Showing posts with label আইয়্যামুল্লাহ. Show all posts
Showing posts with label আইয়্যামুল্লাহ. Show all posts

Saturday, August 15, 2026

ঈদে মীলাদুন নবী ﷺ পালন ব্যতীত হাক্বীক্বী শাকির হওয়া অসম্ভবঃ প্রথম অধ্যায়

ঈদে মীলাদুন নবী ﷺ পালন ব্যতীত হাক্বীক্বী শাকির হওয়া অসম্ভবঃ প্রথম অধ্যায়

ঈদে মীলাদুন নবীঃ হাক্বিকত, পরিভাষা, বিদয়াত এবং শরঈ ফয়ছালার উছূল

আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রযীম। বিছমিল্লাহির রহমানির রহীম। নাহমাদুহূ ওয়া নুছ্বল্লী ওয়া নাছাল্লিমু য়ালা রছুলিহিল কারীম, ওয়া য়ালা আলিহী ওয়া আছ্বহাবিহী আযমাঈন।

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পবিত্র জাত মুবারকের জন্য। অসংখ্য দুরুদ, ছ্বলাত ও ছালাম নবীয়ে আকরাম, শাফীয়ে উমাম, নবীয়ে মুহতারাম, ছাইয়্যিদুল মুরছালীন, ইমামুল মুরছালীন, খতামান নাবীইয়্যিন, নূরে মুজাছছাম, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পবিত্র ক্বদম মুবারকে নিবেদিত হোক।

এখন কথা হলোঃ “ঈদে মীলাদুন নবী” বলতে আসলে কী বোঝায়? এই একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর না জেনে কেউ যদি সরাসরি বলে “বিদয়াত”, “হারাম”, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করেননি”, “ছ্বহাবায়ে কেরাম করেননি”, তাহলে সে প্রথমেই একটি উছূলী ভুল করে বসে। কারণ কোনো বিষয়ের হালাল হারাম, ছুন্নাহ, বিদয়াত, মুস্তাহাব নাজায়িযের ফয়ছালা দেওয়ার পূর্বে সেই বিষয়ের প্রকৃত হাক্বিক্বত নির্ধারণ করা ফরজে ঈলমীর অন্তর্ভুক্ত। যে জিনিসের সংজ্ঞাই বদলে দেওয়া হলো, তার বিরুদ্ধে যত দলীলই পেশ করা হোক, সেই দলীল আসল বিষয়ের বিরুদ্ধে নয়, একটি কল্পিত বিষয়ের বিরুদ্ধে যাবে।

ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিয়ে বিরোধের বড় অংশ এখানেই। কেউ মনে করে ঈদে মীলাদুন নবী মানেই ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আদ্বহার সমান্তরালে তৃতীয় একটি নতুন ফিক্বহী ঈদ। কেউ মনে করে মীলাদ মানেই মাইক, ব্যানার, জুলুছ, আলো, খাবার বা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক অনুষ্ঠান। কেউ আবার এমনভাবে প্রশ্ন করে যেন আমরা দাবি করছি, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম প্রতি রবীউল আউয়াল শরীফে নতুন করে জন্মগ্রহণ করেন। এই সব সংজ্ঞাই ভুল। তাই প্রথম অধ্যায়ে আমি কোনো আবেগী স্লোগান নয়, প্রথমে শব্দ, তারপর পরিভাষা, তারপর উছূল, তারপর “করেননি” যুক্তির সীমা, তারপর বিদয়াতের মাপকাঠি এবং শেষে আজকের সাংগঠনিক ছুরতের শরঈ অবস্থান নির্ধারণ করব।

“ঈদ” শব্দের হাক্বিক্বত

“ঈদ” আ’রবি عِيدٌ। ইমাম ইবনে মানযূর রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (وَالْعِيدُ كُلُّ يَوْمٍ فِيهِ جَمْعٌ، وَاشْتِقَاقُهُ مِنْ عَادَ يَعُودُ كَأَنَّهُمْ عَادُوا إِلَيْهِ)

অর্থঃ “ঈদ এমন প্রত্যেক দিন, যেদিন মানুষের সমাবেশ ঘটে। এর উৎপত্তি ‘আদা, ইয়াউদু’ থেকে, যেন মানুষ পুনরায় সেই দিনের দিকে ফিরে আসে।” (ইবনে মানযূর, লিছানুল য়া’রব, (عَوْد) :مَادَّةُ)

ইমাম আযহারী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (وَالْعِيدُ عِنْدَ الْعَرَبِ الْوَقْتُ الَّذِي يَعُودُ فِيهِ الْفَرَحُ وَالْحُزْنُ)

অর্থঃ “আ’রবদের নিকট ঈদ হলো সেই সময়, যে সময়ে আনন্দ অথবা দুঃখের স্মৃতি পুনরায় ফিরে আসে।” (আযহারী, তাহযীবুল লুগ্বাহ, (عَوْد) :مَادَّةُ; ইবনে মানযূর, লিছানুল য়া’রব, (عَوْد) :مَادَّةُ)

ইবনুল আ’রাবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (سُمِّيَ الْعِيدُ عِيدًا لِأَنَّهُ يَعُودُ كُلَّ سَنَةٍ بِفَرَحٍ مُجَدَّدٍ)

অর্থঃ “ঈদকে ঈদ বলা হয়েছে, কারণ তা প্রতি বছর নবায়িত আনন্দ নিয়ে ফিরে আসে।” (ইবনে মানযূর, লিছানুল য়া’রব, (عَوْد) :مَادَّةُ)

ইমাম নববী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (قَالُوا وَسُمِّيَ عِيدًا لِعَوْدِهِ وَتَكَرُّرِهِ، وَقِيلَ لِعَوْدِ السُّرُورِ فِيهِ)

অর্থঃ “উলামায়ে কিরাম বলেছেন, একে ঈদ বলা হয়েছে তার ফিরে আসা ও পুনরাবৃত্তির কারণে, আবার বলা হয়েছে, এতে আনন্দ ফিরে আসে বলেই একে ঈদ বলা হয়।” (ইমাম নববী, আল মিনহাজ শরহু ছ্বহীহ মুছলিম, কিতাবু ছ্বলাতিল ঈদাইন)

অতএব “ঈদ” শব্দের ভেতর তিনটি বিষয় স্পষ্টঃ একটি স্মরণীয় সময়ের পুনরাগমন, মানুষের সেই উপলক্ষের দিকে পুনরায় প্রত্যাবর্তন এবং সেই উপলক্ষের সঙ্গে আনন্দ/কষ্টের স্মরণ বা সমাবেশের সম্পর্ক। ঘটনা একবার ঘটতে পারে, কিন্তু তার স্মৃতি ও তার নিয়ামতের জন্য আনন্দ প্রতি বছর নতুন হয়ে ফিরে আসতে পারে। “ঘটনা তো একবার ঘটেছে, আবার আনন্দ কেন?” এই প্রশ্ন যারা করে, তারা আ’রবি “ঈদ” শব্দের মূল অর্থই বুঝে না তাদের জাহেলিয়াতের কারনে।

ক্বুরআন শরীফেও “ঈদ” শব্দ শুধু ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার জন্য ব্যবহার হয়নি। হযরত ঈছা ইবনে মারইয়াম য়ালাইহিছ ছালাম দু’য়া করেছেনঃ (قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِّأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِّنكَ وَارْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ)

অর্থঃ হযরত ঈছা ইবনে মারইয়াম য়ালাইহিছ ছালাম বললেন, হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা! হে আমাদের রব! আপনি আমাদের জন্য আসমান থেকে একটি মায়িদাহ নাযিল করুন, যা আমাদের প্রথম ও শেষ সকলের জন্য ঈদ হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আর আমাদেরকে রিয্ক দান করুন, আপনিই-তো শ্রেষ্ঠ রিয্কদাতা। (ছুরাহ আল মায়িদাহ ৫:১১৪)

এই আয়াত শরীফেই-তো একটি মৌলিক বিভ্রান্তি শেষ করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ তা’য়ালা। “ঈদ” শব্দের ক্বুরআনিক ব্যবহার ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার ফিক্বহী কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ক্বুরআন অনুসারে আসমানী খাবার নামক নিয়ামতের আগমনই “ঈদ” হওয়ার বিষয় বানানো হয়েছে। সুতরাং কোনো খোদায়ী নিয়ামতের স্মরণীয় দিনকে আভিধানিক ও ক্বুরআনিক অর্থে “ঈদ” বলা ক্বুরআনি ভাষা, খোদায়ী নিয়ামত লাভের বিপরীতে ঈদের দিন ঘোষণা করা মানেই ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার পাশে নতুন তৃতীয় ঈদের নামাজ, নতুন তাকবীর, নতুন ওয়াযিব বা নতুন ফিক্বহী বিধান বানিয়ে ফেলা নয়। এই পার্থক্য না বুঝে শুধু “মুছলমানের ঈদ দুইটা” বলে শব্দগত আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া শুদ্ধ উছূল নয় বরং ঈলমী খিয়ানত ও নবী বিদ্বষী জাহিল হওয়া।

“মীলাদ” এবং “মাওলিদ” শব্দের হাক্বিক্বত

“মীলাদ” এবং “মাওলিদ” উভয় শব্দের মূলধাতু و ل د। এখান থেকেই وِلَادَةٌ, مَوْلِدٌ, مِيلَادٌ ইত্যাদি শব্দ এসেছেন। মূল-কেন্দ্রীয় অর্থ হলেন জন্ম, জন্মের সময় এবং জন্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিছবত।

ইমাম ইবনে মানযূর রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (وَمَوْلِدُ الرَّجُلِ وَقْتُ وِلَادِهِ، وَمَوْلِدُهُ الْمَوْضِعُ الَّذِي وُلِدَ فِيهِ، وَمِيلَادُ الرَّجُلِ اسْمُ الْوَقْتِ الَّذِي وُلِدَ فِيهِ)

অর্থঃ “কোনো ব্যক্তির মাওলিদ হলো তার জন্মের সময়, তার মাওলিদ সেই স্থানও যেখানে সে জন্মগ্রহণ করেছে, আর কোনো ব্যক্তির মীলাদ হলো সেই সময়ের নাম যে সময়ে সে জন্মগ্রহণ করেছে।” (ইবনে মানযূর, লিছানুল য়া’রব, (وَلَدٍ) :مَادَّةُ)

ইমাম ফাইয়ূমী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি বলেনঃ (الْمَوْلِدُ الْمَوْضِعُ وَالْوَقْتُ أَيْضًا، وَالْمِيلَادُ الْوَقْتُ لَا غَيْرُ)

অর্থঃ “মাওলিদ জন্মের স্থান এবং সময় উভয় অর্থে ব্যবহৃত হয়, আর মীলাদ বিশেষভাবে জন্মের সময়কে বোঝায়।” (ফাইয়ূমী, আল মিছবাহুল মুনীর, (وَلَدٍ) :مَادَّةُ)

অতএব “মীলাদ” কোনো বিকৃত বাংলা, ফারসি বা উর্দু শব্দ নয়। এটি বিশুদ্ধ আ’রবি শব্দ। “মীলাদুন নবী” বলতে আভিধানিকভাবে নবীজি উনার জন্ম, জন্মকাল বা জন্মদিবস বোঝানো সম্পূর্ণ শুদ্ধ। “শুভাগমন” শব্দটি “মীলাদ” এর অভিধানগত প্রতিশব্দ নয়, কিন্তু রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদতের মর্যাদা প্রকাশকারী আদবী ব্যাখ্যা। অর্থাৎ মীলাদ শরীফ হলেন বিলাদতের ঘটনা ও সময়, আর শুভাগমন হলো সেই বিলাদত শরীফকে উনার নববী মর্যাদা ও বিশ্বজনীন ফলের আলোকে বর্ণনা করা।

আ’রবি কিতাবি ঐতিহ্যেও “মাওলিদ” শব্দ শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যবহৃত হয়েছে। ইমাম আবুল খাত্তাব ইবনে দিহইয়াহ রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (التَّنْوِيرُ فِي مَوْلِدِ السِّرَاجِ الْمُنِيرِ وَالْبَشِيرِ النَّذِيرِ) আত-তানউয়ীরু ফী মাওলিদিছ-ছিরাজিম মুনীরি ওয়াল-বাশীরিন নাজির। ইমাম জালালুদ্দীন ছুয়ূত্বী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (حُسْنُ الْمَقْصِدِ فِي عَمَلِ الْمَوْلِدِ) হুসনুল-মাক্বছ্বিদি ফী য়ামালিল-মাওলিদ। মুল্লা য়ালী ক্বারী হানাফী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (الْمَوْرِدُ الرَّوِيُّ فِي الْمَوْلِدِ النَّبَوِيِّ) আল-মাওরিদুর-রাওয়িয়্যু ফিল-মাওলিদিন-নাবাওউয়্যি। ইমাম ইবনে নাছিরুদ্দীন দিমাশক্বী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি রচনা করেছেন (جَامِعُ الْآثَارِ فِي السِّيَرِ وَمَوْلِدِ الْمُخْتَارِ) যামি‘য়উল-আছারি ফিছ-ছিয়ারি ওয়া মাওলিদিল-মুখতার)। কেবল কিতাবের নাম দিয়ে শরঈ হুকুম প্রমাণ হয় না, কিন্তু “মাওলিদ” শব্দ কোনো অশিক্ষিত লোকসমাজের বানানো শব্দ নয় এটা প্রমানের জন্যেই দিলাম, এইসব দেখার পর আর বিতর্কই থাকে না জাহিল না হলে।

এখানে আরেকটি পার্থক্য অবশ্যই স্থির রাখতে হবেঃ বিলাদত এবং বেয়ছত একই ঘটনা নয়। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম প্রথমে পবিত্র মক্কা শরীফে বিলাদত লাভ করেছেন, পরবর্তীতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনাকে প্রকাশ্য নবুওয়্যাতীর দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন। অতএব “মীলাদ” কে “বেয়ছত” এর আভিধানিক অর্থ বানানো হবে না। কিন্তু যিনি পরবর্তীতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রছুল, হাদী, রহমত, মু’য়াল্লিম ও মুযাক্কী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, উনার দুনিয়াবি হায়াত মুবারকের সূচনা তো উনার বিলাদত শরীফ দিয়েই, সেটা অস্বীকার করে উনাকে স্বীকার করার দাবিই মুর্খতা।

তাহলে “ঈদে মীলাদুন নবী” বলতে আমি কী বুঝাচ্ছি?

আমি একেবারে পরিষ্কার ভাষায় বলছিঃ ঈদে মীলাদুন নবী বলতে ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার সমান্তরালে তৃতীয় নতুন কোন ফিক্বহী ঈদ বুঝাচ্ছি না। আমি নতুন কোনো ফরজ ছ্বলাত বানাচ্ছি না। নতুন কোনো ওয়াযিব রোযা বানাচ্ছি না। নতুন কোনো আক্বিদাহ-ও বানাচ্ছি না। আমি এটাও বলছি না যে রবীউল আউওয়াল শরীফে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আবার নতুন করে বিলাদত লাভ করেন।

ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামের হাক্বিক্বত হলোঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত ও দুনিয়াবি শুভাগমনের নিয়ামতকে পুনরাবর্তিতভাবে স্মরণ করা, উনার আগমনে আনন্দিত হওয়া, উনার তা’য়জ্বীম ও মুহব্বত নবায়ন করা, উনার জিকির করা এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার এই বিরাট নিয়ামতের শুকুর শরীয়তসম্মত য়া’মলের মাধ্যমে প্রকাশ করা।

এই সংজ্ঞা লক করে রাখুন। পরবর্তী আট পর্বের প্রতিটি দলীল এই হাক্বিক্বতের ওপর বসবে। কেউ যদি মীলাদের নামে অমুক জায়গায় অমুক হারাম কাজ হয় বলে, আমি বলব সেই হারাম কাজ হারামই। মীলাদ তার লাইসেন্স নয়। আবার কোনো ব্যক্তির ভুল য়া’মলকে কেন্দ্র করে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদতের স্মরণ, দুরুদ, ছালাম, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত, ছীরাত আলোচনা, ছ্বদক্বাহ, ইকরাম/তাবারুক ও শুকুরের মূল হাক্বিক্বতকে হারাম বলাও শরীয়তের উছূল বিরোধি। শরীয়ত প্রতিটি কাজকে তার নিজস্ব দলীলের আলোকে বিচার করেন।

হারাম বলার অধিকার কার?

এখানে একটি কথা খুব শক্তভাবে বুঝতে হবে। “আমি করিনি”, “আমার ভালো লাগে না”, “আমাদের এলাকায় ছিল না”, “আমার শাইখ করেন না” এসব কোনো কিছুর নাম শরঈ তাহরীম নয়। কোনো কাজকে “হারাম” ঘোষণা করা মানে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার শরীয়তের নামে একটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। তাই হারাম বলতে হলে ক্বুরআন শরীফ, ছুন্নাহ মুবারক অথবা তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শরঈ মূলনীতির অধীনে দলীল লাগবে।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ لَكُم مِّن رِّزْقٍ فَجَعَلْتُم مِّنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا قُلْ آللَّهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى اللَّهِ تَفْتَرُونَ)

অর্থঃ “(হে নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের জন্য যে রিজিক নাযিল করেছেন, তোমরা তার মধ্য থেকে নিজেরাই কিছু হারাম এবং কিছু হালাল বানিয়ে নিয়েছ? (ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলুন, মহান আল্লাহ তা’য়ালা কি তোমাদেরকে এর অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ?” (ছুরাহ ইউনুছ য়ালাইহিছ ছালাম ১০:৫৯)

মহান আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেনঃ (وَلَا تَقُولُواْ لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ ٱلْكَذِبَ هَـٰذَا حَلَـٰلٌ وَهَـٰذَا حَرَامٌ لِّتَفْتَرُواْ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ‌ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ)

অর্থঃ “আর তোমরা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর মিথ্যা রটানোর জন্য তোমাদের জিহবা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং ওটা হারাম, নিশ্চয় যারা মহান আল্লাহ তায়ালা উনার উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফলকাম হবে না।” (ছুরাহ আন নাহল ১৬:১১৬)

সুতরাং মূলনীতি দ্বিমুখী। স্বতন্ত্র ঈবাদত বানাতে দলীল লাগে, আবার কোনো বৈধ বিষয়কে হারাম বলতেও দলীল লাগে। এখানেই ঈবাদত এবং ওয়াছ্বিলার পার্থক্য বুঝতে হবে। আমি নিজের পক্ষ থেকে নতুন একটি নির্দিষ্ট ঈবাদত বানালাম, এর এত রক’আত, এতবার, এত ছাওয়াব, মহান আল্লাহ তা’য়ালা এটাকে আবশ্যিক করেছেন, এই দাবি দলীল ছাড়া চলবে না। পক্ষান্তরে মাইক, ছাপাখানা, সভাস্থল, সময়সূচি, অনলাইন দাওয়াত, গাড়ি, আলোকব্যবস্থা, বইয়ের অধ্যায় নম্বর, হাদিছ শরীফ নম্বর, মাদরাসার শ্রেণিকক্ষ ইত্যাদি স্বতন্ত্র ঈবাদত নয়, এগুলো ওয়াছ্বিলাহ ও তানযীম। এগুলোর নিজস্ব নিষেধ না থাকলে শুধু “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যুগে এই ছুরত ছিল না” বলে হারাম বানানো যাবে না।

বিদয়াতের মূল হাদিছ শরীফ আসলে কী বলছেন?

উম্মুল মুওমিনীন হযরত আয়িশাহ ছ্বিদ্দীক্বাহ রদ্বিআল্লাহু য়ানহা থেকে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেছেনঃ (مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ)

অর্থঃ “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুনভাবে প্রবেশ করাবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ২৬৯৭; ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ১৭১৮)

অন্য বর্ণনায়ঃ (مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ)

অর্থঃ “যে এমন কোনো কাজ করবে, যার ওপর আমাদের দ্বীনের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।” (ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ১৭১৮)

এই দুই হাদিছ শরীফের নির্ণায়ক অংশ হলোঃ “مَا لَيْسَ مِنْهُ” এবং “لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا”। অর্থাৎ যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, যার ওপর দ্বীনের কোনো ভিত্তি নেই। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেননি, “আমার পরে যে সাংগঠনিক ছুরত তৈরি হবে সব প্রত্যাখ্যাত।” বলেননি, “আমি নিজে যে ওয়াছ্বিলাটি ব্যবহার করিনি তা সব হারাম।” তিনি বলেছেন, দ্বীনের মধ্যে এমন জিনিস ঢুকানো যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেটি প্রত্যাখ্যাত।

তাই এখানে প্রশ্ন হবে, মীলাদের মজলিছে যে কাজগুলো করা হয় সেগুলোর আছল শরীয়তে আছে কি না? ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত শরীয়তে আছে কি না? হামদ আছে কি না? দুরুদ ও ছালাম আছে কি না? রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছীরাত বর্ণনা আছে কি না? ছ্বদক্বাহ আছে কি না? মানুষকে খাবার খাওয়ানো আছে কি না? মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নিয়ামতের শুকুর আছে কি না? যদি প্রতিটি আছল নিজ নিজ দলীলে প্রমাণিত হয়, তাহলে সেগুলোকে একটি প্রমাণিত নিয়ামতের স্মরণে একত্র করার সাংগঠনিক ছুরতকে “মা লাইছা মিনহু” বলার আগে দলীল দিতে হবে।

“যে ইছলামে উত্তম পন্থা জারি করবে”

হযরত জারীর ইবনে য়াব্দুল্লাহ রদ্বিআল্লাহু য়ানহু থেকে বর্ণিত, একদল দরিদ্র মানুষ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কাছে এলে উনি ছ্বদক্বাহর প্রতি উৎসাহ দিলেন। একজন আনছারী ছ্বহাবী রদ্বিআল্লাহু য়ানহু প্রথমে একটি ভারী থলি নিয়ে এলেন, এরপর মানুষ একের পর এক দান করতে শুরু করল। তখন রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করলেনঃ (مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ)

অর্থঃ “যে ব্যক্তি ইছলামে কোনো উত্তম পন্থা জারি করবে, সে তার প্রতিদান পাবে এবং তার পরে যারা তাতে য়া’মল করবে তাদের প্রতিদানও পাবে, তাদের প্রতিদান থেকে কিছুই কমানো হবে না।” (ছ্বহীহ মুছলিম ১০১৭)

এখানে ছ্বদক্বাহ নতুন ঈবাদত ছিল না। নতুন ছিল একজন ছ্বহাবীর অগ্রণী উদ্যোগ এবং তার ফলে অন্যদের সেই প্রমাণিত নেক য়া’মলে সক্রিয় হয়ে ওঠা। অতএব কোনো শরীয়তপ্রমাণিত য়া’মলকে নতুন উপায়ে জাগ্রত, সংগঠিত বা বিস্তৃত করা এবং শরীয়তের বাইরে নতুন ঈবাদত বানানো এক জিনিস নয়।

হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার “নি’য়মাতিল বিদ’য়াতু হাজিহী”

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমাদ্বান শরীফে ক্বিয়াম করেছেন এবং কয়েক রাত জামায়াতেও আদায় করেছেন। পরে উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নিয়মিত বের হননি। হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার যামানায় মানুষকে এক ক্বারীর পেছনে সুবিন্যস্তভাবে একত্র করা হলে তিনি বললেনঃ (نِعْمَ الْبِدْعَةُ هَذِهِ)

অর্থঃ “এটি কতই না উত্তম নতুন ব্যবস্থা।” (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ২০১০)

এখানে ক্বিয়াম নতুন ছিল না, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত নতুন ছিল না, জামায়াতের আছলও নতুন ছিল না। নতুন ছিল স্থায়ীভাবে এক ইমামের পেছনে সুবিন্যস্ত সাংগঠনিক ছুরত। অতএব “নতুন” শব্দ দেখলেই “শরঈ বিদয়াতে দ্বলালাহ” হবে, এই সমীকরণ ছ্বহাবী য়া’মলেই টেকে না। নতুনত্বের বিচার করতে হবে তার আছল ও শরঈ সামঞ্জস্য দিয়ে।

হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার নিজস্ব নিয়মিত নফল য়া’মল

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনার যান্নাতী পদধ্বনি শুনে এমন কোন য়া’মলের ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি আশা রাখেন তা জিজ্ঞাসা করেন। হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু য়ানহু জানান, যখনই পবিত্রতা অর্জন করতেন, সেই ওযুর পর যতটুকু সম্ভব নফল ছ্বলাত আদায় করতেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার এই নিয়মিত (বিদ’য়াতী) পন্থাকে বাতিল করেননি। (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ১১৪৯; ছ্বহীহ মুছলিম শরীফ ২৪৫৮)

এই হাদিছ শরীফ দিয়ে কেউ ইচ্ছামতো নতুন নতুন ঈবাদত বানানোর লাইসেন্স পাবে না। কিন্তু এটুকু অবশ্যই প্রমাণিত হয়, শরীয়তস্বীকৃত নফল য়া’মলের মধ্যে একটি বৈধ নিয়মিত পন্থা গ্রহণ করলেই তা শুধু “এই একই বিন্যাস আগে আলাদাভাবে নির্দেশিত ছিল না” এই কারণে হারাম/নাযায়েজ হয়ে যায় না।

“রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি করেননি” মানেই কি “হারাম”?

এখানে উছূলের একটি ভয়াবহ অপব্যবহার হয়। কোনো কাজ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করেছেন, এটি অবশ্যই দলীল। কিন্তু উনি কোনো কাজ করেননি, সেখান থেকে সরাসরি “হারাম” বের করতে হলে আলাদা প্রমাণ লাগবে। কারণ “ত্যাগ” নিজে সবসময় “নিষেধ” নয়। উনি কোনো কাজ না করার কারণ হতে পারে, তখন প্রয়োজন হয়নি, কোনো আশঙ্কা ছিল, কোনো বিকল্প করেছেন, উম্মতের ওপর কষ্টের ভয় ছিল, কোনো সাংগঠনিক প্রয়োজন তখন তৈরি হয়নি, অথবা কাজটির আছল অন্য বৈধ য়া’মলের মধ্যে ছিল।

ইমাম আবূ য়াব্দুল্লাহ তিলিমছানী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উছূলের আলোচনায় “তারক” এর দালালত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মূলত এই পার্থক্যই স্থির করেছেন, রছুলে পাক রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ত্যাগ থেকে সর্বোচ্চ সেই কাজের আবশ্যিকতা না থাকা বোঝা যায়, নিছক ত্যাগ থেকেই তাহরীম প্রতিষ্ঠিত হয় না। (তিলিমছানী, মিফতাহুল উছূল ইলা বিনাইল ফুরূ’ য়ালাল উছূল, দালালাতুত তারক আলোচনা)

এখানে আল-ক্বুরআনের উছূলও স্মরণে রাখুনঃ কোনো জিনিসকে “হারাম” বলার জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার অনুমতি কোথায়, এই প্রশ্ন আল-ক্বুরআন নিজেই তুলেছেন। (ছুরাহ ইউনুছ য়ালাইহিছ ছালাম ১০:৫৯) অতএব “উনি করেননি, তাই হারাম” কোনো পূর্ণ শরঈ ক্বায়িদাহ নয়। সঠিক প্রশ্ন হলোঃ উনি কি নিষেধ করেছেন? কোনো সাধারণ নিষেধের অন্তর্ভুক্ত কি না? কাজটি কি শরীয়তের আছ্বলের বিরোধী? নাকি কাজটির আছ্বল প্রমাণিত, শুধু সাংগঠনিক ছুরত পরবর্তী?

এখানে একটি খুব শক্ত উদাহরণ ক্বুরআন শরীফ সংকলনের ইতিহাস। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যামানায় ক্বুরআন শরীফ লিখিত ও মুখস্থ উভয়ভাবে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু উনার বিছাল শরীফের পরে ইয়ামামাহর ঘটনায় হাফিজ্বদের শাহাদতের প্রেক্ষাপটে হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনাকে একত্রে ক্বুরআন শরীফ সংগ্রহের প্রস্তাব দিলে প্রথম প্রশ্নই উঠেছিলঃ “আপনি এমন কাজ কীভাবে করবেন যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম করেননি?” হযরত উমর ফারূক রদ্বিআল্লাহু য়ানহু বললেনঃ هُوَ وَاللَّهِ خَيْرٌ, “মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ক্বছম, এটি কল্যাণ।” পরে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিআল্লাহু য়ানহু এবং হযরত যায়দ ইবনে ছাবিত রদ্বিআল্লাহু য়ানহু উনাদের ক্বলবও এই কাজে প্রশস্ত হলো এবং ক্বুরআন শরীফ একত্রে সংকলিত হলো। (ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ৪৯৮৬)

এই দৃষ্টান্তের অপব্যবহার করা যাবে না। আল-ক্বুরআনের একটি আয়াত শরীফও নতুন বানানো হয়নি, কোনো শব্দ পরিবর্তন করা হয়নি। নতুন ছিল সংরক্ষণ ও তানযীমের একটি প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা। কিন্তু এই ঘটনাই দেখায়, “রছুলে পাক ছল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি এই সাংগঠনিক ছুরতে করেননি” বাক্যটি একা কোনো কল্যাণকর ও শরীয়তসম্মত ব্যবস্থাকে হারাম বানায় না।

“আজকের মতো ঘটা করে কোথায়?” প্রশ্নের উত্তর

এখন আসি সেই বহুল ব্যবহৃত প্রশ্নে। বলা হয়ঃ “আজকের মতো ঘটা করে সম্মিলিতভাবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যামানায় ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কোথায়?”

আমি বলিঃ প্রশ্নের “আজকের মতো” অংশটিই প্রমাণ করছে আপনি সাংগঠনিক ছুরত খুঁজছেন, আছ্বল নয়। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যামানায় আজকের মতো মাইক্রোফোন ছিল না, অফসেট ছাপা ক্বুরআন শরীফ ছিল না, অধ্যায় ও আন্তর্জাতিক নম্বরসহ ছ্বহীহ বুখারী, মুছলিম ছিল না, মাদরাছার আজকের ক্লাসরুম ব্যবস্থা ছিল না, ডিজিটাল ঘড়ি ছিল না, অনলাইন দাওয়াত ছিল না, গাড়িতে করে ওয়াজ মাহফিলে যাওয়া ছিল না, বিমানে করে আকাশে উড়ে হজ্জে যাওয়া ছিলো না। এসবের কোনোটিই কিন্তু স্বতন্ত্র ঈবাদত নয়, বরং ওয়াছ্বিলাহ। তাই কোনো শরীয়তসম্মত উদ্দেশ্য সাধনের ওয়াছ্বিলাহ যুগে যুগে বদলাতে পারে, যতক্ষণ তা নিজে হারাম না হয়।

তাছাড়া “প্রথম যুগে দ্বীন প্রতিষ্ঠাই প্রধান ছিল, ইমান, ফরজ য়া’মল, তাজকিয়া, হালাল হারাম, হিযরত, যুদ্ধ, নিপীড়ন ও রাষ্ট্রগঠন ছিল বড় বাস্তবতা”, আর এই কথার ঐতিহাসিক সত্যতাও আছে। মক্কী যুগে নির্যাতন, হিযরত, মদীনায় নতুন সমাজগঠন, ধারাবাহিক গাযওয়াহ, নতুন মুছলমানদের আক্বিদাহ ও য়া’মল শিক্ষা, আল-ক্বুরআনের অবতরণ, শরীয়তের বিধান প্রতিষ্ঠা, সব মিলিয়ে নববী যুগের সামাজিক অগ্রাধিকার আজকের স্থিতিশীল সমাজের অগ্রাধিকারের মতো ছিল না। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাকে কচলিয়ে আমরা শরঈ দলীলের বিকল্প কোন কিছু বানাব না। আমাদের মূল যুক্তি আমরা এটা বলবনা যে, “তারা ব্যস্ত ছিলেন তাই আজকের মতো মীলাদ শরীফ পালন করেননি।” বরং আমাদের শক্ত যুক্তি হচ্ছেঃ কোনো পরবর্তী সাংগঠনিক ছুরতের হুবহু অনুপস্থিতি তার আছ্বলকে হারাম প্রমাণ করে না।

“বুখারী মুছলিম শরীফে পাইনি” মানেই কি “দ্বীনে নেই”?

ইদানীং আরেকটি অদ্ভুত যুক্তি উত্থাপন হতে দেখা যায়, কিছু মানুষ কোনো প্রশ্ন শুনলেই বলে, “বুখারী শরীফ, মুছলিম শরীফে তো এমন কিছু পাইনি।” ভাবখানা এমন যে, যেনো আল-ক্বুরআন ও বাকি হাদিছ শরীফের কিতাব, মুছান্নাফ, মুছনাদ, ছুনান, মুয়াত্তা, আছার, তাফছীর, ছীরাত এবং ফিক্বহের সমস্ত দলীল বাতিল, কেবল দুটো কিতাবের সূচিপত্রই পুরো দ্বীন।

ছ্বহীহ বুখারী শরীফ ও ছ্বহীহ মুছলিম শরীফের মর্যাদা বিশাল। কিন্তু কোনো মুহাদ্দিছই দাবি করেননি, উনার কিতাবে উম্মতের কাছে সংরক্ষিত প্রতিটি ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি উনার জামি’ ছ্বহীহকে প্রায় ছয় লক্ষ হাদিছ শরীফের বৃহৎ সংরক্ষিত উপাদান থেকে নির্বাচন করেছেন এবং ষোলো বছরে সংকলন করেছেন। (ত্বাবাক্বাতুশ শাফিঈয়্যাহ, ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহ য়ালাইহি উনার জীবনী)

তাই কোনো একটি নির্বাচিত সংকলনের মোট হাদিছ শরীফ সংখ্যা দিয়ে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার সমগ্র ছুন্নাহকে সীমাবদ্ধ করা যাবে না। বুখারী শরীফ একটি নির্বাচিত জামি’ ছ্বহীহ, মুছলিম শরীফও একটি নির্বাচিত ছ্বহীহ সংকলন। ইমামগণ নিজেরাই নির্বাচন করেছেন। তাই “এই নির্দিষ্ট কিতাবে নেই” তাই “শরীয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই” বলা জাহেলিয়াত।

২৩ বছরে কি কয়েকটি হাদিছের কিতাবের মধ্যে থাকা কয়েক হাজার হাদিছই শুধু বলেছিলেন?

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার প্রকাশ্য নবুওয়াতী জীবনের ২৩ বছরকে দিন, ঘণ্টা ও মিনিটে হিসাব করলে ৮৩৯৫ দিন, ২০১৪৮০ ঘণ্টা এবং ১২০৮৮৮০০ মিনিট হয়। এই সংখ্যাকে “হাদিছ শরীফের সংখ্যা” বলা যাবে না, কারণ প্রতিটি মিনিট একটি স্বতন্ত্র হাদিছ শরীফ নয়। কিন্তু এই হিসাব একটি যৌক্তিক বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়ঃ ২৩ বছরের জীবন্ত নববী সমাজ, হাজারো কথা, কাজ, অনুমোদন, ছফর, যুদ্ধ, ঈবাদত, পারিবারিক জীবন, বিচার, শিক্ষা, মজলিছ, ব্যক্তিগত উপদেশ এবং দৈনন্দিন ঘটনার সমগ্রতা কোনো একটি মুদ্রিত কিতাবের মোট নম্বরের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।

হাদিছ শরীফের উছূলী পরিচয় কেবল “একটি বাক্য নম্বর” নয়। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ক্বওল, ফে’য়ল এবং তাক্বরীর, অর্থাৎ কথা, কাজ ও কোনো কাজের প্রতি অনুমোদন, ছুন্নাহর দলীলগত পরিসরের অংশ। অতএব “আমার মোবাইল অ্যাপে সার্চ করে পেলাম না” দিয়ে দ্বীনের ফয়ছালা হয় না। দলীল খুঁজতে হয় সমগ্র ক্বুরআন শরীফ, হাদিছ শরীফ, আছার, উছূল ও প্রাসঙ্গিক উৎসে।

আল-ক্বুরআনের দলীল থাকলে “একই কথা বুখারী শরীফে নাই কেন?”

এই ধরণের প্রশ্ন করাই ভুল। ক্বুরআন শরীফ নিজেই শরীয়তের মূল উৎস। কোনো হুকুম ক্বুরআন শরীফে স্পষ্ট থাকলে সেটি গ্রহণ করার জন্য “একই বাক্য বুখারী শরীফে কোথায়?” এমন শর্ত শরীয়ত দেন-নাই। অবশ্য আল-ক্বুরআনের ব্যাখ্যা, সীমা ও বাস্তব প্রয়োগ বুঝতে ছুন্নাহ অপরিহার্য। আল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ মুবারক পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। কিন্তু আল-ক্বুরআনের একটি প্রতিষ্ঠিত নির্দেশকে শুধু এই কারণে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নাই যে, কেউ অনুরূপ কোন কিছুই হাদিছ শরীফ খুঁজে পাননি।

পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা দেখব, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বিরাট নিয়ামত ও রহমত কি না, উনার প্রাপ্তিতে আনন্দের ক্বুরআনিক নির্দেশ আছে কি না, নিয়ামতের কথা প্রকাশ ও শুকরের নির্দেশ আছে কি না, মহান নিয়ামতের দিন স্মরণ করার নীতি আছে কি না, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনি নিজের বিলাদতের দিনকে ঈবাদতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন কি না, ছ্বহাবায়ে কিরাম উনাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার মিন্নত হিসেবে চিনে সম্মিলিত হামদ করেছেন কি না, এবং মীলাদের বর্তমান শরীয়তসম্মত য়া’মলগুলোর প্রতিটির নিজস্ব দলীল আছে কি না। যদি এগুলো একে একে প্রমাণিত হয়, তখন “আজকের মতো একটি অনুষ্ঠান বুখারী শরীফে কোথায়?” প্রশ্নটি প্রশ্নকর্তাকে জাহিল প্রমাণ করবে।

প্রথম যুগে বর্তমানের সাংগঠনিক ছুরত না থাকার বাস্তবতাঃ

ইছলামের প্রথম যুগ ছিল দ্বীন প্রতিষ্ঠা, ঈমান দৃঢ় করা, তাজকিয়া, ছ্বলাত, জাকাত, রোযা, হজ্জ, হালাল হারাম, সামাজিক ন্যায়, হিযরত, জিহাদ, রাষ্ট্র ও উম্মাহ গঠনের যুগ। নওমুছলিম সমাজকে শত শত জাহিলী রীতি থেকে বের করে আনা হচ্ছিল। জীবনযাত্রা ছিল কঠিন। মক্কায় নির্যাতন, শি’য়বের অবরোধ, হিযরত, মদীনার নতুন রাষ্ট্র, একের পর এক গাযওয়াহ, মুনাফিক্বদের ষড়যন্ত্র, বাইরের আক্রমণ, সবকিছু একসঙ্গে চলেছে। তাই পরবর্তী স্থিতিশীল মুছলিম সভ্যতায় যে ধরনের বৃহৎ আয়োজন, মাদরাসা, গ্রন্থাগার, স্মরণসভা, ধর্মীয় ক্যালেন্ডার, সম্মেলন ও সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, নববী যুগে সেগুলোর হুবহু রূপ খোঁজা ঐতিহাসিকভাবেই অযৌক্তিক।

কিন্তু আবারো বলছি, এটাকে আমরা মূল শরঈ দলীল বানাচ্ছি না। কারণ আমাদের রিছালা “হয়তো তারা করতেন কিন্তু লিখিত হয়নি” এই অনুমানের ওপর দাঁড়াবে না। আমরা বিদ্যমান ক্বুরআন শরীফ, ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ, প্রাচীন তাফছীর, উছূল এবং ইতিহাসের ওপর দাঁড়াব। যে রেওয়ায়েত দুর্বল, তাকে দুর্বল বলেই ব্যবহার করব। যে ঐতিহাসিক, তাকে ইতিহাসের স্তরে রাখব। যে তাফছীরী ক্বওল, তাকে তাফছীরী ক্বওল বলব। কিন্তু “ছ্বহীহ নয়, তাই অস্তিত্বই নেই” অথবা “বুখারী শরীফে নেই, তাই বাতিল” এই অজ্ঞতার পথেও কাউকে হাটার সুযোগ দেবো না।

ওয়াছ্বিলাহ বদলালে ঈবাদতের হাক্বিক্বত বদলায় না

আজ আমরা ক্বুরআন শরীফ ছাপাখানায় ছাপি, মোবালে এপ্স বানাই। হাদিছ শরীফকে কিতাব, বাব, নম্বর দিয়ে ডিজিটাল ডাটাবেসে সাজাই। মসজিদে মাইক্রোফোন ব্যবহার করি। রমাদ্বান শরীফের সময়সূচি ছাপি। হজ্জে বিমান ব্যবহার করি। দূরের মানুষকে অনলাইনে দ্বীনের দাওয়াত দিই। এসবের কোনোটি নববী যুগের হুবহু প্রযুক্তিগত ছুরত নয়। কিন্তু এগুলোর উদ্দেশ্য ও আছ্বল বৈধ হলে ওয়াছ্বিলাহও বৈধ, যতক্ষণ কোনো স্বতন্ত্র হারাম উপাদান নেই।

একইভাবে ঈদে মীলাদুন নবী ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার কোনো মজলিছে যদি ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত হয়, দুরুদ ও ছালাম হয়, ছীরাত বর্ণিত হয়, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হামদ হয়, ছ্বদক্বাহ হয়, মানুষকে খাবার দেওয়া হয়, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বিলাদতের নিয়ামত স্মরণ করা হয়, তাহলে প্রতিটি কাজের নিজস্ব দলীল বিচার করতে হবে। মাইক, ইকো নতুন বলে ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত বিদয়াত হয় না, হামদ-নাতের মাহফিল হারাম হয়ে যায় না। নির্দিষ্ট দিনে মানুষ একত্র হয়েছে বলে দুরুদ শরীফ নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। তবে কোনো হারাম কাজ ঢুকলে সেই হারাম অংশ অবশ্যই বাদ দিতে হবে।

মীলাদের নামে হারাম হলে আমার অবস্থান কী?

এই রিছালা অন্ধ সমর্থনের রিছালা নয়। মীলাদের নামে যদি বেপর্দা হয়, অশ্লীলতা হয়, ফরজ ছ্বলাত নষ্ট হয়, অপচয় হয়, মানুষের হাক্ব নষ্ট হয়, মিথ্যা রেওয়ায়েতকে ছ্বহীহ বলে চালানো হয়, হারাম বাদ্য বা অন্য কোনো শরীয়তবিরোধী কাজ হয়, সেই নির্দিষ্ট কাজ যত নামেই করা হোক হারামই থাকবে। “মীলাদ” শব্দ কোনো হারামকে হালাল করেন না।

কিন্তু এখানেই ন্যায়বিচার চাই। কোনো বিয়েতে হারাম কাজ হলে “নিকাহ হারাম” বলা হয় না। কোনো ওয়াজ মাহফিলে মিথ্যা বলা হলে “ওয়াজ হারাম” বলা হয় না। কোনো মসজিদের কমিটি দুর্নীতি করলে “মসজিদ হারাম” বলা হয় না। তাহলে কোনো মীলাদী আয়োজনে কারও ভুল হলে পুরো নববী বিলাদতস্মরণ, দুরুদ শরীফ, ছীরাত, হামদ, ছ্বদক্বাহ ও শুকুরকে কেন হারাম বলা হবে? ভুল অংশকে ভুল বলো, হারাম অংশকে হারাম বলো, কিন্তু হালালকে হারাম বানিও না।

প্রথম অধ্যায়ের ফায়ছালা

এখন প্রথম পর্বের সমস্ত আলোচনা এক জায়গায় রাখুন। “ঈদ” বিশুদ্ধ আ’রবি শব্দ, যার মধ্যে পুনরাগমন, পুনরাবৃত্তি, সমাবেশ ও নবায়িত আনন্দের অর্থ রয়েছে। “মীলাদ” এবং “মাওলিদ” বিশুদ্ধ আ’রবি শব্দ, যার মূল অর্থ বিলাদত, বিলাদতের সময় ও স্থান। “ঈদে মীলাদুন নবী” বলতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদত ও শুভাগমনের নিয়ামতকে পুনরাবর্তিতভাবে স্মরণ, উনার প্রতি তা’য়জ্বীম ও মহব্বত নবায়ন, উনার প্রাপ্তিতে আনন্দ এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার শুকুর শরীয়তসম্মত য়া’মলের মাধ্যমে প্রকাশ করা বোঝানো হচ্ছে।

এটি ঈদুল ফিত্বর ও ঈদুল আদ্বহার সমান্তরালে নতুন তৃতীয় ফিক্বহী ঈদ সৃষ্টি নয়। এটি নতুন কোনো ফরজ, নতুন ওয়াযিব, নতুন আক্বিদাহ বা নতুন স্বতন্ত্র ঈবাদতও নয়। বিদয়াতের হাদিছ শরীফ যে জিনিসকে প্রত্যাখ্যান করেছে তা হলো “দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়” এমন বিষয়কে দ্বীনের অংশ বানানো। শরীয়তপ্রমাণিত নেক য়া’মলকে নতুন সাংগঠনিক পন্থায় জাগ্রত ও একত্র করার দৃষ্টান্ত ছ্বহীহ হাদিছ শরীফ এবং ছ্বহাবী য়া’মলে আছে। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার নিছক ত্যাগ নিজে তাহরীম নয়। “আজকের মতো” প্রযুক্তিগত বা সাংগঠনিক ছুরত প্রথম যুগে না থাকাও তাহরীম নয়।

আর “বুখারী শরীফ, মুছলিম শরীফে পাইনি” দ্বীনের ফয়ছালার চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়। হাদিছ শরীফ সংরক্ষণ নববী যুগ থেকেই মৌখিক ও লিখিত উভয়ভাবে ছিল, পরে বৃহৎ কিতাবি সংকলন হয়েছে। প্রাচীন মুহাদ্দিছদের লক্ষ লক্ষ “হাদিছ” গণনা মানে লক্ষ লক্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন নববী বাক্য নয়, তাই ভুল শতাংশ দিয়ে যুক্তি সাজানো প্রয়োজন নেই। কিন্তু কোনো একটি নির্বাচিত সংকলনকে সমগ্র ছুন্নাহর সমার্থক ভাবাও ভুল। ক্বুরআন শরীফ নিজে মূল দলীল এবং ক্বুরআন শরীফ ও ছুন্নাহ মুবারক একসঙ্গে শরীয়তের হেদায়েতী ভিত্তি।

সুতরাং এখন আর প্রশ্ন “আজকের মতো মীলাদ বুখারী শরীফে কোন নম্বরে?” নয়। এখন সঠিক প্রশ্ন হবেঃ যাঁর মীলাদ আমরা স্মরণ করছি, তিনি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার কাছে কে? উনি কি সাধারণ কোনো নিয়ামত, নাকি মুওমিনদের প্রতি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বিরাট মিন্নত? উনি কি শুধু একটি জাতির শিক্ষক, নাকি বিশ্বজগতের রহমত? উনার মহব্বত কি ঐচ্ছিক আবেগ, নাকি ঈমানের পূর্ণতার শর্ত? উনার দুনিয়ায় তাশরীফ আনা যদি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বিরাট নিয়ামত হয়, তাহলে সেই নিয়ামতের বিপরীতে একজন হাক্বিক্বী শাকিরের অবস্থান কী হওয়া উচিত? এই ফয়ছালা দ্বিতীয় অধ্যায়ে।

Monday, March 16, 2026

ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর বা ফিতরার পূর্ণাঙ্গ মাছআলাহ

ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর বা ফিতরার পূর্ণাঙ্গ মাছআলাহ

মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি এবং রোজা পালনকালীন ত্রুটি-বিচ্যুতির কাফফারা হিসেবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম (صَدَقَةُ الْفِطْرِ) ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর ওয়াযিব করেছেন। (আবু দাউদ শরীফ ১৬০৯, ইবনে মাজাহ শরীফ ১৮২৭)

১. ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর কার ওপর ওয়াযিব?

ঈদুল ফিত্বরের দিন ছ্বুবহে ছ্বাদিকের সময় কোন আজাদ বা স্বাধীন মুছলমানের নিকট যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও ঋণ ব্যতিরেকে সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা এর সমপরিমাণ মূল্যের কোন মাল বা সম্পদ (নগদ টাকা, সোনা, রূপা, ব্যবসায়িক পণ্য বা অপ্রয়োজনীয় স্থাবর সম্পত্তি) থাকে, তবে তার ওপর ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর আদায় করা ওয়াযিব।

√ পার্থক্যঃ জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদ এক বছর হাতে থাকা শর্ত, কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে ঈদের দিন সকালে মালিক হলেও তা আদায় করতে হবে।

√ নাবালিগ ও মজনুনঃ যদি কোনো নাবালিগ শিশু বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি নিছ্বাবের মালিক হয়, তবে তাদের পক্ষ থেকে অভিভাবক তাদের মাল থেকে ফিতরা আদায় করে দিবেন।

২. কার পক্ষ থেকে আদায় করতে হবে?

√ নিজস্ব ও সন্তানদের পক্ষ থেকেঃ প্রত্যেক নিছ্বাবের মালিক ব্যক্তির ওপর নিজের পক্ষ থেকে এবং তার নাবালিগ সন্তানদের পক্ষ থেকে (যদি তাদের নিজস্ব সম্পদ না থাকে) ফিতরা আদায় করা ওয়াযিব।

√ বড় সন্তানদের ক্ষেত্রেঃ সাবালিগ বা প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি নিছ্বাবের মালিক হয়, তবে সে নিজেই আদায় করবে। পিতা যদি আদায় করে দেন তবে তা আদায় হয়ে যাবে, তবে এটি পিতার ওপর আইনত আবশ্যক নয়।

√ স্ত্রীঃ স্ত্রীর ফিতরা স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ থাকলে তিনি নিজেই দিবেন। তবে স্বামী যদি খুশি মনে দিয়ে দেন, তবে তা আদায় হয়ে যাবে।

৩. আদায়ের সঠিক সময়

√ ওয়াযিব হওয়ার সময়ঃ ঈদুল ফিত্বরের দিন ছ্বুবহে ছ্বাদিকের সময় ফিতরা ওয়াযিব হয়।

√ ছুন্নাতী সময় ঈদের ছ্বলাত বা নামাজের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বেই ফিতরা আদায় করে দেওয়া ছুন্নাহ এবং সর্বোত্তম। হযরত ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহু য়া'নহু বলেনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন মানুষ যেন ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায় করে দেয়। (বুখারী শরীফ ১৫০৯, মুছলিম শরীফ ৯৮৬)

√ অগ্রিম আদায়ঃ রমজান শরীফ মাসে বা রমজান শরীফ শুরু হওয়ার আগে শা’য়বান শরীফ মাসেও ফিতরা অগ্রিম আদায় করা জায়েজ।

√ বিলম্বে আদায়ঃ কেউ যদি ঈদের দিন দিতে ভুলে যায়, তবে তাকে সারাজীবনের মধ্যে অবশ্যই তা আদায় করতে হবে। কারণ এটি বান্দার হাক্ব, যা মাফ হয় না। তবে সেটা হয় মাকরূহ।

৪. ফিতরার পরিমাণ (শরঈ মাপকাঠিতে)

ছ্বদক্বাতুল ফিত্বর পরিমাণ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার প্রদর্শিত শরঈ মানদণ্ড অনুযায়ী নির্ধারিত। সাধারণত এটি দুই ধরনের মাপে নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি গম বা আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করা হয়, তবে এর পরিমাণ হবে অর্ধেক ছ্বা'য় (نِصْفُ صَاعٍ)। বর্তমান ওজনের হিসেবে এটি প্রায় ১ কেজি ৬৬২ গ্রাম। তবে অধিক সতর্কতা অবলম্বনের জন্য অনেক য়া'লিম প্রায় ২ কেজি ধরে দেওয়াকে উত্তম মনে করেন।

√ অন্যদিকে যদি খেজুর, যব বা কিশমিশ দ্বারা ফিতরা আদায় করা হয়, তবে এর পরিমাণ হবে পূর্ণ এক ছ্বা'য় (صَاعٌ كَامِلٌ)। আধুনিক ওজন অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ৩ কেজি ৩২৪ গ্রাম। নিরাপদ ও উত্তম হিসেবে প্রায় ৪ কেজি ধরে দেওয়া অধিক গ্রহণযোগ্য বলে অনেক য়া'লিম পরামর্শ দেন।

√ এই মাপকাঠিগুলো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যুগে প্রচলিত “ছ্বা'য় (صَاعٌ)” নামক পরিমাপের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছে, যা ছ্বহাবা-এ কিরাম রদ্বিআল্লাহু য়া'নহুম উনারা অনুসরণ করতেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ যারা অত্যন্ত ধনী বা সচ্ছল, তাদের জন্য শুধু আটার দানে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রাস্তায় আভিজাত্যের খাতিরে উন্নত মানের খেজুর বা কিশমিশের মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা অধিক ছ্বওয়াবের কাজ।

বিস্তারিত হাদিছ শরীফঃ বুখারী শরীফ ১৫০৩, মুছলিম শরীফ ৯৮৪।

৫. ফিতরা কাদের দেওয়া যাবে (খাতসমূহ)?

√ যাদের জাকাত দেওয়া যায়, তাদেরই ছ্বদাক্বায়ে ফিত্বর প্রদান করা যাবে। যেমনঃ গরীব, মিছকিন, নিঃস্ব এবং ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।

√ নিছ্বাবের মালিক নয় এমন নিকটাত্মীয় (যেমনঃ ভাই, বোন, ফুফু, খালা, চাচা, ভাগ্নে, ভাতিজা)। এতে দ্বিগুণ ছ্বওয়াব, ছ্বদাক্বহ-এর ছ্বওয়াব এবং আত্মীয়তার হাক্ব আদায়ের ছ্বওয়াব।

৬. যাদের ফিতরা দেওয়া যাবে নাঃ

√ হাশেমী খানদানঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বংশধর অর্থাৎ ছাইয়্যিদ বংশের কাউকে ছ্বদক্বাহ বা জাকাত দেওয়া জায়েজ নেই।

√ উর্ধ্বতন ও অধস্তনঃ নিজের মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি (উর্ধ্বতন) এবং নিজের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি (অধস্তন) এদেরকে ফিতরা দেওয়া যাবে না।

√ স্বামী-স্ত্রীঃ স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে ফিতরা দিতে পারবে না।

√ অমুছলিম ও ধনী ব্যক্তিঃ কোনো অমুছলিম বা নিছ্বাব পরিমাণ সম্পদের মালিককে ফিতরা দেওয়া যাবে না।

পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফের রাজ-রহস্য ও উনার ফজিলত

পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফের রাজ-রহস্য ও উনার ফজিলত

আমাদের আজকের আলোচনা হলো পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে কেন্দ্র করে। আপনারা অনেকেই অবগত আছেন, আমি সাধারণত সেই দলের কেউ নই যারা মনে করেন কালামুল্লাহ শরীফের মধ্যে জাহিরিভাবে যা দেখা যায় তাই যথেষ্ট, এবং পূর্ববর্তী উলামায়ে-কিরামগণের তাফছীরই শেষ কথা। বরং আমি ক্বুরআন শরীফ নিয়ে তাফাক্কুর ও তাদ্বাব্বুর করতে পছন্দ করি, কারণ মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই মানুষকে উনার কালাম নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার আহ্বান জানিয়েছেন, আহ্বান বললে ভুল হবে বরং তাফাক্কুর ও তাদ্বাব্বুর না করার উপর তিরস্কার করে বলেনঃ (اَفَلَا یَتَدَبَّرُوۡنَ الۡقُرۡاٰنَ اَمۡ عَلٰی قُلُوۡبٍ اَقۡفَالُهَا) তারা কি (পবিত্র কিতাব) আল-ক্বুরআন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করে না? নাকি তাদের ক্বলবসমূহে তালা লাগানো আছে? (ছুরাহ আল-কিতাল ৪৭:২৪ ও ছুরাহ আন-নিছাআ ৪:৮২) এই আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে ক্বুরআন শরীফের উপর তাদ্বাব্বুর করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রত্যেক ইনছানকে, সাথে যে ব্যক্তি ক্বুরআন শরীফ নিয়ে চিন্তা করে না, তার হৃদয়ের উপর তালা থাকার কথা বলা হয়েছে। এখন যারা মনে করে যে কিছু পূর্ববর্তী ইমামদের জন্যেই চিন্তা ফিকির করা খাছ ছিলো, তারা তাফছীর লিখে আমাদের উদ্ধার করে গেছেন, আমরা এখন চিন্তা ফিকির থেকে মুক্ত, যা দেওয়া হয়েছে তা চোখ বুঝেই গেলা হবে, নাহলে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়ে যাবে, তারা উক্ত আয়াত অস্বীকার করে মুরতাদ হয়ে যাক আমার কিছুই করার নাই। এছাড়াও আমি পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আয়াতগত রাবতা অন্বেষণকেও জরুরি মনে করি। আমি এ কথাও মনে করি না যে, ক্বুরআন শরীফের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কেবল কিছু নির্দিষ্ট পূর্ববর্তী ব্যক্তির হাতেই চিরতরে সমাপ্ত হয়ে গেছে, আর পরবর্তীদের কাজ শুধু তা কপি-পেস্ট করা, কেননা খোদ মহান আল্লাহ তায়ালা উনিই সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেনঃ (كِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰهُ اِلَیۡكَ مُبٰرَكٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِهٖ وَ لِیَتَذَكَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ) এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং (কেবল) উলুল আলবাবেরাই (এর থেকে) নছীহত গ্রহণ করে। (ছুরাহ-ছ্বদ ৩৮:২৯) ক্বুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলোঃ “আয়াতসমূহ নিয়ে তাফাক্কুর-তাদ্বাব্বুর করা, হেদায়েত গ্রহণ করা” কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা উনিই বলছেনঃ (كَذٰلِكَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ لَكُمُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّكُمۡ تَتَفَكَّرُوۡنَ) এভাবেই মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য (উনার) আয়াতসমূহ খুলে খুলে বর্ননা করেন, যাতে তোমরা তাফাক্কুর করো। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:২১৯) এর পরে আর কিছু বলার দরকার আছে বলে মনে করিনা তাদের যারা বলবে আপনি কি পূর্ববর্তী ইমামদের মতামতের চেয়ে বেশী বুঝেন, কারন এই ধরণের কথাবার্তা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নির্দেশিত তাফাক্কুর-তাদ্বাব্বুর এর হুকুম কে ডিমোরালাইজড করে মানুষকে ক্বুরআন শরীফ নিয়ে চিন্তা ফিকির করা থেকে দূরে সরাই রাখে। মনে রাখতে হবে যে, কালামুল্লাহ শরীফ এমন য়া'জ্বীম এক কিতাব, যার মধ্যে প্রত্যেক যুগেই নতুন করে ভাবার, বোঝার এবং উপলব্ধি করার সুযোগ রয়েছে। এই কালামের মধ্যে এমন দিগন্ত রয়েছে, যা প্রত্যেক যুগে নতুনভাবে উন্মোচিত হতে পারে। কিছু অর্থ আছে, যা আউওয়াল থেকে আখির পর্যন্ত সমভাবে সত্য; আবার কিছু স্তর আছে, যা গভীর তাদ্বাব্বুরে নতুন আলো দেয়, দিতে পারে। অনেক বিষয়ে প্রথম যুগ ও শেষ যুগ একই অর্থ উপলব্ধি করতে পারে, আবার অনেক বিষয়ে নতুনভাবে সম্পর্ক ও ইঙ্গিত আবিষ্কার হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এই কারণে আল-ক্বুরআনের কোন ব্যাখ্যা যদি ক্বুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ এবং ছুন্নাহ মুবারক দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হয়, তাহলে সেই বিষয়ে ভিন্নমত বা ইখতিলাফ করার সুযোগ থাকে। যদি কোন মত আল-ক্বুরআনের ভাষা, প্রসঙ্গ এবং লজিকের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেই মতকে আলোচনায় উপস্থাপন করাও দোষের কিছু নয়। কেউ যদি তা গ্রহণ না করেন, তাতেও সমস্যা নেই; কারণ আল-ক্বুরআনের তাফছীরের ইতিহাসে বহু বিষয়ে বিভিন্ন মত বিদ্যমান ছিল এবং তা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে। সুতরাং যত বড় ইমামই কোন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকুন না কেন, যদি সেই ব্যাখ্যা আল-ক্বুরআন, ছুন্নাহ মুবারক ও ছ্বহীহ হাদীছ শরীফ, এবং আয়াত শরীফের অভ্যন্তরীণ লজিক দ্বারা এমনভাবে প্রমাণিত না হয় যে সেখানে আর কোন শক্তিশালী ভিন্নমতের সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না, তাহলে ঈলমী ও মানতেকি ইখতিলাফের দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। কেউ যদি তা মেনে নিতে না পারেন, সেটি ভিন্ন কথা; কিন্তু দলিলভিত্তিক ভিন্নমতের অধিকার অস্বীকার করার কোন সুযোগ নাই।

এবার আসি মূল বিষয়েঃ পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন এক রাত, যার মর্যাদা ও মাহাত্ম্য স্বয়ং মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি উনার কালামুল্লাহ শরীফে নিজেই ঘোষণা করেছেন। এই রাতকে তিনি শুধু বরকতময়ই বলেননি, বরং একে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে অভিহিত করেছেন। এই রাতের সাথে জড়িয়ে আছে পবিত্র ক্বুরআন শরীফের নুযূল,ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের ও রূহ-এর অবতরণ, হিকমতপূর্ণ আমরের প্রবাহ, এবং ফাযর পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশেষ ছালামতি। তাই লাইলাতুল ক্বদর শরীফের আলোচনা কেবল ফজিলতের আলোচনা নয়; বরং এটি ক্বুরআনিক নযম, আসমানী তদ্ববীর, এবং রূহানী বাস্তবতার আলোচনা।

আমার দৃষ্টিতে, লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে বুঝতে হলে শুধু একটি ছুরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং ছুরাহ আল-ক্বদর, ছুরাহ আল-বাক্বারাহ, ছুরাহ আদ-দুখন, এমনকি ছুরাহ আল-ফাযরের শুরুতেও যে ইশারা ও ক্বছমসমুহ এসেছেন, সেগুলোকে পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতর রেখে দেখতে হবে। তখনই বোঝা যাবে, লাইলাতুল ক্বদর কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ফজিলতের রাত নন; বরং এটি আল-ক্বুরআনের বহু আয়াতের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা এক মহিমান্বিত কেন্দ্রবিন্দু।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ পবিত্র রমাদ্বন শরীফ মাসের একটি বেজোড় রাতের সাথেই খাছ, এই রাতে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালাম ও রূহ-এর অবতরণ হয়, হিকমতপূর্ণ আমরের চূড়ান্ত রাত এটি, এবং এই রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও বরকতে পরিপূর্ণ থাকে ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত। ফলে এই আলোচনায় আমরা আল-ক্বুরআনের ভাষা, আয়াতগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বাস্তব ঈবাদতের ধারাবাহিকতা সামনে রেখে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করব।

এখানে রাতই মূল, দিন নয়। এই রাতের সাথে সম্পর্কিত হয়েছে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের অবতরণ, আমরের অবতরণ, ছালামতির বিস্তার, এবং ফাযর পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব। শুধু তা-ই নয়, ছ্বহীহ ছুন্নাহ মুবারকের এই রাতকে শেষ দশকের বেজোড় রাতসমূহের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে আমরা একটি সম্পূর্ণ রাত-কেন্দ্রিক বিষয় দেখতে পাই: রাত, বেজোড় রাত, ফাযর পর্যন্ত শান্তির স্থায়িত্ব, এবং আসমানী নুযূল। এই সমগ্র কাঠামোকে সামনে রেখে আল-ক্বুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহকে একসাথে পড়লে একটি গভীর রাবতা প্রকাশ পায়, যা সাধারণ জাহেরি পঠনের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ সম্মানিত দ্বীন ইছলামের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রাতগুলোর একটি। মহান আল্লাহ তায়ালা এই রাতকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং ক্বুরআন শরীফে সরাসরি এর আলোচনা করেছেন। এই রাতের সাথে আল-ক্বুরআন নাযিলের সম্পর্ক রয়েছে এবং এই রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। এই রাতের মধ্যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত, বরকত এবং মাগ্বফিরাত নাযিল হয়। ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ এবং রূহ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নির্দেশে অবতরণ করেন এবং এই রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও কল্যাণে পূর্ণ থাকে ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত।

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উম্মাহকে এই রাত অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিশেষভাবে রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের মধ্যে এই রাত খুঁজতে বলেছেনঃ (تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ) হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম থেকে  বর্ণিত তিনি বলেনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, “তোমরা রমাদ্বন শরীফ মাসের শেষ দশ রাতে লাইলাতুল ক্বদর শরীফ তালাশ করো”। উনার থেকে বর্নিত অন্য হাদীছ শরীফে এসেছেনঃ (تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ) (বুখারী শরীফ ২০১৭, ২০১৮ মুছলিম শরীফ ১১৬৯) এছাড়াও এই রাতের গুরুত্ব কি পরিমাণ বেশী তা এই হাদীছ শরীফেই প্রমাণ পাওয়া যায়ঃ (الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ  يَعْنِي لَيْلَةَ الْقَدْرِ- فَإِنْ ضَعُفَ أَحَدُكُمْ أَوْ عَجَزَ فَلَا يُغْلَبَنَّ عَلَى السَّبْعِ الْبَوَاقِي) হযরত ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহ য়া'নহু থেকে বর্নিত তিনি বলেন, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা এটিকে শেষ দশ রাতে অনুসন্ধান কর। যদি তোমাদের কেউ দুর্বল হয়ে পড়ে বা অক্ষম হয়, তবে যেন শেষ সাত রাত থেকেও বঞ্চিত না হয়”। (মুছলিম শরীফ ১১৬৫)

এখন প্রশ্ন আসে যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজে কীভাবে অনুসন্ধান করতেন?

হযরত আঈশা সিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম বলেনঃ (كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ الْأَوَاخِرُ أَحْيَا اللَّيْلَ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ وَشَدَّ مِئْزَرَهُ) রমজান শরীফের শেষ দশ রাত শুরু হলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজে রাত জাগতেন এবং উনার পরিবারকেও রাত জাগাতেন এবং ঈবাদতে খুবই মনোযোগী হয়ে যেতেন। (বুখারী শরীফ ২০২৪, মুছলিম শরীফ ১১৭৪) এতে বোঝা গেলো নিজে কেবল লম্বা ছ্বিয়াম ক্বিয়ামে শেষ দশ রাত কাটালেই হবেনা, সাথে বৌ বাচ্চাকেও জাগ্রত রাখতে হবে, ঈবাদাত করাতে হবে। আর এই কারণে মুছলিম উম্মাহ যুগ যুগ ধরে রমজান শরীফের শেষ দশ রাতে বিশেষভাবে ঈবাদতে মনোনিবেশ করে থাকেন।

এই আলোচনায় আমরা লাইলাতুল ক্বদর শরীফের প্রকৃতি, পবিত্র আল-ক্বুরআন শরীফের আলোকে এর ব্যাখ্যা, ছুরাহ ক্বদর শরীফ ও ছুরাহ ফাযর শরীফের আয়াত শরীফগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, এবং এই রাতের ফজিলত ও য়া’মল নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব।

ছুরাহ ক্বদর শরীফঃ মূল পরিচয় ও ব্যাখ্যা। (তবে এর আগেরাত কি তা জেনে নিতে হবে, নাহলে ক্বদর শরীফ বুঝতে অসুবিদা হবে।)

লাইলাতুল ক্বদর শরীফের প্রকৃত পরিচয় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে এসেছেন ছুরাহ ক্বদর শরীফের মধ্যেঃ (إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ، وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ، لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ، سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ) নিশ্চয়ই আমি (পবিত্র) এই আল-ক্বুরআনকে লাইলাতুল ক্বদর শরীফেই নাযিল করেছি। (ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আর আপনি কি জানেন লাইলাতুল ক্বদর শরীফ কী? (মূলত) লাইলাতুল ক্বদর শরীফ হচ্ছেন হাজার মাসের চেয়েও উত্তম (এক রাত), এই (রাত)-এর মধ্যে মালাইকাহ য়ালাইহিমুছ ছালামগণ ও রূহ তাদের রব তা’য়ালা উনার সব ধরনের আদেশ নিয়ে (যমীনে) অবতরণ করেন, (সেই আদেশবার্তা হচ্ছেন চিরন্তন) প্রশান্তি, (আর) তা ফাযরের সূর্যদয় পর্যন্ত (অব্যাহত) থাকেন। (ছুরাহ আল-ক্বদর ৯৭:১-৫) মহান আল্লাহ তা’য়ালা এখানে ঘোষণা করেছেন যে ক্বুরআন শরীফ নাযিল করা হয়েছে লাইলাতুল ক্বদরের রাতে। এই ঘোষণা থেকেই বোঝা যায় যে এই রাত কেবল একটি সাধারণ রাত নয়; বরং এটি এমন একটি রাত যার সাথে আসমানি ওহীর সূচনা এবং মানবজাতির  হেদায়েতের ইতিহাস গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এই ছুরায় আরও বলা হয়েছে যে লাইলাতুল ক্বদর শরীফ হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ এই রাতের মধ্যে যে ঈবাদত করা হয় তা দীর্ঘ সময়ের ঈবাদতের চেয়েও অধিক মর্যাদা লাভ করতে পারে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে মহান আল্লাহ তা'য়ালা উম্মাহকে এমন একটি সুযোগ দিয়েছেন যেখানে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক বড় ছ্বওয়াব অর্জন করা সম্ভব। আমরা যদি একটু ফিকির করি তাহলে দেখবো যে ১ হাজার মাসে ৮৩ বছর ৪ মাস হয়। আর আমরা যদি উম্মতে মুহাম্মাদি(ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম)-এর গড় আয়ু যাচাই করি তাহলে হাদীছ শরীফে যা পাওয়া যায় তা হলোঃ (أَعْمَارُ أُمَّتِي مَا بَيْنَ السِّتِّينَ إِلَى السَّبْعِينَ، وَأَقَلُّهُمْ مَنْ يَجُوزُ ذَلِكَ) হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিআল্লাহু য়া'নহু বলেন, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মতের অধিকাংশ মানুষের বয়স হবে ষাট থেকে সত্তর বছরের মধ্যে; তবে অল্পসংখ্যকই এর বেশি অতিক্রম করবে”। (তিরমিযি শরীফ ৩৫৫০, ইবনে মাজাহ শরীফ ৪২৩৬) এতে বোঝা গেলো একজন উম্মতে মুহাম্মাদী(ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম)-এর হায়াত যদি ৮৩ বছর হয় যা সর্বোচ্চ বয়স বলা যায়, তাহলে তার সারা জীবনেও যদি সে ১ বার লাইলাতুল ক্বদর শরীফ পেয়ে যায় তাহলে সে কামিয়াব।

এদিকে ইমাম ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহ য়ালাইহি বর্ণনা করেন যে, কিছু য়া’লিম বলেনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পূর্ববর্তী উম্মতের দীর্ঘ জীবনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তারা শত শত বছর ঈবাদত করার সুযোগ পেতেন। তখন উনার উম্মতের স্বল্প আয়ুর কথা বিবেচনা করে মহান আল্লাহ তা'য়ালা লাইলাতুল ক্বদর শরীফ দান করেন, যাতে অল্প আয়ু থাকা সত্ত্বেও উম্মতে মুহাম্মদী(ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) বিশাল ছ্বওয়াব অর্জন করতে পারে। তিনি আরও একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেন যেখানে বলা হয়ঃ একজন বনি ইছরাইলের ব্যক্তি হাজার মাস জিহাদে লিপ্ত ছিলেন, তখন মহান আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুল ক্বদর শরীফের আয়াত নাযিল করেন এবং জানান যে এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আর তারাউয়্যীতে আছে এই রাতের ঈবাদত এমন হাজার মাসের ঈবাদতের চেয়েও উত্তম, যেখানে লাইলাতুল ক্বদর নেই।

এরপর বলা হয়েছে যে এই রাতে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ এবং রূহ অবতরণ করেন তাদের রব তায়ালা উনার নির্দেশে। এর অর্থ হলো এই রাতের মধ্যেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে বিভিন্ন আমর বা সিদ্ধান্ত নাযিল হয় এবং আসমানি ব্যবস্থার একটি বিশেষ কার্যক্রম সংঘটিত হয়। এই কারণে এই রাতকে একটি আসমানি ব্যবস্থাপনার রাত হিসেবেও বোঝা যায়।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা ছুরাহ আল-বাক্বারাহ শরীফের মধ্যে স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, “আল-ক্বুরআন নাযিল করা হয়েছে রমজান শরীফ মাসে (شَهۡرُ رَمَضَانَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ فِیۡهِ الۡقُرۡاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡهُدٰی وَ الۡفُرۡقَانِ) রমজান শরীফ মাস এমন একটি মাস, যাতে পবিত্র আল-ক্বুরআন নাযিল করা হয়েছে; আর এই ক্বুরআন মানবজাতির জন্য হেদায়াতের দিশা প্রদানকারী, হেদায়েতের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহের বাহক এবং হাক্ব ও বাতিলের পার্থক্য নির্ধারণকারী ছিফাত ফুরক্বন শরীফও নাযিল করা হয়েছে (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৮৫)। আর ছুরাহ আল-ক্বদর শরীফের প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنٰهُ فِیۡ لَیۡلَۃِ الۡقَدۡرِ) তিনি ক্বুরআন শরীফ নাযিল করেছেন “লাইলাতুল ক্বদর” শরীফে।

এখন ক্বুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার “রাত” যদি রমজান শরীফের মধ্যেই হয়, এবং ক্বুরআন শরীফ নিজেই সেই নাযিলের রাতকে “লাইলাতুল ক্বদর” নামে চিহ্নিত করেন, তাহলে ছুরাহ দুখানের “লাইলাতুম মুবারকাহ” দ্বারা পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ অনুসারেই “শবে বরাত” প্রমাণিত হয়। পবিত্র শবে বরাত বা ভাগ্য রজনীকে স্বয়ং মহান আল্লাহ তা'য়ালা তিনি স্বীয় কিতাবের ছুরাহ আদ দুখান শরীফের ৩-৪ নং আয়াত শরীফের মাঝে (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) “বরকত পূর্ণ রাত” হিসেবে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (حٰمٓ وَ الۡكِتٰبِ الۡمُبِیۡنِ إِنَّآ أَنزَلْنٰهُ فِى لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) হা-মীম, ক্বছম কিতাবে মুবিনের, নিশ্চয়ই আমি ইহাকে এক বরকতপূর্ণ রাত্রিতে নাজিল করেছি, নিশ্চয় আমি (যাহান্নাম থেকে) সতর্ককারী, (আর) এই রাত্রিতে সমস্ত হিকমতপূর্ণ কাজসমূহের ফায়ছালা করা হয়। (ছুরাহ আদ দুখান শরিফঃ আয়াত শরীফ ৪৪:১-৪)

ছুরাহ আদ-দুখানের “কিতাবুল মুবিন” কী, তা আলাদা করে অনুমান করার দরকার নেই; পরের আয়াতেই মহান আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন যে, সেই কিতাবের বৈশিষ্ট্য হলো এতে প্রত্যেক হিকমতপূর্ণ বিষয়ের ফায়ছালা নির্ধারিত হয়। সুতরাং এখানে পাঠযোগ্য ক্বুরআন শরীফ নয়, বরং তাক্বদীর ও আমর-সংক্রান্ত ডিভাইন রেকর্ডের কথাই বলা হয়েছে। এছাড়াও আল-ক্বুরআনের আয়াতের গঠন থেকে সরাসরি বোঝা যায় যে (وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ) দ্বারা পাঠযোগ্য আল-ক্বুরআন (যা আমরা পড়ি) বোঝানো হয়নি, বরং তাক্বদীর ও আমর-সংক্রান্ত ডিভাইন রেকর্ড (আসমানী লাওহ বা লাওহে মাহফুজ থেকে বর্ষীয় ফয়সালা) বোঝানো হয়েছে। পবিত্র আল-ক্বুরআনের আয়াত শরীফের গঠন থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হলেনঃ ছুরাহ আদ-দুখান ৪৪:২ এ (وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ) আর সেই সুস্পষ্ট কিতাবের ক্বছম। আর ৪৪:৪ নং আয়াত শরীফে (فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) এই মুবারক রাতে প্রত্যেক হিকমতপূর্ণ বিষয়ের ফায়ছালা নির্ধারিত:বণ্টিত:পৃথক করা হয়।

এখন ২ নং আয়াত শরীফে কিতাবিল মুবীন এর ক্বছম করার পর ৪ নং আয়াত শরীফে সরাসরি (فِيهَا) এই রাতে (يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) বলা হয়েছে। এখানে আমর হাকীম (হিকমতপূর্ণ বিষয়:ফায়ছালা) বলতে তাক্বদীর, রিজিক, আজল, মওত, যুদ্ধ-শান্তি ইত্যাদি সবকিছুর বার্ষিক ফায়ছালা বোঝানো হয়েছে, যা লাওহে মাহফুজ থেকে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাছাড়া কিতাবিল মুবীন যদি পাঠযোগ্য আল-ক্বুরআন হতো তাহলে ৪ নং আয়াতে (يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) এর সাথে সরাসরি মিলত না, কারণ আল-ক্বুরআন নাযিল হওয়ার রাতে ক্বুরআন শরীফের ফয়সালা বণ্টন হয় না, বরং ক্বুরআন শরীফ নিজেই হেদায়েত ও ফুরক্বন। কিন্তু আয়াতের গঠন থেকে স্পষ্ট যে ক্বছমের পরের বর্ণনা (ফায়ছালা নির্ধারণ) কিতাবিল মুবীনের সাথে যুক্ত, এবং এটা লাওহে মাহফুজ-এর রেকর্ড (যা মুবীন/স্পষ্ট, কোনো অস্পষ্টতা নেই)।

প্রথমত, ক্বুরআন শরীফ ১০০% নিশ্চিতভাবে বলেছেন যে ক্বুরআন শরীফ নাযিল হয়েছেন লাইলাতুল ক্বদরের রাতে, এখানে কোনো দ্বিধা নেই। ছুরাহ আল-বাক্বারাহ শরীফের ২:১৮৫ নং আয়াত শরীফ স্পষ্ট করে দেন যে পবিত্র আল-ক্বুরআন রমজান শরীফ মাসে নাযিল হয়েছেন, এবং ছুরাহ আল-ক্বদর শরীফের ৯৭:১ নং আয়াত শরীফ সেই নাযিলের রাতকে নাম দিয়ে চিহ্নিত করেছেন লাইলাতুল ক্বদর বলে। এই দুই আয়াত একসাথে পড়লে। পবিত্র ক্বুরআন শরীফের নুযূলের সময় ও রাত উভয়ই নির্ধারিত হয়ে যায়। সুতরাং “ক্বুরআন শরীফ নাযিল” ইস্যুতে লাইলাতুল ক্বদর ছাড়া অন্য কোনো রাতকে বসানোর গ্রামাটিক বা ক্বুরআনিক সুযোগ নেই।

দ্বিতীয়ত, ছুরাহ আল-ক্বদর শরীফের ৯৭:৪ নং আয়াত শরীফে ব্যবহৃত বাক্যাংশ (مِنْ كُلِّ أَمْرٍ) আর ছুরাহ আদ-দুখান ৪৪:৪ নং আয়াত শরীফে ব্যবহৃত (كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) এই দুইটার মধ্যে গ্রামাটিক পার্থক্যই প্রমাণ করে যে দুই আয়াত শরীফ একই স্তরের ঘটনা বর্ণনা করছেন না। ক্বদর শরীফের আয়াতে পাকে (مِنْ) এসেছেন, যা আরবিতে (تَبْعِيض) তাবঈদ্ব বোঝায়, অর্থাৎ “সমস্ত আমর থেকে” বা “নির্ধারিত আমরগুলোর মধ্য থেকে”। এখানে আমরগুলো আগেই নির্ধারিত ধরে নিয়ে, সেগুলোর একটি অংশ নিয়ে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের নাযিল হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিপরীতে,ছুরাহ দুখানের আয়াতে (كُلُّ) এসেছেন কোনো (مِنْ) ছাড়াই, এবং তার সাথে (حَكِيمٍ) ছ্বিফাত যুক্ত হয়েছেন। এর মানে, এখানে আমরগুলোর মধ্য থেকে কিছু নয়, বরং সমস্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ আমর নিজেই আলাদা করে নির্ধারিত হচ্ছেন। গ্রামার অনুযায়ী এক জায়গা নির্বাচন:কার্যকরকরণ, আর অন্য জায়গা নির্ধারণ:শ্রেণীবিভাগ।

তৃতীয়ত, এই গ্রামাটিক পার্থক্যের কারণে লাইলাতুল ক্বদর ও লাইলাতুল মুবারকাহকে একই রাত বানালে ভাষাগত সংঘর্ষ তৈরি হয়। যদি দুই রাত একই হতো, তাহলে আল-ক্বুরআন একই জায়গায় হয় (كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) রাখতেন, নয়তো (مِنْ كُلِّ أَمْرٍ) তবুও দুই জায়গায় দুই রকম গঠন ব্যবহার করতেন না। আ'রবী ভাষায় যখন কাজের স্তর আলাদা হয়, তখনই এই ধরনের পার্থক্য আসে। ফলে ক্বুরআন শরীফের গ্রামার নিজেই ইঙ্গিত দেন যে, এক রাতে আমর নির্ধারণ, আরেক রাতে সেই নির্ধারিত আমরগুলোর কার্যকরী প্রবাহ।

এখন দেখবো তাফছিরে ইমামদের থেকে কি পাওয়া যায়, যেহেতু আল-ক্বুরআন হাদিছ শরীফ এর দলিলে অনেকে বুঝেনা, সেই বেবুঝদের জন্যে বুঝদারদের অভিমত পেশ করবো।

উক্ত আয়াত শরীফের মধ্যে বর্ণিত (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) ‘লাইলাতিম মুবারকাহ’ শব্দ দ্বারা তাবেঈ হযরত ঈকরমা রহমাতুল্লাহী য়ালাইহি বলেনঃ (هَى لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ وَسَمَّى لَيْلَةَ الرَّحْمَةِ وَاللَّيْلَةِ المُبَارَكَةِ وَلَيْلَةِ الصَّكِّ) অর্থাৎ “লাইলাতিম মুবারকাহ দ্বারা লাইলাতুন নিছ্বফি মিন শা’য়বান তথা অর্ধ শা’য়বানের পবিত্র রাত (শবে বরাতকে) বুঝানো হয়েছে যেমন (لَيْلَةُ الرَّحْمَة) (লাইলাতুর রহমাহ) তথা রহমতের রাত, (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) লাইলাতুল মুবারকাহ তথা বরকতের রাত। (لَيْلَةُ الصَكَّ) (লাইলাতুছ ছ্বক) ভাগ্য লিপিবদ্ধকরণের রাত তথা ভাগ্য রজনী।” আর (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) (বরকতপূর্ণ রাত) দ্বারা পবিত্র শবে বরাত তথা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে তার যথার্থ প্রমাণ বহন করে তার পরবর্তী আয়াত শরীফের (يُفْرَقُ) (নির্ধারিত:স্থির করা হয়) শব্দ দ্বারা। কেননা তাফছির জগতের প্রায় সকল তাফছিরে সমস্ত মুফাছছীরীনে কিরাম উনারা (يُفْرَقُ) শব্দের তাফছীর করেন (يَكْتُبَ) ইয়াকতুব (বন্টন বা নির্ধারণ করা হয়) (يُبْرِمُ) (বাজেট করা হয়) (فَيْصَلَه) (নির্দেশনা দেয়া হয় বা ফায়ছালা করা হয়) ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে। কাজেই (يُفْرَقُ) শব্দের অর্থ ও তার ব্যাখ্যার দ্বারা আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল যে, (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) দ্বারা (لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ) অর্ধ শা’য়বানের রাত, বা পবিত্র শবে বরাত তথা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে। যেই রাতে সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্যগুলো সামনের এক বৎসরের জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়, আর সেই ভাগ্য লিপি অনুসারে রমজান শরীফ মাসে (لَيْلَةُ الْقَدْرِ) বা শবে ক্বদরের রাত্রে তা চালু করা হয়। এ জন্য (لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ) অর্ধ শা’য়বানের রাতকে (لَيْلَةُ التَجْوِيْز) (নির্ধারণের বা বৈধকরণের রাত) এবং (لَيْلَةُ الْقَدْرِ) কে (لَيْلَةُ التَنْفِيْذِ) (নির্ধারিত ফায়ছালা কার্যকরী করার রাত বা বৈধকরণ বিষয়ের কার্যকারীকরণের রাতও) বলা হয়। (তথ্য সূত্রঃ তাফছীরে মাযহারী, তাফছীরে খযিন, তাফছীরে রূহুল মায়ানী ও রূহুল বায়ান শরীফদ্বয়।)

আর (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) এর ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত তাফছীর, তাফছীরে মাযহারী শরীফ উনার অষ্টম খণ্ডের ৩৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছেঃ (قَالَ عِكْرِمَةُ: هِيَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، يُبْرَمُ فِيهَا أَمْرُ السَّنَةِ، وَيُنْسَخُ الْأَحْيَاءُ مِنَ الْأَمْوَاتِ، فَلَا يُزَادُ فِيهِمْ وَلَا يُنْقَصُ مِنْهُمْ أَحَدٌ. رَوَى الْبَغَوِيُّ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمَيْسَرَةِ بْنِ الْأَخْفَسِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يُقْطَعُ الْآجَالُ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى شَعْبَانَ، حَتَّى إِنَّ الرَّجُلَ لَيَنْكِحُ وَيُولَدُ لَهُ، وَلَقَدْ أُخْرِجَ اسْمُهُ فِي الْمَوْتَى. وَرَوَى أَبُو الضُّحَى عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ اللَّهَ يَقْضِي الْأَقْضِيَةَ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَيُسَلِّمُهَا إِلَى أَرْبَابِهَا فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ.) অর্থাৎ “প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত ঈকরমা রহমাতুল্লাহী য়ালাইহি তিনি বলেন, (ছুরাহ আদ-দুখান শরীফের ৩ নং আয়াত শরীফে বর্ণীত (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) হচ্ছেন ১৫ই শা’য়বানের পবিত্র রাত তথা পবিত্র শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত শরীফ উনার রাত। এই পবিত্র রাত্রে সারা বৎসরের কাজ কর্মের ফায়ছালা করা হয় কতজন জীবিত থাকবেন, কতজন মারা যাবেন তারও ফায়ছালা করা হয়। অতঃপর এ ফায়ছালার থেকে কোন কিছু আর কম বেশি করা হয় না আগামী এক বছর। ইমাম হযরত বাগাবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন, হযরত মুহম্মদ ইবনে মাইছারা ইবনে আখফাশ রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার থেকে। তিনি বলেন, “রছুলুল্লাহ্ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তিনি ইরশাদ মোবারক করেন, শা’য়বান মাসে পরবর্তী শা’য়বান মাস পর্যন্ত মৃত্যুর ফায়ছালা করে দেয়া হয়। এমনকি লোকেরা যে বিবাহ করবে, সেই বৎসর তার থেকে কত জন সন্তান জন্মগ্রহণ করবেন তার তালিকা এবং তার মৃত্যুর তালিকাও প্রস্তুত করা হয় ওই বৎসরে অর্ধ শা’য়বানের রাতে তথা শবে বরাতে”। আর আবুদ্বহা এর বর্ণনায় এসেছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাছ রদ্বিআল্লাহু য়া'নহু তিনি বলেন, পবিত্র শা’য়বানের মাঝামাঝি অর্থাৎ ১৫ই শা’য়বানের রাতে তথা শবে বরাতে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সমস্ত কিছুই ফায়ছালা করেন, আর রমজান শরীফে ক্বদরের রাতে (শবে ক্বদরে) সেই ফায়ছালার তালিকা (কপি) বাস্তবায়ন করার জন্য বাস্তবায়নকারী ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালাম উনাদের কাছে অর্পণ করা হয়”।

তাফছীরে মাদিরকে (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) এ আয়াতাংশের তাফছীরে উল্লেখ আছেঃ (وَهَذِهِ اللَّيْلَةُ مُفَرَّقُ كُلِّ أَمْرٍ حَكيمٍ وَمَعْنَى يُفَرِّقُ يَفْصِلُ وَيَكْتُبُ كُلَّ أَمْرٍ مِنْ ارِّزاقِ العِبادِ واِجالَهُمْ وَجَميعُ أَمْوَرِهِمْ مِنْ هَذِهِ اللَّيْلَةِ الَّى لَيْلَةِ الْقَدْرَالَتَى تَجَى فَى اَلْسَنَّتِ المُقْبِلَةِ) অর্থাৎ লাইলাতিম মুবারকাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্ধ শা’য়বানের পবিত্র রাত তথা শবেবরাত এবং এই মুবারকময় রাতে সকল প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়সমূহের ফায়ছালা করা হয়। যেমন (إِنَّآ أَنزَلْنٰهُ فِى لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) আয়াত শরীফের মধ্যে যে (يُفْرَقُ) শব্দ মহান আল্লাহ তা'য়ালা ব্যবহার করেছেন, এর অর্থ হচ্ছে (يُفَصَّلُ) তথা ফায়ছালা করা, এবং (يُكْتَبُ) (ইউকতাবু) তথা লেখা হয় প্রত্যেক বান্দাদের রিযিক বা জীবিকাসমূহ। তাদের মৃত্যুর সময় সীমাও লেখা হয় এবং সমস্ত বিষয়ের তালিকা লেখা হয় এই মুবারক রাতে, তথা শবে বরাত শরীফে। আর পবিত্র ক্বদর শরীফের রাতে তথা মর্যাদাবান রাতে ওই সমস্ত ফায়ছালাকৃত বিষয়গুলো চালু করা হয় তথা কার্যকরী করা হয় যা সামনের এক বৎসর পর্যন্ত চলতে থাকে। (তথ্য সূত্রঃ তাফছীরু হাশিয়াতিল খাযিন ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১১২)

উল্লেখ্য যে, যদিও কেউ কেউ (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) দ্বারা (لَیۡلَۃُ الۡقَدۡرِ) বুঝে থাকেন, কিন্তু এই রাত মূলত সেই রাত নন, বরং (لَیۡلَۃُ الۡقَدۡرِ) দ্বারা শবে বরাত শরীফ উনার সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন বা কার্যকরী করার রাতকেই বুঝানো হয়েছে।

যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র ছুরাহ আল-ক্বদর শরীফের তাফছীরে, বিশ্ববিখ্যাত তাফছীর, তাফছীরে খাযিনের ৪র্থ খণ্ডের ৩৯০ পৃষ্ঠায় ইমাম উল্লেখ করেছেনঃ (فقيل له (للحسين بن الفضل) فما معنى ليلة القدر قال سوق المقادير الى المواقيت وتنفيذ القضاء المقدر) “হযরত হুছাইন ইবনে ফযল রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলো ‘লাইলাতুল ক্বদর’-এর অর্থ কি? তিনি উত্তরে বলেন, পূর্বে স্থিরীকৃত সিদ্ধান্তসমূহ নির্ধারিত সময়ের দিকে পরিচালনা করা এবং পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্তের যথার্থ বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে পবিত্র ক্বদর শরীফের রাতের অর্থ।” কাজেই উল্লিখিত দলীলের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, অর্ধ শা’য়বানের রাত হচ্ছেন (لَيْلَةُ الْتَجْوِيْزِ) তথা অনুমোদনের রাত। আর লাইলাতুল ক্বদর হচ্ছেন (لَيْلَةُ الْتَنْفِيْذِ) তথা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের রাত।

“তাফছীরে নাযমুদ দুরা শরীফ” কিতাব উনার ৭ম খণ্ডের ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছেঃ (اَوْ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبانَ) অর্থাৎ “লাইলাতিম মুবারকা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্ধ শা’য়বানের রাত তথা ১৪ই শা’য়বানের দিবাগত রাত।” উক্ত তাফছীরে ৭ম খণ্ডের ৬৪ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছেঃ (قال وروى ابو الضحى عنه ان الله تعالى يقضى الاقضية فى ليلة النصف من شعبان فيسلمها الى اربابها فى ليلة القدر وقال الكرمانى فيسلمها الى اربابها وعمالها من الملائكة ليلة السابع والعشرين من شهر رمضان) অর্থাৎ “হযরত ইমাম বাগবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি তিনি বলেন- হযরত আবু দ্বুহা রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার থেকে পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক তিনি অর্ধ শা’য়বানের রাতে তথা শবে বরাত শরীফ উনার রাত্রে যাবতীয় বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। আর ক্বদর শরীফের রাতে তথা শবে ক্বদর শরীফে সেই সিদ্ধান্তকে কার্যকরী তথা বাস্তবায়ন করার জন্য তালিকা পেশ করেন বাস্তবায়নকারী ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের হাতে। হযরত ইমাম কিরমানী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি তিনি বলেন, পূর্ব সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার জন্য বাস্তবায়নকারী ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালাম উনাদের হাতে যেই রাত্রিতে তালিকা পেশ করা হয়, সেই রাত্রিটি হচ্ছেন রমজান মাসের ২৭ তারিখের রাত।

আর ছুরাহ ক্বদর শরীফের শেষ আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, এই রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও কল্যাণে পূর্ণ থাকে ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করার মতো এই রাতের শেষ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ফাযরের মাধ্যমে। অর্থাৎ লাইলাতুল ক্বদর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিদ্যমান থাকেন, এবং সেই সময়সীমা হলেন রাতের শুরু থেকে ফাযর পর্যন্ত।

এই পুরো ছুরাহটি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এখানে তিনটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছেঃ এই রাতের সাথে ক্বুরআন শরীফ নাযিলের সম্পর্ক, এই রাতের অসাধারণ মর্যাদা, এবং এই রাতের মধ্যে আসমানি ব্যবস্থার বিশেষ কার্যক্রম আগামি ১ বছরের তাক্বদীরের ফায়ছালা শুরুর রাত। এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে ইছলামের ইতিহাসে একটি অনন্য ও বিশেষ রাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

এবার আসি ছুরাহ আল-ফাযরের ক্বছমগুলোর বিশ্লেষণ

ছুরাহ ফাযরের শুরুতেই মহান আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্বছম করেছেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَالْفَجْرِ، وَلَيَالٍ عَشْرٍ، وَالشَّفْعِ وَالْوَتْرِ، وَاللَّيْلِ إِذَا يَسْرِ، هَلْ فِي ذَٰلِكَ قَسَمٌ لِذِي حِجْرٍ، أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ) ক্বছম ফাযরের, ক্বছম দশ রাতের, ক্বছম জোড় ও বেজোড় (রাতের), ক্বছম (সেই) রাতের যখন তা গমন করে; এতে কি বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য ক্বছমের বিষয় নেই? আপনি কি দেখেননি আপনার রব তা’য়ালা ‘য়া’দ’ জাতির সাথে কী করেছিলেন। (ছুরাহ আল-ফাযর ৮৯:১-৬) অর্থাৎ আল-ক্বুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে, ফাযরের ক্বছম, দশ রাতের ক্বছম, জোড় ও বেজোড় রাতের ক্বছম, এবং সেই রাতের ক্বছম যা চলে যায়। ক্বুরআন শরীফের ক্বছমগুলো কখনোই এলোমেলোভাবে আসে না; বরং এগুলোর মধ্যে একটি গভীর অর্থপূর্ণ ধারাবাহিকতা থাকে। এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এই ক্বছমগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়চক্রকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে।

যারা কপিপেষ্ট পাবলিক নয়, এবং রিসার্চ পছন্ধ করেন তারা প্রথমে রাত আসলে কি সেটা জেনে নিন, নতুবা তাফছির এর বর্ননা আপনাকে বিভ্রান্ত করে দিবে আমার বক্তব্যের বিষয়ে।

প্রথমেই বলা হয়েছে ফাযরের ক্বছম। ফাযর এমন একটি মুহূর্ত যা রাতের সমাপ্তি এবং দিনের সূচনার সীমারেখা। অর্থাৎ রাতের একটি নির্দিষ্ট পরিণতি বা সমাপ্তির দিকে ইঙ্গিত এখানে উপস্থিত। এরপর বলা হয়েছে “দশ রাত”-এর কথা। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো আল-ক্বুরআন এখানে “দিন” শব্দ ব্যবহার করেনি; বরং স্পষ্টভাবে “রাত” শব্দ ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুরু থেকেই রাতকে ঘিরে। এরপর মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন জোড় ও বেজোড়ের কথা। এই অংশটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন কোনো ধারাবাহিক সময়ের মধ্যে জোড় ও বেজোড়ের কথা বলা হয়, তখন বোঝা যায় যে সেই সময়ের মধ্যে এমন একটি বিন্যাস রয়েছে যেখানে প্রতিটি অংশ গণনাযোগ্য এবং পর্যায়ক্রমিক। সবশেষে বলা হয়েছে সেই রাতের কথা যা অতিক্রম করে চলে যায়। এখানে আবারও “রাত” শব্দটি এসেছে এবং সেই রাতের অতিক্রম বা চলে যাওয়ার দৃশ্যকে সামনে আনা হয়েছে।

এই চারটি ক্বছম একত্রে লক্ষ্য করলে একটি ধারাবাহিক দৃশ্য তৈরি হয়ঃ একটি রাতের সময়কাল, সেই রাতগুলোর একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা, সেই সংখ্যার মধ্যে জোড় ও বেজোড়ের বিন্যাস, এবং শেষে ফাযরের মাধ্যমে সেই রাতের সমাপ্তি। ফলে বোঝা যায় যে এখানে একটি নির্দিষ্ট ধরনের রাতভিত্তিক সময়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এই পর্যায়ে যখন আমরা আল-ক্বুরআনের অন্য আয়াতগুলোর সাথে সম্পর্ক খুঁজে দেখি, বিশেষ করে ছুরাহ ক্বদর শরীফের সাথে, তখন একটি স্বাভাবিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ সেখানে বলা হয়েছে একটি বিশেষ রাতের কথা যা ফাযর পর্যন্ত স্থায়ী থাকে, এবং সেই রাতকে এমন একটি সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে যেখানে বেজোড় রাতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই কারণে ছুরাহ ফাযরের ক্বছমগুলোর এই ধারাবাহিকতা কেবল একটি সাধারণ সময়ের উল্লেখ নয়; বরং একটি বিশেষ রাতকেন্দ্রিক সময়চক্রের দিকে ইঙ্গিত করে, “যেখানে রাত, জোড়-বেজোড় বিন্যাস এবং ফাযরের সমাপ্তি” এই তিনটি বিষয় একত্রে উপস্থিত থাকে।

“লায়ালিন আ’শর” - প্রচলিত তাফছীরের দাবী ও তার বিশ্লেষণ

ছুরাহ ফাযরের শুরুতে মহান আল্লাহ তা'য়ালা যখন “দশ রাত”-এর ক্বছম করেছেন, তখন বহু তাফছীর গ্রন্থে এর ব্যাখ্যা হিসেবে জিলহজ্জ শরীফ মাসের প্রথম দশ দিনের কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু মতের মধ্যে মুহররমুল হারাম শরীফ মাসের প্রথম দশ দিনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাফছিরের ইতিহাসে এই মতগুলো বিদ্যমান আছে এবং সেগুলোকে সম্মান রেখেই আলোচনায় উল্লেখ করছি দ্বীমত হিসেবে। যখন আল-ক্বুরআনের ভাষা, প্রসঙ্গ এবং বাস্তবতার সাথে এগুলো মিলিয়ে দেখা হয়, তখন কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।

প্রথমত, যদি এটি জিলহজ্জ শরীফ মাসের প্রথম দশ দিন হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সেখানে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় আরাফার দিন এবং ঈদু আদ্বহার দিনের উপর। এই দুটি দিনের ফজিলত অত্যন্ত বড় এবং তা সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ছুরাহ ফাযরের আয়াতে “দিন” শব্দ ব্যবহার করা হয়নি; বরং স্পষ্টভাবে “রাত” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আল-ক্বুরআনের ভাষা যখন একটি নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেন, তখন সেই শব্দের অর্থকে অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়া সহজ নয়। যদি এখানে “রাত” বলা হয়ে থাকে, তাহলে তার আলোচনাও স্বাভাবিকভাবে রাতকেন্দ্রিক হওয়ার কথা।

দ্বিতীয়ত, যদি এই দশ দিনের মধ্যে বিশেষ কোনো তাৎপর্য থাকে যার জন্য আল্লাহ তায়ালা ক্বছম করেছেন, তাহলে প্রশ্ন আসে এই দশটির মধ্যে কেন কেবল দুইটি দিনই প্রধান হয়ে দাঁড়াবে এবং বাকি আটটির আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য আলোচনায় থাকবে না। আল-ক্বুরআনে যখন কোন কিছুর ক্বছম করা হয়, তখন সাধারণত সেই বিষয়টির ভেতরে একটি স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য থাকে। কিন্তু যদি দশটির মধ্যে মাত্র এক বা দুইটি বিষয়ই কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, তাহলে ক্বছমের পূর্ণ অর্থ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

একইভাবে যদি এটিকে মুহাররমুল হারাম শরীফ মাসের প্রথম দশ দিন হিসেবে ধরা হয়, তাহলেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। মুহাররমুল হারাম শরীফ মাসের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো দশ মুহাররমুল হারাম শরীফের দিন। কিন্তু এখানে আবারও “রাত”-এর কথা চলে আসে, অথচ মুহাররমুল হারাম শরীফ মাসের দশ রাতের মধ্যে এমন কোনো ধারাবাহিক রাতভিত্তিক ঈবাদতের ঐতিহ্য উম্মাহর মধ্যে দেখা যায় না যা ছুরাহ ফাযরের ক্বছমের ভাষার সাথে সুস্পষ্টভাবে মিল খায়।

আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ছুরাহ ফাযরের ক্বছমগুলোর মধ্যে “জোড় ও বেজোড়”-এর কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু যদি এই দশ রাতকে জিলহজ্জ শরীফ বা মুহাররমুল হারাম শরীফের সাথে যুক্ত করা হয়, তাহলে সেই সময়ের সাথে জোড়-বেজোড় রাতভিত্তিক ঈবাদতের কোনো সুপরিচিত ধারাবাহিকতা দেখা যায় না। অথচ আল-ক্বুরআনের ক্বছমগুলোর ধারাবাহিকতা দেখলে মনে হয় যে এখানে এমন একটি সময়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যেখানে রাতগুলোর গণনা, জোড়-বেজোড় বিন্যাস এবং রাতের অতিক্রম, এই সবকিছুই একটি বাস্তব ঈবাদতের প্রেক্ষাপটে উপস্থিত। ১৫০০ বছরের ইতিহাসে কোন ফিরকার কোন য়া’মলেও রমজান শরীফ ছাড়া টানা ১০ রাতের কোন স্পেশাল, স্পেসিফিক য়া’মল খুঁজে পাওয়া যাবেনা, ছুন্নী, শিয়া, ওহাবী-ছালাফি কিংবা দেওবন্দী ফিরকার মধ্যেও।

এই কারণে যখন আল-ক্বুরআনের ভাষা, প্রসঙ্গ এবং বাস্তব ঐতিহাসিক য়া’মলের ধারাকে একত্রে দেখা হয়, তখন “লায়ালিন য়া’শর” অর্থাৎ দশ রাতের বিষয়টি নিয়ে পুনরায় চিন্তা করার দরজা খোলা থাকে। কারণ আল-ক্বুরআনের ক্বছমগুলো সাধারণত এমন বিষয়ের উপর করা হয় যা মানুষের কাছে স্পষ্ট অর্থ ও গভীর তাৎপর্য বহন করে।

রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের সাথে ক্বুরআনিক মিল

যখন ছুরাহ ফাযরের ক্বছমগুলোকে আল-ক্বুরআনের অন্য আয়াত ও ইছলামের বাস্তব ঈবাদাতের ধারার সাথে মিলিয়ে দেখা হয়, তখন একটি বিষয় খুব স্বাভাবিকভাবে সামনে আসে, রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের সাথে এই ক্বছমগুলোর ভাষা ও কাঠামোর একটি গভীর সামঞ্জস্য রয়েছে।

প্রথমত, এখানে বলা হয়েছে “লায়ালিন য়া’শর”-অর্থাৎ দশ রাত। রমজান শরীফের শেষ দশ রাত ইছলামের ইতিহাসে এমন একটি সময়কাল যেখানে মুছলিম উম্মাহ বিশেষভাবে ঈবাদতের দিকে মনোনিবেশ করে (সকল ফিরকা, হোক হাক্ব কিংবা বাতিল)। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এই দশ রাতের সময় ঈবাদতের মাত্রা বাড়িয়ে দিতেন, নিজেও রাত জেগে ঈবাদত করতেন এবং পরিবারকেও জাগিয়ে তুলতেন। ফলে বাস্তব য়া’মলের দিক থেকেও এই দশ রাত একটি সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল।

দ্বিতীয়ত, ছুরাহ ফাযরে “শাফ‘ ও ওয়াতর” অর্থাৎ জোড় ও বেজোড়ের ক্বছম করা হয়েছে। ছ্বহীহ হাদীছ শরীফসমূহে লাইলাতুল ক্বদরকে বিশেষভাবে বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে, বিশেষ করে রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের মধ্যে, যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। ফলে জোড় ও বেজোড় রাতের এই ধারণাটি এখানে বাস্তব ঈবাদতের ধারার সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে।

তৃতীয়ত, ছুরাহ ফাযরে বলা হয়েছে সেই রাতের ক্বছম যা অতিক্রম করে চলে যায়। এই কথাটি রাতের একটি প্রবাহমান সময়চক্রকে নির্দেশ করে, যেখানে রাত আসে, অতিবাহিত হয়, এবং শেষে ফাযরের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে। লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কেও আল-ক্বুরআনে ছুরাহ ক্বদর শরীফে বলা হয়েছে যে এই সেই রাত যা ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত শান্তি ও বরকতে পূর্ণ থাকে। ফলে রাতের শুরু থেকে ফাযর পর্যন্ত এই সময়সীমা দুটি ছুরাহর মধ্যেই একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যায়।

আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। রমজান শরীফের শেষ দশ রাত এমন একটি সময় যখন উম্মাহর মধ্যে ধারাবাহিক রাতভিত্তিক ঈবাদতের একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য বিদ্যমান। ক্বিয়ামুল লাইল, ক্বুরআন শরীফের তিলাওয়াত, দু'য়া, ইস্তিগ্বফার, এই সব য়া’মল মূলত রাতকে কেন্দ্র করেই সম্পাদিত হয়। ফলে “রাত”, “দশ রাত”, “জোড়-বেজোড়”, এবং “রাতের অতিক্রম” এই চারটি ধারণা বাস্তব ঈবাদতের একটি সুসংগত কাঠামো তৈরি করে।

এই দিকগুলো একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে ছুরাহ ফাযরের ক্বছমগুলোর ভাষা ও ছুরাহ ক্বদরের আলোচনার মধ্যে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়। সেখানে রাতের গুরুত্ব, ফাযর পর্যন্ত সময়সীমা, এবং বেজোড় রাতের বিশেষ তাৎপর্য এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সাথে মিল খুঁজে পায়।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফের রাজ রহস্য

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন একটি রাত যার প্রকৃত মর্যাদা ও গভীরতা মানুষের সাধারণ উপলব্ধির বাইরে। আল-ক্বুরআনে এই রাতকে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যাতে বোঝা যায় এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং প্রতি বছর পুনরাবৃত্ত হওয়া একটি আসমানি রহস্যময় সময়। এই রাতের মধ্যে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ অবতরণ করেন এবং আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে বিভিন্ন আমর বা সিদ্ধান্ত নাযিল হয়। এই কারণে বহু য়া’লিম এটিকে আসমানি ব্যবস্থাপনার একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এই রাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নির্দিষ্টভাবে গোপন রাখা হয়েছে। যদিও আল-ক্বুরআনে এর মর্যাদা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, তবুও সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। বরং নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে এই রাতকে অনুসন্ধান করতে হবে। এর মধ্যে একটি গভীর হিকমত রয়েছে। যদি নির্দিষ্ট রাতটি স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হতো, তাহলে মানুষ কেবল সেই একটি রাতেই ঈবাদতে মনোযোগ দিত। কিন্তু যখন এটি গোপন রাখা হয়েছে, তখন মুওমিনকে একাধিক রাত জেগে ঈবাদত করতে হয়। এর ফলে ঈবাদতের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের অন্তরে মহান আল্লাহ তা'য়ালা উনার প্রতি আরও গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

আরও একটি রহস্য এখানে লক্ষ্য করা যায়। আল-ক্বুরআনে এই রাতকে “ক্বদর” নামে অভিহিত করা হয়েছে। আ'রবী ভাষায় “ক্বদর” শব্দের মধ্যে মর্যাদা, নির্ধারণ এবং পরিমাপ এই তিনটি অর্থই নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ এই রাত এমন একটি রাত যেখানে মহান মর্যাদা প্রকাশ পায়, আসমানি ব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নির্ধারিত হয় এবং মানবজীবনের জন্য বিশেষ বরকত নাযিল হয়।

এই কারণেই আল-ক্বুরআনে বলা হয়েছে যে এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এর অর্থ কেবল সময়ের তুলনা নয়; বরং এই রাতের আধ্যাত্মিক মূল্য এত বেশি যে এটি মানুষের দীর্ঘ জীবনের ঈবাদতের সমতুল্য হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা উনার রহমতের একটি বিশেষ নিদর্শন হলো তিনি উম্মতে মুহাম্মদী (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম)-কে এমন একটি রাত দান করেছেন যার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে অসাধারণ ছ্বওয়াব অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে কেবল একটি পবিত্র রাত হিসেবে দেখলে পূর্ণ অর্থ প্রকাশ পায় না। বরং এটি এমন একটি সময় যখন আসমান ও জমিনের মধ্যে রহমতের বিশেষ সংযোগ সৃষ্টি হয়, মানুষের দোয়া কবুল হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং বান্দা তার রবের নিকট ফিরে যাওয়ার এক বিরল সুযোগ লাভ করে।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফের ফজিলত

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ ইছলামের ইতিহাসে এমন একটি রাত যার মর্যাদা মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং ক্বুরআন শরীফে ঘোষণা করেছেন। এই রাতের ফজিলত এত বেশি যে আল-ক্বুরআনে পুরো একটি ছুরাহ নাযিল করা হয়েছে এই রাতের মর্যাদা বর্ণনা করার জন্য।

হাদীছ শরীফেও এই রাতের অসাধারণ মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ) যে ব্যক্তি ইমান ও ছ্বওয়াবের আশায় লাইলাতুল ক্বদরের রাতে ঈবাদতে দাঁড়ায়, মহান আল্লাহ তা'য়ালা তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। (বুখারী শরীফ ১৯০১ মুছলিম শরীফ ৭৬০)

এই হাদীছ শরীফ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই রাত কেবল ছ্বওয়াব অর্জনের সুযোগ নয়; বরং এটি গুনাহ মাফের একটি বিশেষ সুযোগও। আর এই কারণেই রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমজান শরীফের শেষ দশ রাতে ঈবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি এই সময়ে রাত জাগতেন, অধিক ঈবাদত করতেন এবং পরিবারকেও ঈবাদতের জন্য জাগিয়ে তুলতেন। এই সব দিক বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে লাইলাতুল ক্বদর শরীফ মহান আল্লাহ তা'য়ালা উনার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদী(ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম)-এর জন্য একটি মহান রহমত ও অমূল্য নিয়ামত।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফের য়া’মল

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন একটি রাত, যেখানে একজন মুওমিনের জন্য ঈবাদত, দু'য়া এবং তাওবার দরজা বিশেষভাবে খুলে দেওয়া হয়। এই রাতকে কেন্দ্র করে যে য়া’মলগুলো করা হয় সেগুলোর মূল ভিত্তি হলো ক্বুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ এবং রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার ছুন্নাহ।

প্রথমত, এই রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ য়া’মল হলো ক্বিয়ামুল লাইল অর্থাৎ রাতের নামাজ। প্রিয় নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমজান শরীফের শেষ দশ রাতে বিশেষভাবে রাত জেগে ঈবাদত করতেন। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি এই সময়ে নিজের ঈবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন এবং পরিবারকেও ঈবাদতের জন্য জাগিয়ে তুলতেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে এই রাতকে ঘুমিয়ে কাটানো নয়, বরং ঈবাদতের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা উচিত।

দ্বিতীয়ত, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত এই রাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ য়া'মল। কারণ এই রাতের সাথে ক্বুরআন শরীফ নাযিলের সম্পর্ক রয়েছে। তাই এই রাতে বেশি বেশি ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা, তার অর্থ নিয়ে চিন্তা করা এবং আল্লাহ তায়ালা উনার কালামের সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক দৃঢ় করা অত্যন্ত বরকতময় কাজ।

তৃতীয়ত, পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফের দু'য়া ও ইস্তিগ্বফার হলেন সেই রাতের একটি বিশেষ য়া’মল। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে উম্মুল মুওমিনীন হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়া’লাইহাছ ছালাম একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন যদি তিনি লাইলাতুল ক্বদর শরীফ পান তাহলে কী দু'য়া করবেন। তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে একটি দু'য়া শিক্ষা দিয়েছিলেনঃ (اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي) (আল্লাহুম্মা ইন্নাকা য়া’ফুউন্ন তুহিব্বুল য়া’ফওয়া ফা’য়ফু য়া’ন্নীই) অর্থাৎ হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (ছুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ ৩৮৫০) এই দু'য়াটি লাইলাতুল ক্বদরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দু'য়া হিসেবে বিবেচিত।

চতুর্থত, যিকির ও তাছবিহ এই রাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঈবাদত। “ছুবহান‌ আল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এই ধরনের জিকিরের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার স্মরণে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারে। বিশেষ করে ইস্তিগ্বফার করা এই রাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি গুনাহ মাফের রাত।

পঞ্চমত, ইত্তিকাফ এই রাতগুলোর সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ছুন্নাহ। রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমজান শরীফের শেষ দশ দিন ই'য়তিকাফ করতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে গিয়ে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ পাক উনার ঈবাদতে নিজেকে নিয়োজিত করা।

সবশেষে বলা যায়, লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন একটি রাত যা একজন মুওমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। যে ব্যক্তি এই রাতকে গুরুত্ব দেয়, ঈবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা উনার  নিকট ফিরে আসে এবং আন্তরিকভাবে তাওবা করে, তার জন্য এই রাত রহমত, মাগ্বফিরাত এবং নাজাতের এক অসাধারণ সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।

এই কারণে মুওমিনের জন্য উচিত রমজান শরীফের শেষ দশ রাতকে বিশেষভাবে মূল্য দেওয়া, বেজোড় রাতগুলোতে অধিক মনোযোগ দেওয়া এবং ফাযর পর্যন্ত ঈবাদতের পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা। কারণ এই রাত কখন এসে যায় তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না, কিন্তু যে ব্যক্তি অনুসন্ধান করে সে-ই এর বরকত লাভ করার সম্ভাবনা বেশি রাখে। (মহান আল্লাহ তায়ালা তিনিই সবকিছু পারফেক্ট জানেন।)