Sunday, March 29, 2026

পবিত্র উমরাহ পালনের নিয়ম কানুন ও ফজিলত

উমরাহ শব্দের অর্থ হচ্ছে, সম্মানিত পাক-পবিত্র স্থানের জিয়ারত করা। ইছলামী শরী’য়াহ-এর পরিভাষায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নির্ধারিত নিয়মে ইহরামে প্রবেশ করে বাইতুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ, ছ্বফা-মারওয়া উনাদের মধ্যে ছা’য়ই এবং হলক্ব বা ক্বছর করার মাধ্যমে যে ঈবাদাত সম্পন্ন করা হয়, তাকে উমরাহ বলা হয়। সম্মানিত দ্বীন ইছলামে উমরাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঈবাদাত।

হানাফী মাযহাবের মাযহাবী মত অনুযায়ী জীবনে একবার উমরাহ করা ছুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। তবে কেউ উমরাহ-এর ইহরামে প্রবেশ করে উমরাহ শুরু করলে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হয়ে যায়।

একজন মুছলিম হিসেবে কেনো আপনাকে উমরাহ করতে হবে?

উমরাহ-এর ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ (وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ) অর্থাৎ, তোমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যেই হাজ্জ ও উমরাহ পূর্ণ করো। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৯৬) অর্থাৎ, হাজ্জ ও উমরাহ-এর ইহরামে প্রবেশ করার পর তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হয়ে যায়, যদিও তা নফল হিসেবে শুরু করা হয়ে থাকে।

মহান আল্লাহ পাক উৎসাহ দিলেও উমরাহ-এর সবচেয়ে বড় বেনিফিট হচ্ছে গুনাহের কাফফারা। দেখুন হাদীছ শরীফে এসেছেঃ (كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ) অর্থাৎ, “প্রত্যেক আদম সন্তানই গুনাহগার, আর গুনাহগারদের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছেন তাওবাকারীগণ।” হযরত আনাছ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি এ কথা বলেছেন। (তিরমিযী শরীফ ২৪৯৯)

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি আরো বলেছেনঃ (وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَذَهَبَ اللَّهُ بِكُمْ وَلَجَاءَ بِقَوْمٍ يُذْنِبُونَ فَيَسْتَغْفِرُونَ اللَّهَ فَيَغْفِرُ لَهُمْ) অর্থাৎ, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, আমি উনার ক্বছম করে বলছি, তোমরা যদি গুনাহ না করতে, তবে অবশ্যই মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের সরিয়ে এমন এক সম্প্রদায় নিয়ে আসতেন, যারা গুনাহ করতো, অতঃপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নিকট ক্ষমা চাইতো এবং তিনি তাদের ক্ষমা করে দিতেন। (মুছলিম শরীফ ২৭৪৯)

এর মানে এই নয় যে মানুষকে গুনাহের ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে বা ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহে লিপ্ত হওয়ার প্রেরণা যোগানো হচ্ছে। বরং আমরা এমন এক জাতি, যাদের দ্বারা গুনাহ হয়ে যায়। তাই গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার দিকে ফিরে আসা, তাওবাহ করা এবং পরিশুদ্ধ হওয়াই এর শিক্ষা।

আর সামর্থ্যবানদের জন্য গুনাহের কাফফারা ও মাগফিরাত লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পন্থা হলো মহান আল্লাহ পাক উনার ঘরের জিয়ারতে চলে যাওয়া। কেননা হযরত আবু হুরাইরাহ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি বলেছেনঃ (الْعُمْرَةُ إِلَى الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُمَا) অর্থাৎ, “এক উমরাহ থেকে অন্য উমরাহ উভয়ের মধ্যবর্তী গুনাহসমূহের কাফফারা।” (বুখারী শরীফ ১৭৭৩, মুছলিম শরীফ ১৩৪৯)

উমরাহ যারা করতে চান, তাদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সময় হচ্ছে পবিত্র রমজান শরীফের মাস। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার থেকে ছ্বহীহ হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, রমজান শরীফ মাসের উমরাহ ছ্বওয়াবের দিক দিয়ে হাজ্জের সমান। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ (فَإِنَّ عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ تَقْضِي حَجَّةً مَعِي) অর্থাৎ, “রমজান শরীফ মাসে উমরাহ পালন করা আমার সঙ্গে হাজ্জ করার সমতুল্য।” এখানে ছ্বওয়াবের সমতার কথা বলা হয়েছে, এর দ্বারা ফরজ হাজ্জের দায়িত্ব আদায় হয়ে যায় না। (বুখারী শরীফ ১৮৬৩, মুছলিম শরীফ ১২৫৬)

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার চারটি উমরাহ পালনের কথা হাদীছ শরীফে পাওয়া যায়ঃ (اعْتَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرْبَعَ عُمَرٍ كُلُّهُنَّ فِي ذِي الْقَعْدَةِ إِلَّا الَّتِي كَانَتْ مَعَ حَجَّتِهِ: عُمْرَةً مِنَ الْحُدَيْبِيَةِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ وَعُمْرَةً مِنَ الْعَامِ الْمُقْبِلِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ وَعُمْرَةً مِنَ الْجِعْرَانَةِ حَيْثُ قَسَّمَ غَنَائِمَ حُنَيْنٍ فِي ذِي الْقَعْدَةِ وَعُمْرَةً مَعَ حَجَّتِهِ) উক্ত চারটি উমরাহর মধ্যে প্রথম তিনটি তিনি জিলক্বদ শরীফ মাসে করেছেন এবং চতুর্থটি উনার বিদায় হাজ্জের সঙ্গে করেছেন। প্রথমটি ছিল হুদায়বিয়ার উমরাহ, যা ষষ্ঠ হিজরীতে সংঘটিত হয়। মুশরিকদের বাধার কারণে তিনি বাইতুল্লাহ শরীফে হাজির হয়ে উমরাহর আমলসমূহ সম্পাদন করতে পারেননি; হুদায়বিয়াতেই হাদী যবেহ ও হলক্ব করে ইহরাম থেকে হালাল হন। দ্বিতীয় উমরাহ পরবর্তী বছর, সপ্তম হিজরীতে জিলক্বদ শরীফ মাসে পালন করেন। তৃতীয় উমরাহ অষ্টম হিজরীতে হুনাইনের গনীমত বণ্টনের পর জি’রানা থেকে ইহরাম বেঁধে জিলক্বদ শরীফ মাসে পালন করেন। আর চতুর্থ উমরাহটি দশম হিজরীতে উনার বিদায় হাজ্জের সঙ্গে ছিল। (মিশকাত শরীফ ২৫১৮)

রমজান শরীফ মাসে উমরাহ করার এত ফজিলত থাকা সত্ত্বেও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি রমজান শরীফ মাসে উমরাহ করেননি। তবে এর নিশ্চিত কারণ কোনো ছ্বহীহ হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়নি। ইমাম ইবনে হাজার আসক্বালানী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি তিনি ফাতহুল বারীতে সম্ভাব্য হিকমত হিসেবে নকল করেছেন যে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি রমজান শরীফে উমরাহ-এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য ঈবাদাতে মশগুল থাকতেন এবং উম্মতের উপর কষ্টের আশঙ্কাও ছিল। কেননা তিনি রমজান শরীফে উমরাহ করলে উম্মতও তা পালনে তৎপর হয়ে উঠতো এবং রোজার সঙ্গে উমরাহর কষ্টও বহন করতে হতো। সুতরাং এটিকে নিশ্চিত কারণ না বলে সম্ভাব্য হিকমত হিসেবেই বলা সঠিক। এছাড়াও বছরে তিনি একটির বেশি উমরাহ করেছেন বলে কোনো ছ্বহীহ হাদীছ শরীফ এখনো আমার চোখে পড়েনাই।

শুধু উমরাহই নয়, যেকোনো ঈবাদাত বা য়া’মলের পূর্বে তার ব্যাপারে পূর্ণ অবগত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈবাদাতের ক্ষেত্রে যে ঈবাদাত করা হবে, সেটা কোন ক্যাটাগরির এবং এর মধ্যে ফরজ, ওয়াজিব, ছুন্নাহ ও মুস্তাহাব কি কি বিদ্যমান রয়েছে, তা জানা আবশ্যক। নতুবা য়া’মল করার পর দেখা যাবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মিসিং বা ছুটে গেছে, তখন আর আফসোসের সীমা থাকবে না।

পবিত্র উমরাহ-এর নিয়তে ইহরামে প্রবেশ করার পর থেকে উমরাহ সম্পাদন পর্যন্ত যা যা নিষিদ্ধঃ

মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ (ٱلْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ ۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي ٱلْحَجِّ ۗ وَمَا تَفْعَلُوا مِنْ خَيْرٍ يَعْلَمْهُ ٱللَّهُ ۗ وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقْوَىٰ ۚ وَٱتَّقُونِ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ) অর্থাৎঃ পবিত্র হাজ্জের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি মাস রয়েছে। (১) অতঃপর যে ব্যক্তি এসব মাসের মধ্যে নিজের উপর পবিত্র হাজ্জ আবশ্যক করে নেয়, তার জন্য হাজ্জের মধ্যে রফাছ তথা স্ত্রী সহবাস ও যৌনাচারসংক্রান্ত অশ্লীলতা জায়েয নয়। (২) কোনো ফুছূক্ব তথা নাফরমানীর কাজ জায়েয নয়। (৩) এবং ঝগড়া-বিবাদ করাও জায়েয নয়। (৪) আর তোমরা যে সৎকাজই করো, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি তা জানেন। (৫) আর তোমরা পাথেয় সঙ্গে নিয়ে নাও। (৬) নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে তাক্বওয়া। (৭) আর আমাকে ভয় করতে থাকো, হে জ্ঞানীগণ! (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৯৭)

আয়াত শরীফের ব্যাখ্যা নিচে বর্ণনা করা হলোঃ

(১) যারা পবিত্র হাজ্জ অথবা উমরাহ করার নিয়তে ইহরামে প্রবেশ করেন, তাদের উপর এর সকল অনুষ্ঠানক্রিয়াদি সম্পন্ন করা ওয়াজিব হয়ে পড়ে। উমরাহর জন্য হাজ্জের মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস নির্ধারিত নেই। বছরের প্রায় সকল সময় উমরাহ আদায় করা যায়। তবে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ৯ জিলহাজ্জ য়ারাফাহর দিন এবং তার পরবর্তী ১০, ১১, ১২ ও ১৩ জিলহাজ্জ, এই পাঁচ দিনে নতুন করে উমরাহ-এর ইহরামে প্রবেশ করা মাকরূহ তাহরীমী। তবে পূর্ব থেকেই উমরাহ-এর ইহরাম বহাল থাকলে এই দিনগুলোতে সেই উমরাহ-এর আমল সম্পন্ন করার হুকুম এর অন্তর্ভুক্ত নয়।

কিন্তু পবিত্র হাজ্জের জন্য নির্দিষ্ট মাস ও সময় রয়েছে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেছেনঃ (ٱلْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ) অর্থাৎ, “পবিত্র হাজ্জের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি মাস রয়েছে।” আর তা হচ্ছে শাওয়াল শরীফ, জিলক্বদ শরীফ এবং জিলহাজ্জ শরীফের প্রথম দশ দিন।

আমার মতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা যখন স্পষ্টভাবে (فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلْحَجَّ) অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি এসব মাসের মধ্যে নিজের উপর হাজ্জ আবশ্যক করে নেয়” ইরশাদ করেছেন, তখন হাজ্জের নির্ধারিত মাসসমূহ শুরু হওয়ার পূর্বে হাজ্জের ইহরামে প্রবেশ করা জায়েয নয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহুমা তিনি বলেছেনঃ (مِنَ السُّنَّةِ أَنْ لَا يُحْرِمَ بِالْحَجِّ إِلَّا فِي أَشْهُرِ الْحَجِّ) অর্থাৎ, “ছুন্নাহ হচ্ছেন, হাজ্জের মাসসমূহ ব্যতীত হাজ্জের ইহরামে প্রবেশ না করা।”

তবে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী হাজ্জের মাসের পূর্বে হাজ্জের ইহরামে প্রবেশ করলে তা হাজ্জের ইহরাম হিসেবেই সংঘটিত হবে, যদিও এভাবে সময়ের পূর্বে হাজ্জের ইহরামে প্রবেশ করা মাকরূহ।

২) (رَفَث) ‘রফাছ’ একটি ব্যাপক শব্দ, যাতে স্ত্রী সহবাস ও তার আনুষঙ্গিক কর্ম, স্ত্রীর সঙ্গে কামভাবপূর্ণ ঘনিষ্ঠ আচরণ, এমনকি প্রকাশ্যভাবে সহবাস সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনাও অন্তর্ভুক্ত। ইহরাম অবস্থায় এসবই নিষিদ্ধ।

হাদীছ শরীফে এসেছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি বলেছেনঃ (مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ) অর্থাৎ, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টির জন্য এমনভাবে পবিত্র হাজ্জ সম্পাদন করবে যে, তাতে রফাছ ও ফুছূক্ব ছিল না, সে তার হাজ্জ থেকে এমন অবস্থায় ফিরে আসবে, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিলেন। (বুখারী শরীফ ১৫২১, মুছলিম শরীফ ১৩৫০)

৩) (فُسُوق) ‘ফুছূক্ব’-এর শাব্দিক অর্থ বের হয়ে যাওয়া। আল ক্বুরআন শরীফের পরিভাষায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নির্দেশ লঙ্ঘন বা নাফরমানী করাকে ফুছূক্ব বলা হয়। সাধারণ অর্থে যাবতীয় পাপই ফুছূক্বের অন্তর্ভুক্ত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে ‘ফুছূক্ব’-এর ব্যাখ্যায় ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজসমূহের কথাও বর্ণিত হয়েছে। স্থান অনুসারে এ ব্যাখ্যাও যুক্তিযুক্ত। কারণ সাধারণ পাপ শুধু ইহরামের অবস্থায় নয়, বরং সবসময়ই নিষিদ্ধ। আর যেসব কাজ সাধারণ অবস্থায় হালাল, কিন্তু ইহরামের কারণে নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ

(ক) স্ত্রী সহবাস ও এর আনুষঙ্গিক যাবতীয় আচরণ, এমনকি প্রকাশ্যভাবে সহবাস সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা।

(খ) স্থলভাগের জীব-জন্তু শিকার করা অথবা শিকারে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করা।

(গ) নখ বা চুল কাটা।

(ঘ) সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করা।

এ চারটি বিষয় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুহরিমের জন্য প্রযোজ্য। অবশিষ্ট দুটি বিষয় পুরুষের সঙ্গে সম্পৃক্তঃ

(ঙ) পুরুষের জন্য শরীরের আকৃতি অনুযায়ী তৈরি পোশাক পরিধান করা।

(চ) পুরুষের জন্য মাথা ও মুখমণ্ডল আবৃত করা।

আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে স্ত্রী সহবাস সাধারণ অর্থে ‘ফুছূক্ব’-এর অন্তর্ভুক্ত হলেও মহান আল্লাহ তা’য়ালা একে “রফাছ” শব্দের দ্বারা স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা ইহরাম অবস্থায় এ কাজ থেকে বিরত থাকার বিশেষ গুরুত্ব প্রতীয়মান হয়। কেননা, ইহরাম অবস্থায় স্ত্রী সহবাস অন্যান্য বহু নিষিদ্ধ কাজের তুলনায় অধিক গুরুতর; এমনকি কোনো কোনো অবস্থায় এর দ্বারা পবিত্র হাজ্জই ফাছিদ হয়ে যায়।

কোনো হাজ্জ পালনকারী ব্যক্তি য়ারাফাতে উকূফের পূর্বে স্ত্রী সহবাস করলে তার পবিত্র হাজ্জ ফাছিদ হয়ে যাবে। তবে সে ইহরাম ত্যাগ করে ফিরে যেতে পারবে না; বরং ফাছিদ অবস্থাতেই হাজ্জের অবশিষ্ট সকল আমল সম্পন্ন করতে হবে এবং পরবর্তীতে সেই হাজ্জ পুনরায় ক্বদ্বা করতে হবে। হানাফী ফিক্বহ অনুযায়ী এর জন্য একটি ছাগল বা ভেড়া দম দিতে হবে। পক্ষান্তরে য়ারাফাতে উকূফের পর সহবাসের হুকুম এবং তার দমের পরিমাণ ভিন্ন। এজন্যই মহান আল্লাহ তা’য়ালা (فَلَا رَفَثَ) বলে ‘রফাছ’-কে স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করেছেন।

৪) (جِدَال) ‘জিদাল’ শব্দের অর্থ একে অপরকে যুক্তি ও কথার মাধ্যমে পরাস্ত করার চেষ্টা করা। এ জন্য বড় ধরনের বিবাদকে (جِدَال) বলা হয়। শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। ফুছূক্ব ও জিদাল সর্বাবস্থাতেই নিষিদ্ধ, কিন্তু পবিত্র হাজ্জ ও ইহরাম অবস্থায় এসব গুনাহের গুরুতরতা আরো বৃদ্ধি পায়। পবিত্র দিনসমূহে এবং পবিত্র স্থানে, যেখানে কেবল মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ঈবাদাতের উদ্দেশ্যে আগমন করা হয়েছে এবং মুখে ‘লাব্বাইকাল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ বলা হচ্ছে, সেখানে ঝগড়া-বিবাদ, গালিগালাজ ও অন্যকে কষ্ট দেয়া অত্যন্ত অন্যায় ও চরম নাফরমানীর কাজ। (মা’রিফুল ক্বুরআন)

৫) ইহরামকালে নিষিদ্ধ বিষয়াদি বর্ণনা করার পর মহান আল্লাহ তা’য়ালা হিদায়াত দিয়েছেন যে, পবিত্র হাজ্জের সময় শুধু নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং এই সুবর্ণ সুযোগকে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার যিকির, ঈবাদাত ও অন্যান্য সৎকাজে নিয়োজিত করতে হবে। তোমরা যে নেক য়া’মলই করো না কেন, মহান আল্লাহ তা’য়ালা তিনি তা জানেন এবং তার উত্তম প্রতিদান দান করবেন।

৬) এ আয়াত শরীফে ঐ সমস্ত ব্যক্তিরও সংশোধনী পেশ করা হয়েছে, যারা পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহর উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় পাথেয় ছাড়া বের হয়ে পড়ে এবং একে তাওয়াক্কুল বলে দাবি করে, অথচ পরে অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে বাধ্য হয়। তাদের উদ্দেশ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, পবিত্র হাজ্জের উদ্দেশ্যে ছ্বফর করার পূর্বে প্রয়োজনীয় পাথেয় সঙ্গে নেয়া উচিত। এটা তাওয়াক্কুলের অন্তরায় নয়। বরং মহান আল্লাহ পাক প্রদত্ত হালাল আসবাব নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী গ্রহণ করে অতঃপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার উপর পূর্ণ ভরসা করাই তাওয়াক্কুলের সঠিক রূপ।

৭) (وَاتَّقُونِ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নাফরমানী, পাকড়াও ও আযাব থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তাক্বওয়া অবলম্বন করো। কেননা, যারা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নির্দেশ পালন করে না এবং উনার নিষেধ থেকে বিরত থাকে না, তারা নিজেদেরকে উনার পাকড়াও ও আযাবের সম্মুখীন করে। (ছুরাহ আল-বাক্বারাহ ২:১৯৭)

স্মরণীয় যে, পবিত্র হাজ্জের নিয়তে ইহরামে প্রবেশ করার পর হাজ্জ সম্পাদন পর্যন্ত যেসব বিষয় নিষিদ্ধ, তার মূল নিষেধগুলো উমরাহ-এর ইহরামে প্রবেশ করার পর থেকেও প্রযোজ্য থাকে। পার্থক্য হলো, আমার মতে হাজ্জের ইহরাম কেবল হাজ্জের নির্ধারিত মাসসমূহের মধ্যেই বাঁধা যায়। পক্ষান্তরে উমরাহ বছরের প্রায় সকল সময় করা যায়। তবে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ৯ জিলহাজ্জ য়ারাফাহর দিন এবং তার পরবর্তী ১০, ১১, ১২ ও ১৩ জিলহাজ্জ, এই পাঁচ দিনে নতুন করে উমরাহ-এর ইহরামে প্রবেশ করা মাকরূহ তাহরীমী। তবে পূর্ব থেকেই উমরাহ-এর ইহরাম বহাল থাকলে এই দিনগুলোতে সেই উমরাহ-এর আমল সম্পন্ন করার হুকুম এর অন্তর্ভুক্ত নয়। উমরাহ-এর ইহরাম নিয়ত ও তালবিয়ার মাধ্যমে শুরু হয়ে তাওয়াফ, ছা’য়ই এবং হলক্ব বা ক্বছরের মাধ্যমে তাহাল্লুল পর্যন্ত বহাল থাকে।

আমরা এখন অবগত যে, পবিত্র উমরাহ শুরু করার জন্য ইহরামে প্রবেশ করা অপরিহার্য। ইহরামের হুকুম-আহকাম কার্যকর হয় উমরাহর নিয়ত ও তালবিয়ার মাধ্যমে ইহরামে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই। তবে ইহরামে প্রবেশ করার পূর্বে কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুবা হাজ্জ বা উমরাহর বাহ্যিক আমল ছ্বহীহভাবে সম্পন্ন করলেও ঈবাদাতের পূর্ণ বরকত ও কবুলিয়ত থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।

প্রাক হাজ্জ/উমরাহ প্রস্তুতি

√ আন্তরিকতার সঙ্গে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হাজ্জ/উমরাহ করার নিয়ত করুন।

√ আপনার অতীতের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হন এবং ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে বিরত থাকার দৃঢ় নিয়ত করুন।

√ হাজ্জ/উমরাহর জন্য আপনার ব্যয় হালাল উপার্জন থেকে হচ্ছে তা নিশ্চিত করুন।

√ অতীতের কাযা নামায, রোজা, যাকাত অথবা অন্য কোনো ফরজ দায়িত্ব বাকি থাকলে তা আদায় করার ব্যবস্থা ও দৃঢ় সংকল্প করুন।

√ মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে যারা আপনার দ্বারা জীবনে চলার পথে কষ্ট বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের কাছে ক্ষমা চান।

√ প্রয়োজন থাকলে উত্তরসূরিদের জন্য লিখিতভাবে একটি উইল/অছিয়ত তৈরি করুন এবং যথাযথ সাক্ষীর মাধ্যমে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুন।

√ এমন এক ছ্বফরের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করুন, যেখানে আপনার অনুভূতি হবে আপনি সমস্ত দুনিয়াবী ব্যস্ততা থেকে নিজেকে সরিয়ে কেবল মহান আল্লাহ পাক উনার দিকেই ধাবিত হচ্ছেন।

√ হাজ্জ/উমরাহ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় মাছআলা জানুন এবং কিভাবে তা পালন করতে হয় তা ভালোভাবে শিখে নিন।

√ হাজ্জ ও উমরাহর প্রতি হুব্ব, মুহব্বত ও শওক্ব বৃদ্ধি করুন।

√ শারীরিকভাবে ফিট হওয়ার চেষ্টা করুন। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং যথাসময়ে ঘুম ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন।

√ হাজ্জ/উমরাহর জন্য প্রয়োজনীয় দ্বোআ ও যিকর আগে থেকেই শেখা শুরু করুন।

√ আপনার পরিবারের যারা আপনার উপর নির্ভরশীল, তাদের প্রয়োজনীয় রিযিক ও খরচের ব্যবস্থা করে যান।

√ কোনো ঋণ থাকলে সম্ভব হলে তা পরিশোধ করুন অথবা পাওনাদারের সঙ্গে পরিশোধের ব্যবস্থা সুস্পষ্ট করে যান।

√ আপনার পাসপোর্ট চেক করুন। সৌদি আরবে প্রবেশের তারিখ থেকে পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ৬ মাস অবশিষ্ট থাকা নিশ্চিত করুন।

√ আপনার সমস্ত প্রয়োজনীয় নথির কপি সঙ্গে রাখুন।

√ নিয়মিত কোনো ঔষধ সেবন করলে প্রেসক্রিপশনসহ পর্যাপ্ত ঔষধ সঙ্গে নিন।

√ পর্যাপ্ত পরিমাণ পথখরচ নিয়ে বের হোন। নগদ অর্থ ও কার্ড ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিরাপদ স্থানে সঙ্গে রাখুন।

√ ইহরামের পূর্বে লজ্জাস্থান ও বগলের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করুন। প্রয়োজন হলে চুল ও দাড়ি পরিপাটি করুন এবং নখ কাটুন।

√ গোসল করুন। পুরুষরা ইহরামে প্রবেশ করার পূর্বে শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারেন, তবে ইহরামের কাপড়ে ইচ্ছাকৃতভাবে সুগন্ধি লাগাবেন না।

√ ইহরামের পোশাক পরে নিন, বিশেষ করে পরে পরিবর্তন করতে অসুবিধা হওয়ার আশঙ্কা থাকলে।

√ ছ্বফরের জন্য দুই রকত নফল নামায আদায় করতে পারেন। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এই দ্বোআ পাঠ করুনঃ (بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ) বিছমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু য়ালাল্লাহি, লা হাওলা ওয়া লা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

√ নিজেকে মানসিকভাবে স্থির রাখতে একই সময়ে অপ্রয়োজনীয় একাধিক কাজে ব্যস্ত হওয়া থেকে বিরত থাকুন।

√ নিজের মধ্যে থাকা অহংকার, হিংসা ও বিদ্বেষ যথাসম্ভব পরিত্যাগ করুন। যাদের প্রতি মনে কষ্ট রয়েছে, তাদের ক্ষমা করে দিন এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার ক্ষমার প্রত্যাশা করুন।

√ পবিত্র ভূমীতে অপ্রয়োজনে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে সময় নষ্ট না করে যিকির, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত, নফল নামায, দু’য়া ও মুরাক্বাবার জন্য নিজের একটি রুটিন তৈরি করুন।

√ ছ্বফরে যথাসম্ভব হালকা থাকুন এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে রাখুন।

√ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য একটি হালকা ব্যাকপ্যাক রাখতে পারেন। যেমন নগদ টাকা, একটি ছোট ক্বুরআন শরীফ, একটি ছোট দ্বোআর বই, হালকা ওজনের জায়নামায, টিস্যু, একটি ছোট উমরাহ/হাজ্জ গাইড এবং হালকা শুকনো খাবার।

√ সময় ও সামর্থ্য থাকলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার এবং সম্মানিত দ্বীন ইছলামের স্মৃতিময় স্থানগুলো যিয়ারত করার পরিকল্পনা করুন।

√ উল্লেখযোগ্য স্মৃতিময় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছেন জান্নাতুল বাক্বী শরীফ, জান্নাতুল মু’য়াল্লা শরীফ, গ্বারে হেরা, গ্বারে ছাওর, বদর শরীফের প্রান্তর, উহুদ শরীফের প্রান্তর এবং রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার বিলাদত শরীফের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসহ অন্যান্য মুবারক ও ঐতিহাসিক স্থানসমূহ।

উমরাহ-এর সহজ ত্বরীক্বাহ

শুধু উমরাহই নয়, যেকোনো ঈবাদাত বা য়া’মলের পূর্বে তার ব্যাপারে পূর্ণ অবগত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈবাদাতের ক্ষেত্রে যে ঈবাদাত করা হবে সেটা কোন ক্যাটাগরির এবং এর মধ্যে ফরজ, ওয়াজিব, ছুন্নাহ ও মুস্তাহাব কি কি বিদ্যমান রয়েছে তা জানা আবশ্যক। নতুবা য়া’মল করার পর দেখা যাবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মিসিং বা ছুটে গেছে, তখন আর আফসোসের সীমা থাকবে না। তাই পবিত্র উমরাহ করতে যেসব বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে জানা প্রয়োজন, এবার আমরা সেগুলো জানবো।

পবিত্র উমরাহ-এর ফরজ, ওয়াজিব, ছুন্নত ও মুস্তাহাব কি কি?

পবিত্র উমরাহ-এর শর্ত ও ফরজ রুকনঃ

১) উমরাহ-এর নিয়ত ও তালবিয়ার মাধ্যমে ইহরামে প্রবেশ করা। হানাফী ফিক্বহ অনুযায়ী তালবিয়ার স্থলে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার তা’যীমমূলক যিকির যুক্ত হলেও ইহরাম সংঘটিত হয়। ইহরাম উমরাহ-এর শর্ত। ইহরাম ব্যতীত উমরাহ সংঘটিত হয় না।

২) ক্বাবা শরীফের পূর্ণ ৭ চক্কর তাওয়াফ করা। আমার মতে তাওয়াফের পূর্ণ ৭ চক্করই ফরজ। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী তাওয়াফের অধিকাংশ, অর্থাৎ ৪ চক্কর ফরজ এবং অবশিষ্ট ৩ চক্কর পূর্ণ করা ওয়াজিব।

পবিত্র উমরাহ-এর ওয়াজিব ও আবশ্যক আমলসমূহঃ

১) মীকাত অতিক্রম করার পূর্বে ইহরামে প্রবেশ করা।

২) ইহরামের নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকা।

৩) তাওয়াফের সময় অজুসহ পবিত্র থাকা।

৪) তাওয়াফের সময় ছতর ঢাকা রাখা।

৫) সামর্থ্য থাকলে পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করা।

৬) তাওয়াফের সময় ক্বাবা শরীফকে বাম পাশে রাখা।

৭) হাতীম শরীফকে তাওয়াফের অন্তর্ভুক্ত রেখে উনার বাইরে দিয়ে তাওয়াফ করা।

৮) তাওয়াফের পর সম্ভব হলে হযরত ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালাম উনার মাক্বামকে নিজের ও ক্বাবা শরীফের মাঝখানে রেখে দুই রকত নামায আদায় করা।

৯) ছ্বফা ও মারওয়া উনাদের মধ্যে ছা’য়ই করা।

১০) ছা’য়ই পূর্ণ তাওয়াফের পরে আদায় করা।

১১) উমরাহর ছা’য়ই ইহরাম বহাল থাকা অবস্থায়, অর্থাৎ হলক্ব বা ক্বছর করে ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার পূর্বে আদায় করা।

১২) ছা’য়ই-এর পূর্ণ ৭ চক্কর সম্পন্ন করা।

১৩) ছা’য়ই ছ্বফা থেকে শুরু করে সপ্তম চক্কর মারওয়ায় শেষ করা।

১৪) সামর্থ্য থাকলে পায়ে হেঁটে ছা’য়ই করা।

১৫) ছা’য়ই সম্পন্ন করার পর হলক্ব অথবা ক্বছর করা।

পবিত্র উমরাহ-এর ছুন্নত ও মুস্তাহাবসমূহঃ

১) ইহরামের পূর্বে গোসল করা, সম্ভব না হলে অজু করা।

২) প্রয়োজন হলে নখ কাটা।

৩) বগল ও নাভির নিচের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা।

৪) চুল ও দাড়ি পরিপাটি করা।

৫) পুরুষদের জন্য গোঁফ ছাঁটা।

৬) পুরুষদের জন্য ইহরামে প্রবেশ করার পূর্বে শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করা।

৭) পুরুষদের জন্য পরিষ্কার বা ধোয়া সাদা ইহরামের কাপড় পরিধান করা।

৮) ইহরামে প্রবেশ করার পূর্বে দুই রকত নামায আদায় করা।

৯) নিয়তের সঙ্গে তালবিয়া পাঠ করে ইহরামে প্রবেশ করার পর বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করা।

১০) অবস্থার পরিবর্তনের সময়, যেমন উঁচু-নিচু স্থানে ওঠানামা, যানবাহনে ওঠা, নামা, ঘুম থেকে ওঠা ইত্যাদি সময়ে তালবিয়া পাঠ করা।

১১) তালবিয়া পাঠের পর ছালাওয়াত তথা দুরুদ শরীফ পাঠ এবং দু’য়া করা।

১২) মক্কা শরীফে প্রবেশের পূর্বে গোসল করা।

১৩) মাছযিদুল হারাম শরীফ উনাতে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা।

১৪) সম্ভব হলে বাবুছ ছালাম দিয়ে প্রবেশ করা।

১৫) ক্বাবা শরীফ উনাকে প্রথম দেখার সময় তাকবীর, তাহলীল ও দু’য়া করা।

১৬) তাওয়াফ হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার বরাবর থেকে শুরু করে প্রত্যেক চক্কর পুনরায় হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার বরাবর এসে পূর্ণ করা।

১৭) পুরুষদের জন্য উমরাহ-এর তাওয়াফের সাত চক্করেই (اِضْطِبَاع) ইদ্বত্বিবা’য় করা। ইদ্বত্বিবা’য় হলো তাওয়াফের সময় পুরুষ মুহরিমের জন্য উপরের চাদর পরার একটি বিশেষ পদ্ধতি। এর ত্বরীক্বাহ হলো, উপরের চাদরটি ডান বগলের নিচ দিয়ে বের করে বাম কাঁধের উপর ফেলে দেয়া, যাতে ডান কাঁধ খোলা থাকে এবং বাম কাঁধ ঢাকা থাকে।

১৮) পুরুষদের জন্য প্রথম ৩ চক্করে রমল করা। রমল হলো তাওয়াফের প্রথম ৩ চক্করে একটু দ্রুত ছোট ছোট পদক্ষেপে, কাঁধ হালকা দুলিয়ে, দৃঢ়ভাবে হাঁটা। এটা দৌড়ানো নয়। প্রথম ৩ চক্কর রমল করার পর বাকি ৪ চক্কর স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন।

১৯) হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনাকে চুম্বন করা।

২০) চুম্বন সম্ভব না হলে স্পর্শ করা।

২১) স্পর্শ সম্ভব না হলে উনার দিকে ইশারা করা।

২২) প্রত্যেক চক্করের শেষে হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার ইস্তিলাম করা। হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার ইস্তিলাম বলতে সংক্ষেপে উনাকে সম্মান জানানোর ছুন্নত য়া’মল বোঝায়। সুযোগ হলে সরাসরি স্পর্শ ও চুম্বন করা, তা সম্ভব না হলে হাত দিয়ে স্পর্শ করে সেই হাত চুম্বন করা এবং এটাও সম্ভব না হলে দূর থেকে উনার দিকে ইশারা করে তাকবীর বলা।

২৩) তাওয়াফে বেশি বেশি যিকির, দু’য়া ও ছালাওয়াত তথা দুরুদ শরীফ পাঠ করা।

২৪) সম্ভব হলে রুকনে ইয়ামানী শরীফ উনাকে স্পর্শ করা।

২৫) রুকনে ইয়ামানী শরীফ উনাকে স্পর্শ করা সম্ভব না হলে উনার দিকে ইশারা না করা।

২৬) তাওয়াফের পর দুই রকত নামায বিলম্ব না করে আদায় করা, যদি নামাযের মাকরূহ সময় না হয়।

২৭) যমযম শরীফের পানি পান করা।

২৮) ছ্বফা ও মারওয়া উনাদের উপর ক্বিবলামুখী হয়ে তাকবীর, তাহলীল ও দু’য়া করা।

২৯) পুরুষদের জন্য দুই সবুজ নিশানের মাঝখানে দ্রুত চলা।

৩০) ছা’য়ই-এর মধ্যে বেশি বেশি যিকির ও দু’য়া করা।

৩১) স্বতন্ত্র উমরাহকারী পুরুষদের জন্য ক্বছরের চেয়ে হলক্ব করা উত্তম। তবে তামাত্তু হাজ্জকারী এবং হাজ্জ নিকটবর্তী হলে উমরাহর পর ক্বছর করা উত্তম, যাতে হাজ্জের পর হলক্ব করা যায়।

মীকাত

প্রত্যেক ঈবাদাতের পূর্বে নিয়ত করা আবশ্যক। উমরাহও যেহেতু ঈবাদাত, সেহেতু এর জন্যও নিয়ত করা বাধ্যতামূলক। আর উমরাহ-এর উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ গমনকারী ব্যক্তিকে নির্ধারিত মীকাত অতিক্রম করার পূর্বেই ইহরামে প্রবেশ করতে হবে। মীকাত অর্থ নির্ধারিত সময় অথবা স্থান। হাজ্জ ও উমরাহ-এর মীকাত দুই ধরনেরঃ

১) মীকাতে জামানী, অর্থাৎ সময়গত মীকাত।

২) মীকাতে মাকানী, অর্থাৎ স্থানগত মীকাত।

হাজ্জের সময়গত মীকাতঃ

মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ (ٱلْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ) অর্থাৎ, পবিত্র হাজ্জের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি মাস রয়েছে। (ছুরাহ আল বাক্বারাহ ২:১৯৭)

হাজ্জের মীকাতে জামানী হচ্ছেনঃ

১) শাওয়াল শরীফ।

২) জিলক্বদ শরীফ।

৩) জিলহাজ্জ শরীফের প্রথম দশ দিন।

আমার মতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা যখন স্পষ্টভাবে (فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلْحَجَّ) অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি এসব মাসের মধ্যে নিজের উপর হাজ্জ আবশ্যক করে নেয়” ইরশাদ করেছেন, তখন হাজ্জের নির্ধারিত মাসসমূহ শুরু হওয়ার পূর্বে হাজ্জের ইহরামে প্রবেশ করা জায়েয নয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহুমা তিনি বলেছেনঃ (مِنَ السُّنَّةِ أَنْ لَا يُحْرِمَ بِالْحَجِّ إِلَّا فِي أَشْهُرِ الْحَجِّ) অর্থাৎ, “ছুন্নাহ হচ্ছেন, হাজ্জের মাসসমূহ ব্যতীত হাজ্জের ইহরামে প্রবেশ না করা।”

তবে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী হাজ্জের মাসসমূহের পূর্বে হাজ্জের ইহরামে প্রবেশ করলে তা হাজ্জের ইহরাম হিসেবেই সংঘটিত হবে, যদিও নির্ধারিত সময়ের পূর্বে এভাবে হাজ্জের ইহরামে প্রবেশ করা মাকরূহ।

অন্যদিকে উমরাহর জন্য হাজ্জের মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস নেই। বছরের প্রায় সকল সময় উমরাহ করা যায়। তবে হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ৯ জিলহাজ্জ য়ারাফাহর দিন এবং তার পরবর্তী ১০, ১১, ১২ ও ১৩ জিলহাজ্জ, এই পাঁচ দিনে নতুন করে উমরাহ-এর ইহরামে প্রবেশ করা মাকরূহ তাহরীমী। তবে পূর্ব থেকেই উমরাহ-এর ইহরাম বহাল থাকলে এই দিনগুলোতে সেই উমরাহ-এর আমল সম্পন্ন করার হুকুম এর অন্তর্ভুক্ত নয়।

স্থানগত মীকাতঃ

হাজ্জ ও উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ গমনকারীদের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি স্থানগত সীমারেখা রয়েছে। মক্কা শরীফে প্রবেশের পথে যে ব্যক্তি যে মীকাত অথবা তার সমান্তরাল সীমা অতিক্রম করবেন, তাকে সেই সীমা অতিক্রম করার পূর্বে ইহরামে প্রবেশ করতে হবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি বলেন, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি মদীনাবাসীর জন্য জুল হুলাইফা, শামবাসীর জন্য জুহফা, নজদবাসীর জন্য ক্বারনুল মানাযিল এবং ইয়েমেনবাসীর জন্য ইয়ালামলামকে মীকাত নির্ধারণ করেছেন। তিনি আরো ইরশাদ করেছেন, এসব মীকাত সংশ্লিষ্ট এলাকার অধিবাসীদের জন্য এবং হাজ্জ বা উমরাহর উদ্দেশ্যে অন্য যেসব মানুষ এসব পথ দিয়ে আসবেন তাদের জন্যও প্রযোজ্য। (বুখারী শরীফ ১৫২৪, মুছলিম শরীফ ১১৮১)

স্থানগত মীকাতসমূহ হচ্ছেনঃ

১) মদীনা শরীফের দিক থেকে আগমনকারীদের জন্য জুল হুলাইফা।

জুল হুলাইফা বর্তমানে আবইয়ারে আলী নামেও পরিচিত। এটি মাছযিদে নববী শরীফ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মদীনা শরীফের অধিবাসী এবং হাজ্জ বা উমরাহর উদ্দেশ্যে এই পথ দিয়ে মক্কা শরীফ গমনকারী সকলেই এখান থেকে অথবা এর সমান্তরাল সীমা অতিক্রমের পূর্বে ইহরামে প্রবেশ করবেন। মক্কা শরীফ থেকে এটি সবচেয়ে দূরবর্তী মীকাত।

২) শাম ও পশ্চিম দিক থেকে আগমনকারীদের জন্য জুহফা।

জুহফা প্রাচীন মীকাত। বর্তমানে সাধারণত রাবেগ এলাকা দিয়ে এই মীকাতের সীমা গ্রহণ করা হয়। শাম, মিশর এবং পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে যেসব মানুষ এই পথ দিয়ে মক্কা শরীফ গমন করেন, তারা জুহফা অথবা এর সমান্তরাল সীমা অতিক্রম করার পূর্বে ইহরামে প্রবেশ করবেন।

৩) নজদের দিক থেকে আগমনকারীদের জন্য ক্বারনুল মানাযিল।

ক্বারনুল মানাযিল বর্তমানে আছ ছাইলুল কাবীর নামে পরিচিত। রিয়াদ, তায়েফ এবং পূর্ব ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যেসব হাজ্জ বা উমরাহকারী এই পথ দিয়ে মক্কা শরীফ গমন করেন, তারা ক্বারনুল মানাযিল অথবা এর সমান্তরাল সীমা অতিক্রম করার পূর্বে ইহরামে প্রবেশ করবেন।

ক্বারনুল মানাযিলের সমান্তরাল পথে ওয়াদী মুহরিম নামক স্থান থেকেও অনেক মানুষ ইহরামে প্রবেশ করেন। এটি তায়েফ থেকে হাদা হয়ে মক্কা শরীফ গমনের পথে অবস্থিত। ওয়াদী মুহরিম স্বতন্ত্র নতুন কোনো মীকাত নয়, বরং ক্বারনুল মানাযিলের সমান্তরাল মীকাত।

৪) ইয়েমেন ও দক্ষিণ দিক থেকে আগমনকারীদের জন্য ইয়ালামলাম।

ইয়ালামলাম একটি উপত্যকার নাম। বর্তমানে ছা’দিয়াহ নামেও এ এলাকা পরিচিত। ইয়েমেন এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে যেসব মানুষ এই পথ অথবা এর সমান্তরাল পথ দিয়ে মক্কা শরীফ গমন করেন, তারা ইয়ালামলাম অতিক্রম করার পূর্বে ইহরামে প্রবেশ করবেন।

বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া অথবা অন্য কোনো দেশের মানুষের মীকাত কেবল দেশের নামের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে না। বিমান, জাহাজ অথবা স্থলপথে তিনি যে মীকাত অথবা তার সমান্তরাল সীমা দিয়ে মক্কা শরীফের দিকে প্রবেশ করছেন, সেই মীকাতই তার জন্য প্রযোজ্য হবে।

৫) ইরাকের দিক থেকে আগমনকারীদের জন্য জাতু ইরক্ব।

হযরত আয়িশাহ ছিদ্দীক্বাহ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহা উনার থেকে বর্ণিত, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি ইরাকবাসীর জন্য জাতু ইরক্বকে মীকাত নির্ধারণ করেছেন। (আবূ দাউদ শরীফ ১৭৩৯)

ছ্বহীহ বুখারী শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে, ইরাকের কুফা ও বছরা বিজিত হওয়ার পর সেখানকার মানুষ হযরত উমর ফারূক্ব রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার কাছে এসে জানালেন যে ক্বারনুল মানাযিল তাদের স্বাভাবিক যাত্রাপথ থেকে দূরে পড়ে। তখন তিনি তাদের পথের ক্বারনুল মানাযিলের সমান্তরাল স্থান নির্ধারণ করে জাতু ইরক্বকে মীকাত হিসেবে নির্ধারিত করেন। (বুখারী শরীফ ১৫৩১)

অতএব জাতু ইরক্বের মীকাতের হুকুম এখনো বহাল রয়েছে। কোনো পথ বর্তমানে কম ব্যবহৃত হওয়া এবং শরঈ মীকাত হিসেবে তার হুকুম বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়।

বিশেষ নোটঃ

হাজ্জ অথবা উমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ গমনকারী কোনো ব্যক্তির জন্য ইহরামে প্রবেশ না করে তার প্রযোজ্য মীকাত অথবা মীকাতের সমান্তরাল সীমা অতিক্রম করা বৈধ নয়। যদি কোনো ব্যক্তি ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করে ফেলেন, তবে তার উচিত মীকাতে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে ইহরামে প্রবেশ করা। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী মীকাতে ফিরে গিয়ে ইহরামে প্রবেশ করলে তার উপর মীকাত অতিক্রম করার কারণে দম ওয়াজিব থাকবে না। কিন্তু মীকাতে ফিরে না গিয়ে মীকাতের ভেতর থেকেই ইহরামে প্রবেশ করলে তার হাজ্জ বা উমরাহ আদায় হয়ে যাবে, তবে মীকাত ইহরাম ছাড়া অতিক্রম করার কারণে একটি দম ওয়াজিব হবে।

বিমানে আগমনকারীদের জন্য দেশের নাম নয়, বিমানের যাত্রাপথ বিবেচ্য। বিমান যে মীকাত অথবা তার সমান্তরাল আকাশসীমা অতিক্রম করবে, তার পূর্বেই নিয়ত ও তালবিয়ার মাধ্যমে ইহরামে প্রবেশ করতে হবে। বিমানের দ্রুতগতির কারণে একেবারে মীকাতের উপর পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা না করে কিছু পূর্বেই ইহরামে প্রবেশ করা নিরাপদ ও উত্তম।

ইহরাম

পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ শুরু করার জন্য ইহরামে প্রবেশ করা অপরিহার্য। ইহরাম সম্পর্কে আমাদের অনেকের সঠিক ধারণা নেই। অনেকেই ইহরামের কাপড়কেই ইহরাম মনে করেন, অথচ ইহরামের কাপড় এবং শরঈ ইহরাম এক জিনিস নয়।

ইহরাম (اَلْإِحْرَامُ) শব্দটি হারাম (حَرَامٌ) শব্দমূল থেকে এসেছে। ইহরামে প্রবেশ করার মাধ্যমে হাজ্জ অথবা উমরাহ পালনকারী ব্যক্তি নিজের উপর এমন কিছু কাজ সাময়িকভাবে হারাম করে নেন, যেগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় হালাল ছিল।

পুরুষদের জন্য ইহরামের পোশাক হলো সাধারণত দুই টুকরা পরিষ্কার সেলাইবিহীন কাপড়। একটি নিম্নাংশে এবং অন্যটি শরীরের উপরের অংশে পরিধান করা হয়। সাদা কাপড় ব্যবহার করা উত্তম। তবে এই দুই টুকরা কাপড় পরিধান করলেই কেউ মুহরিম হয়ে যায় না। এটি কেবল ইহরামের পোশাক।

নারীদের জন্য ইহরামের কোনো নির্দিষ্ট রঙ বা বিশেষ ধরনের পোশাক নেই। তারা স্বাভাবিক শরঈ, ঢিলেঢালা, অস্বচ্ছ ও পর্দাসম্মত পোশাক পরিধান করবেন।

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী নারী মুহরিমা নিকাব দ্বারা এমনভাবে মুখ ঢাকবেন না যাতে কাপড় সরাসরি মুখের সঙ্গে লেগে থাকে। তবে গায়রে মাহরাম পুরুষ সামনে থাকলে মুখ খোলা রাখাও উচিত নয়। এমতাবস্থায় মাথার উপর থেকে কাপড় বা ওড়না এমনভাবে ঝুলিয়ে মুখের সামনে রাখবেন যাতে তা মুখের সঙ্গে না লাগে। এতে ইহরামের বিধান ও পর্দা উভয়ই রক্ষা হবে।

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী নারী মুহরিমার জন্য হাতে গ্লাভস বা হাতমোজা পরিধান করা জায়েয। হাদীছ শরীফে মুহরিমা নারীকে গ্লাভস পরিধান না করার যে নিষেধ এসেছে, হানাফী ফুক্বাহায়ে কিরাম সেটিকে নাহয়ে নাদব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

পুরুষ মুহরিম মাথা ও মুখ আবৃত করবেন না এবং শরীরের আকৃতি অনুযায়ী তৈরি সাধারণ পোশাক, যেমন জামা, পায়জামা ইত্যাদি পোশাকের স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পরিধান করবেন না।

পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহ পালনকারী ব্যক্তি ইহরামে প্রবেশ করার পর নিজের উপর আহলিয়ার সহিত নিছবতে খাছ, কামভাবপূর্ণ আচরণ, মাথা বা শরীরের চুল কাটা, নখ কাটা, সুগন্ধি ব্যবহার, স্থলভাগের শিকারসহ ইহরামের অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়সমূহকে তাহাল্লুল পর্যন্ত হারাম করে নেন।

ইহরাম কিভাবে সংঘটিত হয়?

শুধু পবিত্র হাজ্জ অথবা উমরাহ করার সংকল্প করলেই কেউ মুহরিম হয়ে যায় না। কেউ নিজ দেশ থেকে বের হওয়ার সময় মনে মনে উমরাহ করার সিদ্ধান্ত নিলেও তখনই সে মুহরিম হবে না। একইভাবে শুধু ইহরামের কাপড় পরিধান করলেও ইহরাম সংঘটিত হবে না।

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী হাজ্জ অথবা উমরাহর নিয়তের সঙ্গে তালবিয়া অথবা তালবিয়ার স্থলাভিষিক্ত মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার তা’যীমমূলক যিকির যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ইহরাম সংঘটিত হয়। শুধু অন্তরের নিয়ত দ্বারা ইহরাম সংঘটিত হয় না।

অর্থাৎ উমরাহর নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যক্তি মুহরিম হয়ে যাবেন এবং সেই মুহূর্ত থেকেই ইহরামের সকল নিষেধাজ্ঞা তার উপর কার্যকর হয়ে যাবে।

ইহরামের প্রয়োজনীয়তাঃ নামায শুরু করার জন্য যেমন তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে নামাযে প্রবেশ করা হয় এবং এর ফলে স্বাভাবিক অবস্থার কিছু হালাল কাজ নামাযরত ব্যক্তির জন্য সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তেমনি পবিত্র হাজ্জ ও উমরাহর নিয়ত ও তালবিয়ার মাধ্যমে ইহরামে প্রবেশ করার পর মুহরিম ব্যক্তির জন্যও স্বাভাবিক অবস্থার কিছু হালাল কাজ সাময়িকভাবে হারাম হয়ে যায়।

পবিত্র হাজ্জ বা উমরাহ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি ইহরামের পূর্বে গোসল করবেন, সম্ভব না হলে অজু করবেন। পুরুষরা ইহরামের দুই টুকরা কাপড় পরিধান করবেন এবং নারীরা স্বাভাবিক শরঈ পর্দাসম্মত পোশাক পরিধান করবেন। পুরুষরা ইহরামে প্রবেশ করার পূর্বে শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারেন।

স্মরণীয় যে, অজু থাকা ইহরাম সংঘটিত হওয়ার শর্ত নয়। একইভাবে ইহরামের দুই রকত নামাযও ইহরামের শর্ত নয়। তবে মাকরূহ সময় না হলে ইহরামে প্রবেশ করার পূর্বে দুই রকত নামায আদায় করা ছুন্নত।

কেউ বিমানে চড়ে পবিত্র উমরাহ করতে গেলে ইহরামের কাপড় বিমানে ওঠার পূর্বেই পরে নেয়া আমার মতে উত্তম। বিমানে জায়গা কম থাকে, যাত্রী বেশি থাকে এবং ওয়াশরুম ব্যবহারে অসুবিধা হতে পারে। তাই পূর্বেই গোসল, অজু ও পোশাকের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নেয়া উত্তম। তবে কেবল ইহরামের কাপড় পরিধান করার কারণে তিনি মুহরিম হবেন না।

বিমান মীকাত অথবা তার সমান্তরাল সীমার নিকটবর্তী হওয়ার পূর্বে উমরাহর নিয়ত করবেন। অন্তরে নিয়তই মূল। চাইলে এই দু’য়াটি পাঠ করতে পারেনঃ (اَللَّهُمَّ إِنِّي أُرِيدُ الْعُمْرَةَ فَيَسِّرْهَا لِي وَتَقَبَّلْهَا مِنِّي) আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল উমরাতা ফাইয়াছছিরহা লী ওয়া তাক্বব্বালহা মিন্নী।

অর্থাৎ, হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আমি উমরাহ পালনের ইচ্ছা করেছি, আপনি তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন।

এই দু’য়াটি অন্তরের নিয়তকে মুখে প্রকাশ করার জন্য পড়তে পারেন। অতঃপর তালবিয়া পাঠ করাই স্বাভাবিক ও ছুন্নতী ত্বরীক্বাহ। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী নিয়তের সঙ্গে তালবিয়া অথবা তালবিয়ার স্থলাভিষিক্ত মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার তা’যীমমূলক যিকির যুক্ত হলে ইহরাম সংঘটিত হবে।

অতঃপর বলবেনঃ (لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ عُمْرَةً) লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা উমরাতান।

তারপর তালবিয়া পাঠ করবেনঃ (لَبَّيْكَ اَللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ) লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।

নিয়তের সঙ্গে তালবিয়া পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মুহরিম হয়ে যাবেন। এরপর পুরুষরা তাওয়াফ শুরু করার আগ পর্যন্ত উচ্চস্বরে বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করবেন। নারীরা নিজেদের শোনার মতো অনুচ্চ স্বরে তালবিয়া পাঠ করবেন।

ইহরামের পোশাক বিমানে চড়ার আগেই পরে নেয়া আমার মতে উত্তম। কারণ বিমানে স্বল্প জায়গা, অধিক যাত্রী এবং ওয়াশরুমের অসুবিধার কারণে মীকাত নিকটবর্তী হওয়ার পর প্রস্তুতি নিতে গিয়ে মীকাত অতিক্রম হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, পূর্বে ইহরামের পোশাক পরে নিলেও নিয়ত ও তালবিয়া করার পূর্ব পর্যন্ত ইহরামের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না।

তাওয়াফ

১) উমরাহ-এর উদ্দেশ্যে মাছযিদুল হারাম শরীফ উনাতে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করবেন এবং মাছযিদে প্রবেশের দু’য়া পড়বেনঃ (بِسْمِ اللَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ، وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ، وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ، مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ) উচ্চারণঃ বিছমিল্লাহি, ওয়াছ ছ্বলাতু ওয়াছ ছালামু য়ালা রছুলিল্লাহ। আ’উযু বিল্লাহিল য়াযীম, ওয়া বি ওয়াজহিহিল কারীম, ওয়া ছুলত্বানিহিল ক্বদীমি মিনাশ শাইত্বানির রজীম। আল্লাহুম্মাফতাহ লী আবওয়াবা রহমাতিক।

অতঃপর পাক পবিত্র অবস্থায় অজুর সহিত ক্বাবা শরীফ উনার দিকে অগ্রসর হবেন।

ক্বাবা শরীফ উনাকে প্রথম দেখার সময় মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হামদ, তাকবীর, তাহলীল, ছালাওয়াত ও দু’য়া করবেন। ফুক্বাহায়ে কিরাম এই দু’য়াটিও উল্লেখ করেছেনঃ (اللَّهُمَّ زِدْ هَذَا الْبَيْتَ تَشْرِيفًا وَتَعْظِيمًا وَتَكْرِيمًا وَمَهَابَةً، وَزِدْ مَنْ شَرَّفَهُ وَكَرَّمَهُ وَعَظَّمَهُ مِمَّنْ حَجَّهُ أَوِ اعْتَمَرَهُ تَشْرِيفًا وَتَكْرِيمًا وَتَعْظِيمًا وَبِرًّا) উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা যিদ হাযাল বাইতা তাশরীফাও ওয়া তা’যীমাও ওয়া তাকরীমাও ওয়া মাহাবাতান, ওয়া যিদ মান শাররাফাহু ওয়া কাররামাহু ওয়া আ’যযামাহু মিম্মান হাজ্জাহু আও ই’তামারাহু তাশরীফাও ওয়া তাকরীমাও ওয়া তা’যীমাও ওয়া বিররা।

অর্থঃ হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, এই ঘরকে আরো তাশরীফ, তা’যীম, তাকরীম ও মাহাবাত দান করুন। আর যারা হাজ্জ বা উমরাহর মাধ্যমে এই ঘরের সম্মান, মর্যাদা ও তা’যীম করেছেন, তাদের তাশরীফ, তাকরীম, তা’যীম ও নেকী বৃদ্ধি করুন।

ইমাম বাইহাক্বী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি তিনি উক্ত বর্ণনা সম্পর্কে বলেছেনঃ (هَذَا مُنْقَطِعٌ وَلَهُ شَاهِدٌ مُرْسَلٌ) অর্থাৎ, এই সনদটি মুনক্বাতি’, তবে এর একটি মুরছাল শাহিদ রয়েছে। কাজেই এটিকে ছ্বহীহ মারফূ’ হাদীছ হিসেবে না লিখে বর্ণিত দু’য়া হিসেবেই উল্লেখ করা হবে। মুরছাল শাহিদে (اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ، وَمِنْكَ السَّلَامُ، فَحَيِّنَا رَبَّنَا بِالسَّلَامِ) বাক্যটিও বর্ণিত রয়েছে। (বাইহাকী শরীফ, ছুনানুল কুবরা ৫/৭৩)

মুহরিম ব্যক্তি অন্তরে তাওয়াফের নিয়ত করবেন। অন্তরই নিয়তের মূল স্থান। উমরাহকারী হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার ইস্তিলাম করে তাওয়াফের প্রথম চক্কর শুরু করার সময় তালবিয়া পাঠ বন্ধ করবেন।

তাওয়াফ হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার বরাবর থেকে শুরু হবে এবং পূর্ণ সাত চক্কর শেষে হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার বরাবর এসেই শেষ হবে। বর্তমানে হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার বরাবর মাছযিদুল হারাম শরীফের দেয়ালে থাকা সবুজ আলোর চিহ্ন দিয়েও অবস্থান নির্ণয় করা যায়।

তাওয়াফের জন্য হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার কাছে পৌঁছার পর সেখানকার আমলগুলো নিম্নরূপে করার চেষ্টা করবেন।

ক) ভিড় না থাকলে হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার কাছে গিয়ে উনাকে চুম্বন করে তাওয়াফ শুরু করবেন। হযরত উমর ফারূক্ব রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনাকে চুম্বন করে বলেছিলেনঃ আমি জানি, আপনি একটি পাথর। আপনি কারো ক্ষতি বা উপকার করতে পারেন না। আমি যদি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনাকে আপনাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমিও আপনাকে চুম্বন করতাম না। (বুখারী শরীফ ১৫৯৭, মুছলিম শরীফ ১২৭০)

হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার ইস্তিলামের সময় (بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ) “বিছমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার” বলবেন।

খ) ভিড়ের কারণে হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনাকে চুম্বন করা সম্ভব না হলে ডান হাত দিয়ে স্পর্শ করবেন এবং যে হাত দিয়ে স্পর্শ করেছেন সেই হাত চুম্বন করবেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি বলেছেন, আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনাকে এভাবে করতে দেখার পর থেকে কখনো তা পরিত্যাগ করিনি। (মুছলিম শরীফ ১২৬৮)

গ) যদি হাত দিয়েও হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনাকে স্পর্শ করা সম্ভব না হয়, তাহলে লাঠি জাতীয় কোনো বস্তু দিয়ে উনাকে স্পর্শ করে সেই বস্তুটির যে অংশ দ্বারা স্পর্শ করেছেন, তা চুম্বন করা যায়। হযরত আবু তুফাইল রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনাকে উনার লাঠি দ্বারা হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনাকে ইস্তিলাম করে সেই লাঠি চুম্বন করতে দেখেছেন। (মুছলিম শরীফ ১২৭৫)

ঘ) বর্তমান সময়ে প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনাকে সরাসরি চুম্বন বা স্পর্শ করা সম্ভব না হলে উনার বরাবর এসে উনার দিকে মুখ করে ডান হাত উঁচু করে তাকবীর বলে ইশারা করবেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি তাওয়াফের সময় হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার বরাবর এসে উনার দিকে ইশারা করে তাকবীর বলেছেন। (বুখারী শরীফ ১৬১৩)

ঙ) প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনাকে চুম্বন বা স্পর্শ করতে গিয়ে মানুষকে ধাক্কা দেয়া, কষ্ট দেয়া, ঝগড়া বিবাদ বা গালিগালাজ করা যাবে না। এগুলো ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। তবে শুধু এ ধরনের গুনাহের কারণে উমরাহ বাতিল হয়ে যায় না।

তাওয়াফের শুরুতে ফুক্বাহায়ে কিরাম এই দু’য়াটিও উল্লেখ করেছেনঃ (اَللَّهُمَّ إِيمَانًا بِكَ وَتَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاءً بِعَهْدِكَ وَاتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ)

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা ঈমানাম বিকা ওয়া তাছদীক্বাম বিকিতাবিকা, ওয়া ওয়াফাআম বি’য়াহদিকা, ওয়াত্তিবা’য়ান লিছুন্নাতি নাবিয়্যিকা মুহাম্মাদিন ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম।

অর্থঃ হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আপনার প্রতি ঈমান, আপনার কিতাবের সত্যায়ন, আপনার অঙ্গীকার পূর্ণ করা এবং আপনার নবী মুহাম্মাদ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার ছুন্নতের অনুসরণের উদ্দেশ্যে তাওয়াফ করছি।

স্মরণীয় যে, এই পূর্ণ বাক্যটি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার থেকে ছ্বহীহ মারফূ’ সনদে সাব্যস্ত নয়। তবে এর বিভিন্ন অংশ ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহুম উনাদের থেকে মওকূফভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাই দু’য়া হিসেবে পড়া যাবে, কিন্তু ছ্বহীহ মারফূ’ হাদীছ হিসেবে উল্লেখ করা হবে না।

২) হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনাকে চুম্বন, স্পর্শ অথবা ইশারা করার পর ক্বাবা শরীফ উনাকে হাতের বাঁয়ে রেখে তাওয়াফ শুরু করবেন।

পুরুষদের জন্য উমরাহর তাওয়াফে সাত চক্করেই ইদ্বত্বিবা’য় করা ছুন্নত। ইদ্বত্বিবা’য় হলো উপরের চাদরটি ডান বগলের নিচ দিয়ে বের করে বাম কাঁধের উপর ফেলে দেয়া, যাতে ডান কাঁধ খোলা থাকে এবং বাম কাঁধ ঢাকা থাকে।

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার থেকে উমরাহর তাওয়াফে ইদ্বত্বিবা’য় করার য়া’মল বর্ণিত হয়েছে। (আবূ দাউদ শরীফ ১৮৮৩, ১৮৮৪)

পুরুষরা প্রথম ৩ চক্করে রমল করবেন এবং বাকি ৪ চক্কর স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন। রমল হচ্ছে ছোট ছোট পদক্ষেপে কাঁধ হালকা দুলিয়ে একটু দ্রুত ও দৃঢ়ভাবে হাঁটা। এটা দৌড়ানো নয়।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিতঃ (سَعَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلَاثَةَ أَشْوَاطٍ وَمَشَى أَرْبَعَةً فِي الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ) অর্থাৎ, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি হাজ্জ ও উমরাহর তাওয়াফে প্রথম ৩ চক্কর রমল করেছেন এবং বাকি ৪ চক্কর স্বাভাবিকভাবে হেঁটেছেন। (বুখারী শরীফ ১৬০৪)

মহিলারা রমল ও ইদ্বত্বিবা’য় করবেন না।

৩) রুকনে ইয়ামানী শরীফ উনার বরাবর এলে সম্ভব হলে ডান হাত দিয়ে উনাকে স্পর্শ করবেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি ক্বাবা শরীফের কোণসমূহের মধ্যে হাযারে আছওয়াদ শরীফ ও রুকনে ইয়ামানী শরীফ উনাদেরই ইস্তিলাম করতেন। (বুখারী শরীফ ১৬০৯, মুছলিম শরীফ ১২৬৭)

রুকনে ইয়ামানী শরীফ উনাকে স্পর্শ করা সম্ভব না হলে উনার দিকে ইশারা করবেন না।

৪) রুকনে ইয়ামানী শরীফ থেকে হাযারে আছওয়াদ শরীফ পর্যন্ত এই দু’য়া পড়া ছুন্নতঃ (رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ) উচ্চারণঃ রব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাছানাতাও ওয়া ফিল আখিরতি হাছানাতাও ওয়াক্বিনা য়াযাবান্নার।

অর্থঃ হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। (আবূ দাউদ শরীফ ১৮৯২)

তাওয়াফের অন্য অংশে নির্দিষ্ট কোনো দু’য়া বাধ্যতামূলক নয়। বেশি বেশি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার যিকির করবেন, হামদ করবেন, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত করবেন, ছালাওয়াত ও ছালাম পাঠ করবেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য নিজের ভাষাতেও দু’য়া করতে পারবেন।

হাজ্জ ও উমরাহতে দু’য়া ও যিকির অনুচ্চ স্বরে হওয়া উচিত বলে মনে করি।

৫) ক্বাবা শরীফ উনার নিকট দিয়ে তাওয়াফ করা সম্ভব হলে উত্তম। তবে ভিড়ের কারণে মানুষকে কষ্ট দেয়া অথবা নিজে কষ্টে পড়ার আশঙ্কা থাকলে দূর দিয়ে তাওয়াফ করবেন।

সাত চক্কর পূর্ণ হলে ইদ্বত্বিবা’য় শেষ করে ডান কাঁধ ঢেকে ফেলবেন।

৬) সাত চক্কর তাওয়াফ শেষ করে হযরত ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালাম উনার মাক্বামের দিকে অগ্রসর হবেন। মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ (وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى) অর্থাৎ, হযরত ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালাম উনার মাক্বামকে তোমরা নামাযের স্থান বানাও। (ছুরাহ আল বাক্বারাহ ২ঃ১২৫)

সম্ভব হলে হযরত ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালাম উনার মাক্বামকে নিজের ও ক্বাবা শরীফ উনার মাঝখানে রেখে দুই রকত নামায আদায় করবেন। অর্থাৎ মাক্বামে ইবরাহীম আপনার সামনে থাকবে এবং উনার পর ক্বাবা শরীফ থাকবেন।

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার বর্ণনায় এসেছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি তাওয়াফ শেষে মাক্বামে ইবরাহীমের দিকে অগ্রসর হয়ে (وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى) আয়াত শরীফ পাঠ করেন এবং মাক্বামে ইবরাহীমকে নিজের ও ক্বাবা শরীফের মাঝখানে রেখে নামায আদায় করেন।

এই দুই রকত নামাযের প্রথম রকতে ছুরাহ ফাতিহা শরীফের পর ছুরাহ কাফিরূন (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ) এবং দ্বিতীয় রকতে ছুরাহ ফাতিহা শরীফের পর ছুরাহ ইখলাছ শরীফ (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ) পড়া ছুন্নত। হযরত জাবির রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার দীর্ঘ হাদীছ শরীফে এই দুই ছুরাহ পাঠের বর্ণনাও রয়েছে। (মুছলিম শরীফ ১২১৮)

তাওয়াফের দুই রকয়াত নামায হানাফী মাযহাবে ওয়াজিব।

মাক্বামে ইবরাহীম য়ালাইহিছ ছালাম উনার পেছনে জায়গা পাওয়া না গেলে অথবা সেখানে নামায পড়লে তাওয়াফকারীদের কষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে মাছযিদুল হারাম শরীফের অন্য কোনো স্থানে এই দুই রকত নামায আদায় করবেন।

নামাযের মাকরূহ সময় হলে মাকরূহ সময় শেষ হওয়ার পর আদায় করবেন।

৭) নামায শেষ করার পর যমযম শরীফের পানি পান করবেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি বলেছেনঃ (سَقَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ زَمْزَمَ فَشَرِبَ وَهُوَ قَائِمٌ) অর্থাৎ, আমি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনাকে যমযম শরীফের পানি পান করিয়েছি এবং তিনি তা দাঁড়িয়ে পান করেছেন। (বুখারী শরীফ ১৬৩৭, মুছলিম শরীফ ২০২৭)

যমযম শরীফের পানি মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার নাম নিয়ে পেট ভরে পান করবেন এবং পান শেষে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার হামদ করবেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু যমযম শরীফ পান করার সময় এই দু’য়াটি পড়তেনঃ (اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا وَاسِعًا، وَشِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ) উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা ইন্নী আছআলুকা য়িলমান নাফি’য়ান, ওয়া রিযক্বান ওয়াছি’য়ান, ওয়া শিফাআম মিন কুল্লি দাআ।

অর্থঃ হে মহান আল্লাহ তা’য়ালা, আমি আপনার নিকট উপকারী ইলম, প্রশস্ত রিযিক্ব এবং সকল রোগ থেকে শিফা কামনা করছি।

এই দু’য়াটি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাছ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার য়া’মল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। তাই এটিকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার হাদীছ বলে উল্লেখ করা হবে না।

অতঃপর সম্ভব হলে পুনরায় হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার কাছে গিয়ে ইস্তিলাম করবেন। হযরত জাবির রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার দীর্ঘ হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি মাক্বামে ইবরাহীমের দুই রকত নামাযের পর পুনরায় হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার কাছে গিয়ে ইস্তিলাম করেন, অতঃপর ছ্বফা শরীফের দিকে অগ্রসর হন। (মুছলিম শরীফ ১২১৮)

ছ্বফা মারওয়া ছা’য়ই

শরী’য়তসম্মত ও ছুন্নতী পন্থায় ছা’য়ই-এর কাজ সম্পন্ন করা আবশ্যক। কিছু লোক মনে করেন, ছা’য়ই ছ্বফা থেকে শুরু হয়ে মারওয়া গিয়ে আবার ছ্বফাতে ফিরে আসলে এক চক্কর পূর্ণ হয়। এটি সঠিক নয়। হানাফী ফিক্বহের ছ্বহীহ ও প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী ছ্বফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত যাওয়া এক চক্কর এবং মারওয়া থেকে ছ্বফা পর্যন্ত ফিরে আসা দ্বিতীয় চক্কর। এভাবে সপ্তম চক্কর মারওয়ায় গিয়ে শেষ হবে।

ইমাম কাছানী রহমতুল্লাহী য়ালাইহি তিনি বলেন, ছা’য়ই সাত চক্কর। ছ্বফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত এক চক্কর এবং মারওয়া থেকে ছ্বফা পর্যন্ত আরেক চক্কর। উম্মতের ইজমা এবং রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার য়া’মল দ্বারা সাত চক্কর সাব্যস্ত।

তাওয়াফ ও দুই রকত নামাযের পর সম্ভব হলে পুনরায় হাযারে আছওয়াদ শরীফ উনার ইস্তিলাম করে ছ্বফা শরীফের দিকে অগ্রসর হবেন।

ছ্বফা শরীফের নিকটবর্তী হলে মহান আল্লাহ পাক উনার এই আয়াত শরীফ পাঠ করবেনঃ (إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ) অর্থাৎ, নিশ্চয়ই ছ্বফা ও মারওয়া মহান আল্লাহ পাক উনার নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। (ছুরাহ আল বাক্বারাহ ২:১৫৮)

অতঃপর রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি বলেছেনঃ (أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ পাক যা দিয়ে শুরু করেছেন, আমিও তা দিয়েই শুরু করছি। (মুছলিম শরীফ ১২১৮)

স্মরণীয় যে, (إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ) অংশটি মহান আল্লাহ পাক উনার কালাম এবং (أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللَّهُ بِهِ) অংশটি রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার বক্তব্য। দুটিকে একত্রে আয়াত শরীফ মনে করা যাবে না।

এরপর ছ্বফা শরীফের উপর এমন স্থানে উঠবেন, যেখান থেকে সম্ভব হলে ক্বাবা শরীফ উনাকে দেখা যায়। ক্বাবা শরীফ উনার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার তাওহীদ, বড়ত্ব ও প্রশংসা বর্ণনা করবেন।

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি বলেছিলেনঃ (لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ) উচ্চারণঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া য়ালা কুল্লি শাইয়িন ক্বদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু, আনজাযা ওয়া’দাহু, ওয়া নাছ্বারা য়াবদাহু, ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু।

অর্থঃ মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক, উনার কোনো শরীক নেই। সমস্ত রাজত্ব উনারই এবং সমস্ত প্রশংসাও উনারই। তিনি সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান। মহান আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক। তিনি উনার ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, উনার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রুদলগুলোকে পরাজিত করেছেন। (মুছলিম শরীফ ১২১৮)

অতঃপর নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের প্রয়োজনের জন্য দু’য়া করবেন। এরপর পুনরায় উপরোক্ত যিকর করবেন এবং আবার দু’য়া করবেন। এভাবে উক্ত যিকর তিনবার করবেন এবং এর মধ্যবর্তী সময়ে দু’য়া করবেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি ছ্বফা শরীফে এভাবে করেছেন। (মুছলিম শরীফ ১২১৮)

এরপর ছ্বফা শরীফ থেকে মারওয়া শরীফের দিকে ছা’য়ই শুরু করবেন। ছ্বফা থেকে মারওয়া পর্যন্ত যাওয়া প্রথম চক্কর।

স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে হাঁটতে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার যিকির, ইস্তিগফার, ছালাওয়াত, ক্বুরআন শরীফ তিলাওয়াত এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দু’য়া করতে পারবেন।

দুই সবুজ নিশানের মধ্যবর্তী অংশে পৌঁছালে সামর্থ্যবান পুরুষরা দ্রুতগতিতে চলবেন। এই দ্রুত চলা সাধারণ দৌড় নয়, বরং শক্তি ও তৎপরতার সঙ্গে দ্রুত অগ্রসর হওয়া। দ্বিতীয় সবুজ নিশান পার হলে আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটবেন।

মহিলারা দুই সবুজ নিশানের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই হাঁটবেন, দ্রুত চলবেন না।

দুই সবুজ নিশানের মধ্যবর্তী স্থানে এই দু’য়াটি পড়া যায়ঃ (رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ، إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ)

উচ্চারণঃ রব্বিগফির ওয়ারহাম, ইন্নাকা আনতাল আ’য়ায্যুল আকরাম। অর্থঃ হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি রহম করুন। নিশ্চয়ই আপনিই মহাপরাক্রমশালী, সর্বাধিক মহানুভব।

তবে স্মরণীয় যে, এটিকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম উনার থেকে ছ্বহীহ মারফূ’ হাদীছ হিসেবে বর্ণনা করা সঠিক নয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাছউদ রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনাদের থেকে ছা’য়ই-এর সময় এ দু’য়া পাঠ করার য়া’মল বর্ণিত হয়েছে। (মুছান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ ১৫৮০৭, ১৫৮১২)

অতঃপর স্বাভাবিক গতিতে মারওয়া শরীফের দিকে অগ্রসর হবেন। মারওয়া শরীফে পৌঁছালে প্রথম চক্কর পূর্ণ হবে।

মারওয়া শরীফের উপর উঠে সম্ভব হলে ক্বাবা শরীফ উনার দিকে মুখ করে দাঁড়াবেন এবং ছ্বফা শরীফে যেভাবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার তাওহীদ, তাকবীর, তাহলীল ও হামদ পাঠ করেছেন এবং দু’য়া করেছেন, মারওয়া শরীফেও একইভাবে করবেন।

রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি মারওয়া শরীফে ছ্বফা শরীফের মতোই যিকির ও দু’য়া করেছেন। (মুছলিম শরীফ ১২১৮)

অতঃপর মারওয়া শরীফ থেকে ছ্বফা শরীফের দিকে ফিরে আসবেন। এটি দ্বিতীয় চক্কর। পথের দুই সবুজ নিশানের মধ্যবর্তী স্থানে পুরুষরা আবার দ্রুত চলবেন এবং দ্বিতীয় সবুজ নিশান পার হলে স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবেন।

ছ্বফা শরীফে এসে আবার পূর্বের মতো যিকির ও দু’য়া করবেন।

একই নিয়মে সাত চক্কর পূর্ণ করবেনঃ

১ম চক্করঃ ছ্বফা থেকে মারওয়া।

২য় চক্করঃ মারওয়া থেকে ছ্বফা।

৩য় চক্করঃ ছ্বফা থেকে মারওয়া।

৪র্থ চক্করঃ মারওয়া থেকে ছ্বফা।

৫ম চক্করঃ ছ্বফা থেকে মারওয়া।

৬ষ্ঠ চক্করঃ মারওয়া থেকে ছ্বফা।

৭ম চক্করঃ ছ্বফা থেকে মারওয়া।

অতএব ছা’য়ই ছ্বফা শরীফ থেকে শুরু হবে এবং সপ্তম চক্কর মারওয়া শরীফে গিয়ে শেষ হবে।

হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতে ছ্বফা থেকে ছা’য়ই শুরু করা আবশ্যক। কেউ ভুল করে মারওয়া থেকে শুরু করলে মারওয়া থেকে ছ্বফা পর্যন্ত সেই প্রথম চলাকে চক্কর হিসেবে গণ্য করা হবে না। ছ্বফা থেকে মারওয়া যাওয়াটিই তার প্রথম গণ্য চক্কর হবে।

সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য নিজের পায়ে হেঁটে ছা’য়ই করা হানাফী মাযহাবে ওয়াজিব। অসুস্থতা, অক্ষমতা অথবা গ্রহণযোগ্য শরঈ ওযর থাকলে হুইলচেয়ার, বাহন অথবা অন্যের সাহায্যে ছা’য়ই করা যাবে।

উমরাহর ছা’য়ই অবশ্যই ইহরাম বহাল থাকা অবস্থায় সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাৎ ছা’য়ই শেষ করার পূর্বে হলক্ব বা ক্বছর করে ইহরাম থেকে হালাল হওয়া যাবে না। উমরাহর ক্রম হচ্ছেঃ ইহরাম, তাওয়াফ, ছা’য়ই, অতঃপর হলক্ব অথবা ক্বছর।

হলক্ব অথবা ক্বছর করা

ছা’য়ই-এর সপ্তম চক্কর মারওয়া শরীফে শেষ করার পর উমরাহকারী পুরুষ মাথার চুল মুণ্ডন করবেন অথবা ছোট করবেন।

হলক্ব অর্থ মাথার চুল মুণ্ডন করা এবং ক্বছর অর্থ মাথার চুল ছোট করা।

হলক্ব ও ক্বছর উভয়টাই বৈধ। তবে সাধারণ অবস্থায় পুরুষের জন্য হলক্ব ক্বছরের চেয়ে উত্তম। কেননা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়াছাল্লাম তিনি মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য একাধিকবার রহমতের দু’য়া করেছেন এবং পরবর্তীতে চুল ছোটকারীদের জন্যও দু’য়া করেছেন।

তবে তামাত্তু হাজ্জকারী যদি হাজ্জের খুব কাছাকাছি সময়ে উমরাহ সম্পন্ন করেন, তাহলে উমরাহর পর ক্বছর করা উত্তম, যাতে হাজ্জ সম্পন্ন করার পর হলক্ব করার জন্য মাথায় যথেষ্ট চুল অবশিষ্ট থাকে।

বিদায় হাজ্জের সময় যেসব ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহুম উনাদের সঙ্গে হাদী ছিল না এবং উমরাহ করে তামাত্তু করেছিলেন, উনারা চুল ছোট করে ইহরাম থেকে হালাল হয়েছিলেন। হাদীছ শরীফে এসেছেঃ (فَحَلَّ النَّاسُ كُلُّهُمْ وَقَصَّرُوا) অর্থাৎ, অতঃপর লোকেরা সবাই হালাল হলেন এবং চুল ছোট করলেন। (মুছলিম শরীফ ১২১৮)

হানাফী মাযহাব অনুযায়ী পুরুষের হলক্ব অথবা ক্বছরের ওয়াজিব ন্যূনতম পরিমাণ মাথার এক চতুর্থাংশ। ক্বছরের ক্ষেত্রে মাথার অন্তত এক চতুর্থাংশ চুলের অগ্রভাগ থেকে এক আঙুলের কর পরিমাণ কাটতে হবে। তবে পূর্ণ মাথার চুল মুণ্ডন করা অথবা পূর্ণ মাথার চুল সমানভাবে ক্বছর করা উত্তম।

যার মাথায় একেবারেই চুল নেই, হানাফী ফিক্বহ অনুযায়ী তার জন্য মাথার উপর ক্ষুর চালিয়ে হলক্বের সাদৃশ্য গ্রহণ করা মুস্তাহাব।

মহিলাদের জন্য হলক্ব নেই। তারা কেবল ক্বছর করবেন। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী মহিলার মাথার অন্তত এক চতুর্থাংশ চুলের অগ্রভাগ থেকে এক আঙুলের কর পরিমাণ ক্বছর করলেই ওয়াজিব পরিমাণ আদায় হবে। সমস্ত চুলের অগ্রভাগ থেকে ক্বছর করা উত্তম।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিআল্লাহু তা’য়ালা আনহুমা উনার থেকে বর্ণিত, উনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, একজন মহিলা কতটুকু চুল ক্বছর করবেন? তিনি এক আঙুলের কর পরিমাণের দিকে ইশারা করে বলেছেনঃ (مِثْلَ الْأُنْمُلَةِ) অর্থাৎ, “এই পরিমাণ।” হলক্ব অথবা ক্বছর করার মাধ্যমেই উমরাহকারী ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাবেন।

স্বতন্ত্র উমরাহকারী হলে হলক্ব বা ক্বছরের পর ইহরাম অবস্থায় তার জন্য যেসব হালাল বিষয় সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হয়েছিল, সেগুলো পুনরায় হালাল হয়ে যাবে।

তামাত্তু হাজ্জকারী হলে উমরাহর হলক্ব বা ক্বছরের পর সম্পূর্ণরূপে ইহরাম থেকে হালাল হয়ে যাবেন এবং ৮ জিলহাজ্জ অথবা হাজ্জের ইহরামে প্রবেশ করার সময় পর্যন্ত স্বাভাবিক হালাল অবস্থায় থাকবেন। এরপর হাজ্জের জন্য নতুন করে ইহরামে প্রবেশ করবেন।

ক্বিরান হাজ্জকারীর হুকুম আলাদা।

ক্বিরান হাজ্জকারী একই ইহরামে উমরাহ ও হাজ্জ উভয়টি আদায় করেন। তাই তিনি উমরাহর তাওয়াফ ও ছা’য়ই সম্পন্ন করার পর হলক্ব অথবা ক্বছর করবেন না এবং ইহরাম থেকেও হালাল হবেন না।

হানাফী ফিক্বহে ক্বিরান হাজ্জকারী সম্পর্কে স্পষ্ট বলা হয়েছে, তিনি প্রথমে উমরাহর সাত চক্কর তাওয়াফ করবেন, প্রথম তিন চক্করে রমল করবেন, ছা’য়ই করবেন, কিন্তু হলক্ব করবেন না। কারণ তিনি একই সঙ্গে হাজ্জের ইহরামেও রয়েছেন।

অতএব ক্বিরান হাজ্জকারী উমরাহর আমল সম্পন্ন করলেও উনার ইহরাম বহাল থাকবে এবং হাজ্জের নির্ধারিত আমল সম্পন্ন করার পরই তাহাল্লুল করবেন।

ইফরাদ হাজ্জকারীর বিষয়টি ক্বিরানের সঙ্গে এক নয়।

ইফরাদ হাজ্জকারী কেবল হাজ্জের নিয়তে ইহরামে প্রবেশ করেন, উমরাহর নিয়তে নয়। তাই “উমরাহ সম্পন্ন করার পর ইফরাদ হাজ্জকারী চুল কাটবেন না” বলা সঠিক নয়। কেননা ইফরাদ হাজ্জকারী উমরাহই করেননি। তিনি হাজ্জের ইহরামে থেকেই হাজ্জের আমলসমূহ সম্পন্ন করবেন।

সুতরাং উমরাহ সম্পন্ন হওয়ার পর অবস্থাগুলো হচ্ছেঃ স্বতন্ত্র উমরাহকারী হলে হলক্ব বা ক্বছরের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হালাল।

তামাত্তু হাজ্জকারী হলে উমরাহর পর হলক্ব বা ক্বছরের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হালাল, অতঃপর হাজ্জের জন্য নতুন ইহরাম।

ক্বিরান হাজ্জকারী হলে উমরাহর তাওয়াফ ও ছা’য়ই-এর পর হলক্ব বা ক্বছর নয়, বরং হাজ্জের ইহরামসহ একই ইহরামে বহাল থাকবেন।

ইফরাদ হাজ্জকারী উমরাহ পালন করেন না, তাই উমরাহর পর তাহাল্লুলের এই আলোচনা উনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

উপরোক্ত সকল আমল সম্পন্ন করে স্বতন্ত্র উমরাহকারী অথবা তামাত্তু হাজ্জকারী হলক্ব বা ক্বছর করার মাধ্যমে পবিত্র উমরাহ সম্পন্ন করবেন। অতঃপর গোসল করে স্বাভাবিক পোশাক পরিধান করতে পারবেন এবং ইহরাম অবস্থায় যেসব হালাল বিষয় সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ছিল সেগুলো পুনরায় হালাল হয়ে যাবে।

পবিত্র উমরাহ সম্পন্ন হওয়ার পর মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার শুকরিয়া আদায় করবেন, বেশি বেশি তাওবাহ ও ইস্তিগফার করবেন এবং নিজের উমরাহ মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে কবুল হওয়ার জন্য দু’য়া করবেন।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: