Showing posts with label রমজান শরীফ. Show all posts
Showing posts with label রমজান শরীফ. Show all posts

Friday, March 20, 2026

আল-ক্বুরআন-ছুন্নাহ মুবারক অনুসারে জাকাত না দেওয়ার কঠিন পরিণতি

আল-ক্বুরআন-ছুন্নাহ মুবারক অনুসারে জাকাত না দেওয়ার কঠিন পরিণতি

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাকে সম্পদ দান করেন পরীক্ষার জন্য। সম্পদ নিজে কোনো সফলতা নয়; বরং সফলতা হলো সেই সম্পদের হাক্ব আদায় করা। আর সেই হাক্বের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফরজ ঈবাদাত হলো জাকাত। জাকাত কোনো দয়া নয়, বরং এটি অসহায় ও বঞ্চিতদের নির্ধারিত অধিকার যা মহান আল্লাহ তা’য়ালা ধনীদের সম্পদের মধ্যে ফরজ করে দিয়েছেন। যারা এই ফরজ আদায়ে অবহেলা করে, তাদের জন্য আল-ক্বুরআন ও ছুন্নাহ মুবারকে অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে। মূলত গরীবের হাক্বটাই মহান আল্লাহ তায়ালা ধনীদের দিয়ে দেন যাতে তারা সেই আমানত তার প্রাপকের কাছে নফছের তাজকিয়ার জন্যে দিয়ে দেয়। অধিকাংশ মানুষ ভাবে জাকাত মহান আল্লাহ পাক ফরজ করেছেন তাই দিতে হবে, কিন্তু ফরজ কেন, আর কিভাবে সঠিকভাবে দিতে হবে তারা সেটাই জানেনা। ☞ (এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এটা পড়ুন)

প্রথমত যারা মোটেও জাকাত দেয়না তাদের বিষয়ে পবিত্র আল-ক্বুরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছুরাতুত তাওবাহ এর মধ্যে স্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেনঃ (وَ الَّذِیۡنَ یَكۡنِزُوۡنَ الذَّهَبَ وَ الۡفِضَّۃَ وَ لَا یُنۡفِقُوۡنَهَا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۙ فَبَشِّرۡهُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ یَّوۡمَ یُحۡمٰی عَلَیۡهَا فِیۡ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكۡوٰی بِهَا جِبَاهُهُمۡ وَ جُنُوۡبُهُمۡ وَ ظُهُوۡرُهُمۡ ؕ هٰذَا مَا كَنَزۡتُمۡ لِاَنۡفُسِكُمۡ فَذُوۡقُوۡا مَا كُنۡتُمۡ تَكۡنِزُوۡنَ) আর যারা সোনা-রূপা জমা করে রাখে এবং তা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে ব্যয় করে না, আপনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। ক্বিআমতের দিন (তাদের) সেই সম্পদ যাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, তারপর তা দিয়ে তাদের কপাল, পার্শ্ব ও পিঠ দগ্ধ করা হবে; (এবং বলা হবে) এটাই তো (তোমার) সেই সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য জমিয়ে রেখেছিলে; সুতরাং এখন আস্বাদন করো তার স্বাধ যা তোমরা সঞ্চয় করতে”। (ছুরাতু্ত তাওবাহ ৯:৩৪-৩৫)

এ আয়াতে পাকে জমাকৃত স্বর্ণ ও রৌপ্যকে যাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করার যে কঠোর সাজার উল্লেখ রয়েছে, তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তার এ সাজা তারই অর্জন করা। অর্থাৎ যে অর্থ সম্পদ অবৈধ পন্থায় জমা করা হয়, কিংবা বৈধ পন্থায় জমা করলেও তার জাকাত আদায় করা না হয়, সে সম্পদই তার জন্য আযাবের কারণ হয়। হাদীছ শরীফে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যারা সম্পদ পুঞ্জীভূত করে রাখে তাদেরকে সেই যাহান্নামের উত্তপ্ত পাথরের ছেকার সুসংবাদ দিন, যা যাহান্নামের আগুনের দ্বারা দেয়া হবে। যা তাদের কারো স্তনের বোঁটার মধ্যে রাখা হবে, আর তা বের হবে দু কাঁধের উপরিভাগে। আর দু কাঁধের উপরিভাগে রাখা হবে যা স্তনের বোঁটার মধ্য দিয়ে বের হবে। (মুছলিম শরীফ ৯৯২)

কোন কোন মুফাছছির বলেনঃ এ আয়াতে পাকে যে ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করার উল্লেখ এজন্যে করা হয়েছে যে, যে কৃপন ব্যক্তি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রাহে খরচ করতে চায় না, তার কাছে যখন কোন ভিক্ষুক কিছু চায়; কিংবা ছ্বদক্বাহ তলব করে, তখন সে প্রথমে ভ্রুকুঞ্চন করে, তারপর পাশ কাটিয়ে তাকে এড়িয়ে যেতে চায়। এতেও সে ক্ষান্ত না হলে তাকে পৃষ্ঠ দেখিয়ে চলে যায়। এজন্যে বিশেষ করে এ তিন অঙ্গে আযাব দানের উল্লেখ করা হয়েছে। (তাফছীরে কুরতুবী)

আব্দুল্লাহ বিন উমার রদ্বিআল্লাহু য়া'নহু বলেন যে, এটা জাকাত ফরজ হওয়ার পূর্বের আদেশ। জাকাতের হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পর জাকাত দ্বারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা মাল-সম্পদকে পবিত্র করার মাধ্যম বানিয়েছেন। এই জন্য উলামাগণ বলেন, যে মাল থেকে জাকাত বের করা হবে সে মাল (আয়াতে পাকে নিন্দনীয়) ‘জমা করে রাখা’ মাল নয়। আর যে মাল থেকে জাকাত বের করা হবে না, সে মালই হবে ‘জমা করে রাখা’ ধনভান্ডার; যার জন্য রয়েছে এই আল-ক্বুরআনী ধমক। সুতরাং হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘‘প্রত্যেক সোনা ও চাঁদীর অধিকারী ব্যক্তি যে তার হাক্ব (জাকাত) আদায় করে না, যখন ক্বিআমতের দিন আসবে তখন তার জন্য ঐ সমুদয় সোনা-চাঁদীকে আগুনে দিয়ে বহু পাত তৈরী করা হবে। অতঃপর সেগুলোকে যাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগা হবে। যখনই সে পাত ঠান্ডা হয়ে যাবে তখনই তা পুনরায় গরম করে অনুরূপ দাগার শাস্তি সেই দিনে চলতেই থাকবে যার পরিমাণ হবে ৫০ হাজার বছরের সমান; যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দাদের মাঝে বিচার-নিষ্পত্তি শেষ করা হয়েছে। অতঃপর সে তার পথ দেখতে পাবে; হয় যান্নাতের দিকে না হয় দোযখের দিকে।’’ (মুছলিম শরীফ ৯৮৭) ছ্বহিহ হাদীছ শরীফে এসেছেন যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যাকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা সম্পদ দান করেছেন, তারপর যে সেই সম্পদের জাকাত দিবে না, ক্বিআমতের দিন তার সম্পদ তার জন্য চক্ষুর পাশে দুটি কালো দাগবিশিষ্ট বিষাক্ত সাপে পরিণত হবে, তারপর সেটি তার চোয়ালের দু’পাশে আক্রমন করবে এবং বলতে থাকবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার গচ্ছিত ধন। (বুখারী শরীফ ১৪০৩)

অন্য হাদীছ শরীফে এসেছেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, যে কোন ব্যক্তি তার উটের জাকাত দিবে না সে যেভাবে দুনিয়াতে ছিল তার থেকে উত্তমভাবে এসে তাকে পা দিয়ে মাড়াতে থাকবে, অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি ছাগলের জাকাত দিবে না সে যেভাবে দুনিয়াতে ছিল তার থেকেও উত্তমভাবে এসে তাকে তার খুর ও শিং দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকবে। আর তোমাদের কেউ যেন ক্বিআমতের দিন তার কাধে ছাগল নিয়ে উপস্থিত না হয়, যে ছাগল চিৎকার করতে থাকবে, তখন সে বলবে, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম! আর আমি বলব, আমি তোমার জন্য কোন কিছুরই মালিক নই, আমি তো তোমার কাছে বাণী পৌছিয়েছি। আর তোমাদের কেউ যেন তার কাধে কোন উট নিয়ে উপস্থিত না হয়, যা শব্দ করছে। তখন সে বলবে, ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আমি বলব, আমি তোমার জন্য কোন কিছুর মালিক নই, আমি তো তোমাদেরকে পৌছিয়েছি। (বুখারী শরীফ ১৪০২; মুছলিম শরীফ ৯৮৮)

আবার কৃপণতা ও জাকাত আটকে রাখার কুফল বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ (وَ لَا یَحۡسَبَنَّ الَّذِیۡنَ یَبۡخَلُوۡنَ بِمَاۤ اٰتٰهُمُ اللّٰهُ مِنۡ فَضۡلِهٖ هُوَ خَیۡرًا لَّهُمۡ ؕ بَلۡ هُوَ شَرٌّ لَّهُمۡ ؕ سَیُطَوَّقُوۡنَ مَا بَخِلُوۡا بِهٖ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ وَ لِلّٰهِ مِیۡرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ) মহান আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে তাদের যে প্রাচুর্য দিয়েছেন তা থেকে যারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পথে ব্যয় করতে কার্পণ্য করে, তারা যেন কখনো এটা মনে না করে, এটা তাদের জন্যে কোনো কল্যাণকর কিছু হবে। বরং এ (কৃপণতা আসলে) তাদের জন্যে খুবই অকল্যাণকর (হবে)। কার্পণ্য করে তারা যা জমা করেছে, ক্বিআমতের দিন অচিরেই তা দিয়ে তাদের গলায় বেড়ি পরিয়ে দেয়া হবে, আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার তো কেবল মহান আল্লাহ তায়ালা উনারই জন্যে, আর তোমরা যা করো মহান আল্লাহ তায়ালা তা সম্পর্কে বেখবর নন। (ছুরাতু আলে ঈমরান য়ালাইহিছ ছালাম ৩:১৮০) এই আয়াত শরীফে এমন কৃপণের কথা বলা হচ্ছে, যে মহান আল্লাহ পাক উনার দেওয়া সম্পদ উনার রাস্তায় ব্যয় করে না। এমন কি সেই মালের ওয়াযিব জাকাতও আদায় করে না।

অনেক মানুষ হয়তো মানতেই পারবেনা যে সে যদি জাকাত ইনকার করে, কখনোই না দিয়ে মারা যায় তাহলে সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে, কেননা মহান আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেছেনঃ (فَاِنۡ تَابُوۡا وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَ اٰتَوُا الزَّكٰوۃَ فَاِخۡوَانُكُمۡ فِی الدِّیۡنِ ؕ وَ نُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ) অতঃপর যদি তারা (মুশরিকরা) তাওবাহ করে এবং নামায আদায় করে এবং জাকাত প্রদান করে তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই। আর আমি জ্ঞানীদের জন্য (আমার) আয়াতসমূহ খুলে খুলে বর্ণনা করি। (ছুরাতুত তাওবাহ ৯:১১) এছাড়াও মহান আল্লাহ তায়ালা ছুরাতু ফুছ্বছ্বিলাতে যা বলেছেন তা আরও ভয়াবহ, তিনি বলেনঃ (وَ وَیۡلٌ لِّلۡمُشۡرِكِیۡنَ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡتُوۡنَ الزَّكٰوۃَ وَ هُمۡ بِالۡاٰخِرَۃِ هُمۡ كٰفِرُوۡنَ) আর ধ্বংস মুশরিকদের জন্য যারা জাকাত আদায় করে না, মূলত তারাই আখিরাতে অবিশ্বাসী। (ছুরাতু ফুছ্বছ্বিলাত ৪১:৬-৭)।

মুফাছছীরগণের মতে এখানে জাকাত না দেওয়াকে কুফর ও শিরকী আচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু আমি সোজা সাপ্টা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত বলেই মনে করি। বলুনতো জাকাত মুছলিম নাকি মুশরিকদের উপর ফরজ? যদি মুছলিমদের উপর হয়ে থাকে তাহলে যারা জাকাত দেয় না তাদের কাম খতম, যদিও নামাজ, রোজা, হজ্জ করা হাজী হয়ে থাকে।

দুনিয়াবি ও সামাজিক শাস্তিঃ জাকাত না দেওয়া কেবল পরকালের আযাবই ডেকে আনে না, বরং দুনিয়াতেও রহমত কমিয়ে দেয়। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ লোকেরা যখন তাদের সম্পদের জাকাত বন্ধ করে দেয়, তখন আকাশ থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়; যদি পশু-পাখি না থাকত, তবে তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিতই হতো না।” (ছুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ ৪০১৯)

শরঈ ও ফিক্বহি সিদ্ধান্তঃ ইছলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জাকাত অস্বীকার করা কুফরী, আর অবহেলা করে আদায় না করা কঠিন ফাছিক্বি ও কবিরা গুনাহ বলেছেন ইমামগণ যদিও আমি অবহেলাও মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া মনে করছি।

বলপ্রয়োগে আদায়ঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এবং আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিআল্লাহু য়া'নহু উনার ছুন্নাহ মুবারক অনুযায়ী, কেউ জাকাত দিতে অস্বীকার করলে ইছলামী শাসক তা বলপ্রয়োগে আদায় করবেন।

অতিরিক্ত দণ্ডঃ কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী (ছুনানে নাছাই শরীফ), জাকাত দিতে অস্বীকারকারীর থেকে জাকাতের পাশাপাশি দণ্ডস্বরূপ তার অর্ধেক মাল নিয়ে নেওয়ার বিধানও বর্ণিত হয়েছে।

উপসংহারঃ অতএব জাকাত না দেওয়া কোনো সাধারণ আর্থিক ভুল নয়; এটি আখিরাত ধ্বংসকারী গুনাহ এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হুকুমের অবাধ্যতা। আজ যা সঞ্চয়, কাল তা-ই আযাবের হাতিয়ার। সুতরাং প্রতিটি সামর্থ্যবান মুছলিমের উচিত অবিলম্বে হিসাব করে জাকাত আদায় করা এবং অতীতের ভুলের জন্য খাঁটি তাওবাহ করা।

Monday, March 16, 2026

ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর বা ফিতরার পূর্ণাঙ্গ মাছআলাহ

ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর বা ফিতরার পূর্ণাঙ্গ মাছআলাহ

মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি এবং রোজা পালনকালীন ত্রুটি-বিচ্যুতির কাফফারা হিসেবে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম (صَدَقَةُ الْفِطْرِ) ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর ওয়াযিব করেছেন। (আবু দাউদ শরীফ ১৬০৯, ইবনে মাজাহ শরীফ ১৮২৭)

১. ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর কার ওপর ওয়াযিব?

ঈদুল ফিত্বরের দিন ছ্বুবহে ছ্বাদিকের সময় কোন আজাদ বা স্বাধীন মুছলমানের নিকট যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও ঋণ ব্যতিরেকে সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা এর সমপরিমাণ মূল্যের কোন মাল বা সম্পদ (নগদ টাকা, সোনা, রূপা, ব্যবসায়িক পণ্য বা অপ্রয়োজনীয় স্থাবর সম্পত্তি) থাকে, তবে তার ওপর ছ্বদাক্বতুল ফিত্বর আদায় করা ওয়াযিব।

√ পার্থক্যঃ জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদ এক বছর হাতে থাকা শর্ত, কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে ঈদের দিন সকালে মালিক হলেও তা আদায় করতে হবে।

√ নাবালিগ ও মজনুনঃ যদি কোনো নাবালিগ শিশু বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি নিছ্বাবের মালিক হয়, তবে তাদের পক্ষ থেকে অভিভাবক তাদের মাল থেকে ফিতরা আদায় করে দিবেন।

২. কার পক্ষ থেকে আদায় করতে হবে?

√ নিজস্ব ও সন্তানদের পক্ষ থেকেঃ প্রত্যেক নিছ্বাবের মালিক ব্যক্তির ওপর নিজের পক্ষ থেকে এবং তার নাবালিগ সন্তানদের পক্ষ থেকে (যদি তাদের নিজস্ব সম্পদ না থাকে) ফিতরা আদায় করা ওয়াযিব।

√ বড় সন্তানদের ক্ষেত্রেঃ সাবালিগ বা প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি নিছ্বাবের মালিক হয়, তবে সে নিজেই আদায় করবে। পিতা যদি আদায় করে দেন তবে তা আদায় হয়ে যাবে, তবে এটি পিতার ওপর আইনত আবশ্যক নয়।

√ স্ত্রীঃ স্ত্রীর ফিতরা স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ থাকলে তিনি নিজেই দিবেন। তবে স্বামী যদি খুশি মনে দিয়ে দেন, তবে তা আদায় হয়ে যাবে।

৩. আদায়ের সঠিক সময়

√ ওয়াযিব হওয়ার সময়ঃ ঈদুল ফিত্বরের দিন ছ্বুবহে ছ্বাদিকের সময় ফিতরা ওয়াযিব হয়।

√ ছুন্নাতী সময় ঈদের ছ্বলাত বা নামাজের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বেই ফিতরা আদায় করে দেওয়া ছুন্নাহ এবং সর্বোত্তম। হযরত ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহু য়া'নহু বলেনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন মানুষ যেন ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায় করে দেয়। (বুখারী শরীফ ১৫০৯, মুছলিম শরীফ ৯৮৬)

√ অগ্রিম আদায়ঃ রমজান শরীফ মাসে বা রমজান শরীফ শুরু হওয়ার আগে শা’য়বান শরীফ মাসেও ফিতরা অগ্রিম আদায় করা জায়েজ।

√ বিলম্বে আদায়ঃ কেউ যদি ঈদের দিন দিতে ভুলে যায়, তবে তাকে সারাজীবনের মধ্যে অবশ্যই তা আদায় করতে হবে। কারণ এটি বান্দার হাক্ব, যা মাফ হয় না। তবে সেটা হয় মাকরূহ।

৪. ফিতরার পরিমাণ (শরঈ মাপকাঠিতে)

ছ্বদক্বাতুল ফিত্বর পরিমাণ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার প্রদর্শিত শরঈ মানদণ্ড অনুযায়ী নির্ধারিত। সাধারণত এটি দুই ধরনের মাপে নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি গম বা আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করা হয়, তবে এর পরিমাণ হবে অর্ধেক ছ্বা'য় (نِصْفُ صَاعٍ)। বর্তমান ওজনের হিসেবে এটি প্রায় ১ কেজি ৬৬২ গ্রাম। তবে অধিক সতর্কতা অবলম্বনের জন্য অনেক য়া'লিম প্রায় ২ কেজি ধরে দেওয়াকে উত্তম মনে করেন।

√ অন্যদিকে যদি খেজুর, যব বা কিশমিশ দ্বারা ফিতরা আদায় করা হয়, তবে এর পরিমাণ হবে পূর্ণ এক ছ্বা'য় (صَاعٌ كَامِلٌ)। আধুনিক ওজন অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ৩ কেজি ৩২৪ গ্রাম। নিরাপদ ও উত্তম হিসেবে প্রায় ৪ কেজি ধরে দেওয়া অধিক গ্রহণযোগ্য বলে অনেক য়া'লিম পরামর্শ দেন।

√ এই মাপকাঠিগুলো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার যুগে প্রচলিত “ছ্বা'য় (صَاعٌ)” নামক পরিমাপের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছে, যা ছ্বহাবা-এ কিরাম রদ্বিআল্লাহু য়া'নহুম উনারা অনুসরণ করতেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ যারা অত্যন্ত ধনী বা সচ্ছল, তাদের জন্য শুধু আটার দানে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রাস্তায় আভিজাত্যের খাতিরে উন্নত মানের খেজুর বা কিশমিশের মূল্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা অধিক ছ্বওয়াবের কাজ।

বিস্তারিত হাদিছ শরীফঃ বুখারী শরীফ ১৫০৩, মুছলিম শরীফ ৯৮৪।

৫. ফিতরা কাদের দেওয়া যাবে (খাতসমূহ)?

√ যাদের জাকাত দেওয়া যায়, তাদেরই ছ্বদাক্বায়ে ফিত্বর প্রদান করা যাবে। যেমনঃ গরীব, মিছকিন, নিঃস্ব এবং ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।

√ নিছ্বাবের মালিক নয় এমন নিকটাত্মীয় (যেমনঃ ভাই, বোন, ফুফু, খালা, চাচা, ভাগ্নে, ভাতিজা)। এতে দ্বিগুণ ছ্বওয়াব, ছ্বদাক্বহ-এর ছ্বওয়াব এবং আত্মীয়তার হাক্ব আদায়ের ছ্বওয়াব।

৬. যাদের ফিতরা দেওয়া যাবে নাঃ

√ হাশেমী খানদানঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার বংশধর অর্থাৎ ছাইয়্যিদ বংশের কাউকে ছ্বদক্বাহ বা জাকাত দেওয়া জায়েজ নেই।

√ উর্ধ্বতন ও অধস্তনঃ নিজের মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি (উর্ধ্বতন) এবং নিজের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি (অধস্তন) এদেরকে ফিতরা দেওয়া যাবে না।

√ স্বামী-স্ত্রীঃ স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে ফিতরা দিতে পারবে না।

√ অমুছলিম ও ধনী ব্যক্তিঃ কোনো অমুছলিম বা নিছ্বাব পরিমাণ সম্পদের মালিককে ফিতরা দেওয়া যাবে না।

পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফের রাজ-রহস্য ও উনার ফজিলত

পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফের রাজ-রহস্য ও উনার ফজিলত

আমাদের আজকের আলোচনা হলো পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে কেন্দ্র করে। আপনারা অনেকেই অবগত আছেন, আমি সাধারণত সেই দলের কেউ নই যারা মনে করেন কালামুল্লাহ শরীফের মধ্যে জাহিরিভাবে যা দেখা যায় তাই যথেষ্ট, এবং পূর্ববর্তী উলামায়ে-কিরামগণের তাফছীরই শেষ কথা। বরং আমি ক্বুরআন শরীফ নিয়ে তাফাক্কুর ও তাদ্বাব্বুর করতে পছন্দ করি, কারণ মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই মানুষকে উনার কালাম নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার আহ্বান জানিয়েছেন, আহ্বান বললে ভুল হবে বরং তাফাক্কুর ও তাদ্বাব্বুর না করার উপর তিরস্কার করে বলেনঃ (اَفَلَا یَتَدَبَّرُوۡنَ الۡقُرۡاٰنَ اَمۡ عَلٰی قُلُوۡبٍ اَقۡفَالُهَا) তারা কি (পবিত্র কিতাব) আল-ক্বুরআন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ফিকির করে না? নাকি তাদের ক্বলবসমূহে তালা লাগানো আছে? (ছুরাহ আল-কিতাল ৪৭:২৪ ও ছুরাহ আন-নিছাআ ৪:৮২) এই আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে ক্বুরআন শরীফের উপর তাদ্বাব্বুর করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রত্যেক ইনছানকে, সাথে যে ব্যক্তি ক্বুরআন শরীফ নিয়ে চিন্তা করে না, তার হৃদয়ের উপর তালা থাকার কথা বলা হয়েছে। এখন যারা মনে করে যে কিছু পূর্ববর্তী ইমামদের জন্যেই চিন্তা ফিকির করা খাছ ছিলো, তারা তাফছীর লিখে আমাদের উদ্ধার করে গেছেন, আমরা এখন চিন্তা ফিকির থেকে মুক্ত, যা দেওয়া হয়েছে তা চোখ বুঝেই গেলা হবে, নাহলে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়ে যাবে, তারা উক্ত আয়াত অস্বীকার করে মুরতাদ হয়ে যাক আমার কিছুই করার নাই। এছাড়াও আমি পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আয়াতগত রাবতা অন্বেষণকেও জরুরি মনে করি। আমি এ কথাও মনে করি না যে, ক্বুরআন শরীফের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কেবল কিছু নির্দিষ্ট পূর্ববর্তী ব্যক্তির হাতেই চিরতরে সমাপ্ত হয়ে গেছে, আর পরবর্তীদের কাজ শুধু তা কপি-পেস্ট করা, কেননা খোদ মহান আল্লাহ তায়ালা উনিই সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেনঃ (كِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰهُ اِلَیۡكَ مُبٰرَكٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِهٖ وَ لِیَتَذَكَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ) এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং (কেবল) উলুল আলবাবেরাই (এর থেকে) নছীহত গ্রহণ করে। (ছুরাহ-ছ্বদ ৩৮:২৯) ক্বুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলোঃ “আয়াতসমূহ নিয়ে তাফাক্কুর-তাদ্বাব্বুর করা, হেদায়েত গ্রহণ করা” কেননা মহান আল্লাহ তায়ালা উনিই বলছেনঃ (كَذٰلِكَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ لَكُمُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّكُمۡ تَتَفَكَّرُوۡنَ) এভাবেই মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য (উনার) আয়াতসমূহ খুলে খুলে বর্ননা করেন, যাতে তোমরা তাফাক্কুর করো। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:২১৯) এর পরে আর কিছু বলার দরকার আছে বলে মনে করিনা তাদের যারা বলবে আপনি কি পূর্ববর্তী ইমামদের মতামতের চেয়ে বেশী বুঝেন, কারন এই ধরণের কথাবার্তা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নির্দেশিত তাফাক্কুর-তাদ্বাব্বুর এর হুকুম কে ডিমোরালাইজড করে মানুষকে ক্বুরআন শরীফ নিয়ে চিন্তা ফিকির করা থেকে দূরে সরাই রাখে। মনে রাখতে হবে যে, কালামুল্লাহ শরীফ এমন য়া'জ্বীম এক কিতাব, যার মধ্যে প্রত্যেক যুগেই নতুন করে ভাবার, বোঝার এবং উপলব্ধি করার সুযোগ রয়েছে। এই কালামের মধ্যে এমন দিগন্ত রয়েছে, যা প্রত্যেক যুগে নতুনভাবে উন্মোচিত হতে পারে। কিছু অর্থ আছে, যা আউওয়াল থেকে আখির পর্যন্ত সমভাবে সত্য; আবার কিছু স্তর আছে, যা গভীর তাদ্বাব্বুরে নতুন আলো দেয়, দিতে পারে। অনেক বিষয়ে প্রথম যুগ ও শেষ যুগ একই অর্থ উপলব্ধি করতে পারে, আবার অনেক বিষয়ে নতুনভাবে সম্পর্ক ও ইঙ্গিত আবিষ্কার হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এই কারণে আল-ক্বুরআনের কোন ব্যাখ্যা যদি ক্বুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ এবং ছুন্নাহ মুবারক দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হয়, তাহলে সেই বিষয়ে ভিন্নমত বা ইখতিলাফ করার সুযোগ থাকে। যদি কোন মত আল-ক্বুরআনের ভাষা, প্রসঙ্গ এবং লজিকের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেই মতকে আলোচনায় উপস্থাপন করাও দোষের কিছু নয়। কেউ যদি তা গ্রহণ না করেন, তাতেও সমস্যা নেই; কারণ আল-ক্বুরআনের তাফছীরের ইতিহাসে বহু বিষয়ে বিভিন্ন মত বিদ্যমান ছিল এবং তা স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে। সুতরাং যত বড় ইমামই কোন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকুন না কেন, যদি সেই ব্যাখ্যা আল-ক্বুরআন, ছুন্নাহ মুবারক ও ছ্বহীহ হাদীছ শরীফ, এবং আয়াত শরীফের অভ্যন্তরীণ লজিক দ্বারা এমনভাবে প্রমাণিত না হয় যে সেখানে আর কোন শক্তিশালী ভিন্নমতের সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না, তাহলে ঈলমী ও মানতেকি ইখতিলাফের দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। কেউ যদি তা মেনে নিতে না পারেন, সেটি ভিন্ন কথা; কিন্তু দলিলভিত্তিক ভিন্নমতের অধিকার অস্বীকার করার কোন সুযোগ নাই।

এবার আসি মূল বিষয়েঃ পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন এক রাত, যার মর্যাদা ও মাহাত্ম্য স্বয়ং মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি উনার কালামুল্লাহ শরীফে নিজেই ঘোষণা করেছেন। এই রাতকে তিনি শুধু বরকতময়ই বলেননি, বরং একে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে অভিহিত করেছেন। এই রাতের সাথে জড়িয়ে আছে পবিত্র ক্বুরআন শরীফের নুযূল,ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের ও রূহ-এর অবতরণ, হিকমতপূর্ণ আমরের প্রবাহ, এবং ফাযর পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশেষ ছালামতি। তাই লাইলাতুল ক্বদর শরীফের আলোচনা কেবল ফজিলতের আলোচনা নয়; বরং এটি ক্বুরআনিক নযম, আসমানী তদ্ববীর, এবং রূহানী বাস্তবতার আলোচনা।

আমার দৃষ্টিতে, লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে বুঝতে হলে শুধু একটি ছুরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং ছুরাহ আল-ক্বদর, ছুরাহ আল-বাক্বারাহ, ছুরাহ আদ-দুখন, এমনকি ছুরাহ আল-ফাযরের শুরুতেও যে ইশারা ও ক্বছমসমুহ এসেছেন, সেগুলোকে পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতর রেখে দেখতে হবে। তখনই বোঝা যাবে, লাইলাতুল ক্বদর কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ফজিলতের রাত নন; বরং এটি আল-ক্বুরআনের বহু আয়াতের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা এক মহিমান্বিত কেন্দ্রবিন্দু।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ পবিত্র রমাদ্বন শরীফ মাসের একটি বেজোড় রাতের সাথেই খাছ, এই রাতে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালাম ও রূহ-এর অবতরণ হয়, হিকমতপূর্ণ আমরের চূড়ান্ত রাত এটি, এবং এই রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও বরকতে পরিপূর্ণ থাকে ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত। ফলে এই আলোচনায় আমরা আল-ক্বুরআনের ভাষা, আয়াতগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বাস্তব ঈবাদতের ধারাবাহিকতা সামনে রেখে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করব।

এখানে রাতই মূল, দিন নয়। এই রাতের সাথে সম্পর্কিত হয়েছে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের অবতরণ, আমরের অবতরণ, ছালামতির বিস্তার, এবং ফাযর পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব। শুধু তা-ই নয়, ছ্বহীহ ছুন্নাহ মুবারকের এই রাতকে শেষ দশকের বেজোড় রাতসমূহের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে আমরা একটি সম্পূর্ণ রাত-কেন্দ্রিক বিষয় দেখতে পাই: রাত, বেজোড় রাত, ফাযর পর্যন্ত শান্তির স্থায়িত্ব, এবং আসমানী নুযূল। এই সমগ্র কাঠামোকে সামনে রেখে আল-ক্বুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহকে একসাথে পড়লে একটি গভীর রাবতা প্রকাশ পায়, যা সাধারণ জাহেরি পঠনের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ সম্মানিত দ্বীন ইছলামের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রাতগুলোর একটি। মহান আল্লাহ তায়ালা এই রাতকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং ক্বুরআন শরীফে সরাসরি এর আলোচনা করেছেন। এই রাতের সাথে আল-ক্বুরআন নাযিলের সম্পর্ক রয়েছে এবং এই রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। এই রাতের মধ্যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত, বরকত এবং মাগ্বফিরাত নাযিল হয়। ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ এবং রূহ মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নির্দেশে অবতরণ করেন এবং এই রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও কল্যাণে পূর্ণ থাকে ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত।

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উম্মাহকে এই রাত অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিশেষভাবে রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের মধ্যে এই রাত খুঁজতে বলেছেনঃ (تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ) হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম থেকে  বর্ণিত তিনি বলেনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেন, “তোমরা রমাদ্বন শরীফ মাসের শেষ দশ রাতে লাইলাতুল ক্বদর শরীফ তালাশ করো”। উনার থেকে বর্নিত অন্য হাদীছ শরীফে এসেছেনঃ (تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ) (বুখারী শরীফ ২০১৭, ২০১৮ মুছলিম শরীফ ১১৬৯) এছাড়াও এই রাতের গুরুত্ব কি পরিমাণ বেশী তা এই হাদীছ শরীফেই প্রমাণ পাওয়া যায়ঃ (الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ  يَعْنِي لَيْلَةَ الْقَدْرِ- فَإِنْ ضَعُفَ أَحَدُكُمْ أَوْ عَجَزَ فَلَا يُغْلَبَنَّ عَلَى السَّبْعِ الْبَوَاقِي) হযরত ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহ য়া'নহু থেকে বর্নিত তিনি বলেন, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা এটিকে শেষ দশ রাতে অনুসন্ধান কর। যদি তোমাদের কেউ দুর্বল হয়ে পড়ে বা অক্ষম হয়, তবে যেন শেষ সাত রাত থেকেও বঞ্চিত না হয়”। (মুছলিম শরীফ ১১৬৫)

এখন প্রশ্ন আসে যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজে কীভাবে অনুসন্ধান করতেন?

হযরত আঈশা সিদ্দিকা য়ালাইহাছ ছালাম বলেনঃ (كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ الْأَوَاخِرُ أَحْيَا اللَّيْلَ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ وَشَدَّ مِئْزَرَهُ) রমজান শরীফের শেষ দশ রাত শুরু হলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিজে রাত জাগতেন এবং উনার পরিবারকেও রাত জাগাতেন এবং ঈবাদতে খুবই মনোযোগী হয়ে যেতেন। (বুখারী শরীফ ২০২৪, মুছলিম শরীফ ১১৭৪) এতে বোঝা গেলো নিজে কেবল লম্বা ছ্বিয়াম ক্বিয়ামে শেষ দশ রাত কাটালেই হবেনা, সাথে বৌ বাচ্চাকেও জাগ্রত রাখতে হবে, ঈবাদাত করাতে হবে। আর এই কারণে মুছলিম উম্মাহ যুগ যুগ ধরে রমজান শরীফের শেষ দশ রাতে বিশেষভাবে ঈবাদতে মনোনিবেশ করে থাকেন।

এই আলোচনায় আমরা লাইলাতুল ক্বদর শরীফের প্রকৃতি, পবিত্র আল-ক্বুরআন শরীফের আলোকে এর ব্যাখ্যা, ছুরাহ ক্বদর শরীফ ও ছুরাহ ফাযর শরীফের আয়াত শরীফগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, এবং এই রাতের ফজিলত ও য়া’মল নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব।

ছুরাহ ক্বদর শরীফঃ মূল পরিচয় ও ব্যাখ্যা। (তবে এর আগেরাত কি তা জেনে নিতে হবে, নাহলে ক্বদর শরীফ বুঝতে অসুবিদা হবে।)

লাইলাতুল ক্বদর শরীফের প্রকৃত পরিচয় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে এসেছেন ছুরাহ ক্বদর শরীফের মধ্যেঃ (إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ، وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ، لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ، سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ) নিশ্চয়ই আমি (পবিত্র) এই আল-ক্বুরআনকে লাইলাতুল ক্বদর শরীফেই নাযিল করেছি। (ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আর আপনি কি জানেন লাইলাতুল ক্বদর শরীফ কী? (মূলত) লাইলাতুল ক্বদর শরীফ হচ্ছেন হাজার মাসের চেয়েও উত্তম (এক রাত), এই (রাত)-এর মধ্যে মালাইকাহ য়ালাইহিমুছ ছালামগণ ও রূহ তাদের রব তা’য়ালা উনার সব ধরনের আদেশ নিয়ে (যমীনে) অবতরণ করেন, (সেই আদেশবার্তা হচ্ছেন চিরন্তন) প্রশান্তি, (আর) তা ফাযরের সূর্যদয় পর্যন্ত (অব্যাহত) থাকেন। (ছুরাহ আল-ক্বদর ৯৭:১-৫) মহান আল্লাহ তা’য়ালা এখানে ঘোষণা করেছেন যে ক্বুরআন শরীফ নাযিল করা হয়েছে লাইলাতুল ক্বদরের রাতে। এই ঘোষণা থেকেই বোঝা যায় যে এই রাত কেবল একটি সাধারণ রাত নয়; বরং এটি এমন একটি রাত যার সাথে আসমানি ওহীর সূচনা এবং মানবজাতির  হেদায়েতের ইতিহাস গভীরভাবে সম্পর্কিত।

এই ছুরায় আরও বলা হয়েছে যে লাইলাতুল ক্বদর শরীফ হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ এই রাতের মধ্যে যে ঈবাদত করা হয় তা দীর্ঘ সময়ের ঈবাদতের চেয়েও অধিক মর্যাদা লাভ করতে পারে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে মহান আল্লাহ তা'য়ালা উম্মাহকে এমন একটি সুযোগ দিয়েছেন যেখানে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক বড় ছ্বওয়াব অর্জন করা সম্ভব। আমরা যদি একটু ফিকির করি তাহলে দেখবো যে ১ হাজার মাসে ৮৩ বছর ৪ মাস হয়। আর আমরা যদি উম্মতে মুহাম্মাদি(ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম)-এর গড় আয়ু যাচাই করি তাহলে হাদীছ শরীফে যা পাওয়া যায় তা হলোঃ (أَعْمَارُ أُمَّتِي مَا بَيْنَ السِّتِّينَ إِلَى السَّبْعِينَ، وَأَقَلُّهُمْ مَنْ يَجُوزُ ذَلِكَ) হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিআল্লাহু য়া'নহু বলেন, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মতের অধিকাংশ মানুষের বয়স হবে ষাট থেকে সত্তর বছরের মধ্যে; তবে অল্পসংখ্যকই এর বেশি অতিক্রম করবে”। (তিরমিযি শরীফ ৩৫৫০, ইবনে মাজাহ শরীফ ৪২৩৬) এতে বোঝা গেলো একজন উম্মতে মুহাম্মাদী(ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম)-এর হায়াত যদি ৮৩ বছর হয় যা সর্বোচ্চ বয়স বলা যায়, তাহলে তার সারা জীবনেও যদি সে ১ বার লাইলাতুল ক্বদর শরীফ পেয়ে যায় তাহলে সে কামিয়াব।

এদিকে ইমাম ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহ য়ালাইহি বর্ণনা করেন যে, কিছু য়া’লিম বলেনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পূর্ববর্তী উম্মতের দীর্ঘ জীবনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তারা শত শত বছর ঈবাদত করার সুযোগ পেতেন। তখন উনার উম্মতের স্বল্প আয়ুর কথা বিবেচনা করে মহান আল্লাহ তা'য়ালা লাইলাতুল ক্বদর শরীফ দান করেন, যাতে অল্প আয়ু থাকা সত্ত্বেও উম্মতে মুহাম্মদী(ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) বিশাল ছ্বওয়াব অর্জন করতে পারে। তিনি আরও একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেন যেখানে বলা হয়ঃ একজন বনি ইছরাইলের ব্যক্তি হাজার মাস জিহাদে লিপ্ত ছিলেন, তখন মহান আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুল ক্বদর শরীফের আয়াত নাযিল করেন এবং জানান যে এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। আর তারাউয়্যীতে আছে এই রাতের ঈবাদত এমন হাজার মাসের ঈবাদতের চেয়েও উত্তম, যেখানে লাইলাতুল ক্বদর নেই।

এরপর বলা হয়েছে যে এই রাতে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালামগণ এবং রূহ অবতরণ করেন তাদের রব তায়ালা উনার নির্দেশে। এর অর্থ হলো এই রাতের মধ্যেই মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার পক্ষ থেকে বিভিন্ন আমর বা সিদ্ধান্ত নাযিল হয় এবং আসমানি ব্যবস্থার একটি বিশেষ কার্যক্রম সংঘটিত হয়। এই কারণে এই রাতকে একটি আসমানি ব্যবস্থাপনার রাত হিসেবেও বোঝা যায়।

মহান আল্লাহ তা'য়ালা ছুরাহ আল-বাক্বারাহ শরীফের মধ্যে স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, “আল-ক্বুরআন নাযিল করা হয়েছে রমজান শরীফ মাসে (شَهۡرُ رَمَضَانَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ فِیۡهِ الۡقُرۡاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡهُدٰی وَ الۡفُرۡقَانِ) রমজান শরীফ মাস এমন একটি মাস, যাতে পবিত্র আল-ক্বুরআন নাযিল করা হয়েছে; আর এই ক্বুরআন মানবজাতির জন্য হেদায়াতের দিশা প্রদানকারী, হেদায়েতের সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহের বাহক এবং হাক্ব ও বাতিলের পার্থক্য নির্ধারণকারী ছিফাত ফুরক্বন শরীফও নাযিল করা হয়েছে (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৮৫)। আর ছুরাহ আল-ক্বদর শরীফের প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنٰهُ فِیۡ لَیۡلَۃِ الۡقَدۡرِ) তিনি ক্বুরআন শরীফ নাযিল করেছেন “লাইলাতুল ক্বদর” শরীফে।

এখন ক্বুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার “রাত” যদি রমজান শরীফের মধ্যেই হয়, এবং ক্বুরআন শরীফ নিজেই সেই নাযিলের রাতকে “লাইলাতুল ক্বদর” নামে চিহ্নিত করেন, তাহলে ছুরাহ দুখানের “লাইলাতুম মুবারকাহ” দ্বারা পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ অনুসারেই “শবে বরাত” প্রমাণিত হয়। পবিত্র শবে বরাত বা ভাগ্য রজনীকে স্বয়ং মহান আল্লাহ তা'য়ালা তিনি স্বীয় কিতাবের ছুরাহ আদ দুখান শরীফের ৩-৪ নং আয়াত শরীফের মাঝে (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) “বরকত পূর্ণ রাত” হিসেবে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (حٰمٓ وَ الۡكِتٰبِ الۡمُبِیۡنِ إِنَّآ أَنزَلْنٰهُ فِى لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) হা-মীম, ক্বছম কিতাবে মুবিনের, নিশ্চয়ই আমি ইহাকে এক বরকতপূর্ণ রাত্রিতে নাজিল করেছি, নিশ্চয় আমি (যাহান্নাম থেকে) সতর্ককারী, (আর) এই রাত্রিতে সমস্ত হিকমতপূর্ণ কাজসমূহের ফায়ছালা করা হয়। (ছুরাহ আদ দুখান শরিফঃ আয়াত শরীফ ৪৪:১-৪)

ছুরাহ আদ-দুখানের “কিতাবুল মুবিন” কী, তা আলাদা করে অনুমান করার দরকার নেই; পরের আয়াতেই মহান আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন যে, সেই কিতাবের বৈশিষ্ট্য হলো এতে প্রত্যেক হিকমতপূর্ণ বিষয়ের ফায়ছালা নির্ধারিত হয়। সুতরাং এখানে পাঠযোগ্য ক্বুরআন শরীফ নয়, বরং তাক্বদীর ও আমর-সংক্রান্ত ডিভাইন রেকর্ডের কথাই বলা হয়েছে। এছাড়াও আল-ক্বুরআনের আয়াতের গঠন থেকে সরাসরি বোঝা যায় যে (وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ) দ্বারা পাঠযোগ্য আল-ক্বুরআন (যা আমরা পড়ি) বোঝানো হয়নি, বরং তাক্বদীর ও আমর-সংক্রান্ত ডিভাইন রেকর্ড (আসমানী লাওহ বা লাওহে মাহফুজ থেকে বর্ষীয় ফয়সালা) বোঝানো হয়েছে। পবিত্র আল-ক্বুরআনের আয়াত শরীফের গঠন থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হলেনঃ ছুরাহ আদ-দুখান ৪৪:২ এ (وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ) আর সেই সুস্পষ্ট কিতাবের ক্বছম। আর ৪৪:৪ নং আয়াত শরীফে (فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) এই মুবারক রাতে প্রত্যেক হিকমতপূর্ণ বিষয়ের ফায়ছালা নির্ধারিত:বণ্টিত:পৃথক করা হয়।

এখন ২ নং আয়াত শরীফে কিতাবিল মুবীন এর ক্বছম করার পর ৪ নং আয়াত শরীফে সরাসরি (فِيهَا) এই রাতে (يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) বলা হয়েছে। এখানে আমর হাকীম (হিকমতপূর্ণ বিষয়:ফায়ছালা) বলতে তাক্বদীর, রিজিক, আজল, মওত, যুদ্ধ-শান্তি ইত্যাদি সবকিছুর বার্ষিক ফায়ছালা বোঝানো হয়েছে, যা লাওহে মাহফুজ থেকে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাছাড়া কিতাবিল মুবীন যদি পাঠযোগ্য আল-ক্বুরআন হতো তাহলে ৪ নং আয়াতে (يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) এর সাথে সরাসরি মিলত না, কারণ আল-ক্বুরআন নাযিল হওয়ার রাতে ক্বুরআন শরীফের ফয়সালা বণ্টন হয় না, বরং ক্বুরআন শরীফ নিজেই হেদায়েত ও ফুরক্বন। কিন্তু আয়াতের গঠন থেকে স্পষ্ট যে ক্বছমের পরের বর্ণনা (ফায়ছালা নির্ধারণ) কিতাবিল মুবীনের সাথে যুক্ত, এবং এটা লাওহে মাহফুজ-এর রেকর্ড (যা মুবীন/স্পষ্ট, কোনো অস্পষ্টতা নেই)।

প্রথমত, ক্বুরআন শরীফ ১০০% নিশ্চিতভাবে বলেছেন যে ক্বুরআন শরীফ নাযিল হয়েছেন লাইলাতুল ক্বদরের রাতে, এখানে কোনো দ্বিধা নেই। ছুরাহ আল-বাক্বারাহ শরীফের ২:১৮৫ নং আয়াত শরীফ স্পষ্ট করে দেন যে পবিত্র আল-ক্বুরআন রমজান শরীফ মাসে নাযিল হয়েছেন, এবং ছুরাহ আল-ক্বদর শরীফের ৯৭:১ নং আয়াত শরীফ সেই নাযিলের রাতকে নাম দিয়ে চিহ্নিত করেছেন লাইলাতুল ক্বদর বলে। এই দুই আয়াত একসাথে পড়লে। পবিত্র ক্বুরআন শরীফের নুযূলের সময় ও রাত উভয়ই নির্ধারিত হয়ে যায়। সুতরাং “ক্বুরআন শরীফ নাযিল” ইস্যুতে লাইলাতুল ক্বদর ছাড়া অন্য কোনো রাতকে বসানোর গ্রামাটিক বা ক্বুরআনিক সুযোগ নেই।

দ্বিতীয়ত, ছুরাহ আল-ক্বদর শরীফের ৯৭:৪ নং আয়াত শরীফে ব্যবহৃত বাক্যাংশ (مِنْ كُلِّ أَمْرٍ) আর ছুরাহ আদ-দুখান ৪৪:৪ নং আয়াত শরীফে ব্যবহৃত (كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) এই দুইটার মধ্যে গ্রামাটিক পার্থক্যই প্রমাণ করে যে দুই আয়াত শরীফ একই স্তরের ঘটনা বর্ণনা করছেন না। ক্বদর শরীফের আয়াতে পাকে (مِنْ) এসেছেন, যা আরবিতে (تَبْعِيض) তাবঈদ্ব বোঝায়, অর্থাৎ “সমস্ত আমর থেকে” বা “নির্ধারিত আমরগুলোর মধ্য থেকে”। এখানে আমরগুলো আগেই নির্ধারিত ধরে নিয়ে, সেগুলোর একটি অংশ নিয়ে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের নাযিল হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিপরীতে,ছুরাহ দুখানের আয়াতে (كُلُّ) এসেছেন কোনো (مِنْ) ছাড়াই, এবং তার সাথে (حَكِيمٍ) ছ্বিফাত যুক্ত হয়েছেন। এর মানে, এখানে আমরগুলোর মধ্য থেকে কিছু নয়, বরং সমস্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ আমর নিজেই আলাদা করে নির্ধারিত হচ্ছেন। গ্রামার অনুযায়ী এক জায়গা নির্বাচন:কার্যকরকরণ, আর অন্য জায়গা নির্ধারণ:শ্রেণীবিভাগ।

তৃতীয়ত, এই গ্রামাটিক পার্থক্যের কারণে লাইলাতুল ক্বদর ও লাইলাতুল মুবারকাহকে একই রাত বানালে ভাষাগত সংঘর্ষ তৈরি হয়। যদি দুই রাত একই হতো, তাহলে আল-ক্বুরআন একই জায়গায় হয় (كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) রাখতেন, নয়তো (مِنْ كُلِّ أَمْرٍ) তবুও দুই জায়গায় দুই রকম গঠন ব্যবহার করতেন না। আ'রবী ভাষায় যখন কাজের স্তর আলাদা হয়, তখনই এই ধরনের পার্থক্য আসে। ফলে ক্বুরআন শরীফের গ্রামার নিজেই ইঙ্গিত দেন যে, এক রাতে আমর নির্ধারণ, আরেক রাতে সেই নির্ধারিত আমরগুলোর কার্যকরী প্রবাহ।

এখন দেখবো তাফছিরে ইমামদের থেকে কি পাওয়া যায়, যেহেতু আল-ক্বুরআন হাদিছ শরীফ এর দলিলে অনেকে বুঝেনা, সেই বেবুঝদের জন্যে বুঝদারদের অভিমত পেশ করবো।

উক্ত আয়াত শরীফের মধ্যে বর্ণিত (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) ‘লাইলাতিম মুবারকাহ’ শব্দ দ্বারা তাবেঈ হযরত ঈকরমা রহমাতুল্লাহী য়ালাইহি বলেনঃ (هَى لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ وَسَمَّى لَيْلَةَ الرَّحْمَةِ وَاللَّيْلَةِ المُبَارَكَةِ وَلَيْلَةِ الصَّكِّ) অর্থাৎ “লাইলাতিম মুবারকাহ দ্বারা লাইলাতুন নিছ্বফি মিন শা’য়বান তথা অর্ধ শা’য়বানের পবিত্র রাত (শবে বরাতকে) বুঝানো হয়েছে যেমন (لَيْلَةُ الرَّحْمَة) (লাইলাতুর রহমাহ) তথা রহমতের রাত, (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) লাইলাতুল মুবারকাহ তথা বরকতের রাত। (لَيْلَةُ الصَكَّ) (লাইলাতুছ ছ্বক) ভাগ্য লিপিবদ্ধকরণের রাত তথা ভাগ্য রজনী।” আর (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) (বরকতপূর্ণ রাত) দ্বারা পবিত্র শবে বরাত তথা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে তার যথার্থ প্রমাণ বহন করে তার পরবর্তী আয়াত শরীফের (يُفْرَقُ) (নির্ধারিত:স্থির করা হয়) শব্দ দ্বারা। কেননা তাফছির জগতের প্রায় সকল তাফছিরে সমস্ত মুফাছছীরীনে কিরাম উনারা (يُفْرَقُ) শব্দের তাফছীর করেন (يَكْتُبَ) ইয়াকতুব (বন্টন বা নির্ধারণ করা হয়) (يُبْرِمُ) (বাজেট করা হয়) (فَيْصَلَه) (নির্দেশনা দেয়া হয় বা ফায়ছালা করা হয়) ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে। কাজেই (يُفْرَقُ) শব্দের অর্থ ও তার ব্যাখ্যার দ্বারা আরো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল যে, (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) দ্বারা (لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ) অর্ধ শা’য়বানের রাত, বা পবিত্র শবে বরাত তথা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে। যেই রাতে সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্যগুলো সামনের এক বৎসরের জন্য লিপিবদ্ধ করা হয়, আর সেই ভাগ্য লিপি অনুসারে রমজান শরীফ মাসে (لَيْلَةُ الْقَدْرِ) বা শবে ক্বদরের রাত্রে তা চালু করা হয়। এ জন্য (لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ) অর্ধ শা’য়বানের রাতকে (لَيْلَةُ التَجْوِيْز) (নির্ধারণের বা বৈধকরণের রাত) এবং (لَيْلَةُ الْقَدْرِ) কে (لَيْلَةُ التَنْفِيْذِ) (নির্ধারিত ফায়ছালা কার্যকরী করার রাত বা বৈধকরণ বিষয়ের কার্যকারীকরণের রাতও) বলা হয়। (তথ্য সূত্রঃ তাফছীরে মাযহারী, তাফছীরে খযিন, তাফছীরে রূহুল মায়ানী ও রূহুল বায়ান শরীফদ্বয়।)

আর (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) এর ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত তাফছীর, তাফছীরে মাযহারী শরীফ উনার অষ্টম খণ্ডের ৩৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছেঃ (قَالَ عِكْرِمَةُ: هِيَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، يُبْرَمُ فِيهَا أَمْرُ السَّنَةِ، وَيُنْسَخُ الْأَحْيَاءُ مِنَ الْأَمْوَاتِ، فَلَا يُزَادُ فِيهِمْ وَلَا يُنْقَصُ مِنْهُمْ أَحَدٌ. رَوَى الْبَغَوِيُّ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمَيْسَرَةِ بْنِ الْأَخْفَسِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يُقْطَعُ الْآجَالُ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى شَعْبَانَ، حَتَّى إِنَّ الرَّجُلَ لَيَنْكِحُ وَيُولَدُ لَهُ، وَلَقَدْ أُخْرِجَ اسْمُهُ فِي الْمَوْتَى. وَرَوَى أَبُو الضُّحَى عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ اللَّهَ يَقْضِي الْأَقْضِيَةَ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَيُسَلِّمُهَا إِلَى أَرْبَابِهَا فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ.) অর্থাৎ “প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত ঈকরমা রহমাতুল্লাহী য়ালাইহি তিনি বলেন, (ছুরাহ আদ-দুখান শরীফের ৩ নং আয়াত শরীফে বর্ণীত (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) হচ্ছেন ১৫ই শা’য়বানের পবিত্র রাত তথা পবিত্র শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত শরীফ উনার রাত। এই পবিত্র রাত্রে সারা বৎসরের কাজ কর্মের ফায়ছালা করা হয় কতজন জীবিত থাকবেন, কতজন মারা যাবেন তারও ফায়ছালা করা হয়। অতঃপর এ ফায়ছালার থেকে কোন কিছু আর কম বেশি করা হয় না আগামী এক বছর। ইমাম হযরত বাগাবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন, হযরত মুহম্মদ ইবনে মাইছারা ইবনে আখফাশ রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার থেকে। তিনি বলেন, “রছুলুল্লাহ্ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তিনি ইরশাদ মোবারক করেন, শা’য়বান মাসে পরবর্তী শা’য়বান মাস পর্যন্ত মৃত্যুর ফায়ছালা করে দেয়া হয়। এমনকি লোকেরা যে বিবাহ করবে, সেই বৎসর তার থেকে কত জন সন্তান জন্মগ্রহণ করবেন তার তালিকা এবং তার মৃত্যুর তালিকাও প্রস্তুত করা হয় ওই বৎসরে অর্ধ শা’য়বানের রাতে তথা শবে বরাতে”। আর আবুদ্বহা এর বর্ণনায় এসেছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাছ রদ্বিআল্লাহু য়া'নহু তিনি বলেন, পবিত্র শা’য়বানের মাঝামাঝি অর্থাৎ ১৫ই শা’য়বানের রাতে তথা শবে বরাতে মহান আল্লাহ তা'য়ালা সমস্ত কিছুই ফায়ছালা করেন, আর রমজান শরীফে ক্বদরের রাতে (শবে ক্বদরে) সেই ফায়ছালার তালিকা (কপি) বাস্তবায়ন করার জন্য বাস্তবায়নকারী ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালাম উনাদের কাছে অর্পণ করা হয়”।

তাফছীরে মাদিরকে (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) এ আয়াতাংশের তাফছীরে উল্লেখ আছেঃ (وَهَذِهِ اللَّيْلَةُ مُفَرَّقُ كُلِّ أَمْرٍ حَكيمٍ وَمَعْنَى يُفَرِّقُ يَفْصِلُ وَيَكْتُبُ كُلَّ أَمْرٍ مِنْ ارِّزاقِ العِبادِ واِجالَهُمْ وَجَميعُ أَمْوَرِهِمْ مِنْ هَذِهِ اللَّيْلَةِ الَّى لَيْلَةِ الْقَدْرَالَتَى تَجَى فَى اَلْسَنَّتِ المُقْبِلَةِ) অর্থাৎ লাইলাতিম মুবারকাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্ধ শা’য়বানের পবিত্র রাত তথা শবেবরাত এবং এই মুবারকময় রাতে সকল প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়সমূহের ফায়ছালা করা হয়। যেমন (إِنَّآ أَنزَلْنٰهُ فِى لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ) আয়াত শরীফের মধ্যে যে (يُفْرَقُ) শব্দ মহান আল্লাহ তা'য়ালা ব্যবহার করেছেন, এর অর্থ হচ্ছে (يُفَصَّلُ) তথা ফায়ছালা করা, এবং (يُكْتَبُ) (ইউকতাবু) তথা লেখা হয় প্রত্যেক বান্দাদের রিযিক বা জীবিকাসমূহ। তাদের মৃত্যুর সময় সীমাও লেখা হয় এবং সমস্ত বিষয়ের তালিকা লেখা হয় এই মুবারক রাতে, তথা শবে বরাত শরীফে। আর পবিত্র ক্বদর শরীফের রাতে তথা মর্যাদাবান রাতে ওই সমস্ত ফায়ছালাকৃত বিষয়গুলো চালু করা হয় তথা কার্যকরী করা হয় যা সামনের এক বৎসর পর্যন্ত চলতে থাকে। (তথ্য সূত্রঃ তাফছীরু হাশিয়াতিল খাযিন ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১১২)

উল্লেখ্য যে, যদিও কেউ কেউ (لَيْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ) দ্বারা (لَیۡلَۃُ الۡقَدۡرِ) বুঝে থাকেন, কিন্তু এই রাত মূলত সেই রাত নন, বরং (لَیۡلَۃُ الۡقَدۡرِ) দ্বারা শবে বরাত শরীফ উনার সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন বা কার্যকরী করার রাতকেই বুঝানো হয়েছে।

যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র ছুরাহ আল-ক্বদর শরীফের তাফছীরে, বিশ্ববিখ্যাত তাফছীর, তাফছীরে খাযিনের ৪র্থ খণ্ডের ৩৯০ পৃষ্ঠায় ইমাম উল্লেখ করেছেনঃ (فقيل له (للحسين بن الفضل) فما معنى ليلة القدر قال سوق المقادير الى المواقيت وتنفيذ القضاء المقدر) “হযরত হুছাইন ইবনে ফযল রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলো ‘লাইলাতুল ক্বদর’-এর অর্থ কি? তিনি উত্তরে বলেন, পূর্বে স্থিরীকৃত সিদ্ধান্তসমূহ নির্ধারিত সময়ের দিকে পরিচালনা করা এবং পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্তের যথার্থ বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে পবিত্র ক্বদর শরীফের রাতের অর্থ।” কাজেই উল্লিখিত দলীলের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো যে, অর্ধ শা’য়বানের রাত হচ্ছেন (لَيْلَةُ الْتَجْوِيْزِ) তথা অনুমোদনের রাত। আর লাইলাতুল ক্বদর হচ্ছেন (لَيْلَةُ الْتَنْفِيْذِ) তথা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের রাত।

“তাফছীরে নাযমুদ দুরা শরীফ” কিতাব উনার ৭ম খণ্ডের ৬২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছেঃ (اَوْ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبانَ) অর্থাৎ “লাইলাতিম মুবারকা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্ধ শা’য়বানের রাত তথা ১৪ই শা’য়বানের দিবাগত রাত।” উক্ত তাফছীরে ৭ম খণ্ডের ৬৪ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছেঃ (قال وروى ابو الضحى عنه ان الله تعالى يقضى الاقضية فى ليلة النصف من شعبان فيسلمها الى اربابها فى ليلة القدر وقال الكرمانى فيسلمها الى اربابها وعمالها من الملائكة ليلة السابع والعشرين من شهر رمضان) অর্থাৎ “হযরত ইমাম বাগবী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি তিনি বলেন- হযরত আবু দ্বুহা রহমতুল্লাহি য়ালাইহি উনার থেকে পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ পাক তিনি অর্ধ শা’য়বানের রাতে তথা শবে বরাত শরীফ উনার রাত্রে যাবতীয় বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। আর ক্বদর শরীফের রাতে তথা শবে ক্বদর শরীফে সেই সিদ্ধান্তকে কার্যকরী তথা বাস্তবায়ন করার জন্য তালিকা পেশ করেন বাস্তবায়নকারী ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ উনাদের হাতে। হযরত ইমাম কিরমানী রহমতুল্লাহি য়ালাইহি তিনি বলেন, পূর্ব সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার জন্য বাস্তবায়নকারী ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ ছালাম উনাদের হাতে যেই রাত্রিতে তালিকা পেশ করা হয়, সেই রাত্রিটি হচ্ছেন রমজান মাসের ২৭ তারিখের রাত।

আর ছুরাহ ক্বদর শরীফের শেষ আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে যে, এই রাত সম্পূর্ণ শান্তি ও কল্যাণে পূর্ণ থাকে ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করার মতো এই রাতের শেষ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ফাযরের মাধ্যমে। অর্থাৎ লাইলাতুল ক্বদর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিদ্যমান থাকেন, এবং সেই সময়সীমা হলেন রাতের শুরু থেকে ফাযর পর্যন্ত।

এই পুরো ছুরাহটি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এখানে তিনটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছেঃ এই রাতের সাথে ক্বুরআন শরীফ নাযিলের সম্পর্ক, এই রাতের অসাধারণ মর্যাদা, এবং এই রাতের মধ্যে আসমানি ব্যবস্থার বিশেষ কার্যক্রম আগামি ১ বছরের তাক্বদীরের ফায়ছালা শুরুর রাত। এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে ইছলামের ইতিহাসে একটি অনন্য ও বিশেষ রাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

এবার আসি ছুরাহ আল-ফাযরের ক্বছমগুলোর বিশ্লেষণ

ছুরাহ ফাযরের শুরুতেই মহান আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্বছম করেছেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (وَالْفَجْرِ، وَلَيَالٍ عَشْرٍ، وَالشَّفْعِ وَالْوَتْرِ، وَاللَّيْلِ إِذَا يَسْرِ، هَلْ فِي ذَٰلِكَ قَسَمٌ لِذِي حِجْرٍ، أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ) ক্বছম ফাযরের, ক্বছম দশ রাতের, ক্বছম জোড় ও বেজোড় (রাতের), ক্বছম (সেই) রাতের যখন তা গমন করে; এতে কি বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য ক্বছমের বিষয় নেই? আপনি কি দেখেননি আপনার রব তা’য়ালা ‘য়া’দ’ জাতির সাথে কী করেছিলেন। (ছুরাহ আল-ফাযর ৮৯:১-৬) অর্থাৎ আল-ক্বুরআনের ভাষায় বলা হয়েছে, ফাযরের ক্বছম, দশ রাতের ক্বছম, জোড় ও বেজোড় রাতের ক্বছম, এবং সেই রাতের ক্বছম যা চলে যায়। ক্বুরআন শরীফের ক্বছমগুলো কখনোই এলোমেলোভাবে আসে না; বরং এগুলোর মধ্যে একটি গভীর অর্থপূর্ণ ধারাবাহিকতা থাকে। এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এই ক্বছমগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়চক্রকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে।

যারা কপিপেষ্ট পাবলিক নয়, এবং রিসার্চ পছন্ধ করেন তারা প্রথমে রাত আসলে কি সেটা জেনে নিন, নতুবা তাফছির এর বর্ননা আপনাকে বিভ্রান্ত করে দিবে আমার বক্তব্যের বিষয়ে।

প্রথমেই বলা হয়েছে ফাযরের ক্বছম। ফাযর এমন একটি মুহূর্ত যা রাতের সমাপ্তি এবং দিনের সূচনার সীমারেখা। অর্থাৎ রাতের একটি নির্দিষ্ট পরিণতি বা সমাপ্তির দিকে ইঙ্গিত এখানে উপস্থিত। এরপর বলা হয়েছে “দশ রাত”-এর কথা। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো আল-ক্বুরআন এখানে “দিন” শব্দ ব্যবহার করেনি; বরং স্পষ্টভাবে “রাত” শব্দ ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুরু থেকেই রাতকে ঘিরে। এরপর মহান আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন জোড় ও বেজোড়ের কথা। এই অংশটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন কোনো ধারাবাহিক সময়ের মধ্যে জোড় ও বেজোড়ের কথা বলা হয়, তখন বোঝা যায় যে সেই সময়ের মধ্যে এমন একটি বিন্যাস রয়েছে যেখানে প্রতিটি অংশ গণনাযোগ্য এবং পর্যায়ক্রমিক। সবশেষে বলা হয়েছে সেই রাতের কথা যা অতিক্রম করে চলে যায়। এখানে আবারও “রাত” শব্দটি এসেছে এবং সেই রাতের অতিক্রম বা চলে যাওয়ার দৃশ্যকে সামনে আনা হয়েছে।

এই চারটি ক্বছম একত্রে লক্ষ্য করলে একটি ধারাবাহিক দৃশ্য তৈরি হয়ঃ একটি রাতের সময়কাল, সেই রাতগুলোর একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা, সেই সংখ্যার মধ্যে জোড় ও বেজোড়ের বিন্যাস, এবং শেষে ফাযরের মাধ্যমে সেই রাতের সমাপ্তি। ফলে বোঝা যায় যে এখানে একটি নির্দিষ্ট ধরনের রাতভিত্তিক সময়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এই পর্যায়ে যখন আমরা আল-ক্বুরআনের অন্য আয়াতগুলোর সাথে সম্পর্ক খুঁজে দেখি, বিশেষ করে ছুরাহ ক্বদর শরীফের সাথে, তখন একটি স্বাভাবিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ সেখানে বলা হয়েছে একটি বিশেষ রাতের কথা যা ফাযর পর্যন্ত স্থায়ী থাকে, এবং সেই রাতকে এমন একটি সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে যেখানে বেজোড় রাতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই কারণে ছুরাহ ফাযরের ক্বছমগুলোর এই ধারাবাহিকতা কেবল একটি সাধারণ সময়ের উল্লেখ নয়; বরং একটি বিশেষ রাতকেন্দ্রিক সময়চক্রের দিকে ইঙ্গিত করে, “যেখানে রাত, জোড়-বেজোড় বিন্যাস এবং ফাযরের সমাপ্তি” এই তিনটি বিষয় একত্রে উপস্থিত থাকে।

“লায়ালিন আ’শর” - প্রচলিত তাফছীরের দাবী ও তার বিশ্লেষণ

ছুরাহ ফাযরের শুরুতে মহান আল্লাহ তা'য়ালা যখন “দশ রাত”-এর ক্বছম করেছেন, তখন বহু তাফছীর গ্রন্থে এর ব্যাখ্যা হিসেবে জিলহজ্জ শরীফ মাসের প্রথম দশ দিনের কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু মতের মধ্যে মুহররমুল হারাম শরীফ মাসের প্রথম দশ দিনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাফছিরের ইতিহাসে এই মতগুলো বিদ্যমান আছে এবং সেগুলোকে সম্মান রেখেই আলোচনায় উল্লেখ করছি দ্বীমত হিসেবে। যখন আল-ক্বুরআনের ভাষা, প্রসঙ্গ এবং বাস্তবতার সাথে এগুলো মিলিয়ে দেখা হয়, তখন কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।

প্রথমত, যদি এটি জিলহজ্জ শরীফ মাসের প্রথম দশ দিন হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সেখানে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় আরাফার দিন এবং ঈদু আদ্বহার দিনের উপর। এই দুটি দিনের ফজিলত অত্যন্ত বড় এবং তা সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ছুরাহ ফাযরের আয়াতে “দিন” শব্দ ব্যবহার করা হয়নি; বরং স্পষ্টভাবে “রাত” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আল-ক্বুরআনের ভাষা যখন একটি নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেন, তখন সেই শব্দের অর্থকে অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়া সহজ নয়। যদি এখানে “রাত” বলা হয়ে থাকে, তাহলে তার আলোচনাও স্বাভাবিকভাবে রাতকেন্দ্রিক হওয়ার কথা।

দ্বিতীয়ত, যদি এই দশ দিনের মধ্যে বিশেষ কোনো তাৎপর্য থাকে যার জন্য আল্লাহ তায়ালা ক্বছম করেছেন, তাহলে প্রশ্ন আসে এই দশটির মধ্যে কেন কেবল দুইটি দিনই প্রধান হয়ে দাঁড়াবে এবং বাকি আটটির আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য আলোচনায় থাকবে না। আল-ক্বুরআনে যখন কোন কিছুর ক্বছম করা হয়, তখন সাধারণত সেই বিষয়টির ভেতরে একটি স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ তাৎপর্য থাকে। কিন্তু যদি দশটির মধ্যে মাত্র এক বা দুইটি বিষয়ই কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, তাহলে ক্বছমের পূর্ণ অর্থ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

একইভাবে যদি এটিকে মুহাররমুল হারাম শরীফ মাসের প্রথম দশ দিন হিসেবে ধরা হয়, তাহলেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। মুহাররমুল হারাম শরীফ মাসের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো দশ মুহাররমুল হারাম শরীফের দিন। কিন্তু এখানে আবারও “রাত”-এর কথা চলে আসে, অথচ মুহাররমুল হারাম শরীফ মাসের দশ রাতের মধ্যে এমন কোনো ধারাবাহিক রাতভিত্তিক ঈবাদতের ঐতিহ্য উম্মাহর মধ্যে দেখা যায় না যা ছুরাহ ফাযরের ক্বছমের ভাষার সাথে সুস্পষ্টভাবে মিল খায়।

আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ছুরাহ ফাযরের ক্বছমগুলোর মধ্যে “জোড় ও বেজোড়”-এর কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু যদি এই দশ রাতকে জিলহজ্জ শরীফ বা মুহাররমুল হারাম শরীফের সাথে যুক্ত করা হয়, তাহলে সেই সময়ের সাথে জোড়-বেজোড় রাতভিত্তিক ঈবাদতের কোনো সুপরিচিত ধারাবাহিকতা দেখা যায় না। অথচ আল-ক্বুরআনের ক্বছমগুলোর ধারাবাহিকতা দেখলে মনে হয় যে এখানে এমন একটি সময়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যেখানে রাতগুলোর গণনা, জোড়-বেজোড় বিন্যাস এবং রাতের অতিক্রম, এই সবকিছুই একটি বাস্তব ঈবাদতের প্রেক্ষাপটে উপস্থিত। ১৫০০ বছরের ইতিহাসে কোন ফিরকার কোন য়া’মলেও রমজান শরীফ ছাড়া টানা ১০ রাতের কোন স্পেশাল, স্পেসিফিক য়া’মল খুঁজে পাওয়া যাবেনা, ছুন্নী, শিয়া, ওহাবী-ছালাফি কিংবা দেওবন্দী ফিরকার মধ্যেও।

এই কারণে যখন আল-ক্বুরআনের ভাষা, প্রসঙ্গ এবং বাস্তব ঐতিহাসিক য়া’মলের ধারাকে একত্রে দেখা হয়, তখন “লায়ালিন য়া’শর” অর্থাৎ দশ রাতের বিষয়টি নিয়ে পুনরায় চিন্তা করার দরজা খোলা থাকে। কারণ আল-ক্বুরআনের ক্বছমগুলো সাধারণত এমন বিষয়ের উপর করা হয় যা মানুষের কাছে স্পষ্ট অর্থ ও গভীর তাৎপর্য বহন করে।

রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের সাথে ক্বুরআনিক মিল

যখন ছুরাহ ফাযরের ক্বছমগুলোকে আল-ক্বুরআনের অন্য আয়াত ও ইছলামের বাস্তব ঈবাদাতের ধারার সাথে মিলিয়ে দেখা হয়, তখন একটি বিষয় খুব স্বাভাবিকভাবে সামনে আসে, রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের সাথে এই ক্বছমগুলোর ভাষা ও কাঠামোর একটি গভীর সামঞ্জস্য রয়েছে।

প্রথমত, এখানে বলা হয়েছে “লায়ালিন য়া’শর”-অর্থাৎ দশ রাত। রমজান শরীফের শেষ দশ রাত ইছলামের ইতিহাসে এমন একটি সময়কাল যেখানে মুছলিম উম্মাহ বিশেষভাবে ঈবাদতের দিকে মনোনিবেশ করে (সকল ফিরকা, হোক হাক্ব কিংবা বাতিল)। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এই দশ রাতের সময় ঈবাদতের মাত্রা বাড়িয়ে দিতেন, নিজেও রাত জেগে ঈবাদত করতেন এবং পরিবারকেও জাগিয়ে তুলতেন। ফলে বাস্তব য়া’মলের দিক থেকেও এই দশ রাত একটি সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল।

দ্বিতীয়ত, ছুরাহ ফাযরে “শাফ‘ ও ওয়াতর” অর্থাৎ জোড় ও বেজোড়ের ক্বছম করা হয়েছে। ছ্বহীহ হাদীছ শরীফসমূহে লাইলাতুল ক্বদরকে বিশেষভাবে বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে, বিশেষ করে রমজান শরীফের শেষ দশ রাতের মধ্যে, যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। ফলে জোড় ও বেজোড় রাতের এই ধারণাটি এখানে বাস্তব ঈবাদতের ধারার সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে।

তৃতীয়ত, ছুরাহ ফাযরে বলা হয়েছে সেই রাতের ক্বছম যা অতিক্রম করে চলে যায়। এই কথাটি রাতের একটি প্রবাহমান সময়চক্রকে নির্দেশ করে, যেখানে রাত আসে, অতিবাহিত হয়, এবং শেষে ফাযরের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে। লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কেও আল-ক্বুরআনে ছুরাহ ক্বদর শরীফে বলা হয়েছে যে এই সেই রাত যা ফাযর উদিত হওয়া পর্যন্ত শান্তি ও বরকতে পূর্ণ থাকে। ফলে রাতের শুরু থেকে ফাযর পর্যন্ত এই সময়সীমা দুটি ছুরাহর মধ্যেই একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যায়।

আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। রমজান শরীফের শেষ দশ রাত এমন একটি সময় যখন উম্মাহর মধ্যে ধারাবাহিক রাতভিত্তিক ঈবাদতের একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য বিদ্যমান। ক্বিয়ামুল লাইল, ক্বুরআন শরীফের তিলাওয়াত, দু'য়া, ইস্তিগ্বফার, এই সব য়া’মল মূলত রাতকে কেন্দ্র করেই সম্পাদিত হয়। ফলে “রাত”, “দশ রাত”, “জোড়-বেজোড়”, এবং “রাতের অতিক্রম” এই চারটি ধারণা বাস্তব ঈবাদতের একটি সুসংগত কাঠামো তৈরি করে।

এই দিকগুলো একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে ছুরাহ ফাযরের ক্বছমগুলোর ভাষা ও ছুরাহ ক্বদরের আলোচনার মধ্যে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়। সেখানে রাতের গুরুত্ব, ফাযর পর্যন্ত সময়সীমা, এবং বেজোড় রাতের বিশেষ তাৎপর্য এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সাথে মিল খুঁজে পায়।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফের রাজ রহস্য

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন একটি রাত যার প্রকৃত মর্যাদা ও গভীরতা মানুষের সাধারণ উপলব্ধির বাইরে। আল-ক্বুরআনে এই রাতকে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যাতে বোঝা যায় এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং প্রতি বছর পুনরাবৃত্ত হওয়া একটি আসমানি রহস্যময় সময়। এই রাতের মধ্যে ফিরিশতা য়ালাইহিমুছ-ছালামগণ অবতরণ করেন এবং আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে বিভিন্ন আমর বা সিদ্ধান্ত নাযিল হয়। এই কারণে বহু য়া’লিম এটিকে আসমানি ব্যবস্থাপনার একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এই রাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নির্দিষ্টভাবে গোপন রাখা হয়েছে। যদিও আল-ক্বুরআনে এর মর্যাদা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, তবুও সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। বরং নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে এই রাতকে অনুসন্ধান করতে হবে। এর মধ্যে একটি গভীর হিকমত রয়েছে। যদি নির্দিষ্ট রাতটি স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হতো, তাহলে মানুষ কেবল সেই একটি রাতেই ঈবাদতে মনোযোগ দিত। কিন্তু যখন এটি গোপন রাখা হয়েছে, তখন মুওমিনকে একাধিক রাত জেগে ঈবাদত করতে হয়। এর ফলে ঈবাদতের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের অন্তরে মহান আল্লাহ তা'য়ালা উনার প্রতি আরও গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

আরও একটি রহস্য এখানে লক্ষ্য করা যায়। আল-ক্বুরআনে এই রাতকে “ক্বদর” নামে অভিহিত করা হয়েছে। আ'রবী ভাষায় “ক্বদর” শব্দের মধ্যে মর্যাদা, নির্ধারণ এবং পরিমাপ এই তিনটি অর্থই নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ এই রাত এমন একটি রাত যেখানে মহান মর্যাদা প্রকাশ পায়, আসমানি ব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নির্ধারিত হয় এবং মানবজীবনের জন্য বিশেষ বরকত নাযিল হয়।

এই কারণেই আল-ক্বুরআনে বলা হয়েছে যে এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এর অর্থ কেবল সময়ের তুলনা নয়; বরং এই রাতের আধ্যাত্মিক মূল্য এত বেশি যে এটি মানুষের দীর্ঘ জীবনের ঈবাদতের সমতুল্য হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা উনার রহমতের একটি বিশেষ নিদর্শন হলো তিনি উম্মতে মুহাম্মদী (ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম)-কে এমন একটি রাত দান করেছেন যার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে অসাধারণ ছ্বওয়াব অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে লাইলাতুল ক্বদর শরীফকে কেবল একটি পবিত্র রাত হিসেবে দেখলে পূর্ণ অর্থ প্রকাশ পায় না। বরং এটি এমন একটি সময় যখন আসমান ও জমিনের মধ্যে রহমতের বিশেষ সংযোগ সৃষ্টি হয়, মানুষের দোয়া কবুল হওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং বান্দা তার রবের নিকট ফিরে যাওয়ার এক বিরল সুযোগ লাভ করে।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফের ফজিলত

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ ইছলামের ইতিহাসে এমন একটি রাত যার মর্যাদা মহান আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং ক্বুরআন শরীফে ঘোষণা করেছেন। এই রাতের ফজিলত এত বেশি যে আল-ক্বুরআনে পুরো একটি ছুরাহ নাযিল করা হয়েছে এই রাতের মর্যাদা বর্ণনা করার জন্য।

হাদীছ শরীফেও এই রাতের অসাধারণ মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ) যে ব্যক্তি ইমান ও ছ্বওয়াবের আশায় লাইলাতুল ক্বদরের রাতে ঈবাদতে দাঁড়ায়, মহান আল্লাহ তা'য়ালা তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। (বুখারী শরীফ ১৯০১ মুছলিম শরীফ ৭৬০)

এই হাদীছ শরীফ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এই রাত কেবল ছ্বওয়াব অর্জনের সুযোগ নয়; বরং এটি গুনাহ মাফের একটি বিশেষ সুযোগও। আর এই কারণেই রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমজান শরীফের শেষ দশ রাতে ঈবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি এই সময়ে রাত জাগতেন, অধিক ঈবাদত করতেন এবং পরিবারকেও ঈবাদতের জন্য জাগিয়ে তুলতেন। এই সব দিক বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে লাইলাতুল ক্বদর শরীফ মহান আল্লাহ তা'য়ালা উনার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদী(ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম)-এর জন্য একটি মহান রহমত ও অমূল্য নিয়ামত।

লাইলাতুল ক্বদর শরীফের য়া’মল

লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন একটি রাত, যেখানে একজন মুওমিনের জন্য ঈবাদত, দু'য়া এবং তাওবার দরজা বিশেষভাবে খুলে দেওয়া হয়। এই রাতকে কেন্দ্র করে যে য়া’মলগুলো করা হয় সেগুলোর মূল ভিত্তি হলো ক্বুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ এবং রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার ছুন্নাহ।

প্রথমত, এই রাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ য়া’মল হলো ক্বিয়ামুল লাইল অর্থাৎ রাতের নামাজ। প্রিয় নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমজান শরীফের শেষ দশ রাতে বিশেষভাবে রাত জেগে ঈবাদত করতেন। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি এই সময়ে নিজের ঈবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন এবং পরিবারকেও ঈবাদতের জন্য জাগিয়ে তুলতেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে এই রাতকে ঘুমিয়ে কাটানো নয়, বরং ঈবাদতের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা উচিত।

দ্বিতীয়ত, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত এই রাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ য়া'মল। কারণ এই রাতের সাথে ক্বুরআন শরীফ নাযিলের সম্পর্ক রয়েছে। তাই এই রাতে বেশি বেশি ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা, তার অর্থ নিয়ে চিন্তা করা এবং আল্লাহ তায়ালা উনার কালামের সাথে হৃদয়ের সম্পর্ক দৃঢ় করা অত্যন্ত বরকতময় কাজ।

তৃতীয়ত, পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর শরীফের দু'য়া ও ইস্তিগ্বফার হলেন সেই রাতের একটি বিশেষ য়া’মল। হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে উম্মুল মুওমিনীন হযরত আঈশা ছিদ্দিকা য়া’লাইহাছ ছালাম একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন যদি তিনি লাইলাতুল ক্বদর শরীফ পান তাহলে কী দু'য়া করবেন। তখন রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাকে একটি দু'য়া শিক্ষা দিয়েছিলেনঃ (اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي) (আল্লাহুম্মা ইন্নাকা য়া’ফুউন্ন তুহিব্বুল য়া’ফওয়া ফা’য়ফু য়া’ন্নীই) অর্থাৎ হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (ছুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ ৩৮৫০) এই দু'য়াটি লাইলাতুল ক্বদরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দু'য়া হিসেবে বিবেচিত।

চতুর্থত, যিকির ও তাছবিহ এই রাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঈবাদত। “ছুবহান‌ আল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এই ধরনের জিকিরের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার স্মরণে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারে। বিশেষ করে ইস্তিগ্বফার করা এই রাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি গুনাহ মাফের রাত।

পঞ্চমত, ইত্তিকাফ এই রাতগুলোর সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ছুন্নাহ। রছুলুল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম রমজান শরীফের শেষ দশ দিন ই'য়তিকাফ করতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে গিয়ে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ পাক উনার ঈবাদতে নিজেকে নিয়োজিত করা।

সবশেষে বলা যায়, লাইলাতুল ক্বদর শরীফ এমন একটি রাত যা একজন মুওমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। যে ব্যক্তি এই রাতকে গুরুত্ব দেয়, ঈবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা উনার  নিকট ফিরে আসে এবং আন্তরিকভাবে তাওবা করে, তার জন্য এই রাত রহমত, মাগ্বফিরাত এবং নাজাতের এক অসাধারণ সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।

এই কারণে মুওমিনের জন্য উচিত রমজান শরীফের শেষ দশ রাতকে বিশেষভাবে মূল্য দেওয়া, বেজোড় রাতগুলোতে অধিক মনোযোগ দেওয়া এবং ফাযর পর্যন্ত ঈবাদতের পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা। কারণ এই রাত কখন এসে যায় তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না, কিন্তু যে ব্যক্তি অনুসন্ধান করে সে-ই এর বরকত লাভ করার সম্ভাবনা বেশি রাখে। (মহান আল্লাহ তায়ালা তিনিই সবকিছু পারফেক্ট জানেন।)

Friday, February 27, 2026

রমজানের রোজা রেখে আমরা কি আজ পর্যন্ত রোজাদার হয়েছি? রোজা আসলে কি?

রমজানের রোজা রেখে আমরা কি আজ পর্যন্ত রোজাদার হয়েছি? রোজা আসলে কি?

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ

اللّٰهُمّٰ صَلِّ عَلیٰ سَيِّدِنَا نَبِيِّنَا حَبِيْبِنَا شَفِيْعِنَا مَوْلَانَا مُحَمَّدٍ الْنَّبِيَّ الْأُمِّيَّ وَ اَزْوَاجِهِ وَ اَهْلِ بَيْتِهِ وَ اَصْحَبِهِ وَ اٰلِهِ وَ سَلَّمۡ

প্রত্যেক বছর রমজান শরীফ আসে, আর আমরা খাবার দাবারের মাস মনে করে ছাহরী ইফতারে বিয়ে বাড়ীর আয়োজন করে পার করে দিই। এর মূল কারণ রমজান শরীফ সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা, তাই শুধু রমজান শরীফের ছুরত সম্পর্কে জানলেই হবেনা, বরং এর রুহকে হাছিল করতে হবে। রোজার বিষয়টা মূলত আমাদের সাদা পোশাক পরিষ্কার করার মতো। যদি তুমি কাপড় ধোয়া শিখে ফেলো তাহলে তুমি রোজা রাখাও শিখে ফেলবে ইনশাআল্লাহ।

মনে প্রশ্ন আসতে পারে “কিভাবে” তাই না?

যখন তুমি কাপড় ধোও তখন তুমি কি করো? পানি ব্যবহার করো, এর সাথে ব্যবহার করো ডিটারজেন্ট, তাই না? অনুরূপ ১৫/১৬ ঘন্টা খাবার দাবার ছেড়ে দেওয়া, পানির দরজা রাখে, আর ক্বলবে নূর আসার ব্যাপারটা, ডিটারজেন্ট এর দরজা রাখে। তুমি যদি সাদা পোশাকের মধ্যে থাকা কালো নাপাকির দাগে যখন কেবল পানিই ঢালো, ডিটারজেন্ট ব্যবহার করো না, তখন তা পরিষ্কার হবে না। অথবা তুমি গোসলের কথাই ধরো, জমিনে কাজ করেছ, বা ময়লা নর্দমায়, কাজ শেষে গায়ে কয়েক বালতি পানি ঢেলে দিলে কেবল, তাহলে কি ময়লা ও বাজে গন্ধ চলে যাবে? যাবে না। ভালো মতো সাবান দিয়ে ঘষে মেজে তারপর পানি ঢাললে গন্ধ প্লাস ময়লা দূর হবে। তাহলে তুমি হাক্বিক্বতে পয় পরিষ্কার হয়ে যাবে। অর্থাৎ সাবান তোমাকে ময়লা আবর্জনা গায়ে লাগলে পাক সাফ করে। অনুরূপ রোজা ক্বলবকে পাক সাফ করে, এর মধ্যে থাকা গালিজ বের করে দেন। তোমার রোজা যদি তোমার ক্বলবে নূর বানাতে না পারেন, তাহলে বুঝতে হবে তুমি শুধুই ক্ষুধার্ত থাকছো, এর বেশী কিছুই নয়। ক্ষুধার্ত থাকছো, পানি ঢালছো, মানুষ মনে করছে কাপড় ধুইতেছো, কিন্তু পরনে ওয়ালা ভালো করেই জানে যে এখনো কাপড় থেকে দুর্গন্ধ আসছে। তেমনি তুমি এমন রোজাদার যে কেবল সারাদিন উপোষ করেছে, অথচ তোমার ক্বলবেও শয়তান, নফছেও শয়তান বাস করতেছে। সেখানে নূরের কোন উপস্থিতিই নাই। মূলত রোজা তাদের জন্যেই কামিয়াবি, যাদের ক্বলব সৌন্দর্যমন্ডিত হয়, ক্বলব নূরানি হয়ে যায়।

বলুনতো রোজার মাক্বছ্বদ কি?

রোজার মাক্বছ্বদ হলোঃ নফছ কে পাক করা। শুধু ক্ষুধার্ত থাকলে তো নফছ পাক হবেনা তাইনা। ক্ষুধার্ত থাকলে নফছ দুর্বল হয়, পাক হয় নূর দ্বারা। ভুক নফছকে কমজুর করে ফেলে, তাই কমজুর করে সহজে পাক করতে চাইলে নূর এর প্রয়োজন। এজন্যেই রোজা তাদের জন্যে কামিয়াবি যারা ক্বলবি জিকির করে থাকেন দিবা রাত্রি। ক্ষুধার্ত থাকেন, নফছ কমজুর হয়, সাথে যখন ক্বলবি জিকির ও চলে তখন সেখানে নূর উৎপন্ন হয়, সেখান থেকে নূর আসেন, রাতে লম্বা সময় নিয়ে মুহব্বত ভরে তারাউয়্যিহ পড়েন, সেটার নূরও সিনায় অর্থাৎ ক্বলবে আসে। রমজান মাসে এই একটা এক্সট্রা নূরের মালিক আপনি হয়ে যাচ্ছেন ফি-ছাবি-লিল্লাহ। এইসব তাদের জন্য সাহায্যকারী হয়, তারাই রোজায় কামিয়াব হয়।

ঐসকল লোকের রোজাই তাদের জন্য ফায়েজ হয়, ফায়দা হয়। কারণ মহান আল্লাহ তা’য়ালা তো রোজারদারদেরকেই বলেনঃ (لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) আশা করা যায় তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাবে, পাক পবিত্র হয়ে যাবে, তাক্বওয়া হাসিল করতে পারবে।

এবার খুব সামান্য একটি প্রশ্ন করি? আমাদের বর্তমান মুছলিমরা যারা জীবিত হায়াৎ-এ বিদ্যমান, তারা কতো বছর থেকে রোজা রেখে আসছে? যে কাউকে জিজ্ঞাসা করো, যে কত বছর থেকে রোজা রাখছেন? উত্তর পাবে আরে ভাই বুঝ হওয়ার পর থেকে রেখে আসছি, রোজায় আমি খুবই সচেতন, কোন কাজা নাই। অনেক মানুষ তাদের ৮/১০ বছরের বাচ্চাকেও পুরো রমজান মাসে রোজা রাখায়। কোন মানুষের যদি বয়স ৫০ হয় তাহলে সে মিনিমাম ৪০ বছর থেকে রোজা রাখতেছে। যে মানুষ ৪০ বছর টানা রোজা রাখছে এমন আম মানুষকে না বরং হুজুর, ইমাম, ওয়াজী, বাবা টাইপের যে কাউকেই জিজ্ঞাসা করো, যে ভাই, ৪০ বছরের রোজা কি আপনাকে মুত্তাক্বি, পরহেজ গার, তাক্বওয়ার অধিকারী বানাতে সক্ষম হয়েছে? উত্তর হিসেবে যদি বলে, যে না রে ভাই এখনো মুত্তাকীহতে পারিনি, তাক্বওয়া, পরহেজগারিতা হাসিল করতে পারিনি। তাহলে জিগাও কেনওওও? ৪০ বছর থেকে রোজা রাখতেছ এখনো কেনো মুত্তাকী, পরহেজগার হতে পারলেনা? এই প্রশ্ন বয়সের ভারে নূয়ে পড়া আম পাব্লিক না বরং হুজুর, ইমাম, ওয়াজী, বাবা টাইপের সবাই নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার যারা ব্রেইনে ঈলমের ভান্ডার নিয়ে বসে আছে অথচ ক্বলব ভরা নার-এ। আমাদের এই অঞ্চল তথা ভারত, পাকিস্থান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপে কতো রোজাদার বিদ্যামান। একজন মুত্তাকী তুমি কি চেনো তোমার আশেপাশে বিদ্যামান, ইমাম, মুয়াজ্জিন, নামাজী, ইফতার করানো কারো মধ্যে থেকে? মহান আল্লাহ পাক তো বলেই দিছেনঃ (وَاللَّهُ وَلِىُّ الْمُتَّقِينَ) অর্থাৎ, আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা তো মুত্তাকিদেরই বন্ধু। (ছুরাহ আল-যাশিয়া ৪৫/১৯) এখন বলো, এমন একজন য়া’লীম-ই ধরা যাক যাকে তুমি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার বন্ধু, উনার আউলিয়া মনে করো, যে কোন ধরনের হারাম কাজে নিজেকে জড়ায়নি বিগত ৪০ বছর। কোন কবিরা গুনাহ তার আমলনামায় ৪০ বছরে কখনো ফেরেশতা লিখেন নাই, পাবে?

অথচ লাখ লাখ মানুষ ৪০/৫০ বছর ধরে রোজা রাখতেছে রমজান শরীফে, একটি রোজাও কখনো কাজা করেনি, পেট ভরে ভরে খেয়েছে ছাহরীতে, এতো খেয়েছে প্রত্যেক ছাহরীতে যে এমনিতেই ২০ ঘন্টা আর না খেলেও তার ভুক লাগবেনা। হাহাহা রোজা। আজ যে ৪০ বছর ধরে রোজা রাখতেছে তাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করো যে জনাব মুত্তাকী হয়ে গেছেন? যদি বলে না ভাই মুত্তাকী হইনি, প্রশ্ন করুনঃ কেন হও নাই? মহান আল্লাহ তা’য়ালা তো ওয়াদা করেছেনঃ (يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) হে মুমিনগণ তোমাদের উপর রোজা ফরয করে দেয়া হয়েছে, যেমনি করে ফরজ করা হয়েছিলো, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, আশা করা যায় (এই রোজার মাধ্যমে) তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাবে। (ছুরাহ আল-বাক্বরা ২/১৮৩)

তো তুমি যদি নিজে নিজের সার্টিফিকেট দেও যে তুমি মুত্তাকী হতে পার নাই, তাহলে বুঝতে হবে তোমার রোজার মধ্যে কোন ঝামেলা আছে। এটা কি চিন্তা করা দরকার নয় যে, তুমি যখন পার্মানেন্ট কোন অসুখে পড়ে ডাক্তারের নিকট যাও তখন তার সাজেশনে খাওয়া টানা কোন ঔষধে-ও যখন কোন ফায়দা না পাও, তখন আবার যাও গিয়ে বলো, যে ডাক্তার সাহেব অনেকদিন তো খাইলাম কিন্তু কোন পতিকার, উপকার, ফায়দা পেলাম না। একিই ছ্বওয়াল নিজেই নিজেকে করো না কেনো? যে ২০/৩০/৪০ বছর হয়ে গেছে এখনো কেনো মুত্তাকী হতে পারি নাই। আরে রোজাদার মহান আল্লাহ তায়ালা উনার ওয়াদা তো সত্য, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তো বলেই দিছেন (لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) তুমি মুত্তাকী হবেই যদি তোমার রোজা সঠিক হয়ে থাকে। ৪০ বছর রোজা রাখার পরেও যদি তুমি মুত্তাকী হতে না পারো তাহলে তোমাকে বুঝতে হবে যে তোমার ঐসকল রোজা রোজাই ছিলনা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নিকট।

আচ্ছা তাহলে এখন সঠিক রোজা কিভাবে রাখতে হবে? এই বিষয়ে বাজারি ওয়াজি মুল্লারা বেহুদা অনেক জিনিস বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে, উদাহরণস্বরূপ রোজা অবস্থায় মিছওয়াক (ব্রাশ) করনা, কুল্লি করতে খুব সাবধানতা অবলম্বন করো, সামান্য এদিক সেদিক হলে, এক ফুটা পানি ভিতরে গেলে তোমার রোজা শেষ। হাটুর উপর কাপড় তুলনা, রক্ত বের হলে রোজা মাকরূহ হয়ে যাবে, রক্ত দিলে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। এইসব বেহুদা জিনিসে রোজাদারদের পেরেশান করে রাখে রমজান মাস এলেই। অহে উলামায়ে ছু, নফছের পূজারী ওয়াজিরা তোমরাই বলো, তোমরাতো সারা দুনিয়াকে রোজা রাখাচ্ছো ৩০/৪০ বছর ধরে, তুমরা কি মুত্তাকী হয়ে গেছ? তোমাদের তাক্বওয়া এটাই যে মাদ্রসায় ছাত্রদের বলাৎকার করা? পর্দা ফরজ মেয়েদের চেহারার দিকে তাকিয়ে দ্বীন শিখীয়ে তৃপ্তি পাওয়া, কতো মুল্লাই ধরা খাচ্ছে কওমি মাদ্রাসায়, আহলে হাদীছদের মধ্যে। এমনকি রোজা রাখা অবস্থায় এরূপ কাজ ভারত, পাকিস্থান, বাংলাদেশে ভরা। কোথায় তোমাদের তাক্বওয়া। নোংরামি করো তোমরা, লম্বা লম্বা দাঁড়ি বুক পর্যন্ত রেখে। অথচ রোজার ব্যপারে হাক্বিকতে কিছুই জাননা তোমরা, না মহান আল্লাহ তায়ালা, না আল-ক্বুরআন, না রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লামের ব্যপারে তোমরা জানো।

আচ্ছা বাদবাকি বাদ দিলাম, রোজা কিভাবে রাখে তোমরা কি তা জানো? রোজা রাখা খালি ক্ষুধার্ত, পিপাসার্থ থাকার নাম নয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি একারণেই রোজা রাখাচ্ছেন যেনো তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাও। এখন তোমার তো জানাই নাই যে এটা কোন রোজা যেটা তোমাকে মুত্তাকী বানিয়ে দেবে। জিজ্ঞাসা করো নিজেকে, ৪০ বছর রোজা রাখতেছো, এতে আবার খুব গর্ব বিদ্যমান, আমিতো বুঝ হওয়ার পরে কখনো রোজা কাজাই করিনি। আজ পর্যন্ত একটি রোজাও আমি ছাড়িনি। আচ্ছা তো এটা বলো মুত্তাকী হয়ে গেছ?

বাস্তবে তারা চিন্তা করবে মুত্তাকী? এটা আবার কি জিনিস? তাহলে শোন জাহিল ক্বুরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলতেছেনঃ (يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) হে মুমিনগণ তোমাদের উপর রোজা ফরয করে দেয়া হয়েছে, যেমনি করে ফরজ করা হয়েছিলো, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, আশা করা যায় (এই রোজার মাধ্যমে) তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাবে। (ছুরাহ আল-বাক্বরা ২/১৮৩) কিন্তু বাবাজীদের কোন খবরই নাই, টেলিভিশনে আরামে বসে রোজার ফযিলত বয়ান করেই যাচ্ছে, অথচ হাক্বিকতে রোজা কি এর খবর নাই।

তোমার রোজা তোমাকে মুত্তাকী তখনই বানাবে যখন তোমার নফছের ত্বহারাত হবে, অর্থাৎ নফছ পাক পবিত্র হয়ে যাবে। ক্ষুধার্ত থাকলে নফছে ত্বহারাত আসেনা, ক্ষুধার্ত থাকলে নফছ দুর্বল হয়, ত্বহারাত তখনই আসে যখন ক্বলব থেকে অবিরত নূর বর্ষিত হয় নফছের মধ্যে। তোমরা পরিক্ষা করে দেখতে পারো, যখন তুমি ক্ষুধার্ত থাকবে তখন তোমার হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাবে, যত বেশী ক্ষুধার্ত হবে, তত বেশী পরিষ্কার হৃদস্পন্দন শুনতে পাবে। খুব জিকির অনুভব করবে। এটা চিন্তা করা দরকার ক্ষুধার্তের সাথে ক্বলবের কি সম্পর্ক। ক্ষুধার সাথে ক্বলবের সম্পর্ক এই যে, যখন তুমি ক্ষুধার্ত থাকবে তখন ক্বলবে নার কম আসবে, আর নার কম মানে ক্বলব তখন বেশী কাজ করবে। আর এটাই অটোমেটিক হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। আর যখন জাকিরে ক্বলবি রোজা রাখে, তখন সে দেখবে যে রোজায় তার হৃদস্পন্দন নিজে নিজেই বেড়ে যাচ্ছে। আর যখন জিকির বেড়ে যাবে তখন সেটাই হবে তার রোজার বিনিময়। এদিকে রাতে ঈশার পরে তুমি যখন তারাবীতে মনোযোগ দিয়ে ক্বুরআন শুনবে হুজুরি ক্বলব দিয়ে, সেটাও নূর উৎপন্ন করে নফছে যাচ্ছে, কিন্তু আজকের যারা ক্বারি তারা কি করে? এরা নিজেরাই একেক্টা খিঞ্জীর খোদ আল-ক্বুরআন অনুসারে, যাদের কেবল মুখে থেকে ক্বুরআনের শব্দ আসে হাক্বিকি ক্বুরআন নয়। পুরো সিস্টেমটাই উল্টো হয়ে গেছে আজ, অথচ সিস্টেম এমন হওয়া উচিৎ ছিলো যে, ইমাম, মুয়াজ্জিন, মুতাওয়াল্লি সবাই জাকিরে ক্বলবী হবে, তারাবী পড়নে ওয়ালাও জাকিরে ক্বলবী হবে, অতএব যখন ৪০ জাকিরে ক্বলবী মুছল্লি মসজিদে ক্বিয়াম করবে জাকিরে ক্বলবী মুয়াজ্জিনের সাথে জাকিরে ক্বলবী ইমামের পিছে, তখন এক আউলিয়ার ক্ষমতা আসবে ঐ পুরো এলাকার মধ্যে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার রহমত বর্ষিত হবে, কারণ মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই বলেছেনঃ (إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ) নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমত মুহছিন লোকদের নিকটেই থাকে। (ছুরাহ আল-আ’রফ ৭/৫৬) তাই ঐ এলাকায় অবস্থানকারী জাকিরে ক্বলবীদের কারণে মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত নাযিল হবে। অথচ তুমি তো শ দুইশো খিঞ্জীর নিয়ে নামাজ পড়তেছ, এরা নামাজে ঢুকার আগেই বের হওয়ার চিন্তা করে, ইমামকে দ্রুত পড়ার চাপ দেয়, ছুন্নতের খিলাফ রকেট গতিতে রুকু সেজদা করে মাক্বামে গ্বফিলে ফায়েজ হয়, আর একারণেই এরা খিঞ্জিরের চেয়েও নিকৃষ্ট হালে যায়, এরা যে খিঞ্জীর মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই বলে দিয়েছেনঃ (فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ) (মর্মান্তিক) দুর্ভোগ রয়েছে সেসব (মুনাফিক) নামাজিদের জন্যে, যারা নিজেদের নামাজের ব্যপারে গ্বফিল। (ছুরাহ আল-মা’উন ১০৭/৪-৫) শুধু কি তাই? রকেট সাইন্সে নামাজ পড়ে যে নামাজী মুনাফিক হবে এর স্পষ্ট বর্ননা দিচ্ছেন মহান আল্লাহ তা’য়ালা এইভাবেঃ (اِنَّ الۡمُنٰفِقِیۡنَ یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰهَ وَ هُوَ خَادِعُهُمۡ ۚ وَ اِذَا قَامُوۡۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوۡا كُسَالٰی ۙ یُرَآءُوۡنَ النَّاسَ وَ لَا یَذۡكُرُوۡنَ اللّٰهَ اِلَّا قَلِیۡلًا مُّذَبۡذَبِیۡنَ بَیۡنَ ذٰلِكَ ٭ۖ لَاۤ اِلٰی هٰۤؤُلَآءِ وَ لَاۤ اِلٰی هٰۤؤُلَآءِ ؕ وَ مَنۡ یُّضۡلِلِ اللّٰهُ فَلَنۡ تَجِدَ لَهٗ سَبِیۡلًا) নিশ্চয়ই মুনাফিকেরা মহান আল্লাহ তা’য়ালাকে ধোঁকা দিতে চায়; কিন্তু মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাদেরকে তাদের (নিজেদের) ধোঁকায়ই ফেলে রাখেন। আর যখন তারা নামাজে দাঁড়ায়, তখন খুব (গ্বফিল থাকে) অলসভাবেই দাঁড়ায়, তারা মূলত রিয়া করে; উপরন্তু (নামাজে) মহান আল্লাহ তা’য়ালাকে তারা খুব কমই স্বরন করে থাকে। (ছুরাহ আন-নিছা ৪/১৪২-১৪৩) আর যারা গ্বফিল তাদের ব্যপারেও মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলতেছেনঃ (أُولٰٓئِكَ كَالْأَنْعٰمِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولٰٓئِكَ هُمُ الْغٰفِلُونَ) (আসলে) এরা হচ্ছে পশুর মতো, বরং (কোন কোন ক্ষেত্রে) পশুর চাইতেও অধিক পথভ্রষ্ট, (আর) এসব লোকেরাই হচ্ছে গ্বফিল। (ছুরাহ আল-আ’রফ ৭/১৭৯) অতএব মহান আল্লাহ পাক উনার ফজলে করম কই থেকে আসবে, উল্টা লা’য়নাত বর্ষিত হচ্ছে তোমাদের উপর।

ক্বলবকে মুনাওয়্যার করতে হয়। যতক্ষন ক্বলব মুনাওয়্যার না হবে ততক্ষন রোজার ফায়দা, ফযিলত হাসিল করতে পারবেনা কস্মিনকালে। কারণ মহান আল্লাহ পাক কালামুল্লাহ শরীফে বলেছেনঃ অহে (মানুষেরা) তোমরা যারা ঈমানদার তাদের অপর রোজা ফরয করে দেয়া হয়েছে, (কেনো?) আশা করা যায় (এই রোজার মাধ্যমে) তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাবে। (يٰٓأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) হে মুমিনগণ তোমাদের উপর রোজা ফরয করে দেয়া হয়েছে, আশা করা যায় (এই রোজার মাধ্যমে) তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাবে। (ছুরাহ আল-বাক্বরা ২/১৮৩) তোমাদের উপর ফরজ করেছি, তোমাদের আগের নবীদের উম্মতদের উপরও ফরজ করেছিলাম, আর এই ফরজ করার কারণে হিসেবে কি বলছেন আল্লাহ পাক? (لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) আমি তোমাদের মুত্তাকী বানাতে চাই। এবার তুমিই বলো হে ৩০/৪০ বছরি রোজাদার তুমি কি মুত্তাকী হয়ে গেছ? যদি না হয়ে থাকো তাহলে এর মানে দাঁড়ালো তোমার ঐসব রোজা বরবাদ হয়ে গেছে। বরবাদ একারণেই হয়েছে যে রোজা মূলত নফছে ত্বহারাত আনে, নফছকে পাক করে। আর নফছকে পাক করতে হলে শুধু ক্ষুধার্ত থাকা জরুরি নয় বরং নূর প্রয়োজন, যা তোমার ক্বলবেই নাই। একারণে তুমি মুত্তাকীই হওনি।

এটা না বোঝার মতো কঠিন কোন বিষয় নয়। ওয়াশিং মেশিনে তুমি ময়লা কাপড় ঢুকালে, পানিও আসছে, কিন্তু ওয়াশিং পাউডার, ট্যাবলেট দাওনি, তাহলে ওয়াশিং ম্যাশিন চল্লেও কি তোমার পোশাক পরিষ্কার হয়ে যাবে? তুমি ফরজ নামাজ পড়েছ, তারাবি পড়েছ, ১৫/১৬ ঘন্টা উপোষ ও করেছ, অথচ ক্বলবে নূর নাই যা গুনাহকে পরিষ্কার করে থাকে। কিভাবে নফছ পাক হবে? যদি ক্বলব ওয়াশিং মেশিন হয় তাহলে নূর তার ওয়াশিং পাউডার, ট্যাবলেট। আর ঐ নূর ব্যতীত নফছ জীবনেও পাক হবেনা, নফছে ত্বহারাত আসবেনা। এটাই আমাদের বুঝতে হবে।

মূলত রমজান শরীফ মাস মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য একটি সাশ্রয়ী জান্নাতি প্যাকেজ, এমন এক রিলিফ যার বুনিয়াদি মাক্বছ্বুদই হলো নফছের, ক্বলবের ত্বহারাত অর্থাৎ পাক পবিত্রতা। কারণ ক্বুরআনুল কারিমে রোজার যে ব্যাখ্যা মহান আল্লাহ পাক দিয়েছেন সেখানে প্রথমেই তিনি বলেছেন, “হে ঈমানদারেরা আমি তোমাদের উপর রোজা ফরজ করে দিয়েছি, এর পরে বলছেন, তোমাদের পূর্বে যে সকল উম্মত এসেছে তাদের উপরও ফরজ ছিলো, এরূপ ভাবার অবকাশ নাই যে এই মেহনৎ কেবল তোমাদের ঘাড়েই একা দিয়েছি, বরং তোমাদের পূর্বে র উম্মতদের উপরও ফরজ ছিলো। তোমাদের জন্যেও করেছি। আর শেষে এটাও বলেছেন যে একারণেই যে যেনো তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাও। অর্থাৎ তোমাদের নফছের, ক্বলবের ত্বহারাত হোক, তোমরা পাক পবিত্র হয়ে যাও।

এখন, স্পষ্টতই, এটা কোন প্রকাশ্য শারীরিক পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে ছিল না। যদি এটি শারীরিক পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে হতো তবে তোমাকে বছরের ১১ মাস গোসল করতে হতো না, এবং শুধুমাত্র রমজান শরীফ মাস আসলেই গোসল করতে হতো।

অতএব, স্পষ্ট হয়ে গেলো এটি শারীরিক পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে নয় বরং আধ্যাত্মিক পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বলা হচ্ছে। এখন এই আধ্যাত্মিক পরিচ্ছন্নতার মানে কি? এর মানে হল তাজকিয়ায়ে নফছ। এখন নফছের খাবার হলো নার, যা আমাদের কৃত গুনাহের মাধ্যমে, স্বামী-স্ত্রীর সহবাসের মাধ্যমে, আমাদের খাবারের মাধ্যমে, আমরা যে পানি পান করি তার মাধ্যমে, এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেও এসে থাকে। একারণেই রমজান শরীফ মাসে আমরা ছাহরী থেকে ইফতার পর্যন্ত শারীরিক সম্পর্ক করিনা, কোন কিছুই খাই না বা পান করি না।

তো এতে আমাদের লাভ কি?

অন্ততপক্ষে, নফছ এক্টিভ হলে যে নার পয়দা হতো, সেটা সহবাস সহ খাদ্য ও পানি গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের শরীরে যে নার প্রবেশ করতো সেই নারের সরবরাহ ১৫/১৬ ঘণ্টা (বা তার বেশি) সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। তবে অন্যান্য উত্স থেকে তো নার এখনও আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। সে জন্য আমরা তাছবিহ-তাহলিল পাঠ করি, নামাজ পড়ি, ক্বুরআন তেলাওয়াত করি, রাতে তারাবী পড়ি, নফল ইবাদত করি। আর এই ক্বুরআন তেলাওয়াত, রাতের তারাবী পড়া, মূলত এই সমস্ত কিছুর মূল উদ্দেশ্যই হল নূর আমাদের ক্বলবে উৎপন্ন হবে এবং আমাদের নফছের মধ্যে প্রবেশ করবে যাতে ক্বলবে ও নফছে ত্বহারাত আসে। অথচ না আমাদের ক্বলব জারি না আমরা তাজকিয়ায়ে নফছের উপর আমল করি, তাই যত পরহেজগারিই হাসিল করি, ১৫/১৬ ঘণ্টা ক্ষুধার্ত থেকে, রাতভর তারাবীতে ক্বিয়াম করে, কিন্তু যদি এই সমস্ত কিছুর বিনিময়েও নূর আমাদের মধ্যে প্রবেশ না করে, তবে আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা কিন্তু বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। এবং ভুলে যেওনা না যে, মহান আল্লাহ তায়ালা যাদের সম্বোধন করেছেন তারা হলেন মুমিন। আর মুমিনের বর্ণনা কিন্তু ক্বুরআন শরীফের মধ্যে বিদ্যামান, কিছু আ’রব বেদুঈন ইছলাম কবুল করার পরে নিজেদের মুমিন বলে বেড়াতে লাগলো, বাকি যারা প্রথম সারীর ছ্বহাবায়ে কেরাম রদ্বিআল্লাহু আনহুম ছিলেন, উনাদের বড় ইজ্জত ছিলো, কারণ উনারা হাক্বিকতে মুমিন ছিলেন, তো এইসব কতিপয় আ’রবি ইমান আনার পরে যখন বলে বেড়াতে লাগলেন আমরাও মুমিন হয়ে গেছি কালিমা পড়ে, নামাজ পড়ে, রোজা রেখে, তখন মহান আল্লাহ তা’য়ালা অতি দ্রুত আয়াত নাযিল করে দিলেন এই বলে যেঃ (قَالَتِ الْأَعْرَابُ ءَامَنَّا ۖ قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلٰكِن قُولُوٓا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمٰنُ فِى قُلُوبِكُمْ) (এই আরব) বেদুঈনরা বলছে, আমরাও মুমিন? (পেয়ারে হাবীব ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম) আপনি এদের বলে দিন, না, তোমরা (এখনও) মুমিন নও, তোমরা (বরং) বলো, ইছলাম কবুল করে মুছলিম হয়েছ মাত্র, এখনো তো ঈমান তোমাদের ক্বলবে প্রবেশই করেনি (অথচ তোমরা নিজেদের মুমিন বলে বেড়াচ্ছো)। (ছুরাহ আল-হুজুরাত ৪৯/১৪)

তো আজকের যামানার মুছলমান কি এইসব চিন্তা করে যে, তার ক্বলবে ঈমান প্রবেশ করে ফেলেছে? অতএব নামাজ পড়ার আগে, রোজা রাখার আগে, ক্বুরআন পড়ার আগে জেনে নাও যে, তুমি একজন ধার্মিক মুমিন হয়েছ কি না? শুধুমাত্র মৌখিকভাবে কলিমা শরীফ কয়েক দফা আওড়ালেই মুমিন হওয়া যায়না। ক্বুরআন শরীফ অনুসারে মুমিন হওয়ার পূর্বশর্ত হল ক্বলবে ঈমানকে প্রবেশ করানো। (وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمٰنُ فِى قُلُوبِكُمْ) এখনো তো ঈমান তোমাদের ক্বলবে প্রবেশই করেনি (অথচ তোমরা নিজেদের মুমিন বলে বেড়াচ্ছো)।

সুতরাং তোমার বোঝা উচিত যে তুমি যদি একজন মুমিন না হও তবে তুমি রোজার ফায়দা লাভের যোগ্যই নও। তুমি যদি একজন ধর্মপ্রাণ মুমিন না হও তাহলে তোমার নামাজ পড়ার কোনো যোগ্যতাই নেই, তুমি নামাজ আদায় করতে পারো কিন্তু এর থেকে কোনো ফায়দা লাভ করবে না। আর এটাইতো হচ্ছে তোমার সাথে। পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ হয়েছেঃ (إِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰى عَنِ الْفَحْشَآءِ وَالْمُنكَرِ ۗ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই নামাজ (মানুষকে সমস্ত) অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখেন। আর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার জিকিরই সর্বশ্রেষ্ঠ (ঈবাদাত)। (ছুরাহ আল-আনকাবুত ২৯/৪৫) এটা ক্বুরআন শরীফ বলছেন আমি নই। এখন আমরা যদি আজ আমাদের নিজেদের দেশ ও প্রতিবেশি ভারত ও পাকিস্তানের মুছলিমদের অবস্থার দিকে তাকাই, তাহলে তোমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, লম্বা দাড়ি রাখে, মাদ্রাসার শিক্ষক, ইমাম নামাজ পড়ায় একই সাথে অল্প বয়স্ক ছেলেদের শ্লীলতাহানি, ব্যাভিচারও করে। ৪/৫ বছরের মেয়েদের ধর্ষণ করে বসে ভয় দেখিয়ে। টেলিভিশন সিনেমা নাটক দেখে, খেলাধুলায় মত্ত থাকে কথিত শরীরচর্চার নামে। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করছি, তোমরা তো চল্লিশ বছর ধরে নামাজ পড়ছো, তা তোমাদের নামাজ কেন তোমাদেরকে এসব খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখেনি? একারণেই রাখেনি কারণ তুমি মুমিন না হয়েই নামাজ আদায় করেছ এবং তোমার নামাজ তোমাকে ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। এটা কালামুল্লাহ শরীফই বলছেন। কালামুল্লাহ শরীফে বলা হয়েছেঃ (فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ الَّذِينَ هُمْ يُرَآءُونَ) (মর্মান্তিক) দুর্ভোগ রয়েছে সেসব (মুনাফিক) নামাজিদের জন্যে, যারা নিজেদের নামাজের ব্যপারে গ্বফিল। (ছুরাহ আল-মা’উন ১০৭/৪-৫) অতএব, রোজা ও নামাজের সুফল সেই ভোগ করবে, যে প্রথমে ঈমানদার হবে, একজন পাক্কা মুমিন হয়ে যাবে। আর মুমিন হওয়া কি?

মহান আল্লাহ পাক উনার নাম কালিমা তাইয়্যিব এর সার আল্লাহ-হু হৃদস্পন্দনের মধ্যে মিশে যাবে, তুমি চুপ থাকলেও হৃদস্পন্দন আল্লাহ-হু আল্লাহ-হু করতে থাকবে, তুমি দাঁড়িয়ে থাকো ক্বলব আল্লাহ-হু আল্লাহ-হু করতে থাকবে, বসে থাকো কিংবা ঘুমিয়ে যাও ক্বলব আল্লাহ-হু আল্লাহ-হু করতে থাকবে। তোমার শরীর জাগতিক কাজে নিয়োজিত, আর তোমার ক্বলব আল্লাহ-হু আল্লাহ-হু করছে। এখন তুমি মুমিন হয়ে গেছ, এখন তুমি নামাজ পড়, দেখবে দুনিয়ার কোন বিষয়ে এখন আর খেয়াল যাচ্ছে না। এখন তুমি নামাজ পড়ো। দেখবে পার্থিব চিন্তায় তুমি আর বিভ্রান্ত হচ্ছ না।