহত্যা করা হারাম হওয়ার পরে উনি কি এই কুফুরী কাজ করার চেষ্টা করেছেন? নাউযুবিল্লাহ!!! নাউযুবিল্লাহ!!! নাউযুবিল্লাহ!!!
পাঠকের আক্বিদাহ বিশুদ্ধ করার নিমিত্তে বলা প্রয়োজন যে উক্ত বিষয়ে মুহাদ্দিসীনে কেরাম রহমতুল্লাহি য়ালাইহিম থেকে একাধিক জবাব রয়েছে। যার কয়েকটি নিচে উদ্ধৃত করা হলঃ
১) ইবনে হাজার আছকালানী রহমতুল্লাহ বলেনঃ উক্ত বর্ণনায় “এমনকি আমরা এ সম্পর্কে তার থেকে জানতে পেরেছি যে” এরপর থেকে যা বর্ণিত হয়েছে এর প্রবক্তা হলেন ইমাম জুহরী (হযরত আয়শা য়ালাইহাছ ছালাম নন)। আর উপরোক্ত কথার অর্থ হলো, এ বিষয়ে আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে এর সারমর্ম হল…..। বাকি বর্ণনা ইমাম জুহরী বাড়িয়েছেন। এটি মুত্তাসিল তথা হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম পর্যন্ত সূত্রবদ্ধ নয়। আল্লামা কিরমানী রহমতুল্লাহ বলেন, একথাই পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে। (ফাতহুল বারী-১২/৩৫৯)
২) আল্লামা মাকদিছি রহমতুল্লাহ বলেনঃ এটি ইমাম জুহরী বা অন্য কারো বক্তব্য। হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালামের বক্তব্য নয়। তথা “এমনকি আমরা এ সম্পর্কে তার থেকে জানতে পেরেছি যে” এর পরের বক্তব্যটি হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালামের উক্ত হাদীসে এ বিষয়ে কিছুই বলেননি। (আল হাদীছুল মুকতাফী ফী মাবআছিন নাবীয়্যিল মুছতাফা - ১৭৭)
৩) উক্ত অংশটি সন্দিহান হওয়ার আরেকটি কারণ হল, ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহ তিনি উনার কিতাবুত তাবীরে যে হাদীসটি এনেছেন তা তিনি বুখারী শরীফের প্রথম খন্ডের বাদউল ওহীতে এনেছেন। কিন্তু তাতে এ অতিরিক্ত অংশটি আনেননি।
উক্ত অতিরিক্ত অংশসহ ইমাম আহমাদ রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার মুসনাদে আহমাদে ৬/২৩২-২৩৩ পৃষ্ঠায় এবং আবু নুআইম রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার আদ-দালাইল গ্রন্থের ৬৮-৬৯ পৃষ্ঠায় এবং ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার আদ-দালাইল গ্রন্থের ১/৩৯৩-৩৯৫ পৃষ্ঠায় ইমাম আব্দুর রাজ্জাক রহমতুল্লাহি য়ালাইহি মা’মার থেকে বর্ণনা করেছেন। এই একই সুত্রে ইমাম মুছলিম ছ্বহীহ মুছলিমের ১/৯৮ পৃষ্ঠায় এনেছেন। কিন্তু তাতে এ অতিরিক্ত অংশ নেই। এমনিভাবে আকীল বিন খালিদের সূত্রে ছ্বহীহ মুছলিম এবং মুসনাদে আহমাদের ৬/২২৩ নং পৃষ্ঠায় এনেছেন। কিন্তু তাতে এ অতিরিক্ত অংশ নেই।
তাহলে কি বুঝা গেল? আকীল এবং ইউনুসের বর্ণনায় এ অংশ নেই। আছে শুধু মা’মারের বর্ণনায়। তাই এটি শাজ বর্ণনা।
৪) এখন যদি কথা প্রসঙ্গে, বা তর্কের খাতিরে ধরেও নেই (আউযুবিল্লাহ) এটি একটি ছ্বহিহ বিষয়, বা সত্য ঘটনা তাহলে এটা স্পষ্ট বিষয় যে এটি হলো “আত্মহত্যা নিষিদ্ধ হবার আগের আমল”। তাই এটি কোন দোষণীয় আমল ও বলার সুযোগ নাই। নিষিদ্ধ হবার পর রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এমন করেননি। (ইরশাদুস সারী) (আরবি IslamQA’এর মধ্যে আরো বিশধভাবে দলিলাদি পেশ করা হয়েছে, যা ছালাফি, লা মাজহাবিদের অনলাইন ফতোয়ার সবচেয়ে বড় ওয়েবসাইটগুলির একটি।)

0 ফেইসবুক: