Monday, March 16, 2026

ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর বা ফিতরার পূর্ণাঙ্গ মাছআলাহ

মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি এবং রোজা পালনকালীন ত্রুটি-বিচ্যুতির কাফফারা হিসেবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম (صَدَقَةُ الْفِطْرِ) ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর ওয়াজিব করেছেন। (আবু দাউদ শরীফ ১৬০৯, ইবনে মাজাহ ১৮২৭)

১. ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর কার ওপর ওয়াজিব?

ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় কোনো আজাদ বা স্বাধীন মুছলমানের নিকট যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও ঋণ ব্যতিরেকে সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা এর সমপরিমাণ মূল্যের কোনো মাল বা সম্পদ (নগদ টাকা, সোনা, রূপা, ব্যবসায়িক পণ্য বা অপ্রয়োজনীয় স্থাবর সম্পত্তি) থাকে, তবে তার ওপর ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর আদায় করা ওয়াজিব।

পার্থক্যঃ জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদ এক বছর হাতে থাকা শর্ত, কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে ঈদের দিন সকালে মালিক হলেও তা আদায় করতে হবে।

নাবালিগ ও মজনুনঃ যদি কোনো নাবালিগ শিশু বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি নিছ্বাবের মালিক হয়, তবে তাদের পক্ষ থেকে অভিভাবক তাদের মাল থেকে ফিতরা আদায় করে দিবেন।

২. কার পক্ষ থেকে আদায় করতে হবে?

নিজস্ব ও সন্তানদের পক্ষ থেকেঃ প্রত্যেক নিছ্বাবের মালিক ব্যক্তির ওপর নিজের পক্ষ থেকে এবং তার নাবালিগ সন্তানদের পক্ষ থেকে (যদি তাদের নিজস্ব সম্পদ না থাকে) ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।

বড় সন্তানদের ক্ষেত্রেঃ সাবালিগ বা প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি নিছ্বাবের মালিক হয়, তবে সে নিজেই আদায় করবে। পিতা যদি আদায় করে দেন তবে তা আদায় হয়ে যাবে, তবে এটি পিতার ওপর আইনত আবশ্যক নয়।

স্ত্রীঃ স্ত্রীর ফিতরা স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ থাকলে তিনি নিজেই দিবেন। তবে স্বামী যদি খুশি মনে দিয়ে দেন, তবে তা আদায় হয়ে যাবে।

৩. আদায়ের সঠিক সময়

ওয়াজিব হওয়ার সময়ঃ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় ফিতরা ওয়াজিব হয়।

ছুন্নাহ সময় ঈদের ছলাত বা নামাজের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বেই ফিতরা আদায় করে দেওয়া সুন্নাহ এবং সর্বোত্তম। হযরত ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহু আনহু বলেনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন মানুষ যেনো ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায় করে দেয়। (বুখারী শরীফ ১৫০৯, মুছলিম শরীফ ৯৮৬)

অগ্রিম আদায়ঃ রমজান মাসে বা রমজান শুরু হওয়ার আগে শা’বান মাসেও ফিতরা অগ্রিম আদায় করা জায়েজ।

বিলম্বে আদায়ঃ কেউ যদি ঈদের দিন দিতে ভুলে যায়, তবে তাকে সারাজীবনের মধ্যে অবশ্যই তা আদায় করতে হবে। কারণ এটি বান্দার হক, যা মাফ হয় না। তবে সেটা হয় মাকরূহ।

৪. ফিতরার পরিমাণ (শরয়ী মাপকাঠিতে)

ছদকায়ে ফিতরের পরিমাণ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার প্রদর্শিত শরয়ী মানদণ্ড অনুযায়ী নির্ধারিত। সাধারণত এটি দুই ধরনের মাপে নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি গম বা আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করা হয়, তবে এর পরিমাণ হবে অর্ধেক ছা (نِصْفُ صَاعٍ)। বর্তমান ওজনের হিসেবে এটি প্রায় ১ কেজি ৬৬২ গ্রাম। তবে অধিক সতর্কতা অবলম্বনের জন্য অনেক আলেম প্রায় ২ কেজি ধরে দেওয়াকে উত্তম মনে করেন।

অন্যদিকে যদি খেজুর, যব বা কিশমিশ দ্বারা ফিতরা আদায় করা হয়, তবে এর পরিমাণ হবে পূর্ণ এক ছা (صَاعٌ كَامِلٌ)। আধুনিক ওজন অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ৩ কেজি ৩২৪ গ্রাম। নিরাপদ ও উত্তম হিসেবে প্রায় ৪ কেজি ধরে দেওয়া অধিক গ্রহণযোগ্য বলে অনেক আলেম পরামর্শ দেন।

এই মাপকাঠিগুলো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যুগে প্রচলিত “ছা (صَاعٌ)” নামক পরিমাপের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছে, যা সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিআল্লাহু আনহুম উনারা অনুসরণ করতেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ যারা অত্যন্ত ধনী বা সচ্ছল, তাদের জন্য শুধু আটার দানে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রাস্তায় আভিজাত্যের খাতিরে উন্নত মানের খেজুর বা কিশমিশের মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা অধিক সওয়াবের কাজ।

বিস্তারিত হাদিছ শরীফঃ বুখারী শরীফ ১৫০৩, মুছলিম শরীফ ৯৮৪।

৫. ফিতরা কাদের দেওয়া যাবে (খাতসমূহ)?

যাদের জাকাত দেওয়া যায়, তাদেরই ছদকায়ে ফিতর প্রদান করা যাবে। যেমনঃ গরীব, মিসকিন, নিঃস্ব এবং ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।

নিছ্বাবের মালিক নয় এমন নিকটাত্মীয় (যেমনঃ ভাই, বোন, ফুফু, খালা, চাচা, ভাগ্নে, ভাতিজা)। এতে দ্বিগুণ ছ্বওয়াব, ছ্বদাক্বহ-এর ছ্বওয়াব এবং আত্মীয়তার হক আদায়ের ছ্বওয়াব।

৬. যাদের ফিতরা দেওয়া যাবে নাঃ

হাশেমী খানদানঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বংশধর অর্থাৎ ছৈয়দ বংশের কাউকে ছদকা বা জাকাত দেওয়া জায়েজ নেই।

উর্ধ্বতন ও অধস্তনঃ নিজের মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি (উর্ধ্বতন) এবং নিজের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি (অধস্তন) এদেরকে ফিতরা দেওয়া যাবে না।

স্বামী-স্ত্রীঃ স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে ফিতরা দিতে পারবে না।

অমুছলিম ও ধনী ব্যক্তিঃ কোনো অমুছলিম বা নিছ্বাব পরিমাণ সম্পদের মালিককে ফিতরা দেওয়া যাবে না।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: