Friday, March 20, 2026

ক্বুরআন-ছুন্নাহ অনুসারে জাকাত না দেওয়ার কঠিন পরিণতি

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাকে সম্পদ দান করেন পরীক্ষার জন্যসম্পদ নিজে কোনো সফলতা নয়; বরং সফলতা হলো সেই সম্পদের হক্ব আদায় করাআর সেই হক্বের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফরজ ঈবাদত হলো জাকাতজাকাত কোনো দয়া নয়, বরং এটি অসহায় ও বঞ্চিতদের নির্ধারিত অধিকার যা মহান আল্লাহ তা’য়ালা ধনীদের সম্পদের মধ্যে ফরজ করে দিয়েছেনযারা এই ফরজ আদায়ে অবহেলা করে, তাদের জন্য ক্বুরআন ও ছুন্নায় অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছেমূলত গরীবের হক্বটাই মহান আল্লাহ তায়ালা ধনীদের দিয়ে দেন যাতে তারা সেই আমানত তার প্রাপকের কাছে নফছের তাজকিয়ার জন্যে দিয়ে দেয়অধিকাংশ মানুষ ভাবে জাকাত মহান আল্লাহ পাক ফরজ করেছেন তাই দিতে হবে, কিন্তু ফরজ কেন, আর কিভাবে সঠিকভাবে দিতে হবে তারা সেটাই জানেনা (এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এটা পড়ুন)

প্রথমতো যারা মোটেও জাকাত দেয়না তাদের বিষয়ে পবিত্র আল-ক্বুরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছুরাহ আত-তাওবার মধ্যে স্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেনঃ (وَ الَّذِیۡنَ یَكۡنِزُوۡنَ الذَّهَبَ وَ الۡفِضَّۃَ وَ لَا یُنۡفِقُوۡنَهَا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۙ فَبَشِّرۡهُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ یَّوۡمَ یُحۡمٰی عَلَیۡهَا فِیۡ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوٰی بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَ جُنُوۡبُهُمۡ وَ ظُهُوۡرُهُمۡ ؕ هٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِاَنۡفُسِكُمۡ فَذُوۡقُوۡا مَا كُنۡتُمۡ تَكۡنِزُوۡنَ) আর যারা সোনা-রূপা জমা করে রাখে এবং তা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে ব্যয় করে না, আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিনক্বিয়ামতের দিন (তাদের) সেই সম্পদ যাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, তারপর তা দিয়ে তাদের কপাল, পার্শ্ব ও পিঠ দগ্ধ করা হবে; (এবং বলা হবে) এটাই তো (তোমার) সেই সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য জমিয়ে রেখেছিলে; সুতরাং এখন আস্বাদন করো তার স্বাধ যা তোমরা সঞ্চয় করতে”। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:৩৪-৩৫)

এ আয়াতে পাকে জমাকৃত স্বর্ণ ও রৌপ্যকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করার যে কঠোর সাজার উল্লেখ রয়েছে, তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তার এ সাজা তারই অর্জন করাঅর্থাৎ যে অর্থ সম্পদ অবৈধ পন্থায় জমা করা হয়, কিংবা বৈধ পন্থায় জমা করলেও তার জাকাত আদায় করা না হয়, সে সম্পদই তার জন্য আযাবের কারণ হয়হাদীছ শরীফে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যারা সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখে তাদেরকে সেই যাহান্নামের উত্তপ্ত পাথরের ছেকার সুসংবাদ দিন, যা যাহান্নামের আগুনের দ্বারা দেয়া হবেযা তাদের কারও স্তনের বোঁটার মধ্যে রাখা হবে, আর তা বের হবে দু কাঁধের উপরিভাগেআর দু কাঁধের উপরিভাগে রাখা হবে যা স্তনের বোঁটার মধ্য দিয়ে বের হবে। (মুছলিম শরীফ ৯৯২)

কোন কোন মুফাছছির বলেনঃ এ আয়াতে যে ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করার উল্লেখ এজন্যে করা হয়েছে যে, যে কৃপন ব্যক্তি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাহে খরচ করতে চায় না, তার কাছে যখন কোন ভিক্ষুক কিছু চায়; কিংবা ছ্বদকা তলব করে, তখন সে প্রথমে ভ্রুকুঞ্চন করে, তারপর পাশ কাটিয়ে তাকে এড়িয়ে যেতে চায়এতেও সে ক্ষান্ত না হলে তাকে পৃষ্ঠ দেখিয়ে চলে যায়এজন্যে বিশেষ করে এ তিন অঙ্গে আযাব দানের উল্লেখ করা হয়েছে। (তাফছীরে কুরতুবী)

আব্দুল্লাহ বিন উমার রদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন যে, এটা জাকাত ফরয হওয়ার পূর্বের আদেশযাকাতের হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পর জাকাত দ্বারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা মাল-সম্পদকে পবিত্র করার মাধ্যম বানিয়েছেনএই জন্য য়ু’লামাগণ বলেন, যে মাল থেকে জাকাত বের করা হবে সে মাল (আয়াতে নিন্দনীয়) ‘জমা করে রাখা’ মাল নয়আর যে মাল থেকে জাকাত বের করা হবে না, সে মালই হবে ‘জমা করে রাখা’ ধনভান্ডার; যার জন্য রয়েছে এই ক্বুরআনী ধমকসুতরাং হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘প্রত্যেক সোনা ও চাঁদীর অধিকারী ব্যক্তি যে তার হক্ব (জাকাত) আদায় করে না, যখন ক্বিয়ামতের দিন আসবে তখন তার জন্য ঐ সমুদয় সোনা-চাঁদীকে আগুনে দিয়ে বহু পাত তৈরী করা হবেঅতঃপর সেগুলোকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগা হবেযখনই সে পাত ঠান্ডা হয়ে যাবে তখনই তা পুনরায় গরম করে অনুরূপ দাগার শাস্তি সেই দিনে চলতেই থাকবে যার পরিমাণ হবে ৫০ হাজার বছরের সমান; যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দাদের মাঝে বিচার-নিষ্পত্তি শেষ করা হয়েছেঅতঃপর সে তার পথ দেখতে পাবে; হয় জান্নাতের দিকে না হয় দোযখের দিকে’’ (মুছলিম শরীফ ৯৮৭) ছ্বহিহ হাদীছ শরীফে এসেছেন যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা সম্পদ দান করেছেন, তারপর যে সেই সম্পদের জাকাত দিবে না, ক্বিয়ামতের দিন তার সম্পদ তার জন্য চক্ষুর পাশে দুটি কালো দাগবিশিষ্ট বিষাক্ত সাপে পরিণত হবে, তারপর সেটি তার চোয়ালের দু’পাশে আক্রমন করবে এবং বলতে থাকবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার গচ্ছিত ধন। (বুখারী শরীফ ১৪০৩)

অন্য হাদীছ শরীফে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যে কোন ব্যক্তি তাঁর উটের জাকাত দিবে না সে যেভাবে দুনিয়াতে ছিল তার থেকে উত্তমভাবে এসে তাকে পা দিয়ে মাড়াতে থাকবে, অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি ছাগলের জাকাত দিবে না সে যেভাবে দুনিয়াতে ছিল তার থেকেও উত্তমভাবে এসে তাকে তার খুর ও শিং দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকবেআর তোমাদের কেউ যেন ক্বিয়ামতের দিন তার কাধে ছাগল নিয়ে উপস্থিত না হয়, যে ছাগল চিৎকার করতে থাকবে, তখন সে বলবে, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! আর আমি বলব, আমি তোমার জন্য কোন কিছুরই মালিক নই, আমি তো তোমার কাছে বাণী পৌছিয়েছিআর তোমাদের কেউ যেন তার কাধে কোন উট নিয়ে উপস্থিত না হয়, যা শব্দ করছেতখন সে বলবে, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমি বলব, আমি তোমার জন্য কোন কিছুর মালিক নই, আমি তো তোমাদেরকে পৌছিয়েছি। (বুখারী শরীফ ১৪০২; মুছলিম শরীফ ৯৮৮)

আবার কৃপণতা ও জাকাত আটকে রাখার কুফল বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَ لَا یَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ یَبۡخَلُوۡنَ بِمَاۤ اٰتٰهُمُ اللّٰهُ مِنۡ فَضۡلِهٖ هُوَ خَیۡرًا لَّهُمۡ ؕ بَلۡ هُوَ شَرٌّ لَّهُمۡ ؕ سَیُطَوَّقُوۡنَ مَا بَخِلُوۡا بِهٖ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ وَ لِلّٰهِ مِیۡرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ) মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে তাদের যে প্রাচুর্য দিয়েছেন তা থেকে যারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে ব্যয় করতে যারা কার্পণ্য করে, তারা যেন কখনো এটা মনে না করে, এটা তাদের জন্যে কোনো কল্যাণকর কিছু হবেবরং এ (কৃপণতা আসলে) তাদের জন্যে খুবই অকল্যাণকর (হবে)কার্পণ্য করে তারা যা জমা করেছে, ক্বিয়ামতের দিন অচিরেই তা দিয়ে তাদের গলায় বেড়ি পরিয়ে দেয়া হবে, আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার তো কেবল মহান আল্লাহ তায়ালা উনারই জন্যে, আর তোমরা যা করো মহান আল্লাহ তায়ালা তা সম্পর্কে বেখবর নন। (ছুরাহ আলে ইমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩:১৮০) এই আয়াতে এমন কৃপণের কথা বলা হচ্ছে, যে মহান আল্লাহ পাক উনার দেওয়া সম্পদ উনার রাস্তায় ব্যয় করে নাএমন কি সেই মালের ওয়াজিব জাকাতও আদায় করে না

অনেক মানুষ হয়তো মানতেই পারবেনা যে সে যদি জাকাত ইনকার করে, কখনোই না দিয়ে মারা যায় তাহলে সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে, কেননা মহান আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেছেনঃ (فَاِنۡ تَابُوۡا وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّكٰوۃَ فَاِخۡوَانُكُمۡ فِی الدِّیۡنِ ؕ وَ نُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ) অতঃপর যদি তারা (মুশরিকরা) তাওবাহ করে এবং নামায আদায় করে এবং জাকাত প্রদান করে তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। আর আমি জ্ঞানীদের জন্য (আমার) আয়াতসমূহ খুলে খুলে বর্ণনা করি। (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:১১) এছাড়াও মহান আল্লাহ তায়ালা ছুরাহ ফুছছিলাতে যা বলেছেন তা আরও ভয়াবহ, তিনি বলেনঃ (وَ وَیۡلٌ لِّلۡمُشۡرِكِیۡنَ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡتُوۡنَ الزَّكٰوۃَ وَ هُمۡ بِالۡاٰخِرَۃِ هُمۡ كٰفِرُوۡنَ) আর ধ্বংস মুশরিকদের জন্য যারা জাকাত আদায় করে না, মূলত তারাই আখিরাতে অবিশ্বাসী। (ছুরাহ ফুছছিলাত ৪১:৬-৭)

মুফাছছীরগণের মতে এখানে জাকাত না দেওয়াকে কুফর ও শিরকী আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছেকিন্তু আমি সোজা সাপ্টা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত বলেই মনে করি বলুনতো জাকাত মুছলিম নাকি মুশরিকদের উপর ফরজ? যদি মুছলিমদের উপর হয়ে থাকে তাহলে যারা জাকাত দেয় না তাদের কাম খতম, যদিও নামাজ, রোজা, হজ্জ করা হাজী হয়ে থাকে।

দুনিয়াবি ও সামাজিক শাস্তিঃ জাকাত না দেওয়া কেবল পরকালের আযাবই ডেকে আনে না, বরং দুনিয়াতেও রহমত কমিয়ে দেয়রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ লোকেরা যখন তাদের সম্পদের জাকাত বন্ধ করে দেয়, তখন আকাশ থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়; যদি পশু-পাখি না থাকত, তবে তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিতই হতো না” (ছুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ ৪০১৯)

শরয়ী ও ফিক্বহি সিদ্ধান্তঃ ইছলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জাকাত অস্বীকার করা কুফরি, আর অবহেলা করে আদায় না করা কঠিন ফাছিকি ও কবিরা গুনাহ বলেছেন ইমামগণ যদিও আমি অবহেলাও মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া মনে করছি

বলপ্রয়োগে আদায়ঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিআল্লাহু আনহু উনার ছুন্নাহ অনুযায়ী, কেউ জাকাত দিতে অস্বীকার করলে ইছলামী শাসক তা বলপ্রয়োগে আদায় করবেন

অতিরিক্ত দণ্ডঃ কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী (ছুনানে নাছাই শরীফ), জাকাত দিতে অস্বীকারকারীর থেকে জাকাতের পাশাপাশি দণ্ডস্বরূপ তার অর্ধেক মাল নিয়ে নেওয়ার বিধানও বর্ণিত হয়েছে

উপসংহারঃ অতএব জাকাত না দেওয়া কোনো সাধারণ আর্থিক ভুল নয়; এটি আখিরাত ধ্বংসকারী গুনাহ এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমের অবাধ্যতাআজ যা সঞ্চয়, কাল তা-ই আযাবের হাতিয়ারসুতরাং প্রতিটি সামর্থ্যবান মুছলিমের উচিত অবিলম্বে হিসাব করে জাকাত আদায় করা এবং অতীতের ভুলের জন্য খাঁটি তাওবাহ করা


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: