Saturday, August 15, 2026

ঈদে মীলাদুন নবী ﷺ পালন ব্যতীত হাক্বীক্বী শাকির হওয়া অসম্ভবঃ প্রথম অধ্যায়

ঈদে মীলাদুন নবীঃ হাক্বিকত, পরিভাষা, বিদয়াত এবং শরঈ ফয়ছালার উছূল

আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রযীমবিছমিল্লাহির রহমানির রহীমনাহমাদুহূ ওয়া নুছ্বল্লী ওয়া নাছাল্লিমু য়ালা রছুলিহিল কারীম, ওয়া য়ালা আলিহী ওয়া আছ্বহাবিহী আযমাঈন

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পবিত্র জাত মুবারকের জন্যঅসংখ্য দুরুদ, ছ্বলাত ও ছালাম নবীয়ে আকরাম, শাফীয়ে উমাম, নবীয়ে মুহতারাম, ছাইয়্যিদুল মুরছালীন, ইমামুল মুরছালীন, খতামান নাবীইয়্যি, নূরে মুজাছছাম, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পবিত্র ক্বদম মুবারকে নিবেদিত হোক

এখন কথা হলোঃঈদে মীলাদুন নবীবলতে আসলে কী বোঝায়? এই একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর না জেনে কেউ যদি সরাসরি বলেবিদয়াত”, “হারাম”, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করেননি”, “ছ্বহাবায়ে কেরাম করেননি”, তাহলে সে প্রথমেই একটি উছূলী ভুল করে বসেকারণ কোনো বিষয়ের হালাল হারাম, ছুন্নাহ, বিদয়াত, মুস্তাহাব নাজায়িযের ফয়ছালা দেওয়ার পূর্বে সেই বিষয়ের প্রকৃত হাক্বিক্বত নির্ধারণ করা ফরজে ঈলমীর অন্তর্ভুক্তযে জিনিসের সংজ্ঞাই বদলে দেওয়া হলো, তার বিরুদ্ধে যত দলীলই পেশ করা হোক, সেই দলীল আসল বিষয়ের বিরুদ্ধে নয়, একটি কল্পিত বিষয়ের বিরুদ্ধে যাবে

ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিয়ে বিরোধের বড় অংশ এখানেইকেউ মনে করে ঈদে মীলাদুন নবী মানেই ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আদ্বহার সমান্তরালে তৃতীয় একটি নতুন ফিক্বহী ঈদকেউ মনে করে মীলাদ মানেই মাইক, ব্যানার, জুলুছ, আলো, খাবার বা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক অনুষ্ঠানকেউ আবার এমনভাবে প্রশ্ন করে যেন আমরা দাবি করছি, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম প্রতি রবীউল আউয়াল শরীফে নতুন করে জন্মগ্রহণ করেনএই সব সংজ্ঞাই ভুলতাই প্রথম অধ্যায়ে আমি কোনো আবেগী স্লোগান নয়, প্রথমে শব্দ, তারপর পরিভাষা, তারপর উছূল, তারপরকরেননিযুক্তির সীমা, তারপর বিদয়াতের মাপকাঠি এবং শেষে আজকের সাংগঠনিক ছুরতের শরঈ অবস্থান নির্ধারণ করব

ঈদশব্দের হাক্বিক্বত

ঈদরবি عِيدٌইমাম ইবনে মানযূর রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (وَالْعِيدُ كُلُّ يَوْمٍ فِيهِ جَمْعٌ، وَاشْتِقَاقُهُ مِنْ عَادَ يَعُودُ كَأَنَّهُمْ عَادُوا إِلَيْهِ)

অর্থঃঈদ এমন প্রত্যেক দিন, যেদিন মানুষের সমাবেশ ঘটেএর উৎপত্তিআদা, ইয়াউদুথেকে, যেন মানুষ পুনরায় সেই দিনের দিকে ফিরে আসে” (ইবনে মানযূর, লিছানুল য়ারব, (عَوْد) :مَادَّةُ)

ইমাম আযহারী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (وَالْعِيدُ عِنْدَ الْعَرَبِ الْوَقْتُ الَّذِي يَعُودُ فِيهِ الْفَرَحُ وَالْحُزْنُ)

অর্থঃরবদের নিকট ঈদ হলো সেই সময়, যে সময়ে আনন্দ অথবা দুঃখের স্মৃতি পুনরায় ফিরে আসে” (আযহারী, তাহযীবুল লুগ্বাহ, (عَوْد) :مَادَّةُ; ইবনে মানযূর, লিছানুল য়ারব, (عَوْد) :مَادَّةُ)

ইবনুল আরাবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (سُمِّيَ الْعِيدُ عِيدًا لِأَنَّهُ يَعُودُ كُلَّ سَنَةٍ بِفَرَحٍ مُجَدَّدٍ)

অর্থঃঈদকে ঈদ বলা হয়েছে, কারণ তা প্রতি বছর নবায়িত আনন্দ নিয়ে ফিরে আসে” (ইবনে মানযূর, লিছানুল য়ারব, (عَوْد) :مَادَّةُ)

ইমাম নববী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (قَالُوا وَسُمِّيَ عِيدًا لِعَوْدِهِ وَتَكَرُّرِهِ، وَقِيلَ لِعَوْدِ السُّرُورِ فِيهِ)

অর্থঃউলামায়ে কিরাম বলেছেন, একে ঈদ বলা হয়েছে তার ফিরে আসা ও পুনরাবৃত্তির কারণে, আবার বলা হয়েছে, এতে আনন্দ ফিরে আসে বলেই একে ঈদ বলা হয়” (ইমাম নববী, আল মিনহাজ শরহু ছ্বহীহ মুছলিম, কিতাবু ছ্বলাতিল ঈদাইন)

অতএবঈদশব্দের ভেতর তিনটি বিষয় স্পষ্টঃ একটি স্মরণীয় সময়ের পুনরাগমন, মানুষের সেই উপলক্ষের দিকে পুনরায় প্রত্যাবর্তন এবং সেই উপলক্ষের সঙ্গে আনন্দ/কষ্টের স্মরণ বা সমাবেশের সম্পর্কঘটনা একবার ঘটতে পারে, কিন্তু তার স্মৃতি ও তার নিয়ামতের জন্য আনন্দ প্রতি বছর নতুন হয়ে ফিরে আসতে পারেঘটনা তো একবার ঘটেছে, আবার আনন্দ কেন?” এই প্রশ্ন যারা করে, তারারবিঈদশব্দের মূল অর্থই বুঝে না তাদের জাহেলিয়াতের কারনে

ক্বুরআন শরীফেওঈদশব্দ শুধু ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার জন্য ব্যবহার হয়নিহযরত ঈছা ইবনে মারইয়াম য়ালাইহিছ ছালাম দুয়া করেছেনঃ (قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِّأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِّنكَ وَارْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ)

অর্থঃ হযরত ঈছা ইবনে মারইয়াম য়ালাইহিছ ছালাম বললেন, হে মহান আল্লাহ তায়ালা! হে আমাদের রব! আপনি আমাদের জন্য আসমান থেকে একটি মায়িদাহ নাযিল করুন, যা আমাদের প্রথম ও শেষ সকলের জন্য ঈদ হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে আর আমাদেরকে রিয্ক দান করুন, আপনিই-তো শ্রেষ্ঠ রিয্কদাতা (ছুরাহ আল মায়িদাহ ৫:১১৪)

এই আয়াত শরীফ-তো একটি মৌলিক বিভ্রান্তি শেষ করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ তা’য়ালাঈদশব্দের ক্বুরআনিক ব্যবহার ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার ফিক্বহী কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং ক্বুরআন অনুসারে আসমানী খাবার নামক নিয়ামতের আগমনঈদহওয়ার বিষয় বানানো হয়েছেসুতরাং কোনো খোদায়ী নিয়ামতের স্মরণীয় দিনকে আভিধানিক ও ক্বুরআনিক অর্থেঈদবলা ক্বুরআনি ভাষা, খোদায়ী নিয়ামত লাভের বিপরীতে ঈদের দিন ঘোষণা করা মানেই ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার পাশে নতুন তৃতীয় ঈদের নামাজ, নতুন তাকবীর, নতুন ওয়াযিব বা নতুন ফিক্বহী বিধান বানিয়ে ফেলা নয়এই পার্থক্য না বুঝে শুধুমুছলমানের ঈদ দুইটাবলে শব্দগত আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া শুদ্ধ উছূল নয় বরং ঈলমী খিয়ানত ও নবী বিদ্বষী জাহিল হওয়া

মীলাদএবংমাওলিদশব্দের হাক্বিক্বত

মীলাদএবংমাওলিদউভয় শব্দের মূলধাতু و ل دএখান থেকেই وِلَادَةٌ, مَوْلِدٌ, مِيلَادٌ ইত্যাদি শব্দ এসেছে মূল-কেন্দ্রীয় অর্থ হলেন জন্ম, জন্মের সময় এবং জন্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিছবত

ইমাম ইবনে মানযূর রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (وَمَوْلِدُ الرَّجُلِ وَقْتُ وِلَادِهِ، وَمَوْلِدُهُ الْمَوْضِعُ الَّذِي وُلِدَ فِيهِ، وَمِيلَادُ الرَّجُلِ اسْمُ الْوَقْتِ الَّذِي وُلِدَ فِيهِ)

অর্থঃকোনো ব্যক্তির মাওলিদ হলো তার জন্মের সময়, তার মাওলিদ সেই স্থানও যেখানে সে জন্মগ্রহণ করেছে, আর কোনো ব্যক্তির মীলাদ হলো সেই সময়ের নাম যে সময়ে সে জন্মগ্রহণ করেছে” (ইবনে মানযূর, লিছানুল য়ারব, (وَلَدٍ) :مَادَّةُ)

ইমাম ফাইয়ূমী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (الْمَوْلِدُ الْمَوْضِعُ وَالْوَقْتُ أَيْضًا، وَالْمِيلَادُ الْوَقْتُ لَا غَيْرُ)

অর্থঃমাওলিদ জন্মের স্থান এবং সময় উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়, আর মীলাদ বিশেষভাবে জন্মের সময়কে বোঝায়” (ফাইয়ূমী, আল মিছবাহুল মুনীর, (وَلَدٍ) :مَادَّةُ)

অতএবমীলাদকোনো বিকৃত বাংলা, ফারসি বা উর্দু শব্দ নয়এটি বিশুদ্ধ আরবি শব্দমীলাদুন নবীবলতে আভিধানিকভাবে নবীজি উনার জন্ম, জন্মকাল বা জন্মদিবস বোঝানো সম্পূর্ণ শুদ্ধশুভাগমনশব্দটিমীলাদএর অভিধানগত প্রতিশব্দ নয়, কিন্তু রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদতের মর্যাদা প্রকাশকারী আদবী ব্যাখ্যাঅর্থাৎ মীলাদ হলো বিলাদতের ঘটনা ও সময়, আর শুভাগমন হলো সেই বিলাদতকে তার নববী মর্যাদা ও বিশ্বজনীন ফলের আলোকে বর্ণনা করা

রবি কিতাবি ঐতিহ্যেও মাওলিদশব্দ শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যবহৃত হয়েছেইমাম আবুল খাত্তাব ইবনে দিহইয়াহ রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (التَّنْوِيرُ فِي مَوْلِدِ السِّرَاجِ الْمُنِيرِ وَالْبَشِيرِ النَّذِيرِ) আত-তানয়ীরু ফী মাওলিদি-ছিরাজি মুনীরি ওয়াল-বাশীরিন নাজি ইমাম জালালুদ্দীন ছুয়ূত্বী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (حُسْنُ الْمَقْصِدِ فِي عَمَلِ الْمَوْلِدِ) হুসনুল-মাক্বছ্বিদি ফী য়ামালিল-মাওলিদ মুল্লা য়ালী ক্বারী হানাফী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (الْمَوْرِدُ الرَّوِيُّ فِي الْمَوْلِدِ النَّبَوِيِّ) আল-মাওরিদুর-রাওয়িয়্যু ফিল-মাওলিদিন-নাবাওয়্যি ইমাম ইবনে নাছিরুদ্দীন দিমাশক্বী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (جَامِعُ الْآثَارِ فِي السِّيَرِ وَمَوْلِدِ الْمُخْتَارِ) যামিউল-আছারি ফি-ছিয়ারি ওয়া মাওলিদিল-মুখতার)কেবল কিতাবের নাম দিয়ে শরঈ হুকুম প্রমাণ হয় না, কিন্তু মাওলিদশব্দ কোনো অশিক্ষিত লোকসমাজের বানানো শব্দ নয় এটা প্রমানের জন্যেই দিলাম, এইসব দেখার পর আর বিতর্ক থাকে না জাহিল না হলে

এখানে আরেকটি পার্থক্য অবশ্যই স্থির রাখতে হবেঃ বিলাদত এবং বেয়ছত একই ঘটনা নয়রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম প্রথমে পবিত্র মক্কা শরীফে বিলাদত লাভ করেছেন, পরবর্তীতে মহান আল্লাহ তায়ালা উনাকে প্রকাশ্য নবুওয়্যাতী দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেনঅতএবমীলাদ কেেয়ছতএর আভিধানিক অর্থ বানানো হবে নাকিন্তু যিনি পরবর্তীতে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রছুল, হাদী, রহমত, মুয়াল্লিম ও মুযাক্কী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, উনার দুনিয়াবি হায়াত মুবারকের সূচনা তো উনার বিলাদত শরীফ দিয়েই, সেটা অস্বীকার করে উনাকে স্বীকার করার দাবিই মুর্খতা

তাহলেঈদে মীলাদুন নবীবলতে আমি কী বুঝাচ্ছি?

আমি একেবারে পরিষ্কার ভাষায় বলছিঃ ঈদে মীলাদুন নবী বলতে ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার সমান্তরালে তৃতীয় নতুন ফিক্বহী ঈদ বুঝাচ্ছি নাআমি নতুন কোনো ফরজ ছ্বলাত বানাচ্ছি নানতুন কোনো ওয়াযিব রোযা বানাচ্ছি নানতুন কোনো আক্বিদাহ বানাচ্ছি নাআমি এটাও বলছি না যে রবীউল আউওয়ালে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আবার নতুন করে বিলাদত লাভ করেন

ঈদে মীলাদুন নবীর হাক্বিক্বত হলোঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত ও দুনিয়াবি শুভাগমনের নিয়ামতকে পুনরাবর্তিতভাবে স্মরণ করা, উনার আগমনে আনন্দিত হওয়া, উনার তায়জ্বীম ও মহব্বত নবায়ন করা, উনার জিকির করা এবং মহান আল্লাহ তায়ালা উনার এই বিরাট নিয়ামতের শুকর শরীয়তসম্মত য়ামলের মাধ্যমে প্রকাশ করা

এই সংজ্ঞা লক করে রাখুনপরবর্তী আট পর্বের প্রতিটি দলীল এই হাক্বিক্বতের ওপর বসবেকেউ যদি মীলাদের নামে অমুক জায়গায় অমুক হারাম কাজ হয় বলে, আমি বলব সেই হারাম কাজ হারামইমীলাদ তার লাইসেন্স নয়আবার কোনো ব্যক্তির ভুল য়ামলকে কেন্দ্র করে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদতের স্মরণ, দুরুদ, ছালাম, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত, ছীরাত আলোচনা, ছ্বদক্বাহ, ইকরাম ও শুকরের মূল হাক্বিক্বতকে হারাম বলাও উছূল নয়শরীয়ত প্রতিটি কাজকে তার নিজস্ব দলীলের আলোকে বিচার করে

হারাম বলার অধিকার কার?

এখানে একটি কথা খুব শক্তভাবে বুঝতে হবেআমি করিনি”, “আমার ভালো লাগে না”, “আমাদের এলাকায় ছিল না”, “আমার শাইখ করেন নাএসব কোনো কিছুর নাম শরঈ তাহরীম নয়কোনো কাজকেহারামঘোষণা করা মানে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার শরীয়তের নামে একটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাতাই হারাম বলতে হলে ক্বুরআন শরীফ, ছুন্নাহ মুবারক অথবা তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শরঈ মূলনীতির অধীনে দলীল লাগবে

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ لَكُم مِّن رِّزْقٍ فَجَعَلْتُم مِّنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا قُلْ آللَّهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى اللَّهِ تَفْتَرُونَ)

অর্থঃআপনি বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য যে রিজিক নাযিল করেছেন, তোমরা তার মধ্য থেকে নিজেরাই কিছু হারাম এবং কিছু হালাল বানিয়ে নিয়েছ? আপনি বলুন, মহান আল্লাহ তায়ালা কি তোমাদেরকে এর অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ?” (ছুরাহ ইউনুছ য়ালাইহিছ ছালাম ১০:৫৯)

আর মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِّتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ)

অর্থঃতোমাদের জবান মিথ্যা বর্ণনা করে বলে দিও না, এটা হালাল আর এটা হারাম, যাতে তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার প্রতি মিথ্যা আরোপ কর” (ছুরাহ আন নাহল ১৬:১১৬)

সুতরাং মূলনীতি দ্বিমুখীস্বতন্ত্র ঈবাদত বানাতে দলীল লাগে, আবার কোনো বৈধ বিষয়কে হারাম বলতেও দলীল লাগেএখানেই ঈবাদত এবং ওয়াছ্বিলার পার্থক্য বুঝতে হবেআমি নিজের পক্ষ থেকে নতুন একটি নির্দিষ্ট ঈবাদত বানালাম, এর এত রকআত, এতবার, এত ছাওয়াব, মহান আল্লাহ তায়ালা এটাকে আবশ্যিক করেছেন, এই দাবি দলীল ছাড়া চলবে নাপক্ষান্তরে মাইক, ছাপাখানা, সভাস্থল, সময়সূচি, অনলাইন দাওয়াত, গাড়ি, আলোকব্যবস্থা, বইয়ের অধ্যায় নম্বর, হাদিছ শরীফ নম্বর, মাদরাসার শ্রেণিকক্ষ ইত্যাদি স্বতন্ত্র ঈবাদত নয়, এগুলো ওয়াছ্বিলাহ ও তানযীমএগুলোর নিজস্ব নিষেধ না থাকলে শুধুরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম  উনার যুগে এই ছুরত ছিল নাবলে হারাম বানানো যাবে না

বিদয়াতের মূল হাদিছ শরীফ আসলে কী বলছে?

উম্মুল মুওমিনীন হযরত আয়িশাহ ছ্বিদ্দীক্বাহ রদ্বিআল্লাহু য়ানহা থেকে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেছেনঃ (مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ)

অর্থঃযে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুনভাবে প্রবেশ করাবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত” (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ২৬৯৭; ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ১৭১৮)

অন্য বর্ণনায়ঃ (مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ)

অর্থঃযে এমন কোনো কাজ করবে, যার ওপর আমাদের দ্বীনের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত” (ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ১৭১৮)

এই দুই হাদিছ শরীফের নির্ণায়ক অংশ হলোঃمَا لَيْسَ مِنْهُএবংلَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَاঅর্থাৎ যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, যার ওপর দ্বীনের কোনো ভিত্তি নেইরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেননি, “আমার পরে যে সাংগঠনিক ছুরত তৈরি হবে সব প্রত্যাখ্যাতবলেননি, “আমি নিজে যে ওয়াছ্বিলাটি ব্যবহার করিনি তা সব হারামতিনি বলেছেন, দ্বীনের মধ্যে এমন জিনিস ঢুকানো যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেটি প্রত্যাখ্যাত

তাই এখানে প্রশ্ন হবে, মীলাদের মজলিছে যে কাজগুলো করা হয় সেগুলোর আছল শরীয়তে আছে কি না? ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত শরীয়তে আছে কি না? হামদ আছে কি না? দুরুদ ও ছালাম আছে কি না? রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছীরাত বর্ণনা আছে কি না? ছ্বদক্বাহ আছে কি না? মানুষকে খাবার খাওয়ানো আছে কি না? মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিয়ামতের শুকর আছে কি না? যদি প্রতিটি আছল নিজ নিজ দলীলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেগুলোকে একটি প্রমাণিত নিয়ামতের স্মরণে একত্র করার সাংগঠনিক ছুরতকেমা লাইছা মিনহুবলার আগে দলীল দিতে হবে

যে ইছলামে উত্তম পন্থা জারি করবে

হযরত জারীর ইবনে য়াব্দুল্লাহ রদ্বিআল্লাহু য়ানহু থেকে বর্ণিত, একদল দরিদ্র মানুষ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কাছে এলে উনি ছ্বদক্বাহর প্রতি উৎসাহ দিলেনএকজন আনছারী ছ্বহাবী রদ্বিআল্লাহু য়ানহু প্রথমে একটি ভারী থলি নিয়ে এলেন, এরপর মানুষ একের পর এক দান করতে শুরু করলতখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেনঃ (مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ)

অর্থঃযে ব্যক্তি ইছলামে কোনো উত্তম পন্থা জারি করবে, সে তার প্রতিদান পাবে এবং তার পরে যারা তাতে য়ামল করবে তাদের প্রতিদানও পাবে, তাদের প্রতিদান থেকে কিছুই কমানো হবে না” (ছ্বহীহ মুছলিম ১০১৭)

এখানে ছ্বদক্বাহ নতুন ঈবাদত ছিল নানতুন ছিল একজন ছ্বহাবীর অগ্রণী উদ্যোগ এবং তার ফলে অন্যদের সেই প্রমাণিত নেক য়ামলে সক্রিয় হয়ে ওঠাঅতএব কোনো শরীয়তপ্রমাণিত য়ামলকে নতুন উপায়ে জাগ্রত, সংগঠিত বা বিস্তৃত করা এবং শরীয়তের বাইরে নতুন ঈবাদত বানানো এক জিনিস নয়

হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনারনিয়মাতিল বিদয়াতু হাজিহী

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমদ্বানে ক্বিয়াম করেছেন এবং কয়েক রাত জামায়াতেও আদায় করেছেনপরে উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নিয়মিত বের হননিহযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার যামানায় মানুষকে এক ক্বারীর পেছনে সুবিন্যস্তভাবে একত্র করা হলে তিনি বললেনঃ (نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ)

অর্থঃএটি কতই না উত্তম নতুন ব্যবস্থা” (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ২০১০)

এখানে ক্বিয়াম নতুন ছিল না, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত নতুন ছিল না, জামায়াতের আছলও নতুন ছিল নানতুন ছিল স্থায়ীভাবে এক ইমামের পেছনে সুবিন্যস্ত সাংগঠনিক ছুরতঅতএবনতুনশব্দ দেখলেইশরঈ বিদয়াতে দ্বলালাহহবে, এই সমীকরণ ছ্বহাবী য়ামলেই টেকে নানতুনত্বের বিচার করতে হবে তার আছল ও শরঈ সামঞ্জস্য দিয়ে

হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার নিজস্ব নিয়মিত নফল য়ামল

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার যান্নাতী পদধ্বনি শুনে এমন কোন য়ামলের ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি আশা রাখেন তা জিজ্ঞাসা করেনহযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু য়ানহু জানান, যখনই পবিত্রতা অর্জন করতেন, সেই ওযুর পর যতটুকু সম্ভব নফল ছ্বলাত আদায় করতেনরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার এই নিয়মিত পন্থাকে বাতিল করেননি। (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ১১৪৯; ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ২৪৫৮)

এই হাদিছ শরীফ দিয়ে কেউ ইচ্ছামতো নতুন ঈবাদত বানানোর লাইসেন্স পাবে নাকিন্তু এটুকু অবশ্যই প্রমাণিত হয়, শরীয়তস্বীকৃত নফল য়ামলের মধ্যে একটি বৈধ নিয়মিত পন্থা গ্রহণ করলেই তা শুধুএই একই বিন্যাস আগে আলাদাভাবে নির্দেশিত ছিল নাএই কারণে হারাম হয়ে যায় না

রছুলে পাক উনি করেননিমানেই কিহারাম”?

এখানে উছূলের একটি ভয়াবহ অপব্যবহার হয়কোনো কাজ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করেছেন, এটি অবশ্যই দলীলকিন্তু উনি কোনো কাজ করেননি, সেখান থেকে সরাসরিহারামবের করতে হলে আলাদা প্রমাণ লাগবেকারণত্যাগনিজে সবসময়নিষেধনয়উনি কোনো কাজ না করার কারণ হতে পারে, তখন প্রয়োজন হয়নি, কোনো আশঙ্কা ছিল, কোনো বিকল্প করেছেন, উম্মতের ওপর কষ্টের ভয় ছিল, কোনো সাংগঠনিক প্রয়োজন তখন তৈরি হয়নি, অথবা কাজটির আছল অন্য বৈধ য়ামলের মধ্যে ছিল

ইমাম আবূ য়াব্দুল্লাহ তিলিমছানী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উছূলের আলোচনায়তারকএর দালালত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মূলত এই পার্থক্যই স্থির করেছেন, রছুলে পাক উনার ত্যাগ থেকে সর্বোচ্চ সেই কাজের আবশ্যিকতা না থাকা বোঝা যায়, নিছক ত্যাগ থেকেই তাহরীম প্রতিষ্ঠিত হয় না। (তিলিমছানী, মিফতাহুল উছূল ইলা বিনাইল ফুরূয়ালাল উছূল, দালালাতুত তারক আলোচনা)

এখানে আল-ক্বুরআনের উছূলও স্মরণে রাখুনঃ কোনো জিনিসকেহারামবলার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা উনার অনুমতি কোথায়, এই প্রশ্ন আল-ক্বুরআন নিজেই তুলেছে। (ছুরাহ ইউনুছ য়ালাইহিছ ছালাম ১০:৫৯) অতএবউনি করেননি, তাই হারামকোনো পূর্ণ শরঈ ক্বায়িদাহ নয়সঠিক প্রশ্ন হলোঃ উনি কি নিষেধ করেছেন? কোনো সাধারণ নিষেধের অন্তর্ভুক্ত কি না? কাজটি কি শরীয়তের আছ্বলের বিরোধী? নাকি কাজটির আছ্বল প্রমাণিত, শুধু সাংগঠনিক ছুরত পরবর্তী?

এখানে একটি খুব শক্ত উদাহরণ ক্বুরআন শরীফ সংকলনের ইতিহাসরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যামানায় ক্বুরআন শরীফ লিখিত ও মুখস্থ উভয়ভাবে সংরক্ষিত ছিলকিন্তু উনার বিছাল শরীফের পরে ইয়ামামাহর ঘটনায় হাফিজ্বদের শাহাদতের প্রেক্ষাপটে হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনাকে একত্রে ক্বুরআন শরীফ সংগ্রহের প্রস্তাব দিলে প্রথম প্রশ্নই উঠেছিলঃআপনি এমন কাজ কীভাবে করবেন যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করেননি?” হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু বললেনঃ هُوَ وَاللَّهِ خَيْرٌ, “মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ক্বছম, এটি কল্যাণপরে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিআল্লাহু য়ানহু এবং হযরত যায়দ ইবনে ছাবিত রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনাদের ক্বলবও এই কাজে প্রশস্ত হলো এবং ক্বুরআন শরীফ একত্রে সংকলিত হলো। (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ৪৯৮৬)

এই দৃষ্টান্তের অপব্যবহার করা যাবে নাআল-ক্বুরআনের একটি আয়াত শরীফও নতুন বানানো হয়নি, কোনো শব্দ পরিবর্তন করা হয়নিনতুন ছিল সংরক্ষণ ও তানযীমের একটি প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থাকিন্তু এই ঘটনাই দেখায়, “রছুলে পাক ছল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি এই সাংগঠনিক ছুরতে করেননিবাক্যটি একা কোনো কল্যাণকর ও শরীয়তসম্মত ব্যবস্থাকে হারাম বানায় না

আজকের মতো ঘটা করে কোথায়?” প্রশ্নের উত্তর

এখন আসি সেই বহুল ব্যবহৃত প্রশ্নেবলা হয়ঃআজকের মতো ঘটা করে সম্মিলিতভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যামানায় ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কোথায়?”

আমি বলিঃ প্রশ্নেরআজকের মতোঅংশটিই প্রমাণ করছে আপনি সাংগঠনিক ছুরত খুঁজছেন, আছ্বল নয়রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যামানায় আজকের মতো মাইক্রোফোন ছিল না, অফসেট ছাপা ক্বুরআন শরীফ ছিল না, অধ্যায় ও আন্তর্জাতিক নম্বরসহ ছ্বহীহ বুখারী ছিল না, মাদরাসার আজকের ক্লাসরুম ব্যবস্থা ছিল না, ডিজিটাল ঘড়ি ছিল না, অনলাইন দাওয়াত ছিল না, গাড়িতে করে ওয়াজ মাহফিলে যাওয়া ছিল নাএসবের কোনোটি স্বতন্ত্র ঈবাদত নয়, ওয়াছ্বিলাহতাই কোনো শরীয়তসম্মত উদ্দেশ্য সাধনের ওয়াছ্বিলাহ যুগে যুগে বদলাতে পারে, যতক্ষণ তা নিজে হারাম না হয়

তবে পুরোনো মূল পাণ্ডুলিপিতে যে কথা ছিল, “প্রথম যুগে দ্বীন প্রতিষ্ঠাই প্রধান ছিল, ইমান, ফরজ য়ামল, তাজকিয়া, হালাল হারাম, হিযরত, যুদ্ধ, নিপীড়ন ও রাষ্ট্রগঠন ছিল বড় বাস্তবতা”, এই কথার ঐতিহাসিক সত্যতা আছেমক্কী যুগে নির্যাতন, হিযরত, মদীনায় নতুন সমাজগঠন, ধারাবাহিক গাযওয়াহ, নতুন মুছলমানদের আক্বিদাহ ও য়ামল শিক্ষা, আল-ক্বুরআনের অবতরণ, শরীয়তের বিধান প্রতিষ্ঠা, সব মিলিয়ে নববী যুগের সামাজিক অগ্রাধিকার আজকের স্থিতিশীল সমাজের অগ্রাধিকারের মতো ছিল নাকিন্তু এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাকে আমরা শরঈ দলীলের বিকল্প বানাব নাআমাদের মূল যুক্তি হবে না, “তারা ব্যস্ত ছিলেন তাই মীলাদ করেননিআমাদের শক্ত যুক্তি হলোঃ কোনো পরবর্তী সাংগঠনিক ছুরতের হুবহু অনুপস্থিতি তার আছ্বলকে হারাম প্রমাণ করে না

প্রথম যুগে হাদিছ শরীফ লেখা কি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল?

পুরোনো লেখায় একটি কথা ছিলঃপ্রথম যুগে হাদিছ শরীফ লেখা নিষিদ্ধ ছিল, শুধু ক্বুরআন শরীফ লেখা হতোএই পয়েন্ট বাদ দেওয়া হবে না, কিন্তু তাহক্বীক্ব ছাড়া হুবহু রাখাও ঠিক হবে নাকারণ ছ্বহীহ মুছলিম শরীফে হযরত আবূ ছাঈদ খুদরী রদ্বিআল্লাহু য়ানহু থেকে বর্ণিত একটি নিষেধ আছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ (لَا تَكْتُبُوا عَنِّي، وَمَنْ كَتَبَ عَنِّي غَيْرَ الْقُرْآنِ فَلْيَمْحُهُ)

অর্থঃআমার থেকে আল-ক্বুরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিখো না, আর যে আল-ক্বুরআন ব্যতীত আমার থেকে অন্য কিছু লিখে রেখেছে সে তা মুছে ফেলুক” (ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ৩০০৪)

কিন্তু একই ছুন্নায় লেখার অনুমতিও প্রমাণিতহযরত য়াব্দুল্লাহ ইবনে য়ামর রদ্বিআল্লাহু য়ানহু বলেন, তিনি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কাছ থেকে যা শুনতেন তা লিখতেনকুরাইশের কিছু লোক আপত্তি করলে তিনি লেখা বন্ধ করেন এবং রছুলে পাক উনার কাছে বিষয়টি বলেনতখন রছুলে পাক উনি নিজের মুখ মুবারকের দিকে ইশারা করে বলেনঃ (اُكْتُبْ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا يَخْرُجُ مِنْهُ إِلَّا حَقٌّ)

অর্থঃলিখুনযাঁর হাতে আমার প্রাণ উনার ক্বছম, এই মুখ মুবারক থেকে হাক্ব ছাড়া কিছু বের হয় না” (ছুনান আবূ দাঊদ শরীফ ৩৬৪৬)

আবার ফাতহে মক্কার খুত্ববাহ শুনে আবূ শাহ লিখে দেওয়ার আবেদন করলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃاُكْتُبُوا لِأَبِي شَاهٍ”, “আবূ শাহর জন্য লিখে দাও” (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ২৪৩৪; ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ১৩৫৫)

হযরত আবূ হুরাইরাহ রদ্বিআল্লাহু য়ানহু নিজেই বলেছেন, ছ্বহাবায়ে কেরামের মধ্যে হাদিছ শরীফ বর্ণনায় উনার চেয়ে বেশি কেউ ছিলেন না, তবে হযরত য়াব্দুল্লাহ ইবনে য়ামর রদ্বিআল্লাহু য়ানহু ব্যতিক্রম, কারণ তিনি লিখতেন আর হযরত আবূ হুরাইরাহ রদ্বিআল্লাহু য়ানহু লিখতেন না। (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ, কিতাবুল ঈলম, হাদিছ শরীফ ১১৩)

অতএব শুদ্ধ কথা হলোঃ প্রথম যুগে হাদিছ শরীফ লেখার ব্যাপারে এক পর্যায়ে নিষেধের বর্ণনা আছে, পাশাপাশি স্পষ্ট অনুমতির বর্ণনাও আছেউলামায়ে কেরাম এগুলোকে নাছিখ মানছূখ, আল-ক্বুরআনের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা, অথবা ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে অনুমতি নিষেধের মাধ্যমে সমন্বয় করেছেনতাইহাদিছ শরীফ একেবারেই লেখা হয়নিবলা ভুলআবারনববী যুগেই আজকের মতো অধ্যায়, কিতাব, নম্বর, পূর্ণ সংকলন ছিলবলাও ভুলমৌখিক হিফয, ব্যক্তিগত ছ্বহীফাহ এবং পরে বৃহৎ সংকলন, সব মিলিয়ে হাদিছ শরীফ সংরক্ষণের ইতিহাস গড়ে উঠেছে

বুখারী মুছলিম শরীফে পাইনিমানেই কিদ্বীনে নেই”?

এখন আরেকটি অদ্ভুত যুক্তি আসেকিছু মানুষ কোনো প্রশ্ন শুনলেই বলে, “বুখারী মুছলিম শরীফে তো পাইনিযেন এমন আল-ক্বুরআন, বাকি হাদিছ শরীফের কিতাব, মুছান্নাফ, মুছনাদ, ছুনান, মুয়াত্তা, আছার, তাফছীর, ছীরাত এবং ফিক্বহের সমস্ত দলীল বাতিল, কেবল দুটো কিতাবের সূচিপত্রই পুরো দ্বীন

ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ও ছ্বহীহ মুছলিম শরীফের মর্যাদা বিশালকিন্তু কোনো মুহাদ্দিছই দাবি করেননি, উনার কিতাবে উম্মতের কাছে সংরক্ষিত প্রতিটি ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ ঢুকিয়ে দিয়েছেনইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি উনার জামিছ্বহীহকে প্রায় ছয় লক্ষ হাদিছ শরীফের বৃহৎ সংরক্ষিত উপাদান থেকে নির্বাচন করেছেন এবং ষোলো বছরে সংকলন করেছেন। (ত্বাবাক্বাতুশ শাফিঈয়্যাহ, ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহ য়ালাইহি উনার জীবনী)

কিন্তু এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ তাহক্বীক্ব আছেপুরোনো মূল পাণ্ডুলিপিতেছয় লক্ষ থেকে মাত্র এতগুলো, তাই ৯৯ শতাংশ হাদিছ শরীফ কোথায়?” এইভাবে শতাংশ বের করা হয়েছিলএই হিসাবকে আমি আর সেই রূপে ব্যবহার করব নাকারণ প্রাচীন মুহাদ্দিছদের গণনায় একই মাতনের বিভিন্ন ছনদ, পুনরাবৃত্তি, আছার, বিভিন্ন ত্বরীক্ব ইত্যাদিও সংখ্যার মধ্যে ঢুকতইমাম যাহাবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বড় বড় হিফজ্বের সংখ্যা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পষ্ট করেছেন, এই গণনায় পুনরাবৃত্তি, আছার, তাবিঈর ফতোয়া এবং বিভিন্ন ছনদও গণ্য হতোঅতএবছয় লক্ষ মানে ছয় লক্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন নববী বাক্যবলা বৈজ্ঞানিক নয়

কিন্তু পুরোনো পয়েন্টের আসল কথা ১০০ শতাংশ বহাল থাকেঃ কোনো একটি নির্বাচিত সংকলনের মোট হাদিছ শরীফ সংখ্যা দিয়ে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সমগ্র ছুন্নাহকে সীমাবদ্ধ করা যাবে নাবুখারী শরীফ একটি নির্বাচিত জামিছ্বহীহ, মুছলিম শরীফও একটি নির্বাচিত ছ্বহীহ সংকলনইমামগণ নিজেরাই নির্বাচন করেছেনতাইএই নির্দিষ্ট কিতাবে নেইএবংশরীয়তে কোনো ভিত্তি নেইএক বাক্য নয়

২৩ বছরের হিসাবের আসল শিক্ষা

পুরোনো মূল পাণ্ডুলিপিতে একটি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছিলঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার প্রকাশ্য নবুওয়াতী জীবনের ২৩ বছরকে দিন, ঘণ্টা ও মিনিটে হিসাব করলে ৮৩৯৫ দিন, ২০১৪৮০ ঘণ্টা এবং ১২০৮৮৮০০ মিনিট হয়এই সংখ্যাকেহাদিছ শরীফের সংখ্যাবলা যাবে না, কারণ প্রতিটি মিনিট একটি স্বতন্ত্র হাদিছ শরীফ নয়কিন্তু এই হিসাব একটি যৌক্তিক বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়ঃ ২৩ বছরের জীবন্ত নববী সমাজ, হাজারো কথা, কাজ, অনুমোদন, ছফর, যুদ্ধ, ঈবাদত, পারিবারিক জীবন, বিচার, শিক্ষা, মজলিছ, ব্যক্তিগত উপদেশ এবং দৈনন্দিন ঘটনার সমগ্রতা কোনো একটি মুদ্রিত কিতাবের মোট নম্বরের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না

হাদিছ শরীফের উছূলী পরিচয় কেবলএকটি বাক্য নম্বরনয়রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ক্বওল, ফেয়ল এবং তাক্বরীর, অর্থাৎ কথা, কাজ ও কোনো কাজের প্রতি অনুমোদন, ছুন্নাহর দলীলগত পরিসরের অংশঅতএবআমার মোবাইল অ্যাপে সার্চ করে পেলাম নাদিয়ে দ্বীনের ফয়ছালা হয় নাদলীল খুঁজতে হয় সমগ্র ক্বুরআন শরীফ, হাদিছ শরীফ, আছার, উছূল ও প্রাসঙ্গিক উৎসে

আল-ক্বুরআনের দলীল থাকলেএকই কথা বুখারী শরীফে কোথায়?” প্রশ্ন কেন ভুল

আরও একটি মৌলিক কথাক্বুরআন শরীফ নিজেই শরীয়তের মূল উৎসকোনো হুকুম ক্বুরআন শরীফে স্পষ্ট থাকলে সেটি গ্রহণ করার জন্যএকই বাক্য বুখারী শরীফে কোথায়?” এমন শর্ত শরীয়ত দেয়নিঅবশ্য আল-ক্বুরআনের ব্যাখ্যা, সীমা ও বাস্তব প্রয়োগ বুঝতে ছুন্নাহ অপরিহার্যআল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ মুবারক পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়কিন্তু আল-ক্বুরআনের একটি প্রতিষ্ঠিত নির্দেশকে শুধু এই কারণে প্রত্যাখ্যান করা যাবে না যে, কেউ তার একই শব্দের আরেকটি হাদিছ শরীফ খুঁজে পায়নি

এই রিছালার পরবর্তী পর্বগুলোতে আমরা দেখব, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বিরাট নিয়ামত ও রহমত কি না, উনার প্রাপ্তিতে আনন্দের ক্বুরআনিক নির্দেশ আছে কি না, নিয়ামতের কথা প্রকাশ ও শুকরের নির্দেশ আছে কি না, মহান নিয়ামতের দিন স্মরণ করার নীতি আছে কি না, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি নিজের বিলাদতের দিনকে ঈবাদতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন কি না, ছ্বহাবায়ে কিরাম উনাকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মিন্নত হিসেবে চিনে সম্মিলিত হামদ করেছেন কি না, এবং মীলাদের বর্তমান শরীয়তসম্মত য়ামলগুলোর প্রতিটির নিজস্ব দলীল আছে কি নাযদি এগুলো একে একে প্রমাণিত হয়, তখনআজকের মতো একটি অনুষ্ঠান বুখারী শরীফে কোথায়?” প্রশ্নটি নিজের ওজন হারাবে

প্রথম যুগে সব বর্তমান সাংগঠনিক ছুরত না থাকার বাস্তবতা

ইছলামের প্রথম যুগ ছিল দ্বীন প্রতিষ্ঠা, ঈমান দৃঢ় করা, তাজকিয়া, ছ্বলাত, জাকাত, রোযা, হজ্জ, হালাল হারাম, সামাজিক ন্যায়, হিযরত, জিহাদ, রাষ্ট্র ও উম্মাহ গঠনের যুগনওমুছলিম সমাজকে শত শত জাহিলী রীতি থেকে বের করে আনা হচ্ছিলজীবনযাত্রা ছিল কঠিনমক্কায় নির্যাতন, শিয়বের অবরোধ, হিযরত, মদীনার নতুন রাষ্ট্র, একের পর এক গাযওয়াহ, মুনাফিক্বদের ষড়যন্ত্র, বাইরের আক্রমণ, সবকিছু একসঙ্গে চলেছেতাই পরবর্তী স্থিতিশীল মুছলিম সভ্যতায় যে ধরনের বৃহৎ আয়োজন, মাদরাসা, গ্রন্থাগার, স্মরণসভা, ধর্মীয় ক্যালেন্ডার, সম্মেলন ও সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, নববী যুগে সেগুলোর হুবহু রূপ খোঁজা ঐতিহাসিকভাবেই অযৌক্তিক

কিন্তু আবার বলছি, এটাকে আমরা মূল শরঈ দলীল বানাচ্ছি নাকারণ আমাদের রিছালাহয়তো তারা করতেন কিন্তু লিখিত হয়নিএই অনুমানের ওপর দাঁড়াবে নাআমরা বিদ্যমান ক্বুরআন শরীফ, ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ, প্রাচীন তাফছীর, উছূল এবং ইতিহাসের ওপর দাঁড়াবযে রেওয়ায়েত দুর্বল, তাকে দুর্বল বলেই ব্যবহার করবযে ঐতিহাসিক, তাকে ইতিহাসের স্তরে রাখবযে তাফছীরী ক্বওল, তাকে তাফছীরী ক্বওল বলবকিন্তুছ্বহীহ নয়, তাই অস্তিত্বই নেইঅথবাবুখারী শরীফে নেই, তাই বাতিলএই অজ্ঞতার পথেও যাব না

ওয়াছ্বিলাহ বদলালে ঈবাদতের হাক্বিক্বত বদলায় না

আজ আমরা ক্বুরআন শরীফ ছাপাখানায় ছাপিহাদিছ শরীফকে কিতাব, বাব, নম্বর ও ডিজিটাল ডাটাবেসে সাজাইমসজিদে মাইক্রোফোন ব্যবহার করিরমদ্বানের সময়সূচি ছাপিহজ্জে বিমান ব্যবহার করিদূরের মানুষকে অনলাইনে দ্বীনের দাওয়াত দিইএসবের কোনোটি নববী যুগের হুবহু প্রযুক্তিগত ছুরত নয়কিন্তু এগুলোর উদ্দেশ্য ও আছ্বল বৈধ হলে ওয়াছ্বিলাহও বৈধ, যতক্ষণ কোনো স্বতন্ত্র হারাম উপাদান নেই

একইভাবে ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কোনো মজলিছে যদি ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত হয়, দুরুদ ও ছালাম হয়, ছীরাত বর্ণিত হয়, মহান আল্লাহ তায়ালা উনার হামদ হয়, ছ্বদক্বাহ হয়, মানুষকে খাবার দেওয়া হয়, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদতের নিয়ামত স্মরণ করা হয়, তাহলে প্রতিটি কাজের নিজস্ব দলীল বিচার করতে হবেমাইক নতুন বলে ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত বিদয়াত হয় নাবড় হল নতুন বলে হামদ হারাম হয় নানির্দিষ্ট দিনে মানুষ একত্র হয়েছে বলে দুরুদ শরীফ নিষিদ্ধ হয়ে যায় নাতবে কোনো হারাম কাজ ঢুকলে সেই হারাম অংশ অবশ্যই বাদ দিতে হবে

মীলাদের নামে হারাম হলে আমার অবস্থান কী?

এই রিছালা অন্ধ সমর্থনের রিছালা নয়মীলাদের নামে যদি বেপর্দা হয়, অশ্লীলতা হয়, ফরজ ছ্বলাত নষ্ট হয়, অপচয় হয়, মানুষের হাক্ব নষ্ট হয়, মিথ্যা রেওয়ায়েতকে ছ্বহীহ বলে চালানো হয়, হারাম বাদ্য বা অন্য কোনো শরীয়তবিরোধী কাজ হয়, সেই নির্দিষ্ট কাজ যত নামেই করা হোক হারামই থাকবেমীলাদশব্দ কোনো হারামকে হালাল করে না

কিন্তু এখানেই ন্যায়বিচার চাইকোনো বিয়েতে হারাম কাজ হলেনিকাহ হারামবলা হয় নাকোনো ওয়াজ মাহফিলে মিথ্যা বলা হলেওয়াজ হারামবলা হয় নাকোনো মসজিদের কমিটি দুর্নীতি করলেমসজিদ হারামবলা হয় নাতাহলে কোনো মীলাদী আয়োজনে কারও ভুল হলে পুরো নববী বিলাদতস্মরণ, দুরুদ শরীফ, ছীরাত, হামদ, ছ্বদক্বাহ ও শুকরকে কেন হারাম বলা হবে? ভুল অংশকে ভুল বলো, হারাম অংশকে হারাম বলো, কিন্তু হালালকে হারাম বানিও না

প্রথম পর্বের ফয়ছালা

এখন প্রথম পর্বের সমস্ত আলোচনা এক জায়গায় রাখুনঈদবিশুদ্ধ আরবি শব্দ, যার মধ্যে পুনরাগমন, পুনরাবৃত্তি, সমাবেশ ও নবায়িত আনন্দের অর্থ রয়েছেমীলাদএবংমাওলিদবিশুদ্ধ আরবি শব্দ, যার মূল অর্থ বিলাদত, বিলাদতের সময় ও স্থানঈদে মীলাদুন নবীবলতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত ও শুভাগমনের নিয়ামতকে পুনরাবর্তিতভাবে স্মরণ, উনার প্রতি তায়জ্বীম ও মহব্বত নবায়ন, উনার প্রাপ্তিতে আনন্দ এবং মহান আল্লাহ তায়ালা উনার শুকর শরীয়তসম্মত য়ামলের মাধ্যমে প্রকাশ করা বোঝানো হচ্ছে

এটি ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার সমান্তরালে নতুন তৃতীয় ফিক্বহী ঈদ সৃষ্টি নয়এটি নতুন কোনো ফরজ, নতুন ওয়াযিব, নতুন আক্বিদাহ বা নতুন স্বতন্ত্র ঈবাদতও নয়বিদয়াতের হাদিছ শরীফ যে জিনিসকে প্রত্যাখ্যান করেছে তা হলোদ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়এমন বিষয়কে দ্বীনের অংশ বানানোশরীয়তপ্রমাণিত নেক য়ামলকে নতুন সাংগঠনিক পন্থায় জাগ্রত ও একত্র করার দৃষ্টান্ত ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ এবং ছ্বহাবী য়ামলে আছেরছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নিছক ত্যাগ নিজে তাহরীম নয়আজকের মতোপ্রযুক্তিগত বা সাংগঠনিক ছুরত প্রথম যুগে না থাকাও তাহরীম নয়

আরবুখারী শরীফ, মুছলিম শরীফে পাইনিদ্বীনের ফয়ছালার চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়হাদিছ শরীফ সংরক্ষণ নববী যুগ থেকেই মৌখিক ও লিখিত উভয়ভাবে ছিল, পরে বৃহৎ কিতাবি সংকলন হয়েছেপ্রাচীন মুহাদ্দিছদের লক্ষ লক্ষহাদিছগণনা মানে লক্ষ লক্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন নববী বাক্য নয়, তাই ভুল শতাংশ দিয়ে যুক্তি সাজানো প্রয়োজন নেইকিন্তু কোনো একটি নির্বাচিত সংকলনকে সমগ্র ছুন্নাহর সমার্থক ভাবাও ভুলক্বুরআন শরীফ নিজে মূল দলীল এবং ক্বুরআন শরীফ ও ছুন্নাহ মুবারক একসঙ্গে শরীয়তের হেদায়েতী ভিত্তি

সুতরাং এখন আর প্রশ্নআজকের মতো মীলাদ বুখারী শরীফে কোন নম্বরে?” নয়এখন সঠিক প্রশ্ন হবেঃ যাঁর মীলাদ আমরা স্মরণ করছি, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার কাছে কে? উনি কি সাধারণ কোনো নিয়ামত, নাকি মুওমিনদের প্রতি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বিরাট মিন্নত? উনি কি শুধু একটি জাতির শিক্ষক, নাকি বিশ্বজগতের রহমত? উনার মহব্বত কি ঐচ্ছিক আবেগ, নাকি ঈমানের পূর্ণতার শর্ত? উনার দুনিয়ায় তাশরীফ আনা যদি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বিরাট নিয়ামত হয়, তাহলে সেই নিয়ামতের বিপরীতে একজন হাক্বিক্বী শাকিরের অবস্থান কী হওয়া উচিত?

এই ফয়ছালা দ্বিতীয় অধ্যায়ে

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: