অনেক মানুষ মনে করে নফছের সবচেয়ে বড় চাল হলো গুনাহ। কিন্তু এটিই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। কারণ গুনাহ হলো নফছের প্রথম আঘাত, শেষ নয়। বাস্তবে নফছের শেষ চাল এতটাই সূক্ষ্ম যে সেখানে পৌঁছে মানুষ নিজেকেই সফল মনে করতে শুরু করে। সে ভাবে, এখন আমি বেঁচে গেছি, এখন আমি সামলে নিয়েছি, এখন আমার উপর নফছের আর কোনো প্রভাব নেই। আর ঠিক এই মুহূর্তেই নফছ তার শেষ আঘাতটি করে।
এই চাল চিৎকার করে আসে না। এটি নিঃশব্দে ক্বলবে আস্তানা গেড়ে নেয়। মানুষ টেরই পায় না যে সে ইতিমধ্যেই হেরে গেছে। অধিকাংশ মানুষ এই স্থানেই পড়ে যায়। কিন্তু তারা যেহেতু ইবাদতে থাকে, তাই তাদের মনে হয় তারা জিতে যাচ্ছে, পরাজয়ের চিন্তা-ফিকির তাদের ধারে কাছেও আসেনা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নফছের সেই শেষ চালটি কী? নফছ মানুষকে কোন ভ্রান্ত ধারণায় ফেলে? আর এই বিষয়ে কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম কোন বিষয়ে সতর্ক করেছেন?
এই রহস্য তখনই খুলে যায়, যখন আমরা নফছের সেই শেষ দরজাটিকে বুঝতে পারি।
কামিল ছুফিয়ায়ে কেরামরা বলেন নফছের শেষ চাল এটা নয় যে সে মানুষকে গুনাহের দিকে নিয়ে যাবে; বরং তার শেষ চাল হলো মানুষকে নিজের ইছলাহি থেকে বেপরোয়া করে দেবে। এটি সেই মাক্বাম, যেখানে মানুষ গুনাহ ছেড়ে দিয়েছে, নামাজী হয়েছে, জাকির হয়েছে, নিজে দ্বীনের আলোচনা নছিহত করে দিন কাটায়, ঠিক তখন ক্বলবের ভেতরে এক নীরব কণ্ঠ জন্ম নেয়, “এখন আমার তোমার কোন নসিহতের দরকার নেই।”
এই কণ্ঠই নফছের শেষ চাল। নফছের সবচেয়ে ভয়ংকর ভ্রান্তি। এখানে নফছ অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি খেলা খেলে। সে মানুষের অন্তরে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেয়, আমি তো এখন ঠিক হয়ে গেছি, আমি তো অন্যদের থেকে আলাদা, এসব কথা সাধারণ মানুষের জন্য, আমার জন্য নয়।
কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, নফছের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো মানুষকে এই বিশ্বাসে পৌঁছে দেওয়া যে সে এখন নিরাপদ। কারণ যেদিন মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করে, সেদিনই তার আত্মপর্যবেক্ষণ শেষ হয়ে যায়।
অনেকে এই কথা শুনে চমকে যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো নফছ ইবাদতের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। নামাজে, জিকিরে, ইলমে, এমনকি নীরব নেকিতেও। নফছ বলে, আমি নিয়মিত, আমি খাঁটি, আমি লোক দেখানো করি না। আর যে নেকির ওপর হৃদয় নিশ্চিন্ত হয়ে যায়, সেটাই নফছের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।
নফছের শেষ চালের একটি নীরব লক্ষণ হলো, নিজের চোখে অন্যদের দুর্বলতা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। সে নিজেকে কম কথা বলা মনে করে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে অন্যদের হিসাব রাখে। মুখে কিছু বলে না, কিন্তু অন্তরে বিচার করতে থাকে। এটি সেই স্তর, যেখানে নফছ কথা বলে না, শুধু রায় ঘোষণা দেয়। আর এই বিচারপ্রবণতাই নফছের শেষ বিজয়।
যখন মানুষ নফছের শেষ চালে পড়ে যায়, তখন তার কাছে নসিহত ভারী মনে হয়। সে বলে, এগুলো তো বহুবার শোনা কথা, আমার সব জানা আছে, এসব বয়ান অন্যদের জন্য। কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, যে হৃদয়ে নসিহত বোঝা হয়ে যায়, বুঝে নিও সেখানে নফছ সিংহাসনে বসে গেছে। কারণ জীবিত হৃদয় সবসময় নসিহতের মুখাপেক্ষী থাকে।
নফছ তখন ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যখন সে আর গুনাহের পথে থাকে না, বরং নেকির পথে চলতে চলতেই মানুষকে মহান আল্লাহ তায়ালা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এজন্যই দেখা যায়, কিছু মানুষ বাহ্যিকভাবে খুব ধার্মিক মনে হয়, কিন্তু তাদের হৃদয়ে কোমলতা নেই, দয়া নেই, বিনয় নেই। কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, যেখানে বিনয় শেষ হয়ে যায়, সেখানে যত ইবাদতই থাকুক নফছ জিন্দা থাকে।
যে ব্যক্তি নফছের শেষ চাল থেকে বাঁচতে চায়, তার একটি পরিচয় হলো সে নিজেকে সকল অবস্থায় ইছলাহীর মুখাপেক্ষী মনে করবে। সে কখনো বলবে না “আমি ঠিক আছি”; বরং বলবে “হে আল্লাহ তায়ালা, আমাকে রক্ষা করুন।” এই দোয়া নফছ সহ্য করতে পারে না।
নফছ সেদিনই হারে, যেদিন মানুষ নিজের নেকির থেকেও আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, বান্দা যখন নিজের নেকিকেও নিজের পক্ষে প্রমাণ বানায় না, তখন নফছ অসহায় হয়ে পড়ে।
নফছের শেষ চাল তখনই ব্যর্থ হয়, যখন মানুষ এমন একটি অবস্থা গ্রহণ করে, যেখানে নফছের কোনো অংশই অবশিষ্ট থাকে না। আর তা হলোঃ- সব অবস্থায় নিজেকে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সামনে সম্পূর্ণ মুখাপেক্ষী মনে করা। এটি শুধু মুখের কথা নয়; এটি হৃদয়ের গভীরে নেমে আসা একটি অবস্থা।
নফছ ভয় পায়, কারণ সে কোনো না কোনো ভরসা চায়, কোনো দাবি চায়, কোনো ভিত্তি চায়। কিন্তু যখন বান্দা মেনে নেয়, আমার বোঝাপড়া অসম্পূর্ণ, আমার ইবাদত দুর্বল, মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমত ছাড়া আমি কিছুই নই, তখন নফছ দাঁড়ানোর জায়গা পায় না।
এখানেই আত্মনির্ভরতা আর তাওয়াক্কুলের সূক্ষ্ম পার্থক্য স্পষ্ট হয়। আত্মনির্ভরতা হলো আমি পারব। আর তাওয়াক্কুল হলো হে মহান আল্লাহ তায়ালা, আপনি না ধরলে আমি কিছুই নই। নফছ আত্মনির্ভরতায় বাঁচে, আর তাওয়াক্কুলে মারা যায়।
নফছের শেষ আশ্রয় হলো মানুষের নিজের মতামত। যখন মানুষ ভাবে, আমার ধারণাই ঠিক, আমি ভালো জানি, তখন নফছ বেঁচে থাকে। কিন্তু যেদিন সে বলে “হে মহান আল্লাহ তায়ালা, যদি আমার বুঝ আপনার হুকুমের বিরুদ্ধে যায়, তবে তা আমার থেকে কেড়ে নিন” - এই দোয়া নফছের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।
কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলেন, প্রকৃত নীরবতা মানে শুধু না বলা নয়; বরং নিজের মতকে পেছনে সরিয়ে রাখা। সব জায়গায় নিজের কথা না বলা, অধিকার থাকা সত্ত্বেও বিতর্কে না জড়ানো, সব সময় নিজেকে প্রমাণ না করা। এগুলো নফছের শিকড় কেটে দেয়।
নফছের মৃত্যুর একটি লক্ষণ হলোঃ- মানুষের চিন্তা বদলে যায়। সে আর ভাবে না “আমি কেমন দেখাচ্ছি”; বরং ভাবে “মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে কেমন দেখছেন, তিনি কি আমার উপর সন্তুষ্ট?” এই পরিবর্তন এলে বুঝে নিও নফছের শেষ চাল ব্যর্থ হয়েছে।
কামিল ছুফিয়ায়ে কেরাম বলতেনঃ- প্রতিদিন নিজেকে অপরাধী মনে করে দিন শুরু করো, আর মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমতের আশা নিয়ে দিন শেষ করো। এই আচরণ নফছকে আবার মাথা তুলতে দেয় না। কারণ নফছ হয় হতাশায় বাঁচে, নয়তো অহংকারে আর এই পথ দুটোই বন্ধ করে দেয়।
সবশেষে নফছ পুরোপুরি ভেঙে যায় তখনই, যখন মানুষ তার মুক্তিকে নিজের চেষ্টা নয়, বরং মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রহমতের সঙ্গে যুক্ত করে। যখন হৃদয় থেকে বলে “হে মহান আল্লাহ তায়ালা, আপনি না বাঁচালে আমি কিছুই নই।”
কুরআন অনুসারে, নফছ সেখানে বাদশাহ যেখানে মওজুদ থাকেন না ইলাহ, তাই ইকবালের ভাষায় আল্লাহ থেকে দূরে রাখে এমন তালীম ও ফিত্না, মাল, সম্পদ, আওলাদও ফিত্না, না হক্বের বিরুদ্ধে উঠা শমশির ও ফিত্না, শমশির তো কিয়া, নারায়ে তাকবীর ফিত্না।
আর সকল ফিত্নার মূল হলো এই নফছ, হে মহান আল্লাহ তায়ালা, আমাদের এক মুহূর্তের জন্যও আমাদের নফছের হাতে ছেড়ে দিয়েন না। আমাদের হৃদয়কে বিনয়ের মধ্যে জীবিত রাখুন। আপনার রহমত ছাড়া আর কোনো ভরসার ওপর আমাদের ছেড়ে দিয়েন না।
এইখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, নফছের সকল ওয়ার থেকে যিনি
ব্যক্তিকে বাঁচাতে সাহায্য করেন তিনি হলেন মুর্শিদ। উপরে খোদা আর নিচে মুর্শিদ
হলেন নফছের সবচেয়ে বড় দুষমন, তাই ইনছান যখন নফছের পূজারী হয় তখন উভয় খালিক-মাখলুক
থেকে পালাতে থাকে। নফছ এমন এক চিজ, যে কেবল মুর্শিদে কামিলেই তাছলিম হয়, তার
সম্মুখে কোনঃ হুজুর, মুল্লা, মুফিত, মুহাদ্দিস, ইমাম, মুস্তাহিদ, শায়েখের ও বেইল
নাই কামিল মুর্শিদ ব্যতীত, তাই যাদের এই আকল আছে যে সে তার নফছকে কাবু করতে সক্ষম
নয়, সে তার ডাক্তার তথা মুর্শিদে কামিলেই চিকিৎসা নিক।

0 ফেইসবুক: