Saturday, March 28, 2026

তুর্কী নেটোতে থাকা নিয়ে খারেজীদের আপত্তির দাঁতভাঙ্গা জবাব

খারেজীরা তুর্কীবিরোধি যত অপপ্রচার চালায় তার মধ্যে অন্যতম অপপ্রচার হলো কোন মুসলমান কান্ট্রির ন্যাটোতে থাকা নাকি হারাম। তাই আজকে আমরা ক্বুরআন-ছুন্নাহ, মানতেক ও ইতিহাসের আলোকেই দেখবো যে এটা কি হারাম নাকি খারেজীদের ছুন্নীদের প্রতি বিদ্বেষ।

প্রথমে নেটো কি সেটা সম্পর্কে জেনে নেইঃ

নেটো কী, নেটোর ইতিহাসঃ নেটো হলো “North Atlantic Treaty Organization” - ১৯৪৯ সালে গঠিত একটি সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা জোটএর মূল ভিত্তি Washington Treaty, বিশেষ করে Article 5: এক সদস্যের উপর সশস্ত্র হামলাকে সবার উপর হামলা হিসেবে ধরা হতে পারেনেটোর নিজস্ব ভাষায়, এটি একটি political and military allianceদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সোভিয়েত চাপ ও নিরাপত্তা-সংকটের প্রেক্ষাপটে এটি গঠিত হয় (অর্থাৎ এর সাথে ধর্মিয় কোন কিছুই মূলে জড়িত না, কাফেররা যখন অন্য কাফেরদের থেকে নিজেদের বাঁচাতে ঝোট করছে তখন তাদের এক প্রতিবেশী ঐ কাফের দেশের থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে সামরিক চুক্তি করেছে অন্য কাফেরের সাথে।)

নেটোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে নিরাপত্তা-ছাতা তৈরি করাপরে শীতল যুদ্ধ, ওয়ারশ চুক্তি, বলকান সংকট, আফগানিস্তান, সন্ত্রাসবিরোধী সামুদ্রিক টহল, মিসাইল প্রতিরক্ষা - এসবের মাধ্যমে এর ভূমিকা বিস্তৃত হয়গ্রিস ও তুর্কী ১৯৫২ সালে এতে যোগ দেয়

তুর্কী কেন নেটোতে যোগ দিয়েছিল, আর এখনো কেন আছেঃ

তুর্কীর নিজের সরকারি বয়ান অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কী “free world” ও Western Bloc-এর পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-তে নেটো সদস্য হয়তুর্কী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট বলছেঃ তখন থেকে নেটো তুর্কীর defence and security policy-এর cornerstoneতারা আরও বলছে, Article 5-এর collective defence guarantee তুর্কীর জন্য অত্যন্ত মূল্যবান নিরাপত্তা-গ্যারান্টি

ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এর পেছনে যে বড় কারণ ছিল, সেটা ছিলো সোভিয়েত হুমকিআমেরিকার State Department-এর ইতিহাসভিত্তিক নথি দেখায়, কোরিয়ান যুদ্ধের পর সদস্যরা দ্রুত প্রতিরক্ষা-সমন্বয়ের দিকে যায়, এবং ১৯৫২ সালে গ্রিস-তুর্কীকে অন্তর্ভুক্ত করেঅর্থাৎ Cold War security calculus এখানে কেন্দ্রীয় ছিল

সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এটাই যে, তুর্কী নেটোতে ঢুকেছিল মূলত নিরাপত্তা-গ্যারান্টির জন্য; বিশেষত সোভিয়েতের চাপের মুখে একা না থাকার জন্যআর এখনো আছে কারণ নেটো এখনও তুর্কীর জন্য প্রতিরক্ষা-ছাতা, পশ্চিমা সামরিক interoperability, গোয়েন্দা-সহযোগিতা, মিসাইল-প্রতিরক্ষা, এবং আঞ্চলিক deterrence-এর বড় প্ল্যাটফর্মএই “কেন এখনো আছে” প্রশ্নের সরকারি উত্তরও প্রায় একইঃ নেটো এখনো তুর্কীর নিরাপত্তা নীতির মূল স্তম্ভ

বর্তমানে নেটোতে তুর্কীর অবস্থান কী?

বর্তমানে তুর্কী নেটোর ভিতরে peripheral actor না; central military actorনেটো মহাসচিব ২৫ নভেম্বর ২০২৪-এ প্রকাশ্যে বলেছেন, তুর্কীর নেটোতে second-largest army আছে, এবং দেশটি জোটের collective security-তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেএকই বক্তব্যে তিনি তুর্কীর KFOR-এ troop contribution এবং Kosovo mission command-এর জন্যও প্রশংসা করেছেন

প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকেও তুর্কীর অবস্থান শক্তNATO Allied Land Command (LANDCOM) ইজমিরে অবস্থিত; এটি নেটোর land forces-এর প্রধান স্থায়ী সদরগুলোর একটিএছাড়া NATO-র ওয়েবসাইট অনুযায়ী, Basat Öztürk মে ২০২৫ থেকে আবার তুর্কীর Permanent Representative to NATO হিসেবে দায়িত্বে আছেনঅর্থাৎ তুর্কী শুধু সদস্য নয়; HQ-hosting, high-level representation, troop contribution সব ক্ষেত্রেই ভেতরের সারির খেলোয়াড়

অপারেশনাল দিক থেকে তুর্কী এখনো সক্রিয়Kosovo-তে NATO-led KFOR এখনো চলছে; নেটো ২০২৬ সালের আপডেটে বলছে KFOR ১৯৯৯ থেকে শান্তি-সহায়ক অপারেশন হিসেবে কাজ করছেআর ২০২৪ সালে নেটো মহাসচিব তুর্কীর KFOR command role ও troops contribution বিশেষভাবে তুলে ধরেন

আরও তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, মার্চ ২০২৬-এ তুর্কী জানিয়েছে NATO ballistic missile defence সম্পূর্ণ defensive প্রকৃতির এবং deterrence/defence-এর অংশএকই সময় Reuters জানায়, ইরান যুদ্ধ-সংকটের মধ্যে নেটো তুর্কীতে অতিরিক্ত Patriot প্রতিরক্ষা মোতায়েন করেছেঅর্থাৎ তুর্কী নেটোর southeastern flank-এ বাস্তব frontline security state হিসেবেও কাজ করছে

নেটোর কোন যুলুমে তুর্কী শরীক ছিল?

এখানে খুব সাবধানে সিদ্ধান্ত দিতে হবেঃ “নেটোর সদস্য” হওয়া আর “নেটোর প্রতিটি বিতর্কিত বা জালিম অপারেশনে সমান শরীক” হওয়া এক কথা নয়

সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে যে ক্ষেত্রগুলোতে তুর্কীর অংশগ্রহণ প্রমাণিত, সেগুলো হলো বলকান, আফগানিস্তান, ভূমধ্যসাগরীয় maritime missions, এবং লিবিয়া ২০১১তুর্কী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেই বলছে, ১৯৯৫ থেকে বলকানে NATO-led সব অপারেশনে তুর্কী অংশ নিয়েছে - Bosnia-র IFOR/SFOR, Kosovo-র KFOR, Macedonia-র Essential Harvest, Amber Fox, Allied Harmony ইত্যাদিতে

Kosovo-র ক্ষেত্রে নেটো বলছে KFOR হলো peace-support operation, যার UN Security Council Resolution 1244 ভিত্তি আছেকিন্তু একই সঙ্গে নেটো এটাও বলে যে KFOR-এর আগে ৭৮ দিনের air campaign হয়েছিল Milosevic regime-এর বিরুদ্ধেতাই সমালোচকেরা ১৯৯৯-এর Kosovo air war-কে বিতর্কিত বলে, আর সমর্থকেরা humanitarian intervention বলেতুর্কী KFOR-এ অংশ নিয়েছে এটি নিশ্চিত; তবে এটিকে “নিরেট যুলুম” নাকি “জননিরাপত্তা/শান্তিরক্ষা” - এটি রাজনৈতিক-নৈতিক বিতর্কের বিষয়

আফগানিস্তানে তুর্কী কি শরীক ছিল?

নেটো বলছে Resolute Support Mission ছিল non-combat mission, Afghan government-এর আমন্ত্রণে এবং UNSC Resolution 2189-এর আলোকে পরিচালিত training/advisory missionআবার নেটোর ২০২১-এর এক ঘোষণায় দেখা যায়, তুর্কী command position-ও নিয়েছিল Kabul-এ training, advising, assisting-এর ক্ষেত্রেসুতরাং “আফগানিস্তানে তুর্কীর ভূমিকা ছিল, তবে সেটি নেটোর ভাষায় non-combat/train-advise-assist ভূমিকাসমালোচক চাইলে বলবে দখলদার কাঠামোকে sustain করেছে; সমর্থক বলবে security assistance দিয়েছে

লিবিয়াতে ২০১১ সালে তুর্কী সরাসরি অংশ নিয়েছিল যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর একটিReuters জানায়, তুর্কী চারটি frigate, একটি submarine, এবং একটি support ship নেটোর arms embargo enforcement-এ দেয়নেটোর Libya chronology-তেও দেখা যায় ৩১ মার্চ ২০১১ থেকে NATO sole command নেয়, এবং NATO air and sea assets military actions শুরু করেআরও গুরুত্বপূর্ণ, NATO-র নিজস্ব বিবরণে AC Izmir, Turkey air operations management-এ ছিলঅতএব লিবিয়ার নেটো অপারেশনে তুর্কীর institutional ও operational involvement ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না

তবে এখানেও সূক্ষ্মতা আছেতুর্কী শুরু থেকেই বলেছিল, অপারেশন UN mandate-এর বাইরে যাওয়া চলবে না২২ মার্চ ২০১১-র রিপোর্টে দেখা যায়, আঙ্কারা no-fly zone বা NATO role তখনই মানবে যখন তা UN framework-এর ভেতরে থাকবে; এর বাইরে গেলে legitimised হবে না, এ কথা আহমেত দাভুতোওঁয়লু বলেছিলেনসুতরাং তুর্কী লিবিয়ায় অংশ নিয়েছে, কিন্তু শুরু থেকেই সীমা-আপত্তিও তুলেছে

ভূমধ্যসাগরে Operation Active Endeavour-এও তুর্কী সরাসরি naval assets দিয়েছেনেটো নিজেই বলছে, Greece, Italy, Spain, Turkey মূল অবদানকারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ছিলএটি মূলত counter-terror maritime surveillance mission ছিল, তাই একে “যুলুম” বলা স্বয়ংক্রিয় নয়; কিন্তু এটি নেটো ঝোট হিসেবে সামরিক কাঠামোতে তুর্কীর সক্রিয় থাকার বিষয়

অন্যদিকে ২০০৩-এর Iraq invasion-কে নেটোর নামে তুর্কীর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা অনেকে করে যা মোটেও সঠিক নয়ঐ আক্রমণ ছিল U.S.-led coalition invasion, NATO operation নয়আরও গুরুত্বপূর্ণ, ১ মার্চ ২০০৩-এ তুর্কী পার্লামেন্ট U.S. troops-কে তুর্কী ভূখণ্ড ব্যবহার করে northern front খোলার অনুমতি দেয়নি, এটি Congressional/CRS ও U.S. State Department chronology-তে নথিভুক্তকাজেই “ইরাক আক্রমণে তুর্কী নেটোর মাধ্যমে সরাসরি শরীক” এ বক্তব্য অন্তত ২০০৩ invasion প্রসঙ্গে সঠিক নয়তবে পরে NATO Training Mission-Iraq বা advisory missions-এ আলাদা প্রশ্ন আছে; সেগুলো invasion নয়, post-war training/advisory কাঠামো

সুতরাং এতক্ষণের আলাপের নির্ভুল সারসংক্ষেপ এইঃ

তুর্কী নেটোর কিছু সামরিক ও নিরাপত্তা অভিযানে অবশ্যই শরীক ছিল, বিশেষত Balkans, Afghanistan, Libya, Mediterranean maritime missions-এ লিবিয়া ২০১১-তে তুর্কীর অংশগ্রহণ পরিষ্কার, যদিও আঙ্কারা UN সীমা অতিক্রমের বিরুদ্ধে আপত্তিও জানিয়েছিল Kosovo ও Afghanistan-এ তুর্কী অংশ নিয়েছে, কিন্তু সেগুলোকে “যুলুম” না “security/peace support” বলা হবে এটি নৈতিক-রাজনৈতিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন; তথ্যগতভাবে অংশগ্রহণ ছিল ২০০৩ Iraq invasion-এ তুর্কী নেটোর নামে invasion partner ছিল না; বরং তুর্কী পার্লামেন্ট U.S. ground deployment প্রত্যাখ্যান করেছিল

নেটোকে কি তুর্কী দ্বীনি কোন জোট বলে দাবী করে?

না মোটেও না, তবে তুর্কী নেটোতে কেন আছে এর উত্তর আবেগে নয়, রাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী দিতে হবে। নেটো ১৯৪৯ সালের collective defence alliance, আর তুর্কী ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-এ এতে যোগ দেয়তুর্কীর নিজের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজও বলে নেটো তাদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতির cornerstone, কাজেই তুর্কী নেটোতে ঢুকেছিল নিরাপত্তার জন্য, কুফরকে মহব্বত করে নয়; আর এখনো আছে কারণ এখনও বিকল্প শক্তিশালী মুসলিম প্রতিরক্ষা-জোট দাঁড়ায়নি

তাই নেটোতে থাকা মানেই “কুফরের গোলামি” এটা একটা প্রপাগান্ডাময় স্লোগান, শরীয়তের কোন দলিল নাতুর্কী ১৯৫২ সালে নেটোতে গেছে নিরাপত্তার কারণে, আজও আছে একই কারণেসব অপারেশনে সমান শরীকও নয়, যেমনঃ ইরাক ২০০৩-এ পার্লামেন্টই U.S. northern front ঠেকিয়েছেআবার লিবিয়ায় সীমিত নৌ-ভূমিকা ছিল সেটা লুকানোর কিছুই নাই। তাই সত্য কথা হলোঃ তুর্কীর নেটো সদস্যতা রাজনৈতিক-সামরিক ইজতিহাদ; প্রতিটি case আলাদা বিচার হবে, স্লোগান দিয়ে না

এবার আসি শরীয়ত অনুসারে তুর্কীর নেটো ঝোটে থাকা কি হারাম?

প্রথমতো আমরা আজকে দেখতে পাচ্ছি অ্যামেরিকা ইছরাঈল কিভাবে ইরানের প্রতি যুলুম নির্যাতন চালাচ্ছে। আজকে তুর্কী যদি নেটোর ঝোট না হতো তাহলে সামরিক খাতে উদীয়মান মুছলিম রাষ্ট হিসেবে তুর্কীর আজকের হালে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে যেতো। আজকে অ্যামেরিকা-ইছরাঈল ইরানের আগে তুর্কীকেই আক্রমণ করতো। এমনিতেই তারা তুর্কী ইকোনমির উপর যে আগ্রাসন বিগত ১ যুগ থেকে চালাচ্ছে তার পরেও তুর্কী যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তার শুকরিয়া আদায় করে মুছলমানদের শেষ করা যাবেনা। তুর্কী না থাকলে সারা দুনিয়ায় মুছলমানদের আর কোন দেশ থাকতোনা একটা সাউন্ড বা টু শব্দ করার মতো।

তুর্কী কি চুক্তি করে ভুল করেছে? না ভেঙ্গে গাদ্দারি করছে?

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (إِلَّا ٱلَّذِينَ عَـٰهَدتُّم مِّنَ ٱلْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنقُصُوكُمْ شَيْــًٔا وَلَمْ يُظَـٰهِرُواْ عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوٓاْ إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَىٰ مُدَّتِهِمْ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُتَّقِينَ) তবে মুশরিকদের মধ্য থেকে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছ, অতঃপর তারা তোমাদের সাথে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, তোমরা তাদেরকে দেয়া চুক্তি তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ করনিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাক্বীদের ভালবাসেন (ছুরাহ আত-তাওবাহ ৯:৪) চিন্তা করা যায়? মুশরিকদের সাথে যত দিনের চুক্তি ছিল সেই সময় পর্যন্ত তাদেরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছেকেননা, তারা চুক্তি পালন করেছিল এবং তার পরিপন্থী কোন আচরণ প্রদর্শন করেনিএই জন্য মুছলিমদের পক্ষেও চুক্তি পালনকে জরুরী করা হয়েছিল কেবল জরুরী না, এই আচরণকে মহান আল্লাহ তায়ালা মুত্তাক্বীদের আচরণ বলে উল্লেখ করেছেন যাদের তিনি মুহব্বত করেন। আর জ্ঞানপাপীরা বলে হারাম। আউজুবিল্লাহ। এছাড়াও মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ (لَّا يَنْهَـٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمْ يُقَـٰتِلُوكُمْ فِى ٱلدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَـٰرِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوٓاْ إِلَيْهِمْ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِينَ) দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদেরকে নিষেধ করছেন নানিশ্চয় মহান আল্লাহ তায়ালা ন্যায় পরায়ণদেরকে ভালবাসেন (ছুরাহ আল-মুমতাহীনা ৬০:৮) অর্থাৎ যেসব কাফের মুছলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কারেও অংশগ্রহণ করেনি, আলোচ্য আয়াত শরীফে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার ও ইনছাফ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছেন্যায় ও সুবিচার তো প্রত্যেক কাফেরের সাথেও জরুরীএতে যিম্মি কাফের, চুক্তিতে আবদ্ধ কাফের এবং শক্র কাফের সবাই সমান

তাছাড়া মহান আল্লাহ তায়ালা উনার স্পষ্ট হুকুম পাওয়া যায়ঃ (وَ اِنۡ جَنَحُوۡا لِلسَّلۡمِ فَاجۡنَحۡ لَهَا وَ تَوَكَّلۡ عَلَی اللّٰهِ ؕ اِنَّهٗ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ) আর যদি তারা (শত্রুরা) শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে আপনিও শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ুন এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ওপর ভরসা রাখুন। (ছুরাহ আল-আনফাল ৮:৬১) 

অন্যদিকে ইছলামী তারীখেও এ কথা পাওয়া যে, সব অমুছলিমের সঙ্গে সবধরনের সামরিক সহযোগিতাকে শুরু থেকেই এককথায় বাতিল করা হয়নি; বরং বাস্তব যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতা সংঘটিত হয়েছে। প্রাচীন ইছলামী ইতিহাসভিত্তিক আধুনিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে ইরাক বিজয়ের শুরুতেই, বিশেষত আল-বুয়াইব যুদ্ধের প্রসঙ্গে, খ্রিষ্টান আরবদের একাংশ মুছলিম বাহিনীর সঙ্গে সাসানীয় পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। ওয়াদাদ আল-ক্বাদী তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেন যে ১৩ হিজরিতে আল-মুছান্না ইবনু হারিছাহর অভিযানে দুইজন খ্রিষ্টান আরব নেতা ও তাদের লোকজন মুছলিমদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেয়; এমনকি যুদ্ধ চলাকালে তাগলিব গোত্রের একদল খ্রিষ্টান তরুণ এসে বলে, “আমরা আরবদের সঙ্গে মিলে পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব,” এবং তাদের মধ্যকার এক খ্রিষ্টান তরুণ মিহরানকে হত্যা করে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ আছে। সুতরাং তারীখের আলোকে এটুকু স্পষ্ট যে, দারুল-ইছলামের স্বার্থে, বৃহত্তর শত্রুর বিরুদ্ধে, এবং মুছলিম নেতৃত্বের অধীনে অমুছলিমদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার নজির ইছলামী ইতিহাসে একেবারেই অজানা বা অভূতপূর্ব কিছু নয়। 

অতএব, বর্তমান যুগে কোন মুছলিম রাষ্ট্র যদি নিজের অস্তিত্ব, সীমান্ত, জনগণ, প্রতিরক্ষা-সামর্থ্য ও কৌশলগত নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অমুছলিম শক্তির সঙ্গে সামরিক চুক্তি বা প্রতিরক্ষামূলক জোটে প্রবেশ করে, তাহলে শুধু “অমুছলিমদের সঙ্গে জোট” এই একক কারণে তাকে সরাসরি হারাম, খিয়ানত, বা কুফরির সহযোগিতা বলা শরঈ ও তারীখি, উভয় দিক থেকেই দুর্বল অবস্থান। বরং সঠিক বিচার হবে এই ভিত্তিতে যে, ঐ জোটের উদ্দেশ্য কী, তা কি আত্মরক্ষা ও deterrence-এর জন্য, নাকি জুলুম ও আগ্রাসনের জন্য; মুছলিম রাষ্ট্রটি কি প্রতিটি অপারেশনে নির্বিচারে শরীক, নাকি নিজের সীমা, আপত্তি ও জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে শর্তসাপেক্ষে অবস্থান করছে। এই পার্থক্য না করে স্লোগানধর্মী ফতোয়া দেওয়া ঈলমি আমানতের পরিপন্থী।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: