Friday, March 20, 2026

রাত হলো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সৃষ্ট এক রহস্যময় মাখলুক

সাধারণত রাত বলতে মানুষ অন্ধকার, সূর্যাস্তের পরের সময়, কিংবা দিনের আলো নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পরের অবস্থাকেই বুঝে থাকেকিন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, পবিত্র ক্বুরআন শরীফে রাত বা লাইল’-কে কেবল আলোর অনুপস্থিতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং একে পৃথক, স্বতন্ত্র এবং আলাদাভাবে সৃষ্ট এক মাখলুক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছেযেন এর সৃষ্টি অন্যভাবে, বিশেষভাবে এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ এক বাস্তবতা হিসেবে সংঘটিত হয়েছেউদাহরণস্বরূপ, ছুরাহ আল-আম্বিয়া য়ালাইহিমুছ ছালাম-উনাতে, যেখানে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বড় বড় এবং শক্তিশালী সৃষ্টিসমূহের উল্লেখ করেছেনসেখানে বলা হয়েছে যে, তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করেছেনএখানে রাতের উল্লেখ আগে, তারপর দিনেরযেন ইঙ্গিত করা হচ্ছে আগে রাত সৃষ্টি হয়েছে, পরে দিন; অর্থাৎ রাত একটি স্বতন্ত্র মাখলুক, যাকে প্রথমে পয়দা করা হয়েছে

এমনই আরেকটি সাদৃশ্যপূর্ণ বর্ণনা ছুরাহ আল-আনয়াম শরীফে পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছেঃ সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ তায়ালা উনারই জন্য, যিনি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং অন্ধকারসমূহ ও আলো সৃষ্টি করেছেনএখানেও অন্ধকারের উল্লেখ আলোর আগে এসেছেএর দ্বারা বুঝা যায়, রাত বা অন্ধকার কেবল আলো না থাকার নাম নয়; বরং এটি এক আলাদা সৃষ্টি, যা নিজস্ব অস্তিত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠিততবে বিষয়টি এখানেই শেষ হয় না; বরং আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, পবিত্র ক্বুরআন শরীফে বর্ণিত বহু বড় বড় ঐতিহাসিক ও মহাজাগতিক ঘটনা রাত থেকেই শুরু হয়েছেযেমন, ছুরাহ আল-হাক্কাহ-তে কওমে আদ্ব-এর ওপর যে ভয়ংকর ঝড় প্রেরিত হয়েছিল, তা সাত রাত এবং আট দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিলঅর্থাৎ সেই আযাবের সূচনা হয়েছিল রাতেই, পরে তা দিনে চলমান ছিলআবার ছুরাহ আল-ইছরা শরীফ অনুসারে মিয়রাজ শরীফের মহান ঘটনাও এই রাতেই সংঘটিত হয়েছিলছুরাহ আল-হিজর শরীফ অনুযায়ী, হযরত লূত য়ালাইহিছ ছালাম-উনাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তিনি রাতের এক অংশে উনার পরিবারকে ছদূম ও আমূরার জনপদ থেকে বের করে নিয়ে যাবেন, কারণ সেই রাতেই সেখানে আযাব অবতীর্ণ হবেএকইভাবে হযরত মুছা য়ালাইহিছ ছালাম-উনাকেও বনী ইছরাঈলকে সঙ্গে নিয়ে মিশর ত্যাগের নির্দেশ রাতেই দেওয়া হয়েছিল; ছুরাহ আদ-দুখনে এ মর্মে বলা হয়েছেঃ রাতে আমার বান্দাদের নিয়ে বের হয়ে যাওআর হুযূর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার মক্কা থেকে হিজরতও রাতের বেলাতেই সংঘটিত হয়েছিল

পবিত্র ক্বুরআন শরীফ-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়াত, যে আয়াত সম্পর্কে ইহুদিরা হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিআল্লাহু আনহু-উনাকে বলেছিল, “যদি এই আয়াত আমাদের ওপর নাযিল হতো, তবে আমরা সেই দিনটিকে ঈদের দিন বানিয়ে নিতামসে আয়াত শরীফও রাতেই নাযিল হয়েছিলএটি হলো ছুরাহ আল-মায়িদাহ- শরীফের তৃতীয় আয়াত, যেখানে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন যে, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করে দিলামএকইভাবে হুযূর পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেছেন যে, শায়বান মাসে এমন একটি রাত আসে, যখন মহান আল্লাহ তায়ালা উনার মাখলুকাতের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টিতে তাকানআরও লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, পবিত্র ক্বুরআন শরীফ উনার সাত জায়গায় মহান আল্লাহ তায়ালা রাতের কছম খেয়েছেনউপরন্তু, একটি পূর্ণাঙ্গ ছুরাহ-ই রাতের নামে নামকরণ করা হয়েছে যা ছুরাহ আল-লাইল নামে পরিচিত

ইসলামি তাকভীম বা বর্ষপঞ্জিতেও সময়ের সূচনা রাত থেকেই হয়যেমন রমাদ্বন শরীফের মাস শুরু হয় কখন? যখন চাঁদ দেখা যায়, সেই রাত থেকেইসেই রাতেই তারাউয়্যী শুরু হয়, আর সেই রাতের শেষ প্রান্তে ছাহরী হয়, যার মাধ্যমে রোযার দিনের সূচনা ঘটেঅর্থাৎ ইছলামী সময়-চেতনায় রাত আগে, দিন পরেতবে রাত সম্পর্কে পবিত্র ক্বুরআন শরীফের সবচেয়ে গভীর ও রহস্যময় বর্ণনাগুলোর একটি রয়েছে ছুরাহ ইয়াছিন শরীফে, যেখানে বলা হয়েছেঃ তাদের জন্য একটি নিদর্শন হলো রাত; আমি তা থেকে দিনকে টেনে বের করে নিইএখানে টেনে বের করে নেওয়া”-র জন্য যে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে নাছলাখুতার অর্থ হচ্ছে কোনো প্রাণীর দেহ থেকে চামড়া টেনে ছড়িয়ে বা ছিঁড়ে আলাদা করে নেওয়াএই শব্দচয়ন অত্যন্ত বিস্ময়করএর দ্বারা যেন বোঝানো হচ্ছে, আসল ও মৌলিক বাস্তবতা হলো রাত; আর দিন হলো তার ওপর একটি আবরণ, একটি স্তর, একটি খোলস, যা রাতের ওপর জড়ানো থাকে, পরে তা টেনে আলাদা করা হয়

এটি পবিত্র ক্বুরআন শরীফের এক অভূতপূর্ব উদ্ঘাটনএই আয়াত শরীফ যেনো জানিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃত অবস্থা হলো রাত, আর দিন হলো আলোর একটি অস্থায়ী স্তর মাত্রবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও বিষয়টি গভীর তাৎপর্যপূর্ণকারণ আমাদের এই মহাবিশ্বের মৌলিক অবস্থা হলো অন্ধকার; মহাশূন্যে নিজস্ব কোনো আলো নেইসর্বত্রই রাতের আধিপত্য বিরাজমানকেবল সূর্য কিংবা অন্য নক্ষত্রের উপস্থিতির কারণে পৃথিবী বা অন্য কোনো গ্রহে সাময়িকভাবে কিছু সময়ের জন্য দিনের অবস্থা তৈরি হয়অর্থাৎ দিন স্থায়ী নয়; বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে উদ্ভাসিত সাময়িক আলোকাবস্থাএই ইঙ্গিতও পবিত্র ক্বুরআন শরীফে পূর্ব থেকেই বিদ্যমানছুরাহ আন-নাযিআত শরীফের মর্মার্থে দেখা যায়, রাত আসমানের এক বৈশিষ্ট্য, যাকে অন্ধকার করা হয়েছে, যাকে নূরশূন্য করা হয়েছে, যাকে অন্ধকারের গুণে চিহ্নিত করা হয়েছেফলে মূল বাস্তবতা রাত, আর আমাদের এই সৃষ্টিজগতে নাযিল হওয়া বিশেষ রাতগুলোর শীর্ষে রয়েছেন লাইলাতুল ক্বদর শরীফ, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদত ঐ রাতের সমান নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে আসেআজকাল অনেকে জিজ্ঞাসা করেঃ লাইলাতুল ক্বদর শরীফ কোন অঞ্চলের বেজোড় রাতে অনুসন্ধান করতে হবেবাংলাদেশের বেজোড় রাত, না সৌদি আরবের বেজোড় রাত? এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো প্রশ্নকারণ সারা পৃথিবীতে রমাদ্বন শরীফ একই তারিখে শুরু বা চলমান থাকে নাএমনও হতে পারে, অ্যামেরিকাতে এখন বেজোড় রাত চলছে, অথচ বাংলাদেশ/ভারত/পাকিস্তানে তা পরেরদিন হবেএ কারণেই রাতের ধারণা শুরুতেই বুঝে নেওয়া জরুরিমহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিকট মূল সত্তা হলো রাতএমনকি পবিত্র ক্বুরআন শরীফে যখন ২৪ ঘণ্টার একটি পূর্ণ সময়কাল উল্লেখ করা হয়, তখনও অনেক ক্ষেত্রে রাতশব্দটি দিয়েই তা প্রকাশ করা হয়উদাহরণস্বরূপ, ছুরাহ আল-আরাফ-এ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন যে, তিনি হযরত মূছা য়ালাইহিছ ছালাম-উনার সঙ্গে ত্রিশ রাতের ওয়াদা করেছেনএখানে এই ত্রিশ রাত মানে কেবল ত্রিশটি রাত নয়; বরং পূর্ণ ত্রিশ দিনের সময়কালও এর অন্তর্ভুক্ত

অনুরূপভাবে ছুরাহ মরিয়ম য়ালাইহাছ ছালাম-এ হযরত যাকারিয়া য়ালাইহিছ ছালাম-উনার ঘটনা উল্লেখ আছেতিনি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার নিকট নেক সন্তান কামনা করে দ্বোআ করেছিলেনমহান আল্লাহ তায়ালা উনার দ্বোআ কবুল করেন এবং তার নিদর্শন হিসেবে বলেন যে, তিনি তিন রাত পর্যন্ত কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবেন নাএখানেও তিন রাতবলতে শুধু রাত নয়; বরং দিনসহ পূর্ণ সময়কাল বুঝানো হয়েছেঅর্থাৎ সমগ্র কায়িনাত এক বিশেষ মহাজাগতিক বিধান বা কসমিক অর্ডার অনুসরণ করছে, যার কেন্দ্রীয় সত্য হলো রাতই মৌলিক বাস্তবতারাত মহাবিশ্বের সর্বত্র বিস্তৃত, আর লাইলাতুল ক্বদর শরীফেও পুরো কায়িনাতে একই সাথে অবতীর্ণ হয়এই রাত সর্বত্র একই সময়ে বিস্তৃত থাকেতবে প্রতিটি দেশ নিজ নিজ চাঁদ দেখার হিসাব অনুযায়ী সেই রাতকে নিজেদের ভূখণ্ডে শনাক্ত করে থাকে। (লাইলাতুল ক্বদরের রাজ রহস্য জানতে পড়ুন।)

সুতরাং রাত নিছক অন্ধকার নয়, নিছক দিনশেষের শূন্যতা নয়, নিছক আলোহীনতার নামও নয়বরং রাত হলো মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সৃষ্ট এক রহস্যময়, মৌলিক, স্বতন্ত্র এবং তাৎপর্যপূর্ণ মাখলুকক্বুরআন শরীফের ভাষা, নবী য়ালাইহিমুছ ছালামগণ উনাদের ঘটনা, ইছলামী সময়গণনা, মহাজাগতিক বাস্তবতা এবং লাইলাতুল ক্বদরের রহস্য, সবকিছু মিলিয়ে রাতের এক অসাধারণ মর্যাদা ও গভীর সৃষ্টিতত্ত্ব আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়এই দৃষ্টিতে দেখলে স্পষ্ট হয়, দিন যেন রাতের ওপর চাপানো এক অস্থায়ী আলোকস্তর, আর রাত হলো সেই বিস্তৃত, গম্ভীর, প্রাথমিক বাস্তবতা, যার বুকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার বহু নিদর্শন, বহু রহস্য এবং বহু বিশেষ ফায়ছালার আবির্ভাব ঘটে


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: