ভূমিকাঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন। তবে মানবজাতির জন্য শুধু সম্পদের মালিক হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সে সম্পদকে পবিত্র করতে হবে এবং সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করতে হবে। এজন্যই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে জাকাত ফরয করা হয়েছে, যা ধনীদের সম্পদ থেকে গরীবদের অধিকার বুঝিয়ে দেওয়ার এক অদ্বিতীয় বিধান। জাকাতের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা হয়, গরীব-মিছকিনদের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয় এবং ধনীদের অন্তর শুদ্ধ হয়। এক্ষেত্রে কেবল জাকাত প্রদান করাই যথেষ্ট নয়, বরং এটি যেন সঠিক পদ্ধতিতে এবং উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিকট পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করা আবশ্যক।
এতটুকু হলো জাকাতের জাহির, কিন্তু এটাই কি মূল? জাকাত হলেন ইছলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের তৃতীয় স্তম্ভ, বলা যায় মাঝ খুটি, জাহিরে এটা মুছলিম সমাজের ব্যালেন্স রাখে, কিন্তু বাতিন বলেন ভিন্ন কথা। আমরা এই আলোচনায় জাহিরের বিপরীতে লুকীয়ে থাকা বাতিনের বিষয়েও আজ জানার চেষ্টা করবো।
এই গবেষণায় আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবোঃ-
✅ জাকাত ফরজ হওয়ার “হুকুম” এবং ক্বুরআন শরীফের আয়াতসমূহ।
✅ জাকাত “কারা পাবে” এবং ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বিআল্লাহু আনহু উনারা কাদের হকদার
মনে করতেন।
✅ জাকাত কিভাবে প্রদান
করতে হবে, এবং কাদের মাধ্যমে
এটি বিতরণ করা ছুন্নাহ।
✅ জাকাতের ফজিলত ও মূল
উদ্দেশ্য।
✅ জাকাতের নিসাব, সম্পদের ধরন এবং এ সংক্রান্ত বিধান।
✅ এবং পরিশেষে “জাকাতের প্রকৃত হাক্বিকত”, যা মালের পরিশুদ্ধি এবং নফছের তাজকিয়ার জন্য অপরিহার্য।
জাকাত সম্মানিত দ্বীন ইছলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রূকন। জাকাতকে মহান আল্লাহ পাঁক ফরজ করে দিয়েছেন সম্পদশালী মুছলিমদের জন্যে। ঈমান আনার পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য ইবাদত হল নামাজ প্রতিষ্টা করা ও জাকাত আদায় করা। ঈমান আনার পর পরই এ দুটো ইবাদত একসাথে গুরুত্বপূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে কারণ; মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি কালামুল্লাহ শরীফের অনেক জায়গায় নামাজ ও জাকাতের কথা একসাথে উল্লেখ করেছেন। জাকাত এর কথা ৩২ বার এসেছে কালামুল্লাহ শরীফের বিভিন্ন জায়গায়। যার মধ্যে ২৮ বারই এসেছে নামাজের সাথে এইভাবে যে মহান আল্লাহ পাঁক বলতেছেনঃ (وَ مَاۤ اُمِرُوۡۤا اِلَّا لِیَعۡبُدُوا اللّٰهَ مُخۡلِصِیۡنَ لَهُ الدِّیۡنَ ۬ۙ حُنَفَآءَ وَ یُقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَ یُؤۡتُوا الزَّكٰوۃَ وَ ذٰلِكَ دِیۡنُ الۡقَیِّمَۃِ) আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ইবাদাত করবে বিশুদ্ধ চিত্তে মুখলিছ (বান্দাদের মতো পূর্ণ) আনুগত্যের মাধ্যমে। আর তারা পবিত্র নামায প্রতিষ্ঠা করবে আর পবিত্র জাকাত প্রদান করবে। আর এটাই হচ্ছে সঠিক জীবন বিধান। (আল বাইয়্যেনাহ ৯৮/৫)
জাকাতের গুরুত্ব কত! তা বুঝার জন্য আবু বকর ছিদ্দিক রদ্বিআল্লাহু আনহুর প্রসিদ্ধ একটি ঘটনাই যথেষ্ট। নামাযের পর পরই গুরুত্বপূর্ণ ও ফরযকৃত রুকন হল জাকাত, যা অস্বীকার করায় কিছু লোককে মুরতাদ ঘোষণা করে আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিআল্লাহু আনহু উনার খিলাফতকালে তিনি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু যখন খলিফা হলেন, তখন একদল লোক জাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানাল। তারা বললো, আমরা তো মুহাম্মাদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কাছে এতোদিন জাকাত দিয়ে এসেছি, মুহাম্মাদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যেহেতু এখন আর বেঁচে নেই সেহেতু আমরা এখন আর জাকাত দিবনা। তাদের এহেন দ্বীন বিরোধী কথায় আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার গায়ে আগুন লেগে যায়, উনি তাদের বিরুদ্ধে সাথে সাথেই জিহাদের ঘোষণা দিলেন!
ভাবা যায়, শুধুমাত্র জাকাত দিবেনা বলায় তাঁদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন আমাদের এই ডিজিটাল যুগে এরূপ হলে আমরা নিশ্চয়ই আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর এই সিদ্ধান্তকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানাতাম ফেইসবুক, টুইটার, ইউটিউব আর টেলিগ্রাম টিকটকে। উনাকে কড়া মেজাজি, এমনকি হয়তো টকশোতে বেপর্দা নারীদের সাথে সময় কাটানো বাজারি মুফতিরা উনাকে জঙ্গি সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে ফেলতো।
তবে সে যুগেও প্রথম প্রথম উনার এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা হয়েছিলো। আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিআল্লাহু আনহু যখন উনার খিলাফতকালে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন, তখন হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আপনি (সে সব) লোকদের বিরুদ্ধে কিভাবে যুদ্ধ করবেন (যারা সম্পূর্ণ ধর্ম পরিত্যাগ করেনি, বরং কেবল জাকাত দিতে অস্বীকার করেছে মাত্র)? অথচ রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ “কলিমা শরীফ” পাঠের আগ পর্যন্ত মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ আমাকে দেয়া হয়েছে, যে কেউ তা পাঠ করলো, সে তার সম্পদ ও জীবন আমার পক্ষ থেকে নিরাপদ করে নিলো। তবে ইছলামের বিধান লঙ্ঘন করলে (শাস্তি দেয়া যাবে), আর তার অন্তরের গভীর (হৃদয়াভ্যন্তরে কুফরী বা পাপ লুকানো থাকলে এর) হিসাব-নিকাশ মহান আল্লাহ তা’য়ালার যিম্মায় (বুখারি শরীফ ১৩৯৯)। তাছাড়া মুছলিমদের রক্ত ঝরানো অন্য মুছলিমের উপর হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এইভাবে, “মুছলমনদের হত্যা করা কুফুরি” (বুখারি শরীফ ৬০৪৪)। হজরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর এইসব কথায় আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন। এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর দাড়িতে ধরে বললেন, হে ওমর! ইছলামের আগে তো তুমি অনেক বীর ছিলে! আজ কোথায় গেছে তোমার সেই বীরত্ব?
আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি আবু বকর বেঁচে থাকতে ইছলামের কোন বিধানে সামান্যতম আঘাত আসবে, আর আমি তা মুখ বুজে সহ্য করব! তা কখনোই হবেনা। মহান আল্লাহ তা’য়ালার শপথ! তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই আমি যুদ্ধ করবো যারা নামায ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, কেননা জাকাত হল সম্পদের উপর আরোপিত মহান আল্লাহ তা’য়ালার হক্ব। মহান আল্লাহ তা’য়ালার কসম। যদি তারা একটি মেষ শাবকও জাকাত হিসেবে দিতে অস্বীকৃতি জানায় যা রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের কাছে তারা দিত, তাহলে জাকাত না দেয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই জিহাদ করবো। উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু তখন বলেনঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালার কসম, মহান আল্লাহ তা’য়ালা আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হৃদয় বিশেষ জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত করেছেন বিধায় উনার এই দৃঢ়তা, এতে আমি বুঝতে পারলাম উনার সিদ্ধান্তই যথার্থ। (বুখারি শরীফ ১৪০০) আর উনার এই দৃঢ়তার হেতু ছিলো এই আয়াত শরীফ (فَاِنۡ تَابُوۡا وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّکٰوۃَ فَاِخۡوَانُکُمۡ فِی الدِّیۡنِ) অতঃপর যদি তারা (মুশরিকরা) তাওবাহ করে এবং নামায আদায় করে এবং জাকাত প্রদান করে তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। (আল ক্বুরআন ৯/১১) অতএব যারাই জাকাত আর ছ্বলাতের মাঝে পার্থক্য করবে আমি তাঁদের বিরুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত জিহাদ করবো। আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু রছুলে পাঁক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের কাছ থেকে জাকাতের গুরুত্বটা খুব ভালভাবে বুঝতে পেরেছিলেন বিধায় তিনি এতোটা কঠোর হয়েছিলেন। ওনার সেই সিদ্ধান্তটা ছিল কালজয়ী সিদ্ধান্ত। ইতিহাসের পাতায় তা আজ অবধি পূর্ণিমার চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ও আলো ছড়াচ্ছে।
পরবর্তীতে উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সেদিনের ধমক আমার অন্তর খুলে দিয়েছিল। আমিও পরে বুঝতে পেরেছিলাম, আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সিদ্ধান্তই ছিল সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত।
জাকাতের হক্বদার
কারা? (بِمَن يُدْفَعُ الزَّكَاةُ)
এখন কথা হলো, জাকাত মানুষ কাকে দেবে? জাকাত কাকে দেওয়া হতো?
জাকাত মূলত বাইতুল মালে প্রদান করা হতো। জাকাত হল দ্বীন ইছলামের এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে ইছলামি সালতানাতের কোষাগার মজবুত হতো। বায়তুল-মাল হলো সেই ইসলামিক ব্যাঙ্ক যেখান থেকে আল ক্বুরআনে বর্ণীত ৮ শ্রেণীর লোকদের সাহায্য করা হতো। মূলত জাকাত ইসলামি কোষাগারে সংগ্রহ করা হবে এবং খলীফা কিংবা আমীর তা ইছলামি রাষ্ট্রের ও জনগনের কাজে, অর্থায়নে ব্যবহার করবেন। এখন যেহেতু ইসলামিক হুকুমাত নাই, সালতানাত ও নাই তাহলে মানুষ কার হাতে দিবে?
জাহেরিভাবে শুধু ফরজ আদায় যদি করতে চায় তাহলেও মানুষ প্রথমে দেখবে
হাক্বিকি ইসলাম প্রতিষ্টায় লিপ্ত কোন ব্যক্তি সারা দুনিয়ার কোথাও বিদ্যমান রয়েছেন কি না। ঐ লোকের কার্যক্রম ছোট নাকি বড় সেটা কোন বিষয়
না, বিষয় হচ্ছে জমিনে মহান আল্লাহ
পাঁক উনার দ্বীন কি তিনি খোলাফায়ে রাশেদার আদলে কায়মের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন? যদি না পাওয়া যায় তাহলে নিজের পরিচিত আর্থিক সংগতিহীন
তালেবে ইলম কোথাও আছে কি না যে বিশুদ্ধ আক্বিদাহ নিয়ে দ্বীনের ইলম অর্জনে রত। যে ইলম অর্জন করে দ্বীনের খেদমত করার মন মানসিকতা নিয়ে ইলম
অর্জনে রত, আলিম হয়ে যে ব্যবসায়ী ইমাম, ওয়াজি হবেনা এরূপ তালেবে ইলমদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাদের ইলম অর্জনের
ব্যবস্থা করে দিতে হবে। যদি তাও পাওয়া না যায় তাহলে সম্ভ্রান্ত মিছকিনদের খুঁজে খুঁজে তাদের
বাড়িতে গিয়ে পৌঁছে দিতে হবে চুপিসারে।
এবার আসি জাকাত বণ্টনের ৮ টি খাত কি কি, যাদেরকে জাকাত দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ পাঁক পবিত্র আল ক্বুরআনে বলেনঃ (إِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَالْمَسٰكِينِ وَالْعٰمِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِى الرِّقَابِ وَالْغٰرِمِينَ وَفِى سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ) নিশ্চয়ই ছ্বদাকাহ (জাকাত) হচ্ছে ফকীর (১) ও মিসকীনদের জন্য (২) এবং এর (ব্যবস্থাপনার) ওপর নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্যে, (৩) (এছাড়াও) যাদের অন্তকরণ (দ্বীনের প্রতি) অনুরাগী (করা প্রয়োজন) তাদের জন্যে, (৪) গোলামী থেকে আযাদ করার ক্ষেত্রে, (৫) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের (ঋণমুক্তির) মধ্যে, (৬) মহান আল্লাহ তায়ালার পথে (৭) ও মুসাফিরদের জন্যে (৮) (এ জাকাতের অর্থ ব্যয় করা হবে)। (আর) এটাই মহান আল্লাহ তা'য়ালার নির্ধারিত ফরয (বিধান জাকাতের ব্যপারে); মহান আল্লাহ তায়ালা মহাজ্ঞানী, হিকমতওয়ালা। (আত্ব তাওবা ৯/৬০) উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা জাকাত প্রদানের ৮টি খাত উল্লেখ করেছেন। নিম্নে প্রত্যেকটি খাত আলাদাভাবে আলোচনা করা হলঃ-
শব্দ বিশ্লেষণ ও বাস্তবিক ব্যাখ্যাঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালা কতৃক যাদেরকে জাকাত দেওয়া যাবে ঐসকল প্রতিটি শব্দের বিশ্লেষণ ও ছ্বহাবায়ে কিরাম (রদ্বিআল্লাহু আনহুম) উনাদের দৃষ্টিতে এগুলোর বাস্তবিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হলোঃ
১) (আল-ফুক্বর-আ) (الْفُقَرَآءِ) দরিদ্র/ফকিরগণ।
✅ ফুক্বর-আ শব্দের অর্থ “অত্যন্ত
গরীব, যাদের ন্যূনতম জীবিকা নেই।
✅ ছ্বহাবীগণ (রদ্বিআল্লাহু আনহুম) “এই শ্রেণীভুক্তদের মধ্যে প্রধানত মুহাজিরীনদের (রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের সঙ্গী হয়ে মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফে হিজরতকারীদের) অন্তর্ভুক্ত করতেন” কারণ উনারা সবকিছু ছেড়ে হিজরত করেছিলেন।
এখন কথা হলো দরিদ্র হলেই কি জাকাত দেওয়া যাবে? মোটেও না, বরং যারা নিঃসম্বল মুমিন ভিক্ষাপ্রার্থী, তাদেরকেই দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। যাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা জাকাতের ৮টি খাতের প্রথমেই উল্লেখ করেছেন। রসূলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যতা থেকে মহান আল্লাহ তা'আলার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তিনি বলতেন, (اللَّهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ) ‘আয় আল্লাহ পাঁক! আমি আপনার নিকট কুফরী ও দারিদ্র্যতা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি’। (আবু দাউদ ৫০৯০; নাসাঈ ১৩৪৭; মিশকাত ২৪৮০) অতএব ফকীর জাকাতের মাল পাওয়ার হকদার যদি সে নামাজি ও আক্বিদাহ বিশুদ্ধ থাকে। তাছাড়া মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (إِنْ تُبْدُوْا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ وَإِنْ تُخْفُوْهَا وَتُؤْتُوْهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ) ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে ছ্বদাক্বাহ প্রদান কর তবে উহা ভাল; আর যদি তা গোপনে কর এবং (মুছলিম) দরিদ্রদেরকে দাও (তাহলে) তা তোমাদের জন্য আরো ভাল’। (বাক্বারাহ শরীফ ২/২৭১)।
রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (أَنَّ اللهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِيْ أَمْوَالِهِمْ، تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ) মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদের উপর তাদের সম্পদে জাকাত ফরয করেছেন। যেটা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে আর তাদের দরিদ্রের মাঝে বণ্টন হবে’। (বুখারী ১৩৯৫, মুছলিম ১৯)
২) (আল-মাছাকীন) (الْمَسٰكِينِ) অভাবগ্রস্তগণঃ
✅ মাছাকীন শব্দের অর্থ “যারা
দরিদ্র, কিন্তু ফকীরদের মতো একেবারে নিঃস্ব নয়”।
✅ ছ্বহাবীদের মতে, “যাদের সামান্য কিছু সম্পদ আছে কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় কম, তাদের মাছাকীন বলা হয়। অর্থাৎ ঐ লোক যাকে দেখে বোঝা যায়না সে অভাবের জীবন কাটাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সে অর্থসংকটে রয়েছে।
সম্মানিত জাকাত প্রদানের ৮টি খাতের মধ্যে দ্বিতীয় খাত হিসাবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা মিছকীনকে উল্লেখ করেছেন। আর মিছকীন হল ঐ ব্যক্তি যে নিজের প্রয়োজন মিটাতেও পারে না, আবার মুখ ফুটে চাইতেও পারে না। বাহ্যিকভাবে তাকে সচ্ছল বলেই মনে হয়। হাদিছ শরীফে এসেছেঃ (عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رضى الله عنه أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَيْسَ الْمِسْكِيْنُ الَّذِى يَطُوْفُ عَلَى النَّاسِ تَرُدُّهُ اللُّقْمَةُ وَاللُّقْمَتَانِ وَالتَّمْرَةُ وَالتَّمْرَتَانِ، وَلَكِنِ الْمِسْكِيْنُ الَّذِى لاَ يَجِدُ غِنًى يُغْنِيْهِ، وَلاَ يُفْطَنُ بِهِ فَيُتَصَدَّقُ عَلَيْهِ، وَلاَ يَقُوْمُ فَيَسْأَلُ النَّاسَ) আবু হুরায়রাহ রদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, এমন ব্যক্তি মিছকীন নয় যে এক মুঠো-দু’মুঠো খাবারের জন্য বা দুই একটি খেজুরের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং তাকে তা দেওয়া হলে ফিরে আসে। বরং প্রকৃত মিছকীন হল সেই ব্যক্তি যার প্রয়োজন পূরণ করার মত যথেষ্ট সঙ্গতী নেই। অথচ তাকে চেনাও যায় না যাতে লোকে তাকে ছ্বদাক্বাহ্ করতে পারে এবং সে নিজেও মানুষের নিকট কিছু চায় না। (বুখারী শরীফ ১৪৭৯, ৪৫৩৯, মুছলিম শরীফ ১০৩৯, মিশকাত শরীফ ১৮২৮)
৩) (আল-য়া’মিলীনা য়া’লাইহা) (الْعٰمِلِينَ عَلَيْهَا) জাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মচারী, আমিল, যারা জাকাত আদায়
করতে গিয়ে নিজের কাজকর্ম পরিত্যাগ করেন।
✅ জাকাত ব্যবস্থাপনায় যারা
দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা নিজেরা ধনী হলেও জাকাত গ্রহণ করতে পারেন।
✅ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সময়ে একদল ছ্বহাবীকে জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের কাজে নিয়োগ করেছিলেন। (বুখারি শরীফ, ১৪৬৮)।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা জাকাত প্রদানের তৃতীয় খাত হিসাবে ঐ ব্যক্তিকে উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি জাকাত আদায়, হেফাযত ও বণ্টনের কাজে নিয়োজিত। অতএব উক্ত ব্যক্তি সম্পদশালী হলেও সে চাইলে জাকাতের অংশ গ্রহণ করতে পারবে, কেননা হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (عَنِ ابْنِ السَّاعِدِىِّ الْمَالِكِىِّ أَنَّهُ قَالَ اسْتَعْمَلَنِيْ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رضى الله عنه عَلَى الصَّدَقَةِ فَلَمَّا فَرَغْتُ مِنْهَا وَأَدَّيْتُهَا إِلَيْهِ أَمَرَ لِيْ بِعُمَالَةٍ فَقُلْتُ إِنَّمَا عَمِلْتُ لِلَّهِ وَأَجْرِى عَلَى اللهِ، فَقَالَ خُذْ مَا أُعْطِيْتَ فَإِنِّيْ عَمِلْتُ عَلَى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَعَمَّلَنِيْ فَقُلْتُ مِثْلَ قَوْلِكَ فَقَالَ لِيْ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا أُعْطِيْتَ شَيْئًا مِنْ غَيْرِ أَنْ تَسْأَلَ فَكُلْ وَتَصَدَّقْ) ইবনু সায়ে‘দী আল-মালেকী রদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওমর ইবনুল খাত্তাব রদ্বিআল্লাহু আনহু আমাকে জাকাত আদায়কারী হিসাবে নিযুক্ত করলেন। যখন আমি কাজ শেষ করলাম এবং উনার কাছে তা পৌঁছিয়ে দিলাম তখন তিনি নির্দেশ দিলেন আমাকে পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য। আমি বললাম, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই আমি ইহা করেছি। সুতরাং আমি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিকট থেকেই এর প্রতিদান নেব। তিনি বললেন, আমি যা দিচ্ছি তাও নিয়ে নাও, কেননা আমিও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের সময় জাকাত আদায়কারীর কাজ করেছি। তখন তিনিও আমাকে পারিশ্রমিক প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন আমিও তোমার মত এরূপ কথা বলেছিলাম। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাকে বলেছিলেন, যখন তুমি না চাওয়া সত্ত্বেও তোমাকে কিছু দেওয়া হয়, তখন তুমি তা গ্রহণ কর। তুমি তা নিজে খাও অথবা ছ্বদাকাহ কর। (মুছলিম ১০৪৫; মিশকাত ১৮৫৪)
অন্য হাদিছে এসেছেঃ (عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ لاَ تَحِلُّ الصَّدَقَةُ لِغَنِىٍّ إِلاَّ لِخَمْسَةٍ لِغَازٍ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ أَوْ لِعَامِلٍ عَلَيْهَا أَوْ لِغَارِمٍ أَوْ لِرَجُلٍ اشْتَرَاهَا بِمَالِهِ أَوْ لِرَجُلٍ كَانَ لَهُ جَارٌ مِسْكِيْنٌ فَتُصُدِّقَ عَلَى الْمِسْكِيْنِ فَأَهْدَاهَا الْمِسْكِيْنُ لِلْغَنِىِّ) আতা ইবনু ইয়াসার রদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, সম্পদশালী ব্যক্তির জন্য জাকাত গ্রহণ হালাল নয়। তবে পাঁচ শ্রেণীর ধনীর জন্য তা জায়েয। (১) মুজাহিদ। (২) জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী। (৩) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি। (৪) যে ব্যক্তি জাকাতের মাল নিজ মাল দ্বারা ক্রয় করেছে এবং (৫) মিসকীন প্রতিবেশী তার প্রাপ্ত জাকাত থেকে ধনী ব্যক্তিকে উপঢৌকন দিয়েছে। (আবু দাউদ ১৬৩৫; মিশকাত ১৮৩৩ ছহীহুল জামে ৭২৫০)
৪) (আল-মুয়াল্লাফাতু ক্বুলুবুহুম) (الْمُؤَلَّفَةِ
قُلُوبُهُمْ) যাদের অন্তকরণ (দ্বীনের প্রতি)
অনুরাগী (করা প্রয়োজন) তাদের জন্যে “নতুন মুছলিম যাদের হৃদয় ইছলামের দিকে আকৃষ্ট
করা প্রয়োজন”।
✅ ছাহাবায়ে কিরামের যুগে ইছলামের
নবাগত অনুসারীদের মধ্যে কেউ কেউ আর্থিক দুর্বলতার কারণে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত হতে
কঠিন সময় পার করতেন।
✅ মহান আল্লাহ তা’য়ালা
নির্দেশ দিয়েছেন “নবাগত মুসলমানদের ইসলাম গ্রহণে দৃঢ় করার জন্য তাদের জাকাত দাও”।
✅ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কিছু অমুছলিম নেতাদেরও জাকাত দিয়েছেন, যেন তারা ইছলামের সৌন্দর্য বুঝতে পারে। (বুখারি শরীফ, ১৪৬৫)।
মূলত ইছলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য কোন অমুছলিমকে জাকাত প্রদান করা যায় যদি তার মধ্যে ইছলামের প্রতি মুহব্বত ফিল করা যায়, কিন্তু সে দ্বীন এই ভয়ে কবুল করতেছেনা যে, তাকে তার সম্প্রদায় পরিত্যাগ করবে এবং জীবনযাপন কঠিন হয়ে যাবে, তাই ইছলামের প্রতি আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে অথবা কোন অনিষ্ট বা কাফেরের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার লক্ষ্যে কোন অমুছলিমকেও জাকাতের অর্থ প্রদান করা যায়। হাদিছ শরীফে এসেছেঃ (حَدَّثَنَا هَنَّادُ بْنُ السَّرِيِّ، حَدَّثَنَا أَبُو الأَحْوَصِ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ مَسْرُوقٍ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، بْنِ أَبِي نُعْمٍ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ بَعَثَ عَلِيٌّ - رضى الله عنه - وَهُوَ بِالْيَمَنِ بِذَهَبَةٍ فِي تُرْبَتِهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَسَمَهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَيْنَ أَرْبَعَةِ نَفَرٍ الأَقْرَعُ بْنُ حَابِسٍ الْحَنْظَلِيُّ وَعُيَيْنَةُ بْنُ بَدْرٍ الْفَزَارِيُّ وَعَلْقَمَةُ بْنُ عُلاَثَةَ الْعَامِرِيُّ ثُمَّ أَحَدُ بَنِي كِلاَبٍ وَزَيْدُ الْخَيْرِ الطَّائِيُّ ثُمَّ أَحَدُ بَنِي نَبْهَانَ - قَالَ - فَغَضِبَتْ قُرَيْشٌ فَقَالُوا أَتُعْطِي صَنَادِيدَ نَجْدٍ وَتَدَعُنَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " إِنِّي إِنَّمَا فَعَلْتُ ذَلِكَ لأَتَأَلَّفَهُمْ ) আবু সা‘ঈদ খুদরী রদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী য়ালাইহিছ ছালাম ইয়ামান থেকে কিছু অপরিশোধিত স্বর্ণ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের কাছে পাঠালেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তা চার ব্যক্তি যথাঃ- (১) আক্বরা ইবনু হাবিছ আল হানযালী, (২) উআইনাহ্ ইবনু বাদর আল ফাযারী, (৩) আলকামাহ্ ইবনু উলাসাহ্ আল আমির ও (৪) বানী কিলাব গোত্রীয় এক ব্যক্তির মধ্যে বণ্টন করলেন এবং এরপর তায়ী গোত্রীয় যায়দ আল খায়র ও বানী নাহান গোত্রের এক ব্যক্তিকে এ থেকে দান করলেন। এতে কুরায়শ গোত্রের লোকেরা ক্ষেপে গিয়ে বললেন, “আপনি কেবল নজদের নেতৃস্থানীয় লোকদের দান করছেন আর আমাদের বাদ দিচ্ছেন, এটা কেমন ব্যাপার?” এ কথা শুনে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেনঃ আমি তাদের শুধু চিত্তাকর্ষণ অর্থাৎ তাদের অন্তরে ইছলামের প্রতি ভালবাসা ও অনুরাগ সৃষ্টির জন্য দিচ্ছি। (৩৩৪৪, মুছলিম শরীফ ১০৬৪, নাসাঈ শরীফ ২৫৭৮)
৫) (ফি রিক্বাব) (الرِّقَابِ) দাস
মুক্তির জন্য।
✅ ইছলামের সোনালী যুগে
দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল, এবং দাসদের মুক্তি দেওয়া এক মহৎ কাজ হিসেবে গণ্য হতো। যারা লিখিত কোন চুক্তির বিনিময়ে দাসে পরিণত হয়েছে, তাদেরকে মালিকের নিকট থেকে
ক্রয়ের মাধ্যমে মুক্ত করার লক্ষ্যে জাকাতের অর্থ প্রদান করা যায়। অনুরূপভাবে বর্তমানে কোন মুছলিম ব্যক্তি অমুছলিমদের হাতে যদি বন্দি হয়ে থাকে, তাহলে সে ব্যক্তিও এই খাতের
অন্তর্ভুক্ত হবে। (শারহুল মুনতে ৬/২৩০)
✅ ছ্বহাবীগণ জাকাতের অর্থ দিয়ে অনেক দাসকে মুক্ত করেছেন, বিশেষত হযরত আবু বকর ছিদ্দিক রদ্বিআল্লাহু আনহু উনি বহু দাসকে মুক্ত করেছেন। হাদিছে এসেছেঃ (عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ دُلَّنِيْ عَلَى عَمَلٍ يُقَرِّبُنِيْ مِنَ الْجَنَّةِ وَيُبَاعِدُنِيْ مِنَ النَّارِ قَالَ لَئِنْ كُنْتَ أَقْصَرْتَ الْخُطْبَةَ لَقَدْ أَعْرَضْتَ الْمَسْأَلَةَ أَعْتِقِ النَّسَمَةَ وَفُكَّ الرَّقَبَةَ قَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ أَوَلَيْسَا وَاحِدًا قَالَ لاَ عِتْقُ النَّسَمَةِ أَنْ تُفْرِدَ بِعِتْقِهَا وَفَكُّ الرَّقَبَةِ أَنْ تُعِيْنَ فِيْ ثَمَنِهَا وَالْمِنْحَةُ الْوَكُوْفُ وَالْفَىْءُ عَلَى ذِى الرَّحِمِ الظَّالِمِ فَإِنْ لَمْ تُطِقْ ذَلِكَ فَكُفَّ لِسَانَكَ إِلاَّ مِنْ خَيْرٍ) বারা ইবনু আজেব (রদ্বিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন একদিন এক গ্রাম্য লোক রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের নিকট এসে বললেন, “আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার মাধ্যমে আমি জান্নাতে যেতে পারি"। তিনি (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) বললেন, “যদিও তুমি অল্প কথায় জিজ্ঞেস করেছ, কিন্তু তুমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় জানতে চেয়েছ”। (শোন) তুমি একজন দাস আযাদ করো এবং গোলামের গোলামীর জিঞ্জীর খুলে দাও। লোকটি জিজ্ঞাসা করল, “এ দুটি কি একই নয়”? তিনি (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) বললেন, “না। “একজন মানুষকে মুক্ত করার অর্থ হলো তুমি তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে দিচ্ছ, আর “গোলাম মুক্ত করার অর্থ হলো তার মুক্তিপণ পরিশোধে সাহায্য করা’। (আরো যা করতে পারো তা হলো) “একটি অধিক দুগ্ধদানকারী প্রাণী দান করো এবং যে আত্মীয় তোমার প্রতি অন্যায় করেছে, তার প্রতিও তুমি সদয় হও”। যদি তুমি এগুলো করতেও সক্ষম না হও, তবে ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়াও এবং তৃষ্ণার্তকে পানি পান করাও। সৎকর্মের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজে বাধা দাও”। আর যদি এটাও করতে না পারো, তাহলে তোমার জিহ্বাকে সংযত রাখো এবং শুধু কল্যাণকর কথাই বলো। (মুসনাদে আহমাদ ১৮৬৭০; আদাবুল মুফরাদ ৬৯; মিশকাত ৩৩৮৪, শু‘আবুল ঈমান ৪০২৬, সহীহ আত্ তারগীব ১৮৯৮)
উল্লিখিত হাদিছে ইছলাম দাসমুক্তিকে জান্নাত লাভের বিশেষ মাধ্যম হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আর দাসমুক্তির জন্য যেহেতু প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়, সেহেতু আল্লাহ তা’য়ালা ইছলামি অর্থনীতির প্রধান উৎস জাকাত বণ্টনের খাত সমূহের মধ্যে দাসমুক্তিকে উল্লেখ করেছেন।
৬) (আল-গ্বরিমীন) (الْغٰرِمِين) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিগণ।
✅ যারা বৈধ কারণে ঋণগ্রস্ত
হয়ে পড়েছেন এবং তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়, তারা জাকাতের হকদার।
✅ ছ্বহাবীগণ উনাদের সময়ে
এমন ব্যক্তিদের সাহায্য করেছেন যারা ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে তার ঋণ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জাকাত
প্রদান করা যাবে, যদিও সে সম্পদশালী হয়। হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (عَنْ
قَبِيصَةَ بْنِ مُخَارِقٍ الْهِلاَلِىِّ قَالَ تَحَمَّلْتُ حَمَالَةً فَأَتَيْتُ
رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَسْأَلُهُ فِيْهَا فَقَالَ أَقِمْ حَتَّى
تَأْتِيَنَا الصَّدَقَةُ فَنَأْمُرَ لَكَ بِهَا قَالَ ثُمَّ قَالَ يَا قَبِيْصَةُ
إِنَّ الْمَسْأَلَةَ لاَ تَحِلُّ إِلاَّ لأَحَدِ ثَلاَثَةٍ رَجُلٍ تَحَمَّلَ
حَمَالَةً فَحَلَّتْ لَهُ الْمَسْأَلَةُ حَتَّى يُصِيْبَهَا ثُمَّ يُمْسِكُ
وَرَجُلٍ أَصَابَتْهُ جَائِحَةٌ اجْتَاحَتْ مَالَهُ فَحَلَّتْ لَهُ الْمَسْأَلَةُ
حَتَّى يُصِيْبَ قِوَامًا مِنْ عَيْشٍ أَوْ قَالَ سِدَادًا مِنْ عَيْشٍ وَرَجُلٍ
أَصَابَتْهُ فَاقَةٌ حَتَّى يَقُوْمَ ثَلاَثَةٌ مِنْ ذَوِى الْحِجَا مِنْ قَوْمِهِ
لَقَدْ أَصَابَتْ فُلاَنًا فَاقَةٌ فَحَلَّتْ لَهُ الْمَسْأَلَةُ حَتَّى يُصِيْبَ
قِوَامًا مِنْ عَيْشٍ أَوْ قَالَ سِدَادًا مِنْ عَيْشٍ فَمَا سِوَاهُنَّ مِنَ
الْمَسْأَلَةِ يَا قَبِيْصَةُ سُحْتًا يَأْكُلُهَا صَاحِبُهَا سُحْتًا) ক্ববিছ্বাহ ইবনে মুখারেক্ব রদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি কিছু ঋণের
যিম্মাদার হয়েছিলাম। অতএব এ ব্যাপারে কিছু
চাওয়ার জন্য আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের নিকট গেলাম। তিনি আমাকে বললেন,
(মদিনা শরীফে) আবস্থান কর যতক্ষণ
পর্যন্ত আমার নিকট জাকাতের মাল না আসে। তখন আমি তা হতে তোমাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দান করব। অতঃপর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, মনে রেখ হে ক্ববিছ্ব তিন ব্যক্তি ব্যতীত অন্য
কারো জন্য (জাকাতের মাল হতে) সাহায্য চাওয়া হালাল নয়।
১) যে ব্যক্তি কোন ঋণের যিম্মাদার হয়েছে তার জন্য
(জাকাতের মাল হতে) সাহায্য চাওয়া হালাল যতক্ষণ না সে তা পরিশোধ করে। তারপর তা বন্ধ করে দিবে।
২) যে ব্যক্তি কোন বালা মুছীবতে আক্রান্ত হয়েছে
যাতে তার সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে তার জন্য (জাকাতের মাল হতে) সাহায্য চাওয়া হালাল
যতক্ষণ না তার প্রয়োজন পূর্ণ করার মত অথবা তিনি বলেছেন, বেঁচে থাকার মত কোন কিছু লাভ করে এবং
৩) যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত হয়েছে এমনকি তার প্রতিবেশীদের মধ্যে জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন তিন জন ব্যক্তি তার দারিদ্র্যের ব্যাপারে সাক্ষী প্রদান করেছে তার জন্য (জাকাতের মাল থেকে) সাহায্য চাওয়া হালাল যতক্ষণ না সে তার জীবিকা নির্বাহের মত অথবা তিনি বলেছেন, বেঁচে থাকার মত কিছু লাভ করে। হে ক্ববিছ্ব এরা ব্যতীত যারা (জাকাতের মাল থেকে) চায় তারা হারাম খাচ্ছে। (মুছলিম ১০৪৪; মিশকাত ১৮৩৭)
৭) (ফি সাবিলিল্লাহ) (فِى سَبِيلِ اللَّهِ) মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রাস্তায়।
✅ এই শ্রেণীর মধ্যে
সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলেন “যারা ইছলামের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন, দ্বীনি
কাজের জন্য অর্থ প্রয়োজন, যেমন মুজাহিদিন, ইসলাম প্রচারক এবং ফ্রিতে দ্বীনী শিক্ষা
প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। তবে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বীনকে সমুন্নত
করার লক্ষ্যে যে কোন ধরনের প্রচেষ্টা “ফী ছাবীলিল্লাহ’ বা ত্বরীকাতুল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত। জিহাদ, দ্বীনী ইলম অর্জনের
যাবতীয় পথ এবং দ্বীন প্রচারের যাবতীয় মাধ্যম এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। হাদিছ শরীফে এসেছেন, আতা ইবনু ইয়াসার রদ্বিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, সম্পদশালী ব্যক্তির
জন্য জাকাত গ্রহণ হালাল নয়। তবে
পাঁচ শ্রেণীর ধনীর জন্য তা জায়েযঃ
১) মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে জিহাদরত ব্যক্তি।
২) জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী।
৩) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।
৪) যে ব্যক্তি জাকাতের মাল নিজ মাল দ্বারা ক্রয়
করেছে এবং
৫) মিসকীন প্রতিবেশী তার প্রাপ্ত জাকাত থেকে ধনী ব্যক্তিকে উপঢৌকন দিয়েছে। (আবুদাউদ ১৬৩৫; মিশকাত ১৮৩৩, ছহীহুল জামে ৭২৫০)
৮) (ইবনে সাবীল) (ابْنِ السَّبِيل) মুসাফিরগণ।
✅ যারা “সফরে নিঃস্ব হয়ে
পড়েছেন, অথচ তারা তাদের নিজ শহরে ধনী, তাদেরও জাকাত দেওয়া যাবে। সফরে গিয়ে যার পাথেয় শেষ হয়ে গেছে সে ব্যক্তিকে জাকাতের
অর্থ প্রদান করে বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে জাকাতের অর্থ দান করা যাবে। এক্ষেত্রে উক্ত মুসাফির সম্পদশালী হলেও তাকে জাকাত প্রদান
করা যাবে।
✅ ছাহাবীগণ এই বিধান অনুসারে অনেক ভ্রমণকারীদেরও জাকাত দিয়েছেন।
এই হলো জাকাত বন্টনের ৮ খাতের খোলাসা। এখন জানার বিষয় হলো এই ৮ ক্যাটাগরিতে কেউ পড়লেই কি সে জাকাতের হক্বদার হবে? অবশ্যই না। ফকির মিছকিনদের মধ্যে জাকাতের হক্বদার হলো কেবল ঈমানদারগণ, কেননা জাকাতের মাধ্যমেই তাদের কুদরতি রিজিক প্রদান করা হয় যখন তারা কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের তাক্বওয়া পরহেজগারিতা বজায় রাখে, যেমন মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (ذٰلِكُمۡ یُوۡعَظُ بِهٖ مَنۡ كَانَ یُؤۡمِنُ بِاللّٰهِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ۬ؕ وَ مَنۡ یَّتَّقِ اللّٰهَ یَجۡعَلۡ لَّهٗ مَخۡرَجًا وَّ یَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَیۡثُ لَا یَحۡتَسِبُ ؕ وَ مَنۡ یَّتَوَكَّلۡ عَلَی اللّٰهِ فَهُوَ حَسۡبُهٗ ؕ اِنَّ اللّٰهَ بَالِغُ اَمۡرِهٖ ؕ قَدۡ جَعَلَ اللّٰهُ لِكُلِّ شَیۡءٍ قَدۡرًا) যারা মহান আল্লাহ তায়ালা এবং শেষ বিচার দিনের উপর ঈমান আনে, তাদের সকলের এর দ্বারা উপদেশ দেওয়া হচ্ছে; যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ উনার তাক্বওয়া হাছিল করে, তিনি তার জন্য (যাবতীয় সমস্যা থেকে) নিষ্কৃতির একটি পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন এক জায়গা থেকে রিযিক দান করেন যেখান থেকে (রিজিক আসার) সে কল্পনাও করতে পারে না; এবং যে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর ভরসা করে, তাঁর জন্য তিনিই যথেষ্ট; (কারণ) মহান আল্লাহ তা’য়াল উনার উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই; নিশ্চয় মহান আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেকটি জিনিসের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ঠিক করে রেখেছেন। (আত ত্বলাক্ব ৬৫/২-৩) অতএব যে সারাবছর বেদ্বীনের মতো চলছে, যে ক্বুরআন ছুন্নাহর হুকুমের ধার ধারেনাই সে আপন গরীব ভাই-বোন, মামা-চাচা, আত্মীয়স্বজন হলেও তাকে তা দেওয়া যাবেনা বরং শত মাইল দূরে যদি কোন দ্বীনি গরীব ভাই থাকে তাহলে তাকে দিবে, সেই সবার চেয়ে বড় হক্বদার।
জাকাতের নিসাব ও সম্পদের ধরন (نِصَابُ ٱلزَّكَاةِ وَأَنْوَاعُ ٱلْمَالِ)
✅ জাকাত দেওয়ার জন্য
ন্যূনতম সম্পদ কত হওয়া দরকার?
✅ কোন কোন সম্পদের উপর জাকাত
ফরয?
✅ বর্তমান যুগের সম্পদগুলোর ক্ষেত্রে জাকাতের বিধান কী?
জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য বুনিয়াদি শর্ত হচ্ছে ৯ টিঃ
১) জাকাত প্রদানকারী মুছলিম হতে হবে।
২) ছাহিবে নিসাবকে বালেগ হতে হবে।
৩) সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে।
৪) মাল নিজের অধিকারে থাকতে হবে।
৫) নিজের অধিকারে থাকার সাথে সাথে ব্যবহারের ক্ষমতাও
থাকতে হবে।
৬) মাল কর্জ মুক্ত হতে হবে।
৭) সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত হতে হবে।
৮) সম্পদ বর্ধনযোগ্য হতে হবে।
৯) সম্পদ একবছর নিজের অধিকারে থাকতে হবে।
✅ জাকাতের নিসাব (ন্যূনতম সম্পদের পরিমাণ): মহান আল্লাহ তা’য়ালা ক্বুরআন শরীফে নিসাবের নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেননি, তবে হাদীস শরীফে স্পষ্টভাবে নিসাবের পরিমাণ উল্লেখ আছে। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ যদি কারও কাছে ৫ উকিয়াহ (প্রায় ৬১২ গ্রাম বা সাড়ে ৫২ ভরি) রূপা অথবা ২০ মিসকাল (প্রায় ৮৭.৫ গ্রাম - ৭ ভরি ১০ আনা) স্বর্ণ থাকে, তাহলে তার উপর জাকাত ফরয। (সহীহ মুছলিম ৯৭৮)
স্বর্ণ ও রৌপ্যের নিসাবঃ
✅ স্বর্ণের নিসাবঃ ৮৭.৫
গ্রাম (২০ মিসকাল) → এর উপর ২.৫% জাকাত ফরয।
✅ রৌপ্যের নিসাবঃ ৬১২.৩৬ গ্রাম (৫ উকিয়াহ) → এর উপর ২.৫% জাকাত ফরয। সাধারণত রুপার নিসাব হিসেবে "সনাতন পদ্ধতি" বা রুপার প্রচলিত বাজারমূল্যকে বিবেচনা করা হয়। সেক্ষেত্রে আপনার কাছে অন্তত ২,১৪,৩০৫ টাকা বা তার সমমূল্যের সম্পদ থাকলে জাকাত ফরজ হবে। যেহেতু রৌপ্যের মূল্য কম, তাই রৌপ্য হিসাব ধরে জাকাত আদায় করা হয়, যাতে গরীব মানুষ বেশী উপকৃত হয়।
জাকাত ফরজ হয় এমন সম্পদের ধরনঃ
জাকাত কেবলমাত্র নগদ টাকা বা স্বর্ণের উপর নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের সম্পদের উপর ফরয হয়।
১) নগদ অর্থ
✅ ব্যাংক একাউন্ট, নগদ টাকা, ফিক্সড ডিপোজিট → ২.৫% জাকাত ফরয।
২) স্বর্ণ ও রৌপ্য
✅ অলংকার বা বার যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে তার জাকাত দিতে হবে।
৩) ব্যবসায়িক পণ্য
✅ ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত সমস্ত পণ্যের উপর ২.৫% জাকাত ফরয। হাদীস শরীফঃ “যে ব্যবসায়ীদের কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তাদের উপর জাকাত ফরয। (আবু দাউদ ১৫৬২)
৪) কৃষিজাত পণ্য খনি ও সম্পদ (রিকায ও মাদান)
✅ বৃষ্টির পানি বা
প্রাকৃতিকভাবে সেচ দেওয়া হলেঃ ১০% (উশর) জাকাত।
✅ মানুষের সেচ ব্যবস্থায়
চাষাবাদ করলেঃ ৫% (নিসফ উশর) জাকাত।
✅ খনি বা জমির নিচে পাওয়া
সম্পদের উপরঃ ২০% জাকাত (খুমুস)
✅ প্রাচীন ধনভাণ্ডার পাওয়া গেলেঃ ২০% জাকাত (রিকায)।
হাদীস শরীফঃ যে জমি বৃষ্টির পানিতে বা প্রাকৃতিকভাবে চাষ হয়, তার ফলের উপর ১০% জাকাত, আর যা সেচ দেওয়া হয়, তার উপর ৫% জাকাত। (সহীহ বুখারী ১৪১৩) এছাড়াও আল ক্বুরআনে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ তোমরা যখন কোনো ফসল ফলাও, তখন তা কাটার দিন তার হক (অশর) আদায় করো। (ছুরাহ আল-আনআম ৬:১৪১) আর খনিজ সম্পদের ব্যপারে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ খনি ও ধনভাণ্ডারের উপর ২০% (খুমুস) জাকাত ফরয। (সহীহ বুখারী ১৪৯৯)
৫) গবাদিপশু (গরু, ছাগল, উট ইত্যাদি)
✅ ৪০টি ছাগল বা ভেড়া হলেঃ ১টি
জাকাত দিতে হবে।
✅ ৩০টি গরু হলেঃ ১টি বাছুর
(২ বছরের) দিতে হবে।
✅ ৫টি উট হলেঃ ১টি ছাগল বা ভেড়া দিতে হবে।
হাদীস শরীফঃ “গবাদিপশুর উপরও জাকাত ফরয, নির্দিষ্ট সংখ্যক হলে সেগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট হারে জাকাত দিতে হবে। (তিরমিযী শরীফ ৬৩৭)
৬) শেয়ার, স্টক ও বিনিয়োগঃ ব্যবসার উদ্দেশ্যে শেয়ার কেনা হলে, যদি কেউ শেয়ার ব্যবসার জন্য কেনে (অর্থাৎ, দাম বাড়লে বিক্রি করবে এমন উদ্দেশ্যে), তবে এগুলো ব্যবসায়িক সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে।
✅ হুকুমঃ এই ক্ষেত্রে
শেয়ারের বাজারমূল্যের উপর ২.৫% হারে জাকাত ফরজ হবে।
✅ হিসাবঃ জাকাত দেওয়ার সময় শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী হিসাব করতে হবে।
উপসংহারঃ
✅ জাকাত কেবল স্বর্ণ বা
রৌপ্যের উপর ফরয নয়, বরং নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য, কৃষিজাত পণ্য, পশুসম্পদ, শেয়ার
ও বিনিয়োগের উপরও ফরয।
✅ স্বর্ণের নিসাব ৮৭.৫
গ্রাম, রৌপ্যের নিসাব ৬১২.৩৬ গ্রাম।
✅ কৃষিজাত পণ্য, গবাদিপশু
এবং খনি সম্পদের উপর আলাদা হারে জাকাত ফরয।
✅ যদি কারও কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর পর্যন্ত থাকে, তাহলে তার উপর ২.৫% জাকাত ফরয হবে।
জাকাত না দেওয়ার কুফল ও আদায়ের ফজিলতঃ
কুফলঃ যারা সঠিকভাবে জাকাত আদায় করেনা তাদের উদ্যেশ্যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَ الَّذِیۡنَ یَكۡنِزُوۡنَ الذَّهَبَ وَ الۡفِضَّۃَ وَ لَا یُنۡفِقُوۡنَهَا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۙ فَبَشِّرۡهُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ یَّوۡمَ یُحۡمٰی عَلَیۡهَا فِیۡ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوٰی بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَ جُنُوۡبُهُمۡ وَ ظُهُوۡرُهُمۡ ؕ هٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِاَنۡفُسِكُمۡ فَذُوۡقُوۡا مَا كُنۡتُمۡ تَكۡنِزُوۡنَ) আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা মহান আল্লাহ তা’য়ালার পথে ব্যয় করে না, আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। যেদিন সেই ধন-সম্পদকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, অতঃপর সেগুলি দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ এবং পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করা হবে। (তাদেরকে বলা হবে,) ‘এটাই সেই সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করেছিলে, সুতরাং তোমরা যা জমা করেছিলে (আজ) তার স্বাদ গ্রহণ করো।’” (সূরা আত-তাওবাহ: ৩৪-৩৫) অর্থাৎ যারা জাকাত দেয় না এবং সম্পদ জমা করে রাখে, তাদের সম্পদ জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তাদের দেহে দগ্ধ করা হবে। এটি প্রমাণ করে, জাকাত না দেওয়া ভয়ংকর শাস্তির কারণ হবে। আর মুছলিম শরীফের ৯৮৭ হাদিছ শরীফে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (مَا مِنْ صَاحِبِ ذَهَبٍ وَلَا فِضَّةٍ، لَا يُؤَدِّي مِنْهَا حَقَّهَا، إِلَّا إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ، صُفِّحَتْ لَهُ صَفَائِحُ مِنْ نَارٍ، فَأُحْمِيَ عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ، فَيُكْوَى بِهَا جَنْبُهُ وَجَبِينُهُ وَظَهْرُهُ، كُلَّمَا بَرَدَتْ أُعِيدَتْ لَهُ، فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ، حَتَّى يُقْضَى بَيْنَ الْعِبَادِ، فَيَرَى سَبِيلَهُ، إِمَّا إِلَى الْجَنَّةِ، وَإِمَّا إِلَى النَّارِ) “সোনা রূপার মালিক যদি এর জাকাত আদায় না করে, তবে কিয়ামতের দিন এ ধন সম্পদকে আগুনের পাত বানানো হবে এবং জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে। তারপর এগুলো দ্বারা তার পার্শ্ব, ললাট ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। যখনই ঠাণ্ডা হবে পূণরায় তা উত্তপ্ত করা হবে -এমন দিন যেদিনের পরিমাণ দুনিয়ার পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হবে। এভাবে বান্দার পরিণতি জান্নাত বা জাহান্নাম নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত শাস্তি চলতে থাকবে”। (মুছলিম শরীফের ৯৮৭) তিনি আরো বলেনঃ (مَنْ آتَاهُ اللَّهُ مَالًا، فَلَمْ يُؤَدِّ زَكَاتَهُ مُثِّلَ لَهُ مَالُهُ يَوْمَ القِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ لَهُ زَبِيبَتَانِ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ القِيَامَةِ، ثُمَّ يَأْخُذُ بِلِهْزِمَتَيْهِ - يَعْنِي بِشِدْقَيْهِ - ثُمَّ يَقُولُ أَنَا مَالُكَ أَنَا كَنْزُكَ) যাকে আল্লাহ তা’য়ালা সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এ জাকাত আদায় করে নি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় মালা পরিয়ে দেওয়া হবে, সাপটি তার মুখের দুই পার্শ্ব কামড় দিয়ে বলতে থাকবে, আমি তোমার সম্পদ আমি তোমার জমাকৃত সম্পদ”। (বুখারী শরীফ ১৪০৩)
ফজিলতঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেন, (وَ مَاۤ اٰتَیۡتُمۡ مِّنۡ رِّبًا لِّیَرۡبُوَا۠ فِیۡۤ اَمۡوَالِ النَّاسِ فَلَا یَرۡبُوۡا عِنۡدَ اللّٰهِ ۚ وَ مَاۤ اٰتَیۡتُمۡ مِّنۡ زَكٰوۃٍ تُرِیۡدُوۡنَ وَجۡهَ اللّٰهِ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡمُضۡعِفُوۡنَ) যা (কিছু ধন সম্পদ) তোমরা সুদের উপর দাও, (তা তো এ জন্যই দাও) যেন তা অন্য মানুষদের মালের সাথে (শামিল হয়ে) বৃদ্ধি পায়, (কিন্তু) মহান আল্লাহ তা’য়ালার দৃষ্টিতে তা (কিন্তু মোটেই) বাড়ে না। অপরদিকে যে জাকাত তোমরা দান করো তা (যেহেতু) মহান আল্লাহ তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই দান করো, (তাই) বরং বেশি বৃদ্ধি পায়, এরাই হচ্ছে (সেসব লোক) যারা (আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে) নিজেদের সম্পদ বহুগুণে বাড়িয়ে নেয়। (সূরা আর-রূমঃ ৩০/৩৯) এছাড়াও এর আগের আয়াতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন যে যারা আল্লাহ পাক উনার চেহারা মুবারক দর্শনের আশা রাখে তারাই জাকাত দেয়। আর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ) জাকাত/ছ্বদাকায় (কখনো) সম্পদের ঘাটতি হয় না। (মুছলিম শরীফঃ ২৫৮৮) আর পবিত্র আল ক্বুরআনের ছুরাহ বাক্বারা শরীফের ২/২৭৭ নং আয়াতে পাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেনঃ “যারা জাকাত প্রদান করেছে, তাদের জন্য তাদের মালিকের নিকট মহা পুরস্কার রয়েছে, এছাড়াও কিয়ামতের দিন তাদের কোনো ভয় থাকবেনা, না তারা দুঃখিতও হবে”। আর ছূরাহ আন-নূরের ২৪/৫৬ নং আয়াত শরীফে বলেছেনঃ “তোমরা জাকাত প্রদান করো যাতে তোমরা রহমত প্রাপ্ত হও”।
➡ জাকাত (زَكَاةٌ) শব্দের আবজাদি মান বিশ্লেষণ করলেও আমরা যা পাই তা হলোঃ ৭ (ز) + ২০ (ك) + ১ (ا) + ৫ (ة) = ৩৩ (শেষ হরফ তা মারবুতা হলেও ওয়াকফ এর কারণে হা উচ্চারিত হবে, একারণে হা এর মান ধরেই আমরা হিসাব করেছি।)
✅ ৩৩ সংখ্যার অর্থঃ
১) মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মূল তাছবিহ যথা,
ছুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, বা আল্লাহু আকবার নামাজের পর ৩৩ বার করে পাঠের
নির্দেশ রয়েছে হাদিছ শরীফে।) (মুছলিম
শরীফ ৫৯৫) ফলাফল ৩৩ সংখ্যা সরাসরি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার জিকিরের সাথে সংযুক্ত,
আর তিনটি জিকিরের সমষ্টি ৩৩ × ৩ = ৯৯, যা আল্লাহর ৯৯ গুণবাচক নামের সংখ্যা।
২) জান্নাতে মানুষের বয়স হবে ৩৩ বছর, যা (রূহানিয়াতের পূর্ণতা)। (তিরমিযী শরীফঃ ২৫৪৫)
➡ ফলাফলঃ জাকাত শুধুমাত্র টাকা দেয়া নয়, বরং আত্মার পবিত্রতা, রূহানিয়াত বৃদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যম।
এই হলো জাকাতের ক্বুরআন সুন্নাহ অনুসারে জাহেরি হুকুম আহকাম ও ফজিলত। এবার আমরা দেখবো জাকাতের বাতেনি মানে কি? আচ্ছাহ বাতেনি মানে কি জানা লাগবেনা? নাকি শুধু ফরজ হিসেবেই জাকাত দেওয়া হবে?
ক্বুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বারবার বলেছেনঃ (أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ) তারা কি (আমার নাযিল করা) ক্বুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করে না? (ছুরাহ নিছা ৪/৮২) অতঃপর বললেনঃ (إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَذِكْرَىٰ لِأُو۟لِى ٱلْأَلْبَٰبِ) নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ রয়েছে। (ছুরাহ আয-যুমারঃ ৩৯/৯)
তাহলে বান্দা কি রোবটের মতো আমল করবে? না, বরং ক্বুরআনের জাহির ও বাতিন উভয় দিক বুঝে আমল করতে হবে। গভীর উপলব্ধি ছাড়া আমল করলে সেটি নিছক যান্ত্রিক কর্ম হয়ে যাবে, যা আত্মার উন্নতি ঘটাবে না। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, আল ক্বুরআনের আয়াত দ্বারা যে হুকুম দেওয়া হয়েছে তা শুধু বাহ্যিকভাবে পালন করার জন্য নয়, বরং তার গভীর অর্থ উপলব্ধি করতে হবে।
সুফি ও আউলিয়ায়ে কেরামের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
উনারা আল ক্বুরআনের প্রতিটি আয়াতকে “জাহির ও বাতিন” উভয় দৃষ্টিতে দেখেন। উনারা বলেন খারেজীরা ক্বুরআনের কেবল জাহির দেখতো, যা আহলে ছুন্নত ওয়াল জামায়াতের বিপরীত।
- জাহির (প্রকাশ্য অর্থ): শারীরিকভাবে কীভাবে আমল করতে হবে, এর সাথে
ক্বলবের কোন সম্পর্ক নাই।
- বাতিন (অন্তর্নিহিত অর্থ): আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং ক্বলবের উন্নতি কীভাবে ঘটবে, নফছের তাজকিয়া কীভাবে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা ক্বুরআন শরীফে বলেনঃ (وَأَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ لِذِكْرِى) অর্থাৎ আমার স্মরণে ছ্বলাত কায়েম কর। (ছুরাহ ত্বহাঃ ১৪)
✅ জাহিরঃ নামায পড়তে হবে,
অর্থাৎ নামাজের হুকুম আহকাম শরীর দিয়ে আদায় করবে, সুরাহ কেরাত, রুকু সেজদাহ করবে।
✅ বাতিনঃ এই নামায শুধু শারীরিক ব্যায়াম নয়, বরং এর মাধ্যমে ক্বলবের মধ্যে আল্লাহ পাকের যিকির করা হয়, যখন লতিফায়ে ক্বলবে ক্বুরআন তিলাওয়াত হয়, তখন তা নূর উৎপন্ন করেন, ফলে ক্বলব সেই নূর নফসে প্রেরণ করে, আর নফছ যখন দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নূর পান, তখন নার ধ্বংস হয়, আর নার ধ্বংস হলে নফছ পাক হয়, নফছ পাক হলে সাথে থাকা কারিন দুর্বল হয়, কারিন দুর্বল হলে আর ওয়াস ওয়াসা দিতে পারেনা, আর যখন ক্বলব ওয়াস ওয়াসা পায়না তখন ঐ নামাজে সে কামিয়াবি লাভ করে এই আয়াতের কায়িম মাকাম হয়ঃ (إِنَّ ٱلصَّلَوٰةَ تَنْهَىٰ عَنِ ٱلْفَحْشَآءِ وَٱلْمُنكَرِ) নিশ্চয়ই ছ্বলাত (নামায) মানুষকে (সমস্ত) অশ্লীলতা ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখেন। (ছুরাহ আনকাবুত ২৯:৪৫)
তাহলে বান্দা কি রোবটের মতো আমল করে যাবে? কিয়ামতের দিন কত নামাজিকে জাহান্নামে পাঠাই দেওয়া হবে শুধুমাত্র রোবটের মতো নামাজ পড়ার জন্যে, তখন যদি বলে আমিতো মুসল্লায় দাড়াতাম, নিয়ত করতাম, ৫ ওয়াক্তই ছুরাহ কেরাত পাঠ করতাম, তাহলেও কেনো আমি জাহান্নামী? অথচ দেখা যাচ্ছে, ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েও তার কোন উন্নতি হয়নি, বরং সে ঐসকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে যাদের আল্লাহ পাক ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার পরেও মুনাফিক বলতেছেন “ছুরাহ আন-নিছার ৪:১৪২” আয়াতে, সাথে (فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ) অতএব দুর্ভোগ সেইসব নামাযীদের জন্য, যারা তাদের নামাযে গ্বফিল (অর্থাৎ নামাজে তাদের ক্বলব মওজুদ থাকেনা)। (ছুরাহ আল-মাউন ১০৭/৪-৭) উক্ত আয়াতের ব্যখায় একটি মশহুর হাদিছের ব্যখ্যা পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছেঃ (لَا صَلَاةَ إِلَّا مَعَ حُضُورِ الْقَلْبِ) সেই নামায নামাযই নয় যেখানে ক্বলবের উপস্থিতি থাকেনা। আর হাদিছ শরীফেও এর মূল বক্তব্য পাওয়া যায়, যেমন হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন “আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ (عَنْ عَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " إِنَّ الرَّجُلَ لَيَنْصَرِفُ وَمَا كُتِبَ لَهُ إِلاَّ عُشْرُ صَلاَتِهِ تُسْعُهَا ثُمُنُهَا سُبُعُهَا سُدُسُهَا خُمُسُهَا رُبُعُهَا ثُلُثُهَا نِصْفُهَا) নিশ্চয়ই একজন ব্যক্তি নামায থেকে ফিরে আসে, অথচ তার জন্য (সওয়াব হিসেবে) কেবল দশমাংশ, নবমাংশ, অষ্টমাংশ, সপ্তমাংশ, ষষ্ঠাংশ, পঞ্চমাংশ, চতুর্থাংশ, তৃতীয়াংশ, বা অর্ধেক অংশই লেখা হয়। (ছুনান আবু দাউদ ৭৯৬, মুসনাদে আহমদ ১৮৪২৩) উক্ত হাদিছ শরীফ প্রমাণ করে কেবল জাহেরি আমল মোটেও আল্লাহ পাক উনার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। বরং আমলের জাহিরের সাথে বাতিন ও জানতে হবে মানতে হবে। গভীর উপলব্ধি ছাড়া আমল করলে সেটি নিছক যান্ত্রিক কর্ম হয়ে যাবে, যা আত্মার উন্নতি ঘটাতে সক্ষম না। এ কারণেই আউলিয়ায়ে কেরাম বলেনঃ “শরীয়ত, ত্বরীকত, হাকীক্বত ও মারিফাত এই ৪ টি মিলেই পূর্ণ দ্বীন। কেবল বাহ্যিক হুকুম মানলেই যথেষ্ট নয়, বরং তার রূহানী তাৎপর্যও বুঝতে হবে। কেউ যদি শুধু বাহ্যিক আমল করেই সন্তুষ্ট থাকে তাহলে তার আমল হয়তো দেহের জন্য উপকারী হবে, সামাজিক স্বীকৃতি পাবে, তবে তার নফছ ও ক্বলবের কোন ফায়দা হবেনা, ক্বলব মহান আল্লাহ পাকের নৈকট্য পাবে না, না পাবে স্বীকৃতি, কেননা (يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ) কিয়ামতের দিন ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না, তবে কামিয়াব হবে সেই ব্যক্তি, যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দরবারে ক্বলবে ছালীম নিয়ে হাজীর হবে। (সুরাহ আশ-শু'আরা ২৬/৮৮-৮৯)
অতএব মহান আল্লাহ তা’য়ালা যখন কোনো হুকুম দেন, তখন বান্দার দায়িত্ব শুধু যান্ত্রিকভাবে তা পালন করা নয়, বরং তার গভীর অর্থ, আত্মিক উদ্দেশ্য ও সত্যিকার হিকমাহ অনুধাবন করা, সেইরূপে আমল করা।
প্রথমে জাকাত শব্দের মানে জেনে নিই, আমাদের সমাজে জাকাত শোনার পর একজন ধনী ব্যক্তির মাথায় যেটা আসে সেটা হলো শতকরা ২.৫% আমাকে দিয়ে দিতে হবে গরিবকে, আর গরিবেরা ভাবে আমাকে ধনীদের থেকে নিতে হবে। মানে জাকাতের কথা আসলেই মানুষের মাথায় মাল/সম্পদের চিন্তার উদয় হয়, অথচ বাতিনে কিন্তু ব্যপারটা এরূপ না। তাহলে কীরূপ?
বাতিনে জাকাতের আলাপ আসলেই সম্পদশালী মুমিনের হৃদয়ে দোল খাবে, কেননা সে অলরেডি জানে, যে জাকাত (زَكَاةٌ) শব্দের মূল অর্থ পরিশুদ্ধি, বৃদ্ধি, উন্নতি ও কল্যাণ। আর এই জাকাত (الزكاة) শব্দটি মূলত (زكى) থেকে এসেছে, যার মূল অর্থই হলো আত্মশুদ্ধি। মানে সম্পদের মায়া পরিত্যাগ করবে এই কারনে যে, যেনো তার নফছ পাক হয়ে যায়, কেননা মহান আল্লাহ তা’য়ালা স্পষ্ট বলেছেনঃ (وَ سَیُجَنَّبُهَا الۡاَتۡقَی الَّذِیۡ یُؤۡتِیۡ مَالَهٗ یَتَزَكّٰی) আর সেই সর্বাধিক তাক্বওয়াশীল ব্যক্তিকে তা (জাহান্নামের আযাব) থেকে দূরে রাখা হবে। যে তার ধন-সম্পদ (মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পথে) দান করে নফছের তাজকিয়ার উদ্দেশ্যে। (ছুরাহ আল লাইলঃ ৯২/১৮)
|
জাকাত এবং তাজকিয়াহ'র
পার্থক্য |
||
|
জাকাত (ٱلزَّكَاةُ) এবং তাজকিয়াহ (ٱلتَّزْكِيَةُ) এর মূল ধাতু একই, কিন্তু অর্থগত কিছু পার্থক্য রয়েছে |
||
|
শব্দ |
অর্থ |
ব্যবহার |
|
زَكَاةٌ |
বাহ্যিক ও আর্থিক পরিশুদ্ধি |
সম্পদ পরিশুদ্ধ করা, দান করা |
|
تَزْكِيَةٌ |
আত্মার পরিশুদ্ধি |
নফছ ও ক্বলবের পরিশুদ্ধি, আত্মশুদ্ধি |
জাকাতের প্রধান ৫টি অর্থঃ
✅ ১. পরিশুদ্ধি (التَّطْهِيرُ) – পাপ বা মন্দ থেকে পবিত্র হওয়া।
✅ ২. বৃদ্ধি (النَّمَاءُ) – বরকত ও উন্নতি পাওয়া।
✅ ৩. কল্যাণ ও সচ্ছলতা (الْبَرَكَةُ
وَالصَّلَاحُ) – আধ্যাত্মিক ও পার্থিব সফলতা।
✅ ৪. হক্ব প্রদান করা (إِيتَاءُ
الْحَقِّ) – সম্পদের নির্ধারিত অংশ আদায়
করা।
✅ ৫. তাজকিয়াতুন্ন নফছ (تَزْكِيَةُ النَّفْسِ) – নফছ ও ক্বলবের পরিশুদ্ধি।
জাকাত দিয়ে বাহ্যিক সম্পদের হক্ব আদায় করা হলেও, বাতিনে তাযকিয়াহ তথা, নফছ, ক্বলবকে পাক পবিত্র করা, যা নফছের লালসার নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত।
এখন জাহেরি ক্বুরআনের নির্দেশ অনুসারে আজকে কতজন জাকাত আদায় করছে? মানুষ কি আদৌ জানে যে তারা যে জাকাত দিচ্ছে তা ক্বুরআন ছুন্নাহ সম্মত কি না? মহান আল্লাহ তা’য়ালা, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমাদের কি শিক্ষা দিয়েছিলেন? আর আমরা আজ কি পালন করছি? এবার আমরা দেখবো বাতিনে জাকাত কীরূপ পালনযোগ্য আমল। আপনার কাছে লাখ টাকা আছে, হাতের কাছে ফকির পেলেন ২.৫% দিয়ে দিলেন, আদায় হয়ে গেলো? মোটেও না, কেননা মহান আল্লাহ তা’য়ালা জাহেরি ক্বুরআনের মধ্যেই শিক্ষা দিচ্ছেনঃ (خُذۡ مِنۡ اَمۡوَالِهِمۡ صَدَقَۃً تُطَهِّرُهُمۡ وَ تُزَكِّیۡهِمۡ بِهَا وَ صَلِّ عَلَیۡهِمۡ ؕ اِنَّ صَلٰوتَكَ سَكَنٌ لَّهُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ) (হে নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি তাদের ধন-সম্পদ থেকে (জাকাত ও) ছ্বদাকা গ্রহণ করুন, এটা তাদের (সম্পদ ও সম্পদের প্রতি থাকা লোভ-লালসা থেকে) পাক-সাফ করে দেবে, (ফলে) আপনিও এর দ্বারা তাদের (নফছের) তাজকিয়া করে দেবেন, আর আপনি তাদের জন্য দোয়াও করবেন; অবশ্যই আপনার দোয়া তাদের জন্য (হবে পরম) সান্ত্বনার বিষয়; আর মহান আল্লাহ তা'য়ালা সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী। (ছুরাহ আত তাওবাঃ ৯/১০৩)
আয়াতের মূল ব্যাখ্যা ও বিধানঃ
১) মুছলমানদের জাকাত রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের হাতে দিতে হবে নির্দেশ হয়েছে। আয়াতের শুরুতেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা নবীজীকে নির্দেশ দিচ্ছেন “خُذْ” অর্থাৎ আপনি গ্রহণ করুন। এখানে সরাসরি রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের কথা বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের কথা বলা হয়নি যারা জাকাতের হক্বদার ছিলো সেসময়। এর থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, “জাকাত সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না, বরং প্রত্যেক জামানায় নবীজী বা উনার নিযুক্ত প্রতিনিধি (খলিফা/আমির/মুর্শিদ/ঐ য়া’লীম যে দ্বীন কায়েমে লিপ্ত)’রাই কেবল জাকাত গ্রহণ করবেন। করে সঠিক যায়গায় বণ্টন করবেন।
ক্বুরআনে অন্যান্য জায়গায় জাকাতের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে (وَءَاتُوا ٱلزَّكَاةَ) (তোমরা জাকাত দাও), কিন্তু এখানে বলা হয়েছে “خُذْ” (আপনি গ্রহণ করুন), যা রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের জন্য নির্দিষ্ট আদেশ।
✅ ফলাফলঃ জাকাত সাধারণ গরিব-মিসকিনের হাতে দেওয়া যাবে না, বরং প্রত্যেক জামানায় নবীজী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের নিযুক্ত প্রতিনিধি (খলিফা/আমির/মুর্শিদ/ঐ য়া’লীম যে দ্বীন কায়েমে লিপ্ত)’রাই কেবল জাকাত গ্রহণ করবেন। করে ছুরাহ তাওবার (৯/৬০) এ বর্নিত ৮ ক্যাটাগরিতে বণ্টন করবেন।
২) জাকাত কেবল দানের জন্য নয়, আত্মশুদ্ধির জন্য ফরজ করা হয়েছেঃ আয়াতে পাকে বলা হয়েছে “تُطَهِّرُهُمْ” অর্থাৎ যা তাদের ক্বলবকে সম্পদের লোভ লালসা থেকে ও তাদের মালের মধ্যে থাকা নাপাকিকেও পরিশুদ্ধ করবে, এবং (وَتُزَكِّيهِمْ) অর্থাৎ যিনি জাকাত গ্রহণ করবেন তিনি সেই জাকাত দ্বারা জাকাতদাতার নফছের তাজকিয়া করে দেবেন। ব্যপারটা এরূপ কারো ক্বলবের মধ্যে থাকা অসুস্থতাকে দূর করতে সে যখন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাবে, তখন তিনি তার অপারেশন করে দিবেন নিদৃষ্ট পরিমাণ খরচের বিনিময়ে, কিন্তু এইখানে ঐ ডাক্তার সেই খরচ নিজে খাবেন না বরং যাদের জন্যে খাওয়া যায়েজ তাদের দিয়ে দিবেন, তিনি ডাক্তারি করবেন ফি ছাবিলিল্লাহ।
আয়াতে উল্লেখিত উক্ত শব্দের ব্যবহার এটিই প্রমাণ করে যে, জাকাত শুধু গরিবদের সাহায্য করার জন্য ফরজ করা হয়নি, বরং “জাকাতদাতার নফছ ও আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য ফরজ করা হয়েছে”। সাধারণ ফকির বা মিসকিন জাকাত নিলে তারা শুধু অর্থিকভাবে উপকৃত হয়, কিন্তু দানকারীর নফছের তাজকিয়া হয় না।
✅ ফলাফলঃ জাকাত এমন ব্যক্তিকে দিতে হবে, যিনি দানকারীর নফছের তাজকিয়া করার পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত।
৩) এছাড়াও জাকাত গ্রহণকারীকে দোয়া করতে হবে জাকাতদাতার পক্ষে, এবং এই দোয়া জাকাতদাতার জন্য প্রশান্তির কারণ হবে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “وَصَلِّ عَلَيْهِمْ” অর্থাৎ “আপনি তাদের জন্য দোয়া করুন। এখানে বোঝানো হয়েছে, জাকাত গ্রহণকারীকে দানকারীর জন্য দোয়া করতে হবে। তবে এই দোয়া কোনো সাধারণ ব্যক্তির হতেই পারে না, বরং যার দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তিনিই এই দোয়া করবেন।
এরপর বলা হয়েছে, (إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ) অর্থাৎ আপনার দোয়া তাদের জন্য প্রশান্তির কারণ হবে। এটি প্রমাণ করে যে, দোয়া করতে হবে এমন ব্যক্তি, যিনি দানকারীর জন্য প্রশান্তির কারণ হতে পারেন। রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের দোয়া উনার ছ্বহাবিদের জন্য প্রশান্তির কারণ ছিল। আজ উম্মাহ কার নিকট জাকাত দিলে তিনি দোয়া করলে তাদের জন্যে প্রশান্তির কারণ হয় তা উম্মাহকে তালাশ করতে হবে জাকাত প্রদানের বেলায়।
✅ ফলাফলঃ জাকাত গ্রহণকারীকে এমন হতে হবে, যার দোয়া কবুল হয় এবং জাকাতদাতার জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে।
কীভাবে দোয়া করবে?
✅ (اللَّهُمَّ مَنْ دَفَعَ إِلَيَّ الصَّدَقَةَ، فَطَهِّرْ مَالَهُ وَقَلْبَهُ، وَزَكِّهِ، وَاجْعَلِ السَّكِينَةَ فِي قَلْبِهِ، وَبَارِكْ لَهُ فِي مَالِهِ، إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ)
✅ বাংলা অনুবাদঃ হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা! যে ব্যক্তি আমার নিকট জাকাত প্রদান করলো, তার সম্পদ ও তার ক্বলবকে পবিত্র করে দিন। তার নফসের তাজকিয়া করে দিন। তার ক্বলবে প্রশান্তি দান করুন এবং তার সম্পদে বরকত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি হলেন মহান দাতা।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তঃ কেন যাকে ইচ্ছা তাকে জাকাত দেওয়া যাবে না?
১) জাকাত রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি
ওয়া ছাল্লাম উনার যোগ্য প্রতিনিধি গ্রহণ করবেন। সাধারণ মানুষের হাতে জাকাত দিতে বলা হয়নি।
২) জাকাত শুধুমাত্র দান বা গরিবদের সহায়তা করা নয়, বরং
এটি দানকারীর আত্মশুদ্ধির, নফছের তাহকিয়ার মাধ্যম। তাই এটি এমন ব্যক্তির হাতে দিতে হবে, যিনি আত্মশুদ্ধির
বা নফছের তাজকিয়া করতে পারেন।
৩) জাকাত গ্রহণকারীকে দোয়া করতে হবে, যা জাকাতদাতার আত্মার প্রশান্তির কারণ হবে। এবং সেই দোয়া আল্লাহ পাক কবুল ও করবেন বলে গ্যারান্টি দিচ্ছেন। সাধারণ ফকির-মিসকিনের দোয়ার মাকাম তো এমন হতে পারে না।
✅ ফলাফলঃ ক্বুরআনের এই আয়াত প্রমাণ করে যে, জাকাত যেকোনো গরিবের হাতে দেওয়া যাবে না, বরং এমন ব্যক্তিকে দিতে হবে, যিনি দানকারীর আত্মশুদ্ধি নিশ্চিত করতে পারেন। যিনি রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের নিযুক্ত প্রতিনিধি (খলিফা/আমির/মুর্শিদ/ঐ য়া’লীম যে দ্বীন কায়েমে লিপ্ত)’রাই কেবল জাকাত গ্রহণ করবেন। আর পথেঘাটে ফরজ জাকাত বিলিয়ে দেওয়া ক্বুরআনের এই আয়াতের পরিপন্থী কাজ হবে কেননা সাধারণ ফকির, মিছকিন বা পথের ভিক্ষুক এই শর্ত পূরণ করতে পারে না, তাই তাদের হাতে জাকাত দেওয়া শরীয়তের মূল উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে যাবে। এছাড়াও যে ৮ ক্যাটাগরিতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছুরাহ তাওবা শরীফের ৯/৬০ এ জাকাত প্রাদানের নির্দেশ দিয়েছেন সেখানে ১ ক্যাটাগরিই হলোঃ (وَالْعٰمِلِينَ عَلَيْهَا) অর্থাৎ জাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মচারী, য়া’মিল, যারা জাকাত আদায় করে নিদৃষ্ট ব্যক্তি তথা যিনি জাকাত শুষ্টভাবে বন্টন করবেন তার হাতে দেন। এটাও স্পষ্ট প্রমাণ করে জাকাতদাতার জাকাত যাবে বণ্টনকারীর হাতে, সরাসরি ফকির মিছকিন বা অন্য যারা হক্বদার তাদের হাতে নয়।
মহান আল্লাহ পাক আমাদের হক্ব বোঝার মানাত তৌফীক দিন, ক্বুরআন ছুন্নাহ অনুসারে আমল করার, আমল বুঝে করার তৌফীক দিন আমিন।

0 ফেইসবুক: