Sunday, January 18, 2026

একই দিনে ও চাঁদ না দেখেও ঈদ করা নিয়ে প্রোপ্যাগান্ডার পোষ্ট মর্টেম ও ফতওয়া

রায়ঃ খালি চোখে চাঁদ না দেখে হিসাবভিত্তিক হিজরি মাস নির্ধারণ বিদ’য়াত ও হারাম। মেঘলা হলে ৩০ দিন পূর্ণ না করে ২৯ দিনে মাস শুরু করা নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার হুকুমের বিরুদ্ধে অগ্রগামী হওয়া। এছাড়াও একই দিনে সারা পৃথিবীতে রমাদ্বন, ঈদ ও ক্বুরবানী পালন শরীয়ত-বিরোধী আ’মাল; এই বিদ’য়াতি ত্বরীকাহ অনুসারে করা সময়নির্ভর ঈবাদাত শরীয়তে মুহাম্মাদি অনুসারে বাতিল।

ফতওয়ার বিষয়ঃ

(১) খালি চোখে চাঁদ না দেখে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবে হিজরি মাস নির্ধারণ বিদ’য়াত। (২) একই দিনে সারা পৃথিবীতে রমাদ্বন, ঈদ, ক্বুরবানী পালন শরিয়ত-বিরোধী।

প্রথমে আল ক্বুরআনের স্পষ্ট নাছ্বঃ অর্থাৎ স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন, চূড়ান্ত নির্দেশ (পবিত্র আল ক্বুরআন বা ছ্বহীহ হাদিছের এমন বক্তব্য যার বিপরীতে কোনো ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য নয়।)

মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ) হে মুওমিনগণ! মহান আল্লাহ তায়ালা ও উনার রছুল ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনাদের সামনে অগ্রগামী হয়ো না। (ছুরাহ আল-হুজুরাত ৪৯:১) উক্ত আয়াত শরীফের নাছ্ব অনুযায়ী যে বিষয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা ও রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম স্পষ্ট হুকুম দিয়েছেন, সেখানে কারো “নিজস্ব পদ্ধতি” সামনে আনা শরীয়তসম্মত নয়; স্পষ্ট নাছ্বের বিরুদ্ধে কোনো ইজতিহাদের সুযোগ থাকে না।

মাস নির্ধারণে চাঁদের ব্যাপারে ক্বুরআনের সরাসরি নাছ্বঃ মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ (یَسۡـَٔلُوۡنَكَ عَنِ الۡاَهِلَّۃِ ؕ قُلۡ هِیَ مَوَاقِیۡتُ لِلنَّاسِ وَ الۡحَجِّ) তারা আপনাকে নতুন চাঁদগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। (ইয়া রছুলাল্লাহ ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম) আপনি বলে দিনঃ এগুলো মানুষের জন্য হজ্জ ও (ঈবাদাতের) ওয়াক্ত নির্ধারণের মাধ্যম। (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৯)।

তাফছির ইবন জারীর ত্ববারী (রহিমাহুল্লাহ)-এর আলোকে উক্ত আয়াতের নয়া চাঁদ ও ওয়াক্ত শব্দগুলির স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। উক্ত আয়াতে পাক-এর “আহিল্লা/চাঁদসমূহ” বলতে কেবল নতুন চাঁদের প্রথম রাত নয়; বরং চাঁদের উদয়, বৃদ্ধি, পূর্ণতা, ক্ষয়, অদৃশ্য হওয়া, চাঁদের পুরো পরিবর্তনশীল অবস্থা বোঝানো হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা এই পরিবর্তনকে মানুষের জন্য “মাওয়াক্বীত” অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় ও মেয়াদ নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে স্থির করেছেন। তাফছির অনুযায়ী, মানুষ চাঁদের এই অবস্থার মাধ্যমে, প্রত্যেক আরবি মাস, আইয়্যামুল্লাহ, রমাদ্বন শুরু ও শেষ করা, হজ্জ ও ক্বুরবানীর সময় নির্ধারন করা, নারীদের ইদ্দত নির্ধারণ করা, ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া বা পরিশোধের সময় জানা, ভাড়ার বা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া নির্ণয় করা, এমনকি কিছু বর্ণনায় তালাক ও হায়েজ-সংক্রান্ত সময়ও নির্ধারণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, শরীয়ত “আহিল্লা”কে সময়/ওয়াক্ত নির্ধারণের মাধ্যম করেছেন; কোনো ক্যালেন্ডার-উদ্ভাবিত আর্টিফিশিয়াল সিদ্ধান্তকে নয়।

রোজার শুরু ও শেষের বিষয়ে হাদিছের স্পষ্ট নাছ্বঃ রমাদ্বন শরীফ মাস শুরু-শেষের হুকুমকে একদম “শর্ত” হিসেবে স্থির করে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ، وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ، فَإِنْ غُبِّيَ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلاَثِينَ) চাঁদ দেখা গেলে তোমরা রোযা শুরু করো, আর চাঁদ দেখা গেলেই রোযা ভঙ্গ করো। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে তোমাদের কাছে চাঁদ আড়াল থাকে, তাহলে তোমরা শা’য়বান মাসের সংখ্যা পূর্ণ করে ত্রিশ দিন সম্পন্ন করো। (ছ্বহীহ আল-বুখারী ১৯০৯)। এখানে নাছ্বের শব্দ “لِرُؤْيَتِهِ” অর্থাৎ “দেখার কারণে/দেখার ভিত্তিতে।” সুতরাং মাস নির্ধারণের শর'য়ী ভিত্তি হলো “রু’ইয়াত”, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক “হিসাব” নয়।

এই একই হুকুমের নাছ্বের ভেতরেই মেঘলা অবস্থার বিধানও নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম চূড়ান্তভাবে বলে দিয়েছেনঃ (فَإِنْ غُبِّيَ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلاَثِينَ) “যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে তোমাদের কাছে চাঁদ আড়াল থাকে, তাহলে তোমরা শা’য়বান মাসের সংখ্যা পূর্ণ করে ত্রিশ দিন সম্পন্ন করো”। এই নাছ্বের ফলে “মেঘলা হলে কী করবো” এখানে কোনো ইজতিহাদ অবশিষ্ট থাকে না; শরীয়তের নির্ধারিত ব্যাক-আপ হলো “৩০ দিন পূর্ণ করা” অতএব, মেঘলা অবস্থায় “হিসাব বলছে চাঁদ উঠেছে, তাই মাস শুরু” এটা এই নাছ্বের সরাসরি বিরোধিতা, কারণ নাছ্ব বলছে “মেঘলা হলে ৩০ দিন পূর্ণ করো।”

উক্ত নাছ্বের সাথে আরেকটি হাদিছ শরীফের নাছ্ব পাওয়া যায়, যা ১০০% চাঁদ দেখার সম্ভবনা না থাকা স্বত্তেও হিসাব করে অমুক দিন সরকারী অনুসারে রোজা শুরু-শেষ, ক্বুরবানি, ঈদ পালন করা বাতিল বিদয়াতি আ’মাল।

হাদিছ শরীফে এসেছেনঃ (حَدَّثَنَا أَبُو مُوسَى، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ سِمَاكٍ، عَنْ عِكْرَمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلَالَ - يَعْنِي هِلَالَ رَمَضَانَ - فَقَالَ: "أَتَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ؟" قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: "أَتَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ؟" قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: "يَا بِلَالُ، أَذِّنْ فِي النَّاسِ فَلْيَصُومُوا غَدًا) আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আবু মূছা রহমতুল্লাহ, তিনি বর্ণনা করেন আব্দুর রহমান রহমতুল্লাহ থেকে, তিনি সুফিয়ান রহমতুল্লাহ থেকে, তিনি সিমাক রহমতুল্লাহ থেকে, তিনি ইকরিমা রহমতুল্লাহ থেকে এবং তিনি ইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেনঃ এক বেদুইন নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার নিকট এসে বললেন, “আমি নতুন চাঁদ দেখেছি (অর্থাৎ রমজানের চাঁদ)”। নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে মহান আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই”? তিনি বললেন, “হ্যাঁ”। নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আমি মুহাম্মাদ মহান আল্লাহ তায়ালা উনার রছুল”? তিনি বললেন, “হ্যাঁ”। তখন নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেন, “হে বিলাল! মানুষের মাঝে ঘোষণা করে দাও যেন তারা আগামীকাল রোজা রাখে”। (ছ্বহীহ ইবনে খুজাইমা ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯১০)

এই হাদিসের পূর্ণ ঘটনা এবং এর প্রেক্ষাপটঃ ঘটনাটি নিছক একটি সাক্ষ্য প্রদান ছিল না, বরং ইছলামিক মাস নির্ধারনের এটি ছিল একটি চূড়ান্ত নববী পদ্ধতি, এর বাহীরে গিয়ে যাই করা হবে তাই বিদয়াত বাতিল বলেই গন্য হবে।

প্রেক্ষাপটঃ সময়টি ছিল শা’য়বান মাসের ২৯ তারিখ দিবাগত রাত। মদিনা শরীফের আকাশে চাঁদ দেখা নিয়ে সংশয় ছিল। আকাশ মেঘলা থাকার কারণে মদিনা শরীফের সাধারণ মানুষ বা ছ্বহাবীগণ চাঁদ দেখতে পাননি। ফলে সবাই ধরে নিয়েছিলেন যে পরদিন রোজা হবে না এবং শা’য়বান মাস ৩০ দিন পূর্ণ হবে। ঠিক সেই মুহূর্তে মদিনার বাইরের মরু অঞ্চল থেকে এক আ’য়রবি (বেদুইন বা গ্রাম্য লোক) নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার দরবারে এসে হাজির হোন। তিনি এসে দাবি করেন যে তিনি নতুন চাঁদ (হিলাল) দেখেছেন। এইখানে এই বিষয় চূড়ান্তভাবে আজকের আকাশ মেঘে ঢাকা থাকলে টেলিস্কোপ লাগিয়ে জোর করে চাঁদ দেখে মাস শুরু-শেষ করাকে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে, কেননা খোদ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম হিসাব করেন নাই জ্যোতির্বিজ্ঞান দিয়ে, নাকি যারা আজকে এইসব করছে তারা এই আক্বিদাহ রাখে, “রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার এই জ্ঞান ছিলো না? বা উনার জামানায় জ্যোতির্বিজ্ঞান বলে কোন কিছুই ছিলোনা? রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নতুন চাঁদ কবে উঠবে এর কোন জ্ঞান ছিলোনা বলে ৩০ দিন পূর্ন করতেন? তাদের এই জ্ঞান হয়েছে তাই তারা নববী পদ্ধতীকে স্কিপ করে জ্যোতির্বিদদের ছুন্নতের অনুসরণ করছে?

অথচ ২৯ দিনের দিন আকাশ মেঘলা থাকার কারনে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ৩০ দিন পূর্ন করার নির্দেশ দিলেন, খাতা কলম নিয়ে হিসাবে বসেন নাই, অপরদিকে মদিনার মরুভূমির একজন বেদুইন যখন এসে বল্লেন যে আমি চাঁদ দেখেছি, তখন তিনি লোকটির বিশ্বস্ততা বা “ঈমানী মানদণ্ড” যাচাই করলেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম-উনার প্রশ্নগুলো ছিল এমনঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লামঃ “তুমি কি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” স্বীকার করো? বেদুইন বললেনঃ “হাঁ” রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম আবারো বললেনঃ “তুমি কি সাক্ষ্য দাও আমি আল্লাহ তায়ালা উনার রছুল” বেদুইন বললেনঃ “হাঁ” অর্থাৎ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নিশ্চিত হলেন যে লোকটি একজন মুছলিম। একজন মুছলিমের দেওয়া খবর (বিশেষ করে ঈবাদাতের বিষয়ে) সম্মানিত দ্বীন ইছলামে গ্রহণযোগ্য হয়ে গেলো কিয়ামত পর্যন্ত।

তাৎক্ষণিক পূর্বের সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা বাতিল করতে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম কোনো দ্বিধা করেননি। তিনি তৎক্ষণাৎ হযরত বিলাল রদ্বিআল্লাহু আনহুকে ডাকলেন। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বললেনঃ “হে বিলাল” মানুষের মাঝে ঘোষণা করে দাও, তারা যেন আগামীকাল অবশ্যই রোজা রাখে”। এই একটি ঘটনার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়ে গেল যে, রমজানের চাঁদ দেখার জন্য বিশাল জনসমষ্টির সাক্ষ্যও জরুরি নয়, যদি আকাশ মেঘলা থাকে তবে একজন বিশ্বস্ত মুছলিমের সাক্ষ্যই যথেষ্ট। কিন্তু য়ীলম থাকার পরেও জ্যোতির্বিদ্যার আলোকে মাস নির্ধারন করেন নাই।

এই পূর্ণ ঘটনা থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়ঃ

ব্যক্তিগত সাক্ষ্য বনাম রাষ্ট্রীয় প্রযুক্তিঃ রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ওই ব্যক্তির চোখকে বিশ্বাস করেছেন। তিনি কোনো টেলিস্কোপ বা অন্য শহরের খবরের জন্য অপেক্ষা করেননি।

দ্রুত সিদ্ধান্তঃ দ্বীনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে কোনো কমিটি বা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই যদি ক্বুরআন-ছুন্নাহর মূলনীতি সামনে থাকে।

গ্রাম বনাম শহরঃ মদিনার শহরের ভেতরে চাঁদ দেখা যায়নি, কিন্তু মদিনার অদূরে মরুভূমিতে একই অঞ্চলে চাঁদ দেখা গিয়েছিল। রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম সেই আঞ্চলিক চাঁদ দেখাকে গ্রহণ করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে ইছলাম “লোকাল সাইটিং” বা স্থানীয় দর্শনকে কতটা গুরুত্ব দেয়।

দুই একজন ছাড়া উক্ত ইমামগণ সহ ৪ মাজহাবের সকল ফকিহগণ উক্ত হাদিছ শরীফটিকে নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন এবং উনাদের কিতাবে স্থান দিয়েছেনঃ

-> ছ্বহীহ ইবনে খুজাইমা হাদিছ নং: ১৯১০, ইমাম ইবনে খুজাইমা এটিকে উনার ছ্বহীহ গ্রন্থে এনেছেন, যার অর্থ উনার মতে এটি ছ্বহীহ

-> ছ্বহীহ ইবনে হিব্বান হাদিছ নং: ৩৪৪১ তিনিও একে ছ্বহীহ বলেছেন।

-> আল-মুস্তাদরাক আলাছ ছ্বহীহাইন, ইমাম হাকিম একে ছ্বহীহ বলেছেন এবং ইমাম যাহাবী উনার এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করেছেন।

-> ছুনানে আবু দাউদে ২৩৪০, ইমাম আবু দাউদ হাদিছ শরীফটি বর্ণনা করার পর কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেননি, সুকুত ইখতিয়ার করেছেন। উনার মূলনীতি অনুযায়ী, যা নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন না, তা “হাছান” বা আ’মালযোগ্য।

এছাড়াও স্পষ্ট নাছ্ব দ্বারা যেটা পাওয়া যায় সেটা হলোঃ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবকে শুরু-শেষের ভিত্তি বানানো বাতিল বলে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ (إِنَّا أُمَّةٌ أُمِّيَّةٌ لَا نَكْتُبُ وَلَا نَحْسُبُ الشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا - وَعَقَدَ الإِبْهَامَ فِي الثَّالِثَةِ - وَالشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا) নিশ্চয়ই আমার উম্মতের অধিকাংশ উম্মি; (মাস গণনার বিষয়ে) আমরা লিখিও না এবং হিসাবও করি না। মাস কখনো এমন হয়, কখনো এমন হয়, কখনো এমন হয় এ সময় তিনি তৃতীয়বারে বৃদ্ধাঙ্গুলি ভাঁজ করলেন, অর্থাৎ কোনো মাস কখনো ঊনত্রিশ দিনের হয়; আবার মাস কখনো এমন হয়, কখনো এমন হয়, কখনো এমন হয়, অর্থাৎ কোনো মাস ত্রিশ দিনেরও হয়। (ছ্বহিহ বুখারী ১৯১৩, ছ্বহিহ মুছলিম ১০৮০) এই নাছ্বের মধ্যে “الشَّهْرُ” শব্দ নিজেই প্রসঙ্গকে মাস নির্ধারণে লক করে দেয়; ফলে “হিসাবকে মাস নির্ধারণের চূড়ান্ত ভিত্তি” বানানো নবীজির ঘোষিত সুন্নাহ-বিরোধী পদ্ধতি।

অতএব প্রথম সাবজেক্টের ফয়সালা স্পষ্ট নাছ্ব-ভিত্তিকভাবে এই দাঁড়ায়ঃ যে ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ “রু’ইয়াত” ও “মেঘলা হলে ৩০ পূর্ণ” এই ছুন্নাহ-শর্ত বাদ দিয়ে শুধু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবকে মাস নির্ধারণের ভিত্তি বানায়, সে স্পষ্ট নাছ্বের বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন নিয়ম স্থাপন করে; এটি বিদ’য়াত এবং হারাম। কারণ এখানে কেবল “সহায়ক তথ্য” নয়, বরং নাছ্বের-স্থিরকৃত শর্তকে সরিয়ে দিয়ে বিকল্প ভিত্তি বসানো হচ্ছে, যা ছুরাহ (৪৯:১)-এর “لَا تُقَدِّمُوا” এর আওতায়ও পড়ে।

অতএব স্পষ্ট ফতওয়া হলোঃ চাঁদ খালি চোখে দেখেই যেকোন আরবি মাস শুরু করতে হবে, মেঘলা থাকলে হিসাব বা দূরবীন লাগিয়ে দেখে ২৯ দিনে মাস শেষ করা হারাম, ঈবাদাত করা বিদয়াতে ছাইয়্যিয়াহ।

এখন দ্বিতীয় সাবজেক্টঃ “একই দিনে সারা পৃথিবীতে রমাদ্বান, ঈদ, ক্বুরবানী”-এর বিরোধিতা কেবল যুক্তিসঙ্গতই নয়, বরং ছ্বহীহ হাদিছ শরীফের সরাসরি নাছ্ব। ছ্বহীহ মুছলিমে কুরাইব রদ্বিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন তিনি শামে ছিলেন এবং সেখানে শুক্রবার রাতে চাঁদ দেখা হলো; পরে মদীনায় এসে ইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহুকে জানালেন যে মু'য়াবিয়া রদ্বিআল্লাহু আনহু সহ শামের লোকেরা শুক্রবার রাতের রু’ইয়াতে রোযা শুরু করেছে। ইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহু বললেনঃ (لَكِنَّا رَأَيْنَاهُ لَيْلَةَ السَّبْتِ، فَلَا نَزَالُ نَصُومُ حَتَّى نُكْمِلَ ثَلَاثِينَ أَوْ نَرَاهُ) কিন্তু আমরা শনিবার রাতে চাঁদ দেখেছি; তাই আমরা রোযা পালন করতে থাকব, যতক্ষণ না ত্রিশ দিন পূর্ণ করি অথবা আবার চাঁদ দেখি। কুরাইব রদ্বিআল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেনঃ (أَوَلَا تَكْتَفِي بِرُؤْيَةِ مُعَاوِيَةَ وَصِيَامِهِ؟) তাহলে কি মু‘আবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান–এর চাঁদ দেখা এবং তাঁর রোযা রাখাই কি যথেষ্ট নয়? তখন ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু য়ানহু বললেনঃ (لَا، هَكَذَا أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَ آلِهِ وَسَلَّمَ) না; আমাদেরকে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম এভাবেই পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। (ছ্বহিহ আবু দাউদ ২৩৩২, ছ্বহীহ মুছলিম ১০৮৭)।

এই নাছ্ব দ্বারা প্রমাণিত যে শাম-মদীনার মতো নিকটবর্তী শহর (দামেশক থেকে মদীনা পর্যন্ত দূরত্ব আনুমানিক ১,৩০০-১,৪০০ কিলোমিটার ছিলো) একই মুছলিম শাসন-পরিসরে থেকেও, ছ্বহাবায়ে কিরাম রদ্বিআল্লাহু আনহুমদের আ’মাল ছিল স্থানীয়/অঞ্চলগত রু’ইয়াত অনুযায়ী; ফলে “বিশ্বব্যাপী একদিনের আলাপ করা” ছুন্নাহ-সম্মত নয়। যখন ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু, যিনি মুফাসসির ও মুহাদ্দিস ছ্বহাবী, শামের রু’ইয়াতকে মদীনার উপর একদিনে চাপাননি, তখন আজ আমাদের পক্ষে “সারা পৃথিবী একদিন” এমন ধৃষ্টতা দেখানো নাযায়েজ, হারাম, বাতিল, বিদয়াতি আক্বিদাহ।

এখন মনগড়া দিনের “ঈবাদাত বাতিল” কীভাবে হয়, এই অংশটি নাছ্ব দিয়ে স্থাপন করা প্রয়োজনঃ এখানেও ছ্বহীহ নাছ্ব আছে, যে সময়-শর্ত ভাঙলে ঈবাদাত বাতিল হয়। ছ্বহীহ বুখারী ও মুছলিমে এসেছে, এক ছ্বহাবী য়ীদের দিন নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছ্বলাতের আগে ক্বুরবানী করে ফেললে রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম বলেনঃ (شَاتُكَ شَاةُ لَحْمٍ) “তোমারটা ক্বুরবানী নয়; এটা কেবল গোশত।” (ছ্বহিহ আবু দাউদ ২৮০১) এই নাছ্ব প্রমাণ করেন, ঈবাদাতের ক্ষেত্রে শরীয়ত নির্ধারিত সময়/শর্ত অতিক্রম বা লঙ্ঘন করলে, যা রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম নির্ধারন করে দিয়েছেন, উত্তম নিয়ত থাকলেও, ঈবাদাত ঈবাদাত হিসেবে গণ্য হয় না। অতএব, রমাদ্বন/ঈদ/ক্বুরবানীর মতো সময়নির্ভর ইবাদতে শরীয়তের নির্ধারিত ট্রিগার (রু’ইয়াত অথবা মেঘলা হলে ৩০ পূর্ণ) বাদ দিয়ে “হিসাব-ভিত্তিক আগাম শুরু” করা হলে, তা একই উসূলের অধীনে পড়ে, ঈবাদাতের শরীয়ত নির্ধারিত শর্তের বাইরে গিয়ে সংঘটিত হচ্ছে; ফলে তা বাতিল, বাতিল, বাতিল।

চূড়ান্ত ফতোয়া এই যেঃ পবিত্র আল ক্বুরআন ও ছ্বহীহ হাদিছের স্পষ্ট নস দ্বারা প্রমাণিতঃ-

(ক) রমাদ্বান শুরু-শেষ এবং মাস নির্ধারণের শরঈ ভিত্তি হলেন রু’ইয়াত(খালি চোখে দেখা); মেঘলা হলে নাছ্বের হুকুম হলো ৩০ দিন পূর্ণ করা; সুতরাং খালি চোখে চাঁদ না দেখে কেবল হিসাবের উপর মাস নির্ধারণ বিদ’য়াত ও হারাম। কেননা নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম যদি জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব নিতেন, তবে ওই বেদুইনের সাক্ষ্য দেওয়ার আগেই তিনি জানতেন চাঁদ উঠেছে কি না। কিন্তু তিনি হিসাবকে পাত্তা না দিয়ে “চোখে দেখা” (রু’ইয়াত)-কে দ্বীনি সিদ্ধান্ত বা “চূড়ান্ত ফয়সালা”র মানদণ্ড বানিয়েছেন।

(খ) মদিনার মানুষ চাঁদ দেখেনি, কিন্তু মদিনার অদূরে একজন গ্রাম্য লোক চাঁদ দেখেছেন। নবীজি ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম পার্শ্ববর্তী এলাকার সেই সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। তিনি কিন্তু পারস্য, সিরিয়া, রোম কিংবা সুদূর ইয়ামেন থেকে কোনো সংবাদ আসার অপেক্ষা করেননি। আর ছ্বহীহ মুছলিমের কুরাইব–ইবনে আব্বাস রদ্বিআল্লাহু আনহুমার নাছ্ব দ্বারাও প্রমাণিত, এক অঞ্চলের রু’ইয়াত অন্য অঞ্চলে বাধ্যতামূলকভাবে একদিনে চাপানো রছুলে পাক ছ্বল্লাল্লাহু য়ালাইহি ওয়া আলিহি ওয়া ছাল্লাম উনার ছুন্নাহ-এঁর বিপরীতে বিদয়াত; সুতরাং “বিশ্বব্যাপী একই দিনে রমাদ্বান/ঈদ/ক্বুরবানী” শরীয়ত-বিরোধী বিদয়াতী আ’মাল।

(গ) সময়/শর্ত ভেঙে ঈবাদাত করলে তা ঈবাদাত হয় না, এর নাছ্ব “شَاتُكَ شَاةُ لَحْمٍ”। অতএব বিদ’য়াতি ত্বরীকাহ অনুসারে মাস নির্ধারণ করে করা এই সময়নির্ভর ঈবাদাত শরঈ মানদণ্ডে বাতিল।

(ঘ) “ব্লাক-আউট” পরিস্থিতিতেঃ আজকে যারা প্রযুক্তি নির্ভর, ব্লাক-আউট হলে তারা কী করবে? বেদুইনের ঐ হাদিছ শরীফটিই তার উত্তর। মহান আল্লাহ তা’য়ালা উনার সম্মানিত দ্বীন ইছলাম এতই সহজ যে, ইন্টারনেট, টেলিফোন, বিদ্যুৎ কোন কিছুর উপর নির্ভরশীল হতে হয়না, বরং ওই বেদুইন ব্যক্তির মতো একজন সাধারণ মুছলিমের চোখে দেখাই পুরো অঞ্চলে ঈবাদাত শুরু করার জন্য যথেষ্ট। যারা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে আরবি মাস শুরু-শেষ এর বিষয়ে, তারা আসলে ছুন্নতের এই স্বনির্ভর পদ্ধতিকে অস্বীকার করছে।


সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুনঃ

এডমিন

আমার লিখা এবং প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বে আইনি।

0 ফেইসবুক: