জাকাত কেবল ইছলামের একটি স্তম্ভই নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ঈবাদাত যার প্রতিটি নিয়ম নিখুঁতভাবে পালন করা ফরজ। ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে জাকাতের বিস্তারিত মাছআলাগুলো নিচে তুলে ধরা হলোঃ
১. জাকাত ফরজ হওয়ার শর্তাবলী
জাকাত প্রত্যেকের ওপর ফরজ নয়। কারো ওপর জাকাত ফরজ হতে হলে তাকে অবশ্যই মুছলিম, স্বাধীন এবং সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে। এছাড়া প্রধান শর্তগুলো হলোঃ
- বালিগ বা
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াঃ হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, জাকাতদাতার প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া
শর্ত। নাবালকের সম্পদে জাকাত নেই, তবে অভিভাবক চাইলে তার পক্ষ থেকে ছ্বদকা
করতে পারেন।
- পূর্ণ মালিকানাঃ
সম্পদের ওপর ব্যক্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। চুরি হওয়া বা হারানো মালের জাকাত
নেই।
- এক বছর অতিবাহিত হওয়াঃ নিছাব পরিমাণ সম্পদ চাঁদের মাস (হিজরি ক্যালেন্ডার) অনুযায়ী পূর্ণ এক বছর মালিকানায় থাকতে হবে। বছরের শুরুতে নিছাব পূর্ণ হয়ে বছরের শেষেও যদি তা বজায় থাকে, তবে মাঝখানে কিছুটা কমলেও জাকাত দিতে হবে।
২. নিছাবের নিখুঁত হিসাব ও “মিক্সড মাল”
নিছাব হলো জাকাত ফরজ হওয়ার সর্বনিম্ন পরিমাণ। এটি নির্ধারণের দুটি মানদণ্ড রয়েছেঃ
- একক নিছাবঃ যদি
কারো কাছে শুধুমাত্র স্বর্ণ থাকে, তবে তার নিছাব ৭.৫ তোলা (৮৭.৪৮ গ্রাম)। আর
যদি শুধুমাত্র রুপা থাকে, তবে ৫২.৫ তোলা (৬১২.৩৬ গ্রাম)।
- সমন্বিত বা মিক্সড নিছাব (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা): যদি কারো কাছে স্বর্ণের পাশাপাশি কিছু নগদ টাকা, রুপা বা ব্যবসার পণ্য থাকে, তবে তাকে অবশ্যই রুপার নিছাবে (৫২.৫ তোলা) হিসাব করতে হবে। বর্তমান বাজারে রুপার দাম কম হওয়ায় সামান্য স্বর্ণ এবং কিছু টাকা থাকলেই অধিকাংশ মানুষের ওপর জাকাত ফরজ হয়ে যায়।
৩. আধুনিক ও প্র্যাকটিক্যাল জাকাত মাসআলা
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক ধরনের সম্পদ থাকে যা সাধারণ মাসআলায় খুঁজে পাওয়া যায় না। আধুনিক ফিকহের আলোকে সেগুলো হলোঃ
- ঋণ ও জাকাতঃ জাকাতযোগ্য
মোট সম্পদ থেকে তাৎক্ষণিক প্রদেয় ঋণগুলো বিয়োগ করতে হবে। ঋণ বিয়োগ করার পর
অবশিষ্ট সম্পদ নিছাবের ওপরে থাকলে ২.৫% হারে জাকাত দিতে হবে।
- প্রোভিডেন্ট ফান্ড
ও জিপি ফান্ডঃ চাকুরিকালীন ফান্ডে জমা হওয়া টাকার মালিকানা পূর্ণ না হওয়ায়
টাকা হাতে পাওয়ার পর বিগত সব বছরের জাকাত একত্রে দিতে হবে। তবে প্রতি বছর
ক্লোজিং ব্যালেন্স অনুযায়ী হিসাব লিখে রাখা নিরাপদ।
- কমিটি বা বিসিঃ আপনি
যে পরিমাণ টাকা জমা দিয়েছেন তা আপনার সম্পদ হিসেবে জাকাতযোগ্য। আর যদি আগেই
কমিটির বড় অংকের টাকা তুলে নেন, তবে যতটুকু বেশি নিয়েছেন তা ঋণ হিসেবে গণ্য
হবে।
- শেয়ার ও স্টকঃ
ব্যবসার উদ্দেশ্যে শেয়ার কিনলে বর্তমান বাজারমূল্যের ওপর ২.৫% জাকাত আসবে।
দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কোম্পানির জাকাতযোগ্য সম্পদের
(ক্যাশ, স্টক) ওপর জাকাত আসবে।
- কিস্তিতে কেনা প্লট/ফ্ল্যাটঃ বিক্রির নিয়তে কিস্তিতে প্লট কিনলে এ পর্যন্ত যতটুকু টাকা পরিশোধ করেছেন তার ওপর জাকাত আসবে।
৪. জাকাত বন্টন ও মালিকানা (তামলিক)
জাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শর্ত হলো “তামলিক” বা মালিক বানিয়ে দেওয়া।
- ব্যক্তি মালিকানা:
জাকাতের টাকা কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে সরাসরি মালিক বানিয়ে দিতে হবে। জাকাতের
টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, জানাজার গাড়ি কেনা বা রাস্তা মেরামতের মতো
কাজে ব্যয় করা যাবে না, কারণ এখানে কোনো ব্যক্তি মালিকানা হয় না।
- খাবার ও কাপড়: শুধু নগদ টাকা নয়, জাকাতের টাকা দিয়ে চাউল, ডাল বা শাড়ি কিনেও গরীবকে মালিক বানিয়ে দেওয়া যায়। তবে ইফতার মাহফিল বা কাঙ্গালি ভোজ করানো যাবে না, কারণ সেখানে মালিকানা হয় না, কেবল খাওয়ানো হয়।
৫. জাকাতের খাত ও যাদের দেওয়া যাবে না?
কুরআন
শরীফে বর্ণিত ৮টি খাতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শরয়ি ফকির ও মিছকিন। তবে
নিম্নোক্তদের জাকাত দেওয়া যাবে নাঃ
- নিকটাত্মীয়ঃ নিজের
বাবা-মা, দাদা-দাদি এবং সন্তান বা নাতি-নাতনিকে জাকাত দেওয়া যাবে না। স্বামী
স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে জাকাত দিতে পারবে না।
- সৈয়দ ও হাশেমি বংশঃ
রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বংশের মানুষদের
জাকাত দেওয়া হারাম, অর্থাৎ আহলে বাইত হোক কিংবা আওলাদে রছুল, তাদের জন্যে
জাকাত খাওয়া ব্যবহার হারাম। তাদের অভাব থাকলে উপহার হিসেবে দিতে হবে। বিশেষ
প্রয়োজনে “হিলা”র মাধ্যমে সাহায্য করা যেতে পারে।
- ধনী ব্যক্তিঃ যার কাছে নিছাব পরিমাণ সম্পদ (৫২.৫ তোলা রুপার মূল্য) আছে, তাকে জাকাত দেওয়া যাবে না।
৬. জাকাত আদায়ের ব্যবহারিক নিয়মাবলী
- নিয়ত করাঃ টাকা
দেওয়ার সময় জাকাতের নিয়ত থাকতে হবে। যাকে দিচ্ছেন তাকে “জাকাত” বলা জরুরি নয়,
তাকে উপহার বলেও দেওয়া যায়।
- পুরাতন জাকাতের
হিসাবঃ বিগত কয়েক বছরের জাকাত বকেয়া থাকলে, বর্তমান বাজারমূল্যে নয় বরং ওই
বছরগুলোতে স্বর্ণ/রুপার যা দাম ছিল, সেই দাম অনুযায়ী হিসাব করে জাকাত দিতে
হবে।
- স্ত্রীর অলঙ্কারঃ
স্ত্রীর অলঙ্কারের জাকাত স্ত্রীকেই দিতে হবে। যদি তার টাকা না থাকে, তবে
স্বামী চাইলে স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে তার পক্ষ থেকে জাকাত আদায় করে দিতে পারে।
- পেশাদার ভিক্ষুকঃ যাচাই ছাড়া পেশাদার ভিক্ষুকদের জাকাত দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। এর বদলে আত্মসম্মানী দরিদ্র প্রতিবেশী বা দ্বীনি শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
উপসংহারঃ
জাকাত কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়, এটি সম্পদ পবিত্র করার একমাত্র মাধ্যম। আপনার
জাকাত বণ্টনকারী উপরোক্ত মাছআলাগুলো যথাযথভাবে পালন করলেই তবে আপনার জাকাত শরয়ি
পদ্ধতিতে আদায় হবে। আর আপনি যদি জাকাতের বিস্তারিত জানতে চান, তাহলে পড়ুনঃ (সম্মানিত দ্বীন ইছলামে
জাকাত এর হুকুম, ফজিলত ও হাক্বিকত)।

0 ফেইসবুক: